Posted in

প্রেমপত্র বিভ্রাট

Spread the love

সৌভিক ভট্টাচার্য


সৌমিক দে নামের সেই সাধারণ ছাত্রটির জীবন ছিল একঘেয়ে – সকালে স্কুল, বিকেলে টিউশন, রাতে মা-বাবার বকুনিতে পড়াশোনা। ক্লাস নাইনের গড়পড়তা ছাত্র সে, কিন্তু তার চোখে একটা স্বপ্ন লুকিয়ে ছিল—মীনাক্ষী সেন। হ্যাঁ, সেই মেয়েটি যে আঁকা-আঁকিতে দুর্দান্ত, প্রতিটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতে আনে, আর যার হাসিতে সৌমিকের হৃদয়ের কাঁপুনি বেড়ে যায়। মীনাক্ষী তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেও সেটা সৌজন্যবোধ না প্রেম—সে বিষয়ে সৌমিকের কখনও সাহস হয়নি ভাবারও। তবে প্রেমে পড়া তো আর যুক্তির বিষয় নয়—একদিন হঠাৎ ক্লাসরুমে মীনাক্ষী যখন তার খাতা ফেরত দিয়ে বলল, “তোর লেখা কবিতাটা দারুণ লেগেছে”, তখনই সৌমিক যেন ভেসে গেল এক অলীক মেঘের উপর। পরদিন থেকেই সে ঠিক করল—নিজের মনের কথা জানাবে। বলার সাহস নেই, তাই কলমই তার ভরসা। একটা পুরনো ডায়রির পাতায় সে লিখতে শুরু করল—”তোমার হাসি আমার সকালকে আলোকিত করে, আর চোখ দুটো যেন বর্ষার আকাশ। আমি জানি, তুমি অনেক উঁচু, আর আমি মাটির মানুষ—তবু এই মনের কাগজে একটা জায়গা চাই…।” একসময় সে লিখতে লিখতে চিঠিটা শেষ করল। নাম লেখেনি, ঠিক করল যে চিঠিটা মীনাক্ষী পেলে নিশ্চয়ই বুঝবে এটা কার লেখা। হাতের লেখা একটু কুৎসিত, তাও কী করে যেন নিজেকে কবি ভাবতে শুরু করল সে। চিঠিটা ভাঁজ করে ব্যাগের মধ্যে গুঁজে রাখল, গায়ে অদ্ভুত এক উত্তেজনা ও ভয়ের কম্পন নিয়ে।

পরদিন স্কুলে পৌঁছেই সে ঠিক করল—চিঠিটা সরাসরি দিতে পারবে না। তাই রাজর্ষিকে বলল, “দেখ ভাই, ক্লাসে মীনাক্ষীর ব্যাগের ভেতর বা খাতার ওপর রেখে দিবি, যেন ও পায় কিন্তু বুঝতে না পারে কে দিয়েছে।” রাজর্ষি, যাকে সবাই ক্লাসের ‘আইডিয়া-ম্যান’ বলে ডাকে, হেসে সম্মতি দিল। “তুই টেনশন নিস না, আমার হাতে গেলে ব্যস—চিঠি সরাসরি হিয়ার্টে পৌঁছে যাবে!” বলে রাজর্ষি সৌমিকের দেওয়া সেই প্রেমপত্রটা নিজের জেমস বন্ডি দায়িত্বে নিয়ে নেয়। টিফিনের পরের পিরিয়ডে ইংরেজি ক্লাস থাকার কথা, আর তখনই ক্লাস ফাঁকা থাকবে কিছু সময়। রাজর্ষি তখন মীনাক্ষীর বেঞ্চের দিকে যাবে, এমনটাই ঠিক ছিল। কিন্তু ভুলটা ঘটে ঠিক তখনই। সৌমিকের ব্যাগে একইরকমভাবে রাখা ছিল ইংরেজি হোমওয়ার্ক খাতা আর প্রেমপত্রটা—ভাঁজ করা কাগজ দেখে রাজর্ষি ভেবে নেয় সেটা টিচারকে জমা দেওয়ার খাতা। ক্লাসে কেউ না থাকার সুযোগে সে প্রেমপত্র-সহ খাতা তুলে দিয়ে আসে হেডস্যার অম্লান সরকারের ডেস্কে, যিনি তখন স্টাফরুমে ছিলেন। রাজর্ষি তখনও বুঝতে পারেনি কী মহাভুল সে করে ফেলেছে। সৌমিকও শান্ত, ভেবে নিয়েছে চিঠি নিশ্চিন্তে পৌঁছেছে গন্তব্যে। সেইদিন বাকি সময় সৌমিকের মন খুশিতে ভরা ছিল—সে কল্পনায় দেখতে লাগল, মীনাক্ষী সেই চিঠি পড়ে তাকিয়ে হাসছে, আবার হয়তো কোনো একদিন লিখে দেবে উত্তরও!

কিন্তু পরদিন সকালেই স্কুলে ঢুকেই সৌমিক টের পেল কেমন যেন একটা অদ্ভুত গুঞ্জন। ক্লাসরুমে ঢোকার আগেই করিডোরে কয়েকজন সিনিয়র হাসাহাসি করছে, চোখ টিপে বলছে, “প্রেমিক কবি এলেন!” সৌমিক কেবল মাথা নিচু করে চলে গেল ক্লাসে, কিন্তু মীনাক্ষী তাকিয়েই দেখল না তার দিকে। দুপুরে রাজর্ষি তাকে টেনে নিয়ে গেল পিছনের বারান্দায়, কপালে হাত দিয়ে বলল, “দোস্ত… একটা ভয়ানক ভুল হয়ে গেছে। আমি ভুল করে তোর চিঠিটা হেডস্যারের টেবিলে দিয়ে এসেছি। উনি তো খাতা ভেবে খুলে ফেলে চিঠিটা পড়েছেন!” সৌমিকের মুখ তখন ম্লান—সেই মুহূর্তে যদি মাটি ফেটে যেত, সে নিশ্চয়ই তাতে ঢুকে পড়ত। রাজর্ষি বলল, “মঞ্জরী ম্যাডাম তো হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে স্টাফরুমে! হেডস্যার নাকি মুখ গম্ভীর করে বলেছে—‘এটা কি আমার জন্য লেখা?’” তখনই সৌমিক বুঝল, মনের কথা হয়তো ঠিকই কাগজে লেখা হয়েছিল—কিন্তু সে কাগজটা পৌঁছেছে এমন একজনের হাতে, যার ভাবনাতেই ছিল না প্রেম নয়, বরং শৃঙ্খলা আর শাস্তি। আর সেখান থেকেই শুরু হবে এক বিভ্রান্তিকর, হাস্যকর, তিল থেকে তাল হওয়া অধ্যায়, যা বদলে দেবে স্কুলজীবনের সবচেয়ে লজ্জাজনক ও মজার স্মৃতি হিসেবে।

সেই রাতটা সৌমিকের কাছে ছিল এক অভিশপ্ত দুঃস্বপ্নের মতো। রাজর্ষির কথা শোনার পর থেকেই তার মুখ শুকিয়ে কাঠ, চোখের পাতা একবারও নামছে না। সে বারবার মনে করতে লাগল—কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে? কোথাও কি এমন কিছু লিখে ফেলেছিল যা হেডস্যারকে অসম্মান করে? নাকি কোনো লাইন ছিল অতিরঞ্জিত, যেটা প্রমাণ করে সে এখনও বালখিল্য মানসিকতার অধিকারী? সবচেয়ে বড় কথা, তার এখন স্কুলে যাওয়া উচিত হবে কি না! সকালে মা যখন বলল, “তোর কণ্ঠ কেন কেমন শুকনো লাগছে?” তখন সে কোনও রকমে বলল, “টেস্টে কম নম্বর পেয়েছি বুঝি।” কিন্তু যে ভয় তার বুকের ভিতর জমাট বাঁধছিল, তা কোনো পরীক্ষার নম্বরের চেয়েও ভয়ঙ্কর। স্কুলে পৌঁছে ক্লাসরুমে ঢুকতেই সে বুঝল, আজ কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটবে। রাজর্ষি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “হেডস্যার আজ সকালে আসতেই সেই চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে ছিলেন। ম্যাডামদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বারবার চিঠির দিকে তাকাচ্ছিলেন। তারপর ‘বিশ্বাসের অভাব’ বলে কিছু একটা বললেন—আমি আর শুনতে পাইনি, কারণ ওখানে দাঁড়ানোই রিস্ক ছিল!” সৌমিকের তখন মনে হলো তার হাত-পা সব অবশ হয়ে গেছে। সে চেয়ার টেনে বসল বটে, কিন্তু তার কানে শুধু ধ্বনিত হচ্ছিল সেই শব্দ—”বিশ্বাস… অভাব…”।

তবে ঘটনার আসল বিস্ফোরণ ঘটে তখন, যখন দ্বিতীয় পিরিয়ড শেষে পুরো স্টাফরুমে সেই চিঠির আলোচনা উঠে আসে। মঞ্জরী ম্যাডাম মুখে আঁচল চেপে হাসতে হাসতে বলছিলেন, “না হেডস্যার, আপনি তো এখনও হৃদয়জয়ী! প্রেমপত্র আসছে! আপনি দেখুন, কত আবেগ দিয়ে লেখা—‘তোমার চোখ দুটো বর্ষার আকাশের মতো…’” তখন হেডস্যার কিছুটা অপ্রস্তুতভাবে বললেন, “আমি জানি না কে দিয়েছে, কিন্তু এটা একেবারেই অনুচিত! ক্লাসরুম এখন কি রোমান্সের জায়গা হয়ে গেছে?” শিক্ষক মহলে আলোচনা চলতে থাকে, কেউ মজা করছিল, কেউ রেগে যাচ্ছিল, কেউ বলছিল—“বাচ্চারা এখনো এত সাহসী হয়ে গেছে!” ঠিক তখনই বাংলা টিচার, শোভনলাল বাবু বললেন, “কে জানে, যদি কোনো ম্যাডামকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়!” এই কথার পর তো নতুন গুজবের জন্ম হয়—চিঠিটা আদৌ কি হেডস্যারকে উদ্দেশ্য করে লেখা, নাকি কারও দিকে ছুঁড়ে ভুল করে তার হাতে গিয়ে পড়েছে? সেই মুহূর্তেই রাজর্ষি স্টাফরুমের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হেডস্যারের চোখে চোখ পড়ে যায়, আর সে যেন বুঝে ফেলে—তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা হবে। সে দৌড়ে সৌমিকের কাছে ফিরে এসে বলে, “দোস্ত, আমরা ধরা পড়ে গেছি! আমি যদি টিফিনের সময় আগেই হোস্টেল পালাতে পারি, তুই আমার নামে মিসিং রিপোর্ট লিখিস না।” সৌমিক তখন ক্লান্ত ভঙ্গিতে তাকায়, বলে, “ভাগতে হবে না। যা হবে সামনে দাঁড়িয়ে সামলাব। তবে একটা কথা বল—তুই ঠিক কীভাবে আমার চিঠিটা ওনার ডেস্কে রেখে এলি?” রাজর্ষি লজ্জা মেশানো গলায় বলে, “ওই খাতার মাঝে ছিল না?” তখন সৌমিক বুঝে যায়—তার ভালোবাসা কেবল হাতে লেখা ছিল না, সেটি ভুল হাতে এসে পৌঁছেছে একেবারে নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতীক অম্লান সরকারের কাছে।

আর ঠিক সেই সময়েই মীনাক্ষী, যাকে ঘিরে এই কাহিনির সূত্রপাত, আচমকা এসে সৌমিককে জিজ্ঞেস করে, “তুই কি কোনো চিঠি পাঠিয়েছিলি?” সৌমিক একদম জবাব দিতে পারছিল না। মেয়েটা চোখ নামিয়ে বলল, “আমি ভাবছিলাম… যদি সত্যি কিছু বলার থাকত, তুই নিজেই বলতিস। চিঠি পাঠানোর মানে কী?” তারপর ঘুরে চলে গেল। সৌমিক কেবল বোকার মতো তাকিয়ে রইল। তার এখন মাথায় ঘুরছে, সেই চিঠিটা শুধু ভুল জায়গায় যায়নি—সেই সঙ্গে চলে গেছে তার ভালোবাসার সম্ভাবনাও। সে চুপচাপ জানলার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের রোদটা কেমন যেন চোখ ধাঁধানো লাগছিল, আর ভেতরের স্কুলের পরিবেশটা অদ্ভুত গরম ও বিব্রতকর। হঠাৎ ঘোষণায় স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল—“নবম শ্রেণির সৌমিক দে এবং রাজর্ষি মন্ডলকে অধ্যক্ষ মহোদয়ের অফিসে তলব করা হলো।” সৌমিকের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হলো, তার মনের কাগজে লেখা প্রেম এক বিশাল ঝড়ের আকার নিচ্ছে—আর এখন সে ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।

অধ্যক্ষ অম্লান সরকারের অফিসে ঢোকার মুহূর্তটা যেন কোনো মৃত্যুদণ্ডের ঘরের দরজা পেরিয়ে যাওয়ার মতো লাগছিল সৌমিকের কাছে। চারপাশ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, পাখির ডাকও যেন থেমে গিয়েছিল, শুধু হৃদপিণ্ডের ধকধকানিটাই শোনা যাচ্ছিল নিজের কানেই। রাজর্ষিও পাশেই ছিল, কিন্তু এবার তার চোখে ‘আইডিয়া-ম্যান’ ভাব একটুও ছিল না, বরং সে যেন নিজেকেই শাস্তি দিয়ে ফেলেছে আগেভাগেই। অফিসরুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল হেডস্যার তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন, সামনে টেবিলের ওপর অতি পরিচিত সেই ভাঁজ করা কাগজটা রাখা। পাশে বসে আছেন মঞ্জরী ম্যাডাম, মুখে এক রহস্যময় হাসি, আর প্রধান শিক্ষিকা বাসবী ম্যাডাম কাঁধে শাল জড়িয়ে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছেন দু’জনের দিকে। “সৌমিক, রাজর্ষি… বসো।” হেডস্যার ধীর কণ্ঠে বললেন। দুজনই চেয়ার টেনে বসলো, তবে পিঠ ছোঁয়ানো দূরঅস্ত, যেন চেয়ারের সামনে বসে আছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন ইন্টারভিউ দিতে।

“এটা কি তোমার লেখা?” হেডস্যার সেই ভাঁজ করা কাগজটা সৌমিকের দিকে এগিয়ে দিলেন। সৌমিক কিছু বলার আগেই রাজর্ষি হঠাৎ বলে উঠল, “স্যার, আমি দিয়ে ফেলেছিলাম। মানে, আমি ভেবেছিলাম এটা খাতা, ওর ব্যাগে ছিল… আমি বুঝিনি…” হেডস্যার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি জানি, তুমি বুঝোনি। আমি জানতে চাই—এই কাগজে লেখা কথাগুলো কার? লেখার হাতের লেখা খুবই বাজে—তাই পুরোটা বুঝতে কষ্ট হয়েছে, তবে যা বুঝেছি তা যথেষ্ট।” সৌমিক মুখ নিচু করে আস্তে করে বলল, “স্যার, আমি লিখেছিলাম…” প্রধান শিক্ষিকা একটু হেসে বললেন, “তুমি বুঝি প্রেমপত্র লিখেছ?” সৌমিক গাল লাল করে বলল, “আমি… মানে… বলার সাহস পাইনি… তাই লিখেছিলাম… কিন্তু আমি চাইনি আপনি সেটা পান!” মঞ্জরী ম্যাডাম এবার আর ধরে রাখতে পারলেন না, হেসেই ফেললেন, “হেডস্যার, আপনি এতটা জনপ্রিয় যে ছাত্ররাও প্রেমে পড়ে যাচ্ছে!” হেডস্যারের মুখ গম্ভীরই রইল, কিন্তু চোখে একটা দৃষ্টি খেলে গেল—ধমক নয়, যেন একরকম বিস্ময়ের ছাপ। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “তুমি জানো, স্কুল হলো শৃঙ্খলার জায়গা। ভালোবাসা দোষের কিছু নয়, কিন্তু প্রকাশের জায়গা ও সময় থাকা দরকার। তোমার অনুভবকে আমরা হেয় করছি না, কিন্তু এই ঘটনা আমাদের সবাইকে বিব্রত করেছে।” সৌমিক কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।

তারপর হঠাৎ বাসবী ম্যাডাম বললেন, “তোমার চিঠিটা আমি পড়েছি। ভাষা খারাপ ছিল না, বরং খুব সংবেদনশীল। তুমি যদি চিঠিটা ভুল জায়গায় না পাঠাতে, তাহলে আজ এত গোলমাল হতো না। কিন্তু আমি খুশি, তুমি সত্যি বলেছ। এই বয়সে ভুল হতেই পারে, সাহস করে স্বীকার করা কিন্তু অনেক বড় গুণ।” রাজর্ষির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার আইডিয়াগুলো আরেকটু সাবধানে ব্যবহার করো। চিঠি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে গিয়ে স্কুলে কেলেঙ্কারি করেছো।” তারপর হেডস্যার কাগজটা হাতে তুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি যখন তোমার বয়সী ছিলাম, তখনও এমন এক চিঠি লিখেছিলাম… তবে সেটা কখনও পাঠাতে পারিনি। আজ বহু বছর পর, একটা চিঠি আমাকে আমার পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিল।” এই কথা শুনে রুমের পরিবেশটা যেন হঠাৎ করে বদলে গেল। হেডস্যার কোনো কড়া শাস্তি দেননি, বরং বললেন, “তোমরা যেতে পারো। তবে ভবিষ্যতে এধরনের চিঠি স্কুলে নয়, নিজের ডায়েরিতে রেখো।” সৌমিক আর রাজর্ষি উঠে দাঁড়াল, মনে মনে হাঁফ ছাড়ল। বাইরে বেরিয়ে রাজর্ষি ফিসফিসিয়ে বলল, “ওরে বাপরে! হেডস্যার তো প্রেমপত্রের সংবেদন বুঝে ফেলল! ভাবিস নি তোর চিঠি এত আর্টিস্টিক ছিল।” সৌমিক একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ রে… কিন্তু আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না, এই কাণ্ডটার পর মীনাক্ষীর সামনে কীভাবে যাব!”

অফিস থেকে বেরিয়ে আসার পর সৌমিক আর রাজর্ষি একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু তারা জানত—তাদের জীবন আগের মতো থাকবে না। যেটা হেডস্যার, বাসবী ম্যাডাম আর মঞ্জরী ম্যাডামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল, সেটা স্কুলের হাওয়া থেকে আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে! পেছনের করিডোরে দশম শ্রেণির ছেলেরা ফিসফিস করে বলছে, “ওই যে… ওই তো হেডস্যারের ‘রহস্য চিঠি’র কবি!” কেউ বলছে, “নয়নের ভাষায় লেখা চিঠি… কী লাইন রে ভাই!” রাজর্ষি হঠাৎ থেমে বলে, “এত তাড়াতাড়ি রটলো কী করে?” সৌমিক জবাব দিল, “যেখানে মঞ্জরী ম্যাডাম আছে, সেখানে রটনা জঙ্গল ফায়ারের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়!” ক্লাসে ঢোকার সময় মীনাক্ষী একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিল বটে, কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি ছিল না। সৌমিক বুঝে গেল, আজ ওর সঙ্গে কথা বলার মতো পরিবেশ আর নেই। তার নিজের ক্লাসরুমটাও এখন যেন একটা খোলামেলা নাট্যমঞ্চ, যেখানে সে নিজের অজান্তে প্রধান চরিত্র হয়ে গেছে।

আর স্টাফরুমে কী হচ্ছিল? মঞ্জরী ম্যাডাম ইতিমধ্যেই চায়ের কাপ হাতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উদ্দেশ্যে বলছেন, “আমি তো বললাম, হেডস্যারের কড়া চেহারার নিচে একটা কোমল হৃদয় আছে, না হলে প্রেমপত্র হাতে নিয়ে এত সংবেদনশীল বক্তব্য ক’জন দিতে পারে বলুন তো?” অন্যদিকে শোভনলাল স্যার বলছেন, “ছেলেটা যদি কবিতার ভাষায় লিখে থাকে, তবে সেটা উৎসাহযোগ্য—তবে স্কুলে নয়, সাহিত্যের পত্রিকায়!” ইংরেজি টিচার বিজয় মিত্র হেসে বলেন, “আমি তো বললাম—আমাদের স্কুলে কেবল পাঠ্যসূচি না, প্রেমপত্রও গোপনে প্রেরিত হয়!” সবাই হেসে উঠলেও হেডস্যার তখন জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, মনের মধ্যে যেন একটা অজানা সুর বেজে চলেছে। হয়তো কোনো পুরনো দিনের কথা, হয়তো সেই চিঠির কোনো লাইন তাঁর নিজের কৈশোরকালের মনে পড়ে গিয়েছে। কিন্তু তিনি এ নিয়ে আর কথা বলেন না। শুধু টেবিলের ড্রয়ারে সেই ভাঁজ করা চিঠিটা রেখে দেন, যেন সে একটা রহস্য নয়, বরং একটা স্মৃতি।

এদিকে দুপুরের টিফিন পিরিয়ডে পুরো স্কুল যেন একটা পত্রপাঠ প্রতিযোগিতায় নেমে গেছে। ছেলেরা ছড়িয়ে পড়া গুজবগুলো নিয়ে নিজেরাই নতুন নতুন থিওরি বানাচ্ছে। কেউ বলছে, চিঠিটা আসলে ইংরেজি টিচার মিসকে উদ্দেশ্য করে লেখা, কিন্তু ভুল করে হেডস্যারের হাতে চলে গেছে। আবার কেউ বলছে, এটা প্রেমপত্র নয়, নাটকের ডায়লগ—হয়তো কেউ নতুন নাটক লিখছে! কিন্তু সবচেয়ে মজার গুজবটা ছড়াল ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রের মুখে—“হেডস্যার নাকি সত্যিই কারো প্রেমে পড়েছেন, আর চিঠিটা তিনি নিজেই লিখে ফেলেছেন, কিন্তু সাহসে ভুগছিলেন, তাই স্টাফরুমে রেখে বিষয়টা আলোচনার ছলে সবাইকে দেখিয়েছেন!” গল্পের প্যাঁচ এমন জায়গায় পৌঁছায় যে সৌমিক আর রাজর্ষি নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। আর সবচেয়ে বাজে ব্যাপার, মীনাক্ষী কিছু বলছে না। সৌমিক বুঝতে পারছিল না—সে কি রেগে আছে, না বুঝে গেছে পুরোটাই দুর্ঘটনা? রাজর্ষি বলল, “দোস্ত, এ ঘটনা দিয়ে তোকে লাইফটাইম নাটকের স্ক্রিপ্ট দেওয়া যায়!” সৌমিক বলল, “তুই নাটক লিখিস, আমি তাহলে গর্ত খুঁড়ে তাতে ঢুকি। প্রেমের বদলে হয়েছে প্রহসন!” দুজনই ক্লান্ত মুখে হাসল। জীবনে প্রথম প্রেমপত্র লিখে কেউ যদি পুরো স্কুলে কিংবদন্তি হয়ে যায়, সেটা নিশ্চয়ই সৌমিক ছাড়া আর কেউ নয়।

পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় সৌমিক যেন নিজেকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো কোনো পরাজিত সৈনিক মনে করছিল। রাস্তায় হাঁটার সময় মাথার ভেতর ঘুরছিল গত ক’দিনের হাসাহাসি, ফিসফাস, স্টাফরুমের আলোচনার টুকরো টুকরো শব্দ—আর সবচেয়ে বেশি যেটা ওকে কষ্ট দিচ্ছিল, তা হল মীনাক্ষীর নিঃশব্দতা। সৌমিক কখনোই প্রত্যাশা করেনি যে প্রথম প্রেম এমনভাবে স্কুলের কৌতুকের মুখ্যচরিত্র হয়ে যাবে। রাজর্ষি অবশ্য অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সে নতুন নতুন তত্ত্ব দিচ্ছে—”দেখ, আমি বলি কি—হেডস্যার তো আসলে তোকে কিছু বলেইনি। উলটে মনে করিস না, উনি তোকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন লেখালিখি চালিয়ে যেতে!” সৌমিক শুধু বলল, “ওটা অনুপ্রেরণা না ভাই, ওটা সহানুভূতি। উনি দয়াপরবশ হয়ে ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু আমি জানি, আমার নাম এখন শিক্ষকদের কাছে ‘চিঠিওয়ালা কবি’ হিসেবেই থাকবে।” এই কথাগুলো বললেও সৌমিকের অন্তরে একটা জেদ তৈরি হচ্ছিল—সে বুঝে গিয়েছিল, জট কাটা শুরু করতে হলে প্রথমে তাকে মীনাক্ষীর সামনে গিয়ে কথা বলতে হবে। কিন্তু তার চেয়েও আগে দরকার ছিল সেই আসল ঘটনা মীনাক্ষীর সামনে স্পষ্ট করা—যে চিঠিটা তার জন্যই লেখা হয়েছিল, ভুল করে হেডস্যারের হাতে গেছে।

সেই সুযোগ এসে গেল দুপুরবেলা লাইব্রেরিতে। পাঠচক্রের জন্য পুরো ক্লাস পাঠাগারে ছিল, আর সৌমিক জানত—এটাই সঠিক সময়। সে ধীরে ধীরে মীনাক্ষীর পাশে গিয়ে বলল, “একটু কথা বলবি?” মীনাক্ষী তাকাল না, তবে আস্তে করে বলল, “বল।” সৌমিক একটু চুপ করে থেকে বলল, “আমি জানি, তুই জানিস… আমি চিঠিটা তোকে দিতে চেয়েছিলাম। ভুল করে…” — কথাটা বলতেই মীনাক্ষী হঠাৎ তাকাল। চোখে ছিল না রাগ, ছিল না বিদ্রুপ—ছিল একধরনের কৌতূহল। সে বলল, “তুই নিজে বলার সাহস পাইনি কেন?” সৌমিক গলা নিচু করে বলল, “ভয় পেয়েছিলাম… তুই হাসবি, অবহেলা করবি… আর এখন তো সবাই হাসছে।” মীনাক্ষী একটু হেসে বলল, “তোর চিঠি যদি এত হাসির হত, তাহলে হেডস্যার সেটা ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখতেন না।” সৌমিক অবাক হয়ে বলল, “তুই জানিস?” মীনাক্ষী বলল, “আমি কিছুই বলিনি এতদিন। কারণ আমি দেখছিলাম তুই কীভাবে সামলাস এই ব্যাপারটা। তুই সত্যি বলেছিস, এটা সাহসের কাজ।” এই কথায় সৌমিক যেন একটুখানি হাঁফ ছাড়ল। মীনাক্ষী একটু থেমে বলল, “আর একটা কথা—তোর হাতের লেখা ভয়ঙ্কর! আমি যদি পাইও, বুঝতাম না। কিছুটা লেখা তো হেডস্যারও পড়তে পারেননি!” সৌমিক লজ্জায় মাথা নামিয়ে বলল, “তাহলে এবার থেকে প্রিন্ট করে দেব?” দুজনেই হেসে ফেলল, সেই হাসিটায় ছিল অন্যমাত্রার মেলবন্ধন। অনেক অপমান, ভুল, ভয় পেরিয়ে এসে সৌমিক যেন প্রথমবার মীনাক্ষীর চোখে বন্ধুর থেকেও বেশি কিছু হয়ে উঠল।

তবে এই কাহিনি এখানেই শেষ হয়নি। বিকেলে রাজর্ষি চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে গম্ভীরভাবে বলল, “শোন, আমি ঠিক করেছি—আমরা এই ঘটনা একটা নাটক হিসেবে লিখব। নাম হবে ‘প্রেমপত্রের প্রতিক্রিয়া’।” সৌমিক বলল, “তোর তো মাথা খারাপ!” রাজর্ষি মুচকি হেসে বলল, “না রে… ভাব তো—স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে যদি এই ঘটনা নাটক হয়ে মঞ্চে ওঠে, তাহলে কেমন হয়? হেডস্যার নিজের ভূমিকায় অভিনয় করবেন আর আমি… আমি মঞ্জরী ম্যাডামের চরিত্রে!” সৌমিক ধাক্কা মেরে বলল, “তোর দৌড় ওই স্টাফরুম পর্যন্তই থাকবে, এরপর ক্লাসের দরজা তো তোর জন্য বন্ধ হয়ে যাবে!” দুজনেই হেসে উঠল। একটা ভূল, এক টুকরো চিঠি, কিছু কিশোরসুলভ আবেগ—সব মিলিয়ে গড়ে উঠছিল একটা সম্পর্ক, একটা বোঝাপড়া, একটা বন্ধুত্ব, আর হয়তো তার আড়ালেই প্রেমের সেই সূক্ষ্ম আলো। আর সবকিছুর মাঝেই স্কুলজীবনের পাতা হয়ে উঠছিল এক ভোলার মতো নয়, বরং হাসতে হাসতে মনে রাখার মতো অধ্যায়।

তিনদিন সবকিছু বেশ নিঃশব্দে চলার পর হঠাৎ এক সকালে স্কুলে ঢুকেই সৌমিক বুঝল—আবার কিছু একটা হতে চলেছে। স্কুলের প্রধান করিডোরে নোটিস বোর্ডের নিচে কয়েকজন শিক্ষক আর ছাত্রছাত্রী জমায়েত হয়েছেন। হালকা ফিসফাস, চাপা উত্তেজনা। রাজর্ষি দৌড়ে এসে বলল, “দোস্ত, আজ তো ঝামেলা পাকাপাকি! হেডস্যার ও প্রধান শিক্ষিকা ম্যাডাম ক্লাস টিচারদের বলেছে—আজ নবম শ্রেণির দুই ছাত্রকে অফিসে রিপোর্ট করতে!” সৌমিকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। “আবার ডাকা হচ্ছে? এতদিন পর কেন?” রাজর্ষি বলল, “হয়তো ব্যাপারটা স্কুল ম্যানেজমেন্ট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এখন তারা আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট চাইছে। তুই একটা কথা বল, তুই তো বলেই ফেলেছিলি চিঠিটা তোর লেখা। এরপর যদি ওরা বাবা-মাকে ডাকে?” সেই কথাতেই সৌমিকের মুখ শুকিয়ে গেল। এখনও পর্যন্ত যা ঘটেছে, সেটা ছিল অভ্যন্তরীণ একটা কেলেঙ্কারি। এখন যদি অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে যায়, তবে সেটা বোধহয় চিঠি নয়—একেবারে জীবনচক্রের পরিণাম হয়ে দাঁড়াবে। ওদের ক্লাস টিচার বিভা ম্যাডাম এসে নাম ধরে ডাকলেন, “সৌমিক, রাজর্ষি—অফিসে যাও এখনই। দেরি কোরো না।” দুই বন্ধু আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ হাঁটা দিল অফিস ঘরের দিকে, যেন দু’জন সৈনিক চূড়ান্ত রায় শোনার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে যাচ্ছে।

অফিসঘরে ঢুকতেই ঘরের পরিবেশ একেবারে আলাদা লাগল। হেডস্যার অম্লান সরকার সামনে বসা, পাশে বসে আছেন বাসবী ম্যাডাম, আর ডানদিকে একজন অপরিচিত ব্যক্তি—যাকে সৌমিক আগে কখনও দেখেনি। পেছনের দেওয়ালে স্কুলের মানপত্র, মিশন স্টেটমেন্ট আর মূল্যবোধ লেখা—“শৃঙ্খলা, সততা, সংবেদনশীলতা।” সেই তিন শব্দই যেন এবার সৌমিকের দিকে তর্জনী তুলে দাঁড়িয়ে আছে। হেডস্যার একটু কাশি দিয়ে বললেন, “তোমাদের আবার ডাকা হয়েছে কারণ আমরা চাই এই ঘটনাটার ন্যায্য ও নৈতিক সমাধান হোক।” তারপর পরিচয় করিয়ে দিলেন পাশে বসা ভদ্রলোককে—“এঁনি মৃণাল চট্টোপাধ্যায়, স্কুল গভর্নিং বডির সদস্য। তিনি কিছু জানতে চান তোমাদের থেকে।” সৌমিক আবার একবার মাথা নিচু করল। মৃণালবাবু মৃদু গলায় বললেন, “তোমরা এই ঘটনাটার কেন্দ্রবিন্দুতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা ইচ্ছাকৃত হয়েছিল, না নিছক একটি দুর্ঘটনা?” রাজর্ষি জোর দিয়ে বলল, “স্যার, আমি সত্যি ভুল করে চিঠিটা হেডস্যারের টেবিলে রেখে এসেছিলাম! আমি ভাবিনি এটা প্রেমপত্র… আমি খাতা ভেবেছিলাম।” বাসবী ম্যাডাম বললেন, “তোমরা প্রথমেই আমাদের বলেছো, সেটা আমাদের কাছে অনেক বড় কথা। আমরা বিশ্বাস করি—এই বয়সে অনুভূতি থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু প্রকাশের জায়গা গুরুত্বপূর্ণ।” হেডস্যার এবার সামনে ঝুঁকে বললেন, “আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। চিঠির ভাষা এবং উপস্থাপন বেশ পরিণত ছিল, তবে স্কুলের পরিবেশে ওটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল—তোমরা বুঝতে পারো কেন?”

সৌমিক এবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “স্যার, আমি জানি আমি ভুল করেছি। আমার সাহস হয়নি সরাসরি কিছু বলার, তাই লিখেছিলাম। কিন্তু সেটা আমি ওর (মীনাক্ষীর) কাছে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম… আপনি পড়বেন, সেটা আমি কল্পনাও করিনি।” মৃণালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “ভাল, সত্যি বলেছ। তাই আজ তোমাদের বরখাস্ত বা চিহ্নিত করা হচ্ছে না। বরং আমরা চাই এই ঘটনা অন্যদের জন্য শিক্ষার উদাহরণ হোক।” হেডস্যার মৃদু হাসলেন—অনেকদিন পর সেই মুখে হাসি দেখা গেল। তিনি বললেন, “তোমার লেখা খারাপ হয়নি, শুধু ভুল জায়গায় পৌঁছেছে। এই বয়সে যা অনুভব করো, সেটা লিখে রাখা ভালো—কিন্তু পাঠাতে গেলে আরও পরিণত হওয়া দরকার।” বাসবী ম্যাডাম বললেন, “তোমাদের একটা শর্তে মাফ করা হচ্ছে—তোমরা লাইব্রেরি ক্লাবে নিয়মিত থাকবে, এবং স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য কিছু লেখো, যাতে এই লেখার অভ্যাস একটা গঠনমূলক পথে যায়।” রাজর্ষি বলে উঠল, “স্যার, নাটক লিখতে পারি?” চারপাশে হালকা হাসির সুর বাজে। সৌমিক একটু হেসে বলে, “হয়তো আমার চিঠিই একদিন নাটকের পাণ্ডুলিপি হবে।” হেডস্যার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “শুভকামনা রইল। কিন্তু এবার সাবধান হও।” সেই মুহূর্তে সৌমিক বুঝে গেল—শাস্তির ভয়কে পার করে সে প্রবেশ করেছে অন্য এক পরিণতির জগতে, যেখানে মনের অনুভবকে শুধু প্রকাশ করতে হয় না—তাকে শ্রদ্ধা করতেও হয়।

সৌমিক আর রাজর্ষি স্কুল অফিস থেকে বেরিয়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে করিডোরের শেষ মাথার দিকে চলে এল, যেখানে সবার নজর পড়ে না, আর দেওয়ালের গায়ে কিছু পুরনো স্কেচিং আর পোস্টার ঝুলে থাকে। সেখানে দাঁড়িয়ে ওরা দু’জন চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর রাজর্ষি নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, “এবার মনে হচ্ছে, আমরা বেঁচে ফিরলাম। ভাবতেই পারছি না গভর্নিং বডি অবধি পৌঁছে গেছিল ব্যাপারটা!” সৌমিক বলল, “আসলে ওরা আমাদের শাস্তি দিতে চাইছিল না। ওরা বোঝাতে চাচ্ছিল—আমাদের এই আবেগটাকে কিভাবে সম্মানজনক ও দায়িত্ববান উপায়ে প্রকাশ করা উচিত।” রাজর্ষি একটু হেসে বলল, “তবু হেডস্যারের মুখে ‘তোমার লেখা খারাপ হয়নি’ শুনে একরকম আত্মতৃপ্তি তো হচ্ছেই!” এই কথায় সৌমিকও হেসে ফেলল। এই প্রথম সে অনুভব করল, সেই অপ্রস্তুত মুহূর্তগুলো কেমন ধীরে ধীরে তার মনে জায়গা করে নিচ্ছে, যেন সেগুলো শুধুই লজ্জার ছিল না—বরং জীবনের শিক্ষা হিসেবে থেকে যাবে। ওরা বুঝতে পারছিল, বড়রা সবসময় ভুল খুঁজে দিতে চায় না, কখনও কখনও তারা শুধু চায়, ছোটরা একটু একটু করে বড় হোক।

ঠিক তখনই, ক্লাসের বাইরে বেঞ্চে বসে থাকা বাসবী ম্যাডাম হাতের ইশারায় ওদের ডাকলেন। দু’জন গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, “তোমরা জানো, জীবনে অনেক সময় এমন ভুল হবে যেগুলো তোমাদের গর্বিত না করলেও শেখায় অনেক কিছু। আমি চাই, তোমরা নিজের সেই আবেগগুলোকে হীনমন্যতা বা লজ্জা না ভাবো।” তারপর সৌমিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি লেখো। সেটা চিঠি হোক বা কবিতা, গল্প হোক বা স্মৃতি—তুমি যখন কলম ধরো, তখন সেটাকে দায়িত্বের চোখে দেখো। কারণ শব্দের ক্ষমতা অনেক।” সৌমিক মৃদু মাথা নেড়ে বলল, “আমি চেষ্টা করব ম্যাডাম।” রাজর্ষিও বলল, “আমি তো নাটকের ডায়লগই লিখব!” এই কথায় বাসবী ম্যাডাম হেসে ফেললেন, “তবে একটা শর্ত—তোমাদের প্রথম লেখা স্কুল ম্যাগাজিনে যাবে, এবং তাতে এই ঘটনার ছায়াও থাকবে, তবে রূপকভাবে।” রাজর্ষি বলল, “তাহলে তো দারুণ হবে! নাম দেব ‘চিঠি যার, গন্তব্য ভুল’!” তখন মঞ্জরী ম্যাডাম পিছন থেকে বলে উঠলেন, “আমি চাই, রাজর্ষি মঞ্চে হেডস্যারের ভূমিকায় অভিনয় করুক!” সেই মুহূর্তটা যেন পুরো ঘটনার ক্লাইম্যাক্স ছিল—যেখানে একদম হাস্যকর ভুল থেকে উঠে এল এক পাকা বন্ধুত্ব, শিক্ষা, এবং একটা পরিণত মন।

দিনটার বাকি অংশটা যেন স্কুল জীবনের একটা উজ্জ্বল পৃষ্ঠা হয়ে উঠল। কেউ আর সৌমিককে “চিঠিওয়ালা কবি” বলে খোঁটা দিচ্ছিল না—বরং অনেকেই এসে বলছিল, “তুই ঠিক করেছিলিস, রে। সব বলেছিস সামনে। সাহসের ব্যাপার!” মীনাক্ষীও পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলল, “আজ থেকে আবার আগের মতো, ঠিক?” সৌমিক হেসে মাথা নাড়ল। ছুটির সময় স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে ওরা তিনজন—সৌমিক, মীনাক্ষী আর রাজর্ষি—কিছুক্ষণ চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সৌমিক তখন ভাবছিল, একটা প্রেমপত্র যদি ভুল হাতে গিয়ে এত কিছুর জন্ম দিতে পারে, তাহলে সঠিক মানুষকে সঠিক সময়ে বলা—সেটা কতটা শক্তিশালী হতে পারে! রাজর্ষি বলল, “এই ঘটনাটাকে কি আমরা পেছনে ফেলে দিব?” সৌমিক মাথা নাড়ল, “না রে। এটা আমার প্রথম লেখা, প্রথম ভুল, প্রথম শিক্ষা। এটা থাক।” আর দূর থেকে হেডস্যার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনজন কিশোরকে দেখে একটু হেসে নিলেন—একটা ভুল চিঠির পাঠ এখন শেষ, আর তার পাতাগুলো বইয়ের মতো জীবনে গাঁথা হয়ে রইল।

সেমিস্টার ফাইনালের পরের দিন ছিল স্কুল ম্যাগাজিন “উন্মেষ”-এর বার্ষিক প্রকাশ অনুষ্ঠান। অডিটোরিয়ামের মঞ্চ আলোকোজ্জ্বল, চেয়ারগুলো সারিবদ্ধ আর দর্শকসারিতে শিক্ষক, অভিভাবক আর ছাত্রছাত্রীদের গুঞ্জন। সবার হাতে বইয়ের একটি কপি, আর তার ঠিক মাঝ বরাবর একটা গল্প—“ভুল ঠিকানার চিঠি”—লেখক: সৌমিক দে। গল্পটা কোনো নির্দিষ্ট নাম বা স্কুলের উল্লেখ ছাড়াই একটা কিশোরের ভুল ঠিকানায় পাঠানো চিঠি ঘিরে আবর্তিত, কিন্তু যাঁরা পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, তাঁরা জানতেন, এই লেখার পেছনে লুকিয়ে আছে হাসি, কান্না, আতঙ্ক আর ভীষণ রকম পরিণত হওয়ার এক অভিজ্ঞতা। হেডস্যার মঞ্চে উঠে সংক্ষিপ্ত ভাষণে বললেন, “আমরা সবসময় বইয়ের পৃষ্ঠায় শিক্ষার সন্ধান করি। কিন্তু জীবনই যখন বই হয়ে ওঠে, তখন তা আরও বেশি অর্থবহ হয়। আমি গর্বিত যে আমাদের ছাত্ররা আজ নিজেদের ভুল থেকে শিখে লিখেছে, বুঝেছে, এবং অন্যদের শেখাতে পেরেছে।” দর্শকাসনে বসে থাকা সৌমিক প্রথমবার বুঝল—তার সেই ভাঁজ করা প্রেমপত্র, যেটা এক ভুল গন্তব্যে পৌঁছেছিল, সেটাই আজ তাকে তুলে এনেছে একটা এমন জায়গায়, যেখানে সবাই তাকে একজন লেখক হিসেবে চেনে।

অনুষ্ঠানের পরের দিন স্কুল ছিল নিরুদ্বেগ, রেজাল্ট প্রকাশের অপেক্ষা, পরীক্ষার চিন্তা পেরিয়ে স্কুলের করিডোরে একটা অলসতা ছড়িয়ে ছিল। সৌমিক লাইব্রেরিতে ঢুকতেই মীনাক্ষী বলল, “তোর গল্পটা পড়ে একবারও হাসিনি। সত্যি বলছি, চোখে জল এসে গেছিল।” সৌমিক অবাক হয়ে বলল, “তুই তো কখনও এতটা সোজাসুজি কিছু বলিস না!” মীনাক্ষী হেসে বলল, “যখন কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে তাতে গল্প বানাতে পারে, তখন তার সামনে সত্যিটা বলতে দ্বিধা থাকে না। তুই চিঠিটা আমায় দিতে পারিসনি, কিন্তু আমার জন্য লেখা ছিল সেটা—এটা এখন আমি জানি।” সৌমিক এবার আর হকচকিয়ে গেল না। শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম তুই জানিস… কিন্তু জানতাম না এটা এত বড় হয়ে যাবে।” মীনাক্ষী একটু থেমে বলল, “আমরা সবাই বড় হচ্ছি, সৌমিক। ভুল থেকেই মানুষ শেখে। এখনো সময় আছে, কিন্তু এবার যদি কিছু বলতেই হয়—তাহলে মুখোমুখি বলিস, কাগজে না।” সৌমিক মুচকি হেসে বলল, “ওকে। তাহলে এবার তোর জন্য কিছু লিখলে সেটা ডায়রিতে রাখব, কেবল তুই পড়বি।” ওরা দুজনেই হেসে ফেলল, আর লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে ছিল সেই কাগজের শেষ প্রতিচ্ছবি—ভুলে যাওয়ার নয়, বরং স্মরণে রাখার মতো।

সেই বছরের শেষদিকে, স্কুলের নাট্যদলের চূড়ান্ত পরিবেশনা ছিল একটি হাস্য-নাটক: “প্রেমপত্র বিভ্রাট”। মঞ্চে হেডস্যারের চরিত্রে রাজর্ষি, হাতে এক চিঠি নেড়ে বলছে, “এই কাগজে প্রেম আছে, ব্যাকরণ নেই!” দর্শকাসনে হেডস্যার নিজে হেসে মাথা নাড়লেন। পর্দা নামার পর সৌমিক পেছনে গিয়ে হেডস্যারকে বলল, “স্যার, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যদি সেদিন রাগ করতেন, আমি হয়তো আবার কখনও লিখতেই পারতাম না।” হেডস্যার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “কখনও নিজের অনুভূতি থেকে লজ্জা পেয়ো না। শুধু মনে রেখো—সেগুলো সঠিক ভাষা আর সঠিক সময়ে প্রকাশ করাটাই শিল্প।” সেই রাতে, সৌমিক নিজের পুরনো ডায়েরি খুলে সেই চিঠিটা আবার পড়ল। কাগজটা একটু হলুদ হয়ে গেছে, ভাঁজগুলো নরম হয়ে এসেছে, কিন্তু প্রতিটা শব্দে সেই প্রথম ভালোবাসা, সেই প্রথম ভুল, আর সেই ভুল থেকে ওঠা জীবনের প্রথম শিক্ষা—সবই স্পষ্টভাবে লেখা ছিল। এবার সে সেই পাতার পাশে নতুন করে লিখল—“এই গল্পের শুরু ভুল ছিল, শেষটা ঠিকঠাক হলো। আর তাতেই এই কাগজের প্রেমপত্র তার আসল গন্তব্যে পৌঁছল।”

সমাপ্ত

1000036028.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *