অংশুমান রায়
ঋদ্ধির আগমন
কলকাতার শীত তখন পড়তে শুরু করেছে, তবে হাওয়ার ধার এখনো নরম। সন্ধের আলোয় গড়িয়াহাটের মোড় থেকে দক্ষিণে যে রাস্তা নেমে গেছে, সেই ফুটপাথগুলো ভরে উঠছে শালপাতার ধোঁয়া, ভাজা মুড়ির গন্ধ, আর দোকানিদের চেঁচামেচিতে। ড. অনির্বাণ দত্তের চেম্বার এই মোড় থেকে দশ মিনিট হাঁটাপথ। তিনতলা পুরনো বাড়ির দ্বিতীয় তলায়, কাঠের পালিশ করা দরজা, পাশে ছোট পিতলের নেমপ্লেট — Dr. Anirban Dutta, Consultant Psychologist.
চেম্বারের ঘড়িতে তখন সাড়ে সাতটা। দিনের শেষ রোগী চলে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। অনির্বাণ ডেস্কে হেলান দিয়ে কাগজপত্র গুছাচ্ছিলেন, তখনই নিচের দারোয়ান কাঁচা গলায় ডাকল,
— “ডাক্তারবাবু, একজন এসেছেন… বলছেন খুব জরুরি।”
তিনি চোখ তুলে তাকালেন না, শুধু ঘড়ির দিকে একবার দেখলেন। “আজ তো শেষ… কাল আসতে বলো,” বললেন যান্ত্রিক ভঙ্গিতে।
দারোয়ান ইতস্তত করল। “তিনি বলছেন, কাল পর্যন্ত সময় নেই। আর… তিনি নাকি বলছেন আপনি স্বপ্নে তাঁর নাম দেখেছেন।”
অনির্বাণ থমকে গেলেন। নাম? তিনি কি ঠিক শুনলেন? ডেস্কের গ্লাসে ধরা জল তুলে এক চুমুক খেলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “ওকে পাঠিয়ে দাও।”
দরজা খুলে যখন রোগী ঢুকল, প্রথমেই চোখে পড়ল তার গলা — তামাটে চামড়ায় গাঢ় বাদামি কিছু দাগ, যেন কেউ শৃঙ্খল পরে ছিল দীর্ঘদিন। চোখ দুটি অস্বাভাবিক শান্ত, কিন্তু তাতে যেন একটা ধাতব আলো — উষ্ণ নয়, শীতল।
— “আমি ঋদ্ধি সেন,” বলল সে, বসে পড়তে পড়তে। “আপনি আমাকে চেনেন না, কিন্তু আমি আপনাকে অনেকদিন ধরে চিনি।”
অনির্বাণ ঠোঁট শক্ত করলেন। এই প্রথমবার কোনো রোগী এমনভাবে কথা শুরু করল। “আপনি আসলেই সাহায্য চাইতে এসেছেন, নাকি কোনো খেলা খেলছেন?”
ঋদ্ধি ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে বলল, “আপনি কি আজ ভোরে স্বপ্ন দেখেননি? এক ধূসর নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন, আর জলে ভাসছে কিছু… রুদ্রাক্ষের মালা?”
অনির্বাণের মেরুদণ্ড দিয়ে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সেই স্বপ্নের কথা তিনি কাউকে বলেননি। স্বপ্নে নদীর জল কালচে ছিল, আর সেই মালাগুলো অদ্ভুতভাবে ঘুরছিল স্রোতের বিপরীতে।
“আমি এসেছি কারণ আমার দেহে এক চক্র ঘুরছে,” ঋদ্ধি বলল ধীর স্বরে। “১০৮ রুদ্রাক্ষ, একে বলে রুদ্রাক্ষ চক্র। আমি… ধারক।”
এই শব্দটা — ধারক — অনির্বাণের কানে শিসের মতো বেজে উঠল। তিনি নোটপ্যাড খুলে কলম চালালেন, যেন কথাগুলো কেবল রোগীর বিভ্রম হিসেবে ধরে রাখছেন।
“এই চক্রটা কোথায়?” প্রশ্ন করলেন তিনি।
ঋদ্ধি শার্টের বোতাম খুলে বুকের ওপরের চামড়া টেনে নামাল। নিচে দেখা গেল ক্ষতচিহ্নের মতো উঁচু দাগ, কিন্তু দাগগুলো বৃত্তাকার, পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, যেন অদৃশ্য মালা ত্বকের ভেতরে পেঁচিয়ে আছে।
অনির্বাণ কপালে হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “আপনি কি শারীরিক যন্ত্রণা অনুভব করেন?”
“হ্যাঁ,” ঋদ্ধি উত্তর দিল। “কিন্তু সেটা ব্যথা নয়, আগুনের মতো উত্তাপ… আর মাঝে মাঝে শীতল হিমালয়ের হাওয়া।”
অনির্বাণ এমন রোগী দেখেছেন, যারা নিজেদের দেবতা, অবতার, বা অলৌকিক শক্তির ধারক বলে দাবি করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিজোফ্রেনিয়া বা বিভ্রান্তিজনিত ব্যাধি। কিন্তু এই রোগীর মধ্যে অন্য কিছু ছিল — যেন তার উপস্থিতি ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলছে।
চিকিৎসার নিয়মমাফিক কিছু প্রশ্ন করলেন তিনি — শৈশব, পারিবারিক ইতিহাস, দুর্ঘটনা, মানসিক আঘাত। ঋদ্ধির উত্তরগুলো ধীর, সংযত, কিন্তু মাঝেমাঝেই এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল কণ্ঠে, যেন দূর থেকে অন্য কেউ ফিসফিস করছে।
হঠাৎ সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। ঠোঁটে এল অচেনা শব্দ — প্রাচীন সংস্কৃত মন্ত্রের সুর, যা অনির্বাণ বুঝতে পারলেন না, তবে অক্ষরগুলো মাথায় গেঁথে গেল। শব্দ শেষ হতেই ঋদ্ধি চোখ খুলে বলল, “আপনিই আমার শেষ আশ্রয়।”
সেই রাতে, অনির্বাণ চেম্বার বন্ধ করে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু ঘুম এল না। বারবার মনে পড়ছিল ঋদ্ধির চোখ, সেই অদ্ভুত দাগ, আর মন্ত্রের সুর। ঘরের এক কোণে টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসের জল কাঁপতে লাগল — কোনো বাতাস ছাড়াই।
তিনি বুঝতে পারলেন না—এটা কি কেবল কাকতাল, নাকি রুদ্রাক্ষ চক্র ইতিমধ্যেই তাঁর জীবনে ঘুরতে শুরু করেছে।
অদ্ভুত দাগ ও মন্ত্র
পরদিন সকালটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব ছিল। গড়িয়াহাটের গাড়ির আওয়াজ যেন কেমন স্তিমিত, রাস্তার কাকেদের ডাকও ফাঁপা লাগছিল। অনির্বাণ জানালা খুলে দেখলেন শহরটা ঠিক আছে, তবু মনে হচ্ছিল কোনো অদৃশ্য পাতলা পরত দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, যেমন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আলো থাকে উজ্জ্বল অথচ মানুষের চোখের উপর একটা সুরক্ষিত গজ বসানো। চা খেতে খেতে তিনি রাতের নোটগুলো পড়লেন—ঋদ্ধির কথাগুলি, দাগ, শ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসা সেই মন্ত্রের ছায়া, আর নিজের অস্বস্তি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আজ রুটিন সাইকোলজিকাল অ্যাসেসমেন্ট নয়; আজ হবে পর্যবেক্ষণ, রেকর্ডিং, এবং একটি প্ররোচনা-নিরপেক্ষ সাক্ষাৎকার। ফোন তুলে ঈশাকে মেসেজ করলেন—“আজ সন্ধে, কেস: R.S., রিচুয়াল-স্পিকিং ইন্ডিউসড রেসপন্স চেক। রেকর্ডার আনবে।” পাঠানোর পর একটু থেমে আবার লিখলেন—“সাবধান থাকবে। অদ্ভুত কিছু হতে পারে।”
চেম্বারে পৌঁছে তিনি প্রথমেই একটা ছোট টেবিল সাজালেন—ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডার, একটি পুরোনো অ্যানালগ টেপরেকর্ডার (ব্যাকআপ হিসেবে), পালস অক্সিমিটার, ব্লাড প্রেসার মেশিন, শ্বাসের হার ধরার মিনি সেন্সর, আর একখানা সস্তা থার্মোমিটার। একপাশে নোটপ্যাড ও একটি তীক্ষ্ণ পেন্সিল। ঘরের বাতাসে ল্যাভেন্ডার ডিফিউজারের গন্ধ স্থির। বোর্ডে তিনি চিহ্ন দিলেন—“সেশন–২: বেসলাইন → প্রোভোকেশন–ফ্রি নারেশন → রেসপন্স লগিং → পোস্ট-সেশন অবজারভেশন।”
সাড়ে ছ’টা নাগাদ ঋদ্ধি এল। আজ তাকে আরও শান্ত লাগল, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে যেন কোনো ঘূর্ণি ঘুরছে—দুর থেকে দেখা নদীর মাঝখানে যেমন জল হঠাৎ নিজে নিজে ঘুরে গাঢ় হয়ে ওঠে। গলায় আজও হালকা বাদামি দাগ, কিন্তু অনির্বাণ প্রথমেই লক্ষ্য করলেন—দাগের বিন্যাস বদলেছে। কাল যেগুলো তির্যক আড়াআড়ি ছিল, আজ সেগুলি যেন একটি শিথিল বৃত্ত গঠন করেছে, এবং বুকের ওপর দিয়ে সামান্য সর্পিল অঙ্কন। “আপনি হাত ধুয়ে এখানে বসুন,” বললেন অনির্বাণ, নিজের গলায় অব্যক্ত কোনো সুরের কেঁপে ওঠা লুকোতে লুকোতে। পালস অক্সিমিটার লাগানোর সময় ঋদ্ধি তাকে খুব কাছে থেকে দেখে ফেলল। “আপনার চোখের নিচে কালচে ভাব,” সে ফিসফিস করে বলল, “স্বপ্নটা কালও এসেছে?” অনির্বাণ সামান্য আঁতকে উঠলেন, তারপর হাসলেন—“মনোবিজ্ঞানীদেরও তো মানুষই। মাঝে মাঝে ঘুম কম হয়।”
বেসলাইন রিডিং নেওয়া হল—পালস ৭৪, অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৮, ব্লাড প্রেসার ১২০/৮০; থার্মোমিটার দেখাল ৯৭.৮। ঘরের তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি। তারপর অনির্বাণ বললেন, “আজ আমরা কোনো ট্রিগার দেব না। আপনি মুক্তভাবে কথা বলবেন। যেখানে থামতে ইচ্ছে হবে থামবেন। কখনো যদি মনে হয় মন্ত্র আসছে, উচ্চারণ করবেন। আমি রেকর্ড করব।” ঋদ্ধি মাথা নীচু করল। “আমি অনেক সময় নিজেই জানি না কখন আসে,” সে বলল, “কিন্তু সে নিজেই জানে কখন বেরোতে হবে।”
প্রথম দশ মিনিট নিস্তব্ধতায় কাটল। রেকর্ডারটি ছোট লাল বিন্দুতে স্থিরভাবে জ্বলল। অনির্বাণ পর্যবেক্ষণ করলেন—ঋদ্ধির বুকের ওঠানামা, কাঁধের পেশির টান, আঙুলের নখে মৃদু কাঁপুনি। তারপর ধীরে ধীরে ছায়ার মতো ভেসে এল শব্দ—কোনো গলার নয়, যেন ঘরের এক কোণায় থাকা বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠে শব্দের কণা ছড়িয়ে দিল। ঋদ্ধির ঠোঁট একটু খুলল, চোখ আধ-বন্ধ, কণ্ঠে নরম কিন্তু ধাতব ধ্বনি—“॥ নমো দেব্যৈ, নমো রৌদ্র্যৈ, নমঃ শশিচন্দ্রবিম্বিনী ॥ … রৌদ্রি কালি রুদ্রাক্ষভূষিতা … হৃদং বি—” শব্দটা আটকে গেল। যেন কেউ গলার উপর হাত রেখে অক্ষরটাকে কেটে দিল। তার বদলে বেরোল অস্পষ্ট এক হুঁশশ—কাঠের মেঝে দিয়ে বাতাস বেরোনোর মতো শব্দ—তারপর নিস্তব্ধতা। রেকর্ডারের ডায়াল এক মুহূর্তের জন্য খট করে থমকে আবার ঘুরল। অনির্বাণ লক্ষ করলেন—ঋদ্ধির শ্বাসের হার বেড়ে ২২–এ উঠেছিল, এখন আবার ১৪–তে নেমে এসেছে। থার্মোমিটার তিনি নাড়লেন—ঘরের তাপমাত্রা অদ্ভুতভাবে ২৪–এ নেমে গেছে, যদিও এসি চলছে না।
ঈশা এসে পৌঁছেছিল সেশনের মাঝখানে—চুপচাপ দরজা টেনে ভিতরে, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে ব্যাগ, ভেতর থেকে ল্যাপটপ বের করে টেবিলে রাখল। অনির্বাণ ভ্রূক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন নীরব থাকতে। সেশন শেষ হলে তিনি ঋদ্ধিকে জল দিলেন, কিছু খেতে হবে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। ঋদ্ধি বলল, “আপনার কাচের গ্লাসটা একটু দিন।” গ্লাসটা হাতে নিয়ে সে একবার বুকের দাগের উপর আলতো ঠেকাল, তারপর জলটা ধীরে ধীরে খেল। রোদে ধরা পাতলা ধুলোর মতো কিছু ভেসে উঠল জলতল থেকে—বা তা কি কেবল অনির্বাণের কল্পনা? সেশন শেষ। ঋদ্ধি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আজ রাতটা আপনার ঘুম ভাঙবে দুটোয়। ভয় পাবেন না। দেখবেন আলো জ্বলছে না, তবু ঘর উজ্জ্বল।” অনির্বাণ বললেন, “আপনি নিজের দাগগুলোর ছবি তুলতে পারলে পাঠাবেন। প্রতিদিন সকালে।” ঋদ্ধি মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে গেল, যাওয়ার সময় হাতলের পাশে হাত রাখতেই পিতলের ধাতবটা হালকা কেঁপে উঠল, যেন অনেকক্ষণ শ্বাস আটকিয়ে রাখা কিছু মুক্তি পেল।
ঋদ্ধি চলে গেলে ঈশা নিঃশ্বাস ফেলল। “আপনি আমাকে আগে কেন বলেননি যে কেস এতটা ‘লিভিং রিচুয়াল’ টাইপ?” সে বলল। অনির্বাণ কাঁধ ঝাঁকালেন। “আমি নিজেও জানতাম না। শোন, রেকর্ডিংটা প্লে করো, স্লোডাউন করে, এবং স্পেকট্রোগ্রাম অ্যাপ্লাই করো। আমি দাগের স্কেচ করি।” ঈশা ল্যাপটপে সফটওয়্যার চালাল, রেকর্ডিংকে ধীর করল। স্ক্রিনে রঙের বারিতে মন্ত্রের প্রতিটি অক্ষর গাঢ় আলোর ডোরার মতো ফুটে উঠল। অনির্বাণ নোটপ্যাডে বৃত্ত এঁকে তার উপর ছোট ছোট বিন্দু টানলেন—বুকের ওপর যেভাবে দাগ দেখা গেছে, সেভাবে। একবার আঁকতে গিয়ে তিনি থমকে গেলেন—বৃত্তের চার কোণায় যে চারটি বিন্দু জোরালো, তাদের মাঝের দূরত্ব প্রায় সমান; যেন কোনো যন্ত্রচক্রের চার দিক-চিহ্ন। “কার্ডিনাল পয়েন্টস?” ঈশা ফিসফিস করল। “না,” অনির্বাণ বললেন, “বরং ২৭ নক্ষত্রের ৪ পদ—১০৮। দেখো, যদি এই বিন্দুগুলোকে ধারাবাহিকভাবে নম্বর দিই, প্রতি চতুর্থ বিন্দুতে গাঢ়তা, একটা ২৭×৪ ছন্দ।” তিনি দ্রুত নম্বর লিখতে লাগলেন—১, ২, ৩, ৪–গাঢ়, ৫, ৬, ৭, ৮–গাঢ়—এভাবে বৃত্ত ঘুরে আবার ১–এ ফিরে এলেন। “স্পেকট্রোগ্রামে দেখো,” বললেন তিনি, “এই যে শব্দটা আটকে গেল ‘হৃদং বি—’ জায়গাটায়, এর আগে ১০৭টা ক্ষুদ্র পিক; শেষ পিকের আগেই ভেঙে গেছে, যেন ১০৮-এর মুখে এসে দাঁড়িয়ে গলা টিপে ধরা হল।”
ঈশা আবার রেকর্ডিংটা চালাল, এবার আরও ধীর, ০.৫ গুণ। মন্ত্রের ভিতরে তারা দ্বিতীয় এক কণ্ঠের রেখচিত্র দেখতে পেল—প্রথম কণ্ঠ ঋদ্ধির, কিন্তু তার নিচে খুব নিম্ন-কম্পাঙ্কে আরেকটি ফিসফিস, যেন বৃষ্টি থামার ঠিক আগের বাতাস হঠাৎ মাথা নীচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। “হেয়ারিং থ্রেশহোল্ডের নীচে,” ঈশা বলল, “কিন্তু উপস্থিত। আরেকটা স্ট্র্যান্ড। কার?” অনির্বাণ চুপ করে রইলেন। অদ্ভুতভাবে তার মাথার পিছনের হাড়ে হালকা চুলকানি হচ্ছিল, যেন সেখানে কোনো নরম সুতো আলগা হয়ে ঝুলছে। তিনি সেই অনুভূতিকে নোট করলেন—“P: occipital itch during analysis.” তারপর বললেন, “কলেজ স্ট্রিটে একটা দোকান আছে—‘জ্যোতির্বেদ গ্রন্থাবলী’। ওরা তাম্রপত্রের রাবার ইমপ্রেশন, লোকমুখে শোনা মন্ত্রের সংকলন এসব রাখে। ‘রুদ্রাক্ষ চক্র’ নামটা যদি কোথাও থাকে, তো সেখানেই।” ঈশা মাথা নাড়ল। “আজই যাই?”—“এখন নয়,” অনির্বাণ বললেন, “প্রথমে ঘরটা পরীক্ষা করি।”
ঘরের চার কোণায় তিনি একটি করে চিহ্ন দিলেন—টেপ দিয়ে ছোট ক্রস। টেবিলের চারদিকে একটি কাল্পনিক বৃত্ত কল্পনা করে তিনি দাঁড়ালেন কেন্দ্রবিন্দুতে। এ সবই একধরনের থেরাপিস্টিক রিচুয়াল—নিজেকে স্থিত রাখা, জায়গাকে নিজের বলে মানা, যাতে ‘অন্য’ কোনো উপস্থিতি থাকলেও তার সংজ্ঞা মেঘাচ্ছন্ন না করে। ঈশা হেসে ফেলল—“আপনিও তো রিচুয়াল করছেন, ডাক্তারবাবু।” অনির্বাণ তির্যক হাসলেন—“যা কাজ করে, সেটাই বিজ্ঞান। আমার রিচুয়ালের নাম: Control of Variables.”
সন্ধ্যার পর কলেজ স্ট্রিট। পুরোনো বইয়ের ঝাঁপি, পানির ফোঁটায় ভেজা রাস্তার নোনা গন্ধ, গলির মুখে ধোঁয়া ওঠা চা। ‘জ্যোতির্বেদ গ্রন্থাবলী’ দোকানটা ছোট, ছাদের ফ্যান ঢিমেতালে ঘুরছে। কাউন্টারের পিছনে এক শুকনো চেহারার প্রবীণ ভদ্রলোক, চোখে জ্বলজ্বলে উচ্ছ্বাস, যেন নতুন গ্রন্থের গন্ধেই তিনি বেঁচে আছেন। “রুদ্রাক্ষ নিয়ে কোনো তন্ত্রশাস্ত্র, বিশেষ করে চক্র-সম্পর্কিত কিছু দরকার,” অনির্বাণ বললেন। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ গোঁফ চুলকে তাকালেন, তারপর নীচের তাকে হাত ঢুকিয়ে বার করলেন ঝুমঝুমে ধুলোমাখা পাতলা বই—“‘রুদ্রাক্ষ-তন্ত্র সংহিতা’—বেসরকারি মুদ্রণ, ‘৫২–র। আরেকটা—‘দেবী-চক্র-প্রকার’, লেখক অজ্ঞাত।” পাতাগুলো এঁটে গেছে, আঙুল দিয়ে আলগা করতেই ধুলোর ফোটা উড়ে চোখে ঢুকে লাগল। বইয়ের ভেতরে ছবি—বৃত্ত, রেখা, বিন্দু, মাঝে মাঝে কোনো দেবীমূর্তির খণ্ডিত অঙ্কন। এক জায়গায় পড়লেন—“রুদ্রাক্ষচক্রে ধারক সর্বদা এক নহে; চক্র স্বয়ং বেছে লয়। ধারক বাঁচে কি না, তাহা চক্রের সমাপনকালে দেব্যৈচ্ছা।” অনির্বাণ সেরে নিলেন—“আহা”—লেখাটা যেন রক্তচাপ একটু নীচে নামিয়ে দিল। আরেক জায়গায়—“১০৮ বীজে ১ ইষ্ট, ২ রক্ষক, ৩ ত্রিভাগিনী; চতুর্থে বরাভয়।” ভাবে বোঝা কঠিন, তবু মনে হল কিছু একটা চেনা। তিনি বই দুটি কিনলেন, সঙ্গে কয়েকটা ছিটেফোঁটা পামফলেট।
ফিরতি বাসে আলো কমছিল। জানলার বাইরে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানগুলোর সাইনবোর্ড উল্টো দিক দিয়ে সরে যাচ্ছিল; ভেতরে বসে তিনি খেয়াল করলেন—এক পাতায় ‘হৃ’ বীজের পাশে লেখা—“হৃ-দং”—এরপর একটা অদ্ভুত প্রতীক, যেটা দেখতে সি-অক্ষরের মতো, তার মাঝ দিয়ে সোজা রেখা। ঠিক যেমন ঋদ্ধির মন্ত্র ভেঙে গেল—“হৃদং বি—” তারপর শূন্য। তিনি পাতাটায় ছোট পেন্সিল-ক্রস দিলেন। বাস ঝাঁকুনি খেলে তার বুকের মধ্যে একটা অক্ষর যেন পাথরের মতো বসে গেল। তিনি লম্বা শ্বাস নিলেন।
রাতে বাড়ি ফিরে তিনি বইগুলো টেবিলে ছড়ালেন, একপাশে ল্যাপটপে রেকর্ডিং, অন্য পাশে নোট। ঘড়িতে তখন ১টা ৫১। চোখদুটো নিজের অজান্তে ভারী। থার্মোস থেকে কফি ঢেলে তিনি শুনতে লাগলেন সেই মন্ত্র। একসময় শব্দ বন্ধ করে রেখেছিলেন, তবু কানে অম্লান থেকে গেল এক ঝিকিমিকি ছন্দ, যেন আলোর পালস। তিনি সিগন্যাল অ্যানালাইসিস মাথায় ঘোরাতে ঘোরাতে খেয়াল করলেন—১০৮টি ক্ষুদ্র ধ্বনি-পালসের পর এক বৃহৎ বিরতি, তারপর আবার ন্যূনতম আলোর মতো একটি ধাক্কা। “রিসেট?” তিনি লেখলেন। “চক্র নিজে নিজে রিসেট নেয়?” ঠিক তখনই খেয়াল করলেন—ঘরের আলো জ্বলছে না, তবু টেবিল, বই, কাগজ—সব যেন কোনো চাঁদের কোমল আলোয় দেখা যাচ্ছে। তিনি খেয়াল না করেই জানালার দিকে তাকালেন—কার্নিশে কোনো আলো নেই, রাস্তার বাতিও ঝিমোচ্ছে। তবু ঘর উজ্জ্বল। তিনি হাত ঘড়ির দিকে তাকালেন—২টা ০০। ঋদ্ধি বলেছিল—“দুটোয় ঘুম ভাঙবে।”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন, বুকের মাঝে এক অকারণ উত্তাপ, ঠিক যেমন অনেকক্ষণ দৌড়নোর পরে বুকে ধুপধুপ করে। বাথরুমে গিয়ে মুখে জল দিলেন। আয়নায় নিজের চোখে প্রতিবিম্ব দেখা গেল—স্বাভাবিক। কিন্তু ঠোঁটের নিচে চোয়ালের কাছে খুব সূক্ষ্ম এক বাদামি ছোপ। তিনি আঙুল দিয়ে টান দিলেন—মুছে গেল। ভেজা টাওয়ালে ঘষে আবার তাকালেন—কিছু নেই। তিনি নিজের ওপর রাগ করলেন—অতিসংবেদনশীলতা! চেম্বারে কাল তিনি অ্যানালাইসিসের অংশ হিসেবে কী করবেন তার একটা পরিকল্পনা লিখলেন—“ঋদ্ধির দাগদের দৈনিক ফটোগ্রাফিক লগ। রেকর্ডিংয়ে সাব-অডিবল লেয়ার আলাদা করে বের করতে বান্ডপাস ফিল্টার। চক্রের ২৭×৪ মানচিত্র আঁকা। ঈশাকে দিয়ে শাক্ত তন্ত্রের রেফারেন্স খোঁজা—দেবী-চক্র-প্রকার।” কিন্তু পরিকল্পনা যখন তিনি খাতায় লেখেন, তখন খাতার পাতাটা অদ্ভুতভাবে সেঁটে যাচ্ছিল, যেন আর্দ্রতা বেড়ে গেছে। তিনি ঘরের মধ্যিখানে দাঁড়ালেন, আলো বন্ধ না করেও ঘর অন্ধকার ছিল; কিছুক্ষণ পরে সেই অদৃশ্য আলো ধীরে ধীরে নিভল, যেন কোনো শ্বাস ধরে রাখা দেবশিশু হঠাৎ নিঃশ্বাস ছাড়ল। তিনি বিছানায় গিয়ে শুলেন, চোখ বন্ধ করে গুনতে লাগলেন—এক, দুই, তিন… ১০৭ পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে তার ঘুম নেমে এল। ১০৮ বলা হল না।
সকালে মোবাইলে একটি ছবি। ঋদ্ধি পাঠিয়েছে। বাথরুমে দাঁড়িয়ে শর্টস পরে বুক খোলা, গলায় দাগগুলো আজ স্পষ্ট এবং একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত প্রায়। বৃত্তের ঠিক উপরে, কণ্ঠনালির গর্তের নিচে, একটি গাঢ় বিন্দু—যেন বৃত্তের কেন্দ্র। সে ছবির সঙ্গে একটি লাইন লিখেছে—“আজকের বিন্যাস। রাতের শেষে নিজে নিজে বদলে গেল। আপনি কি চান আমি একটি টাইম-ল্যাপ্স রেকর্ড করি?” অনির্বাণ ‘হ্যাঁ’ লিখলেন। তারপরই ঈশার মেসেজ—“রেকর্ডিং থেকে সাব-অডিবল লেয়ার আলাদা করেছি। অবাক করা ব্যাপার—ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেস ৪টি ক্লাস্টারে ভাগ হচ্ছে। প্রতিটা ক্লাস্টারে ২৭টি ক্ষুদ্র নড। ঠিক যেমন আপনি বলেছিলেন। আর একটা জিনিস—শেষ ক্লাস্টারে ২৬টি পূর্ণ, ১টি অসম্পূর্ণ। আপনার ‘রিসেট’ থিওরি কাজ করতে পারে।” অনির্বাণ মেসেজ টাইপ করলেন—“আজ দুপুরে চেম্বারে এসো। আমরা ‘চক্র-নকশা’ সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করব।”
দুপুরে ঈশা এলে তিনি টেবিলের ওপর বড় সাদা কাগজ পেতে দিলেন। কম্পাস, স্কেল, পেন্সিল দিয়ে একটি বড় বৃত্ত আঁকলেন। বৃত্তকে ১০৮ সমভাগে ভাগ করা প্রায় অসম্ভব; তাঁরা তাই ২৭টি সেক্টর বানালেন, প্রতিটিতে ৪টি করে টিক। প্রতিটি টিকের উপর ক্ষুদ্র নম্বর। “এখন,” বললেন অনির্বাণ, “ঋদ্ধির দাগের ছবিটা প্রিন্ট আউট করে স্কেলে স্কেল করে এই বৃত্তে ম্যাপিং করব।” ঈশা প্রিন্ট বার করে স্কেল করল; তারা দু’জন দাগগুলোর জায়গা ধরে ধরে নম্বর দিতে লাগলেন। একসময় ঈশা থেমে গেল—“দেখুন, ১৩ নম্বর থেকে ১৪–র মধ্যে একটা অদ্ভুত গ্যাপ। হয়তো এখানে কোনো দাগ নেই।” অনির্বাণ বললেন, “অথবা লুকোনো। কিংবা এটা ‘বীজ’—অ উচ্চার্য, লিখিত নয়!” তিনি চশমা খুলে কপালে হাত বুলোলেন। মাথার পিছনে আবার সেই অদ্ভুত চুলকানি। তিনি নোট করলেন—“P: itch persists at fixed time—noon?” তারপর বললেন, “ঋদ্ধিকে আজ রাতে আমরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখব—চেম্বারে। সেন্সর লাগিয়ে, ক্যামেরা রেখে, পুরো রাত টাইম-ল্যাপ্স। কোনো রিচুয়াল হবে না, কোনো মন্ত্র নয়। কেবল দেখি চক্র চলাচল করে কি না।”
সন্ধ্যা নামার আগে ঋদ্ধি এল। তাকে দেখে অনির্বাণের মনে হল সে যেন একটু ক্লান্ত, কিন্তু চোখে সেই শীতল দীপ্তি আরও চকচক করছে। তাঁরা সেন্সর লাগালেন—বুক, কাঁধ, গলা; ক্যামেরা সেট হল কোণের উঁচু তাকের উপর। টেবিলে দুইটি রেকর্ডার। ঈশা জানালার পর্দা টেনে দিল। “আপনি শুয়ে থাকুন,” অনির্বাণ বললেন, “আমরা অন্য ঘরে থাকব। কিছু হলে ইন্টারকম বাজাবেন।” ঋদ্ধি মাথা নেড়ে চোখ বন্ধ করল। ঘড়ির কাঁটা আটটা স্পর্শ করতেই টেপরেকর্ডারটা নিজে থেকে ‘ক্লিক’ করে নীচু শব্দে ঘুরতে শুরু করল—যেন লোহার কোনো ছোট চাকা কেউ আলগোছে ঠেলে দিল। অনির্বাণ ও ঈশা একই সঙ্গে তাকালেন—কেউ তো বোতামে হাত দেয়নি। অনির্বাণ এগিয়ে গিয়ে সুইচ অফ করলেন, তারপর বিদ্যুৎ সংযোগটাই খুলে দিলেন। “স্ট্যাটিক,” বিড়বিড় করলেন তিনি, “থেকে থাকতে পারে।”
রাত বাড়ল। ঈশা আর অনির্বাণ পাশের ঘরে বসে কফি খাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেয়ালের ওপারে মৃদু পায়ের শব্দ, তারপর খুব ক্ষীণ এক শব্দ—কোনো মন্ত্র নয়, বরং কোনো জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হাওয়ার হুঁশশ। অনির্বাণ ওঠার আগেই ইন্টারকম একবার ‘টিং’ করে উঠল। তিনি ছুটে গেলেন। ঋদ্ধির চোখ খোলা, কিন্তু সে যেন দেখছে না; বুকের দাগগুলো হালকা লালচে জ্যোতিতে টিমটিম করছে, একেকটা বিন্দু জ্বলে, নিভে। অনির্বাণ মন্ত্রের কোনো ধ্বনি শুনলেন না, তবু এক ছন্দ তাঁর কানে কানে বাজল, যেন দূরের মন্দিরে ড্রাম বেজে চলেছে—ডিম… ডিম… ডিম… প্রতিটি ডিমের ফাঁকে ক্ষুদ্র বিরতি, আর প্রতি ২৭–এর পরে একটু বড় শ্বাস।
ঈশা ক্যামেরার ডিসপ্লেতে টাইম-ল্যাপ্স ফ্রেম দেখছিল। “দেখুন,” সে একসময় ফিসফিস করে বলল, “বিন্দুগুলো ঘড়ির কাঁটার দিকে নয়—বিপরীতে ঘুরছে।” অনির্বাণ তাকালেন—সত্যিই, বৃত্তটা ঘুরছে, কিন্তু কোনো পেশি নড়ছে না, চামড়ার উপর দিয়ে ছায়ার মতো দীপ্তি এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে চলে যাচ্ছে। “এটা কীভাবে সম্ভব?” ঈশা বলল। “স্নায়ুর ভেতরের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কোনো ত্বক-প্রকাশ? কিন্তু তারও তো গতি এমন নয়!” অনির্বাণ বললেন, “এটা আমাদের শরীরজ্ঞানের বাইরে। কিন্তু রেকর্ড করো। সব। কোনো ব্যাখ্যা হোক, বা না হোক।” তিনি হাতের প্যাডে লিখলেন—“Cycle direction: anticlockwise; speed: ~১ বিন্দু/৪ সেকেন্ড; reset every ১০৮।”
রাত বারোটার পরে ঘরে একটা গন্ধ তৈরি হল—চন্দনের নয়, কপূরের নয়, বরং কোনো পুরোনো কাঠের গন্ধ যার মধ্যে ধাতুর শীতলতা। ঈশা দরজা খুলে করিডরে তাকাল—কেউ নেই। ফিরে এসে দেখল ঋদ্ধির ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটেছে, যেন সে কোনো খুশির খবর ভেতরে ভেতরে পাচ্ছে। হঠাৎই তার গলা দিয়ে বেরোল একটা দীর্ঘশ্বাস—তাতে অক্ষরের ছায়া, “—দং বি—”—আবার কেটে গেল। অনির্বাণ বুকের মধ্যে চমকে উঠলেন। তিনি ইশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই জায়গাটাই বারবার ভাঙছে।” ঈশা মাথা নেড়ে বলল, “সম্ভবত ‘বি’–র পরে কোনো বীজস্বর। উচ্চারণে নিষেধ—তাই শরীর নিজেই আটকে দিচ্ছে।” “অথবা,” অনির্বাণ বললেন, “কেউ আটকে দিচ্ছে। যে দ্বিতীয় কণ্ঠটা আমরা শুনেছিলাম, সে।”
রাতের শেষে যখন সেশন থামানো হল, ঋদ্ধি একবার চোখ মেলে অনির্বাণের দিকে তাকাল, যেন বলল—“আপনিই পারবেন।” তারপর নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ল। অনির্বাণ ঈশাকে বললেন, “তাকে থাকতে দাও। ভোরে জাগাব। তখন দাগের নতুন বিন্যাসের ছবি নেব।” দু’জনেই চুপচাপ পাশের ঘরে বসে রইলেন। ঘড়ি দুটো বাজাল কি না বলা মুশকিল—ঘড়ির কাঁটা হঠাৎই নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, পরে আবার নিজেই চলতে লাগল। ঈশা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, “ডক্টর, আপনি কি কখনও ভেবেছেন, ধারক মানে শুধু পাত্র নয়, রিসিভারও? যেমন রেডিও তরঙ্গ—সিগন্যাল সব জায়গাতেই আছে, কিন্তু রিসিভার না থাকলে ধরা পড়ে না।” অনির্বাণ বললেন, “তাহলে ধারককে বেছে নেয় সিগন্যাল, আর সিগন্যাল বেছে নেয় মুহূর্ত।”
ভোরের দিকে, কাঁচা আলো যখন পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকছিল, ঋদ্ধি নিজে থেকেই উঠে বসল। গলার দাগগুলো আজ আবার বদলেছে—এবার বৃত্ত সম্পূর্ণ, আর কেন্দ্রে গাঢ় বিন্দুর চারপাশে পাতলা একটি দ্বিতীয় বৃত্তের সূচনা। “দ্বৈত চক্র,” ঈশা বলল, “অথবা মণ্ডল–ভিত্তিক মণ্ডল।” অনির্বাণ গাইডলাইন অনুযায়ী ছবি তুললেন, স্কেলে স্কেলে মাপ নিলেন। ঋদ্ধি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকল, যেন কোনো প্রাচীন পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছে। তারপর সে ধীরে বলল, “আজ আপনারা উত্তর পাবেন। কিন্তু তার আগে আপনারা প্রশ্ন ঠিক করুন।” অনির্বাণ হেসে ফেললেন—“প্রশ্ন তো হাজারটা। কোনটা আগে?” ঋদ্ধি বলল, “যেটা আপনি গত রাত শেষ মুহূর্তে বলতে পারেননি।”
অনির্বাণের গলা শুকিয়ে গেল। ১০৮ বলা হয়নি। “আমার প্রশ্ন,” তিনি বললেন, “শেষ অক্ষরটা কী?” ঋদ্ধির চোখে এক ঝলক আলো জ্বলে উঠে নিভে গেল। “শেষ অক্ষর বলা যায় না,” সে বলল শান্তভাবে, “শুধু ধারক সে অক্ষর জানে। আর আপনি তো জানেন—ধারক কে।” ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা এমন ঘনীভূত হল যে ল্যাপটপের ফ্যানের ক্ষীণ শব্দটি দূরের ট্রামের ঘণ্টার মতো শোনা গেল। অনির্বাণ ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন, “ধারক তুমি।” ঋদ্ধি মাথা নেড়ে বলল, “ধারকও আমি, আর…” সে বাক্য শেষ করল না। কিন্তু বাক্য শেষ না হওয়াটাই যেন উত্তর। অনির্বাণের মাথার পিছনের চুলকানি আবার ফিরে এল—এইবার তীক্ষ্ণ, ছোট্ট নখের আঁচড়ের মতো। তিনি হঠাৎ অনুভব করলেন নিজের গলার ত্বক সামান্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে, যেমন খুব পাতলা রোদে বসলে ত্বক সেঁকে ওঠে। তিনি হাত উঠিয়ে ছুঁতেই অতি সূক্ষ্ম এক দানা আঙুলে ঠেকল—কিছু না, কিংবা সবকিছু। তিনি হাত সরিয়ে নিলেন, নীরব।
সেশন লগ শেষ করে, ঋদ্ধিকে বাড়ি পাঠিয়ে, ঈশা দরজা বন্ধ করল। টেবিলে বই, কাগজ, রেকর্ডার এলোমেলো। অনির্বাণ ধীরে ধীরে চেয়ারে বসলেন, চোখ বন্ধ করলেন, নিজের ভেতরে যে অদ্ভুত চক্রটা বাসা বাঁধতে চাইছে তাকে তিনি নিঃশব্দে স্বীকার করতে না-চাইতে চাইতেও চিনলেন। তিনি নোটপ্যাডে শেষ লাইনটি লিখলেন—“চক্রের শব্দ-ছন্দ ১০৮–এর মুখে এসে থামে। শেষ অক্ষর উচ্চারণ-বর্জ্য। ধারকের সংজ্ঞা সংক্রমণশীল—পর্যবেক্ষকও পরিণত হতে পারে।” এরপর তিনি পেন্সিল নামিয়ে রাখলেন। জানালার বাইরে শহর তখন জেগে উঠছে। সূর্য ওঠার ঠিক আগে যে ক্ষণস্থায়ী ফ্যাকাশে আভা, তা ঘরের মধ্যে একঘেঁয়ে আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ল। কাচের জলে ক্ষুদ্র ঢেউ উঠল এক মুহূর্তের জন্য—যেন কারও অদৃশ্য আঙুল হালকা ছোঁয়াছুঁয়ি করে দিয়ে গেল। তারপর সব স্বাভাবিক। কেবল কাগজের ওপর পেন্সিলের ধুলোয় নিজের অজান্তে তিনি একটি অক্ষর এঁকে ফেলেছিলেন—একটা ‘বি’, যার মাঝে সরু একটি রেখা, আর তার পাশে ছোট্ট বিন্দু। তিনি টের পেতেই আঁচড়ে মুছে দিলেন। অথচ মুছে দেওয়ার পরও অক্ষরটি যেন কাগজের ভেতরের সাদা স্তরে থেকে গেল, চোখে দেখা যায় না, কিন্তু স্পর্শে টের পাওয়া যায়—যেন দাগ, যা রাত পোহালেই নতুন করে বিন্যাস বদলাবে।
প্রাচীন নথি
ঋদ্ধিকে বাড়ি পাঠিয়ে সেই বিকেলটা অনির্বাণ একা কাটালেন। চেম্বারের জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা আলো এসে পড়ছিল ডেস্কের ওপর, আর তার ওপরে ছড়ানো ছিল দুটি ধুলোমাখা বই—রুদ্রাক্ষ-তন্ত্র সংহিতা আর দেবী-চক্র-প্রকার। বইগুলোর পাতাগুলো ভঙ্গুর, হালকা আঙুল চাপতেই মিহি ধুলো উঠে বাতাসে ভাসতে লাগল, যেন পুরনো কোনো স্মৃতি জেগে উঠেছে। ঈশা সকালেই বলে গিয়েছিল, আজ রাতটা যেন একা থাকেন না; কিন্তু তিনি জানতেন, এই সব লেখা পড়া বাইরের কারও সঙ্গে বসে করা যাবে না—এখানে মনোযোগের এমন এক স্তর দরকার, যেখানে কেউ না থাকলেই আসল শব্দগুলো ধরা দেয়।
প্রথম বইটির ভূমিকায় এক লাইন বড় অক্ষরে লেখা—“রুদ্রাক্ষ চক্র ধারককে পায়, ধারক চক্রকে নয়।” অনির্বাণ এই লাইনটায় বারবার থেমে গেলেন। রোগী যদি সত্যিই ধারক হয়, তাহলে কি চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কাজ সেটাকে দূর করা, নাকি সম্পূর্ণ রূপে গঠন সম্পন্ন হতে দেওয়া? পৃষ্ঠাগুলো উল্টে দেখতে দেখতে তিনি থমকে গেলেন—একটি মলিন তাম্রপত্রের রাবার ইমপ্রেশন এখানে সেঁটে রাখা। বৃত্তাকার নকশা, চারদিকে ১০৮ ক্ষুদ্র খোপ, প্রতিটিতে মন্ত্রাংশের অক্ষর। আর কেন্দ্রবিন্দুতে একটিমাত্র প্রতীক—হৃ-বীজ, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি ক্ষুদ্র রেখা ও বিন্দু, যা সাধারণ মুদ্রণে দেখা যায় না।
তিনি টেবিলের ম্যাগনিফায়ার তুলে নিলেন। প্রতীকের চারপাশে খোদাই করা আছে মৃদু দাগ—যেন আঙুলের ছাপ, কিন্তু মানুষের নয়; গঠনটি অদ্ভুতভাবে সর্পিল, প্রতিটি সর্পিলের ভিতরে ক্ষুদ্র বিন্দু, একেকটিতে আবার ক্ষুদ্র ত্রিভুজ আঁকা। অনির্বাণ মনে মনে গুনলেন—২৭টি সর্পিল, প্রতিটিতে চারটি বিন্দু। “একই বিন্যাস…” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “যেটা আমরা ঋদ্ধির দাগে দেখেছি।”
দ্বিতীয় বই দেবী-চক্র-প্রকার-এর ভেতরে ভাষা আরও জটিল। সংস্কৃত শ্লোকের পাশে অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক ফার্সি লিপিতে ব্যাখ্যা, যেন একে একে শতাব্দী পেরিয়ে ভাষা বদলে বদলে এখানে এসে পৌঁছেছে। একটি অধ্যায়ে লেখা—
“যদি চক্রের ধারক অসম্পূর্ণ বিন্যাসে থাকে, তবে ধ্বংস আসন্ন। যদি বিন্যাস পূর্ণ হয়, তবে ধারক হবে দেবীর দেহ। তবে দেবীর ইচ্ছা যদি কেবল আংশিক অবতরণ, তবে ধারক জীবিত থেকে যাবে—কিন্তু সে আর মানুষ থাকবে না।”
এই লাইনটা পড়েই অনির্বাণের বুকের ভেতর চাপা শব্দ হল, যেন ভেতরে কোনো ভারী দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। তিনি নিজেকে যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে জানতেন, কিন্তু এই সব বর্ণনার সঙ্গে ঋদ্ধির শারীরিক লক্ষণ মিলিয়ে ফেলতে তাঁর একটুও কষ্ট হচ্ছিল না।
সন্ধে নামল। গলির বাতিগুলো জ্বলল, জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হল দূরের আলো। বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হল, আর সেই ফোঁটার শব্দ তাঁর কানে মন্ত্রের ছন্দ হয়ে বাজতে লাগল—এক, দুই, তিন… সাতাশ… আটাশ… আটাশে বড় বিরতি… ঠিক যেমন ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল ঋদ্ধির দাগের ঘূর্ণন।
টেবিলে রাখা নোটপ্যাডে তিনি দুই বইয়ের নকশা মিলিয়ে আঁকলেন একটি বৃহৎ চক্রমানচিত্র। ১০৮ বিন্দুর উপর তিনি পেন্সিলের ক্ষুদ্র বিন্দু টানলেন, তারপর কেন্দ্রে হৃ-বীজ চিহ্ন। শেষ বিন্দুতে এসে কলম থামল। এখানে কিছু নেই—না অক্ষর, না বিন্দু। শুধু শূন্য জায়গা। তিনি সেই জায়গায় প্রশ্নচিহ্ন আঁকলেন।
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ হল—নরম নক, যেন দ্বিধা নিয়ে কেউ কড়া নাড়ছে। তিনি চমকে উঠে দরজা খুললেন। বাইরে কেউ নেই। শুধু মাদুরের উপর একটি সাদা খাম। তাতে কেবল লেখা—“শেষ অক্ষর জানতে হলে, প্রথম ধারকের মৃত্যু জানো।”
খাম খুলে ভেতরের কাগজ হাতে নিয়েই তিনি বুঝলেন এটি পুরনো, পাতলা, প্রায় ভেঙে পড়া অবস্থায়। কাগজে হাতের লেখা নয়, বরং লালচে রঙে ছাপা একখানা ছোট্ট বৃত্তের ছবি—প্রায় ঋদ্ধির দাগের মতো, কিন্তু এর ভেতরের কেন্দ্রে মানুষের মুখ। মুখটি অদ্ভুত—একচোখ খোলা, আরেক চোখে রুদ্রাক্ষ গেঁথে দেওয়া।
কাগজের নিচে একটি শব্দ—“ভদ্রেশ্বর”। অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে চিনলেন নামটা—হুগলির ধারে ভদ্রেশ্বর শ্মশান, যেখানে এখনো লোকমুখে নানা তান্ত্রিক আখ্যান প্রচলিত। তিনি মনে মনে হিসেব করলেন—প্রথম ধারক কি সেখানে মারা গিয়েছিল?
রাত তখন সাড়ে দশটা। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু রাস্তা ফাঁকা, বাতাসে নদীর নোনা গন্ধ। তিনি জানতেন এই মুহূর্তে সেখানে যাওয়া উচিৎ নয়—তবু মনে হচ্ছিল, কিছু যেন তাকে ঠেলে নিয়ে যাবে সেই জায়গায়।
ঘরে ফিরে তিনি বইগুলোর শেষ কয়েক পৃষ্ঠা পড়লেন। রুদ্রাক্ষ-তন্ত্র সংহিতা-তে লেখা—
“ধারকের মৃত্যু হলে, চক্র তার দেহ ত্যাগ করিয়া বাতাসে ছড়াইয়া পড়ে। তখন নতুন ধারক বেছে লয়, সাধারণত নিকটবর্তী কেউ। কিন্তু যদি কোনো পর্যবেক্ষক চক্রের সম্পূর্ণ বিন্যাস জেনে যায়, চক্র প্রথমে তাকে পরীক্ষা করে—তার স্বপ্ন, তার গলা, তার শ্বাস।”
এই লাইন পড়েই তাঁর বুক ঠান্ডা হয়ে এল। তিনি কি ইতিমধ্যেই সেই ‘পর্যবেক্ষক’? মাথার পিছনের চুলকানি হঠাৎ এমন তীব্র হয়ে উঠল যে তিনি হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। মনে হল চুলের গোড়ায় কেউ যেন ক্ষুদ্র বিন্দু এঁকে দিচ্ছে—একটি, দুটি, তিনটি…
অন্ধকারে জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকল হালকা চাঁদের আলো। বইয়ের পাতাগুলো যেন নিজে নিজে উল্টে গেল—শেষ পৃষ্ঠায় এসে থামল। সেখানে লেখা—
“শেষ অক্ষর কেবল রাত্রির তৃতীয় প্রহরে উচ্চারিত হয়। ধারক তখন দুই দিক দেখতে পায়—এক দিকে মৃত্যু, আরেক দিকে অবতরণ। যে দিক সে নেয়, সেটিই দেবীর ইচ্ছা।”
তিনি পাতা বন্ধ করলেন, বইটি স্তূপের ওপর রাখলেন। বাইরের বাতাসে নদীর গন্ধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মনে হল, দূরে কোথাও ঢাক বাজছে—ধীরে, গম্ভীর, আর প্রতি সাতাশতম বীটে এক দীর্ঘ বিরতি।
টেবিলের ওপর রাখা সাদা খামটির দিকে তাকিয়ে তিনি ঠিক করলেন—পরের দিন ভদ্রেশ্বর যাবেন। প্রথম ধারকের মৃত্যু যদি খুঁজে পাওয়া যায়, হয়তো শেষ অক্ষরের রহস্যও খুলে যাবে। কিন্তু বুকের গভীরে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন—যতটুকু পথ তিনি হেঁটেছেন, এখন আর ফিরে আসা সম্ভব নয়।
ঘরের কোণে রাখা কাচের গ্লাসের জলে তখন অদ্ভুতভাবে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে—যেন অদৃশ্য কোনো চক্র ঘুরছে তার ভেতরে, ঠিক যেমন ঋদ্ধির দাগে, আর হয়তো তাঁর নিজের গলার নীচেও।
প্রথম প্রভাব
ভদ্রেশ্বরের শ্মশান গ্রামের ধারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনির্বাণের বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত চাপ তৈরি হলো। রাস্তার ধুলো ও ভিজে পাতা তার পা স্পর্শ করে, আর দূরের অন্ধকারে শ্মশানের কাঁঠালবৃক্ষের ছায়া যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে। তিনি বুঝেছিলেন—আজ রাতটি শুধুই পর্যবেক্ষণ নয়, এটি পরীক্ষা, এবং পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
শ্মশানের প্রবেশ পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি লক্ষ্য করলেন—মাটি ভিজে আছে, কিন্তু কোনো মানুষের পায়ের ছাপ নেই। যেন কেউ এখানে চলাচল করেনি দীর্ঘদিন। দূরে খাঁ খাঁর শব্দ—এক ধরনের পুরনো ঢাকের প্রতিধ্বনি—হঠাৎ তাঁর কানে পৌঁছালো। প্রতিটি ঘুমন্ত গ্রামবাসীর মনকে কাঁপিয়ে দেওয়া সেই ধ্বনি যেন তার নিজের হৃৎকম্পকে প্রতিধ্বনিত করল।
তিনি থেমে দাঁড়িয়ে খামটি খুললেন। ভেতরে একটি নোট—কেবল দুটি শব্দ লেখা, লাল কালি দিয়ে: “ধারকের ছায়া।” অনির্বাণ বুঝতে পারলেন, প্রথম ধারক যে মৃত্যু দেখেছে, তার ছায়া এখনও চক্রে ঘুরছে। ভেতর থেকে হিম হিম শিহরণ বয়ে গেল।
শ্মশানের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখতে পেলেন দূরের কবরস্তানে এক আংশিক ভাঙা মূর্তি—মূর্তির চেহারা মানুষের, কিন্তু চোখ বন্ধ। ঘাড়ের কাছে লাল রঙের দাগ, যা অনেকটা রুদ্রাক্ষ চক্রের বিন্যাসের মতো। অনির্বাণের হাত নিজে নিজে খামে থাকা নোটের দিকে গেল, এবং তিনি বুঝলেন—মূর্তির প্রতিটি দাগ সেই ১০৮ চক্রের অংশ।
হঠাৎ বাতাসে হালকা আভা—মৃদু লাল আলো—ভাঙা মূর্তির উপরে। অনির্বাণ দেখলেন, আলো ধীরে ধীরে মানুষের চোখের দিকে চলল, এবং মূর্তির মুখ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তিনি পিছু হটে গেলেন, কিন্তু মনে হল—চোখের আলো তাঁকে অনুসরণ করছে। সেই মুহূর্তে তিনি বুঝলেন, রুদ্রাক্ষ চক্র শুধু ঋদ্ধির শরীর নয়, এখন তাঁর নিজস্ব জীবনের উপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
মনে পড়ল বইয়ের সেই লাইন—“যদি পর্যবেক্ষক চক্রের সম্পূর্ণ বিন্যাস জানে, চক্র তাকে পরীক্ষা করে—তার স্বপ্ন, তার গলা, তার শ্বাস।” আর আজ রাতটি ছিল সেই পরীক্ষা।
একটি হালকা কাঁপুনি তাঁর হাত ও পায়ে ছড়িয়ে গেল। তিনি দেখলেন, মাটিতে ধীরে ধীরে ১০৮ ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো আলো জ্বলছে, সর্পিল আকারে ঘুরছে, একে একে যেন তার চারপাশের বাতাসও ঘূর্ণন করছে। হৃদয়স্পন্দন বেড়ে চলল; মনে হল, বাতাসের প্রতিটি কণায় চক্রের ক্ষুদ্র স্পর্শ।
সেই মুহূর্তে, অনির্বাণের চোখের সামনে অদ্ভুত দৃশ্য ফুটে উঠল—ঋদ্ধি, চেম্বারে বসে, তার শরীর ধীরে ধীরে আলোতে ভেসে উঠছে। রুদ্রাক্ষ চক্রের প্রতিটি বিন্দু তার শরীরে চিহ্ন হয়ে আবদ্ধ হচ্ছে। এবং সেই বিন্দুগুলো যেন ধীরে ধীরে তাঁর নিজের শরীরের প্রতিটিকে স্পর্শ করছে।
ভয় আর বিস্ময়ের মধ্যে তিনি প্রথম অনুভব করলেন—চক্রের প্রভাব তার মানসিক স্থিতিশীলতাকেও স্পর্শ করছে। সাধারণ মানুষ এইভাবে ছোঁয়ানোর কথা ভাবতেও পারবে না। তার চোখে অন্ধকারে অদ্ভুত আলো, কানে অজানা সুর, এবং শরীরে এক অদ্ভুত ভারী চাপ—যেমন কারো হাতে ধরিয়ে দেওয়া গোপন বস্ত্র।
তিনি মাটিতে হাত রেখে বিশ্রাম নিলেন, তবে মনে হল—শরীর আর মানসিকতা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। চোখ বন্ধ করলেই দেখা যায়, মূর্তির চোখের আলো ধীরে ধীরে তার নিজস্ব চোখে ঢুকছে। সেই আলো যেন তার মনকে পরীক্ষা করছে, হৃদয়কে ঘুরিয়ে দিচ্ছে, এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতিটি ছন্দকে চক্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে।
হঠাৎ বাতাসে শব্দ—মৃদু ফিসফিসানি, যা শোনা গেল যেন চারপাশের গাছপালার ভিতর থেকে। শব্দটি অনির্বাণকে বলল: “প্রথম প্রভাব শেষ হয়েছে না। তুমি এখন অংশ। ঘুমে চক্র দেখবে।”
চোখের সামনে ধূসর আলো ভেসে উঠল। অনির্বাণ দেখলেন, নিজের কক্ষের দৃশ্য। কিন্তু সব জিনিস উল্টো, সর্পিল চিহ্নিত। ঋদ্ধি উপস্থিত, কিন্তু মুখে অদ্ভুত নিঃশ্বাস। তার হাতের আঙুলে সেই চক্রের ছোট ছোট বিন্দু। এবং তার মুখের অর্ধেক হাসি, অর্ধেক ভয়।
তার মন ভেঙে গেল। বুঝতে পারলেন, এবার আর ফিরে যাওয়া যাবে না। চক্র ইতিমধ্যেই শরীরে প্রবেশ করেছে, এবং রাত্রির প্রথম প্রহরে, ঘুমের মধ্যে, অনির্বাণ তার প্রভাব অনুভব করবে।
বৃষ্টির ফোঁটা যেন আবার শুরু হল। কিন্তু এবার তারা শুধু জানালার কাঁচে পড়ছে না—শরীরের ওপরও। অনুভব করলেন, প্রতিটি ফোঁটা তার ত্বকে স্পর্শ করছে, কিন্তু স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে তা মানসিকতা ও স্মৃতিকে জাগিয়ে দিচ্ছে।
একটু পরে, ধীরে ধীরে চোখের ভেতর অন্ধকার জমল। প্রতিটি শ্বাসে চক্রের ছায়া বেড়ে চলল। স্বপ্নের ভিতরে, তিনি দেখলেন—এক অচেনা পাথরের মন্দির, যেখানে কেন্দ্রে একটি চক্রের প্রতীক জ্বলছে। প্রতিটি বৃত্তে ছোট ছোট চিহ্ন—১০৮ রুদ্রাক্ষ।
তাদের মাঝে, একটি বিন্দু তার চোখের সামনে ঘূর্ণন করল। এবং সেই বিন্দু একটিমাত্র বার্তা দিল—“যে অংশ নেবে, সে আর পুরনো মানুষ থাকবে না। কিন্তু যে মানবে, সে দেবীর ইচ্ছার ধারক হবে।”
অনির্বাণ বুঝলেন, প্রথম প্রভাব শুধু মানসিক ছিল না; এটি শরীরের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে গেছে। পরবর্তী তিন দিন, তিনি ঘুম, চেতনাশীলতা, এবং বাস্তবতার মধ্যে এক অদ্ভুত সীমান্তে থাকবেন। এবং সেই সময়েই চক্রের শেষ গোপন রহস্য—শেষ অক্ষর—প্রকাশিত হবে।
তিনি শ্মশান থেকে ধীরে ধীরে ফিরলেন। প্রতিটি ধাপ যেন বাতাসে ঘূর্ণিত রুদ্রাক্ষ চক্রের একটি অংশ। ঘরে ফিরে ডেস্কে বসে, জানালার ফাঁকে চাঁদের আলো পড়ে বইগুলোর ওপরে। কিন্তু অনির্বাণ জানতেন—আজ রাতের স্বপ্নে চক্রের প্রভাব আরও গভীর হবে, এবং তিনি হয়তো প্রথমবারই বুঝবেন—ঋদ্ধি শুধু ধারক নয়, এখন তিনি নিজেও চক্রের অংশ।
চূড়ান্ত পরীক্ষা
ভদ্রেশ্বর থেকে ফেরার পর তিন রাত কেটে গেছে। প্রতিটি রাতের স্বপ্ন যেন একই ধারায় চলেছে—একটি কালো আকাশ, যার নিচে অজস্র রুদ্রাক্ষের মালা শূন্যে ঝুলছে, ধীরে ধীরে ঘুরছে এক অবাস্তব সর্পিল পথে। মাঝখানে সবসময় থাকে একটি ফাঁকা বিন্দু, শূন্যের মতো, কিন্তু তার দিকে তাকালে মনে হয় যেন চোখের মণি থেকে আলো চুষে নিচ্ছে। অনির্বাণ বুঝে গিয়েছিলেন, চক্র এখন আর কেবল ঋদ্ধির ভেতর নেই—এটি তাঁর শ্বাস, তাঁর দৃষ্টি, এমনকি তাঁর চিন্তার ভেতরও স্থাপন হয়ে গেছে।
চতুর্থ রাতের শেষে, ঘুম ভাঙার পর গলার ঠিক নীচে আঙুল দিয়ে তিনি অনুভব করলেন এক ক্ষুদ্র উঁচু দানা—যেন চামড়ার নিচে রুদ্রাক্ষের খোসা। আয়নায় দেখলেন, বাদামি ছোপ, কেন্দ্রে একটি বিন্দু, আর চারপাশে ম্লান সর্পিল দাগ। সেই দাগগুলো একেবারে ঋদ্ধির দাগের মতো, কিন্তু ক্ষুদ্রাকারে। মনে পড়ল বইয়ের সেই বাক্য—“ধারকের সংজ্ঞা সংক্রমণশীল—পর্যবেক্ষকও পরিণত হতে পারে।”
ঈশা পরদিন সকালে চেম্বারে এসে অবাক হয়ে বলল, “আপনার গলায়… এগুলো কি নতুন?” অনির্বাণ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলেন, “চক্রের ছোঁয়া পেয়েছি। এখন বোঝার পালা—শেষ অক্ষরটি কী।”
ঋদ্ধি সেইদিন দুপুরে এলো, কিন্তু তার চেহারায় এমন ক্লান্তি, যেন সে বহুদিন ঘুমায়নি। তার চোখের গভীরে এক প্রকার অতল দীপ্তি, এবং কথার মাঝে এক অদ্ভুত নিশ্চুপতা। সে এসে সরাসরি বলল, “আজ রাতেই হবে চূড়ান্ত পরীক্ষা। দেবী আসবেন।”
“পরীক্ষা কোথায়?” অনির্বাণ জিজ্ঞাসা করলেন।
“যেখানে প্রথম ধারক মারা গিয়েছিল,” ঋদ্ধি উত্তর দিল। “ভদ্রেশ্বর নয়—ওটা ছিল শুধু ছায়া। আসল স্থান হলো শহরের উপকণ্ঠে, এক পরিত্যক্ত রাজবাড়ির শ্মশানঘর।”
রাত ন’টার মধ্যে তারা পৌঁছোল। রাজবাড়িটি ভগ্নপ্রায়, দেয়ালে শেওলা, ছাদের ফাঁকে বাদুড়। মাটির নিচে আর্দ্রতা, বাতাসে পচা ফুলের গন্ধ। শ্মশানঘরের কেন্দ্রে একটি বৃত্তাকার পাথরের প্ল্যাটফর্ম—যেখানে কালের ক্ষয়ে অর্ধেক ভেঙে পড়া রুদ্রাক্ষের খোদাই এখনও টিকে আছে। পাথরের চারপাশে ১০৮টি ক্ষুদ্র খোপ, প্রতিটিতে ভাঙা মালার দানা।
ঋদ্ধি প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রে দাঁড়াল। “আজ রাতের তৃতীয় প্রহরে, চক্র সম্পূর্ণ হবে। আপনি যদি ধারক না হন, তবে এখানেই থামুন।”
কিন্তু অনির্বাণ এগিয়ে গেলেন। তাঁর শরীরে তখন এমন এক স্রোত বইছে যা ভয়কে অতিক্রম করে গেছে। প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়াতেই বুকের মধ্যে ধুকপুকানি শুরু হলো—প্রথমে স্বাভাবিক, তারপর তালে তালে, আর হঠাৎই তা মিলে গেল এক অদ্ভুত ছন্দে—২৭টি ধাপ, এক বিরতি, আবার শুরু।
চারপাশের বাতাস ঘন হয়ে এল। কোথাও কোনো বাতি নেই, তবু অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ছে খোপগুলো থেকে। খোপের ভিতরের রুদ্রাক্ষগুলো একে একে জ্বলে উঠছে—প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়… সাতাশতমে এক দীর্ঘ বিরতি। সেই বিরতিতে অনির্বাণের মাথার ভেতর শোনা গেল এক ফিসফিস—“শেষ অক্ষরের জন্য প্রস্তুত হও।”
ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল। তার গলা দিয়ে বেরোচ্ছে সেই একই মন্ত্র—“॥ নমো দেব্যৈ… রৌদ্রি কালি রুদ্রাক্ষভূষিতা… হৃদং বি—” কিন্তু এবার শব্দটি ভাঙল না। বরং তার কণ্ঠের সঙ্গে মিলল আরেকটি কণ্ঠ—অনির্বাণের নিজের। তিনি টেরও পাননি, কিন্তু তাঁর ঠোঁট মন্ত্র উচ্চারণ করছে একই সুরে।
মন্ত্রের শেষ অংশ এসে থামল ফাঁকা জায়গায়। হঠাৎ, বুকের ভেতরে এক প্রবল শ্বাসের ধাক্কা, আর মাথার পিছনের সেই দীর্ঘদিনের চুলকানি যেন ফেটে গেল। চোখের সামনে তীব্র সাদা আলো। আলো থেকে ভেসে এলো এক নারীমূর্তি—চোখে আগুন, কপালে চাঁদের দাগ, গলায় অসংখ্য রুদ্রাক্ষের মালা।
তিনি বললেন না, তবু তাঁর কণ্ঠ অনির্বাণের মাথার ভিতর বাজল—“শেষ অক্ষর উচ্চারণ করো, আর সম্পূর্ণ হও।”
ঋদ্ধি তখন স্থির, হাত দুটি আকাশের দিকে তোলা। অনির্বাণ অনুভব করলেন, চক্রের প্রতিটি বিন্দু একসঙ্গে জ্বলে উঠছে—ঋদ্ধির শরীরে, তাঁর নিজের গলায়, আর প্ল্যাটফর্মের খোপে।
তারপর… শেষ অক্ষর।
একটি ধ্বনি, যা মানুষের ভাষায় নেই, কিন্তু উচ্চারণ করতেই মনে হল সমস্ত শরীর ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, আবার এক নতুন রূপে গড়ে উঠছে।
প্ল্যাটফর্মের চারপাশে বাতাস ঘুরপাক খেতে লাগল, যেন ঘূর্ণিঝড়। রুদ্রাক্ষের মালাগুলো শূন্যে উঠে ঘুরছে, তারপর একে একে মিলিয়ে যাচ্ছে সেই নারীমূর্তির দেহে।
আলো নিভে গেলে, অনির্বাণ দেখলেন—ঋদ্ধি আর নেই। প্ল্যাটফর্মে শুধু একটি রুদ্রাক্ষ পড়ে আছে, যার কেন্দ্রে ছোট্ট বিন্দু ও রেখা—ঠিক শেষ অক্ষরের প্রতীক।
দূরে, রাতের আকাশে একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো বাতাস বয়ে গেল। এবং অনির্বাণ জানলেন—এখন তিনি ধারক।
মহামায়ানন্দের প্রত্যাবর্তন
শেষ অক্ষর উচ্চারণের পর তিন দিন যেন এক ধরনের ধোঁয়াটে স্বপ্নের ভেতর কেটে গেল। অনির্বাণ বুঝতে পারছিলেন, তাঁর শরীর আগের মতো নয়—শ্বাসের ভেতর অন্য এক ছন্দ ঢুকে গেছে, রক্তে এক ধরনের উষ্ণতা জমে আছে, যা রাতে বেড়ে ওঠে, আর দিনে মৃদু থাকে। গলার নিচের বাদামি চক্রের বিন্যাস এখন সম্পূর্ণ; কেন্দ্রে সেই রহস্যময় বিন্দু, যা তিনি শেষ রাতে প্রথমবার দেখেছিলেন।
ঋদ্ধির অনুপস্থিতি তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল। প্ল্যাটফর্মে যে একমাত্র রুদ্রাক্ষ পড়ে ছিল, সেটি এখন তাঁর ডেস্কের ড্রয়ারের ভেতরে রাখা, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় ড্রয়ারের ভেতরে থেকেও তা নরম গুঞ্জন তুলছে। ঈশাকে কিছু বলেননি—জানেন, এ ধরনের অনুভূতি বোঝানো যায় না, আর বোঝালেও বিশ্বাস পাবে না।
চতুর্থ দিনের রাতে, যখন তিনি বইপত্র গুছিয়ে ঘুমোতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল এল। অপর প্রান্তে কর্কশ, ধীর কণ্ঠ—
— “ড. দত্ত, চক্র সম্পূর্ণ হয়েছে। এখন ইতিহাস বোঝার সময়।”
— “আপনি কে?” অনির্বাণ জিজ্ঞাসা করলেন।
— “মহামায়ানন্দ গিরি,” কণ্ঠ বলল, “যাকে আপনি খুঁজতে গিয়েছিলেন, কিন্তু খুঁজে পাননি।”
নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর চাপা ধ্বনি হলো। বইয়ের পাতায় পড়া সেই প্রাচীন তান্ত্রিক, যিনি নাকি চক্রের প্রথম রক্ষক… তিনি কি সত্যিই জীবিত?
মহামায়ানন্দ বললেন, “কাল ভোরে বেলুড়ঘাটের ওপারের জঙ্গলে আসুন। চক্র যদি আপনাকে ধারক করেছে, তবে আমাদের দেখা হবে।”
ভোরবেলায়, কুয়াশা ঢাকা গঙ্গার ধারে, অনির্বাণ পৌঁছোলেন। জঙ্গলের ভেতর মাটির গন্ধ, ভিজে পাতার গন্ধ, আর দূরে মৃদু শঙ্খধ্বনি। কুয়াশার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, এক বৃদ্ধ বসে আছেন পাথরের আসনে। সাদা দাড়ি, গায়ে গেরুয়া, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। তাঁর চোখে এমন দীপ্তি, যেন ভিতরে পুরো রাতের আকাশ জমে আছে।
— “আপনি ধারক হয়েছেন,” মহামায়ানন্দ বললেন, “কিন্তু ধারকের মানে জানেন না।”
— “আপনি জানেন?” অনির্বাণের কণ্ঠে অবিশ্বাস।
— “আমি জানি, কারণ আমি ছিলাম ধারক—তিন যুগ আগে। তারপর স্বেচ্ছায় চক্র ত্যাগ করেছি।”
মহামায়ানন্দ ব্যাখ্যা করতে লাগলেন—চক্র কেবল এক অলৌকিক শক্তি নয়, এটি এক প্রাচীন চুক্তি। দেবী একসময় তান্ত্রিক সাধকদের দিয়েছিলেন এই যন্ত্র—১০৮ রুদ্রাক্ষের বিন্যাস—যাতে তাঁর শক্তি মানুষের ভেতর সংরক্ষিত থাকে, যুগে যুগে প্রয়োজন হলে তা জাগ্রত হয়। ধারকরা কেবল বাহন নয়; তারা দেবীর ইচ্ছার বাহক, যা প্রায়শই ব্যক্তিগত জীবনের বিনাশ ডেকে আনে।
— “ঋদ্ধি কোথায়?” অনির্বাণ জিজ্ঞাসা করলেন।
মহামায়ানন্দ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “ঋদ্ধি এখন চক্রের ছায়া মাত্র। শেষ অক্ষর উচ্চারণে তার অংশ আপনার মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু তার আত্মা এখনো মুক্তি পায়নি। যদি চক্র সম্পূর্ণ রূপে স্থায়ী হয়, তার ছায়া আপনার শরীরেই বাসা বাঁধবে।”
বৃদ্ধ তাঁকে একটি তাম্রপত্র দিলেন। তাতে খোদাই করা বৃত্তাকার চিত্র, কেন্দ্রে সেই একই প্রতীক—বিন্দু ও রেখা। “এটাই চক্রের মানচিত্র,” তিনি বললেন, “কিন্তু এর শেষ ধাপ তুমি এখনো জানো না। শেষ ধাপ হলো ‘প্রত্যাবর্তন’—যখন ধারক দেবীর শক্তি ব্যবহার করে চক্রকে আবার উৎসে ফিরিয়ে দেবে। নইলে চক্র ধীরে ধীরে ধারকের মন ও দেহকে গ্রাস করে নেবে।”
অনির্বাণ কাগজটি মুঠোয় চেপে ধরলেন। মাথায় ভিড় করল অজস্র প্রশ্ন—শেষ অক্ষর উচ্চারণের পর যে আলো দেখেছিলেন, তা কি প্রত্যাবর্তনের সূচনা, নাকি ধ্বংসের? আর তিনি আদৌ দেবীর ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারবেন কি?
মহামায়ানন্দ উঠে দাঁড়ালেন। “তুমি আগামী পূর্ণিমায় চক্রের মণ্ডল সম্পূর্ণ করবে। গঙ্গার মাঝে যেখানে দুই স্রোত মিশেছে, সেখানে। যদি সফল হও, চক্র তোমার ভেতর থেকে মুক্ত হবে, আর ঋদ্ধির ছায়া শান্তি পাবে। ব্যর্থ হলে… তুমি হবে চক্রের স্থায়ী ধারক, এবং তোমার মানবজীবনের অবসান হবে।”
বৃদ্ধের কণ্ঠে এমন স্থিরতা ছিল যে অনির্বাণের শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। তিনি প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি থাকবেন?”
মহামায়ানন্দ ধীরে হাসলেন। “ধারক হতে হয় একা। তবে দেবী থাকবেন।”
ফেরার পথে, অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, জঙ্গলের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পাথর তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। বাতাসে ভেসে আসছে মন্ত্রের সূক্ষ্ম ছন্দ—২৭, বিরতি, ২৭… যেন গাছের পাতায়ও চক্রের বিন্যাস খোদাই হয়ে আছে।
ঘরে ফিরে তিনি তাম্রপত্রটি ডেস্কে রাখলেন। গলার নিচের চক্রের দাগ হালকা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, যেন আলো শুষে নিচ্ছে। চোখ বন্ধ করতেই আবার সেই মন্দিরের দৃশ্য—কিন্তু এবার কেন্দ্রে মহামায়ানন্দ বসে আছেন, আর চারপাশে জ্বলন্ত রুদ্রাক্ষ ভাসছে। বৃদ্ধের চোখে সরাসরি তাকাতেই শোনা গেল—“প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত হও, ধারক।”
প্রত্যাবর্তনের পূর্ণিমা
পূর্ণিমার দিন ভোর থেকেই শহরের আকাশ অদ্ভুতভাবে স্বচ্ছ, অথচ আলো যেন ধুলো দিয়ে ফিল্টার করা। অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, প্রতিটি মুহূর্ত তার গলার চক্রের বিন্যাসকে আরও স্পষ্ট করছে। সকালে আয়নায় দেখলেন—কেন্দ্রের বিন্দুটি আর ম্লান নয়, বরং ভিতরে ক্ষুদ্র সোনালি আলো নাচছে। গলার ত্বক গরম, অথচ আঙুলে ছোঁয়া দিলে ঠান্ডা।
ঈশা তখনও সব জানে না—শুধু জানে, পূর্ণিমার রাতে অনির্বাণকে গঙ্গার ধার ঘিরে এক বিশেষ ‘রিচুয়াল অবজার্ভেশন’-এ অংশ নিতে হবে। কিন্তু তার চোখে উদ্বেগের ছায়া। “আপনি নিশ্চিত? আপনি যদি ফিরে না আসেন…”
অনির্বাণ শুধু বললেন, “ফেরার পথ আমার হাতেই নেই, ঈশা। আমি কেবল শেষটা দেখতে চাই।”
মহামায়ানন্দ নির্দেশ দিয়েছিলেন—“দুই স্রোতের মিলনস্থলে দাঁড়াবে, যেখানে জল একে অপরকে পরীক্ষা করে।” সেই জায়গা বেছে নেওয়া হল বেলুড় ও দক্ষিণেশ্বরের মাঝখানের গঙ্গার একটি অদৃশ্য বাঁক, যেখানে নদীর স্রোত বিভক্ত হয়ে আবার মিলেছে। শীতের জলে স্রোত ভারী, আর তলদেশে পলি জমে বৃত্তাকার ঘূর্ণি তৈরি করেছে—মহামায়ানন্দের ভাষায়, “জলের চক্র, স্থলচক্রের প্রতিবিম্ব।”
সন্ধ্যার আগেই অনির্বাণ পৌঁছে গেলেন। আকাশে ফ্যাকাশে চাঁদ উঠেছে, ধীরে ধীরে রূপালী আভা ছড়াচ্ছে গঙ্গার জলে। স্রোতের শব্দের সঙ্গে মিশে আছে দূরের মন্দিরের ঘণ্টা, আর কোথাও কোথাও ভেসে আসছে ধূপের গন্ধ। মহামায়ানন্দ ইতিমধ্যেই উপস্থিত, গঙ্গার তীরে কালো আসন পেতে বসেছেন। তাঁর পাশে একটি তাম্রপত্র, কয়েকটি রুদ্রাক্ষের মালা, আর এক অদ্ভুত আকারের শঙ্খ।
— “সময় হয়েছে,” বৃদ্ধ বললেন, “চক্রকে উৎসে ফেরানোর।”
অনির্বাণ আসনের কেন্দ্রে বসতেই অনুভব করলেন, গলার চক্র ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠছে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এক অদ্ভুত তাল নিয়েছে—২৭, বিরতি, ২৭… যেন নদীর ঢেউও একই তাল মেনে ভাঙছে তীরে।
মহামায়ানন্দ তাম্রপত্রটি তাঁর হাতে দিলেন। “এটি মণ্ডলের মানচিত্র। মন্ত্র উচ্চারণ করবে তুমি। প্রতিটি বিন্দুতে মন স্থাপন করতে হবে। শেষ বিন্দুতে পৌঁছলে দেবী সিদ্ধান্ত নেবেন—তুমি মুক্ত হবে, নাকি স্থায়ী ধারক হবে।”
অনির্বাণ চোখ বন্ধ করলেন। মন্ত্র শুরু হল—প্রথমে ধীরে, তারপর ক্রমে তীব্র। গলার ভেতর দিয়ে শব্দের কম্পন কাঁপিয়ে তুলল তাঁর শরীর। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি বিন্দু আলোর দানার মতো খুলে যাচ্ছে, আর সেই আলো গঙ্গার জলে মিশে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে, চোখের সামনে ভেসে উঠল ঋদ্ধির মুখ—শূন্য, কিন্তু চোখে অনুরোধ। “আমাকে ফিরিয়ে দাও।” তিনি মন্ত্রের তৃতীয় পর্বে ঢুকে পড়লেন। গলার চক্রের উজ্জ্বলতা এখন বাইরে থেকে স্পষ্ট, মহামায়ানন্দের চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে।
শেষ বিন্দুর ঠিক আগে, বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। আকাশে চাঁদের চারপাশে রক্তিম আভা। নদীর স্রোত থেমে গেছে মনে হল। এবং সেই মুহূর্তে, মাথার ভিতর দেবীর কণ্ঠ—“শেষ অক্ষর উচ্চারণ করো, আর উৎসে ফিরিয়ে দাও।”
অনির্বাণ অনুভব করলেন, শেষ অক্ষর ঠোঁটে এসে গেছে। কিন্তু উচ্চারণের মুহূর্তে বুকের ভেতর দ্বন্দ্ব—তিনি কি সত্যিই চক্র ত্যাগ করতে চান? এই শক্তি, এই সংযোগ, এই ভয়াবহ দীপ্তি—সব হারাতে পারবেন?
ঋদ্ধির ছায়া আবার চোখের সামনে, এবার কেবল মুখ নয়—পুরো দেহ, যার গলা শূন্য, যেন চক্রের বিন্যাস টেনে নিয়ে গেছে। অনির্বাণের মনে হল, এই ছায়া মুক্তি না পেলে চক্রও পূর্ণ হবে না।
এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে তিনি শেষ অক্ষর উচ্চারণ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে গলার চক্র থেকে আলো বেরিয়ে গেল, নদীর ওপর এক উজ্জ্বল মণ্ডল তৈরি হল। সেই মণ্ডল ঘুরে ঘুরে মিলিয়ে গেল স্রোতের গভীরে।
মহামায়ানন্দ চোখ বন্ধ করলেন। “তুমি পেরেছো,” তিনি বললেন, “চক্র উৎসে ফিরেছে।”
অনির্বাণ হাত ছুঁয়ে দেখলেন—গলার দাগ ম্লান, বিন্দু নেই, শুধু ফিকে ছায়া। বুকের ভেতর হালকা শূন্যতা, কিন্তু তার সঙ্গে এক আশ্চর্য স্বস্তি। দূরে কোথাও, যেন হাওয়ার মধ্যে, ঋদ্ধির কণ্ঠ—“ধন্যবাদ।”
পূর্ণিমার আলোয় নদী আবার স্বাভাবিক স্রোতে ফিরে এলো।
আখড়ার নিষিদ্ধ কক্ষ
পূর্ণিমার রাতে গঙ্গার স্রোতে চক্র প্রত্যাবর্তন করার পর অনির্বাণের ভেতরে যেন এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছিল। গলার দাগ প্রায় মিলিয়ে গেছে, শরীর হালকা, স্বপ্নে আর সেই উন্মত্ত আলো দেখা যায় না। কিন্তু শান্তির ভেতরেও এক অদ্ভুত শূন্যতা। শক্তি হারিয়ে ফেলার পর মনে হচ্ছিল, যেন কিছু অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
মহামায়ানন্দ বলেছিলেন, “তুমি উৎসে ফিরিয়ে দিয়েছো। এখন তোমার পথ শেষ।” অথচ অনির্বাণ অনুভব করছিলেন—চক্রের আসল রহস্য এখনও আড়ালে। কেননা, প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তে তিনি এক ঝলক দেখেছিলেন—এক বিশাল যন্ত্রচক্র, নদীর স্রোতের নিচে নয়, বরং কোনো অন্ধকার কক্ষে। সেই কক্ষে শত শত বছর ধরে কেউ প্রবেশ করেনি।
ঈশা একদিন সাহস করে বলল, “আপনি মুক্ত হয়েছেন, তবু আপনার চোখে সেই একই দীপ্তি। আপনি কি কিছু দেখেছেন, যা আমাদের বলা হয়নি?” অনির্বাণ ধীরে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ। এক কক্ষ। এক আখড়ার ভেতর। যেখানে চক্রের আসল যন্ত্র লুকানো।”
তদন্ত করতে গিয়ে জানা গেল, হিমালয়ের ধারে যেখানে ঋদ্ধি শৈশবে ছিল, সেই আখড়া আজও অর্ধভাঙা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়রা বলে, আখড়ার ভেতরে একটি নিষিদ্ধ কক্ষ আছে, যেটি কেউ খোলেনি বহু প্রজন্ম। ভেতরে নাকি এমন কিছু আছে, যা মানুষকে গ্রাস করে।
অনির্বাণ, ঈশা ও মহামায়ানন্দ—তিনজন রওনা দিলেন সেই আখড়ার দিকে। পাহাড়ি পথে শীতল হাওয়া, আকাশে মেঘ জমেছে। আখড়ায় পৌঁছে তারা দেখল—অর্ধেক ভেঙে পড়া কাঠামো, ছাদের ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে, আর দেওয়ালে পুরনো মন্ত্র খোদাই। চারপাশে নির্জনতা, কেবল বাতাসের শব্দ।
মধ্যভাগে একটি দরজা, কালো পাথরের। দরজার গায়ে ১০৮টি ক্ষুদ্র গর্ত, প্রতিটিতে একসময় রুদ্রাক্ষ বসানো ছিল, এখন শূন্য। মহামায়ানন্দ কাঁপা গলায় বললেন, “এই কক্ষ নিষিদ্ধ। আমি বহু বছর আগে এখানে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস করিনি। কারণ জানতাম—একবার ঢুকলে ফেরার নিশ্চয়তা নেই।”
কিন্তু অনির্বাণ অনুভব করলেন—এই দরজা খুলতেই হবে। কেননা চক্র হয়তো নদীতে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে, কিন্তু এর উৎস এই কক্ষেই।
দরজা ঠেলে খোলার মুহূর্তে এক দমকা বাতাস বেরিয়ে এল, যেন শতাব্দীর জমে থাকা শ্বাস মুক্তি পেল। ভেতরে অন্ধকার, কেবল মৃদু আলো ফুটছে দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে। কক্ষের কেন্দ্রে বিশাল এক পাথরের যন্ত্র—একটি বৃত্তাকার মণ্ডল, যাতে খোদাই করা ১০৮ খোপ। কিন্তু প্রতিটি খোপ পূর্ণ, অক্ষত, যেন সময়ের প্রভাব পড়েনি।
যন্ত্রের কেন্দ্রে রাখা একটি অদ্ভুত বস্তু—রুদ্রাক্ষ নয়, বরং মানুষের খুলি। খুলির কপালে খোদাই করা সেই একই প্রতীক—বিন্দু ও রেখা।
ঈশা বিস্মিত হয়ে বলল, “এটা… প্রথম ধারকের?”
মহামায়ানন্দ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “হ্যাঁ। প্রথম ধারক যে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তাঁর খুলি এই কক্ষে সংরক্ষিত। আর এই খুলির ভেতরেই চক্রের শেষ অক্ষর লুকানো।”
অনির্বাণ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। খুলির ফাঁপা চোখের গর্তের ভেতর থেকে যেন আলো বেরিয়ে আসছে। তিনি অনুভব করলেন, সেই আলো আবার ডাকছে তাঁকে। বুকের ভেতরে আবার ধুকপুক শুরু হলো, গলার শিরা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তিনি ফিসফিস করে বললেন, “কেন আমাকে আবার ডাকা হচ্ছে? আমি তো চক্র ফেরিয়েছি।”
খুলির ভেতর থেকে শব্দ ভেসে এল—“তুমি ফেরাওনি। তুমি কেবল শাখা বন্ধ করেছো। মূল চক্র এখনও এখানে, এই কক্ষে। তুমি যদি সত্যিই ধারক হও, তবে এই মূল চক্র ভাঙতে হবে। নইলে তা যুগে যুগে নতুন ধারক খুঁজবে।”
ঈশা ভয়ে চিৎকার করে বলল, “না, ডক্টর, ভেতরে যাবেন না!” কিন্তু অনির্বাণ বুঝলেন, তাঁর সামনে পথ মাত্র একটি।
তিনি পাথরের যন্ত্রে হাত রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো কক্ষ কেঁপে উঠল। দেওয়ালের মন্ত্রগুলো জ্বলতে শুরু করল। মহামায়ানন্দ চিৎকার করে বললেন, “সাবধান! মূল চক্র জাগছে!”
অনির্বাণ অনুভব করলেন, বুকের ভেতর থেকে আলো বেরিয়ে এসে যন্ত্রের সঙ্গে মিশছে। তাঁর চোখের সামনে ঝড়ের মতো ভেসে উঠল শত শত মুখ—পূর্বের ধারকরা, যারা এই চক্রের দ্বারা গ্রাস হয়েছিল। তাদের কণ্ঠ একসঙ্গে বলল—“মুক্তি চাই!”
তিনি বুঝলেন, প্রত্যাবর্তন অসম্পূর্ণ ছিল। নদীতে যা মিশেছিল তা ছিল কেবল প্রতিফলন, মূল উৎস রয়ে গেছে এখানে। এখন তাঁকে যা করতে হবে, তা হলো এই মূল যন্ত্র ভেঙে ফেলা।
কিন্তু প্রশ্ন—ভাঙলে কি তিনি বাঁচবেন? নাকি প্রথম ধারকের মতো তিনিও এই কক্ষের চিরন্তন ছায়ায় বন্দী হবেন?
মহামায়ানন্দ শেষবারের মতো সতর্ক করলেন—“ধারক, মনে রেখো—একবার এই যন্ত্র ভাঙলে, দেবীর শক্তি ছড়িয়ে পড়বে। তা গ্রহণ করার ক্ষমতা যদি না থাকে, তুমি শেষ হয়ে যাবে।”
অনির্বাণ চোখ বন্ধ করলেন। বুকের ভেতরে সেই শেষ অক্ষর আবার জেগে উঠছে। তিনি জানলেন—এবার আর কোনো দ্বিধা নয়।
চূড়ান্ত বিসর্জন
আখড়ার নিষিদ্ধ কক্ষ তখন জ্বলজ্বল করছে অদ্ভুত আলোয়। ১০৮ খোপের প্রতিটি বিন্দু একসঙ্গে উজ্জ্বল, যেন প্রাচীন কোনো সূর্য মাটির নিচে বন্দী হয়ে আছে। বাতাস ভারী, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট। ঈশা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিল, কিন্তু তার কণ্ঠ এই কক্ষের ভিতরে পৌঁছোচ্ছিল না। অনির্বাণের চোখের সামনে শুধুই আলো, আর সেই আলোর কেন্দ্রে খুলি—প্রথম ধারকের অবশিষ্ট।
খুলির চোখের গর্ত থেকে যেন শূন্যতার কালো ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে, অথচ তার মধ্যেই টলমল করছে রুদ্রাক্ষের মতো দীপ্ত বিন্দু। বুকের ভেতর থেকে অনির্বাণ শুনলেন শত শত কণ্ঠস্বর—প্রথম ধারক থেকে শুরু করে অগণিত মানুষ, যারা চক্রের দ্বারা গ্রাস হয়েছে। তাদের আর্তনাদ, তাদের মুক্তির আরজি যেন কক্ষকে ভরে ফেলেছে।
মহামায়ানন্দ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— “এখন সিদ্ধান্ত তোমার, ধারক। যদি যন্ত্র ভেঙে দাও, এই সমস্ত আত্মা মুক্তি পাবে। কিন্তু তুমি নিজেও তাদের সঙ্গে মিশে যাবে। যদি যন্ত্র অক্ষত রাখো, তবে তুমি বেঁচে থাকবে—কিন্তু চক্র আবার নতুন ধারক খুঁজবে।”
অনির্বাণ জানতেন, দুটোই ভয়াবহ পথ। তিনি নিজের বুকের দিকে তাকালেন। দাগগুলো আবার জ্বলছে, কেন্দ্রে আলো ধুকপুক করছে। তাঁর ভেতরে দ্বন্দ্ব—জীবন রক্ষা করবেন, নাকি মুক্তি দিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করবেন।
ঋদ্ধির মুখ হঠাৎ ভেসে উঠল তাঁর সামনে। চোখে সেই একই অনুরোধ—“আমাকে মুক্ত করো।” অনির্বাণের বুক ভারী হয়ে উঠল। তিনি তো ডাক্তার, মানুষের যন্ত্রণা কমানোই তাঁর কাজ। আর আজ এই মুহূর্তে, অসংখ্য আত্মার যন্ত্রণা তাঁর হাতে বাঁধা।
তিনি তাম্রপত্রের কেন্দ্রে হাত রাখলেন। মুহূর্তে সমস্ত যন্ত্র কেঁপে উঠল। দেওয়ালের মন্ত্র জ্বলজ্বল করতে করতে আগুনের শিখার মতো লাফিয়ে উঠল। খোপের প্রতিটি রুদ্রাক্ষ আলো ছড়াতে ছড়াতে ভেসে উঠল শূন্যে, তারপর ঘুরতে লাগল এক মহাজাগতিক সর্পিলের মতো।
অনির্বাণ বুক ভরে শেষ অক্ষর উচ্চারণ করলেন—সেই অক্ষর, যা এতদিন ধরে তাঁকে তাড়া করেছে, যা ভাষার বাইরে। শব্দটি বেরোতেই কক্ষের সমস্ত আলো ভেঙে পড়ল। খুলির কপাল ফেটে গেল, ভেতর থেকে আগুনের মতো ঝলক বেরোল।
ঈশা দরজার বাইরে থেকে কেবল দেখতে পেলেন—পুরো আখড়া কেঁপে উঠছে। মাটির ভেতর থেকে গর্জন, যেন ভূমিকম্প। ধুলো উড়ছে, পাথর ভাঙছে। আর কক্ষের ভেতরে উজ্জ্বল সাদা আলো—যেন আকাশের সমস্ত পূর্ণিমা একসঙ্গে নেমে এসেছে।
আলো মিলিয়ে গেলে দেখা গেল—পাথরের যন্ত্র ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। খোপগুলো ফাঁকা, রুদ্রাক্ষ নেই। খুলিও ভস্মীভূত। কিন্তু অনির্বাণ… তিনি নেই। কক্ষের কেন্দ্রে কেবল একটি রুদ্রাক্ষ পড়ে আছে, তাতে সূক্ষ্ম বিন্দু ও রেখা—শেষ অক্ষরের প্রতীক।
ঈশা কক্ষে ঢুকে কাঁপতে কাঁপতে রুদ্রাক্ষটি তুলে নিল। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল। মনে হল, অনির্বাণ কোথাও মিলিয়ে গেছেন, কিন্তু তাঁর আত্মা মুক্ত হয়েছে সেই অসংখ্য ধারকের সঙ্গে।
মহামায়ানন্দ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে জল চিকচিক করছে, কণ্ঠে গভীরতা—
— “তিনি বিসর্জন দিয়েছেন। চক্র ভেঙে গেল। শত শত আত্মা মুক্তি পেল। এবার থেকে রুদ্রাক্ষ চক্র আর কোনো ধারক খুঁজবে না।”
কক্ষের ভেতরের আলো নিভে গেল। চারদিকে নিস্তব্ধতা। কেবল ঈশার হাতে থাকা সেই রুদ্রাক্ষটি ক্ষীণ উষ্ণতায় স্পন্দিত হচ্ছিল।
সে মুহূর্তে, ঈশা অনুভব করলেন—ড. অনির্বাণ দত্ত কেবল একজন চিকিৎসক ছিলেন না; তিনি হয়েছিলেন শেষ ধারক, যিনি নিজের বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এক ভয়ংকর অভিশাপ ভেঙে দিলেন।
কিন্তু তাঁর ভেতরের প্রশ্ন রয়ে গেল—শেষ অক্ষরটি কি সত্যিই চক্রকে ধ্বংস করেছে? নাকি এটি অন্য কোনো রূপে আবার ফিরে আসবে, অন্য কোনো আখড়ায়, অন্য কোনো যুগে?
গঙ্গার জলে পূর্ণিমার প্রতিফলন তখনো ঝিলমিল করছে। বাতাসে মৃদু ফিসফিসানি—“ধারক শেষ হয়েছে, কিন্তু দেবী অনন্ত।”
দেবীর নীরবতা
আখড়ার নিষিদ্ধ কক্ষ ধ্বংসের পর পাহাড়ি অঞ্চলে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। যেন বাতাসও থেমে গেছে, পাখিরা ডাকছে না। কেবল ভাঙা পাথরের ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরোচ্ছে মিহি ধুলো, আর তার ভেতরে আলো-আঁধারের লুকোচুরি। ঈশা এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে অনির্বাণের বিসর্জিত রুদ্রাক্ষ। সেই ক্ষুদ্র দানা উষ্ণ, যেন ভেতরে প্রাণ আছে।
মহামায়ানন্দ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন সব শেষ।” কণ্ঠে আশ্বাস, কিন্তু চোখে অদ্ভুত সঙ্কোচ। ঈশা জিজ্ঞেস করল, “তাহলে ডক্টর দত্ত… তিনি কোথায়?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। তাঁর চাহনিতে ছিল এক ভারী নীরবতা। ঈশার মনে হচ্ছিল, অনির্বাণ হারিয়ে যাননি, তিনি কেবল অন্য এক স্তরে গিয়েছেন—যেখানে মানুষের ভাষা পৌঁছায় না।
সেই রাতে ঈশা ঘুমোতে পারেনি। আখড়ার ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে সে রুদ্রাক্ষটি বারবার হাতের মুঠোয় ঘুরিয়েছে। প্রত্যেকবার মনে হয়েছে, দানাটির ভেতরে মৃদু স্পন্দন আছে—যেন হৃদস্পন্দন। আর প্রতিটি স্পন্দন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে অনির্বাণের কণ্ঠস্বর।
ভোর হওয়ার আগে সে স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নে একটি নদী—অসীম, আকাশে চাঁদ নেই, কিন্তু জল ঝিকমিক করছে। নদীর মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন অনির্বাণ, সাদা পোশাক, চোখে শান্তি। তিনি দূর থেকে ঈশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি নেই, অথচ আছি। দেবী নীরব, কিন্তু তিনি সর্বদা। রুদ্রাক্ষকে বাঁচিয়ে রেখো, কারণ সেটি এখন তোমার পরীক্ষা।”
স্বপ্ন ভেঙে গেলে ঈশার হাতে এখনও দানাটির উষ্ণতা টের পাওয়া গেল।
দিন কয়েক পর তারা কলকাতায় ফিরে এল। শহরের কোলাহল, ট্রামের ঘণ্টা, বইপাড়ার ভিড়—সব আগের মতো। কিন্তু ঈশার চোখে পৃথিবী অন্যরকম হয়ে গেছে। মানুষের হাসি, রাস্তায় ভিখারির হাত, ট্রাফিকের আওয়াজ—সবকিছুর নিচে যেন এক নীরব সুর বেজে চলেছে। সেই সুর চক্রের মতোই পুনরাবৃত্ত, অসীম।
ঈশা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে কাজ শুরু করল—চক্রের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা। তবে আর প্রকাশ্যে নয়, গোপনে। কারণ সে জানত, সত্য যদি প্রকাশ পায়, আবারও কোনো পাগল অনুসন্ধানী এটিকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
একদিন আর্কাইভের পুরনো এক ফোল্ডারে সে একটি অদ্ভুত নোট পেল। তাতে লেখা—
“দেবীর নীরবতা মানে তাঁর অনুপস্থিতি নয়, বরং মানুষের পরীক্ষা। ধারকরা চলে যায়, কিন্তু চক্র নীরব রূপে রয়ে যায়। যখন মানুষ অন্ধকারে ডুবে যায়, দেবী তখন আবার ফিরে আসেন।”
ঈশার বুক ধক করে উঠল। রুদ্রাক্ষটি তখনও তার ব্যাগে রাখা। সে কি সত্যিই শেষ? নাকি দেবী শুধু অপেক্ষা করছেন?
সেদিন রাতে ঘুম ভাঙল হঠাৎ। জানালার বাইরে চাঁদের আলো ঢুকছে। টেবিলের ওপর রাখা রুদ্রাক্ষটি নিজে নিজে গড়িয়ে পড়ল, মেঝেতে পড়তেই ক্ষুদ্র শব্দ হলো—টুক্। ঈশা কাঁপতে কাঁপতে তুলে নিল। আলোয় দেখল, দানাটির কেন্দ্রে ক্ষুদ্র রেখা ও বিন্দু—শেষ অক্ষরের প্রতীক—এখন আরও স্পষ্ট।
তার মনে হল, অনির্বাণ আবারও কথা বলছেন—“তুমি-ই ধারক, এখন।”
সে ভয়ে চোখ বন্ধ করল, কিন্তু ভেতরে অনুভব করল, বুকের মাঝে উষ্ণ আলো জেগে উঠছে।
সমাপ্ত


