তন্ময় ঘোষ
১
অরূপের কাছে বর্ষার প্রথম দিনটা সবসময় আলাদা রকম অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। সে কলকাতার কোলাহল থেকে একটু দূরের গলিপথে অবস্থিত পুরনো এক চায়ের দোকানে বসেছিল, টেবিলের উপর রাখা কাগজে কলম চালাচ্ছিল নিঃশব্দে। দোকানের টিনের চাল থেকে টুপটাপ বৃষ্টির জল ঝরে পড়ছিল, আর ভিজে বাতাসে মিশে যাচ্ছিল চায়ের পাতার গন্ধ। বাইরের রাস্তায় গাড়ির চাকার ছপছপ শব্দ, ছাতার নিচে তাড়াহুড়ো করে হেঁটে যাওয়া মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে এক ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। অরূপের মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্ত যেন অন্যরকম; যেন প্রকৃতি নিজে তার জন্য এক বিশেষ দৃশ্য সাজিয়ে রেখেছে। কাগজে লেখা শব্দগুলো ধীরে ধীরে ছন্দে বাঁধা হচ্ছিল, কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারছিল যে তার মন কেবল লেখায় আটকে নেই, বরং বর্ষার ভেজা গন্ধ আর ঝরঝরে সুর তার ভেতরে এক অজানা আলোড়ন তৈরি করছে।
ঠিক সেই সময়েই দরজার ঘণ্টা টুং করে বাজল। ভিজে কাপড়ে, কাঁধ থেকে চুলের ডগা ঝরতে ঝরতে দোকানে প্রবেশ করল এক তরুণী। মেঘলা। প্রথম দর্শনে তাকে নিয়ে অরূপের মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল জন্ম নিল। সে যেন বৃষ্টিরই কোনো দূত, ভিজে যাওয়া পায়ের ছাপ মেঝেতে রেখে ধীরে ধীরে দোকানের ভেতরে এগিয়ে এলো। তার চোখে ভিজে অন্ধকারের মধ্যেও এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা ছিল, যা অরূপের দৃষ্টি আটকে দিল। অরূপ লেখার ভান করলেও, তার হাত থেমে গিয়েছিল কাগজের উপর। মেঘলার চোখের সঙ্গে অরূপের চোখ মিলতেই মুহূর্তের জন্য চারপাশের শব্দ ম্লান হয়ে গেল, শুধু বৃষ্টির একটানা সুর বাজতে লাগল। দু’জনের মধ্যে কোনো কথা হল না, কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয়ও নয়, কিন্তু তবুও যেন এক নিঃশব্দ বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গেল।
চায়ের দোকানের ভেতরটা ভিজে আলোয় ঝিমঝিম করছিল। দোকানদার আগের মতোই চায়ের কাপে ধোঁয়া তুলে দিচ্ছিল, কিন্তু তার মধ্যে যেন একটা অদৃশ্য ফাঁক তৈরি হয়েছে, যেখানে কেবল অরূপ আর মেঘলা বিদ্যমান। মেঘলা জানালার পাশে বসে বাইরে ঝরঝরে বৃষ্টি দেখছিল, তার হাত টেবিলের উপর রাখা, আঙুলগুলো ছন্দে ছন্দে টোকা দিচ্ছিল কাঠের চৌকো টেবিলে। অরূপ মাঝে মাঝে কাগজে দৃষ্টি নামালেও তার চোখ আসলে বারবার ছুটে যাচ্ছিল সেই মেয়েটির দিকে। অদ্ভুত এক অস্থিরতা তার মধ্যে জন্ম নিল—সে কি কথা বলবে? সে কি হাসবে? কিন্তু একই সঙ্গে ভেতরে জন্ম নিল এক আশ্চর্য স্বস্তি, যেন কিছু না বলেও সব বলা হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির নরম সুর, চায়ের দোকানের পুরনো কাঠের গন্ধ, আর তাদের চোখের নীরবতা—সবকিছু মিলে যেন এক সিনেমার প্রথম দৃশ্য গড়ে উঠল।
সময় থেমে গিয়েছিল বলে মনে হচ্ছিল। বাইরে যখন বজ্রপাত আকাশকে সাদা আলোয় আলোকিত করছিল, তখনও দোকানের ভেতরে সেই দু’জনের মধ্যে জন্ম নেয়া নীরব সংলাপ চলতে থাকল। মেঘলা মাঝে মাঝে বাইরে তাকিয়ে হাসছিল, যেন বৃষ্টির সঙ্গে তার কোনো গোপন আলাপ চলছে, আর অরূপ চুপচাপ সেই হাসি দেখছিল, যা তার বুকের ভেতর অজানা স্রোত বইয়ে দিচ্ছিল। কোনো শব্দ বিনিময় না হলেও, দু’জনেই বুঝতে পারছিল, আজকের এই হঠাৎ দেখা—এই আকস্মিক চোখের মিলন—তাদের জীবনের কোনো বিশেষ অধ্যায়ের সূচনা। তারা কেউই জানত না, এই গল্প কোথায় যাবে; হয়তো আবার আর দেখা হবে না, হয়তো হবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে, বৃষ্টির ভেজা আলোয়, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠতে উঠতে, তাদের হৃদয়ে অঙ্কুরিত হলো এক অদৃশ্য সেতু—যা কেবল অনুভূতির, কোনো ভাষার নয়।
২
বর্ষার দ্বিতীয় দিনের বিকেল। শহরটা আবারও অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। অরূপের মনে অদ্ভুত এক কাঁপন কাজ করছিল। সে জানত না কেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল সেই পুরনো চায়ের দোকানে আবার গেলে হয়তো কোনো আশ্চর্য ঘটবে। কলম আর খাতাটা ব্যাগে ভরে সে পৌঁছল দোকানে। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়েই তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল—গতবারের সেই মেয়েটি, যার চোখের সঙ্গে নীরব এক সেতু তৈরি হয়েছিল, সে কি আবার আসবে? দোকানে ঢুকেই সে জানালার পাশে বসল, চায়ের অর্ডার দিল, আর বাইরে চোখ রেখে বৃষ্টির স্রোত দেখল। তার মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি আজ যেন কেবল তার জন্য এই দৃশ্য সাজিয়ে রেখেছে। মিনিট কয়েক পর দরজার ঘণ্টা আবার বেজে উঠল, আর অরূপের বুকের ভেতরে জমে থাকা আশা যেন সত্যি হয়ে গেল। মেঘলা ভিজে চুল পেছনে সরিয়ে দোকানে প্রবেশ করল। চোখের পলকেই অরূপ বুঝতে পারল—সে-ই। তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি খেলে গেল, আর মেঘলার চোখে পড়ল সেই পরিচিত দৃষ্টি।
মেঘলা এবার আর জানালার পাশে নয়, অরূপের টেবিলের বিপরীতে বসে পড়ল। দোকানদার যেন পুরনো অভ্যাসের মতো তার সামনে চা এগিয়ে দিল। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি চলছিল, কিন্তু দোকানের ভেতরে যেন এক নতুন রঙ ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের অস্বস্তিকর নীরবতার পর অরূপ সাহস সঞ্চয় করে বলল, “আপনি… গতবারও এসেছিলেন, তাই না?” মেঘলা হালকা হেসে মাথা নাড়ল। সেই হাসিটা ছিল নির্মল, নিস্পাপ, আর বৃষ্টির মতোই স্বতঃস্ফূর্ত। অরূপের মনে হলো, তার প্রতিটি শব্দ যেন হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু একই সঙ্গে সে চাইছিল মুহূর্তটা দীর্ঘ হোক। কথোপকথন এগোতে থাকল ছোট ছোট প্রশ্ন দিয়ে—কে কোথায় থাকে, কি করে, চা-কে কফির চেয়ে কেন বেশি পছন্দ করে। মেঘলা সংক্ষেপে উত্তর দিচ্ছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল খেলা করা কৌতূহল, আর প্রতিটি হাসি যেন অরূপের বুকের ভেতর ঢেউ তুলে যাচ্ছিল।
এই অল্প সময়েই তাদের মধ্যে এক সহজবোধ্য আরাম তৈরি হয়ে গেল। অরূপ খেয়াল করল, মেঘলা তার হাতের আঙুল দিয়ে কাপে আঁকিবুকি করছে, যেন সে চায়ের ধোঁয়ার ভেতর গল্প লিখছে। আর মেঘলা খেয়াল করল, অরূপের খাতার কোণে অসমাপ্ত কিছু শব্দ পড়ে আছে, যেগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে সে লেখকসুলভ এক আত্মা। দুজনের কথোপকথনে কোনো ভারীতা ছিল না, বরং হালকা খুনসুটি আর নীরবতার ফাঁকে জন্ম নেয়া বোঝাপড়া। তবুও অদৃশ্য এক সীমানা ছিল—তারা দুজনেই অনুভব করছিল যে এই পরিচয় কেবল বৃষ্টির দিনেই সীমাবদ্ধ। যেন এই দোকান, এই বৃষ্টি আর এই মুহূর্তই তাদের সম্পর্কের একমাত্র ঠিকানা। বাইরে রোদ উঠলে বা আকাশ পরিষ্কার হলে হয়তো তারা আবার নিজেদের পৃথিবীতে ফিরে যাবে। কিন্তু এই ভেজা দিনে, চায়ের কাপে ধোঁয়া আর বৃষ্টির সুরে তারা নিজেদেরকে এক অদৃশ্য বাঁধনে আবদ্ধ করে ফেলছিল।
বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছিল, দোকানের বাইরে ভিজে গলি আর আলো-আঁধারিতে ঝিকমিক করছিল। অরূপ আর মেঘলা চুপচাপ সেই দৃশ্য দেখছিল, মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। কথার প্রয়োজন ছিল না, কারণ দুজনেই বুঝতে পারছিল—তাদের এই দেখা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটা যেন ভাগ্যের অদৃশ্য খেলা, যা কেবল বর্ষার দিনেই তাদেরকে একত্রিত করে। অরূপ ভাবছিল, হয়তো এই সম্পর্ক কোনো নাম পাবে না, হয়তো কোনো ভবিষ্যৎও নয়। কিন্তু এই মুহূর্ত, এই পরিচয়ের ছোঁয়া, তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় লিখে দিচ্ছে। মেঘলার ঠোঁটে তখনো এক হালকা হাসি খেলে যাচ্ছিল, যা যেন অরূপের খাতার ফাঁকা পাতাগুলো ভরিয়ে তুলছিল অদেখা শব্দে। দোকানের ভেতর আলো একটু ম্লান হয়ে এলো, বাইরে বজ্রপাত আকাশ ছিঁড়ে সাদা আলো ছড়াল, আর সেই মুহূর্তে তাদের চোখ আবারও এক হলো—একটি নীরব প্রতিশ্রুতি নিয়ে, যা কেবল বৃষ্টির দিনেই বাঁচবে।
৩
চায়ের দোকানের ভেতরের পরিবেশ যেন প্রতিদিনই বৃষ্টির সঙ্গে নতুন করে জন্ম নিত। টিনের চাল থেকে জল পড়ার টুপটাপ শব্দ, ভিজে কাঠের গন্ধ, আর কাপে ভেসে ওঠা ধোঁয়ার আড়ালে সময় যেন ধীর হয়ে যেত। দোকানের মালিক হরিপদ কাকা, যিনি বহু বছর ধরে একই জায়গায় চা বানিয়ে আসছেন, দুই তরুণ-তরুণীর দিকে একবার তাকিয়ে হেসে বললেন, “বাবু, বৃষ্টির দিনে চা আর গল্প—এই দুটোই মানুষকে বন্ধু বানায়।” মেঘলা হালকা হেসে কাকাকে ধন্যবাদ জানাল, আর অরূপ মাথা নিচু করে খাতার কোণে আঁকিবুকি করতে লাগল। আসলে তারা দুজনেই ভেতরে ভেতরে বুঝতে পারছিল, এই দোকানের অদ্ভুত উষ্ণতা না থাকলে হয়তো তাদের মধ্যে এই নৈকট্যও গড়ে উঠত না। হরিপদ কাকার গল্পে বারবার উঠে আসত তার যৌবনের দিন, যখন তিনিও নাকি প্রেমে পড়েছিলেন এক বৃষ্টির দুপুরে। সেইসব স্মৃতি শুনে অরূপ আর মেঘলা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলত, যেন হরিপদ কাকার গল্পে তারা নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাচ্ছিল।
ধীরে ধীরে আলাপের বিষয়বস্তু বদলাতে শুরু করল। অরূপ বলল, ছোটবেলা থেকে বৃষ্টিকে সে কতটা ভালোবাসে, কারণ বৃষ্টি তাকে লেখার অনুপ্রেরণা দেয়। খাতার পাতায় অসমাপ্ত কবিতার ছন্দগুলো মেঘলা দেখতে পেল, আর সে অবাক হয়ে বলল, “তুমি তাহলে কবি?” অরূপ হেসে উত্তর দিল, “কবি না, চেষ্টা করি কেবল।” সেই উত্তর শুনে মেঘলার চোখে ঝিলিক দেখা গেল। সে বলল, “আমি ছোটবেলায় আঁকতে ভালোবাসতাম। এখনো মাঝে মাঝে তুলির টান দিয়ে মনে হয় যেন বৃষ্টির রঙ ক্যানভাসে বন্দী করছি।” কথার স্রোতে তারা আবিষ্কার করল—তাদের দুজনের স্বপ্নই সৃজনশীলতা আর অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অরূপ লিখতে চায়, মেঘলা আঁকতে চায়। সেই মুহূর্তে তাদের মনে হলো, বৃষ্টি যেন তাদেরকে এক অভিন্ন রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছে, যেখানে শব্দ আর রঙ মিশে এক হয়ে যায়।
আড্ডার ফাঁকে একদিন হরিপদ কাকা তাদের প্রশ্ন করলেন, “তোমাদের পছন্দের রঙ কী?” প্রশ্নটা সাধারণ হলেও তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল গভীরতা। অরূপ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “নীল—কারণ আকাশ, সমুদ্র, আর বৃষ্টি—সবই নীলের ভেতর লুকিয়ে থাকে।” মেঘলা একটু হাসল, তারপর উত্তর দিল, “সবুজ। কারণ সবুজ মানে জীবন, মানে বৃষ্টির পর নতুন করে জন্ম নেওয়া পাতা।” তারা দুজনেই বুঝতে পারল, তাদের রঙ আলাদা হলেও একে অপরকে সম্পূর্ণ করে। নীলের আকাশ যদি না থাকে, সবুজের জীবন রঙিন হয় না; আবার সবুজ ছাড়া নীলের বিস্তারও যেন নির্জন লাগে। এই ছোট ছোট স্বীকারোক্তিই তাদের সম্পর্কে নতুন গভীরতা এনে দিল। দুজনেই অনুভব করল, তাদের চিন্তা, অনুভূতি, আর স্বপ্নগুলো এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা হয়ে যাচ্ছে।
দিন কেটে যাচ্ছিল, আর প্রত্যেক বৃষ্টির দিনে চায়ের দোকান তাদের জন্য হয়ে উঠছিল এক বিশেষ আশ্রয়। অরূপ মেঘলার সামনে নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো খুলে ধরতে শুরু করল—একদিন বই ছাপানোর আশা, কিংবা দূরের পাহাড়ে বসে লেখার স্বপ্ন। মেঘলাও ভাগ করল তার ভয় আর দ্বিধা—কীভাবে পরিবার তাকে প্রায়ই বাস্তবের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়, অথচ তার হৃদয় সবসময় ছুটে যায় রঙ-তুলির দিকে। চায়ের দোকানের ভেতরে তাদের কথোপকথন যত গভীর হচ্ছিল, ততই তারা নিজেদেরকে নতুন করে চিনতে পারছিল। বাইরে বৃষ্টি ঝরছিল অঝোর, অথচ ভেতরে দুটো হৃদয় আস্তে আস্তে কাছাকাছি আসছিল, এমনভাবে যে তারা বুঝতেও পারছিল না—চায়ের কাপের ধোঁয়া, বৃষ্টির ফোঁটা আর দোকানের গল্পের আড়ালে তাদের সম্পর্ক ইতিমধ্যেই গভীর বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেছে।
৪
ছাদের তলার ছোট করিডোরটি, যেখানে বৃষ্টি শুরুর আগেই তাদের পায়ের ধুলো মুছে ফেলার মতো শান্তি মেখে দেয়, সেই বিকেলেই অরূপ ও মেঘলা বসে ছিল। বাইরে আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, আর বৃষ্টি নামছিল যেন আকাশ থেকে ধুয়ে দেওয়া জল তাদের শহরের রঙ মুছে দিতে চাইছে। করিডোরের দেয়ালে পানি পড়ার শব্দে যেন প্রকৃতির নিজের হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছিল। অরূপ প্রথমে চুপচাপ ছিল, কিন্তু মেঘলার চোখে যে কৌতূহল আর সততার ঝিলমিল, তা তার অজান্তেই তাকে ভেতরের কথা খোলার প্রলুব্ধ করেছিল। অরূপ ধীরে ধীরে তার কণ্ঠে অতীতের সেই ক্ষতচিহ্ন তুলে ধরতে শুরু করল, যা সে বহু বছর ধরে নিজের মধ্যে গুঁজে রেখেছিল। মেঘলা নীরবে শুনছিল, কখনও কখনও মাথা হেলিয়ে, কখনও হাত দিয়ে হালকা করে তার কব্জি স্পর্শ করে যেন বোঝাতে চায়, সে একাই নয়।
বৃষ্টির শব্দ ক্রমশ বাড়ছিল, কখনও ছাদে কড়া ধাক্কা দিয়ে, কখনও করিডোরের পাথরে পড়ে ছোট ছোট ঝরনার মতো হয়ে। অরূপ বলছিল, “যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার বাবা মারা গেলে ঘরটা একদম খালি মনে হতো। মনে হতো পৃথিবী আমার জন্যই থেমে গেছে।” তার কণ্ঠে যে নীরবতা এবং হাহাকার, তা মেঘলার হৃদয়ে সরাসরি ঢুকে যাচ্ছিল। সে নিজেও ছোটবেলার ভয়, মা-বাবার অনুপস্থিতি এবং স্কুলে বঞ্চিত হওয়া মুহূর্তগুলো মনে করল। অরূপের ব্যথা যেন তার নিজের সাথে মিলেছিল। আর এই মিলন কেবল শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাদের মধ্যকার দূরত্ব কেটে গিয়েছিল। সে বুঝল, কখনও কখনও মানুষের ব্যথা শুনলে, তা নিজেরও হয়ে যায়।
তারপর মেঘলা, অরূপের চোখের দিকে তাকিয়ে, তার গোপন স্বপ্নের কথা খুলে দিল। “আমার স্বপ্ন,” সে বলল, “আমি চেয়েছি, এমন একটি জায়গায় থাকতে যেখানে মানুষ শুধু নিজের কথা ভাববে না, বরং একে অপরের অনুভূতি বুঝবে। যেখানে প্রতিটি মানুষ জানবে, যে আমরা সবাই কখনও কখনও ভেঙে পড়ি, এবং তবুও আবার উঠে দাঁড়াই।” তার চোখে সেই অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, যা অরূপকে আকৃষ্ট করল। তিনি বোঝালেন, স্বপ্ন মানে কেবল ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা নয়, এটি হলো সেই অদৃশ্য ধ্বনি, যা আমাদের আজকের মুহূর্তের সাথে যুক্ত করে। বৃষ্টির ফোঁটা যেন তাদের কথার সঙ্গে ছন্দ মিলাচ্ছিল, প্রতিটি শব্দকে হালকা করে ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
শেষে, তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। করিডোরে ভেজা মেঝে এবং বাতাসে ভেসে আসা ভিজে চুপচাপের মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি বিরাজ করছিল। অরূপ বুঝতে পারল, মেঘলার সঙ্গে এই সংযোগ তার দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতার অন্ধকারকে কিছুটা আলোকিত করে দিল। মেঘলা অনুভব করল, কখনও কখনও মানুষের সাথে এমন নির্দিষ্ট মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হতে পারে। তারা দুজনেই জানত, এই সম্পর্ক এখন শুধু বন্ধুত্ব নয়; এটি এক অদৃশ্য বিশ্বাসের বন্ধন, যা ব্যথা, স্মৃতি এবং স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বৃষ্টি চলতে চলতে কমল, কিন্তু তাদের অন্তরের অনুভূতি সেই জলছাপের মতো, চিরকালীন ছায়া ফেলে গেল। করিডোরের ছোট স্থানটি তাদের জন্য একটি বিশ্ব হয়ে উঠেছিল, যেখানে অতীতের ব্যথা এবং ভবিষ্যতের আশার মিশ্রণ এক অনন্য সুরে বাজছিল।
৫
বৃষ্টি সেইদিন এতটাই ভীষণ ছিল যে শহরের রাস্তাগুলো নদীর মতো হয়ে উঠেছিল। ঝড়ের গর্জন ও বাতাসের তীব্র স্রোত করিডোরের দরজা-জানালার কাঁচগুলোতে আঘাত করলে ভেতরে বসা মানুষদের মনটা কেমন করে কাঁপিয়ে তুলছিল। অরূপ ও মেঘলা ঠিক সেই করিডোরের এক কোণে বসেছিল, যেখানে বাইরে ঝড়ের আভাস ভেতরে আসছিল। মেঘলার চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি, আর অরূপের মুখে সেই শান্ত, কিন্তু অপ্রকাশিত উত্তেজনা, যা সবসময়ই তার ব্যক্তিত্বে লুকিয়ে থাকে। হঠাৎ, মেঘলা অরূপের দিকে তাকাল, এবং সে দেখতে পেল যে তার চোখ শুধু ভিজে নয়, বরং অদ্ভুতভাবে উজ্জ্বল। সেই মুহূর্তে ঝড়ের শব্দ যেন পিছনে চলে গিয়েছিল, এবং কেবল তাদের দুজনের নিঃশ্বাস ও হৃদস্পন্দনই করিডোরের বায়ুতে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
মেঘলা ধীরে ধীরে বলল, “অরূপ, আমি… আমি তোমার সঙ্গে থাকতে চাই, কেবল বন্ধু হিসেবে নয়।” তার কণ্ঠ হালকা কাঁপছিল, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা ছিল। অরূপ প্রথমে কিছুটা হতবাক হল, কারণ সে ভাবত না যে মেঘলা এতটা সাহসী হয়ে তার অনুভূতি খুলে দেখাবে। তবে কিছুটা সময়ের পর সে নিজেই অনুভব করল, তার হৃদয়ে মেঘলার জন্য যে বিশেষ আকর্ষণ লুকানো ছিল, সেটি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অরূপ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, এবং তার কণ্ঠে অদ্ভুত নরমতা ছড়িয়ে পড়ল। “আমিও,” সে বলল, “আমি জানতাম না কিভাবে বলব, কিন্তু তোমার কাছে, সব সময়, আমি নিজেকে বিশেষ মনে করি।” তাদের চোখের দিকে চোখ রেখে কথাগুলো শোনার সময়, যেন করিডোরের দেওয়ালগুলো একরকম উজ্জ্বল হয়ে উঠল, এবং ঝড়ের শব্দও যেন হঠাৎ থেমে গেল।
ঝড়ের মধ্যে তাদের নীরবতা ছিল সমৃদ্ধ। তারা বুঝতে পারছিল, এই প্রথম স্বীকারোক্তি শুধুই একটি বাক্য নয়; এটি ছিল একটি নতুন সম্পর্কের সূচনা। অরূপ হাত বাড়াল, এবং মেঘলা তার হাত নিল, দুজনের আঙুল ধীরে ধীরে মিলল। এই সংযোগ ছিল এতটা সূক্ষ্ম, যে কেউ যদি পাশ দিয়ে যায়, তা সহজে লক্ষ্য করতে পারত না। কিন্তু তাদের জন্য এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তারা দুজনেই জানত, এখন থেকে তাদের হৃদয় একে অপরের প্রতি আরও খোলা হবে, আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। মেঘলা হেসে বলল, “বৃষ্টি কখনও কখনও শুধু জল নয়, অনুভূতিরও প্রতিফলন।” অরূপের চোখে সেই হাসির প্রতিফলন পড়ল, এবং সে বুঝল যে, মেঘলার সাথে তার সম্পর্ক শুধু আগের মতো বন্ধুত্ব নয়; এটি এক নতুন স্তরে পৌঁছে গেছে, যেখানে অনুভূতি, স্নেহ এবং আকর্ষণ একত্রিত হয়েছে।
বৃষ্টির থামার পরও, তাদের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে, তা করিডোরের নীরবতায় বাজতে লাগল। তারা দুজনেই চুপচাপ বসে ছিল, কিন্তু একে অপরের কাছাকাছি থাকার অনুভূতি ছিল স্পষ্ট। অরূপ বুঝতে পারল, কখনও কখনও কথার চেয়ে সংযোগের নিঃশব্দতা আরও গভীর। মেঘলা অনুভব করল, যে এই মুহূর্তটি তাদের জীবনের একটি অমোঘ স্মৃতি হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে ঝড় থেমে গেল, আকাশের মাঝে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তাদের হৃদয়ে সেই প্রথম স্বীকারোক্তির উষ্ণতা চিরকাল প্রবাহিত থাকল। করিডোরের ছোট স্থানটি তাদের জন্য আর শুধুই একটি স্থান ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল তাদের আবেগের প্রতীক, যেখানে প্রথমবার তারা নিজেকে একে অপরের কাছে পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে পারল, এবং সেই উন্মুক্ততা থেকে জন্ম নিল নতুন সম্পর্কের সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী বন্ধন।
৬
বৃষ্টির পরের দিনগুলো ছিল অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ, কিন্তু অরূপের জীবন একেবারে তীব্র গতিতে চলছিল। অফিসের চাপ, অনাবশ্যক মিটিং, ডেডলাইন এবং কর্মচারীদের জটিলতা তার মন প্রায় পুরোপুরি দখল করে ফেলেছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কম্পিউটার স্ক্রিনের নীল আলোতে আটকে থাকা অরূপকে মনে হচ্ছিল, যেন তার জীবনের ঘণ্টা হাতে নেই। সে চেষ্টা করলেও মেঘলার সাথে সময় কাটানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। মেঘলা, অন্যদিকে, তার পরিবারিক বাধার মুখোমুখি হয়ে ছিল। তার মা-বাবা চাইতেন, মেঘলা যেন “সঠিক সময়ে” এবং “সঠিক ব্যক্তির” সাথে জীবন শুরু করে, এবং তারা অরূপকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। এই বাস্তবতার চাপ দুজনের মধ্যকার সম্পর্কের সেতুটি হঠাৎ করে দুর্বল করে তুলছিল।
একদিন, অরূপ অফিস থেকে দেরিতে ফিরে আসার সময় মেঘলা ঠিক করেছিল তার সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু অরূপ ফোনের বার্তা পেয়েও দেরি হয়ে গিয়েছিল, আর মেঘলার পরিবারের বাধার কারণে সে বাইরে আসতে পারল না। মেঘলা হতাশ হয়ে চুপচাপ বসে রইল, এবং তার মনে অজানা ভয় জন্ম নিল—অরূপ হয়তো তার অনুভূতিগুলোর গুরুত্ব বোঝে না। অন্যদিকে, অরূপ নিজেকে দোষী মনে করছিল, কিন্তু কাজের চাপ এবং দফার পর দফা বাধ্যতায় সে মেঘলার জন্য সময় বের করতে পারছিল না। এই দূরত্ব তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি করছিল, যা খুব ধীরে ধীরে, কিন্তু স্থায়ীভাবে তাদের সম্পর্কের উষ্ণতাকে কমিয়ে দিচ্ছিল।
ভুল বোঝাবুঝিও তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ল। একবার মেঘলা অরূপকে ফোন করেছিল, কিন্তু তিনি খুব ক্লান্ত অবস্থায় ফোন ধরলেন না। মেঘলা ভেবেছিল, “তিনি কি সত্যিই চাইছেন না আমার সঙ্গে কথা বলতে?” অন্যদিকে, অরূপ মনে মনে ভাবছিল, “মেঘলা কি বুঝবে না আমি কতটা ব্যস্ত?” এই এক মুহূর্তের ছোট ভুল বোঝাবুঝি তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিল। তারা দুজনেই জানত যে তাদের হৃদয় এখনও একে অপরের দিকে আছে, কিন্তু সময় এবং পরিস্থিতি যেন তাদের সম্পর্কের রং কিছুটা ম্লান করে দিচ্ছিল। দুজনের মনেই ছিল অদ্ভুত এক খামখেয়ালিপনা—চোখে চোখ রেখে কথা বলার অভাব, এবং একে অপরের উপস্থিতি অনুভবের জন্য ছোট ছোট সুযোগের অপেক্ষা।
সময় এগিয়ে গেলেও দূরত্ব এবং বিভ্রান্তি তাদের সম্পর্ককে পরীক্ষা করতে লাগল। তারা দুজনেই একে অপরকে ভুল বোঝার চক্রান্তে পড়ছিল না, বরং জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছিল। অরূপ বুঝল, কখনও কখনও ভালোবাসা থাকা যথেষ্ট নয়; এটি সমঝোতা, সময়ের হিসাব, এবং পরিস্থিতি মোকাবেলার সাহসও চায়। মেঘলা অনুভব করল, যে প্রেম মানেই শুধু অনুভূতি নয়, এটি ধৈর্য এবং অপেক্ষারও নাম। তাদের ছোট করিডোরের স্মৃতি, বৃষ্টির স্মৃতি এবং প্রথম স্বীকারোক্তির উষ্ণতা এখন যেন দূরের আলো হয়ে গেছে, যা প্রতিদিনের ব্যস্ততা এবং পরিবারের চাপের মধ্যে ঝলমল করছে। এই অধ্যায়ের শেষে, তারা দুজনেই জানল—যতই দূরত্ব এবং বিভ্রান্তি বাড়ুক, তাদের সংযোগ এখনো টিকে আছে, কিন্তু এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার জন্য ধৈর্য এবং সমঝোতার পরীক্ষা দিতে হবে।
৭
কয়েক সপ্তাহ ধরে আকাশ ছিল পরিষ্কার, কিন্তু তার মধ্যে যেন অদ্ভুত শূন্যতা লুকিয়ে ছিল। বৃষ্টি নামেনি, আর সেই শূন্যতা অরূপ ও মেঘলার মধ্যে গভীর হয়ে উঠেছে। তারা দুজনেই ব্যস্ত ছিল নিজের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টায়, কিন্তু মনে হচ্ছিল—যে নীরবতা তাদের চারপাশে ভেসে আসছে, তা কেবল প্রকৃতিরই নয়; তাদের সম্পর্কের মধ্যেও অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে গেছে। অরূপ সকালে অফিসের দফার পর ঘরে ফিরে খালি অনুভব করছিল, যেন তার হৃদয় কিছুটা ফাঁকা। মেঘলা, অন্যদিকে, তার পরিবারের চাপ এবং নিজের স্বপ্নের মধ্যে লড়াই করছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল—কেউ নেই যার সঙ্গে সে নিজের অনুভূতি ভাগ করতে পারে। এই শূন্যতা, এই নিঃশব্দতার মধ্যে, তারা দুজনেই অতীতের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করল।
একদিন, অরূপ তার পুরনো ডায়েরি খুলে দেখল। ডায়েরিতে লেখা ছোট ছোট নোট, করিডোরে বৃষ্টির দিনে লেখা মুহূর্ত, মেঘলার হাসি এবং তাদের চোখের কণ্ঠ—সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারল, শূন্যতা শুধুই সময় এবং দূরত্বের নয়; এটি এক ধরনের আত্ম-উপেক্ষা এবং সম্পর্ককে মূল্যায়ন করার সুযোগও। মেঘলাও তার কক্ষে বসে পুরনো ছবি, চিঠি এবং ছোট ছোট স্মৃতি পড়ছিল। সে অনুভব করল, এই নীরবতা তার অনুভূতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে—যে অরূপ কেবল বন্ধু নয়, বরং তার জীবনের অদৃশ্য অংশ। তারা দুজনেই জানল, এই সময়টি ব্যর্থতা নয়; এটি এমন এক সময়, যেখানে তারা নিজেরা এবং একে অপরকে গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পাচ্ছে।
নীরবতার এই অধ্যায়ে, অরূপ নিজেকে প্রশ্ন করল—কেন সে সবসময় ব্যস্ত থাকে? কেন তার হৃদয় মেঘলার দিকে এতটা টান অনুভব করে, কিন্তু সে প্রকাশ করতে পারে না? মেঘলা ওর দিকে তাকিয়ে চিন্তায় ডুবে গেল, এবং অনুভব করল—কতটা গভীরভাবে সে অরূপের প্রতি সংযুক্ত। তারা দুজনেই বুঝল, প্রেমের কোনো সংজ্ঞা কেবল মুহূর্তের উষ্ণতা নয়; এটি হলো একে অপরকে বুঝতে চাওয়া, শূন্যতার মধ্যে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা, এবং স্মৃতির সাহায্যে সম্পর্কের গভীরতাকে পরিমাপ করা। তারা একে অপরের অনুপস্থিতি অনুভব করলেও, স্মৃতির আলো তাদের পথ দেখাচ্ছিল।
শেষে, অরূপ ও মেঘলা দুজনেই চুপচাপ বসে স্মৃতির পাতা উল্টাচ্ছিল। করিডোরের ছোট বাতি, জানালার কাচে পড়া সূর্যরশ্মি, পুরনো বৃষ্টির স্মৃতি—সবকিছু যেন নীরবতায় একে অপরের প্রতি আকর্ষণ ও অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছিল। তারা বুঝল, এই বৃষ্টিহীন সময় তাদের সম্পর্ককে দুর্বল করেছে না, বরং গভীর করেছে। অরূপের মন এবং মেঘলার হৃদয় এখন এক অদৃশ্য সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত, যা সময়, দূরত্ব এবং নীরবতার মধ্যে আরও দৃঢ় হয়েছে। বৃষ্টি আসুক বা না আসুক, স্মৃতি তাদের আবেগকে জীবন্ত রেখেছে, এবং শূন্যতার মাঝেও তারা একে অপরকে আরও স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পেরেছে।
৮
বর্ষার আগমন সেই সকালে শহরের রাস্তায় নতুন জীবন বয়ে এনেছিল। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, আকাশে কালো মেঘের ঘনত্ব, এবং দূরের গর্জন—সবকিছু যেন এক অদ্ভুত উত্সবের আভাস দিচ্ছিল। অরূপ কর্পোরেট অফিসের ব্যস্ততা সামলে অবশেষে সেই চায়ের দোকানের দিকে চলল, যেখানে কয়েক সপ্তাহ আগে মেঘলার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। চায়ের দোকানটি একই রকম ছোট, কিন্তু আজকের দিনের আলোতে এটি যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। জানালার পাশে ছোট টেবিলটি, যেখানে তারা প্রথম স্বীকারোক্তি করেছিল, আজও সেই অবস্থায় ছিল। বাইরে ঝড়ের ফোঁটা কাঁচের ওপর পড়ছিল, আর ভেতরে বসে থাকা মানুষজনের মুখে হালকা হাসি—সবকিছু যেন তাদের মিলনের জন্য অপেক্ষা করছে।
মেঘলা ইতিমধ্যে সেই টেবিলে বসে ছিল। তার চুল ভিজে গেছে, কিন্তু চোখে যে উজ্জ্বলতা, তা অরূপকে মুহূর্তেই আকৃষ্ট করল। তাদের চোখ একে অপরের দিকে পড়তেই, করিডোরের নিঃশব্দতা যেন এক মুহূর্তে গলে গেল। অরূপ ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগোল, আর মেঘলা হাসল, ছোট্ট লাজুক হাসি, যা তার পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রাকৃতিকভাবে প্রকাশ করল। চায়ের কাপ দুজনের সামনে রাখা হলো, বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ এবং দোকানের ছোট ছোট আওয়াজ তাদের সংলাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে যেন একটি নীরব সুর তৈরি করল। তারা দুজনেই জানল, কয়েক সপ্তাহের দূরত্ব, বিভ্রান্তি এবং নীরবতা শেষ হয়ে গেছে, আর আজ তাদের সম্পর্ক পুনর্জীবিত হবে।
চায়ের গরম কাপ হাতে নিয়ে তারা চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। অরূপ বলল, “বৃষ্টি ফেরার মতো, আমাদের সম্পর্কও ফিরে এসেছে।” মেঘলার চোখে আনন্দ ও সান্ত্বনার এক অদ্ভুত মিলন দেখা গেল। তারা দুজনেই জানত, এই ছোট্ট মুহূর্তটি কেবল একটি মিলন নয়, এটি ছিল তাদের অনুভূতি পুনর্নবীকরণের প্রতীক। তাদের হাসি, চোখের যোগাযোগ, আর ছোট ছোট কথা—সবকিছু মিলিত হয়ে সম্পর্কের অদৃশ্য দাগগুলো আরও দৃঢ় করল। তারা বুঝল, কখনও কখনও জীবনের দূরত্ব এবং বিভ্রান্তি সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে, এবং আজ সেই শক্তি তাদের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বৃষ্টি ক্রমশ বাড়তে লাগল, কিন্তু তাদের মন শান্ত ছিল। চায়ের দোকানের জানালা দিয়ে ভিজে থাকা রাস্তায় ফোঁটার ধারা চলছিল, আর তারা দুজনেই হাত ধরাধরি করে বসে ছিল। ছোট ছোট হাসি, চায়ের কাপের ধোঁয়া, এবং ঝড়ের মৃদু গর্জন—সবকিছু যেন তাদের সম্পর্কের পুনর্জন্মের সাক্ষী। তারা জানল, এই মিলন শুধুই বাহ্যিক নয়; এটি অন্তরের গভীর সংযোগের উন্মোচন। বর্ষার এই দিন তাদের জীবনকে নতুনভাবে আলোকিত করল, এবং তাদের হৃদয়ে সেই প্রাপ্তির উষ্ণতা চিরকাল প্রবাহিত হবে।
৯
বর্ষার পরের দিনগুলো অরূপ ও মেঘলার জীবনে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এলো। অরূপের কোম্পানি তাকে অন্য শহরে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিল, একটি পদক্ষেপ যা তার পেশাগত জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য বিপজ্জনক ছিল। একদিকে তার ক্যারিয়ার, অন্যদিকে মেঘলার সঙ্গে সম্পর্ক—এই দ্বন্দ্ব তার মনে অদ্ভুত চাপ তৈরি করল। মেঘলার পরিবারের পক্ষ থেকেও চাপ বাড়তে লাগল। তার মা-বাবা চাইছিল, মেঘলা যেন অরূপের সঙ্গে সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হওয়ার আগে জীবন ও কাজের সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোয়। দুজনের মধ্যকার দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছিল, এবং তারা অনুভব করছিল, এখন তাদের সম্পর্ক শুধুই অনুভূতির ওপর নির্ভর করতে পারবে না; এটিকে বাস্তব জীবনের পরীক্ষাও দিতে হবে।
এক বিকেলে তারা ছোট করিডোরে বসে দীর্ঘক্ষণ কথা বলল। অরূপ বলল, “আমি জানি এই স্থানান্তর আমাদের জন্য কঠিন হতে পারে। কিন্তু আমি চাই সবকিছু পরিষ্কারভাবে ভাবা হোক।” মেঘলা চুপচাপ শুনছিল, এবং তার চোখে মিশ্রিত হতাশা ও দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারা দুজনেই জানত, প্রেম শুধুমাত্র অনুভূতির শক্তি নয়; এটি সমঝোতা, পরিকল্পনা এবং পরস্পরের স্বপ্ন ও বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা চায়। অরূপ বোঝাতে চাইল যে, কাজের স্থানান্তর তার জীবনের একটি বড় অংশ, কিন্তু মেঘলার জন্য সে কতটা গুরুত্ব দেয়, তা সে নীরবভাবে প্রকাশ করল। মেঘলাও বুঝল যে, সত্যিকারের সম্পর্ক মানে শুধু ভালোবাসা নয়, বরং জীবন ও পরিস্থিতি মোকাবেলার একসাথে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে তারা দুজনেই নিজেদের ভাবনা এবং প্রয়োজনের দিকে মনোযোগ দিল। মেঘলা তার পরিবারকে বোঝাতে লাগল, যে অরূপের সঙ্গে সম্পর্ক তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এবং সে তার জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে চায় যেন দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া থাকে। অরূপও তার অফিসের দায়িত্ব এবং স্থানান্তরের প্রস্তাব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করল। ভুল বোঝাবুঝি এবং ছোট ছোট দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে তারা দুজনেই শিখল, সম্পর্কের মূল পরীক্ষা কখনও অনুভূতি নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন। এই সময় তাদের মধ্যে গভীর আস্থা তৈরি হল—যা কেবল শব্দে নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত।
শেষে, তারা দুজনেই একটি কঠিন কিন্তু স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছল। অরূপ স্থানান্তর গ্রহণ করল, কিন্তু মেঘলার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য পরিকল্পনা করল। মেঘলা তার পরিবারের কাছে তার অবস্থান স্পষ্ট করল, এবং দুজনেই জানল, প্রেম শুধু অনুভূতি নয়, এটি প্রতিশ্রুতি, সমঝোতা এবং ধৈর্যের পরীক্ষার নাম। ঝড়, বৃষ্টি, দূরত্ব, বিভ্রান্তি—সব কিছু মিলিত হয়ে তাদের সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে। তারা চেয়েছিল, এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যে বোঝাপড়া এসেছে, তা চিরকাল ধরে রাখবে। সেই সন্ধ্যায়, তারা করিডোরের ছোট্ট টেবিলে বসে একে অপরের হাতে হাত রেখে, নীরবভাবে জানল—যত বড় পরীক্ষা আসুক, তাদের সম্পর্ক স্থায়ী হবে, কারণ তারা একে অপরকে শুধুই ভালোবাসে না, বরং একে অপরের জন্য জীবনকে মানিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে।
১০
বর্ষার শেষদিনগুলিতে শহর যেন এক অদ্ভুত নীরবতা ও উজ্জ্বলতার মধ্যে ডুবে ছিল। বৃষ্টি পড়ছিল ধীরে ধীরে, কখনও ঝরঝর করে, কখনও মৃদু ফোঁটার মতো ভেজা চাদরে ছড়িয়ে। অরূপ এবং মেঘলা সেই সকালেই ছোট করিডোরের পাশে বসে ছিল, যেখানে বহু স্মৃতি তাদেরকে একত্র করেছে। তারা দুজনেই জানত, আজকের এই বৃষ্টি শুধু জল নয়; এটি তাদের সম্পর্কের প্রতিফলন, তাদের আবেগ, প্রত্যাশা, এবং পরীক্ষার সব স্মৃতি একত্র করে তৈরি হয়েছে একটি রঙিন পালক। অরূপ মেঘলার দিকে তাকাল, চোখে মিশ্রিত আশ্চর্যতা, আনন্দ এবং শান্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। মেঘলাও ধীরে ধীরে হেসে তাকাল, যেন বুঝে গেল যে প্রেমের প্রকৃত রঙ শুধু ঝড়ের মধ্যে নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষণিক মুহূর্তে ছড়িয়ে থাকে।
বৃষ্টির ফোঁটার শব্দের সঙ্গে তারা ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু করল। অরূপ বলল, “আমাদের সম্পর্কের প্রতিটি মুহূর্ত যেন বৃষ্টির মতো—কখনও ঝড়, কখনও হালকা ফোঁটা। কিন্তু সব মিলিয়ে, এগুলোই আমাদের জীবনকে রঙিন করেছে।” মেঘলা চোখ বন্ধ করে অনুভব করল, প্রতিটি ফোঁটা যেন তাদের আবেগকে আরও ঘন করে তুলছে। তারা দুজনেই জানল, প্রেম কেবল অনুভূতির জন্য নয়, বরং সংযোগ, বোঝাপড়া, এবং একে অপরের জন্য ধৈর্য ধরার জন্যও রঙ ছড়ায়। তারা মৃদু হাসি দিয়ে একে অপরের হাত ধরে বসল, এবং বৃষ্টির শব্দ যেন তাদের হৃদয়ের ছন্দের সাথে মিলিত হয়ে এক অসাধারণ সুর তৈরি করল।
এরপর তারা স্মৃতির পাতায় ফিরে গেল। করিডোরে বসে, বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচে পড়ছিল, আর তারা তাদের অতীতের মুহূর্তগুলো মনে করছিল। প্রথম স্বীকারোক্তি, বিভ্রান্তি, দূরত্ব, মিলন, এবং পরীক্ষা—সবকিছু মনে পড়ল। অরূপ বুঝল, প্রতিটি মুহূর্তই তাদের সম্পর্কের রঙ আরও সমৃদ্ধ করেছে। মেঘলা অনুভব করল, প্রেম মানে শুধু আনন্দ নয়; এটি হলো জীবনের সব অনুভূতির সঙ্গে মিশে যাওয়া—দুঃখ, অপেক্ষা, দূরত্ব এবং আবার মিলন। তারা দুজনেই বোঝল, রঙ শুধুমাত্র দৃশ্যের জন্য নয়; এটি অনুভূতি, প্রতিশ্রুতি এবং সংযোগের প্রতীক। বৃষ্টির এই মৃদু স্রোত তাদের আবেগকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে শব্দের চেয়ে অনুভূতির শক্তি বেশি ছিল।
শেষ মুহূর্তে, তারা দুজনেই করিডোরের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। শহর ভেজা, রাস্তার ধুলো ভেসে যাচ্ছে, এবং দূরে ধোঁয়াশা ভরা আলো যেন তাদের জন্য নতুন সূচনা নিয়ে এসেছে। অরূপ মেঘলার কানের কাছে বলল, “প্রেম কেবল ঝড়ের সময় নয়, প্রতিটি মুহূর্তেই রঙ ছড়াতে পারে। আজ আমরা সেটা বুঝেছি।” মেঘলা হাসল, আর তাদের চোখে ঝলমল করল সেই অদৃশ্য বৃষ্টির রঙ, যা শুধু আকাশে নয়, তাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। তারা ধীরে ধীরে হাত ধরে চায়ের দোকানের ছোট টেবিলে ফিরে এল, আর বৃষ্টি চলতে থাকল। এই অধ্যায়ের শেষে, গল্পটি হ্যাপি এন্ডে পৌঁছালো—বৃষ্টি শুধু জল নয়, তাদের জীবনের প্রতিটি অনুভূতিকে রঙিন করার প্রতীক হয়ে রইল, এবং তাদের আবেগ চূড়ান্তভাবে মিলিত হয়ে চিরকালীন সুখের প্রতিফলন হয়ে উঠল।
শেষ




