Bangla - নারীবিষয়ক গল্প - ভূতের গল্প

পুতুলকন্যার অভিশাপ

Spread the love

এক

রোদ ঝলমলে একটা দুপুরে কলকাতা থেকে রওনা হয়ে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ডঃ অনিন্দিতা সরকার পৌঁছালেন দক্ষিণবঙ্গের এক প্রাচীন গ্রামে—সোনাচূড়া। চারদিকে যেন কুয়াশার আস্তরণ, অথচ বর্ষা নয়, শীতও নয়। তিনি জানতেন, এই জায়গার নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নয়, তবুও এখানে একটি বিশেষ জমিদার প্রাসাদ আছে, যার কথা প্রায় কেউ জানে না। স্থানীয় লোকজন ভয়ে তার ধারে-কাছে যায় না। পুরনো দলিলপত্র ঘাঁটতে গিয়ে এই রায়চৌধুরী বাড়ির নাম ও বর্ণনা পেয়ে যান অনিন্দিতা। জমিদাররা নাকি ১৮৪০-এর দশকে গড়ে তুলেছিলেন এই রাজবাড়ি, কিন্তু ১৯৪৭-এর পর ধীরে ধীরে পরিবার ছড়িয়ে যায়, প্রাসাদ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। আজও বাড়িটির উত্তরাধিকারী আছে — এক অরিন্দম রায়চৌধুরী — যিনি শহর ছেড়ে মাঝে মধ্যে গ্রামে এসে থাকেন, সংস্কৃতির নামে কিছু সামগ্রী সংরক্ষণ করেন। বাড়ির অর্ধেকটাই যেন ঘুমিয়ে আছে শতাব্দীর নিঃশব্দে। স্থানীয় এক যুবক রজত, যাকে অনিন্দিতা শহর থেকে ফোনে ঠিক করে এনেছিলেন, তাঁকে নিয়ে গেলো জমিদারবাড়ির ফটকে। গ্রামটা কেমন চুপচাপ। ঘুঘু ডাক, শুকনো পাতার মচমচে শব্দ আর মাঝেমধ্যে ঝিরঝিরে বাতাসে বাড়ির পুরনো দরজাগুলোর কেঁপে ওঠা ছাড়া আর কিছু নেই। রজতের গলায় একরকম চাপা শঙ্কার সুর, “আপনি ওই ঘরটায় যাবেন তো? পুতুলওলা ঘরটা? অনেকে বলে, ওখানে কিছু আছে। পুরুষরা যদি বেশি সময় দাঁড়ায়, তাহলে…” সে আর বাক্য শেষ করে না।

প্রাসাদের বারান্দা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেই অনিন্দিতার মনে হলো যেন চোখ দুটি তাকে অনুসরণ করছে। পুরনো তক্তার সিঁড়ি, দেয়ালে ঝুলে থাকা বিবর্ণ তেলচিত্র, ছাদের কর্কশ কাঠের বিম, আর মাঝে মাঝে যেন বাতাসে ভেসে আসে নীরব কান্নার মতো শব্দ—এ সমস্ত কিছুতেই গা ছমছম করে উঠল তার। অরিন্দম রায়চৌধুরী এগিয়ে এলেন, তার চলনে একটা ক্লান্ত অথচ রক্ষণশীল আত্মবিশ্বাস। “আপনারা ইতিহাস খোঁজেন, কিন্তু কিছু জিনিস ইতিহাসে থাকার জন্যই ভালো,” — একথা বলে হালকা হাসলেন তিনি। অনিন্দিতা খুব বিনয়ের সাথে জানালেন, তিনি শুধুমাত্র বাংলার জমিদারতন্ত্রের সামাজিক অবক্ষয় ও মহিলাদের অবদমনের ইতিহাসের উপর কাজ করছেন। অরিন্দম তাকে ঘরগুলি ঘুরিয়ে দেখান। কিন্তু এক ঘর নিয়ে কথা বলেন না—উত্তরের কোণের ঘরটি, যার দরজায় তালা ঝুলে আছে। সেই তালার ওপরে জমেছে ধুলো আর কপাটে লেগে আছে কিছু চুলকানির মতো আঁচড়। রজত পরে ফিসফিস করে বলে, “এটাই সেই ঘর, পুতুল যেখানে থাকে। কেউ ঠিক জানে না কে রেখেছে, কিন্তু যত পুরুষ গেছে এই ঘরে, কিছু না কিছু অস্বাভাবিক দেখেছে। কেউ তো রাতে তার দাদার মুখে রক্ত দেখে উঠে পড়েছিল। কেউ পুতুলকে নাকি চোখ ঘোরাতে দেখেছে।” অনিন্দিতা হেসে উঠলেন, এসব যেন ভৌতিক কিংবদন্তির ফেলে দেওয়া অংশ। তবুও কেমন একটা ভারী অনুভূতি তার বুকের ভিতরে জমতে লাগলো।

রাত্রে অতিথিশালায় বসে চা খেতে খেতে অনিন্দিতা তার নোটবুক খুললেন। তার কলম যেন একটু থেমে থাকল সেই পুতুলের ঘরের কথা লিখতে গিয়ে। এই বাড়িতে যেন কোথাও কোথাও সময় থমকে আছে। দালানে এক কোনায় পুরনো রেশমের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি তেলচিত্রে তিনি নজর দিলেন—এক কিশোরী, গলায় মুক্তোর হার, চোখে অভিমান আর ক্লান্তি। পাশের দেয়ালে খোদাই করা এক নাম—‘চন্দ্রবালা’। তার বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা বাজল। সেই নাম তো তিনি পূর্বে শুনেননি! কে এই চন্দ্রবালা? না কি সে-ই সেই পুতুলকন্যা? তার মনে হল, বাড়িটির প্রতিটি ইট, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি ছায়া যেন চিৎকার করে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু কেউ শোনে না। ঐ পুতুল শুধু একটি অলঙ্কার নয় — তা যেন সাক্ষী এক অব্যক্ত ইতিহাসের, এক নিঃশব্দ অভিশাপের, যা এতদিন অপেক্ষা করছিল কারও শোনার, কারও লেখার জন্য। সেই দায়িত্ব নিতে হয়তো অনিন্দিতাই এসেছেন — অজান্তেই এক নারী আত্মার ইতিহাসকে মুক্তি দেওয়ার দায় মাথায় নিয়ে।

দুই

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে উঠে বসলেন অনিন্দিতা। জানালার কাঁচের ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে বটে, কিন্তু সেই আলোর ভিতরেও যেন একটা ধুলো জমে থাকা নিস্তরঙ্গতা আছে। সকালের চা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতেই দূরে দেখা গেল দিদিমা রঞ্জবালা রায়চৌধুরী ধীরে ধীরে হাঁটছেন – এক হাতে কাঠের লাঠি, অন্য হাতে ছোট পেতলের পাত্র। অনিন্দিতা এগিয়ে গিয়ে কুশল বিনিময় করতেই তিনি একবার তাকালেন, চোখে অস্পষ্টতা এবং সময়ের ভার। “আপনিই বুঝি এসেছেন শহর থেকে? ইতিহাস খোঁজেন?” – প্রশ্ন করলেন নিস্তরঙ্গ স্বরে। অনিন্দিতা মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ দিদিমা, প্রাচীন জমিদারবাড়ির সামাজিক কাঠামো ও নারীর অবস্থান নিয়ে গবেষণা করছি।” রঞ্জবালার চোখ যেন অতীতের ভিতর দিয়ে হেঁটে গেল মুহূর্তে, তারপর বললেন, “তবে এই বাড়ির মেয়েদের ইতিহাস আপনি কাগজে পাবেন না।” তিনি ধীরে হাঁটতে হাঁটতে একটা কাঠের দরজার দিকে ইঙ্গিত করলেন – সেদিকে আগেও গিয়েছিলেন অনিন্দিতা – পুতুলের ঘর। “ওখানে আজ কেউ যায় না। কিন্তু একসময় সেখানে গান বাজত, পায়ের ঘুঙুর বাজত, আর মেয়েরা জানালার গরাদের ফাঁকে চাঁদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত,” বলেই তিনি চুপ করে গেলেন। সেই ঘরের দিকে তাকিয়ে অনিন্দিতা আবার মনে মনে প্রশ্ন করলেন — কাদের দীর্ঘশ্বাস জমে আছে আজও সেই পুতুলের চোখে?

দুপুরে রজতের সহায়তায় ঘরের তালা খুলে ফেললেন অনিন্দিতা। পুতুলের ঘরের দরজা খুলতেই ভেতরের বাতাস একরকম ভারী হয়ে বুকে আছড়ে পড়ল। ঘরের এক কোণে কাঠের তক্তার ওপর বসে আছে সেই রহস্যময় পুতুল—পোড়ামাটির তৈরি, পরনে ছোট শাড়ির ছাঁদে লাল কাপড়, মাথায় টিকলি আঁকা, চোখ দু’টো বড়ো, কালচে আর গভীর—যেন স্থির নয়, যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। অনিন্দিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। ঘরের মেঝেতে ধুলো, কিছু পুরনো কাঠের খেলনা, ছিঁড়ে যাওয়া একটা রেশমের চুড়িদার পড়ে আছে মলিন হয়ে। হঠাৎ পেছন থেকে রজতের কণ্ঠ — “ম্যাডাম, আপনি একা একা থাকবেন তো?” সে স্পষ্ট উদ্বিগ্ন। অনিন্দিতা মৃদু হেসে তাকে বাইরে দাঁড়াতে বললেন। এবার তিনি পুতুলটির আরও কাছাকাছি গিয়ে দেখলেন — সেটি কেমন যেন পরিচিত মনে হচ্ছে। মুখখানা অদ্ভুতভাবে মানবিক। পুতুলটিকে হাতে তুলতেই তার তলায় কিছু খোদাই করা দেখতে পেলেন — “চ.বা. রায়চৌধুরী বাড়ি ১৮৭১”। ‘চ.বা.’—চন্দ্রবালা? অনিন্দিতার কণ্ঠে চাপা বিস্ময়। পুতুলের তলায় আঙুল বুলিয়ে মনে হল যেন এখানে কেউ নিজের নাম চাপা দিয়ে যেতে চেয়েছে, একটা ইতিহাস খোঁজার আকুতি রেখে গিয়েছে নিঃশব্দে। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল হঠাৎ — জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে হালকা হাওয়া এসে পুতুলের শাড়ির কোণটা একটু নাড়া দিল। অনিন্দিতা কেমন একটা হিমশীতল শিহরণ অনুভব করলেন—এই পুতুল শুধু একটি খেলনা নয়, এটি যেন এক আত্মার শরীর, এক বন্দি জীবনের দর্পণ।

রাত বাড়তেই আকাশে মেঘ জমে এল। নয়নতারা এসে পৌঁছেছে বিকেলের দিকে, হাতে তার DSLR ক্যামেরা। সে অনিন্দিতার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই বলেছিল, “এমন কেস আমি মিস করতে পারি না, ভুতুড়ে হোক বা ইতিহাস!” দুজনে মিলে আবার ঘরটি দেখতে গেল। নয়নতারা পুতুলের কয়েকটি ক্লোজআপ তুলতে গিয়ে বলল, “তুই দেখেছিস? এই পুতুলটার চোখে একটা মানুষী অভিমান আছে।” পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রজত থতমত খেয়ে বলল, “ওটা শুধু খেলনা, কিন্তু কেউ কেউ বলে, চোখদুটো মাঝে মাঝে ঘোরে।” অনিন্দিতা সে কথা গুরুত্ব না দিলেও লক্ষ্য করলেন, নয়নতারা ছবি তুলতে তুলতে কেমন যেন ধীর হয়ে গেছে। সে হঠাৎ বলে উঠল, “একটা আশ্চর্য ব্যাপার — ফ্রেমের মধ্যে অন্যরকম লাগছে ওটা। ক্যামেরায় ওই পুতুলটা আরও জীবন্ত, আরও বেদনার।” সেই রাতে নয়নতারা তার ল্যাপটপে ছবিগুলি দেখতে গিয়ে দেখে একটি ছবিতে স্পষ্ট একটি ছায়াময় মুখ — কিশোরীর মত, বিষণ্ণ, আর একধরনের নির্লিপ্ত অভিমান মাখা। তারা দুজনই বুঝে গেলেন, বিষয়টি কেবল অতীত নয়, এটি এখনো জীবন্ত, এখনো চলমান। অনিন্দিতা ভাবলেন, “চন্দ্রবালার ইতিহাস যদি কাগজে না-ও থাকে, তবে সে নিজের ছাপ রেখে গেছে এই ইট-কাঠ-মাটি আর পোড়ামাটির শরীরের মধ্যে। সত্যটা বের করতেই হবে।” আর সেই সত্যের উৎস ছিল সেই পুতুল—প্রাসাদের নিঃশব্দ চোখ।

তিন

সকালের আলোয় নয়নতারা আরও কয়েকটি ছবি তুলতে গিয়ে লক্ষ করল, ঘরের মেঝের এক কোণে ধুলো ঝেড়ে ফেললে কিছু অক্ষর দেখা যাচ্ছে। অনিন্দিতা এসে কাছ থেকে তাকিয়ে পড়লেন — মাটি খোদাই করে লেখা: “আমি আছি। চ.” — বাকিটা অস্পষ্ট। তিনি জানতেন, এই “চ.” নামটি আগেও এসেছিল — পুতুলের তলায় খোদাই করা চিহ্নে। মনে পড়ে গেল সেই চিত্র, সেই কিশোরী-মুখ — ‘চন্দ্রবালা’। প্রাসাদের রেকর্ড ঘরে ফিরে গিয়ে পুরনো খাতা, নথিপত্র ও দানপত্র খুঁজে খুঁজে কিছুই পেলেন না এই নামের অস্তিত্ব। একজন পরিচারিকার নাম কখনও নথিভুক্ত হত না — সে তো এক যন্ত্র, এক ছায়া। কিন্তু অনিন্দিতা জানতেন, ইতিহাসের সবটাই রাজা-জমিদারদের লেখা নয়, আসল ইতিহাস লুকিয়ে থাকে এইরকম অনুল্লেখিত নামে। তিনি পুরনো টিনের একটা বাক্স খুলে দেখলেন — ভিতরে রাখা কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি, একটি পুরনো আয়না, আর রক্তের দাগ লেগে থাকা ছোট্ট এক টুকরো পিতলের হার। চিঠিগুলোর একটিতে লেখা—”আমি জানি, তিনি আমাকে ভুলে যাবেন। কিন্তু এই পুতুলটা আমাকে মনে রাখবে। আমি তাকে বলে দিয়েছি—সব দেখো, কাউকে কিছু বলো না।” নিচে স্বাক্ষর — শুধু “চন্দ্র।” অনিন্দিতা নিঃশ্বাস ছাড়লেন—”সে আছে, সে ছিল, আর হয়তো এখনও আছে।”

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। নয়নতারা বাড়ির ছাদ থেকে ড্রোন ক্যামেরা উড়িয়ে প্রাসাদের ছাদ আর পিছনের কাঠের ঘরগুলোর ছবি নিচ্ছিল। সেইসময় একটি অদ্ভুত ছায়ামূর্তি চোখে পড়ে ক্যামেরায়—ছোটখাটো গড়নের, মাথায় লাল ওড়না, জানালার ছায়ায় এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে, আবার উধাও। নয়নতারা অবাক হয়ে ভিডিও চালিয়ে বারবার দেখতে লাগল — “এইটা নিশ্চয়ই কিছু ধোঁয়া বা আলোর রিফ্লেকশন?” কিন্তু অন্তরে কেমন একটা কাঁপুনি লাগছিল। অনিন্দিতা তখন সেই চিঠির লেখার তুলনা করে দেখতে লাগলেন — কিশোরী কণ্ঠ, সংযত অথচ ক্ষতবিক্ষত মনের কথা। তিনি ভাবতে লাগলেন, কীভাবে এই মেয়েটি একাকী, নিশ্চুপভাবে নিজের কথা বলে গিয়েছে এই পুতুলের মাধ্যমে। এই পুতুল আসলে তার আত্মপ্রকাশ — তার শরীর হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার সত্তা, তার চোখ, তার অভিমান — সব রয়ে গেছে এই পোড়ামাটির শরীরে। সন্ধ্যে নামতেই হঠাৎই প্রাসাদের পিছনের বারান্দা দিয়ে একটি দরজা খোলা পাওয়া গেল — যেটা বছরের পর বছর বন্ধ ছিল। ভিতরে ঢুকেই তারা দেখলেন—দেয়ালে অজস্র পুতুল সাজানো, তার মধ্যে সবচেয়ে মাঝখানে রাখা সেই বিশেষ পুতুল — যেন একটি উপাস্য প্রতিমা। আর দেয়ালে রক্তরঙে আঁকা একটি বাক্য — “তোমরা দেখনি, আমি দেখেছি।” নয়নতারা পেছনে তাকিয়ে বলল, “তুই কি বুঝতে পারছিস, সে আমাদের দিয়ে তার ইতিহাস বলাতে চাইছে?”

রাত্রে অনিন্দিতা ঘুমোতে পারলেন না। জানালার ধারে বসে থেকে থেকে তিনি ভাবছিলেন — এই প্রাসাদ কেবল ইট, কাঠ আর ঐতিহ্যের গল্প নয়, এটি এক মৃত নারীর গোপন সাক্ষ্যদাতা। তিনি চোখ বন্ধ করতেই যেন কানে বাজে ঘুঙুরের আওয়াজ, রেশমের কাপড়ে হাওয়ার দোল, এবং একটি কিশোরী কণ্ঠস্বর — “আমি হারিয়ে গেছি। তুমি কি শুনতে পাচ্ছো?” চমকে উঠে বসলেন তিনি। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন — কিছুই নেই, কিন্তু সেই কণ্ঠ যেন তার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যেন কেউ তার মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝলেন, এটি আর কল্পনা নয়, এটি ‘মন দিয়ে দেখা’র সময়। হয়তো চন্দ্রবালার আত্মা তাকে বেছে নিয়েছে নিজের কণ্ঠ হতে। হয়তো তার চোখ দিয়েই এখন ইতিহাসের বিচার হবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পরদিন থেকে গ্রামের পুরনো মানুষদের সঙ্গে কথা বলবেন, বিশেষ করে যারা এই বাড়িতে ছোটবেলায় কাজ করেছে বা কিছু দেখেছে। এই ইতিহাসকে তিনি শুধু গবেষণার উপাদান বানাবেন না, এক জীবিত কণ্ঠে পরিণত করবেন — যাতে চন্দ্রবালার মতো কেউ আর হারিয়ে না যায় এক নিঃশব্দ অভিশাপের ভিতরে। পেছনে রাখা পুতুলটির দিকে তাকিয়ে তিনি প্রথমবার অনুভব করলেন — সেটি তাকে “দেখছে” না, বরং তাকে “দেখতে দিচ্ছে”।

চার

রাত দশটা। পুরো রায়চৌধুরী বাড়ি স্তব্ধ। দূরে বাঁশবাগানে বাতাস হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে, ছাদে শুকনো পাতার কড়মড় আওয়াজ শোনা যাচ্ছে শুধু। অনিন্দিতা তখনও ঘুমোতে পারেননি। নয়নতারা আগেই শুয়ে পড়েছে, ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জে দিয়েছে — কিন্তু সে ঘরের বাতিটা জ্বালিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, অরিন্দম রায়চৌধুরী সেদিন অদ্ভুতভাবে চুপচাপ। বিকেলে পুতুলের ঘরের সামনে যখন নয়নতারা তার সঙ্গে দেখা করে, তখন সে কিছু না বলে সোজা তাকিয়েছিল পুতুলের দিকে, যেন তার ভিতরে কিছু দেখছে। এরপর সে একাই বেরিয়ে যায় বাড়ির পিছনের দিকের সেই পরিত্যক্ত করিডোর ধরে। অনিন্দিতা তা লক্ষ করলেও কিছু বলেননি। কিন্তু রাত দশটায় তিনি আচমকা শুনলেন নিচের দিক থেকে একটা খিঁচখিঁচে চিৎকার — যেন কেউ হঠাৎ ভয় পেয়ে উঠেছে। দৌড়ে গিয়ে দেখলেন — পুতুলের ঘরের সামনে অরিন্দম বসে আছে, পেছন ঠেস দিয়ে দেয়ালে হুঁশহারা চোখে তাকিয়ে। মুখ ঘেমে একেবারে ভিজে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে। পাশে পুতুলটি, একটুও নড়েনি, চোখও আগের মতোই। কিন্তু অরিন্দম যেন এক গভীর আতঙ্কে আটকে গেছে।

অনিন্দিতা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি ঠিক আছেন?” — কিন্তু অরিন্দম চুপ। শুধু বলল, “সে আমাকে দেখল… ও দেখল আমি কী করেছি…” অনিন্দিতা থমকে গেলেন। অরিন্দম যেন এখন নিজের মধ্যে নেই। ধীরে ধীরে বলে চললেন — “আমার ঠাকুরদা… উনি… চন্দ্রবালাকে… উনি ওকে বলতেন ‘ঘরের মানুষ’… কিন্তু বাড়ির কেউ ওর কথা বলত না। একদিন আমি সেই ঘরে গিয়েছিলাম ছোটবেলায়… তখনও পুতুলটা ছিল… আমি জানতাম না… জানতাম না ও দেখছে…” অনিন্দিতা অনুভব করলেন, এই পুরুষসন্তান শুধু ইতিহাসের উত্তরাধিকার নয় — পাপেরও উত্তরাধিকার। হঠাৎ অরিন্দম মাটিতে বসে নিজের মুখে হাত চাপা দিয়ে বললেন, “আমি… আমি ওকে এক রাতে দেখি… ঘরে… খোলা চুল… গলায় দাগ… জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিল… আমি কিছু করিনি তবু সে জানত আমি দেখেছি… সে জানত…” — এই কনফেশন যেন ভয়ের চেয়েও বেশি গ্লানির ছিল। পুতুলের চোখ যেন চুপচাপ শোনছিল। নয়নতারা পেছন থেকে এসে এই দৃশ্য দেখে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার ক্যামেরা হাতে, কিন্তু কোনও ছবি তুলল না। এই মুহূর্তটা যেন অতীত আর বর্তমানের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে—যেখানে পাপের মুখোমুখি হয়েছে উত্তরাধিকার।

পরদিন সকাল। অরিন্দম কাউকে কিছু না বলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যান। অনিন্দিতা চুপচাপ বসে চায়ের কাপ হাতে ভাবছিলেন — চন্দ্রবালাকে হয়তো কোনওদিন বিচার বা ন্যায় দেওয়া হয়নি। তার দেহ হয়তো নিখোঁজ, নাম কোথাও লেখা নেই, স্মৃতি চাপা দেওয়া হয়েছিল প্রাসাদের গর্ভে। কিন্তু তার চোখ—তার আত্মা—থেমে থাকেনি। তা রয়ে গেছে একটি পুতুলের ভিতর, একটি শিশু খেলনার খোলসে বন্দি, যেখানে সে প্রতিটি অপরাধী পুরুষকে বাধ্য করে নিজের অতীতের মুখোমুখি হতে। অনিন্দিতা বুঝলেন, এই পুতুল কোনও ভৌতিক বস্তু নয়, এটি একটি প্রতীক। প্রতিটি পুরুষ, যারা চুপ থেকে, চোখ ফিরিয়ে, অথবা সরাসরি অন্যায় করেছে — তারা এর সামনে দাঁড়ালে, দেখতে পায় নিজের কালো দিক, নিজের পাপ। নয়নতারা এসে পাশে বসে বলল, “তুই জানিস তো, ও আসলে বিচার করছে। কে দোষী, কে নির্দোষ — ও চুপচাপ বিচার করছে। ও কোনও ভয় দেখায় না। ও শুধু দেখায়, তুমি কী লুকিয়ে রেখেছো।” অনিন্দিতা মৃদু মাথা নেড়ে বললেন, “এই ঘর, এই পুতুল, আর চন্দ্রবালার আত্মা—সবই একটি নারীসত্তার প্রতিরোধ। যাকে ইতিহাসে ঠাঁই দেওয়া হয়নি, সে নিজেই নিজের ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।” সেই মুহূর্তে মনে হল, প্রাসাদের সিঁড়ির নিচে একটি দরজা কাঁপছে—হয়তো বাতাসে, হয়তো আত্মায়।

পাঁচ

প্রাসাদের পুরনো লাইব্রেরির ধুলোমাখা কাঁচের আলমারির নিচ থেকে বের করে আনা সেই রেজিস্ট্রার বইতে, অনিন্দিতা প্রথম দেখতে পেলেন কয়েকটি নাম যা কোনও দিন আধুনিক ইতিহাসের পাতায় আসেনি। নামগুলো পাশে এক শব্দে পরিচয় — “দাসী”, “দুধওয়ালি”, “আয়াও”, “বাইরে থেকে”— এমন অসংখ্য মেয়েদের নাম, যাদের কাজের স্বীকৃতি কখনোই ছিল না, বরং তারা ছিল ‘অদৃশ্য’। বইয়ের একেবারে শেষ পাতায়, এক ফাঁকা জায়গায়, কমলা কালি দিয়ে লেখা ছোট একটি নাম: “চন্দ্রবালা – ঘরের ভিতর”। সেই নামের পাশে কোনো তারিখ নেই, পদবী নেই, পরিচয়ও নেই। কিন্তু সেই কয়েকটি অক্ষর যেন হাজারটা চিৎকারের সমান জোরে অনিন্দিতার অন্তরে বাজল। পরক্ষণেই পিছন থেকে শোনা গেল রঞ্জবালা দিদিমার গলা — “তোমাকে সেই ঘরের গল্প বলি?” ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন অনিন্দিতা, বৃদ্ধার চোখে সজল স্মৃতি, বহু বছর ধরে চেপে রাখা একটি কাহিনির ভার। “আমি তখন ছোট। বাবা-মা কাজ করত এই বাড়িতে। আমি খেলতাম দোতলার উঠোনে। ও ছিল অন্যরকম — চন্দ্রবালা। বয়সে বড়, কিন্তু মন ছিল ছেলের মতো, দৌড়ঝাঁপ, কবিতা, পুতুল খেলা — সব করত। তার একটা পুতুল ছিল, নিজের হাতে বানানো। বলত, ‘ওই পুতুল আমার কথা রাখবে।’ আমরা কিছু বুঝতাম না। কিন্তু একরাতে, আমি জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলাম কিছু — যেটা এখনও ভুলতে পারিনি।” রঞ্জবালা থামলেন, চোখে জল, কণ্ঠে কাঁপুনি।

“এক রাতে আমি খেয়াল করলাম — দোতলার কোণের ঘরে আলো জ্বলছে। জানলার ফাঁকে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ও চন্দ্রবালা একা দাঁড়িয়ে আছে, চোখে জল, আর সামনে দাঁড়িয়ে সেই সময়কার ঠাকুর্দা — মানে অরিন্দমের ঠাকুরদা। আমি বুঝিনি ঠিক কী হচ্ছিল, শুধু শুনলাম ও বলল, ‘আমি বলেছিলাম না, আমি ঘরের জন্য নই।’ তারপর ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সকালে শুনলাম ও নেই। কেউ বলল পালিয়ে গেছে। কেউ বলল জ্বরে মরেছে। কিন্তু আমি জানি, ও মরে গেছিল — এই বাড়িরই ভিতরে। ওর পুতুলটাও হারিয়ে গেছিল। কিছুদিন পর আমি দেখলাম ওর পুতুল ফেরত এসেছে, কিন্তু তার চোখটা অন্যরকম — যেন কারও চোখ। কেউ আর ঘরটার কাছে যেত না, লোক বলত, রাতে কান্নার শব্দ শোনা যায়। তারপর আমি আর কিচ্ছু বলতে পারিনি কাউকে। কিন্তু আজ, তুমি এসে যখন নামটা পড়লে, মনে হল — ও চায় কেউ জানুক।” রঞ্জবালার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। অনিন্দিতা আর নয়নতারা স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন। এই বৃদ্ধা সাক্ষী ছিলেন ইতিহাসের, নারী নির্যাতনের, এবং এক আত্মার নীরব অভিশাপের। এবং আজ, বহু দশক পর, সেই সাক্ষ্য সামনে আনতে পেরেছেন অনিন্দিতা।

রাতে ঘরের বাতি নিভিয়ে বসে থাকলেন অনিন্দিতা। তার চোখে ভাসছিল সেই দৃশ্য — ছোট্ট কিশোরী, পায়ে ঘুঙুর, গলায় পিতলের হার, জানালার বাইরে তাকিয়ে যেন বলছে — “আমি তো দাসী নই, আমি তো মানুষ!” — কিন্তু সেই কথাগুলো কারও কানে যায়নি। সে তার কথা রেখে গেছে এক পুতুলে। নয়নতারা এসে পাশে বসে বলল, “তুই জানিস, আমি আজ স্বপ্নে দেখেছি ওকে। সে চুল বেঁধে জানালার ধারে বসে আছে, হাতে পুতুল নিয়ে বলছে — ‘এইটুকুই আমার, বাকিটা ওরা নিয়েছে।’” অনিন্দিতা তার ডায়েরিতে লিখলেন, “চন্দ্রবালা — দাসী, মেয়ে, আত্মা। যার শরীর হারালেও আত্মা থেকে গেছে। যার কথা চাপা পড়লেও চোখ থেকে যায় — ইতিহাসের বাইরে দাঁড়িয়ে, প্রতিটি চোখ ফিরিয়ে নেওয়া পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতিশোধ নয়, এক নিঃশব্দ ন্যায়।” জানালার বাইরে হাওয়া দুলে উঠল, যেন কারও শ্বাস পড়ে গেল খুব কাছে। হয়তো চন্দ্রবালা এখন সত্যিই পাশে, আর অনিন্দিতা হয়ে উঠছেন তার কণ্ঠস্বর — যার মাধ্যমে শতবর্ষের অভিশপ্ত নীরবতা ভেঙে আজ জেগে উঠছে এক পুতুলকন্যার ইতিহাস।

ছয়

রাত্রি প্রায় এগারোটা বাজে। নয়নতারা তার ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জ দিয়ে বারান্দার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ করেই তার চোখ গেল পশ্চিম কোণের দিকে, যেখানে পুতুলের ঘর। জানালার ফাঁকে ধীরে ধীরে মেঘের আলোর মতো এক ফিকে আলো জ্বলতে দেখে সে চমকে উঠল। পুতুল কি আলো দিচ্ছে? ওটা তো আলোর উৎস নয়! সে দৌড়ে এসে অনিন্দিতাকে ডেকে তুলল। দুজনে টর্চ হাতে সেই ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তালাবদ্ধ না থাকলেও দরজাটা যেন নিজে থেকেই হালকা ফাঁক হয়ে ছিল। ঘরের মধ্যে পা রেখেই তারা থমকে গেল। পুতুলটি তক্তার ওপর আগের মতোই বসে আছে, কিন্তু তার চোখ — সেগুলো যেন লালচে, দীপ্তিমান। যেন আগুনের নীচে জমে থাকা হীরের মতো জ্বলছে। অনিন্দিতার মনে হল, ঘরের ভিতরের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেলেও পুতুলের চোখে তীব্র উত্তাপ। নয়নতারা ফিসফিস করে বলল, “ও আমাদের দেখছে না রে, ও আমাদের ভিতরটা দেখছে।” অনিন্দিতার হাত কাঁপতে শুরু করল। তিনি জানতেন না, ভয় পাচ্ছেন কিনা — কারণ এই পুতুল এখন শুধুই আত্মা নয়, যেন এক বিচারক, এক রেকর্ডকিপার — যে সব কিছু দেখে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

ঠিক তখনই ঘটল অদ্ভুত এক কাণ্ড। বাড়ির এক বৃদ্ধ পুরুষ পরিচারক, মদন, হঠাৎ সেই ঘরের দরজার কাছে চলে আসে। অন্ধকার ঘরে পা দিয়েই সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়, দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় পুতুলের চোখে। এবং পরমুহূর্তেই সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে, কাঁপতে কাঁপতে বলে, “আমি বলিনি কিছু… আমি তো কিছুই করিনি… আমি শুধু দেখেছিলাম… আমি তো কাউকে কিছু বলিনি…” তার চোখ দিয়ে জল ঝরছে, হাতজোড় করে সে একরকম ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে পড়ে। অনিন্দিতা আর নয়নতারা স্তব্ধ হয়ে দেখে — পুতুল তাকে ছুঁয়েও দেখাচ্ছে না, কিন্তু তার চোখ যেন আয়নার মতো তার ভিতরের লুকোনো দোষ, ভীরুতা, নীরবতা — সবই প্রকাশ করে দিচ্ছে। মদন কাঁদতে কাঁদতে বলে, “সেই রাতে আমি দেখেছিলাম ওকে টেনে নেওয়া হচ্ছিল… আমি জানতাম, কিন্তু কিছু বলিনি… আমি ভয়ে চুপ ছিলাম।” তার গলা কেঁপে ওঠে। এক সময়ে সে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। নয়নতারা বলল, “এই পুতুল কাউকে মারে না… এই পুতুল কাউকে ছোঁড়েও না… শুধু তার নিজের চোখ দিয়েই পাপীদের ভিতরের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।” অনিন্দিতা তখন বুঝে যান — এটি কোনও অলৌকিক ভীতিকর বস্তুর গল্প নয়, এটি প্রতীক — এক নীরব পুরনো মেয়ের অভিমান ও দ্রোহের প্রতিকৃতি।

সেই রাতের পর, নয়নতারা পুতুলটির ভিডিও তুলতে গিয়ে আবিষ্কার করে একটি দৃশ্য — ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ছে, পুতুলটির ছায়া মাঝে মাঝে পরিবর্তন হচ্ছে। কিছু সময় পর সেই ছায়া একজন কিশোরীর আকার নেয় — এক হাতে ঘুঙুর, মুখে অভিমান, আর চোখে ভয় আর আশ্চর্য ধৈর্য্যের মিশেল। “তুই দেখেছিস?” নয়নতারা কাঁপা গলায় বলে, “ও তো তোর চিত্রকল্প নয়! ও তো সত্যিই এখানে আছে!” অনিন্দিতা সেই ভিডিও বারবার দেখে অনুভব করেন, পুতুল আর চন্দ্রবালা একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে — শরীর আর আত্মার সীমানা ঘুচে গেছে। সেই মুহূর্তে বাইরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল, ঝড়ের হাওয়া বাড়ি জুড়ে বয়ে গেল, আর পুতুলের ঘরের জানালার কপাট নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল ধাক্কায়। দূর থেকে কে যেন বলে উঠল, “দেখেছো তো?” — কণ্ঠটি অস্পষ্ট, অথচ নারীকণ্ঠ, যেন বাতাসের ভেতর দিয়ে ভেসে আসে। অনিন্দিতা বুঝলেন, সময় ঘুরে ঘুরে ফিরে এসেছে সেই জায়গায়, যেখানে একবার অন্যায় হয়েছিল। এবার সেই অন্যায় পুতুলের চোখে আগুন হয়ে জ্বলছে। আর সেই আগুন নিভবে না, যতক্ষণ না সত্যি আর ন্যায় প্রকাশ্যে আসে।

সাত

সকালের আলো বাড়ির চাতালে পড়তেই এক অদ্ভুত সুর ভেসে এল—কেমন যেন মিহি, করুণ এক রবীন্দ্রসংগীত, “আমারে তুমি অশ্রুজলে ভাসাইলে…”। কোথা থেকে আসছে, কেউ জানে না। নয়নতারা ছুটে এসে বলল, “তুই শুনছিস তো?” অনিন্দিতা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাইরের উঠোনে কাউকে দেখা যাচ্ছিল না, অথচ গানের সুর যেন বাড়ির ইটের ভিতর দিয়ে গুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে। ঘরের ভিতর পুতুলটা সেই আগের জায়গাতেই রয়েছে, কিন্তু যেন একটু বাঁদিকে মুখ ঘোরানো — অথবা এটি কেবল তাদের মনের অলীক প্রতিফলন? সেই মুহূর্তে পুরনো রেকর্ডঘরে চলে গেলেন অনিন্দিতা। সেখানে রাখা একটি গ্রামোফোনের ধুলোমাখা ডিস্ক ঘেঁটে এক ভগ্নাঙ্গ ডিস্কে লেখা দেখা গেল: “চন্দ্র–গান”। তিনি সেটি চালিয়ে দিলেন — আর ঠিক তখনই ঘরে ভেসে উঠল সেই একই সুর, এক তরুণী কণ্ঠে, কম্পিত অথচ সুরেলা। নয়নতারা চিৎকার করে উঠল, “এ তো একই গান! সেই… সেই ঘরের ভেতর থেকে আসছিল!” এই একযোগে ঘটনার ধারাবাহিকতায় তারা বুঝে গেলেন, এই বাড়ির ভিতরে কোথাও এক মৃত আত্মা কথা বলতে চাইছে — গান দিয়ে, চোখ দিয়ে, ছায়া দিয়ে — ইতিহাসের সত্যের মতোই এক নিরুত্তাপ অথচ অনিবার্য কণ্ঠস্বর।

দুপুরের দিকে গ্রামের এক বৃদ্ধা — ধানসিঁড়ি, বাড়ির প্রাক্তন ঝি — খবর পেয়ে এলেন দেখা করতে। তাঁর চোখে জল, মুখে থরথরানি, কিন্তু কথায় একরকম শাস্ত দহন ছিল। “চন্দ্রবালা আমার মেয়ে হত পারত, মা। আমি ওকে বলতাম ‘চাঁদপাখি’। গলায় গান ছিল, মনটা রোদ-ছায়ার খেলা। জমিদারের নজর পড়েছিল… আর আমরা তখন কীই বা করতে পারতাম?” বৃদ্ধা স্তব্ধ হয়ে গেলেন, তারপর বললেন, “একদিন রাতে ওর চিৎকার শুনে ছুটে গেছিলাম। দরজা বন্ধ, ভিতর থেকে সাড়া নেই। পরদিন শুনলাম, ‘চন্দ্র পালিয়েছে’। কেউ বলল নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে। কিন্তু আমি জানতাম, এই বাড়ির ভেতরেই ওর শবদেহ গুম করা হয়েছিল। ওর সেই প্রিয় পুতুলটাকেই রাখা হয়েছিল ঘরে, যাতে ও চিরকাল ‘ঘরের ভিতর’ থাকে। চিরকাল এক নিঃশব্দ সাক্ষ্য হয়ে।” ধানসিঁড়ি থেমে চোখ মুছে বললেন, “মৃতরা কথা বলে, মা… যদি কেউ শোনার থাকে। ও চায় কেউ জানুক, ও চায় কেউ বলুক।” নয়নতারা তার হাত ধরল, আর অনিন্দিতা বুঝলেন — এ কেবল ইতিহাস নয়, এটি এক বংশগত ভয়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো নারীকণ্ঠ, যাকে এতদিন চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল।

রাত্রি নামতেই ঘটল কিছু যা বহু বছরেও কেউ কল্পনা করেনি। নয়নতারা সেই ভিডিও ফুটেজের শেষটা দেখে বলল, “এই দেখ, ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ছে — প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে, লাল শাড়ি, হাতে পুতুল, কিন্তু সেখানে কেউ নেই!” অনিন্দিতা ক্যামেরা হাতে ছাদে গেলেন — রাতের আঁধারে ঝোড়ো হাওয়া বইছে, আর ঠিক ছাদের কিনারায় একটি পাথরের কোণে খোদাই করা কয়েকটি অক্ষর দেখা গেল — “চন্দ্র, ১৮৭৩”। তাদের দুজনের চোখ ছলছলিয়ে উঠল — এই ছিল তার শেষ আত্মপ্রকাশ, তার শেষ স্বাক্ষর। পেছনে তাকাতেই, তারা দেখতে পেল সেই পুতুল — ছাদের কিনারার ধারে দাঁড়িয়ে, যেন তারা না বললে সে ঝাঁপ দিয়ে দেবে অতল নীরবতায়। নয়নতারা ছুটে গিয়ে পুতুলটিকে জড়িয়ে ধরল, যেন একটি মৃত আত্মাকে নিজের বুকে টেনে নিচ্ছে, ভয় নয় — সম্মান নিয়ে। তখনই হঠাৎ হাওয়া থেমে গেল, রাতের পাখির ডাকও স্তব্ধ, এবং চারদিক নিঃশব্দ হয়ে গেল। অনিন্দিতা আস্তে করে বললেন, “চন্দ্রবালা, তুই চুপ করিস না আর। এবার তোর কথা আমরাই বলব — ইতিহাসে, মানুষের মনে, আর সেইসব ঘরগুলিতে যেখানে মেয়েরা এখনও চুপ করে বাঁচে।” পেছনে থাকা অন্ধকার ছায়া এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল — আর বাতাসে যেন কারও কণ্ঠ ভেসে এল — “আমি শুনছি।”

আট

ভোর হতেই অনিন্দিতা ও নয়নতারা ছুটে গেলেন বাড়ির পিছনের জঙ্গল ঘেঁষা ধ্বংসপ্রায় গুদামঘরে, যেখানে একসময় জমিদার বাড়ির পুরনো রেকর্ডপত্র, নথি, আর কিছু নিষিদ্ধ জিনিস লুকিয়ে রাখা হত বলে শোনা যায়। ভেতরে ঢুকে চারদিক খুঁজতে খুঁজতে নয়নতারা মাটির তলায় এক জায়গায় ধসে যাওয়া কাঠের বাক্সের ভগ্নাংশ খুঁজে পেল — তার ভিতরে পুরনো কাগজের কয়েকটি ছেঁড়া টুকরো, তাতে গাঢ় লাল দাগ। প্রথমে মনে হল জং, কিন্তু গন্ধটা কেমন ধাতব। কাগজের এক পাশে লেখা, “এই ঘরের আঙিনায় আমি নেই, কিন্তু আমার চিৎকার রয়ে গেছে…” — নিচে কোনও নাম নেই। অন্য একটি কাগজে খসখসে হাতে লেখা “সেদিন, রাত্রি দ্বাদশ প্রহর — সে কান্না করছিল, কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ ছিল।” নয়নতারা ফিসফিস করে বলল, “এই তো, এই সেই রক্তে লেখা ইতিহাস — যা কেউ কখনও ছাপেনি, লিখেও মুছে ফেলেছে।” অনিন্দিতার চোখ কাঁপছিল — এসব যেন শুধু প্রমাণ নয়, এক আত্মার জীবন্ত স্মারক। পুতুলটি, যাকে আজ তারা বারবার দেখছে নীরব দর্শক হিসেবে, আসলে সেই স্মৃতির সংরক্ষক — একটা মেয়ের কণ্ঠ যার কথাগুলো আর গলায় নেই, চলে এসেছে ঘর, কাগজ, পাথর, বাতাস, আর মানুষের বিবেকের ভিতর।

তাদের গবেষণার গতি পাল্টে গেল সেদিন থেকেই। অনিন্দিতা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষণাগারে জমা দিলেন একপ্রস্থ রিপোর্ট — যেখানে উল্লেখ রইল, কিভাবে একজন ‘দাসী’ চন্দ্রবালার অস্তিত্ব মুছে ফেলতে গিয়ে এক ভয়াবহ সামাজিক প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছিল — যে শুধু একজন নারীর মৃত্যুই নয়, এক গোটা যুগের মুখে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল। নয়নতারা সেই রেকর্ডগুলো ডিজিটাইজ করল, ক্যামেরায় ধরে রাখল চিঠিগুলি, ঘরগুলির ছায়া, এমনকি পুতুলটির প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিচ্ছবি — সবই যেন এক নিঃশব্দ দলিল হয়ে উঠছিল, যা ইতিহাসের বাইরে থেকেও সময়ের সীমানায় ছাপ ফেলছিল। রঞ্জবালা দিদিমা এসে একদিন বললেন, “এই প্রথম, এত বছর পর, মনে হচ্ছে সেই মেয়েটা সত্যি মানুষ হয়ে উঠেছে — শুধু অভিশাপ নয়, সে নিজের কথা বলছে।” নয়নতারা সেদিন রাতে অনিন্দিতাকে বলেছিল, “তুই বুঝতে পারিস, এটা কেমন রকম একটা ন্যায়? আদালত নেই, বিচারক নেই, অথচ একটা পুতুলই এমন সত্য বলছে, যা কেউ বলতে চায়নি। এই তো ‘রক্তে লেখা ইতিহাস’।” অনিন্দিতা একমনে শুনছিলেন, আর তার মনে হচ্ছিল, পুতুলটি তাদের দু’জনকে শুধুই গবেষক বানায়নি, তাদেরকে বানিয়েছে সাক্ষী।

রাত্রি তখন গভীর। চন্দ্রবালার ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে পুতুলটির সামনে নয়নতারা প্রথমবার একটা প্রশ্ন করল — “তুই যদি বেঁচে থাকতে পারতিস, কী হতে চাইতিস?” বাতাস থেমে গিয়েছিল, এবং পুতুলটি একটুও নড়েনি। কিন্তু ঠিক তখন ঘরের জানালার গায়ে ভেসে উঠল শিশিরে লেখা কয়েকটি অক্ষর — “আমি কেবল কথা বলতে চাইতাম।” অনিন্দিতা আর নয়নতারা দু’জনেই চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইল — তারা কেউ এগিয়ে গিয়ে লিখেনি, বাতাসও কিছু করেনি — কেউ নেই, অথচ একটি আত্মা, একটি ইতিহাস, নিজের কথা বলতে শিখে গেছে। তারা জানত না, কীভাবে এটা হচ্ছে — কিন্তু নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারল, এখন আর সে নীরব নেই। পুতুলের চোখ এখন নিঃশব্দ নয়, তাতে কথা আছে — “আমাকে কেউ ভুলে যেও না”। বাড়ির পুরনো সিঁড়ির গায়ে, চুন-ধরা দেওয়ালে, কাঠের জানালায় এখন চন্দ্রবালার ছায়া রয়ে গেছে — আর সেই ইতিহাস তারা মুছতে পারবে না কেউ, কারণ এখন তা শুধু রক্তে লেখা নয়, হৃদয়ে গাঁথা।

নয়

ঝড়ের এক নিঃশব্দ রাতে, যখন বাড়ির সকলে নিদ্রায়, অনিন্দিতা বসে আছেন পুরনো কাঠের জানালার পাশে। বাতাসে ভেসে আসছে বেলগন্ধ, আর দূর থেকে মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে নিশাচর পাখির ডাক। নয়নতারা ঘুমিয়ে, কিন্তু অনিন্দিতার মনে জেগে রয়েছে এক অদ্ভুত টান। ঠিক যেন কেউ ডাকছে, ধীর অথচ অদম্য স্বরে। তিনি উঠে ধীরে ধীরে হাঁটলেন সেই দিকটায় — যেখানে পুরনো একটি ওয়াল ছিল, বছরের পর বছর বন্ধ, কেউ ব্যবহার করেনি। সেই দেয়ালের পেছনে, বাড়ির মানচিত্র অনুযায়ী, আরেকটি কক্ষ থাকার কথা ছিল — একটি “ঘরের ভিতরের ঘর”, যার কথা কেউ কখনও বলেনি, আর কেউ খুঁজেও দেখেনি। তিনি টর্চ হাতে পাথরের সেই মোটা দেয়ালে আলতো চাপ দিলেন — আশ্চর্যজনকভাবে, দেয়ালের একাংশ ধসে পড়ল যেন ইচ্ছায়, আর ভেতরে একটি সরু করিডোর দেখা গেল, ধুলো, জাল, আর গন্ধে ভর্তি। অনিন্দিতা নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করলেন। করিডোরের শেষে খোলা একটি ছোট্ট ঘর — চারপাশে কাঠের তাক, কিছু ছেঁড়া পুতুল, কাঁচের মধ্যে রাখা একখানি চিরকুট, আর মাঝখানে রাখা আছে সেই পুতুল — চন্দ্রবালার।

ঘরটি নিঃশব্দ, অথচ যেন সজীব। দেয়ালে পাথরের গায়ে খোদাই — “এই ঘরে আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব” — নিচে আবার সেই এক অক্ষরে স্বাক্ষর — “চন্দ্র।” অনিন্দিতা টর্চের আলো ঘোরাতেই তাকের ওপরে রাখা ছোট একটি আয়না কেঁপে উঠল, তাতে দেখা গেল এক ক্ষীণ মুখচ্ছবি — যুবতী, উড়ন্ত চুল, কপালে কাটা দাগ, চোখে অনন্ত অভিমান। আয়নাটি তখন থেমে গেল, প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে গেল। পেছন থেকে বাতাসে শোনা গেল চুড়ির মৃদু শব্দ — যেন কেউ পেছনে হাঁটছে। তিনি ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন — কেউ নেই। কিন্তু ঘরের দেয়ালজুড়ে পেন্সিলে আঁকা অসংখ্য মুখ — সবই নারীমুখ, কিশোরী, যুবতী, কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ চিৎকার করছে, কেউ চুপ। প্রত্যেক মুখের নিচে নাম নেই, শুধু একটি তারিখ — হয়তো তাদের “মুছে ফেলার” দিন। এ যেন ইতিহাসের মৃত আর্কাইভ, যার ভাষা কেউ শেখেনি, কিন্তু প্রতিটি রেখায় লেখা কষ্টের প্রতিচ্ছবি। পুতুলটি টেবিলের ওপর নীরব, কিন্তু চোখ দুটি যেন আবারও জলছোঁয়া, যেন এখন চন্দ্রবালার আত্মা নয়, এক সমষ্টিগত নারীসত্তা — যারা সবাই মিলে এই “ঘরের ভিতরের ঘর”-এ নিজেরা আশ্রয় নিয়েছে।

সকালে নয়নতারা উঠে দেখল, অনিন্দিতা চুপচাপ বসে ডায়েরি লিখছেন। তার পাশে রাখা সেই আয়না, যেটা তিনি আনিয়েছেন ভেতরের ঘর থেকে। “তুই গেছিস সেখানে?” — নয়নতারা জিজ্ঞেস করল। অনিন্দিতা চোখ তুলে বললেন, “হ্যাঁ, ওরা সব ছিল। শুধু চন্দ্র নয় — আরও অনেকে, যারা হারিয়ে গেছে, গুম হয়ে গেছে, ভুলে যাওয়া হয়েছে — তারা সবাই ওই ঘরে। আমি বুঝতে পারলাম, এই গল্পটা আসলে চন্দ্রবালার একার নয়, এটা সেই সব নারীর — যারা কথার বদলে চুপ হয়েছিল, চিৎকারের বদলে চাপা পড়েছিল।” নয়নতারা বলল, “তাহলে তুই কি ভাবছিস, এইসব মেয়েদের কণ্ঠকে ফিরিয়ে আনবি?” অনিন্দিতা মৃদু হেসে বললেন, “আমি কিছু ফিরিয়ে আনব না, আমি শুধু পথ খুলে দেব — ওরাই ফিরে আসবে। ইতিহাসকে এখন মুখ দিতে হবে, নয়তো সে নীরব অভিশাপে চাপা পড়বে।” ঘরের কোণে রাখা পুতুলটি সেই মুহূর্তে হালকা কেঁপে উঠল, যেন সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলছে — “এইবার আমাদের কথা শোনা হোক।”

দশ

শেষ পর্যন্ত সেই দিনটি এসে গেল, যেদিন অনিন্দিতা রায়চৌধুরী বাড়ি ছেড়ে ফিরবেন শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তাঁর গবেষণাপত্র জমা পড়বে “Forgotten Women of Colonial Bengal: A Subaltern Feminist Gothic Reclamation” নামে। নয়নতারা ক্যামেরার সমস্ত ভিডিও, স্ক্যান, রেকর্ডিং গোছাচ্ছিল। কিন্তু তার চোখ বারবার ঘুরে যাচ্ছিল সেই পুতুলের দিকে — যে এখনও বাড়ির দোতলার ঘরে, ঠিক সেই পুরনো কাঠের তাকের ওপর বসে আছে, নীরব অথচ জেগে। অনিন্দিতা শেষবারের মতো পুতুলটির সামনে এসে দাঁড়ালেন, একটি পাণ্ডুলিপি রেখে গেলেন তার পাশে — পাতার ওপর লেখা: “চন্দ্রবালা এবং ঘরের মেয়েরা – তাদের কথা”। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, “তোর কথা কেউ শোনেনি, তাই তুই চোখ দিয়ে দেখিয়েছিস। এখন থেকে আমরা বলব, আমরা শোনাব, আমরা লিখব।” বাতাসে যেন হালকা ঢেউ উঠল, আর পুতুলের চোখের এক কোণে আলোর ক্ষীণ ঝলক খেলে গেল — অনিন্দিতা জানেন, এ কেবল প্রতিক্রিয়া নয়, এটা সম্মতি। নয়নতারা বলল, “তুই জানিস, এই পুতুলটা আর ভয়ঙ্কর নয় — এটা এখন এক ইতিহাসের উত্তরাধিকার।” অনিন্দিতা মৃদু হাসলেন। দরজা খুলে বারান্দায় পা রাখতেই হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এল এক মেয়ের কণ্ঠ — মৃদু, ঝরনার মতন — “ধন্যবাদ…”

দু’জন একসঙ্গে ঘুরে তাকালেন — ঘর ফাঁকা। কিন্তু দরজার গায়ে শিশিরে লেখা কয়েকটি অক্ষর:
“আমি এখন মুক্ত। কিন্তু আমার মতন আরও অনেকে… খুঁজে নিও।”
নয়নতারা কাঁপা গলায় বলল, “ও আমাদের দায়িত্ব দিয়ে দিল…” অনিন্দিতা মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, এই বাড়ি হয়তো আমাদের কাজের শুরু ছিল — শেষ নয়। এই অভিশাপ কেবল এক পুতুলে থেমে নেই, এর শিকড় আছে প্রতিটি ইতিহাসের পাতায়, যেখানে নারীর মুখ চাপা পড়েছে — কখনও ধর্মে, কখনও বংশে, কখনও নিঃশব্দতায়।” সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তারা শুনলেন, দূরের বেলগাছে এক পাখি ডাকছে — ঠিক সেই সুরে, যে সুরে চন্দ্রবালা গাইত। বাতাসে রেশ রয়ে গেল, মাটিতে পায়ের ছাপ, ছায়ায় একটা মেয়েলি অবয়ব, কিন্তু এবার আর তা ভয়ের নয় — তা ছিল প্রতীক্ষার। শেষবারের মতো নয়নতারা তার ক্যামেরা ঘোরাল পেছনের ঘরের দিকে — দরজাটা তখন পুরোপুরি খোলা, আর তাতে আলো এসে পড়েছে — সূর্যোদয়ের আলো। যেন শতাব্দীর অভিশপ্ত ঘর আজ প্রথমবার দিনের আলোয় মুখ দেখাল।

সেই বিকেলে শহরের পথে ফেরার সময়, বাসে বসে অনিন্দিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন — মাঠ, কুয়ো, খড়ের ছাউনি, কিছু ছিন্ন মুখ — যেন সবকিছু আজ অন্যরকম লাগছে। নয়নতারা হালকা গলায় বলল, “তুই ভাবিস এই সবের কোনো শেষ আছে?” অনিন্দিতা উত্তর দিলেন, “না, এই গল্পের কোনও শেষ নেই। শুধু দরজা খুলে গেছে — বাকিটা হাঁটার দায়িত্ব আমাদের।” তারা জানতেন, পুতুলটির মতো আরও অনেক ‘নীরব কণ্ঠ’ অপেক্ষা করছে — খুঁজে পাওয়ার জন্য, বলার সুযোগের জন্য। এ শুধু এক জমিদারবাড়ির অভিশাপ নয় — এটি এক প্রতীক, এক চিৎকার, যা আজও বাতাসে জেগে আছে। গল্প শেষ নয়, বরং এই শেষ খোলা দরজা থেকেই শুরু সেই সমস্ত ইতিহাস, যেগুলো রক্তে, চোখে, মাটিতে — আর এখন কলমে লেখা হবে। আর চন্দ্রবালার সেই অভিশপ্ত চোখ — আজ শান্ত, নিঃশব্দ — কারণ সে জানে, কেউ আর তাকে ভুলে যাবে না।

___

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *