তীর্থঙ্কর দেবনাথ
রবিবারের সকালটা বরাবরই অন্যরকম। শহর যেন একটু দেরিতে চোখ মেলে, অটো-ট্যাক্সির হর্নের কোলাহল নেই, দোকানদারের গলা নেই, শুধু রয়েছে এক ধরনের অলস নিস্তব্ধতা, যেন শহরও একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ঋজু চক্রবর্তী এই নিস্তব্ধতা ভালোবাসে, বরং সারা সপ্তাহ তার যান্ত্রিক অফিসজীবনের মাঝে সে শুধু এই একদিনের জন্য অপেক্ষা করে। তার ছোট্ট ব্যাচেলর ফ্ল্যাটের সাদা রঙের বারান্দাটা ঠিক উত্তর দিকে মুখ করা, আর সেই মুখোমুখি বারান্দাটিতেই থাকেন একজন মেয়ে—ঐশানী সেনগুপ্ত। বয়স হবে হয়তো পঁচিশ-ছাব্বিশ, প্রতিবার চুল বাঁধেন আলগা খোঁপায়, কখনো ফুলদানিতে গাঁদাফুল রাখেন, আর সকালবেলা বারান্দায় বসে মাটির কাপ হাতে চা খান। তারা কখনো কথা বলেনি, এমনকি একবারও নয়, কিন্তু এই “না-কথা”র মধ্যেও একটা জোরালো সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে—কমপক্ষে ঋজুর মনে তো বটেই। ঋজু সপ্তাহের ছ’টা দিন অফিসের ডেডলাইন, ক্লায়েন্টের রিভিশন, আর ক্রমাগত ইমেলের মধ্যে ডুবে থাকলেও রবিবার সকালে তার মন পুরোপুরি ঐশানীর বারান্দাতেই আটকে থাকে। আজও তাই হলো। সকাল আটটায় সে তার বিছানা ছেড়ে উঠে রান্নাঘরের ফিল্টার থেকে জল নিয়ে একটা ড্রিপ কফি বানিয়ে বারান্দায় এসে বসল। গায়ে হালকা রঙের কুর্তা, চোখে ঘুমঘুম ভাব। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সে চোখ রাখল সামনের বারান্দায়।
ঐশানী ততক্ষণে এসে বসেছেন। আজ তার পরনে হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি, চুলের খোঁপায় একটা বকফুল গুঁজে রেখেছেন, আর মুখে সেই শান্ত অভিব্যক্তি—যা কোনো আয়নার প্রয়োজন পড়ে না, নিজস্ব আলোয় জ্বলজ্বল করে। তার হাতে মাটির কাপ, যার ধোঁয়া আস্তে আস্তে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। পাশের টুলে রাখা আছে একটি বই—সম্ভবত বুদ্ধদেব বসুর কোনো কবিতার সংকলন। ঐশানীর চোখ ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রতিটি পৃষ্ঠার অক্ষর, আর মাঝে মাঝে সে গুনগুন করে গান ধরছে—শুধু ঠোঁট নড়ছে, শব্দ শুনতে পাওয়া যায় না, কিন্তু সুর যেন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। ঋজু নিজের অজান্তেই কফির কাপটা দুই হাতে ধরে বসে থাকে, ঠিক যেমন কোনো পূজোর সময় কেউ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটি—যার সঙ্গে তার কোনো আলাপ নেই, যাকে সে নিজের ভাষায় চেনে না—তার প্রতিদিনের অভ্যেস হয়ে উঠেছে। সে বুঝতে পারে, এই দৃশ্য যদি এক রবিবারেও না ঘটে, তার ভেতরের কিছু যেন ফাঁকা হয়ে যাবে। অথচ সে জানে, এই ভালো লাগার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। এ কেবল দেখা, নিরব অনুভব, প্রতিটি রবিবারে গড়ে ওঠা একরকম সঙ্গ—যা শুধু একতরফা।
আজকের সকালে হঠাৎ একটা নতুন ব্যাপার ঘটল। ঐশানী হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য, কিন্তু ঋজুর মনে হলো সেই সময়টা যেন থমকে গেছে। চোখে চোখ পড়ার সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুত কম্পন তৈরি হলো ঋজুর শরীরে। সে ভেবে পাচ্ছিল না কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। সে কি হেসে নেবে? মাথা নাড়বে? হাত তুলবে? কিন্তু কিছুই করতে পারল না। কেবল বসে রইল, কাপটা ঠোঁটে লাগিয়েও চুমুক না দিয়ে। ঐশানী তার চোখ নামিয়ে আবার বইয়ের পাতায় ডুবে গেলেন, যেন কিছুই হয়নি। অথচ ঋজুর মন তখন দুলছে সমুদ্রের ঢেউয়ে। সে জানে, আজকের দিনটা আলাদা। আজ তারা মুখে কিছু না বলেই কিছু বলে ফেলেছে। সেই কিছুটা সে নিজে বানিয়ে নিক বা না-ই-ইক, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে কোথাও একটা পরিবর্তন হয়েছে। তার কাছে আজকের রবিবারটা ঠিক আগের মতো আর নয়। সে জানে না, ঐশানী আদৌ তাকে কখনো খেয়াল করে কিনা, অথবা তার চোখের ভাষা পড়তে পারে কিনা। কিন্তু তাও, সে যেভাবে মুগ্ধ হয়ে রবিবারের বারান্দায় এই মেয়েটিকে দেখছে, সেটা তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সে নিজেকে বুঝিয়ে নেয়—ভালোবাসা মানেই সবসময় পাওয়া নয়, কখনো কখনো কেবল ভালোভাবে তাকিয়ে থাকাই যথেষ্ট। রবিবারের বারান্দায় বসে থাকা এই একতরফা ভালবাসা যেন তার জীবনের এক অনবদ্য ধ্যান হয়ে উঠেছে।
–
ঋজু বুঝতে পারছিল, তার ভেতরে কেমন একটা নরম ও অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে—যেটার নাম সে দিতে পারে না, অথচ যার অস্তিত্ব প্রতিটি রবিবার তার হৃদয়ে আরও গভীরভাবে ছায়া ফেলে। ঐশানী তার জীবনে কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেয়নি, তবুও প্রতিদিনের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যায় তার চিন্তায়, চোখে, নিঃশ্বাসে সে এক অলিখিত নাম হয়ে রয়ে গিয়েছে। কখনো জানলায় হাওয়া এলেই সে ভাবত, ঐশানীর ঘরের পর্দাও কি একইভাবে উড়ে ওঠে? বিকেলে ট্রেনের শব্দ শুনে ভাবে, ঐশানীও কি তখন বইটা বন্ধ করে একটু থমকে শোনে? অথবা তার চায়ের কাপও কি কাঁপে ঋজুর মতোই ছোট শব্দে? এইসব ছোট ছোট অনুভবে, অদৃশ্য সেতুবন্ধনে গড়ে উঠেছিল এক নিঃশব্দ ভালোবাসার সংসার—যেখানে কথার চেয়ে বেশি জায়গা পেত দেখা, অনুভব, আর প্রত্যাশাহীন ভালো লাগা। অনেক সময় সে রাতে ঘুমানোর আগে বারান্দার গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকত, যেখানে ঐশানীর কিছু গাছও দেখা যেত। টবে রাখা তুলসী গাছ, কাঁচা লঙ্কার গাছ, আর মাঝে মাঝে এক-আধটা কাঁচা গোলাপের ঝোপ। ঋজুর মনে হতো, ঐশানীর হাতের ছোঁয়া পেয়ে গাছগুলোও যেন বেশি প্রাণবন্ত। এমনকি একবার সে লক্ষ্য করেছিল, ঐশানী যে দিন টবে জল দেয় না, সে দিন পাতাগুলোর চকচকে ভাবটাও যেন ম্লান হয়ে যায়। এই পর্যবেক্ষণ, এই নীরব অনুরাগ, এক পেশাদার ডিজাইনারের চেয়েও অনেক বেশি সূক্ষ্ম ছিল—এটা ছিল এক প্রেমিকের মন।
কিন্তু এই অনুভব একতরফা—ঋজু তা জানে, স্বীকারও করে। তবুও সে বাঁচে এই অভ্যেসে, এই একতরফা অনুভবে। সপ্তাহের বাকি ছয়দিন সে ঐশানীকে দেখে না—তবুও তার চুলের গন্ধ, মুখের শান্তি, শাড়ির ভাঁজ, এমনকি চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ানোর ভঙ্গিও তার স্মৃতিতে অক্ষত থাকে। সে মাঝে মাঝে মনে মনে চিঠি লেখে ঐশানীকে, যেমন: “তোমায় জানি না আমি, কিন্তু তোমাকে দেখি। আর এই দেখা আমার কাছে প্রেম হয়ে দাঁড়ায়।” আবার কখনো লিখে, “তুমি জানো না আমি কে, তবু রবিবারের বারান্দায় বসে তুমি আমায় পূর্ণ করো।” এসব চিঠি সে কখনোই লেখে না কাগজে, শুধু কল্পনায় গাঁথা হয় সেইসব অদেখা পংক্তি, যা হয়তো জীবনে কখনো বলা হবে না। এমনকি কখনো কখনো রাতে স্বপ্নেও ঐশানী আসে—সে আর ঐশানী একসঙ্গে বসে আছে এক নতুন বারান্দায়, হয়তো পাহাড়ের ধারে, আর তাদের মধ্যে চলছে অনর্গল কথা। অথচ সকালে উঠে দেখলে, তার সেই ছোট্ট বারান্দায় কেবল একা সে আর ধোঁয়াহীন এক কাপ কফি।
ঐশানী নিজের জগতে ব্যস্ত। সকালে স্কুলে যান, দুপুরে ফিরে বারান্দায় কয়েক মিনিট বসেন। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকে, কিন্তু সেই ক্লান্তি কোনো অভিযোগে রূপ নেয় না। বরং সে যেন নিঃশব্দে বাঁচতে জানে, নিজের ছায়া নিজে হয়ে। তার চোখে এক ধরনের স্বপ্নময়তা আছে, যা তাকে রহস্যময় করে তোলে। একবার ঋজু দেখেছিল, ঐশানী হঠাৎ হেসে উঠেছেন—কোনো বইয়ের পাতায় কি এমন কিছু পেয়েছিলেন হয়তো—আর সেই হাসি দেখে তার বুকটা হু-হু করে উঠেছিল। কতদিন পর সে এমন প্রাণখোলা হাসি দেখেছে? ঐশানী হয়তো জানে না, তার একটি হাসি পাশের বারান্দায় বসে থাকা ছেলেটির সকাল, দুপুর, এমনকি গোটা জীবনটাই উল্টে দিতে পারে। এই ভালোবাসা কোনো দাবিতে তৈরি নয়, কোনো প্রত্যাশায়ও নয়। এটি এমন এক অনুভূতি, যা কেবল দেখা, বোঝা, আর অনুভব করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঋজু বুঝে গেছে—ভালোবাসা মানেই সবসময় কথা নয়, কোনো সম্পর্ক গড়ে তোলা নয়। ভালোবাসা হতে পারে শুধু পাশে বসে থাকা, অথচ দূরে থেকে অনুভব করা।
–
সপ্তাহ কেটে যায় নিঃশব্দে, পুরনো ছকে বাঁধা সময়ের মতো। কাজের ব্যস্ততা, ক্লায়েন্ট মিটিং, ইমেলের ভিড়, রাত জেগে প্রেজেন্টেশন তৈরি—এইসব যন্ত্রজীবনের মাঝেই ঋজু প্রতি রবিবার নিজেকে খুঁজে পায় ঐ একটুকু বারান্দায়, যেখানে সে আশ্রয় খুঁজে নেয় এক অচেনা ভালোবাসার নিরালায়। এ এক অভ্যেস হয়ে গেছে, যেমন প্রতিদিন সকাল হলে সূর্য ওঠে, ঋজুর হৃদয়ে তেমনি করে আলো ফোটে ঐশানীর বারান্দায়। তবে আজকের রবিবারটা যেন একটু অন্যরকম। সকাল থেকেই আকাশে মেঘ, বাতাসে হালকা শীতলতা। ঋজু ব্যালকনিতে এসে বসেছে যথারীতি, কিন্তু মন যেন অস্থির—কোনো এক অজানা পূর্বাভাসে। তার হাতে কফির কাপ থাকলেও সে খুব কমই চুমুক নিচ্ছে। চোখ রাখা ঐশানীর বারান্দায়। আজ ঐশানীর পরনে লাল-বেগুনি রঙের ছাপা শাড়ি, কপালে ছোট্ট টিপ, হাতে রবিবারের কাগজের এক টুকরো। তিনি বারান্দায় এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর গাছের পাতায় জল ছিটালেন। হঠাৎই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল—ঐশানীর হাত থেকে তার বইটা হঠাৎ করে পড়ে গেল নিচে, একেবারে দুইতলার বেলকনি থেকে সোজা নিচের পাথরে। শব্দটা বেশ জোরে হল।
ঋজু এক মুহূর্তও না ভেবে সোজা উঠে দাঁড়াল। কেমন একটা তীব্র আবেগে সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নিচে। বইটা এক কোণে পড়ে আছে—ভেজা হয়ে ওঠেনি, তবে মলাট কিছুটা ছিঁড়ে গেছে। বইটা হাতে নিয়ে ঋজু উপরে তাকিয়ে দেখল, ঐশানী ইতিমধ্যে নিচে নেমে এসেছেন, সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে। তারা প্রথমবার একে অপরের এতটা কাছে। ঋজু বুকের মধ্যে ধকধক শুনতে পাচ্ছিল, সে নিজেই যেন অজানা কোনো নাটকের অংশ হয়ে গেছে। সে বইটা বাড়িয়ে দিল নিঃশব্দে। ঐশানী মৃদু হাসলেন, বললেন, “ধন্যবাদ। অমন করে পড়ে যাবে বুঝিনি একদম।” এই প্রথমবার তার কণ্ঠস্বর শুনল ঋজু—কান্না আর মেঘের মাঝামাঝি এক শান্ত সুর যেন। সে কিছু বলতে পারল না, কেবল মাথা নাড়ল। ঐশানী বইটা নিয়ে তার দিকে তাকালেন একবার, চোখে ছিল একধরনের ভদ্রতাসিক্ত বিস্ময়। তারপর আস্তে পায়ে ফিরে গেলেন নিজের ফ্ল্যাটের দিকে, ঋজু দাঁড়িয়ে রইল কিছুটা সময় নিচে—হাতে কফির কাপ, কিন্তু কফি ততক্ষণে ঠাণ্ডা। তার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত আলোড়ন—একটা কিছু ভাঙল, আবার গড়েও উঠল যেন।
ঋজুর মনে হচ্ছিল, যেন কোনো অলিখিত দেয়াল একটুখানি সরেছে আজ। এতদিনের দেখা, অনুভব, অভ্যেস আজ সত্যি হয়ে উঠল একটুখানি মুখোমুখি কথায়। ঐশানীর “ধন্যবাদ” শব্দটা তার মনে বহুবার ধ্বনিত হচ্ছিল—একটা সাধারণ কৃতজ্ঞতাবোধ, যা ঋজুর কাছে প্রেমের প্রথম ছোঁয়া হয়ে উঠেছিল। আজ রবিবারটা একটু বেশিই অন্যরকম, একটু বেশিই ব্যক্তিগত, একটু বেশিই জীবন্ত। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন ধীরে ধীরে একটা সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে—যেখানে সে শুধু নিরব দর্শক ছিল না, বরং এই গল্পের এক নিঃশব্দ চরিত্র হয়ে উঠছে। যদিও ঐশানীর চোখে সে কেবল একজন সহানুভূতিশীল প্রতিবেশী, তবু তার হৃদয় বলছিল—এই সামান্য সংঘর্ষই ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনার বীজ হয়ে উঠতে পারে। সে জানে না, আগামী রবিবার কী হবে, কিংবা ঐশানী আবার তার দিকে তাকাবেন কিনা। তবু আজ যে তারা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, একসঙ্গে ছিল এক মেঘলা সকালে—তাই আজকের দিন তার জীবনে হয়ে থাকল এক অবিস্মরণীয় রবিবারের স্মৃতি।
–
ঋজুর রবিবারগুলো এখন আগের থেকেও বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। আগেও সে ঐশানীকে দেখে মুগ্ধ হতো, কিন্তু এখন সেই মুগ্ধতার সঙ্গে মিশেছে একধরনের পরিচয়ের সম্ভাবনা। সেই সামান্য “ধন্যবাদ” আর একঝলক দৃষ্টির বিনিময়ে তার ভিতরের নিঃশব্দ ভালবাসায় যেন আলো এসে পড়েছে। আগে সে কেবল জানত, ঐশানী চা খেতে ভালোবাসেন, রবিবারে শাড়ি পরেন, বই পড়েন—কিন্তু এখন সে জেনেছে, ঐশানী হাসলে কীভাবে চোখ কুঁচকে যায়, কথা বলার সময় তার কণ্ঠস্বর কেমন মৃদু, বিনীত। এই কয়েক সেকেন্ডের মোলাকাত থেকে সে শত শত মুহূর্তের গল্প বুনে ফেলেছে নিজের মনে। সে এখন আগের চেয়ে বেশি সময় কাটায় বারান্দায়, শুধু রবিবারে নয়—শনিবার বিকেলেও সে নিশ্চুপে বসে থাকে, যদি কোনো ছায়া ভেসে ওঠে ঐশানীর বারান্দায়। যদিও ঐশানী সেই রবিবারের পর নতুন করে আর মুখোমুখি আসেননি, তবু ঋজুর আশা বাড়ছে। প্রেমে পড়ার চেয়ে, প্রেমে আশার জন্মই বোধহয় বেশি বিপজ্জনক।
একদিন সকালে নিমাই কাকা—ঋজুর বাড়িওয়ালা—আসে বারান্দায়। পত্রিকার পাতা উল্টে বললেন, “ঐ মেয়েটাকে দেখি না ক’দিন… সব ঠিক আছে তো?”
ঋজু অন্যমনস্কভাবে বলল, “হয়তো ব্যস্ত আছে।”
নিমাই কাকা খানিকটা হাসলেন, “তুই কিন্তু দেখিস না এমন করতেই গিলে ফেলবি একদিন। একটা রবিবারেও যদি ও না আসে, তোর কফি ঠিকমতো টেস্ট করবে না।”
ঋজু একটু অপ্রস্তুত হেসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। এভাবে কেউ তার মনের কথাগুলো এত সহজে বুঝে ফেলবে ভাবেনি সে।
সেইদিন সন্ধ্যেতেই সে তার পুরোনো স্কেচবুক বের করল। কাগজের এক কোণে সে আঁকল ঐশানীর মুখ—যেমনটা মনে আছে: চোখে অল্প কাজল, শাড়ির আঁচল কাঁধে এলোমেলো, আর হাতে বই। পাশে ছোট করে লিখে রাখল: “রবিবারের নায়িকা।” নিজের অজান্তেই সে আঁকাআঁকির ফাঁকে একটা চিঠিও খসিয়ে ফেলল—একটা অদেখা চিঠি, যা ঐশানীর জন্য কিন্তু কখনো দেওয়া হবে না।
ঋজু প্রতিদিন এখন একটু বেশিই খেয়াল করে ঐশানীর ঘরের জানালাগুলো। কখনো সে দেখে, জানালায় লাইট জ্বলছে, কখনো টানা পর্দা পড়ে থাকে। একদিন রাতে সে হঠাৎ শুনল, ঐশানী রবীন্দ্রসঙ্গীত গুনগুন করছেন—খুব আস্তে: “এই পথ যদি না শেষ হয়…” সেই মুহূর্তটা তার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। গানের সুর তার বুকের ভিতর ঢুকে পরপর ভাবনার সাঁকো বুনে দিতে লাগল। তখন সে অনুভব করল—সে শুধু ভালোবাসে না, সে ঐশানীর জীবনের একটুকু অংশ হয়ে যেতে চায়। যদিও সে জানে, এই চাওয়া নির্ভর করে না তার উপর। একটা গভীর টান থাকে তার মধ্যে, কিন্তু সেই টানের রশিটা ধরে টানার সাহস নেই। সে এখনো ঠিক করতে পারেনি, সে সত্যি করে সামনে গিয়ে বলবে কিনা, “আমার রবিবারগুলো শুধু তোমার জন্য অপেক্ষা করে।” বরং সে তার নীরব ভালোবাসাকে আরও মজবুত করে তুলছে ছোট ছোট দেখার মধ্যে, ছোট ছোট স্বপ্নে, আর চুপিচুপি গড়ে ওঠা একরাশ আশা নিয়ে।
–
ঋজু সারাদিন ভাবতে থাকে, সে কি ঐশানীর সঙ্গে কথা বলবে? যদি বলে, কী বলবে? যদি ভুল বোঝে মেয়েটি? কিংবা রাগ করে? অথবা শুধু মুচকি হেসে পাশ কেটে চলে যায়?—এইসব প্রশ্ন তাকে কুরে কুরে খায়। অথচ তার মধ্যে একটা অদ্ভুত সাহসও জন্ম নিচ্ছে, ঠিক যেমন কোনো পুরনো অভ্যেস হঠাৎ গাঢ় হয়ে ওঠে। সে বারবার ভাবে, মুখে না হোক, একটা চিঠি দিলে কেমন হয়? ছোট্ট একটা কাগজে যদি লিখে দেয় তার মনের কথা? না, না, খুব বেশি কিছু নয়—শুধু একটা চুমুক দেওয়া শব্দের মতো, একটা মৃদু ছোঁয়ার মতো কিছু। পরদিন সকালেই সে নিজের ডেস্কে বসে একটা সাদা কাগজ টেনে নেয়। লিখতে শুরু করে, বারবার কাটে, আবার লেখে। শেষমেশ যা লেখে তা হল—
“আপনার রবিবার আমার রবিবার হয়ে উঠেছে। কোনোদিন আপনাকে না দেখলে আমার সকাল হয় না। এই অভ্যেসটা কীভাবে শুরু হলো জানি না। শুধু জানি, চুপচাপ আপনাকে দেখে যাওয়ার মাঝেই কোথায় যেন একটা ভালো লাগা জমে উঠেছে।”
চিঠিটা বারান্দার মোড়ার নিচে লুকিয়ে রাখে সে—নির্ভরতার জন্য। ভাবছিল আজ রাতটা যাক, কাল সকালে ঐশানীর দরজার নিচে দিয়ে আসবে। কিন্তু সারারাত সে ঘুমোতে পারে না। পাখার শব্দের মাঝে ঘড়ির কাঁটা শুনতে পায় স্পষ্ট, বুক ধড়ফড় করে, মন বারবার চিঠির শব্দগুলো আওড়ায়। হঠাৎই ভোররাতে সে উঠে পড়ে। একটা অদ্ভুত দুর্বলতা চেপে ধরে তাকে। চিঠিটা খুলে আবার পড়ে। তারপর এক মুহূর্তে সে সিদ্ধান্ত নেয়—না, এটা ঠিক না। মেয়েটা তাকে চেনে না, তার অনুভবের দায় নিতে পারেন না ঐশানী। এই একতরফা আবেগ তার নিজের, তা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। সে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দেয়। কাগজের টুকরোগুলো হাত থেকে ছুটে উড়ে যায় জানালার বাইরে—যেমন ওড়াউড়ি করে রঙিন স্বপ্নেরা, যাদের ঠাঁই মেলে না মাটিতে। সে চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বারান্দার গাছগুলোয় জল দেয়, যেন নিজের ভেতরের কাঠিন্যটাও একটু নরম হয়।
ঐ রবিবার সকালে ঐশানী বারান্দায় আসেন ঠিকই, কিন্তু তার মুখে আজ একরকম অন্যমনস্কতা। চায়ের কাপটা হাতে ধরে রাখলেও চুমুক দেন না, চোখ চলে যায় দূরের কোথাও। ঋজু বারান্দায় বসে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু আজ যেন কোনও দৃষ্টি বিনিময় নেই, কোনও চুম্বকীয় মুহূর্ত নেই। তার মনে হয়, সে কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে। চিঠিটা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি ঠিক ছিল? যদি দিয়ে দিত, যদি সাহস করে ফেলত, যদি ঐশানী অন্তত জানতে পারতেন যে তার নিঃশব্দ উপস্থিতি কারও সকালকে অর্থ দেয়—তবে কি ভিন্ন কিছু ঘটত? কিন্তু এখন এই ‘যদি’র ভারে সে নিজেই কুঁকড়ে যায়। চুপিচুপি, নিজের অলীক সাহসে সে হার মেনে নেয়। আর ঠিক তখনই বুঝতে পারে—ভালোবাসা সবসময় উচ্চারণে ধরা পড়ে না, কখনো কখনো তা শুধু অনুভবেই থেকে যায়। সে নিজেই নিজের একমাত্র শ্রোতা, একমাত্র পাঠক।
–
সকালটা কেমন অদ্ভুত শূন্যতায় ভরা ছিল। রবিবার হলেও শহর যেন সাড়া দিচ্ছিল না তার চেনা গতিতে। পাখির ডাক শুনতে ভালো লাগছিল না, কফির সুগন্ধও আজ যেন ভেসে আসছিল না ঠিকঠাক। ঋজু বারান্দায় এসে বসল যথারীতি, কিন্তু সামনের ঐশানীর বারান্দাটা আজ ফাঁকা। চেয়ারটা খালি, টবের গাছে জল নেই, মাটির কাপটাও নেই টেবিলে। প্রথমে ভেবেছিল—বেশি ঘুমিয়ে পড়েছেন হয়তো। তারপর এক ঘণ্টা কেটে গেল—কিন্তু তবুও সেই শাড়ি-পরা ছায়া, যার জন্য সে প্রতিটি রবিবার সাজিয়ে রাখে নিজের হৃদয়ের সমস্ত অনুভব—তাকে দেখা গেল না। প্রথমবারের মতো সে অনুভব করল, একজন মানুষের অভ্যাস না থাকাটা কেমন ভয়াবহভাবে প্রভাব ফেলে দিতে পারে দৈনন্দিন জীবনে। সে বারবার ঘড়ি দেখল, জানালার পর্দার দিকে তাকাল, কোনো আলো জ্বলে উঠছে কি না, শব্দ পাওয়া যাচ্ছে কি না। কিন্তু না। যেন বাড়িটার একপাশটা নিঃশব্দে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
দিনগুলো যেন হঠাৎ করে লম্বা হয়ে গেছে। সে চেষ্টা করল নিজেকে ব্যস্ত রাখতে—পুরনো ডিজাইন প্রজেক্টগুলো ঘাঁটল, স্কেচ করল, এমনকি বাড়িওয়ালা নিমাই কাকার সঙ্গেও একটু বেশি গল্প করল। কিন্তু কিছুতেই ঐশানীর শূন্যতা পূরণ করতে পারল না। বারবার মনে পড়তে লাগল সেই সামান্য মুহূর্তগুলো—তার হাতে পড়ে যাওয়া বই, সেই “ধন্যবাদ”, রবিবার সকালের একটুকরো হাসি। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলো যেন তার হৃদয়ে গাঁথা হয়ে গেছে। এখন তার মাথার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ঘোরে—ঐশানী কোথায় গেলেন? অসুস্থ? না কি অন্য কোথাও চলে গেলেন? আবার কি ফিরবেন বারান্দায়? সে চেয়েছিল চিঠিটা একদিন পৌঁছে দিতে, কিন্তু এখন আর সেই সুযোগটাও নেই। যে নিরব সম্পর্কটা সে নিজের মনে এতদিন ধরে পুষে রেখেছিল, তা যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে একটানা নিরুত্তর প্রতীক্ষার মধ্যে।
তিনটে রবিবার কেটে গেল, কোনো চিহ্ন নেই ঐশানীর। বারান্দার গাছগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে, টবের মাটি শুকনো, এবং পায়রা বসে আছে সেই খালি চেয়ারে। ঋজুর মধ্যে আশার আলো নিভে আসছে। সে রাতের বেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ, চুপচাপ তার ফাঁকা চেয়ারের দিকে তাকিয়ে, যেন বারবার সেই শূন্য জায়গায় ঐশানীর মুখটাকে কল্পনা করার চেষ্টা করছে। কফির স্বাদ এখন কেবল তিক্ত লাগে। রবিবার মানেই এখন একরাশ অপেক্ষা আর একটি নিঃস্তব্ধ অভিমান। ভালোবাসা, সে বুঝে গেছে, কেবল উপস্থিতিতে নয়—অনুপস্থিতির মাঝেও জেগে থাকে, ছায়ার মতো। আগে সে জানত, সে একজনকে ভালোবাসে যাকে সে চেনে না; এখন সে জানে, সে সেই অনুপস্থিতিকে ভালোবাসে, যাকে সে হয়তো কোনোদিন আর দেখবে না। এই একতরফা ভালোবাসার গল্পটা, মনে হয়, সময়ের শহরে এসে নিজের শেষাংশ লিখে দিয়ে যাচ্ছে—চুপিচুপি, চোখে জল এনে দেওয়ার মতো একাকিত্বে।
–
চারটে রবিবার কেটে গিয়েছিল নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গতায়, আর আশাহীন প্রতীক্ষায়। বারান্দার মোড়াটা ঋজুর জীবনের সবচেয়ে বিষণ্ণ বসার জায়গা হয়ে উঠেছিল। ঐশানী না থাকলেও তার জন্য রাখা চায়ের কাপ, পাতার ছায়ায় জেগে ওঠা পুরনো অনুভূতিরা, আর দেওয়ালে ঝুলে থাকা তার স্কেচ করা সেই একমাত্র মুখ—সব মিলিয়ে একধরনের জড় অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল এই ভালোবাসা। সে এখন আর অপেক্ষাও করত না, কেবল বসে থাকত। যেন নিজের মধ্যে হারিয়ে যেতে চাওয়া এক ক্লান্ত প্রেমিক, যার ভালোবাসা বেঁচে আছে শুধু তার হৃদয়ের স্মৃতিতে। এমনই এক রবিবার সকালে, নিঃসঙ্গতায় ভেজা শহর যখন সবে হালকা রোদে চোখ মেলেছে, তখনই ঘটল এক অলৌকিকতা। ধীরে ধীরে খুলে গেল ঐশানীর বারান্দার কাচের দরজা। প্রথমে মাথা উঁকি দিল ছোট্ট একটা ছায়া, তারপর ঐশানী নিজে—হলুদ সালোয়ারে, একটু ক্লান্ত মুখ, কিন্তু চোখে সেই পুরোনো গভীরতা। হাতের মাটির কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর কাঁধে ছিল একটুখানি উঁকি দেওয়া শাল।
ঋজু প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, ঠিক যেন ভয় পাচ্ছে চোখের সামনে দৃশ্যটা হারিয়ে যাবে। আজও সে কিছু বলেনি, কিছু করে ওঠেনি। ঐশানী তার চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে কাপে চুমুক দিলেন, তারপর একবার তাকালেন ঋজুর দিকেও। আর এবার প্রথমবার সেই দৃষ্টিতে ছিল চেনার ছোঁয়া, হয়তো একটুখানি স্মৃতিও—সেই রবিবার, সেই বই পড়ে যাওয়া, সেই চোখে চোখ পড়া মুহূর্ত। এবার তার চোখে ছিল অদ্ভুত শান্তি, আর সেই শান্তির ভেতরে মিশে থাকা একটা না বলা অনুভূতির স্বীকৃতি। বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ দুজনে নিজেদের বারান্দায় বসে রইল—দুজনেই নীরব, তবুও যেন দুই হৃদয়ের মাঝখানে কথোপকথন চলছিল একেকটা চুমুকের ছন্দে। শহরের শব্দ, পাখির ডাক, দূরের কুকুরের ঘেউ ঘেউ—সবকিছু মিলিয়ে একটা ছায়াময় রোমাঞ্চ তৈরি হচ্ছিল।
ঋজু এবার আর চেপে রাখতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দার রেলিংয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ঐশানী তাকিয়ে রইলেন। সে মৃদু স্বরে বলল, “চা ভালো লাগছে তো?”
ঐশানী অবাক না হয়ে মুচকি হাসলেন, সেই একই কণ্ঠে বললেন, “হ্যাঁ, আজ অনেকদিন পর আবার নিজের মতো লাগছে।”
এই কয়েকটি কথার মধ্যেই যেন ঝরে পড়ল সমস্ত প্রতীক্ষার মূল্য। এই কয়েকটি সেকেন্ডে ঋজু বুঝতে পারল—ভালোবাসা সবসময় শোনানো দরকার নেই, বোঝানোরও দরকার নেই। কখনো কখনো ভালোবাসা চুপচাপ হেঁটে আসে ফিরে, ঠিক সেই চুপিসারে যেভাবে ঐশানী ফিরে এসেছেন তার বারান্দায়। এই ফিরিয়ে আনা অনুভব, এই প্রথম সত্যিকারের কথোপকথন, আর এই দুটি চায়ের কাপ—একসঙ্গে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে—এই সব মিলিয়ে তাদের সম্পর্কের ইতিহাসের প্রথম পৃষ্ঠা লেখা হয়ে গেল। এখন আর একতরফা নয়, এ এক সম্ভাব্য গল্প—যার পরের অধ্যায় সময় আপনেই লিখবে, নিরবে, গোধূলির রঙে রাঙিয়ে।
–
রবিবারের সকাল যেন আবার নিজের পরিচয় ফিরে পেয়েছে। সেই পুরোনো রোদ, ছায়া, বারান্দার চেয়ার, চায়ের ধোঁয়া—সবকিছু আগের মতো হলেও কিছু একটা বদলে গেছে নিঃশব্দে। আর সেই বদলটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে ঋজু। এখন সে কেবল দেখে না, সে এখন অপেক্ষা করে চোখে চোখ রাখার, হালকা কথার, কিংবা শুধু দু’জনের নিঃশব্দ উপস্থিতির। ঐশানী আবার নিয়ম করে বারান্দায় আসেন, চায়ের কাপ হাতে বসে থাকেন, মাঝে মাঝে তাকান পাশের বারান্দার ছেলেটার দিকে, আর হাসেন হালকা করে—যেমন একটা অভ্যস্ত বিশ্বাস গড়ে ওঠে। তাদের কথাবার্তা এখনো খুব সীমিত, কিন্তু সেই সীমার মধ্যেই যেন এক গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কোনোদিন বইয়ের কথা, কোনোদিন বারান্দার গাছ নিয়ে—অথবা কেবল, “আজ খুব গরম,” বা “চায়ের কাপটা ভেঙে গেল”—এইসব সাধারণ কথায়ও থাকে একরাশ অপ্রকাশিত অনুভব। এক রবিবারে ঋজু সাহস করে একটা লাল গোলাপের টব উপহার দিল। সে বলল, “ভেবেছিলাম আপনার টবগুলোতে আবার একটু রং ফিরুক।” ঐশানী তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তুমি না থাকলে বারান্দাটা আর একা লাগে।”
ঋজুর কাছে সেই কথাগুলো ছিল কবিতার চেয়ে বেশি। এতদিন যে অনুভূতিরা কেবল তার বুকের ভেতর দোলা দিত, আজ তারা শব্দ পেয়েছে, জায়গা পেয়েছে ঐশানীর দৃষ্টিতে। তারা এখনো হাতে হাত রাখে না, বা একসঙ্গে কফি শপে যায় না—তাদের প্রেম এখনো গড়ে উঠছে একধরনের ছায়ার আড়ালে, কিন্তু এই ছায়াটা শান্ত, বিশ্বাসে ভরা। কেবল রবিবারই নয়, মাঝে মাঝে সন্ধ্যেয় ঐশানী বারান্দায় এসে দাঁড়ান। দু’জনের চোখে চোখ পড়ে, হাসি বিনিময় হয়। একদিন ঋজু বলল, “তোমার গানটা আর শোনা যায় না।” ঐশানী হেসে বললেন, “আবার গাইব, যদি কেউ শোনার জন্য অপেক্ষা করে।” সেই সন্ধ্যায়, আকাশে যখন হালকা তারা ফুটছে, তখন ঐশানী সত্যিই গুনগুন করে উঠলেন—“এই পথ যদি না শেষ হয়…” আর ঋজু জানালার কাছে দাঁড়িয়ে শুনল—কানে নয়, হৃদয়ের মধ্যে শুনল।
দিনগুলি এগোয়। ঋজুর চায়ের কাপের সংখ্যা বাড়ে না, কিন্তু সেই এক কাপের পাশে আরেকটি ধোঁয়া ওঠা কাপ রাখা থাকে এখন—ঐশানীর কাপ। তারা মাঝে মাঝে বারান্দার রেলিং越িয়ে বই বিনিময় করে, হয়তো কোনো রবিবার হঠাৎ বৃষ্টিতে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকে, জানালার শিকে হাত রেখে। তাদের কোনো সম্পর্কের সংজ্ঞা নেই, কেউ কাউকে ‘প্রেমিক’ বলে ডাকে না। তারা কেবল জানে, প্রতিটি রবিবারে তারা একে অপরের জন্য থাকে—কখনো চোখে, কখনো নীরবতায়, কখনো চায়ের গন্ধে। এই ভালোবাসা, যা শুরু হয়েছিল একতরফা অভ্যেস হিসেবে, শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াল দু’জনের ভাগ করে নেওয়া নিঃশব্দ অনুভবে। ভালোবাসা শব্দ ছাড়া—যেখানে বারান্দা সাক্ষী, চায়ের কাপ সাক্ষী, আর শহরের নিরব রবিবার সকালগুলি সাক্ষী হয়ে রইল এক অনুচ্চারিত, অথচ পরিপূর্ণ প্রেমের।
—




