Bangla - নারীবিষয়ক গল্প

পেনসিলের গল্প

Spread the love

কৃষ্ণা চক্রবর্তী


অধ্যায় ১: ছোট পেনসিল, বড় মন
শীতের সকালে কুয়াশায় ঢাকা গ্রামটার গায়ে প্রাইমারি স্কুলটা যেন এক ছায়াপথের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশটা কুড়িয়ে কুড়িয়ে জেগে উঠছে; কাঁচা রাস্তায় ছেলেমেয়েদের চেনা পায়ের ধ্বনি, বইয়ের ব্যাগের চড়া ভার আর মায়ের তাড়াহুড়ির গলা মিশে একটা গাঁথা তৈরি করছে। স্কুলের ছোট মাঠটা শিশিরে ভেজা, কাঠের পুরোনো বেঞ্চগুলো যেন কাঁপছে ঠান্ডায়। এই দৃশ্যের মাঝখানে, নিরিবিলিতে, তার রোজকার সময়ের আগেই স্কুলে এসে গেছেন শ্রীমতী কাবেরী দাস – হালকা বেগুনি শাল জড়িয়ে, ছোটখাটো গড়নের মধ্যে এক বিস্ময়কর দৃঢ়তা। স্কুলে তাঁর পরিচয় ‘কাবেরী ম্যাডাম’, কিন্তু গ্রামে তিনি শুধুই ‘দিদিম্যাডাম’ — সম্মান আর মমতার একত্র নাম। আজ বছরের প্রথম দিন, স্কুল খুলছে পুজোর ছুটির পর। ঘরভর্তি মেয়েরা আসবে, কোলের ফাঁকে বই-খাতা ঠাসা ব্যাগ নিয়ে, অপ্রস্তুত চোখে কৌতূহল আর ঘুমের মিশেল নিয়ে তারা চেয়ে থাকবে তাঁর দিকে। কাবেরী ম্যাডাম প্রতি বছর এই দিনে একটি ছোট কাজ করেন, যা কেউ কখনো গুরুত্ব দেয়নি, কেউ প্রশ্ন করেনি, কেউ প্রয়োজনও মনে করেনি। তিনি মেয়েদের হাতে একটি ছোট পেনসিল তুলে দেন—নতুন, একটু রঙিন, ছোট করে কাটা, পেছনে গোলাপি ইরেজার লাগানো। অনেক সময় দোকানদার অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছে, “ম্যাডাম, এত ছোট পেনসিল নেবেন কেন? বড় দিতেই তো পারেন।” তিনি সবসময় একই হাসি দিয়ে বলেন, “ছোট হলেও দাগ তো ফেলতে পারে, তাই না?” আজও তিনি সেই নিয়ম ভাঙেননি। কাঠের টেবিলের ওপর একটা পুরোনো কাঁথা বিছিয়ে তিনি এক একটা পেনসিল সাজিয়ে রাখছেন, যেন এই সামান্য উপহারগুলো কোনো বিশেষ উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে নিজের শৈশবের কথা — যখন ক্লাস ফোরে পড়তেন, গ্রামের প্রথম মহিলা শিক্ষকী শিবানী মেম তাঁর হাতে দিয়েছিলেন একটি লাল রঙের পেনসিল। সে পেনসিলের দাম ছিলো না, কিন্তু তা দিয়েই তিনি প্রথম নিজের নাম লিখেছিলেন সাদা কাগজে। সেই ছোট মুহূর্তের মধ্যে কেমন করে যেন নিজের ‘আমি’ খুঁজে পেয়েছিলেন, আর মনে হয়েছিল – “আমি পারি”। সেই অনুভূতি এত বছর পরও তাঁর হৃদয়ে তাজা আছে, তাই তিনি চান তাঁর ছাত্রীদেরও অন্তত একবার সেই বিশ্বাসটা স্পর্শ করুক।
ক্লাসঘর ধীরে ধীরে ভরে উঠছে কচিকাঁচা কণ্ঠে, খুনসুটিতে। মেয়েরা ব্যাগ থেকে পুরোনো বই বের করছে, কেউ কেউ নতুন খাতা আনেনি, কিছু বই কুড়িয়ে পড়েছে, টিফিনের হাঁড়ি থেকে ভাজা মুড়ির গন্ধ ছড়াচ্ছে। কাবেরী ম্যাডাম বোর্ডে চক দিয়ে লিখে ফেলেন — “নতুন বছরের শুভারম্ভ”। তারপর হালকা হাঁটায় ক্লাসরুমে ঢোকেন, এবং তাঁর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা উঠে দাঁড়িয়ে “Good morning, Madam” বলে ওঠে সমস্বরে। সেই গলায় কাঁচা আদব, সত্যিকারের শ্রদ্ধা আর একটু ভয়ও মিশে থাকে। কাবেরী ক্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ — যেন বোঝার চেষ্টা করছেন কার চোখে আজ নতুন প্রশ্ন, কে সকালে না খেয়ে এসেছে, কার বুকভরা বলার কথা জমে আছে। তারপর তিনি ছোট্ট একটি ঝুড়ি এগিয়ে আনেন — ঝুড়িতে সাজানো সেই পেনসিলগুলো, রঙিন, চকচকে, ছোট ছোট। তিনি মৃদু হেসে বলেন, “এই পেনসিল তোমাদের নতুন বছর শুরুর চাবিকাঠি। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার কণ্ঠ নেই, যাকে শোনানো যাবে না। এই পেনসিল দিয়ে তোমরা শুধু পড়া লিখবে না, নিজের মনের কথাও লিখবে।” মেয়েরা একে একে এগিয়ে আসে, কেউ একটু লাজুক, কেউ মুগ্ধ, কেউ জানে না এটা কী করে ব্যবহার করতে হয়। কেউ কেউ কানে কানে বলে— “দেখ, লাল রঙের পাইলাম!” আর একজন বলে— “আমি এইটা দিয়ে চিঠি লিখুম ম্যাডামরে।” পেনসিল পাওয়া এই মেয়েদের চোখে এক রকমের উজ্জ্বলতা জন্ম নেয়, যা বইয়ের নাম মুখস্থ করলেও হয় না। কাবেরী বুঝতে পারেন—এই ছোট মুহূর্তটিই বদলের বীজ। ক্লাসের শেষ দিকে তিনি বলেন— “যে যেমন পারো, পেনসিল দিয়ে একটা ছবি আঁকো, বা একটা লাইন লেখো নিজের মনের কথা।” কেউ লিখে— “আমি বড় হয়ে দিদিম্যাডাম হইব”, কেউ আঁকে একটা স্কুলঘর, কেউ একটা সূর্য, কেউ একটা মেয়ে আর তার পাশে বইয়ের থলা। এইসব ছবির ভেতরেই তিনি পড়েন সময়ের ভাষা— যে ভাষা কোনো প্রশ্নপত্রে থাকে না, থাকে না রেজাল্টশিটে, কিন্তু থাকে প্রত্যেক ভবিষ্যতের ভিতরে।
দিনটা শেষ হওয়ার মুখে স্কুলের বাইরে মায়েরা এসে দাঁড়িয়েছেন, কেউ কেউ প্যাকেট হাতে এনেছেন মেয়েকে নিতে, কেউ কৌতূহল নিয়ে দেখছেন মেয়ের হাতে পেনসিল। কেউ বলে— “দিদিম্যাডাম সবসময় অদ্ভুত কিছু করেন, বুঝি না,” আবার কেউ মুগ্ধ গলায় বলে— “মেয়ে তো বাড়ি গিয়ে বলে সে কবিতা লিখবে।” কাবেরী এসব শুনে শান্তভাবে হেসে ফেলেন। এই শান্ত হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে তাঁর বছরের পর বছর ধরে করা একটা ব্যক্তিগত বিপ্লব—যেখানে বইয়ের বাইরেও মেয়েরা চিন্তা করতে শিখছে, লেখার সাহস পাচ্ছে, প্রশ্ন করার শক্তি পাচ্ছে। গ্রামে যতই স্কুলে আসা মেয়ের সংখ্যা বাড়ুক না কেন, মানসিক বাধা এখনও রয়ে গেছে, আর সেই বাধা ভাঙতে বড় কথা নয়, ছোট ইঙ্গিত লাগে, ছোট বিশ্বাস লাগে — যেমন এই পেনসিল। স্কুলের হেডপণ্ডিত, বিরাজ বাউরি, বিকেলে এসে প্রশ্ন করেন— “এই পেনসিল বিলানো কিসের জন্য? সরকারের কোনো প্রকল্প?” কাবেরী হালকা হেসে বলেন— “না, এ আমার ব্যক্তিগত। আমি জানি, সবাই লেখে, কিন্তু কেউ কেউ নিজের জীবনটাও লিখে ফেলতে পারে এই দিয়ে। আমি চাই ওরা নিজের জীবন নিজের ভাষায় লেখার সাহস পাক।” বিরাজ কিছু না বলে চলে যান, কিন্তু মনে মনে গম্ভীর হন। স্কুল বন্ধ হবার পর কাবেরী জানালার ধারে দাঁড়িয়ে শেষ আলোটুকু দেখেন মাঠের ওপর পড়তে—যেখানে এখনো কয়েকটা মেয়ে দেরিতে টিফিন খাচ্ছে, কেউ মাঠে পেনসিল দিয়ে মাটি আঁচড়ে কিছু লিখছে। তিনি জানেন না আজকের এই মুহূর্তের মধ্যে কোন একটা ভবিষ্যৎ লিখে যাচ্ছে নিজের গল্প, হয়তো এই দৃশ্য তিনি পরে মনে রাখবেন না, হয়তো এই মেয়েগুলোর নাম তিনি দশ বছর পরে ভুলে যাবেন — কিন্তু যেটা থেকে যাবে, সেটা হলো তাদের হাতে ধরা ছোট পেনসিল, যেটা দিয়ে তারা প্রথমবার নিজের ইচ্ছে আঁকবে, নিজের কথা বলবে, আর সেই বলার মধ্যেই তারা নিজেকে খুঁজে নেবে। কাবেরী জানেন, এই পেনসিল দিয়েই তৈরি হয় আত্মশক্তির শুরু — মৃদু, নিরব, কিন্তু চিরকালীন।
অধ্যায় ২: মিনতির কবিতা
মিনতি পাল, বয়স দশ, চোখে একটি বেমানান কৌতূহল আর গলায় চিরন্তন ক্লান্তি। তার ছোট্ট গড়নের শরীরটার ওপর যেন সংসারের দায়ভারে চেপে বসেছে বছর দশেক আগেই। ওর বাড়ি স্কুল থেকে আধ ঘণ্টার হাঁটা পথ দূরে — মাঝরাস্তায় শুকনো খালের ধারে কুঁড়েঘর, যার ছাউনিতে একপাশে ছিদ্র, সেখান দিয়ে বর্ষার দিনে জল ঢোকে আর শীতে ঠান্ডা বাতাস। মিনতির মা বিছানায় শুয়ে থাকে বেশির ভাগ সময়, এক অজানা অসুখে ভুগছে বছরের পর বছর, আর বাবা—কথা উঠলেই কেউ মুখ ঘুরিয়ে নেয়। গ্রামের সবাই জানে সে মানুষটা সকালে চায়ের দোকানে খবরের কাগজ পড়ে, আর সন্ধ্যায় হাটে গিয়ে হাঁড়িয়া খেয়ে ফিরতেও ভুলে যায় কোন বাড়ি তার। মিনতির নিজের কাছে এইসব আর কিছুই অচেনা নয়, সে এগুলোকেই জীবনের নিয়ম মেনে নিয়েছে। স্কুলই একমাত্র জায়গা, যেখানে মিনতি নিজেকে হালকা মনে করে, মুক্ত ভাবে হাঁটে, আর কাবেরী ম্যাডামের মুখটা দেখলেই তার ভিতরের কান্না কোথাও একটা শান্ত হয়ে যায়। সেই যে বছরের প্রথম দিনে কাবেরী ম্যাডাম একটি ছোট রঙিন পেনসিল তুলে দিয়েছিলেন মিনতির হাতে, সেদিন সে কিছু বলতেও পারেনি, কেবল সেদিকে চেয়ে ছিল এক অদ্ভুত বিস্ময়ে। তার জীবনে এর আগে কেউ কখনো তাকে কিছু ‘উপহার’ দেয়নি, কোনো কিছু এমনভাবে হাতে তুলে দেয়নি যেন তা খুব জরুরি, খুব মূল্যবান। সে পেনসিলটা সে যত্ন করে রেখেছে তার বালিশের নিচে, পাথরের মতো, যেন হারিয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না।
এক বিকেলে স্কুল ছুটির পর ক্লাসঘরে একা বসে ছিল মিনতি। ক্লাসের সবাই চলে গেছে, রুণা বলে গিয়েছিল, “চল ঘরে ফিরি, মা বকা দেবে।” কিন্তু মিনতি বলে, “তুই যা, আমি একটু কিছু লিখে নিই।” সামনে ছিল তার খাতার শেষ পাতা—এক কোণায় দাগ কাটা আর একটু ময়লা হয়ে যাওয়া। সে পেনসিলটা বের করল, একটু কেটে নিল ছেঁড়া ব্লেড দিয়ে, এরপর কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইল। কাবেরী ম্যাডাম জানালা দিয়ে তাকে লক্ষ্য করছিলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। সেই চুপচাপ সময়ে হঠাৎ যেন মিনতির ভিতরে কোন অতল থেকে শব্দ উঠে এলো, আর সে লিখতে শুরু করল—”আমার ঘর, আমার স্বপ্ন, আমার মা ঘুমিয়ে, আমি জেগে / রাতজেগে ভাবি, কী লিখি, কোন পাখি এসে বলে / মেয়েরা কাঁদে না, মেয়েরা গল্প লেখে…”। কাবেরী ম্যাডাম চুপচাপ তার পেছনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি কিছুক্ষণ পর বললেন, “এই কী লিখলি, শুনাবি?” মিনতি একটু লজ্জায় পড়ে গেল, কিন্তু তার চোখে ভয় ছিল না, ছিল একরকম আত্মবিশ্বাস, যেটা সে আজ প্রথম অনুভব করল নিজের ভিতরে। সে চুপচাপ পাতা এগিয়ে দিল ম্যাডামের হাতে। কাবেরী শব্দগুলো পড়তে পড়তে থেমে গেলেন মাঝপথে — তাঁর গলার ভিতর দলা পাকিয়ে উঠল। এই মেয়ে, যে কখনও প্রকাশ্যে কিছু বলে না, যে প্রায়ই ভুল বানান করে, সে কেমন করে এত গভীর কথা লিখে ফেলল? পেনসিলের সেই দাগ যেন তার হৃদয় পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল। তিনি মিনতির মাথায় হাত রাখলেন, বললেন, “তুই জানিস না, তুই কী লিখলি।” মিনতি কিছু বলল না, কেবল হেসে ফেলল ছোট করে, সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না, ছিল স্বীকারোক্তি—যেন বলতে চাইছে, “আমি শুধু কষ্টগুলোকে লিখে ফেলেছি, ম্যাডাম।”
পরদিন সকালে কাবেরী ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকে বোর্ডে মিনতির সেই কবিতাটা লিখে দিলেন। মেয়েরা প্রথমে বুঝতেই পারেনি, কী হচ্ছে—ক্লাসে কবিতা! কেউ কেউ উচ্চস্বরে পড়তে লাগল, কেউ আবার মিনতির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুই লেখছিস?” কাবেরী ম্যাডাম হাসলেন—“হ্যাঁ, এটা তোমাদের এক বন্ধুর লেখা। জানো, ও কী বলেছে? মেয়েরা কাঁদে না, গল্প লেখে। এই লাইনটা আমাদের সকলের জন্য। আজ থেকে তোমরাও চেষ্ট করো, তোমার মন যা বলে, পেনসিল দিয়ে লিখে ফেলো। বানান ভুল হতেই পারে, কিন্তু ভাবনার ভুল হয় না।” ক্লাসঘরটা তখন এক অন্যরকম আলোয় ভরে উঠল, একে একে মেয়ে গুলো তাদের খাতা খুলে ফেলল, কেউ লিখছে — “আমার দাদু মারা গেছে, আমি কাঁদিনি”, কেউ লিখছে — “আমি খেলতে ভালোবাসি”, কেউ শুধু একটা গাছ এঁকেছে আর পাশে লিখেছে — “এই গাছ আমার বন্ধু।” রুণা, যে সাধারণত সবকিছুতেই একটু ঠোঁট বাঁকায়, সেও আজ লিখল — “মা বলে কাজ কর, আমি বলি আমি লিখব।” কাবেরী ম্যাডাম বুঝলেন, এই মুহূর্তেই সেই অদৃশ্য বিপ্লবের শুরু হয়েছে। যে বিপ্লব কোনো স্লোগান ছাড়াই ঘটে, কোনো রক্তপাত ছাড়াই, কোনো নেতা ছাড়াই—শুধু বিশ্বাস আর পেনসিলের ছোঁয়ায়। স্কুল ছুটির পর কাবেরী স্কুলের অফিস ঘরে বসে চুপচাপ মিনতির কবিতাটা আবার পড়েন। তাঁর মনে পড়ে যায় নিজের ছোটবেলা, সেই পেনসিল দিয়ে প্রথম লিখেছিলেন “আমার নাম কাবেরী”, তারপর লিখেছিলেন, “আমি মেয়েদের শিক্ষক হতে চাই।” আজ এত বছর পর, আরেকটা মেয়ে লিখল — “আমি জেগে / রাতজেগে ভাবি / মেয়েরা কাঁদে না…” — এই মিল কোথা থেকে এল? এটা কি কেবল এক অনুলিখন, নাকি সময় নিজের গহীন সুরে এক মেয়েকে অন্য মেয়ের আত্মা দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছে নিজের কথাগুলো? বাইরে তখন সন্ধ্যা নামে, স্কুল ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়, আর কাবেরী ম্যাডাম বুঝে যান—এই পেনসিল শুধু লেখার নয়, আত্মার ভাষা হয়ে উঠছে, এমন ভাষা যেটা দিয়ে মেয়েরা প্রথমবার নিজের বুকের কথা প্রকাশ করতে শিখছে—আর তাতেই জন্ম নিচ্ছে সেই নীরব বিপ্লব, যার নাম ‘মেয়েরা লিখছে’।
অধ্যায় ৩: রুণার প্রতিবাদ
রুণা খাতুন – বয়স এগারো, চোখে জেদ আর মুখে সেই রুক্ষতা যা অভিমান আর অভাব একসাথে গড়ে তোলে। ওর বাবা দিনমজুর, সকালে বাজারে যায় আর রাতে ফিরে আসে মদের গন্ধ নিয়ে। মা কাজ করে এক জমিদার বাড়ির রান্নাঘরে, যেখানে তাকে ‘খাতুন’ না বলে ‘খাটুন’ বলে ডাকে সবাই। এই বাড়ির ভিতরেই বড় হয়েছে রুণা—দারিদ্র্য, কটু কথা আর উপেক্ষার মাঝে দাঁতে দাঁত চেপে। পড়াশোনার প্রতি তার একটা অদ্ভুত টান থাকলেও সে কখনো প্রকাশ করেনি; কেবল কাবেরী ম্যাডামের ক্লাসেই যেন সে একটু স্বস্তিতে থাকে। কিন্তু সেই স্বস্তিও বেশিদিন থাকল না। একদিন সন্ধ্যায় তার মা এসে জানিয়ে দিল—“তোর বিয়ের কথা পাকা হয়েছে, পরের মাসেই।” প্রথমে রুণা ভেবেছিল, এ এক ধরণের রসিকতা। কিন্তু চোখে চোখ পড়তেই সে বুঝে গেল, এটা কোনো কল্পনা নয়। পরদিন সকালে সে স্কুলে এল না। কাবেরী ম্যাডাম স্কুল শেষে খবর পেলেন, রুণা তার বাড়িতেই রয়েছে, দরজা বন্ধ করে কাঁদছে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, দুদিন পর সে ক্লাসে ফিরল—কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই, চোখে আগুন। সে কিছু না বলে নিজের পেনসিলটা বের করল আর কাবেরীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে তা ভেঙে ফেলল মাঝখান থেকে। বলল—“এই পেনসিল দিয়ে কিছুই লেখা হবে না, ম্যাডাম। আমার কপালে শুধু রান্নাঘরের ধোঁয়া আর কাঁসার থালার শব্দ।” ক্লাস স্তব্ধ হয়ে যায়। কেউ কোনো শব্দ করে না। কাবেরী তার দিকে চেয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, চোখে জলের আভাস। তিনি ধীরে ধীরে বলেন—“রুণা, ভাঙা পেনসিল দিয়েও দাগ ফেলা যায়। কথা থামে না। যদি তুমি চাও, আমি তোমার পাশে থাকব।”
পরের কয়েকদিন রুণা স্কুলে এলেও তার চোখে বিরক্তি, ঠোঁটে বিদ্রূপ। সে কাবেরীর বোঝানো কথাগুলো শুনতেও চায় না, বরং প্রায়শই বলে ওঠে—“আপনি কিছু পারেন না। আপনি তো মেমসাহেব, আমাদের কিছু বোঝেন না।” মেয়েরা দ্বিধায় পড়ে, কেউ কেউ রুণার কথায় সায় দেয়, কেউ আবার চুপ থেকে কাবেরীর পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু কাবেরী বুঝতে পারেন, এটা শুধুই এক কিশোরীর বিদ্রোহ নয়—এটা তার শেষ বাঁচার আর্তনাদ। তিনি সিদ্ধান্ত নেন—এবার শুধু বোঝানোর সময় নয়, এবার কাজ করতে হবে। তিনি গ্রামের মহিলাদের নিয়ে ছোট এক সভা ডাকেন—জায়গা করেন স্কুলের মাঠেই। সেখানে রুণার মা-সহ আরও কয়েকজন মেয়ের মা-বাবা হাজির হন। কাবেরী বলেন, “আপনার মেয়েরা যদি পড়তে পারে, ভাবতে পারে, তাহলে তারা কেবল ভালো ঘরের বউ নয়, সমাজের চোখে মানুষ হয়ে উঠতে পারবে। তাদের হাতে যদি পেনসিল থাকে, তাহলে তারা কেবল রান্নাঘরের কাহিনি নয়, জীবনের গল্প লিখতে পারবে।” কেউ কেউ মাথা নেড়ে, কেউ কেউ চুপ, কিন্তু সবচেয়ে চমকে ওঠেন রুণার মা। প্রথমবার তিনি শোনেন তার মেয়ের মনেও এত কিছু চলছিল—যেটা তিনি জানতেনই না। পরদিন স্কুলে রুণা আসে, কিন্তু মুখে হাসি নেই, চোখে কেমন এক অপেক্ষা। ক্লাস শুরু হবার আগেই কাবেরী তার সামনে আরেকটা পেনসিল এগিয়ে দেন। বলেন—“এইটা ভাঙিস না, এইটা দিয়ে এবার নিজের কথা লিখ।” রুণা ধীরে ধীরে পেনসিলটা নেয়, খাতায় কিছুকাল চুপচাপ থাকার পর লিখে ফেলে—“আমি পড়তে চাই। আমি বাঁচতে চাই। আমি শুধু কোনো কারো মালিকানা হতে চাই না।” কাবেরী বোঝেন, মেয়েটার ভেতরে আগুন জ্বলছে, তাকে শুধু দিশা দিতে হবে।
সেই দিন বিকেলে কাবেরী ক্লাসে একটা ঘোষণা করেন—“আগামী শুক্রবার আমরা একটা দেয়ালপত্র করব। যার যা বলার আছে, লিখে আনো। বানান ভুল হলেও চলবে। মনের ভুল হবে না।” সবাই উত্তেজিত। অনেকেই প্রথমবার নিজের ভাষায় কিছু বলবে। রুণা চুপচাপ বসে থাকে। শুক্রবার দেয়ালপত্রের দিন, সবাই খাতা থেকে পাতা ছিঁড়ে দেয়ালে লাগাতে থাকে—কেউ আঁকে, কেউ কবিতা লেখে, কেউ গল্প। দেয়ালের এক কোণায় একটি চিঠির মতো লেখা থাকে—“আমার নাম রুণা। আমি মেয়েদের পক্ষে। আমাদের শুধু ঘর নয়, স্কুল দরকার। পেনসিল দিয়ে আমরা যুদ্ধ করব, কলম দিয়ে স্বপ্ন আঁকব।” কেউ জানতে পারে না সে লেখাটি রুণার, কিন্তু কাবেরী জানেন। তিনি চোখ বন্ধ করে ভাবেন—একদিন এই গ্রামে, এইসব ছোট মেয়েরা নিজের কথা লিখবে, নিজের অধিকারের জন্য লড়বে, আর তখন হয়তো এই পেনসিল শুধু লেখার উপকরণ নয়—একটা বিপ্লবের অস্ত্র হয়ে উঠবে। রুণা সেই পথ দেখিয়ে দিল আজ, তার প্রতিবাদ ভাঙা পেনসিল দিয়ে শুরু হলেও, শেষ হবে কলম হাতে তুলে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে। কাবেরী জানেন, এই অদৃশ্য বিপ্লব তারা থামাতে পারবে না।
অধ্যায় ৪: স্কুল কমিটির প্রশ্ন
গ্রামের স্কুলে হঠাৎ করেই একটা গুঞ্জন শুরু হয়—“স্কুলে নাকি এখন কবিতা লেখা শেখানো হচ্ছে, পড়া-গণিতের বদলে মেয়েরা আঁকাআঁকি করছে, পেনসিল দিয়ে দেয়াল লিখছে!” বিষয়টা প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে বাজারের চায়ের দোকানে, তারপর আসে স্কুল কমিটির কানে। সভাপতি বিরাজ বাউরি, যিনি গ্রামের একজন প্রভাবশালী কৃষক, নিজে খুব বেশি পড়াশোনা না করলেও ‘শৃঙ্খলা’ শব্দটি তার মুখে প্রায়শই শোনা যায়। তিনি মনে করেন—স্কুল মানেই নিয়ম মেনে বইয়ের পাঠ শেখানো, বেয়াড়া কিছু না হওয়া। সেই বিকেলে, যখন কাবেরী ম্যাডাম ক্লাস সেভেনের মেয়েদের সঙ্গে মেঝেতে বসে ‘আপনার স্বপ্ন’ বিষয়ে একটি দেয়ালচিত্র আঁকতে সাহায্য করছিলেন, ঠিক তখনই স্কুলে উপস্থিত হন বিরাজবাবু—সঙ্গে আরও তিনজন অভিভাবক এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য। তাঁদের চোখে বিস্ময়, ভ্রু কুঁচকে। তারা দেখেন, মেয়েরা কেউ রঙিন পেনসিল দিয়ে সূর্য আঁকছে, কেউ লিখছে—“আমি ডাক্তার হতে চাই”, কেউ লিখেছে—“আমার কণ্ঠ আছে, আমায় থামিও না।” দেয়ালে এসব দেখে বিরাজবাবু রীতিমতো বিরক্ত। তিনি কাবেরীকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলেন—“ম্যাডাম, এ কী হচ্ছে স্কুলে? পেনসিল বিলিয়ে আপনি ভাবছেন কী? মেয়েরা না পড়ালেখা করছে, না শৃঙ্খলা মানছে, দেয়াল লিখছে!” কাবেরী শান্ত স্বরে উত্তর দেন—“ওরা পড়াশোনার বাইরেও নিজেকে খুঁজছে, ওরা শুধু মুখস্থ করছে না, ভাবতেও শিখছে। এটা তাদের নিজের মনের দরজা খুলে দেওয়ার পথ।” বিরাজবাবুর মুখ গম্ভীর হয়—“আপনি বুঝতে পারছেন তো, পেনসিল দিয়ে সমাজ বদলায় না, এইসব অতিরিক্ত আবেগ মেয়েদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়।” তাঁর কণ্ঠে কৌতুকের ছাপ স্পষ্ট। কাবেরী সেই পরিচিত হাসি দিয়ে বলেন—“হ্যাঁ, পেনসিল দিয়ে সমাজ বদলায় না, কিন্তু বদলটা শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই। এই মেয়েটা—” তিনি একজনকে দেখিয়ে বলেন, “এ পেনসিল দিয়ে লিখেছে তার মা ঘরের বাইরে যেতে পারে না। সে এই লেখায় মুক্তির ছবি আঁকছে।” বিরাজ কিছু না বলে চলে যান, কিন্তু তাঁর চোখে ছিল প্রশ্ন আর অস্বস্তির রেখা।
দিন কয়েকের মধ্যেই পঞ্চায়েতের একটি বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। কয়েকজন বলেন—“মেয়েদের লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে হবে, এই সব দেয়াল লিখে সময় নষ্ট হচ্ছে।” কিন্তু সেখানে উপস্থিত এক মহিলা সদস্য, যিনি একসময় স্কুলছাত্রী ছিলেন কাবেরীর, তিনি বলেন—“আমি তো এসব শুনে আনন্দিত। আগে আমরা কেবল মুখস্থ করতাম, এখন মেয়েরা নিজের মনের কথা লিখছে। আমি নিজেই স্কুলে গিয়ে সেই দেয়ালপত্র দেখেছি।” এই কথায় পরিবেশ কিছুটা বদলায়, কিন্তু বিরাজবাবু কিছুতেই সন্তুষ্ট নন। সেই দিন বিকেলে তিনি এক চিঠি পাঠান স্কুলের অফিসে—“শিক্ষিকা কাবেরী দাসের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাই”। চিঠিটা হাতে পেয়ে কাবেরী চুপচাপ পড়েন, মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তিনি জানেন—এই প্রশ্ন আসবেই। যে সমাজ বছরের পর বছর ধরে মেয়েদের চুপ করিয়ে রাখে, তাদের কণ্ঠ খোলা মানে তো বিদ্রোহ। আর এই বিদ্রোহ যদি আসে একখানা ছোট পেনসিল থেকে, তাহলে তা নিয়ে বিতর্ক হবেই। তিনি কোনও জবাব পাঠান না চিঠির উত্তরে, বরং পরদিন স্কুলে নতুন একটি পর্ব শুরু করেন—‘আমি কে’ নামক দেয়ালপত্র। যেখানে প্রত্যেক মেয়ে নিজের ছবি আঁকে, নাম লেখে, এবং একটি বাক্যে নিজের স্বপ্ন লেখে। ক্লাস ফোর থেকে ক্লাস এইট—সব মেয়েরা অংশ নেয়। সেই দেয়াল জুড়ে দেখা যায়—“আমি তৃষা, আমি ফুটবল খেলি”, “আমি নেহা, আমি গান গাই”, “আমি রুণা, আমি দাঁড়াতে শিখছি।” এই দেয়ালটি এত সুন্দর আর আন্তরিক হয়ে ওঠে যে স্কুলে আসা কয়েকজন অতিথি, এমনকি পঞ্চায়েতের একজন সদস্য, ছবি তুলে নিয়ে যান, তা সোশ্যাল মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে।
সপ্তাহখানেক পর বিরাজবাবু আবার আসেন স্কুলে। এবার তাঁর হাতে কোনো চিঠি নেই, চোখে কঠোরতা নেই। তিনি কাবেরীর কাছে এসে বলেন—“ম্যাডাম, আমার মেয়েও এই স্কুলে পড়ে। ওর লেখা আমি এখন ঘরে গিয়ে পড়ি। আপনি যদি ওকে পেনসিল না দিতেন, আমি কখনো জানতেই পারতাম না, সে কত কিছু ভাবছে।” কাবেরী কিছু বলেন না, শুধু বলেন—“আপনার মেয়ে ভালো লেখে, ওর স্বপ্নকে ভয় দেখাবেন না।” বিরাজ মাথা হেঁট করেন। সেই সন্ধ্যায় গ্রামে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে—বিরাজবাবু হাট থেকে ফেরার সময় তার মেয়ের জন্য একটা নতুন খাতা আর রঙিন পেনসিল কিনে আনেন। গ্রামের দোকানদার চোখ কপালে—“বিরাজদা, আপনি?” আর সে হেসে বলেন—“পেনসিল দিয়ে যদি স্বপ্ন আঁকা যায়, তবে কেন নয়?” সেইদিন কাবেরী জানলেন—প্রশ্ন আসবেই, সন্দেহ আসবেই, কিন্তু যদি বিশ্বাস অটুট থাকে, আর হাতে থাকে একখানা পেনসিল, তাহলে প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হয় নিঃশব্দে। মেয়েরা তখন কেবল পড়ুয়া থাকে না, হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের নির্মাতা।
অধ্যায় ৫: নতুন শিক্ষিকা রামিতা
শহর থেকে আসা শিক্ষিকা রামিতা ঘোষ যখন প্রথম দিন স্কুলে পা রাখলেন, তখন চারপাশে ধুলোমাখা উঠোন, কাঠের পুরোনো বেঞ্চ, আর মেয়েদের কচিকাঁচা মুখের সারি দেখে তিনি খানিকটা থমকে গেলেন। তার চোখ এখনও অভ্যস্ত শহরের পাকা ভবনের ক্লাসরুম, ডিজিটাল বোর্ড, সিলিং ফ্যানের ঘূর্ণন আর নির্ধারিত নিয়মে চলা জীবনের। এই গ্রামীণ স্কুলে এসে যেন হঠাৎ এক অতীতের খোলা খাতা তিনি হাতে পেলেন—যেখানে শব্দের চেয়ে চাহনিই বড়, আর শৃঙ্খলার চেয়ে সম্পর্ক বেশি জরুরি। প্রথম দিন ক্লাস নিতে গিয়ে তিনি বুঝলেন, এখানকার পড়ানোর ধরনটা আলাদা। কাবেরী ম্যাডামের পদ্ধতি তাঁকে বেশ অবাক করল। ক্লাসে মেয়েরা শুধু বইয়ের পড়া মুখস্থ করে না, বরং খাতার পাতায় নিজের স্বপ্ন লেখে, দেয়ালে দেয়ালে নিজের গল্প আঁকে। তিনি ভাবলেন, “শিক্ষা কি এতটাই ব্যক্তিগত হতে পারে?” শহরের স্কুলে তিনি যেটা জানতেন তা হলো নির্দিষ্ট পাঠ্যবই, নির্দিষ্ট প্রশ্ন, নির্দিষ্ট উত্তর। কিন্তু এখানে… এখানে তো মেয়েরা খাতায় লিখছে—“আমি কাঁদলে, মাটিও ভিজে যায়”, কিংবা “আমার মা পাখির মতো উড়ে যাক।” এইসব শুনে রামিতা প্রথমদিকে বিরক্তই হন। স্টাফরুমে কাবেরীকে বলেন—“আপনি পড়াশোনার বাইরে এত কিছু করছেন, সময় নষ্ট হচ্ছে না?” কাবেরী তখন মৃদু হাসিতে বলেন—“সময় নষ্ট হয় তখন, যখন শিশু কথা বলার আগেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমি চাই ওরা নিজের কথা বলুক, ভুল হলেও।”
কিছুদিন পর একদিন, ক্লাস সিক্সের ছাত্রী মিনতির খাতা রিভিউ করতে গিয়ে রামিতা হঠাৎ থমকে যান। খাতার মাঝে একটা পাতা আলাদা করে ভাঁজ করা। খুলতেই তাতে লেখা ছোট একটা কবিতা—“বাড়ির জানালায় তাকিয়ে দেখি / আমি আর কেউ নেই / শুধু শব্দগুলো আসে, আমায় জড়িয়ে।” তিনি আবার পড়ে নেন, এবং কিছু একটা ভিতরে কেঁপে ওঠে। তিনি ভাবেন—“এই লাইনগুলো কে লিখল? এই মেয়ে তো টেস্টে সেভেন আউট অব টেন পায় না!” এরপর রামিতা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এই কবিতা কাবেরী ম্যাডামের দেওয়া ‘নিজের ভাষায় কিছু লেখো’ প্রকল্পে মেয়েরা যা খুশি লিখেছে, সেটার অংশ। এরপর একদিন ক্লাসে তিনি মিনতির পাশে বসে জিজ্ঞাসা করেন—“তুই কীভাবে এমন লিখিস?” মিনতি চুপ করে বলে, “পেনসিল দিলে মন কথা বলে, ম্যাডাম।” রামিতা সেইদিন রাতে ঘরে ফিরে কেবল পেনসিলটার কথাই ভাবতে থাকেন। তাঁর স্মৃতিতে ফিরে আসে নিজের শৈশব, যখন তিনিও কবিতা লিখতেন—বাবার মৃত্যুর পর কাগজে লিখে রেখেছিলেন—“আলো ফুরালে কী হয়, আমি আলো আঁকব।” কিন্তু সেই স্বপ্ন হারিয়ে গিয়েছিল পরীক্ষার প্রেশারে, চাকরি পাওয়ার তাড়ায়। এখন এই গ্রামে এসে যেন আবার সেই পুরনো সুর ফিরে পেলেন, সেই নিঃশব্দ টান যেটা হারিয়েও ফেলে ছিলেন। পরদিন তিনি কাবেরীর কাছে গিয়ে বলেন—“আমি একটা প্রজেক্ট শুরু করতে চাই। নাম রাখব ‘চিন্তার খাতা’। মেয়েরা যেকোনো চিন্তা, স্বপ্ন, গল্প বা ভয় সেই খাতায় লিখবে। আপনি সহযোগিতা করবেন?” কাবেরী হেসে মাথা নাড়েন—“তুমি নিজের পথ খুঁজে পেয়েছ রামিতা, ওদের পথ দেখাতে এখন তুমি প্রস্তুত।”
এরপর স্কুলের প্রতিটি ক্লাসে ‘চিন্তার খাতা’ চালু হয়। মেয়েরা তাতে এমন এমন কথা লেখে যা তাদের বাড়িতে কেউ শোনে না—“আমার দাদা আমায় মারলে মা কিছু বলে না”, “আমি ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশে উড়তে চাই”, “আমার গলায় গান আটকে থাকে, কেউ শোনে না।” রামিতা বুঝতে পারেন, এই খাতাগুলো শুধু কাগজ নয়—এই মেয়েদের হৃদয়ের দরজা। তিনি মাঝে মাঝে স্কুলের পর কাবেরীর সঙ্গে বসে সেগুলো পড়েন, কেউ কারো নাম বলে না, কেবল অনুভব ভাগ হয়। স্কুলে যেন এক অদৃশ্য নদী বইছে, যার স্রোত পেনসিল দিয়ে লেখা শব্দে তৈরি, আর যার গতিপথ তৈরি করছে দুই শিক্ষিকার দুজনার ভাবনা, সম্মিলিত যাত্রা। সেইদিন বিকেলে, দেয়ালে যখন নতুন একটি দেয়ালপত্র লাগানো হয়—তাতে একজন মেয়ে লিখেছে, “আমার দুই ম্যাডাম—একজন স্বপ্ন দেখায়, আরেকজন ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগায়।” রামিতার চোখে জল আসে, আর কাবেরী বলেন—“তুমি যদি সত্যিই বুঝে ফেলো এই কথাটার মানে, তবে তুমি আর শিক্ষক নও, তুমি পথপ্রদর্শক।” রামিতা জানেন, আজ যে মাটির ক্লাসঘর, পেনসিলের দেয়াল আর কথার খাতা নিয়ে কাজ করছেন তিনি, তা কোনো পঠনপাঠনের পাঠ্যক্রম নয়—এ এক আত্মার পাঠ, যেখানে শিক্ষকতা মানে শুধু পড়ানো নয়, বরং শোনার, বোঝার, এবং অনুভব করার ক্ষমতা। পেনসিলের সেই ছোট্ট বিন্দুতে আজ তাঁর নিজের জীবনও নতুন করে আঁকা হচ্ছে।
অধ্যায় ৬: অপুর পেনসিল
অপু, স্কুলের একমাত্র ছেলেমেয়ে মিশ্র ক্লাসে পড়া ছাত্র, যার উপস্থিতি প্রথম থেকেই কিছুটা আলাদা। সে চুপচাপ থাকে, কারো সঙ্গে বিশেষ কথা বলে না, কিন্তু ক্লাসে সবসময় আগেভাগেই এসে বসে। তার পোশাক কখনও কুঁচকানো, চুল এলোমেলো, চোখে শুষ্কতার রেখা—যেমন হয় একটা শিশুর, যে ছোট থেকেই বুঝে গেছে নিজের জায়গাটা কতটা সংকীর্ণ। অপু এসেছে এমন এক পরিবার থেকে যেখানে বাবা নেই, মা একজন কারখানার শ্রমিক, সকাল থেকে সন্ধ্যে ঘরে ফেরে না, আর অপু সারাদিন একাই নিজের ছায়ার সঙ্গে বড় হয়। মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হয়েছিল স্থানীয় পঞ্চায়েতের চাপে—“স্কুলে ছেলে নেই বলেই মেয়েদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া সহজ হবে।” কিন্তু অপুর মন যেন ঠিক মানিয়ে নিতে পারে না। সে মেয়েদের কৌতূহলের কেন্দ্র, কখনও টিপ্পনী, কখনও হাসির টার্গেট। কিন্তু কাবেরী ম্যাডাম তার চোখে যা দেখেন, তা একেবারেই ভিন্ন—তিনি দেখেন এক আত্মসচেতন শিশু, যে নিজের মনের দরজা খোলার জন্য মুখিয়ে, কিন্তু সমাজের চোখের বাঁধা জালে আটকে যায় বারবার। একদিন ক্লাসে সবাই যখন “আমি কে” প্রজেক্টে নিজের ছবি আঁকছিল, তখন অপু শুধুই নিজের নামের পাশে লিখল—“আমি নেই।” বাকিরা যখন হাসল, কাবেরী চুপ করে তার পাশে বসে বললেন—“তুই নেই বলছিস, কিন্তু তোর ভাবনা আছে, আর যার ভাবনা আছে, সে থাকে। চুপচাপ থেকে লিখে ফেল, তুই কী হতে চাস।” অপু চেয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর পেনসিল হাতে নিয়ে নিচে ছোট করে লিখল—“আমি গল্প লিখতে চাই, যাতে আমার মতো যারা নেই, তারা জানে—তারা আছে।”
এই ছোট্ট লাইনটাই কাবেরী ম্যাডামকে আলোড়িত করে। সেদিন বিকেলেই তিনি স্টাফরুমে গিয়ে রামিতাকে দেখান সেই খাতা। রামিতা স্তব্ধ হয়ে পড়ে বলেন—“এই তো, পেনসিল আবার বলল সে কথা, যেটা কেউ শোনেনি।” এরপর কাবেরী সিদ্ধান্ত নেন, অপুর জন্য আলাদা একটা প্রজেক্ট তৈরি করবেন—নাম রাখেন “পেনসিলের মানুষ”, যেখানে সপ্তাহে একদিন বাচ্চারা নিজের বানানো কোনো কল্পচরিত্র নিয়ে গল্প লিখবে। অপু প্রথমদিনই লিখে—“পেনসিলমানব”—একটি ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে, যে তার পকেটে একটি পেনসিল রাখে, আর যখনই কেউ কষ্ট পায়, সে চুপিচুপি গিয়ে তার খাতায় সেই কষ্টগুলো সুন্দর বাক্যে লিখে দেয়। সেই লেখা পড়ে লোকেরা হাসে, কেউ গান গায়, কেউ ছবি আঁকে। অপু লেখে—“পেনসিলমানব নিজে কোনো শব্দ বলে না, কিন্তু সে সব কষ্টকে ভাষা দেয়।” কাবেরী ম্যাডাম সেই গল্প পুরো ক্লাসে পড়ে শোনান, মেয়েরা অবাক হয়ে শোনে—এমন একটা চরিত্র? কেউ ফিসফিসিয়ে বলে—“ওইটা তো অপুই।” এরপর থেকে অপুর পাশে বসে থাকা নিয়ে আর কারো আপত্তি থাকে না। কেউ তার খাতা চেয়ে দেখে, কেউ তার গল্প পড়ে কাঁদে। অপুও ধীরে ধীরে খুলে যায়, কথা বলে, হেসে ফেলে মাঝেমধ্যে। তার কাছে সেই ছোট্ট পেনসিলটা এখন আর লেখার জিনিস নয়, এটা যেন তার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা—যা সে হারিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু আবার খুঁজে পেয়েছে শব্দের ভিতর দিয়ে।
একদিন কাবেরী ম্যাডাম তার খাতা দেখে বলেন—“তুই গল্পকার হবি, অপু।” অপু মুখ নিচু করে বলে—“আমি শুধু চাই, আমার লেখা পড়ে কেউ বলুক—আমিও অনুভব করি।” সেই দিনেই কাবেরী ও রামিতা মিলে অপুর গল্পগুলো নিয়ে একটা দেওয়াল পত্র বের করেন, নাম রাখেন—“নেই থেকেও থাকা”—যেটা পড়ে অনেক ছাত্রী চিঠি লিখে জানায়—“আমার মনেও এমন কিছু কথা ছিল, বলতে পারিনি।” অপুর পেনসিল হয়ে ওঠে সেই কাঁচা সেতু, যার মাধ্যমে চুপ করে থাকা শিশুরা আবার শব্দের মুখ পায়। কাবেরী জানেন, এই সব ছেলেমেয়েরা কোনো প্রতিষ্ঠিত লেখক নাও হতে পারে, কিন্তু যদি তারা নিজের মনের কথা নিজেই লিখতে শেখে, তাহলেই এই পেনসিল তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধু হয়ে থাকবে। আর অপু? সে নিজের মতো করে অন্যদের কষ্ট, ভয়, স্বপ্নকে শব্দে রূপ দিচ্ছে, যাতে তার মতো আর কোনো ‘আমি নেই’ বলা শিশু একা না পড়ে। অপুর হাতে ধরা পেনসিল যেন এক জাদুর কাঠি—যা শব্দ দিয়ে গড়ে তোলে আত্মপরিচয়ের নতুন ভাষা।
অধ্যায় ৭: নিষিদ্ধ প্রশ্ন
শীতকালের শুরুতে এক সকালে ক্লাস ফাইভের ছাত্রী লাবণ্যের খাতা থেকে একটা পৃষ্ঠা খুলে পড়ে যায় বেঞ্চের তলায়। কাবেরী ম্যাডাম সেটা কুড়িয়ে নিয়ে দেখতে পান, সেখানে লেখা—“আমার কাকা রাতে আসে, মা চুপ থাকে। আমি কী বলব?” প্রথমে কাবেরী স্তব্ধ হয়ে যান। তারপর পৃষ্ঠাটা আবার পড়েন, যেন নিশ্চিত হতে চান—এটা গল্প নাকি বাস্তব। মেয়েটির লেখায় না ছিল কোন অলংকার, না কোনও ছেঁকে রাখা শব্দ—শুধু এক নিঃশব্দ চিৎকার। সেই বিকেলেই কাবেরী রামিতাকে ডাকেন, খাতা দেখান। রামিতা সেটা পড়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকেন, তারপর বলেন—“এটা তো… অনেক গভীর বিষয়। তুমি কি নিশ্চিত?” কাবেরী বলেন—“আমি জানি না, কিন্তু আমি এটাও জানি, ও কিছু একটা বলতে চেয়েছে। আর আমরা যদি শুনতে ব্যর্থ হই, তাহলে এই পেনসিলগুলো শুধুই অলংকার হয়ে থাকবে।” রামিতা মাথা নাড়েন—“তুমি ঠিক বলছ। কিন্তু এই প্রশ্নটা স্কুলের বাইরে নেওয়া যায় না। গ্রামের সমাজ একে ‘নষ্ট প্রশ্ন’ বলবে।” কাবেরী উত্তর দেন—“আর ঠিক সেই কারণেই এই প্রশ্নটা তোলাই দরকার।” দুই শিক্ষিকার চোখে ছিল আতঙ্ক, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল দায়িত্ববোধ।
পরদিন সকালে কাবেরী লাবণ্যকে একান্তে ডেকে নেন। জিজ্ঞাসা করেন—“তুই যেটা লিখেছিস, সেটা কি কল্পনা?” লাবণ্য চোখ সরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে—“আমি জানি না গল্পটা কি, আমি শুধু লিখেছিলাম। রাতে ভয় হয় ম্যাডাম।” এই ‘ভয়’ শব্দটা কাবেরীর বুক কাঁপিয়ে দেয়। তিনি লাবণ্যের হাত ধরে বলেন—“তুই আমার সঙ্গে সত্যি কথা বলেছিস, সেটাই অনেক বড় কাজ। আমি তোর পাশে আছি।” সেই দিনই কাবেরী শিক্ষাকর্মী সংস্থার এক পরিচিত মনোবিশেষজ্ঞকে ফোন করেন। তিনি গ্রামে এসে কয়েকজন ছাত্রীদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেন। পরে জানান—লাবণ্যর লেখা একান্ত বাস্তব, তার অভিজ্ঞতা গভীর এবং নির্লজ্জ চুপিসারে ঘটে চলা অত্যাচারের চিহ্ন বহন করছে। এরপর শুরু হয় এক অনির্ধারিত যুদ্ধ—যে যুদ্ধে শত্রু নেই, কিন্তু ভয় আছে, প্রশ্ন আছে, সমাজের মুখরক্ষা করার নামে সত্যকে ঢেকে রাখার চেষ্টা আছে। কাবেরী সেই দিন সিদ্ধান্ত নেন—এই পেনসিল শুধু স্বপ্ন আঁকবে না, সাহসের অস্ত্রও হবে। স্কুলে তিনি একটা ছোট প্রোজেক্ট শুরু করেন—নাম দেন “জিজ্ঞাসা করো”। প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে বলা হয়—যে প্রশ্ন কেউ জিজ্ঞেস করতে দেয় না, সেই প্রশ্ন কাগজে লিখে ডালে ঝুলিয়ে দাও। স্কুলের বটগাছের নিচে একটি “প্রশ্নগাছ” তৈরি হয়।
প্রথমে প্রশ্নগুলো সহজ—“ছেলেরা রান্না করতে পারে না কেন?”, “বাবা রাতে এত রাগ করেন কেন?”, “ছোটদের কেউ শুনতে চায় না কেন?”—কিন্তু ধীরে ধীরে প্রশ্নগুলো তীক্ষ্ণ হতে থাকে। এক ছাত্রী লিখে—“যা ভয় পাই, তাই কি আমার দোষ?”, আরেকজন—“চুপ থাকা কি ঠিক?” কাবেরী ও রামিতা এইসব প্রশ্ন পড়েন আর বুঝতে পারেন—এই মাটির স্কুল, যেখানে খড়ের ছাউনি আর কাদামাটির গন্ধে দিন কাটে, সেখানেই জন্ম নিচ্ছে সবচেয়ে ভয়ানক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস। প্রশ্নগুলো কেউ পড়ে না, কেউ উচ্চারণ করে না, কিন্তু পেনসিল দিয়ে লেখা বলেই তা আকার নেয়, দাগ কাটে, থেকে যায়। সমাজ হয়তো এখনও প্রস্তুত নয় উত্তর দিতে, কিন্তু এই স্কুলের মেয়েরা এখন প্রশ্ন করতে শিখেছে—আর এখানেই শুরু সাহসের অধ্যায়। লাবণ্য ধীরে ধীরে চোখের ভীত দৃষ্টি বদলে প্রশ্নপত্রে লিখে—“আমি এখনো ভয় পাই, কিন্তু চুপ থাকব না।” সেই লাইন কাবেরী পড়েন বারবার। তাঁর মনে পড়ে যায় প্রথম দিনে দেওয়া সেই পেনসিল—যেটা ছিল লেখার হাতিয়ার। আজ তা হয়ে উঠেছে জীবনের প্রথম মঞ্চের আলো, যেখানে শিশুরা নিজেদের সত্য, নিজের শরীর, নিজের ভয়ের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে—নিষিদ্ধ হলেও প্রশ্ন তো প্রশ্নই থাকে, আর যেখানেই প্রশ্ন জন্ম নেয়, সেখানেই শুরু হয় পরিবর্তনের গল্প।
অধ্যায় ৮: শেষ প্রদর্শনী
গ্রামের স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর দিন ধার্য হল পৌষ মাসের এক শুক্রবারে। মাঠে বাঁশের খুঁটি দিয়ে প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছে, স্থানীয় কিছু দোকানদার চাঁদা দিয়েছে, আর পঞ্চায়েত থেকেও সামান্য অনুদান এসেছে। কিন্তু এই বছর কিছু আলাদা হবে, সেটা কেবল কাবেরী ম্যাডাম, রামিতা এবং কিছু ছাত্রী জানত। কারণ এই বছর প্রদর্শনীর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল—“পেনসিলের গল্প”—একটি দেওয়াল পত্র, যেখানে একাধিক খাতা, পৃষ্ঠা, কবিতা, আঁকা ছবি, প্রশ্নের পাতা আর স্বপ্নের রেখায় গাঁথা ছিল এই আট মাসের লড়াইয়ের প্রতিটি ক্ষণ। প্রথমে যখন কাবেরী ম্যাডাম এই প্রদর্শনী পরিকল্পনা করেন, অনেকেই বলেছিল—“এটা কি স্কুলের অনুষ্ঠানে ঠিক মানায়?” কিন্তু তিনি শুনেছিলেন না। কারণ তাঁর মাথায় ছিল সেই প্রথম দিনের দৃশ্য—যখন মিনতি চুপ করে লিখেছিল এক পংক্তি, রুণা পেনসিল ভেঙে প্রতিবাদ করেছিল, অপু বলেছিল সে নেই, আর লাবণ্য প্রশ্ন করেছিল—চুপ থাকাই কি সমাধান? এইসব কণ্ঠ একদিনের মঞ্চে মুখ খুলবে না, কিন্তু তাদের লেখা থাকবে দেয়ালে দেয়ালে, জড়িয়ে থাকবে শত সহস্র দর্শকের চোখে জল টেনে নেওয়ার মতো গভীরতায়। প্রদর্শনীর আগের দিন রাতে স্কুলে আলো জ্বলছিল অনেক রাত অবধি—মেয়েরা নিজ হাতে সাজাচ্ছে নিজের লেখা, নিজের আঁকা। দেয়ালে পিন দিয়ে টাঙানো কবিতার পাশে ছোট্ট একটা লাইন—“এই পেনসিল আমাদের কথা বলে”, পাশে অপুর পেনসিলমানবের ছবি, রুণার কবিতা, লাবণ্যের প্রশ্ন। যেন একেকটা শব্দ নয়, রক্তমাংসের মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
প্রদর্শনী শুরু হবার দিন সকাল থেকেই গ্রামের মানুষ ভিড় জমাতে থাকে। স্কুলের উঠোনে হইহই করে ছোটরা দৌড়াচ্ছে, অভিভাবকেরা নিজেদের মেয়ের লেখা খুঁজছে—“এইটা তোর কবিতা রে?”, “তুই এটা লিখেছিস?” কেউ কেউ মুখ নিচু করে হাসে, কেউ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে—“হ্যাঁ, আমি লিখেছি।” সেই প্রথম বারের মতো মেয়েরা বুঝতে পারে, তাদের কথা অন্যরা শুনছে। দেওয়ালের এক কোণায় লাল কাগজে লেখা—“আমরা পেনসিল দিয়ে স্বপ্ন লিখি, কেউ আটকাতে পারবে না।” সেই লাইন পড়ে পঞ্চায়েতের মহিলা সদস্য এসে বলেন—“এই লাইনটা তো আজ আমার নিজের কথা হয়ে দাঁড়াল।” কাবেরী ম্যাডাম সেই মুহূর্তে কিছু বলেন না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকেন পেছনে, চোখে জল চেপে। স্টেজে ওঠে অপু, কাঁপা গলায় নিজের গল্প পড়ে—“আমি ছিলাম নেই, এখন আমি আছি, কারণ আমার পেনসিল জানে আমি কোথায় থাকি।” শ্রোতারা তখন নিস্তব্ধ, মাঠে বাতাস বইছে, যেন শব্দগুলোকে আরও দূর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর রুণা উঠে নিজের কবিতা পড়ে—“আমি মেয়েই ঠিক আছি / আমার কথাও প্রশ্ন হতে পারে।” সেই মুহূর্তে কেউ ক্ল্যাপ করে না, কেউ চিৎকার করে না, কেবল একজন মা—পুরনো শাড়িতে সাদামাটা চেহারার—চুপ করে এসে রুণাকে জড়িয়ে ধরেন। হয়তো তিনি নিজেও কোনোদিন এমন প্রশ্ন করতে পারেননি, আজ তাঁর মেয়েটা তা করছে।
প্রদর্শনীর শেষভাগে কাবেরী ও রামিতা একসঙ্গে মাইকে উঠে দাঁড়ান। তাঁরা কিছু বলেন না প্রথমে। তারপর কাবেরী বলেন—“আজকের প্রদর্শনী কোনো প্রতিযোগিতা নয়। আজ আমরা সবাই শুধু একটা কথা বলতে এসেছি—শব্দের চেয়ে শক্তিশালী কিছু নেই। যে শিশু পেনসিল ধরে প্রথম অক্ষর লেখে, সে জানে না সে কাকে জয় করতে চলেছে। কিন্তু আমরা জানি—তারা নিজেদের ভয়, ব্যথা, স্বপ্ন সবকিছুকে ভাষা দিতে পারছে।” রামিতা বলেন—“এই স্কুল একটা ভবন নয়, একটা ভাষার জন্মস্থান। এখান থেকে শুধু ছাত্র ছাত্রী বের হবে না, বের হবে এমন কিছু মানুষ, যারা শুনতে জানে, যারা নিজের গল্প লিখতে জানে।” এরপর মেয়েরা একে একে এসে পেনসিল হাতে রেখে যায় মঞ্চের সামনে ছোট্ট একটা টেবিলে—যেন এক উৎসর্গ, যেন এক কৃতজ্ঞতা, যেন বলছে—এই পেনসিল আমাদের ভিতরটাকে চিনিয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে মাঠ খালি হতে থাকে, আলো নেভে, কিন্তু দেয়ালগুলো তখনও দাঁড়িয়ে—তাতে লেখা সেই শব্দগুলো, যেগুলো এই গল্পের সত্যিকারের নায়ক। আর দূরে দাঁড়িয়ে কাবেরী জানেন—এই প্রদর্শনী শেষ নয়, এটা শুরু, কারণ যেখানেই একটা মেয়ে পেনসিল হাতে নিজের ভয়কে লিখে ফেলে, সেখানেই শুরু হয় নীরব বিপ্লব।

1000032171.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *