Posted in

পুজোর পাঁচ দিন

Spread the love

কুহেলী ধর


বাড়ির বারান্দায় রোদ এসে পড়েছে। মেঘলা গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে রইল জানলার ধারে। নীচে প্যান্ডেলের বাঁশ বেঁধে গাঁদার মালা ঝোলানো হচ্ছে, ঢাকিরা এসেছে, ঢাকের প্রতিটা আওয়াজে যেন বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। ঘরের ভেতরে চায়ের কাপ রাখা, তাতে ধোঁয়া উঠছে না — কারণ মেঘলা আর চা খায় না, কবে যে নিজের পছন্দের তালিকা থেকে চা নিজেই বাদ দিয়েছে, তার ঠিক নেই। বরং, স্বামী রণদীপ আর মেয়ের জন্য রোজ সময়মতো ব্রেকফাস্ট বানানোই এখন তার কাছে ‘প্রিয় কাজ’। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে আটটায় দাঁড়িয়ে, স্বামী অফিসের কথা বলে আজ একটু দেরিতে উঠেছে। মেয়েটা পাশের ঘরে অনলাইন ক্লাসে ব্যস্ত, অথচ তার চোখ দুটো এখনো অর্ধেক ঘুমে ভারী। মেঘলা জানে, এই সময়টা একদম নিজের — এই আধঘণ্টা। প্যান্ডেলের গানে আজ লেগেছে একটা পুরোনো রবীন্দ্রসংগীত — ‘এলো খুশির উজ্জ্বল দিন’ — আর সেই শব্দে ভেসে যেতে যেতে তার চোখ চলে যায় ঘরের কোণায় রাখা পুরোনো ট্রাঙ্কের দিকে। তার ভেতরেই আছে মেঘলার সেই ডায়েরি, যা সে শেষ লিখেছিল ক্লাস টুয়েলভে। কলেজে পড়ার সময় সে কবিতা লিখত, গল্প লিখত — বিভাগীয় ম্যাগাজিনে তার নাম ছাপা হত — একবার এক পুজোর সংখ্যাতেও একটা ছোটগল্প ছাপা হয়েছিল, সেই পত্রিকাটা সে কত যত্নে রেখেছিল! অথচ এখন? পুজো মানে রান্না, অতিথি সামলানো, মেয়ের সাজগোজ, শাড়ির ম্যাচিং ব্লাউজ, শ্বশুরবাড়ির লোকের ছবি তুলে পোস্ট করা — কোথাও মেঘলা নেই। সকালবেলা যখন সে একা থাকে, তখন সেই খালি জায়গাটায় হাওয়ার মত ঢুকে পড়ে পুরোনো মেঘলা — যে স্বপ্ন দেখত। আজকের ঢাকের শব্দে যেন সেই মেঘলাটাই আবার টোকা দিল মনে — “তুই আছিস তো এখনো?”

সপ্তমীর দিনটা মেঘলার ছোটবেলাতে ছিল খুশির দিন। বাবা তাকে সকালে সঙ্গে করে নিয়ে যেত প্যান্ডেলের প্রতিমা দেখতে, তারপর পুজোর মাঠে গিয়ে লটারি টানত — যে লটারি কখনো জেতেনি, তবু ছোট্ট সে বিশ্বাস করত, পরের বার নিশ্চয়ই জিতবে। সেই মেয়ে আজ নিজের মেয়েকে বলে — “ওসব বাজে জিনিস, সময় নষ্ট।” অথচ তার নিজের ভিতরেই যেন কেউ ফিসফিসিয়ে বলে, “তুইই তো লটারির কাগজ ছিঁড়ে ফেলেছিস।” রণদীপ কখনো তাকে জিজ্ঞেস করেনি, সে কী ভালোবাসে। হয়তো করার প্রয়োজনও মনে করেনি — সংসার মেনে চলা মানেই যেন স্ত্রীর জীবনের মানে বুঝে নেওয়া হয়ে গেছে! অথচ তার মেয়েটা — ৯ বছরের ছোট্ট ঈরা — একদিন বলে বসে, “মা, তোমার ছোটবেলায় তুমি কী হতে চাইতে?” এই প্রশ্নে সে থমকে গিয়েছিল। কী হতে চাইত? লেখিকা? শিক্ষক? বাউল? নাকি শুধুই স্বাধীন? সে উত্তর দেয়নি তখন। আজ, সাত বছর পরে সপ্তমীর সকালে মেয়ের সেই প্রশ্ন আবার যেন মাথার ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জানে, এবার হয়তো উত্তর না দিলে প্রশ্নটা তাকে ছাড়বে না। তার ভিতরে চাপা পড়ে থাকা শব্দগুলো আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে — শব্দগুলো, যাদের একসময় সে নিজের অস্তিত্ব ভাবত। ঘরের কোণায় রাখা ডায়েরিটা তার দিকে তাকিয়ে আছে যেন — ‘খোল আমাকে, আবার লিখে ফেল, যা কিছু বলা হয়নি।’ সে জানে না, কবে কীভাবে সে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে রান্নাঘরের ভাঁড়ার তালিকায়, ভাজা মশলার গন্ধে, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হাসিমুখের ছবিতে। অথচ এই মুখের পেছনে একটা কণ্ঠস্বর রয়ে গেছে — যেটা বলে, ‘তুই একা, তোরও আলাদা পরিচয় আছে।’

দুপুরের ভাত গরম করতে করতে মেঘলা ভাবে, আজ যদি ডায়েরি বের করেই ফেলা যেত! কিন্তু রণদীপ দেখলে বলবে, “এই সময় এগুলো করার দরকার নেই তো — রান্না শেষ করেছো?” কিংবা শ্বাশুড়ি বলবেন, “সময় পেলে একবার চাল ডালগুলো গুছিয়ে নিও।” অথচ সেই ডায়েরির পাতাগুলো তার দিকে চেয়ে আছে, যেন অনেকদিন পরে কেউ বলছে, “তুই আজকেই আমাকে ছুঁয়ে দেখ।” হঠাৎ দরজায় বেল বাজে — পাশের পাড়ার রিমি, বন্ধু বলতে একমাত্র সে-ই — এসে দাঁড়িয়েছে, হাতে প্যাকেট। “শোন, তোকে বলতেই ভুলে গেছিলাম — এইবার প্যান্ডেলের স্মরণিকা বেরচ্ছে, মহিলা সদস্যা হিসেবে একটা লেখা দে না। একটা গল্প লিখে দে, যেমন তোর হাত ছিল…” মেঘলা চুপ করে থাকে। ভিতরটা যেন কেঁপে ওঠে। সত্যিই কি সে পারবে? এত বছর পরে? নাকি তার ভিতরের সেই মেয়েটা মরেই গেছে? কিন্তু রিমি বলে, “শোন, তোকে আমি মেঘলা বলেই জানি — রণদীপের বউ বা ঈরার মা না।” এই কথা শোনামাত্র মেঘলার মনে হয়, কুয়াশার ভিতর দিয়ে একটা আলো উঁকি দিচ্ছে। দরজা বন্ধ করে ভিতরে ফিরে এসে সে ডায়েরিটার দিকে তাকায়। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে ট্রাঙ্ক খুলে ফেলে। পুরোনো পাতাগুলোর গায়ে ধুলো জমেছে, কিন্তু শব্দগুলো যেন এখনো উষ্ণ। প্রথম পাতায় লেখা আছে: “আমার কথা, আমার মতো করে।” মেঘলা জানে না গল্প লিখবে কিনা, কিন্তু জানে — লিখতে বসবে। সপ্তমীর সকাল তাকে ডাক দিয়েছে। হয়তো আবার নিজেকে ফিরে পাওয়ার পুজো শুরু হল তার আজ, এখানেই, ঘরের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া রোদের মাঝে।

রাত আটটার সময় প্যান্ডেল থেকে ফিরল রণদীপ আর ঈরা। হাতে এক ঝুড়ি প্রসাদ, মুখে খুশির ছাপ। “অপূর্ব আলোকসজ্জা হয়েছে এই বছর,” বলতে বলতে রণদীপ সোফায় বসে পড়ে। ঈরা এসে কাঁধে ঝুলে বলে, “মা, তুই গেলে না কেন? আমরা তোকে খুব মিস করলাম।” মেঘলা হাসে, বলে, “ভাত রান্না করতে হচ্ছিল তো।” অথচ সে জানে, ওটা একটা অজুহাত। আসলে আজ তার মনই চায়নি প্যান্ডেলে যেতে। আজ তার একটা অন্যরকম সময়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া দরকার ছিল — যেখানে ধূপ, মন্ত্র নয় — বরং কাগজ, কলম আর স্মৃতির সঙ্গে মগ্ন হয়ে থাকা। সে রান্না গুছিয়ে, খাওয়া শেষ করে ঘরের দরজা টেনে দেয়। টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটা আজ আর ধুলোপড়া কিছু নয় — যেন জীবন্ত। সে একটা পুরোনো কলম বের করে, খাতার প্রথম পাতায় তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। বহু বছর ধরে তার হাতে লেখা হয়নি। হাত কাঁপে। মনে হয়, শব্দ ভুলে গেছে সে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে কলম চলতে শুরু করে — প্রথমে অগোছালো, তারপর ছন্দে। “আজ সপ্তমী। পুজোর সকালে আমি নিজেকে ফিরে পেলাম — আর আমি জানি, এই ফিরে পাওয়া সহজ ছিল না।” এরপর লেখা এগোতে থাকে — ছোট ছোট লাইন, নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো। সে নিজের পুরোনো লেখা পড়ে, একবার হেসে ফেলে, একবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এত শব্দ, এত ভাবনা — অথচ এতদিন সে সেগুলোকে ত্যাগ করেছিল, যেন এরা অকাজের জিনিস! আজ মনে হচ্ছে, শব্দই যেন তার একমাত্র বন্ধন, আর মুক্তির পথও। সে লিখে চলে — মায়ের পুরোনো গল্প, কলেজের দিনের প্রেম, ঈরার জন্মের দিন, এমনকি তার নিজের ভয়, শূন্যতা, ক্ষোভ, হাসি। ডায়েরির পাতা পাতায় যেন তার ভিতরের আস্ত একটা মহিলাকে সে তুলে আনছে — যে বহুদিন ধরে তাকে ধাক্কা দিচ্ছিল জানলার ওপাশ থেকে।

ঘরের কোণায় একটা মৃদু বাতি জ্বলছে, ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গিয়েছে সাড়ে দশটা। রণদীপ টিভি দেখছে, ঈরা ঘুমিয়ে গেছে। মেঘলার মাথায় ব্যথা হলেও সে থামতে পারছে না। তার ভিতরকার শব্দ যেন আজ কোনো বাধা মানছে না। সে লিখছে নিজের ‘না বলা’ অনুভব — শাশুড়ির প্রতি গোপন বিরক্তি, স্বামীর সঙ্গে না মিলিয়ে ওঠার যন্ত্রণা, একাকীত্ব, বন্ধুহীনতা — এসব নিয়ে এতদিন সে কাউকে কিছু বলেনি, এমনকি নিজেকেও নয়। কিন্তু এখন সে নিজেকেই বলছে, সব খুলে বলছে। কাগজের পাতায় কোনো বিচার নেই, কোনো নিন্দে নেই — সেখানে আছে শুধু গ্রহণযোগ্যতা। সে আজ বুঝতে পারছে, কত কিছু জমে ছিল তার ভিতরে, যা সে চাপা দিয়ে রেখেছিল ‘ভদ্র গৃহবধূ’ হয়ে থাকার দায়ে। সে ভাবে, এই যে সে কথা বলছে — নিজের সঙ্গে, নিজের জন্য — এটাই তো একটা বিপ্লব। এই লেখার ভিতরেই যে এমন শক্তি লুকিয়ে আছে, তা সে কোনোদিন ভাবেনি। সে ভাবে, মা দুর্গা যখন অসুরবধ করেন, তখন তিনি বাহ্যিক শত্রুর সঙ্গে লড়াই করেন। কিন্তু তার নিজের ভিতরের ভয়ের সঙ্গে, চুপচাপ মেনে নেওয়ার সঙ্গে লড়াইটা তো আরও ভয়ংকর। এই ডায়েরির শব্দে সে যেন নিজের সেই ভিতরের অসুরকেই বধ করছে — নিজের অস্বীকৃত চাওয়া, তার চাপা দুঃখ, অভিমান, না পাওয়া, সব কিছুকে সে ধীরে ধীরে শব্দে গলিয়ে ফেলছে। তাকে কেউ বাহবা দেবে না, ফেসবুকে লাইক করবে না, কিন্তু তবু এই মুহূর্তে সে নিজেকে জীবিত অনুভব করছে। এতদিন ধরে সেই অনুভূতি যেন উধাও হয়েছিল — শুধু সংসার করে যাওয়া, দায়িত্ব পালনের মতো এক মেকানিকাল অস্তিত্বে আটকে ছিল সে।

হঠাৎই টেবিলের পাশ থেকে একটা কণ্ঠ আসে — “তুমি এতক্ষণ ধরে কী লিখছো?” মেঘলা ঘুরে দেখে, রণদীপ দাঁড়িয়ে। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু কৌতূহলও আছে। মেঘলা একটু থমকে যায়। তারপর হাসে, বলে, “একটা গল্প… হয়তো আমার নিজের কথা।” রণদীপ একটু ভ্রু কুঁচকে তাকায়, তারপর বলে, “তোমার তো আগেও এসব করার শখ ছিল না?” মেঘলা খুব শান্ত স্বরে বলে, “ছিল, কিন্তু আমি নিজেই ভুলে গেছিলাম।” কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে রণদীপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মেঘলা আবার লিখতে বসে। কিছুটা ব্যথা হয়, কিন্তু সে জানে, সে কারও অনুমতির অপেক্ষায় নেই আর। তার ভিতরের যন্ত্রণা আর দমন যতদিন ওলন্দাজদের মত শক্তভাবে বসে ছিল, আজ তার নিজের শব্দের স্বাধীনতা এসে যেন সব দখল নিয়ে নিচ্ছে। সে জানে না কোথা যাবে এই লেখা, কেউ পড়বে কিনা, তবু সে থামবে না — কারণ সে আজ বুঝেছে, নিজের জন্য বাঁচা মানেই আত্মপ্রকাশ। একটা প্রদীপ জ্বলছে টেবিলের কোণায়, ধূপের হালকা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে — আর মেঘলার মধ্যে সেই আগুন জ্বলে উঠছে — শান্ত, গভীর, নরম কিন্তু দহনশক্তিসম্পন্ন। সে জানে, কাল আবার রান্না, ঘরদোর, অতিথি — কিন্তু আজ রাতে সে একটা যুদ্ধ জিতেছে। সে আবার নিজের সঙ্গে দেখা করেছে — এবং সেটাই এই সপ্তমীর সবচেয়ে বড় পুজো।

অষ্টমীর সকালে হোস্টেলের ছাদটা গলে পড়ে রূপার চোখে। আকাশ অদ্ভুত ঝকঝকে, যেন কেউ মুছে দিয়েছে সমস্ত ধুলোমাটি। চারপাশে রঙিন শাড়ির ভিড়, মণ্ডপের মাইক থেকে বেজে চলেছে চণ্ডীপাঠ, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা ঠোঁটে লিপস্টিক দিচ্ছে, চোখে কাজল। রূপা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে — কড়া চোখ, অথচ গভীর; সে নিজেই বুঝতে পারে, তার ভেতর এখন কেমন এক অস্থিরতা। এই দিনটা তার প্রিয় ছিল না কোনোদিন — কুমারীপুজো, ‘পবিত্রতা’ ঘিরে ঢাকঢোল পেটানো, মেয়েদের একটা বিশেষ কাঠামোয় বেঁধে ফেলা — এসব তার মনে হয় চূড়ান্ত ভণ্ডামি। অথচ সে দেখছে, তারই বান্ধবী মীনাক্ষী আজ কুমারী রূপে বসবে — লাল শাড়ি, সিঁদুর, পদ্ম হাতে। রূপা তাকিয়ে দেখে, এই মীনাক্ষী তো গত মাসেই প্রেমে পড়ে ছেলেটার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে গেছে — অথচ আজ সে দেবী! রূপা হাসে — তীক্ষ্ণ এক খণ্ড হাওয়া যেন বয়ে যায় তার ভেতর দিয়ে। সত্যিই কি এই সমাজ জানে কাকে ‘দেবী’ বলছে? কে ঠিক করে দেয় কে ‘শুদ্ধ’ আর কে ‘অপবিত্র’? সে নিজেই কি নিজেকে কখনো দেবী ভাবে না, অথচ দিনের পর দিন তার বাবার অসুস্থতা সামলে, নিজের পড়াশোনা চালিয়ে, রাত্রে গুগল ঘেঁটে টিউশন পড়িয়ে নিজের খরচ চালায় — তার ভিতরের সেই পরিশ্রমটাকে কি কেউ কখনো মণ্ডপে তুলে দেয়?

কলেজে ক্লাস না থাকলেও রূপা যায় তার প্রিয় বাংলা প্রফেসরের সঙ্গে আড্ডা দিতে। আজ সেখানে গিয়ে দেখে, প্রফেসর বন্দ্যোপাধ্যায় ক্যাম্পাসে বসে চা খাচ্ছেন, সঙ্গে আরও কয়েকজন শিক্ষক। “রূপা, কেমন চলছে তোদের প্রস্তুতি?” প্রশ্ন করেন তিনি। রূপা এক গাল হেসে বলে, “কোন প্রস্তুতি? পুজোর সাজগোজ, না সমাজের মুখোশ পরে থাকা?” শিক্ষক একটু চমকে যান। রূপা বলে, “স্যার, আজকে আমার বান্ধবী কুমারীপুজোয় বসছে। ভালো কথা, কিন্তু সে যে গত মাসেই প্রেমিকের সঙ্গে একসঙ্গে ছিল, সেটা যদি জানত সবাই, তাহলে কি তাকে কেউ এই আসনে বসাত?” কথাটা বলেই সে থেমে যায়। বন্দ্যোপাধ্যায় চুপচাপ শুনে যান, তারপর ধীরে বলেন, “রূপা, সমাজ যেটা দেখে না, সেটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বিচার করে। কিন্তু প্রশ্ন তুই তুলেছিস ঠিক — পবিত্রতার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে? কুমারী মানে কি শুধুই দেহগত অবস্থান, নাকি মানসিক শক্তি, সততা, আত্মবিশ্বাস?” রূপা গভীরভাবে মাথা নাড়ে। সে জানে, প্রশ্ন তোলা মানেই ঝড় ডেকে আনা — কিন্তু সে ভয় পায় না। সে বলতে চায় — একটি মেয়ে তার শরীর নিয়ে কী করবে, সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। সমাজ কী ভাবছে, সেটা দিয়ে কারো ‘পবিত্রতা’ মাপা যায় না। একসময় সে ভাবে — আজ যদি সে নিজেই গিয়ে দাঁড়ায় কুমারীপুজোর আসনে, কী হবে? সবাই তো নিন্দা করবে, বলবে সে ‘যোগ্য নয়’। কিন্তু কে সেই যোগ্যতার সংজ্ঞা তৈরি করেছে? যে মেয়ে নিজের ইচ্ছায় বাঁচে, প্রশ্ন তোলে, লড়াই করে — সে কি দেবী নয়?

সন্ধ্যেবেলা, কলেজ প্যান্ডেলে গিয়ে রূপা চুপচাপ দাঁড়ায় দর্শনার্থীদের ভিড়ে। সামনে মীনাক্ষী বসে — চোখে কাজল, ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসি, হাতে পদ্ম। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেন, চারপাশে সেলফির ঝলকানি, মায়ের সামনে ঢাকের তালে বেজে চলেছে নরনারায়ণের আড়ম্বর। হঠাৎ করেই রূপা দু’পা এগিয়ে যায় সামনে, সবাই তাকে দেখে চমকে ওঠে। সে সোজা দাঁড়িয়ে বলে, “আমি রূপা। আমি কুমারী নই সমাজের সংজ্ঞায়, কিন্তু আমি নিজের জীবনের মালিক। আমি পড়ি, আমি কাজ করি, আমি ভালোবাসি, আমি প্রতিবাদ করি। আমি দুর্বল হতে হতে আবার উঠে দাঁড়াই। যদি এই সাহসকে দেবীত্ব বলা হয়, তবে আমিও কুমারী।” চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কেউ ফিসফিস করে, কেউ বিরক্ত হয়, কেউ হতবাক। কিন্তু রূপার চোখে জল নেই, ভয় নেই — বরং এক জ্যোতি, এক স্থিরতা। কেউ তার দিকে হাত বাড়ায় না, কেউ হাততালি দেয় না — কিন্তু সে জানে, এই কয়েক মুহূর্তেই সে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেছে। সে ফিরে আসে আস্তে আস্তে, আর পেছনে কেউ বলে ওঠে, “এই মেয়েটার সাহসে মা দুর্গা রয়েছেন।” সে শুনে হাঁটে, মৃদু হেসে — যেমন করে হাঁটে এক যোদ্ধা, পেছনে চিহ্ন রেখে, সামনে আলোর পথ খুঁজে।

রূপার সেই সাহসী বক্তব্যের পর থেকেই পাড়ায় ও কলেজে নানা রকম গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। কেউ তার সমর্থনে সুর তোলে, কেউ আবার কটাক্ষ করতে শুরু করে। “মেয়েটা বড়ই অবাধ্য,” বলে মেয়ে ভাইদের গায়ে গলান দিতে শুরু করে। অথচ রূপার মন অটুট, সে জানে, এই প্রশ্ন তোলাই ছিল সবচে বড় কাজ। রাতের অন্ধকার যখন নামতে থাকে, তখনও সে ঘুমাতে পারে না। তার মন দোলা খায় — নিজের বক্তব্য ঠিক হয়েছিল কি? পরিবার কী ভাববে? মা-বাবার চোখে সে কেমন দেখাবে? এমন সময় মোবাইলের স্ক্রিনে মেসেজ বেজে ওঠে — রিমির। “রূপা, তুমি কী করেছ? সবাই তোমার বিরুদ্ধে। আমি তো বলেছিলাম একটু ধৈর্য ধর, কিন্তু তুই তো ঝড় তুলেছিস।” রূপা হাসে, টাইপ করে, “ঝড় ছাড়া শান্তি আসে না, রিমি। আমি বিশ্বাস করি, একদিন এই ঝড়ই সমাজ বদলাবে।”

কলেজের ডরমিটরির ছাদে উঠে সে একা বসে থাকে। চারপাশে অল্প আলো, দূরে বাজছে দূর্গাপুজোর ঢাক। সেই ঢাকের আওয়াজে তার মনের ভাব ভাসে — একটা প্রশ্ন, ‘আমি ঠিক পথ ধরেছি তো?’ সে নিজের জীবনের এক গভীর জায়গায় ঢুকে যায়, যেখানে সব ভয়ের প্রতিধ্বনি। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো ফিরে আসে — “মেয়ে হলে ভদ্র হও, কম কথা বলো, কোথাও ঘুরতে যেয়ো না একলা।” অথচ সে আজ সেই সব বাঁধন ভেঙে দিয়েছে। আজ সে স্বপ্ন দেখে — নিজের মতো করে বাঁচার, নিজের মত করে সাজগোজ করার, নিজের মত করে প্রেম করার। তার চোখে জল আসে — এটা দুঃখ নয়, মুক্তির আনন্দ। সে ভাবে, ‘দুর্গাপুজো মানে কি শুধু মণ্ডপ, ঢাক, মায়া? না, এটা আত্মার জয়, নিজের স্বতন্ত্রতা রক্ষার লড়াই।’

রূপার মা ফোন করে। “মেয়ে, আমি শুনেছি তোমার কিছু বলার ঘটনা হয়েছে?” রূপা সাড়ে হাসি দিয়ে বলে, “মা, আমি শুধু বলেছি সত্যি কথা — নিজের জীবন নিয়ে আমি দোষ করিনি। আমি চাই সমাজ আমাকে আমার মতো দেখতে শিখুক।” মা হয়তো কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু রূপা ফোন রেখে দেয়। সে জানে, সব সময় মায়ের সমর্থন পাবে না, কিন্তু সে চাইবে নিজের পথে এগোতে। সে নিজের চোখের সামনে কল্পনায় দেখতে পারে — হাজার হাজার মেয়েরা যারা তার মতো হেঁটে যাচ্ছে, যারা আজ ভয় পায়, কিন্তু কাল মুক্তির স্বপ্ন দেখবে। সে নিজের ভেতর এক অদ্ভুত শক্তি খুঁজে পায় — যেমন দুর্গার বীরাঙ্গনা, যিনি অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, প্রতিবাদ করেন, কেউ না শোনলেও থেমে থাকেন না।

প্যান্ডেলে ফিরে এসে রূপা দেখেছে, কিছু মানুষ তাকে নিয়ে ফিসফিস করছে, কেউ কেউ কড়া ভাষায় সমালোচনা করছে। কেউ তার উপর গালাগালি করছে, কেউ আবার তাকে ভালো বোঝে না বলে ঘাড় কুঁচকে ফেলে। তবে তার একদল বন্ধু আছেন, যারা তার পাশে দাঁড়িয়ে বলছে, “তুই করেই যা, রূপা। আমরা আছি তো।” রাতের এই কোলাহলে রূপা আবার নিজের ভেতর শান্তি খুঁজে পায়। সে জানে, পথ যতই কঠিন হোক, এই প্রতিবাদই তার জীবনের আলো। সে নিজের হাতে হাত রেখে ভাবছে — “আজ আমি নিজের জন্য দাঁড়ালাম, কাল আরও কেউ দাঁড়াবে।” দূরে থেকে ধীরে ধীরে প্যান্ডেলের প্রদীপ ম্লান হতে থাকে, কিন্তু রূপার হৃদয়ে জ্বলছে নতুন এক আলোর দীপ। সে জানে, এ আলো সবার ভেতর প্রবাহিত হবে — যেমন মায়ের প্রার্থনায়, যেমন বোনের স্বপ্নে, যেমন বউয়ের সাহসে। আজকের এই প্রতিবাদ শুধু তার নয়, এক নতুন যুগের সূচনা।

নবমীর দুপুরে পাড়ার প্যান্ডেলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চামেলি আস্তে আস্তে এগোচ্ছে। তার গলায় মোটা সোনার চেইন, হাতে রঙিন চুড়ি, কপালে লাল টিপ — ঠিক যেন পুজোর মণ্ডপের মধ্যবর্তী একজন নতুন দেবী। পাড়ার লোকজন চোখ ঘুরিয়ে দেখছে তাকে। কেউ কেউ ছোটাছুটি করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, কেউ নাক সুঁইফে কটাক্ষ করছে। কিন্তু চামেলির পায়ের ধাপ যেন থেমে না, সে একটুও ঘাবড়ে না। সে জানে, এই সমাজের চোখ অনেক সময় মায়া দেখাতে পারে না। তারা শুধু বিচার করে, দৃষ্টিতে ছোট করে। কিন্তু চামেলির কাছে সে বড় গর্বের বিষয়, যে সে আজ এই রঙে প্যান্ডেলের বাইরে দাঁড়িয়ে — নিজের অস্তিত্বের কাছে মাথা নত করছে না।

চামেলির জীবনে পুজোর এই দিনটা সব সময়ই অন্যরকম ছিল। প্রতিদিন অন্যের ঘরে কাজ করে, মানুষ থেকে মানুষে ঘুরে, বেলা দুপুরে এক বেলা খাবার খেতে পেত না ঠিকমতো। কিন্তু পুজোর সময় নিজেকে সাজিয়ে নেওয়া যেন তার আত্মার মুক্তি। আজ সে শাড়ি কিনেছিল নিজের হাতে উপার্জিত টাকায় — লাল রেশমি শাড়ি, যার কিনারে সোনার কাজ। তার হাতে চুড়ি গুলো ঝুলছে, যার মাঝে কিছু চুরি হয়ে গিয়েছিল আগের রাতে। অথচ সে হাসি দিয়ে সেই সব ভুলে যায়। তার ভিতর যে নারীটা বসবাস করে, তার জন্য এই শাড়ি, এই লাল টিপ, মানে এক অন্যরকম পরিচয় প্রতিষ্ঠা। সে জানে, অনেকেই তাকে ‘পাপিনী’ বলবে, অনেকেই তার পেছনে ফিসফিস করবে, কিন্তু সে নিজের মতো করে বাঁচতে চায় — যন্ত্রণার মাঝে থেকেও। এই লাল টিপ তার কাছে শুধু সাজগোজ নয়, বরং এক প্রতিবাদের ভাষা, এক অস্ত্র। যে বলে, “আমি এখানে আছি, আমি আছি জীবিত।”

প্যান্ডেলের এক কোনায় দাঁড়িয়ে চামেলি দেখে, বৃদ্ধা ভবানী মৈত্র এসে তার হাতে হাত রাখল, চোখে স্নেহের জল। “বউ, তুই আমার মতো করে এসেছে পুজোয়। আমি জানি কতো কষ্ট করিস, তবু এতো সাহস রাখিস। তুই শুধু আমার বউ নও, তুই সেই দুর্গা, যাকে কেউ বুঝতে চায় না।” চামেলি কিছুতেই সেদিকে তাকাতে পারে না। সে অনেক দিন ধরে এই সমর্থন খুঁজছিল, কেউ যেন তার অস্তিত্বকে মেনে নিক। তার চোখে জল আসে, কিন্তু সে লুকিয়ে রাখে। পুজোর আবহাওয়া যেন তার মনও একটু শুদ্ধ করে দেয়। সে জানে, যতই সমাজ তাকে ছোট করবে, তার নিজের মূল্য কমবে না। সে নিজের মতো করে এক মায়ের মতো, এক নারী হিসেবে বাঁচতে চায়। এই দুপুর তার কাছে এক নতুন সূচনা। পুজোর মণ্ডপে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারে — দুর্গা শুধু সাদা শাড়ি পরা, সিঁদুর লাগানো মেয়েদের নয়, দুর্গা সেইসব নারীর মধ্যেও বেঁচে আছে, যাদের জীবন কঠিন, যাদের রক্ত আর ঘাম দিয়ে গড়া। চামেলির লাল টিপ আজ পুজোর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

নবমীর রাতের আরতি শুরু হয়েছে প্যান্ডেলের গগনে। বাতি আর প্রদীপের আলোর মাঝে মানুষ সমবেত হয়েছে, হাতে হাতে ধূপবাতি। চামেলি, যে সারা দিন পাড়ার চোখের নিচে এক রকম নির্বাসিত হয়, আজ সাহস করে প্যান্ডেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার গলার কাঁপন কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না; বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত উত্তেজনা আর ভয়ের মিশেল। চারপাশ থেকে কিছু মানুষ থমথমে চোখে তাকাচ্ছে, কেউ কেউ সন্দেহ আর অবজ্ঞার ছলে তাকে দেখে। কিন্তু চামেলির মন স্থির, সে জানে, আজকের রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই।

আলোছায়ার মণ্ডপের কোণে দাঁড়িয়ে পুরোহিতের আরতি শুরু হয়। চারপাশে ভক্তরা হাত তোলেন, ধুপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। ধীরে ধীরে চামেলি নিজের গলায় গাওয়া শুরু করে। তার কণ্ঠমধুর, গলার সুর গভীর, যেন নদীর কলতান আর পাহাড়ের গর্জনের মিশ্রণ। তার গানে ভেসে উঠে জীবনের করুণ গল্প, বেদনার সুর, মুক্তির আকুতি। মানুষের চোখে অবাক ভাব, কেউ কেউ ধীরে ধীরে তার পেছনে ঘুরে তাকায়। কেউ যেন শুনতে শুরু করে, কেউ যেন প্রথমবারে তার বেদনার ভাঙা হৃদয় উপলব্ধি করে। প্যান্ডেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে গেয়ে উঠে — ‘তুই যদি থাকিস আমার ভেতরে, তবে বাইরের দুর্গা কোথায়?’

তার গান যেন রাতের আকাশে ঝাঁকুনি দেয়, যা দিয়ে সমাজের ভাঙা মায়াবী চোখও কিছুক্ষণের জন্য আচ্ছন্ন হয়। তার গানের মাঝে লুকিয়ে থাকে এক নারীর অস্তিত্ব, যে বারবার ধাক্কা খেয়েও জেগে থাকে। গান শেষ করে চামেলি খানিকক্ষণ থেমে দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশ্বাস নিয়ে মৃদু হাসে। কিছু মানুষ তাকে প্রশংসা করে, কেউ কেউ মৃদু করুণার চোখে তাকায়। পাড়ার এক বৃদ্ধা এসে বলে, “বউ, তোর গান শুনে মনে হলো, তুই আসলেই সেই দুর্গা, যে কোনো বাধা ভেঙে নতুন পথ খুঁজে নেয়।” চামেলি কান্নায় ভিজে যায়, ভাবতে পারে না এই শব্দগুলো তার জীবনে কখনো আসবে। আজ রাতে সে বুঝতে পারে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি যতই কঠোর হোক, তার নিজের শক্তি তার পথ তৈরি করে। পুজোর মণ্ডপে দাঁড়িয়ে সে নিজের অস্তিত্বের জয় উদযাপন করে।

আরতির শেষে মানুষ ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে যায়, কিন্তু চামেলির মনে একটা নতুন আশার আলো জ্বলে উঠেছে। সে জানে, তার পথ সহজ হবে না, কিন্তু সে আর ভয়ে সঙ্কুচিত হবে না। এই রাত তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়, যেখানে সে নিজের মতো করে বাঁচবে — পাড়ার গুঞ্জনের উপেক্ষা করে, নিজের আত্মাকে শক্ত করে গড়ে তুলবে। সে ভাবছে, “আমার লাল টিপ আর আমার গানই আমার শক্তি, আমার পুজো।” রাতের আকাশের তারা তাকে দেখে, যেন কেউ বলছে, “চামেলি, তুই এক অসাধারণ দেবী।”

দশমীর ভোর হতেই ভবানী মৈত্র আলমারি থেকে সিঁদুরের কৌটো বের করল। বাটি আর তুলো নিয়ে সে আস্তে আস্তে নিজের মাথায় লাল সিঁদুর লাগাতে লাগল। তার হাত খানিকটা কাঁপছিল, কিন্তু চোখে এক গভীর স্থিরতা। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, সবাই প্রস্তুত একদিনের আনন্দময় যাত্রার জন্য। কিন্তু ভবানীর মনে আজ যেন এক অতীতের ছবি ভেসে উঠছে — তার স্বামীর চলে যাওয়ার দিন, সন্তানের কোল ছাড়া ঘর, ছায়ামূর্তি সংসার। অথচ সে আজও পাড়ার সবাইকে বুকে নিয়ে নেয়, তাদের চোখে ভালোবাসার দীপ্তি জ্বালায়। তার হাতে সিঁদুর, মনের মধ্যে হাজারো স্মৃতি — জীবনের দুঃখ, হারানো আশা আর অবশেষে পাওয়া শান্তি।

ভবানী যখন গলিয়ে দিল সিঁদুর, তখন সে মনে করল, জীবনের যন্ত্রণাগুলো যেন এক এক করে তার শরীর থেকে সরে যাচ্ছে। বছর গুলো কতো কঠিন ছিল — বৃষ্টির মতো ঝরেছে কাঁদন, শীতের মতো তুষারপাত হয়েছে শূন্যতায়। কিন্তু দশমীর সকাল তার মনে করালো, নতুন সূচনা আছে। পাড়ার মেয়েরা এসে তার হাত ধরে, “ভবানী দিদি, আজ তোমাকে ছাড়া আমাদের দশমী অসম্পূর্ণ।” সে হাসল, চোখের কোণ থেকে অল্প জল মুছে নিয়ে বলল, “তুমি আমার জন্য আলোর প্রদীপ।” পাড়ার এই মায়া, এই গ্রহণযোগ্যতা তার হৃদয়ে নতুন শক্তির সঞ্চার করল।

দিন শেষে যখন প্যান্ডেলের বিসর্জনের সময় আসে, ভবানী সিঁদুর আর ফুল দিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কপালে তিলক করে দেয়। তার গলা কাঁপছে, কিন্তু চোখে রয়েছে এক অপার্থিব দীপ্তি। সে জানে, এই পুজো শুধু দেবীর নয়, এই পাড়ার নারীরাও দুর্গা — যাদের জীবন যুদ্ধ আর ভালোবাসার এক জোড়া গল্প। ভবানী নিজের ভেতর থেকে এক নতুন বীরাঙ্গনা খুঁজে পায়, যে ত্যাগের মূর্ত প্রতীক। পুজোর শেষ রাঙা দুপুরে, সে একাকী বসে থাকে, কিন্তু একাকীত্ব তার জন্য নয় — এক আলোর সঙ্গী।

বিসর্জনের আগের সন্ধ্যায় পাড়ার অলিগলিতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে নীরবতা। ভবানী মৈত্র বসলেন বাড়ির বারান্দায়, হাত মোড়ানো শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিলেন। আজকের দিনগুলো তার জীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রা — কঠোর পরিশ্রম, একাকীত্ব, বেদনা আর ভালোবাসার মিশ্রণে গড়া। এই পুজো তাকে শুধু দেবী আর দেবতার কাছে নোঙর দেয়নি, বরং নিজেকেই খুঁজে পেয়েছে — এক নারী, এক যোদ্ধা, এক মা। চারপাশে তার পাড়ার মানুষরা প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে, ভক্তিভরে মন্ত্রপাঠ করছে। ভবানী জানেন, কাল থেকে আবার সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতায় নামতে হবে তাকে, কিন্তু আজ এই সন্ধ্যা যেন একশ্রেণীর শান্তির বার্তা।

তার চোখে একদিনের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল — মেয়ের বিয়ে, স্বামীর চলে যাওয়া, ছেলের প্রতি অভিমান, আর পাড়ার মানুষের মায়া। পুজোর মধ্যে সে শিখেছে কিভাবে সব কিছু ছাপিয়ে নিজেকে ভালোবাসতে হয়। এই সন্ধ্যায় সে একটা ছোট্ট ডায়েরি খুলল, যেখানে লেখার পাতায় ভরা আছে তার জীবনের নানা গল্প। সে লিখছে নিজের কষ্ট, স্বপ্ন আর আশার কথা — কখনো মুখ খুলে, কখনো গোপনে। “আমি শুধু একটা নারী, যিনি নিজের অস্তিত্বের লড়াই করে চলেছি,” লেখা পড়ল তার হাতে। আজ বিসর্জনের আগের এই সময়টাই তার নিজের, যেখানে সে নিজের সঙ্গে কথা বলে, নিজেকে ক্ষমা করে, আবার সামনে এগোবার শক্তি খুঁজে পায়।

বিসর্জনের মুহূর্তে যখন ফুল, পানি আর পুষ্প দিয়ে প্রতিমাকে বিদায় জানানো হয়, ভবানীর চোখ থেকে অঝোর ধারায় জল পড়ে। সে জানে, এদিনের শেষ নয় — নতুন শুরু। প্রতিমার মতোই তার জীবনও স্রোত থেকে মুক্তির দিকে যাচ্ছে। পাড়ার সবাই তাকে দেখে, কিছু মুগ্ধ হয়, কিছু সমবেদনা জানায়। কেউ কেউ বলে, “ভবানী, তুই আমাদের পাড়ার প্রকৃত দুর্গা।” সে হাসে, মুখে শান্তির ছাপ। একাকী বসে থাকা এই বৃদ্ধা জানে, এই পুজোর আলো তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, আবার নতুন করে লড়াই করার শক্তি দিয়েছে। বিসর্জনের এই সন্ধ্যা তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় — যেখানে বেদনার সঙ্গেই জেগে ওঠে আশার আলো।

বিসর্জনের সকালে পাড়ার ছোট চত্তরে পাঁচ জন নারী একসঙ্গে জমে বসেছে — মেঘলা, রূপা, চামেলি, ভবানী, আর পাড়ার বাউল গান গাওয়া রেবেকা। গত কয়েকদিনের পুজোর অবসান নিয়ে তারা আলাপ করছে, একে অপরের চোখে চোখ রেখে, জীবনের নানা গল্প ভাগাভাগি করছে। মেঘলা তার ডায়েরি নিয়ে এসেছে, যেখানে সে তার পুজোর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছে। রূপা বলতে থাকে তার প্রতিবাদের গল্প, আর চামেলি গল্প করে তার গান আর লাল টিপের জয়ের কথা। ভবানী তাদের কাছে জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা শোনায়, আর রেবেকার গলা থেকে উঠে আসে বাউলের মধুর সুরের প্রতিধ্বনি — যেন আজকের দিনের কথা গেয়ে বলা। এই পাঁচ নারী যেন এক মন্দিরের নানা স্তম্ভ — আলাদা আলাদা কিন্তু একসাথে এক শক্তির প্রতীক।

মেঘলা ডায়েরি খুলে তাদের মাঝে পড়তে শুরু করে। তার লেখায় জীবনের টানাপোড়েন, নিজের হোঁচট খাওয়া, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াই স্পষ্ট। রূপা মৃদু হাসে, বলে, “তোর লেখা পড়ে মনে হলো, আমরা সবাই পুজোর মধ্য দিয়ে নিজের জন্য এক নতুন পথ খুঁজে নিয়েছি।” চামেলি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, “সত্যি। এই পুজো আমার জন্য শুধুই সাজগোজ বা সামাজিক চোখে পড়ার অনুষ্ঠান নয় — এটা আমার জীবনের লড়াই।” ভবানী একটু গম্ভীর হয়ে বলে, “আমাদের মতো নারীরা যাঁরা একসময় সমাজের কিনারে পড়ে যেতাম, আজ আমরা যেন এক নতুন দুর্গা হয়ে উঠেছি — যাদের গল্প কেউ লিখবে না, কিন্তু তাঁদের বীরত্ব অম্লান।” রেবেকার গলায় আবার একটা বাউল গান শুরু হয় — “জীবনের ঢেউ, কষ্টের ছোঁয়া, তবু ঝরে না আশা…”

তারা একে অপরের গল্প শুনে বুঝতে পারে, দুর্গা শুধু মণ্ডপে বসা দেবী নয়, তাদের ভেতরে, তাদের জীবনে, তাদের সংগ্রামে। এই পাঁচ নারীর একতা পাড়ার অনেক মানুষকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে — নারীর মর্যাদা, স্বাধীনতা আর সাহসের বিষয়ে। তারা বুঝতে পারে, প্রতিটি নারী তার নিজস্ব দুর্গা, যিনি প্রতিদিনের ছোট ছোট যুদ্ধে জয়ী। একসঙ্গে বসে, তারা ঠিক করে — এই পুজোর পর থেকে তারা শুধু নিজেকে নয়, পাড়ার অন্য নারীদের জন্যও লড়াই করবে, তাদের শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। এই পুজো তাদের জন্য এক নতুন সূচনা — যেখানে নারীসত্তার জয়গান গাওয়া হবে না কেবল মন্দিরে, বরং সমাজের প্রতিটি কোণে।

১০

পুজোর শেষ পাঁচ দিন পাড়ায় যেমন গত, তেমনই মানুষের মনে, নারীদের হৃদয়ে সে ঢেউ বয়ে গেছে দীর্ঘস্থায়ী। মেঘলা নিজের ডায়েরি হাতবদল করে বুঝতে পারে, জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে — যেখানে নিজের কাছে সরল, নিজের চাহিদাকে সম্মান জানানো। সে শ্বাস ফেলে, নিজের ভিতরের ভয় আর দ্বিধাকে জয়ে পরিণত করার সঙ্গী হয়ে ওঠে। রূপা কলেজে ফিরে গিয়ে নতুন আড্ডায় তার প্রতিবাদের গল্প শোনায়, যেটা বন্ধুরা স্বাগত জানায়, কেউ কেউ চিন্তাভাবনায় ডুবে যায়। সে বুঝতে পারে, এই ছোট্ট বিপ্লবই তার জীবনের বড় জয়। চামেলি পাড়ায় নতুন গানে নতুন পথ খুলেছে, তার লাল টিপ আর গানের সুরের মধ্য দিয়ে জীবনের প্রতি তার দৃঢ়তা ফুটে ওঠে। ভবানী মৈত্র পাড়ার নারীদের কাছে এক মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যিনি জীবনের সংগ্রামে লড়াই করেও হার মানেননি।

এই পাঁচ নারী তাদের জীবনের নানা বাধা অতিক্রম করে নিজের আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার পথে হাঁটছে। পাড়ার মানুষ তাদের অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছে — শুধু আরেক নারীর মতো নয়, বরং এক সংগ্রামী, এক বীরাঙ্গনা। পুজোর আনন্দ, ভক্তি আর আবেগ যেন তাঁদের আত্মার এক নতুন অবয়ব হয়ে ওঠে। পাঁচ দিনের এই মিলনসার পাড়ার অন্যান্য নারীদের মধ্যেও নতুন আগুন জ্বালিয়ে দেয় — যারা নিজেদের জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করে, যাঁরা নিজেদের স্বপ্নগুলোকে ভালোবাসতে শিখে। পুজোর মণ্ডপে দুর্গা যেমন অসুর বধ করেন, তেমনি এই নারীরাও সমাজের নানা অসুরের বিরুদ্ধে নিজের অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে — সাহস, প্রতিবাদ, ভালোবাসা।

অবশেষে, পাড়ার পাঁচ নারী একত্রে বসে ভাবছে — আগামী বছর আবার দেখা হবে, আর আরও বেশি নতুন গল্পের জন্ম হবে। তারা জানে, জীবনের পথে নানা ঝড় আসবে, কিন্তু একসাথে তারা সে ঝড়কেও জয় করবে। এই পুজোর পাঁচ দিন ছিল শুধু উৎসব নয়, এটি এক নতুন জীবনের সূচনা, যেখানে নারীসত্তার জাগরণ আর শক্তি এক সাথে ফুটে উঠেছে। পাড়ার বাতাসে ঘুরে বেড়ায় সেই গান — “মা দুর্গা আমাদের মধ্যেই, আমাদের ভেতরেই।” এই গান শুধু আজকের নয়, আগামীরও। আর এভাবেই পুজোর পাঁচ দিন হয়ে উঠল পাঁচটি নারীর জীবনের আলোকবর্তিকা, যাদের পথ চলা সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণা।

1000041001.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *