দেবযানী চৌধুরী
কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদগামী বাসটা যখন রাতের অন্ধকারে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে এগোচ্ছিল, তখন অভিষেক মুখার্জি জানালার কাঁচের বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, সে কি সত্যিই এমন কিছু পাবে যেটা রিপোর্টে ব্যবহারযোগ্য? বছর দুয়েক হল সে এক অনলাইন নিউজ চ্যানেলে কাজ করছে—”রিয়েল শ্যাডো”—যেখানে তাকে পাঠানো হয় গ্রামীণ অলৌকিক ঘটনার অনুসন্ধানে। ভূত, প্রেত, চুড়েল, পেত্নী—এইসব নিয়ে সাধারণত ভিডিও বানানো হয়, আর টাইটেল হয় “Real Ghost Spotted in West Bengal” টাইপের। কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা কৌতূহল নিয়েই সে এসেছিল। কিন্তু এইবারের গন্তব্য একটু আলাদা। মুর্শিদাবাদের এক অজপাড়া গ্রাম—ভাঙ্গাড়িপুর, যেখানে এক বৃদ্ধা থাকেন একা, শ্মশানের পাশে। গ্রামবাসীরা বলেন, তার ঘরে মৃতরা কথা বলেন। তাকে সবাই ডাকে “শ্মশানবালা” নামে। কাকে যেন ফোনে বলেছিলেন তার এক সহকর্মী—“ওই বৃদ্ধা নাকি সত্যিই মৃতের আত্মা ডাকে, শোনো… অদ্ভুত জিনিস পাওয়া গেছে ক্যামেরায়।” তার আগ্রহ তখনই চরমে উঠেছিল। বাস থেমে যায় কাঁচা রাস্তার মোড়ে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে অভিষেক পৌঁছায় সেই ছোট গ্রামে। ডাকবাংলোয় থাকার বন্দোবস্ত আগে থেকেই করা ছিল। দরজায় নক করতেই ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার সুধীরবাবু তাকিয়ে বলে ওঠেন, “আপনি সাংবাদিক বাবু তো? শ্মশানের দিকে যাবেন শুনলাম? সাবধান থাকবেন… বালামা কিন্তু মানুষ না…” কথাটা শুনে অভিষেকের ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি। সে নিজের ব্যাগ রাখে, ক্যামেরা, টর্চ, ডায়েরি বার করে রাখে। তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন: লোকেরা যাকে ভয় পায়, সে আদতে কী?
পরদিন সকালে সে ঘুরে দেখে গ্রামটাকে। মাটির ঘর, তাল গাছ, পুকুর, আর তার বাইরের দিকে শ্মশান। দূরে কুয়াশায় ঢাকা একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর, খড়ের ছাউনি, পাশে পোড়া কাঠের স্তূপ। সেই ঘরেই থাকেন “শ্মশানবালা”। গ্রামের একজন বৃদ্ধা বলেন—“বিয়ের পর নাকি এসেছিলেন, স্বামী ছিল তান্ত্রিক। শ্মশানে বসে তপস্যা করত। একরাতে আগুনে আত্মাহুতি দেয়, আর সেই থেকে বালামা একা ওই ঘরে থাকে। মানুষজন কাছেও যায় না।” অভিষেক ক্যামেরা বের করে কিছু ক্লিপ নেয়। পাশেই দেখা মেলে একজন উলঙ্গ, রঙ্গিন কাপড়ে মোড়া ছন্নছাড়া মানুষ—পাগলা মাধব, যার কাজ শ্মশানে দাহের সময় কাঠ জোগাড় করে দেওয়া। অভিষেক এগিয়ে যায় মাধবের দিকে। “শোনেন, এই বৃদ্ধা… মানে শ্মশানবালা… উনি এখন কেমন আছেন?” মাধব হেসে বলে ওঠে—“ওঁর ঘরে কেউ বাঁচে না… রাতে গেলে ফিরে আসে ছায়া হয়ে…” অভিষেক হাসে, “আপনি কি ভূতে বিশ্বাস করেন?” মাধব কিছু না বলে একটা ছেঁড়া লাল কাপড়ের গেরো খুলে ভিতর থেকে একটা পুরনো হাঁড়ির টুকরো বার করে দেয়—মাথার খুলি। “শ্মশানবালার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল এটা। আমার কাছে রেখে দিয়েছি।” অভিষেক প্রথমবারের মতো সামান্য অস্বস্তি বোধ করে। সবকিছু যেন একটু বেশিই বাস্তব মনে হচ্ছে। কিন্তু সে নিজেকে দৃঢ় রাখে। রাতে সে ঠিক করে শ্মশানবালার ঘরের কাছাকাছি থাকবে। সুধীরবাবু তাকে বলে—“ভোরে উঠে যাবেন, রাতে ওখানে থাকবেন না।” অভিষেক হেসে বলে, “রাতেই তো ওসব বোঝা যায়। দিনের বেলা কেউ ভূত দেখে না।”
রাত গাঢ় হয়। অভিষেক একটি ছোট ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে দেয় শ্মশানবালার ঘরের মুখোমুখি দূরত্বে। সে নিজে বসে একটি গাছের পাশে, নিজের ডায়েরি খুলে লিখতে থাকে—“রাত ১২টা, শ্মশানবালার ঘরে কোনও শব্দ নেই। কিন্তু বাতাসে একটা ভিন্ন ধরনের গন্ধ… যেন পুরনো ধূপের সঙ্গে পচা কাঠ মেশানো। আশেপাশে কুকুর ডেকে উঠছে। আলো ধরা পড়ছে ক্যামেরায়, যদিও কোথাও কোনও আলো নেই।” ঠিক তখনই হঠাৎ ঝপ করে দরজা খুলে যায়। অভিষেক চমকে ওঠে। কিন্তু কেউ বেরোয় না। দূর থেকে ঘরের ভিতর থেকে মন্ত্রোচ্চারণের মতো আওয়াজ ভেসে আসে। ধোঁয়ার মতো কিছু একটা ঘরের ভিতর ঘুরছে, সে স্পষ্ট দেখতে পায়। ক্যামেরার লেন্স ক্লিক ক্লিক করে—ধরা পড়ছে প্রতিটি মুহূর্ত। সে উঠে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে ঘরের দিকে এগোয়। ভিতরে যাওয়ার আগেই দরজাটা আবার নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। ঠান্ডা হাওয়া চারপাশে ঘুরে ওঠে। পেছন থেকে কে যেন ফিসফিসিয়ে বলে—“ফিরে যা… না হলে ওরা তোকে নেবে।” অভিষেক পিছনে তাকায়, কেউ নেই। মাথার চুল খাড়া হয়ে যায়, তবুও সে সাহস করে দাঁড়িয়ে থাকে। রাত গড়ায়, ক্যামেরার ফুটেজে আলোর ফ্ল্যাশ, কুয়াশা, আর এক নারীকণ্ঠে দূর থেকে শোনা যায়—“সব পাপের শেষ আছে…”। সকালবেলা সে ঘুম থেকে উঠে দেখে নিজেকে ডাকবাংলোর বিছানায়। সুধীরবাবু অবাক হয়ে বলে—“আপনাকে তো রাতে কেউ খুঁজে পাচ্ছিল না বাবু! আপনি ওই শ্মশানে গিয়ে কোথায় হারিয়ে গেলেন?” অভিষেক তার ক্যামেরা দেখে, কিন্তু ফুটেজের কিছু অংশ ধোঁয়াচ্ছন্ন। তার ডায়েরির শেষ পাতায় সে নিজেই কিছু লিখে রেখেছে—“ওরা কথা বলে… আমি শুনেছি… আমি ফিরেছি, কিন্তু কেউ সঙ্গে এসেছে…”
–
পরদিন দুপুরে স্নান সেরে, অভিষেক নিজের ক্যামেরার ফুটেজ একবার ভাল করে বসে চেক করতে শুরু করল। প্রথম দিকে সব স্বাভাবিক ছিল—ক্যামেরা স্থির, সামনের গাছপালা নড়ছে বাতাসে, দূরে কুকুরের ডাক। কিন্তু রাত ১২টার পর, এক অদ্ভুত ঝাপসা কুয়াশা ক্যামেরার লেন্সে জমতে থাকে, যেন ভেতর থেকে কেউ ধোঁয়া ছাড়ছে। কিছু সময় পরে ক্যামেরার ডান দিক দিয়ে এক নারীর আবছা ছায়া হেঁটে যায়—তার মুখ দেখা যায় না, শুধু সাদা ধবধবে চুল আর মাথা নিচু করা অবস্থা। অভিষেক থমকে যায়। সে তো নিশ্চিত সে রাতে কেউই আসেনি ওই ঘরের সামনে, এমনকি দরজাও নিজে থেকেই বন্ধ হয়েছিল। এই দৃশ্য তাকে নাড়িয়ে দেয়, তার যুক্তি-ভিত্তিক মস্তিষ্ক প্রথমবারের মতো দ্বিধায় পড়ে যায়। ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় নিজের লেখা দেখে সে কাঁপে—“আমি ফিরেছি, কিন্তু কেউ সঙ্গে এসেছে।” কীভাবে এই কথা তার হাতে লেখা থাকতে পারে যখন সে এই লাইনটা লিখে মনে করতে পারছে না? সে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়, এবার তাকে শ্মশানবালার ঘরে ঢুকতেই হবে।
বিকেলে সে গ্রামের বাইরে একটি সাদামাটা ওষুধের দোকান ঘেঁষা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা করে ডাঃ অনিরুদ্ধ লাহার সঙ্গে। ডাক্তারটি স্বভাবতই শান্ত ও যুক্তিবাদী। অভিষেক তাকে ক্যামেরার ছবি দেখায়, ডায়েরির কথা বলে। ডাঃ লাহা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে, “এটা ডিসোসিয়েটিভ ট্রান্সও হতে পারে। তুমি হয়তো মানসিক চাপে ছিলে, যার ফলে নিজের অজান্তে কিছু লিখে ফেলেছ। কিন্তু ক্যামেরার ফুটেজ… সেটা ব্যাখ্যা করা মুশকিল।” তিনি পরামর্শ দেন কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করার, সঙ্গে মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার। অভিষেক ফেরে, কিন্তু ডাক্তারের যুক্তিবাদ তাকে আশ্বস্ত করতে পারে না। গ্রামে ফিরে সে আবার শ্মশানঘাটের দিকে হাঁটতে থাকে। পথের ধারে এক ডালিম গাছের নিচে বসে ছিল চাঁদনি—সেই কিশোরী, যার চোখে নাকি মৃতদের ছায়া ধরা পড়ে। অভিষেক জিজ্ঞেস করে, “তুমি ওর ঘরের সামনে থাকো কেন?” চাঁদনি বলে, “ওরা বলে আমি পাগল, কিন্তু আমি ওদের দেখতে পাই… তারা বালামার কাছে আসে… কালো কাপড়ে, মাথাহীন কেউ কেউ…” অভিষেক হাসে না, বিরক্ত হয় না, বরং গভীর কৌতূহলে চেয়ে থাকে তার মুখে। চাঁদনি হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার কাঁধে কেউ বসে আছে, কিন্তু তুমি জানো না।” অভিষেকের গলা শুকিয়ে যায়। সে পেছনে তাকায়, কিছু নেই।
সন্ধ্যার পরে আবার সে প্রস্তুতি নেয় শ্মশানবালার ঘরের দিকে যাওয়ার। এইবার সে কোনও ক্যামেরা বা ট্রাইপড রাখে না, শুধু নিজের টর্চ আর ডায়েরি সঙ্গে নেয়। রাত নেমে এলে সে হাঁটতে থাকে শ্মশানের দিকে—পায়ের নিচে শুকনো পাতা খসখস করে ওঠে, বাতাসের শব্দের সঙ্গে কোথা থেকে যেন আসে এক টানা বাঁশির আওয়াজ। ঘরের সামনে পৌঁছাতেই সে দেখতে পায় দরজা আধখোলা। অভিষেক ধীরে ধীরে ভিতরে পা রাখে—ঘরের ভেতরে ধূপের গন্ধ, দেওয়ালে ঝোলানো হাড়ের মালা, পেতলের পুরনো ঠাকুরের মূর্তি। কুঁড়েঘরের এক কোণায় বসে আছেন সেই বৃদ্ধা—শ্মশানবালা। তার চোখজোড়া অদ্ভুত নিস্পৃহ, অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অভিষেকের চোখে চোখ রাখেন। তিনি বলেন, “ফেরার সময় পাসনি… যেদিন এসেছিলি, সেদিন থেকেই সময় থেমে গেছে তোর জন্য।” অভিষেক কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে, “আপনার ঘরে রাতে যারা আসে… তারা কে?” শ্মশানবালা উত্তর দেন না। তিনি শুধু ঘরের এক কোণে ইঙ্গিত করেন—সেখানে একটা ছেঁড়া লাল কাপড়ের তলায় ঢাকা কিছু। অভিষেক এগিয়ে কাপড় সরিয়ে দেখে—একটা পুরনো কাঁসার থালা, তার ভেতরে রক্তমাখা চাল, আর তার পাশে পড়ে থাকা একটি হাতের হাড়। হঠাৎ বাইরে ঝড় শুরু হয়, ঘরের ভেতর আলো নেভে। তখনই বৃদ্ধার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক মন্ত্র—“জয় অঘোর! জয় কালভৈরব! মৃতের খিদে তৃপ্ত হোক!” অভিষেক ভয় পেয়ে পেছিয়ে আসে, কিন্তু দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সে বুঝে যায়, এই ঘরটা শুধু ছাদের নিচে কিছু ইট আর মাটি নয়—এটা যেন জীবন্ত, শ্বাস নেয়, কথা বলে। আর সেদিন সে বুঝে যায়, এই জায়গা থেকে ফিরে গেলে সে হয়তো আর আগের মানুষ থাকবে না।
–
রাতের সেই ঘটনার পর অভিষেক আর সহজে ঘুমোতে পারে না। শ্মশানবালার ঘরে দেখা থালার রক্তমাখা চাল আর হাড়ের দৃশ্য তাকে তাড়া করে ফেরে। সকালে সুধীরবাবু তাকে দেখে বলে—“আপনার চোখের নিচে কালচে দাগ পড়েছে বাবু, সব ঠিক তো?” অভিষেক কোনও উত্তর না দিয়ে নিজের ডায়েরিতে লিখে যায়—“ওরা খায়। কাকে খায় জানি না, কিন্তু ওরা খায়।” গ্রামের মন্দিরে গিয়ে সে পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলে। পুরোহিত প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও পরে মুখ খোলে, “আমাদের গ্রামে এক রীতির কথা খুব গোপনে প্রচলিত ছিল—‘মৃতভোজ’। খুব পুরনো তান্ত্রিক বিশ্বাস। বলা হয়, কিছু আত্মা যদি নির্দিষ্ট দেহভোজ পায়, তবে তারা শান্তি পায় না বরং শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। শ্মশানবালার স্বামী একবার এই আচার শুরু করেছিলেন, কিন্তু সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তারপর থেকে মাঝে মাঝে কেউ কেউ নিখোঁজ হয়ে যায়—কেউ খুঁজে পায় না, কেউ খোঁজ করে না।” অভিষেক হঠাৎ করে বুঝতে পারে, সে হয়তো একটা বড় চক্রের মধ্যে ঢুকে গেছে, যেখানে বিশ্বাস, ভয়, আর তন্ত্র এক হয়ে গেছে। দুপুরের পর সে আবার খোঁজ নিতে বের হয়, এবার গ্রামের একটু বাইরে, যেখানে এক পুরনো পোড়ো বাড়ি আছে। সেখানেই সে খুঁজে পায় পাগলা মাধবকে।
মাধব, যাকে সবাই পাগল বলে, সেদিন কিন্তু অদ্ভুত ভাবে শান্ত ছিল। সে এক পুরনো কাঠের বাক্সে বসে গুনগুন করে বলছিল—“তোর শরীর নরম, রক্ত টাটকা… তারা তোকে পছন্দ করেছে।” অভিষেক জিজ্ঞেস করে, “কে তারা?” মাধব হেসে উঠে বলে, “যারা খায়, যারা বেঁচে আছে মৃত্যুর পরে… যারা বালামার ঘরে আসে। তুই যেদিন থেকে ঘরে গেছিস, তারা তোর গন্ধ পেয়েছে।” অভিষেক হঠাৎ লক্ষ্য করে, তার হাতের কবজিতে ছোট্ট একটা কালো দাগ—যা সে আগে কোনওদিন দেখেনি। মাধব বলে, “ওই চিহ্ন হলে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়।” অভিষেক আর ঠাণ্ডা থাকতে পারে না। সে সোজা গিয়ে ডাঃ লাহার সঙ্গে দেখা করে। ডাক্তার চমকে যায়। তিনি বলেন, “এই দাগটা কোনো বিষাক্ত উদ্ভিদের সংস্পর্শে এলে হয়, তবে সাধারণত এত গভীর কালচে হয় না।” অভিষেকের চোখে এখন ভয়, কিন্তু মুখে সেই পুরনো সাংবাদিকের ছায়া—যে সত্য বের করার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ে যায়। সে ডাক্তারের কাছে চায় একটা ইনজেকশন—যেটা দিলে সে রাতে কিছুটা স্থির থাকতে পারবে। ডাক্তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও দিয়ে দেন—“এইটা কেবল শারীরিক প্রশমন দেবে, মানসিক নয়।”
রাত নেমে এলে অভিষেক আবার বের হয়। এইবার সে শ্মশানবালার ঘরে নয়, যায় শ্মশানের মূল কেন্দ্রে—যেখানে মৃতদেহ পোড়ানো হয়। কাঁধে ব্যাগ, হাতে ডায়েরি। সেখানে গিয়ে সে দেখতে পায়—আগুন জ্বলছে না, অথচ আগুনের গন্ধ। বাতাসে ছাই উড়ে বেড়াচ্ছে, অথচ কোথাও আগুন জ্বলছে না। হঠাৎ পিছন থেকে এক আওয়াজ—চাঁদনি এসে দাঁড়ায়। সে বলে, “আজ রাত্রে তারা আসবে। কেউ একজন খাবে, কেউ একজন খেয়ে যাবে। বাঁচতে হলে চুপ করে থাকতে হবে।” অভিষেক হতবাক হয়ে যায়। সে চাঁদনির সঙ্গে বসে পড়ে, কিন্তু তার শরীর ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসতে থাকে। মনে হয় যেন কেউ ভিতর থেকে টেনে ধরছে, তার ঘাড়ের কাছ থেকে শুরু করে কাঁধ পর্যন্ত ঠাণ্ডা এক অনুভূতি। হঠাৎ শোনে—পায়ের শব্দ, ছয়-সাতজন ছায়ামূর্তি আসছে। তারা একে একে বসে, তাদের মাঝখানে এক পিতলের থালা রাখা হয়—ভেতরে রক্তমাখা চাল, মাছের কাঁটা, আর কিছু চেনা যায় না এমন হাড়। সবাই হাত বাড়িয়ে খেতে থাকে—কিন্তু তারা মানুষ নয়, তাদের চোখ নেই, মুখ নেই, কেবল ছায়া। আর তাদের মধ্যে বসে আছে এক বৃদ্ধা—শ্মশানবালা। তিনি বলছেন, “খাও… সব খাও… পেট ভরলে ওরা কথা বলে না…” অভিষেক বোঝে, সে একটা প্রাচীন প্রথার মধ্যে ঢুকে পড়েছে—যেখানে মৃত্যু কোনও শেষ নয়, বরং শুরু। সে চিৎকার করতে পারে না, তার গলা যেন কেউ চেপে ধরেছে। চোখের সামনে তার ক্যামেরার ব্যাগ পড়ে আছে, কিন্তু হাত তুলতে পারছে না। সে বুঝতে পারে—এখানে থাকলে, সে একদিন কোনও প্রতিবেদক নয়, শুধু “অন্য এক খাওয়া যাওয়া শরীর” হয়ে উঠবে।
–
তারপরের কয়েক দিন যেন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। রাত যত গাঢ় হয়, তন্ময়ের চোখে ঘোর লাগে। শহরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সে, কারণ কিছু একটার টান যেন তাকে শিকড় গাঁথা করে রেখেছে ওই শ্মশানের পাশে। সকালে শ্মশানবালার ঘরের সামনে বসে চা খেতে খেতে সে শোনে, বৃদ্ধা বলছে, “তুই দেখেছিস অন্ধকার, এখন দেখবি তার ভিতরটা।” তন্ময় বুঝতে পারে, কেবল গল্প বা লোককথা নয়, এখানে এমন কিছু আছে যা বাস্তবকে উল্টেপাল্টে দিতে পারে। সেদিন সন্ধ্যায় সে শ্মশানের এক কোণে একটি প্রাচীন ভাঙা শিবমন্দির দেখতে পায়, যার পাশে ছিল একটি পোড়া বটগাছ – গায়ে কাপড়ের টুকরো বাঁধা, মাথার কাছে হাড়। “এইখানেই তারা আসে,” বলে শ্মশানবালা হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে যেন অদ্ভুত আলো। “তুই চাইলে শুনতে পাবি – মৃতেরা কী চায়, কী বলে।”
তন্ময় সেদিন রাতে আর ঘুমোতে পারেনি। মধ্যরাতে হঠাৎ যেন শোনে শ্মশানের দিক থেকে ভেসে আসছে কণ্ঠস্বর – গান নয়, আবার আর্তনাদও নয়, যেন কোনও অজানা ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ। সে ধীরে ধীরে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। চাঁদের আলোয় দেখতে পায়, একজন কালো পোশাক পরা মানুষ বটগাছের নিচে বসে ধূপ জ্বালাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে শ্মশানবালা – তার কপালে রক্ত, চুলে ছাই মাখানো। তন্ময় থমকে যায় – এ কী? কোনো নাটক? না কি সত্যি কিছু? পরের দিন সকালে সে সোজা চলে যায় কাছের গ্রাম ‘কালিকাপুর’-এ, সেখানে শুনতে পায় – এক তান্ত্রিক একসময় এই শ্মশানে বাস করত। লোকের বিশ্বাস, সে এখনও মরে যায়নি, বরং ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়ায়। স্থানীয়রা তাকে ‘অঘোরী পিশাচ’ নামে ডাকে। শ্মশানবালার নামের সাথেও তার সংযোগ আছে – তারা নাকি একই শক্তির ধারা বয়ে আনে। তন্ময় হতভম্ব – একজন সাংবাদিক হিসেবে সব যুক্তিতে বিশ্বাস করলেও এবার যেন যুক্তির জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে অভিজ্ঞতাগুলি।
রাতে সে শ্মশানবালার কাছে সব খোলাখুলি জিজ্ঞেস করে। বৃদ্ধা শুধু হেসে বলে, “তুই এখনো ছোট, তোর চোখে আলো বেশি, তাই অন্ধকার বুঝিস না। তোর গায়ে শহরের গন্ধ, সেটা সরে গেলে সব দেখবি, সব জানবি।” সে রাতে শ্মশানবালা তাকে একটি কড়চা দেয় – পুরনো তালপাতার পুঁথি, যার পাতাগুলো ছাই আর মাটি মেখে প্রায় গলে গেছে। কড়চাতে তন্ত্র-মন্ত্রের টুকরো, অদ্ভুত প্রতীক, আর একটি চিত্র – অর্ধেক মানুষ অর্ধেক ছায়া, মাথায় শ্মশানের মুকুট। তন্ময় জানে না সে কী হাতে পেয়েছে, কিন্তু অনুভব করে, সে এখন এমন এক পথের শুরুতে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে ফেরা সহজ নয়। সেই রাতে প্রথমবার, তন্ময় দেখে স্বপ্নে একটি ছায়া – তাকে ডেকে বলছে, “আয়, মৃতদের কথায় কান দে।” শ্মশানের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছায়া – যেন তান্ত্রিকের হাসি ঠাট্টা করে, আর শ্মশানবালা যেন তাকে ছায়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
–
ভোরের আলো সবে ফুটেছে, আর মুর্শিদাবাদের সেই নিঃসঙ্গ শ্মশান ঘিরে কুয়াশার চাদর এখনো মোড়ানো। শ্মশানের পেছনের বনজ পাড়ায় এক লুকনো ঘরে বসে সাংবাদিক রুদ্র কাঁপতে কাঁপতে তার রেকর্ডার পরীক্ষা করছে—গতরাতে সে যা শুনেছে, তা যেন বাস্তব নয়, অথচ রেকর্ডারে সবটা স্পষ্ট: গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খধ্বনি, মৃত মানুষের গলায় উচ্চারিত একটি নাম—”বালা”। বালার ঘর থেকে ফিরে আসার পর রুদ্র ঘুমোতে পারেনি; চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছে সেই নারীকে—যার চোখ দুটো নিভু নিভু প্রদীপের মতো, যার কণ্ঠে আছে মৃতদের ভাষা বোঝার অদ্ভুত ক্ষমতা। বালার মুখে শোনা এক কাহিনী তাকে দিশেহারা করেছে—”প্রতি দশ বছরে একবার মৃতদের আত্মা ভোজ চায়। যারা এই ভোজ দেয়, তারা আশীর্বাদ পায়। যারা দেয় না, তারা অভিশপ্ত হয়।” রুদ্র প্রথমে ভাবছিল এটা সব লোককথা, কিন্তু এখন তার বিশ্বাস হচ্ছে, বালার ঘরের সেই হাঁড়ি, যার মধ্যে নির্জন রাতে কোনো খাবার ফুটে ওঠে আর সকালবেলায় থাকে না কিছুই—তা কেবল কল্পনা নয়। তিনি বুঝলেন, এই গ্রামে ভয় আর বিশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত প্রথা, যাকে কেউ খণ্ডন করতে পারেনি।
রুদ্র সিদ্ধান্ত নেয় এই রহস্যের উৎস খুঁজবে। তিনি যায় পুরনো মহাশ্মশানের আরো গভীরে, যেখানে একটা পুরনো গম্বুজ আকৃতির স্থাপত্য পড়ে আছে—স্থানীয়রা একে “ভোজমণ্ডপ” বলে ডাকে। সেখানে গিয়ে সে দেখতে পায় কিছু আগুনের চিহ্ন, পোড়া ফুল, অর্ধপচা খাবার, আর মাটির উপর আঁকা এক বিশাল রক্তলাল মণ্ডল। তার সঙ্গী হয় গ্রামের যুবক জিতু, যে তার ঠাকুরদার মুখে শোনা গল্প মনে করিয়ে দেয়—”আমার ঠাকুরদা বলত, এক কালে এখানে সত্যি এক রাজতান্ত্রিক তান্ত্রিক বসবাস করত, যিনি মৃতদের দিয়ে সেবা করাতেন আর ভোজ দিতেন জীবিতদের আত্মা কিনতে। সে এক তন্ত্র যার খরচ হল আত্মা, আর লাভ হল অমর জ্ঞান।” রুদ্র ভাবছিল, এ কি তাহলে জীবনের দরজার উল্টোদিক? যেখানে মৃত্যুই পরম শিক্ষা? সন্ধ্যা নামতে না নামতেই তারা ফিরে আসে বালার কাছে, আর বালার কণ্ঠে তখন এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা—”আজ রাত ভোজের। যদি প্রস্তুত না থাকো, তাদের ক্ষুধা তোমাকে পাবে।”
রাত্রি আসে সেই বিশেষ রাতে, যখন চাঁদ ঢেকে যায় মেঘে, আর বাতাসে জড়িয়ে থাকে ধূপের গন্ধ। বালার ঘর থেকে শুরু হয় এক অদ্ভুত যাত্রা, রুদ্রকে চোখে কালো কাপড় বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় সেই গহীন শ্মশানে। সেখানে মাটিতে বসে আছে কিছু মানুষ—চোখে অন্ধকার, মুখে নিঃশব্দ। বালার হাতে এক পিতলের থালা, যার ভেতরে ভাত, কাটা লেবু, আর এক ধরণের অজানা মাংস। তারা সবাই একে একে সেই থালা নিয়ে মৃতদের উদ্দেশে মাথা নত করে। তারপর শুরু হয় মন্ত্রপাঠ—তন্ত্রমতে আত্মা ডাকার মন্ত্র। হঠাৎ চারদিক ঠান্ডা হয়ে যায়, যেন বাতাস স্তব্ধ, আগুন নিভে আসছে। তখনই রুদ্র শুনতে পায়—কেউ বা কিছু হাঁটছে আশেপাশে, ধ্বংসস্তুপের ওপরে, গাছের মাথায়, বাতাসে। কেউ তার কানে ফিসফিস করে বলে—”আমাদের ভোজন পূর্ণ করো, নাহলে আমরা তোমায় ভোগ করব।” সে চমকে উঠে দেখে, বালার চোখ এখন পাথরের মতো স্থির, সে বলছে—”এবার তুমি খাও, রুদ্র। এবার তুমি বুঝবে কেন মৃতদেরও খাওয়াতে হয়।” তখন রুদ্রের সামনে এসে পড়ে সেই পিতলের থালা, যেটা সে কাঁপা হাতে নিতে বাধ্য হয়। খাবারের গন্ধ তার কাছে শবদেহের মতো, কিন্তু এই রাতে না খেলে সে বেঁচে ফিরবে না—সে বুঝে গেছে, এই রাত শুধু রীতি নয়, এটা এক চুক্তি। এক অদৃশ্য চুক্তি যার রক্তে লেখা আছে শ্মশানের ছায়ায়।
–
শহরের পুরাতন রেকর্ড ঘেঁটে অর্ণব যখন শ্মশানবালার অতীত সম্পর্কে খোঁজ করছিল, তখন এক পুরনো সংবাদপত্রের কাটিংয়ে সে একটি ছবি দেখতে পায়—এক বালিকা, চুল খোলা, মুখে হালকা হাসি, আর পেছনে কালীপূজার বিসর্জনের দৃশ্য। নিচে লেখা: “বিসর্জনের রাতে নিখোঁজ শ্বেতা সরকার, বয়স দশ, স্থান—মাহেশপুর।” অর্ণব বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়, কারণ ছবির মেয়েটির মুখটি অবিকল শ্মশানবালার সঙ্গে মিলে যায়। সে বুঝতে পারে, শ্মশানবালার আসল নাম সম্ভবত শ্বেতা, এবং তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পেছনে বড় কোনও ষড়যন্ত্র রয়েছে। তখনই সে যোগাযোগ করে স্থানীয় থানা থেকে পুরনো তদন্ত রিপোর্ট আনিয়ে পড়ে, যেখানে লেখা আছে, বিসর্জনের রাতে এক তান্ত্রিক মেলা বসেছিল শ্মশানের গা ঘেঁষে। কিছু শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু রহস্যজনক কারণে তদন্ত মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়। অর্ণব মনে মনে স্থির করে, সে আর থামবে না—এই ঘটনার শেকড় টেনে বের করে আনবেই।
রাতের শ্মশান এখন তার কাছে শুধুই ভয় নয়, বরং এক জীবন্ত রহস্যগ্রন্থের পাতা হয়ে উঠেছে। অর্ণব এবার শ্মশানবালার সঙ্গে বসে তাঁর অতীত সম্পর্কে জানতে চায়। দীর্ঘ নীরবতার পর শ্মশানবালা বলে ওঠে, “তুই সত্যিই জানবি? পারবি তো জেনে সহ্য করতে?” অর্ণব মাথা নেড়ে রাজি হয়। বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করেন—“আমার নাম ছিল শ্বেতা, আমি কালীভক্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা ছিলেন গায়ের একজন বৈষ্ণব, কিন্তু মা গোপনে তান্ত্রিক চর্চা করতেন। একবার এক সন্ন্যাসী আমাদের গ্রামে আসেন, মা তাকে গোপনে পূজা করতে শুরু করেন। আমি তা দেখে ফেলেছিলাম, আর সেই রাতেই আমি হারিয়ে যাই।” অর্ণব শোনে, শ্বেতা কালীপূজার বিসর্জনের রাতে তান্ত্রিকদের হাতে বলির প্রস্তুতি হিসেবে তুলে দেওয়া হয়, কিন্তু কোনোভাবে সে পালিয়ে যায়। গহীন শ্মশানে আশ্রয় নেয়। সেখানেই একজন বৃদ্ধী তান্ত্রিকী তাকে রক্ষা করেন ও শেখাতে থাকেন কালিতন্ত্র, মৃতচেতনার সাথে সংযোগ, এবং আত্মার আর্তি শোনা। বহু বছর পর, সেই শ্বেতাই হয়ে ওঠেন ‘শ্মশানবালা’—মৃতদের সেবাদাত্রী, জীবিতের চোখে পাগল, কিন্তু আত্মাদের চোখে একজন দ্বাররক্ষী।
অর্ণবের মনের মধ্যে তখন ভয়, বিস্ময় আর শ্রদ্ধার এক অদ্ভুত মিশ্রণ কাজ করছে। সে বুঝে যায়, শ্মশানবালাকে কেউ কখনো আসল করে বোঝেনি। সেই রাতে শ্মশানবালা তাকে নিয়ে যায় একটি নির্জন গর্তের ধারে, যেটি এককালে সেই তান্ত্রিকদের মূল আস্তানা ছিল। সেখানে এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কঙ্কাল, ছাই, মাটি চাপা মৃতভোজের চিহ্ন। অর্ণব সেই গর্তের পাশে বসে অনুভব করে—এ যেন শুধু এক মাটি নয়, এ এক ইতিহাস, এক লুকোনো রক্তের রেখা, যাকে মুছে ফেলা যায় না। শ্মশানবালা তাকে বলে, “তুই এখন জানিস। কিন্তু জেনেই কী করবি? যদি বলিস, তোরা হাসবি, যদি লিখিস, তোরা মুছে দিবি।” অর্ণব জানে, তার সামনে দুটি পথ—একটা পথ সত্যি প্রকাশের, আরেকটা আত্মার গভীরে হারিয়ে যাওয়ার। এবং সে ঠিক করে, সত্যিকে শোনাতে হবে। কারণ রক্তের রেখা যতই পুরনো হোক, তার গন্ধ মাটি ভোলে না।
–
চাঁদের আলো ক্রমশ ধুসর হয়ে আসছিল, যেন আকাশের গায়ে কেউ ছাই মাখিয়ে দিয়েছে। বালার কুঁড়েঘর থেকে বের হওয়ার সময় আরিন্দমের শরীরে যেন শীতল স্রোত বইল। সে এখনও হজম করতে পারছিল না—তান্ত্রিক মৃতভোজ, আত্মার আহার এবং সেই “অমাবস্যার খিদে”র গল্প। বালা তাকে জানিয়েছিল, এই শ্মশানে কিছু আত্মা পূর্ণ মুক্তি পায় না—তাদের দেহ দগ্ধ হলেও মন বদ্ধ থাকে, অপূর্ণ বাসনায়। আর সেই আত্মাদের শান্ত করতে হলে তন্ত্রাচারীরা এক ধরনের বিশেষ ভোজের আয়োজন করে, যেখানে খাদ্য তো থাকে—তবে শুধু খাদ্য নয়, মন্ত্র, রক্ত, আর এক গভীর মানসিক সন্নিবেশ। আরিন্দমের মনে ভয় আর কৌতূহল একসঙ্গে গিজগিজ করছিল। শ্মশানের প্রাচীন পাথরের ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, এই গ্রামে মানুষের থেকেও বেশি ইতিহাস বাস করে। বালা জানাল, পরের অমাবস্যার রাতে হবে মৃতভোজ—আর সেই রাতেই আত্মাদের প্রার্থনার আসর বসবে, যেখানে মানুষ নয়, ছায়ারা হবে অতিথি। আরিন্দম রাজি হয়ে গেল। সে বলল, “আমি থাকতে চাই সেই রাতে। আমি দেখতে চাই—যা সত্যিই ঘটে, আর যা হয়তো শুধু ভয়ের গল্প।”
পরের কয়েকটা দিন যেন স্থির সময়ে আটকে গিয়েছিল। আরিন্দম ঘুরে বেড়াত শ্মশান চত্বর, পুরনো শিলালিপি, গলিত কাঠামো, আর মৃতদের জন্য ছেড়ে যাওয়া জিনিসপত্র—মাটির কলস, ছেঁড়া চাদর, পুরনো চুড়ি। সব যেন কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু কথাগুলো মুখে আনতে পারছে না। বালাও যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। তার চোখে ছিল অন্য এক দীপ্তি, শরীর ঝুঁকে পড়লেও কণ্ঠে ছিল শাসন। সে বলত, “এই কাজ শুধু সাধনার নয়, দায়িত্বের। যদি ভুল কিছু কর, তবে যারা তৃপ্ত নয় তারা তোমার সত্তা খেয়ে ফেলবে।” আরিন্দম তার ক্যামেরা, ডায়েরি, রেকর্ডার—সব প্রস্তুত করে ফেলেছিল। সেই রাতের জন্য। রাতে সে ঘুমোতে পারত না। চোখ বন্ধ করলেই যেন মৃত মুখগুলো তাকে ঘিরে ধরত, কেউ ফিসফিস করে বলত, “ভোজনের সময় আসছে… আসছে…”
অবশেষে এল সেই অমাবস্যার রাত। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, হাওয়ায় ছিল কাঁপন ধরানো ঠাণ্ডা। বালার নির্দেশে আরিন্দম একটা কুৎসিত কালো পোশাক পরল—তান্ত্রিকদের উৎসবের পরিধান। ঘরের এক কোণে সাজিয়ে রাখা হল মৃতভোজের উপকরণ—পচা চাল, তেঁতো ফল, কালো ঘৃত, আর এক বাটি রক্তমেশানো তরল। শ্মশানের নির্দিষ্ট বেদিতে রাখা হল প্রদীপ, কঙ্কালগুঁড়ো, পঞ্চমকার দ্রব্য। আরিন্দম মনে মনে কাঁপছিল, কিন্তু মুখে ছিল দৃঢ়তা। শ্মশানবালা ধীরে ধীরে শুরু করল মন্ত্রোচ্চারণ, আর আগুনের শিখায় তার ছায়া লাফিয়ে উঠতে লাগল। বালার গলা ক্রমশ অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল—সে যেন আর একজন নয়, একাধিক সত্তার প্রতিনিধি। “আজ রাত্রে তারা খাবে, যারা অপূর্ণ, তারা চাইবে জীবিতের সংযোগ,” সে বলল। বাতাস থমকে গিয়েছিল, আর হঠাৎই চারপাশে একটা হালকা ছায়ার আনাগোনা দেখা গেল। এক পলকে আরিন্দম বুঝল, সে যা দেখতে চেয়েছিল তা আসছে, কিন্তু সে তৈরি তো নয়—তার শরীর হিম হয়ে গেল। মৃতভোজ শুরু হল, ছায়ারা এগিয়ে এল, আর শ্মশানবালা বলল, “তুই জেনে রাখ, এই রাত্রি যে শুধু প্রত্যক্ষ করবার নয়, এই রাত্রি এক পথ—ফেরার নাও হতে পারে!”
–
রাতের অন্ধকার যখন ঘন হয়ে আসে, তখন শ্মশান যেন অন্য এক জগতের রূপ নেয়। কুয়াশা আর ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে কেবল শোনা যায় কাকের আর্তনাদ আর দূরে কোথাও বাজতে থাকা শ্মশানের ঘণ্টার শব্দ। সায়ন্তন সেই রাতে সিদ্ধান্ত নেয়, সে যাই হোক—এই রহস্যের শেষ পর্যন্ত সে যাবে। শ্মশানবালার বলা ‘মৃতভোজ’ কথাটা তাকে ঘুমোতে দেয়নি। সে জানত, গ্রামে বহুদিন ধরে এক গোপন রীতি চলে আসছে, যেখানে এক নির্দিষ্ট রাত—’কৃষ্ণা ত্রয়োদশী’ তে—তান্ত্রিকেরা মৃত দেহের পাশে বসে এমন এক ভোজ সম্পন্ন করে, যেটা সাধারণ মানুষের ভাবনার অতীত। শ্মশানবালা তাকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, “যদি সত্য জানতে চাস, তবে ওই রাতে শ্মশানে থাকিস। কিন্তু সাবধান, প্রত্যেক চোখ যা দেখে, সেটা দেখে থাকার যোগ্য না।” সেই ভয়ানক রাতটিতে, সায়ন্তন নিজেকে লুকিয়ে রাখল শ্মশান ঘাটের একটা ভাঙা পোড়ো চাতালের পেছনে। চাঁদ নেই, আলো নেই, শুধু কয়েকটা লাল আগুনের জ্বলন্ত আলো জ্বলছে দূরে। একটা পিতলের পাত্রে গঙ্গাজল ছিটিয়ে এক তান্ত্রিক কিছু মন্ত্র পড়তে পড়তে আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে আসছে। তার পাশে কিছু সাদা বসনে ঢাকা মৃতদেহ, আর তাদের মুখ ঘিরে বসে কয়েকজন—কেউ চুপচাপ, কেউ মাথা নাড়ছে ছন্দে, যেন এক অচেনা তালে। হঠাৎ দেখা গেল এক যুবক—যার মুখ দেখা যাচ্ছিল না—সে মৃতদেহের পাশে বসে পড়ল, এবং ধীরে ধীরে তার হাত মৃতদেহের মুখের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। সায়ন্তনের গলা শুকিয়ে গেল, চোখের সামনে যা ঘটছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়, অথচ সত্যি।
সেই মৃতভোজের দৃশ্যের সময় হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল, আগুনের শিখা দুলে উঠল, আর আশেপাশের গাছগুলো যেন শিরশির করে কাঁপতে লাগল। একজন বৃদ্ধ তান্ত্রিক বলল, “শুরু হয়েছে… আত্মারা জেগে উঠছে।” মৃতদেহের পাশ থেকে আচমকা এক বিকৃত শব্দ উঠে এল, যেন মাংসের ভেতর দিয়ে কেউ হামাগুড়ি দিচ্ছে। সায়ন্তন ভয়ে জমে গিয়েছিল, কিন্তু তার চোখ ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে আটকে ছিল। সে জানত, এর ভিডিওটাই তাকে ভারতের মিডিয়ার শিরোনামে এনে দেবে। কিন্তু তখনই তার পাশের মাটির ভেতর থেকে যেন কিছু একটা নড়ে উঠল, আর সে বুঝতে পারল, শুধু মৃত না, এখানে এমন কিছু আছে যাদের নাম দেয়া যায় না। শ্মশানবালার কুটির তখন থেকেই আলোকিত হতে শুরু করল, যেন তার জানালা দিয়ে লাল আলো বেরোচ্ছে। এবং সেই আলো সোজা এসে পড়ল মৃতভোজের দলের ওপর। এক বৃদ্ধা, যিনি মুখ ঢাকা কালো শাল দিয়ে, সোজা চলে এল মৃতদেহের সামনে। চারপাশ থমকে গেল, তান্ত্রিকেরা মাথা নিচু করল। সেই বৃদ্ধা গলা তুলে বললেন, “এ দেহ আত্মার নয়, শোধনের নয়। এর মধ্যে প্রবেশ করেছে বেদনার অতীত। পেছাও।”
সায়ন্তন তখনই চিনতে পারল—সেই বৃদ্ধা আর কেউ নন, শ্মশানবালা। যে নারীকে মানুষ পাগল বলে তাড়িয়ে দেয়, সেই নারী আজ এই মৃতভোজীদেরও অধিপতি। তিনি মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ গর্জে উঠল। মৃতদেহের পাশে বসে থাকা যুবক যেন হঠাৎ পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। আগুন নিভে গেল, আর চারপাশে এক নিঃসংশয় নীরবতা নেমে এল। সায়ন্তন অনুভব করল, তার ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেছে, ব্যাটারি গলে পড়েছে—যেন কোনো অলৌকিক শক্তি তার প্রমাণ ধরে রাখতে দিচ্ছে না। শ্মশানবালা এক ঝলক তার দিকে তাকালেন, বললেন, “তুই সত্যি জানতে চেয়েছিস, তাই তোকে দেখালাম। কিন্তু এখন থেকে তোকে ফিরতে হবে—তোর মধ্যেও তাদের ছায়া লেগে গেছে।” সেই রাত, সেই মৃতভোজ, সেই তান্ত্রিক সভা—সবই সায়ন্তনের মনে আজীবনের দাগ ফেলে দিল। কিন্তু সে জানত, আর পিছু হটার পথ নেই।
–
শ্মশানবালার কুঁড়ে ঘরে ঢুকে অর্ণব বুঝেছিল—এখানে সময়ের কোনও নিয়ম চলে না, বেঁচে থাকার আর মৃত থাকার মাঝখানে একটা অদৃশ্য পর্দা, যেটা এই বৃদ্ধা প্রতিদিন টেনে সরান এবং আবার আগলে রাখেন। কালীপ্রণামের ধূপগন্ধ, ছাইভরা কাঁসার থালা, আর ঝুলন্ত উল্কা-চর্ম—এই ঘরের প্রতিটি কোণ যেন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো এক জাগ্রত উপাসনার ক্ষেত্র। শ্মশানবালা তাকে ডেকে বললেন, “তুই তো কালি চাস অর্ণব, কিন্তু কালি তো শুধু মৃত্যু নয়—তিনি স্মৃতি, তিনি দহন, তিনি প্রলয়। তুই যদি শুনতে চাস, তাহলে আজ রাতে এস। তারা আসবে কথা বলতে।” রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্মশানের নিকটে অর্ণব পৌঁছাল। ছায়ারা গাঢ় হতে শুরু করল, বাতাস যেন মৃতেদের নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে উঠল। শ্মশানবালা তখন কালী মন্ত্র জপছেন, আগুনের পাশে বসে একটা খাঁটি মৃতদেহের মাথার খুলি নিয়ে। অর্ণব ভয় পায়নি, কিন্তু ভিতর থেকে একটা কান্না উঠে এল—এই নারীর জীবনের গল্পটা কি শুধুই শ্মশান আর তন্ত্র? তিনি কি কখনো বাঁচতে চেয়েছিলেন?
হঠাৎ, শ্মশানের ভেতর থেকে উঠে এল এক গলার আওয়াজ—ছেলেমানুষের কণ্ঠ, যেটা চেনা মনে হয় অর্ণবের। “মা, তুমি একবারও ডাকলে না আমায়?” অর্ণব চমকে ওঠে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটি বড়ই অদ্ভুত, সে যেন তার নিজের ছোটবেলার ছায়া! শ্মশানবালা বললেন, “এ তোমার নয় অর্ণব, এটা ওই মৃত শিশুর আত্মা—যে তার মায়ের অপেক্ষায় এখানে পড়ে ছিল। এই জায়গাটায় কেউ যায় না, কেউ ফেরেও না, তাই তাদের কথাও কেউ শোনে না। কিন্তু আমি শুনি।” এক মুহূর্তের জন্য অর্ণবের চোখে জল আসে। আজ সে বুঝল, শ্মশানবালা শুধুই তান্ত্রিক নন, তিনি এই মৃত আত্মাদের আত্মীয়—যাদের পৃথিবীর কেউ মনে রাখেনি, যাদের আত্মা রয়ে গেছে অপূর্ণতাতে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—শ্মশানবালার নিজের অপূর্ণতা কী? কেন তিনি বেছে নিয়েছিলেন এই মৃতদের সংসার?
শ্মশানবালা এবার তার নিজের কাহিনি বললেন। “আমি কখনো তান্ত্রিক হতে চাইনি। আমার স্বামী ছিল কাশীধারী, এক তান্ত্রিক, যে আমায় বলেছিল কালী মা-র ডাকে সাড়া দিতেই হবে। আমি মানিনি, পালাতে চেয়েছিলাম, আর সেই দণ্ডে সে আমায় শ্মশানে বেঁধে ফেলে দিয়ে চলে যায়। সেদিন এক মৃত পুরোহিতের আত্মা আমায় রক্ষা করে, এবং তার কাছেই আমি শিখি এই বিদ্যা, যা আসলে আত্মাদের মুক্তির পথ। তন্ত্র মানেই ভয় নয় অর্ণব—তন্ত্র মানে আত্মার সত্যের সঙ্গে সম্মুখীন হওয়া।” অর্ণব স্তব্ধ হয়ে শুনছিল, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর বাইরে আরেকটা ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের গল্প চলেছে—যেখানে এই বৃদ্ধা একজন নীরব যোদ্ধা। সেই রাতে, প্রথমবারের মতো অর্ণব অনুভব করল, ভয় আর করুণা পাশাপাশি বসবাস করে—আর শ্মশানবালা তাদের সীমানায় বসে প্রহরী হিসেবে কাজ করেন।
–
শেষরাতের অন্ধকারে যখন মুর্শিদাবাদের পুরনো শ্মশানের উপর ঘন কুয়াশা নামে, তখন রাত যেন মৃতদের আওয়াজে জীবন্ত হয়ে ওঠে। শ্মশানবালার কুঁড়েঘর তখন আর নিছক একটি ঘর থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক প্রাচীন তান্ত্রিক মন্দিরের অনুরণন। অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিল সেই ঘরের দোরগোড়ায়, হাতে সেই পুরনো রুদ্রাক্ষ মালা যা সে শহর থেকে ফেরার পথে খুঁজে পেয়েছিল মৃত তান্ত্রিক কালিকেশ্বরের মঠে। মালাটি ছিল রক্তমাখা, যেন কোন আত্মবলিদানের সাক্ষী। শ্মশানবালা মৃদুস্বরে মন্ত্র জপছিলেন, তার কণ্ঠস্বরে তখন কোনও নরম মানবিকতা ছিল না — বরং ছিল আগুনে পোড়া চরণের মতো শক্ত এক আত্মবিশ্বাস। “আজ, পূর্ণিমার রাতে, যখন চিতার ছাই উড়ে উড়ে এই আকাশ ঢেকে দেবে, তখনই খোলস ফেটে সত্যি বেরিয়ে আসবে”— বলেছিলেন শ্মশানবালা। অনিরুদ্ধ কিছু না বলেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ করেই গাছপালার মধ্যে থেকে একদল কৃষ্ণপক্ষের সন্ন্যাসী বেরিয়ে এল — মুখ ঢাকা, গলায় জটা, কাঁধে খাঁকি কাপড়। তারা শ্মশানবালার সামনে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বসে পড়ল। রাত তখন থমকে গেছে, যেন সময় নিজেই কিছু বলতে চাইছে না।
আকাশের গহীন কালো থেকে ধীরে ধীরে জ্যোৎস্না ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো এক অদ্ভুত আলো, যা ঠিক চাঁদের আলো নয় — যেন মৃতের চোখের দীপ্তি। অনিরুদ্ধ সেই আলোতে পরিষ্কার দেখতে পেল — ঘরের ভেতরে থাকা পুরনো মাটির পুতুলগুলো কেঁপে উঠছে, তাদের ফাটল ধরা চোখ থেকে যেন জল গড়িয়ে পড়ছে। সেই পুরনো পুতুলগুলোই ছিল কালিকেশ্বরের নির্মাণ, যা শ্মশানবালার ঘরে আগলে রাখা ছিল বছরের পর বছর। “ওগুলো শুধু পুতুল নয়, ওরা ছিল ধারক — আত্মাদের বাসনা, তৃষ্ণা, প্রতিশোধের বাহক” — বললেন শ্মশানবালা, এবার তার কণ্ঠে যেন অনেক কালের জমে থাকা ক্লান্তি। হঠাৎ করেই এক তীব্র হাওয়া ঘরের দরজা খুলে দিলো, আর একে একে পুতুলগুলো মাটিতে পড়ে চুরমার হতে লাগল। প্রতিটি পুতুল ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা একটা আত্মা মুক্তি পেয়ে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছিল, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল এক ধরণের শান্তি ও বিষণ্নতা। অনিরুদ্ধ এবার বুঝল, এই পুরো ঘটনা শুধু তন্ত্র নয়, শুধুমাত্র হরর নয় — এটি ছিল এক দীর্ঘকালীন সামাজিক বন্দীত্বের ইতিহাস, যেখানে মৃতরাও কথা বলে, প্রতিকার চায়, মুক্তি চায়। শহর তার ক্যামেরা আর কলম নিয়ে যা বুঝতে পারেনি, এই শ্মশানের ছাই থেকে তা উঠে এল প্রাণ নিয়ে।
শেষরাত কেটে সকাল হল, সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ল শ্মশানের মাটিতে, যে মাটি রাতে মৃতের অধিকার ছিল, সকালবেলা তা জীবনের হাতে ফিরে এল। শ্মশানবালা চুপচাপ জানালার ধারে বসে ছিলেন, অনিরুদ্ধ তাঁর পাশে গিয়ে বসল। “তুমি এবার ফিরে যাও শহরে,” শ্মশানবালা বললেন ক্লান্ত গলায়, “তোমার কাজ শেষ।” অনিরুদ্ধ জানত, এখন সে যা লিখবে, তা হবে ইতিহাস নয়, খবর নয় — বরং একটি মহাতান্ত্রিক সমাজ-আত্মচর্চার দলিল। সে ফিরে যাওয়ার আগে একবার শেষবারের মতো পেছন ফিরে শ্মশানবালার দিকে তাকাল — তাঁকে তখন যেন এক পুরানো মহাকাব্যের শেষ চরিত্র মনে হচ্ছিল। সেইদিন সন্ধ্যায়, অনিরুদ্ধ শহরে ফিরে এসে প্রথম যেটা করেছিল তা হল — সে নিজের রিপোর্টের শিরোনাম দিয়েছিল: “শ্মশানবালার জীবন: আত্মারাও কথা বলে।” কিছুদিন পর জানা গেল — শ্মশানের পাশের ঘরটি খালি, শ্মশানবালা আর নেই। তবে রাত হলেই কেউ কেউ বলে — সেই ঘরের মাটি থেকে আবার সেই পুতুলদের কান্নার আওয়াজ শোনা যায়।
—




