Posted in

ভূতনাথের বদলি চাকরি

Spread the love

হিমাদ্রি মিত্র


পর্ব ১: ভূতনাথের বদলির চিঠি

ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এক অনবদ্য মানুষ—সাহিত্যপ্রেমী, টুপিপরা, চটি পরা, গম্ভীর অথচ দয়ালু। তিনি ছিলেন পূর্ব বর্ধমানের গোপালপুর হাইস্কুলের একজন নামকরা বাংলা শিক্ষক। তবে আজ যা লিখছি, তা তার মৃত্যুর পরের গল্প। কারণ ভূতনাথ, নামের মতোই, এখন একজন পুরোদস্তুর ভূত।

মৃত্যুর পর বেশ কয়েক বছর ধরে ভূতনাথ গোপালপুর স্কুলের লাইব্রেরিতেই বাস করছেন। “ব্ল্যাকবোর্ডের ওপারে জীবন” বইটি তার বালিশ, “বিদ্যাসাগরের জীবনী” দিয়ে মাথা চেপে শুয়ে পড়েন, আর মাঝরাতে উঠে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ পড়েন গম্ভীর গলায়, যেন কোনো পরীক্ষার আগে রিভিশন নিচ্ছেন।

সবই ঠিকঠাক চলছিল, যতক্ষণ না একদিন সন্ধ্যাবেলায় স্কুল চৌকিদার গোবিন্দ মণ্ডল তার হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বলে,

“ভূতবাবু, আপনের নামে রেজিস্ট্রি চিঠি আইছে। ডাকঘর থিকা পাঠাইছে।”

ভূতনাথ ভুরু কুঁচকে বললেন, “আমি তো মৃত। মৃতের নামে আবার চিঠি আসে নাকি?”

গোবিন্দ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “আপনি তো জ্যান্তের চেয়েও বেশি ঘোরাফেরা করেন! লাইব্রেরির ভূতের নাম আপনের নামে দেওয়া হইছে তো!”

চিঠি খুলে ভূতনাথ পড়লেন:

প্রতি, ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিষয়: বদলি

এই মর্মে জানানো যাইতেছে যে, আপনাকে অবিলম্বে রামগড় ভূত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে বদলি করা হইল। আধুনিক ভূতদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, এবং ডিজিটাল যুগে ভয় দেখানোর কৌশল শেখাইব এই ইনস্টিটিউটের মূল উদ্দেশ্য।

নির্দেশক্রমে,

ভূতবিভাগ, অতিপ্রাকৃত কার্যক্রম দপ্তর (এ.কে.ডি.)

নোট: বদলির আদেশ অমান্য করলে, পুনর্জন্মে অবাঞ্ছিত ফল ভোগ করিতে হইবে।

ভূতনাথ আঁতকে উঠলেন। “পুনর্জন্মে অবাঞ্ছিত ফল”? এর মানে কি রাধাবল্লভ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বিল কেটার কাজ করতে হবে?

এই চিঠি হাতে নিয়েই ভূতনাথ গেলেন লাইব্রেরির এক কোণে বসে থাকা আরেক ভূত, দিগন্তবাবুর কাছে—একজন অবসরপ্রাপ্ত ভূগোল শিক্ষক, যিনি নিজের মৃত্যু ভুলে এখনও ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডে মানচিত্র আঁকেন।

“দিগন্তদা, বদলির অর্ডার এসেছে,” ভূতনাথ কাঁপা গলায় বললেন।

দিগন্তবাবু বললেন, “ভয় কীসের? ভূতেরও তো ক্যারিয়ার গ্রোথ লাগে ভাই। আজকে বদলি, কালকে হয়তো প্রমোশন!”

ভূতনাথ তবু চিন্তিত। “রামগড় ইনস্টিটিউট শুনেছি খুব আধুনিক। ওখানে ল্যাপটপে ভয় দেখানো শেখায়, ড্রোনে ওড়া শেখায়!”

“তা তো হবেই,” হেসে বললেন দিগন্তবাবু। “তুমি কি আজীবন চটি পরে, ধোঁয়াটে চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে? এখন ভূতেরও ফ্যাশন সেন্স দরকার, স্যোশাল মিডিয়া প্রেজেন্স দরকার।”

এদিকে লাইব্রেরির বইয়ের পোকারা শিস দিয়ে উঠল, আর পেছনের জানালা থেকে কুকুরের এক দীর্ঘ হাউ হাউ ভেসে এল।

সবই বুঝে ভূতনাথ পাট গুটিয়ে পরের দিন রওনা দিলেন রামগড়ের দিকে। চটি, টুপি, আর একটা পুরনো খাতা সঙ্গে নিয়ে।

রামগড় ইনস্টিটিউটে পৌঁছে তিনি থমকে গেলেন। বড় গেট, তার উপরে লেখা “RBGTI – Ramgarh Bhoot Ghost Training Institute”। নিচে ইংরেজি ক্যাপশান:

“Scaring is Caring. Let’s Haunt Smartly.”

সামনেই দাঁড়িয়ে এক রোবট-ভূত: আধা মানুষ, আধা মেশিন। হাতে ধরে আছে ওয়েলকাম বোর্ড: “ভূতনাথ স্যার, আমাদের ইনস্টিটিউটে স্বাগতম!”

ভূতনাথের মাথা ঘুরতে লাগল।

তিনি কি ঠিক জায়গায় এসেছেন?

এতক্ষণে তার অজানা এক ভয় জন্ম নিল—ভবিষ্যতের ভূতেরাও হয়তো আর “ভুঁ…ভুঁ…” করে ভয় দেখাবে না, তারা হয়তো অ্যাপ ব্যবহার করবে, QR কোড স্ক্যান করেই লোকজনকে “হাও” করে তাড়িয়ে দেবে।

কিন্তু সে গল্প তো আরও বাকি।

পর্ব ২: ভূতদের ট্রেনিং এবং ভূতনাথের গণ্ডগোল 

রামগড় ভূত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (RBGTI)-এর ভেতরে পা দিতেই ভূতনাথ বুঝলেন, তিনি সময়ের অনেক পেছনে পড়ে গেছেন। করিডোরে ঘোরাঘুরি করছে আধুনিক ভূতেরা—কেউ কানে হেডফোন গুঁজে EDM ঘোস্ট বিট শুনছে, কেউ চোখে VR গগলস পরে নতুন যুগের ‘স্মার্ট হন্টিং’ শিখছে। একটা ক্লাসে ভূতেরা শিখছে কীভাবে ইনস্টাগ্রামে শ্যাডো ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল হওয়া যায়!

ভূতনাথ থ দাঁড়িয়ে থাকলেন। তার পরনের সাদা ধুতি, হাতপাখার মতো ছেঁড়া জামা, আর মাথার টুপি দেখে দুই-একজন ভূত ফিসফিস করে বলল, “ও বুঝি প্রি-ইন্ডিপেন্ডেন্স ব্যাচ!”

রিসেপশনে বসে ছিল একটি বেশ সুন্দরী ভূত—নাম মিষ্টি মালো। মিষ্টি ভূত হলেও রীতিমতো ইন্টারকমে কথা বলে, মুখে হেডসেট, হাতে একজোড়া টিকটিকি লাল নেইলপলিশ।

“নাম বলুন?”

“ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।”

“ওয়েলকাম, মিস্টার বন্দ্যোপাধ্যায়,” বলে সে কম্পিউটারে কয়েকটা কি চাপল, “আপনার ক্লাস শিডিউল নিচ্ছি—আজ সন্ধে ছয়টায় ‘ডিজিটাল হন্টিং ১০১’, এরপর রাত আটটায় ‘উইফাই তাড়ন কৌশল’, আর দশটায় ‘ভয়ের কনটেন্ট ক্রিয়েশন’। রুম নম্বর বি-১৩।”

ভূতনাথ আকাশ থেকে পড়লেন, “উইফাই তাড়ন কৌশল? ভয় এখন নেট দিয়ে ছড়াতে হয় নাকি?”

মিষ্টি হেসে বলল, “স্যার, আপনি তো পুরনো দিনের ভূত! এখনকার বাচ্চারা ভূত বললেই গুগল করে ফেলে। ভয় দেখাতে হলে আপানার SEO লাগবে, ক্লিকবেট শিরোনাম লাগবে!”

রুম বি-১৩ খুঁজে পেতে একটু সময় লাগল। সেখানেই দেখা হলো জুজুবুড়ার সঙ্গে—RBGTI-এর প্রধান প্রশিক্ষক। চুল খাড়া, মুখে চশমা, আর পিঠে একটা ল্যাপটপের ব্যাগ ঝোলানো।

“তুমি ভূতনাথ তো? বাংলা শিক্ষক ছিলে না?”

“জি। কিন্তু… এখন আমি একটু বিভ্রান্ত।”

“ঠিক আছো। আজ আমরা ‘ভয় দেখানোর ন্যূনতম আধুনিক পদ্ধতি’ শিখব। খাতা-কলম বের করো।”

ভূতনাথ জড়সড় হয়ে বললেন, “স্যার, আমার তো খাতা-কলম আছে… কিন্তু আমি এখনও ইন্টারনেট বুঝি না।”

জুজুবুড়া ক্লাসে চোখ বুলিয়ে বললেন, “আরে, এই তো সময়! শিখে নাও। এখন ভূতদেরও ওয়ার্কশপ করতে হয়, ওয়েবিনারে অংশ নিতে হয়, হন্টিংয়ের কনটেন্ট বানাতে হয়।”

প্রথম স্লাইডে লেখা:

“Don’t just haunt, influence. Use fear as a brand.”

ভূতনাথের মাথা চক্কর দিচ্ছিল। তার ভয় দেখানোর কৌশলগুলো ছিল সহজ—পিছন থেকে গম্ভীর আওয়াজে “ভুঁ…” বলা, হঠাৎ জানালায় আবছা ছায়া ফেলা, বা হেঁসে উঠে শিশুর কান্না অনুকরণ করা।

কিন্তু এখন? এখন ভূতেরাও influencer হতে চায়!

একজন মডার্ন ভূত হাত তুলল, “স্যার, ইউটিউব হন্টিং কবে শুরু হবে? আমার সাবস্ক্রাইবার ১০০০ ছাড়ায়নি এখনও!”

আরেকজন বলল, “স্যার, গতকাল রাতে আমি ভয়ের মধ্যে ‘মুক্কাবলা’ গান চালিয়ে Tiktok  করেছিলাম, সেটার রিভিউ চাই।”

ভূতনাথ চুপচাপ বসে আছেন। তিনি ভাবছেন, এখন কি ভূতেরাও ইউপিএসসি বা গেট পরীক্ষার মতো কোচিং নিতে শুরু করেছে?

ক্লাস শেষে এক বিশ্রামে ভূতনাথ বাইরে বারান্দায় এলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক বুড়ো ভূত বলল, “নতুন এসেছো?”

“জি,” ভূতনাথ মাথা নোয়ালেন।

“আমি হবিন্দর সিং। আগে সিমলা রেলস্টেশনে হন্ট করতাম। এখন আমি রিটায়ার্ড।”

“ভয় দেখিয়ে রিটায়ার করা যায়?” ভূতনাথ চমকে উঠলেন।

“অবশ্যই,” বলল হবিন্দর, “ভয়ের কোটার সময় ফুরিয়ে গেলে আর ভয় ধরাতে হয় না। তখন ভয় শেখাতে হয়। আমি এখন গেস্ট লেকচারার।”

“আপনি কি কখনও রামায়ণের কাহিনি শোনাতেন ভয় দেখাতে?”

“না রে ভাই, আমি তো লোকজনের ট্রেন মিস করিয়ে ভয় দিতাম!”

দু’জনেই হেসে উঠলেন।

হঠাৎ করেই আকাশে বজ্রপাত। ঘোষিত হলো পরের দিনের টাস্ক:

প্রথম বাস্তব মিশন।

সব ভূতকে যেতে হবে শহরের নানা জায়গায়—ক্লাসিক হন্টিং অ্যাসাইনমেন্ট।

ভূতনাথের গন্তব্য নির্ধারিত হলো—গড়িয়াহাট, কলকাতা।

একটি ফ্ল্যাট যেখানে ভয় পাওয়া ভুলে গেছে গোটা পরিবার।

তাদের জাগিয়ে তোলাই হবে ভূতনাথের মিশন।

তবে ভূতনাথ কিছুটা নার্ভাস। কারণ আধুনিক ভূতরা এখন LED আলো ব্যবহার করে ভয় দেখায়, আর তিনি এখনও কেরোসিন ল্যাম্প খুঁজে বেড়ান!

কিন্তু ‘মিশন’ মানে তো চেষ্টা—আর ভূতনাথ তা ভালোই জানেন।

পর্ব ৩: ভূতনাথের প্রথম মিশন 

রামগড় ভূত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ভূতনাথকে একটি পুরনো থলে, একটি ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়াল এবং একটি ‘ভয় পরিমাপক যন্ত্র’ (যেটার নাম দেওয়া হয়েছে—ডরোমিটার 2.0) দিয়ে পাঠানো হলো গড়িয়াহাটে।

গন্তব্য—৭ নম্বর হিমাংশু অ্যাপার্টমেন্ট, চতুর্থ তলার এক আধুনিক ফ্ল্যাট। সেখানে বাস করে বসু পরিবার—প্রযুক্তি প্রিয়, ভয়হীন, এবং রাতে হরর সিনেমা দেখে হো হো করে হাসে।

ভূতনাথ রাত ১টার সময় বিল্ডিংয়ের সামনে হাজির। বিল্ডিংয়ের নিচে নেমপ্লেটে লেখা ‘ওয়াই-ফাই এনাবল্ড হোম’। তিনি কপাল ঠুকে বললেন, “আধুনিক ভয়হীন পরিবারে কাজ করতে পাঠিয়েছে! হায় রে আমার কপাল!”

সে সময় এক কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল, ভূতনাথ তাকে ভেবেছিলেন অন্তত ভয়ে পালাবে। উলটে কুকুরটি তার পায়ের ওপর পা তুলে দাঁড়াল, তারপর একটা হালকা ঘুমঘুম ভোঁসভোঁস আওয়াজ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

“এটা নাকি ফ্ল্যাট পাহারা দেওয়া কুকুর?” ভূতনাথ আফসোস করলেন।

যাই হোক, চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে ঢোকার সময় তার মনে অনেক পরিকল্পনা—একটা জানালার পাশে দাঁড়াবেন, তারপর একদম গম্ভীর গলায় বলবেন “ভুঁ…ভুঁ…”, তারপর ছায়া হয়ে ঘরের কর্নারে অবস্থান করবেন।

কিন্তু ঘটনা হলো এর উলটো।

ঘরে ঢুকে তিনি প্রথমেই বসলেন বসু পরিবারের ড্রয়িংরুমে। সেখানে টিভিতে চলছে এক বিখ্যাত হরর সিরিজ। ঘরের বাচ্চা ছেলেটা বলল, “মা, লুক! একটা পুরনো দিনের ভূতের কস্টিউম পরা লোক বসে আছে!”

বাবা হেসে বললেন, “আরে ধুর, এটা তো ওটিটির নতুন থ্রিডি হরর শো! ভালোই তো বানিয়েছে।”

ভূতনাথ মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “আমি তো সত্যিকারের ভূত!”

বসুদের কেয়ারই নেই। তারা পাশের টেবিলে চিপস আর কোল্ডড্রিংক নিয়ে টিভির দিকে মুখ করে বসে রইল। ভূতনাথ কাশলেন। তবু কেউ পাত্তা দিল না।

তিনি রেগে গিয়ে একখানা চেয়ারে উঠলেন, আর জোরে বললেন, “ভুঁ…ভুঁ… আমি ভূতনাথ। ভয় পেতে শেখো!”

ছেলেটা তালি দিয়ে উঠল, “ওয়াও! এই তো আমার প্রজেক্টের জন্য পারফেক্ট কন্টেন্ট! দাদা, আপনি একটু হেঁটে দেখান তো, আমি রিল বানাব।”

ভূতনাথ ধপ করে বসে পড়লেন। ভাবলেন, “ভয়ের যুগ বুঝি শেষ!”

হঠাৎ তিনি ভাবলেন, একটু কৌশল পাল্টান যাক।

তাই তিনি ফ্রিজ খুলে একখানা ল্যাংচা বের করে খেয়ে ফেললেন। মা চেঁচিয়ে উঠলেন, “এই যে! ফ্রিজ থেকে মিষ্টি গায়েব!”

বাবা বললেন, “কচিকাঁচার কাজ হবে, অমন ‘ভূতের কাণ্ড’ বলে দোষ দিও না।”

ভূতনাথ এবার আরও এগিয়ে গেলেন। বাথরুমে গিয়ে আয়নায় আবছা ছায়া ফেললেন। মেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আহা! কি দারুণ স্পেশাল ইফেক্ট! এই অ্যাপটা কী?”

ভূতনাথ হতাশ হয়ে সোফায় বসে চশমা মুছলেন।

এমন সময় পেছন থেকে কে যেন বলল, “প্রথম মিশনে ব্যর্থ?”

তিনি ঘুরে দেখেন, এক তরুণ ভূত—নাম মিহির, যিনি নাকি ইনস্টিটিউটের অন্যতম স্মার্ট ক্যাডেট।

মিহির বলল, “ভূতনাথ স্যার, এই সময় ভয় দেখানোর জন্য আপনাকে মানুষের চেয়ে স্মার্ট হতে হবে।”

“মানে?”

“মানে, আপনাকে এখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছায়া নাচ শিখতে হবে। আপনাকে ভয় নয়, কনটেন্ট দিতে হবে। আজকাল ভূত নিয়ে মানুষ বেশি ভয় পায় না—বেশি চায় বিনোদন!”

ভূতনাথ একটু ভেবে বললেন, “তাহলে আমি যদি ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা পড়ি, যেমন ‘এলো রে ভূত, বলো তুমি কুত’, কেমন হয়?”

মিহির হেসে বলল, “দারুণ! আপনি ভয়ংকর রকমের ফানি!”

তবে সেই রাতের মিশন আর সফল হয়নি। ভোরের আলো ফোটার আগে ভূতনাথ ফিরে এলেন রামগড়ে। আর তার ডরোমিটার যন্ত্রে ভয়-মাপ সূচক দাঁড়াল ০.০৩।

(যেটা ভূত জগতে মানে “ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লায়েন্ট, ভয় তো দূরের কথা।”)

পর্ব ৪: ভূতদের প্রতিবাদ সমিতি 

রামগড় ভূত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ফিরে ভূতনাথ হাঁপিয়ে উঠলেন। চোখে-মুখে ক্লান্তি, চটি জোড়া হাঁটার ক্লান্তিতে প্রায় খুলে গেছে। ইনস্টিটিউটের বড় দরজার সামনে একটা ব্যানার ঝুলছে:

“ভয় দেখানোর অধিকার রক্ষা করো! ভূতদের স্বীকৃতি দাও!”

— রামগড় ভূত প্রতিবাদ সমিতি (RBGU – Ramgarh Bhoot Grievance Union)

ক্যাফেটেরিয়া, ক্লাসরুম—সব ফাঁকা। গোটা ইনস্টিটিউটের ভূতরা জমায়েত হয়েছে মূল গেটের সামনে। কেউ হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, কেউ প্ল্যাকার্ড তুলেছে, কেউ হাউমাউ করে কান্না করছে।

ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলেন এক দীর্ঘ গলা-ওয়ালা ভূতকে, “কি হচ্ছে এখানে, গলাধরা?”

গলাধরা বলল, “ভয় দেখানোর সম্মান হারিয়ে গেছে রে ভূতনাথ! আগে মানুষ ভূতের গল্প শুনে রাতে ঘুমাত না, এখন তারা ভূতের মিম বানায়! রিল করে, ফিল্টার দেয়—আমরা নাকি এন্টারটেইনমেন্ট!”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্ষীণকায়া ভূত কেঁদে বলল, “কাল এক টিনএজার আমাকে দেখে বলেছে, ‘ভাই তোর তো CGI লেভেল খুব লো!’”

ভূতনাথ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তাকে মাইক দেওয়া হলো—কারণ তিনি হলেন ‘ক্লাসিক ভূতের প্রতিনিধি’।

তিনি গম্ভীর গলায় শুরু করলেন—

“বন্ধুগণ, এক সময় ছিল, যখন গাছের নীচে ছায়া পড়লেই লোকজন বলত, ‘ভূত এসেছে!’ এখন সেই ছায়া দেখে বলে, ‘ওটা তো ফিল্টার!’

আমরা আর ভয়ের প্রতীক নই—আমরা হয়ে গেছি মিম, রিল, কনটেন্ট!

কিন্তু আমাদেরও অধিকার আছে।

আমাদেরও প্রয়োজন—সম্মান।

ভয় নয়, অন্তত স্বীকৃতি দাও, যে আমরাও আছি।

ভয় পেতে নেই, তবে অবজ্ঞাও কোরো না।”

বক্তব্য শেষে কয়েকজন ভূত তালি দিল। কেউ আবার “হুজুগে ভূত!” বলে হেসে উঠল।

ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল জুজুবুড়া।

“এত বিক্ষোভ করে কী হবে, হে ভূতসকল?”—তিনি বললেন, “ভয়ের ধরন বদলেছে। এখন আর ‘উঁ…উঁ…’ করে জঙ্গলে ঘোরাফেরা করলে কাজ হবে না। এখন ভয় আসে নোটিফিকেশনে, লোডশেডিংয়ে, চাকরি না পাওয়ায়! তুমি যদি সত্যিই মানুষকে ভয় দেখাতে চাও—তবে তাদের দৈনন্দিন দুশ্চিন্তার ভাষায় ভয় দেখাও। না হলে আমরা শুধুই অতীত হয়ে যাব।”

ভূতনাথ বললেন, “তাহলে কি আমাদের ভয়ের সংস্কৃতি শেষ হয়ে গেল?”

জুজুবুড়া মুচকি হেসে বললেন, “ভয় শেষ হয়নি, রূপ পাল্টেছে। এখন ভয় মানেই রিয়েলিটি—আমরা যদি সেই রিয়েল ভয়কে ধরতে পারি, তাহলেই আমরা আবার মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারব।”

প্রতিবাদ সমিতির সভাপতি ভূত ‘টিকটাক’ বলল, “তাহলে কি আমরা ভয় দেখানো ছেড়ে দিয়ে মেন্টাল হেলথ ক্যাম্প করব?”

জুজুবুড়া হেসে বললেন, “তা নয়, তবে সময় এসেছে ভয় দেখানোর নতুন ধারা গড়ার। ভূতনাথকে দেখি না, উনি চেষ্টা করছেন। যদিও ওনার প্রথম মিশন একটু ‘মিষ্টিমার্কা’ হয়েছিল।”

সবার মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল।

ভূতনাথ মাথা নিচু করে হাসলেন। “কি করব, গড়িয়াহাটে ল্যাংচা লোভ সামলাতে পারিনি।”

পরের দিন সকালেই ঘোষণা এলো—

নতুন বিভাগ গঠন হচ্ছে: “ভয়-সংস্কৃতি ও কনটেন্ট গবেষণা সেল”

এই সেলের মুখ্য ভূত নিযুক্ত হলেন—ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

সবাই তালি দিল।

একটা পুরনো দিনের ভূত, আধুনিক কালের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলেও—তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে নতুন ভূত প্রজন্মের জন্য।

নিচে দেওয়া হলো —

পর্ব ৫: ভূতনাথ ইউটিউবার! 

“ভয়-সংস্কৃতি ও কনটেন্ট গবেষণা সেল”-এর প্রধান হয়ে ভূতনাথ প্রথমেই যে কাজটা করলেন, তা হলো একটা ইউটিউব চ্যানেল খোলা। নাম রাখলেন—

Bhootnath Bangla Bhoot

ট্যাগলাইন: ভয় নয়, গল্প শোনো!

প্রথম কয়েকদিন কিছুই হয়নি। ভিডিও বানানোর কৌশল, লাইটিং, এডিটিং—সব কিছুতেই ভূতনাথ ন্যাড়া। তিনি ভিডিও শুরু করতেন এই বলে,

“ভুঁ… হ্যাঁরে, আমি ভূতনাথ। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। আজ বলব ‘ভূতের গপ্পো, আর মানুষের ব্যস্তপনা।’ চা নিয়ে বসো।”

শুরুর ভিডিওগুলোতে তার ধরা-ছোঁয়া ছায়া, ভুঁ ভুঁ আওয়াজ, টেবিলে ধাক্কা খাওয়ার আওয়াজ, আর মাঝেমধ্যে ল্যাংচা খাওয়ার ‘চপচপ’ শব্দ ছিল।

কমেন্টে কেউ লিখল:

– “এটা ভূত না, দাদু-ইনফ্লুয়েন্সার!”

– “ভূতনাথ দাদা ভয় না দেখিয়ে আবেগ দেখাচ্ছেন!”

– “ভূতের লাইভ স্ট্রিমিংও এখন হয়? মডার্ন!”

ভূতনাথ প্রথমে রেগে গিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ভয় দেখানো ছিল, হাস্যকর হওয়া নয়। কিন্তু জুজুবুড়ার কথা মনে পড়ে গেল—“ভয় নয়, সংযোগ তৈরি করো। তবেই টিকে থাকবে।”

তাই তিনি নিজেকে বদলে ফেললেন। নতুন ভিডিও বানালেন—

“ভূতের চোখে মানুষের পরিবর্তন”

সেখানে তিনি বললেন,

“আমরা যারা পুরনো দিনের ভূত, তারা জানি বাতাসের শিসে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকলে মানুষ আঁতকে উঠত। এখন তারা মোবাইল ক্যামেরা বের করে সেলফি তোলে, বলে ‘ওয়াও ভাই, ফিল্টারটা দারুণ!’

তবু আমরা রেগে যাই না। কারণ আমরা জানি, ভয় মানে আর কাঁপা নয়—ভয় মানে বাস্তব।

আমরা রয়ে গেছি, তোমাদেরই পাশে, নিঃশব্দে, অপেক্ষায়, এক কাপ চা আর গল্প নিয়ে।”

ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেল।

ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টুইটার—সবখানে ভূতনাথ ট্রেন্ডিং!

হ্যাশট্যাগ হলো: #GhostWithChai #ভূতেরব্লগ #BhootnathLive

এমনকি এক নামকরা ইউটিউবার ভূতনাথকে কোলাবরেশনের জন্য মেসেজ দিল। লিখল,

“দাদা, চলুন দু’জনে মিলে ‘Ghost Reacts to Horror Movies’ বানাই। আপনার মুখে ‘ভূ…ভূ’ আর আমার মুখে ‘ও মা!’—সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন লাগিয়ে দেব!”

ভূতনাথ কিছুটা লজ্জা পেলেও রাজি হলেন।

পরের ভিডিওর নাম রাখলেন:

“ভূতের চোখে বিবেকানন্দ রোডের ভূতের বাড়ি”

ভিডিওতে তিনি ঘুরে ঘুরে দেখালেন,

“এই বাড়িটা ১৯৩৪ সালের। আমি এখানে প্রথম ভয় দেখাই, এক মিষ্টি দোকানদারকে। কিন্তু সে ভয় না পেয়ে বলেছিল, ‘ভূত হলে মিষ্টি খাও, আজ পয়সা লাগবে না।’ সেই থেকে আমি ওর দোকানের ল্যাংচার অনুরাগী!”

দর্শকেরা হেসে গড়িয়ে পড়ে।

কমেন্ট বক্সে কেউ লেখে:

– “এমন ভূত হলে আমি নিজের ঘরেই রাখতাম!”

– “ভূতনাথকে ভোটে দাঁড় করানো হোক!”

ভূতনাথ এখন দিনে দুইটা ভিডিও বানান, রাতে ইনস্টিটিউটে ফিরে নোট তৈরি করেন—‘ভয়ের সংস্কৃতি ও গল্পের বিবর্তন’ নিয়ে।

মিষ্টি মালো একদিন এসে বলে, “স্যার, আপনার চ্যানেল দেখে আমার ভাই ভূতে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে! সে এখন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বলে, ‘ভূতনাথ দাদার ভিডিও দেখি, তাহলে ভূত এসে গল্প বলবে।’”

ভূতনাথ হেসে বলেন, “ভয় নয়, গল্পই বড়। আর সেই গল্পই যদি ভয় ছড়ায়—তবে সে ভয় অর্থবহ।”

ইনস্টিটিউটে এখন নতুন ভূতেরা তার ফলোয়ার। কেউ ভয় দেখায় না, সবাই শেখে কীভাবে গল্প বলতে হয়। ভূতনাথ তাদের শেখান—

“তোমার ভয় যদি মনে থাকে, তবে মানুষ মনে রাখবে তোমার অস্তিত্ব।”

আর তার ডরোমিটার?

সে এখন শব্দ করে ওঠে রোজ,

“Warning: Emotional Ghost Detected!”

 পর্ব ৬: ভূতনাথের স্থায়ী পোস্টিং

রামগড় ভূত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রধান গেটের পাশে একটা নতুন ফলক লাগানো হয়েছে:

ভয়-সংস্কৃতি ও গল্পশিক্ষা ভবন

অধ্যক্ষ: ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

“ভয় নয়, সংযোগের শিক্ষা”

হ্যাঁ, আজ ভূতনাথ শুধুই এক ভূত নন—তিনি একজন শিক্ষাবিদ, ইউটিউবার, বক্তা, এবং ভূতসমাজের অন্যতম সম্মানীয় মুখ।

ইনস্টিটিউট থেকে হেড অফিসের মেইল এলো—

বিষয়: স্থায়ী নিয়োগ

এই মর্মে জানানো যাইতেছে যে, ভূতনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-কে রামগড় ইনস্টিটিউটে স্থায়ীভাবে নিযুক্ত করা হইল, ভয়-সংস্কৃতি রক্ষা এবং আধুনিক ভৌতিক কনটেন্ট তৈরির দায়িত্বে।

ভূতনাথ চিঠি পড়ে চশমা খুলে মুছলেন। লাইব্রেরির ধুলো ছাপানো পাতা থেকে আজ তিনি উঠে এসেছেন এক নতুন অধ্যায়ে।

সে রাতে তার ঘরে আসে দিগন্তবাবু, হবিন্দর সিং, জুজুবুড়া, মিষ্টি মালো এবং আরও অনেকে।

দিগন্তবাবু হেসে বললেন, “ওহে ভূতনাথ, এবার কেমন লাগছে সরকারি চাকরির মতো পোস্টিং পেয়ে?”

ভূতনাথ মুচকি হেসে বললেন, “এখন আর কেউ আমাকে ‘ভুঁ…’ শুনে পালায় না। বরং চায়, আমি আরেকটা গল্প বলি। ভয় যেন একটা উপাখ্যান হয়ে উঠেছে।”

হবিন্দর সিং বলেন, “তবে ভয়ই থাকবে না বুঝি?”

“ভয় থাকবে,” ভূতনাথ বললেন, “কিন্তু তা হবে আত্মার কথা বলার এক মাধ্যম। যেমন শীতে কুয়াশার মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমাদের মনে হয় কেউ পাশে আছে—সেই অনুভবটাই তো আসল ভয়। সেটাই আমি শেখাই।”

রাতে ইনস্টিটিউটে আয়োজিত হলো এক বিশেষ অনুষ্ঠান—‘ভূতসম্মেলন ২০২৫’।

বিভিন্ন জায়গা থেকে ভূতেরা এসেছে—কলকাতা, কুমিল্লা, কাশ্মীর, কানপুর, কর্ণাটক—সব জায়গা থেকে।

ভূতনাথ সেখানে বক্তৃতা দিলেন।

“ভয়ের ভাষা বদলেছে, ভয়ের চেহারা বদলেছে, কিন্তু ভয়ের প্রয়োজন এখনও আছে।

আমাদের কাজ ভয় জাগানো নয়, আত্মার ছায়া হয়ে দাঁড়ানো।

মানুষ এখন একা, প্রযুক্তির নিচে চাপা, ব্যস্ততা আর কৃত্রিমতায় ভরা। তারা নিজেদের গল্প ভুলে যাচ্ছে।

আমরা, ভূতেরা, সেই ভুলে যাওয়া গল্পের পাতা। আমাদের কাজ মানুষকে তার ভেতরের ভয় ও ভালোবাসার দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।”

বক্তৃতার শেষে সব ভূত দাঁড়িয়ে সম্মানে তালি দিল।

রাতের খোলা মাঠে, এক কাপ ছায়া-চা হাতে, ভূতনাথ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা মিষ্টি গলা শোনা গেল—“স্যার, পরের চ্যানেলের জন্য একটা নতুন ভিডিও তৈরি করব, ‘ভয়ের ৭টা রঙ’। আপনি থাকবেন না?”

মিষ্টি মালো হেসে বলল।

ভূতনাথ তাকিয়ে বললেন, “রঙ নিয়ে যদি ভয় তৈরি হয়, তাহলে আমার চটি জোড়া নিয়ে শুরু করো—একটা লাল, একটা হলুদ।”

হাসির রোল পড়ে গেল।

পেছন থেকে চাঁদের আলো পড়ল তাঁর সাদা টুপির ওপর।

ভূতনাথ হেঁটে গেলেন মাঠের দিকে, যেখানে ভেসে আছে গল্প, হাসি, আর সেই পুরনো দিনের একটি সাদা ছায়া—যার নাম এখন এক নতুন ইতিহাস:

ভূতনাথ, ভূতের দুনিয়ার গল্পওয়ালা।

শেষ

Lipighor_1750325082667.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *