Bangla - ভ্রমণ

শিলং-এর মেঘবাড়ি

Spread the love

রোহিত মজুমদার


গুয়াহাটির ব্যস্ত শহর পেরিয়ে যখন গাড়ি ধীরে ধীরে পাহাড়ি ঘুরপথে উঠতে শুরু করে, তখনই ভ্রমণকারীর মন এক অদ্ভুত উত্তেজনায় ভরে ওঠে। শহরের কোলাহল, যানজট, বাজারের ভিড়—সব যেন দ্রুত পিছনে মিলিয়ে যায়, আর সামনে এসে দাঁড়ায় প্রকৃতির এক নতুন রূপ। সেদিন বর্ষার ভেজা সকাল। আকাশে মেঘ জমে উঠেছিল অনেকক্ষণ ধরেই, কিন্তু পাহাড়ের দিকে এগোতেই সেই মেঘ যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। রাস্তার দু’ধারে ঘন সবুজ গাছ, তাদের ভেজা পাতার উপর বৃষ্টির ফোঁটা জমে চকচক করছে। গাছের গায়ে বেয়ে নামছে অদৃশ্য ছোট ছোট ঝরনা, যার শব্দ মিশে যাচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিনের গুঞ্জনে। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছে ছোট গ্রাম, টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়ি, মাটির চুল্লি থেকে ধোঁয়া উড়ছে। পাহাড়ি মহিলারা রঙিন শাল পরে হাঁটছেন, কাঁধে বাঁশের ঝুড়ি, আর মুখে অচেনা সুরের গান। প্রতিটি দৃশ্য যেন জানাচ্ছিল—ভ্রমণকারী এখন আর সমতলের শহুরে জগতে নেই, ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে এক স্বপ্নরাজ্যে, যার নাম মেঘালয়।

গাড়ি যত উপরে উঠতে থাকে, আকাশে মেঘ তত নিচে নেমে আসে। কখনও মনে হয়, মেঘ যেন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিচ্ছে। দূরের পাহাড়চূড়ায় ধূসর পর্দার মতো মেঘের আস্তরণ পড়েছে, আর সেই আস্তরণ মাঝে মাঝে ছিঁড়ে গিয়ে ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে রোদমাখা সবুজ। মেঘের চলাফেরা এত দ্রুত যে এক মুহূর্তে পাহাড় পুরোপুরি আড়াল হয়ে যায়, আর পরের মুহূর্তেই আবার সগৌরবে দাঁড়িয়ে ওঠে সবুজ কোলাহলে ভরা চূড়াগুলো। এই ওঠানামার মধ্যে যে রহস্য, তা ভ্রমণকারীর মনে কবিতার মতো জায়গা করে নেয়। গাড়ির ভেতরে বসে কেউ ছবি তুলছে, কেউ জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ভেজা বাতাস ছুঁয়ে দিচ্ছে, আবার কেউ শুধু নীরবে তাকিয়ে আছে সামনে—কারণ এই সৌন্দর্যকে শব্দে বাঁধা সত্যিই কঠিন। মনে হচ্ছিল, মেঘ যেন এই পথের সত্যিকারের রক্ষক, যিনি আগন্তুককে স্বাগত জানাচ্ছেন আবার একইসঙ্গে পরীক্ষা নিচ্ছেন, প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে প্রস্তুত কি না।

একসময় রাস্তা এমন সরু হয়ে আসে যে মনে হয়, একপাশে ঘন বন, আরেকপাশে গভীর খাদ—কেবল সেই আঁকাবাঁকা পথটুকুই ভ্রমণকারীর নিরাপদ আশ্রয়। নিচে তাকালেই দেখা যায় কুয়াশায় ঢেকে থাকা নদী, যার শব্দ উপরের নীরবতায় মিলিয়ে গেছে। বাতাসে তখন এক অদ্ভুত গন্ধ—ভেজা মাটি, বুনো ফুল, আর অচেনা পাহাড়ি গাছের সুবাস মিলেমিশে যেন এক নেশার আবেশ তৈরি করেছে। গাড়ির জানলা দিয়ে আসা হাওয়ায় ভিজে ওঠে মুখ, আর মনে হয় সত্যিই পৃথিবীর কোনও সাধারণ শহরের দিকে নয়, এক জাদুকরী রাজ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে সবাই। যাত্রীদের মনে তখন শুধু একটি প্রশ্ন—শিলং কি কেবল একটি পাহাড়ি শহর, নাকি প্রকৃতির আঁকায় তৈরি কোনও অদৃশ্য কবিতা, যার প্রতিটি স্তবক ভেসে আসে মেঘের আড়াল থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর তখনও অজানা, কিন্তু মনে হচ্ছিল—যাত্রাপথের প্রতিটি বাঁকই যেন ধীরে ধীরে সেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার একটি ধাপ। এখানেই ভ্রমণের প্রকৃত সূচনা—মেঘালয়ের দ্বারে প্রথম প্রবেশ, যা যাত্রীকে ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গভীরে, আর প্রতিশ্রুতি দেয় এক অনন্ত বিস্ময়ের।

শিলং-এ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ভ্রমণকারীর মনে যে দৃশ্যটি স্থায়ী হয়ে যায়, তা হলো মেঘের বিস্ময়কর উপস্থিতি। সাধারণত আমরা মেঘকে দেখি আকাশের ওপরে ভেসে বেড়াতে, দূরের এক অচেনা ছায়া বা ভাসমান ক্যানভাসের মতো। কিন্তু শিলং-এ এসে সেই ধারণা পাল্টে যায় সম্পূর্ণ। এখানে মেঘ কেবল আকাশে থাকে না, বরং ঘরবাড়ির জানলার পাশে এসে দাঁড়ায়, পাহাড়ি রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়, কখনও আবার চুপিসারে ঘরে ঢুকে পড়ে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে মনে হয়, যেন এক বিশাল সমুদ্র, যেখানে ঢেউয়ের জায়গায় আছে সাদা ধোঁয়াশা মেঘ। গাড়ির হেডলাইট কেটে এগোতে হয় সেই মেঘের ভেতর দিয়ে, কখনও সামনে পথের অস্তিত্বই বোঝা যায় না। এই অভিজ্ঞতা শহরের মানুষকে প্রথমে বিভ্রান্ত করে, আবার একইসঙ্গে বিমুগ্ধও করে তোলে। মেঘালয়ের নামের ভেতর যে মেঘের রাজত্বের আভাস আছে, তার প্রতিটি প্রমাণ মেলে শিলং-এর প্রথম দিনেই।

শিলং-এর স্থানীয় মানুষজনের কাছে মেঘ কোনও বিস্ময়ের বিষয় নয়। তারা একে অতিথি নয়, আত্মীয় হিসেবে মানেন। তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মেঘ এমনভাবে মিশে গেছে যে আলাদা করে ভাবার সুযোগ নেই। একজন দোকানদার হাসিমুখে বললেন—“আপনারা যেমন প্রতিবেশীকে প্রতিদিন দেখেন, আমরাও তেমনই প্রতিদিন মেঘকে দেখি।” সত্যিই, বাজারে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় মেঘ এসে দোকানের ভেতর ঢুকে পড়েছে; খোলা চায়ের কাপে বাষ্পের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মেঘের কণিকা। আবার পাহাড়ি গ্রামে গেলে দেখা যায়, বাচ্চারা মাঠে খেলছে, হঠাৎ মেঘ নেমে এসে তাদের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিল। অথচ খেলায় তাদের বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটে না। যেন মেঘ তাদের শৈশবের সঙ্গী। পাহাড়ের মহিলারা মেঘের ভেতর দিয়েই ঘর থেকে বের হচ্ছেন, হাতের ঝুড়ি নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন, আর মুখে হাসি। মেঘকে তারা ভয় পান না, বরং স্নেহের সঙ্গে বরণ করেন। এই সহজ সম্পর্ক ভ্রমণকারীর মনে বিস্ময় জাগায়—যেখানে শহুরে মানুষ কেবল দূর থেকে মেঘকে দেখে মুগ্ধ হয়, সেখানে শিলং-এর মানুষ মেঘকে নিজেদের আত্মীয়ের মতো করে বুকে টেনে নিয়েছে।

শিলং-এর ভেজা বিকেল বা সন্ধ্যায় মেঘের খেলা সবচেয়ে মোহময় হয়ে ওঠে। রাস্তার ধারে দাঁড়ালে হঠাৎ দেখা যায় মেঘ এসে সবকিছু আড়াল করে দিল। দোকান, গাড়ি, মানুষ—সবই যেন মুছে গেল সাদা পর্দার আড়ালে। কয়েক মুহূর্ত পরে মেঘ সরতেই আবার প্রকাশ পেলো এক নতুন দৃশ্য, নতুন আলো। ঠিক যেন এক নাটকের মঞ্চে বারবার উঠছে আর নামছে পর্দা। ভ্রমণকারীরা তখন শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, মনে হয় প্রকৃতি যেন তাদের জন্য এক বিশেষ প্রদর্শনী সাজিয়েছে। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরে তাকালে মেঘের ভেতর থেকে শোনা যায় অচেনা পাখির ডাক, কখনও আবার ঝর্ণার গর্জন। এই মিশ্র শব্দে ভেসে ওঠে পাহাড়ের সুরেলা গান, যা মেঘালয়ের আকাশে চিরকাল বাজতে থাকে। সেই মুহূর্তে সত্যিই মনে হয়—এখানে মেঘ অতিথি নয়, আত্মীয়। তার উপস্থিতি শুধু চোখে দেখা নয়, হৃদয়ে অনুভব করার বিষয়। ভ্রমণকারী বুঝতে পারে, শিলং-এর সৌন্দর্যের প্রকৃত রহস্য লুকিয়ে আছে এই মেঘের অন্তরালে, যে মেঘ প্রতিদিন নতুন রূপে এসে বলে যায়—“আমি তোমার কাছের, তোমার আপনজন।”

বর্ষার মৌসুমে শিলং শহর যেন নতুন রূপে সাজে। শহরের চিরাচরিত ব্যস্ততা ও জীবনের ভিড় কিছুক্ষণ থমকে যায়, কারণ চারপাশ জুড়ে ঝর্ণার সুরেলা আহ্বান প্রতিধ্বনিত হয়। এলিফ্যান্ট ফলসের বিশাল জলপ্রপাতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় প্রকৃতিই যেন এক সঙ্গীতকার। পাহাড় থেকে নেমে আসা জলের নীলাভ ঝর্ণা বাতাসের সাথে মিশে একধরনের সুরের স্রোত তৈরি করে, যা দূর থেকে শুনলেও মনকে শীতল করে দেয়। পর্যটকেরা প্রায়শই এখানে থমকে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে সেই জলপ্রপাতের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেয়। ঝড়ো বাতাসে পানি কণাগুলো হালকা ছিটকে পড়ে, এবং সেই ছিটকায় তৈরি হওয়া রংধনুর আভা দর্শকের চোখকে মুগ্ধ করে। এলিফ্যান্ট ফলসের চারপাশের পাহাড়ের সবুজ গাছপালা যেন এই জলপ্রপাতকে আলিঙ্গন করছে, আর পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঝর্ণাগুলো এলিফ্যান্ট ফলসের সাথে প্রতিযোগিতা করে মনে হয়, কে বেশি মনোমুগ্ধকর সুর সঞ্চার করবে। দূর থেকে শোনা যায় ঝর্ণার গর্জন, আর কাছে গেলে সেই শব্দ যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে, প্রতিটি ফোঁটা যেন গল্প বলছে, পাহাড়ের গোপন ইতিহাসের মতো।

শিলং পিকের সৌন্দর্যও এ সময়ে তার চরম সীমায় পৌঁছায়। এখানে বসে পাহাড়ী ঝর্ণাগুলোকে দেখা যায়, যা ছোট ছোট ধাপের মতো নিচে নামে। প্রতিটি ধাপে ধাপে জল পড়ে, এবং সেই পড়ার সুর দূর-দূরান্তে শোনা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ভ্রমণকারীরা চোখ বন্ধ করে সেই সুরের সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে নেয়। ঝর্ণার জলে ধরা পড়া আলো এবং ছায়ার খেলা এক অন্যরকম রঙের মহিমা তৈরি করে। বাতাসে ভেসে আসা জলকণা ভ্রমণকারীদের গায়ে লেগে যায়, যেন প্রকৃতিই তাদের সঙ্গে খেলছে। শিলং পিকের পাশের বনাঞ্চলে নানা প্রজাতির পাখি ঝর্ণার কাছাকাছি এসে গান গায়, আর সেই পাখির সুর জলের সুরের সাথে মিলিত হয়ে এক অসাধারণ সঙ্গীত তৈরি করে। পাহাড়ের ঢালু পথ ধরে নামার সময় ছোট ছোট ঝর্ণাগুলো যেন হঠাৎ হঠাৎ দর্শকের সামনে আসে, আর প্রতিটি ধাপের সঙ্গেই ভ্রমণকারীর মনকে নতুন রোমাঞ্চ দেয়। নীচের গ্রামগুলোও এই জলধারা থেকে আলোকিত মনে হয়, কারণ ঝর্ণার জলের প্রতিফলন গাছপালার পাতা, ছোট নদী আর ধানের ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো এলাকা জুড়ে এক প্রাকৃতিক জ্যোতি সঞ্চার করে।

ঝর্ণার পরিবেশ শুধু চোখের আনন্দই নয়, এটি মানসিক শান্তিরও উৎস। বর্ষার এই মৌসুমে শিলং শহর যেন মানুষের সকল দুশ্চিন্তা মুছে ফেলে, এবং প্রত্যেকটি ভ্রমণকারী নিজের ভেতরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। জলের শব্দে মিশে বাতাসের ফিসফিস, পাখির সুর আর পাহাড়ের নীরবতা—সবকিছু এক সঙ্গে মিলিয়ে একটি অনন্য সঙ্গীতের সৃষ্টি করে। ভ্রমণকারীরা প্রায়শই ঝর্ণার ধারে বসে সময় কাটায়, চুপচাপ সেই সুরের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে নিয়ে। অনেকেই ছবি তুলে রাখে, কিন্তু প্রকৃত আনন্দ আসে তখন, যখন তারা চোখ বন্ধ করে প্রকৃতির এই অনন্য সঙ্গীতকে অনুভব করে। ছোট ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার মন যেন একাকার হয়ে যায় ঝর্ণার সুরে। বর্ষার জলধারা, পাহাড়ের সবুজ শোভা, আর বাতাসের সঙ্গীত একত্র হয়ে একটি চিরন্তন স্মৃতি তৈরি করে, যা ভ্রমণকারীর মনে আজীবন লেগে থাকে। এই ঝর্ণার সুরেলা আহ্বান শুধুমাত্র ভ্রমণকে নয়, বরং মানুষের অন্তরের এক গভীর শান্তি ও আনন্দকে উন্মুক্ত করে, যা শহরের জীবনের ভিড় থেকে অনেক দূরে, প্রকৃতির কোলে স্থায়ী হয়ে যায়।

বর্ষার দিনে শিলং শহর যেন এক নতুন প্রাণ পায়। শহরের ছোট ছোট রাস্তা, তার বাঁকা মোড়, এবং পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা বাজারগুলো ভিজে থাকে বৃষ্টির রঙিন ছটায়। পর্যটকেরা ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে রঙিন পোশাকে মানুষজনকে লক্ষ্য করে, যারা নিজেদের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে মিশিয়ে শহরের রঙিন ছন্দে খাপ খাইয়ে চলেছে। ছোট ছোট দোকানগুলো থেকে চা ও স্থানীয় খাবারের সুগন্ধ বাতাসে মিশে যায়। গরম, ভাপোমাখা চা হাতে নিয়ে মানুষ হাটছে, আর পাশে ঝাল-ঝাল খাবারের দোকানগুলো থেকে ভাপ বের হচ্ছে, যা মনকে খুশিতে ভরে দেয়। বাজারের ছোট ছোট রাস্তাগুলোতে শিশুদের হাসি আর দোলনা চাকা ঘোরানোর শব্দ শহরের প্রাণের সঙ্গে মিশে যায়। প্রতিটি দোকান, প্রতিটি রঙিন ছাতা, প্রতিটি হাসি যেন শহরের প্রাণের একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়। পর্যটকরা ছবি তোলে, কিন্তু প্রকৃত আনন্দ আসে তখন, যখন তারা চারপাশের মানুষের সঙ্গে সেই শহরের জীবনের ছন্দকে অনুভব করে।

শিলংয়ের পাহাড়ি বাজারের সৌন্দর্য বর্ষার দিনে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। লম্বা লাইন ধরে সাজানো দোকানগুলো, যেগুলোতে স্থানীয় চা, হস্তশিল্প, মশলা এবং সুগন্ধি বিক্রি হয়, যেন পর্যটকের মনে এক ধরনের আবেগের ঢেউ তোলে। বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা পাথুরে পথ দিয়ে হেঁটে যেতে গিয়ে মানুষের মন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। দোকানিরা হাসিমুখে অতিথিদের স্বাগত জানায়, আর স্থানীয় ভাষায় হালকা কথোপকথন বাজারে এক অনন্য সঙ্গীতের সুর তৈরি করে। রাস্তার কোণে কোণে ছোট ছোট ঝুলন্ত বাতি, রঙিন কাপড়ের ছাতা, এবং পাহাড়ের সবুজ প্রাকৃতিক পটভূমি এক অদ্ভুত মিলনের সৃষ্টি করে। ছোট ছোট চা ঘরগুলোতে মানুষ বসে গল্প করে, গরম চায়ের কাপে মুখ ঢেকে বসে থাকে, আর বাইরে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ চারপাশকে আরও মধুর করে তোলে। ঝাল-ঝাল খাবারের গন্ধ এবং চা থেকে আসা গরম ভাপ শহরের আভিজাত্যকে আরেকধরনের প্রাণবন্ততা দেয়।

শিলং শহরের প্রাণ কেবল বাজার এবং রঙিন পোশাকে মানুষে সীমাবদ্ধ নয়; শহরের সাংস্কৃতিক দিকও বর্ষায় এক বিশেষ ছন্দে জেগে ওঠে। পাহাড়ি ভাষার গান, স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রের সুর, এবং রাস্তার কোণে আয়োজিত ছোট ছোট নৃত্যকলা—সব মিলিয়ে পর্যটকের মনে একটি চিরন্তন স্মৃতি তৈরি করে। মানুষ শুধু ভ্রমণ করছে না, তারা শহরের সঙ্গে এক অভিন্নতার অনুভূতি লাভ করছে। শিশুরা খেলছে, দোকানিরা হাসছে, এবং পাহাড়ি নায়কের মতো স্থানীয় লোকেরা ভ্রমণকারীদের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত—সব মিলিয়ে শহরের প্রাণের রূপান্তর ঘটে। বর্ষার এই দিনগুলোতে শিলং কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং একটি অভিজ্ঞতা, যা মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। শহরের রঙিন সৌন্দর্য, বাজারের জীবন্ততা, পাহাড়ি সুর আর মানুষের আন্তরিকতা একসাথে মিলিয়ে একটি প্রাণবন্ত চিত্র তৈরি করে, যা প্রত্যেক ভ্রমণকারীর মনে আজীবন অমর হয়ে থাকে।

বর্ষার এই সময়ে শিলং-এর গ্রামাঞ্চল যেন নতুন জীবনে সিক্ত হয়। পাহাড়ের ঢালু পথে হাঁটতে হাঁটতে, দূরের মাটির বাড়ি এবং খোলা প্রাঙ্গণে স্থানীয় মেলা বা ছোট গ্রামোৎসব দেখা যায়। এই উৎসবগুলোতে খাসি, গারো এবং অন্যান্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ একত্র হয়ে নিজেদের সংস্কৃতি, গান, নৃত্য এবং খাদ্য নিয়ে মেলায় মেতে ওঠে। শিলং-এর বর্ষার মাটির গন্ধ, বৃষ্টির ফোঁটার ছন্দ, এবং পাহাড়ি বাতাসের হালকা সুর এই সবকিছুর সঙ্গে মিলেমিশে এক অদ্ভুত সঙ্গীত সৃষ্টি করে। গ্রামের পাকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভ্রমণকারীরা হঠাৎ খাসি নারী বা গারো পুরুষদের কণ্ঠে উঠে আসা প্রেমের, প্রকৃতির, বৃষ্টির গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যায়। এই গানগুলো শুধুই সুর নয়, বরং মানুষের অনুভূতি, তাদের গল্প এবং পাহাড়ের সঙ্গে তাদের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের একটি জীবন্ত প্রকাশ। গানের ছন্দ, লয়ের সঙ্গে পাহাড়ের বৃষ্টির সুর মিশে এক অদ্ভুত কাব্যিক পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা ভ্রমণকারীর মনকে হালকা করলেও গভীরভাবে স্পর্শ করে।

মেলার চারপাশে ছোট ছোট কাঠের মঞ্চে স্থানীয় লোকেরা গান গায়। খাসি যুবকরা বাঁশের বাঁশি বা স্থানীয় ড্রাম বাজিয়ে গানের সঙ্গে তাল মেলায়, আর মহিলা এবং বৃদ্ধেরা নাচে, তাদের পা জমে উঠা মাটিতে এক বিশেষ ছন্দ তৈরি করে। বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা পিচ্ছিল পথ, বালির উপর পড়ে থাকা জল, সব মিলিয়ে এই সঙ্গীতময় পরিবেশকে আরও প্রাকৃতিক ও প্রাণবন্ত করে তোলে। স্থানীয় মানুষদের চোখে উজ্জ্বলতা, হাসি, এবং উদ্দীপনা ভ্রমণকারীদের মনে এক অদ্ভুত আনন্দের সৃষ্টি করে। পাহাড়ের চারপাশের সবুজ গাছপালা যেন গানের সুরে মিলে একত্রিত হয়, এবং প্রতিটি পাতা, প্রতিটি ঝর্ণার ফোঁটা যেন মানুষের কণ্ঠের সাথে তাল মেলাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি ভ্রমণকারীর জন্য অনুভূতির এক সম্পূর্ণ রূপান্তর। তারা কেবল দেখতে পাচ্ছে না, তারা শুনছে, স্পর্শ করছে, এবং নিজের অন্তরে সেই সুরের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে।

বর্ষার দিনে এই লোকগানের স্রোত গ্রামবাসীর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। ছেলে-মেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে এসে মেলায় যোগ দেয়, বৃদ্ধরা গল্পের মাধ্যমে গানগুলোর অর্থ এবং ইতিহাস ব্যাখ্যা করে, এবং প্রতিটি গানের লয়ে স্থানীয় জীবনের গল্প ফুটে ওঠে। পাহাড়ের প্রতিটি গাছ, ঝর্ণার প্রতিটি ফোঁটা, এবং বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় যেন সেই সুরের প্রতিধ্বনি দেখা যায়। ভ্রমণকারীরা এই পরিবেশে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, মনে হয় তারা শুধু দর্শক নয়, বরং এই জীবন্ত সঙ্গীতের অংশ। খাসি এবং গারো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, তাদের লোকগান এবং পাহাড়ের প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে এক অনন্য সঙ্গীতের সৃষ্টি করে, যা ভ্রমণকারীর মনে আজীবন স্থায়ী হয়ে থাকে। বর্ষার এই দিনগুলোতে লোকগানের স্রোত কেবল আনন্দের স্রোত নয়, বরং মানুষের অন্তর এবং প্রকৃতির একাত্মতার প্রতীক, যা শিলং-এর পাহাড়ি শহরের প্রাণকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

সন্ধ্যা নামতেই শিলং-এর পাহাড়ি পথগুলো ধীরে ধীরে কুয়াশার আবরণে ঢেকে যায়। বর্ষার সময় এই কুয়াশা বিশেষভাবে ঘন হয়, যেন পাহাড় নিজেই হালকা ধোঁয়াশায় সুরক্ষিত। রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়, গাছপালা, ছোট নদী এবং ধারে-ধারে থাকা পাহাড়ের ছোট ছোট দোকানগুলো যেন এক অদ্ভুত স্বপ্নময় ধূসর ফ্রেমে ধরা পড়ে। আলো জ্বলে ওঠে ম্লান প্রদীপের মতো, যা পথ দেখায় না বরং চারপাশের কুয়াশাকে আরও গভীর করে তোলে। পথিকেরা ধীর গতিতে হাঁটতে থাকে, তাদের পায়ের শব্দ কুয়াশার নীরবতায় হারিয়ে যায়। মাঝে মাঝে দূরের পাহাড়ের চূড়া হালকা আলো দিয়ে ঝলক দেয়, যেন নীরব কুয়াশার আড়ালে থাকা পাহাড় নিজেই তাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। এই সময়ে শিলং-এর প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাঁকা মোড়, প্রতিটি ছোট নদী যেন গল্প বলা শুরু করে। কুয়াশার আড়ালে লুকানো সবুজ গাছ, ছোট ছোট ঝর্ণা, এবং পাহাড়ের প্রতিটি ঢালু স্থান ভ্রমণকারীর মনে এক অদ্ভুত নীরবতার অভিজ্ঞতা জাগায়। তারা অনুভব করে, এখানে রাত নামা মানেই এক নতুন কবিতা লেখা, যা কেবল চোখে নয়, হৃদয়ে অনুভূত হয়।

রাস্তায় ধীরে ধীরে হালকা বাতাস বইতে থাকে, যা কুয়াশার সঙ্গে মিশে পথিকের চুল এবং পোশাকে স্পর্শ ফেলে। পাহাড়ি গাছগুলোতে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা কুয়াশার আলোয় হালকা ঝলমল করে, যেন এক ধরণের অদৃশ্য আলো পরিবেশকে আলোকিত করছে। ছোট ছোট কুঁড়েঘর, যেগুলো দিনের আলোতে সাধারণ মনে হতো, এখন কুয়াশার আড়ালে এক অদ্ভুত রহস্যময় রূপ নেয়। পর্যটকরা কখনও সেই কুঁড়েঘরের দিকে তাকায়, কখনও পাহাড়ের চূড়া থেকে ভেসে আসা মৃদু বাতাসে নিজেরা হারিয়ে যায়। চারপাশে থাকা অন্য পর্যটকরা নীরব, কেউ কথা বলে না—কারণ এই কুয়াশা মানুষের কথা নয়, প্রকৃতির নিজস্ব গীতি বহন করে। ধীর-ধীরে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়ে, এবং শহরের আলো কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে যায়। ম্লান প্রদীপের হালকা আলোতে পথিকেরা নিজেদের অস্তিত্বকে এক অদ্ভুতভাবে ছোট মনে করে, আর সেই অনুভূতি তাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি এবং কাব্যিকতা তৈরি করে।

শিলং-এর এই দো-আঁশলির কুয়াশা শুধু ভৌগোলিক নয়, মানসিকও। এটি মানুষের মনকে ধীরে ধীরে শান্ত করে, তাদের দৈনন্দিন চিন্তা, চাপ এবং উদ্বেগ থেকে মুক্তি দেয়। পর্যটকরা কেবল পথ চলছে না; তারা কুয়াশার সঙ্গে মিলেমিশে নিজের অন্তরকে নতুনভাবে উপলব্ধি করছে। পাহাড়ের প্রতিটি ঢালু, প্রতিটি ঝোপঝাড়, প্রতিটি নদীর ধারে কুয়াশার ম্লান ছায়া যেন তাদের অন্তরের আবেগকে প্রতিফলিত করছে। দূরের পাহাড়ের ওপর দিয়ে মৃদু বাতাস বয়ে যায়, যা কুয়াশার সঙ্গে মিশে নতুন ধরনের সঙ্গীতের সৃষ্টি করে। রাতের নীরবতা, কুয়াশার আবরণ, এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একত্রে পর্যটকের মনে এমন অনুভূতি জাগায়, যা কেবল চোখে নয়, হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকে। শিলং-এর দো-আঁশলির কুয়াশা একটি কবিতা, যা বর্ষার রাতে শহরকে ঘিরে রাখে এবং প্রতিটি ভ্রমণকারীর মনে একটি চিরন্তন স্মৃতি তৈরি করে।

শিলং থেকে ঘন সবুজ পাহাড় অতিক্রম করে কয়েক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় চেরাপুঞ্জিতে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চল হিসেবে খ্যাত। বর্ষার দিনে এই স্থান যেন এক সম্পূর্ণ নতুন জগতে পরিণত হয়, যেখানে বৃষ্টি কেবল জল নয়, বরং প্রকৃতির এক জীবন্ত সঙ্গীত। পাহাড়ের প্রতিটি ঢালু, প্রতিটি গাছ, এবং প্রতিটি ঝর্ণা বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মিলেমিশে এক অদ্ভুত নৃত্য শুরু করে। নদী ও খালের পানি উপচে পড়ে, পথ ও পাথুরের উপর দিয়ে এক অসাধারণ স্রোত সৃষ্টি করে। ভ্রমণকারীরা যখন পাহাড়ি পথ ধরে এগোতে থাকে, তখন মনে হয় যেন প্রতিটি ফোঁটা তাদের শরীরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছে। চারপাশের সবুজ গাছপালা বৃষ্টির পানিতে ভিজে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, আর খাসি পাহাড়ের বুকের উপরে মোড়ানো সবুজে ছাপা আলো এক অভিনব দৃশ্য উপস্থাপন করে। দূরের ঝর্ণাগুলো থেকে নেমে আসা জলধারা এবং পাহাড়ের চূড়ার ধোঁয়াশা একত্র হয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যা ভ্রমণকারীদের মনে চিরস্থায়ী আবেগের স্রোত বয়ে দেয়।

চেরাপুঞ্জির বর্ষায় বৃষ্টি কেবল চোখে নয়, কানেও আনন্দ দেয়। দূরের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্নার শব্দ, উপচে পড়া নদী-নালার কলতান, এবং বৃষ্টির ফোঁটার হালকা ছিটকা—সব মিলিয়ে এক রকম প্রাকৃতিক সিম্ফনি তৈরি করে। ভ্রমণকারীরা থেমে দাঁড়িয়ে সেই সঙ্গীতের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে নেয়। কখনও বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ফোঁটা গোনা, কখনও পাহাড়ি পথ ধরে হালকা ছাতা নিয়ে হাঁটা, কখনও ঝর্ণার ধারে বসে পানি পড়ার ছন্দ লক্ষ্য করা—সব মিলিয়ে এই অভিজ্ঞতা শুধু দর্শন নয়, বরং অনুভূতির এক গভীর জায়গায় প্রবেশের মতো। খাসি গ্রামাঞ্চলের মানুষ, যারা বর্ষার এই দিনগুলোতে নিজেদের জীবনযাত্রা চালায়, তারা ভ্রমণকারীদের সঙ্গে হাসিমুখে মিলিত হয়। তাদের স্থানীয় গান এবং হাসি এই বৃষ্টির পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। পাহাড়ের প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনি ফেলে এই বৃষ্টির সঙ্গীত, যা প্রকৃতির অন্তঃস্বরের এক অপূর্ব প্রকাশ।

চেরাপুঞ্জির বর্ষা কেবল প্রকৃতির দৃশ্য নয়, বরং এটি মানুষের অভিজ্ঞতাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। ভ্রমণকারীরা এখানে কেবল ছবি তোলে না; তারা বৃষ্টির সঙ্গে মিশে নিজের অন্তরকে নতুনভাবে উপলব্ধি করে। পাহাড়ের প্রতিটি ঢালু, উপচে পড়া জল, ভিজে থাকা পাথর এবং বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা গাছপালা—সব মিলিয়ে এক চিরন্তন স্মৃতি তৈরি করে, যা মানুষের মনে অমলিন থেকে যায়। কখনও কখনও হালকা কুয়াশা গিয়ে পাহাড়ের চূড়া ঢেকে দেয়, আর বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মিলেমিশে এটি এক স্বপ্নময় পরিবেশে পরিণত হয়। চেরাপুঞ্জি বর্ষার দিনে শুধু ভিজে থাকা শহর নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরকে ছুঁয়ে যাওয়া এক প্রাকৃতিক কবিতা। ভ্রমণকারীরা এখানে দাঁড়িয়ে মনে করে, পৃথিবীতে এমন সৌন্দর্য আর কোথাও নেই—প্রতিটি ফোঁটা, প্রতিটি ঝর্ণা, প্রতিটি সবুজ পাহাড়ের ঢেউ যেন তাদের অন্তরকে স্পর্শ করছে এবং প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে শেখাচ্ছে। এই বৃষ্টির রাজ্য ভ্রমণকারীর মনে গভীর ছাপ ফেলে, যা আজীবন থেকে যায়, আর তারা বোঝে যে প্রকৃতির সঙ্গীতের স্রোতে ভেসে চলা মানে প্রকৃতির অন্তঃস্বরকে শোনার সৌভাগ্য লাভ করা।

খাসি গ্রামের প্রতিটি কোণায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য মিল দেখা যায়, এবং এর মধ্যে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর হল লিভিং রুট ব্রিজ। এই সেতু কেবল কাঠ বা পাথরের তৈরি নয়; বরং এটি জীবন্ত গাছের শিকড় এবং পাহাড়ি ধাপে জন্মানো রুটের সমন্বয়ে তৈরি, যা বর্ষার দিনে আরও চমকপ্রদ হয়। ভিজে মাটির ওপর দিয়ে যখন এই সেতু পার হতে হয়, প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির সঙ্গেই গাছের শিকড়ের সংস্পর্শ এবং ঝর্ণার ফোঁটার স্পর্শ অনুভব করা যায়। দূরের পাহাড় থেকে নেমে আসা জলধারার শব্দ এবং সেতুর শিকড়ের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বাতাস এক অদ্ভুত সঙ্গীতের সৃষ্টি করে, যা ভ্রমণকারীর মনকে এক গভীর প্রশান্তি দেয়। এই লিভিং রুট ব্রিজ কেবল মানুষকে একটি স্থানের সঙ্গে আরেক স্থানে পৌঁছে দেয় না; এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানবতার সংযোগের এক অদ্বিতীয় সাক্ষ্য। ভ্রমণকারীরা যখন সেতুর উপর দিয়ে হাঁটে, তখন মনে হয় যেন প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের প্রকৃতির এক অদৃশ্য ছোঁয়া দিচ্ছে, আর পাহাড়ি নদীর পাশ দিয়ে বইছে সেই ছোঁয়া ভিজে থাকা বাতাসে মিলিয়ে।

বর্ষার দিনে এই লিভিং রুট ব্রিজ আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। সেতুর শিকড়ে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা, নীলাভ আলো, এবং চারপাশের সবুজ পাহাড়ের প্রতিফলন এক অপরূপ দৃশ্য সৃষ্টি করে। ভ্রমণকারীরা কখনও সেতুর ধারের পাথর ধরে খাড়া ঝর্ণার দিকে তাকায়, কখনও সেতুর মাঝখান দিয়ে ভিজে থাকা শিকড় স্পর্শ করে। এই সেতু পার হওয়া কেবল দৈনন্দিন পথচলা নয়; এটি একটি অনুভূতির যাত্রা। গাছের শিকড়ের নরমতা, জলধারার সঙ্গীত, বাতাসের হালকা ফিসফিস—সব মিলিয়ে এটি একটি অন্তঃস্বরের অভিজ্ঞতা। স্থানীয় খাসি মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের হাতে এই কৌশল ও ধৈর্য দিয়ে তৈরি করেছে, এবং তারা সেতুর যত্নে বছরজুড়ে নিয়মিত কাজ করে। এই পরিচর্যা এবং গাছের জীবন্ত শিকড়ের সংযোগ মিলিয়ে ভ্রমণকারীর কাছে সেতুটি হয়ে ওঠে কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং জীবনের, ধৈর্যের এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানবতার মিলনের প্রতীক।

লিভিং রুট ব্রিজের পরিবেশ কেবল ভিজে থাকা পদ্মপাতার মতো সৌন্দর্য নয়; এটি ভ্রমণকারীর মনকে এক অদ্ভুত শান্তি ও কাব্যিকতার সঙ্গে মিলিত করে। বর্ষার দিনে পাহাড়ি বাতাস, ঝর্ণার সঙ্গীত এবং সেতুর জীবন্ত শিকড়ের স্পর্শ মিলিয়ে একটি অনন্য অনুভূতি তৈরি করে, যা শুধু চোখে নয়, অন্তরে স্পন্দন জাগায়। ভ্রমণকারীরা কখনও সেতুর ধারে বসে চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করে, কখনও সেতুর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে, আর প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের মনে চিরন্তন স্মৃতি হিসেবে স্থান নেয়। এই সেতু পার হওয়া কেবল স্থানান্তর নয়, বরং এক অভিজ্ঞতা, যা মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং ধৈর্যের মূল্য বোঝায়। লিভিং রুট ব্রিজের বিস্ময় ভ্রমণকারীর মনকে শেখায় যে প্রকৃতি কেবল দৃশ্য নয়, বরং এটি জীবন্ত, স্পন্দমান, এবং মানুষের সংস্পর্শে আরও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্ষার এই সময়ে ভিজে থাকা শিকড়, পাহাড়ের সবুজ ঢেউ, আর ঝর্ণার ফোঁটার সঙ্গে মিলিত হয়ে এই সেতু একটি চিরন্তন অনুভূতির উৎস হয়ে দাঁড়ায়, যা প্রত্যেক ভ্রমণকারীর হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে।

ঝর্ণার সঙ্গীতময় শব্দ দূরের পাহাড়ের গহ্বরে ভেসে আসে, আর সন্ধ্যার শেষে যখন কুয়াশা ধীরে ধীরে শহরের সমস্ত রাস্তায় ভিজে যায়, তখন শিলং-এর রাত এক অদ্ভুত নীরবতা ধারণ করে। পাহাড়ি বাতাসের হালকা ফিসফিস আর ভিজে থাকা গাছপালার মধ্যে ঝর্ণার ফোঁটা পড়ার শব্দ এক রহস্যময় সুরের মতো ভ্রমণকারীর মনে ঘুরে বেড়ায়। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায় কুয়াশার আড়ালে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা আলো—হালকা বাতি, দূরের ছোট ছোট ঘর এবং পাহাড়ের কোণে ঝলমল করে ওঠা বৃষ্টি-ভেজা ল্যান্ডস্কেপ। ভ্রমণকারীরা গরম চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে, কাপের ধোঁয়া মুখের কাছে উঠিয়ে বসে থাকে। চায়ের গরম ভাব আর পাহাড়ি রাতের নীরবতা মিলেমিশে মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তৈরি করে। চারপাশে কোন শব্দ নেই, শুধু দূরের ঝর্ণার মৃদু কলতান, কুয়াশার ভিজে বাতাসের ফিসফিস এবং মাঝে মাঝে পাহাড়ের চূড়া থেকে ভেসে আসা এক ধরণের দূরের গর্জন। প্রতিটি মুহূর্ত যেন একটি কবিতা, যা ভ্রমণকারীর চোখ, কান এবং অন্তরের সঙ্গে খেলা করে, আর রাতের নীরবতা তাদের ভাবনাকে আরও গভীর করে তোলে।

শিলং-এর পাহাড়ি রাতের অভিজ্ঞতা কেবল নীরবতা নয়, বরং এটি দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমান সৌন্দর্যের এক মেলবন্ধন। ভ্রমণকারীরা জানলার পাশে বসে পাহাড়ের নীচে ভেসে আসা কুয়াশা দেখে, পাহাড়ি নদী ও ঝর্ণার ধারে ভেজা পথ লক্ষ্য করে। চারপাশের গাছপালা ভিজে থাকা পাতায় মৃদু ঝকঝক শব্দ করে, যা মৃদু তালের মতো মনে হয়। মাঝরাতে পাহাড়ের দূরে দূরে কয়েকটি ম্লান আলো ঝলমল করে, যা কুয়াশার আড়ালে এক রহস্যময় ছাপ ফেলে। এই আলোয় পাহাড়ের ঢালু এবং ঘন সবুজ বনাঞ্চলের ছায়া ভেসে আসে, আর প্রতিটি ভ্রমণকারী নিজের চারপাশকে নতুনভাবে অনুভব করে। পাহাড়ি বাতাসের সাথে গরম চায়ের ঘ্রাণ মিলিয়ে মনে হয় যেন রাতের আকাশ, পাহাড়, কুয়াশা এবং ঝর্ণার সঙ্গীত একত্রিত হয়ে একটি জীবন্ত ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে। ভ্রমণকারীরা অনেক সময় কথা বলে না; তারা চুপচাপ বসে এই নীরব কবিতার অংশ হয়ে যায়, যার প্রতিটি সুর, প্রতিটি শব্দ তাদের মনকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।

নীরব পাহাড়ি রাত শিলং-এর ভ্রমণকারীদের জন্য একটি অন্তর্দৃষ্টি। এই রাতের ম্লান আলো, কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পাহাড়, ঝর্ণার ফোঁটা এবং বাতাসের হালকা স্পর্শ মিলিয়ে এক ধরণের ধ্যান এবং চিন্তার অবস্থা তৈরি করে। মানুষ শুধুই পর্যটক নয়; তারা রাতের সঙ্গীত, পাহাড়ের নিঃশব্দ গল্প, এবং কুয়াশার সঙ্গে মিশে নিজের অন্তরকে নতুনভাবে অনুভব করছে। গরম চায়ের পেয়ালা হাতে তারা চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে এক শান্তি ও প্রশান্তির অনুভূতি লাভ করে, যা দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে তাদের মুক্ত করে। শিলং-এর রাত কেবল চোখের আনন্দ নয়; এটি মনে, হৃদয়ে এবং আত্মার মধ্যে ছাপ ফেলে। প্রতিটি মুহূর্ত একটি কবিতা, প্রতিটি ধোঁয়াশার আভা একটি রোমাঞ্চ, এবং প্রতিটি ঝর্ণার ফোঁটা মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির সৌন্দর্য ও রহস্য। এই নীরব পাহাড়ি রাত ভ্রমণকারীর মনে এক চিরস্থায়ী স্মৃতি তৈরি করে, যা আজীবন তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে থেকে যাবে।

১০

ভ্রমণ শেষে যখন ভ্রমণকারীরা পাহাড়ি পথে ফিরে আসে, তখন শিলং-এর সৌন্দর্য কেবল চোখে নয়, অন্তরে স্থায়ী হয়ে থাকে। বর্ষার দিনে ভিজে থাকা পাহাড়, ঝর্ণার সুর, সবুজ বনভূমি এবং কুয়াশার ঢেউ—সব মিলিয়ে মনে হয় যেন প্রকৃতি তাদের হৃদয়ে নিজস্ব গল্প লিখে দিচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তার ধাপে ধাপে হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রতিটি দৃশ্যের সঙ্গে এক অদৃশ্য সংযোগ অনুভব করে। দূরের ঝর্ণা থেকে নেমে আসা জলধারার ধ্বনি, বৃষ্টির ফোঁটার সাথে মিলেমিশে একটি সঙ্গীত তৈরি করে, যা ভ্রমণকারীর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। জানলা দিয়ে পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে মেঘ আকাশের সাথে পাহাড়ের চূড়ায় মিলেমিশে এক রহস্যময় ছায়া তৈরি করেছে। এই মেঘের আড়ালে পাহাড়ের প্রতিটি ঢালু, ঝোপঝাড় এবং ছোট নদী যেন ভ্রমণকারীর স্মৃতির পৃষ্ঠায় এক অদ্ভুত অঙ্কন খোদায়। শিলং-এর প্রতি পদক্ষেপ, প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি শব্দ তাদের মনে এক গভীর শান্তি এবং আনন্দের অনুভূতি জন্মায়, যা দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে।

পাহাড়ি পথ ধরে ফেরার সময় ভ্রমণকারীরা আবারও সেই পাহাড়ি গান এবং স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া অনুভব করে। খাসি ও গারো জনগোষ্ঠীর লোকেরা যে গান গায়, তা কেবল সঙ্গীত নয়, বরং ইতিহাস, অনুভূতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সংযোগের এক অদ্ভুত প্রকাশ। ঝর্ণার ফোঁটা, কুয়াশার আবরণ, পাহাড়ের সবুজ ঢেউ এবং পথের ধাপের শব্দ—সব মিলিয়ে এই গান যেন ভ্রমণকারীর অন্তরকে স্পর্শ করে। গরম চায়ের পেয়ালা হাতে ধীরে ধীরে পথ চলা, মাঝে মাঝে পাহাড়ের দৃশ্যের দিকে তাকানো, এবং চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া—সব মিলিয়ে মনে হয় যেন তারা কেবল পথচলা করছে না, বরং শিলং-এর সঙ্গে এক রকম অন্তরঙ্গ সংলাপে নিযুক্ত। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি শব্দ তাদের মনে গভীর ছাপ ফেলে, যা ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে কেবল দৃষ্টিনন্দন নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ করে তোলে।

শিলং-এর স্মৃতি শুধু ভ্রমণকারীর চোখে নয়, অন্তরে, আত্মায় এবং মনে এক জীবন্ত কবিতা হয়ে থেকে যায়। পাহাড়ি পথ, ঝর্ণার সুর, কুয়াশার ভিজে আলো, পাহাড়ি গান এবং মেঘে ঢাকা সকাল—সব মিলিয়ে মনে হয় যেন প্রতিটি মুহূর্ত একটি সঙ্গীতের মতো বাজছে, যা ভ্রমণকারীর হৃদয়ে আজীবন অমর। তারা যখন শহরের ব্যস্ত জীবনে ফিরে আসে, তখনও শিলং-এর এই সৌন্দর্য তাদের স্মৃতিতে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে। ঝর্ণার কলতান মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির নিখুঁত সঙ্গীত, পাহাড়ি গান অন্তরের আবেগকে উজ্জীবিত করে, আর মেঘের আড়ালে পাহাড়ের দৃশ্য একটি কাব্যিক রূপ ধারণ করে। শিলং কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; বর্ষার এই দিনের অভিজ্ঞতা, পাহাড়ের সৌন্দর্য, ঝর্ণার সুর এবং স্থানীয় সংস্কৃতি একত্র হয়ে ভ্রমণকারীর মনে স্থায়ী স্মৃতি এবং অনন্তকালীন আনন্দের স্রোত সৃষ্টি করে। শিলং-এর প্রতিটি মুহূর্ত তাদের মনে বাজতে থাকে, যেন এক জীবন্ত কবিতা, যা কখনও শেষ হয় না, বরং জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে থাকে।

শেষ

1000064433.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *