Bangla

বইয়ের পাতায় প্রেম

Spread the love

শ্রেয়সী হাজরা


পুরনো শহরের এক অলিন্দ গলির মোড়ে, যেখানে আধুনিকতার চমক-ঝলক কম, আর সময় যেন একটু ধীরে চলে, দাঁড়িয়ে আছে “অন্তরবাতি” নামের একটি পুরনো বইয়ের দোকান। দোকানটির কাঠের জানালা আর দরজা ছুঁয়ে গিয়েই মনে হয়, কেউ যেন ইতিহাসের পাতা উল্টাচ্ছে, যেখানে গাঁথা আছে নানা গল্প, অজানা স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া কথার ঢেউ। দোকানটির ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই একটা আলাদা গন্ধে মন ভরে যায়— পুরনো কাগজের গন্ধ, ধুলো-মাখা বইয়ের ছোঁয়া আর সেইসব পুরনো দিনের আবেগ। বছর কেটেছে অনেক, মানুষ এসেছে গেছে। কিন্তু এই দোকান যেন থেমে থাকে এক নিরব গানের সুরে। আজও এখানে এসে মিলিত হয় সেইসব প্রাণ, যাদের জীবনের একটা বড় অংশ জড়িয়ে আছে বইয়ের পাতায়।

অন্বেষা, বয়স মেরেই পঁইত্রিশ, হাতে ছোট্ট একটা ক্যানভাস ব্যাগ। তার চোখে ঝিলিক, আর মনটা যেন সদ্য ছোঁয়া পেয়েছে পুরনো কোন স্মৃতির। সে এই দোকানে আসার অনেক কারণ আছে, সবচেয়ে বড় কারণ— ভালো বইয়ের সন্ধান আর শান্তির খোঁজ। দোকানের কোণে, এক কিশোর থেকে তরুণ হয়ে ওঠা দীপক দাঁড়িয়ে আছে। গাঢ় কালো চুল, চোখে মায়ার একটা ছায়া। তার হাতে একটা হাফ-পুরানো কবিতার বই, যার পাতা ভাঁজ পড়া। সে এই দোকানের নিয়মিত আসা-যাওয়া, আর বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা অন্বেষার মতোই গভীর। অন্বেষা যখন দোকানের সামনের তাকের সামনে দাঁড়ায়, সে দেখে দীপক হাতে ধরে রেখেছে ‘রবার্ট ফ্রস্টের The Road Not Taken’ কবিতার বই।

“এই কবিতাটি পড়েছেন?” দীপক মৃদু হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল।

অন্বেষা অবাক হয়ে বলল, “অবশ্যই! আমার প্রিয় কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। একটা সময় এই কবিতা আমার জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।”

দীপকের চোখে সেই প্রশংসার আলোর ঝিলিক এল। “আমারও তাই। কবিতাগুলো জীবনের সেই হারিয়ে যাওয়া রাস্তা খুঁজে পেতে সাহায্য করে।”

এই কথাবার্তা থেকে তাদের মধ্যকার প্রথম সেতুটি তৈরি হলো। বইয়ের পাতায় লেখা শব্দগুলো তাদের মনের ভাবকে আকাশের তারার মতো একে অপরের সঙ্গে জোড়া দিল।অন্বেষা জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি নিয়মিত এই দোকানে আসেন?”

“হ্যাঁ, এই ‘অন্তরবাতি’ আমার দ্বিতীয় বাড়ি। বইয়ের সেসব পুরনো গল্পের মাঝে আমি হারিয়ে যাই,” দীপক বলল। “আপনিও তো এতো ভালো বই নিয়ে এসেছেন!”

অন্বেষা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “আমি সব সময় চেষ্টা করি এমন বইগুলো খুঁজে বের করতে যা হারিয়ে যাচ্ছে, যেগুলো পড়ে মনে হয় যেন জীবনের কোনো গভীর কথাই শুনছি।” দুজনেই একে অপরের বইয়ের পছন্দের কথা জানতে চাইল, কবিতা, উপন্যাস, প্রিয় লেখক আর এমনকি সাহিত্যকেন্দ্রিক ছোট ছোট অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে লাগল।

দীপক বলল, “বই আর কবিতার মাঝে যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, সেটা কোনো ভাষায় বোঝানো কঠিন। আপনি কি কখনো অনুভব করেছেন, বইয়ের পাতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা একটা ভালোবাসার মতো?”

অন্বেষা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল, “হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি যে বই আমাদের জীবনের সঙ্গী, আমাদের সময়ের সাক্ষী। আর সেই সাক্ষীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা হওয়া স্বাভাবিক।”

এরপর তাদের গল্পের গতি আরও বাড়তে লাগল। একদিন দীপক অন্বেষাকে বলল, “আমার বাবার সংগ্রহে একটা বিরল কবিতার সংকলন আছে, খুব কমই দেখা যায়। কি জানেন? সেই কবিতাগুলো পড়লে আপনি হয়তো আমাদের সময়ের থেকে অনেকটাই দূরে চলে যাবেন।”

অন্বেষার চোখ জ্বলে উঠল, “আমি চাই সেটা পড়তে। হারিয়ে যাওয়া কবিতা আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়।”

তারা দুজনেই একটি পুরনো চেয়ারে বসে একসঙ্গে কবিতার পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। দীপক উঠে এল একটি সোনালী বক্স, যেখানে বাবার লেখা পুরনো কাগজ আর কবিতা ছিল।

“শান্তনু,” দীপক মৃদু কণ্ঠে বলল, “আমার বাবার প্রিয় কবি। তার কবিতা এখনও বেশি পরিচিত না হলেও তার শব্দগুলো হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়।”

অন্বেষা মন দিয়ে শুনল, এবং পড়তে শুরু করল। ধীরে ধীরে তাদের মাঝে সেই কবিতার ছোঁয়া আর বইয়ের গন্ধের মাঝে ভালোবাসার অনুভূতি ফুটে উঠল।

একদিন অন্বেষা বলল, “আমারও একজন লেখক আছে, যাকে খুঁজে পেতে আমি সারাদিন চলাফেরা করি। তার লেখা বইগুলো খুবই বিরল, কিন্তু তার ভাবনার গভীরতা আমাকে বার বার আকৃষ্ট করে।”

দীপক বলল, “সত্যিই, আমাদের জীবনের অনেকটা ভাগ্যে যেমন কিছু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে, তেমনি হারিয়ে যাওয়া লেখক ও কবিতাও যেন জীবনের অন্য এক অধ্যায়।”

তাদের কথাবার্তায় ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের সঙ্গে জন্ম নিল এক নতুন ভালোবাসার সম্পর্ক। তারা একে অপরের জন্য হয়ে উঠল জীবনের সেই অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাকে বলা যায়— ‘বইয়ের পাতায় লেখা প্রেমের গল্প’।

এক বিকেলে, বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর তারা দোকানের বাইরে গিয়ে বসে পড়ল এক চায়ের দোকানে। দীপক বলল, “অন্বেষা, আপনি কি বিশ্বাস করেন, যে বইয়ের পাতায় লেখা ভালোবাসা জীবনের সমস্ত কষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারে?”

অন্বেষা নরম করে বলল, “হ্যাঁ, বই যেমন আমাদের জীবনের স্মৃতি ধরে রাখে, তেমনি ভালোবাসাও স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।”

তারপর দুজনেই একে অপরের চোখে তাকিয়ে চুপচাপ বসল। বইয়ের গল্পে আচ্ছন্ন তাদের হৃদয় যেন এক নতুন অধ্যায়ের পথে হাঁটতে শুরু করল।

এক রাত, দোকানের অন্ধকার কোণে বসে দীপক বলল, “অন্বেষা, আমি যখন এই বইগুলো পড়ি, তখন মনে হয় আমার জীবনের অনেক অজানা গল্প এখানে লুকিয়ে আছে।”

অন্বেষা বলল, “হয়তো আমাদের জীবনের কিছু স্মৃতি, কিছু ভালোবাসা এই বইয়ের পাতার মতোই, যা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় না।”

তারা দুজনেই বুঝতে পারল, তারা শুধু বন্ধু নয়, তারা একে অপরের জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠছে।সন্ধ্যার আলো ম্লান হলেও তাদের চোখে আগুন জ্বলে উঠেছিল— আগুন যা বইয়ের অক্ষরে লেখা প্রেমের রূপ। তারা জানত, তাদের এই সম্পর্ক শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব জীবনেও তারা একে অপরের সাথে থাকবে।

বইয়ের দোকান “অন্তরবাতি” আজও আছে, কোলাহলের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া শহরের সেই কোণে। আর সেখানে বসে থাকে দুই জন— অন্বেষা ও দীপক, যারা বইয়ের পাতায় নিজেদের গল্প খুঁজে পেয়েছে। তাদের প্রেমের গল্প লেখা আছে সেই পুরনো কবিতার পৃষ্ঠায়, হারিয়ে যাওয়া বইয়ের মাঝখানে, আর এক টুকরো কাগজের গন্ধে। তারা বিশ্বাস করে— ভালোবাসা যেমন হারিয়ে যায় না, ঠিক তেমনি বইয়ের পাতায় লেখা শব্দও হারায় না। একদিন হয়তো তাদের গল্প কেউ পড়বে, বইয়ের পাতায় পড়ে জীবনের নতুন রং খুঁজে পাবে।

 

আর এইভাবেই বইয়ের পাতায় লেখা প্রেমের গল্প চলে, সময়ের স্রোত পেরিয়ে, এক চিরন্তন গাথায় রূপ নেয়।

1000022501.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *