সায়ন্তনী রায়
বাঁকুড়ার খড়গপুর গ্রামে ভোরবেলাটা যেমন হয়—গঙ্গাজলঘাট থেকে ঘোরা শুরু করে হালকা কুয়াশায় ঢাকা মাটির রাস্তা, পাখির ডাকে ভাঙা ঘুম, আর দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসা রেডিওর রবীন্দ্রসঙ্গীত। এই সবের মাঝখানে, বুড়ো হরিরাম গাঁয়ের এক কোণে নিজের কাজে ব্যস্ত। তিনি পোড়া মাটির শিল্পী—তাঁর হাতেই প্রাণ পায় ঘোড়া, হাতি, নর্তকী, কৃষ্ণের বাঁশি, আর গম্ভীরা। পাঁচ পুরুষ ধরে হরিরামের পরিবার এই কাজ করে। তাদের রক্তে মিশে আছে মাটি, আগুন, আর শিল্পের ভালোবাসা। তাঁর দাদার কথা মনে পড়ে—একবার বলেছিলেন, “এই মাটি যখন আগুনে পুড়ে ওঠে, তখন সে শুধু ঠাকুর হয় না, সে হয়ে ওঠে আত্মা।”
হরিরামের মেয়ে রেবা কলেজে পড়ে বিষ্ণুপুরে। ওর স্বপ্ন, এই মাটির কাজকে শহরে, দেশের বাইরেও পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু হরিরাম জানেন, তার পাকা ছাদ নেই, গ্যালারি নেই, শুধু মাটি আর হৃদয় দিয়ে গড়া জীবন।
রেবা বিষ্ণুপুর কলেজে ইতিহাস পড়ে। একদিন ক্লাসে শিক্ষক বললেন, “বিষ্ণুপুর শুধু টেরাকোটার জন্য বিখ্যাত নয়, এই শহর এক সময় ছিল মল্ল রাজাদের রাজধানী। তখনকার শিল্প আর সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শহর।”
রেবার বন্ধু অপূর্ব বলে উঠল, “রেবা, তোমাদের পোড়া মাটির ঘোড়াগুলো নাকি বিষ্ণুপুর মন্দিরের অলংকরণেও দেখা যায়!”
রেবা গর্বে মাথা তোলে, “হ্যাঁ। বাঁকুড়ার শিল্পীরা সেই ঘোড়া বানিয়েছিল। তখন থেকেই মাটি দিয়ে দেবতা গড়া, যুদ্ধের কাহিনী বলা—সব কিছু শুরু।”
কলেজের পড়াশোনার ফাঁকে রেবা শুরু করে নিজের ইউটিউব চ্যানেল—“মাটির গল্প”—যেখানে সে গ্রামের কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের কাজ দেখায়, আর মাটির ইতিহাস তুলে ধরে।
একদিন, একটি ছোট ফেস্টিভ্যালে রেবা ও হরিরাম একসঙ্গে গেলেন। রেবা ভিডিও করছিল, আর হরিরাম নিজের তৈরি টেরাকোটা ঘোড়া সাজাচ্ছিল। হঠাৎ একজন বিদেশি শিল্প-সংগ্রাহক এগিয়ে এসে প্রশ্ন করেন, “Did you make this? It’s beautiful!”
হরিরাম প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হন, তারপর রেবা অনুবাদ করে দেয়। তিনি মাথা নেড়ে বলেন, “হ্যাঁ, এই ঘোড়া আমি বানিয়েছি। এই মাটিতে আমার মায়ের গন্ধ আছে।”
সংগ্রাহকটি ঘোড়া কিনে নেন, আর রেবার চ্যানেলে সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে যায়। দেশের বড় বড় শিল্প গ্যালারিগুলো থেকে ডাক আসে। মনে হচ্ছিল স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। কিন্তু তখনই আসে ঝড়—একদিন রাতে আগুন লাগে হরিরামের ওয়ার্কশপে। বহু বছরের শ্রম, মূর্তি, রং, মাটি—সব পুড়ে ছাই।রেবা ছুটে আসে—বাবার মুখে হতাশার ছায়া। “এই মাটি তো আবারও গড়া যাবে,” রেবা বাবার কাঁধে হাত রেখে বলে। হরিরাম মৃদু হেসে বলেন, “মাটি তো একটাই থাকে, শুধু তাকে ভালোবাসা দিয়ে বারবার গড়ে নিতে হয়।”
গ্রামের সবাই এগিয়ে আসে। ছাত্রছাত্রীরা, শহরের লোকেরা টাকা তুলে দেয়। আবার শুরু হয় নতুন করে। আর এবার শুধু ঘোড়া নয়, বিষ্ণুপুর মন্দিরের টেরাকোটা দেয়ালের অনুকরণে তৈরি হয় শিল্পের নতুন ধারা।
রেবার চ্যানেল আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে পরিচিতি পায়। একদিন লন্ডনের একটি গ্যালারি থেকে আমন্ত্রণ আসে—“Indigenous Clay: The Art of Bankura” নামক প্রদর্শনীর জন্য। হরিরাম প্রথমে যেতে চান না। বলেন, “আমরা গাঁয়ের লোক। বিদেশে গিয়ে কী করব?” রেবা উত্তর দেয়, “বাবা, তুমি শুধু মাটিকে ভালোবেসেছো। সেই ভালোবাসার ভাষা তো সারা পৃথিবী বোঝে।” প্রথমবার প্লেনে ওঠেন হরিরাম। প্রদর্শনীতে তাঁর ঘোড়া, বিষ্ণুপুর অনুপ্রাণিত মূর্তি, দেবদেবী, যুদ্ধ দৃশ্য—সব মুগ্ধ করে দর্শকদের। কেউ বলে, “It’s like the clay speaks.” কেউ বলে, “We feel India through this art.”
গ্রামে ফিরে হরিরাম আর রেবা একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলেন—“মাটির পাঠশালা”। সেখানে ছোটদের শেখানো হয় পোড়া মাটির কাজ, গল্প বলা, ইতিহাস জানানো। বিষ্ণুপুরের মতো বাঁকুড়াও শিল্পের মানচিত্রে নতুন করে উঠে আসে। হরিরাম একদিন মাটির ওপর হাত বুলিয়ে বলেন, “এই মাটি শুধু ঠাকুর গড়ে না, সে মনুষ্য গড়ে, আত্মা গড়ে, আর ভবিষ্যৎ গড়ে।” রেবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “এই গল্প শুধু আমার বা বাবার নয়। এই গল্প বাঁকুড়ার, বিষ্ণুপুরের, আর প্রতিটা সেই শিল্পীর, যাঁরা আগুনে পুড়ে গড়েন নতুন ইতিহাস।”




