অন্বেষা দত্ত
শীতের মেঘলা সকালটা যেন নিজের ভিতরেই কথা বলছিল। জলপাইগুড়ির ছোট শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সৃজনী ভেতরে ভেতরে কেমন একটা অব্যক্ত ঘুম ভাঙার শব্দ শুনতে পেল। দূরের মাঠে পৌষমেলা বসেছে— বাঁশের খুঁটি, তালপাতার ছাউনি, বেলুন, হাতে আঁকা ফেস্টুন; চায়ের ভাপ ওঠা কাপে দোকানিরা চুন-সুরক্ষা দেওয়া আঙুলে গরম গরম গোলমরিচ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সৃজনীর লালচে কোটের ওপর ভেজা কুয়াশা বসে আছে, তবু সে থামল— শুধু মেলার গন্ধটা ভালো করে নেবার জন্য। কাঁচা কাঠ, তাজা উলের শাল, শুঁটকি নুডলসের হালকা ধোঁয়া, আর কোথাও থেকে ভেসে আসা “পর্যটকগণ, সামলে হাঁটুন”— এমন সব গন্ধ-শব্দে সকালটা তীব্র, কিন্তু শান্ত।
কলকাতার চৌকো জীবনে সব আছে— চাকরি, নির্দিষ্ট বেতন, বন্ধুদের সপ্তাহান্তের ক্যাফে-ছবি, বুকশেলফে সাজানো ছোট ছোট পুরস্কার— তবু কেমন যেন একটানা ধূসরতা। ছুটি নিয়ে উত্তরবঙ্গে আসার সিদ্ধান্তটা হঠাৎই। কোনো পরিকল্পনা ছিল না, শুধু একদিন ভোরে মনে হয়েছিল: রং দেখতে হবে। সত্যিকারের রং, যে রং ধুয়ে যাবার মতো নয়। তাই সৃজনী এসেছে, ট্রেনের জানালায় মুখ রেখে পাহাড়ের আভাস দেখেছে, আর আজ দাঁড়িয়ে আছে এই মেলায়; ভাবছে, হয়তো কোনো রঙিন জিনিস কিনলেই ভেতরের ধূসরটা একটু হলেও সরে যাবে।
শালের দোকানটার সামনে দাঁড়াতে হলদে কাপড়ে হাত-লিখে রাখা নামটা চোখে পড়ল— “শাল-গল্প।” নামটা এমনই সহজ, তবু কৌতূহলী করে। বাঁশের ফ্রেমে টাঙানো উলের শালগুলো বাতাসে দুলছে— মাটির রং, নদীর কুয়াশা, পাকা কুলের লাল, শুকনো পাতা-সবুজ, ধূপকাঠির ধোঁয়ার মতো ধূসর। কাউন্টারের ওপারে বসে থাকা যুবকটি মাথা তুলল, সৃজনীর চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান শীতে একটা অভ্যস্ত হাসি ছুঁড়ে দিল। “কোন রং খুঁজছেন?” তার কণ্ঠে পাহাড়ি হাওয়া নেই, নদীর পাড়ের মাটি আছে— নরম, ধুলো-মাখা, কিন্তু দৃঢ়।
“জানি না,” সৃজনী বলল, নিজের কথাটাই যেন নিজেকে বলল। “হয়তো এমন একটা রং, যেটা আমি জানি না যে আমাকে মানাবে।”
“আপনার কোটটা লাল,” যুবকটি শালগুলোর ভিতর হাত চালিয়ে বলল, “লাল মানে সাহস আছে। কিন্তু লালের ওপর যদি কুয়াশা বসে, তাহলে কী রং হয় জানেন?” সে একটা শাল নামিয়ে রাখল— ধূসর-নীলের ভাঁজে খুব সূক্ষ্ম সরু সরু সাদা রেখা, যেন রাতের আকাশে ভাঙা চাঁদের ভেলাভাসা পথ। “নদীর শীতের ভোর। এটা কুয়াশার লালকে শান্ত করে।”
সৃজনী শালটা কাঁধে চাপাল। উলের উষ্ণতা যেন কেবল গায়ে নয়, ভেতরেও চুপচাপ জেগে উঠল। “নাম কী আপনার?” তার অপ্রস্তুত প্রশ্নটা বেরিয়েই পড়ল।
“সোহম,” বলল সে। “আপনার?”
“সৃজনী,” সে হাসল, “নামের ভেতরই রং আছে, কিন্তু আমার জীবনটা সাদা-কালো।”
সোহম কাউন্টারের পেছনে একটা ছোট খাতা টেনে নিল। পাতার ওপর গোটা গোটা অক্ষরে লিখল— “এই শালটা রঙিন, কারণ এর ভেতর একটা ভোর আছে।” তারপর পাতা ছিঁড়ে শালটার সঙ্গে ক্লিপ করল, যেন শালের নিজের দলিল। “আমাদের দোকানে শালের সঙ্গে আমরা গল্প দিই,” বলল সে, “শাল-গল্প বলে নাম। রং শুধু চোখে নয়, মনে বসে।”
সৃজনী হেসে ফেলল, অনেকদিন পর এমনভাবে। “কে গল্প লেখে?”
“আমরাই,” সোহম কাঁধ ঝাঁকাল। “আমি, মা, আর গ্রামের দু-একজন দিদি। এই শালের সুতোটা যে বুনেছে, তার নানীর শীতকথা থেকে লাইন ওঠে কখনো। সবটাই ছোট, সাধাসিধে।”
দোকানের সামনে ভিড় একটু জমল। এক বৃদ্ধা এসে উলের মোটা শাল চাইলেন, দামদর করতে করতে বললেন, “ছেলে, হাতটা দেখাচ্ছে ঠান্ডা, একটু চা খেয়ে নিস।” সোহম এদিক-ওদিক শাল ঝুলিয়ে, গোছাতে, হাসতে হাসতে কাজ চালাতে লাগল। সৃজনী একটু পাশে সরে দাঁড়াল— দূরে চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর আকাশে একটা সাদামাটা সূর্য; তবু এই সাদামাটা সূর্য যেমন ভোরের গল্পটা সত্যি করে, ঠিক তেমনই এই দোকানের ভেতর থেকে আসছে অনুচ্চারিত উষ্ণতা।
ভিড় একটু কমতেই সোহম বলল, “চা খাবেন? দোকানটা দুই মিনিট আমাকে ছাড়বে না, কিন্তু সুমন—” সে পাশের কাঁথার দোকানদারের দিকে ইশারা করল, “—দু’কাপ এনে দেবে। খরচ আমার।”
“না না, লাগবে না,” সৃজনী আপত্তি জানালেও সোহম ইতিমধ্যে দূরে চায়ের দোকানে হাত নেড়ে ইশারা করে ফেলেছে। অল্পেই তার সঙ্গে কথা বলা যায়, অল্পেই ভরসা করা যায়— এমন মানুষ সাধারণত গল্প লেখে না; তারা গল্পের ভিতরে থাকে। সৃজনী এই ভাবনাটা টের পেয়ে একটু চুপ করে গেল। ক’মাস আগে তার জীবনে একটা ভাঙন হয়েছিল— এমন ভাঙন, যাকে সে নাম দেয়নি। শুধু জানত, শহরের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, তার ঘরে ছায়াটা থিকথিক করে। আজ এই অচেনা শহরের শীতের ভেতর, চায়ের কাপ হাতে, ধোঁয়া-ধোঁয়া এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সে একটা চরিত্রকে দেখতে পেল— যে নিজেকে বিক্রি করে না, শাল বিক্রি করে; গল্প বাঁধে, গিরা খুলে; আর রংগুলোকে নাম দেয় ভোর, নদী, ধূপ, কুল।
“আপনারা কোথা থেকে?” চা এসে গেলে সৃজনী জিজ্ঞেস করল।
“তিস্তার ধার থেকে। দোরজা-পাহাড়ের নীচে আমাদের গ্রাম। আগে বাবা ছিলেন,” সোহম কথাটা খুব আলতো করে বলল, ঠিক যেমন উলের গায়ে হাত বুলিয়ে। “এখন মা-ই সব। মহিলা সমিতিতে বোনেরা বোনে— আমি নিয়ে আসি, বিক্রি করি। শহরের লোকেরা শীতকে রং করে নেয়, আমরা সেই রঙের গল্প করে দিই।”
“আর আপনার গল্প?” সৃজনী এবার একটু তাকিয়ে প্রশ্ন করল, যেন শালের ভিতর থেকে কোনো ফিতে টেনে বের করল।
সোহম ভেবেচিন্তে হাসল। “আমার গল্পের নাম হয়তো ‘বিকেলের রোদ’— থাকে, কিন্তু ধরতে গেলেই সরে যায়। আপনার গল্প?”
“আমার গল্পের নাম ‘আলমারির সাদা শাড়ি’— রয়েছে, কিন্তু বাইরে পরার সাহস হয় না।” কথাটা বলে সৃজনী নিজেই চমকে উঠল; এমন খোলামেলা উত্তর সে নিজের সঙ্গেও দেয় না।
দু’জনেই একটু চুপ। মেলায় তখন ঢোল বাজছে, দূরে কেউ বেহালা টানছে এমনভাবে, যেন সূক্ষ্ম সুতোয় আকাশ বেঁধে দিচ্ছে। সোহম শালটা আবার কাঁধে জড়িয়ে দিল সৃজনীর। “এইটা নিন,” বলল, “রঙটা আপনাকে মানিয়েছে। দাম…,” সে একটা ছোট কাগজে লিখল। দামটা খুব বেশি না, খুব কমও না— ঠিক যতটা হলে জিনিসটার মর্যাদা থাকে, আর ক্রেতার মনে অস্বস্তি জাগে না।
সৃজনী পয়সা দিল, টাকা ধরানোর ভঙ্গিটা অনভ্যস্ত কিন্তু আন্তরিক। “আমি কালও আসব,” বলে ফেলল অজান্তেই।
“এলেই গল্পটা শেষ হবে না,” সোহম বলল, “নতুন ফোঁড় তুলতে হবে। চাইলে গ্রামে নিয়ে যেতে পারি— দেখবেন কীভাবে রং ওঠে, কীভাবে সুতো ধুয়ে মেঘের মতো শুকোয়। তিস্তার ধারে দুপুরের রোদে শালগুলো ওপর থেকে দেখলে মনে হয় আকাশ নিচে নেমে এসেছে।”
প্রস্তাবটা বাতাসে ঝুলে রইল— রহস্য আর সরলতার মাঝখানে। সৃজনী বোঝাতে পারল না কেন তার হাঁটুতে সামান্য কাঁপুনি লাগল। হয়তো অচেনাকে বিশ্বাস করতে চাওয়া, হয়তো জীবনের নতুন একটা বাক্য শুরু হওয়া— যেখানে কমা আছে, কিন্তু ফুলস্টপ নেই। “দেখা যাক,” সে শুধু বলল, “আমি হোটেল থেকে বেরোতে পারলে খবর দেব।”
“খবর দেবেন কীভাবে?” সোহম হেসে বলল, “কল করবেন না; আজকাল ফোনে গল্প সরে যায়।” বলেই সে আবার খাতাটা টানল, পাতার ওপর একটা ছোট্ট মানচিত্র আঁকল— মেলা-গেট, বাঁদিকের কাঁচা পথ, দু’টো শালিকের গাছ পার হলেই নদীর বাঁক। শেষে লিখল: “বেলা তিনটের আগে এলে তিস্তা বেশি কথা বলে।”
কাগজটা সৃজনী ব্যাগে রাখল, খুব যত্ন করে, যেন এর কাগজ-গন্ধটা হারালে গল্প ভেঙে যাবে। মেলার ভিড়ে পা বাড়াতে গিয়ে সে ফিরে তাকাল— সোহম ইতিমধ্যে আরেক ক্রেতার কাঁধে শাল জড়িয়ে দিচ্ছে, এমন ভঙ্গিতে যেন মানুষের ওপর শুধু কাপড় নয়, একটু উষ্ণতা, একটু আস্থা, একটু রঙের কাজও করে দিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, কোথা থেকে এক টুকরো রোদ এসে পড়ল সৃজনীর শালের ওপর— ধূসর-নীলের ভাঁজে সাদা রেখাগুলো দপ করে জ্বলে উঠল, যেন ভালোবাসা আসলে রঙের অভ্যাস; বারবার দেখা হলে তবেই চোখ তা চিনতে শেখে।
বিকেল নামতে লাগল। সৃজনী মেলার গেট পেরোল, রাস্তায় উঠল, হোটেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজের কাঁধে শালের উষ্ণতা টের পেল। শহরের জীবনে তার যে অংশটা দীর্ঘদিন নিস্তেজ ছিল, সেখানে আজ যেন রঙের একটুখানি স্রোত ঢুকে পড়েছে। রাস্তার দু’পাশে ছায়া লম্বা হচ্ছে, ওদিকে আকাশের রং বদলাচ্ছে— কমলা থেকে লাল, লাল থেকে বেগুনি। সৃজনী জানে, এই রংগুলো ক্ষণিক; তবু ক্ষণিক রংই কখনো চিরকালের দরজা খুলে দেয়।
হোটেলের দরজায় পৌঁছে সে থামল। ব্যাগ থেকে সোহমের দেওয়া ছোট মানচিত্রটা বার করল, যেন নিজের বুকের মধ্যে একটা চিহ্ন টাঙিয়ে দিল। কাগজটার মলিন দাগে, গোটা গোটা অক্ষরে, একটা বাক্য ঝলসে উঠল— “বেলা তিনটের আগে এলে তিস্তা বেশি কথা বলে।” সৃজনীর হঠাৎ মনে হল, হয়তো রং দেখতে হলে নদীর কথাই আগে শুনতে হবে। আর তার ভেতরে অনেকদিন ধরে চুপ করে থাকা মেয়েটা নিঃশব্দে বলল— কাল, বেলা তিনটার আগেই, আমি শুনতে যাব।
পর্ব ২
সকালটা যেন কাঁচের মতো স্বচ্ছ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোথাও ঠান্ডার ছোট ছোট কাঁপুনি লুকিয়ে আছে। সৃজনী ঘুম ভাঙতেই প্রথমে বুঝতে পারল না, কোথায় আছে সে। তারপর মনে পড়ল— হোটেলের কাঠের ছাদের নিচে, ছোট্ট কক্ষে, যেখানে জানলার বাইরে গাঢ় সবুজ পাহাড়ের রেখা, আর তার ফাঁকে ফাঁকে ধোঁয়া ওঠা চিমনির ধূসর রেখা। বিছানার পাশে রাখা শালটা— সেই ধূসর-নীল ভাঁজে সাদা রেখার শাল— যেন রাতভর তার ঘুম পাহারা দিয়েছে।
সে চুপচাপ শালটা কাঁধে জড়িয়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তিস্তার জলরেখা এখনো দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু হালকা হাওয়া এসে জানাচ্ছে, নদী খুব দূরে নেই। নিচের রাস্তায় দু-একটা বাস, মেলার দিকে হাঁটছে কিছু মানুষ, আর কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে আসছে ভাজা পাঁপড় আর চায়ের গন্ধ।
গতরাত থেকে সেই কাগজের মানচিত্রটা তার মাথায় ঘুরছে। “বেলা তিনটের আগে এলে তিস্তা বেশি কথা বলে।” সোহমের লেখা কথাগুলো তেমন কিছু নয়, তবু কেন যেন তার ভেতরে গভীরভাবে ঢুকে গেছে। শহরে অভ্যস্ত জীবনে মানুষ খুব কমই এমনভাবে কিছু বলে— যেখানে একটা প্রস্তাবের মধ্যে গল্প থাকে, আর গল্পের মধ্যে রঙ।
চা খাওয়ার সময় সৃজনী ঠিক করল, আজ সে যাবে। কিন্তু যাওয়ার আগে, নিজের মনকে একটু সামলাতে হবে। কারণ সে ভালো করেই জানে— এমন অচেনা ভরসা, এমন হঠাৎ রঙের ডাক, অনেক সময় জীবনের বুকে হাওয়া লাগায়, আবার অনেক সময়… ফাঁপা করে দেয়।
পথটা সহজ ছিল না। মেলার গেট পেরিয়ে বাঁদিকে সেই কাঁচা পথ— কাদা শুকনো, তবু জুতোর তলায় শীতের স্যাঁতসেঁতে ভাব। দু’পাশে সারি সারি বাঁশগাছ, ক’টা পুরোনো কুঁড়ে, ছাদের ধারে শুকোতে দেওয়া লাল-মেরুন-কালো শাল। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে গরুর গাড়ি থেমে আছে, হালচাষিদের হাসি শোনা যাচ্ছে।
দু’টো শালিকের গাছ পার হতে যেতে হঠাৎ সৃজনীর চোখে পড়ল— গাছের গোড়ায় বসে আছে এক বৃদ্ধা, হাতে সুতোর গোছা। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে উলের গিঁট খুলছে, যেন একটা জট ছাড়াচ্ছে শুধু শালে নয়, নিজের জীবনেও। সৃজনী থামল।
“পথ হারিয়েছেন নাকি?” বৃদ্ধা হাসল।
“না, তিস্তার ধারের দিকে যাচ্ছি,” সৃজনী বলল।
“সোহমের কাছে?” বৃদ্ধা প্রশ্ন করল, যেন নামটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বুঝে ফেলেছে।
সৃজনী অবাক হয়ে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। বৃদ্ধা নিজের কাজে ফিরে গেল, তবে যাওয়ার আগে বলল, “নদীর জল সব দেখে রাখে। তবে যা দেখবে, তার গল্প ফেলে আসা যায় না।”
কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল, আর সৃজনীর মনে হল, সে সত্যিই হয়তো এমন এক পথে পা দিয়েছে, যেখান থেকে ফেরার রাস্তা আগের মতো থাকবে না।
নদীর ধারে পৌঁছে প্রথমেই শুনল জলছাপার শব্দ। তিস্তার রং আজ মাটির মতো ঘন সবুজ, তার মধ্যে কোথাও কোথাও সাদা ফেনার টুকরো। ওপারে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা কুয়াশা ধীরে ধীরে জলের উপর নামছে, যেন নদীকে ঢেকে দিতে চাইছে।
সোহম দাঁড়িয়ে আছে একটি কাঠের প্ল্যাটফর্মের ওপর, হাতে বড় একটা বাঁশের ফ্রেম, তাতে ঝুলছে রঙিন শাল— ধোয়া হয়ে শুকোচ্ছে। তার চোখে এমন মনোযোগ, যেন সে শুধু কাপড় শুকোচ্ছে না, বরং আকাশে রঙ বুনছে।
“আপনি এলেন,” সে তাকিয়ে বলল, “তিস্তা আজ খুশি।”
সৃজনী কাছে গিয়ে দাঁড়াল। “আপনি তো বলেছিলেন তিনটার আগে আসতে, আমি তো বেশ তাড়াতাড়ি এলাম।”
“কারণ এই সময় রোদটা সোজা শালের উপর পড়ে। দেখুন, প্রতিটা রঙ কেমন বদলে যাচ্ছে।”
সত্যিই, শীতের সোনালি রোদে লালটা হয়ে উঠছে আরও উজ্জ্বল, সবুজে নেমে এসেছে নরম মলিনতা, আর ধূসর-নীলের ভাঁজে সাদা রেখাগুলো যেন নদীর ঢেউয়ের মতো নড়ছে। সৃজনী চুপ করে দেখল, এই রঙের পরিবর্তন হয়তো শুধু চোখে নয়, মনে হয়— সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরের রঙও বদলায়।
“আপনি কি সব শালের সঙ্গে গল্প লিখে দেন?” সৃজনী জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” সোহম বলল, “কারণ গল্প ছাড়া রঙ অপূর্ণ। একেকটা শালের সুতো বোনা হয় যেমন হাতে, তেমন কথাতেও। শীতের সকাল, নদীর ধারে বিকেল, কারো অপেক্ষা, কারো বিদায়— সবই ঢুকে যায় রঙে।”
সৃজনী মুচকি হাসল। “তাহলে আজ যে শাল বুনছেন, তার গল্প কী হবে?”
সোহম এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “এটার নাম দেব ‘অচেনার ভোর’। কারণ আজকের গল্পটা আমার নয়, আপনার।”
কথাটায় সৃজনীর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শিরশিরে ঢেউ বয়ে গেল। সে জানে না, এই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, এই রঙের ভেতরে, তার গল্পের শুরু হচ্ছে নাকি আগেই কোথাও শুরু হয়ে গেছে, আর সে কেবল আজ প্রথমবার তা দেখতে পাচ্ছে।
পর্ব ৩
তিস্তার ধার থেকে সোহমের গ্রামের পথটা সরু, প্রায় সুঁইয়ের চোখের মতো। দুই পাশে বাঁশবাগান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের পাতার ফাঁক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রোদ পড়ে ধুলোভরা রাস্তায়। পায়ের তলায় নরম মাটি, মাঝে মাঝে শুকনো পাতা মাড়ানোর কচমচ শব্দ— সব মিলিয়ে একটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া নীরবতা, যেখানে শহরের মতো শব্দের ভিড় নেই, বরং শব্দ নিজেই ছায়া হয়ে গেছে।
সোহম হাতে ঝুলন্ত বাঁশের ফ্রেমে কিছু ভেজা শাল নিয়ে হাঁটছে, আর সৃজনী তার থেকে সামান্য পিছনে। কখনো দু’জনের চোখাচোখি হয়, কখনো শুধু দূরের কোনো পাখির ডাক শোনে। এই পথের প্রতিটা বাঁক যেন কোনো গোপন কাহিনির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
“এই যে বাঁ দিকে যে বাড়িটা, ওখানে মা থাকেন,” সোহম ইশারা করল। কাঁচা ইটের দেওয়াল, টিনের ছাদ, আঙিনায় শুকোতে দেওয়া লাল-মেরুন শালগুলো বাতাসে নাচছে। আঙিনার ধারে একটা ছোট তুলসী গাছ, তার চারপাশে সাদা আঁকা বৃত্ত— ঠিক যেমন শৈশবে সৃজনী তার দিদার বাড়িতে দেখেছিল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি মাথায় সাদা আঁচল, গায়ের ওপর উলের পাতলা শাল, চোখে টানটান উজ্জ্বলতা। “এই কি শহরের অতিথি?” হাসতে হাসতে তিনি বললেন।
“হ্যাঁ মা, সৃজনী,” সোহম পরিচয় করিয়ে দিল। “মেলায় এসেছিল, শাল কিনল, তারপর নদীর গল্প শুনতে এল।”
মায়ের চোখে কৌতূহল আর উষ্ণতা একসাথে। “এসো, বসো। চা দেব।”
আঙিনার এক কোণে কাঠের বেঞ্চে বসে সৃজনী দেখল— বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে শালের রঙে ভরা একঘর। চারপাশে বড় বড় কাঠের তাঁত, ঝুলছে অসমাপ্ত শাল, টেবিলে রঙের হাঁড়ি, আর বাতাসে মিশে আছে উলের গন্ধ।
“এখানে কাজ হয় সারা বছর?” সৃজনী প্রশ্ন করল।
মা মাথা নেড়ে বললেন, “শীতে বিক্রি বেশি হয়, কিন্তু সুতো বুনতে হয় গরমেও। আর রঙ তো মরসুম দেখে হয় না— নদীর জল যেমন থাকে, তেমনই রঙ ওঠে।”
সোহম শালগুলো ফ্রেম থেকে নামিয়ে মায়ের হাতে দিল। মা সেগুলো ধীরে ধীরে ভাঁজ করতে করতে বললেন, “প্রতিটা শালের একটা করে গল্প আছে, কিন্তু সব গল্প ক্রেতাকে বলা হয় না। কিছু গল্প শালের ভেতরে থেকে যায়।”
সৃজনী অবাক হয়ে তাকাল, “তাহলে আমি যে শাল কিনেছি, তার ভেতরের গল্পটা কি অন্য?”
মা মৃদু হাসলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। যেন সেই উত্তর পেতে হলে আরও কিছু পথ হাঁটতে হবে।
সোহম সৃজনীকে নিয়ে গেল বাড়ির পেছনের উঠোনে। সেখানেই তিস্তার ধারে একটা খোলা জায়গা, যেখানে বাঁশের খুঁটিতে ঝুলছে সারি সারি শাল— রোদে শুকোচ্ছে, হাওয়ায় দুলছে। শালগুলোর রঙ যেন নদীর সঙ্গে কথোপকথন করছে। লাল শালকে নদী দিয়েছে আভা, ধূসর শালকে দিয়েছে গভীরতা, আর নীল শাল যেন জলের প্রতিফলনেই তৈরি।
“এগুলো শুধু কাপড় নয়,” সোহম বলল, “প্রতিটা রঙ এখানে আসার আগে একবার নদীর কাছে নতজানু হয়। তাই আমি বলেছিলাম, বেলা তিনটার আগে এলে তিস্তা বেশি কথা বলে— তখনই রঙের স্বর সবচেয়ে স্পষ্ট।”
সৃজনী শালগুলোর ফাঁকে দাঁড়িয়ে ভাবল, শহরে কোনোদিন কি সে এমন কোনো জায়গায় থেকেছে, যেখানে জিনিসপত্রের ভেতরে এত গল্প থাকে? হয়তো থেকেছে, কিন্তু শোনার সময় পায়নি।
হঠাৎ সোহমের ফোনে একটা কল এল। কথা বলতে বলতে তার মুখের রঙ বদলে গেল। কল কেটে সে বলল, “মেলায় একটু যেতে হবে, একজন আগেই বুক করা শাল নিতে এসেছে। তুমি চাইলে এখানে থাকতে পারো, মা তোমাকে সব দেখিয়ে দেবে।”
সৃজনী মাথা নেড়ে রাজি হল। সোহম চলে যেতেই মা তার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা পুরোনো শাল— কাঁথার মতো মোটা, কিন্তু তার ভাঁজে ভাঁজে অদ্ভুত নকশা।
“এই শালটা,” মা ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার কেনা শালের মতোই ধূসর-নীল ছিল একসময়। কিন্তু এই নকশাগুলো… এগুলো এক নারীর জীবনের গল্প।”
সৃজনী শালটা বুকে চেপে রাখল। কৌতূহল তার ভেতরে জমাট বাঁধতে লাগল— কে সেই নারী? কেন তার গল্প এত গোপন?
মা শুধু বললেন, “সব রঙ চোখে দেখা যায় না, কিছু রঙ কেবল মনে ওঠে।”
এবং ঠিক সেই মুহূর্তে, সৃজনীর মনে হল— তার এই উত্তরবঙ্গ-যাত্রা হয়তো কেবল রঙের জন্য নয়, বরং সেই অদৃশ্য রঙ খুঁজে পাওয়ার জন্য, যেগুলো এতদিন তার চোখে ধরা দেয়নি।
পর্ব ৪
শালটার ভাঁজে আঙুল চালাতেই সৃজনীর মনে হল, যেন সুতোয় সুতোয় লুকিয়ে আছে কালের ধুলো, নদীর শব্দ আর কারও নিঃশ্বাসের গোপন ছাপ। ধূসর-নীলের ফিতে ফিতে রঙের ফাঁকে ছড়ানো আছে ক্ষুদ্র নকশা— শঙ্খ, কাশফুল, আর কোথাও যেন একজোড়া পাখির ছায়া। নকশাগুলো এত সূক্ষ্ম যে প্রথমে বোঝা যায় না, কিন্তু মনোযোগ দিয়ে তাকালে মনে হয় এগুলো শুধু সাজ নয়, বরং কিছু বলছে।
মা উঠোনের দিকে তাকিয়ে একমুহূর্ত চুপ করে রইলেন, যেন ঠিক করছিলেন কতটা বলা যায়। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“এই শাল বুনেছিল বীণা— আমাদের গ্রামেরই মেয়ে। বীণা ছিল তিস্তার মতো— শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্থির। তার বাবা তাঁত বুনতেন, মা রঙ তুলতেন। ছোটবেলা থেকেই শাল বোনার হাত ছিল তার অসাধারণ। কিন্তু বীণার শালের রঙগুলো ছিল অন্যরকম— ও নদীর জল, কুয়াশা, সন্ধ্যার আকাশ, এমনকি কারও হাসি পর্যন্ত রঙে বুনে দিত। যে দেখত, অবাক হয়ে যেত।”
সৃজনী নিঃশব্দে শুনছিল। শীতল সকালের হাওয়া এখন যেন একটু ভারী লাগছিল, কারণ গল্পের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে সে।
মা বললেন,
“মেলায় একবার এসেছিল শহরের এক শিক্ষক— নাম অরিন্দম। বই আর কাগজে ভরা ব্যাগ, চোখে গোল চশমা, গলায় নরম স্বর। বীণার সঙ্গে দেখা হল শালের দোকানে। কথা শুরু হয়েছিল শুধু ‘এটা কত দাম?’ থেকে, কিন্তু সেখানেই থামেনি। অরিন্দমের গল্প ছিল শহরের— রোদের দুপুরে কলেজের আড্ডা, পুরোনো সিনেমা হল, বইয়ের গন্ধ। আর বীণা তাকে শোনাত নদীর স্রোত, বুননের তাল, বৃষ্টির মধ্যে শুকোতে দেওয়া রঙিন সুতো। তারা আলাদা জগতের মানুষ, তবু একে অপরের মধ্যে সেই জগত দেখতে শুরু করল।”
সৃজনী শালটা বুকের কাছে টেনে নিল, যেন তার উষ্ণতা দিয়ে সে অচেনা দু’জনের কাছে আসা অনুভব করছে।
“অরিন্দম বলেছিল,” মা স্মৃতির গলিপথে হেঁটে যাচ্ছিলেন, “‘তুমি একদিন শহরে চলে এসো, তোমার শাল নিয়ে। আমি তোমাকে নিয়ে যাব বইমেলায়।’ বীণা হাসত, কিছু বলত না। কিন্তু এক শীতে, অরিন্দম আর এল না। খবর এল— সে শহর ছেড়ে বিদেশে পড়াতে চলে গেছে। চিঠি লিখেছিল কিনা, কেউ জানে না। বীণা শুধু সেই শীতেই বুনেছিল এই শাল— ধূসর-নীল, ফাঁকে ফাঁকে পাখি, কাশফুল, আর শঙ্খ। ও বলেছিল, ‘এটা আমার বিদায়ের শাল, কিন্তু বিদায় আমি বেচব না।’”
সৃজনীর গলা শুকিয়ে এল। “তারপর?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তারপর এক বর্ষায় তিস্তা ফুলে উঠল। একদিন সকালে দেখা গেল, বীণা নেই। কোথায় গেল, কেউ জানে না। শুধু এই শালটা ছিল ওর তাঁতের ওপর, শুকোতে দেওয়া। আমরা ভাঁজ করে রেখে দিয়েছিলাম। বিক্রি করিনি, দেবও না। তিস্তা যাদের নেয়, তাদের গল্প নদীর স্রোতে মিশে যায়।”
শালটার ভেতরে এখন সৃজনীর হাত কাঁপছিল। সে যেন দেখতে পাচ্ছিল বীণাকে— লম্বা চুলে বাতাস, চোখে গভীর জল, আর হাতে এই শাল। সে বুঝতে পারছিল, এই কাপড় শুধু উল আর রঙ নয়— এটি অসমাপ্ত প্রেমের ছাপ, যার পরিসমাপ্তি নদী লিখে দিয়েছে নিজের ভাষায়।
ঠিক তখন সোহম ফিরে এল, হাতে কিছু নতুন শাল। সৃজনী চুপচাপ শালটা গুটিয়ে মায়ের হাতে দিল, কিন্তু তার চোখে যেন প্রশ্ন ঝলসে উঠছিল— কেন এই গল্পটা আমায় শোনালেন?
মা মৃদু হেসে বললেন,
“কারণ তোমার চোখে আমি সেই রঙ দেখেছি— যে রঙ শুধু নদী বোঝে।”
সোহম অবাক হয়ে দু’জনের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। তার চোখে যেন মায়ের কথার মানে সে নিজেও বুঝতে পারছে না, বা হয়তো বুঝে ফেলে চুপ করে আছে।
সৃজনী বুঝল, তার এই যাত্রা আর শুধু শীতের ছুটি নয়। বীণার গল্প তার ভেতরে ঢুকে গেছে, আর তিস্তার রঙের সঙ্গে মিশে গেছে এমন এক ধ্বনি, যা হয়তো একদিন তার নিজের গল্পের সাথেও জুড়ে যাবে।
পর্ব ৫
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে সোনালি থেকে গাঢ় কমলাতে ঢলে পড়ছে। তিস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সৃজনী দেখছে— নদীর ওপর সূর্যের প্রতিফলন যেন রঙ বদলে বদলে গান গাইছে। পাশে সোহম, হাতে ধরা এক কাপ চা, চোখ দূরের পাহাড়ে। শীতের এই সময়টায় পাহাড়ের ছায়া নদীর গায়ে নেমে আসে, আর জল হয়ে ওঠে অদ্ভুত এক ধূসর-সবুজ, যেখানে দিনের স্মৃতি আর রাতের প্রতিশ্রুতি একসাথে লুকিয়ে থাকে।
দু’জনের মাঝে কিছুক্ষণ কোনো কথা নেই। নীরবতা এত ঘন যে মনে হয়, শ্বাস নেওয়ার শব্দও নদী শুনে ফেলবে। অবশেষে সোহম বলল,
“মা কি তোমাকে গল্পটা বলেছে?”
সৃজনী মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল। তার চোখ এখনো নদীর জলে— যেন গল্পের ভেতরে সে এখনো ডুবে আছে।
“বীণার গল্প শুধু প্রেমের নয়,” সোহম বলল ধীরে, “ওর ভেতরে ছিল এমন এক রঙ, যা খুব কম মানুষ বোঝে। অরিন্দম যদি ফিরে আসত, হয়তো কিছু বদলাত… কিন্তু নদী কিছু গল্প নিজের মতো শেষ করে।”
সৃজনী চুপ করেই শুনছিল। কিছু গল্পে মন্তব্য করার মতো কথা থাকে না। শুধু মনে হয়, সেই গল্পগুলো ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেও জায়গা করে নিচ্ছে।
হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা এলো, শীতল আর সজীব। নদীর ওপর শুকোতে দেওয়া কয়েকটা হালকা শাল হেলে পড়ল, আর একটি এসে সোজা সৃজনীর কাঁধে জড়িয়ে গেল। সোহম এগিয়ে এসে শালটা ঠিক করে দিল। আঙুলের ছোঁয়া এতটুকুই— কিন্তু শীতের ভেতরে সেই ছোঁয়া যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতার ঢেউ ছড়িয়ে দিল তার শরীরে।
“তুমি জানো,” সোহম বলল, “রঙ শুধু চোখে দেখা যায় না। কখনো কখনো মানুষই রঙ হয়ে যায়— কারও জীবনে ঢুকে যায়, আর তারপর সে রঙ চাইলেও মুছতে পারে না।”
সৃজনী তার দিকে তাকাল, কিন্তু সোহম তখন নদীর জলে চোখ রেখেছে, যেন তার কথাগুলো শুধু হাওয়ায় ভেসে গেছে।
দূরে মেলার দিক থেকে ভেসে আসছে ঢোলের শব্দ, কোথাও কোনো শিশুর হাসি, আর গরম জিলিপির গন্ধ। সৃজনী মনে মনে ভাবল, শহরে ফিরে গেলে এই মুহূর্তটাকে সে কীভাবে মনে রাখবে? শালের মতো ভাঁজ করে রাখবে, নাকি নদীর মতো চলতে দেবে?
সোহম বলল,
“তুমি কাল ফিরে যাচ্ছ?”
সৃজনী এক মুহূর্ত থামল। “এখনও জানি না। হয়তো থাকব আরেকটা দিন।”
“থাকো,” সোহম বলল সহজভাবে। “কাল নদীর ধারে মেলা শেষ হবে। শেষ দিনে নদী অন্যরকম দেখায়। হয়তো তুমি বীণার চোখে যে রঙ দেখেছিলে, তা নিজেও দেখতে পাবে।”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আকাশে প্রথম তারা উঠেছে। নদীর ধারে বসে সৃজনী বুঝতে পারল— এই জায়গাটা তার ভেতরে এমন কিছু জাগিয়ে দিয়েছে, যা হয়তো বহুদিন ঘুমিয়ে ছিল। হয়তো এটাই সেই অদৃশ্য রঙ, যেটা মা বলেছিলেন।
ফেরার পথে দু’জনের মাঝখানে আবার সেই স্বাভাবিক নীরবতা। কিন্তু এবার নীরবতার ভেতরে একটুকরো আস্থা, একটুকরো অচেনা প্রতীক্ষা এসে বসেছে।
সৃজনী জানে, তার শহরের জীবন একদিন আবার শুরু হবে— কফিশপ, মিটিং, সপ্তাহান্তের আড্ডা। কিন্তু আজকের এই সন্ধ্যা, এই নদী, এই শালের উষ্ণতা— এগুলো তার মনে থেকে যাবে রঙের মতো, যা কোনো ধোয়ার জলে মুছবে না।
পর্ব ৬
রাতটা ছিল নিস্তব্ধ, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে যেন নদীর স্রোতের একটা অদৃশ্য গুঞ্জন বাজছিল। সৃজনী হোটেলের কক্ষে শুয়ে শুয়ে বারবার শালের ভাঁজে আঙুল বোলাচ্ছিল— সেই ধূসর-নীল, সাদা রেখার শাল, যা সে প্রথমদিন কিনেছিল। সোহমের কণ্ঠস্বর, মায়ের চোখের রহস্য, আর বীণার গল্প— সবকিছু মিলে তার মনে এক ধরনের অব্যক্ত টান তৈরি করেছে।
জানলার বাইরে চাঁদের আলো গাছের পাতার ওপর সাদা আঁচল ফেলে দিয়েছে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে, আবার কোথাও মেলার শেষ রাতের প্রস্তুতির শব্দ। শহরে থাকলে এই সময়টায় সৃজনী হয়তো ফোন স্ক্রল করত, নতুন কোনো সিরিজ শুরু করত, বা ঘুমিয়ে পড়ত ব্যস্ত আগামী দিনের জন্য। কিন্তু এখানে সময় যেন থেমে আছে, আর সে নিজেই সময়ের অংশ হয়ে গেছে।
সকালে কুয়াশা ছিল এত ঘন যে আঙুল বাড়ালেই মনে হয় কুয়াশার তুলো ছুঁয়ে ফেলা যাবে। সৃজনী নদীর ধারের পথ ধরল, সঙ্গে ছোট্ট এক ব্যাগ— যাতে ছিল তার কেনা শাল আর কিছু নোটবই। আজ মেলার শেষ দিন, আর সোহমের কথা মতো নদীর রঙ আজ অন্যরকম দেখতে চায় সে।
দূরে গিয়ে দেখে, তিস্তার জল আজ একেবারে স্বচ্ছ সবুজাভ— যেন পাহাড়ের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো পুরোনো কাঁচের টুকরো। রোদের আলো তাতে পড়ে রঙকে ভেতর থেকে জ্বেলে দিচ্ছে। তীরে বাঁশের খুঁটিতে ঝুলছে কিছু নতুন শাল— রঙ গাঢ়, যেন শেষ দিনের প্রদর্শনী।
সোহম শাল মেলছে, চোখে ক্লান্তি আছে কিন্তু মুখে সেই অভ্যস্ত উষ্ণ হাসি।
“তুমি এসেছ,” সে বলল, “ভেবেছিলাম হয়তো শহরের টিকিট কেটে ফেলেছ।”
সৃজনী হেসে মাথা নাড়ল। “এমন রঙের দিন মিস করা যায়?”
দু’জন মিলে শালগুলোর ফাঁকে হাঁটতে হাঁটতে সোহম হঠাৎ একটা শাল নামাল— গাঢ় নীল, তাতে হালকা সোনালি নকশা।
“এটা আজ সকালে বোনা শেষ হয়েছে,” সোহম বলল। “এটার নাম রেখেছি ‘ফেরার আলো’।”
সৃজনী শালটা হাতে নিল। আঙুলে স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল, এই রঙের ভেতরে লুকিয়ে আছে একধরনের প্রতিশ্রুতি— হয়তো বিদায়ের, হয়তো ফেরার।
“কেন এই নাম?” সে জিজ্ঞেস করল।
সোহম একটু থেমে বলল, “কারণ কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের গল্প রঙের ভেতরে থেকে যায়। সেই গল্প যখন আবার আলোতে আসে, তখন বুঝতে পারি— বিদায় আর ফেরার মধ্যে আসলে তফাৎ খুব কম।”
সৃজনী কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল, এই কথাগুলো সে নিজের জীবনের সাথেও মিলিয়ে দেখতে পারছে। হয়তো কিছু সম্পর্ক, কিছু অনুভূতি কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না— তারা রঙ বদলে, আকার বদলে আবার ফিরে আসে।
বিকেলের দিকে মেলার গন্ধ, শব্দ, আর মানুষের ভিড় বেড়ে গেল। শালের দোকানের সামনে ক্রেতারা জড়ো হচ্ছে, কেউ দরদাম করছে, কেউ গল্প শুনছে। সোহম ব্যস্ত, কিন্তু মাঝে মাঝে সৃজনীর দিকে তাকিয়ে হাসছে— যেন সেই ভিড়ের মধ্যেও দু’জনের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতো টানটান হয়ে আছে।
মেলার শেষ মাইকে ঘোষণা হল— “আজ রাতের পর এই বছরের মেলা শেষ হবে।” সৃজনীর বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হল, ঠিক যেমন কোনো বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছে গেলে হয়।
সন্ধ্যা নামতেই নদীর ধারে শালগুলো গুটিয়ে নেওয়া হল। সোহমের মা এসে সৃজনীর হাতে একটি ছোট পুঁটলি দিলেন।
“এটা রাখো,” তিনি বললেন, “ভিতরে একটি ছোট শাল আছে— বীণার নয়, কিন্তু বীণার রঙে বোনা। হয়তো একদিন বুঝবে কেন দিলাম।”
সৃজনী অবাক হয়ে পুঁটলিটা হাতে নিল, কিছু বলার আগেই মা অন্য ক্রেতার দিকে চলে গেলেন।
সোহম কাছে এসে বলল, “কাল আমি তোমাকে স্টেশনে পৌঁছে দেব। কিন্তু যাওয়ার আগে… নদীর ধারে একটু হাঁটবে?”
সৃজনী মাথা নেড়ে রাজি হল। আজকের এই শেষ বিকেল, শেষ রঙ— সে মিস করতে চায় না।
পর্ব ৭
রাত নেমেছে ধীরে ধীরে, যেন কেউ আঙুলের ডগা দিয়ে আকাশের আলো মুছে দিচ্ছে। তিস্তার ধারে কুয়াশা গাঢ় হয়ে বসে গেছে, দূরে পাহাড়ের সিলুয়েট অদৃশ্য হয়ে কেবল নদীর গায়ের মৃদু ঝিলিক রয়ে গেছে। মেলার ভিড় ধীরে ধীরে কমে এসেছে, কেবল কয়েকটি দোকান এখনও আলো জ্বালিয়ে রেখেছে— হলুদ বাল্বের চারপাশে পতঙ্গেরা চক্কর কাটছে।
সোহম আর সৃজনী নদীর ধারের সরু পথ ধরে হাঁটছে। চারপাশে এত শান্ত যে, কেবল পায়ের নিচে নুড়ি পাথরের খসখস শব্দ আর দূরে ভেসে আসা ঢোলের ক্ষীণ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
“এখানকার রাতের গন্ধ আলাদা,” সোহম বলল ধীরে। “শহরে তো গন্ধ হারিয়ে যায় ধোঁয়ার মধ্যে, কিন্তু এখানে… নদীর জল, কুয়াশা, আর শুকনো পাটের গন্ধ মিশে থাকে।”
সৃজনী হালকা হেসে বলল, “গন্ধেরও কি গল্প থাকে?”
“অবশ্যই,” সোহম থামল না হাঁটায়। “গন্ধই তো প্রথমে বলে দেয়— কোনো জায়গা তোমার হবে কি না। যেমন রঙ গল্প ধরে রাখে, তেমন গন্ধ স্মৃতি ধরে রাখে।”
তারা নদীর ধারে এসে দাঁড়াল। চাঁদের আলো কুয়াশার ভেতর দিয়ে ফুঁড়ে বেরোতে পারছে না, শুধু নদীর পিঠে হালকা রূপালি রেখা এঁকে দিচ্ছে। সোহম পকেট থেকে একটা ছোট টিনের বাক্স বের করল, ভেতরে শুকনো তুলোতে মোড়ানো কিছু রঙিন সুতো।
“এগুলো,” সে বলল, “বীণার শেষ রঙের সুতো। মা রেখেছিল। কাউকে দেয়নি।”
সৃজনী বাক্সটা হাতে নিয়ে দেখল— গাঢ় নীল, হালকা সোনালি, আর একটা ফিকে সাদা, যা প্রায় কুয়াশার মতো। আঙুল ছোঁয়াতেই মনে হল যেন নদীর জল ছুঁয়ে যাচ্ছে।
“তুমি এগুলো রাখো,” সোহম বলল। “তুমি শুনেছ তার গল্প, দেখেছ তার রঙ। হয়তো একদিন তুমি এর নতুন গল্প বুনতে পারবে।”
সৃজনী অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “কেন আমি?”
সোহম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কারণ তুমি শুনতে জানো। সবাই শোনে না— অনেকেই শুধু নিজের কথা বলে। তুমি প্রথম দিন থেকেই রঙের ভাষা শুনছ।”
নীরবতা আবার নেমে এল। নদীর ওপরে কোথাও জলচর পাখির ডাক ভেসে এলো। সৃজনীর মনে হল, এই মুহূর্তটা যেন আটকে রাখতে ইচ্ছে করছে— ঠিক যেমন পুরোনো কোনো চিঠির মধ্যে শুকনো ফুল চাপা দিয়ে রাখা হয়।
“কাল তুমি গেলে…” সোহমের গলায় সামান্য থেমে যাওয়া, “হয়তো দেখা হবে না অনেকদিন।”
“হয়তো,” সৃজনী বলল, “কিন্তু রঙ তো থেকে যাবে।”
সোহম মৃদু হাসল। “হ্যাঁ, রঙ থেকে যায়।”
তারা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে মেলার আলোয় ফিরে এল। দূরে ঢোল থেমে গেছে, কেবল নদী তার নিজের গল্প বলে যাচ্ছে— নিরবচ্ছিন্ন, ধীর, আর রঙিন।
পর্ব ৮
ভোরবেলা হোটেলের জানালা খুলতেই সৃজনী দেখল— পাহাড়ের মাথায় নরম কুয়াশা, আর তিস্তার ধারে হালকা ধোঁয়ার মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। শহরে ফেরার জন্য ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছে আগের রাতেই, তবু হাত শালের ভাঁজে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে, যেন স্পর্শটা মনে রাখতে চাইছে।
চায়ের কাপ হাতে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সে ভেবেছিল, বিদায়ের সকাল হয়তো বিষণ্ণ হবে। কিন্তু আজকের আকাশে রোদ আছে— মৃদু, নরম, যেন বলতে চাইছে, “সব শেষ নয়।” তবু বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত টান রয়ে গেছে— যেন এখানে কিছু অসম্পূর্ণ রঙ ফেলে যাচ্ছে সে।
স্টেশনে পৌঁছনোর সময়টায় হাওয়া ছিল কনকনে ঠান্ডা। ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, লাল রঙের ছাউনির নিচে কয়েকটা বেঞ্চ, আর দূরে চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে। সোহম তার জন্য এক কাপ গরম দুধ-চা এনে দিল, হাতে ধরিয়ে বলল, “রাস্তার ক্লান্তি কমে যাবে।”
সৃজনী মৃদু হেসে কাপটা নিল। “তুমি মেলায় যাচ্ছ না আজ?”
“মেলা তো শেষ,” সোহম বলল, “তবে তোমাকে বিদায় না দিয়ে কোথাও যাব না।”
দু’জনেই বেঞ্চে বসে চুপচাপ চা খাচ্ছিল। প্ল্যাটফর্মের ওপারে, লাইনের ধারে শালিক পাখি কয়েকটা বসে আছে। সৃজনীর মনে হল, বিদায়ের মুহূর্তও যেন নিজের মতো করে শান্ত হতে চাইছে।
ট্রেন ঢোকার শব্দ শোনা গেল দূরে— লোহার চাকার খটখট, হুইসেলের তীক্ষ্ণ ডাক। সৃজনী ব্যাগ তুলে দাঁড়াতেই সোহম পকেট থেকে কিছু বের করল— ছোট্ট একটা কাপড়ের থলি, বাঁধা লাল সুতোয়।
“এটা কী?” সৃজনী অবাক।
সোহম থলিটা তার হাতে দিল। “ভিতরে আছে তিনটে জিনিস— বীণার শেষ রঙের সুতো, আমাদের গ্রামের কাশফুলের শুকনো ডাঁটা, আর নদীর ধারে পাওয়া এক মসৃণ পাথর। আমি চাই, এগুলো তোমার সঙ্গে যাক।”
সৃজনীর গলা যেন আটকে গেল। “আমি… কী করব এগুলো দিয়ে?”
সোহম শান্ত গলায় বলল, “যখন মনে হবে, রঙ মুছে যাচ্ছে… তখন এগুলো ছুঁয়ে দেবে। রঙ ফিরে আসবে।”
ট্রেন থামল। যাত্রীরা ওঠা-নামা করছে, হৈচৈ, কিন্তু তাদের দু’জনের চারপাশ যেন অন্য এক নীরবতায় ঘেরা। সৃজনী ব্যাগ কাঁধে তুলে ট্রেনের সিঁড়িতে উঠতে গেল, কিন্তু এক মুহূর্ত থেমে সোহমের দিকে তাকাল।
“আমার গল্পটা শেষ হয়নি,” সে বলল আস্তে।
সোহম মৃদু হাসল— সেই হাসি যা প্রথমদিন মেলায় দেখেছিল সৃজনী। “গল্প শেষ হলে রঙ ফিকে হয়ে যায়। তুমি ফিরে এলে নতুন রঙ উঠবে।”
ট্রেন ছাড়ল ধীরে ধীরে। সৃজনী জানালার ধারে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে দেখল— সোহম এখনো দাঁড়িয়ে আছে, শীতের সকালের ভেতর, তার হাতে ধরা ধূসর-নীল শাল বাতাসে দুলছে।
স্টেশন পেছনে মিলিয়ে যেতেই সৃজনীর মনে হল, তিস্তা আর এই শাল— দুটোই তার জীবনে এমন এক রঙ দিয়ে গেছে, যা মুছে ফেলার নয়। আর হয়তো একদিন, যখন ফেরার সময় হবে, সেই রঙই পথ দেখাবে।
পর্ব ৯
কলকাতায় ফেরার পর প্রথম ক’দিন সৃজনী যেন ভাসমান ছিল— কাজের চাপ, মিটিং, মেসেজের উত্তর, রাতবিরেতে ল্যাপটপের আলো। তবু, ব্যস্ততার মাঝেই মাঝে মাঝে তার বুকপকেটে রাখা ছোট কাপড়ের থলিটা ছুঁয়ে দেখত। লাল সুতোয় বাঁধা সেই থলির ভেতরের তিনটি জিনিস— বীণার শেষ রঙের সুতো, শুকনো কাশফুলের ডাঁটা, আর নদীর ধারে পাওয়া মসৃণ পাথর— যেন গোপনে তার দিন বদলে দিচ্ছিল।
প্রথম ক’দিন সে থলিটা খোলেনি। কেবল জানত, ওগুলো আছে। কিন্তু একদিন অফিস থেকে ফিরে, বৃষ্টিস্নাত শহরের জানালা খুলে রাখল, আর হঠাৎ থলিটা খুলে ফেলল। সুতোটার গাঢ় নীল, কাশফুলের ফ্যাকাসে সাদা, আর পাথরের মসৃণ ধূসর— একসাথে দেখে মনে হল, নদী যেন তার ঘরের ভেতরে এসে বসেছে।
পরের সপ্তাহে, সৃজনী এক প্রদর্শনীতে গিয়েছিল— শহরের এক কোণে হাতে বোনা কাপড়ের মেলা। রঙিন স্টল, কাঠের তাঁত, উলের গন্ধ— মুহূর্তের জন্য সে ভেবেছিল, হয়তো জলপাইগুড়ির মেলায় ফিরে এসেছে।
একটি স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে শাল দেখছিল, তখনই কানে এলো পরিচিত এক স্বর— নরম, গলায় হালকা হাসি মেশানো।
“এই রঙটা লাল নয়, বৃষ্টির পরে রোদ যেমন হয়, ঠিক তেমন।”
সৃজনী চমকে তাকাল— না, সোহম নয়। একজন তরুণ ছেলে, কিন্তু কথার ভঙ্গিতে, চোখের কোণে সেই একই আন্তরিকতা। সে শাল গুছিয়ে ক্রেতার হাতে দিল, তারপর সৃজনীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি জলপাইগুড়ি গিয়েছিলেন, তাই না? সোহমদার কথা বলতেন?”
সৃজনী বিস্মিত। “তুমি… চেনো ওকে?”
“আমি ওর বন্ধু,” ছেলেটি হেসে বলল। “এবারের শীতের মেলায় ও আসতে পারেনি— মা অসুস্থ। তাই আমাকে পাঠিয়েছে। বলেছে, যদি একদিন এমন একজন আসেন, যার চোখে নদীর রঙ থাকে, তাকে এটা দিতে।”
সে ব্যাগ থেকে ছোট একটি খাম বার করল। ভেতরে ধূসর-নীল কাগজে লেখা—
“সৃজনী,
রঙ মুছে যাওয়ার আগে আমি আরেকটা গল্প শুরু করেছি। তিস্তার ধারে, শালের ভাঁজে, তোমার জন্য রাখা আছে নতুন রঙ। ফিরে আসবে তো?”
সৃজনীর বুকের ভেতর হঠাৎ এক ঝলক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল— ঠিক যেমন শীতের সকালের প্রথম রোদে নদী ঝিলমিল করে ওঠে।
সেই রাতে, ঘুমোবার আগে শালটার ভাঁজে কাগজটা রেখে দিল সে। শহরের শব্দ, গাড়ির হর্ন, মোবাইলের স্ক্রিন— সব মিলিয়ে চারপাশ আবার ব্যস্ত। তবু তার ভিতরে, কোথাও এক নদী বয়ে চলেছে— যার রঙ এখন আরও গভীর, আরও ডাকছে।
সে জানে, এই গল্প এখানেই থেমে নেই।
পর্ব ১০
শহরের ভিড়, ধোঁয়া আর কাজের চাপের ভেতরেও সৃজনীর মন যেন বারবার এক অদৃশ্য পথ ধরে চলে যাচ্ছিল— তিস্তার ধার, বাঁশের খুঁটিতে ঝুলে থাকা শাল, আর সোহমের হাসি। অফিসের লাঞ্চব্রেকে, মেট্রোর ভিড়ে, এমনকি রাতের কোলাহলহীন জানালার ধারে দাঁড়িয়েও তার কানে ভেসে আসত নদীর শব্দ।
সেই চিঠি পাওয়ার পর থেকে দিনগুলো অন্যরকম হয়ে গেছে। সুতোর গাঢ় নীল, শুকনো কাশফুলের ফ্যাকাশে সাদা, আর পাথরের ধূসর— এই তিন রঙ যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিছু গল্প অসম্পূর্ণ রাখলে তারা ভেতরে পচে যায়।
এক রবিবার ভোরে সৃজনী সিদ্ধান্ত নিল— ফিরবে। আর কোনো পরিকল্পনা নয়, কোনো ঘোষণা নয়। শুধু ব্যাগে রাখল শালটা, সোহমের খাম, আর নিজের নোটবই। টিকিট কেটে ফেলল রাতের ট্রেনের জন্য।
জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছনোর সময় কুয়াশা ভেসে ছিল রেললাইনের ওপর। ভোরের হাওয়ায় তীক্ষ্ণ ঠান্ডা কামড় দিচ্ছে, আর প্ল্যাটফর্মে চায়ের ধোঁয়া উড়ছে। সৃজনীর বুকের ভেতরে হালকা কাঁপুনি— উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার মিশ্রণ।
নদীর ধারের পথে হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝতে পারল, শরীর যতটা ঠান্ডা পাচ্ছে, মন ঠিক ততটাই গরম হয়ে উঠছে। বাঁশের গেট পেরিয়ে সেই পরিচিত উঠোনে পৌঁছনোর মুহূর্তে তার চোখে পড়ল— আঙিনায় রোদে শুকোতে দেওয়া শাল, আর সামনে দাঁড়িয়ে সোহম, হাতে ধরা নতুন একটি ফ্রেম, তাতে ঝুলছে একেবারে অন্যরকম রঙ।
গাঢ় সবুজের ভেতরে ফোঁটা ফোঁটা হলুদ, যেন বসন্তের প্রথম সরষে ক্ষেত, আর তার ফাঁকে ধূসর রেখা— নদীর পাড়ের নুড়ি-পাথরের ছাপ।
সোহম থমকে গেল, তারপর ধীরে ধীরে হাসল— সেই চেনা হাসি, যা প্রথমদিন মেলায় দেখেছিল সৃজনী।
“তুমি ফিরেছ,” সে শুধু এইটুকুই বলল।
সৃজনী শালের দিকে তাকাল। “এটার নাম কী?”
“আমি নাম দিইনি,” সোহম বলল। “চেয়েছিলাম, তুমি আসবে, তারপর নাম রাখব।”
দু’জনেই নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, আর রোদ জলরেখায় নাচছে। সোহম শালটা তার কাঁধে জড়িয়ে দিল— এবার স্পর্শটা অনেক দীর্ঘ, অনেক বেশি নিশ্চিন্ত।
“এটার নাম হবে ‘ফেরার রঙ’,” সৃজনী আস্তে বলল। “কারণ কিছু রঙ শুধু ফিরে আসার পরই দেখা যায়।”
সোহম মাথা নত করে সম্মতি দিল। নদীর ধারে তখন বাতাসে হালকা গন্ধ— শুকনো পাট, শীতের রোদ, আর কিছু অদৃশ্য কণ্ঠস্বর, যা হয়তো নদীর নিজের গল্প।
সেই মুহূর্তে সৃজনী বুঝল— সে আর কেবল অতিথি নয়। এই নদী, এই শাল, এই মানুষ— সব মিলিয়ে এখন তার নিজের গল্পের অংশ হয়ে গেছে। আর এই গল্পে রঙ কখনো ফিকে হবে না, যতদিন তিস্তা বয়ে চলবে।
***


