পৌলমী দে
কলকাতার সেপ্টেম্বরের বিকেলগুলো একটা অদ্ভুত শূন্যতা বয়ে আনে, যেন আকাশও জানে এই শহরে কিছু সম্পর্ক থাকে—অধরা, অনির্ধারিত। স্কুল ছুটি হলে যেমন ছেলেমেয়েরা প্রাণপণে মাঠ ছেড়ে যায় না, তেমনই কিছু বন্ধুত্ব শেষ হতে চায় না, শুধু রূপ বদলায়। আজ মিতুলের স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। তিরিশ পেরোনো মিতুলের জীবনে যেন প্রতিটি দিনই একইরকম—বাচ্চাদের পড়ানো, খাতা দেখা, বাড়ি ফেরা, মা-র সাথে গল্প করা আর নিজের ছোট্ট একাকীত্বের গণ্ডীতে নিজেকে গুটিয়ে রাখা। কিন্তু আজ ফেরার পথে কলেজ স্ট্রিটের কোন এক মোড়ে আচমকাই তার চোখে পড়ল এক চেনা মুখ—অর্পণ। হ্যাঁ, অর্পণ সেন, তার ছেলেবেলার বন্ধু। সেই অর্পণ, যে একসময় নোটবই ধার দেওয়ার অজুহাতে একসাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাত, আর তারপর মিতুলের বাড়ির গলি অবধি হেঁটে যেত। তাদের বন্ধুত্বটা কখন যেন সময়ের তালে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল—অর্পণ চলে গিয়েছিল দিল্লিতে পড়তে, আর মিতুল ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল তার নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে। এতগুলো বছর পর হঠাৎ করে দেখা হওয়ায় এক মুহূর্তের জন্য যেন দুজনেই থমকে গিয়েছিল। চোখে একধরনের বিস্ময় আর অজানা উচ্ছ্বাস নিয়ে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ, তারপর হাসল। সময়টা যেন থেমে গিয়েছিল।
ওই মুহূর্তে কেউই বুঝতে পারেনি, ওই হঠাৎ দেখা থেকেই শুরু হতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়। তারা দুজনে বসেছিল কলেজ স্ট্রিটের এক পুরোনো কফি হাউজে। চারপাশে কোলাহল, চায়ের কাপের ঠকঠকানি, অথচ তাদের দুইজনের মধ্যকার নীরবতাটা ছিল ভারী, অনুভূতিপূর্ণ। অর্পণ এখন কলকাতাতেই ফিরেছে, একটি নামী আর্কিটেকচারের ফার্মে কাজ নেয়ায়। মিতুল তাকে দেখছিল কিছুটা অবাক হয়ে—চেনা সেই অর্পণ, কিন্তু চোখে আজ অনেক বেশি ভার, অনেক বেশি পরিণত গাম্ভীর্য। কথায় কথায় জানা গেল, অর্পণ এখন একা থাকে, বাবা-মা গ্রামে, আর শহরে সে প্রায় নিঃসঙ্গ। মিতুল হেসে বলল, “তুই তো সবসময় বলতিস, কলকাতা ছেড়ে গেলে বাঁচবি—এখন বাঁচছিস তো?” অর্পণ একটু থেমে বলল, “বাঁচছি, কিন্তু যেটা ছিল সেটা আর নেই।” মিতুল জানে না, এই কথার পেছনে কতখানি অভিমান লুকিয়ে ছিল, কিংবা ভালোবাসা। সন্ধ্যার আলো গাঢ় হচ্ছিল, শহরের হর্ণের আওয়াজ ধীরে ধীরে আবছা হয়ে যাচ্ছিল, আর দুই পুরনো বন্ধু যেন সময়ের গায়ে হাত রেখে আবার হেঁটে চলেছিল সেই পুরোনো দিনগুলোর দিকে। তারা আলাদা হয়, কিন্তু একধরনের নৈঃশব্দ্য যেন তাদের দুজনের মাঝখানে পড়ে থাকে—একটা না বলা কথা, একটা না বুঝে ফেলা অনুভব।
কিন্তু জীবন সবসময়ই পরিকল্পনা করে না, সে আচমকাই বদলায়। কয়েকদিন পর এক গভীর রাতে ফোন এল মিতুলের মায়ের কাছ থেকে—মিতুল অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। বাইকে করে ফিরছিল, হঠাৎ এক অটোভ্যান সামনে পড়ে যায়। গুরুতর চোট, মাথায় কয়েকটি সেলাই, হাত বাঁকা। ফোন পেয়ে অর্পণ যেন শূন্য হয়ে গেল। সব ফেলে সে ছোটে এসএসকেএম-এ। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের বাইরে সে দাঁড়িয়ে থাকে, বারবার ঘড়ি দেখে, সিগারেটে আগুন দেয় আবার নিভিয়ে দেয়। জীবনে এই প্রথম সে উপলব্ধি করে, কেউ একজন তার ভেতরে এতখানি জায়গা দখল করে আছে। কিছু না বলা কথার ভিতরেও যে ভালোবাসা জন্মায়, তা সে বুঝল তখনই। মিতুলের জ্ঞান ফিরলে, প্রথম যে মুখটা সে দেখে, সেটা ছিল অর্পণের—অভিব্যক্তি জর্জরিত মুখ, চোখে জল। ধীরে ধীরে যখন সে সুস্থ হতে শুরু করল, তখন অর্পণ হয়ে উঠল তার ছায়া—ওষুধ আনা, ডাক্তার দেখানো, বকা দিয়ে সময়মতো খাওয়ানো, আর গভীর রাতে ভিডিও কল করে শোনানো রবীন্দ্রনাথের কবিতা। আর মিতুল…? তার চোখে ভাসতে লাগল সেই অর্পণ, যে নোট খাতা দিতে গিয়ে প্রতিবারই একটা কবিতার লাইন লিখে রাখত শেষ পাতায়। তারা কখনো বলেনি কিছু, কিন্তু অনুভব করত সব। আজ এত বছর পর একটা দুর্ঘটনা যেন তাদের দুজনকেই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল এক প্রশ্নের সামনে—বন্ধুত্বের নাম বদলে যেতে পারে কি? প্রেমের দ্বিতীয় সুযোগ কি সবার ভাগ্যে থাকে? আর যদি থাকে—তাহলে কি সাহস থাকে বুক ভরে বলতে, “ভালোবাসি”?
***
মিতুল এখনো বিছানাতেই, কিন্তু ধীরে ধীরে আগের মতো হাসছে, কথা বলছে, মাঝে মাঝে চোখ রাঙিয়ে বকেও দিচ্ছে—বিশেষত যখন অর্পণ ওষুধ খাওয়ার সময় ভুলে যায় বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে। দুর্ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় তিন সপ্তাহ। ওর বাঁহাতটা এখনো ঠিকঠাকভাবে নড়েনা, কিন্তু অর্পণ থাকায় ওর মনে সাহস আছে। এমনকি মিতুলের মা-ও মেনে নিয়েছেন যে “ছেলেটা ভারী ভালো, একটুও কুমতলব নেই মনে।” কিন্তু মিতুল জানে, কুমতলব নেই—এটা অর্পণকে অপমান করার মতো কথা। বরং এত যত্ন, এত মনোযোগ—সব কিছুর মধ্যে কোথাও একটা আবেগ আছে, না বলা প্রেম আছে। দুপুরবেলা অর্পণ এসে বসে, এক কাপ চা বানিয়ে দেয়, তারপর দুজনে একটা পুরোনো বাংলা ছবি দেখে—জহর গাঙ্গুলী, সুচিত্রা সেন, কিম্বা উত্তম কুমারের সেই দৃষ্টির প্রেম। মিতুল ভাবতে থাকে, “আচ্ছা, এইসব সিনেমার মত করে কি প্রেম সত্যিই হয়?” তারপর চোখ চলে যায় অর্পণের দিকে—সে তখন চায়ের কাপ হাতে জানালার বাইরে তাকিয়ে, দূরে বিকেলের আলো ঝিমিয়ে পড়ছে শহরের ছাদের ওপরে। অনেক সময় কিছু দৃশ্য গল্পের চেয়েও বেশি বলে, আর মিতুল জানে—সে নিজেও ধীরে ধীরে এক নতুন গল্পের চরিত্র হয়ে উঠছে।
সন্ধ্যার দিকে অর্পণ একদিন বলল, “চল, আজ তোর প্রিয় মোড়ের সেই চায়ের দোকানে যাই—যেখানে বসে তুই ক্লাস টেন এ প্রেমপত্র লিখেছিলি, আর আমাকে বলেছিলি পোস্ট করে দিতে।” মিতুল হেসে বলে, “তুই তো দেয়নি! সেই চিঠিটা তোর কাছে জমা রইল!” অর্পণ তখন মুচকি হেসে বলল, “হ্যাঁ, এখনো আছে।” এই ছোট্ট বাক্যে মিতুলের বুক কেঁপে ওঠে। অর্পণের কাছে থাকা চিঠি মানে তো তার ছেলেবেলার প্রেমের গল্প নয়, তার বিশ্বাসের একটুকরো, যা সে অর্পণকে দিয়েছিল। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো মোড়ে এসে দাঁড়ায়—চায়ের কাপ হাতে, দুজনে সেদিনকার অদ্ভুত অনুভূতিকে লুকাতে চায় চোখের সামনে ভেসে ওঠা ধোঁয়ার আড়ালে। কিন্তু একে অপরের দিকে তাকিয়ে তাদের মনে পড়ে যায়—কতগুলো বছর পেরিয়ে এসেছে তারা, কত কিছু হারিয়ে আবার পেয়েছে, আর আজকের এই সন্ধ্যাটা ঠিক যেন অন্যরকম। মিতুল চুপ করে বলে, “অর্পণ, তুই কি সবসময় এতটাই ছিলি আমার পাশে?”
অর্পণ চোখ নামিয়ে বলে, “তুই কখনো পিছনে তাকিয়ে দেখিসনি, তবু আমি ছিলাম।”
তাদের কথার ফাঁকে শহরের শব্দ ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে, যেন চাঁদের আলো বুঝে গেছে এই মুহূর্তে কেউ কাউকে ভালোবেসে ফেলেছে—চুপিচুপি, ধীরে ধীরে, ঠিক যেমনভাবে বিকেলে চায়ের ধোঁয়া মিশে যায় আকাশের গাঢ় নীলতায়। কিন্তু ভালোবাসা মানেই কি বলা, ছোঁয়া, অথবা প্রতিশ্রুতি? নাকি কখনো কখনো শুধু পাশে থেকে যাওয়া, সঠিক সময়ে ফিরে আসা, আর পুরোনো একটা চিঠির মতো বুকের ভেতর কিছু ধরে রাখা—এটাই যথেষ্ট? অর্পণ ও মিতুল জানে না উত্তর কোথায়, কিন্তু তারা বুঝতে পারে এই মুহূর্তে একে অপরের পাশে থাকা, এক কাপ চা আর চোখের ভাষা—সেই পুরোনো পথেই একটা নতুন মোড় এসেছে।
***
মিতুলের সেই পুরোনো প্রেমপত্রটা ছিল একটি নীলচে প্যাডের পাতায় লেখা, কুচকে যাওয়া কোনায় মৃদু করে আঁকা একটি ফুলের রেখাচিত্র। চিঠিটি সে দিয়েছিল অর্পণকে, এই বলে—“তুই পোস্ট করে দিস, না হলে মা পড়ে ফেলবে।” কিন্তু তখনও সে জানত না, অর্পণ চিঠিটা কখনোই পোস্ট করেনি। কেন করেনি, সেটা মিতুল কখনো জিজ্ঞেস করেনি, আর অর্পণও বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। এত বছর পর, এক সন্ধ্যায়, যখন মিতুল তার সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে থাকল ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটা কোলে রেখে, তখন অর্পণ ব্যাগের ভেতর থেকে কেয়ারফুলি মোড়ানো সেই চিঠিটা বের করল। হালকা হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজটা হাতে নিয়ে মিতুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল—কোনো স্মৃতি গলার কাছে এসে আটকে গেল। অর্পণ বলল, “আমি জানতাম না কেন রেখে দিয়েছিলাম। হয়তো ভেবেছিলাম… যদি someday তোকে পড়িয়ে দিতে পারি।” মিতুল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই জানতিস, আমি ওই চিঠিটা কাকে লিখেছিলাম?” অর্পণ ম্লান হেসে বলল, “জানি না… জানতাম না… তবুও মনে হত, এই কাগজের ভাঁজে হয়তো কোথাও আমিও আছি।” এক মুহূর্তের নীরবতায় চোখে চোখ আটকে যায়। চিঠির শব্দেরা যেন তখন নীরবতায়ও বাজে।
সেই রাতে তারা আর সিনেমা দেখে না, গল্পও করে না বেশি। অর্পণ জানে, আজকের চুপ করে বসে থাকাটাও অনেক কিছু বলে দেয়। টেবিলের ওপর রাখা সেই চিঠিটা যেন একটা জাদুময় বস্তু—একটা সময়কে ধরে রেখেছে, যেখানে অনুভব ছিল কিন্তু প্রকাশ ছিল না। মিতুল হঠাৎ বলল, “জানিস, সেদিনের চিঠিটা আমি আসলে তোকে নিয়েই লিখেছিলাম। শুধু সাহস হয়নি নামটা লিখে দিতে।” কথাটা শুনে অর্পণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আমি যদি ওইদিন সেটা বুঝেও থাকি… তবুও কিছু বলতে পারিনি। কারণ তোকে হারানোর ভয়টা… সবকিছুর ওপরে ছিল।” বাইরে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা এসে জানালার কাঁচে পড়ে একটানা শব্দ তুলছে, আর ঘরের ভেতরে—দুজন মানুষের মুখে একটাও শব্দ নেই, তবুও যেন সব কথা বলে ফেলেছে তারা। চিঠির নিচে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকলে তা একদিন ঠিক প্রকাশ পায়, হয়তো অনেক দেরিতে… কিন্তু পায়।
পরদিন সকালে মিতুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, অর্পণ চুপ করে তার পাশে এসে দাঁড়াল। হাতে কফির কাপ, দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য এক আড়াল যেন রাতের কথাগুলো জমিয়ে রেখেছে। হঠাৎ অর্পণ বলল, “এই যে এতগুলো বছর কেটে গেল, আমরা হয়তো নতুন করে শুরু করতে পারি।” মিতুলের মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল—যেমনটা হয় দীর্ঘ শীতের পর হঠাৎ করে রোদ এলে। সে চোখ নামিয়ে বলল, “বন্ধু হয়ে থাকবি তো?” অর্পণ হাসল, “বন্ধু তো ছিলামই। এখন তুই বল, আর কি হতে দে?” মিতুল কিছু বলল না, শুধু অর্পণের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল বিশ্বাস, সাহস আর হয়তো একটু আশঙ্কাও—কারণ দ্বিতীয়বার ভালোবাসা মানে দ্বিতীয়বার ভাঙার ভয়ও। কিন্তু মানুষ তো জীবনে সবকিছুর পরে আবার ভালোবাসতেই চায়, চিঠির মতো যত্নে গুছিয়ে রাখা সেই অনুভূতিটাকে একদিন প্রকাশ করতেই চায়।
***
বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে হালকা রোদ, শহরের রাস্তায় জল জমে থাকা টালিগুলোতে সূর্যের প্রতিচ্ছবি খেলছে। সেই আলোয় যেন কেমন এক স্থিরতা রয়েছে—যেন অপেক্ষা করে আছে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য। আজ রবিবার, মিতুলের ছুটি। সকালের দিকে অর্পণ এসে মাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল, আর হেসে বলল, “আজ আমরা একটু বাইরে যাব, ওকে একটু হাঁটাচলা করাতে হবে।” মিতুল অবাক হয়ে তাকাল, অর্পণ আগে কখনো এমন সরাসরি কিছু বলেনি। মা অনুমতি দিলেন খুশি মনেই—তিনি এখন অর্পণকে প্রায় জামাই হিসেবেই ভাবতে শুরু করেছেন, যদিও কিছুই পরিষ্কার নয় এখনো। মিতুল জানে না ঠিক কীভাবে, কিন্তু সে চুপচাপ রেডি হয়ে নেয়। সাদা পাড়ের নীল কুর্তি পরে, খোলা চুলে মুখে হালকা হাসি—যেন কোনো পুরোনো দিনের পোস্টকার্ড থেকে উঠে আসা একটা ছবি।
তারা যায় রবীন্দ্র সরোবরের দিকে। মিতুল ধীরে ধীরে হাঁটছে, অর্পণ তার পাশে, মাঝে মাঝে হাতটা বাড়িয়ে দেয় যেন সে পড়ে না যায়। চারপাশে ছেলেমেয়েরা ছবি তুলছে, প্রেমিক-প্রেমিকারা গাছের নিচে বসে গল্প করছে—আর তারা দুজনে যেন সেই দৃশ্যপটে একটু আলাদা, একটু বেশি ভাবুক। হঠাৎ করেই মিতুল বলে ফেলে, “আচ্ছা অর্পণ, যদি আমরা আবার একসাথে হই, যদি কিছু শুরু করি… আর সেটা শেষ না হয়?” অর্পণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি জানি না শেষ কী হবে, কিন্তু তুই যদি এখন আমাকে বলিস—‘আয়, শুরু করি’, তাহলে আমি বলব ‘চল, হাত ধরি।’” মিতুল হেসে ফেলে, তারপর গম্ভীর হয়ে বলে, “আমি ভয় পাই… ভালোবাসা মানেই আমার কাছে হারানোর আশঙ্কা।”
অর্পণ থামে, ওর মুখের দিকে তাকায় আর বলে, “ভালোবাসা মানেই তো সাহস… আবার শুরু করার সাহস।”
বিকেলটা কেটে যায় এইভাবেই—অসংখ্য অসমাপ্ত বাক্য, কিছু ছুঁয়ে যাওয়া নিঃশব্দ, কিছু নতুন বোঝাপড়া। ফিরতি পথে, অর্পণ হঠাৎ থেমে যায়। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, কাঁধে ব্যাগ, চোখে দৃঢ়তা নিয়ে বলে, “মিতুল, তুই যদি চাস, আমি আছি। শুধুই বন্ধু হয়ে নয়… যদি তুই চাস, আমি তোকে ভালোবেসে থাকতে চাই। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।” মিতুল কিছু বলে না। তার চোখে জল চলে আসে, সে চুপচাপ মাথা ঝাঁকায়—নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক নয়, যেন অনুভবের অবাক দুপুরে সে নিজেকেই খুঁজে পেতে চায়। কিন্তু এই নিরবতা দিয়েই নতুন করে শুরু হয় তাদের প্রেমের দ্বিতীয় অধ্যায়—চুপিসারে, কিন্তু মাটির মত স্থির।
***
সন্ধ্যার পর মিতুলের ঘরে যে আলোটা জ্বলে, সেটা খুব মৃদু, উষ্ণ হলুদ। সেই আলোয় তার মুখে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছায়া পড়ে, ঠিক যেমন পড়ে কোনো ধ্যানমগ্ন চিত্রকরের চোখে, যখন সে নিজের ক্যানভাসে প্রথম আঁচরটা তোলে। আজকের বিকেলের কথাগুলো এখনো তার মনে দোল খাচ্ছে—অর্পণ বলেছিল, “আমি তোকে ভালোবেসে থাকতে চাই… প্রতিদিন।” এই শব্দগুলো শুনে বুকের ভেতরে একটা তীব্র কাঁপুনি উঠেছিল, যেন এতদিন ধরে চেপে রাখা কোনো কল্পনারা হঠাৎ করেই সত্যি হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই বাস্তবতায় ভয়ও থাকে—ভাঙার ভয়, হারানোর ভয়, এবং সবথেকে বেশি—নিজেকে হারাবার ভয়। রাতে অর্পণ যখন ফোন করল, তখন মিতুল বলল না, “আমি খুব খুশি”—বরং বলল, “আমার একটু সময় চাই।” অর্পণ থমকে গেল, কিন্তু বোঝাল, “তুই যত সময় চাস, আমি আছি।” ফোনের ওপাশে এক দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। সেই নীরবতায় কিছু অপূর্ণতা ছিল, কিন্তু তার গভীরে ছিল প্রতীক্ষার শব্দ।
পরদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। মিতুল স্কুলে ফিরে যায়, তার ক্লাসের বাচ্চারা হইচই করে, পেছনে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা করে। এমন মুহূর্তে একজন সহশিক্ষিকা মৃদু হেসে বলে, “তোমার তো চেহারায় এক নতুন আলো… প্রেম বুঝি?” মিতুল হেসে ফেলে, কিন্তু তার হাসির ভেতরে একটা কুঁচকে থাকা দ্বিধা থাকে। সে জানে, ভালোবাসা এসেছে, কিন্তু তার ভিতরে পুরোনো সম্পর্কের ভাঙনের ক্ষত এখনো শুকোয়নি। একসময় সে একজনের সঙ্গে এনগেজড ছিল—তবে তা টিকেনি। সেই মানুষটি তার বিশ্বাস ভেঙেছিল, বারবার। মিতুল ভেবেছিল, ভালোবাসা হয়তো তার জীবনে শেষ হয়ে গেছে। এখন সেই পুরোনো ছায়ারা ফিরে আসে, আর অর্পণের মুখের ওপর পড়ে। বিকেলে সে আরেকবার অর্পণকে দেখা করে, কিন্তু এবার সে কিছুটা দূরত্ব রেখে চলে। অর্পণ বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলে না।
“তুই রাগ করিসনি তো?”
“রাগ না… ভয় পেয়েছি।”
“কিসের ভয়?”
“তোর দূরে চলে যাওয়ার।”
এইরকম ছোট ছোট বাক্য, যেগুলো প্রেমকে বড় করে তোলে, আবার ভয়েও ভরিয়ে দেয়। সেদিন রাতে মিতুল জানালার ধারে বসে সেই পুরোনো প্রেমপত্রটার দিকে তাকায়। এই চিঠি তো সে অর্পণকে নিয়েই লিখেছিল। তাহলে কি আজ তার নিজের লেখা চিঠির উত্তর সে নিজেই খুঁজে পাচ্ছে? হয়তো হ্যাঁ। অথবা, উত্তরগুলো এখনো আসেনি, কেবল প্রশ্নগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু এটাই তো ভালোবাসার প্রথম পর্ব—নিরবতার ভিতরেও শব্দ থাকে, আর ভালোবাসা বোঝাতে সবসময় শব্দ দরকার হয় না। দরকার হয় শুধু পাশে থাকার ইচ্ছেটুকু।
***
শহরের রাস্তায় হেমন্তের হালকা কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। বাতাসে ঠান্ডার ইঙ্গিত, আর সেই হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পুরোনো স্মৃতিও যেন ফিরে আসতে থাকে। মিতুল স্কুল থেকে ফিরে এসে আজ কিছুটা অস্থির। কারণ সকালে হঠাৎ স্কুলের গেটের সামনে একজন দাঁড়িয়ে ছিল—যার মুখ একসময় তার জীবনের কেন্দ্র ছিল। ঋষভ।
তিন বছর আগের সেই মানুষ, যে একসময় মিতুলের হাত ধরেছিল এই বলে—“তোর মতো কাউকে আর পাব না।” কিন্তু সেই ‘না পাওয়া’-টা যে নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছিল বিশ্বাসঘাতকতার ধোঁয়া। কাজের চাপ, ব্যক্তিগত অবসাদ—এসবের দোহাই দিয়ে ঋষভ দূরে সরে গিয়েছিল, আর শেষে একদিন সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল একটা এসএমএস-এ। মিতুল সেইসব অধ্যায় বন্ধ করে ফেলেছিল অনেক কষ্টে, ভেবেছিল, ‘ভালোবাসা আর নয়।’ কিন্তু আজ… আজ সে ফিরে এসেছে।
ঋষভ বলে, “তুই কেমন আছিস?”
মিতুল উত্তর দেয়, “ভালো।”
“তোর মুখে ওই হাসি দেখি… অনেক দিন পরে।”
“হাসিটা নতুন কেউ ফিরিয়ে দিয়েছে।”
ঋষভ বুঝে যায়, সে আর আগের জায়গায় নেই। তবু সে বলে, “আমি ভুল করেছিলাম, আমি হয়তো তখন ভয় পেয়েছিলাম… কিন্তু আজ আমি জানি, তুই ছাড়া আমি অপূর্ণ।” এই স্বীকারোক্তি মিতুলকে কিছুটা কাঁপিয়ে দেয়, কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতরে অন্য একটি ছায়া আগে থেকেই বসে আছে—অর্পণ। সে বলল না কিছু, শুধু বলল, “জীবন এগিয়ে গেছে, ঋষভ। ফিরে আসা মানেই ফিরে পাওয়া নয়।” আর ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে—অর্পণের নাম ভেসে ওঠে স্ক্রিনে। মিতুল ফোন তোলে, আর ঋষভ চুপ করে পেছনে সরে যায়।
সন্ধ্যায় অর্পণ আসে, তার চোখে আজও সেই আগের উষ্ণতা, তবে কপালের ভাঁজে এক অদৃশ্য প্রশ্ন। সে জানে না আজ কী ঘটেছে, কিন্তু মিতুলের চোখে যে এক চাপা অস্থিরতা, তা সে মিস করে না। ড্রয়িং রুমে বসে তারা চুপচাপ বসে থাকে কিছুক্ষণ। অর্পণ ধীরে বলে, “তুই ঠিক আছিস তো? আজকে একটু অন্যরকম লাগছে তোকে।” মিতুল মাথা নিচু করে বলে, “আজ একটা পুরোনো ছায়া ফিরে এসেছিল।”
“ঋষভ?”
একটু থেমে, শান্তস্বরে মিতুল বলে, “হ্যাঁ।”
অর্পণ চোখ নামিয়ে চুপ করে থাকে, তারপর বলে, “তুই যদি মনে করিস… ফিরে যেতে চাস…”
“না অর্পণ!”—মিতুলের কণ্ঠে কাঁপন, কিন্তু নিশ্চিততা—“আমি ফিরতে চাই না। আমি শুধু ভয় পেয়েছি, কারণ জীবনে প্রথমবার… আমি সত্যিই কাউকে ভালোবেসে ফেলেছি, আর এবার হারাতে চাই না।”
এই স্বীকারোক্তির ভিতর দিয়ে যেন সমস্ত অস্থিরতা দূর হয়ে যায়। অর্পণ এগিয়ে এসে মিতুলের পাশে বসে, ধীরে তার ভালো হাতটা ধরে। কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না, কোনো কবিতা পড়ে শোনায় না, শুধু বলে, “এই হাতটা যতক্ষণ তুই চাইবি… ততক্ষণ আমি ছাড়ব না।”
***
কলকাতার আকাশ আজ হালকা ধূসর। মাঝে মাঝে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি, আর বাতাসে এক ধরণের জড়তা। এমন দিনে অর্পণ আর মিতুল ঠিক করেছে তারা প্রথমবারের মতো একসাথে বাইরে যাবে—কোনো অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর বা হাসপাতালের ওয়ার্ডে নয়, বরং একেবারে নিজেদের মতো করে, কিছুটা স্বাধীনভাবে। অর্পণ প্ল্যান করেছে ওদের প্রথম “আফিশিয়াল” ডেট—ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে দিয়ে হাঁটা, তারপর মুকুন্দপুরের একটা ছোট্ট ক্যাফেতে বসে কফি আর কথা। মিতুল একটু দ্বিধায় ছিল—হাতটা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, তবু তার চোখে আজ এক নতুন রঙ। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই তো কখনো নিজের জন্য সাজিসনি… আজ সাজ।”
প্রথম ক্যাফেতে পা রাখতেই অর্পণ দেখে মিতুল সিঁথিতে হালকা করে একটা ছোট্ট টিপ দিয়েছে। অর্পণ মৃদু হেসে বলে, “এই টিপটা শুধু সাজ নয়, তোর সাহস।” ক্যাফের একটা কোণার টেবিলে বসে তারা কথায় কথায় হারিয়ে যায়—স্কুলের সেই টিফিন ভাগ করা, কলেজের লাইব্রেরিতে বইয়ের ফাঁকে রেখে আসা ছোট চিরকুট, আর অবশেষে সেই চিঠিটা, যা এতগুলো বছর পর এখন তাদের মাঝে সেতু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যেন নিজেদের গল্পটাই আবার লিখছে, নতুনভাবে, নতুন অক্ষরে। হঠাৎ করেই মিতুল বলে, “তুই কি আমাকে সত্যিই এমন করেই দেখিস? এত আপন, এত ভালোবাসার?”
অর্পণ বলে, “আমি তোকে দেখি… যেমন তুই—ভাঙা, গড়া, রাগী, হাসিখুশি… সবটুকু তুই।”
কিন্তু গল্পটা এতটাও মসৃণ নয়। ডেট শেষে অর্পণ অফিসের এক জরুরি ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার মনটা দোটানায় পড়ে যায়—মিতুল যেন একটু কষ্ট পেল, এই ভেবে যে তার প্রথম ‘বিশেষ দিন’-এ অর্পণ তার দিকে পুরোটা মনোযোগ দিতে পারল না। সে বলে না কিছু, কিন্তু তার মুখে এক চাপা বিরক্তি ফুটে ওঠে। রাতে ফোনে অর্পণ যখন বলে, “আজ তো তুই খুব চুপচাপ হয়ে গেছিস,” মিতুল হালকা ঠান্ডা গলায় বলে, “তুই তখন ফোনেই ব্যস্ত ছিলি।”
অর্পণ থেমে যায়, বলে, “হ্যাঁ, বুঝেছি… তোর প্রথম দিনটার মূল্য আমি হয়তো পুরোটা দিতে পারিনি।”
এই ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝি তাদের মধ্যে একটু নীরবতা তৈরি করে। পরদিন সারাদিন দুজনে কথা বলে না, শুধু মাঝেমধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে ‘seen’ হয়ে যায় কথাগুলো। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে দরজায় বেল বাজে। মিতুল দরজা খুলে দেখে, অর্পণ দাঁড়িয়ে আছে হাতে একটি পত্রপাঠ খাম—ভিতরে একটা কার্ড, লেখা আছে:
“প্রথম দিনটা হয়তো ভুল হয়ে গেছে, কিন্তু দ্বিতীয় দিনটা ভুল হতে দেব না।
ভালোবাসি,
— অ.”
মিতুল হেসে ফেলে, তারপর তার চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে ফেলে।
সে ধীরে ধীরে বলে, “আজ এক কাপ চা দে। আমরা আবার শুরু করি… একটুও দেরি না করে।”
অর্পণ চুপচাপ মাথা নেড়ে বলে, “চা-র কাপে যতবার ধোঁয়া উঠবে, ততবার তোর পাশে থাকব।”
***
পুজোর ঠিক আগের সন্ধ্যা। শহরের গলি-ঘুপচিতে আলো ঝলমল করছে, ঠাকুরবাড়িগুলিতে প্যান্ডেল গড়ার আওয়াজ, ঢাকের মৃদু অনুশীলন, আর বাতাসে একরকম প্রেমের সুবাস। এই সময়টা বাঙালিদের হৃদয়ে একরকম দুর্বলতা তৈরি করে—একটা অজানা আনন্দ, সঙ্গে একটা চেপে রাখা হাহাকার। মিতুল জানালার ধারে বসে এসবই ভাবছিল। চারপাশের জগৎ সাজছে, রঙ লাগছে, কিন্তু তার নিজের ভিতরে যেন এখনো একটা নির্দিষ্ট স্বীকারোক্তির অপেক্ষা। এতদিন ধরে অর্পণ পাশে থেকেছে, নিজের প্রতিটা কাজে বুঝিয়ে দিয়েছে তার ভালোবাসা। কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলেনি, “ভালোবাসি।”
মিতুলও বলেনি।
তবু প্রতিটা স্পর্শে, প্রতিটা চায়ের কাপে, প্রতিটা নীরব অপেক্ষায়—সে ভালোবেসেছে।
সেই সন্ধ্যেটা ছিল পুজোর আগের রবিবার। অর্পণ হঠাৎ বলল, “আজ তুই আর আমি একটু দূরে যাই—একেবারে শহরের বাইরের দিকে, যেখানে আলো কম, শব্দ নেই।” তারা গাড়ি করে চলে গেল কোলাঘাটের দিকে। নদীর ধারে বসে তারা দুজনে চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। পেছনে হালকা বাতাস, গাছের পাতার মৃদু শব্দ, আর সামনে ঝিম ধরা নদী। মিতুল ধীরে বলল, “তুই সব সময় বলিস ‘আমি আছি’… কিন্তু তুই কী নাম দিস আমাদের এই থাকার?”
অর্পণ তার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি তোকে বলিনি কখনো, কারণ ভয় পেতাম… যদি তোকে বলি, ‘ভালোবাসি’, আর তুই মুখ ঘুরিয়ে নিস…”
মিতুল হেসে বলে, “আর আমি বলিনি, কারণ আমি চাইতাম তুই আগে বল।”
এক মুহূর্ত নীরবতার পর, অর্পণ মিতুলের ভালো হাতটা ধরে, চোখে চোখ রাখে আর বলে—
“ভালোবাসি।”
এই দুটি শব্দ এত সহজে উচ্চারিত, অথচ তার ভেতরে এত জমানো কাঁপুনি, স্মৃতি, ভয়, আশ্বাস।
মিতুল তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর চোখ নামিয়ে বলে—
“ভালোবাসি… অনেকদিন ধরেই।”
তারা কাছাকাছি আসে, কোনো চুম্বন নয়, কোনো অতিরিক্ত আবেগ নয়—শুধু মাথা কাঁধে রেখে একসাথে বসে থাকে অনেকক্ষণ। সেই নদীর ধারে তারা তাদের সম্পর্ককে আজ নাম দিল—ভালোবাসা। কোনো বন্ধুত্বের অস্পষ্টতা নয়, কোনো না বলা চিঠির ভাষা নয়—সরাসরি, স্পষ্ট, খাঁটি। সেই রাতে, তারা শহরে ফেরে চুপচাপ, কিন্তু ভেতরে একেকজনের মনে বাজতে থাকে সেই দুটি শব্দ…
“ভালোবাসি”…
আর তার মানে তখন হয়ে দাঁড়ায়—“আজ, আগামীকাল, আর যতদিন তুমি চাও, আমি তোমার।”
***
কলকাতার পুজো মানেই আলোয় মোড়ানো অলিগলি, চেনা মুখে নতুন রঙ, আর অজস্র না বলা কথার মেলা। অর্পণ আর মিতুল এই প্রথম দুর্গাপুজো কাটাবে একসাথে—প্রেমিক-প্রেমিকার মতো, শুধু বন্ধু নয়, আর কোনো ধোঁয়াশাও নয়। ষষ্ঠীর সকাল থেকেই শহরটা বদলে গেছে। মিতুল যখন নতুন শাড়িতে সেজে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তখন তার চোখে একটা অন্য রকম উজ্জ্বলতা। মা অবাক হয়ে বলে, “তোর চোখে আজ যেন আলো জ্বলছে, শুধু সাজের জন্য না।” মিতুল মুচকি হেসে উত্তর দেয়, “আলোটা মনে থেকেছে, মা। বাইরে তো শুধু পর্দা।”
অর্পণ আসে হোয়াইট কুর্তা-পাজামায়, চোখে একরকম উচ্ছ্বাস লুকিয়ে রাখা। মিতুলকে দেখে সে কিছু বলে না, শুধু একবার মৃদু হাসে—সেই হাসি বলেই দেয়, ‘তুই আজ শুধু সুন্দর না, তুই আমার।’ তারা প্রথমে যায় বাগবাজার সার্বজনীন পুজোতে, ভিড় ঠেলে ঠাকুর দর্শন, তারপর হাত ধরে হেঁটে যায় হাটখোলা, বউবাজার, মিত্র ইনস্টিটিউশন হয়ে নর্থ কলকাতার পুরোনো বনেদি বাড়ির পুজোয়। সিঁড়ির ধাপে বসে ঠাকুর দেখার ফাঁকে অর্পণ বলে, “তোর শাড়ির খোঁপায় এই ফুলটা দিব?” মিতুল মাথা নেড়ে হাসে, বলে, “ফুলটা আজ সারা দিন টিকে থাকবে তো?”
অর্পণ ঠোঁটের কোণে বলে, “আমি থাকলে সব টিকে যাবে।”
সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী—তারা একসাথে কাটায়। একদিন মিতুলের বাড়িতে সিঁদুর খেলার সময়, অর্পণ তাকে লাল সিঁদুরের টিপ দেয়। অন্য কেউ দেখলে ভাবে হয়তো রীতি, কিন্তু তারা জানে—এই একফোঁটা রঙের ভেতরে ছড়িয়ে আছে ভালোবাসার অজস্র প্রতিশ্রুতি। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরার সময় মাঝে মাঝে চোখাচোখি হয়—কেউ কিছু বলে না, তবু চারপাশের কোলাহলের মাঝেও তারা বুঝে নেয় একে অপরের মন।
তবে এক বিকেলে মিতুল হঠাৎ থেমে যায়। অর্পণ জানতে চায়, “কি হলো?”
মিতুল ধীরে বলে, “তুই ভাবিস না তো… খুব তাড়াতাড়ি আমরা এই জায়গায় চলে এসেছি?”
অর্পণ একটু ভেবে উত্তর দেয়, “জীবনে যা সত্যি, তা সময়ের অপেক্ষা করে না। আর তুই তো আমার কাছে নতুন না—তুই তো সেই ক্লাস সেভেনের মেয়েটা, যার চিঠিটা আমি এখনো কাছে রাখি।”
মিতুল চোখ ঘুরিয়ে নেয়, কারণ তার চোখে জল এসে গেছে।
অর্পণ তখন বলে, “চল, তোর চোখটা শুকিয়ে ফেলি। কারণ আজ রাতে আমাদের ডেট—প্যান্ডেলের পাশে বসে ফুচকা আর কাগজে মোড়া জিলিপি খাওয়া।”
মিতুল হেসে বলে, “আর চা?”
অর্পণ হাসে, “চা তো প্রেমের কসম—চিরকাল একসাথে।”
এই পুজোর দিনগুলোতে তারা উপলব্ধি করে, ভালোবাসা মানে শুধু বড় বড় কথা নয়, মানে একসাথে অটো ধরার জন্য দৌড়ানো, মানে একে অপরের হাত ধরে ঠাকুর দেখার সময় ঠান্ডা বাতাসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা, আর মানে—এক কাপ ভাগ করে নেওয়া চা।
***
পুজোর দিনগুলো শেষ হয়েছে। শহরের আলো নিভে এসেছে, গলিগুলোতে ধুনোর গন্ধ মিশে গেছে শূন্যতার সঙ্গে। বিজয়ার পরের সেই প্রথম সোমবারে, মিতুল স্কুল থেকে ফিরে জানালার ধারে বসে ছিল অনেকক্ষণ। বাইরে আকাশে একটু মেঘ, একটু হাওয়া। অর্পণের সঙ্গে কথা হয়নি আজ সকাল থেকে। এমনটা আগে হয়নি—দিনের শুরুতে একটা “গুড মর্নিং” তো থাকতই। কিন্তু আজ নেই।
কারণ: গতকাল রাতে ফোনে এক ছোট্ট কথোপকথন।
মিতুল বলেছিল, “তুই আজ সারা দিন অন্য রকম ছিলি। কেমন যেন গা ছাড়া…”
অর্পণ বিরক্ত স্বরে বলেছিল, “তুই একটু বেশি ভাবিস না?”
সেই স্বরে অভিমান ছিল না, ছিল ক্লান্তি।
কিন্তু মিতুল ঠিক ওই স্বরের ভেতরে শুনে ফেলেছিল দূরত্ব।
সেই রাতে ঘুম হয়নি মিতুলের। সকালেও অর্পণের মেসেজ আসেনি। এমন সময় খবর আসে, অর্পণের অফিসে বড়ো একটা ঝামেলা হয়েছে—একটি প্রজেক্ট বাতিল হয়েছে শেষ মুহূর্তে, অনেক দিনের পরিশ্রম ডুবে গেছে। সেই হতাশা, মানসিক চাপ—সবকিছুই সে গতকাল চেপে রেখেছিল, আর সেই কারণেই তার স্বরটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মিতুল জানত না কিছু। সে শুধু শুনেছিল বদলে যাওয়া গলা। সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল—যেন সবকিছু আবার ভেঙে না পড়ে।
সন্ধ্যায় দরজার ঘণ্টা বাজে। অর্পণ এসে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখে ক্লান্তি, কণ্ঠে অনুশোচনা।
সে বলে, “আমি রাগ করিনি। আমি ভেবেছিলাম তুই বুঝবি…”
মিতুল চোখ তুলে তাকিয়ে বলে, “আমিও ভেবেছিলাম… তুই বলবি।”
তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে দেয়ালঘড়ির টিক টিক শব্দ।
তারপর অর্পণ ধীরে মিতুলের হাতটা ধরে, বলে,
“তুই যদি চুপ থাকিস, আমি ভয় পাই। তুই যদি অভিমান করিস, আমি থমকে যাই। কিন্তু সবথেকে ভয় পাই, যদি তুই দূরে চলে যাস… আবার।”
মিতুল মাথা নিচু করে ফেলে। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
“আমি শুধু চাই, তুই আমাকে সময় দে… বুঝিয়ে বলিস সব।
আমিও সবসময় ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।”
অর্পণ মৃদু হেসে বলে, “আমি তো ভাবতাম, তুই আমার মন পড়ে নিতে পারিস।”
মিতুল এবার হাসে, বলে, “মন পড়ার বদলে… মন বোঝার চেষ্টাটা আরও জরুরি।”
তারা দুজনেই কাছাকাছি আসে। কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।
মিতুল চুপ করে বলে, “ঝগড়াটা থাক, অভিমানটাও থাক, কিন্তু তুই যদি পাশে থাকিস… তাহলে আমি ঠিক রাগ ভুলে যাব।”
অর্পণ জবাব দেয় না, শুধু দুটো হাত দিয়ে মিতুলের মুখটা ছুঁয়ে বলে—
“তুই আছিস, এটাই আমার শান্তি।”
***
শীতকাল আসছে। মিতুলের বারান্দার বোগেনভেলিয়া গাছটা রঙ ছড়াতে শুরু করেছে। চারপাশে ধোঁয়াটে আলো, আর সেই আলোয় মিতুল নিজেকে দেখে অন্যরকম লাগছে—একটু পরিণত, একটু সাহসী, আর অনেকটা নির্ভরশীল। অর্পণের সাথে সম্পর্কটা এখন আর শুধু প্রেম নয়, একটা গভীর সঙ্গ, একটা আস্থা—যা ঝগড়ার মাঝেও থেকে যায়, অভিমান পেরিয়ে আবার হাত ধরে ফেলে। এইসব অনুভবের মধ্যে হঠাৎই একদিন অর্পণ বলে ফেলল, একেবারে হুট করে—“চল বিয়ে করি?”
মিতুল চুপ করে ছিল। কিচেন থেকে প্লেটে চা নিয়ে বেরোচ্ছিল তখন। তার মুখ থেমে যায়। কাপটা নামিয়ে সে হেসে ফেলে, বলে, “এটা কোন প্রোপোজাল রে? এক কাপ চা, আর একটা ‘চল বিয়ে করি’? ফুল-কেক-ক্যান্ডেল কই?”
অর্পণ হেসে বলে, “ফুল তো তোকে দেখে নিজেই ফোটে, ক্যান্ডেল তোর চোখের আলোতে জ্বলে, আর কেক… তুই চা দিচ্ছিস, সেটাই সবচেয়ে মিষ্টি।”
হাসির ভেতরেও মিতুল বুঝে যায়, এ কথার ভিতর এক গভীর সিদ্ধান্ত আছে।
পরদিন তারা প্রথম কথা বলে মিতুলের মায়ের সঙ্গে। মা প্রথমে একটু চুপ করে ছিলেন। তারপর বললেন, “এই ছেলেটা যে তোর জন্য ঠিক—আমি সেটা সেই এক্সিডেন্টের দিনেই বুঝে গেছিলাম।”
এরপর অর্পণের বাড়ি। তার বাবা-মা একটু অবাক হলেও মিতুলকে পছন্দ করতে দেরি হলো না।
সব আলোচনার পর তারিখ ধার্য হয়—১৫ ফেব্রুয়ারি। একদিন পর ভ্যালেন্টাইনের, কিন্তু তাতে আরও একটা ব্যক্তিগত মূল্য জুড়ে থাকে। কারণ ১৫ ফেব্রুয়ারিই মিতুল সেই চিঠিটা দিয়েছিল—অর্পণকে, যেটা সে এত বছর আগলে রেখেছিল।
বিয়ের প্রস্তুতির দিনগুলোতে দু’জনেই কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সন্ধ্যাবেলা একে অপরকে সময় দেয়—মিতুল মাঝে মাঝে বলে, “এত বছর লাগল বলার জন্য… তবুও সময়টা বড্ড ঠিক মনে হচ্ছে।”
অর্পণ উত্তর দেয়, “কারণ তোকে পেতে দেরি হলেও… তুই চলে যাওয়ার ভয় নেই আর।”
বিয়ের আগের রাতে, মিতুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে হালকা শোরগোল, বাড়ি ভরেছে আলো-আনন্দে। হঠাৎ সে ফোন পায়—অর্পণ।
“ঘুমাচিস?”
“না।”
“চুপ কেন?”
“ভাবছি, কাল থেকে তোদের বাড়িটা আমারও হয়ে যাবে… ভাবতে কেমন অদ্ভুত লাগছে।”
অর্পণ হেসে বলে, “তোদের বাড়িটাও আমার হয়ে যাবে… কারণ তোকে বিয়ে করা মানে শুধু মানুষটাকে পাওয়া না, তার পুরোটাকেই আপন করে নেওয়া।”
সে রাতে তারা দুজনেই ঘুমায় একরকম শান্তি নিয়ে—কারণ তারা জানে, আগামীকাল সকালে তারা শুধু আর প্রেমিক-প্রেমিকা থাকবে না, তারা হবে একে অপরের চিরসঙ্গী।
***
১৫ ফেব্রুয়ারি। সকালটা যেমন নিঃশব্দ, তেমনি যেন শব্দে পরিপূর্ণ। সূর্যটা উঠেছে ধীরে, কিন্তু তার আলোয় যেন রঙের ছড়াছড়ি—একটা নতুন জীবনের প্রাক্কালে ঠিক যেমন হয়। আজ মিতুলের বিয়ে। মিতুল, যে একদিন বিশ্বাস করেছিল, প্রেম তার জীবনে আর আসবে না… আজ সে প্রেমকেই তার জীবনের স্থায়ী ঠিকানা বানাতে চলেছে। মায়ের চোখে জল, কিন্তু সেই জল অভিমানের নয়—স্বস্তির। মিতুলের হাতে মেহেন্দির দাগ আজ গভীর—অর্পণের নামটা তার তালুর বাঁকে লুকিয়ে আছে।
অন্যদিকে, অর্পণ একেবারে গলদঘর্ম। পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে, বন্ধুরা চারদিক থেকে টিজ করছে। একজন বলল, “তুই তো আজ চুপচাপ, প্রেমিকের মুখে কথা নেই কেন?”
অর্পণ হেসে বলে, “আজ বলার কিছু নেই। আজ শুধু শুনব… তার পায়ের ছন্দ, তার মুখের হাসি… আর আমার নতুন জীবনের প্রথম কণ্ঠ।”
বিয়ের আসরে সেই মুহূর্তটা—যখন মালা বদল হয়, আলতা মাখা পায়ে মিতুল যখন এগিয়ে আসে, চারপাশে ধুনোর ধোঁয়া, ঢাকের আওয়াজ, আর চোখে চোখ পড়ে দুজনার… তখন কোনো শব্দ লাগে না। কাঁধে কাঁধ রাখার সেই প্রতিজ্ঞা তাদের চোখেই লেখা থাকে। গাঁটছড়া বাঁধা হয় না শুধু কাপড়ে, বাঁধা হয় বিশ্বাসে।
সপ্তপদী শেষ করে, কন্যাদান হয়, আর শেষে মিতুলের কানে ফিসফিসিয়ে অর্পণ বলে—
“তোর সেই চিঠিটা আমি এবার পাঠিয়ে দেব… আমার নামে, আমার ঠিকানায়।”
মিতুল হেসে ফেলে, তার চোখে জল—কিন্তু সেই জল আজ পূর্ণতার।
রিসেপশনে মিতুল পরেছে হালকা গোলাপি বেনারসি, অর্পণ তার পাশে সাদা শেরওয়ানি পরে দাঁড়িয়ে, একটানা অতিথিদের হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। কিন্তু তারা দুজনেই জানে, এই পার্টি, এই ক্যামেরার ঝলক, এই সাজ… এগুলো সাময়িক।
আসল গল্পটা শুরু হবে কাল সকাল থেকে—
যখন একসাথে ঘুম ভাঙবে,
একসাথে চা বানাবে,
একসাথে ঝগড়া করবে,
আবার একসাথে ভালোবাসবে।
রাতে, বালিশে মাথা রেখে মিতুল বলে,
“তুই জানিস? আমার ভয় হয়েছিল… আবার যদি কিছু ভেঙে যায়।”
অর্পণ চুপ করে থেকে বলে,
“এইবার আমরা একসাথে আছি,
যদি কিছু ভাঙেও… তা দু’জনে মিলে গড়ব।”
চুপচাপ, একটা হাত আরেকটা হাতে…
চাঁদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢোকে,
আর গল্পটা ধীরে ধীরে শেষ হয় না—
বরং, ঠিক এইখান থেকে শুরু হয়…
সমাপ্ত


