স্মিতা সেন
বিকেলটা ঘন বর্ষায় ভিজে গিয়েছিল যেন আঁধারের রঙে। দিগন্তজোড়া নীলচে মেঘে ঢেকে থাকা আকাশের তলায়, ঈশান তার হাতের ব্যাগটা টেনে তুলল ট্যাক্সি থেকে নামার সময়। সেই পুরনো বাংলো, যার ছাদে কচুরিপানার পাতার মত শ্যাওলা জমেছে, তার দালানে দাঁড়িয়েই সে প্রথম রূপসীকে দেখেছিল।
সে এক অপূর্ব মুহূর্ত। যেন কেউ জলরঙে এঁকে দিয়েছে। মাটি ছোঁয়া শাড়ির প্রান্তটা কাঁধ থেকে খানিকটা পিছলে পড়েছে, ভেজা কেশরাশি কপাল ছুঁয়ে ঝুলছে, আর চোখে সেই চিরচেনা বিষণ্ণতা, যেটা শুধু একাকিত্বের গায়ে জন্মায়।
ঈশান চোখ সরাতে পারছিল না। শিল্পী মাত্রেই সৌন্দর্যে হারিয়ে যায়, কিন্তু এই সৌন্দর্যটা যেন ক্যানভাসের বাইরের কিছু—নাড়ি ছোঁয়া, নিঃশ্বাসের মতো বাস্তব।
“আপনি নিশ্চয়ই নতুন এসেছেন এখানে?”—রূপসীর গলা ছিল নরম, মেঘলা বিকেলের মত ধীর, কিন্তু তাতে ছিল এক অদ্ভুত টান।
“হ্যাঁ। শহরের কোলাহল ছেড়ে এসেছি একটু শান্তির খোঁজে,” ঈশান জবাব দিল।
“এই শান্তি কিন্তু অনেক কিছু নিয়ে আসে, আবার অনেক কিছু কেড়েও নেয়,”—রূপসী হালকা হাসলেন।
তাদের আলাপটা সেদিন সেখানেই থেমেছিল। কিন্তু চোখে চোখে যে ভাষা আদানপ্রদান হয়েছিল, তা লেখা হয় না—অনুভব করা যায়। সেই রাতে বাংলোর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ঈশান দেখেছিল, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, আর মনে পড়ছে রূপসীর চোখের ভাষা। যেন সে কিছু বলতে চেয়েও থেমে গিয়েছিল।
পরদিন সকালে হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ে। ঈশান দরজা খুলে দেখে রূপসী দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে একটি বই।
“আপনি তো বই পড়েন বললেন, এটা আমার খুব প্রিয়—রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’।”
ঈশান বইটা নিল, কিন্তু তার হাত ছুঁয়ে গেল রূপসীর আঙুলে। এক মুহূর্তে বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরজুড়ে। তারা দুজনেই থমকে গিয়েছিল। সেই ছোঁয়া ছিল অগভীর, অথচ অগাধ।
সেই দিন থেকে ঈশানের দিনগুলো আর আগের মত রইল না। প্রতিদিন রূপসী আসতেন—কখনও চা নিয়ে, কখনও কোনও বই, কখনও কেবল গল্প বলতে। আর প্রতিদিন ঈশান নতুন করে তাকে আবিষ্কার করত—তার হাঁটার ছন্দে, কথার ঝর্ণায়, হাসির নিঃশব্দতায়।
একদিন রূপসী বলল, “আপনার তো ছবি আঁকার খুব শখ। আমাকে এঁকেছেন কখনও?”
ঈশান একটু থেমে বলল, “আমি প্রতিদিন আপনাকে এঁকেছি। আমার চোখে, মনে, নিঃশ্বাসে। কিন্তু কাগজে আনি নি, কারণ আপনি তো সম্পূর্ণ হন না। আপনি পাল্টে যান আলো-ছায়ায়, বৃষ্টিতে, নিঃশব্দে।”
রূপসী কিছু বললেন না, শুধু তাকালেন। সেই চোখে আবারও সেই প্রশ্ন—যার উত্তর ঈশান জানে না, কেবল অনুভব করতে পারে।
এক রাতে, খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। ঈশান ক্যান্ডেলের আলোয় নিজের স্কেচবুকে কিছু আঁকছিল। হঠাৎ জানালায় শব্দ। পর্দা সরিয়ে দেখে রূপসী দাঁড়িয়ে, পুরো ভিজে। শাড়িটা শরীরের সঙ্গে লেগে আছে, চোখে জল না বৃষ্টির ফোঁটা বোঝা যাচ্ছে না।
ঈশান দরজা খুলে দিল। কোনও কথা নয়, কেবল চোখে চোখ। রূপসী ঢুকে এল ভিতরে। বাতাসে শুধু বৃষ্টির গন্ধ নয়, ছিল এক ধরনের অস্থিরতা।
“তুমি তো বলেছিলে, আমায় আঁকো। আজ আঁকো না?”—রূপসীর গলা কাঁপছিল।
ঈশান জবাব দিল না, শুধু তার দিকে এগিয়ে গেল। তাদের মাঝে এখন আর কোনও শব্দ ছিল না—শুধু নিঃশ্বাসের সুর।
রূপসী ধীরে ধীরে বসে পড়ল টেবিলের পাশে রাখা কাঠের চেয়ারে। তার চোখে কোনও সংকোচ নেই, কেবল এক গভীর আত্মসমর্পণ। ঈশান তুলির ডগায় রঙ মেখে তার চোখ থেকে শুরু করল—চোখের চারপাশের জলের রেখা, গালের কোণ, গলার বাঁক, কাঁধের জলে ভেজা আভা। ধীরে ধীরে রূপসীর নিঃস্তব্ধ শরীর ক্যানভাসে বেঁধে যেতে লাগল।
কিন্তু তুলি থেমে গেল হঠাৎ। রূপসী উঠে দাঁড়াল, এক পা এগিয়ে এল ঈশানের দিকে। সে বলল না কিছু, শুধু হাত বাড়িয়ে ঈশানের মুখ ছুঁয়ে দিল। সেই স্পর্শে যেন হাজার বছরের তৃষ্ণা মিশে ছিল। ঈশানের বুক ধকধক করছিল। রূপসী তার ঠোঁটের কাছাকাছি এল—অতি ধীরে, যেন সময় থেমে গেছে।
সেই মুহূর্তে বাইরে বজ্রপাত হল। ভেতরে শুরু হল বৃষ্টির থেকেও গাঢ় কিছু—দেহ ও আত্মার মিলন। শাড়ির খসে পড়া, ত্বকের ঘামের গন্ধ, ঠোঁটে জলের মতো নরম চুম্বন, আর তার মাঝে এক নিঃশব্দ দীর্ঘ শ্বাস।
রাত কেটে যায় ধীরে ধীরে, কিন্তু সেই রাত যেন সময়ের বাঁধ ভেঙে যায়। ঈশানের কাঁধে মাথা রেখে রূপসী নিঃশব্দে শুয়ে থাকে। বাতাসে কেবল ভেজা কচুর পাতার গন্ধ, শরীরে ছড়িয়ে পড়ে থাকা চুলের ঘ্রাণ, এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গীত। ঈশান তার আঙুলে আলতোভাবে রূপসীর পিঠে আঁকছিল অদৃশ্য রেখা, যেন কোনও শব্দহীন কবিতা। রূপসী চোখ বন্ধ করে রেখেছে, কিন্তু শরীরের প্রতিটি স্নায়ু তার সে অদৃশ্য লেখার সুরে জেগে আছে।
“তুমি জানো, আমি কোনওদিন কাউকে এতটা বিশ্বাস করিনি,”—রূপসীর গলা ফিসফিস করে উঠল।
“বিশ্বাস না করেও তুমি নিজেকে তুলে দিয়েছো আমার হাতে?”
“হয়তো বিশ্বাস করার জন্যই… নিজেকে একবার হারাতে হয়।”
ঈশান কিছু বলল না। তার ঠোঁট রূপসীর কপালে গিয়ে থেমে গেল। সে বুঝতে পারছিল, এই নারী শুধু শরীর নয়, শরীরের মধ্যেই গোপন এক কাহিনি—যা জলে ভিজে আছে, আগুনে পোড়া, ছায়ায় ঢাকা।
রাতের শেষ প্রহরে হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা টেবিলের ওপর থাকা ডায়েরিটা রূপসীর চোখে পড়ল। সে চুপচাপ উঠে গিয়ে খুলে বসে, নীল কালি দিয়ে লেখা কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়তে শুরু করল।
“তুমি এটা পড়ছো?”—ঈশান কণ্ঠে আশ্চর্য্যের ছোঁয়া।
“এই ডায়েরিতে তুমি আমাকে অনেকবার এঁকেছো… আমার গলা, আমার পিঠ, আমার ঠোঁট—এত গভীর করে দেখেছো কীভাবে?”
ঈশান চুপ। রূপসী এক পৃষ্ঠা ধরে পড়ে—
‘আমি জানি, রূপসীর শরীরের প্রতিটি বাঁক একেকটি অনুচ্চারিত শব্দ। তার মেঘভেজা চুলের ভেতরে ঝড় লুকিয়ে আছে। আমি তাকে ছুঁয়ে যাই না, আমি তাকে অনুভব করি। যেমন কেউ নদীতে নামে না, শুধু তার জলের শব্দে মগ্ন থাকে।’
রূপসীর চোখে জল চলে আসে, কিন্তু সে হাসে। “তুমি তো আমায় আমার চেয়েও বেশি চেনো।”
ঈশান তার দিকে এগিয়ে আসে, চুপচাপ তার ঠোঁটে আবারও স্পর্শ রাখে—কোনও অধিকার নয়, শুধুই উপস্থিতির এক আশ্বাস।
পরদিন সকালবেলা, রূপসী জানালার ধারে দাঁড়িয়ে। গায়ে হালকা একটি নীল শাড়ি, চুল খোলা, চোখে গভীর ভাবনার ছায়া। ঈশান এসে তার কাঁধে হাত রাখতেই সে হঠাৎ প্রশ্ন করে, “তুমি কি ভাবছো, আমাদের এই সম্পর্কটাকে কোন নাম দেওয়া যায়?”
“নাম দিতে গেলে সম্পর্কের পরিসর ছোট হয়ে যায়… আমি চাই না তোমায় কোনও সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলি,”—ঈশানের জবাব যেন এক ধরনের মুক্তি।
“তবে আমায় আঁকো… আবার… পুরো শরীরটা, নগ্ন… কিন্তু শুধু চোখে চোখ রেখে,”—রূপসীর গলা কাঁপে না, বরং তাতে এক আশ্চর্য নির্ভীকতা।
ঈশান বুঝতে পারে, আজকের আঁকাটা হবে ভিন্ন। আজ ক্যানভাস শুধু রঙ নয়, রক্তে, ঘামে, কামনায় ভিজে থাকবে।
ঘরটা বন্ধ করে তারা একে অন্যের দিকে এগিয়ে আসে। রূপসী ধীরে ধীরে শাড়িটা খুলে ফেলেন, আকাশে মেঘ নেমে আসে, বাইরের আলো ম্লান হয়ে আসে। ঈশান তার গায়ে হাত রাখে, কিন্তু তাতে কামনার চেয়ে বেশি থাকে শ্রদ্ধা। তার ত্বক, তার স্তনের কোমলতা, তার নাভির গোল রেখা—সব কিছু যেন জীবনের চিহ্ন হয়ে ওঠে।
রূপসী ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে কাঠের বিছানায়। ঈশান তুলির বদলে এবার নিজের আঙুলে আঁকতে থাকে তাকে—গলার নিচে, বুকের খাঁজে, উরুর ভাঁজে। রূপসী চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ফেলে—প্রথমে ধীরে, তারপর গাঢ় হয়ে ওঠে। তার আঙুল ঈশানের ঘাড়ে চলে আসে, চুলের গোড়ায়, তারপর বুকে, তারপর… সীমানা ভেঙে এক অগ্নিময় ঘূর্ণিতে।
তারা মিলিত হয়, তীব্রতা ও কোমলতার মিশেলে। ঈশান তার নাম ধরে ডাকে, রূপসী কাঁপতে কাঁপতে বলে—“আরও, একটু আরও…” যেন সে এক মোহময় আত্মসমর্পণে বিলীন হয়ে যেতে চায়।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, কেবল শোনা যায় একটানা নিঃশ্বাসের শব্দ, চাদরের খসখসে আওয়াজ, আর তৃপ্তির পর নিঃস্তব্ধতা।
যখন তারা আবার শান্ত, ঈশান বলে, “তুমি তো আমার ছবির বাইরে চলে গেলে, রূপসী। তুমি এখন আমার শরীরের ভিতরে রয়ে গেলে।”
রূপসী চোখ মেলে তাকায়, মৃদু হাসে। “তোমার ভিতরেই তো আমি এতদিন লুকিয়ে ছিলাম। তুমি শুধু দরজাটা খুললে এই বর্ষায়।”
সকালের আলো জানালার ফাঁক গলে পড়ে রূপসীর নগ্ন পিঠে। তার ত্বকে সূর্যের আলো যেন সোনালি তুলির আঁচড়। ঈশান ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকে দেখে, যেন দীর্ঘ ঘুমের শেষে কোনও স্বপ্ন এখনো বাস্তব হয়ে আছে। বিছানার চাদর অল্প উঠে এসে রূপসীর উরু পর্যন্ত পড়ে আছে, স্তন দুটো ধীরে ওঠানামা করছে নিঃশ্বাসের ছন্দে। এই দৃশ্যটা ঈশানের ক্যানভাসেও কখনও আঁকা হয়নি—এটা শুধু তার হৃদয়ে গেঁথে থাকবে।
সে একটু এগিয়ে এসে ঠোঁটে আলতো করে চুমু রাখল রূপসীর ঘাড়ের বাঁকে। রূপসী কেঁপে উঠল না, শুধু মৃদু শব্দে বলল, “তুমি আবার জেগে গেলে?”
“না… আমি তো ঘুমোইনি,”—ঈশান ফিসফিস করে।
“আমিও না,”—রূপসী উত্তর দিল, তার চোখে ক্লান্তি আর তৃপ্তির মিশ্র ছায়া।
ঈশান উঠে গিয়ে একটা পাতলা চাদর টেনে রূপসীর গায়ে জড়িয়ে দেয়। তারপর চা বানাতে যায় রান্নাঘরে। তার মনে পড়ে যায় গত রাতের প্রতিটি মুহূর্ত—তাদের দেহের উষ্ণতা, আঙুলের নরম খোঁচা, আর ঠোঁটের নিষিদ্ধ আরাধনা।
রূপসী ধীরে উঠে বসে। চুলগুলো এলোমেলো, চোখের কোণে ঘুমের রেশ, কিন্তু ঠোঁটে লেগে থাকে এক রহস্যময় মুগ্ধতা। সে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়, বাইরে বৃষ্টির শেষ ছাঁট, পাখির ডাক, আর ভেজা বাতাস। সে শরীরটা সামান্য টেনে চাদরটা আরও আঁটসাঁট করে জড়ায়—কিন্তু ঈশান জানে, এই শরীর তার চেনা হয়ে গেছে, তবুও প্রতিদিন নতুন লাগে।
চা হাতে ঈশান এসে দাঁড়ায়। রূপসী তার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি কি জানো, গত রাতে আমি প্রথমবার কারও সামনে নিজেকে খুলে দিয়েছি… শুধু পোশাক নয়, ভেতরের সব কিছুও…”
“আমি জানি,”—ঈশান মৃদু হাসে, “তুমি খোলার আগে আমার ভিতরেই ছিলে।”
রূপসী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “তবে একটা জিনিস বলিনি আমি।”
“কি?”
“এই গ্রামে আমি এসেছি বছর তিনেক আগে। তখন আমার এক পুরনো সম্পর্ক শেষ হয়েছে। সে আমাকে শুধু দেহে খুঁজত, মনে নয়। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম, ছায়া হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই এই গ্রামের নির্জনতায় আমি আবার নিজেকে খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম।”
“এবং?”—ঈশান তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
“তুমি এসে আবার আমাকে আমাতে ফিরিয়ে দিলে। তোমার চোখে আমি ছিলাম রঙ, আলো, ধ্বনি, অনুভব। এতদিন আমি শুধু দেহের জায়গায় দেহ দিয়েছি, কিন্তু তুমি তো আমায় পূর্ণভাবে ছুঁয়েছো।”
ঈশান ধীরে তার হাত ধরে। সেই মুহূর্তে তারা দুজন কোনও কথা বলে না। শুধু একে অপরের নিঃশ্বাসে আস্থা রাখে।
দুপুর গড়িয়ে যায়, আর রূপসী ঘর গোছাতে বসে। সাদা রঙের একটা পাতলা শাড়ি পরে সে বারান্দায় দাঁড়ায়, চুলগুলো খোলা, শরীর ভেজা, যেন আবার বৃষ্টিতে ভিজতে চাইছে। ঈশান তার ক্যামেরা নিয়ে আসে—সে এবার ছবি তুলবে। নগ্ন নয়, কিন্তু তাতেও কামনার আভা থাকবে।
“তুমি ছবি তুলছো?”—রূপসী চোখ সরিয়ে বলে।
“তোমার এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চাই, কারণ এটা উধাও হয়ে যাবে—যেমন বর্ষার প্রথম ফোঁটা, বা শরীরের প্রথম কাঁপুনি।”
রূপসী সরে যায় না, কেবল মাথা নাড়ে। তার চোখে তখন সম্মতি, কিন্তু তাতে একটা খেলা আছে। ঈশান বোঝে, এই নারী শুধু শরীর দিয়ে নয়, দৃষ্টিতে, ভঙ্গিমায়, ও ঠোঁটের মোড়কে কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে দিতে জানে।
চট করে সে ক্যামেরা নামিয়ে দেয়। সামনে গিয়ে বলে, “আজ ছবি নয়, আজ আবার আঁকবো তোমায়—আমার মনে, তোমার ছায়ায়।”
রূপসী বলে, “তবে আজ আমি তোমায় ছুঁবো, যেমন তুমি আমায় ছুঁয়েছিলে—চুপচাপ, ধীরে ধীরে, আগুন ছুঁয়ে দেওয়ার মতো।”
তারা ঘরে ফিরে আসে, চাদরের ওপর বসে পড়ে মুখোমুখি। রূপসী তার আঙুল দিয়ে ঈশানের বুকের খাঁজ, কাঁধের হাড়, গলার নিচে আঙুল বুলিয়ে যায়। ঈশান নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে। রূপসীর ঠোঁট তার বুকে, তারপর ঘাড়ে, তারপর পেটে। সে ঈশানের প্রতিক্রিয়া দেখে, যেন প্রতিটি স্পর্শে একেকটা সুর তুলছে।
ঈশান আর ধরে রাখতে পারে না। সে রূপসীর কোমরে হাত রাখে, তাকে নিজের দিকে টেনে আনে। এইবার মিলনটা আরও গভীর, আরও ধীর, যেন প্রতিটি মুহূর্ত চিরকাল ধরে চলতে পারে। ঘরের বাতাস থমকে যায়, কেবল দু’জন মানুষের শরীরী ভাষা বয়ে চলে চাদরের ভাঁজে ভাঁজে।
রূপসী কাঁপতে কাঁপতে বলে, “তুমি তো আমাকে শেষ করে দিচ্ছো, আবার নতুন করে গড়ে তুলছো।”
ঈশান চুমু খেয়ে বলে, “তুমি আগেও ছিলে, এখন শুধু আরও বাস্তব হয়ে উঠছো।”
বাইরে আবার শুরু হয় বৃষ্টি। সেই শব্দেই তারা মিলেমিশে যায়, যেন প্রকৃতি নিজের করে নিচ্ছে দু’জন মানুষকে—কামনায়, ভালোবাসায়, স্পর্শে, ও নিঃশ্বাসে।
বৃষ্টির সেই সকালটা যেন আগের সব দিনের চেয়ে আলাদা। ঈশান জানালার পাশে বসে কফির কাপ হাতে, কাঁচের ওপারে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গুনছিল। পাশেই বিছানায় আধখোলা চাদরে ঘুমন্ত রূপসী—তার এক পা চাদরের বাইরে, এলোমেলো চুলে লেগে থাকা রাতের গন্ধ, আর ঠোঁটে যেন ঘুমের মধ্যেও রয়ে গেছে গতরাতের পরিতৃপ্তির ছায়া। ঈশান জানত না, কীভাবে এমনভাবে একজন মানুষ তার ক্যানভাস ছাপিয়ে তার নিঃশ্বাসে মিশে যেতে পারে। সে তাকিয়ে ছিল, আর সেই দৃষ্টির গভীরতায় আর কিছু খুঁজতে হয়নি।
হঠাৎ রূপসী কেঁপে উঠে চোখ খুলল। চোখে তখনো ঘুম আর শরীরে থেমে থাকা স্নায়ুর মৃদু সাড়া। ঈশান ধীরে এসে পাশে বসে বলে, “রাতটা খুব গভীর ছিল, না?” রূপসী হাসে, চোখ আধভাঙা রেখেই বলে, “গভীর বললে কম বলা হয়। আমি তো মনে মনে হারিয়ে গিয়েছিলাম, আর ফিরে এসেছি তোমার বুকে।” তারা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে—না কোনও কথায়, না স্পর্শে—শুধু নিঃশ্বাসের ছন্দে, একে অপরের শরীরের উষ্ণতা টের পেয়ে।
বিকেল নাগাদ আকাশ পরিষ্কার হয়। রূপসী জানায়, সে আজ বাজারে যাবে, কিছু জিনিস কেনার দরকার। ঈশান বলে, “আমি যাব?” রূপসী হাসে, “তুমি যদি যাও, তাহলে গ্রামের লোক কানাকানি করবে—এই বর্ষায় কার সঙ্গে কে ভিজে ফিরছে।” ঈশান হেসে ফেলে। সে জানে, রূপসীর এই দুষ্টু খুনসুটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অভিমানের নরম স্তর, একটা কাঁচভাঙা বিশ্বাস—যেটা এখনো সেরে ওঠেনি।
রূপসী চলে গেলে ঈশান তার স্টুডিওঘরটায় যায়। বড় ক্যানভাস এনে রাখে, তুলি বেছে নেয়, রঙ মিশিয়ে। আজ সে রূপসীর শরীর নয়, তার অভিব্যক্তিকে আঁকবে—ভেজা চোখ, মৃদু হাসি, চুপচাপ আত্মসমর্পণের ভাষা। কিন্তু যতবার সে তুলির টান দিতে যায়, তার সামনে ভেসে ওঠে রূপসীর নগ্ন পিঠে জড়ানো সকালবেলার আলো, কাঁধে পড়ে থাকা চুলের রেখা, আর মিলনের সময় কাঁপতে থাকা ঠোঁট। সে নিজের অজান্তেই আঁকতে শুরু করে সেই দৃশ্য—এক নগ্নতা, যেখানে শরীর নেই, আছে আত্মার উন্মোচন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসে। রূপসী ফিরে আসে একটা কাগজে মোড়ানো প্যাকেট হাতে। ঘরে ঢুকেই সে বলে, “আজ তোমার জন্য রান্না করব, আর তুমি শুধু বসে থাকবে।” ঈশান কিছু না বলে শুধু রূপসীর কপালে চুমু খায়। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে মশলার গন্ধ, শসার খোসা কাটার শব্দ, আর মাঝে মাঝে রূপসীর গুনগুন করে গান গাওয়া। ঈশান জানে, এই মুহূর্তগুলোই জীবনের আসল ছবি।
রাতের খাওয়া শেষ হলে রূপসী মোমবাতির আলোয় ঘরটা সাজায়। এক পাশে বালিশের ওপর নরম চাদর বিছিয়ে বসে পড়ে। ঈশান তার কাছে এসে বসে, চোখে চেয়ে থাকে। রূপসী তার মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলে, “তুমি জানো, দেহ দিয়ে প্রেম শুরু হলেও, আত্মা দিয়ে প্রেম বাঁচে। আমি চেয়েছিলাম কেউ আমার ভেতরের সেই অন্ধকার গলিগুলোয় হাঁটে—তুমি হয়তো প্রথম।”
ঈশান তার ঠোঁটে আঙুল রাখে। “আমি হাঁটিনি, আমি তোমায় ছুঁয়ে দেখেছি, তোমার গোপন কামনা, তোমার লুকনো কষ্ট—সব আমার ভিতর গেঁথে গেছে।” রূপসী এবার নিঃশব্দে তার জামার বোতাম খুলতে থাকে। তার আঙুলে কোনও তাড়াহুড়ো নেই, যেন প্রতিটি বোতামে জমে থাকা বাঁধন ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে। ঈশান চুপ করে বসে থাকে, আর রূপসীর হাতের ছোঁয়ায় শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়।
সে ঈশানের জামাটা নামিয়ে ফেলতে না ফেলতেই, তার ঠোঁট ঈশানের ঘাড়ে চলে আসে। ধীরে ধীরে গলার পাশ দিয়ে নিচে নামতে থাকে। ঈশানের বুক থেকে নিঃশ্বাস বেরোতে থাকে ভারী হয়ে। সে রূপসীর মুখে হাত রাখে, তার চোখে চেয়ে বলে, “আজ শুধু তুমি, রূপসী। আমি শুধু অনুভব করব।” রূপসী এবার চুপচাপ ঈশানের কোলে উঠে বসে। চুল তার মুখে এসে পড়েছে, চোখে ছায়া পড়েছে মোমের আলোয়। সে ঠোঁট রাখে ঈশানের ঠোঁটে, দীর্ঘ, ধীরে, অগাধ।
তারা একে অপরকে আবৃত করে রাখে চাদরের নিচে—কোনও শব্দ নেই, কেবল চামড়ার ওপর ঘামের ফোঁটা, বুকের নিচে হৃদপিণ্ডের ধুকধুকানি, আর মিলনের গভীর ছন্দ। রূপসী তার নাম ধরে ডাকে, ঈশান তার পিঠে আঁচড় কাটে, তৃষ্ণার মতো কামনা আর ভালবাসার অগ্নিময় সংমিশ্রণে তারা এক হয়ে যায়।
রাত যখন শেষের দিকে, তারা নিঃস্তব্ধ হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে থাকে। রূপসী ধীরে ধীরে বলে, “আমার মনে হয়, আমি এই বর্ষায় আবার জন্ম নিচ্ছি। এই বিছানায় নয়, এই চোখে, এই ছোঁয়ায়, এই বিশ্বাসে।”
ঈশান চুমু খায় তার চোখে। “তোমাকে জন্ম দিতে হলে, আমাকে প্রথমে মরে যেতে হতো। আমি সেই মৃত্যু মেনেই নিয়েছি—তোমার জন্য।”
ঘুম ভাঙে কোকিলের ডাক আর পাতার ফাঁকে ঝরে পড়া শেষরাতের বৃষ্টির শব্দে। রূপসী চোখ খুলে দেখে, ঈশান তার গা ঘেঁষে শুয়ে আছে, এক হাত কোমরে রাখা, অন্য হাত তার স্তনের ওপরে আলতো করে জড়িয়ে। তবুও তাতে কোনও তাড়না নেই, যেন সে শুধু ভালোবাসার ভারে নিজেকে মেলে রেখেছে। রূপসী নিঃশব্দে ঈশানের ঠোঁটে একটা নরম চুমু খায়, তারপর মাথা গুঁজে দেয় তার বুকে। ঈশানের ঘুম এখনো পুরোপুরি ভাঙেনি, কিন্তু সে বুঝতে পারে রূপসীর শরীরের সেই চিরচেনা নরম উষ্ণতা। চোখ না খুলেই সে তার চুলে আঙুল চালায়।
“আজ কেমন দিন হবে?”—রূপসী ফিসফিস করে।
“যেমন তুমি চাও। তুমি যেমনভাবে জেগে উঠো, দিনও সেরকম হয় আমার কাছে।”
রূপসী মৃদু হেসে উঠে পড়ে। তার নগ্ন পিঠে আলো পড়ে, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল বয়ে যায় পিঠের মাঝ বরাবর। সে ধীরে পায়ে জানালার ধারে চলে যায়, চাদরের কোণটা সামলে। বাইরে মেঘের চাদর পাতলা হয়ে এসেছে, ধানের জমিতে পড়ে আছে কুয়াশার আবরণ। পাখির ডাক, দূরের বাঁশঝাড়ের ফাঁকে আলো, আর হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা এসে তার শাড়ির খোলা কোণটা ওড়ায়।
ঈশান উঠে এসে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। চাদর খুলে পড়ে যায়, ঈশানের হাত রূপসীর নগ্ন শরীরে থেমে যায় কোমরের ঠিক নিচে। সে বলে, “তোমার পিঠের এই জায়গাটা… এখানেই প্রথম আমি তোমায় ছুঁয়ে অনুভব করেছিলাম, জানো?”
রূপসী তার মুখ ঘুরিয়ে বলে, “সেই প্রথম ছোঁয়াতেই আমি বুঝেছিলাম, তুমি অন্যরকম। আমার দেহের দিকে নয়, দেহের মধ্যে দেখতে চেয়েছিলে।”
তারা আবার বিছানায় ফিরে আসে, কিন্তু এইবার মিলনটা ছিল যেন নতুন ভাষায় লেখা। রূপসী ধীরে ঈশানকে তার দিকে টেনে আনে, হাত রাখে গলার কাছে, তারপর বুকের মাঝখানে। তার ঠোঁট এবার ছুঁয়ে যায় ঈশানের চোখ, কপাল, গাল, এবং তারপর ধীরে, প্রতিটি স্পর্শে কামনার গভীরতা ছুঁয়ে যায়। ঈশান তাকে উল্টে দেয়, চুল ছড়িয়ে পড়ে বিছানায়, দেহে জমে ওঠে উত্তাপের স্পন্দন।
তাদের চুম্বন আজ আরও গভীর, আরও সপ্রতিভ। ঈশানের আঙুল রূপসীর উরুর পাশ দিয়ে ধীরে উপরে উঠে আসে, সে কেঁপে ওঠে, কিন্তু বাঁধা দেয় না। সে ঈশানের কানে ফিসফিস করে, “আজ আমায় শুধু ছুঁয়ো না, আমায় লিখে দাও তোমার শরীরে, যেন আমি আর আলাদা না থাকি।” ঈশান তার ত্বকে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য অক্ষরে নাম লেখে—“রূপসী”—আর তার বুকের ওপর চুমু খেয়ে বলে, “তুমি তো আমার মধ্যে এমনিতেই লেখা ছিলে, আমি শুধু আবৃত করলাম।”
মিলনের গভীরতায় তারা একে অপরকে হারিয়ে ফেলে। চাদরের নিচে ঘাম, নিঃশ্বাস, স্পর্শের ঘূর্ণি—যেখানে শরীর শুধু বাহন নয়, অনুভবের একমাত্র ভাষা। ঈশান তার স্তনের খাঁজে মুখ রাখে, রূপসী তার পিঠে আঁচড় কাটে, তারা একে অপরের কাছে সাড়া খোঁজে, আর তৃপ্তির ঢেউয় তলিয়ে যায়।
ঘন্টা পেরিয়ে যায়, তারা নিঃশ্বাস টেনে আবার শান্ত হয়। রূপসী চুপচাপ বলে, “তুমি জানো, আমি এই মুহূর্তগুলোকে কখনো হারাতে চাই না। এই কামনা, এই ভালবাসা—যা আমার শরীরকে নয়, আমাকে ছুঁয়েছে।”
ঈশান তার মুখে হাত রাখে, চোখে চেয়ে বলে, “তোমার শরীর যেমন সুন্দর, তেমনি গভীর তুমি। আমি দুটোই ভালোবাসি, কিন্তু যার জন্য ভালোবাসি, সে তো তোমার ভেতরের রূপসী।”
দুপুরে রূপসী রান্না করে, আর ঈশান জানালার ধারে বসে তার স্কেচবুকে কিছু আঁকে। তাদের মধ্যে কোনও আরোপ নেই, নেই কোনও প্রশ্ন, শুধু আছে একে অপরের প্রতি নীরব নির্ভরতা। বিকেলে তারা একসঙ্গে হাঁটতে বেরোয় গ্রামের পাশ দিয়ে—হাতে হাত রেখে, ছাতার নিচে।
তারা বসে পড়ে একটা কাদামাটির পাড়ে, পাশেই ছোট জলাশয়, তার গায়ে ফুটে থাকা শাপলা ফুল। ঈশান বলে, “তুমি কি জানো, এই বর্ষায় তুমি শুধু ভিজে যাওনি, আমাকে নতুন করে জাগিয়েছো।”
রূপসী মৃদু হাসে। “তুমি হয়তো ভাবো, আমি তোমার প্রেমে পড়েছি। আসলে আমি আমার হারিয়ে যাওয়া নারীত্বটা তোমার ভেতরে খুঁজে পেয়েছি। আমি এখন আবার নিজেকে অনুভব করতে পারি—নগ্ন হয়ে, সাহস নিয়ে, চোখ তুলে।”
ঈশান তার হাত ধরে চুমু খায়। তারা উঠে দাঁড়ায়, এবং হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে যায় কুয়াশার মাঝে।
রাতে রূপসী আবার মোমবাতি জ্বালায়, কানের দুল খুলে বিছানার পাশে রেখে বলে, “আজ আমাকে তুমিই সাজাবে। তুমি চাইলে আমি থাকব শুধু শাড়িতে, নাকি শুধু তোমার স্পর্শে।” ঈশান হাসে, কাছে আসে, তার চুলে মুখ গুঁজে বলে, “আজ তুমি থাকবে আমার ঘামের গন্ধে, আমার ঠোঁটের চিহ্নে, আমার কামনার ছায়ায়।”
রূপসী চোখ বন্ধ করে, তার ঠোঁট ঈশানের বুকে। সেই রাতে তারা আরও একবার একে অপরের মধ্যে তলিয়ে যায়—নতুন এক ছোঁয়ায়, নতুন এক ভাষায়, যেখানে শুধু শরীর নয়, অনুভবও কাঁপে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর, রূপসী রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে, গ্যাসের শিখায় ফুটছে লাউ চিংড়ি, পাশে চাপা লাল সিঁদুরের মতো কাঁচা লঙ্কা কুচি। ঈশান জানালার ধারে বসে একটানা কিছু লিখছে, খাতার পৃষ্ঠায় ঘাম জমে উঠেছে। বাইরের গাছে একজোড়া শালিক ডাকছে একসুরে। হঠাৎ যেন সবকিছু থেমে যায়, যখন দরজায় একটি টোকা পড়ে। রূপসীর গা কেঁপে ওঠে।
“কেউ আসবে বলেছিলে?” ঈশান প্রশ্ন করে।
“না,” রূপসী জানালার পাশে এগিয়ে যায়, সাদা শাড়ির আঁচলে হাত মুছে দরজা খুলে দেখে গ্রামের সেই বয়স্ক ডাকপিয়ন দাঁড়িয়ে, হাতে একটা খাম।
“আপনার নামেই, কলকাতা থেকে এসেছে,” সে বলে।
খামটা হাতে নিয়ে রূপসী থমকে যায়। চিঠিটা দেখে তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে, যেন তীব্র কোনও স্মৃতির গন্ধ হঠাৎ নাকে এসে বাজে। ঈশান কাছে এসে বলে, “চেনা কারোর?”
“হয়তো… কারো নয়। হয়তো অতীত নিজেই ফিরে এসেছে।”
চিঠিটা খুলে পড়ে রূপসীর চোখ ছলছল করে ওঠে। লেখা ছিল—
“তোমার অভাব, রূপসী, শুধু শরীরের নয়। তুমি হারিয়েছিলে যা, আমি সে শূন্যতায় বাস করতাম। জানি, তুমি খুঁজে নিয়েছো অন্য পথ, কিন্তু জেনে রেখো, তোমার শরীর শুধু তোমার নয়—আমারও ইতিহাস ছিল তাতে। একদিন দেখা হলে, আমি শুধু চোখে চোখ রেখে বলব—ক্ষমা করে দিও, যেদিন তোমাকে কাঁদিয়ে চলে গিয়েছিলাম।”
চিঠিতে কোনও নাম নেই। কিন্তু রূপসী জানে—সে অমিত।
অমিত, যার সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, যার স্পর্শে প্রথম সে নারী হয়ে উঠেছিল, যে তাকে শিখিয়েছিল কামনার কবিতা, আবার সেও সেই লোক, যে হঠাৎ একদিন শহরের কোলাহলে হারিয়ে যায়—কোনও চিঠি, কোনও বিদায়বিহীনভাবে। রূপসী তখন একা, হঠাৎ অন্ধকার।
ঈশান পাশে দাঁড়িয়ে তার মুখ দেখে, চোখে জিজ্ঞাসা, কিন্তু মুখে শব্দ নেই।
“এমন কেউ ছিল, যার কাছে আমার শরীর প্রথম আত্মসমর্পণ করেছিল,” রূপসী ফিসফিস করে।
“তুমি যদি চাও, বলতে পারো,” ঈশানের কণ্ঠে কোনও হিংসা নেই, কেবল একটি আবরণহীন গ্রহণযোগ্যতা।
“একটা সন্ধ্যায় আমার শরীর ফুলে উঠেছিল, বৃষ্টির জল আমার বুক বেয়ে নেমেছিল, আর আমি তাকে বলেছিলাম, আমি তোকে ভালোবাসি। কিন্তু সেই রাতে সে বলেছিল, ‘ভালোবাসা দিয়ে কি পৃথিবী চলে?’ তারপর সে হারিয়ে যায়। আমার ভিতরটা ভেঙে গেছিলো, ঈশান।”
ঈশান রূপসীর কাঁধে হাত রাখে। “তোমার শরীরের অতীত আছে, সেটা তো জানা কথা। আমি তোমার বর্তমানের পাশে আছি।”
রূপসী তার মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁটে ঈশানের ঠোঁট রাখে। “তুমি জানো, তোমার এই নিরবতা, এই না-জানা ভাষা—এইটাই আমাকে আবার নারী করে তোলে।”
সেই রাতে তারা আর বিছানায় নয়, বসার ঘরের পুরোনো কাঠের সোফায় জড়িয়ে থাকে। মোমবাতির আলোতে রূপসীর নগ্ন শরীর ঈশানের বুকের নিচে উঠে পড়ে, সে একা বলে, “আমাকে আবার লেখো, ঈশান। যেন আমার দেহের প্রতিটি রেখা নতুন করে তোমার আঙুলে জন্ম নেয়।”
ঈশান তার স্তন দু’টি আলতো করে চেপে ধরে, ঠোঁট রাখে স্তনবৃন্তে। রূপসী শ্বাস ধরে রাখে। তারপর তার দুই উরুর মাঝে ঈশানের আঙুল এসে পড়ে, এবং কামনার নীচু শব্দে ঘর ভরে ওঠে। তারা আজ কথা কম বলে, কিন্তু শরীর বলছে সব।
রূপসী উঠে ঈশানকে ঠেলে সোফায় শোয়ায়, তার উরুর উপর বসে, হাত রাখে তার বুকে, এবং ধীরে ধীরে, ঈশানের শ্বাস ফেটে যায়। তার দেহে ঈশানের প্রবেশ যেন পুরোনো ক্ষতগুলিকে মুছে দেয়। সে চোখ বন্ধ করে বলে, “আমার সব ব্যথা নিয়ে আমাকে দাও, নতুন করে।”
তারা তীব্র, দীর্ঘ, অসীম এক মিলনে তলিয়ে যায়। কেবল শরীর নয়, আত্মাও জড়িয়ে পড়ে। রূপসীর চুল ঘাম আর আনন্দে লেপ্টে যায় পিঠে, ঈশানের মুখ কেঁপে ওঠে শেষ মুহূর্তে, এবং তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
রূপসী পাশে মাথা রেখে শুয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ বলে, “তুমি যদি আমায় একদিন ছেড়ে যাও?”
“আমি যাবো না। তুমি গেলে তবু আমি তোমার ভেতরে থাকব, তোমার ত্বকে, ঠোঁটে, ঘামের গন্ধে। আমি যদি যাইও, আমি তোকে তবু ভালোবাসব।”
রূপসী চোখ বন্ধ করে, মনে মনে উচ্চারণ করে—”এইবার সত্যি প্রেম পেয়েছি, শরীর দিয়ে, আত্মা দিয়ে।”
ঘুম ভাঙে এক অপূর্ব সুবাসে। রূপসীর চুলে এখনও ঈশানের আঙুলের স্পর্শ লেগে, বুকের গভীরে ঢেউ খেলে যায় তার নিশ্বাসে। সে চোখ মেলে দেখে ঈশান তার মুখের উপর ঝুঁকে তাকিয়ে আছে—চোখে আদরের রেশ, ঠোঁটে ভোরের চুমুর মতো নরম হাসি।
“তোমার চোখে আজও বৃষ্টি,” ঈশান বলে।
“তোমার চোখেই দেখি আমি আকাশ,” রূপসী ফিসফিস করে।
বিছানা ছেড়ে তারা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, ভেজা মাটি, গাছে জমে থাকা জলরাশি, আর ধোঁয়াটে সবুজে ছেয়ে থাকা দূরের নদী—সব যেন তাদের মিলনেরই প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে। রূপসী ঈশানের কাঁধে মাথা রাখে, নিঃশব্দে বলে, “তুমি জানো, আমার বুকে তোমার শরীর মানে শুধু শরীর নয়। এ এক স্বপ্ন, যাকে আমি রোজ ছুঁয়ে থাকতে চাই।”
ঈশান তার ঠোঁটে নরমভাবে স্পর্শ রাখে, যেন কোন কথা ছাড়াই বলে—”আমি আছি, আমি থাকব।”
বিকেলের দিকে তারা হাঁটতে যায় মাঠের দিকে। রূপসী আজ সাদা সুতির শাড়িতে, কোমরে লাল পাড়ের মোচড়। ঈশানের হাত তার কোমরে, আঙুলে নরম টান। হঠাৎ ঝোপের আড়ালে তারা থেমে যায়, অদূরে একটি সাপ সরসরিয়ে চলে যাচ্ছে। রূপসী ঈশানের বুকের কাছে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে, কিন্তু ঈশান তার কানে ফিসফিস করে, “ভয় পেয়ো না, আমি আছি।”
এই ভয় আর আশ্রয়ের মাঝেই রূপসীর মন কেঁপে ওঠে—একটা চেনা অনুভব। যেমন একসময় অমিত তাকে পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিল, ঝর্নার ধারে চুমু খেয়েছিল, বলেছিল, “তুমি আমার, যতদিন বৃষ্টি পড়ে, যতদিন দেহে আগুন জ্বলে।”
এই স্মৃতি হঠাৎ তার শরীর ঠান্ডা করে দেয়। ঈশান তা টের পায়।
“আবার সে কথা মনে পড়ছে?”
“হ্যাঁ। সে বলেছিল, আমি তার সম্পত্তি। কিন্তু ভালোবাসা কি জিনিসপত্র?”
ঈশান রূপসীর মুখ দু’হাতে ধরে বলে, “তুমি কারো সম্পত্তি নও, তুমি নিজস্ব এক পৃথিবী। আমি শুধু সেই পৃথিবীর অতিথি—যাকে তুমি নিজ হাতে আমন্ত্রণ করেছো।”
রাত গভীর হলে, তারা আবার মিলনের শরীরী ভাষায় ডুবে যায়। এবার আর ঘরের মধ্যে নয়—তারা চলে যায় পুকুরপাড়ে, যেখানে কচুরিপানার মধ্যে ছোট্ট নৌকো বাঁধা থাকে। ঈশান তাকে সেই নৌকোয় বসিয়ে, ধীরে ধীরে চুমু খেতে খেতে তার পায়ের পাতায় জল ছুঁইয়ে দেয়। রূপসীর শরীর কাঁপে, ঠোঁট থেকে দীর্ঘ শ্বাস বেরোয়।
“এই জায়গায় কেউ নেই,” ঈশান বলে। “তুমি আমার, একান্ত আমার, শুধু এই রাতের জন্য নয়, প্রতিটি কল্পনার জন্য।”
রূপসী তার গলা চেপে ধরে, নিজে থেকে ঈশানের বুকে উঠে বসে। জলের হালকা দোলা, আকাশের তারা আর শরীরের উত্তাপ একসাথে মিশে যায়। রূপসী তার চুল ছড়িয়ে দেয় ঈশানের মুখে, বুক দিয়ে বয়ে যায় উষ্ণ নদী। ঈশান তার উরু ছুঁয়ে নীচে নামতে থাকে, আর রূপসী চোখ বন্ধ করে বলে, “আরো নিচে যাও, ওখানে আমার বৃষ্টি জমে আছে।”
ঈশান মুখ নামিয়ে তার রহস্যভরা ঠোঁটের মাঝে হারিয়ে যায়, রূপসী হাঁপাতে থাকে, একেকটা ঢেউয়ে তার কোমর কেঁপে ওঠে। তারপর সে ঈশানকে টেনে তোলে, নিজেই গাইড করে তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করায়। সেই গভীরতা, সেই সংবেদন, যেন শরীর আর আত্মা একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে।
পাশের পুকুরের জল হালকা ছলাৎ করে ওঠে, নৌকো দুলে যায়, আকাশে মেঘ জমে আবার। এই রাত যেন শুধুই তাদের, আর কারো না।
মিলনের শেষে রূপসী বলে, “তুমি কি জানো, আমার এই শরীর—যে শরীর তুমি এত ভালোবাসো—ওটাকে আমি একদিন ঘেন্না করতাম।”
“কেন?”
“কারণ, যাকে দিয়েছিলাম প্রথমবার, সে একদিন বলেছিল, আমার শরীর নাকি শুধু ভোগ করার জন্য।”
ঈশান চুপ করে থাকে, তারপর বলে, “তোমার শরীর ভোগের নয়, সেটা এক শিল্প—যাকে আমি অনুভব করি, আঁকি, লিখি, জাগিয়ে রাখি।”
রূপসীর চোখে জল আসে। কিন্তু সে চায় না কেউ সেটা দেখুক। সে শুধুই চায় আরও একবার ঈশান তাকে সেইভাবে ছুঁয়ে দিক—যেভাবে কেউ কাউকে শ্রদ্ধা করে ভালোবাসে।
রাত বাড়ে। তারা চুপচাপ হাত ধরে বসে থাকে নৌকোর মধ্যে, আকাশের তারা দেখে আর গুনে ফেলে—এক, দুই, তিন… প্রতিটা তারা যেন রূপসীর চুমু গোনে।
সকালে রোদ উঠে, কিন্তু মেঘের রঙে ঢেকে থাকে চারপাশ। পুকুরপাড়ের সেই নৌকোয় রূপসী ও ঈশান এখনও পাশাপাশি শুয়ে। জল শুকিয়ে গেছে রূপসীর ত্বকে, কিন্তু চুমুর নোনতা স্মৃতি থেকে যায় ঠোঁটে। ঈশানের হাত রূপসীর কোমরে জড়ানো, যেন সে তাকে ছেড়ে দিতে চায় না, আর রূপসী চোখ বন্ধ করে ঈশানের বুকে শোনে—হৃদয়ের সেই চেনা স্পন্দন।
“আজ যেতে হবে,” রূপসী বলে।
“কোথায়?” ঈশান জানে না সে এই প্রশ্নের উত্তর চায় কিনা।
“ফিরে… সেই জায়গায়, যেখান থেকে আমি পালিয়ে এসেছিলাম।”
ঈশান উঠে বসে, তার চোখে ধোঁয়া জমে। “অমিতের কাছে?”
রূপসী মাথা ঝাঁকায়। “না। নিজের কাছে। আমি তোমার সঙ্গে এসেছি, শরীর দিয়েছি, মনও… কিন্তু কিছু একটা ফাঁকা থেকে গেছে। আমি ভয় পাই, ঈশান। ভয় পাই আবার কারো সঙ্গে ভেঙে পড়তে।”
“আমি কি সেই কেউ হতে পারি, যার সঙ্গে তুমি ধ্বংস হয়ে আবার গড়ে উঠতে পারো?”
রূপসী হেসে ফেলে, কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কান্না মিশে থাকে।
তারা ঘরে ফেরে। দুপুরে ঝুম বৃষ্টি নামে আবার, এবং সেই বৃষ্টির শব্দে হঠাৎ রূপসীর পুরনো একটি ডায়েরি বেরিয়ে পড়ে ট্রাঙ্ক থেকে। পাতায় পাতায় অমিতের চিঠি, কবিতা, ছবি। ঈশান পড়ে ফেলে একটি লাইন—
“তোমার শরীর আমার মন্দির, কিন্তু আমি পুরোহিত নই, আমি চোর।”
ঈশান ডায়েরি বন্ধ করে, রূপসীর দিকে তাকায়। “এইসব জিনিস ফেলে এসো। ওগুলোতে শুধু ছায়া আছে, আলো নয়।”
রূপসী উত্তর দেয় না, শুধু ধীরে ধীরে ঈশানের কাছে গিয়ে তার শার্ট খুলে দেয়। ঈশান তাকে চমকে দেখে।
“তুমি কি করছো?”
“ফিরে যাওয়ার আগে তোমাকে গায়ে মেখে নিতে চাই, যেন তোমার গন্ধ আমাকে সারাদিন রাখে।”
ঈশান রূপসীকে তীব্রভাবে চুমু খায়, ঠোঁট থেকে গলা, গলা থেকে স্তন, তারপর আরও নিচে… রূপসী হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে, “এই শরীর একদিন ভাঙা ছিল, কিন্তু তুমি তাকে কবিতা করে তুলেছো।”
বিছানার চাদরে তাদের শরীর মিশে যায়, ঘাম, কামনা আর কান্নায় এক নতুন ছন্দ বয়ে যায়। রূপসী নিজেকে খুলে দেয় সম্পূর্ণভাবে, কোন লাজ নেই, কোন দ্বিধা নেই—এই পুরুষ, এই ঈশান, তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ পড়ে ফেলেছে, যেন ছন্দময় শ্লোক।
“তুমি কি চাও আমি থাকি?” সে প্রশ্ন করে মিলনের পরে।
“তুমি থাকো, যতদিন চাও। কারণ আমি তোমাকে আটকে রাখব না। আমি শুধু চাই, তুমি ফিরে এসো নিজের ইচ্ছায়।”
রূপসীর মনে পড়ে, অমিত একদিন বলেছিল, “তুমি পালালে আমি মেরে ফেলব নিজেকে।”
আর ঈশান বলে, “তুমি পালালেও আমি তোমার জন্য আলো জ্বেলে রাখব।”
এই দুই পুরুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে খুঁজে পায়।
রাত নামলে সে গাড়িতে উঠে। ব্যাগে অল্প কিছু জামা, কিছু স্মৃতি, আর ঈশানের ছোঁয়া। গাড়ি চলতে শুরু করে, পেছনে ঈশান বারান্দায় দাঁড়িয়ে, চোখে জল নেই, কিন্তু অপেক্ষা আছে। রূপসী জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, বৃষ্টি আবার পড়ছে—তবে এবার সেই বৃষ্টি তার ভেতরের শূন্যতায় নয়, এক নতুন শুরুতে ভিজছে।
গাড়ি বাঁক নিলো, ঈশান আর চোখে পড়ল না। কিন্তু রূপসী জানে—এই রাস্তার প্রতিটা বাঁকে সে ঈশানকে রেখেছে। হয়তো সে ফিরবে, হয়তো ফিরবে না, কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, সে স্বাধীন।
শহরটা সেই আগের মতোই আছে, তবুও কোথাও যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। রূপসী গাড়ি থেকে নামতেই চেনা বাতাস এসে গায়ে লেগে যায়, পুরনো ঘ্রাণ—ধূলি, পানপাতা, শিউলি আর একটা ঝাপসা সুখ। কিন্তু সেই ঘ্রাণেও আজ কেমন বিষ মেশানো মনে হয়। ছয় বছর পর এই বাড়িতে পা রাখছে সে। যেখানে একদিন সে কাঁদতে কাঁদতে ব্যাগ গুছিয়েছিল, যেখানে এক পুরুষ তাকে চুমু খেয়ে বলেছিল, “ভালোবাসা মানে তো ক্ষমা, তাই না?”
ফ্ল্যাটের দরজায় কলিং বেল বাজতেই অমিত নিজেই খুলে দেয়। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়। চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে কালি, তবু ঠোঁটের কোণে সেই চেনা অভিমানী হাসি।
“ফিরলে?” অমিত শুধায়।
“হ্যাঁ। নিজের কাছে।”
অমিত সরে যায়, রূপসী ঘরে ঢোকে। সোফায় পুরনো কুশন, দেয়ালে একসঙ্গে তোলা ছবি, টেবিলের উপর শুকনো গোলাপ… সব কিছুই একসময় তাকে ভালোবাসত, এখন তাকিয়ে থাকে ফাঁকা চোখে।
“তুমি ভালো আছো?” রূপসীর প্রশ্ন।
অমিত চোখ নামিয়ে ফেলে। “তুমি চলে যাওয়ার পরে কিছুই আর ঠিক ছিল না। তুমি জানো, আমি যা করেছি, সেটা ভুল ছিল, কিন্তু…”
রূপসী থামায়, “ভালোবাসা বলে কিছু কখনো ভুল হয় না, অমিত। কিন্তু যখন ভালোবাসা দম বন্ধ করে দেয়, তখন ভুল ঠিক হয়ে যায় চলে যাওয়াটাই।”
তারা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। হঠাৎ অমিত বলে, “তুমি কারো সঙ্গে আছো?”
রূপসী চোখ তুলে বলে, “ছিলাম। সে আমাকে নিজের মতো করে ভালোবেসেছে। আমাকে ফুঁড়ে দেখেনি, আমাকে পূজোও করেনি। শুধু… পাশে ছিল।”
“তাহলে ফিরলে কেন?”
“কারণ জানি, এই শহরের একটা ঝাঁঝালো অংশ আমার শরীরে মিশে আছে। তোমার হাতের ছোঁয়া আমি এখনও ঘৃণা করি না, অথচ ভালোওবাসি না। আমি এসেছি তোমাকে ক্ষমা করতে—not to return, but to release.”
অমিত হেসে ওঠে—ভাঙা, কুয়াশায় ভেজা হাসি। তারপর বলে, “তোমার শরীর এখনও আমার মনে পড়ে, সেই বাঁক, সেই গন্ধ… তুমি কি চাও না, একবার… শুধু একবার, পুরনো অনুভবে ডুবি?”
রূপসী উঠে দাঁড়ায়। “আমার শরীর আর আমার আত্মা এখন একসঙ্গে হাঁটে। আমি আর তাকে কেবল উপহার দিই না, আমি তাকে নিজের মতো বাঁচতে দিই।”
অমিত তার হাত ধরে, হঠাৎ টান দেয়। রূপসীর চোখে ঝিলিক দেয় এক পুরনো আতঙ্ক। কিন্তু সে নিজেকে ছাড়িয়ে না নিয়ে, ধীরে ধীরে বলে, “তুমি এখনও আমাকে ছুঁতে পারো, কিন্তু প্রবেশ করতে পারো না।”
তারপর নিজেই অমিতের ঠোঁটে এক দীর্ঘ চুমু রাখে—নোনতা, নিষিদ্ধ, কিন্তু তবু মুক্তির মতো। তারপর ফিসফিস করে বলে, “এই চুমুটা শেষ বিদায়।”
রাত্রে সে একা হোটেলে ফেরে। বৃষ্টির শব্দ জানালায়। বিছানায় একা, কিন্তু প্রথমবারের মতো নিঃসঙ্গ নয়। শরীর তৃষ্ণার্ত নয়, কারণ মন শান্ত। নগ্ন হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, নিজের বুক, তলপেট, উরু—সব দেখে সে। কোনও দাগ নেই, শুধু ইতিহাস। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে ছোঁয়, ধীরে ধীরে ভালোবাসে, যেন আত্মা দিয়ে শরীরকে চেনে। নিজের ছোঁয়ায় সে নিজেকে বলে, “তুই কারো মালিকানা নয়।”
রাত্রে ঘুমোবার আগে ঈশানের একটি মেসেজ আসে—
“আমি জানি, তুই ফিরে আসবি না। কিন্তু জানিস, তুই যদি একদিন হাওয়া হয়ে যাস, আমি বৃষ্টি ছুঁয়ে তোকে খুঁজে নেব।”
রূপসী মেসেজ দেখে, ফোন বন্ধ করে, কপালে হাত রাখে। তার গায়ে আজ কোনও পুরুষ নেই—তবু সে ভিজে যায়। কারণ ভালোবাসা কেবল শরীরে হয় না, ভালোবাসা হয় চোখে, সাহসে, মুক্তির অনুভবে।
সকালের আলো জানালার কাঁচে আঙুল বোলায়। ভেজা বাতাসে চুলে হালকা জট, আর চোখে নিস্তব্ধির ছায়া। রূপসী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকায়, যেন কেউ ভেতর থেকে ডাকছে—তাকে, যাকে সে একদিন ভুলে গিয়েছিল, সেই মেয়েটাকে, যে নিজের চাওয়াকে আড়াল করে শুধু অন্যের ইচ্ছেতেই নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিল। আজ তার চোখে আর ভয় নেই, পেছনে ফিরে তাকানোর ক্লান্তিও নেই।
হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে সে। ভেজা রাস্তায় জুতো চুপচুপে হয়ে যায়, তবু মন ভারী হয় না। আজ তার গন্তব্য নেই, কারণ আজ সে কোনো ঠিকানার মেয়ে নয়। সে নিজের পথ নিজেই গড়ে নিচ্ছে, পায়ে পায়ে। একটা ক্যাফেতে ঢুকে বসে, জানালার পাশে। ছাতার বাইরের বৃষ্টিকে দেখে, আর ভেতরের কোনও কথা চুপ করে লেখে কাগজে।
“আমি রূপসী। আমি নারী। আমি প্রেম করেছি, শরীর দিয়েছি, ভালোবাসা পেয়েছি, দুঃখ জয় করেছি। আজ আমি নিজেকে গ্রহণ করেছি—এই শহরের, এই বৃষ্টির, এই গল্পের মতোই। আমি আর কারো না, আমি আমার। আজ থেকে শুরু আমার নতুন বর্ষা।”
ক্যাফের দরজা টনটন শব্দ করে খুলে যায়। ঈশান। কালো ছাতা, চোখে গভীর ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটে সেই চেনা শান্ত হাসি।
“তুই জানিস, আমি তোর চলে যাওয়াকে অভিশাপ দিইনি, কারণ তোর মুক্তির পেছনে আমার ভালোবাসা ছিল।”
রূপসী উঠে দাঁড়ায়, ধীরে আসে ঈশানের সামনে। কিচ্ছু না বলে একমুঠো হাওয়ার মতো জড়িয়ে ধরে তাকে। দু’জনের শরীর ভেজে না, শুধু গলে যায়। সময় থেমে থাকে। চায়ের কাপ ঠাণ্ডা হয়ে যায়, কিন্তু তাদের শ্বাস একসাথে জ্বলে ওঠে।
রাত্রে তারা একই হোটেল রুমে ফেরে। এবার তারা নগ্ন হয়, কিন্তু কামনার জন্য নয়—চেনার জন্য। ঈশানের আঙুল ধীরে চলে রূপসীর পিঠ বরাবর, যেন সে খুঁজে নিচ্ছে পুরনো দাগ, যেগুলো রূপসী নিজেই ভুলে গিয়েছিল। রূপসীর ঠোঁট ঈশানের কাঁধে ছুঁয়ে যায়, এমনভাবে যে মনে হয়, চুমু নয়—ভেতর থেকে ছুঁয়ে যাচ্ছে সে।
তারা জড়িয়ে ঘুমায়। দুটো হৃদয় একসঙ্গে শ্বাস ফেলে, কিন্তু কোনও শর্ত ছাড়াই।
ভোরের আলো এসে বিছানায় পড়ে। জানলার কাঁচে এখনও ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। ঈশান ঘুমিয়ে, রূপসী উঠে জানালার পাশে দাঁড়ায়। সাদা চাদর শরীর ঢেকেছে, তবু তার চোখে অনাবৃত সাহস।
সে একবার ফিরে তাকায়—যে পুরুষ তার শরীরকে কখনও মালিকানা ভাবেনি, শুধু চেনার চেষ্টা করেছে।
রূপসী নিজেকে ফিসফিস করে বলে, “ভালোবাসা মানে মুক্তি। আর মুক্তির মানেই—নিজেকে পুরোটা ভালোবাসা।”
একটা শেষ চিঠি রেখে দেয় টেবিলে—
“আমি থাকব, কিন্তু মালিকানা নিয়ে নয়। আমি থাকব, যদি তুই আমায় মানুষ হিসেবে ভালবাসিস—শরীর নয়, আত্মা দিয়ে। আর যদি না পারিস, তাও ভালো। কারণ আমি আজ জানি, আমি পূর্ণ। আমি রূপসী। সেই বর্ষার রাতে যার জন্ম, আর যাকে আজ বৃষ্টি ছুঁয়ে নিজের করেছে।”
ক্লোজড বুকে একটা কবিতা লেখা কাগজ রেখে সে হোটেল ছাড়ে—
“আমাকে খুঁজিস না, আমি তোর ভিতরে আছি।”
সমাপ্ত




