Posted in

প্রেমের ঢাক, পুজোর ধ্বনি

Spread the love

ঈশানী রায়চৌধুরী


পর্ব ১: আগমনী – ফিরে আসার দিন

কলকাতার শরৎকাল মানেই একটা নির্দিষ্ট গন্ধ—পাতাঝরার নিচে ধুলো মাখানো রোদ, মহালয়ার ভোরে ভেসে আসা চণ্ডীপাঠ, আর বাতাসে মিশে থাকা প্রস্তুতির গুঞ্জন। বনেদি বাড়ির আঙিনায় সেই প্রস্তুতির চিহ্ন আরও স্পষ্ট, আরও চেনা—গেটে ঝোলানো আলোকমালার তার, উঠোনে বাঁধা ঢাক, আর ঠাকুরদালানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরনো অশ্বত্থ গাছ, যার পাতা এখনও নিঃশব্দে কাঁপে।

এই সেই বাড়ি—গোবিন্দ রায়চৌধুরী লেনের রায়চৌধুরী বাড়ি, যেখানে দুর্গাপুজো মানে শুধু পূজা নয়, এক আত্মীয়তাসম্পন্ন নাট্যমঞ্চ, একটা মহাকাব্য, আর তার চরিত্রেরা—প্রাণময়। আর তাদেরই মধ্যে ছিল দু’টি চরিত্র, যারা বহু বছর আগে নিঃশব্দে পাতাছড়ানো মাঠে হেঁটেছিল পাশাপাশি—একজন ছিল মেয়ে, অন্যজন ছেলে, আর তাদের মধ্যে ছিল সেই পুরনো প্রেম, যা বলা হয়নি কখনও, শুধু রয়ে গিয়েছে উঠে-পড়া ঢেউয়ের মতো।

আজ, অনেক বছর বাদে, সেই ছেলেটি ফিরছে।

ট্যাক্সি থেমে যায় মুখার্জি মোড়ের ঠিক আগে, কারণ প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে রাস্তার দুই পাশে। সে ব্যাগটা হাতে নিয়ে নেমে পড়ে, কিছুটা হাঁটে, কিছুটা দম নেয়। শরতের ছায়ায় তার মুখে একটু ক্লান্তি, একটু কৌতূহল।

তার নাম অনির্বাণ। একসময় এই পাড়ার গলি গলি তার চেনা ছিল—তবু আজ পা চলতে চায় না। চারদিকে লাল-সাদা ঝান্ডা, বাউন্সারদের হুকুম, আর ছেলেপিলের হাসির ভেতরেও তার ভিতরে শুধু একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—”সে কেমন আছে?”

সে মানে—ঈশা।

ঈশা রায়চৌধুরী। ওই বনেদি বাড়ির ছোট নাতনি, যার চোখে ছিল অবাধ প্রশ্ন, আর যাকে ছেড়ে গিয়ে অনির্বাণ একদিন নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছিল।

“অ্যাই… অনির্বাণ?”

পেছন থেকে চিৎকারটা এল ঠিক সেই মুহূর্তে যখন সে পুরনো গেটটার সামনে দাঁড়িয়েছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে কৌশিকদা—ঈশার দাদা, ঢাক বাজানোর চিরন্তন প্রতিনিধি। তার চোখে একটু অবাক বিস্ময়, তারপর তাতে মিশে যায় খুশির আতিশয্য।

“তুই সত্যি আসলি?”

“হ্যাঁ, অনেকটা হুট করেই… বলছিলাম আসবো এতদিন, এইবার এলাম।“

কৌশিকদা তাকে জড়িয়ে ধরে। গেট খুলে দেয়। সে হাঁটে উঠোনের দিকে—পা টিপে টিপে যেন একটা পুরনো মঞ্চে ফিরে আসা, যেখানে চরিত্ররা এখনও অপেক্ষায় থাকে।

ঠাকুরদালানের সামনের লাল রঙের ইটগুলো এখনও সেইরকমই, শুধু ধূপের গন্ধে যেন বাড়তি ভার এসে পড়েছে। এক কোণে নেমে রাখা প্রতিমার কাঠামো—দাঁড়িয়ে আছে অসম্পূর্ণ চেহারায়, আর গায়ে ধুলোমাখা শাড়ির টুকরো। তার চোখে এক অদ্ভুত আতিথ্য, যেন বলছে—”তুমি ফিরে এসেছো। ঠিক সময়েই এসেছো।”

আর ঠিক তখনই, উঠোন পেরিয়ে ঠাকুরদালানের দিক থেকে হেঁটে এল সে। ঈশা।

সে এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে, অথচ বদলে গেছে সম্পূর্ণভাবে। পরনে তুলো শাড়ি, চোখে কাজল, হাতে চাবির গোছা। তার চুল বাঁধা, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, যেন সে ঠাকুরের ঘর সাজানো থেকে উঠে আসছে।

তাদের চোখাচোখি হয়।

না হাসি, না ভ্রুক্ষেপ—কেবল একটা নীরবতা নেমে আসে, যেটা এক সময় বলা হয়নি বলে এখনও জড়ানো।

“অনির্বাণ?”

তার স্বর একটানা নরম, জিজ্ঞাসু নয়, অভিযোগময়ও নয়—শুধু যেন নিশ্চিত হতে চাওয়া।

“হ্যাঁ… আমি এসেছি।”

ঈশা একটু মাথা হেঁট করে বলে, “জানি।”

তারপর কয়েক মুহূর্তের নিরবতা। পেছনে ঢাক বাজতে শুরু করেছে। প্রথম ঢাকের শব্দে শরীরটা কেঁপে ওঠে অনির্বাণের। এই সেই আওয়াজ, যা তাদের প্রেমের প্রথম সাক্ষী ছিল—ঈশার সিঁড়িতে বসে থাকা, তার চোখে অনির্বাণের তাকানো, আর পেছনে বাজতে থাকা ঢাক, যেন ঈশ্বর নিজেই মন্ত্রপাঠ করছেন।

“তুই এসেছিস ঠিক ষষ্ঠীর আগের দিন… ঠাকুর এখনও বরণ হয়নি, তবে আসরের লোকজন তো চলে এসেছে,” ঈশা বলে।

“তুই?” অনির্বাণ প্রশ্ন করে, নিজের মুখে সেই পুরনো সম্বোধন ফিরে আসায় অদ্ভুত শূন্যতা টের পায়।

ঈশা চোখ সরিয়ে নেয়। “এই বাড়িতে কেউ কাউকে আপনি করে না।”

অনির্বাণ চুপ করে যায়। তারা দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়ায়, ঠাকুরদালানটার পাশে।

“এই জায়গাটার গন্ধ এখনও বদলায়নি,” সে বলে।

“তাই তো? আমার তো মনে হয় প্রতিদিন পাল্টে যায়। প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে কিছু রেখে যায়—অভিমান, দুঃখ, উৎসাহ, পাড়ার গল্প… সব মিলিয়ে একটা ঘ্রাণ হয়।”

অনির্বাণ হাসে না, চমকেও না—শুধু চুপ করে শোনে।

ঈশা তখন বলে, “তুই কতদিন থাকবি?”

“সব দিন। দশমী অবধি।”

সে এবার তাকায়। ঈশার চোখে তখন অদ্ভুত একটা ভাব—না অভিমান, না খুশি, বরং এমন কিছু, যা অনির্বাণ ব্যাখ্যা করতে পারে না।

“ভালো,” ঈশা শুধু বলে। “ঠাকুরের মতো তুইও তো এবার ফিরলি, না?”

অনির্বাণ এবার একটু হেসে ফেলে।

“তবে কি আমিও বোধন হয়ে উঠলাম?”

“তা জানি না,” ঈশা পেছনে ফিরে হেঁটে যায়, “তবে এ বছর ঢাকটা একটু বেশি জোরে বাজছে—কারণ কেউ কেউ ফিরে আসে, আর কেউ কেউ না থেকেও থেকে যায়।”

বাতাসে ধুনুচির ধোঁয়া, পেঁপে পাতার গন্ধ, আর চিরচেনা সেই ঢাক—যার প্রতিটি আওয়াজে মিশে আছে একটা প্রেম, একটা অনুচ্চারিত ফিরে আসা।

 

পর্ব ২: ষষ্ঠীর ছায়া – পুরোনো উঠোনের গন্ধ

ষষ্ঠীর সকালটা যেন আলোর ভিতরেও অদ্ভুতভাবে কুয়াশাচ্ছন্ন। ঠাকুরদালানে রোদ ঢুকছে, কিন্তু তাতে জাঁক নেই—মেঘের গায়ে লেগে থাকা রুপোলি ছায়ার মতো নরম, ছড়ানো। প্রতিমা এখনও অসম্পূর্ণ, তবে দেবীর চোখ আঁকা হয়ে গেছে। সেই চোখ, যেটা ঈশা দেখেছে ছেলেবেলা থেকে, কিন্তু এ বছর যেন অতিপরিচিতের মাঝে একটা অচেনা প্রশ্নবোধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বাড়ির সব কাজে ঈশার ব্যস্ততা একটু বেশি। একদিকে দই-চিনি দিয়ে পুরোহিতের সেলামি বাছাই, অন্যদিকে অতিথি তালিকা সামলানো, এমনকি রাঁধুনিদের সঙ্গে কি রাঁধা হবে তা নিয়েও তার পরামর্শ দরকার। কিন্তু এর মাঝেও ঈশা যেন প্রতি মুহূর্তে অনির্বাণের অস্তিত্ব অনুভব করছে।

সে ঘরের ভেতরে থাকলেও জানে—অনির্বাণ কখন উঠোনে হাঁটছে, কখন ঠাকুরদালানে দাঁড়িয়ে, কখন আড়চোখে তাকাচ্ছে সেই জানালার দিকে যেখানে একদিন ঈশা বসে বসে তার প্রথম প্রেমপত্র লিখেছিল।

কেউ জানত না সেটা কখনও দেওয়া হয়েছিল কিনা।

অনির্বাণ ওই জানালার নিচে এসে দাঁড়ায়। নিচের ইটগুলো এখনও টিকটিক করে গরম, ঠিক যেমন ছিল সেই বছরেও—যখন ঈশা অষ্টমীর অঞ্জলিতে সাদা শাড়ি পরে নামছিল আর পেছন থেকে কেউ ডাকছিল তার নাম।

“ঈশা।”

আবার সেই ডাক।

কিন্তু এ বার ঈশা নিচে নামছে না, বরং ছাদ থেকে তাকিয়ে রয়েছে। তার কপালে চন্দনের রেখা, হাতে ধরা ধুনুচি।

“তুই দাঁড়িয়ে আছিস?”

“তুইও তো দাঁড়িয়ে আছিস,” অনির্বাণ হেসে বলে।

“এই উঠোনটার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই তোর আয়ত্তে নেই, অনির্বাণ। তুই একবার এসেছিস, আবার চলে গেছিস। ঠিক যেমন বাতাস আসে, আর রেখে যায় ধুলো।”

অনির্বাণ কিছু বলে না। ঈশার এই কথাগুলো যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্লান্তির মতো বেরিয়ে আসছে—আস্তে, তবু স্পষ্ট।

“তুই চিঠিটা পেয়েছিলি?” ঈশা জিজ্ঞাসা করে।

অনির্বাণ চমকে ওঠে। এত বছর পর সেই প্রশ্ন!

“পেয়েছিলাম,” সে ধীরে বলে। “তবু চলে যেতে হয়েছিল।”

“জানি। আমিও নিজেকে বুঝিয়েছিলাম যে হয়তো এটা একতরফা ছিল। তবু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন অপেক্ষা করতাম।”

নীচে ছায়া নেমে আসে।

“তোর ফিরে আসা দেখে মনে হচ্ছে, হয়তো ঢাকের মতো—তোর মনের ভিতরেও শব্দ হয়েছিল,” ঈশা বলে।

“হয়েছিল। শুধু সাহস হয়নি, সেটা তোর সামনে বাজাতে,” অনির্বাণ বলে।

নিচে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ মুখ তোলে। ঈশার চোখ তখন ঠাকুরের মতো—নির্মম নয়, কিন্তু অলক্ষ্য এক সত্যকে জড়িয়ে।

“আমরা কি ফিরতে পারি, ঈশা?”

ঈশা ধীরে নিচে নামে। শাড়ির আঁচল লাল ইটের গায়ে লেগে থাকে। দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে সেই উঠোনে, যেখানে পুজোর প্রতিটি মুহূর্ত প্রেমের মতো ছড়িয়ে আছে—উপেক্ষিত, অথচ স্পষ্ট।

“তুই যখন গেছিস, তখন আমি পুজোকে ঘৃণা করতাম,” ঈশা বলে। “মনে হত এই প্যান্ডেল, এই প্রতিমা, সবটাই কেবল লোক দেখানো। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, আসলে এই পুজোই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার মধ্যে তোকে রেখেছিলাম, অনির্বাণ। তোকে ছুঁতে না পারলেও তোর স্মৃতিকে ছুঁতে পেরেছিলাম।”

অনির্বাণ কাঁপা গলায় বলে, “তুই কি এখনও…?”

ঈশা একবার আকাশের দিকে তাকায়। ঢাকের শব্দ বাড়ছে। ঠাকুরদালানে অজস্র মানুষ জড়ো হচ্ছে। কেউ দেখছে না তাদের কথা, অথচ শহর জানে—এই দু’জনের মাঝে কোনো শব্দ নেই, শুধু ঢাকের প্রতিধ্বনি।

“ভালোবাসা কি প্রশ্নের উত্তর দেয়, অনির্বাণ? সে তো ঠিক পুজোর আগমনের মতো—যায়, আবার আসে। প্রতিবার ফিরে আসে অন্য মুখে, অন্য কাঠামোয়। কিন্তু তলদেশে থাকে সেই একটাই নদী।”

অনির্বাণ মাথা নিচু করে। ঈশা তার গলার কাছে একটা পিপঁড়ের কামড়ের মতো অস্থিরতা টের পায়।

“তুই থাকিস,” সে বলে। “এই পুজোটা একসাথে কাটাই। তারপর দেখা যাবে—প্রতিমা যেমন গঙ্গায় মিশে যায়, তেমনি হয়তো আমরাও নতুন করে গড়বো আমাদের মূর্তি।”

অনির্বাণ কিছু না বলে মাথা নাড়ে। সেই ছোট্ট উঠোনে তখন ঢাকের তালে একটা নিরব সুর বেজে ওঠে—একটা ফিরে আসা, একটুখানি চাওয়া, আর অসীম বিসর্জনের পূর্ব মুহূর্তে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ভালোবাসা।

পর্ব ৩: সপ্তমীর আলো – চোখে চোখে পুরনো গান

সপ্তমীর সকালটা রোদেলা, কিন্তু তার উজ্জ্বলতা যেন একটু নরম—ঈশানদের ঠাকুরদালানের খোলা ছাদে এসে পড়ে ঝাঁপিয়ে, তারপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বেলপাতার গন্ধে, ধূপে, ধুনুচির ধোঁয়ায়। প্রতিমার মুখ তখনো আংশিক ঢাকা, কিন্তু চোখদুটি যেন খোলা আছে সম্পূর্ণভাবে—সেই চিরন্তন দৃষ্টি যা চোখের পেছনের কথা বোঝে।

অনির্বাণ সকাল থেকেই উঠোনে বসে। হাতে চায়ের কাপ, কিন্তু চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে প্রতিমার দিকে, মাঝে মাঝে ঈশার দিকে, যে তখন ঠাকুরদালানের একপাশে দাঁড়িয়ে সাবেকি তালিকায় চোখ বোলাচ্ছে—সন্ধ্যায় কারা নাচবে, কারা গাইবে, কখন ঢাক বাজবে, কখন প্রসাদ বিলি।

দূর থেকে গান ভেসে আসে—“জাগো দুর্গা”—কারও বাসায় মহালয়ার রেকর্ড বেজে চলেছে, যদিও মহালয়া কবে পেরিয়ে গেছে। অনির্বাণের মনে হয়, কিছু কিছু গান সময় ভুলে বাঁচে। যেমন কিছু কিছু সম্পর্কও।

“অনির্বাণ,” ঈশা পাশে এসে দাঁড়ায়, “তুই আজ সন্ধ্যায় কিছু গাইবি?”

অনির্বাণ একটু চমকে ওঠে। “আমি? তোর বাড়ির পুজোয়?”

“তুই তো এই বাড়িরই একটা অংশ ছিলি একসময়। বরং ওই উঠোনের আমগাছটার মতো—যেটা কাটা হয়েছে, তবু যার শিকড় এখনও ভেতরে রয়ে গেছে।”

অনির্বাণ মাথা নিচু করে। “তুই তো জানিস, গান আমি এখন অনেকদিন গাই না।”

“তবে শুনিস?” ঈশা জিজ্ঞেস করে।

“প্রতিদিন। গান আমার মধ্যে থেমে থাকলেও, তোকে ঘিরে যে স্মৃতি আছে, সেটা গানে বেঁচে আছে এখনও।”

ঈশা একটু থামে। তার চোখে আজ মেঘ জমেছে—কিন্তু বৃষ্টির নয়, বরং কিছু স্মৃতি ফেলে আসার ছায়া।

“সেই যে একবার সপ্তমীর সন্ধ্যেয় তুই গেয়েছিলি ‘আমার পরান যাহা চায়’,” ঈশা বলে, “আমি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সবাই কেবল গান শুনছিল, কিন্তু আমি দেখছিলাম, তোর চোখ আমার চোখ খুঁজছিল। সেই সন্ধ্যার পর আর কোনো গানকে আমি ঠিক গান বলে মানতে পারিনি।”

অনির্বাণ উঠে দাঁড়ায়। তার গলার স্বর আজ একটু গভীর, একটু গলা কাঁপানো।

“সেদিনও আমি তোকে বলিনি কিছু। গানের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম আমার না বলা প্রেমটাকে। ভাবতাম তুই বুঝবি।”

“বুঝেছিলাম,” ঈশা বলে। “তাই তো চিঠিটা লিখেছিলাম।”

“আর আমি… আমি পালিয়ে গেছিলাম। কারণ তখন আমার মনে হয়েছিল তুই খুব বেশিই সত্যি। তুই ছিলি আমার জীবনের সেই অংশ, যেটা আমি ধারণ করতে ভয় পেতাম।”

ঈশা ধীরে হেসে ফেলে। সেই হাসি যেন ঠাকুরের মুখে আঁকা হাসির মতো—দুঃখের প্রান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আনন্দ।

“আজ বুঝলি?”

“হ্যাঁ,” অনির্বাণ কণ্ঠে কাঁপুনি নিয়ে বলে। “আজ বুঝলাম, কেউ যদি সত্যিই নিজের হয়ে দাঁড়ায় কারও সামনে, তাকে ভয় পাওয়া ভুল।”

সন্ধ্যায় যখন প্যান্ডেল আলোয় মোড়ানো, আর বাতাসে ধূপের গন্ধ ভারী, তখন অনির্বাণ দাঁড়ায় উঠোনের এক কোণে। গলায় তার হারমোনিয়াম ঝোলানো নয়, কিন্তু গলা খুলে গায়:

“তোমায় নতুন করে পাবো বলে,
হারাই গত কালের সব গান…”

সবাই চুপ করে শোনে। ঈশা দাঁড়িয়ে থাকে ঠাকুরদালানের ওপাশে, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখের নিচে হালকা জল জমে।

গানের শেষে অনির্বাণ তাকায় তার দিকে। ঈশা তখন ধীরে ধীরে উঠে হাঁটতে থাকে তার দিকে—না উৎসবের মানুষদের দিকে, না প্রতিমার দিকে—শুধু তারই দিকে।

দু’জনের চোখে তখন অতীত, বর্তমান আর এক অজানা ভবিষ্যতের সমস্ত সুর একসাথে বেজে ওঠে।

ঢাক বেজে ওঠে। প্রতিমার মুখ উন্মুক্ত হয়। আর ঠিক তখনই, বহু বছর পর, তাদের প্রেম আবার নতুন করে পুজোর আলোয় গান হয়ে ওঠে—চোখে চোখে গাওয়া এক পুরনো গান।

 

পর্ব ৪: অষ্টমীর সন্ধ্যে – কাঁসরের শব্দে না বলা কথা

অষ্টমীর সন্ধ্যা বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে এক অদ্ভুত ভার বহন করে। ঢাকের আওয়াজ জোরে বাজে, ধুনুচি নাচের প্রস্তুতি শুরু হয়, কিন্তু সবকিছুর চেয়ে বেশিদিন ধরে বেঁচে থাকে কাঁসরের একটা শব্দ—যেটা প্রতিমার চরণে স্পর্শ করে আসে আর প্রতিবারই কারও হৃদয়ে আছড়ে পড়ে অন্য একভাবে।

ঈশা দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিমার সামনে। পরনে তার সাদা লাল পাড়ের শাড়ি, মাথায় ফুল। চোখে কাজলের রেখা, ঠোঁটে হালকা রঙ, আর কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ। কিন্তু তার চেয়েও বেশি নজর কাড়ে তার দৃষ্টি—যেটা সন্ধ্যার আলোয় আরও নিরব, আরও গভীর হয়ে উঠেছে।

অঞ্জলির পর, ভোগের সময় পেরিয়ে গেছে। এখন ধুনুচি নাচের ঠিক আগের মুহূর্ত। অনির্বাণ ঠাকুরদালানের এক কোণে দাঁড়িয়ে—তার চোখে ঈশাকে দেখার তীব্রতা, যেন চারপাশের সব শব্দ নিঃশব্দ হয়ে গেছে, শুধু কাঁসরের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে।

ঈশা ধুনুচি হাতে তুলে নেয়। ধোঁয়া ঘন হয়ে উঠছে। তখনই কেউ পেছন থেকে বলে ওঠে, “অনির্বাণ, এবার তুইও নাম না। ছোটবেলায় তো কতবার নাচেছিস।”

একটা মুহূর্তের জন্য ঈশা তাকায়। অনির্বাণের চোখে তখন দ্বিধা আর সাহসের মিশেল। সে এগিয়ে আসে, ধুনুচি হাতে তুলে নেয়।

দু’জন পাশাপাশি দাঁড়ায়। চারপাশের মানুষের হাততালি, হাসি, আর সেলফি তোলার মধ্যে ওরা আলাদা।

ধুনুচির ধোঁয়া যখন ঘূর্ণি পাকিয়ে উঠছে, তখন ঈশা কানে ফিসফিসিয়ে বলে, “এই মুহূর্তটাতে তুই কি আছিস, অনির্বাণ?”

“এই মুহূর্তেই তো সবচেয়ে বেশি আছি,” অনির্বাণ হাসে।

“তোর চোখে কেন অত পুরনো অভিমান জমে আছে?”

“কারণ তোকে একদিন কিছু না বলেই ছেড়ে গিয়েছিলাম। আর আজ এই কাঁসরের তালে তালে মনে হচ্ছে—যেন সেই না বলা কথাগুলোই আমাকে নাচাচ্ছে।”

ঈশা ধোঁয়ার ভেতরেও তার মুখ দেখে। এত বছর পরেও সেই চেনা মুখ।

“তুই কখনও জানতিস না,” সে বলে, “তোর চলে যাওয়ার পর আমি ওই প্রতিমার পায়ের কাছে বসে কেঁদেছিলাম, যেমন আজ তুই নাচছিস।”

“জানতাম না,” অনির্বাণ বলে, “তবে এখন বুঝতে পারছি। এখন মনে হচ্ছে, প্রতিমার পায়ের নিচে আমাদের সব কথা জমা পড়ে থাকে। কাঁসরের শব্দে তারা উড়ে আসে, আর ধুনুচির ধোঁয়ায় দেখা যায় না। তবু তারা থেকে যায়।”

একটু দূরে কেউ আবার কাঁসর বাজায়। আওয়াজ বেড়ে ওঠে। মানুষ হাততালি দেয়। কেউ বলে, “কী দারুণ নাচল ওরা!”

তারা তখন থেমে গেছে, শুধু চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে।

ঈশা ধীরে বলে, “এই অষ্টমীর সন্ধ্যায় তুই আমায় ঠিক কী বলতে চাস?”

অনির্বাণ চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ।

“বলি?”

“বলে ফেল,” ঈশার গলায় আর কোনো দ্বিধা নেই।

“তুই যদি বলিস, আমি থাকব। এই শহরে, এই বাড়িতে, তোর পাশে। নতুন করে কিছু শুরু করার সাহস আজ আমার আছে। শুধু তুই বল—তোর মনে এখনো আমার জন্য কোনো জায়গা আছে কি না।”

ঈশা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “এই কাঁসরের শব্দে যদি প্রেম লুকিয়ে থাকতে পারে, তাহলে আমার চোখে এখনও তোর জন্য একটু আলো বাকি আছে।”

তাদের চারপাশে লোকজন ছবি তুলছে, ঢাক বাজছে, শিশুরা দৌড়াচ্ছে, ধোঁয়ার মধ্যে প্রতিমা দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।

কিন্তু ওই সন্ধ্যায়, ঢাকের গর্জন আর কাঁসরের ধ্বনির মাঝখানে, একটা প্রেম নিজের নাম না বলে, উচ্চারণহীন থেকে গেল—তবু জীবন্ত, নিরব, ধুনুচির ধোঁয়ার মতোই স্পষ্ট।

পর্ব ৫: নবমীর বাতাস – হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া

নবমীর সকাল আসে একটা আশ্চর্য রকম নরম শূন্যতা নিয়ে। না তাতে অষ্টমীর উৎসব আছে, না দশমীর বেদনা। যেন সমস্ত শব্দ একটু ধীর হয়ে আসে, আর উঠোনে বসে থাকা পায়রার পালকের মতো হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় অতীতের চিহ্ন।

ঈশা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে লক্ষ করছে গাছের পাতায় জমা শিশির, প্রতিমার গায়ে ধুলো জমে থাকা সিঁদুরের রঙ, আর উঠোনের কোণে রাখা ধুনুচিগুলোর চুপচাপ হয়ে যাওয়া ভঙ্গি।

অনির্বাণ আজ সকাল থেকে নেই।

সে ওঠেনি, ফোন ধরেনি, কারও সঙ্গে দেখা করেনি। ঈশা টের পেয়েছে, কোনও কিছু এক মুহূর্তে পাল্টে গেছে। যেমন দুর্গার চোখে শেষদিনে একটু ক্লান্তি জমে যায়, তেমনি অনির্বাণের চোখে অষ্টমীর রাতে সে দেখেছিল এক অজানা ব্যথা।

“তোর অনির্বাণ কোথায় গেল?” কৌশিকদা জিজ্ঞেস করে।

“জানি না। কাউকে কিছু বলেনি?”

“না। শুনলাম নাকি সকালে একাই প্যান্ডেলের দিকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে খোঁজ নেই।”

ঈশা চুপ করে যায়। তার বুকের ভেতরটা যেন ঢেউ খেলতে থাকে।

সে জানে অনির্বাণ পালাতে পারে। সে এই শহরটাকে ভালোবাসে, কিন্তু তার নিজের ভয়গুলোকে আরও বেশি ভালোবাসে। তাই হয়তো আবার একবার চলে যাচ্ছে, এই উৎসবের ঠিক মাঝখানে, যখন প্রতিমার ঠোঁটে চুপি চুপি জমতে শুরু করেছে বিদায়ের শব্দ।

ঈশা ঠাকুরদালানে ঢোকে। প্রতিমার চোখে আজ কেমন যেন এক বকুল ফোঁটা বিষণ্নতা। এমনটা আগে দেখেনি সে। তার মনে পড়ে—ছোটবেলায় একবার ঠাকুর গড়ার শেষদিনে মাটি ফেটে গিয়েছিল, আর মৃৎশিল্পী বলেছিলেন, “বোধহয় কেউ যার মুখ দেখার অপেক্ষায় ছিল, সে আসেনি। তাই ঠাকুর কাঁদছে।”

আজ ঈশার মনে হয়, সেই কেউ বুঝি সে নিজেই।

বিকেলে প্যান্ডেলে ভিড় বাড়ে। সেলফি, ফুচকা, ষোলোআনা আলো, আর ডান্স পারফরম্যান্সের হইচই। অথচ ঈশার মনে হয়, এই ভিড়ের মধ্যে একা হয়ে গেছে সে।

সে তখন দাঁড়িয়ে থাকে গেটের ঠিক পাশে। শাড়ির আঁচলে বাতাস লাগে। সে খেয়াল করে, বেলগাছটার নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

হ্যাঁ, অনির্বাণ।

সে ফিরে এসেছে। মুখে ক্লান্তি, চোখে ভিজে ভিজে চুপচাপ থাকা।

“তুই চলে গেছিস?” ঈশা বলে।

“গিয়েছিলাম,” অনির্বাণ জবাব দেয়। “চেষ্টা করছিলাম পালিয়ে বাঁচতে। মনে হচ্ছিল, আবার সবকিছু ভেঙে যাবে।”

“এবং?”

“প্যান্ডেলের পাশে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, তোর মুখ না দেখে যদি শহর ছেড়ে যাই, তাহলে শুধু প্রেম নয়, নিজেকেও ফেলে যাব।”

ঈশা কাছে এগিয়ে আসে।

“তুই আমার কথা ভেবে ফেরত এলি?”

“তোর মুখ মনে করে, তোর চোখ মনে করে, তোর চিঠির লাইন মনে করে। আর এই নবমীর বাতাস… এর মধ্যে তোদের উঠোনের গন্ধ থাকে, তোর শাড়ির ভাঁজ থাকে। এই বাতাস আমায় ধরে ফেলেছে।”

ঈশা একটুকু হাসে।

“তোর এখনো ভয় করে?”

“ভয় তো করেই। কিন্তু তার চেয়ে বেশি ভয় হচ্ছে তোকে আর একবার হারানোর,” অনির্বাণ ধীরে বলে।

সেই মুহূর্তে প্যান্ডেল থেকে ঢাক বেজে ওঠে। আতসবাজি ছোঁড়া হয় আকাশে। সবাই চিৎকার করে উঠে হেসে ওঠে।

ঈশা ও অনির্বাণ সেই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে একসাথে। কেউ তাদের আলাদা করে না। কেউ বুঝতেও পারে না, নবমীর বাতাসে এক হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া থেকে আবার এক ফিরে আসার ইতিহাস লেখা হচ্ছে—চুপচাপ, গভীরে, ঠিক যেমন প্রতিমার গায়ে জড়িয়ে থাকা উলুর ধ্বনির মধ্যে মিশে থাকে শেষবারের মতো মুখে মুখে না বলা একটা কথা।

পর্ব ৬: দশমীর সিঁদুর – এক ফোঁটা লাল ভালোবাসা

দশমীর সকালটা আসে যেন নিঃশব্দে চুপি চুপি হেঁটে—কোনও ঢাক, কোনও ধুনুচির গন্ধ নয়, শুধু বাতাসের মধ্যে একটা চেনা মনখারাপের গন্ধ। ঠাকুরদালানে এখন আর ভিড় নেই, ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মাটিতে, আর প্রতিমার গায়ে শুকিয়ে যাওয়া সিঁদুরের দাগে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শেষবেলার কথা।

ঈশা আয়নায় মুখ দেখছে। চোখে কালো কাজল টেনে আবার মোছে। ঠোঁটে লাল রঙ রাখে আবার তুলে ফেলে। কী পরবে আজ—শাদা শাড়ি নাকি সাদার ওপর লাল পাড়? সিদ্ধান্তে আসতে না পারা একটা অদ্ভুত যুদ্ধ।

তবু, শেষমেশ, সে নিজের সবচেয়ে প্রিয় লাল পাড়ের শাড়িটাই পরে নেয়। কারণ আজ বিদায়, আর বিদায়ের দিনে ভালোবাসাকে অন্তত একবার নিজের রঙে সেজে উঠতে হয়।

ঠাকুরদালানের উঠোনে আজ সবাই অপেক্ষায়—সিঁদুর খেলা, প্রণাম, বিসর্জনের জন্য ট্রাক আসবে কখন, কে কার গায়ে সিঁদুর মাখাবে, কার চোখ আগে ভিজে উঠবে।

অনির্বাণ দাঁড়িয়ে ছিল দোতলার বারান্দায়। ঈশাকে দেখে সে কিছু বলে না, শুধু তাকায়। তার চোখে কোনো লাল নেই, কিন্তু ঈশা দেখে—অনির্বাণের চোখের সাদা দাগগুলো আজ একটু বেশি ঝকঝকে।

“তুই আসবি না?” ঈশা প্রশ্ন করে।

“ভেবেছিলাম দূরে থাকব,” অনির্বাণ ধীরে বলে, “কিন্তু এই শেষটাও তো আমাদের গল্পের একটা অংশ, তাই না?”

ঈশা একটুখানি হেসে মাথা হেঁট করে। তার হাতে আজ একটুকরো সিঁদুর আছে। যেটা সে মনে মনে রেখেছিল অনির্বাণের কপালে দিতে।

নিচে সিঁদুর খেলা শুরু হয়েছে। সবার গায়ে লাল, হাসি আর চোখে জল। কেউ কেউ বলছে, “বছর ঘুরে আবার আসবে,” কেউ বলছে, “চলে যাবার সময় এত আনন্দ হয় কেন?”

ঈশা আর অনির্বাণ ঠাকুরদালানের পেছনের উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে কেউ নেই। শুধু তারা দু’জন, আর দূরে প্রতিমার মূর্তি—যার চোখে যেন একটুকরো আশীর্বাদ।

“তোর কপালে একটা সিঁদুর দিতে চাই,” ঈশা বলে।

অনির্বাণ চমকে ওঠে। “আমি তো—”

“আমি জানি,” ঈশা বলে, “তুই কেউ না, তুই কিছু না—আমার প্রেম ছাড়া। আর সেই প্রেমই যদি সত্যি হয়, তবে এই একফোঁটা সিঁদুর তোর কপালে আমার ভালোবাসা হয়ে থাক।”

অনির্বাণ চোখ বন্ধ করে। ঈশা তার কপালে একটুকরো সিঁদুর ছোঁয়ায়। সেই মুহূর্তে চারপাশে ঢাক বেজে ওঠে। হয়তো হঠাৎ, হয়তো ঠিক সময়েই।

সেই লাল দাগটা কপালে লাগতেই অনির্বাণ কাঁপে। সে জানে, এই একফোঁটা সিঁদুর মানে শুধু প্রেম নয়, এই বাড়ির সঙ্গে, এই পুজোর সঙ্গে, আর ঈশার সঙ্গে তার এক চুপচাপ বাঁধন—যেটা সে আর কখনও ছিঁড়তে পারবে না।

“এবার তুই কোথাও পালিয়ে যাবি না তো?” ঈশা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে।

“না,” অনির্বাণ বলে, “এবার পালাবো না। কারণ আমার কপালে এখন তোর ভালোবাসার দাগ, আর এই দাগ মোছা যায় না।”

ওরা দু’জনে দাঁড়িয়ে থাকে একসাথে। ঢাকের আওয়াজ বেড়ে ওঠে। প্রতিমা উঠোন ছাড়ে। শহর আরেকবার চোখ মুছে নেয়।

দশমীর দিন একটা লাল দাগ রেখে যায়—যেটা কেউ সিঁদুর বলে, কেউ প্রেম, আর কেউ বলে, “ভালোবাসা যখন সত্যি হয়, তখন সে একটুখানি রক্তের মতো গাঢ় হয়ে থাকে কপালে।”

 

পর্ব ৭: বিদায়ের পেছনে – মনখারাপের প্যান্ডেল

পুজোর শেষে প্যান্ডেলটাও আর আগের মতো থাকে না। আলো জ্বলে ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে থাকে এক ধরণের ক্লান্তি। চটের কাপড় হেলে পড়ে, ফুল শুকিয়ে গন্ধ হারায়, আর ঢাকিরা চুপচাপ বসে থাকে ভাঙা বাঁশের আড়ালে—যেন সবকিছু কেবল অপেক্ষায়, এবার ঘরের পথ ধরার।

ঈশা প্যান্ডেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। চারদিকে কেবল ভাঙনের গন্ধ—যেটা কাঁচের মতো নয়, বরং স্নানের পর ভিজে শাড়ির মতো—মুঠোয় ধরা যায় না, কিন্তু শরীর জুড়ে থাকে।

অনির্বাণ তার পাশে দাঁড়িয়ে নেই।

সে এখন ঠাকুরদালানে। প্রতিমা চলে যাওয়ার পর যা থাকে, সেই নির্জনতা সামলাচ্ছে। প্রতিবারই সে ফিরে যেতে চাইতো এই মুহূর্তে, এবার সে থাকতে চাইছে, কিন্তু ভিতরটা যেন জানে—যে সম্পর্ক বিদায়ের সঙ্গে জন্ম নেয়, তার কিছুটা চুপ করে থাকাই ভালবাসা হয়ে ওঠে।

“তুই চুপ করে আছিস?” কৌশিকদা এসে দাঁড়ায় ঈশার পাশে।

“হ্যাঁ,” ঈশা ধীরে বলে। “সবাই চলে গেছে। আলো নিভে আসছে। শুধু আমি আর এই প্যান্ডেল—একটা মনখারাপের মতো দাঁড়িয়ে আছি।”

“অনির্বাণ?”

“সে তো আছে। কিন্তু তবু যেন নেই,” ঈশার গলা মলিন হয়ে আসে। “কিছু কিছু ফিরে আসা পুরনো অজুহাত নিয়ে আসে—কী ছিলাম, কী হতে পারতাম। আর তখনই ভয় হয়—যদি আবার তাকে হারিয়ে ফেলি?”

কৌশিকদা চুপ করে যায়। তারপর বলে, “ভালোবাসা কি কখনও সত্যি ফিরে আসে? না কি আমরা শুধু তার ছায়াটাকে আঁকড়ে ধরি?”

ঈশা কিছু বলে না। প্যান্ডেলের এক কোণে একটা শিশুকে দেখে—সে কাঁদছে, কারণ তার বাবার হাত ফসকে গিয়েছে বেলুনটা। বেলুনটা এখন ওপরে, আলো ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে। শিশুটি তাকিয়ে আছে হা করে, কাঁদছে না আর—তাকিয়ে আছে সেই চলে যাওয়া বেলুনের দিকে।

ঈশার মনে হয়, তার বুকের ভেতরেও ঠিক তেমন একটা বেলুন উড়ছে—প্রতিবার প্রেমের বিদায়ের পর যেমন হয়।

অনির্বাণ এসে দাঁড়ায় পেছন থেকে। “তুই ঠিক আছিস?”

“এই প্রশ্নটা না করলেই পারতিস,” ঈশা বলে। “কারণ আমি জানি, তুইও ঠিক নেই।”

অনির্বাণ পাশে এসে দাঁড়ায়। “এই শহরে থাকতে চাই। তোর পাশে। তবু বুঝি, একটা সময় এলেই আবার চলে যেতে হবে। কারণ সব কিছুর মতো পুজোও তো শেষ হয়।”

“কিন্তু প্রেম?”

“সে কি কখনও শেষ হয়?”

ঈশা একটুখানি হাসে। “না, শেষ হয় না। সে কেবল অন্যরূপ নেয়। যেমন আজ এই প্যান্ডেল মনখারাপের হলেও, তাতেই তো সবচেয়ে গভীর সুর বাজে।”

অনির্বাণ তার হাত ধরে। এদের হাতে কোনও প্রতিশ্রুতি নেই, নেই আগামীকালের নিশ্চয়তা। তবু এই বিদায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ওরা অনুভব করে—প্রেম আসলে যাওয়ার গল্প নয়, অপেক্ষার গল্প।

প্যান্ডেলের আলো নিভে যায়। তারা বেরিয়ে আসে ধীরে। শহরের ভিড় এখনও বেঁচে আছে, ঢাকিদের ট্রাক চলে গেছে, মানুষ ফেসবুকে ছবি দিচ্ছে “দশমীর ফেয়ারওয়েল” বলে।

কিন্তু এই দু’জনের বিদায় অন্যরকম—এখানে কোনো ক্যাপশন নেই, নেই হ্যাশট্যাগ, কেবল মনখারাপের একটা দীর্ঘশ্বাস, আর চোখের কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু না বলা কথা।

পর্ব ৮ : প্রতিমা নিরঞ্জন – থেমে থাকা নদীর মতো

বৃষ্টি আসেনি, অথচ আকাশটা যেন ভিজে। ধুলো-জমা পাতার মতো থমকে আছে হাওয়া। প্রতিমা উঠে গিয়েছে ট্রাকে, মাথার ওপর বাঁশের ফ্রেমে ঢেকে রাখা, তবু তার চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে—দেখা যাচ্ছে সেই চিরপরিচিত দৃষ্টি, যা বিদায়ের ভেতরেও আশীর্বাদ রেখে যায়।

অনির্বাণ আর ঈশা দু’জনেই দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তায়। কচি ছেলে-মেয়েরা উলুধ্বনি দিচ্ছে, ঢাকিরা শেষবারের মতো তাল রেখে বাজাচ্ছে—কিন্তু অনির্বাণের মনে হচ্ছে, এই শব্দের ভেতরেও এক রকম নিস্তব্ধতা আছে।

“এই মুহূর্তটা,” অনির্বাণ বলে, “আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় মনে হচ্ছে।”

ঈশা তাকায় তার দিকে। চোখে জল নেই, কিন্তু সেই না-কাঁদা চোখেই অনির্বাণ দেখে এক গভীর নদী—যেটা অনেক কথা বলে, অথচ শব্দ করে না।

“বিদায় মানে কি হারিয়ে যাওয়া?” ঈশা জিজ্ঞেস করে।

“না,” অনির্বাণ বলে, “বিদায় মানে অপেক্ষা শুরু হওয়া। আবার ফিরে আসার দিকে তাকিয়ে থাকা।”

ঈশা হেঁটে যায় ট্রাকের দিকে, যেখানে প্রতিমা দাঁড়িয়ে—অন্তিম চাহনিতে। ঈশা একটা ফুল রাখে দেবীর পায়ের কাছে। তারপর ফিরে এসে বলে, “তোর জন্য কিছু রেখেছিলাম।”

সে পাঞ্জাবির পকেট থেকে বার করে একটা ছোট্ট কাগজ দেয়। অনির্বাণ দেখে—তাতে লেখা আছে সেই পুরোনো চিঠির এক লাইন:

“যদি আবার কখনও ফিরিস, জানবি আমি ঠিক এখানেই আছি—নিরঞ্জনের পেছনে অপেক্ষায়।”

অনির্বাণ চুপ করে থাকে।

“তুই থাকবি তো?” ঈশা আবার জিজ্ঞেস করে।

অনির্বাণ উত্তর দেয় না। শুধু হেঁটে গিয়ে দাঁড়ায় গঙ্গার ঘাটে। প্রতিমা এখনো নামেনি। জল ধারে দাঁড়িয়ে ট্রাক। ঢাক থেমে এসেছে। এখন কেবল নদী, আর কিছু না বলা চোখ।

অনির্বাণ পা রাখে সিঁড়িতে। ঈশা তাকে অনুসরণ করে। দু’জনে চুপ করে দাঁড়িয়ে। প্রতিমা জল ছোঁয়, ঢেউ ছুঁয়ে দেয় ঈশার শাড়ির পাড়।

আর ঠিক তখনই, অনির্বাণ ঈশার হাত ধরে।

“থাকব,” সে বলে। “তোর পাশে, এই শহরে, এই পুজোর পরে, সমস্ত মৌসুম বদলে গেলেও। আমি আর পালাবো না। কারণ এবার আমি জানি, যে নদী থেমে থাকে, তার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি স্রোত জমে।”

ঈশার চোখে জল আসে। এই প্রথম।

“তুই ফিরে আসিস প্রতি বছর,” সে বলে। “আমার জীবনে, আমার উঠোনে, আমার পুজোয়। যেমন দুর্গা মা আসেন, সিঁদুর লাল করে আবার ফিরে যান, তবু থেকে যান।”

ট্রাক চলতে শুরু করে। ঢাকিরা উঠে পড়ে। উলুধ্বনি ভেসে ওঠে। সবার চোখে জল। কেউ ছবি তোলে, কেউ কাঁদে, কেউ চুপ করে যায়।

ঈশা আর অনির্বাণ দাঁড়িয়ে থাকে ঘাটের সিঁড়িতে। একসাথে।

ঢাক থেমে গেলে, আর কেবল জল আর বাতাসের শব্দ থাকে, তখনও তারা দাঁড়িয়ে থাকে পাশাপাশি। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু জানে—এই প্রেম কোনো প্যান্ডেল চেনে না, কোনো বিসর্জন মেনে নেয় না।

এ এক স্থির নদী, যার স্রোত কেবল চোখে দেখা যায় না।

তবু সে বয়ে চলে—চিরকাল।

WhatsApp-Image-2025-08-06-at-7.38.15-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *