Bangla - সামাজিক গল্প

শকুনি

Spread the love

সুশোভন দত্ত


পর্ব ১: যুদ্ধের আগমনী

ইন্দ্রপুর শহরে ভোরের আলো নামে না—এখানে আলো আসে হেডলাইন দিয়ে।

একটা নতুন দিন মানে আরেকটা টক-শো, একটা নতুন বিতর্ক, আর একটা পুরনো ষড়যন্ত্রের ভিন্ন মুখ। কিন্তু আজকের সকালটা একটু আলাদা ছিল।

“আজ সন্ধ্যেবেলা ৭টায় ‘রিপাবলিক ভয়েস’ টিভি চ্যানেলে মুখোমুখি হচ্ছে দর্পণ বসু আর কৃষ মালভিয়া। লাইভ বিতর্ক।”—এই নিউজ টিকারের নিচে অনবরত ঘুরছিল একটা নাম: শকুনি সেন।

সে নিজে কখনও ক্যামেরার সামনে আসে না। অথচ প্রতিটি বিতর্কের পেছনে, প্রতিটি ‘এক্সপোজে’র নেপথ্যে, প্রতিটি বাছাই করা হেডলাইনের গভীরে তার ছায়া ঘন হয়ে থাকে।

কৃষ মালভিয়া টের পাচ্ছিল—এটা আর বিতর্ক নয়, এটা যুদ্ধ। এবং যুদ্ধের নাট্যকার এই ব্যক্তি যার নাম কেউ জানলেও চেহারা জানে না—শকুনি সেন।

একটা ধূসর দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কৃষ পকেট থেকে একটা পুরোনো কলম বের করল। মায়ের দেওয়া কলম। সে জানত, সত্যের জন্য যুদ্ধ করতে হলে তরবারি দরকার হয় না, কলমই যথেষ্ট।

তার পডকাস্ট চ্যানেল “ধর্মক্ষেত্র” এখন অনেকের কাছেই বিকল্প মিডিয়া। কিন্তু মূলস্রোতের শক্তি যে কতটা গভীর, তা সে হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছে।

আর আজ দর্পণ বসুর বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়ানো মানে কেবল ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলা নয়—মানে সেই ক্ষমতাকে চালানো মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ানো, মানে শকুনির বিরুদ্ধাচরণ।

শুধু কৃষ একা নয়—তার পাশে আজ ফিরেছে Meghna Sen।

একসময় দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাইমটাইম মুখ, আজ মিডিয়ার বিচারে “বিতর্কিত”। তার একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও হঠাৎ করে ভাইরাল হয়ে যায়—একই সময় যখন সে একটি শাসকদলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে যাচ্ছিল।

কাকতালীয়?

Meghna আজ চুপ করে বসে নেই। তার ডেটা আর্কাইভে আছে সেই ভিডিওর শেয়ারিং প্যাটার্ন, IP অ্যাক্সেস, আর এমন কিছু ‘লিঙ্ক’ যা প্রমাণ করে: এই স্ক্যান্ডালের আড়ালে ছিল কেউ। এবং সে কেউই হচ্ছে শকুনি সেন।

“তুমি কি নিশ্চিত আজ বলবে?” কৃষ জিজ্ঞেস করল।

Meghna হেসে বলল, “ওরা আমার সম্মান কাড়ার চেষ্টা করেছিল। এখন আমি ওদের মুখোশ খুলব। প্রত্যেকটা ক্যামেরা, প্রত্যেকটা টেলিপ্রম্পটার আজ আমার হয়ে কথা বলবে।”

অন্যদিকে Gandharva Agency, অর্থাৎ শকুনির কার্যালয়ে চলছিল অন্য প্রস্তুতি।

তার চোখের সামনে চারটা স্ক্রিনে চারটি আলাদা লাইভ ফিড চলছিল—সোশ্যাল মিডিয়ার মনিটরিং, পাবলিক সেন্টিমেন্ট ট্র্যাকার, নিউজ কনটেন্ট অ্যালগোরিদম এবং AI রেটিং এনালিটিক্স।

সে এক ঝলকে দেখে নিল ট্রেন্ডিং টপিক: #DeshKeDarpan, #FakeFarmerKrish, #MeghnaLeaks

শকুনি জানে কাকে কীভাবে ভাঙতে হয়। কৃষের সততা? উল্টে দিতে হয় “আদর্শবাদ মানে বেকুবি” বলেই।

Meghna’র লড়াই? সেটাকে বানিয়ে দিতে হয় “মহিলা শিকার” নাটক।

দর্পণ বসু? সে তো কেবল শকুনির কথায় সাজানো এক অচলায়তন। শুধু সামনে দাঁড়ায়, বাকিটা চালায় সে।

“আজ সন্ধ্যেটা হতে যাচ্ছে ইতিহাসের একটা পর্ব।” শকুনি ফোনে বলল কর্ণ কপূরকে—দর্পণ বসুর মিডিয়া মুখ। “তুমি শুধু নিশ্চিত করো ক্যামেরা কোথায় ঘুরবে, বাকিটা আমি দেখছি।”

কৃষ এদিকে একটি ছোট্ট রেকর্ডার চালু করল।

“আজ যা কিছু বলা হবে, তা শুধু টেলিভিশনে নয়—আমার আর্কাইভেও থাকবে। কারণ যুদ্ধ শুধু সামনেই হয় না, পেছনের গল্পগুলোও লড়াই করে।”

একটা মেট্রো ট্রেন পাশ দিয়ে চলে গেল। তার কাচে প্রতিফলিত হলো কৃষের মুখ। পেছনে Meghna দাঁড়িয়ে, চোখে এক দৃঢ় আগুন।

এই প্রতিচ্ছবিতে আজকের পাণ্ডবদের লড়াই শুরু হলো।

ইন্দ্রপুর শহরে সন্ধ্যা নামছিল। আলো জ্বলে উঠছিল টিভি স্ক্রিনে।

আর এক অদৃশ্য মঞ্চে শকুনি নিজের গেমবোর্ড সাজাচ্ছিল প্যাদার সামনে, ঘোড়ার পাশে, রাজার মুখে হাসি—আর কোথাও অন্ধকারে বসে থেকে শুধু একটি কথাই ভাবছিল “সত্য নয়… কাহিনী জিতবে। কারণ ইতিহাস লেখে যে, তারই কলম থাকে হাতে।”

পর্ব ২: দাবার প্রথম চাল

ইন্দ্রপুরের আকাশে সন্ধ্যার আলো ম্লান হচ্ছিল, কিন্তু শহরের মধ্যবিত্ত বসবাসে আলো জ্বলছিল বড় টিভি স্ক্রিনে। সব চ্যানেল একসাথে মুখোমুখি লাইভ বিতর্কের জন্য প্রস্তুত। কেউ জানত না, স্টুডিওর আলো আর প্রশ্নের ঝাঁজের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অপার কৌশল—একটা দাবার চাল, যে চাল দিয়েছে একজন যার নাম কেউ মুখে আনে না, শুধু বুঝে নেয়—শকুনি সেন।

Gandharva Agency-র কনফারেন্স রুমে বড় স্ক্রিনে ফিড চলছিল। চারজন স্পেশালিস্ট তথ্য যাচাই, সোশ্যাল ট্রেন্ড আর মনিটরিং করছিল। শকুনি নিজে একটানা কিছু না বলে কেবল দেখছিল। তার মুখে একটা গাঢ় হাসি, যেন কেউ তার পছন্দের কৌশল কাজে লাগিয়ে বসেছে।

“কর্ণ, রেডি তো?”

“সব প্ল্যানমতো হচ্ছে,” কর্ণ কপূর বলল ফোনের ওদিকে, “Meghna-র একটা পুরনো ইনভেস্টিগেশন ক্লিপ আজকে লাইভ বিতর্ক শুরুর আগে ছড়িয়ে পড়বে সোশ্যালে—প্রমাণ নেই, শুধু সন্দেহ। স্ক্যান্ডাল ঘিরে আবারো আলোড়ন।”

“Perfect,” শকুনি বলল। “Meghna যেন চাপে পড়ে—জাস্ট লাইভের আগেই। আর কৃষকে ট্যাগ করে #UrbanNaxalCampaign শুরু করো। ওর সততার মুখে প্রশ্ন তুলতে হবে। মানুষ যাকে বিশ্বাস করে, তাকে ঘোলাটে করলেই জিতব।”

অন্যদিকে কৃষ মালভিয়া টিভি চ্যানেলের মেকআপ রুমে বসে ছিল। টেবিলের ওপর ফোনের স্ক্রিনে একের পর এক টুইট নেমে আসছে। কিছু পরিচিত মুখের অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়েছে—”Meghna Sen must answer for her shady journalism”, “Krish Malviya is a paid voice”.

Meghna সোজা এসে পাশে বসল।

“শুরু হয়ে গেছে।”

“হ্যাঁ, দেখছি,” কৃষ বলল। “তোমার বিরুদ্ধে স্ক্যান্ডাল-সংক্রান্ত টুইট আবার ফিরেছে।”

Meghna চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “ওরা ভাবছে আমি আবার ভেঙে পড়ব? এবার আর না। আমি তো জানি এও একটা চাল। আর দাবায়, যখন প্রতিপক্ষের রাণী টার্গেটে থাকে, তখন প্রথমেই প্যাদা নয়—চাল হয় শকুনির মতন। চতুর, নীচু, কিন্তু খেলার মধ্যস্থলে সর্বনাশা।”

কৃষ হালকা হাসল। “তোমার মতো দৃঢ় কেউ আমি দেখিনি।”

লাইভ বিতর্ক শুরু হল। ক্যামেরা ঘুরল, আলো জ্বলে উঠল। দর্পণ বসু গলার স্বরে আত্মবিশ্বাস, কিন্তু চোখে গাঢ় দম্ভ।

“তুমি আমাকে বলছ করাপ্ট?” দর্পণ বলল কৃষকে। “একটা ইউটিউব পডকাস্ট করে তুমি ভাবছ তুমি জনতার প্রতিনিধি?”

কৃষ মৃদু হাসল। “আমি কারও প্রতিনিধি নই। আমি শুধু প্রশ্ন করি। তোমার মন্ত্রণালয়ে দেওয়া কনট্রাক্টগুলোর তথ্য RTI-তে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?”

হঠাৎই অ্যাঙ্কর ছেদ করে বলল, “এক মিনিট! আমাদের কাছে একটা ব্রেকিং ক্লিপ এসেছে Meghna Sen-এর আগের ইনভেস্টিগেশন ঘিরে। তার পুরনো সহকর্মী আজ সোশ্যালে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। আমরা সেটাই দেখাবো…”

স্ক্রিনে Meghna-র পুরনো ভিডিওর টুকরো, কেটে-কেটে এমনভাবে দেখানো হল, যাতে বিভ্রান্তি হয়—সে যেন ‘ফেক নিউজ’ ছড়িয়েছে কোনো একসময়।

স্টুডিওর বাতাস মুহূর্তে পালটে গেল। দর্পণ বসুর মুখে তৃপ্তির হাসি।

কিন্তু Meghna চোখ নামাল না। সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনারা এই ক্লিপ দেখালেন, ঠিক আছে। কিন্তু আমি সেই তদন্তের সমস্ত র’ ফুটেজ, ইমেইল, সাক্ষাৎকারের অডিও—সব রাখি। আজ রাতেই আমার ইউটিউব চ্যানেলে পুরোটা পোস্ট করব। বিচার করুক দর্শক। শুধু বলছি—মিথ্যা প্রমাণ করতে এতো তাড়াহুড়ো কেন?”

কৃষ এরপর এক প্যানেলের প্রশ্নে বলল,

“আজকে মিডিয়াকে বলা হয় চতুর্থ স্তম্ভ, অথচ এই স্তম্ভই এখন কংক্রিটে বানানো—ভেতরে ফাঁপা। কারণ এই হেডলাইনগুলো কেউ একজন লিখে দেয় আগে থেকেই। সাংবাদিকতা এখন প্রশ্নের নয়, পছন্দের হয়ে গেছে।”

দর্শকদের চোখ বড় হয়ে গেল। প্যানেল চুপ। দর্পণ বসু কাঁচুমাচু।

লাইভ শেষ হল। স্টুডিওর আলো নিভল।

শকুনি সেন তখনো Gandharva Agency-র রুমে বসে ছিল। স্ক্রিনে কৃষ আর Meghna-র বক্তব্য চলছে। কর্ণ তাকে বলল, “দেখছ? পলিটিক্যাল পয়েন্ট গেছে কৃষের দিকে। কিন্তু ওর ইনফ্লুয়েন্স বাড়বে…”

শকুনি বলল, “তা হোক। দাবার প্রথম চাল সবসময় জেতার জন্য হয় না। কিছু চাল হয় প্রতিপক্ষকে বোঝার জন্য। কে কোথায় যায়, কীভাবে খেলে। এখন খেলাটা জমছে।”

তারপর টেবিলের ওপরের কাঁচের নিচে রাখা একটা ফটোতে চোখ পড়ল তার—একটা পুরনো পারিবারিক ছবি। এক অজানা ইতিহাসের মুখচ্ছবি।

সে ফিসফিস করে বলল,

“তোমরা পাণ্ডব ভাবছো নিজেকে? তবে আমি মনে করিয়ে দেব, মহাভারতে পাণ্ডবরা যুদ্ধ জিতেছিল—কিন্তু তার দামে পুড়েছিল পুরো কুরুক্ষেত্র।”

পর্ব ৩: মিডিয়ার পাঁচালি

ইন্দ্রপুরের রাস্তাগুলো শহরের গল্প বলে না, শহরের মিডিয়াই বলে সেই গল্প। আর সেই গল্পগুলো সাজিয়ে দেয় একদল মানুষ, যারা নিজেদের সম্পাদক বলে, সাংবাদিক বলে, কিন্তু আসলে তারা হচ্ছে কাহিনিকার—ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যারা শকুনির ছায়ায় নাটক পরিচালনা করে।

কৃষ মালভিয়া বুঝতে পারছিলো—একটা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, এবং সেই যুদ্ধ শুধু বিতর্কে নয়, প্রতিটি টুইট, প্রতিটি ভিডিও ক্লিপ, প্রতিটি ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগে ছড়িয়ে আছে।

লাইভ বিতর্কের পরদিন সকাল থেকেই সামাজিক মাধ্যমে #MeghnaVsSystem, #KrishForTruth ট্রেন্ড করতে শুরু করল। কৃষর ফোনে ননস্টপ কল, সাক্ষাৎকারের অনুরোধ, এবং ফলোয়ারের ঢল।

কিন্তু কৃষ জানত, এটা শুধুই সাময়িক সিম্প্যাথি। মিডিয়া যত সহজে কাউকে হিরো বানায়, তত দ্রুত তাকে খলনায়কও করে দিতে পারে।

“তুমি জানো তো, এটা একটা চাল হতে পারে?” কৃষ বলল মেঘনা সেনকে।

Meghna মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। শকুনি কখনো সরাসরি আক্রমণ করে না। সে প্রথমে তোমাকে জনতার ভালোবাসা দেয়—তারপর সেটা কেড়ে নেয় এমনভাবে, যেন তুমি নিজেই দোষী। মিডিয়া এখন আর সংবাদ দেয় না, সংবাদ বানায়।”

Gandharva Agency-তে তখন শকুনির সামনে বসে আছে তাঁর পুরনো বন্ধু বিদুর নারায়ণ। একসময় তিনি ছিলেন সরকারি মিডিয়া নীতির উপদেষ্টা, এখন অবসরে থাকা এক নিরপেক্ষ বিশ্লেষক, কিন্তু সত্যি বলতে কি, শকুনির একমাত্র প্রতিপক্ষ যে তার মস্তিষ্কের ধার বুঝতে পারে।

“তুমি ওদের উঠতে দিচ্ছো কেন?” বিদুর জিজ্ঞেস করল। “Meghna আবার বিশ্বাস পেতে শুরু করেছে। কৃষর ট্র্যাকশন বাড়ছে। এতদিনের ন্যারেটিভ ঝুঁকছে অন্যদিকে।”

শকুনি হাসল। “আহা বিদুর, তুমি তো জানোই—একটা পর্বেই তো মহাভারত লেখা যায় না। আমি গল্পটা লম্বা করছি। কারণ যত দিন যুদ্ধ চলে, ততদিন দর্শকের মনোযোগ আমার হাতে। গল্প যত গভীর, বিশ্বাস তত দুর্বল হয়। আমি শুধু অপেক্ষা করছি—যখন ওদের নিজেদের মধ্যে ফাটল ধরবে।”

বিদুর চুপ করে থাকল। সে জানে শকুনির ছক বড়, ধৈর্য্য বেশি। এবং প্রতিশোধের আগুন এখনো নিভে যায়নি।

“তুমি কি কখনো নিজেকে প্রশ্ন করো না?” বিদুর বলল, “তুমি কি করছো এটা দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?”

শকুনির চোখ স্থির। “দেশ? না, না। আমি তো একটা গল্প লিখছি। আজকের ভারত গুজব ভালোবাসে, টুইটার যুদ্ধ ভালোবাসে, হেডলাইনে বাঁচে—তাহলে আমি শুধু সেটা সরবরাহ করছি।”

অন্যদিকে কৃষ ও Meghna বসেছিল এক ছোট প্রোডাকশন অফিসে, যেখানে তারা এক নতুন ধারাবাহিক ভিডিও বানানোর পরিকল্পনা করছিল—”মিডিয়ার পাঁচালি”।

এই সিরিজে তারা দেখাবে কিভাবে সংবাদ চ্যানেলগুলো নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে একেকটা পাঁচালি গড়ে তোলে—যেখানে নায়ক-খলনায়ক সবই স্ক্রিপ্টেড, দর্শককে ধরে রাখার জন্য নাটকীয়।

“আমরা যদি এটা বানাই, তাহলে অন্তত লোকে বুঝবে—মিডিয়া নিজেই কীভাবে নাটকের অংশ।” কৃষ বলল।

Meghna বলল, “ঠিক, আর এটা শুধু রাজনৈতিক চ্যানেল না—কীভাবে অপরাধ, ধর্ম, সমাজ… সব কিছু এখন ‘প্যাকেজড ন্যারেটিভ’—এই সত্যটাও সামনে আনতে হবে।”

এই কাজের জন্য তারা সাহায্য চাইল দুই তরুণ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের—Naksh Verma ও Sahu Jain, যারা একসময় কর্পোরেট মিডিয়ার ডেটা অ্যানালিটিক্স করত, এখন চুপচাপ সত্য ফাঁস করে বেড়ায়।

Naksh তাদের একটা ড্যাশবোর্ড দেখাল যেখানে দেখা যাচ্ছিল—শুধু একদিনে তিনটি বড় সংবাদপত্রে দর্পণ বসুর দল সম্পর্কে ইতিবাচক খবর ছাপা হয়েছে, আর সেই সঙ্গে একসাথে কৃষের বিরুদ্ধে ২৭টা ব্লগ আর সোশ্যাল পেজে বদনাম ছড়ানো হয়েছে। সবগুলোতেই IP ও সোর্স এক।

Sahu বলল, “এই হচ্ছে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিথ’ তৈরির কৌশল। এটাই শকুনির খেল।”

Meghna বলল, “তাহলে আমরাও আমাদের পাঁচালি বানাই—কিন্তু সত্য দিয়ে।”

সেই রাতে শকুনি Gandharva Agency থেকে বেরিয়ে একটি পুরনো রেকর্ডিং স্টুডিওতে গেল।

সেখানে একটি ধুলোভরা ক্যামেরার সামনে বসে সে প্রথমবার নিজের জন্য এক ক্লিপ রেকর্ড করল।

“তুমি যদি ভাবো, আমি কেবল ক্ষমতার দালাল, তবে ভুল করছো। আমি আসলে সেই গল্পকার, যার গল্প না থাকলে তোমার টেলিভিশন নীরব থাকত।

যে মিডিয়া আজ কৃষ বা মেঘনার পক্ষ নিচ্ছে, কাল তাদের গিলে ফেলবে। কারণ তারা খাবার চায়—আর আমি সেই রাঁধুনি।

এটা কেবল মিডিয়ার পাঁচালি নয়, এটা ইতিহাসের পাঁচালি।

এবং আমি হচ্ছি… সেই গল্পকার, যাকে কেউ ভালোবাসে না, কেউ মনে রাখে না,

তবু যার ছায়া ছাড়া কোনো যুদ্ধের শুরু হয় না।”

সে ক্যামেরা বন্ধ করল।

এটি কোথাও পোস্ট করবে না।

শুধু নিজের আর্কাইভে রেখে দেবে।

পর্ব ৪: আলোর নিচে অন্ধকার

ইন্দ্রপুর শহরের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোগুলো থাকে নিউজ স্টুডিওর সেটে। সেখানে আলো এত তীব্র, ক্যামেরা এত কাছ থেকে তাকিয়ে থাকে, মনে হয় সত্যের মুখ এড়ানো অসম্ভব। অথচ ঠিক সেখানেই সবচেয়ে বেশি অভিনয় হয়।

“নিউজরুমটা অনেকটা মঞ্চের মতো, কৃষ,” Meghna বলেছিল আগেরদিন, “আলো যত বেশি পড়ে, অন্ধকার তত গভীর হয়।”

আর আজ কৃষ মালভিয়া বুঝছিল সেটা খুব ভালো করে। কারণ এইমাত্র তার নতুন ভিডিও সিরিজ “মিডিয়ার পাঁচালি”-এর প্রথম এপিসোড ইউটিউবে পোস্ট হতেই এক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক লিগ্যাল নোটিশ, কনটেন্ট রিপোর্টিং, এমনকি এক অজানা ফোন নম্বর থেকে হুমকি এসেছিল।

“তুমি কি ভয় পাচ্ছো?” Meghna প্রশ্ন করল।

“না,” কৃষ বলল, “কিন্তু বুঝতে পারছি আমরা ঠিক দিকেই যাচ্ছি। এদের মাথাব্যথা শুরু হয়েছে।”

ভিডিওতে তারা দেখিয়েছিল কীভাবে ‘ডিবেট’ নামের অনুষ্ঠানের প্রশ্ন আগে থেকে নির্ধারিত হয়, অতিথিরা স্ক্রিপ্ট পায়, এবং ‘বিতর্ক’ মূলত একটা নাটক যেখানে দর্শকের রাগ ও ভয়কে ব্যবহার করা হয় ট্র্যাফিক বাড়ানোর জন্য।

এই ভিডিওটা পোস্ট করার পর পরই Darpan Basu-এর মিডিয়া টিমের মুখ কর্ণ কপূর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কৃষ ও Meghna-র বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার শুরু করল—তাদেরকে “দেশদ্রোহী”, “সন্ত্রাসবাদ সমর্থক”, “বিদেশি এজেন্ট” বলা হলো।

পেছন থেকে আবার চাল টানছিল শকুনি সেন।

সে জানত, আলোচনার মধ্যে সত্য ঢোকানো যায় না, তাকে গুলিয়ে দিতে হয়। এবং এখন সে জানত, জনগণকে বিভ্রান্ত করতে হলে প্রতিপক্ষের চরিত্র নিয়ে খেলাই সবচেয়ে সহজ।

সে Gandharva Agency-তে বসে কর্ণকে ভিডিও কলে বলল, “মুখ্য ব্যাপার হচ্ছে—ওদের বিশ্বাসযোগ্যতা ভাঙো। তুমি যদি প্রমাণ দিতে পারো Meghna সেন কোনোদিন ভুল রিপোর্ট করেছে, কৃষ কোনোদিন রাজনৈতিক দলে অর্থ নিয়েছে—তাহলে প্রশ্ন আর কেউ করবে না। দর্শক শুধু ক্যারেক্টার দেখে, যুক্তি নয়।”

অন্যদিকে বিদুর নারায়ণ এইসব দেখছিল একপ্রকার আক্ষেপে।

একদিন তিনিও মিডিয়া শিক্ষার অধ্যাপক ছিলেন, এখন শুধু ইতিহাসের ছাত্র।

তিনি কৃষ ও Meghna-কে ডেকে বললেন, “তোমরা জানো তো, ইতিহাস বলবে না শকুনি ছিল নায়ক না খলনায়ক। ইতিহাস শুধু সেই গল্পটাই মনে রাখবে, যা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে লেখা হয়েছে। এখন তোমরা যদি সত্যি লিখতে চাও, তবে সেটা শুধু ইউটিউব-ভিডিও দিয়ে হবে না—তোমাদের একটা সত্যি-ভিত্তিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়তে হবে।”

কৃষের চোখ চকচক করে উঠল। “আমরা যদি একটা ‘জনগণের নিউজরুম’ বানাই? যেখানে কোনো কর্পোরেট নেই, কোনো পিআর নেই—শুধু স্বাধীন সাংবাদিকতা?”

Meghna বলল, “আমাদের পরিচিত কিছু রিপোর্টার আছে যারা সিস্টেমে হাঁপিয়ে উঠেছে। তারা চাইলে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারে।”

এদিকে শকুনি বুঝতে পারল—ওরা যুদ্ধকে শুধু প্রতিরোধে আটকে রাখছে না, একে বিকল্প তৈরি করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এটাই শকুনির আসল ভয়।

“বিদ্রোহ নয়, বিকল্প—এটাই বিপজ্জনক।” সে নিজেই মনে মনে বলল।

সেই রাতেই এক অজানা ভিডিও ভাইরাল হলো—যেখানে দেখা যাচ্ছে কৃষ একটি অচেনা রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ক্যাফেতে কথা বলছে।

ভিডিও কাঁচা, শব্দ অস্পষ্ট, কিন্তু ক্যাপশন পরিষ্কার—“এই সেই কৃষ মালভিয়া, যিনি নাকি নিরপেক্ষ সাংবাদিক! এ তো দলদাস!”

সোশ্যাল মিডিয়া ফেটে পড়ল।

#KrishExposed, #FakeJournalist ট্রেন্ড করতে লাগল।

Meghna বলল, “এই ভিডিওটা তো এডিট করা! আমি তখন ছিলাম ক্যাফের এক টেবিল দূরে। এটা কোনো অফ দ্য রেকর্ড মিটিং ছিল না, ছিল সাধারণ কফি কথোপকথন।”

কৃষ বলল, “কিন্তু জনগণ শুনবে ক্যাপশন, দেখবে ভিউ। সত্য যাচাই করবে ক’জন?”

Naksh ও Sahu ডেটা ঘেঁটে দেখল—ভিডিওটা ছড়িয়েছে প্রায় ৭০টা ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে। সব তৈরি হয়েছে এক সপ্তাহের মধ্যে। IP ট্রেসে ধরা পড়ল—তিনটে অ্যাকাউন্ট সরাসরি Gandharva Agency-র সার্ভার ব্যবহার করেছে।

“আমরা যদি এটা প্রমাণ সহ সামনে আনতে পারি?” কৃষ বলল।

Meghna বলল, “তাহলে শকুনি সামনাসামনি আসবে। কারণ তার ছায়া যতই বড় হোক না কেন, নিজের অস্তিত্বে আঘাত লাগলে সে প্রকাশ্যে নামবেই।”

এদিকে শকুনি গভীর রাতে নিজের অফিসে বসে একটা পুরনো চিঠি খুলে দেখছিল—তার বোনের লেখা।

একটি সরকার বিরোধী প্রতিবাদে মিথ্যা মামলায় তার বোন মারা গিয়েছিল। তখনই সে বুঝেছিল—সত্যকে জিততে হলে আবেগ নয়, কৌশল দরকার। এবং মিডিয়া সেই কৌশলের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।

“ওরা এখনো ভাবে আমি নায়ক বা খলনায়ক,” সে ফিসফিস করে বলল, “কিন্তু আমি কেবল এক স্টোরিটেলার—যে আলোর নিচে অন্ধকার রচনা করে।”

তারপর সে টেবিলের ওপর কৃষ-মেঘনার ভিডিওর চিত্রনাট্য খুলে ফেলল।

“পরবর্তী চ্যালেঞ্জ প্রস্তুত।” সে বলল কর্ণকে।

“তাদের চেনা একজনকে কিনে নাও। যখন ভেতরের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে, তখন যুদ্ধ জেতা সহজ হয়।”

পর্ব ৫: বিশ্বাসঘাতকের গল্প

ইন্দ্রপুর শহর যতই জেগে থাকুক আলোতে, প্রতিটি চক্রের গভীরে লুকিয়ে থাকে একজন বিশ্বাসঘাতক। সেই কেউ, যে মুখে বন্ধুত্ব রাখে, কিন্তু মনে রাখে হিসেব।

এই পর্বটা ঠিক তেমনই এক গল্প—একজন ‘আমাদের লোক’, যে কিনা ছিল সবচেয়ে গভীরে, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, অথচ তার ছায়াতেই ফুটে উঠেছিল বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে সফল চক্রান্ত।

Karna Kapoor—একসময় কৃষ মালভিয়ার অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী। একসাথে পড়া, ছাত্রাবস্থায় প্রতিবাদে কাঁধে কাঁধ, পরবর্তীতে সাংবাদিকতার পেশাতেও দুজনেই ছিল সমান্তরাল।

কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই কর্ণ চলে গিয়েছিল কর্পোরেট মিডিয়ার দিকে, বলেছিল—“সিস্টেমের বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কিছু বদলানো যায় না, কৃষ। ভিতর থেকে বদল আনতে হয়।”

আজ সে Darpan Basu-র মিডিয়া টিমের মুখ। এবং শকুনি সেনের পরামর্শে থাকা এক ‘মিডিয়া যোদ্ধা’।

Meghna একদিন প্রশ্ন করেছিল কৃষকে, “তুমি কর্ণের ওপর এখনো ভরসা রাখো?”

কৃষ বলেছিল, “আমাদের অতীতে যা ছিল, তা এখনও আমাকে আশা দেয়।”

Meghna হেসেছিল। “আশা দুর্বলতা তৈরি করে, কৃষ। এখন আমরা এমন খেলায় আছি যেখানে পেছন ফিরে তাকানো মানেই পরাজয়।”

ঠিক সেই মুহূর্তে, কর্ণ একটা অফার নিয়ে হাজির হল কৃষের কাছে।

“দেখো, আমি বাইরে থেকেও তোমাদের জন্য একটা ‘ইন্ডিপেনডেন্ট স্পেস’ তৈরি করতে পারি। আমি Darpan-কে রাজি করাতে পারি যাতে একটা বিতর্কমুক্ত স্পেস তৈরি হয়, যেখানে সত্য প্রকাশ পাবে। একটা ‘রেগুলেটেড রিফর্ম’।”

কৃষের চোখে বিস্ময়।

“তুমি কি বলছো? শকুনির সঙ্গে থেকে এখন তুমি আমাদের জন্য জায়গা তৈরি করবে?”

কর্ণ বলল, “শকুনি ততটাও একমুখী নয়। ও বিশ্বাস করে, ন্যারেটিভ মানে শুধু একপাক্ষিক গল্প না—বরং এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ থাকবে, কিন্তু চেহারাটা নিরপেক্ষ দেখাবে।”

Meghna শোনার পর রেগে গেল। “ও তোমাকে কিনে নিয়েছে, কর্ণ। তুমি এখনো বুঝছো না—এটা যুদ্ধ, এবং তুমি বিপক্ষ শিবিরে। এই ‘রিফর্ম’-এর মুখোশেই তো ওরা আমাদের বিশ্বাস নষ্ট করতে চায়!”

কৃষ দ্বিধায় পড়ে গেল।

সেই রাতেই কৃষ আর Meghna নিজেদের প্ল্যানের কথা জানতে চাওয়া একটা মেইল ফাঁস হয়ে যায় মিডিয়ায়।

কিছু প্যারা টুইস্ট করে এমনভাবে দেখানো হয় যেন তারা ‘একটি রাজনৈতিক পক্ষের কাছ থেকে ফান্ড নিতে চেয়েছিল’। যদিও পুরোটাই মিথ্যা।

Naksh ও Sahu তদন্ত করে জানায়—মেইল ফাঁস করেছে একজন ইন্টারনাল সোর্স। শুধু তাই নয়, সে বেশ কিছু Draft Docs-ও বাইরে পাঠিয়েছে।

“তোমাদের মধ্যে কেউ একজন… বিশ্বাসঘাতক,” Naksh বলল।

কৃষ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

“তুমি কি বলছো… কর্ণ?”

Sahu বলল, “লজিকাল ডিডাকশন সেই দিকেই যাচ্ছে। ওর পাসওয়ার্ড অ্যাক্সেস ছিল। আর Leak-এর Timestamp ওর অফিসে প্রবেশের সময়ের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।”

Meghna ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“আমি তো বলেছিলাম কৃষ—বিশ্বাস আশা তৈরি করে, আর আশা হল দুর্বলতা। কর্ণ শুধু একজন বিশ্বাসঘাতক নয়, ও হচ্ছে শকুনির প্রথম সফল ‘রূপান্তর’—যে বন্ধু ছিল, এখন প্রতিপক্ষ।”

কর্ণ অবশ্য তখন নিজেই বলছিল এক পডকাস্টে—

“আমি শুধু সত্যের ব্যালান্স খুঁজে নিচ্ছি। ওদের আন্দোলনে অনেক ইমোশন আছে, কিন্তু বাস্তবতা নেই। আমি চাই মিডিয়া নিরপেক্ষ হোক—না কৃষপন্থী, না দর্পণপন্থী।”

এই ‘নিরপেক্ষতা’র জালে পা দিচ্ছিল কিছু সাধারণ মানুষ।

শকুনি সেন জানত, কোনো যুদ্ধই শুধু লাঠিতে জেতা যায় না। যুদ্ধ জেতে বিশ্বাস ভেঙে—ভিতরের মানুষগুলোকে টেনে এনে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।

সে Gandharva Agency-র ফ্লোরে হাঁটতে হাঁটতে বলল কর্ণকে ফোনে,

“তুমি শুধু বিশ্বাস ভেঙেছো না কর্ণ, তুমি একটা বিশ্বাসঘাতকতা নির্মাণ করেছো—যেটা জনগণের চোখে বিশ্বাসযোগ্য।

এটাই আসল গল্প। এবং এই পর্বের নাম হবে ‘বিচ্ছেদের পাঁচালি’। ভালো করেছো।”

কৃষ একবার কর্ণকে মেসেজ করতে চাইল।

লিখল: “তুমি যদি সত্যিই কিছু বদলাতে চাও, তবে এবার অন্তত আমাদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ থেকো।”

তারপর মেসেজটা মুছে দিল।

কারণ এখন আর সময় নেই অনুতাপের। এখন প্রতিটি মুহূর্তই আগুন।

Meghna বলল, “তুমি তো কর্ণকে চেনো, ভালোবাসোও হয়ত… কিন্তু যুদ্ধের মাটিতে পুরনো সম্পর্ক মানে শুধুই ফাঁদ।”

কৃষ চুপ করে মাথা নুইয়ে ফেলল।

“হয়ত একদিন, কর্ণ আবার ফিরে আসবে। কিন্তু সেই কর্ণ আর আমাদের কর্ণ থাকবে না। ইতিহাসে সব ‘কর্ণ’-ই দুঃখের চরিত্র হয়ে থাকে।”

সেই রাতেই, কৃষ নতুন ভিডিও পোস্ট করল:

“বিশ্বাসঘাতকের গল্প: যেভাবে বন্ধুতা আজ অস্ত্র হয়ে উঠছে”

ভিডিওটি পোস্ট হতেই হাজারো শেয়ার, হাজারো মন্তব্য, আরেকটা বিতর্ক। এবং আলোর নিচে আবার গাঢ় হয়ে উঠল অন্ধকার।

পর্ব ৬: জনতার কুরুক্ষেত্র

ইন্দ্রপুর শহর ঠিক তখনই গর্জে উঠেছিল যখন মিডিয়া আর সিস্টেম—দুই পক্ষকেই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করেছিল সাধারণ মানুষ। আর এটাই ছিল কৃষ মালভিয়া ও মেঘনা সেনের সবচেয়ে বড় জয়। কয়েক মাস ধরে তারা যা বানিয়েছিল—”মিডিয়ার পাঁচালি”, “বিশ্বাসঘাতকের গল্প”, এবং অসংখ্য নথিভিত্তিক প্রতিবেদন—সবকিছু এক হয়ে এখন একটা স্পষ্ট বিকল্পের জন্ম দিয়েছে।

একটা নতুন প্ল্যাটফর্ম: “জনতার কুরুক্ষেত্র”। এই প্ল্যাটফর্মে প্রত্যেকটি নাগরিক সংবাদ পাঠাতে পারে, ভিডিও দিতে পারে, পোস্ট করতে পারে—আরেকটি বিকল্প বাস্তবতা তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল দেশ।

কৃষ বলেছিল, “এটা কোনো সংবাদপত্র না, এটা একটা যুদ্ধের ক্ষেত্র—যেখানে প্রতিটি মানুষ যোদ্ধা।”

এই প্ল্যাটফর্ম রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে। শহরের অলিগলি, ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, ছোট শহরের কলেজ—সব জায়গায় কৃষ ও মেঘনার নাম এখন বিশ্বাসযোগ্যতার সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

Gandharva Agency-তে তখন আলো নিভে এলেও উত্তেজনা তুঙ্গে।

শকুনি সেন জানত, যুদ্ধ মাঠে গড়িয়ে পড়েছে। আগে যা মিডিয়ার স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা পৌঁছে গেছে জনতার হাতে।

“তুমি তো প্ল্যান করেছিলে—ন্যারেটিভ কন্ট্রোল থাকবে তোমার হাতে,” কর্ণ বলল শকুনিকে। শকুনি হালকা হেসে বলল, “Narrative কখনো Control করা যায় না কর্ণ, সেটাকে Influence করতে হয়। এখন সেই Influnence কৃষের দিকে সরে যাচ্ছে—এটাই আমাদের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।”

শকুনি এরপর তার পুরনো কৌশলে ফিরল। সে জানত, পজিটিভ ক্যাম্পেইন দিয়ে জনতার মন জয় করা যায় না—তাদের ভিতরে সন্দেহ তৈরি করলেই তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

সে এবার সিদ্ধান্ত নিল—জনতার কুরুক্ষেত্র-এর আস্থা ভেঙে ফেলবে ভিতর থেকে। Meghna ঠিক তখনই এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করলো

একজন অজানা ব্লগার প্রতিদিন জনতার কুরুক্ষেত্র-এর বিরুদ্ধে লিখছে। দাবি করছে—প্ল্যাটফর্মে পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন আসে, ফ্যাক্টচেক ভুল হয়, কৃষ রাজনৈতিক এজেন্ডা ছড়াচ্ছে।

এই ব্লগ হঠাৎই প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি চ্যানেল সেই লেখা নিয়েও প্যানেল সাজাতে শুরু করে।

Meghna সন্দেহ করল—এ নিশ্চয়ই আরেকটা শকুনি-চাল। Naksh ও Sahu আবার তদন্তে নামে। তারা আবিষ্কার করে, সেই ব্লগারের IP সরাসরি Gandharva Agency থেকে চালিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্লগে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তার অনেকটাই প্ল্যাটফর্মের ভেতরের কনফিডেনশিয়াল ডেটা।

“মানে আমাদের মধ্যে আবার বিশ্বাসঘাতক?” কৃষ জিজ্ঞেস করে।

“এটা আরেকটা চাল, কৃষ। এবার শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য নয়, তোমাকে জনতার সামনে সন্দেহজনক করে তোলার জন্য। যুদ্ধ এখন আর শুধু তথ্যের নয়—এটা বিশ্বাসের উপর যুদ্ধ।”

এই পর্যায়ে কৃষ আর Meghna একটা নতুন সিদ্ধান্ত নেয়।

তারা একটি Open Townhall আয়োজন করে—জনসাধারণের সামনে, লাইভ স্ট্রিমিংয়ে, যেখানে সবাই সরাসরি প্রশ্ন করতে পারবে, এবং তারা উত্তর দেবে।

কোনো ফিল্টার ছাড়া, কোনো Teleprompter ছাড়া।

শকুনি হাসল এটা দেখে।

“ওরা ভেবেছে, Public Dialogue-এ ওরা টিকে যাবে? জনগণ জানে না কী চায়। তাদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি, তা-ই আমার মাটি।”

কিন্তু সেই টাউনহল ছিল অন্যরকম।

সেই টাউনহলে এক কৃষক প্রশ্ন করেছিল—“আপনারা যদি সত্যিই আমাদের কথা বলেন, তবে কেন গ্রামের ইস্যু বড় শহরের মিডিয়ায় আসে না?”

এক ছাত্রী বলেছিল—“আপনারা যা করছেন, তার ভবিষ্যৎ কি শুধু অনলাইনেই সীমিত থাকবে?”

প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর কৃষ ও Meghna খোলাখুলি দিল। তারা বলল, “আমরা ভুল করলেও, আমরা সেটা স্বীকার করব। কারণ এই প্ল্যাটফর্ম কোনো নিখুঁত শক্তি নয়, এটা জনতার নির্মিত এক চলমান গল্প।”

সেই টাউনহল শেষ হওয়ার পরে হ্যাশট্যাগ উঠল—#KrishMeghnaKiSarkar

কিছু মানুষ বলতে লাগল—তারা নির্বাচনে দাঁড়াক।

তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা রাজনীতির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে গেছে।

Gandharva Agency-তে এবার একটা জরুরি মিটিং ডাকলেন শকুনি।

তার চোখের কোণে প্রথমবার একটা টেনশন।

“ওরা মিডিয়ার গল্প থেকে উঠে এসে এখন রাজনৈতিক স্তরে পৌঁছাতে চাইছে। এবার আমাদের খেলাও বদলাতে হবে,” সে বলল কর্ণকে।

“তুমি ওদের মধ্যে ভাঙন আনো। কৃষ আর Meghna—এই জুটিকে ভাঙা না গেলে ওদের থামানো যাবে না।”

ঠিক তখনই কৃষ ও Meghna-র মধ্যে শুরু হয় ছোট্ট একটা মতানৈক্য।

কৃষ চান ‘জনতার কুরুক্ষেত্র’ এখন রাজনীতির বাইরে থাকুক, Meghna চায় এই শক্তিকে বাস্তব পরিবর্তনের কাজে লাগাতে।

সেই ফাঁকেই শকুনি নিজের সবচেয়ে নীরব অস্ত্র ব্যবহার করে—সংশয়।

একজন সংবাদকর্মীকে টাকা দিয়ে বলা হয়—Meghna নাকি গোপনে এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিটিং করছেন। সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া হয় একটি ঝাপসা ছবি, যেখানে দেখা যাচ্ছে Meghna একজন পরিচিত রাজনৈতিক মুখের সঙ্গে চায়ের টেবিলে।

ছবিটা ভাইরাল হয়।

কৃষ চুপ থাকে, কিছু না বলে।

Meghna বলে, “তুমি কি সন্দেহ করছো আমাকে?”

কৃষ কিছু বলে না। শুধু চোখ সরিয়ে নেয়।

এটাই ছিল শকুনির উদ্দেশ্য।

“যুদ্ধটা এখন ওদের পাথরে পাথর মারার,” শকুনি বলল নিজেকে, “যেখানে আঘাত না লাগলেও শব্দে ফাটল ধরবে।”

ইন্দ্রপুর শহরের বাতাসে আবার নতুন উত্তেজনা।

সত্যের জন্য যারা দাঁড়িয়েছিল, তাদের মধ্যে

এবার সন্দেহের বাতাস।

আর এই সন্দেহের ঘূর্ণিতে চারপাশের আলো ঝাপসা হয়ে আসে।

পর্ব ৭: ফাটলের শব্দ

সন্দেহ শব্দ করে ফাটে না, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে নিঃশব্দে। ঠিক যেমন ইন্দ্রপুরের আকাশ আজ খুব শান্ত, কিন্তু শহরের মনের ভেতরে এক চাপা বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গেছে।

এটা সেই ফাটলের শব্দ—যেখানে বিশ্বাস আর সংশয় মুখোমুখি দাঁড়ায়।

কৃষ মালভিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাচ্ছিল। এক সপ্তাহ আগে যে মানুষটা পুরো দেশের বিশ্বাস কুড়োচ্ছিল, আজ তার চেহারায় ক্লান্তি, চোখে ধোঁয়াশা।

তার ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রিন্টেড রিপোর্ট, কিছু এলোমেলো নোট, আর একটা ছবি—যেটা এইসব সন্দেহের সূত্রপাত।

ছবিটা ছিল মেঘনা সেনের, যেখানে সে বসে ছিল এক পরিচিত রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে।

ঝাপসা, কাঁচা, কিন্তু যথেষ্ট বিষ ছড়ানোর জন্য।

এই ছবি ঘিরেই হ্যাশট্যাগ শুরু হয়েছিল—#MeghnaBetrayed

Meghna প্রথমে এটাকে পাত্তা দেয়নি। বলেছিল, “আমার মতামত স্পষ্ট, আমি কারো হয়ে কাজ করি না।”

কিন্তু কৃষের চোখে একটা চুপচাপ প্রশ্ন জমে উঠেছিল—“তবে তুমি ওই মিটিং-এ কেন গেলে?”

Meghna বলেছিল, “আমি গিয়েছিলাম জানতে—ওরা কীভাবে আমাদের প্ল্যাটফর্মকে প্রভাবিত করতে চায়। সরাসরি না দেখলে বোঝা যায় না।”

কৃষ বিশ্বাস করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার ভিতরে কোথাও একটা শব্দ ফাটছিল—সন্দেহের শব্দ, একেবারে নিঃশব্দ অথচ গভীর।

Gandharva Agency-তে শকুনি তখন এক কাঁচা হুইস্কির গ্লাস হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।

“ওরা ভাঙছে, কর্ণ,” সে বলল, “তুমি ফাটলের শুরুটা করে দিয়েছো। এবার আমাদের কাজ—ফাটলটাকে ভাঙনে রূপ দিতে হবে।” কর্ণ মাথা নাড়ল। “তবে একটা সমস্যা হচ্ছে, শকুনি। লোকজন এখন আগের মতো গিলছে না। তারা প্রশ্ন করছে।”

শকুনি হাসল। “সেটাই তো পরিকল্পনা। প্রশ্ন করাতে হবে, উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত করে তুলতে হবে, এবং সেই ক্লান্তি থেকেই আসবে ‘নির্বাচনের অনিচ্ছা’।

জেনে রেখো কর্ণ, সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু হল ক্লান্তি।”

অন্যদিকে Naksh আর Sahu নেমে পড়েছে প্রমাণ জোগাড় করতে—ছবির মেটাডেটা, সোর্স, AI স্ক্যান।

তারা খুঁজে পেয়েছে ছবিটি AI-modified—মেঘনার চেহারা বসানো হয়েছে অন্য একজন মহিলার ছবিতে, এবং লোকেশনটাই ছিল ভুয়া।

Meghna কৃষকে প্রিন্টআউটটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই দেখো, সত্যি কথা বলছিলাম।” কৃষ নিরবে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “তোমাকে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি জানতাম না আমি নিজেই কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছি। একটা ছবি, একটা গল্প—আমার বিশ্বাস নড়িয়ে দিতে পারল। হয়ত আমি তোমার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্য ছিলাম না।”

Meghna বলল, “কোনো যুদ্ধেই সব সৈনিক ঠিক থাকে না, কৃষ। কেউ কেউ থেমে পড়ে, কেউ কেউ আবার দাঁড়ায়। আমি চাই তুমি আবার দাঁড়াও।”

কিন্তু এখনকার সময় দাঁড়ানো মানেই প্রতিরোধ নয়—সত্য তুলে ধরা একটা রাজনৈতিক কাজ হয়ে উঠেছে।

তারা ঠিক করল, এই ষড়যন্ত্র ও ডিজিটাল মিথ্যের পেছনের সত্য নিয়ে একটি নতুন ভিডিও বানাবে—“ফেক ফ্রেম: প্রোপাগান্ডার মুখোশ”।

ভিডিওতে তারা দেখাল—কিভাবে AI দিয়ে ছবির রদবদল করা যায়, কিভাবে শত্রুপক্ষ একাধিক ‘বট অ্যাকাউন্ট’ তৈরি করে সামাজিক বিভ্রান্তি ছড়ায়, কিভাবে সাংবাদিকতা নামক শব্দটি আজকাল শুধু যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

ভিডিও পোস্ট হতেই ঝড় ওঠে #StandWithMeghna ট্রেন্ড করে, এবং বহু সংবাদ সংস্থা নিজেদের ফ্যাক্টচেক রিপোর্টে ছবিটি ভুয়া ঘোষণা করে।

Gandharva Agency-তে এবার উত্তেজনা।

কর্ণ বলল, “তুমি বলেছিলে ফাটল ধরালেই ওরা ভেঙে পড়বে। কিন্তু এখন তো তারা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।”

শকুনি একটু থেমে বলল, “তাদের সম্পর্ক বেঁচে গেছে, কিন্তু ক্লান্তি এখনও থেকে গেছে। পরবর্তী ধাক্কাটা আসবে এখনই—একটা ঘটনা, যা শুধু তাদের না, গোটা প্ল্যাটফর্মকেই ধাক্কা দেবে।”

সেই রাতেই জনতার কুরুক্ষেত্র সার্ভারে হ্যাক হয়। সব ভিডিও মুছে ফেলা হয় না, কিন্তু হোমপেজে ভেসে ওঠে এক বার্তা—

“এই প্ল্যাটফর্ম স্বাধীন নয়, এটি পরিচালিত একটি এজেন্ডা। সতর্ক থাকুন।”

Naksh ছুটে এসে কৃষকে জানায়—

“এই হ্যাক কোনও অ্যামেচার হ্যাকার করেনি। এরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গ্রেড-এ হ্যাকার।”

Sahu যোগ করে, “এই হ্যাক মানে শুধু ডিজিটাল আক্রমণ নয়, এটা মনোবলের ওপর আঘাত।”

Meghna চুপ করে বসে ছিল। তারপর বলল, “আমরা এবার আর প্রতিক্রিয়া দেব না।

আমরা এবার কাজ করব। ভিডিও বানাব, রিপোর্ট করব, কথা বলব—যেমন আগেও করতাম। বিশ্বাস হারায় না—কাজে ফিরলে সে আবার ফিরে আসে।”

কৃষ তাকে একবার দেখল। এই অন্ধকারে, ফাটলের শব্দে, বিভ্রান্তির রাজ্যে, এই একমাত্র মানুষ যে এখনও স্থির।

সে জানল—শকুনির খেলায় তারা ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু শেষ হয়নি।এই কুরুক্ষেত্র এখন আর কেবল জনতার নয়, এখন এটি তাদের নিজেদের ভেতরের যুদ্ধ।

পর্ব ৮: শেষ চালে শকুনি

ইন্দ্রপুরের আকাশে ভোর ফোটে, কিন্তু আজকের ভোরটা অন্যরকম। আজ এই শহর বুঝতে পারছে—কেউ একজন একের পর এক দগদগে ষড়যন্ত্র রচনা করেছে, কেউ একজন সব প্রশ্নের আগেই উত্তর লিখে রেখেছে, কেউ একজন নেপথ্যে থেকে গোটা একটা যুগ পরিচালনা করেছে।

সে কেউ একজন—শকুনি সেন।

Gandharva Agency-তে শকুনি আজ একা। কর্ণ নেই, মিটিং নেই, বিশ্লেষক নেই।

শুধু একটা কাঁচের বোতল, একটা পুরনো টাইপ রাইটার, আর তার সামনে রাখা কৃষ ও মেঘনার প্রিন্টেড ছবি।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“সব কিছু শেষ হয়ে গেছে,” সে বলল নিজেকে, “না, আসলে… এখন শুরু।”

শেষ চাল দেয়ার আগে শকুনি লিখছিল নিজের শেষ স্ক্রিপ্ট। এটা কোনো প্ল্যান না, কোনো ব্যাকআপ না। এটা ইতিহাসের জন্য লেখা একটা গল্প—যা হয়ত কোনোদিন কেউ প্রকাশ করবে না, কিন্তু তার নিজের কাছে সেটা সম্পূর্ণ হবে।

এই স্ক্রিপ্টে সে লিখল—

“আমি কেবল ছায়া তৈরি করিনি, আমি আলোকে নির্দেশ দিয়েছি কোথায় পড়বে।

আমি পুতুল নাচাইনি, পুতুলদের ভাবতে দিয়েছি তারা নিজেরাই চলেছে।

আমি শত্রু তৈরি করিনি, আমি বন্ধুত্বে ফাটল ফেলেছি।

আমি সত্য বিকৃত করিনি, সত্যকে করে তুলেছি সন্দেহজনক।”

অন্যদিকে কৃষ মালভিয়া আর মেঘনা সেন জানত—আজ কিছু একটা হবে।

তাদের টিমের তরফে গোয়েন্দা সতর্কতা এসেছে—Gandharva Agency’র সমস্ত সার্ভার ডিলিট করা হচ্ছে। শকুনি সব মুছে দিচ্ছে।

“এটা শেষ চাল,” বলল Naksh। “শকুনি জানে আর পালানোর জায়গা নেই। এখন সে ইতিহাস থেকে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলবে।”

কৃষ বলল, “কিন্তু সে জানে না, আমরা তাকে ইতিহাস থেকে মুছে যেতে দেব না।”

তারা এক প্রাক্তন মিডিয়া কর্মীর সাহায্যে শকুনির লেখা কিছু ই-মেইল, অভ্যন্তরীণ কনভারসেশন, এবং ভিডিও ক্লিপ পায়—যেখানে সে নিজেই বলছে কিভাবে বিতর্ক তৈরির আগেই তার নাটক লেখা হয়, কিভাবে মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে হেডলাইন তৈরি হয়।

এই সব প্রমাণ কৃষ ও মেঘনা “People vs Propaganda” নামে এক ফাইনাল ডকুমেন্টারিতে প্রকাশ করে।

তার নাম—শেষ চালে শকুনি।

এই ভিডিওটি ভাইরাল হয়।

দেশজুড়ে জনতা বুঝতে পারে, তারা যাদের সত্য ভেবে বিশ্বাস করেছিল, তাদের অধিকাংশই ছিল সাজানো।

এবং সেই মুহূর্তে শকুনি নিজে Gandharva Agency থেকে বেরিয়ে একটা পুরনো লাইব্রেরির দোতলায় চলে যায়—যেখানে তার বোনের নামে একটা চুপচাপ কোণ আছে।

সে সেখানে গিয়ে বসে, কাঁচের চশমাটা খুলে একবার নিজের প্রতিফলনের দিকে তাকায়।

তার চোখে ক্লান্তি নেই, আফসোস নেই—শুধু গভীর এক শূন্যতা।

“তারা জিতেছে,” সে ফিসফিস করে। “কিন্তু কিসে জিতেছে জানো?

যে গল্পটা আমি বানিয়েছিলাম, সেটার বিরুদ্ধেই ওরা যুদ্ধ করেছে।

মানে আমিই তাদের অস্তিত্বের কারণ।

তাদের প্রতিবাদ, তাদের আলো, তাদের বিজয়—সব কিছুর পেছনেই আমি আছি।

শেষ চালটা আমিই দিলাম, কারণ আমার হারটাই তাদের জয়।”

এক অজানা চ্যানেলে, এক সপ্তাহ পর, একটি শেষ ভিডিও পোস্ট হয়—

এক অন্ধকার ঘরে বসে শকুনি সেন বলছে:

“তোমরা আমায় খলনায়ক ভাবলে, ঠিক আছে।

কিন্তু জানো তো, প্রতিটি মহাকাব্যের প্রয়োজন হয় একজন শকুনির।

কারণ যুদ্ধ শুরু হয় তখনই, যখন কেউ প্রশ্ন তোলে—কেন শুধু এক পক্ষ ন্যায়বান?”

ভিডিওটি মিনিট তিনেক।

এরপর আর কেউ শকুনিকে খুঁজে পায় না। Gandharva Agency বন্ধ, সমস্ত ডেটা উধাও।

কৃষ ও মেঘনা প্ল্যাটফর্ম চালিয়ে যায়, সত্যের পক্ষে কাজ করে।তবে মাঝে মাঝে কৃষ রাতে নিজের ডেস্কে বসে ভাবে—“আমরা কি জিতেছি? না কি আমরা শুধু গল্পটার পরবর্তী অংশ লিখছি?”

Meghna একদিন বলে, “হয়ত সত্যের কোনো পরিণতি নেই, কৃষ। শুধু লড়াই আছে। আর শকুনিরা বারবার ফিরে আসে—নতুন মুখে, নতুন ছায়ায়।”

কৃষ চুপ করে। তার ডেস্কের এক কোণে পড়ে থাকে একটা ছেঁড়া পোস্টার—“যেখানে আলো পড়ে না, সেখানেই গল্প তৈরি হয়।”

শেষ

Lipighor_1749808360720.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *