গনেশ মাহাতো
পর্ব ১
ভোরের আলো ঠিক যেন সোনার ছিটে মেখে পুরুলিয়ার মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছে। পিড়রা গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর, মাটির দেয়ালে ধানগাছের আঁচড়, ছাউনিতে খড়। এখানেই থাকে বছর চল্লিশের লোখো মাহাতো। নামটাই যেন ভরসার মতো। লোখো মানে লক্ষ্মী—তবে ওর জীবনে লক্ষ্মীটা কেবল নামেই আটকে।
লোকটা শান্ত, নিজের মনে কাজ করে, সারাদিন মাঠে, সন্ধ্যেবেলা হারমোনিয়াম নিয়ে বসে। গান গায় না ঠিক, গায়ে-গায়ে কিছু বোঝাতে চায়। সেই যে একদিন বুড়ো কনেই বলে গেছিল, “তুই কেবল চাষ করিস না রে লোখো, এই মাটির সুরটাও বুকে বাঁধিস।” এইটুকু কথা নিয়ে সে চলেছে।
লোখোর বউ, ফুলমনি, সকালবেলা সিজির গর্তে জল ভরে আনছে, পিঠে কুঁড়ি বাচ্চা—তিন বছরের পুচকে মেয়েটা, নাম মালতি। হেসে খেলে, ধুলোয় লুটিয়ে, দু’চোখে গ্রাম দেখে। ফুলমনির কপালে পুঁটির মতো ঘাম, কিন্তু মুখে কোনও অভিযোগ নেই।
গ্রামের ভিতরে খবর ছড়িয়েছে—তালতোড়ার রাস্তার কাজে ব্লক অফিস থেকে লোক আসছে। লোখো আর দশজনের মতোই জানে, এ কাজ হলে ওর একখণ্ড জমি কেটে যাবে। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। একটুখানি রোজগারের আশায় সবাই মুখ বুজে আছে।
“লোখো, তোর পেছনের ধানখেতত রাস্তা বানাবে শুনলি?” — চা দোকানে ঝর্ণা মুর্মু জিজ্ঞেস করল।
লোখো একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ দিদি, শুনেছি। সরকার যা ভালো বোঝে, করুক।”
কিন্তু ভিতরে ভিতরে লোখোর বুকটা ধুকপুক করছে। জমিটা ছোট, ঠিক মাঝখানটা কেটে গেলে চাষ আর হবে না। তার মানে এই বছরটা বেকার। মালতির স্কুলে ভর্তি, ফুলমনির ওষুধ, নিজের খোরাকি—সবকিছু অনিশ্চিত।
সন্ধ্যাবেলা লোখো বাড়ি ফিরে দেখল মালতি কাদা দিয়ে পুতুল বানাচ্ছে। মুখে হাসি, চোখে স্বপ্ন। “বাবা, এইটা তুমি, এইটা মা, আর এইটা আমি। আমরা তিনজন, কুঁড়েঘরে থাকি।”
লোখো চুপ করে বসে থাকে। ভাবতে থাকে, কুঁড়েঘর থাকবে তো? রাস্তা বানাতে হলে ঘরের পাশের খেজুরগাছগুলো কাটবে, খেত যাবে, জল যাবে। মালতির এই স্বপ্নগুলো কি থাকবে?
রাতে হারমোনিয়াম তুলে নেয় লোখো। একটা সুর বাঁধে—
“মাটির টান না ছাড়ে মন,
দেখিস ভাই, কে হারায় কহন।”
তার গলা খুব ভালো না হলেও, গানটা বুকের ভিতর কাঁপন তোলে।
পরদিন সকালে লোখো যায় ব্লক অফিসের চিঠি নিতে। অফিসের সামনে বহু লোক ভিড় জমিয়েছে—সবার মুখে উত্তেজনা। কেউ চায় টাকা, কেউ চায় রাস্তা, কেউ চায় কিছু না কাটুক।
কিন্তু লোখো জানে, মাটির টানের কাছে সব টাকা হার মানে।
পর্ব ২
চিঠিটা হাতে নিয়ে লোখো ঘরে ফিরে এল। খামে বড় হরফে লেখা—“তালতোড়া ব্লক উন্নয়ন প্রকল্প – রাস্তা সম্প্রসারণ ও পিচঢালাই।”
চিঠির ভিতরে আরও বলা—“গ্রামীণ উন্নয়নের স্বার্থে কিছু কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হবে। ক্ষতিপূরণ সরকার দেবে যথাযথভাবে।”
ফুলমনি পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল, “কি বলল রে?”
লোখো কেবল বলল, “চাষের জমিটা যাচ্ছে। সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে। কিন্তু ওই টাকায় তো আর ধান ফলবে না।”
ফুলমনি কিছু না বলে একটা হাঁড়িতে জল ঢেলে বসে রইল। তার চোখে জল নেই, কিন্তু মন যেন শুকিয়ে গেছে।
সন্ধ্যেবেলায় গ্রামের মিটিং ডাকল পঞ্চায়েত সদস্য রঘুনাথ সাউ। হাটতলায় আলো ঝলমলে, মাইকে গলা ফাটাচ্ছেন তিনি—“এই রাস্তা পুরুলিয়ার গর্ব হবে। পর্যটন বাড়বে, কাজ বাড়বে। তোমরা সবাই খুশি হও।”
ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ বলল, “তবে জমি কেটে দিলে আমরা খাবো কি?”
“সরকার টাকা দেবে ভাই। চুপচাপ জমা দাও। উন্নয়ন চাই না?”—রঘুনাথ চিৎকার করল।
লোখো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওর গলা থেকে কিছুই বেরোয় না। পেছনে ঝর্ণা দিদি এসে বলল, “তুই কিছু বললি না কেন রে?”
লোখো বলল, “বললে লাভ আছে? কারও কান শোনে?”
সেই রাতে মালতিকে ঘুম পাড়িয়ে ফুলমনি বলল, “লোকটা যদি খেত কেটে নেয়, তাহলে আমরা কিভাবে চলব বল তো?”
লোখো মুখ নিচু করে বলল, “আমি ভাবছি, একটা পুকুর খুঁড়ে মাছ চাষ শুরু করব। পুকুর খুঁড়তে কিছু লোক লাগবে, কাজও হবে, খেতের একদিক বাঁচাতে পারব।”
ফুলমনি অবাক, “তুই এতসব ভাবিস কবে রে?”
লোখো বলল, “এই মাটিতেই আমার মা শুয়ে আছে, বাবা হাড় ভেঙেছে, আমি জন্মেছি। এ মাটি ছুঁয়ে যদি চলতে না পারি, তবে বাঁচার মানে কী?”
পরদিন সকালবেলা কয়েকজন অফিসার এল খেত মাপজোখ করতে। সাদা প্যান্ট, লাল ব্যাজ, আর মোটা ফাইল হাতে। তাদের সঙ্গে পঞ্চায়েত সদস্যও।
লোখো মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে কাস্তে। অফিসার তাকে কিছু বলতে এল, সে বলল, “আপনারা যা করবেন করেন। শুধু বলছি, আমার জমির মাঝখানটা যেন কাটা না পড়ে। পাশ দিয়ে গেলে আমি চাষ চালাতে পারব।”
অফিসার বলল, “দেখুন, সরকার যেখানে রাস্তা টানবে, ওখানেই টানবে। আপস করা যাবে না।”
“তবে ক্ষতিপূরণ কত পাব?”—লোখো জিজ্ঞেস করল।
“এটা জমির পরিমাণ দেখে নির্ধারণ হবে। কাগজপত্র দিন।”
লোখো খাতা খুলে দিল। মনে মনে ভাবল, এই খাতা দিয়ে কি মাটির গন্ধ বোঝা যায়?
সন্ধ্যাবেলায় সে আর ফুলমনি বসে বসে হিসেব করল—ছোট পুকুর খোঁড়ার খরচ, মাছের বাচ্চা কেনা, খাদ্য, মালতির স্কুল ফি, ফুলমনির কাশির ওষুধ, চালডাল। হিসেবের খাতায় কোথাও একটা দাগ পড়ে রইল—‘মাটির ঋণ, ফেরত দিতে হবে।’
রাতের আঁধারে লোখো আবার হারমোনিয়াম তুলল। আজ ওর গলায় একটা নতুন সুর, যেন জমির গভীর থেকে উঠছে—
“কাগজে লিখা দাগটা নয়,
মাটির বুকের দাগই বড় হয়…”
গান শুনে পাশের ঘর থেকে মালতি হেসে বলল, “বাবা, গানটা আমায় শেখাবে?”
লোখোর চোখে জল চলে এলো। এই মেয়ে, এই সংসার, এই মাটি—সব যেন একসাথে মিশে গেছে।
পর্ব ৩
ভোরবেলা লোখোর ঘুম ভাঙল মালতির চেঁচামেচিতে—”মা, আজ স্কুলে রং তুলির কাজ! কাগজ দাও, তুলি দাও!”
ফুলমনি হেসে বলল, “লোখো, শুনলি? আমাদের মেয়ে ছবি আঁকবে। যে কদিন পর খেত থাকবে না, অন্তত ছবিতে তো থাকবে!”
লোখো ধানের বোঝা ঘাড়ে তুলতে তুলতে চুপচাপ বলল, “মাটির ছবি আঁকা কি যায় রে? আঁকিস তোদের চোখের ভিতর…”
সেদিন দুপুরে চা দোকানে বসে ছিল লোখো। ঠিক সেই সময় হঠাৎই বাইকে চেপে গ্রামে এল এক আধুনিক পোশাক পরা মেয়ে—মুখে সানগ্লাস, হাতে ডায়রি। নাম বনলতা ঘোষ। কলকাতা থেকে এসেছে, গবেষণার কাজে।
“আমি গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি। শুনেছি তালতোড়ার রাস্তার প্রকল্প নিয়ে একটু দ্বন্দ্ব আছে?”—মিষ্টি গলায় প্রশ্ন করল বনলতা।
ঝর্ণা দিদি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “ওরে লোখো, তুই-ই বল রে! তোর জমি যাচ্ছে। তোকে জিজ্ঞাসাও করে না কেউ!”
বনলতা একটু কৌতূহল নিয়ে লোখোর দিকে তাকাল।
লোখো মাথা নিচু করে বলল, “আমার কথায় কী এসে যায়? জমি তো কাগজে লেখা থাকে, কষ্ট তো মাটির ফাঁকে থাকে।”
বনলতা চুপ করে গেল। তার চোখে কিছুটা বিস্ময়। পরে সে বলল, “আমি আপনাদের গল্প শুনতে চাই, লিখতে চাই। উন্নয়ন কাগজে নয়, মানুষের বুকে লেখা হোক।”
সেদিন বিকেলেই বনলতা এল লোখোর বাড়িতে। মালতি তার ছবি দেখিয়ে বলল, “এই যে দেখুন, আমার বাড়ি, এই আমি, এই বাবা খেতে যাচ্ছে।”
বনলতা মুগ্ধ হয়ে বলল, “তুমি তো দারুণ আঁকো! নাম কী?”
“মালতি মাহাতো। আমার বাবার নাম লোখো।”
লোখো পাশ থেকে বলল, “ছোট ছবি আঁকে, আর আমি মাটি চাষ করি। আমরা দুজনেই কিছুকে ধরে রাখার চেষ্টা করি।”
বনলতা হাসল। ডায়েরিতে টুকে নিল কিছু কথা। তারপর বলল, “আপনাদের কথা কেউ জানে না। আমি লিখে যাব।”
সেই রাতে বনলতা একটা চিঠি লিখে রেখে গেল লোখোর জন্য। সেখানে লেখা—
“প্রিয় লোখো দা,
আপনার জমি, আপনার গান, আপনার মেয়ের আঁকা ছবি—এইসব মিলেই তো একটা পৃথিবী। আমি হয়তো শুধু গবেষক, কিন্তু আপনার গল্প আমার ভেতর নড়ে বসেছে। উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা না, মানুষকেও বোঝা।
ভালো থাকবেন। — বনলতা”
চিঠিটা পড়ে লোখোর চোখে জল এসে গেল। এই প্রথম কেউ বুঝল, সে কেবল জমির মালিক নয়—একটা জীবনের মালিক।
পরদিন সকালে পঞ্চায়েত অফিস থেকে আবার খবর এল—”আগামী সাতদিনের মধ্যে জমি ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সবাই প্রস্তুত থাকুন।”
লোখো এবার আর চুপ রইল না। সে বলল, “আগে শুনুন আমাদের কথা। একবার আমাদের মাঠে এসে দাঁড়ান। বুঝুন, জমি মানে কেবল মাটি নয়, জীবন।”
গ্রামে গুঞ্জন ছড়াল—লোখো এবার মুখ খুলেছে।
ঝর্ণা দিদি বলল, “ও যদি বলে, আমরাও বলব।”
আস্তে আস্তে লোখোর চারপাশে লোক জমতে লাগল। যেন কেউ একজন দরজা খুলে দিয়েছিল, বাকিরাও ঢুকতে পারল।
সেই রাতে হারমোনিয়াম তুলেই লোখো গাইল—
“একদিন কেউ আসবে, বলবে—
তুই যা গেয়েছিস, সেইটাই ইতিহাস…”
মালতি কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
পর্ব ৪
গরম হাওয়া বইছে। তালতোড়ার চারদিকে ধুলো উড়ছে, মাঠ শুকিয়ে কাঠ। এমন দিনে মাটির বুক ফাটে, আর মানুষের মনও ফাটে। লোখো কিন্তু আজ অন্যরকম। সকালবেলাতেই মালতির হাত ধরে মাঠে গেল। সঙ্গে ঝর্ণা দিদি, ছোটচাঁদ হাঁসদা, নন্দরাম সাঁওতাল—সবাই জুটে এসেছে।
মাঠের মাঝখানে একটা গাছের নিচে লোখো দাঁড়িয়ে বলল, “আজ আমরা আমাদের জমির কথা বলব, কাগজে না, মুখে মুখে। যে শুনতে চায়, শুনুক।”
ঝর্ণা দিদি গলা চড়িয়ে বললেন, “এই মাঠে আমার ছেলের অন্নপ্রাশন হয়েছে। এই মাঠে আমার বাপের শেষকৃত্য হয়েছে। এই মাঠ গেলে, আমরা কোথায় যাব?”
লোকজন একে একে বলতে শুরু করল—মাঠে কার ফসল হয়, কার মেয়ের বিয়ের পণ জোটে, কে কতদিন রোদে পুড়ে ধান রোপরেছে। প্রতিটা জমির গল্প আছে, প্রতিটা মানুষের সঙ্গে একটানা জড়িয়ে।
বিকেলবেলা বনলতা ফিরে এল। হাতে রেকর্ডার, গলায় ব্যাগ। সে সবাইকে শুনতে চাইল। তার চোখেমুখে মুগ্ধতা। সে বলল, “এই গল্পগুলো আমি শহরে পৌঁছে দেব। লোকজন জানুক, উন্নয়নের ভিতরে কার কান্না চাপা পড়ে থাকে।”
লোখো তার দিকে চেয়ে বলল, “আমরা চাই না কেউ কাঁদুক। চাই শুধু, আমাদের কথা কেউ শুনুক। মাটি যেমন নরম, মানুষও তেমনই—চেপে রাখলে ফেটে যাবে।”
হঠাৎই উপস্থিত হলেন ব্লক অফিসের বড়বাবু, সঙ্গে পঞ্চায়েত সদস্য রঘুনাথ সাউ। তারা এত ভিড় দেখে অবাক। বড়বাবু কড়া গলায় বললেন, “আপনারা সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছেন। রাস্তা হবে—এইটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।”
লোখো গলা সরিয়ে বলল, “আমরা কাগজ ছিঁড়ছি না, খেতও কাটছি না। শুধু বলছি, রাস্তা পাশ দিয়ে ঘুরিয়ে নিন। মাঝখান কেটে দিলে আমরা চাষ করব কী করে?”
পেছন থেকে ছোটচাঁদ হাঁসদা বলল, “আর আপনি যা ক্ষতিপূরণ বলছেন, সেটা একবছরের চাল কিনতেও যথেষ্ট নয়। এই জমি আমাদের কেবল খাবার দেয় না, ইজ্জতও দেয়।”
বড়বাবু বিরক্ত, “এইসব আবেগের কথা বলে কি রাস্তা তৈরি হয়?”
বনলতা এবার মুখ খুলল, “স্যার, আমার গবেষণার ভিত্তিতে বলছি, উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক পরিকাঠামো জুড়ে দিতে হয়। যদি গ্রামের মানুষ খুশি না হন, তাহলে উন্নয়ন টেকে না।”
রঘুনাথ সাউ হেসে বলল, “আপনি তো শহরের মেয়ে, গ্রামের মাটি বোঝেন না।”
বনলতা চুপ করে বলল, “বুঝি না বলেই শুনতে এসেছি। এখন তো দেখছি, শহরের লোকই কেবল বলে, গ্রাম কিছু বোঝে না।”
সেই মুহূর্তে মালতি দৌড়ে এসে বলল, “আমার বাবা খেতে গান গায়। আমি আঁকি। আমাদের খেত চলে গেলে গান যাবে, আঁকা যাবে।”
সবার মুখ থেমে গেল। শিশুর মুখে সত্য কথা শুনলে বড়দেরও থেমে যেতে হয়।
বড়বাবু একবার লোখোর দিকে তাকাল। বলল, “ঠিক আছে। আমি কাল ব্লকে রিপোর্ট পাঠাব। দেখা যাক, বিকল্প কিছু হয় কিনা।”
সন্ধ্যে নামতে নামতে সবাই বাড়ি ফিরল। লোখো মাঠের শেষ প্রান্তে একবার চোখ রাখল—সূর্যের শেষ আলোটা যেন জমির ওপর চুমু খেয়ে বলছে, ‘আমি ফিরব কাল আবার।’
সেই রাতে লোখো গাইল—
“মাঠে মানে কেবল ফসল নয়,
মাঠে মানে মানুষ, সময়, হৃদয়…”
পর্ব ৫
পিড়রার আকাশ যেন পাল্টে গেছে। আগের দিনগুলোয় যেটা ছিল শুধুই একরঙা দিনচর্যা, সেখানে এখন হাওয়া বইছে নতুন কথার, নতুন ভাবনার। লোখোর কথায়, বনলতার চোখে, আর মালতির ছবিতে জমাট বাঁধছে এক নতুন সকাল।
সেই ভোরে পাখির ডাকের সঙ্গে সঙ্গে মাঠে গিয়ে দাঁড়ায় লোখো। হাতে নেই কাস্তে, নেই কোদাল, শুধু খালি পা—মাটির স্পর্শ পেতে চায়। চোখ বন্ধ করে বলল, “এই মাটি আমায় চিনে, আমি ওকে চিনি। ও যদি কাঁদে, আমি শুনতে পাই।”
পিছনে এসে দাঁড়ায় ফুলমনি, তার হাতে একমুঠো পুঁইশাক। বলে, “যতক্ষণ তুই আছিস, মাটিও থাকবে। গাছ কাটলেও গন্ধটা রয়ে যায়।”
বিকেলে ব্লক অফিসে ডাকা হয় বিশেষ সভা। মাঠের মাঝ দিয়ে নয়, রাস্তা পাশ কাটিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা। বনলতার প্রতিবেদন, গ্রামের মানুষের বক্তব্য, আর শিশুরা আঁকা ছবি—সব মিলিয়ে একটা আবেগ তৈরি হয়েছে প্রশাসনের ভেতরেও।
বড়বাবু এবার একটু নরম সুরে বললেন, “আমরা রাস্তার রুট রিভিউ করব। তবে তোমরা কেউ যেন কাজ থামিয়ে দিও না।”
রঘুনাথ সাউ মুখ টিপে হাসলেন, “দেখি আপনি কতদূর নিতে পারেন। ভোটের আগে এত আবেগ ভালো না।”
লোকজনের মধ্যে চাপা গুঞ্জন। কিন্তু লোখো মাথা নিচু করে থাকলেও জানে, গাছের গোড়ায় জল পৌঁছেছে।
সেই সন্ধ্যায় বনলতা আবার এল লোখোর ঘরে। হাতে একখানা পুরোনো বই। বলল, “এই বইতে একটা লাইন ছিল—‘মাটি যদি কাঁদে, তখন কৃষকের চোখে জল জমে না, বুকের ভেতর নদী হয়।’ আপনি ঠিক তাই।”
লোখো হেসে বলল, “তুমি কলকাতার মেয়ে, আর আমি গ্রামের ছেলে। মাঝখানে এত পথ, তাও কথা এক।”
বনলতা বলল, “আসলে কথা যদি সত্যি হয়, পথ নিজেই মিলে যায়।”
মালতি পাশে এসে বলল, “আপা, আমার ছবিগুলো আপনি নিয়ে যাবেন?”
বনলতা বলল, “নেবই তো। এই ছবিগুলোই তো কাগজের চেয়ে বেশি কথা বলে।”
রাতে ফুলমনি ঘরের মাটিতে ধুপ জ্বালায়। ধূপের গন্ধে ঘরটা যেন একটা পুজোর ঘরে বদলে যায়। সে বলে, “জমি থাকবে না ঠিক, কিন্তু গন্ধটা থাকবে।”
লোখো এবার আর গান গায় না। চুপ করে শোনে মালতির ফিসফিসে গলা—
“জমি মানে খেত নয় কেবল,
জমি মানে আমার মা, আমার ঘর, আমার গল্প…”
সেই রাতে আকাশ ভরে উঠল তারা দিয়ে। আর লোখোর মনে জেগে রইল একটিই কথা—মাটির টান কাগজে আঁকা যায় না, সে মনের ভিতরেই থাকে।
পর্ব ৬
ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই তালতোড়ার স্কুল মাঠে একটা অস্থায়ী ক্যাম্প বসেছে। সরকারের তরফে শুনানি চলবে—যাদের জমি অধিগ্রহণ হবে, তাদের বক্তব্য নেওয়া হবে আজ। লোখো আজ একদম তৈরি হয়ে এসেছে, ধুতি-গামছা পরে, মাথায় টোপরের মতো কাপড় জড়ানো, যেন কেমন একটা শপথ নিয়েছে।
ফুলমনি মালতির চুল বেঁধে দিচ্ছে, আর বলছে, “তোর বাবার মুখ থেকে আজ যে কথা বেরোবে, সেটা শুধু কানে যাবে না, মনে গাঁথা হবে।”
মালতি খসখস করে নিজের খাতায় লিখছে, “আজ বাবা কথা বলবে। আমি ছবি আঁকব।”
মাঠ ভর্তি লোক। হরেক বয়সের, হরেক মুখ—চাষি, কুলি, গৃহবধূ, স্কুলের মাস্টার, এমনকি দু-একজন ছাত্রও এসেছে ‘দেখবে’ বলে।
বনলতা মাইক হাতে বলল, “আজ আপনাদের যার যা বলার আছে, নির্ভয়ে বলবেন। এগুলো কেবল রিপোর্টের জন্য না—মানুষের ভবিষ্যতের জন্য দরকার।”
প্রথমে রঘুনাথ সাউ উঠে বললেন, “আমি বলি সরকার ভালো কাজ করছে। রাস্তা মানে রোটি, রাস্তা মানে প্রগতি। যারা বাধা দিচ্ছে, তারা আসলে পিছনের দিক টেনে ধরে আছে।”
ভিড় একটু গুঞ্জন করে উঠল। এমন সময় হাত তুলে দাঁড়াল লোখো। মঞ্চে উঠে গিয়ে বলল, “রাস্তা মানে রোটি—এ আমি মানি। কিন্তু সেই রোটি যদি আমার মাটি কেটে আসে, তাহলে সেটার স্বাদ কি থাকবে?”
লোকজন চুপচাপ শোনে। লোখোর গলায় রাগ নেই, কিন্তু শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে আগুন।
“আমি চাই রাস্তা হোক। আমার মেয়ে স্কুলে যাক, আমার স্ত্রী শহরে চিকিৎসা করাক। কিন্তু রাস্তা যদি এমনভাবে হয় যে আমি চাষই না করতে পারি, তবে এই রাস্তা কাদের জন্য?”
পেছন থেকে একজন বলে উঠল, “তবে কী করবি তুই? বাধা দিবি?”
লোখো বলল, “আমি শুধু চাই বিকল্প ভাবুন। রাস্তা পাশ দিয়ে ঘুরুক। আমাদের মাঝখান দিয়ে যেন না যায়। আপনারা যদি মাটি দেখেন শুধু কাগজে, তাহলে ভুল হবে।”
বনলতা চোখে জল ধরে রাখতে পারল না। তার ডায়েরিতে লেখা—
“লোকটা গান গায় না আজ, শুধু সত্য বলে। সেই কথায় সুর আছে, যেমন নদীতে শব্দ থাকে, ঢেউ থাকে, কিন্তু জলই আসল।”
শেষে বড়বাবু উঠে বললেন, “আপনাদের বক্তব্য রেকর্ড হয়েছে। আমরা বিকল্প রুটের ওপর রিপোর্ট পাঠাব। তবে সময় লাগবে।”
লোকজন ধীরে ধীরে ফিরে গেল। কেউ চোখ মুছল, কেউ ভেবে নিল—এই মাটির মানুষ যদি কথা বলতে শেখে, তাহলে উন্নয়নও পথ পাল্টাতে বাধ্য।
সন্ধ্যাবেলায় লোখো মাঠে বসে হারমোনিয়ামটা তুলে নেয়। আজ গান নয়, শুধু এক-একটা কাদা মাখা আঙুল তুলে তুলে কি যেন বাজায়।
ফুলমনি এসে বসে পাশে। মালতি মাটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকে।
তখন লোখো গলায় একটুকরো কাঁচা সুর বাঁধে—
“আমার কথা সোজা নয়,
তবু তাতে বাঁধা রয়।
জমির মতো সাদা,
তাই সে পাকা হয়।”
পর্ব ৭
সকালের আলোয় পিড়রা যেন একটু অন্যরকম লাগছিল। মাঠে শিশির পড়েছে, কিন্তু লোকজনের চোখে আজও ঘুম নেই। কারণ কাল রাতে ব্লক অফিস থেকে নোটিশ এসেছে—আগামী তিন দিনের মধ্যেই জমি চিহ্নিত করে ফেন্সিং শুরু হবে। মানে রাস্তার কাজ পাকা।
লোখোর ঘরে উত্তেজনা নেই, কিন্তু থমথমে একটা বাতাস। মালতি খাতা বন্ধ করে বলল, “বাবা, আমাদের খেত যাবে?”
লোখো উত্তর দিল না। শুধু মালতির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তুই আকাশ আঁকিস রে। তাতে মাটি থাকবে, সূর্য থাকবে, আমরা থাকব।”
ফুলমনি এককাপ লাল চা হাতে দিয়ে বলল, “তোর ভাবনায় ভালোই থাকি রে, কিন্তু মালতিকে এবার বোঝাতে হবে—জগৎটা শুধু আঁকার না, হারানোরও।”
সেইদিন দুপুরে ঝর্ণা দিদি, ছোটচাঁদ হাঁসদা, বনলতা আর লোখো মিলে গেলেন ব্লক অফিসে। সেখানে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে দড়ি দিয়ে জমি ঘেরা। কাগজের সঙ্গে সঙ্গে পায়ের দাগও টেনে নেওয়া হচ্ছে।
বনলতা অফিসারকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কি বিকল্প রুট বিবেচনা করলেন?”
ওই অফিসার, নাম গৌরাঙ্গ হেমব্রম, বললেন, “উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সময় দিচ্ছে না। বর্ষা আসার আগেই কাজ শেষ করতে হবে। তাই আগের প্ল্যানেই এগোচ্ছি।”
লোখো বলল, “আপনারা সময় বাঁচাতে গিয়ে আমাদের জীবনটা ছোট করে ফেলছেন।”
ঝর্ণা দিদি বললেন, “আমরা তো কিছু চাইনি, কেবল বলেছি—রাস্তা ঘুরিয়ে দিন। এখন দেখি, সরকার কী করে—মাটি নিয়ে না, না মাটির মানুষের সঙ্গে?”
সন্ধ্যায় লোখো নিজের উঠোনে একটা ছোট সভার ডাক দিল। পঞ্চাশজনের মতো লোক জড়ো হল। কেউ খেতি থেকে এসেছে, কেউ হাট থেকে, কেউবা নাঙ্গল রেখে সোজা এসেছে—কান শুনবে বলে।
লোখো বলল, “আমি কাউকে হিংসে করি না, সরকারকেও নয়। আমি চাই শুধু এই গ্রামের মানুষ নিজেদের টানটা বুঝুক। আমরা চাই রাস্তা, চাই উন্নয়ন, কিন্তু আমাদের টান যেন মুছে না যায়।”
ছোটচাঁদ হাঁসদা বলল, “তবে কাল সকালের আগে আমরা মাঠে শুয়ে থাকব। যে আসে, তার আগে আমাদের গায়ে পড়বে।”
ভিড়ে কেমন একটা ঢেউ উঠল—কেউ বলল, “হ্যাঁ, আমরা শোব!” কেউ বলল, “খেত গেলে ঘর যাবে!”
মালতি তার ছবির খাতা খুলে নতুন পাতা আঁকছিল—একটা রাস্তা, তার একপাশে ঘর, আরেক পাশে ফসল। মাঝখানে একটা ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে, দুহাতে দুদিক টেনে ধরেছে।
ফুলমনি পাশে বসে বলল, “এই ছবিটা যদি কাগজে পৌঁছাত, তবে তারা বুঝত।”
রাতে লোখো কোনো গান গাইল না। সে চুপচাপ বসে খাতা খুলে লিখল—
“যে মাটি আমার পায়ের নিচে,
তাতে আজ আমি আমার মন রাখছি।
যদি কেও নিতে চায়,
সে যেন মনটাও নিয়ে যায়।”
পরদিন সকালেই শুরু হবে প্রতিরোধ।
পর্ব ৮
পরদিন ভোর। আকাশ এখনো ফিকে। গ্রামের ভেতর দিয়ে একে একে লোকজন চলেছে মাঠের দিকে। কারো হাতে লাঠি নেই, নেই পতাকা—কেবল মুখে একরাশ ভাবনা, চোখে স্থিরতা। লোখো, ঝর্ণা দিদি, ছোটচাঁদ, নন্দরাম—সবাই পা ফেলছে শব্দহীন, অথচ দৃঢ়তায়।
মাঠের একপ্রান্তে সবাই মিলে বসে পড়ে ঘাসের ওপর। যেন ঘুমোতে এসেছে সবাই—কিন্তু সে ঘুম প্রতিবাদের। মেয়েরা একদিক, ছেলেরা আরেকদিক। মাঝখানে মালতি আর তার স্কুলের তিনজন বন্ধু একটা ব্যানার ধরে—হাতে আঁকা, লেখা—
“আমরা রাস্তা চাই, কিন্তু মানুষকেই চাপা দিয়ে নয়।”
ফুলমনি সবার জন্য ছোটো ছোটো জলভরা কলসি এনেছে। যেন এ যাত্রা তৃষ্ণার না হয়। কেউ চিৎকার করছে না, কেউ মাইক বাজাচ্ছে না। শুধু ঘাসে বসে থাকা দেহগুলো যেন একেকটা প্রশ্ন—এই জমি যদি না থাকে, তবে গ্রামের শিকড় কোথায় থাকবে?
প্রশাসনের গাড়ি এসে পৌঁছল একটু পর। মাথায় হেলমেট, কাঁধে ফাইল। সামনে গৌরাঙ্গ হেমব্রম অফিসার। তিনি নেমেই চমকে উঠলেন—এই মাঠজুড়ে ঘাসের বিছানায় এত মানুষ?
বনলতা এসে বলল, “স্যার, ওরা কিছু ভাঙছে না, কিছু আটকাচ্ছে না। শুধু বসে আছে। আপনাদের সিদ্ধান্ত যদি বদল না হয়, তাহলে এরা এখানেই থাকবে—যতদিন লাগে।”
গৌরাঙ্গবাবু একবার লোখোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাদের কথাগুলো রিপোর্টে গেছে। আমরা উপরের আদেশ পাইনি এখনো।”
লোখো বলল, “আমরা আদেশ চাই না। চাই কেবল যে কাজটা হচ্ছে, তা যেন দেখে করা হয়। আপনি নিজের চোখে এই জমিতে বসা মুখগুলো দেখুন। আমরা তো শুধু বলছি, মাঝখান কেটে নয়, পাশ ঘেঁষে যান।”
একজন পুলিশ অফিসার হেঁকে উঠলেন, “এইভাবে বসে থাকলে সরকারি কাজে বাধা হবে!”
ঝর্ণা দিদি দাঁড়িয়ে গলা তুলে বললেন, “আপনারা কাগজের কথা বলেন, আমরা গন্ধের। এই ঘাসে আমার বাপ শুয়েছিল, এই মাটিতে আমার ছেলের হাঁটতে শেখা পা পড়েছে। বাধা নয়, এ তো বেঁচে থাকার ভঙ্গি।”
গৌরাঙ্গবাবু চুপচাপ। তিনি একটু পেছনে গিয়ে ফোনে কথা বললেন। মিনিট দশেক পর ফিরে এসে বললেন, “উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিকল্প রুট খতিয়ে দেখার অনুমতি দিয়েছে। আপাতত জমি চিহ্নিতকরণ স্থগিত। আপনারা সবাই এখন ঘরে ফিরে যান।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো মাঠে নীরবতা। যেন কারও কিছু বলার নেই, কেবল নিঃশ্বাস ফেলছে সবাই একসঙ্গে। তারপর ঝর্ণা দিদি প্রথমে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “এবার ফিরি। কিন্তু মনে রেখো—মাটির সঙ্গে থেকে কথা বললে, সে শোনে।”
মালতি একঝলকে লোখোর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, তুমি জিতলে?”
লোখো হেসে বলল, “না রে মা, আমরা সবাই জিতলাম। আর সবথেকে বড় কথা—আমরা কথা বললাম, কেউ চুপ রইলাম না।”
ফুলমনি বলল, “মাঠে ঘুম না এলেও, আজ রাতে মনে শান্তি থাকবে।”
সেই রাতেই লোখো হারমোনিয়াম টেনে বসে। এবার তার সুরে কাঁপন নেই, ভয় নেই—শুধু একটা নিঃশব্দ বিশ্বাস—
“মাটির বুকে লিখা নাম,
যতদিন আমি বাঁচি,
ততদিন সে থাকবে,
ঘাসে ঘাসে, রক্তে রক্তে।”
পর্ব ৯
যে সকালটা এল, সে যেন অন্যরকম। কুয়াশার ঘোমটা তুলেই সূর্য মাথা তুলে বলল—“তোমরা লড়েছ, আমি সাক্ষী।” পিড়রার প্রতিটা মুখে আজ একটু হাসি, একটু গর্ব, আর একটুখানি শান্তি। রাস্তা হবে—কিন্তু মানুষকে ঘিরে, মানুষকে পিষে নয়।
মালতি ঘুম থেকে উঠে চেঁচিয়ে উঠল, “মা! আমার ছবি আজ পাঠাব বনলতা আপাকে। স্কুলের দেয়ালে থাকবে নাকি!”
ফুলমনি হেসে বলল, “তোদের ছবি এবার কাগজে উঠবে, টিভিতেও শুনেছি তোর বাবার কথা বলবে!”
লোখো নিজের ধুতি পরছে, গামছা গলায়, চোখে এক রকম স্থির আলো। সে বলল, “আমি কিছু করিনি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু অনেকেই বুঝল—দাঁড়িয়েও কিছু বলা যায়।”
সেইদিন বিকেলে বনলতা ফিরল কলকাতায়। যাবার আগে সে লোখোর হাতে একটা খাম দিয়ে গেল—ভেতরে মালতির আঁকা ছবি আর লোখোর গানের কথা ছাপা হবে এক চাষি-কথা সংখ্যায়। লোকজন জানবে, কীভাবে একটা ছোট গ্রাম কথা বলেছিল, গান গেয়েছিল, আর রাস্তা বদলেছিল।
বনলতা বলল, “আপনাদের গল্প আমি শুধু ছাপছি না, বাঁচিয়ে রাখছি।”
লোখো বলল, “তুমি শুনেছিলে বলেই আমরা বলতে পেরেছিলাম। তোমরা যদি কানে তুলো দাও, আমাদের গলা কাঁপে না।”
সন্ধ্যেবেলায় স্কুলে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ডাক পড়ল লোখো আর মালতির। ছোটো মঞ্চ, কাগজের ব্যানার, কিন্তু ভরপুর লোক।
মালতি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি একটা ছবি এঁকেছিলাম। আমার বাবা কাঁদেন না, গান গাইতেন। আমরা সবাই মিলে রাস্তা ঘুরিয়ে দিয়েছি। আমি চাই, আমার বন্ধুরাও ছবি আঁকুক—এমন ছবি, যেখানে মানুষ থাকে।”
তালিতে ভরে উঠল স্কুলের মাঠ।
ফেরার পথে লোখো মালতির কাঁধে হাত রেখে বলল, “তুই বড় হলে কি হবি রে মা?”
মালতি হেসে বলল, “আমি ছবি আঁকব, গল্প লিখব, আর মানুষের মুখ দেখব—কে কী হারাতে বসেছে, সেটা চিনে নেব।”
ফুলমনি বলল, “তুই তো মাটির মেয়ে। তোর রঙে রঙে এই মাটিও চিরকাল থাকবে।”
সেই রাতে উঠোনে চুপচাপ বসে ছিল লোখো। তার সামনে হারমোনিয়াম, পাশে ফুলমনি, কোলে ঘুমন্ত মালতি। সে চোখ বন্ধ করে একটা সুর তোলে—
“জমি গেলেও গল্প থাকে,
সুর গেলেও রেশ রয়ে যায়।
ঘাসে লেখা নাম মুছে গেলেও,
জলরঙে সে ফিরে আসে—তোর চোখে,
আমার মনে…”
এভাবেই চলল সেই দিন। প্রতিটি মানুষ আবার ফিরে গেল নিজের জীবনে—কিন্তু তাদের ভেতরে কিছু বদলে গেল চিরতরে।
পর্ব ১০
তালতোড়ার পেঁচানো মেঠোপথ ধরে এবার নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে—জমির মাঝ দিয়ে নয়, পাশ ঘেঁষে, যেন মানুষের বাঁচার জায়গাটা জায়গা পায়। লোখো আর মালতির খেত রয়ে গেছে, ফুলমনির উঠোনে এখনো রোদ পড়ে বিকেলে, আর পিড়রার চায়ের দোকানে এখনও গল্প ফোটে ধোঁয়ার মতো।
গাঁয়ের লোকজন কাজের ফাঁকে দাঁড়িয়ে দেখে সেই রাস্তা গড়ার দৃশ্য। পিচ ঢালা রাস্তায় গাড়ি যাবে, বাইক যাবে, কেউ কেউ চাকরির খোঁজে দূর যাবে। তবু তারা জানে, এই রাস্তা তৈরি হল দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা কণ্ঠস্বরের জোরে।
লোখো সেই ভোরে খেতে যায়, মাটি ছুঁয়ে বলে, “তুই আছিস বলেই তো আমি আছি।” ধানের গোড়া ছুঁয়ে সে বোঝে—মাটি বোঝে কে তার আপন।
সেদিন বিকেলে গ্রামে একটা ছোট অনুষ্ঠান। ব্লক অফিসের তরফ থেকে একটা ঘোষণা এসেছে—“পিড়রা গ্রামের জমির রক্ষা এবং গ্রামীণ বিকল্প রুট পরিকল্পনায় সহায়তার জন্য লোখো মাহাতোকে ‘জনমাটি সম্মান’ দেওয়া হচ্ছে।”
লোখো প্রথমে যেতে চায়নি। বলেছিল, “আমি তো কিছু করিনি, শুধু চুপ করে থাকিনি।” কিন্তু ফুলমনি বলল, “তোর গান, তোর কথা, তোর পায়ের দাগ—এই সবই তো রক্ষা করেছে জমি। সম্মানটা তোর না, তোর মাটির।”
অনুষ্ঠানে বনলতা আবার এসেছে। এইবার সে কেবল গবেষক নয়, বন্ধু হয়ে এসেছে। সে বলল, “যে মানুষ নিজের মাটির কথা বলতে পারে, সে দেশের কথাও বলতে পারে। এই লোখোর মতো মানুষরাই ইতিহাসের নিচে লেখা থাকে—চুপচাপ, কিন্তু স্থায়ী।”
মালতি সেই অনুষ্ঠানে একটা কবিতা বলল—
“আমার বাবার গলা,
আমার মার চোখ,
আমার খেতের ঢেউ,
আর পিড়রার পথ—
সব মিলেই আমি।
তোমরা যদি জানতে,
এই নামটা শুধু মালতি নয়—
এই নামটা মাটির।”
চোখে জল, মুখে গর্ব, আর বুকভরা নিশ্বাস নিয়ে সবাই দাঁত বের করে হেসে উঠল।
সেই রাতে লোখো হারমোনিয়াম ছুঁয়ে বলল, “আজ গান গাইব না। আজ শুধু বাজাব। কারণ কিছু কিছু গান গলার নয়—জমির নিচে ঘুমিয়ে থাকে, দরকার হলে উঠে দাঁড়ায়।”
সে সুর তেমন কিছু ছিল না, তবু ফুলমনি বলল, “এই সুরটা আমি কোথাও শুনেছি। মালতি যখন জন্মাল, তুই এমন সুরই বেঁধেছিলি।”
লোখো হেসে বলল, “হয়তো তখন থেকেই আমি মাটির গান গাই। এখন শুধু মানুষ শুনতে শিখেছে।”
মাটির উপর যে ঘুমিয়ে থাকে, সে শুধু মানুষ না—সে ইতিহাস, সে ভাষা, সে গান।
পর্ব ১১
তালতোড়ার নতুন রাস্তায় প্রথম বাইকটা ছুটল এক রবিবার সকালে। চারদিকে জুটে গেলো ছোট ছেলেমেয়ে, কিশোর-কিশোরীরা চেঁচিয়ে উঠল, “রাস্তা হয়ে গেছে! বাইক গেছে!” কেউ মোবাইলে ভিডিও তুলল, কেউ হাঁ করে চেয়ে রইল।
কিন্তু লোখো সেই সকালেও খেতে গিয়েছিল। তার চোখে বাইকের গতি নয়, ধানের শীষে ভরা স্বপ্ন। গাছেরা যেভাবে বাতাসে নড়ে, তেমন নরমভাবে সে বলল, “আজ রাস্তা হয়েছে, কাল হয়তো সেতু হবে। কিন্তু মাটি রয়ে গেলে, আমরাও থাকব।”
মালতি আজকাল গ্রামের স্কুলেই একটা ছোট লাইব্রেরির দায়িত্ব নেয়। স্কুলের এক কোণে সে নিজের আঁকা ছবিগুলো টাঙিয়েছে—একটা ছবিতে দেখা যায় রাস্তা দু’দিকে ছুটছে, মাঝে এক গ্রাম, আর তার বুকে লেখা—“মাটি ছাড়া প্রগতি হয় না।”
ফুলমনির জীবন যেমন ছিল, তেমনই আছে—কিন্তু তার গলায় যেন একটা নতুন মাধুর্য। বাজার থেকে ফিরে বলে, “আজ সবাই বলে, তোর জামাই সরকারকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমি বলি—সে নিজে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।”
বনলতা কলকাতা ফিরে গেছে, কিন্তু প্রতি মাসে একবার করে চিঠি আসে মালতির নামে। একবারে মিষ্টি হরফে লেখা থাকে—
“তোমার আঁকা ছবিগুলো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিবিশনে টাঙানো আছে। ছাত্ররা দেখে বলে—এটা বাস্তব ছবি, এর ভেতরে গান বাজে।”
গ্রামে কেউ কেউ বলত, “লোখো নাম তো ইতিহাসে ওঠে না।”
আজ তারা চুপচাপ বলে, “লোকটা কথা বলতে জানত, সেইটাই সবচেয়ে বড় বিদ্যে।”
একদিন সন্ধ্যেবেলায় লোখো নিজের হারমোনিয়াম পেঁছিয়ে বসে। চারদিকে শিশুরা ঘিরে বসে থাকে। মালতি ডায়রি নিয়ে। লোখো একবার গলা খাকে নিয়ে বলে—
“এইটা শেষ গান নয়,
শেষ গল্পও নয়।
মাঠ যেমন চাষের পরেও পড়ে থাকে,
এই কথাগুলোও রয়ে যাবে।
তোমরা যদি কখনো হারিয়ে যাও,
মাটিতে পায়ের ছাপ রেখো।
সেই ছাপ দেখেই,
তোমার জমি তোমাকে চিনে নেবে।”
তারপর সুর ওঠে—ধীরে, শান্ত, অথচ স্থায়ী।
ঘাস দুলে ওঠে, শিশুরা চুপ হয়ে শোনে,
আর আকাশের গায়ে লেখা থাকে—
“এই মাটি বাঁচলো, কারণ কেউ কথা বলেছিল।”
এভাবেই শেষ হয় “মাটির টান”।
তালতোড়ার কাদা-মাটি, ধানগন্ধ, আর লোখোর গলায় লেখা এই গল্প শুধু একটা গ্রামের নয়—এ এক জনপদের স্মৃতি, এক জাতির সুর।
শেষ




