Bangla - প্রেমের গল্প

পোস্তার দেশে প্রেম

Spread the love

শৌণক ভট্টাচার্য


পর্ব ১

১৮৫৪ সাল। মালদার আকাশে তখনও ভেসে বেড়ায় পোস্ত গাছের হলুদ ফুলের গন্ধ, অথচ সে সৌরভে ছিল না কোনও পরিত্রাণ। জেলাশহরের বাইরে, রামনগর গ্রামের শেষ প্রান্তে, মাটির ঘরে বাস করত এক তরুণ কুমোর—রাজীব দাস। বয়স চব্বিশ, চোখে ধুলো-মাখা রোদ্দুর, আর হাতের মধ্যে মাটির ভাষা। সে হাঁস-মুরগি পালত না, জমি করত না—সে কেবল মাটি গড়ত, শুকোত, পোড়াত। তার কথা বলার চেয়ে সে হাতেই বেশি বলত।

তবু সেই বছর বসন্তকাল রাজীবের জীবনে অন্যরকম। জমিদারের চাহিদা কমেছে, গ্রামে মানুষ মুখ ফিরিয়েছে তার কাজ থেকে। অথচ শহর থেকে বারবার চিঠি আসছে—”লেবার চাই, অর্ডার চাই, পোস্ত চাই।”

একদিন সন্ধ্যায়, মা চুপ করে বসে ছিলেন তালপাতার পাটিতে, উনুনের ধারে। রাজীব এসে বলল, “মা, আমি শহরে যাবো। কাজ পেলে আফিম কারখানায় ঢুকবো।”

মায়ের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। “পোস্তর গন্ধ শরীরে লাগলে মন মরে যায়, বাবারে,” তিনি বললেন। “ওখানে গন্ধটাই বিষ।”

রাজীব চুপ করে বসে রইল। গন্ধের ভাষা সে জানে না, কিন্তু জানে—এই গ্রামে আর কিছু নেই তার জন্য।

মালদার শহরের একেবারে প্রান্তে তখনও চলছিল ইংরেজদের আফিম গোডাউন। চওড়া কাঠের গেট, ভিতরে দীর্ঘ হলঘর, কাঠের পাটাতন, আর সারি সারি ধূসর বাক্স—যাতে শুকনো পোস্ত মেশানো হচ্ছে ঘন তরলে। ইংরেজ বাবুরা এটাকে বলতেন “মালদা কনসোলিডেটেড ওপিয়াম ফ্যাক্টরি।”

রাজীব প্রথম ঢোকে লেবার হিসেবে, নাম লেখায় স্থানীয় গোমস্তার কাছে। সেই গোমস্তা ছিল মধ্যবয়সী এক দেশীয় কর্মকর্তা, নাম ব্রজকিশোর সান্যাল, যার কণ্ঠে ছিল মিশ্রণ—ভদ্রতার আর ভয় দেখানোর।

প্রথম দিনেই রাজীব টের পেল, এখানে মানুষ নয়, গন্ধই রাজা। একবার ঢুকে পড়লে, পোস্তর ধোঁয়া মনের ভেতর ঢুকে থাকে। শুরুর দিকে মনে হয় মিষ্টি গন্ধ, পরে লাগে মাথা ঘোরানো, আবারও পরে… নিঃশব্দ হাহাকার।

তবু সে প্রতিদিন সকালে ঢোকে, ব্যাগ ফেলে রাখে লকারে, আর লম্বা বাঁশের কাঠি দিয়ে সেদ্ধ পোস্তর পেষ্টর মধ্যে নাড়াচাড়া করে। কোনও কথা নয়, কেবল হাত চলে।

একদিন দুপুরে, ফ্যাক্টরির পিছনের পাথরের সিঁড়িতে বসে জল খাচ্ছিল রাজীব। তখনই প্রথম দেখল তাঁকে—
একজন মেয়ে, হয়তো রাজীবের বয়সের আশেপাশে, একপাশে গমগমে নীল ওড়না, চোখে কাঁচা বিষন্নতা, আর হাতে খাতা।

সে ছিলেন ফিরোজা। কেউ বলে তাঁর আসল নাম ফিরোজা খাতুন, কেউ বলে ফিরোজা বেগম। কেউ বলে তিনি হিসেব রক্ষার কাজ করেন, কেউ বলে তিনি নাকি ইংরেজদের বিশেষ বিশ্বস্ত।

কিন্তু রাজীব জানত না কিছুই। সে শুধু তাকিয়েছিল। ফিরোজার গলায় একটা রূপোর লকেট ছিল, যাতে ছিল আরবি হরফে লেখা কিছু, আর চোখে এমন একটা ভাষা, যা রাজীব কোনওদিন মাটিতে গড়েনি।

পরের দিন কাজে যাওয়ার সময়, রাজীব পিছন থেকে শুনল এক কণ্ঠ—
“আপনি কুমোর?”

সে ঘুরে দেখল—ফিরোজা দাঁড়িয়ে। মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই।

“হ্যাঁ,” সে বলল।

“আপনার কাজ আমি দেখেছি। আপনার হাতের মাটি, অনেক বলছে। আপনি কি জানেন, আফিম যেই মাটির পাত্রে রাখা হয়, সেটাই একদিন বিষ হয়ে ওঠে?”

রাজীব চমকে গেল। কথাগুলো অদ্ভুত। তিনি কি ইংরেজদের হয়ে কাজ করছেন, না তার বিপরীত?

“আপনি কি এখানে কাজ করেন?”

ফিরোজা হেসে বললেন না, মাথা নেড়েও না। শুধু বললেন, “সবাই কাজ করে, কেউ ফাইলে, কেউ আগুনে।”

এরপর ফিরোজা চলে গেলেন, সিঁড়ি বেয়ে ওপরের কাঠের ঘরে।

সেই রাতেই রাজীব স্বপ্ন দেখল—সে হাত দিয়ে মাটি গড়ছে, কিন্তু তা শুকিয়ে যাচ্ছে আগুনের আগে। চারপাশে পোস্ত ফুলের গন্ধ, কিন্তু গন্ধটার মধ্যে কারও কান্না। কে যেন তাকে বলছে, “পাত্রটা ভাঙো… ভাঙো…” সে তাকিয়ে দেখে—ফিরোজা দাঁড়িয়ে।

সকালবেলা চোখ খুলে বুঝল—এটা শুধু স্বপ্ন নয়, এটা কোনও ভাষা।

পরদিন ফ্যাক্টরির ভিতর অদ্ভুত এক গুঞ্জন ছড়ায়—একটা চিঠি খুঁজে পাওয়া গেছে, যাতে নাকি লেখা রয়েছে ব্রিটিশ অফিসারদের নাম ও পরিমাণে পাচার হওয়া আফিমের রেকর্ড।

সবাই ভাবছে এটা ভেতরের কেউ করেছে। ফিরোজার দিকে কেউ কিছু বলে না, কিন্তু গুমগুমে পরিবেশে রাজীব দেখল, তাঁর চোখ আগের মতো স্থির নয়।

সেদিন দুপুরে ফিরোজা এসে রাজীবকে বললেন, “আপনার মাটির হাঁড়ি তৈরি হয়েছে?”

রাজীব মাথা নাড়ল।

ফিরোজা বললেন, “আমি একদিন আপনাকে নিয়ে যাব এমন একটা জায়গায়, যেখানে মাটি শুধু পাত্র নয়—ওটা স্মৃতি। আপনি কি আসবেন?”

রাজীব কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখ, সেই চোখ, যা আগুনে পোড়ানো হাঁড়ির গায়ে ফাটল চেনে—সেই চোখ হ্যাঁ বলেছিল।

পর্ব ২

ফ্যাক্টরির কাজ শেষ হতে হতে রাত নামত মালদার আকাশে। ধোঁয়ায় ঢাকা চাঁদ যেন পোস্তের সাদা রসের মতো ঝাপসা। সেদিন রাজীব অপেক্ষা করছিল গোডাউনের পেছনের পুরনো খড়ের গুদামের কাছে—যেখান থেকে ফিরোজা বলেছিলেন তাকে নিয়ে যাবেন কোথাও।

চারপাশ নিঃশব্দ, শুধু মাঝে মাঝে গরুর গাড়ির চাকা কাঁদায় চেপে গিয়ে একটা আর্দ্র শব্দ তুলছিল। ফ্যাক্টরির ভিতরের আলো নিভে গেল একে একে। তখন, যেন কুয়াশার ভিতর থেকে এসে দাঁড়ালেন ফিরোজা।

“চলুন,” বললেন তিনি। তার গলায় ছিল রক্তচন্দনের গন্ধ, খুব হালকা, কিন্তু স্পষ্ট।

রাজীব কিছু না বলেই হাঁটতে শুরু করল। তারা ফ্যাক্টরির পিছনের ঘাসজমি পেরিয়ে গেল, যেখানে গবাদি পশুর দল গুমোট করে পড়ে থাকত দিনে। সেখান থেকে একটা সরু ধুলোভরা পথ, দু’পাশে নারকেল গাছ আর পোস্তগাছের বুনো ঝাড়, আর সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল একটা পুরনো ইটের কাঠামো—যেটা কোনওদিন জমিদারদের পোস্ত মজুত রাখার গুদাম ছিল।

ভিতরে ঢুকতেই রাজীব দেখল—একটা টেবিল, যার ওপর রাখাছিল ছেঁড়া মানচিত্র, একটা মাটির প্রদীপ, আর দু’জন লোক—একজন শাদা ধুতি আর নীল কুর্তিতে, আরেকজন পরনে ফাটা কুর্তা, চোখে কালো টান।

ফিরোজা বললেন, “এঁরা আমার সহযোদ্ধা—প্রফুল্ল ও রফিক। এঁরা আপনাকে জানতেন না। এখন জানবেন।”

রাজীব চমকে উঠল। তার মুখ দিয়ে কথাই বেরোল না। ফিরোজা নিজেই বললেন, “আপনার তৈরি করা পোস্তর হাঁড়ি দিয়ে পেছনের পথে মজুত করা আফিম আমরা পাচার করি, ইংরেজদের চোখ এড়িয়ে। কিন্তু আমরা শুধু পাচার করি না, আমরা খবর পাঠাই—কে কত পাচার করছে, কোন গোমস্তা ঘুষ খাচ্ছে, কোন ইংরেজ কাদের কিনছে।”

“আর এই কাজ আপনারা—?” রাজীব প্রশ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু গলা শুকিয়ে গেল।

“এই কাজ আমরা করছি, কারণ কেউ না করলে ইতিহাস শুধু মৃতদের নাম মনে রাখবে। যাঁরা বেঁচে থাকবেন, তাঁরা কেবলই মজুর।”

প্রফুল্ল এগিয়ে এসে বললেন, “আপনি কাজ করেন, হাতের ছাপে কথা বলেন। আমরা চাই, আপনি এই কাজের পাশে থাকুন। আপনার মাটির হাঁড়ি শুধু পাত্র নয়—ওটা খবর পৌঁছানোর উপায়। আপনি তৈরি করবেন, আমরা তা পৌঁছে দেব।”

রাজীব মাথা নিচু করল। তার মনে চলছিল এক অন্য যুদ্ধ—সে কি কেবল একজন কুমোর, নাকি সে হয়ে উঠবে ইতিহাসের একজন ক্ষুদ্র অথচ অদৃশ্য সৈনিক?

সে ধীরে বলল, “আমি তৈরি করব। কিন্তু একটা কথা…”

ফিরোজা তাকালেন তার দিকে।

“আমি জানতে চাই, আপনি কে? আপনি শুধু একজন হিসেবরক্ষক নন, আমি জানি।”

ফিরোজা হাসলেন না। বরং ধীরে মাটির প্রদীপের আলোয় একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন।

সেখানে লেখা ছিল:
“ফিরোজা খাতুন, তৎকালীন কুচবিহারের রাজবাড়ির শিক্ষক পরিবারের কন্যা। পিতৃগৃহ ধ্বংস হয় ১৮৫০ সালের দাঙ্গায়। এরপর ছদ্মবেশে প্রবেশ করেন মালদার পোস্ত ফ্যাক্টরিতে। দায়িত্ব—গোপন তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ।”

“আমি শুধু বিপ্লবী নই, রাজীব,” ফিরোজা বললেন। “আমি নিজের পরিচয় হারানো এক নারী, যে গান গাইত, কিন্তু এখন শুধু খবর পাঠায়।”

রাজীব মাথা নিচু করে ফেলল। তার হৃদয়ের মধ্যে যেন এক কুয়াশা জমছিল—যা প্রেম নয়, ভয় নয়, বরং একধরনের শ্রদ্ধা।

এরপরের দিনগুলো বদলে গেল রাজীবের জন্য।
সে আগের মতোই কাজে যেত, মাটির হাঁড়ি বানাত, তবে এবার তার ভিতর থাকত চিহ্ন—মাটি একটু মোচড় দিয়ে বসানো, রিমে ছোট্ট দাগ, অথবা ভিতরের তলায় পোড়া কালি দিয়ে লেখা সংখ্যার মতো কোড।

রফিক এসে সেই হাঁড়ি নিঃশব্দে নিয়ে যেত, মালামালের সঙ্গে গুদামে পৌঁছে দিত। তার বিনিময়ে কিছু পয়সা পেত রাজীব, কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল—প্রতিদিন কাজ শেষে, গুদামের সিঁড়িতে কিছুক্ষণ ফিরোজার সঙ্গে বসা।

সেই বসায় ছিল না ছোঁয়া, ছিল না প্রেমের প্রথাগত ঘোষণা।
ছিল কিছু শব্দ—
“আজ আবার ছদ্মবেশে এলাম।”
“আজ ব্রজকিশোর সাহেব সন্দেহ করছে।”
“আজ গাছপাকা পোস্ত অনেক বেশি গন্ধ ছড়াচ্ছে… তুমি টের পাচ্ছো?”

রাজীব শুধু বলত, “আজ তোমার চোখে ঘুম নেই।”
আর ফিরোজা বলতেন, “আজ আর ঘুম নেই আমার দেশে।”

কিন্তু সমস্ত নিঃশব্দ কাজের মতোই, একদিন সেই ছায়া ফেটে বেরিয়ে এল সূর্যের মতো।

একদিন সকালে রাজীব যখন কাজে যায়, দেখে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুই ইংরেজ অফিসার। একজনের হাতে কাগজ, আরেকজনের হাতে তালিকা।

“সন্দেহভাজন নামের তালিকা তৈরি হয়েছে,” গোমস্তা ব্রজকিশোর জানালেন। “কিছু পোস্তর হাঁড়িতে গোপন সংকেত পাওয়া গেছে।”

রাজীব চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হচ্ছিল, পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠছে। কেবল একটিই শব্দ মাথায় বাজছিল—“ফিরোজা জানে কি?”

সে সেদিন কাজে যায়নি। সে সোজা ছুটে গেল সেই পুরনো গুদামের দিকে।

কিন্তু পৌঁছে দেখল—ওখানে কেউ নেই। টেবিল নেই, মানচিত্র নেই, প্রদীপ নেই।
শুধু একটা মাটির হাঁড়ি পড়ে আছে, যার তলায় লেখা—

“ভুলে যেয়ো না, প্রেম ও বিপ্লব—দুটোই ছদ্মবেশে আসে। অপেক্ষা করো। — ফ”

পর্ব ৩

রাজীব যখন পোস্তর গুদামের ভাঙা দেয়ালে হেলান দিয়ে হাঁপাচ্ছিল, তখন দুপুরের রোদ মাথার উপর এসে পুড়ছিল। আশেপাশে কোনো মানুষ নেই, কেবল পোস্ত ফুলের গন্ধে ভরা বাতাস। সে জানে, এই নীরবতা শূন্য নয়—এই নীরবতার মধ্যে ফিরোজা আছে। অথবা তার ছায়া।

যে মাটির হাঁড়ি এতদিন তার হাত গড়েছিল খবর পৌঁছনোর জন্য, সেই হাঁড়িই আজ তার সামনে পড়ে আছে, ভাঙা নয়, অক্ষত—কিন্তু ভিতরে ফিরোজা নেই, কণ্ঠ নেই, চোখ নেই।

হাঁড়ির তলায় লেখা কালি মুছে যাওয়ার মতো, কিন্তু বার্তাটি যেন স্থির—
“ভুলে যেয়ো না, প্রেম ও বিপ্লব—দুটোই ছদ্মবেশে আসে। অপেক্ষা করো।”

রাজীব জানে, সে অপেক্ষা করবে। কিন্তু সে জানে না কতকাল। কিংবা, কিসের জন্য।

সেদিন রাতেই রাজীবকে ডেকে পাঠায় ফ্যাক্টরির কর্তৃপক্ষ। ব্রজকিশোর সান্যাল মুখে থুতনিতে হাত রেখে বলে, “তোমার নাম তালিকায় ছিল, রাজীব। কিন্তু আমরা কিছু পাইনি তোমার বিরুদ্ধে। তোমার তৈরি হাঁড়ি কোডবিহীন। তুমি পরিষ্কার।”

রাজীব কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখ বলছিল, তুমি ঠিক দেখছো না।

ব্রজকিশোর হেসে বলল, “তবে সাবধান থাকো। অনেকেই বদলে গেছে এখানে। অনেক মুখ নতুন। সবার গায়ে ইউনিফর্ম নেই।”

রাজীব বুঝল, সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। অথবা, ভয় দেখানো।

পরদিন ফ্যাক্টরির কাজে ফিরে গেল সে। হাত আবার নেমে এল মাটির গায়ে, আঙুল ঘুরে ফিরল চক্রাকারে, কিন্তু সুর হারিয়ে গেছে। আগে যেখানে হাত চলত প্রেম ও আশা নিয়ে, এখন সেখানে ভর করছে বিষণ্ণতা।

তবু কাজ করতে হয়।

কিন্তু হঠাৎ একটা জিনিস চোখে পড়ে—গুদামের চতুর্থ বেসমেন্টে নতুন একজন নারী কাজ করছেন, পোশাকে খুব সাধারণ, মুখে ওড়নার ঘের। রাজীব একবার তাকিয়ে থেমে যায়। কেমন যেন চেনা লাগছে মুখের ভঙ্গিমা।

সে সেদিন কাজ শেষে ইচ্ছে করে নিচে যায়। এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখে সেই মেয়েটি খাতা লিখছেন। পায়ের পাশে রাখা একটি পিতলের পাত্র, তার মুখ ঢাকা সুতির কাপড়ে।

মেয়েটি মুখ তুলে তাকালেন।

চোখদুটো পরিচিত।

রাজীবকে দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য বিস্মিত হল, তারপর মাথা নিচু করে কাজ চালিয়ে যেতে লাগল।

রাজীব আস্তে গিয়ে বলল, “আপনি ফিরোজা?”

মেয়েটি চুপ।

“আপনি যদি ফিরোজা না হন, তাহলে জানবেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন অপেক্ষা করতে। আর আমি করেছিলাম।”

মেয়েটি ধীরে মুখ তুলে বললেন, “আমি ফিরোজা নই। কিন্তু কেউ কেউ আমাকে সুলতানা বলে। আমি রেজিস্টার লিখি। আর বেশি কিছু জানি না।”

রাজীব হাসল না। কিন্তু মৃদু স্বরে বলল, “আপনার ডান চোখের নিচে একটা দাগ আছে। ফিরোজারও ছিল।”

মেয়েটি এবার চোখ নামিয়ে বলল, “আপনার চোখ খুব তীক্ষ্ণ, মৃৎশিল্পীর মতো। হয়ত আপনি ঠিক দেখেছেন, হয়ত না। কিন্তু এখন যদি আপনি কিছু বলেন, আপনি বিপদে পড়বেন। আমিও।”

রাজীব চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বলল, “আপনি চাইলে আমি কিছুই বলব না। শুধু জানতে চাই, আপনি ঠিক আছেন তো?”

মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, “এখনও আছি। যতদিন খবর পৌঁছায়, ততদিন বেঁচে আছি।”

সেই সন্ধ্যাটা অন্যরকম ছিল। রাজীব ফিরে এল বাড়িতে, কিন্তু ঘরের বাতাসে আজ অন্য গন্ধ। মা ভেতর ঘরে, চুপ করে বসে আছেন, হাতে তুলসীজল।

“তোর জন্য ভয়ে ছিলাম, রাজীব। শহরে যা হচ্ছে, জানিস না কি?”

“জানি মা,” রাজীব বলল। “কিন্তু জানিস, আমি একজনকে পেয়েছি—আবার, নতুন করে।”

মা কিছু বলেন না। শুধু একবার বলেন, “মেয়ে হলে বুঝতিস, কেমন করে ফিরে ফিরে যেতে হয়, অচেনা পরিচয়ে।”

এরপরের কয়েক সপ্তাহ ফ্যাক্টরিতে রাজীব আর ‘সুলতানা’র মধ্যে কোনও সরাসরি কথা হয়নি। কিন্তু দুইজন জানত—তারা জানে। ফের একদিন হাঁড়ির ভিতরে রাজীব রেখে দিল একটি ছোট কাগজ—
“এই শহরে প্রেম টিকে থাকে না। তবু আমি দাঁড়িয়ে থাকি।”

পরের দিন হাঁড়ি খুলে সে দেখল, তার কোণে লেখা এক লাইনে উত্তর—
“আমি জানি, তুমিই সেই মাটি যা ভাঙলেও গন্ধ রেখে যায়।”

কিন্তু ঠিক তখনই মালদায় ইংরেজ কর্তৃপক্ষ কড়া হতে শুরু করে। আফিম পাচারের অভিযোগে কয়েকজন স্থানীয় লেবার গায়েব হয়ে যায়। গোমস্তা ব্রজকিশোর নিজে অন্তরালে চলে যায়। গুদামে আসতে শুরু করে নতুন, অচেনা মুখ—তারা ইংরেজ নয়, দেশীয় মুখ, কিন্তু চাহনিতে পুলিশের ঘ্রাণ।

সুলতানা/ফিরোজা কাজ বন্ধ করে দেয়। আর আসেন না সেই রেজিস্টার ঘরে।

রাজীব জানে না তিনি কোথায় গেলেন।

একদিন খবর এল—মালদার একটি গ্রামে পোস্তভর্তি বস্তা থেকে পাওয়া গেছে গোপন চিঠিপত্র, কোডে লেখা।

পরদিন গোডাউন সিল করে দেওয়া হয় এক সপ্তাহের জন্য।

রাজীব বুঝে যায়, আর সময় নেই।

সে হাতের সব মাটি পুড়িয়ে তৈরি করে একটি বড় হাঁড়ি—কিন্তু তার তলায় সে বসায় তিনটি ইট-আকৃতির পোড়ামাটির ফলক। তার মধ্যে লেখা—
“ফিরোজা, তুমি থাকো না থাকো, আমি মাটি ছুঁয়ে যাবো। তুমি যদি ফিরে আসো, এই হাঁড়ি থাকবে।”

তারপর সেই হাঁড়ি সে রেখে দেয় সেই পুরনো গুদামে, পোস্ত গাছের ছায়ার নিচে।

পর্ব ৪

মালদার শেষ শীতের রাত। আকাশে চাঁদ উঠেছে, কিন্তু তার আলো রুদ্ধ, যেন এক পর্দা টেনে রাখা হয়েছে—যেন চাঁদ নিজেও কিছু দেখাতে চায় না। রাজীব বসে আছে নিজের বাড়ির উঠোনে, হাতে পুরনো এক পোড়া হাঁড়ি, যার গায়ে আঁচড় দিয়ে লেখা—“ফিরোজা”।

এমন সময় ধীরে ধীরে পায়ে হেঁটে এল এক বালিকা। বয়স বড়জোর বারো, গায়ে কাঁথা জড়ানো, চোখে একরাশ ঘুম আর দূরত্ব।

সে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনি রাজীবদা?”

রাজীব উঠে দাঁড়াল। “তুমি কে?”

বালিকা বলল, “আমার নাম হীরা। আমার কাকা ওখানে কাজ করে, ঝাঁসির কাছে। আমি ফিরোজাদির খোঁজে এসেছি।”

রাজীব থমকে গেল। “তুমি ফিরোজাদিকে চিনো?”

হীরা বলল, “চিনি না, কিন্তু একটা বার্তা এনেছি। বলেছিলেন, যদি কেউ ‘আলোকছায়া’ শব্দটা জানে, তবে সে-ই ঠিক মানুষ। আপনি কি জানেন?”

রাজীব দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। তারপর বলল, “হ্যাঁ, আমি জানি। আলোকছায়া ছিল ফিরোজার বানানো এক গোপন শব্দ। যার মানে—ছায়ার আড়ালে আলো ছড়িয়ে দেওয়া।”

হীরা পকেট থেকে একটা মুড়কি করা চিঠি বের করল।
রাজীব হাতে নিয়ে খুলল।

চিঠির ভিতরে লেখা—

“যদি আমার কণ্ঠ আর শুনতে না পাও, আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে ভাববে না।
আমি এখন ঝাঁসিতে, বিদ্রোহের আগুনের কাছাকাছি।
এখানে আমাকে কেউ ফিরোজা বলে না—বলছে সীতাবাঈ।
তুমি যদি আমাকে শেষবারের মতো দেখতে চাও, তবে এসো।
তুমি না এলে, আমি হয়তো আর ফিরে যাব না।”

চিঠির নিচে নাম নেই। সই নেই। কিন্তু ভাষায় ছিল সেই গভীর ছায়া—যেটা রাজীব একদিন চোখে পড়েছিল।

পরদিনই রাজীব রওনা দিল। সঙ্গে নিল মাত্র দুটো হাঁড়ি—একটায় পোস্ত শুকনো, আরেকটায় পোড়ামাটির কোড। তার মায়ের চোখে জল ছিল, কিন্তু ঠোঁটে কোনও বাধা নয়।

“তুই যাস, কিন্তু ফের যেন ঘরে ফিরিস, রাজীব,” তিনি বলেছিলেন।

শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে, তারপর পায়ে হেঁটে, নদী পেরিয়ে, অবশেষে পৌঁছল ঝাঁসির প্রান্তে—এক মফস্বল গ্রামের নাম কড়েয়া। চারদিকে পোস্ত নয়, এখানে আফিম চাষের চেয়ে বড় বিষয় বিদ্রোহের গুজব।

গ্রামের প্রান্তে একটা পুরনো কুঁড়েঘরে দেখা মিলল হীরার কাকার—একটি বয়স হওয়া মানুষ, নাম নানকু হাজরা।

তিনি বললেন, “তুমি মালদা থেকে এসেছো? ও তো বলেছিল—‘আমার কেউ আসবে না, কারণ আমার পাশে থাকলেই বিপদ বাড়ে।’”

রাজীব কিছু বলল না। তার চোখ খুঁজছিল সেই মুখ—যে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে, ছায়ার মতো হারিয়ে গেছে ইতিহাসে।

নানকু বললেন, “তুমি ওকে দেখতে পাবে, তবে এখন নয়। সন্ধের সময় একটা পুকুরের ধারে যায় সে, গায় গান। কেউ কিছু বলে না, কারণ ওর কণ্ঠে রয়েছে আগুন।”

সন্ধ্যাবেলা। রাজীব একা গেল পুকুরের ধারে। মাটি স্যাঁতসেঁতে, পুকুরে জল ধূসর। গাছের পাতা পড়ে আছে চারদিকে। পেছন থেকে গলায় এল এক সুর—

“ধোঁয়ার নিচে আমি দেখি আগুনের ছবি
কেউ বলে মেয়ে, কেউ বলে ছদ্মনাম
আমি শুধু পুড়তে জানি…”

রাজীব স্তব্ধ হয়ে গেল। গলা ছিল পাল্টে যাওয়া, কিন্তু সুর ছিল সেই আগের।

সে ধীরে পেছন ফিরে দেখল। একজন নারী বসে আছেন পাথরের ওপর, মাথায় কাপড়, কণ্ঠে কাঁপন। চোখে দেখা যায় না পরিষ্কার, কিন্তু চেহারায় আছে গাঢ় চেনা কিছু।

“ফিরোজা?” সে জিজ্ঞেস করল।

নারী তাকালেন। চোখে ছিল বিষন্নতা।

“তুমি এসেছো?”

“তুমি না বলেছিলে, প্রেম আর বিপ্লব—দুটোই ছদ্মবেশে আসে?”

“হ্যাঁ,” ফিরোজা বললেন, “কিন্তু আজ আর কোনও ছদ্মবেশ নেই। আমি এখন বিদ্রোহী। আমি এখন সীতাবাঈ। আমার নাম আর ফেরে না গুদামের হিসেবখাতায়।”

রাজীব এগিয়ে গেল। “আমি জানি। আমি এসেছি শুধু একটা কথা বলার জন্য।”

“কি?”

“তুমি ফেরো না যদি, আমি গান গাইব। তুমি কথা না বললে, আমি কোড লিখব। তুমি হারিয়ে গেলে, আমি হাঁড়ির তলায় লিখে রাখব—‘ফিরোজা বেঁচে আছে।’”

ফিরোজা হেসে ফেললেন। অনেক দিন পর, এক মুক্ত, সোজাসুজি হাসি।

“তুমি জানো, এই প্রেমটা সত্যিই বিপজ্জনক?”

“আমি জানি। কিন্তু বিপ্লব কি কখনও নিরাপদ ছিল?”

সেই রাতে, তারা দুজন আবার একসঙ্গে বসে রচনা করল নতুন এক কোড—এবার আর স্রেফ বার্তা নয়, এবার গান।
রাগ আলোকছায়া-এর ওপর তৈরি সেই গান গাওয়া হবে ঝাঁসির মেলায়, যেখানে ইংরেজ গোয়েন্দারাও থাকবে ছদ্মবেশে। আর সেই গানে থাকবে এমন শব্দ, যা বোঝাবে পরবর্তী পদক্ষেপ—আফিম ফ্যাক্টরির বিদ্রোহ কবে শুরু হবে, কে কোথায় কী করবে।

সুরে ছড়াবে বিপ্লব। আর কণ্ঠে থাকবে প্রেম।

পর্ব ৫

ঝাঁসির বার্ষিক মেলা। গেটের পাশে টাঙানো ত্রিকোণ কাপড়ে লেখা—“লোকগান প্রতিযোগিতা: নারী শিল্পীদের উৎসর্গ”। প্যান্ডেলের ভিতর পাটকাঠির গন্ধ, সিঁদুরি আলো, আর মঞ্চের ওপর ঝোলানো সাদা রুমাল, যাতে সোনালি সুতায় বোনা পদ্ম।

কিন্তু আজকের মঞ্চে গান শুধু গান নয়।
আজকের গান এক বার্তা।
যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি ইংরেজ প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে ছড়িয়ে দেবে সঙ্কেত—বিপ্লব কবে, কোথায়, কিভাবে শুরু হবে।

মঞ্চের পেছনে ফিরোজা বসে আছেন—আজ তিনি “সীতাবাঈ”। চোখে কৃত্রিম কাজল, ঠোঁটে ঈষৎ গেরুয়া রঙ, কানে নূপুর, কিন্তু ভেতরে ঝড়। পাশে রাজীব দাঁড়িয়ে, তার হাতে হারমোনিয়াম—আজ সে গাইবে না, শুধু তান তুলে দেবে সেই সুরে, যেটা ছায়ার ভিতর থেকে আলো হয়ে ওঠে।

“তুমি প্রস্তুত?” ফিরোজা ধীরে বলল।

রাজীব মাথা নেড়ে বলল, “তুমি গাও। আমি তোমার গলা অনুসরণ করব। যেমন প্রথম দিন করেছিলাম।”

তখনই ঘোষক ঘোষণা দিলেন—
“পরবর্তী শিল্পী—সীতাবাঈ, কড়েয়া গ্রামের পক্ষ থেকে। গান—‘রাত যদি ফিরে আসে’।”

তালি নয়, নিঃশব্দে মঞ্চে উঠলেন ফিরোজা। কিছু মানুষ চমকে উঠল। এক বৃদ্ধ বলল, “এই মেয়েটা কে? কণ্ঠ চেনা লাগছে…”

ফিরোজা গান ধরলেন।

“রাত যদি ফিরে আসে
চোখ বুঝে থেকো না—
সুর যদি কাঁপে হাওয়ায়,
তবে জানো, আমি এসেছি…”

তান ঝিরঝিরে।
হারমোনিয়ামের পাখায় চাপের ওঠানামা।
সুরে ঘুরপাক খাচ্ছে আলোকছায়া রাগের অলঙ্কার, আর প্রতিটি লাইনের শেষে বিশেষ সুরচিহ্ন—যেটা বিপ্লবীদের কাছে মানে বিশেষ তারিখ, বিশেষ জায়গা, অথবা সজাগবার্তা।

মঞ্চের এক কোণায় বসে থাকা একদল পুরুষ হঠাৎ কানে হাত রাখল। তাদের মধ্যে একজন হেঁসে ফেলল, তারপর গম্ভীর মুখে উঠল। তারা ইংরেজ সরকারপন্থী। গান তাদের কাছে এখন বিপদের চিহ্ন।

গান চলছিল—
“যদি আমার নাম না থাকে ইতিহাসে,
তবে রেখো গন্ধে…
যদি আমার পায়ে শিকল পড়ে,
তবে রেখো চরণচিহ্নে…”

ঠিক তখনই দুজন লোক হঠাৎ উঠে এসে ভিড় ঠেলে মঞ্চের দিকে এগোল। একজন বলল, “এই গান অনুমোদিত নয়! থামাও এই নাটক!”
আলো জ্বলে উঠল। শব্দ বাড়ল। কেউ বলল, “ওরা পুলিশ!”

রাজীব তৎক্ষণাৎ হারমোনিয়াম বন্ধ করল, ফিরোজার হাত ধরে পেছনের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দৌড়াল বাইরে। মেলা তখন বিশৃঙ্খলা—কেউ ছুটছে, কেউ চিৎকার করছে, কেউ ফোন করছে সাহেব অফিসে।

পেছন থেকে গুলি চলে এক রাউন্ড। কেউ চিৎকার করে পড়ে গেল, গুলিবিদ্ধ কিনা বোঝা গেল না।

ফিরোজা বলল, “ওরা বুঝে গেছে বার্তার ভাষা।”
রাজীব দম নেয়, “তাহলে কি গান ব্যর্থ?”
ফিরোজা চোখে তাকিয়ে বলল, “না। গান চলে গেছে। এই কোলাহলের মধ্যেই সুর পৌঁছে গেছে যার কাছে যাওয়ার ছিল।”

তারা একটা শুকনো ডোবার ভিতর দিয়ে দৌড়ে পালাল—কাদা, বৃষ্টির জল, কাঁটা গাছের মাঝে। ফিরোজার ওড়না ছিঁড়ে গেল, রাজীবের পায়ের পাতা কেটে রক্ত পড়ল।

শেষে তারা এক ভাঙা মন্দিরে এসে আশ্রয় নিল। মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই, শুধু কালি আর দেওয়ালে আগের দিনের চিহ্ন—“বিপ্লব বাঁচাও”।

রাত গভীর। বাইরে কুকুরের ডাক। ঝাঁসির আকাশে আজ তারা ঝলমল করছে, কিন্তু ভিতরে কেউ ঘুমাতে পারছে না।

ফিরোজা এক কোণে বসে বলল, “তুমি তো পালিয়ে যেতে পারতে, রাজীব। আমি তো বলেছিলাম বিপদ বাড়বে।”
রাজীব বলল, “তুমি গান গাইলে আমি তোমার সাথেই পালাব। তুমি না থাকলে, গানের আর মানে থাকে না।”

ফিরোজা ধীরে হেসে বলল, “তুমি কি জানো, আজকের গানটা শেষ হয়নি?”

রাজীব তাকাল।

ফিরোজা বলল, “শেষ লাইনটা ছিল—
‘যদি আমার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়
তবে তুমি গেয়ে নিও আমার হয়ে…’”

রাজীব বলল, “আমি গাইব। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার গলায় আছো, আমি গাইব।”

পরদিন সকালে তারা ফিরে গেল নানকু হাজরার বাড়ি। বাইরে তখন ইংরেজদের পোষাকধারী পাহারা নেই। কিন্তু ফিরোজা জানে, ওরা ফিরে আসবে।

সে রাজীবকে বলল, “তুমি মালদায় ফিরে যাও। আমাকে নিয়ে যতক্ষণ থাকবে, বিপদ বাড়বে। আমি আবার ছদ্মবেশে যাব।”
রাজীব মাথা নেড়ে বলল, “আমি যাব। কিন্তু একটা কথা বলো—এই প্রেমটা তাহলে কী?”
ফিরোজা বলল, “এই প্রেমটা ছায়া। যা তোমার পেছনে থাকবে, কখনও সামনে নয়। কিন্তু যেখানে তুমি গাইবে, আমি শুনব।”

রাজীব ফিরে আসে মালদায়। ফিরে এসে ফ্যাক্টরি পায় বন্ধ। ব্রজকিশোর সান্যাল নাকি ধরা পড়েছেন। গুদাম এখন ব্রিটিশ রিজার্ভে।

কিন্তু রাজীব তার বাড়ির একঘরে বসিয়ে দেয় ছায়াময় মঞ্চ। সেখানে সে গান শেখায়। প্রতিটি ছাত্রকে শেখায় আলোকছায়া, রাগ প্রতিশ্রুতি, আর শেষ রাগ—রাগ ফিরোজা।

তার পেছনের দেয়ালে লেখা—
“যদি তুমি কাউকে না দেখো, তবে গান গাও। কারণ গানেই সে লুকিয়ে থাকে।”

পর্ব ৬

মালদা, ১৮৫৯ সাল।

ভোরের রোদ্দুর তখনও আসেনি। কুয়াশার চাদরে মোড়া শহরের অলিগলি ধীরে জেগে উঠছে। রাজীব বসে আছে তার ছোট্ট আঙিনার মাটির উঠোনে, সামনে একখানা পুরনো কাঠের বাক্স। সেই বাক্সে রয়েছে একটা হারমোনিয়াম, একটা পোড়ামাটির হাঁড়ি, আর কিছু চিঠি—যেগুলোর পাতাগুলোতে জীর্ণ কালি আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।

হঠাৎ দরজায় কড়াকড় শব্দ।

রাজীব ধীরে গিয়ে খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরিচিত যুবক—পরনে ধুলোধূসর পোশাক, মাথায় পাগড়ি, চোখে ক্লান্তি আর দৃষ্টি গভীর।

“আপনি রাজীববাবু?”

রাজীব মাথা নাড়ল।

“আমি কবি অচিন্ত্য ঘোষ। আমি পাটনা থেকে এসেছি। আপনার এক পুরনো পরিচিতের নির্দেশে।”

রাজীব উঠে দাঁড়াল, “কোন পরিচিত?”

অচিন্ত্য পকেট থেকে একটি কাগজ বের করল। খুব ছোট করে বাঁকানো, শুধু তিনটি শব্দ লেখা—

“জয়নব বেঁচে আছেন।”

রাজীবের মুখে রক্তের রঙ উঠে আসে আবার। “জয়নব?”

অচিন্ত্য বলল, “তিনি এখন বিহারের বিদ্রোহী শিবিরে। সবার কাছে তিনি জয়নব। কেউ কেউ তাকে ‘বিদ্রোহী রাণী’ বলেও ডাকছে। তিনি গান গাইছেন, সৈনিক জোগাড় করছেন, আর সঙ্কেত ছড়িয়ে দিচ্ছেন কবিদের মাধ্যমে। আমিও সেই পথেই এসেছি। তিনি আপনাকে ফিরে পেতে চান—একজন সাথি, একজন সুরশিল্পী।”

রাজীব চুপ করে বসে থাকে। তার চোখ চলে যায় উঠোনের কোণে—সেই জ্বালিয়ে রাখা প্রদীপে, যার আলো পোকাদের টেনে আনে আর আবার ফেলে দেয় অন্ধকারে।

পরদিন সকাল। মালদা শহর তখন ঘুমচ্ছে। কেউ জানে না রাজীব তার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো তাকিয়ে আছে চারপাশে। সে আর ফিরবে কি না, জানে না।

মায়ের মুখে আতঙ্ক। “ফের যাবি ওর খোঁজে?”

“হ্যাঁ মা। যেখানেই ও সুর গায়, আমি সুর তুলে দেব। তুমি বলেছিলে ঘরে ফিরতে। কিন্তু এই সুরের ঘর তো আর শুধু মাটি আর ইট নয়।”

মা চুপ করে থাকলেন। শেষবারের মতো তাঁর হাতে সাদা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে দিলেন রাজীবের কাঁধ। বললেন, “তোর গান যেন আগুন না হয়, আলো হয়।”

পাটনার বাইরে একটি নাম না-জানা গ্রাম। সেখানে গঙ্গার ধারে এক অস্থায়ী শিবির। চারপাশে খড়ের ঘর, বাঁশের বেড়া, আর মাঝখানে একখানা মঞ্চ—না, সেটি নাটকের নয়, এটি বিপ্লবের।

রাজীব আর অচিন্ত্য পৌঁছায় বেলা গড়াতেই। দূর থেকে ভেসে আসে গান—

“আঙিনায় পা রেখো না, যদি হৃদয় ভিজে যায়
আমি তো ছায়া, রোদে পুড়লে মিলিয়ে যাবো…”

রাজীব থমকে দাঁড়ায়। গলা বদলেছে, সুর বদলায়নি।
তিনি জানে—ফিরোজা গান গাইছে এখন ‘জয়নব’ নামে।

মঞ্চে একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন, লম্বা লাল ওড়নায় মুখ ঢাকা, কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, চারপাশে সৈনিক আর ছেলেমেয়েরা বসে শুনছে।

গান শেষ হলে তিনি বললেন, “আজকের সঙ্কেত পৌঁছেছে মালদায়। আজকের বার্তা পৌঁছে গেছে শিলিগুড়ি। কিন্তু আজ আমার জন্য একজন এসেছেন দূর থেকে, যিনি একসময় শুধু প্রেমিক ছিলেন না, ছিলেন সহযোদ্ধা। আজ তাকে আমার পাশে চাই। রাজীব!”

রাজীব ধীরে উঠে মঞ্চের দিকে গেল। সবার মাঝে স্তব্ধতা। ফিরোজা—অথবা এখন যিনি জয়নব—তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ফিরে এসেছো। তাহলে আমরা আবার শুরু করতে পারি।”

সেই রাতেই, ছোট শিবিরে ফের গড়ে ওঠে সুরের ঘর। রাজীব হারমোনিয়ামে সুর তোলে, জয়নব শব্দ বসায়, আর অচিন্ত্য লিখে রাখে প্রতিটি গান—প্রতিটি সঙ্কেত।

তারা গড়ে তোলে নতুন কোড—

রাগ তোড়ি মানে “চলো পূর্ব দিকে”

রাগ পিলু মানে “পরবর্তী হামলা”

রাগ ভৈরবী মানে “সতর্কতা ও প্রত্যাগমন”

ফিরোজা বলল, “আমরা গান দিয়ে যুদ্ধ করব, রাজীব। অস্ত্র নয়, সুরে বিপ্লব।”

কিন্তু দিন ভালো থাকে না সবসময়। একদিন রাতে শিবিরে ঢুকে পড়ে ব্রিটিশ গুপ্তচর, ছদ্মবেশে কাব্য পাঠ করতে আসে। সে ধরে ফেলে কোডের ভাষা।

পরদিনই শিবিরে হানা দেয় ইংরেজ পুলিশ। গোলাগুলি হয়। শিবির ভেঙে যায়।

রাজীব ও জয়নব ছুটে পালায় গঙ্গার দিকে। অচিন্ত্য গুলিবিদ্ধ হয়, পড়ে থাকে শালপাতার ওপরে, তার হাতে থাকে সেই খাতা—যেখানে লেখা ছিল সব সুর, সব কোড, সব ইতিহাস।

নৌকায় চেপে পালানোর সময় জয়নব বলে, “আমরা আর নাম দিয়ে পরিচিত হব না। আজ থেকে আমরা শুধু সুর।”

রাজীব বলে, “তাহলে এবার থেকে আমরা গান বেঁধে যাবো ছায়ার মতো—যেখানে কেউ চিনতে পারবে না, কিন্তু সবাই শুনতে পাবে।”

পর্ব ৭

১৮৬০, কলকাতা।

নাট্যশালা তখন নতুন করে জেগে উঠছে। মেটিয়াবুরুজের রাস্তা ধরে রিকশায় চলেছে রাজীব আর ফিরোজা—এখন তারা “অজয় সেন” আর “বীণা দেবী” নামে পরিচিত। নাম বদলেছে, পোশাক পাল্টেছে, কিন্তু তাদের চোখের চাহনি এখনও বোঝায়—কোনও এক অসমাপ্ত গানের খোঁজে তারা ছুটে চলেছে।

বহুবছর আগে যে শহরে ফিরোজা একদিন থিয়েটারের গানে গোপনে সঙ্কেত পাঠাতেন, সেই শহরেই আবার তাদের শরণ। কিন্তু এবার তারা শুধুই শিল্পী নয়—তারা স্মৃতি, তারা ইতিহাসের অসমাপ্ত পৃষ্ঠা।

কলেজ স্ট্রিটের এক পুরনো থিয়েটার—“ছায়ানাট নট্টমঞ্চ”—সেখানে এখন প্রস্তুতি চলছে নতুন নাটকের। নাটকের নাম “নীলচাষীর স্বপ্ন”। এক অখ্যাত নাট্যকার লিখেছেন এই পাণ্ডুলিপি, যেখানে নীলচাষের অত্যাচারের প্রতিবাদ লুকিয়ে আছে এক গাননাট্যের ছন্দে।

নাট্যপরিচালক বিমলেশ বোস প্রথম দেখাতেই বুঝে ফেলেন, এই ‘অজয় সেন’ আর ‘বীণা দেবী’ কেবল অভিনয় করতে আসেননি। তাদের মধ্যে কিছু আছে—এক ধরনের নিঃশব্দ জরুরি বার্তা, যা শুধু চোখ দিয়েই বোঝানো যায়।

তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “আপনারা কি আগে কোনও থিয়েটারে কাজ করেছেন?”

রাজীব হাসেন, “শুধু থিয়েটার নয়, মঞ্চও বানিয়েছি, ভেঙেও দিয়েছি।”

ফিরোজা বলেন, “আমরা গান জানি। কিন্তু গান আমাদের চেয়েও বেশি জানে আমাদের।”

পরিচালক চুপ করে থাকেন। তারপর বললেন, “আপনারা ‘নীলচাষীর স্বপ্ন’–এ থাকুন। কিন্তু জানবেন, এই নাটক শুধু নাটক নয়। এখানে প্রত্যেক দর্শককে কিছু বলার আছে।”

রিহার্সাল শুরু হয়। নাটকে রাজীব একজন চাষী—রামেশ্বর—যে গান দিয়ে প্রতিবাদ করে। ফিরোজা এক বিধবার চরিত্রে—পদ্মাবতী—যার কণ্ঠে ছেলেকে হারানোর আর্তি আর নীলকর সাহেবের প্রতি দহন।

তাদের প্রতিটি সংলাপে থাকে ছন্দ, আর প্রতিটি গান যেন পুরনো সেই বিপ্লবী কোডেরই এক আধুনিক রূপ।

“নীল রঙে যেই আঁকো সংসার
আমার চোখে শুধু পোড়ার ছায়া…”

গান লেখা হচ্ছে নতুন করে, কিন্তু সুরগুলি রাজীব আর ফিরোজার মধ্যেকার অতীত টেনে আনে বারবার।

রিহার্সালের এক দুপুরে রাজীব বলল, “তুমি জানো, এই শহরই প্রথম আমাকে গান থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।”
ফিরোজা জবাব দিল, “এই শহরই আবার আমাদের সুর ফেরত দেবে। কিন্তু এবার আমরা হারাতে চাই না।”

নাটকের প্রিমিয়ার দিন এসে যায়। দর্শকভর্তি “ছায়ানাট” হল। প্রথম সারিতে বসে আছে কিছু সাহেব অফিসার, কয়েকজন সংস্কৃতি কর্মী, আর কয়েকজন কবি—যারা মনে করে নাটক কেবল বিনোদন।

নাটক শুরু হয়।

প্রথম দৃশ্যে রাজীবের সংলাপ—“আমার জমি আমি বেচিনি। আমার গলা আমি তুলেছি। নীল নয়, আমি রক্তে রঙ দেব।”

দ্বিতীয় দৃশ্যে ফিরোজার গান—
“পোড়ামাটির এই বুকে
জেগে আছে একটি নাম
যে নাম কেবল প্রেম নয়
যে নাম প্রতিশোধের মতোই ধ্রুব…”

এই গান শোনার সময় সাহেবদের একজন উঠে যায়। সে বুঝতে পারে এই নাটক শুধু কৃষক-জীবনের কথা নয়, এখানে কোথাও কোথাও ইতিহাসের ছায়া আছে, যা আজও শাসনব্যবস্থার গায়ে খোঁচা দেয়।

অভিনয়ের মাঝখানে অন্ধকার হলে এক চিঠি আসে পরিচালকের হাতে। সেখানে লেখা—

“এই নাটক বন্ধ করতে হবে।
প্রকাশ্যে বিপ্লব উস্কে দেওয়া চলবে না।”

বিমলেশ বোস চুপ করে থাকেন। নাটকের মাঝখানে নির্দেশ আসে—“শেষ গান বাদ দিতে হবে।”

শেষ গান—যেটা গাইবেন ফিরোজা।
যেটার শেষ পংক্তিতে আছে সেই বার্তা—“আগামী বৃহস্পতিবার, দক্ষিণেশ্বর ঘাটে জড়ো হও।”

রাজীব জানে—গানটা না হলে পুরো নাটকটা নিঃস্ব।
ফিরোজা জানে—গানটা গাইলে তারা ধরা পড়বে।

তবু… আলো নিভে যায়, শেষ দৃশ্য আসে।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে ফিরোজা গান শুরু করেন।

“আমি যদি থেমে যাই
তুমি কি গাইবে আমার হয়ে?”

রাজীব হারমোনিয়াম তোলে।

“আমি যদি ছায়া হয়ে যাই
তুমি কি রোদ্দুরের নাম নেবে?”

দর্শকেরা বোঝে না, কিন্তু কেউ কেউ কেঁদে ফেলে। সাহেবরা উঠে চলে যায়—তাদের মনের ভিতরে গমগম করে বার্তা।

মঞ্চের পেছনে আবার ফিরে আসে সেই ছায়া।

পরের দিন “আমৃতবাজার পত্রিকা”–তে বড় শিরোনাম—
“নীলচাষীর স্বপ্ন: নতুন প্রতিরোধ?”
ছোট করে লেখা: “এক অজানা কণ্ঠে গান—যা শুধু গান নয়। যা এক বিপ্লবের ডাক।”

কিন্তু রাজীব আর ফিরোজা ততক্ষণে নেই। তারা আগেই পাড়ি দিয়েছে নদীয়া জেলার দিকে, নতুন এক রামকৃষ্ণ মঠের নাট্যমঞ্চে কাজ করার কথা বলে।

তারা জানে—এখন তারা আর কেউ নয়। এখন তারা ছায়া, যারা নাটকের মধ্য দিয়ে জড়িয়ে যাবে মানুষের মনে, সুর হয়ে, স্পর্শ হয়ে, বার্তা হয়ে।

পর্ব ৮

নদীয়া, ১৮৬0-এর শেষভাগ।

গ্রীষ্মকাল। কৃষ্ণনগরের কাছেই একটা ছোট আশ্রম, যেখানে দিনভর ধ্বনি বাজে—তবলা, হারমোনিয়াম, মৃদঙ্গ আর বাচিক ছন্দ। এখানে কেউ গুরু, কেউ শিষ্য। কেউ আসে গান শিখতে, কেউ আসে গান ভুলতে। কিন্তু ফিরোজা ও রাজীব এসেছেন নতুন কিছু তৈরি করতে—একটা নতুন নাট্যরচনা, যেখানে আবার থাকবে সুরের ভেতর সঙ্কেত।

তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন একজন যুবক—তিনিই নানকু হাজরার ছেলে। নাম শিবেন্দু হাজরা। বয়স পঁচিশের কিঞ্চিৎ ওপরে, গায়ের রঙ ধোঁয়াটে, কণ্ঠে মৃদু কাঁপন।

“আমি শুনেছি আপনারা একসময় ছায়াসঙ্গীত গাইতেন। এখন আবার ফিরেছেন?”

রাজীব উত্তর দেয় না, ফিরোজা বলেন, “ফেরার সময় কেউ জিজ্ঞেস করে না কেন ফিরেছি। তবু হ্যাঁ, ফিরেছি। কিন্তু এবার গানের ভাষা পাল্টেছে।”

শিবেন্দু একটু থেমে বললেন, “আপনারা জানেন কি, আজকাল ব্রিটিশ গোয়েন্দারা গান শিখে নিচ্ছে? তারা সুর বুঝছে, তান ধরে ফেলে, অর্থ ধরতে না পারলেও ছন্দের বাঁধন চিনে যাচ্ছে।”

রাজীব হালকা হেসে বলেন, “তাহলে এবার সুরেরও প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে?”

“ঠিক তাই,” শিবেন্দু বলেন, “এখন শুধু বিপ্লবের বার্তা দেওয়া নয়, প্রতিপক্ষের শ্রবণ ক্ষমতাকেও ছাপিয়ে যেতে হবে। এবার এমন সুর চাই, যা কানে নয়, হৃদয়ে বিঁধবে। তারা গান শিখুক, কিন্তু কখনোই যেন তার ‘অর্থ’ শিখতে না পারে।”

তিনজন মিলে রচনা করতে শুরু করল এক নতুন সুরভিত্তিক নাটক—“অজানা নামের গান”। এখানে গানে গল্প নেই, নেই দৃশ্যধারণযোগ্য বার্তা। এখানে প্রতিটি পংক্তি নিজের মধ্যেই বহন করে বহুস্তরীয় অর্থ। গানের মধ্যে একাধিক সঙ্কেত—কখনও ব্যাকরণে, কখনও অনুপ্রাসে, কখনও ধ্রুপদী স্বরের উচ্চারণে। যেমন—

“বেহাগেতে যেই উচ্চারণ হয় ‘গ’ তে বেশি সময়
সে যেন বলে—’গোপনে মিলো রাত্রির দুইয়ে'”

ফিরোজা বুঝিয়ে দেয়—গানের ভিতরে থাকবে বৈঠক বা বিপ্লবের তারিখ, সময় ও স্থান।

শিবেন্দু বলে, “এইভাবে আমরা শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে গান গাইব, অথচ তারা কিছুই বুঝবে না।”

তবে আশ্রমের এই প্রশান্তিময় পরিবেশে হঠাৎই একদিন ছন্দপতন ঘটে।

এক সন্ধ্যায় শিবেন্দু এসে জানায়—“আজ দুপুরে আশ্রমে এসেছিল এক ইংরেজ মঞ্চবোদ্ধা, নাম জর্জ পামার। সে বলে গেছে, গান সুন্দর, কিন্তু নাকি শব্দে ‘গোপনতা’ মিশে আছে। সে সন্দেহ করছে।”

রাজীব ও ফিরোজা জানে, পামার শুধু বোদ্ধা নয়—সে আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাংস্কৃতিক গোয়েন্দা, যার কাজ থিয়েটার ও সংগীত দিয়ে ছড়িয়ে পড়া প্রতিবাদ চিহ্নিত করা।

রাতে তারা তিনজন বসে একটা গোপন পরিকল্পনা তৈরি করে। এবার ‘অজানা নামের গান’-এর দ্বিতীয় ভাগে প্রবেশ ঘটবে এমন একটি সুরের, যা দেখাবে প্রেম, শোনাবে দুঃখ, কিন্তু পাঠাবে একটি বিপ্লবী দলকে পূর্ব বর্ধমানের ভুঁইচাঁপা এলাকায় সংগঠিত হতে।

এটি হবে রাগ মারু বিহাগ। ফিরোজা জানে, তার কণ্ঠে এই রাগ এত ব্যথা আনে, যে তা শোনার পরেও কেউ সন্দেহ করতে পারবে না, সেখানে লুকিয়ে ছিল বিদ্রোহের দিন।

প্রস্তুতি চলতে থাকে। তবে আশ্রমের অদূরে এক ছায়াঘেরা পোড়োবাড়ি থেকে প্রতি রাতেই দেখা যায় এক আলো। সেখানে বসে থাকে জর্জ পামার, শুনতে থাকে রিহার্সাল। সে বুঝতে পারে না গান, কিন্তু চেনা তার নিঃশব্দ বিপ্লবের ধ্বনি।

এক রাতে সে চিঠি পাঠায় কোম্পানির সদর দফতরে—
“Two artists have returned. Not as soldiers, but as shadows. Their songs must be studied.”

কিন্তু সেই সময়েই আশ্রমের এক প্রবীণ সন্ন্যাসী, যিনি একসময় গানে বিপ্লবী বার্তা পাঠাতেন, তিনি ফিরোজাকে বলেন, “স্মরণ রেখো, সব সুরই চেনা যায়, কিন্তু কিছু কান শুধু সুর শোনে না—তার অন্তর্নিহিত শূন্যতা খোঁজে। তোমাদের গান শত্রুকে নয়, শিষ্যকে ছুঁয়ে যাক।”

ফিরোজা সেদিন প্রথমবারের মতো দীর্ঘ সময় চুপ থাকে।

শেষপর্বের মহড়া। গান উঠছে রাগ মারু বিহাগে—
“আমি তো চাইনি যুদ্ধ, শুধু একটি নাম
যে নাম বললে ছায়া কাঁদে, আলো হাসে…”

শিবেন্দু ব্যাকস্টেজ থেকে বলে, “এই পংক্তির প্রতিটি তান এক একটি পথনির্দেশ। এ গানের মাঝে প্রতিটি ছায়া এক মানচিত্র।”

রাজীব তখন বোঝে—গান শুধু প্রেম নয়, শুধু বিপ্লব নয়, এ এক নতুন ভাষা, যা জন্ম নেয় অন্ধকারের ভেতরে।

পরদিন সকাল।

পামার এসে আশ্রমে ঢোকে। নাটকের মহড়া বন্ধ করতে বলে। কিন্তু গেটে দাঁড়িয়ে থাকা শিবেন্দু তাকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি গান বোঝেন?”

পামার বলে, “আমি বুঝি না, আমি ধরি।”

রাজীব সামনে আসে, বলে, “তবে শোনো, আজ থেকে গান শুধু কণ্ঠে থাকবে না—গান থাকবে চোখে, পায়ে, নিঃশ্বাসে। তোমরা চাইলে আমাদের সুর কেড়ে নিতে পারো, কিন্তু অর্থ চুরি করতে পারবে না।”

পর্ব ৯

১৮৬১, কলকাতা।

কলকাতার ওল্ড চায়না বাজারে ইংরেজি অফিসারদের সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষণ ভবন, “Fort William Sound Archive”। এখানে পাঠানো হয়েছে এক ধ্বনির রেকর্ড—একজন নারীর কণ্ঠে রাগ মারু বিহাগ। সেই কণ্ঠে প্রেম আছে, ব্যথা আছে, কিন্তু কোথাও একটা এমন কিছু আছে যা ঘুম ভাঙিয়ে দেয় ঠান্ডা অফিসের দেয়ালেও।

জর্জ পামার নিজের কক্ষে বসে শুনছেন সেই রেকর্ড। বারবার। তবু ধরতে পারছেন না কোথায় লুকিয়ে সেই বার্তা। তিনি জানেন, একবার যদি কণ্ঠ শনাক্ত হয়ে যায়, তাহলে গান দিয়ে বিপ্লব বন্ধ করা যাবে এক আঘাতে। তবে দুর্ভাগ্য—ফিরোজার গলা পরিচিত নয় সরকারি ফাইলের কোনও রেকর্ডে। সে এক কণ্ঠছায়া—যার নামে নেই ঠিকানা, ইতিহাসে নেই অস্তিত্ব, তবু কান ছুঁয়ে যায় বারবার।

পামার এবার ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নেয়।

কলকাতার এক জমিদারের বাড়িতে আয়োজন হয়েছে ‘সুরসন্ধ্যা’। পামার সেখানে পৌঁছায় মেহমান রূপে, সঙ্গে থাকে তার ভারতীয় সহযোগী অরবিন্দ চৌধুরী—যিনি একসময় কবি ছিলেন, এখন গোয়েন্দা।

“আজ নাকি আশ্রম থেকে আসছে এক নতুন সঙ্গীতজুটি,” বলেন পামার, চায়ের কাপ হাতে।

অরবিন্দ হেসে বলে, “হ্যাঁ, শুনেছি তারা গান গায় আর ছায়া ছড়ায়। তাদের গান নাকি ‘রোদে জ্বলে না, ছায়ায় হিম হয়’।”

পামারের চোখে আলোর ঝিলিক। সে বোঝে, আজ হয়তো সেই কণ্ঠের সামনে সে দাঁড়াবে—সরাসরি।

রাত আটটা।

মঞ্চে ওঠে ফিরোজা ও রাজীব। পরনে সাধারণ পোশাক, চোখে নির্লিপ্ত গভীরতা। সঙ্গীত শুরু হয় ধীরে ধীরে—একটি নতুন রাগে, রাগ চাঁদের রাত—যা তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছে। এই রাগে নেই কোনও পরম্পরা, নেই গ্রন্থগত স্বীকৃতি, তবু প্রতিটি স্বর যেন কোনও এক অজানা ইতিহাসকে টেনে আনে।

“চাঁদের ছায়া যে নদীর তীরে পড়ে
তাতেই আমি তোমার নাম রেখেছি
তুমি না থাকো, আমি তো আছি
সুরের মাঝে শরীর রেখে গেছি…”

পামার মন্ত্রমুগ্ধ। এই গলায় কিছু একটা আছে। সে চেয়ে থাকে ফিরোজার ঠোঁটের নড়াচড়ায়, চোখের চাহনিতে, কিন্তু সব যেন রহস্যে মোড়া। গান শেষ হলে সে উঠে দাঁড়িয়ে হাতে তালি দেয়—সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে আগে।

ফিরোজা ও রাজীব নত মস্তকে প্রণাম করে মঞ্চ থেকে নেমে যান।

পেছন দরজার কাছে এক অচেনা কণ্ঠ বলে ওঠে, “আপনারা কি নদীয়ার আশ্রম থেকে এসেছেন?”

রাজীব এক মুহূর্ত থেমে বলে, “নদীয়া শুধু এক জায়গা নয়, এক সময়। আমরা সময় থেকে এসেছি।”

ফিরোজা যোগ করে, “যেখানে সুরে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস।”

পরদিন সকালে পামার রাজ্যের সাংস্কৃতিক বিভাগে একটি গোপন নোট পাঠায়—

“A woman exists, voice unknown to records, tone known to hearts. She must be found. Her name: possibly Firoza, alias Zaynab. Her presence is not just voice, but revolution.”

এই চিঠি পৌঁছে যায় কলকাতার লালবাজারে। ইংরেজ পুলিশ এখন এক ‘কণ্ঠসন্ধান’ শুরু করে। কিন্তু সমস্যা একটাই—ফিরোজা বা জয়নব নামে কোনও নারী জনমনে নেই।

তারা গায়, অভিনয় করে, চলেও যায় ছায়ার মতো। শুধু গান রয়ে যায় মানুষের মুখে, বাজারে, ঘাটে, স্কুলে, কৃষকের ফসলে, আর প্রেমিকের চিঠিতে।

শিবেন্দু হাজরা তখন নদীয়ায়। রাজীবের কাছে চিঠি লেখে—

“তোমাদের কণ্ঠ তারা খুঁজবে না শুধু ধ্বনি দিয়ে, খুঁজবে ছায়া দিয়েও। এবার সময় এসেছে ‘নাটক’ থেকে বেরিয়ে ‘নাট্যপট’ বদলানোর। আসো, গোপালনগরের পথে আবার সংগঠিত হই।”

রাজীব জানে, শিবেন্দু যা বলছে তা সত্যি। এবার শুধু সুরে নয়, বিপ্লব আসবে কণ্ঠের নিচের নীরবতাতেও।

ফিরোজা চুপ করে বসে থাকে বহুক্ষণ। তারপর বলে, “তারা যদি আমার কণ্ঠ চায়, আমি তাদের কান দেব না। আমি এবার এমন গান গাইব, যা শুধু দেখা যাবে, শোনা যাবে না।”

তারা শুরু করে নতুন এক ছায়ানাট্য। নাম—“অভ্রান্ত কণ্ঠের দিনলিপি”।

নাটকে কেউ কথা বলে না। কেউ গায় না। শুধু হাঁটে, দেখে, আঙুল তোলে, চোখে জল ধরে। অথচ দর্শক বোঝে—কী বলছে চরিত্র, কী বলছে ইতিহাস।

প্রথম শো হয় বাগবাজারে, গৌরীদাস নট্ট কোম্পানির মঞ্চে। তিনদিনের মধ্যে শহরের সব পত্রিকায় খবর—

“একটি গানহীন নাটকে কান্না! ইতিহাস ফিরে আসছে চোখ দিয়ে, নয় কানে। কণ্ঠ ছুঁয়ে যাচ্ছে না, ছায়া ছুঁয়ে যাচ্ছে।”

এই বার্তায় বিভ্রান্ত হয় ইংরেজ সরকার। তারা জানে না—কাকে গ্রেফতার করবে? কাকে চুপ করাবে? কে গায়, কে শুধু দেখে?

জর্জ পামার চিঠি লেখে লন্ডনে—
“We have failed to locate the revolution in sound. It is now in silence. How do you crush silence?”

পর্ব ১০

শিলিগুড়ি, ১৮৬২।

পাহাড় ঘেরা এক ছোট্ট গ্রাম—দমডিমা। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে একটি পার্বত্য মঠ, যেটি বাইরে থেকে সাধারণ বৌদ্ধ আশ্রম, কিন্তু ভিতরে ভিতরে চলছে ইতিহাসের ছায়াচর্চা। রাজীব ও ফিরোজা পৌঁছান গোপনে, তৃতীয়বারের মতো নতুন নামে—এবার তারা পরিচিত সঞ্জীব আরা ও মীরা বৈদ্য নামে।

এই মঠের আবহ অদ্ভুত। ঘন্টার ধ্বনি নেই, প্রার্থনা নেই। শুধু কুয়াশা, পাথরের ঘর, আর একদল মুখ বন্ধ করে থাকা মানুষ—যাদের চোখ বলে বেশি, মুখ নয়।

ফিরোজা এক প্রবীণ সন্ন্যাসিনীর কাছে যান, যিনি পরিচয় দেন একমাত্র নামহীন ছন্দে—

“আমি তবু শুনি,
যদিও কেউ কিছু বলেনি।
তুমি তবু বলো,
যদিও শব্দ হারিয়ে গিয়েছে।”

রাজীব ফিসফিস করে বলে, “এখানে গান নেই, অথচ সব যেন গানের ছায়া।”

মঠে শুরু হয় এক নতুন কর্মযজ্ঞ—একটি নাটক, যার নাম “নাভিন্য নয়, নীরবতা”। এখানে শব্দ নেই, সুর নেই, শুধু ছায়া ও প্রক্ষেপণ। আলো-আঁধারির নকশা দিয়ে, হাতের নড়াচড়া দিয়ে, চোখের দৃষ্টিতে তৈরি হয় দৃশ্যের ভাষা। ভাষা নয়—প্রতিভাষা।

ফিরোজা চিত্রনাট্য লেখেন ছায়া ব্যবহার করে। রাজীব নির্দেশনা দেন—কে কবে কতটা আলোয় থাকবে, কে কবে কতটা অন্ধকারে।

তাদের নাটক এবার বলবে—

কীভাবে পোস্তর খেত রঙ বদলেছে

কীভাবে চুপ করে থেকে প্রতিবাদ করা যায়

কীভাবে এক গানের অভাবে গানের অর্থ তৈরি হয়।

তবে, অশনি সংকেত আসে শিলিগুড়ির পুলিশ সদর থেকে।

এক পাহাড়ি গোয়েন্দা জানান, “কোম্পানি জানতে পেরেছে যে ছায়ার ভেতরে এক ‘কণ্ঠহীন বিপ্লব’ তৈরি হচ্ছে। তারা এই মঠকে ধ্বংস করতে চায়। কারণ এখানে ভাষা নেই, ফলে কোনও প্রমাণও নেই।”

রাজীব বলে, “তারা যা ধ্বংস করতে চায়, তা আসলে ধ্বংসের ঊর্ধ্বে। কারণ এই নাটক কেবল মঞ্চে নয়, এটি মানুষের ভেতরে চলছে।”

১৮৬২ সালের অক্টোবরের এক সন্ধ্যা।

মঠের ভেতরে নাটকের মহড়া চলছিল। সেই সময় হঠাৎ বাইরে আগুন লেগে যায়। গোয়েন্দারা, সেনা, পুলিশ—সব মিলে চতুর্দিক ঘিরে ফেলে।

কেউ বলে, “এই আগুন শুধু আগুন নয়। এটা এক ধরনের ধোঁয়াশা। ধ্বংস নয়, এটি ঢেকে দেওয়ার মাধ্যম।”

রাজীব ছুটে যায় মঞ্চঘরের দিকে, যেখানে ফিরোজা একা বসে আছেন। তিনি জানেন, এই শেষ মুহূর্তে পালানো মানে নাটকের অপমান।

ফিরোজা বলেন, “তুমি যাও। আমি থেকে যাব। কারণ এই আগুন আমাকে গিলে ফেললেও, আমার ছায়া থেকে যাবে।”

রাজীবের চোখে জল। সে বলে, “তুমি ছিলে মাটির মেয়ে। তোমায় পোস্ত বানিয়েছে বিষ। তবু তুমিই আমার গান।”

তিনি একটি কাগজ ফিরোজার হাতে তুলে দেন—সেখানে লেখা, “সুরহীন প্রতিরোধের গাথা – ছায়ার ইতিহাস, ১৮৫০–১৮৬২”।

রাত গভীর হলে, আগুন নিভে আসে। গোয়েন্দারা দেখে, মঠ ভস্মীভূত। কোথাও কেউ নেই। শুধু এক পাথরের ওপর কালো ছায়া পড়ে আছে—কেউ বলে, মেয়েটি আগুনে পুড়েছে, কেউ বলে, সে নিজেই ছায়ায় মিশে গেছে।

২ বছর পর, কলকাতার এক প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেরোয় একটি ছোট বই—

“Shadow Songs of Bengal: 1850–62”
লেখক: Anonymous

বইটিতে গান নেই, কবিতা নেই। আছে শুধু কয়েকটি ছায়াচিত্র—একটি মেয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, এক পুরুষ কুমোরচাক ঘোরাচ্ছেন, আর দূরে পোস্তর খেত।

বইয়ের শেষ পাতায় লেখা—

“তারা গেয়েছিল, তারপর তারা চুপ করে গিয়েছিল।
তাদের কণ্ঠ কেউ জানত না,
তাদের ছায়া কেউ ভুলতে পারেনি।”

কলকাতার নাট্যচর্চায়, ধ্রুপদী সংগীতে, গ্রামীণ জাত্রায় এক নতুন ধারা জন্ম নেয়—“ছায়ানাট”। এই ধারা গানে চেনা নয়, কিন্তু মনে রাখা যায়। কেউ মুখে ফিরোজার নাম নেয় না, কিন্তু তার ছায়া আজও আলো ছুঁয়ে যায়।

 

শেষ

1000019126.jpg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *