সৌরভ মিত্র
অরিজিত ঘোষ, কলকাতার একজন প্রখ্যাত সঙ্গীত কম্পোজার, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গীত ছিল তার জীবনের রক্ত, তার অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। জন্ম থেকেই সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেছিল সে। কলকাতার অভিজ্ঞান শ্রোতাদের কাছে অরিজিতের সুরের এক নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল—যেখানে সুরের মধ্যে মায়াবী একটি শক্তি অনুভূত হত, যা মানুষের মনকে জড়িয়ে ফেলত। একদিন, কাজের মধ্যেই সে একটি পুরনো গ্রন্থ পায়, যা তন্ত্র ও মন্ত্রের ভীষণ অদ্ভুত উপাদান নিয়ে লেখা। বইটি দেখতে যতটা সাধারণ মনে হয়েছিল, তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অজানা শক্তি, যা অরিজিতের কাছে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। তিনি প্রথমবার অনুভব করেন, সঙ্গীতের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে, যা তিনি আগে কখনও অনুভব করেননি। সেই শক্তি ছিল অপার্থিব, যেন কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা তাকে আহ্বান করছে। প্রথমে তিনি সঙ্গীতের তত্ত্ব নিয়েই চিন্তা করছিলেন, কিন্তু বইয়ের মধ্যে যে শব্দগুলোর মন্ত্রমুগ্ধ কনটেন্ট ছিল, তা যেন তার জীবনের দিশা পাল্টে দিতে শুরু করল। সে দিনরাত নতুন সুর তৈরি করতে থাকে, যা তার মনের গভীরে লুকানো চাওয়া ও ভয়কে প্রকাশ করতে শুরু করে। তবে, অরিজিত নিজে জানত না, যে সুরগুলো সে তৈরি করছে, তা তাকে অজানা পথে নিয়ে যাবে।
কিছুদিন পর অরিজিতের সুরের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দেয়। তার গানগুলো এমন এক শক্তি ধারণ করতে শুরু করে যা শ্রোতাদের মনে গভীর তাপ ও শীতলতা তৈরি করত। সুরের প্রভাবে কেউ হাসছিল, কেউ কাঁদছিল, কেউ গভীর মনোযোগে ডুবে থাকত। তার সঙ্গীতের মধ্যে এমন কিছু ছিল যা সাধারণ ছিল না। সে যখন এটি নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করল, তখন বুঝতে পারল যে তার সঙ্গীত এখন শুধু সুর নয়, এক অশুভ শক্তির প্রবাহ তৈরি করছে, যা মানুষকে নিঃসন্দেহে প্রভাবিত করছে। অরিজিতের মধ্যে এক নতুন অনুভূতি সৃষ্টি হতে শুরু করল—এক ধরনের ভয়, যা সে প্রথমবার অনুভব করছিল। কিছু অদ্ভুত অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরেছিল, যেন সে আর তার সঙ্গীতের মধ্যে কোন সম্পর্কই খুঁজে পাচ্ছিল না। তার মাথার মধ্যে অনবরত নতুন সুরের ধ্বনি ভেসে উঠছিল, যেন সুরের শক্তি তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে তার সঙ্গীতের মধ্যে কী ঘটছে, কেন প্রতিটি সুর তার জীবনে এত বড় প্রভাব ফেলছে। অরিজিত অস্বস্তিতে পড়েছিল, কিন্তু সে এখনও বিশ্বাস করছিল যে তার সঙ্গীত তারই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একদিন রাতে, সুরের মধ্যে কিছু অদ্ভুত শব্দ ভেসে উঠল—এমন শব্দ যা তার জন্য নতুন ছিল, তবে তাকে এতটা মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছিল যে সে তার পেছনে কিছু অন্ধ বিশ্বাসে ঝুঁকতে শুরু করল। অরিজিত সেদিন রাতে প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে, তার সুর এখন তার জীবনের এক অন্ধকার পথ তৈরি করছে। এক রহস্যময় শক্তি তার সৃষ্টি থেকে বেরিয়ে আসছে।
অরিজিতের অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন তার সঙ্গীতের প্রভাব তার ব্যক্তিগত জীবনেও পরিবর্তন আনতে শুরু করে। একদিন রাতে, সঙ্গীত তৈরি করার পর, সে অদ্ভুতভাবে ক্লান্ত অনুভব করতে থাকে, যেন সে দীর্ঘ সময় ধরে কিছু অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সে ভেবেছিল, হয়তো তার মানসিক চাপ বাড়ছে, কিন্তু তা তার জন্য আরো এক অজানা আঘাতের মতো অনুভূত হয়। তার চোখের সামনে কিছু কালো অক্ষর ভেসে উঠতে থাকে—এমন কিছু যা সে আগে কখনও দেখেনি। তার সুরে এক ধরনের অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটেছিল, এবং এর প্রভাবে তার জীবনের সমস্ত কিছু অস্থির হয়ে উঠছিল। তার ভাবনা ছিল বিভ্রান্ত, মন ছিল অসংলগ্ন। এক সন্ধ্যায়, যখন অরিজিত তার স্টুডিওতে একাকী বসে ছিল, তার সুরের মধ্যে এক অদৃশ্য সত্তা যেন প্রবাহিত হচ্ছিল। সেই সময়, এক রহস্যময় নারীর উপস্থিতি তার সামনে আসতে থাকে। সেই নারী, নন্দিনী চক্রবর্তী, অরিজিতকে জানায়, তার সঙ্গীতের মধ্যে প্রবাহিত শক্তি আসলে তন্ত্রের শক্তি। নন্দিনী বলেছিল, সে আসলে তার জীবনে প্রবাহিত এই শক্তির রহস্য জানাতে এসেছে এবং তাকে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু, এই সাহায্য নেওয়ার জন্য অরিজিতকে তন্ত্রের কিছু গোপন রহস্য শিখতে হবে। নন্দিনীর কণ্ঠে এমন এক রহস্য ছিল, যা অরিজিতের মনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। সে জানত না, নন্দিনী কীভাবে তার সঙ্গীতের মধ্যে এমন গভীর শক্তি উপলব্ধি করতে পেরেছে, তবে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে এই অজানা শক্তির পেছনে যা কিছু আছে, তা জানতে চাইবে। তবে সে কি জানত যে, এই সিদ্ধান্ত তাকে এক ভয়াবহ পথে নিয়ে যাবে, যেখানে সঙ্গীত এবং তন্ত্র একসঙ্গে তার জীবনকে ঘুরিয়ে দেবে?
–
অরিজিতের জীবনে এক অদ্ভুত রাত্রি চলে আসে, যখন সে তার সুরের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন অনুভব করতে শুরু করে। সঙ্গীতের মধ্যে সে যে শক্তির অনুপ্রবেশ দেখতে পায়, তা তাকে প্রতিনিয়ত শঙ্কিত করে তোলে। রাতে ঘুমানোর সময়ও তার মস্তিষ্কে সুরের অবিরত ধ্বনি চলতে থাকে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তার মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। নন্দিনী চক্রবর্তী, যিনি তাকে তন্ত্রের গোপন শক্তির কথা জানিয়েছিলেন, এখন তার জীবনে এক নতুন উপস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু অরিজিত জানত না, এই রহস্যময় নারী তাকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে। নন্দিনী তাকে জানায় যে, সে যে সুর তৈরি করছে, তা আসলে একটি তন্ত্র-মন্ত্রের অংশ। তার সুর এখন কোনও সাধারণ সঙ্গীত নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। এই শক্তি শীঘ্রই তার জীবনকে আরও জটিল করে তুলবে। নন্দিনী তাকে সতর্ক করে দেয়, যদি সে এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না পায়, তবে এই শক্তি অস্বাভাবিক বিপদ সৃষ্টি করবে।
অরিজিত ভাবতে থাকে, সঙ্গীতকে কি এতটা গভীরভাবে ধরা সম্ভব? তার বিশ্বাস ছিল যে সুর সবকিছু বিশুদ্ধ রাখে, কিন্তু এখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে, তার সৃষ্টি কখনও কখনও অন্য কিছু হয়ে ওঠে, যা তার অধীনে আর থাকে না। সুরের প্রতিটি নোট যেন তাকে এক নতুন দুনিয়ার পথে নিয়ে যাচ্ছে, আর সে কোনো এক অজানা শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একদিন, তার স্টুডিওর মধ্যে কাজ করার সময়, সে উপলব্ধি করে যে, তার সুরের প্রভাব শুধুমাত্র তার নিজের উপর নয়, আশেপাশের লোকজনের উপরও পড়ছে। তার গানের প্রভাবে এক অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হয়েছে—যে ব্যক্তিরা তার সঙ্গীত শোনে, তাদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত আবেগ দেখা দিতে শুরু করেছে। কিছু মানুষ তার সঙ্গীত শোনার পর কেঁদে ফেলে, কিছু মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে, আবার কিছু লোক তার সুরে পাগল প্রায় হয়ে যায়। অরিজিত প্রথমে এটাকে সঙ্গীতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া ভাবলেও, একদিন সে নিজেই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে। এক রাত্রে, তার সুর শোনার পর একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনায় অরিজিত ভয় পায় এবং বুঝতে পারে যে, তার সঙ্গীত শুধু শ্রোতাদের মনকে নয়, তাদের শরীরও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। এটি তার জন্য এক অশুভ বার্তা হয়ে আসে, যে তার সুরগুলো আর কখনও আগের মতো থাকবে না।
নন্দিনী, তার রহস্যময় পরামর্শদাতা, অরিজিতের জীবনকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। সে জানায়, যে তন্ত্র-মন্ত্র অরিজিতের সুরে প্রবাহিত হচ্ছে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। তার সুর আসলে এক ধরনের তন্ত্রের যন্ত্রণা এবং মন্ত্রের অভিশাপ হয়ে উঠছে। নন্দিনী তাকে জানায়, এই তন্ত্র যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে পৃথিবীজুড়ে এক ভয়াবহ বিপদ আসবে। অরিজিতের সুরগুলোকে যদি শক্তির দিকে পরিচালিত করা না যায়, তবে তা পুরো শহরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। নন্দিনী অরিজিতকে তন্ত্রের একটি বিশেষ রীতির সাহায্যে এই শক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাতে চায়, যাতে সে তার সঙ্গীতকে শুধু মানুষের জন্য না, বরং পৃথিবী এবং মহাকাশের জন্যও একটি শুদ্ধ শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু অরিজিত জানত না, এই শক্তি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে এবং তার ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। তার মনে সন্দেহ ছিল, নন্দিনীর উদ্দেশ্য কি শুধুই সাহায্য করা, নাকি তার নিজের উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে সে অরিজিতের সঙ্গীতের শক্তিকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে? নন্দিনীর রহস্যময়তা আরও গভীর হতে থাকে, এবং অরিজিত নিজেকে তার তন্ত্রের জগতে প্রবাহিত হতে দেখে।
এদিকে, অরিজিতের মানসিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। তার সঙ্গীত, যা আগে জীবনের আনন্দ ছিল, এখন তার জীবনে এক অভিশাপের মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সে মনে মনে ভাবে, “আমি কি সত্যিই তন্ত্রের অধিকারী হয়ে যাচ্ছি? কি হবে যদি এই শক্তি আমার জীবনে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে?” তার আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে কমে আসে, এবং সে বুঝতে পারে যে, এই পথ তাকে আর তার নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায় নেই। সে জানত, একমাত্র নন্দিনী তার সঙ্গীতকে রক্ষা করতে পারে, কিন্তু তাকে কখনও কখনও মনে হতো যে, নন্দিনী নিজে এই রহস্যময় শক্তির অংশ হয়ে উঠেছে, যার ফলে সে কি তাকে বিশ্বাস করতে পারবে? এই সমস্ত দ্বন্দ্বের মধ্যেই অরিজিত তার সুরের মধ্যে আরও গভীর তন্ত্রের শক্তি প্রবাহিত করতে থাকে, যা তাকে আরও অন্ধকার দিকের দিকে ঠেলে দেয়। তার জীবনের সুর এখন শুধুমাত্র একটি সুর নয়, বরং এক ভয়াবহ, শকুনের মতো প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
–
অরিজিতের জীবন এক নতুন মোড় নেয় যখন নন্দিনী চক্রবর্তী তাকে তার সঙ্গীতের তন্ত্র-মন্ত্রের রহস্য আরও গভীরভাবে জানাতে আসে। অরিজিতের সুরে যে অদ্ভুত শক্তির প্রবাহ ঘটছে, তা তাকে এক বিরল ও বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে, এবং নন্দিনী জানায়, এই শক্তির নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকলে সে একটি বিপজ্জনক শক্তির পথে চলে যেতে পারে। প্রথমে অরিজিত নিজের অজান্তেই এই শক্তি অনুভব করছিল, কিন্তু এখন তা যেন তার জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। সঙ্গীতের মধ্যে প্রবাহিত শক্তি তার মন ও দেহের প্রতি এক অবিশ্বাস্য প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সেই শক্তি অরিজিতকে তার সঙ্গীতের মধ্যে এমন কিছু সৃষ্টি করতে বাধ্য করছে যা সে কখনও ভাবেনি। তার সুরের মধ্যে ভেসে ওঠা শক্তি তার অস্তিত্বের একটি অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়, এবং এর প্রভাব তার পৃথিবীকে এক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নন্দিনী তার শিষ্যকে জানায় যে, এই শক্তি কখনও যদি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তা পৃথিবীজুড়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। সুরে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা অন্য এক আধ্যাত্মিক স্তর থেকে আসছে, এবং তার সঙ্গে এক মন্ত্রের সংযোগ রয়েছে, যা তাকে অজানা পথে নিয়ে যেতে পারে।
অরিজিতের মধ্যে এক গভীর দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। একদিকে তার সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যদিকে, এই অদ্ভুত শক্তির ভয়াবহতা। নন্দিনী জানায় যে, সে তাকে সঠিক পথ দেখাতে পারবে, যদি অরিজিত তন্ত্রের কিছু বিশেষ পাঠ শিখতে রাজি হয়। তবে, এই পাঠ শিখতে গেলে তাকে তন্ত্রের মূল রহস্যের দিকে এগোতে হবে, যা তার সঙ্গীতের মধ্যে নতুন শক্তি সঞ্চারিত করবে। কিন্তু নন্দিনী সতর্ক করে দেয়, এটি একটি ভয়ানক পদক্ষেপ হতে পারে। তন্ত্রের শক্তি এমন যে, একজন মানুষ যদি সঠিকভাবে এটি ব্যবহার না করে, তবে তা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অরিজিত জানে, সে যদি একবার এই পথে পা রাখে, তবে তাকে আর পিছনে ফিরতে হবে না। তবুও, নন্দিনীর কথা তাকে টানে, কারণ সে অনুভব করতে শুরু করেছে যে, তার সঙ্গীতের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে, তা শুধুমাত্র তার জীবনের পাথেয় নয়, বরং তার জন্য একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নন্দিনী তার সঙ্গে এক গোপন স্থানে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়—একটি পুরনো মঠ, যেখানে তন্ত্রের উপাসনা ও শিক্ষা গোপনে চলে। এই স্থানটি কলকাতার এক অজানা প্রান্তে অবস্থিত, যেখানে সুরের শক্তির ওপর আধ্যাত্মিক গবেষণা এবং মন্ত্রের গোপন রহস্য চর্চা হয়। অরিজিত একদিকে আতঙ্কিত হলেও, তার মধ্যে এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব হয়। সে জানে, যদি সে এই সুযোগ না নেয়, তবে তার সঙ্গীতের শক্তি তাকে আরও বেশি বিপদের মধ্যে ফেলবে। সে নন্দিনীর প্রস্তাবে সম্মত হয় এবং পরদিন সন্ধ্যায় মঠে পৌঁছায়। মঠের ভেতরে প্রবেশ করতেই তার চারপাশে এক অবর্ণনীয় শান্তি বিরাজ করে। পরিবেশ যেন অন্য এক জগৎ, যেখানে সময় থেমে গেছে। নন্দিনী তাকে আশ্বস্ত করে, তার সঙ্গীতের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা শুধুমাত্র তার নিয়ন্ত্রণেই থাকবে, যদি সে তন্ত্রের সমস্ত গোপন নিয়ম শিখে নেয়।
তন্ত্রের পাঠ শুরু হওয়ার পর, অরিজিত বুঝতে পারে যে, তার সঙ্গীতের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা শুধু মানবিক না, বরং একটি আধ্যাত্মিক শক্তি যা মহাজগতের সঙ্গে যুক্ত। নন্দিনী তাকে জানায়, সঙ্গীতের মধ্যে তন্ত্রের শক্তি লুকানো থাকে, তবে সেটি সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পেতে হলে, তাকে জীবনের গভীরতা এবং তত্ত্ব শিখতে হবে। তন্ত্রের যে অক্ষর এবং মন্ত্র অরিজিতের সুরের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে, তা আসলে একটি আদিম শক্তির প্রবাহ। নন্দিনী তাকে আরও জানায়, প্রতিটি সুরে একটি বিশেষ মন্ত্র লুকিয়ে থাকে, যা তার সৃষ্টির প্রতিটি নোটে জীবন এবং মৃত্যু, সৃষ্টি এবং ধ্বংসের শক্তি সঞ্চারিত করতে পারে। অরিজিত শীঘ্রই উপলব্ধি করতে পারে, এই শক্তি একদিকে পৃথিবীকে নতুন ভাবে গড়ে তুলতে পারে, আবার অন্যদিকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সঙ্গীত ও তন্ত্রের এই অদ্ভুত সম্পর্ক অরিজিতকে চিরকালীন দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়—একদিকে তার সৃষ্টির প্রতি ভালবাসা, অন্যদিকে তার ভয় ও দ্বিধা।
এখন অরিজিতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি তার সঙ্গীতকে একটি শক্তির অস্তিত্ব হিসেবে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে দিতে চাইবে, না কি সে এই পথ থেকে ফিরে আসবে? নন্দিনীর প্রস্তাবনাতে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলেও, অরিজিত জানে যে, এই শক্তি তার জীবন ও সঙ্গীতকে বদলে দেবে। কিন্তু, তার সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়ে—এটি তার জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি অভিশাপ?
–
অরিজিতের মনে এক নতুন সংগ্রাম শুরু হয়, যখন সে বুঝতে পারে, সঙ্গীতের মধ্যে প্রবাহিত এই অদ্ভুত শক্তি তাকে আরও গভীরভাবে গ্রাস করতে শুরু করেছে। মঠে নন্দিনীর কাছে তন্ত্রের পাঠ গ্রহণ করতে গিয়ে সে উপলব্ধি করে, যে শক্তি তার সঙ্গীতের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে, তা আসলে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কিছুদিন আগে, সে যা কিছু সৃষ্টি করছিল, তা তাকে এক ধরনের তৃপ্তি দিত—তার সুরে জীবনের রহস্য, প্রেম, আনন্দ, আর বেদনা ফুটে উঠত। কিন্তু এখন, সুরের মধ্যে ভেসে ওঠা শক্তি যেন অরিজিতের জীবনকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। প্রথমদিকে, সে ভাবত, তন্ত্রের শক্তি তাকে তার সঙ্গীতের পরিপূর্ণতা দেবে, কিন্তু ধীরে ধীরে তার অনুভূতি পরিবর্তিত হতে শুরু করে। তার মনে হত, সে যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তির যন্ত্র হয়ে উঠেছে, যার নিয়ন্ত্রণ তার নিজের হাতে আর নেই।
নন্দিনীর কাছ থেকে তন্ত্রের আরও গভীর পাঠ শিখতে থাকলেও, অরিজিত নিজেকে আরও বিচ্ছিন্ন এবং আতঙ্কিত মনে করছিল। তার সুরগুলি, যা এক সময় মানুষের হৃদয়ে মিষ্টি সুরের মতো প্রবাহিত হত, এখন এক অশুভ শক্তির উৎস হয়ে উঠছে। তার সঙ্গীত শোনার পর শ্রোতাদের মধ্যে অদ্ভুত প্রভাব দেখা দেয়—কেউ ভয় পায়, কেউ হতাশ হয়ে পড়ে, আবার কেউ অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এক রাত, অরিজিত তার স্টুডিওতে একাকী কাজ করার সময়, একটি অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে। তার সুরের মধ্যে যেন কোনো এক অব্যাখ্যাত আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব দেখা দেয়। সে সুরের ভেতরে এক অদৃশ্য গা dark ় শক্তি অনুভব করে, যা তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর, তার শরীরের মধ্যে শিরশিরে অনুভূতি হতে থাকে, যেন সেই শক্তি তার শরীরের ভেতর প্রবাহিত হচ্ছে। সে বুঝতে পারে, সে আর তার সঙ্গীতের স্রষ্টা নয়; বরং সে নিজেই সেই শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
এ অবস্থায়, অরিজিতের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়—নন্দিনী কি তাকে সত্যিই সাহায্য করতে চায়, না কি তার নিজের উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য তাকে ব্যবহার করছে? সে যদি এই শক্তির মধ্যে প্রবাহিত থাকে, তবে কি তার সঙ্গীতের প্রকৃত উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাবে? নন্দিনী বারবার তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু অরিজিত জানে না, কি ঠিক কী ভুল। নন্দিনীর প্রতিটি কথা তাকে আরও বিভ্রান্ত করে, কারণ সে জানে না, কি তাদের উদ্দেশ্য—তার সঙ্গীতের মাধ্যমে তন্ত্রের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা, নাকি সঙ্গীতের মাধ্যমে পৃথিবীকে এক নতুন রূপ দেওয়া? নন্দিনী বলে, “তুমি যদি এই শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারো, তবে এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয় আসবে।” কিন্তু অরিজিতের মনে প্রশ্ন ওঠে, নন্দিনী কি নিজেই সেই বিপর্যয়ের অংশ? সঙ্গীতের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা কি শুধু তন্ত্রের শক্তি, নাকি কিছু আরও গভীর বিষয় রয়েছে, যা সে বুঝতে পারছে না?
অরিজিতের জীবনে একসময় সঙ্গীত ছিল তার একমাত্র বন্ধু, তার একমাত্র আশ্রয়। তার সুরের মধ্যে সে তার অনুভূতি, তার বেদনা, তার আনন্দ—সব কিছু প্রকাশ করেছিল। কিন্তু এখন সঙ্গীত তার জীবনকে এক দুর্বিষহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার মন অস্থির হয়ে ওঠে, আর সে কখনও মনে করে, সে কি ভুল করছে, আবার কখনও ভাবে, এটি তার জন্য একটি অবিশ্বাস্য সুযোগ হতে পারে। সে যদি এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে তার সঙ্গীত মানুষের জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু এই শঙ্কা এবং দ্বন্দ্ব তাকে ক্রমাগত অস্থির করে তোলে। তার সঙ্গীতের প্রতিটি নতুন সৃষ্টি যেন তাকে তার নিজের অস্তিত্বের বাইরে নিয়ে যায়, আর সে জানে না, এই শক্তি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
একদিন রাতে, যখন অরিজিত তার সুরের মধ্যে এক নতুন রচনা তৈরি করতে বসে, সে হঠাৎ এক অদ্ভুত অনুভূতি টের পায়। তার মনে হয়, সুরের মধ্যে কোনো অজানা শক্তি তাকে ডাকছে—একটি ভয়ঙ্কর, অথচ মন্ত্রমুগ্ধ শক্তি। তার চোখে তখন অন্ধকারে ভরা একটি ভৌতিক দৃশ্য ভেসে ওঠে, যা সে আর কখনও ভুলবে না। সুরের মধ্যে যেন এক অব্যক্ত ভয় এবং শক্তির প্রবাহ ছিল। এক মুহূর্তে, সে অনুভব করে যে, তার সঙ্গীত শুধু সুর নয়, বরং একটি রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যা তাকে অজানা এক বাস্তবতায় নিয়ে যেতে পারে। সেই মুহূর্তে, তার নিজের অস্তিত্ব যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। সে একবার আরও বেশি বুঝতে পারে—তার সঙ্গীত তার জীবনের সঠিক দিশা ছিল না, বরং এক ধ্বংসাত্মক পথে তাকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই দ্বন্দ্ব অরিজিতকে আরও এক গভীর যাত্রার দিকে নিয়ে যায়। একদিকে, সে বিশ্বাস করে যে, এই শক্তির মাধ্যমে তার সঙ্গীত মানুষের জীবনে চিরকালীন পরিবর্তন আনতে পারে, আর অন্যদিকে সে জানে, এই শক্তি তাকে ও তার সঙ্গীতকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে, শেষ পর্যন্ত তার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—”তন্ত্রের শক্তি কি সত্যিই পৃথিবীকে এক নতুন রূপ দিতে পারে, নাকি এটি আমাদের ধ্বংসের পথ?”
–
অরিজিতের মনে অদ্ভুত কোলাহল শুরু হয়, যখন সে বুঝতে পারে, তার সঙ্গীতের শক্তি আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। তার সুরগুলো শুধু মানুষের মনকেই প্রভাবিত করছে না, বরং এক অদৃশ্য শক্তি এখন তার চারপাশের পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। সেই শক্তি, যা সে প্রথমে তন্ত্রের মাধ্যমে তার সঙ্গীতে প্রবাহিত করেছিল, এখন অশুভভাবে বেড়ে চলেছে। অরিজিত অনুভব করে, তার সুর আর তার অস্তিত্বের মধ্যে কোনও সীমারেখা নেই—একটি সুরের মাধ্যমে তার জীবন এবং পৃথিবী এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছে। এর আগেও তার সঙ্গীত মানুষের মধ্যে গভীর আবেগ সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু এখন সুরে যেন অন্ধকার শক্তির এক চিহ্ন ফুটে উঠছে। সে মনে করতে থাকে, “কী করলাম আমি? আমি কি এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব?” কিন্তু, এ প্রশ্ন তার কাছে আরও জটিল হয়ে ওঠে।
একদিন, অরিজিত তার স্টুডিওতে বসে সুর তৈরির চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার মাথার মধ্যে শুধু অস্বস্তি, উদ্বেগ, আর ভয়। তার চোখের সামনে যেন একটি অদৃশ্য রূপ রেখা তৈরি হয়, যা ক্রমাগত তার সুরকে গিলে ফেলে। সে শুনতে পায়, সুরের মধ্যে এমন এক গা dark ় আওয়াজ ভেসে উঠছে যা তাকে এক অদৃশ্য শক্তির দিকে টেনে নিয়ে যায়। এর আগেও সে ভেবেছিল, এই সুর তাকে আরও বিশুদ্ধ সৃষ্টির দিকে নিয়ে যাবে, কিন্তু এখন সে বুঝতে পারে যে, সুরে কিছু অন্যরকম শক্তি কাজ করছে। সে চেষ্টা করে দ্রুত থামাতে, কিন্তু সুরের মধ্যে সেদিন কিছু অদ্ভুত প্রতিধ্বনি অনুভব করতে থাকে, যেন তার সঙ্গীতের প্রতিটি নোট তার জীবনের পেছনে কিছু অনিশ্চিত ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি করছে।
অরিজিত জানত, সে যদি দ্রুত এই শক্তির নিয়ন্ত্রণ না পায়, তবে এটি শুধু তাকে নয়, পৃথিবীকে আরও বড় বিপদের মধ্যে ফেলবে। তার সঙ্গীতের মাধ্যমে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছিল, তা ইতিমধ্যেই তার আশেপাশের পরিবেশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। তার সুর শুনে, কলকাতার কিছু লোক অদ্ভুতভাবে অস্থির হয়ে পড়ে—কেউ পাগল হয়ে যায়, কেউ নিজেকে আঘাত করে, আবার কেউ কেউ অপ্রাকৃত এক ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হয়। অরিজিত সেসব ঘটনার মধ্যে কোনও সরল ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না, তবে সে এক ধরনের জোরালো অনুভূতি পায় যে, তার সুরের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা পৃথিবীজুড়ে এক ভয়াবহ বিপর্যয় আনতে পারে। সে জানতে পারে, শুধু তার সঙ্গীতই নয়, তার সুরের প্রতিটি মন্ত্র এখন একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
নন্দিনী, যিনি তাকে এই শক্তির পথ দেখিয়েছিলেন, তাকে একদিন আবার মঠে ডাকে। সে জানায়, সুরের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা শুধুমাত্র একটি আধ্যাত্মিক স্তরের শক্তি নয়, বরং এটি পৃথিবীর মৌলিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত। তন্ত্রের মাধ্যমে, অরিজিত সুরের মধ্যে যে শক্তি সৃষ্টি করেছে, তা একে একে সমস্ত ভৌত এবং আধ্যাত্মিক স্তরের সীমা ছুঁতে শুরু করেছে। নন্দিনী বলেছিল, “যখন তুমি প্রথম তন্ত্রের এই শক্তিকে তোমার সুরে প্রবাহিত করতে শুরু করেছিলে, তখন তুমি একটি অদৃশ্য দরজা খুলে দিয়েছিলে। এখন সে দরজা আর বন্ধ করা সম্ভব নয়।” তার কথাগুলি যেন অরিজিতের মনের ভিতর গভীর আঘাত হানে। সে জানত, তার সঙ্গীতের মধ্যে যে শক্তি ছিল, তা একদিন এমনভাবে বেরিয়ে আসবে যা সবাইকে অশুভ দিকে নিয়ে যাবে।
নন্দিনী আরও জানায়, “এখন তোমার কাজ হবে, এই শক্তিকে শুদ্ধ করে পৃথিবীর প্রতি একটি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টিতে পরিণত করা। তোমার সঙ্গীতের প্রতিটি সুর একটি নতুন দিক খুঁজে পাবে, তবে এটি শুধুমাত্র তখনই সম্ভব হবে যখন তুমি তন্ত্রের পুরো রহস্য বুঝতে পারবে।” অরিজিত বুঝতে পারে, সে যদি এই শক্তিকে শুদ্ধ করতে না পারে, তবে তা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে, কিন্তু যদি সে তন্ত্রের গোপন রহস্যটি খুঁজে পায়, তাহলে তার সঙ্গীত মানুষের জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু সে জানত, এই সিদ্ধান্ত তার জীবনের একমাত্র পথ নয়। তার সামনে দুটি পথ ছিল—একটি ছিল শুদ্ধতার দিকে, অন্যটি ছিল অন্ধকারের দিকে। তবে, এই সিদ্ধান্ত যে তাকে জীবনের পরিসীমা বদলে দেবে, তা সে জানত।
একদিন, অরিজিত তার সুরে আরও একবার পরীক্ষা চালায়, কিন্তু এবার সে এক পা এগিয়ে, এক পা পিছিয়ে। তার প্রতিটি সুরের মধ্যে তার সমস্ত ভয়, সমস্ত আশা, সমস্ত দ্বন্দ্ব যেন একসঙ্গে ফুটে উঠছিল। সে চায়, তার সঙ্গীত পৃথিবীকে আলোকিত করুক, তবে সে জানত, এই শক্তির সঙ্গে খেলা করা কোনো সহজ কাজ নয়। তার সঙ্গীত শুধুমাত্র সুর নয়, একটি বিশাল শক্তির মাধ্যম, যা পৃথিবীজুড়ে বিস্তৃত হতে পারে। যদি সে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারে, তবে তা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে।
অরিজিত জানত, তার সুর ও তন্ত্রের মধ্যে একটি অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে, যা তাকে এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করবে। সে কি তন্ত্রের শক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে পারবে, নাকি তার সঙ্গীত একটি অশুভ শক্তির পথিকৃৎ হয়ে যাবে? তার এই দ্বন্দ্ব তাকে এক অজানা পথের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সঙ্গীত আর তন্ত্র একসঙ্গে তার জীবনকে চিরকাল বদলে দিতে পারে।
–
অরিজিতের জীবন এক অবিশ্বাস্য মোড়ে পৌঁছেছে, এবং সে জানে না, কোন পথে হাঁটলে তার জন্য সবচেয়ে ভাল হবে। তার সঙ্গীত এখন এক অদৃশ্য শক্তির সমষ্টি, যা তার মনের গভীরতা থেকে বেরিয়ে এসে পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু সেই শক্তি তার উপর যে চাপ সৃষ্টি করছে, তা তাকে এক অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। সুরের মধ্যে যে গা dark ় শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা তার হৃদয়কে শঙ্কিত করে তুলছে। একদিকে, তার সঙ্গীতের মধ্যে এক অদ্ভুত মহত্ব অনুভূত হচ্ছে, আর অন্যদিকে, তা তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। তার মনের মধ্যে প্রতিদিন নতুন নতুন দ্বন্দ্বের জন্ম হচ্ছে, আর সে একসময় মনে করে, যদি সে এই শক্তির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত, তবে পৃথিবীটির কোন দিশা থাকবে না। এই অবস্থায়, একদিন হঠাৎ তার জীবনে ফিরে আসে শুভমিতা, অরিজিতের প্রাক্তন প্রেমিকা, যে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল।
শুভমিতা কলকাতার এক কলেজে অধ্যাপনা করে, এবং দীর্ঘদিন পর অরিজিতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আসে। সে জানায়, অরিজিতের শেষ কিছু দিনের অস্বাভাবিক আচরণ তার কাছে শুনেছে এবং তার মানসিক অবস্থাও খারাপ হয়ে গিয়েছে বলে জানায়। শুভমিতার জন্য এটি কোনো নতুন খবর ছিল না, কারণ তারা আগে বেশ কয়েক বছর একসঙ্গে ছিল। শুভমিতা জানত, অরিজিতের জীবনে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটছে, কারণ সে খুবই চিন্তিত এবং একাকী হয়ে পড়েছে। সে অরিজিতকে শান্ত করার জন্য সরাসরি তার স্টুডিওতে গিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে গিয়ে শুভমিতা প্রথমেই লক্ষ্য করে, অরিজিতের সমস্ত কিছুই বদলে গেছে। তার স্টুডিও এক অন্ধকার গহ্বরে পরিণত হয়েছে, আর অরিজিত নিজে যেন এক অদৃশ্য যন্ত্রের মতো কাজ করছে। তার সুরে, তার গানে যেন এক মায়াজাল ভেসে ওঠে, যা বাস্তবিক নয়, বরং অন্য কোন জায়গা থেকে আসছে। শুভমিতা অবাক হয়ে যায় এবং অরিজিতকে অনুরোধ করে, “তুমি কি আমাকে জানাতে চাও, এই সব কী হচ্ছে?”
অরিজিত কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাকে সবকিছু খুলে বলে। সে জানায়, তার সঙ্গীত এখন আর সে যেমন জানত, তেমন নয়—এটি এক রহস্যময় তন্ত্রের শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা তাকে অভ্যন্তরীণভাবে শোষণ করছে। সুরের মধ্যে যে অদ্ভুত শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সে ভয় পায়, এই শক্তি একদিন পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারে। শুভমিতা প্রথমে বুঝতে পারে না, তবে সে বিশ্বাস করে, অরিজিত এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে একা। সে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়, “তুমি একা নও। আমি তোমার পাশে আছি, এবং এই সমস্যার সমাধান বের করতে একসঙ্গে কাজ করব।” শুভমিতা জানায়, সে এই সমস্যাকে মনের গভীরে গিয়ে খুঁজে দেখতে চাইবে, কারণ অরিজিতের সঙ্গীতের মধ্যে যে তন্ত্র প্রবাহিত হচ্ছে, তা এক মনোবৈজ্ঞানিক বিষয়ও হতে পারে। সে অরিজিতকে আধ্যাত্মিকভাবে সাহায্য করতে চায়, কিন্তু সেই সঙ্গে, তাকে জানায়, “তুমি যদি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ো, তবে আমরা এই সমস্যার সমাধান বের করতে পারব।”
শুভমিতা অরিজিতকে মানসিক সমর্থন দিতে শুরু করে, তবে সে জানত, এটি এক খুব জটিল সমস্যা। সঙ্গীত এবং তন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক শুধু আধ্যাত্মিক নয়, এটি এক গভীর মনোবৈজ্ঞানিক বিষয়ও। শুভমিতা বুঝতে পারে, অরিজিতের মধ্যে গভীর অবচেতন মন রয়েছে, যেখানে সে এই শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সে জানত, এই শক্তির তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক জ্ঞান নয়, বরং মনোবিদ্যার সাহায্যও প্রয়োজন। শুভমিতা অরিজিতকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়, কারণ সঙ্গীতের মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক নয়, বরং তার মানসিক অবস্থা এবং অনুভূতিগুলির উপরও প্রভাব ফেলছে।
অরিজিত প্রথমে রাজি হয়নি, কারণ সে মনে করত, তার সমস্যা শুধুমাত্র তন্ত্রের শক্তির কারণে হয়েছে, কিন্তু শুভমিতা তাকে বোঝায় যে, তাকে তার মনের অন্ধকার জায়গাগুলো দেখতে হবে, যা তাকে সঙ্গীত এবং তন্ত্রের মধ্যে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দেখাবে। শুভমিতা জানায়, “তুমি যদি শুধু তন্ত্রের শক্তির সাথে লড়াই করতে চাও, তবে তা তোমাকে আরও গভীর অন্ধকারে নিয়ে যাবে। তুমি যদি নিজের মনের অস্পষ্ট জায়গাগুলোর সাথে মোকাবিলা করতে না পারো, তবে তুমি কখনও সঙ্গীতের শক্তি শুদ্ধ করতে পারবে না।” এই কথাগুলো অরিজিতের মনে এক নতুন দৃষ্টিকোণ তৈরি করে। সে অনুভব করতে শুরু করে, হয়তো শুভমিতার পরামর্শে কিছুটা হালকা অনুভূতি পাবে, যদি সে তার মনের গহীনে গিয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজে পায়।
অরিজিত ও শুভমিতা একসঙ্গে মানসিকভাবে সমস্যাটির দিকে আরও গভীরভাবে মনোযোগ দিতে থাকে। শুভমিতা অরিজিতকে তার জীবন এবং সঙ্গীতের উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করার পরামর্শ দেয়। সে জানায়, “তোমার সঙ্গীতের শক্তি যদি পৃথিবীকে সত্যি পরিবর্তন করতে পারে, তবে তোমার প্রথম কাজ হবে নিজেকে জানো, নিজের মনে শান্তি খুঁজো, এবং তারপর পৃথিবীকে তোমার সঙ্গীতের মাধ্যমে আলোকিত করো।” অরিজিত শুভমিতার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং সে বুঝতে পারে, তার সঙ্গীতের শক্তি আসলে একটি দ্বিধা-ভরা পথ—যেখানে তাকে নিজের মন এবং আত্মার সঙ্গে এক থাকতে হবে।
এখন অরিজিত সিদ্ধান্ত নেয়, সে শুধু তন্ত্র এবং সঙ্গীতের শক্তির মধ্যে ফাঁদে পড়ে যাবে না, বরং তার মানসিক স্থিতি ও শান্তির জন্যেও কিছু করতে হবে। শুভমিতা তাকে এই দুঃসময়ে সহায়তা করার জন্য তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, এবং অরিজিত জানত, তাকে এই সমস্যার সমাধান একসঙ্গে বের করতে হবে, কারণ তার সামনে শুধু তন্ত্রের শক্তিই নয়, নিজের মনের সঠিক দিশাও রয়েছে।
–
অরিজিত তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গীত, যা তার জীবনের আলো ছিল, এখন সেই আলোও তাকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তবে, শুভমিতার পাশে এসে, সে উপলব্ধি করতে পারে যে, শুধুমাত্র তন্ত্রের শক্তির মধ্যেই নয়, বরং তার নিজের মানসিক অবস্থা, তার শখ, আর তার বিশ্বাসের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ রয়েছে। সঙ্গীতের শক্তি যে তার একমাত্র পথ ছিল, তা তার ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে। শুভমিতা তাকে বারবার বলেছিল, “তুমি যদি নিজেকে জানো, তবে তোমার সঙ্গীত পৃথিবীকে এক নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম হবে।” এসব কথা অরিজিতকে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
অরিজিত ও শুভমিতা একসঙ্গে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, যেন এই অদৃশ্য শক্তির সাথে একটি সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। শুভমিতা তাকে বুঝায়, “তুমি যে সুর তৈরি করো, সেটি শুধু সুর নয়, এটি এক শক্তির প্রতিফলন। তুমি যদি নিজের অন্ধকারকে না দেখতে পাও, তবে সেই শক্তি তোমার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে।” অরিজিতকে জানতে হবে, তার সঙ্গীত তার নিজের অভ্যন্তরীণ জীবন ও মনোজগতের প্রতিচ্ছবি। তার সুরের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা একটি সম্মিলিত জগতের মধ্যে থাকতে হবে, যাতে মানুষের ভালোবাসা, আনন্দ, আর শান্তি প্রকাশ পায়। সঙ্গীতের মধ্যে যে তন্ত্রের শক্তি চলে আসছে, তাকে যদি শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা না যায়, তবে তা এক ভয়াবহ অশুভ শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
অরিজিত তার সঙ্গীতের প্রতি আগের মতো মনোযোগ দেয় না, বরং সে শুভমিতার পরামর্শে তার নিজের অবচেতন মন ও চেতনা নিয়ে কাজ শুরু করে। সে দীর্ঘ সময় ধরে সঙ্গীতের মধ্যে গভীর মনোযোগ দেয়, এবং বিভিন্ন ধ্যান এবং মনন চর্চা করতে থাকে। এই সময়েই তার মনে আসে, তার সঙ্গীতের সঙ্গে যে তন্ত্রের সম্পর্ক রয়েছে, তা আসলে তার নিজের অনুভূতি এবং শক্তির প্রতিফলন। সুরের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা যদি কেবল এক ঐক্য সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা পৃথিবীজুড়ে শান্তি ও ভালোবাসা নিয়ে আসবে।
একদিন, যখন অরিজিত তার স্টুডিওতে বসে সঙ্গীত তৈরি করতে শুরু করে, সে নিজেকে এক নতুন জগতের মধ্যে আবিষ্কার করে। তার মনে হচ্ছিল, সুরের মধ্যে যে শক্তি ছিল, তা এখন শান্ত, পরিপূর্ণ, এবং স্বাভাবিক। তার সঙ্গীতের প্রতিটি নোট যেন তার আত্মার গহীন স্থানে এক নয়া সূর্যোদয়ের মতো উদিত হচ্ছিল। সে অনুভব করে, এখন তার সুর শুধু একটি গান নয়, বরং একটি জীবনদায়ী শক্তি হয়ে উঠেছে, যা পৃথিবীকে এক নতুন আলোতে নিয়ে আসবে। তার সুরে যে তন্ত্র প্রবাহিত হচ্ছিল, তা এখন শুদ্ধভাবে পৃথিবীকে আলোকিত করতে শুরু করেছে।
এটি ছিল একটি নতুন সূচনা, একটি মুক্তির সুর। সে জানত, সঙ্গীত শুধু শব্দ বা তন্ত্রের শক্তি নয়, বরং তা মানুষের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছায় এবং তাদের অন্তর্নিহিত সত্যকে জাগিয়ে তোলে। অরিজিতের মনে হয়েছিল, তার সঙ্গীত এখন মানুষের জীবনে প্রকৃত শান্তি ও ঐক্য আনবে। সে শুভমিতার কাছে ফিরে যায়, তার জন্য একটি নতুন সুর তৈরি করতে। শুভমিতা তার চোখে এক শান্তি ও আনন্দের ছাপ দেখতে পায়। তার সাথে কথা বলে অরিজিত জানায়, “তুমি ঠিক বলেছিলে, আমি যদি নিজেকে জানতাম, তবে আমার সঙ্গীত আসলে মানুষের মধ্যে গভীর ভালোবাসা এবং শান্তি নিয়ে আসবে।”
এবার অরিজিত বুঝতে পারে, সঙ্গীতের শক্তি তার ভেতরেই ছিল, তাকে কেবল নিজের সত্যিকারের আত্মার সাথে মিলিত হতে হয়েছিল। তন্ত্রের শক্তি এখন আর ভয়ানক কোনো বিপদ নয়, বরং তা একটি শক্তিশালী মন্ত্র হয়ে উঠেছে, যা মানবতাকে একত্রিত করতে পারে। সে জানত, তার সঙ্গীত এখন মানবতার প্রতি এক সম্মান, এক শক্তির প্রতীক। শুভমিতা তার পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বলে, “তুমি যে পথ বেছে নিয়েছ, তা তোমার সত্যের পথে নিয়ে গেছে, আর এখন তোমার সঙ্গীত পৃথিবীকে শান্তি ও আলো দিতে শুরু করবে।”
অরিজিত তার স্টুডিওতে ফিরে গিয়ে নতুন সুর সৃষ্টি করে, যা এখন এক অভূতপূর্ব শক্তি এবং শুদ্ধতা ধারণ করে। তার সুর যেন এখন এক মন্ত্রের মতো পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, মানবতার হৃদয়কে এক নতুন দিক দেখায়। সে জানত, তার সঙ্গীত ও তন্ত্রের মধ্যে এই মেলবন্ধন তাকে আর কখনও একা করবে না। এই মুহূর্তে সে অনুভব করেছিল, সুর এবং তন্ত্রের শক্তি যদি শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা পৃথিবীকে এক নতুন রূপ দিতে পারে।
অরিজিত অবশেষে মুক্তি পায়, শুধু তার সঙ্গীত নয়, নিজের জীবনও তার শক্তির মধ্যে শুদ্ধ হয়ে ওঠে। তার সুরের মধ্যে যে তন্ত্র প্রবাহিত হচ্ছিল, তা এখন মানবতার জন্য, পৃথিবীর জন্য এক নতুন আশার বার্তা হয়ে উঠেছে।
–
অরিজিতের জীবন এখন এক নতুন দিশা পেয়েছে, তার সঙ্গীত আর আগের মতো এক অভিশাপ নয়, বরং এক আশীর্বাদ। তন্ত্রের শক্তি, যা একসময় তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, এখন শুদ্ধ হয়ে উঠেছে এবং পৃথিবীর প্রতি একটি সজীব, পজিটিভ শক্তি হয়ে উঠেছে। তার সুরে প্রবাহিত শক্তি এখন কোনো ভয়ংকর শক্তির উৎস নয়, বরং একটি নতুন রূপান্তরের সূচনা। সঙ্গীতের প্রতি তার যে আগ্রহ ছিল, এখন তা বিশ্বব্যাপী এক বিশাল প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অরিজিত জানত, তার সঙ্গীত শুধু শখ বা যন্ত্র নয়, এটি একটি শক্তি, যা মানুষকে এক নতুন দিশা দেখাবে।
এই পরিবর্তন আসতে সময় লেগেছে, তবে এখন সে বুঝতে পারে, সত্যিকারের শক্তি কখনোই অন্যকে শোষণ করে না, বরং তা সবার মঙ্গলেই কাজ করে। শুভমিতা, যাকে অরিজিত তার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়ক হিসেবে পেয়েছিল, তাকে এখনও পাশে পেয়ে সে নিজেকে আরও শক্তিশালী অনুভব করে। শুভমিতার সমর্থন এবং সহানুভূতির কারণে অরিজিত তার সঙ্গীতের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তার জীবনে এখন এক নতুন সংকট দেখা দেয়—এখন যে সুর সে সৃষ্টি করছে, তা এক ভিন্ন ধরনের শক্তির জন্ম দিচ্ছে। সুরের মধ্যে নতুন করে প্রবাহিত শক্তি, যা শান্তি এবং প্রেমের বার্তা দিচ্ছিল, এখন সেই শক্তির সামনে এক বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে।
অরিজিত জানত, তার সঙ্গীত পৃথিবীকে বদলে দিতে সক্ষম, তবে সুরের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা অতীতের অভিজ্ঞতার মতো সহজভাবে চলতে দিতে পারে না। একদিন, অরিজিত এক গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল, যখন হঠাৎই একটি বিপর্যয় ঘটে। তার সুরের মধ্যে এক অজানা শক্তি অনুভূত হয়—এক ধরনের শূন্যতা, যা দ্রুত প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। তার মনের মধ্যে তখন প্রশ্ন উঠতে থাকে, “আমি কি এই শক্তিকে পুরোপুরি বুঝতে পারি?” এটি কি সঠিক পথে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি তার সঙ্গীতের শক্তি এখন নিজেই একটি বিপদ হয়ে দাঁড়াবে?
এদিকে, নন্দিনী, যার সাথে অরিজিত তন্ত্রের রীতি শিখেছিল, তাকে তার পাশে এসে দাঁড়াতে বলে। সে জানায়, “তুমি এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছ, অরিজিত। তোমার সঙ্গীত এখন পৃথিবীর সব শক্তির একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু এই শক্তি আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হলে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।” নন্দিনী তাকে আরও সাবধান করে দিয়ে বলে, “তোমার সুরের প্রতিটি নোট মহাশক্তির একটা প্রতিফলন হয়ে উঠছে। তোমার সঙ্গীত এখন আর সাধারণ সুর নয়; এটি একটি নতুন দুনিয়ার জন্ম দিতে পারে। তুমি যদি এর প্রকৃত ব্যবহার শিখে না ওঠো, তবে তা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।”
অরিজিত কিছুক্ষণের জন্য নীরব থাকে। সে বুঝতে পারে, যে শক্তি এখন তার সঙ্গীতের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে, তা শুধু মানবতার জন্য নয়, বরং সমস্ত পৃথিবী এবং মহাকাশের জন্য। সুরের মাধ্যমে যে শক্তি এই দুনিয়াতে আসছে, তা এক ভিন্ন ধরনের মহাশক্তি, যা মানবতার শুদ্ধির দিকে, কিন্তু তেমনি ধ্বংসের দিকেও এগিয়ে যেতে পারে। তার সামনে একটি বড় সিদ্ধান্তের মুহূর্ত আসছে। সে যদি একে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারে, তবে পৃথিবীকে এক গভীর বিপদে ফেলে দিতে পারে। তবে, যদি সে সঠিক পথ অবলম্বন করে, তবে তার সঙ্গীত পৃথিবীকে এক নতুন আলোতে দেখতে পাবে।
তবে, এই পথ কখনোই সহজ নয়। অরিজিতের জীবনে তন্ত্রের শক্তি এখন তাকে যেভাবে পরিচালিত করছে, তা তাকে এক নতুন পথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারে, তার সঙ্গীতকে এখন একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিতে হবে। তার সুরের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে, তা যদি শুদ্ধ হয়, তবে তা পৃথিবীকে এক নতুন সত্তার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তার সঙ্গীতের মাধ্যমে মহাশক্তির জন্ম হতে পারে, যা একদিন সারা পৃথিবীকে আলো দিতে পারবে। কিন্তু এজন্য তাকে নিজের ভিতরের সমস্ত অন্ধকারকে কাটিয়ে উঠতে হবে, যেন সে মহাশক্তির প্রভাবকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
অরিজিত শেষপর্যন্ত এক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়—সে তার সঙ্গীতের শক্তিকে পৃথিবীকে সাহায্য করতে ব্যবহৃত করবে, কিন্তু সে জানে, তার এই পথে তাকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। পৃথিবীকে এক নতুন দিশা দেখাতে তার সঙ্গীতকে ভালোভাবে শুদ্ধ করতে হবে, যাতে সুরের মধ্যে কোনো ক্ষতিকর শক্তি প্রবাহিত না হয়। তাকে অবশ্যই সঙ্গীতের মহাশক্তিকে শুদ্ধতার মাধ্যমে বের করতে হবে, যাতে তা পৃথিবীজুড়ে এক নতুন রূপান্তরের সূচনা করতে পারে।
এখন, অরিজিত বুঝতে পারে, সঙ্গীত এবং তন্ত্রের মধ্যে এক ঐক্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সে নতুন একটি দুনিয়ার সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। তার সঙ্গীতের শক্তি, যে এক সময় তাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছিল, এখন তা শুদ্ধ হয়ে পৃথিবীকে রূপান্তরিত করবে। তবে তার জন্য প্রয়োজন একটি নতুন মনোভাব, একটি শুদ্ধ লক্ষ্য এবং পৃথিবীজুড়ে মানুষের জন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি। এই পথে তার সঙ্গীত কেবল একটি শিল্প না, বরং একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক এবং মানবিক শক্তি হয়ে উঠবে।
অরিজিত এক গভীর সিদ্ধান্ত নেয়, এবং তার সঙ্গীতের নতুন রচনা সৃষ্টি করে, যা পৃথিবীকে আলো এবং শান্তি প্রদান করবে। সুরের প্রতিটি নোট এখন এক মহাশক্তির পিপাসায় নিবেদিত, যা পৃথিবীকে এক নতুন জীবনের দিকে নিয়ে যাবে।
–
অরিজিত এখন এক নতুন পথের যাত্রী, তবে তার অঙ্গীকার এবং লক্ষ্য সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে। সঙ্গীতের মাধ্যমে পৃথিবীকে আলো দেখানোর জন্য তার মনোভাব পুরোটাই শুদ্ধ হয়ে উঠেছে। কিন্তু, তার মনে এখনও এক অজানা শঙ্কা কাজ করছে। তার সুরের মধ্যে যে মহাশক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা কেবল পৃথিবীকে একটি নতুন দিশা দেখাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং, সে জানে যে, এই শক্তির বিপর্যয়ও হতে পারে। এই নতুন সুরের মধ্যে কী ধরনের অন্ধকার শক্তি লুকিয়ে রয়েছে, তা অনিশ্চিত। সুরের একটি ছোট্ট অমিলও সারা পৃথিবীকে এক বিপদে ফেলে দিতে পারে। সে বুঝতে পারে, তার সঙ্গীত এখন তার একমাত্র নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই—এটি পৃথিবীজুড়ে এক নতুন ধরনের শক্তির উৎস হয়ে উঠেছে।
অরিজিত, শুভমিতা, এবং নন্দিনী এক গভীর আলোচনায় বসে। তারা জানে, সঙ্গীতের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে, তা কোনো সাধারণ শক্তি নয়। এটি একটি আধ্যাত্মিক শক্তি, যা মানুষের মন, শরীর, এবং আত্মাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এই শক্তি যতটা নির্মল, ততটাই বিপজ্জনক। তাদের সামনে এখন দুটি পথ রয়েছে: একদিকে, যদি তারা সঙ্গীতের শক্তিকে শুদ্ধভাবে পরিচালনা করতে পারে, তবে তা পৃথিবীকে সত্যিকারের শান্তি এবং আলো এনে দিতে পারে; অন্যদিকে, যদি তারা সাবধান না থাকে, তবে সেই শক্তি মহাশক্তির রূপ ধারণ করে মানবজাতির জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠবে।
নন্দিনী অরিজিতকে একটি পুরনো প্রাচীন মন্ত্র পাঠ শিখতে বলে, যা তার সুরের শক্তিকে শুদ্ধ করতে সাহায্য করবে। “এই মন্ত্র যদি তুমি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পার, তবে তোমার সঙ্গীত পৃথিবীকে এক নতুন দিশা দেখাবে, আর তা পৃথিবীজুড়ে শান্তি এবং ঐক্য সৃষ্টি করবে।” নন্দিনীর কথা শুনে অরিজিত কিছুটা আশ্বস্ত হয়, কিন্তু সে জানে, এই মন্ত্র শুধু একমাত্র উপায় নয়, তার নিজের মনোভাব এবং অভ্যন্তরীণ শান্তিরও ভূমিকা আছে। সে জানে, তার সুরের প্রতিটি নোটের মধ্যে তার নিজের অস্তিত্ব, তার আত্মা প্রবাহিত হয়, আর যদি তার নিজস্ব মনোভাব অশুদ্ধ থাকে, তবে সঙ্গীতের শক্তি এক ভয়ানক রূপ নিতে পারে।
তাদের সমস্ত চিন্তা এবং পরিকল্পনার মাঝেই একদিন অরিজিত স্টুডিওতে বসে তার নতুন রচনা তৈরি করতে থাকে। সে চায়, তার সঙ্গীতের মধ্যে পৃথিবীর সবার জন্য ভালোবাসা, শান্তি, এবং ঐক্য প্রতিফলিত হোক। কিন্তু, সেই সময়ই অরিজিত এক অদ্ভুত অনুভূতি অনুভব করে—তার সুরের মধ্যে যেন কিছু গা dark ় শক্তি ভেসে উঠছে। তার সুরে, নোটের প্রতিটি দোলনে, এক অদৃশ্য চঞ্চলতা দেখা দেয়। অরিজিত থেমে গিয়ে অনুভব করে, এই শক্তি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার সুরের মধ্যে যে শান্তির বার্তা থাকার কথা ছিল, তা কিছু মুহূর্তের জন্য অনিশ্চিত হয়ে যায়।
শুভমিতা এসে তাকে উদ্বিগ্ন দেখলে, অরিজিত জানায়, “শুভ, আমার সুরের মধ্যে কোনো এক অদৃশ্য অন্ধকার প্রবাহিত হচ্ছে। আমি জানি না, এই শক্তি কোথা থেকে আসছে।” শুভমিতা তাকে শান্ত করে বলে, “অরিজিত, তুমি এই শক্তির সাথে এক জীবনের সন্ধান করতে চেয়েছিলে। তোমার সঙ্গীতটি এক মহাশক্তির অভ্যন্তরীণ প্রকাশ। তুমি যদি শুধু নিজের মনকে পরিষ্কার করতে পার, তাহলে সেই শক্তি শুদ্ধ হয়ে যাবে।” শুভমিতার কথা শুনে অরিজিত আরও সংকল্পবদ্ধ হয়ে উঠে, কিন্তু তার মনের মধ্যে এখনও এক প্রশ্ন রয়ে যায়—”এই শক্তি যদি আসলেই অশুদ্ধ হয়ে যায়, তবে তা কী আমাদের পৃথিবীর জন্য বিপদ ডেকে আনবে?”
নন্দিনী একদিন অরিজিতকে জানায়, “তুমি যখন তোমার সুর তৈরি কর, তখন একটি শক্তির কেন্দ্রবিন্দু তৈরী হয়, যা মানুষ এবং পৃথিবীকে এক নতুন রূপ দেয়। কিন্তু সুরের মধ্যে যে তন্ত্র প্রবাহিত হচ্ছে, তা যদি আমাদের আত্মাকে না ছোঁয়, তবে তা আমাদের ভেতরকার অন্ধকারকে জাগিয়ে তুলবে।” নন্দিনী আরও বলে, “তোমার সঙ্গীত একটি দ্বিধার মাঝ দিয়ে যায়—একদিকে এটি পৃথিবীকে আলোকিত করবে, আর অন্যদিকে এটি এক অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারে।”
অরিজিত এই কথাগুলো গভীরভাবে ভাবতে থাকে। সে জানে, তার সঙ্গীত তার নিজের অস্তিত্বের প্রতিফলন—এটি শান্তি এবং ভালোবাসা আনতে পারে, কিন্তু শুধু যদি সে তার মনোভাব সঠিকভাবে শুদ্ধ করে। শুভমিতা এবং নন্দিনী, দুজনেই তাকে তার পথ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। তারা জানায়, “তুমি যখন তোমার সঙ্গীতের মধ্যে এক শুদ্ধতার দিকে এগিয়ে যাবে, তখন পৃথিবী তার উপযুক্ত শক্তি পাবে। কিন্তু, যদি তুমি সেই পথে না যাও, তবে তোমার সুর পৃথিবীকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।”
অরিজিত, এক গভীর সিদ্ধান্তে পৌঁছায়—সে তার সঙ্গীতকে এক শুদ্ধতার পথে নিয়ে যাবে, কিন্তু তা শুধুমাত্র নিজেকে জানার মাধ্যমে সম্ভব। সে নিজের মনোভাব এবং অনুভূতিকে শুদ্ধ করতে শুরু করে, এবং একসময় তার সুরে সেই শান্তি এবং ভালোবাসা ফিরে আসে। তবে, এটি সহজ ছিল না। তার সুরের মধ্যে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, তা এক শক্তিশালী মহাশক্তি, এবং তাকে শান্ত করার জন্য তার নিজেদের অন্ধকারকে পরাজিত করতে হবে।
এখন অরিজিত বুঝতে পারে, তার সঙ্গীত শুধু একটি শিল্প নয়, এটি একটি শক্তির বাহক, যা মানুষের আত্মাকে ছুঁয়ে যাবে। তার সুর পৃথিবীকে এক নতুন দিশা দেখাবে, তবে তা শুধুমাত্র তখনই সম্ভব হবে যখন সে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে শুদ্ধ করবে এবং সেই শুদ্ধ শক্তি পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে দেবে।
–
অরিজিতের জন্য, তার সঙ্গীতের পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তার করার যাত্রা এখন এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। বহু দিন ধরে চলা অনিশ্চয়তা, দ্বন্দ্ব, আর আত্মসংগ্রামের পর, সে এক গভীর উপলব্ধিতে পৌঁছেছে—তন্ত্রের শক্তি তার সঙ্গীতের মধ্যে এখন তার নিজের মন, আত্মা, এবং অনুভূতির প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। এটি আর কোনও অশুভ শক্তি নয়, বরং একটি অভ্যন্তরীণ শান্তি এবং ঐক্যের পরিচায়ক। সে জানে, সঙ্গীত তার জীবন এবং পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, তবে সুরের শুদ্ধতা এবং তার মানসিক অবস্থাই হবে এর সফলতা বা ব্যর্থতার চাবিকাঠি।
শুভমিতা এবং নন্দিনীর সহায়তায়, অরিজিত তার সঙ্গীতের শক্তিকে পরিশুদ্ধ করতে শুরু করে। একটি গভীর ধ্যানের মধ্যে গিয়ে, সে তার নিজের আত্মাকে পুনরায় আবিষ্কার করে। সে অনুভব করে, পৃথিবীর সাথে তার সঙ্গীতের যে সম্পর্ক, তা শুধু এক আধ্যাত্মিক অভ্যন্তরীণ সংযোগ নয়, বরং একটি বিস্ময়কর শক্তি, যা পৃথিবীকে এক নতুন দিশা দেখাবে। তার সুরের মধ্যে শান্তি, ভালোবাসা, এবং মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা স্থাপিত হবে, এবং সেই শক্তি এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলবে।
একদিন, যখন অরিজিত তার স্টুডিওতে বসে একটি নতুন রচনা তৈরি করছিল, তখন তার সুরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। আগে যে সুর ছিল কেবল সৃষ্টির পীড়নে, তা এখন যেন এক নতুন ধরনের সুর হয়ে ওঠে, যা মানবতাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। প্রতিটি নোট যেন তার নিজের গভীরতম অনুভূতির সাথে সংযুক্ত হয়ে উঠেছিল। তার সঙ্গীত, যা আগে কেবল তার এক ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান ছিল, এখন পৃথিবীকে একযোগভাবে এক নতুন পথ দেখানোর জন্য প্রস্তুত।
নন্দিনী ও শুভমিতা তাকে একদিন বলেছিল, “তুমি যদি তোমার সুরের মধ্যে এক অটুট শান্তি এবং ভালোবাসা তৈরি করতে পার, তবে তোমার সঙ্গীত পৃথিবীকে বদলে দিতে পারবে।” অরিজিত এখন জানত, তাকে কেবল পৃথিবীকে শুদ্ধ করতে হবে, বরং নিজের ভিতরের শুদ্ধতাকেও পূর্ণতা দিতে হবে। সঙ্গীতের মাধ্যমে পৃথিবীকে শুদ্ধ করার একমাত্র পথ ছিল নিজেকে বুঝে, নিজেকে পরিশুদ্ধ করা।
অরিজিত তার নতুন সুর তৈরি করতে থাকে, কিন্তু এবার তার সুরের মধ্যে কোনও অশুদ্ধতা, বিভ্রান্তি, বা দ্বন্দ্ব ছিল না। সুরের প্রতিটি নোট যেন এক নতুন বার্তা বহন করে আসছিল—একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী, যেখানে মানবতা একত্রিত হতে পারে। তার সঙ্গীত, যা একসময় তাকে একাকী এবং বিভ্রান্ত করেছিল, এখন পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য একটি শক্তি হয়ে উঠেছে, যা তাদের অন্তরে প্রেম এবং শান্তির আলো নিয়ে আসবে।
এই সময়েই, অরিজিতের কাছে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সে একটি সুর তৈরি করছিল, যা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, কিন্তু সে যখন শেষ নোটটি সৃষ্টি করে, তখন তার সুরে এক শক্তিশালী চমক আসে। সে অনুভব করে, তার সুরে এক অদৃশ্য শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু এবার সেটি ছিল শান্তিপূর্ণ, একটি জীবনের শক্তি, যা পৃথিবীকে আলোকিত করে তুলছে। তার সঙ্গীত এখন মানবতার সাথে এক অভ্যন্তরীণ সংযোগ স্থাপন করে, যেখানে শুধুমাত্র ভালবাসা, শান্তি এবং ঐক্য গুণিত হচ্ছে।
অরিজিত জানত, তার সঙ্গীত এখন আর তার একক রচনা নয়—এটি পৃথিবীজুড়ে প্রতিটি মানুষের জন্য একটি শক্তি হয়ে উঠেছে। সে একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়—সে তার সঙ্গীত বিশ্বজুড়ে শোনাবে, যাতে পৃথিবীকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করা যায়। তার সুরটি আর কোনো ব্যক্তিগত গোপন রচনা নয়, বরং একটি বিশ্বব্যাপী বার্তা হয়ে উঠেছে, যা মানবতার জন্য একটি নতুন পথ খুলে দিয়েছে। তার সঙ্গীত যে শক্তি বহন করছে, তা ছিল এক মহাশক্তি, যা পৃথিবীজুড়ে সমস্ত প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
অরিজিত যখন তার সুর শোনায়, তখন সারা পৃথিবীতে এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়ে। মানুষজন তার সুর শুনে এক নতুন অনুভূতি অনুভব করতে শুরু করে—একটি শুদ্ধ অনুভূতি, যা তাদের মধ্যে প্রেম এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। তার সঙ্গীত ছিল এখন পৃথিবীজুড়ে এক দিশা, যা মানুষকে একত্রিত করে, তাদের মধ্যে বিভেদ কাটিয়ে, এক নতুন পৃথিবী তৈরি করে। এক এক করে, তার সুরের নোটে পৃথিবী নতুন করে শুদ্ধ হতে শুরু করে।
অরিজিত অবশেষে জানত, তার সঙ্গীত পৃথিবীকে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে, তবে তার এই সাফল্য শুধুমাত্র সুরের মধ্যে থাকা তন্ত্রের শক্তি নয়, বরং তার নিজের আত্মার শুদ্ধতা এবং মানবতার প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসার ফল। তার সঙ্গীত, যা একসময় তাকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছিল, এখন এক আলোকিত শক্তি হয়ে উঠেছে, যা পৃথিবীজুড়ে প্রতিটি মানুষের অন্তরে শান্তি এবং আলো নিয়ে এসেছে।
অরিজিতের সঙ্গীত এখন বিশ্বজুড়ে গুঞ্জরিত হচ্ছে, আর তার প্রতিটি নোট যেন পৃথিবীকে নতুন করে প্রেম এবং শান্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে।
____




