Bangla - প্রেমের গল্প

শেষ চিঠি

Spread the love

অন্তরা দাস


সকালের আলো যখন ধীরে ধীরে পুরনো বাড়ির জানালার ফাঁক গলে ঢুকছিল, তখন সায়ন মুখার্জি তার কাঁপা হাতে তুলির মাথায় জল দিচ্ছিলেন। ছত্রিশ বছর ধরে তিনি এই বাড়িতে আছেন, বালিগঞ্জের এক পুরনো, রাজবাড়ির মতো দেখতে প্রাসাদোপম ভবনের চিলেকোঠায়। একসময় কলকাতার শিল্পজগতে যে নাম ছিল আলাদা উচ্চতায়, আজ সেই সায়নের নামটা কেবল পুরনো গ্যালারির আর্কাইভে রয়ে গেছে।

রুমটা যেন সময়ের মধ্যে জমে আছে। এক কোণে পুরনো ক্যাম্পাসের পোস্টার—‘অরণ্যের দিনরাত্রি’—বাম দিকে একটা কাঠের আলমারির ওপর অর্ধেক ক্যানভাস, যার ওপর অসমাপ্ত একটি মুখ, হালকা হাসি, চোখে অজানা আকাশের প্রতিচ্ছবি।

তার স্ত্রী ছিল না কখনোই। সন্তান নেই। বন্ধুরা যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে গেছে। বাকি থেকেছে একমাত্র সঙ্গী—স্মৃতি।

প্রতিদিনের মতো তিনি আজও রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত শুনছিলেন, ‘আমার পরান যাহা চায়’ বাজছিল, যখন নিচতলার দারোয়ান গলা তুলে বলল,

“স্যার, একটা চিঠি এসেছে। কিন্তু দেখতেছি খুব পুরনো কাগজ, কই থিকা আসছে বুঝতে পারছি না।“

সায়নের কপালে ভাঁজ পড়ল। এত পুরনো কাগজ এখন আর চিঠি আসে না। তিনি নিচে নেমে এলেন ধীর পায়ে। হাতে যখন খামটা পেলেন, তখন তার মনে হলো সময় হঠাৎ থেমে গেছে।

চিঠির খামের ওপর লেখা—“শ্রী সায়ন মুখার্জি, ফাইন আর্টস বিভাগ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা – ৭০০০০৩।“

তারিখ—৭ই এপ্রিল, ১৯৭৫।

তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল।

এই তারিখটাই তো… সেই দিন, যেদিন মাধুরী হারিয়ে গিয়েছিল। কলকাতা জ্বলছিল রাজনৈতিক উত্তেজনায়, এবং সেই দিনই সে বলেছিল,

“আজকের মিছিলটা গুরুত্বপূর্ণ সায়ন, একটা নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নামছি।”

আর তারপর… আর কোনও খোঁজ মেলেনি।

সায়ন ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এলেন। চিঠিটা খোলার আগে কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকলেন খামের দিকে। একটা চাপা ভয় যেন বুকের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে।

৪৮ বছর পর, সেই একমাত্র মেয়েটির চিঠি—যার জন্য তিনি আজও প্রতিরাতে বিছানার পাশে এক জায়গা ফাঁকা রাখেন।

সময়টা ১৯৭৪। কলকাতা তখন এক জ্বলন্ত শহর। একদিকে শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিদের নতুন উদারতাবাদ, আরেকদিকে ছাত্র-যুবকদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা। নকশাল আন্দোলনের রেশ তখনও শহরের অলিগলিতে ঘুরছে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্যান্টিন থেকে শুরু করে কলেজ স্কয়ারের আড্ডা—সবই যেন এক প্রচ্ছন্ন আগুনে পুড়ে চলেছে।

সেই সময় সায়ন মুখার্জি ছিল চব্বিশ বছরের এক স্বপ্নদর্শী চিত্রশিল্পী। সদ্য ফাইন আর্টস বিভাগে মাস্টার্স শেষ করেছে। তাঁর আঁকায় তখন কবিতা ছিল, প্রতিবাদ ছিল, আর ছিল ভালোবাসার এক রহস্যময় রঙ।

মাধুরী সেন—ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী। লম্বা ঘন চুল, চোখে কড়কড়ে আত্মবিশ্বাস, আর গলায় একটি ধাতব পেনডেন্ট—যেটা সে নিজের হাতে বানিয়েছিল। মিছিল, বিতর্ক, কবিতা, নাটক—সবখানেই তার উপস্থিতি।

তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল কলেজ লাইব্রেরিতে। সায়ন তখন অজিত কোরের লেখা একটি ছোট্ট বই খুঁজছিলেন—‘The New Man in India’। বইটা ছিল মাধুরীর হাতে। এক আলতো ঝগড়া, তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকা।

“তুমি কি আঁকো?”

সায়নের জবাব ছিল, “আঁকতে চেয়েছিলাম, এখন লড়াই করছি ক্যানভাসের সঙ্গে।”

সে হেসেছিল। সায়নের মনে হয়েছিল—এই হাসির একটা আলাদা শব্দ আছে, যেটা শব্দতত্ত্বে মেলে না।

এরপর কফিহাউসে নিয়মিত আড্ডা, প্যারামাউন্টের শরবত, কলেজ স্কয়ারে সন্ধ্যার ধোঁয়াশা। তারা দু’জনে যেন এক আলাদা সময় গড়ে তুলেছিল নিজেদের মধ্যে—যেখানে শহরের রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রবেশ করলেও, ভালোবাসার ভাষাটা নিরবধি ছিল।

একদিন মাধুরী বলেছিল, “তুই জানিস না, সায়ন… এই শহরটা আমাদের কেমন করে গিলে খেতে পারে। কিন্তু আমরা যদি আঁকায়, শব্দে, চিঠিতে… নিজেকে রেখে যেতে পারি, তবেই কিছু বেঁচে থাকবে।”

তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। মাধুরী বিশ্বাস করত বিপ্লবে। তার কাছে প্রতিবাদ ছিল আত্মার আত্মপ্রকাশ। সায়নের কাছে শিল্প ছিল শান্তির পথ, ভাবনার মুক্তি। তবুও, তারা একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করত।

শহরের ছাদে এক রাত, তারা বসেছিল একসাথে।

“তুই কি আমাকে ভালোবাসিস, মাধু?”

সে বলেছিল, “ভালোবাসি। কিন্তু জানিস, আমি যে পথে হাঁটি, সেটা তোর মতো শান্ত নয়।”

সেই দিনটাই ছিল এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ।

তারপর এল সেই ভয়াল দিন—৭ই এপ্রিল, ১৯৭৫। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ছাত্রদের এক বিশাল মিছিল বেরিয়েছিল ধর্মতলার দিকে। মাধুরী খুব উত্তেজিত ছিল। আগের রাতে সায়নের স্টুডিওতে এসে বলেছিল, “এই মিছিলটা ভিন্ন, সায়ন। এখানে কিছু বদল ঘটবে।”

সে দিন শেষ দেখা হয়েছিল ওদের।

সায়ন তার আঁকা একটি পোর্ট্রেট উপহার দিয়েছিল তাকে—মাধুরীর মুখ, চোখে অদ্ভুত এক গভীরতা।

“যদি তুই না ফিরিস?”

সে বলেছিল, “আমি ফিরবই। কিন্তু যদি না ফিরি… তখন জানবি, আমি তোকে ছেড়ে যাইনি—সময় আমাকে টেনে নিয়েছে।”

সেই মিছিলের পর আর মাধুরী ফেরেনি। তার বন্ধু অনিমেষ বলেছিল, “ওকে শেষবার দেখা গেছে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে। তারপর ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।”

অনেকে বলেছিল—“আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। হয়তো দল বদলে ফেলেছে।“

কেউ বলেছিল—“পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে, হয়তো মেরে ফেলা হয়েছে।“

আর সায়ন বিশ্বাস করত—“সে বেঁচে আছে। সময়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে মাত্র।”

সেই বিশ্বাস নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন পুরো জীবন। কোনওদিন মাধুরীর খোঁজ পাননি। কোনও খবর, কোনও নাম, কোনও ছবি। কিন্তু আজ… সেই বিশ্বাস যেন আবার আলো পেল। ৪৮ বছর পর, এক চিঠি। যেন অতীতের ধূলোমলিন দরজা খুলে দিয়েছে।

ঘরটা তখন এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় ঢাকা। রেডিও বন্ধ। জানালার পাশ দিয়ে বাতাস কেবল কাঁচের গায়ে আলতো শব্দ তুলে যাচ্ছে। সায়নের কাঁপা হাত ধীরে ধীরে খামের মুখ খুলল। পুরনো হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ। কালি কিছুটা মুছে গেছে, কিন্তু অক্ষরগুলো এখনও জ্যান্ত। যেন শব্দেরা আজও শ্বাস নিচ্ছে। তিনি চিঠিটি সামনে রাখলেন, টেবিলের নরম আলোয়। তাঁর চোখদুটো আবছা হয়ে এসেছে, কিন্তু মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ যেন মাধুরীর মুখ থেকে উঠে আসছে।

প্রিয় সায়ন,

তুই যখন এই চিঠিটা পাবি, জানি না সময় কেমন থাকবে। আমি কেমন থাকব, তাও জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে তোর মুখটাই আমার মনে পড়ছে। কলেজের সেই ক্যাফেটেরিয়া, তোর তুলি হাতে ঝুঁকে পড়া মুখটা, আমার পেনডেন্ট নিয়ে তোর মজা করা—সব।

আমি জানি, আজকের মিছিলটা অনেক বড়। আমি জানি না, ফিরব কিনা। কিন্তু তোর কাছ থেকে না বলে চলে যাওয়ার সাহস আমার নেই। তাই লিখে যাচ্ছি, যদি কোনওদিন তুই এই চিঠি খুঁজে পাও।

সায়ন, আমি তোকে ভালোবাসি। সেই প্রথম দিন থেকেই, যখন তুই আমার হাত থেকে বইটা কাড়তে গিয়েছিলি। আমি জানি, তুই রাজনীতি ভালোবাসিস না, তোর ভালোবাসা ক্যানভাসে, রঙে। কিন্তু আমি চাইতাম, একদিন তোর ক্যানভাসে আমাদের গল্পও থাকুক।

যদি ফিরতে পারি, আমি তোকে খুঁজে নেব। আর যদি না পারি… তুই জানবি, তুই ছিলি আমার শেষ ঠিকানা।

ভালো থাকিস। তোর,

—মাধুরী

চিঠি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সায়নের শরীর যেন জমে গেল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর, তার কাঁধ নেমে এল। যেন কোনও অলক্ষ্যে দম বন্ধ করে ছিল এতক্ষণ।

তিনি জানতেন না, চিঠিটা এতদিন কোথায় ছিল, কে এতোদিন জমিয়ে রেখেছিল। সম্ভবত ডাকঘরের কোনও পুরনো ব্যাগ, হয়তো কোন পুরনো প্রশাসনিক ভুল। কিন্তু এই মুহূর্তে তার মানে নেই। মানে আছে শুধু এই লেখাগুলোর, এই অনুভবগুলোর, এবং এই প্রশ্নের—তাহলে সে কি বেঁচে আছে?

এক মুহূর্তে তার মনে হলো—তিনি কি দেরি করে ফেলেছেন? এই দীর্ঘ সময় কি কেবল এক ভুলে ভরা প্রতীক্ষা ছিল?

তবে আরেক অংশ মন বলল—না। এখনও কিছু বাকি আছে। হয়তো শেষটা দেখা হয়নি।

তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বহু বছর পর, নিজের আঁকা সেই অসমাপ্ত ছবিটার দিকে তাকালেন—মাধুরীর মুখ, যেটা শেষ করতে পারেননি কখনও। আজ সে মুখ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেন তার চোখ বলছে—“আসিস একবার, পুরনো জায়গাগুলোয়। আমি অপেক্ষায় আছি।”

তিনি টেবিল থেকে এক পুরনো ডায়রি তুলে নিলেন। তাতে ছিল প্রেসিডেন্সির পুরনো বন্ধুর নাম, কিছু জায়গার ঠিকানা, এমনকি মাধুরীর কলেজ হোস্টেলের পুরনো নামও লেখা ছিল। অনেক কিছু মুছে গেছে, কিন্তু কিছু রেখা এখনও রয়ে গেছে।

তিনি জানতেন—এই চিঠিটা কেবল একটা লেখা নয়, এটা একটা ডাক। অতীত ডাকছে, উত্তর চাইছে।

চোখে অদ্ভুত আলো নিয়ে তিনি বললেন, “এবার আবার ফিরতে হবে সেই অলিগলিতে, সেই ঘাসে ঢাকা ক্যাম্পাসে। হয়তো এখনও সময় আছে।”

একটা নতুন সিদ্ধান্তে গতি এল তার চলনে। যেন একটা শান্ত মৃত্যু নয়, বরং এক নবজন্ম।

সকালবেলার হালকা কুয়াশা ভেদ করে ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি ভেসে এলো। সায়ন গার্ডেন রিচ রোড ধরে হাঁটছেন। পরনে ধুতি আর সাদা পাঞ্জাবি, সঙ্গে একটা পাতলা উলের চাদর জড়ানো। কাঁধে পুরনো ক্যানভাস ব্যাগ, তার ভেতরে সেই চিঠিটা আর একটি স্কেচবুক। এত বছর পর কলকাতা যেন একই সাথে অপরিচিত আর নিজের মতোই। মোড়ের চায়ের দোকান বদলে গেছে, কিন্তু রাস্তার মোড়টা ঠিক আগের মতোই। গোল দৃষ্টিতে তাকালে শহরের প্রাচীন রূপ এখনও ভেসে ওঠে।

প্রথম গন্তব্য—কলেজ স্কয়ার। তাঁর পায়ের নিচে কুয়াশা ভেজা ঘাস। বসে পড়লেন সেই পাথরের বেঞ্চটিতে, যেখানে বসে একদিন মাধুরী তার রাজনৈতিক আদর্শ বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। পাশের অশ্বত্থ গাছটা এখনও আছে—কিন্তু পাতাগুলো আর তত ঘন নয়। কোনও এক সময়, পাশে বসে থাকা এক ছাত্রী—নতুন প্রজন্মের—বলল,

“স্যার, আপনি কি এখানে কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?”

সায়ন হেসে বললেন, “হ্যাঁ, অনেক আগের একজনের জন্য।”

এরপর তিনি হাঁটলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের দিকে। কলেজ গেট এখন আরও বড়, সিসিটিভি আর নিরাপত্তা বেড়েছে। কিন্তু রঙ করা গেটের ওপর এখনও ঝুলছে পুরনো লোহার গেটের অবশিষ্ট চিহ্ন।

তিনি প্রবেশের অনুমতি চাইলেন—এক প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে। সৌভাগ্যবশত, কলেজে সেই সময়ের এক প্রবীণ অধ্যাপক, দেবজ্যোতি রায়, এখনও অতিথি বক্তা হিসেবে আসেন। সায়নের নাম শুনে তিনিই গেট পেরোনোর ব্যবস্থা করলেন।

“সায়নদা! আপনি! আপনার ছবি আমি এখনও ক্লাসে দেখাই—‘প্রতিবাদের রং’। কীভাবে একটা মুখে নীরব বিদ্রোহ আঁকা যায়, তা আপনার পোর্ট্রেট থেকেই শেখানো হয়।”

সায়নের কণ্ঠে নরম হাসি। “আমি শুধু এক মেয়েকে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম, দেবু। হয়তো পুরোপুরি পারিনি… আজ তাই এসেছি।”

ক্যান্টিনে গিয়ে বসলেন। চা আর ‘ভেটকি কাটলেট’ এখন আর থাকে না, কিন্তু সেই মোড়ের চায়ের গন্ধ—আজও একই। চোখ বুজে তিনি মাধুরীর গলা শুনলেন, “এই কাটলেটটা তুই খে তো একবার, তারপর বুঝবি কমিউনিজম মানে কেবল বক্তৃতা নয়, খিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও।”

সঙ্গে ছিলেন এক ছাত্র, যিনি শুনে ফেলেছিলেন সায়নের কথাবার্তা।

“স্যার, আপনি কি মাধুরী সেনের কথা বলছেন? আমার ঠাম্মা বলতেন ওনার কথা, ওদের কলেজে খুব নাম ছিল।”

“তুমি জানো কিছু?”—আবেগ চেপে সায়নের প্রশ্ন।

“না স্যার, শুধু শুনেছি উনি নাকি পরে কোথাও চলে যান, কিন্তু কোথায়, কেউ জানে না। তবে দমদমের কাছে এক আশ্রমে উনার ছবি নাকি কেউ দেখেছে। আমি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি।”

এই আলোক রেখা নতুন উদ্যম দিলো।

সেখান থেকে সায়ন গেলেন কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইয়ের দোকানে। ‘মিত্র অ্যান্ড ঘোষ’-এ এখনও সেই ভাঙা সিঁড়ি, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা ‘ঘরে বাইরে’ নিয়ে তর্ক করেছিল। দোকানের শেষ তাকে একজন বয়স্ক কর্মচারী চিনতে পারলেন।

“আপনি তো সায়নবাবু? আপনার আঁকা ‘মোহমুক্তি’ তো এখনও আমাদের দেয়ালে বাঁধাই করা আছে!”

তিনি জিজ্ঞেস করলেন মাধুরীর বিষয়ে। কর্মচারী মাথা নাড়লেন—“অনেক খুঁজেছে লোকে, কিন্তু কেউ কিছু জানে না। তবে একবার ওর নামে কেউ একটি অজানা ছদ্মনামে লেখা কবিতা পাঠিয়েছিল। সেখানে একটা জায়গার নাম ছিল—‘কৃষ্ণবালা আশ্রম’।”

নতুন সূত্র। একটা রোমাঞ্চ বয়ে গেল সায়নের শরীর জুড়ে।

শেষ গন্তব্য—প্যারামাউন্ট শরবতের দোকান।

তিনি জানালেন সেই পুরনো স্বাদ চাই। দোকানদার বলল, “বাবু, আজকাল কেউ আর ‘দাবার লেবু’ চায় না।”

সায়ন হেসে বললেন, “আজকে এক স্মৃতি খুঁজছি, রসনা নয়।”

সেই শরবতের মধ্যে পুরনো কথা, পুরনো চোখ, হাসির প্রতিধ্বনি—সব যেন মিলিয়ে যাচ্ছিল।

সন্ধ্যা নামে। আলো-আঁধারিতে কলকাতা আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। তিনি ভাবেন—‘কৃষ্ণবালা আশ্রম’ যদি সত্যি থাকে, তবে সেখানেই শেষ ভোর হতে পারে।

পরদিন ভোরবেলা দমদমগামী ট্রেনে উঠে পড়েন তিনি। খাতা খুলে চিঠিটা আবার পড়েন। চোখে জল নয়, বরং এক শীতল সংকল্প।

“এইবার তুই না ফিরলেও আমি আসছি। শেষবারের মতো।”

সকাল ৮টা। দমদম স্টেশন পেরিয়ে রিকশায় কৃষ্ণবালা আশ্রমের দিকে যাচ্ছেন সায়ন। শরীরটা ভারী, কিন্তু মনে কেমন একটা হালকা বাতাস। আশ্রমের নামটা আগেও শুনেছেন হয়তো কোথাও—পুরনো পত্রিকার কোনও প্রবন্ধে, বা কোনও সাহিত্য পত্রিকায়। তখন গুরুত্ব দেননি।

“আশ্রম”—এই শব্দে তাঁর মনে পড়ে মাধুরীর একটা উক্তি:

“যদি কোনওদিন হারিয়ে যাই, আমি কোনও শান্ত জায়গায় যাব—যেখানে আর প্রশ্ন নেই, শুধু নিজের ভেতরের উত্তর আছে।”

এখানেই হয়তো সেই স্থিরতার খোঁজ মাধুরী পেতে চেয়েছিল।

রিকশাওয়ালা বলে, “বাবু, ওখানে খুব বেশি লোক যায় না। মা কৃষ্ণবালার নামে একটা নির্জন ঘর তৈরি হয়েছিল, এখন বয়স্ক মহিলারা থাকেন। কেউ কেউ বলেন, ভিতরে একটা ছোট্ট লাইব্রেরি আছে, কেউ-কেউ লেখে, আঁকে… শুনেছি কোনও এক সময় এক ‘মেডাম’ ছিলেন যিনি কাউকে সামনে আসতেন না, কেবল চিঠি লিখতেন।”

সায়নের বুক কেঁপে ওঠে।

তিনি পৌঁছান এক শীতল, শান্ত, গাছপালায় ঢাকা এক বাড়ির সামনে। ভেতরে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়েন। একজন মাঝবয়সী নারী দরজা খোলেন—শান্ত মুখ, কপালে সাদা টিপ, হাতে শাখা-পলা।

“আমি সায়ন মুখার্জি। জানতে চেয়েছিলাম এখানে কি একসময় কেউ ছিলেন—মাধুরী সেন নামের একজন?”

নারীটি কাঁপা গলায় বলেন, “আপনি… সায়নদা?”

তিনি বিস্মিত। “আপনি আমাকে চেনেন?”

“না। কিন্তু এই নামটা আমি বহুবার শুনেছি। আসুন, আমি আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।”

তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় আশ্রমের ভিতরে, একটি ছোট্ট ঘরে—আলো-আঁধারিতে ঢাকা, কাঠের পুরনো বুকশেলফ। শেলফের মাঝের তাক থেকে বের করে আনা হয় একটি নীল কাপড়ে মোড়া পুরনো খাতা।

“এটা আমাদের ‘গেস্ট বুক’ ছিল না। এটা ছিল মাধুরীদি’র ‘রাত্রির খাতা’। উনি কাউকে কিছু বলতেন না, শুধু লিখতেন। আমরা কেউ বুঝতাম না ঠিক কী। উনি সবসময় বলতেন—‘যদি কোনওদিন এক ভদ্রলোক এসে আমার কথা জিজ্ঞেস করেন, এই খাতা তাঁকে দিও।’”

সায়নের হাত কাঁপছে। তিনি ধীরে ধীরে খাতা খুললেন।

ডায়েরির প্রথম পাতা:

“সায়নের জন্য, যদি কোনওদিন দেখা হয়।”

১৩ই এপ্রিল, ১৯৮০

“আমি বেঁচে আছি। পালিয়ে বাঁচিনি, সময়ের ঘূর্ণিতে পড়ে গিয়েছিলাম। মিছিল থেকে ধরা পড়েছিলাম। পুলিশের কাস্টডি, তারপর কিছু অদৃশ্য সময়… আমি বেরিয়ে এলাম ঠিক, কিন্তু আমি আর সেই মাধুরী ছিলাম না। আমার শরীরটা ফিরেছিল, আত্মাটা কোথাও থেকে গিয়েছিল।”

“তোকেই খুঁজতাম… চিঠি লিখেছিলাম জেলের ভিতর থেকে। জানি না পৌঁছেছিল কিনা। ভাবলাম যদি না পেয়েও থাকিস, তবুও জানবি—আমি কখনও তোর ভালোবাসা হারাইনি।”

“এই আশ্রম আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। এখানে আমি আঁকি, লিখি, হাঁটি, ভাবি… কিন্তু সব কিছুতেই তোকে খুঁজি।”

পাতা পাতায়, তারিখে তারিখে সায়নের নাম, সেই কলেজ ক্যান্টিনের স্মৃতি, প্রথম চুম্বনের লজ্জা, তাদের ঝগড়া, মাধুরীর রাজনৈতিক যন্ত্রণার কথা, এবং এক নিঃশব্দ ক্ষমাপ্রার্থনা।

“তুই বলেছিলি—আমার চোখে অদ্ভুত কিছু আছে। আমি এখন জানি, সেটা ছিল ভয়। আমি তোকে না হারানোর ভয়েই তোর থেকে দূরে চলে গিয়েছিলাম।”

ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা—

“যদি তুই কোনওদিন এই খাতা পড়িস, আমি চাই তুই জানিস—তুই ছিলি আমার চিত্রকল্প, আমি ছিলাম তোর ব্যাখ্যাতীত কবিতা। আমরা হয়তো শেষ অবধি এক ছবি আঁকতে পারিনি, কিন্তু প্রতিটা রেখায় তোর ছায়া ছিল।”

সায়নের চোখ তখন ঝাপসা। তার মনে হচ্ছিল—পুরো জীবনটা আসলে অপেক্ষার জন্যই ছিল। একটা চিঠি, একটা ডায়েরি, একটা অসমাপ্ত সম্পর্কের জন্য।

আশ্রমের মহিলাটি বললেন, “উনি পাঁচ বছর আগে মারা যান। খুব নিঃশব্দে। কেবল এই খাতা রেখে গিয়েছিলেন। আমরা জানি না আপনি কোথায় থাকেন, তাই কখনও খোঁজ করা হয়নি।”

সায়ন জানালেন না—তিনি তো কখনও গিয়েও দেখেননি। সাহস হয়নি। হয়তো এটাই সত্যিকারের প্রতিক্রিয়া—ভালোবাসার, অপরাধবোধের, স্মৃতির।

তিনি সেই ডায়েরি কোলে নিয়ে চুপ করে বসলেন। তখন সন্ধ্যা নামছে।

এক বুড়ো গাছের ছায়ায় বসে, তিনি ডায়েরির পাশে নিজের স্কেচবুক খুললেন।

প্রথমবারের মতো, তিনি শেষ করলেন সেই পোর্ট্রেট। মাধুরীর মুখ।

তবে এবার শুধু চোখ নয়, ঠোঁটেও একটুকরো হাসি।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নামে কৃষ্ণবালা আশ্রমে। পাখিরা ফিরে যাচ্ছে, পলাশ গাছের নিচে ছায়া গাঢ় হচ্ছে। সায়ন একা বসে আছেন, তাঁর সামনে মাধুরীর ডায়েরি, পাশে নিজের খোলা স্কেচবুক, আর হাতে একটি সাদা কাগজ।

এই চিঠিটা আর কাউকে পাঠানোর জন্য নয়।

এই চিঠি তাঁর অতীতের মাধুরীকে—যে ট্রামে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত, সেই মাধুরীকে—যে একদিন তার হাত চেপে বলেছিল,

“তুই রং দিয়ে যা বলিস, আমি তা শব্দ দিয়ে বলি। আমরা একসাথে একটা অর্থ তৈরি করি, তাই না?”

সায়নের কলম চলতে শুরু করে…

কলকাতা, কৃষ্ণবালা আশ্রম

২রা জানুয়ারি, ২০২৫

প্রিয় মাধুরী,

আজ অনেক বছর পর তোকে লিখছি। হয়তো তুই এই চিঠি কখনও পাবি না। কিংবা… তুই একান্তভাবে পাঠ পাচ্ছিস—হাওয়ার শব্দ, পাতার নড়াচড়া, আমার আঁকা ছবির রেখায়।

চিঠির শুরুটা কী দিয়ে করব বুঝতে পারছিলাম না। তোকে হারানোর পর আমি অনেকগুলো বছর কাটিয়েছি ভেতরে ভেতরে এক দীর্ঘ নীরবতায়। বাইরের পৃথিবী আমাকে চিনত একজন শিল্পী হিসেবে, কিন্তু আমি জানি, আমি কেবল একজন প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পুরুষ।

তুই যখন হারিয়ে গেলি, আমি তোর চিঠির অপেক্ষায় ছিলাম। আমার ঠিকানায় তোর কিছু না আসায় ভাবলাম—তুই চায় না আমাকে খুঁজতে।

আজ জানলাম, তুই চিঠি লিখেছিলি, ডায়েরি লিখেছিলি, অপেক্ষা করেছিলি… হয়তো আমার থেকেও বেশি।

তোর ডায়েরির প্রতিটি শব্দ পড়তে গিয়ে মনে হলো, তুই যেন ঠিক আমার কানে কানে বলছিস—“তুই দেরি করেছিস, কিন্তু আসছিস।”

আমি দেরি করেছি, মাধু। আমি ভীষণ দেরি করেছি।

তোর চোখের সেই অদ্ভুত আলো আমি কখনও ভুলিনি। কেউ বলেন, সেই আলো ছিল বিপ্লবের, কেউ বলেন প্রেমের। আমি বলি, সেটা ছিল ‘জীবনের’। তুই যা ছিলি, তা সময় পেরিয়ে আজও সত্য।

আমি তোকে আঁকতে চাইনি শুধু—আমি তোকে ধারণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোকে বোঝার জন্য যে গভীরতা চাই, সেটা তখন আমার ছিল না।

আজ, তোকে আর কাছে না পেয়েও, তোর ডায়েরি আমার চোখের সামনে রেখে, আমি বুঝি—তুই আমায় মাফ করেছিস।

আমার শেষ ইচ্ছেটা শুধু এই—যেখানে তুই শুয়ে আছিস, তার পাশে যদি একটু জায়গা থাকে, আমি একদিন সেখানে আসব।

তুই চেয়েছিলি “স্থিরতা”—আমি তা বুঝতে শিখেছি অনেক দেরিতে।

তোর মতো করে না, আমার মতো করে… আমি তোকে ভালোবেসেছিলাম। এখনও বাসি।

তোর সায়ন।

চিঠি লিখে শেষ করেও সায়ন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন কাগজটার দিকে। যেন সাদা পৃষ্ঠায় এখনও কিছু অসমাপ্ত রেখা পড়ে আছে। সন্ধ্যার আলোয় তিনি চিঠিটা ভাঁজ করেন, ডায়েরির ভেতরে রেখে দেন। তারপর উঠে দাঁড়ান। হাঁটেন ধীরে ধীরে সেই গাছটার দিকে—যেখানে মাধুরী নাকি বসতেন বিকেলে, রঙিন চাদরে মোড়া হয়ে। সেখানে বসে তিনি তাঁর স্কেচবুকের শেষ পাতায় আঁকেন দুটি হাত—একটা রঙে রাঙানো, আরেকটা কালি-মাখা। দুই হাত ছুঁয়ে আছে—কিন্তু মাঝখানে কিছুটা ফাঁক রয়ে গেছে। তিনি সেই ফাঁকে একটা লাইন লেখেন—মাধুরীর ভাষায়, “ভালোবাসা মানে সবসময় একসাথে থাকা নয়—কখনও কখনও মানে অপেক্ষার ছবি আঁকা।”

পেছনে আশ্রমের ঘন্টার শব্দ বাজে। এক নতুন দিন শুরু হতে চলেছে।

 

শেষ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

1000022898.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *