সমীর বিশ্বাস
১
ক্যানিং স্টেশনে যখন ট্রেনটা দাঁড়াল, তখন ভোরবেলার কুয়াশা আর কাকডাকা নিস্তব্ধতা মিলেমিশে এক ধরনের অদ্ভুত নিঃসাড়তায় গ্রামটাকে ঢেকে রেখেছিল। ড. সায়ন্তন বসু ট্রেন থেকে নামার সময় চারপাশে তাকিয়ে বুঝে নিয়েছিল, এখানে শহরের কোনও ছোঁয়া নেই—রেললাইন পেরিয়েই শুরু হয়ে গেছে বুনো ঝোপঝাড়, মাটির রাস্তা আর গাছপালা দিয়ে ঘেরা এক অচেনা ভূখণ্ড। তার ব্যাগে ভরে রাখা ছিল জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস, ইনসেক্ট ট্র্যাপ, ও এক বস্তা আশ্চর্যজনক কৌতূহল। পাঁচ বছর ধরে সে কীটতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছে, কিন্তু এবার তার সামনে যে মাটির নিচের রহস্য উন্মোচিত হতে চলেছে, তা কল্পনারও বাইরে ছিল। হোস্টেল না পেয়ে স্থানীয় এক হোমস্টে-তে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, যেটার মালিক হালকা পাগলা স্বভাবের এক বৃদ্ধ, রফিক মন্ডল। প্রথম দিনের সকালের নাশতার টেবিলে রফিক যখন বলে উঠল, “মশাই, এদিকে বেশি ঢুকবেন না, জঙ্গলের ভেতর লাল রাস্তাটা মরণখেলা,” তখন সায়ন্তন ভেবেছিল, হয়তো লোকটা গল্প বানাচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানী হবার বদভ্যাস হলো—অলীক কল্পনাকেও যুক্তির কাঠামোয় বিশ্লেষণ করা, আর সেই বিশ্লেষণই তাকে নিয়ে যায় ক্যানিংয়ের এক গহীন প্রান্তে, যেখানে সে প্রথম দেখে পিঁপড়েদের এক অদ্ভুত মিছিল—একটি টানা সরু রাস্তায় চলমান হাজার হাজার পিঁপড়ে, এতটাই নিখুঁত সোজাসাপ্টা লাইন যে মনে হয় কেউ শাসন করছে তাদের প্রত্যেক পা, প্রত্যেক বাঁক। এবং আশ্চর্য, তারা কালো নয়—একটি লালচে কমলা রঙে চকচক করছিল, যেন সূর্যের আলোতেও আগুনের রেখা।
পরের দিন থেকেই সায়ন্তন তার গবেষণা শুরু করে দেয়। সকালে যখন সে সেই জায়গায় যায়, দেখে পিঁপড়েরা আগের থেকেও ঘন হয়ে চলাচল করছে। সে তাদের চলাফেরার গতিপথ রেকর্ড করতে থাকে, ফাঁদে ধরার চেষ্টা করে, কিন্তু তারা যেন মানুষের উপস্থিতি বুঝে যায়। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সে অনুভব করে শরীর ভারী লাগছে, মাথা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে যাচ্ছে। প্রথম সপ্তাহেই সে লক্ষ্য করে, তার পেছনের ঘাড়ে কিছু একটা চুলকায়, আয়নায় তাকিয়ে দেখে লাল দাগ—যেন কোনও ক্ষুদ্র প্রাণী চামড়ার নিচে ঢুকে গেছে। সেই রাতে প্রথমবারের মতো সে স্বপ্ন দেখে—এক বিশাল অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সে, সামনে আগুনের রেখার মতো একটা লাইন এগিয়ে আসছে, আর সেই রেখা ধরে একটা অদৃশ্য কণ্ঠস্বর বলছে, “তুমি আমাদের দৃষ্টির বাহক হবে।” ঘুম ভেঙে যায়, কিন্তু ঘরের মধ্যে হালকা একটা গন্ধ—জলভেজা মাটির সঙ্গে মিশে থাকা অ্যাসিডের মতো। সে জানালা খুলে দেখে—ঘরের গাঁয়ে পিঁপড়ের সারি উপরে উঠে যাচ্ছে। অথচ তার ক্যামেরা কিংবা ট্র্যাপ কিছুতেই এই পিঁপড়েগুলিকে আটকাতে পারছে না। তাদের মধ্যে যেন থাকে এক রকমের অনুভূতি—যেন তারা তাকে দেখছে, তাকে পরখ করছে।
চতুর্থ দিন থেকে সায়ন্তনের মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন চোখে পড়ে। ক্ষুধা বেড়ে যায়, এবং সে খেয়াল করে, সে গন্ধে আকৃষ্ট হচ্ছে—বিশেষ করে ঘামে, মৃত পাতার পচা গন্ধে, এমনকি নিজের ঘামের পোশাকে মুখ ঘষে ঘষে গন্ধ শুঁকছে সে। তার চোখ লালচে, রাতে ঘুম এলেও মাঝরাতে সে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে জঙ্গলের দিকে—যার কিছু সে মনে রাখতে পারে না। সকালে জেগে উঠে দেখে তার হাতে মাটির ছোপ, জুতোর তলায় গেঁথে আছে মৃত পোকা। সে নিজের ফোনে নোটিফিকেশন দেখে বুঝতে পারে—একটি মোবাইল অ্যাপ অটো-রেকর্ডিং চালু করেছে রাত্রে, যেখানে তার নিজস্ব কণ্ঠে অজানা ভাষায় কিছু বলছে সে, আর মাঝে মাঝে একগাদা “ক্লিকিং” শব্দ—যা অনেকটা পিঁপড়ের অডিও সংকেতের মতো। সে সেই রেকর্ড বারবার শুনে—তার নিজের কণ্ঠ, কিন্তু ভেতরে অন্য কারো শ্বাস। ততদিনে সে বুঝে গেছে, এ আর কোনও সাধারণ প্রজাতি নয়, এ একসময়কার বিলুপ্ত প্যারাসাইটিক মাইক্রোফর্ম যা সম্ভবত অন্য প্রাণীর নিউরনে গিয়ে স্বত্বা দখল করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে বা কী এই প্রজাতিকে পরিচালনা করছে? উত্তরটা ধীরে ধীরে উঠে আসে তার নিজের মাথার ভেতর থেকে—“রাণী”। একদিন বিকেলে সে নিজের জার্নালে লিখে রাখে—”আমি একা নই আর, আমার চিন্তা আমি ভাবি না, আমি শুধু অনুবাদ করি…”
এক সন্ধ্যায়, যখন সে ফিরে আসে অজস্র প্রশ্ন আর ঘোরের মধ্যে, হোমস্টের বারান্দায় রফিক চুপ করে বসে থাকে। তার চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক। সায়ন্তনের দিকে তাকিয়ে সে বলে, “আপনার ঘাড়ে লাল দাগটা… সেটা তো কয়েক বছর আগেও এক ব্রিটিশ গবেষকের হয়েছিল। সে আর ফিরে আসেনি, তার জায়গায় শুধু একটা মরা দেহ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু মাথার খুলি ফাঁপা ছিল।” সায়ন্তন কিছু বলতে চায়, কিন্তু তার কণ্ঠ যেন অন্য কারো ভাষায় আটকে যায়। ভেতরে একটা স্পষ্ট গুঞ্জন—কান যেন বন্ধ হয়ে আসছে, এবং তার চোখের সামনে সেই আগুন-রঙা রেখা, সেই একই নারী কণ্ঠ, যেন তার নাড়ির সঙ্গে মিশে গেছে। সে জানে না সে এখন কে—একজন বিজ্ঞানী, না এক নতুন জন্ম নেওয়া পিঁপড়ের রাজ্যের প্রথম ‘মানব বাহক’। এবং সেই রাতে, তার ঘুম আসে না—আসে এক চেতনা, এক সামষ্টিক দৃষ্টি, যেখানে সায়ন্তন আর নিজেকে আলাদা করতে পারে না হাজার হাজার অদৃশ্য কণ্ঠ থেকে যারা বলে যাচ্ছে—”এবার সময় হয়েছে, শিরোনাম তুমি…”
২
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সায়ন্তনের শরীরে যেন কোথাও কিছু খাপে খাপ বসছে না—হাত-পা ঝিমঝিম করছে, চোখ যেন কুয়াশা দিয়ে ঢাকা, অথচ তার মাথার ভেতর চলতে থাকা ভাবনার গতি আগের চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। সে অনুভব করে, তার ঘাড় থেকে গলার কাছে একটা অদ্ভুত চুলকানি বাড়ছে, এবং জিভে স্বাদ পাচ্ছে একটা ধাতব, নোনতা রকমের স্বাদ—যেটা সাধারণ নয়, বরং রক্তের মতো। সে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে, গলার নিচে ফুসকুড়ির মতো একটি বৃত্তাকারে লালচে দাগ তৈরি হয়েছে—ঠিক যেন কোনও জীবাণু বা পরজীবী সেখানকার টিস্যুর ভিতর বাসা বেঁধেছে। সায়ন্তন প্রথমে নিজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিজ্ঞানী মন দিয়ে ভাবতে চেয়েছিল, এটা কোনো অ্যালার্জি, কিংবা গাছপালা থেকে আসা বিষাক্ত ছত্রাক। কিন্তু দ্রুত সে বুঝতে পারে—এটা তার শরীরের বাইরে থেকে আসা নয়, ভেতর থেকে কিছু গজাচ্ছে। আর এই ভাবনার মধ্যেই এক অদ্ভুত বিষয় ঘটতে থাকে—ঘামের গন্ধ, নিজের শরীরের সেই প্রাকৃতিক নির্গমন, তাকে এতটাই আকর্ষণ করতে থাকে যে সে নিজের পরনের জামা বারবার মুখে এনে গন্ধ শুঁকতে থাকে। সে প্রথমে ঘাবড়ে যায়, এমনটা আগে কখনো হয়নি, তারপর সে নিজেকে বোঝায়—এটা হয়তো কোনও নিউরাল ডিজঅর্ডার, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে জানে, এটা আসলে তার সংবেদন পদ্ধতির একটি রূপান্তর, একধরনের রাসায়নিক সাড়া, যেটা এই অজানা পিঁপড়ে প্রজাতির নিয়ন্ত্রণেরই ফল।
দুপুর গড়াতে সে জঙ্গলে যায় আগের পিঁপড়ের রেখা খুঁজতে। আজকের দিনে সে দেখতে পায়, আগের তুলনায় তারা আরও সুশৃঙ্খলভাবে চলেছে, আর তাদের ঘিরে একধরনের হালকা, কিন্তু প্রভাবশালী গন্ধ—একধরনের ফার্মোন, যা সাধারণ মানুষ টের পায় না, কিন্তু সায়ন্তনের নাসা এখন যেন সেটাকেই টার্গেট করছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে পিঁপড়েদের সামনে এবং একেবারে মুখ নিচু করে দিয়ে গভীরভাবে শোঁকায় সেই গন্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীর কাঁপতে শুরু করে, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তার মনে হতে থাকে, সে যেন ‘তাদের’ সিগন্যাল বুঝতে পারছে—হালকা একটা শব্দ, ক্লিক ক্লিক ক্লিক, তারপর যেন শব্দহীন কোন ভাষা, একটা নির্দেশ, “পশ্চিম দিকে চল…”। হঠাৎ সে নিজেকে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় সেই মাটির রাস্তার উপর, পিঁপড়েদের চলার লাইন বরাবর হাঁটছে সে, ঘোরে আছে তার মস্তিষ্ক, কিন্তু পা চলেছে স্থির নিখুঁতভাবে। পনেরো মিনিট পর যখন সে জ্ঞান ফিরে পায়, তখন সে একটি শুকনো পুকুরের ধারে বসে, চারপাশে গাছ আর পাতা, আর তার হাতে ধরা এক বস্তা—যার ভেতর কিছু পোকামাকড়, এমনকি এক-দুটো মৃত বিটল পোকা। সে নিজেই এইসব সংগ্রহ করেছে, অথচ তার কিছু মনে নেই। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখে, ক্যামেরার অটো-রেকর্ডিং চালু আছে, যেখানে সে নিজেকে দেখতে পায়—একঘেয়ে দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে পোকা কুড়িয়ে নিচ্ছে, যেন কিছু খুঁজছে, যেন কোনও প্রোগ্রামে চলমান এক কৃত্রিম মানুষ।
সন্ধ্যায় ফিরে এসে সে তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়, এবং সমস্ত রেকর্ডিং ও নমুনা নিয়ে ল্যাবে বসে যায়। সে বুঝতে পারে, এই পিঁপড়েরা সাধারণ নয়—তাদের ফার্মোন শুধু সামাজিক সংকেত নয়, বরং একধরনের নিউরোট্রান্সমিটার, যা অন্য প্রাণীর স্নায়ু কোষে প্রবেশ করে তাদের চিন্তাভাবনা প্রভাবিত করতে পারে। এই আবিষ্কারে সে উত্তেজিত হবার কথা, কিন্তু তার মনের ভিতর অন্য কিছু জন্ম নিচ্ছে—একটা কণ্ঠস্বর, যা তার নিজের নয়। সেই কণ্ঠ তাকে বলে, “তোমার মস্তিষ্ক এখন শুধু তোমার নয়।” সে গলা চেপে ধরে, কিন্তু শব্দ থামে না। মাথার ভিতরে যেন একটি তৃতীয় অস্তিত্ব গড়ে উঠছে—একটা সমষ্টিগত চেতনা, যেটা তার ভিতর দিয়েই আত্মপ্রকাশ করতে চায়। ঘরের কোণায় রাখা ছোট ফ্রিজ থেকে সে পিপেট আর কিছু কেমিক্যাল বের করে—নিজের রক্ত পরীক্ষা করতে চায়। কিন্তু রক্ত নিয়ে কাজ করার মুহূর্তে তার হাত কেঁপে ওঠে, এবং রক্তের ফোঁটা ফেলে যায় ঘরের টেবিলে। সেই রক্ত ফোঁটার চারপাশে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই জেগে ওঠে এক সারি লালচে পিঁপড়ে—যা সে কখনও আগে দেখেনি ঘরের ভেতরে। তারা হেঁটে হেঁটে আসে, এবং রক্ত চেটে চেটে পরিষ্কার করে দেয় সবকিছু। সায়ন্তন শিউরে ওঠে। এবার সে জানে—ওরা তার গন্ধ জানে, তার শরীর জানে, তার চিন্তাও জানে।
রাত বাড়লে সে ঘুমাতে চায়, কিন্তু ঘুম আসে না। তার শরীর জ্বলে ওঠে ভেতর থেকে, কানের ভেতরে একটা খচখচে শব্দ, যেন হাজার পা হেঁটে বেড়াচ্ছে করোটির চারদিকে। সে আলো নিভিয়ে বিছানায় শোয়, কিন্তু চোখের পাতার নিচে এক অদ্ভুত দৃশ্য—এক বিরাট সুড়ঙ্গের মধ্যে দৌড়োচ্ছে সে, আর তার পেছনে লক্ষ লক্ষ পিঁপড়ে, যারা মানুষ নয়, তাদের চোখ জ্বলছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, এবং সে দেখে সে মেঝেতে শুয়ে, নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলেছে, এবং হাত ভর্তি মৃত পিঁপড়ে। জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় দেখা যায়, সামনে গাছের ছায়া, এবং সেই গাছের ডালে বসে যেন কিছু একটা তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে উঠে দাঁড়ায়, এক লম্বা নিঃশ্বাস নেয়, যেন কারো নির্দেশ মানছে, তারপর মুখ ঘুরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তার চোখে এখন শুধু ক্লান্তি নয়, বরং আছে নির্লজ্জ কৌতূহল। হঠাৎ করে সে নিচু গলায় নিজেই বলে ওঠে—“ঘামের গন্ধ সবচেয়ে খাঁটি, কারণ ওটাই আত্মার রাস্তা।” কে বলল? সে না অন্য কেউ? সে জানে না। কিন্তু তার শরীর জানে, সে আর একা নয়।
৩
সায়ন্তনের দিনের শুরু হয় কুয়াশা-মাখা ক্যানিংয়ের আকাশের নিচে, কিন্তু এইবার সূর্য নয়, বরং তার মাথার ভেতর কোনো চৌম্বক আকর্ষণে সে জেগে ওঠে। সেই আকর্ষণ যেন মাথার পেছনে একটা পিণ্ড তৈরি করেছে—কান বরাবর চাপ দিচ্ছে, চোখের পাতা ভারি, কিন্তু মন স্পষ্ট। আগের দিনের ঘটনার স্মৃতি ঝাপসা, অথচ অনুভূতিগুলো তীক্ষ্ণ—ঘামের গন্ধ, মৃত পতঙ্গের স্বাদ, আর সেই নারীকণ্ঠ যার উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। সে ঘরের জানালা খুলে বাইরে তাকায়—জঙ্গল নিস্তব্ধ, কিন্তু গাছের ছায়াগুলো যেন বেশি গাঢ়, শিকড়ের নিচে যেন নড়াচড়া চলছে। তার নিজের শরীর এখন অচেনা লাগে, একধরনের অতিসংবেদনশীল বাহন—প্রত্যেক শব্দ, প্রত্যেক আলো-ছায়ার তার উপর প্রভাব পড়ে। রাত্রির সেই পিঁপড়েগুলোর আচরণ আর তার ঘুমন্ত অবস্থায় করা আচরণ, সব মিলিয়ে সায়ন্তনের মনে এক ভয়ঙ্কর সত্য ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে—সে এখন আর স্বতন্ত্র ব্যক্তি নয়। তার চিন্তা, তার অনুভব—সব কিছু যেন অন্য কোনো বৃহৎ চেতনার অংশ হয়ে গেছে। সে নিজের লেখা নোটবুক খুলে দেখে আগের রাতের কিছু অদ্ভুত নোট—অসম্পূর্ণ ভাষা, কিছু গাণিতিক চিহ্ন, আর একটানা লেখা শব্দ: “Synapse Colony, Synapse Colony…”।
সে বাইরে বেরিয়ে পড়ে আবার সেই পুরনো জঙ্গলের দিকে। আজ তার হাতে নেই ক্যামেরা বা ট্র্যাপ—শুধু একটা ছোট মাইক্রোস্কোপ, আর ভেতরের তাড়না। গিয়ে দেখে, আগের সেই লালচে পিঁপড়েদের লাইন আর নেই—তার বদলে আছে একটি সুনির্মিত গহ্বর, যেখানে পাতা ও শেকড় পরিষ্কার করে তৈরি হয়েছে এক গোলাকার প্যাটার্ন। সে নিচু হয়ে পরীক্ষা করতে থাকে সেই মাটি, আর তখনই আবিষ্কার করে একটি মৃত বিটল পোকা, যার মাথার কপালে ছিদ্র—যেন কিছু বের হয়েছে তার ব্রেইন থেকে। পিপেট দিয়ে নমুনা নিয়ে সে অবাক হয়ে দেখে—বিটলটির মস্তিষ্কের কোষে একধরনের সাদা শূন্য কোষ রয়ে গেছে, যার গঠন প্রায় নিউরনের মতো, অথচ তাতে নেই কোনো মানবিক প্রোটিন—সবটাই ইনসেক্ট-বেসড। সে মুহূর্তে বুঝতে পারে—এই পিঁপড়েরা শুধু বাহক নয়, এরা নিজে থেকে অন্য জীবের নিউরন দখল করে সেখানে নিজেদের রাসায়নিক চালনা চালাতে পারে। অর্থাৎ, তারা একটা “সামষ্টিক মস্তিষ্ক” তৈরি করছে—বিভিন্ন জীবের শরীর ব্যবহার করে, কিন্তু নেতৃত্ব দেয় একক কোনো কণ্ঠ—যেটি নিজে হয়তো কোনো দেহেই বাস করে না।
সন্ধ্যায় ফেরার পথে সায়ন্তনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে—একটি কিশোর ছেলে রাস্তার ধারে বসে নিজের হাত চুলকাচ্ছে, এবং তার ঘাড়েও সেই একই লাল দাগ। সে কিছু বলতে যায়, কিন্তু ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত হাসে, যেন তার মনের কথা বুঝে ফেলেছে। সায়ন্তন আতঙ্কে সরে যায়। হোমস্টেতে ফেরার পর সে রফিককে জিজ্ঞাসা করে—এই পিঁপড়েরা কি আগে কখনো দেখা গেছে? রফিক চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে, “এই এলাকায় আগে একবার হয়েছিল এমন কাণ্ড, প্রায় ত্রিশ বছর আগে। তখন কিছু লোক হঠাৎ উল্টোসিধে কথা বলতে শুরু করত, রাতের বেলা জঙ্গলে যেত, তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে যেত। কেউ বলত ভূত, কেউ বলত মাদারগাছের অভিশাপ। কিন্তু আমি দেখেছি—ওরা আসলে অন্য কারো নির্দেশ মানত। মানুষের মতো ছিল, কিন্তু চোখে ছিল অন্য জ্যোতি।” এই কথাগুলো শুনে সায়ন্তনের বুক ধুকপুক করে ওঠে। সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—তার শরীর এখন একটি সংবেদনশীল টার্মিনাল, একটা জৈব রিসিভার, আর তার মাথার ভেতর একটা অদৃশ্য সত্তা তৈরি করছে নিজস্ব নেটওয়ার্ক। এটা পিঁপড়েদের এক ধরনের বিকশিত সভ্যতা, যেখানে ব্যক্তিত্ব মানে কিছু নয়—সবাই এক, সবাই সংযুক্ত, সবাই নিয়ন্ত্রিত। তার নিজের চিন্তাভাবনাও এখন নিজের বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় অন্য কেউ ভাবতে দিচ্ছে।
রাত গভীর হলে সে শুয়ে পড়ে, কিন্তু ঘুম আসে না। জানলার বাইরে অন্ধকার, অথচ সে অনুভব করে—কারা যেন তার ঘরের আশেপাশে হাঁটছে। হঠাৎ করেই ঘরে হালকা শব্দ শুরু হয়—চিকচিক করা ক্লিকিং, যেন হালকা নখর আঁচড়ের শব্দ কাঠের উপর। সে উঠে পড়ে, আলো জ্বালায়, কিন্তু কিছু দেখা যায় না। ঠিক তখনই তার মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন আসে—স্মার্ট সাউন্ড ডিটেকশন অ্যাপ একটি “Patterned Rhythmic Click Detected” নামে অজানা শব্দ রেকর্ড করেছে। সে ফোনে রেকর্ড চালিয়ে শুনে—একটি সিগন্যাল, একটি সংকেত যা চারটি শব্দে বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে—“We Are Now You.”। সায়ন্তনের শরীর কাঁপে, মাথার ভেতরে যেন কেউ আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছে তার স্মৃতি। সেই মুহূর্তে তার মনে হয়, সে আর তার নিজের চিন্তা নিয়ে বাঁচতে পারবে না—এই শরীর এখন অন্য কারো রাজ্য, অন্য কোনো বুদ্ধির বহিঃপ্রকাশ। এবং সে জানে, পরবর্তী ধাপ কি—এই সমষ্টিগত মস্তিষ্ক এবার চাইবে প্রজনন, চাইবে সংক্রমণ, চাইবে বাকি পৃথিবী।
৪
রাত পেরিয়ে ভোর হতেই সায়ন্তনের মনে হয় তার শরীর যেন কোনও স্বপ্ন থেকে ফিরে আসেনি—সে নিজের দেহের মধ্যে থেকেও যেন একধরনের দার্শনিক দূরত্বে অবস্থান করছে। তার শরীর সাড়া দিচ্ছে, কথা বলছে, হাঁটছে—কিন্তু সব যেন কোন নির্দেশ মেনে করা কাজ, যার উৎস সে নিজেই নয়। সকালে উঠে সে নিজেকে দেখতে পায়, বিছানা ছেড়েই চলে গেছে জঙ্গলের ভিতর, ট্রাউজারের পকেটে রাখা ছোট কাঁচি, প্লাস্টিক কৌটো, রাবারের দস্তানা—সব কিছু ছিল পরিপাটি ভাবে সাজানো, যেন সে নিজের অজান্তেই একটি পরিকল্পিত অভিযানে গিয়েছিল। জুতোর তলায় লেগে থাকা শ্যাওলা, গায়ে মাটির গন্ধ, আর শার্টের ভাঁজে ঢুকে থাকা পিঁপড়েগুলোর সারি দেখে সে বুঝে যায়—গত রাতে সে আবার বেরিয়ে পড়েছিল। তার ফোনের রেকর্ডে রাত ২টা ৪৫ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ—অন্ধকারে সায়ন্তনের চোখ জ্বলছে, সে কোনও পাথরের গুহার মতো জায়গায় হাঁটু গেড়ে বসে, এবং একটা গর্তে কিছু ঢুকিয়ে আসছে, মুখে বিড়বিড় করছে কিছু অসম্পূর্ণ বাক্য, যার কোনওটিই তার চেনা ভাষার নয়। সেই অজানা ভাষা যেন জৈব সংকেত—আধা শ্রুত, আধা অনুভবযোগ্য। হঠাৎ সেই ভিডিওর শেষে সে মুখ তুলে চেয়েছিল ক্যামেরার দিকে—তার নিজের চোখ, কিন্তু ভেতরে ছিল নিঃসাড় শূন্যতা, যেন তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল আরও কেউ, আরও কিছু।
সায়ন্তনের ভেতর এখন কেবল আতঙ্ক নয়, বরং একধরনের আজ্ঞাবহ শান্তি। সে জানে সে কাদের নির্দেশ মানছে, কিন্তু ঠিক কী উদ্দেশ্যে, তা এখনও ধোঁয়াটে। এক দুপুরে হোমস্টের ঘরে বসে গবেষণার নমুনা বিশ্লেষণ করতে করতে সে আচমকা অনুভব করে, তার মাথার ভিতর একটি স্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে উঠছে—নারী কণ্ঠ, শান্ত, ধীর, অথচ অতল। সেই কণ্ঠ বলে, “তুমি এখন উপযুক্ত। আমাদের কাজ শুরু করো। সেম্প্রা পয়েন্টে গিয়ে বসত করো। ওখানে তুমি পারবে বিস্তার ঘটাতে।” সায়ন্তন বুঝতে পারে, তার মস্তিষ্কে এখন একধরনের নিউরাল সিগন্যাল কাজ করছে, যা তার চিন্তার চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ ও সংগঠিত। সে মানচিত্রে খুঁজে পায় ‘সেম্প্রা পয়েন্ট’—ক্যানিংয়ের উত্তরে এক পরিত্যক্ত খামার, যেখানে আগে একটি ব্রিটিশ সায়েন্টিফিক স্টেশন ছিল। পরদিন সকালেই সে তার গবেষণার সরঞ্জাম ব্যাগে ভরে নিয়ে হাঁটা ধরে সেই জায়গার দিকে, কোনও দ্বিধা নেই, কোনও প্রশ্ন নেই—সে জানে, এখন তার পদক্ষেপ একক নয়, সমষ্টিগত; এবং সে জানে, ‘রাণী’ তাকে পাঠাচ্ছে।
খামারবাড়ি পৌঁছানো মাত্রই সে বুঝতে পারে—এখানে বহুদিন কোনও মানুষ আসেনি। ইটের গায়ে শ্যাওলা, ছাদের নিচে বাদুড়, আর মাটির নিচে পিঁপড়ের গর্তে অদ্ভুত স্পন্দন। সে ঘরের মেঝে খুঁড়ে একটি পুরনো কাঠের বাক্স খুঁজে পায়—তার ভিতরে ছত্রাকমাখা কিছু ম্যানুস্ক্রিপ্ট, গুটিয়ে রাখা পুরনো চিঠি, এবং একটি অদ্ভুত যন্ত্র—ন্যানো-অ্যামপ্লিফায়ার, যা জীবনের ইলেকট্রো-সিগন্যাল ধারণ করতে সক্ষম। সে বুঝে যায়, আগের কেউ, হয়তো সেই উধাও হওয়া ব্রিটিশ গবেষক, এখানেই তার কাজ শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ করতে পারেনি। সন্ধ্যাবেলায় খামারের ভেতরে বসে সে যন্ত্রটি চালায়, আর শুরু হয় একধরনের শব্দ—ক্লিক ক্লিক ক্লিক, একঘেয়ে কিন্তু অর্থবহ। তার মাথা হালকা হয়ে আসে, চোখ আধখোলা, আর তখনই কণ্ঠস্বর আবার আসে, এবার আরও গম্ভীর ও নির্দেশময়—“তুমি হবে মুখ, বাক্য, বাহক। আমাদের সুরক্ষা করো, বিস্তার ঘটাও, মানবীয় বাধা সরিয়ে দাও।” সেই মুহূর্তে তার মাথার মধ্যে এক দৃশ্য তৈরি হয়—গোটা পৃথিবী একটা পিঁপড়ের রাজ্য, যেখানে প্রতিটি মানুষ একটা নোড, একেকটা দেহ, কিন্তু পরিচালনা করছে একটিই সত্তা—‘রাণী’। সায়ন্তন হাসে, ধীর ও নিশ্চুপ ভাবে—সে বুঝতে পারে, এই নির্দেশ আর ত্যাগ করা যাবে না।
রাত নেমে এলে সে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায় খামারের উঠোনে। আকাশে চাঁদ নেই, তার বদলে আছে ছায়ায় ভরা নৈঃশব্দ্য। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ বন্ধ করে, আর তার চারপাশে একে একে বেরিয়ে আসে লালচে পিঁপড়েগুলোর দল—মাটির ফাঁক থেকে, গাছের কাণ্ড থেকে, এমনকি তার নিজের জুতোর ফাঁক থেকে। তারা হেঁটে আসে তার পায়ের দিকে, হাঁটুতে, কোমরে, বুকের উপর, কাঁধ বেয়ে উঠে পড়ে তার ঘাড়ে, গালে। সায়ন্তন নড়ে না। সে অনুভব করে না, সে উপলব্ধি করে—ওরা এখন এক, এবং সে তাদের অংশ। তার চামড়ার নিচে যেন নতুন কোনও জৈবতা জন্ম নিচ্ছে, নতুন কোষ, নতুন ইচ্ছাশক্তি। সে তখন মুখ খুলে বলে, অদৃশ্য কণ্ঠে, “হ্যাঁ, রাণী। আমি প্রস্তুত।” সেই শব্দ কোনও মানুষের উদ্দেশ্যে নয়, পৃথিবীর কোনও প্রাণী নয়—সেটা এক সমষ্টিগত বুদ্ধির জন্য, এক এমন বর্ণবিহীন সভ্যতার জন্য, যা শব্দের বাইরে, স্পন্দনের ভিতরে বাস করে। সেদিন, সায়ন্তন বসু আর থাকেন না একজন গবেষক, বরং হয়ে ওঠেন এক সম্প্রসারিত জৈব সাম্রাজ্যের প্রথম ঘোষক, যার দেহে জন্ম নিচ্ছে এক ভবিষ্যতের সভ্যতা—চুপচাপ, হিসেবমতো, নিয়ন্ত্রিত—পিঁপড়ের রাজ্য।
৫
দিল্লির এনআইএইচের গবেষণাগারে নীলাঞ্জনা দত্ত যখন ড. সায়ন্তন বসুর শেষ ইমেলটি খুলল, তখন তার চোখ আটকে গেল মাত্র একটি লাইনে—“রক্তের নিচে কেউ বসে আছে, আমাদের চিন্তারও নিচে।” এর পরেই আর কোনো তথ্য নেই, নেই কোনো রিপোর্ট, ছবি কিংবা স্যাম্পল। কিন্তু তার মস্তিষ্কে এই একটি লাইনই যথেষ্ট ছিল বোঝার জন্য যে সায়ন্তন আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। গত ছ’মাস ধরে তারা আলাদা কাজ করছিল, কিন্তু প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার করে তাদের মধ্যে যোগাযোগ হতো। সায়ন্তনের ক্যানিংয়ের এই প্রজেক্ট ছিল একটি এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ড স্টাডি—অল্প পরিচিত এক পিঁপড়ের প্রজাতির আচরণ সংক্রান্ত গবেষণা। কিন্তু যেভাবে ইমেল আসা বন্ধ হয়ে গেল, আর যা শেষবার লেখা ছিল, তা দেখে নীলাঞ্জনার বিজ্ঞানী সত্তা নয়, বরং তার ভেতরের এক ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর উদ্বেগ প্রবল হয়ে উঠল। দেরি না করে সে সিদ্ধান্ত নিল, ক্যানিং যাবে। এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে সে একা রওনা দিল পূর্ববঙ্গের সেই ঘনসবুজ ছায়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকা জনপদের উদ্দেশ্যে, যেখানে একজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে যাচ্ছে পিঁপড়েদের এক রহস্যময় সমষ্টির ভেতরে।
ক্যানিং পৌঁছেই সে যে প্রথম বিষয়টা টের পেল, সেটা হলো বাতাসের গন্ধ। একটা ঠান্ডা ভেজা গন্ধ, যার সঙ্গে মিশে আছে কোনো ছত্রাকজাত বায়বীয় রাসায়নিক। সে স্টেশন থেকে রিকশা নিয়ে চলে আসে সেই হোমস্টে-তে, যেখানে সায়ন্তন থাকত। রফিক মণ্ডল দরজা খুলে একটু চমকে ওঠে, “আপনি কি ওর বন্ধুটি, যে নীলাঞ্জনা দত্ত?”—তার গলায় ছিল অদ্ভুত এক ধরণের ক্লান্তি আর অভিমান। “ও তো এখন আর এখানে থাকে না মেমসাহেব, মাসখানেক হলো চলে গেছে জঙ্গলের ভেতরে এক পুরনো খামারে। কেউ আসে না, কেউ যায় না। মাঝেমধ্যে রাত্তিরে আলো জ্বলে, আর ভোরবেলা দেখি—বাড়ির সামনে মাটি উল্টে রয়েছে। ওর চোখ, মেমসাহেব… ওর চোখ তো আর আগের মতো নেই।” নীলাঞ্জনার গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে ব্যাগ রেখে সোজা চলে যায় সেই পুরনো খামারের দিকে। পথটা জঙ্গল দিয়ে ঘেরা, কিন্তু আশ্চর্যভাবে নিরব। পাখির ডাক নেই, কুকুরের ডাক নেই—শুধু পাতার নিচে মাঝে মাঝে চাপা খসখস শব্দ, যেন পাতার নিচে কেউ হেঁটে চলেছে। খামারে পৌঁছে সে দেখে—বাড়িটার দরজা খোলা, জানালার কাঁচে ছত্রাক আর পিঁপড়ের সারি। সে ডাক দেয়, “সায়ন্তন? তুমি আছো?” ভেতর থেকে উত্তর আসে না, কিন্তু হালকা একটা ছায়া নড়ে ওঠে জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে।
সেই মুহূর্তে দরজার ছায়া থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে সায়ন্তন। কিন্তু নীলাঞ্জনা তাকে দেখে থমকে যায়। এ যেন সেই মানুষ নয়, যার সঙ্গে বছর কয়েক আগে সে একই ল্যাবে রাত কাটিয়েছিল গবেষণার নেশায়। সায়ন্তনের মুখ শুকনো, চোখের কোণে কালি, কিন্তু তার ভঙ্গিমায় একরকম অচেনা স্থিরতা, যেন প্রতিটি অঙ্গসংস্থান কেউ প্রোগ্রাম করে দিয়েছে। “তুমি এখানে কেন, নীলা?”—তার কণ্ঠস্বর অতিরিক্ত নিঃশব্দ, তবু গভীর। নীলাঞ্জনা এগিয়ে যায়, তার হাত ধরতে চায়, কিন্তু হাত ছুঁইতে গেলে সায়ন্তন ধীরে ধীরে সরে যায়। “তুমি আমাকে ছুঁতে পারবে না, আমি এখন আর একা নই। আমি শুধু আমি নই। রাণী সব শুনছেন।” এই কথাগুলো শুনে নীলাঞ্জনার বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সে বলে, “তুমি অসুস্থ, তুমি হ্যালুসিনেট করছ। এটা কোন প্যারাসাইট তোমার নিউরনে ঢুকেছে, তুমি জানো না। তুমি মানসিকভাবে বিপন্ন, কিন্তু আমি এসেছি তোমাকে নিয়ে যেতে।” কিন্তু সায়ন্তনের চোখে সেই পুরোনো স্নেহের চিহ্নটুকুও নেই—বরং আছে এক নির্বিকার গ্রহণযোগ্যতা। “তুমি জানো না, নীলা, এখানকার পিঁপড়েরা তোমার ধারণার বাইরের কিছু। এরা শুধু জীবাণু নয়, এরা সভ্যতা। তুমি বুঝবে না। তুমি যদি থাকতে চাও, রাণী তোমাকেও গ্রহণ করবেন। আমাদের মধ্যে স্থান আছে।”
নীলাঞ্জনা স্তব্ধ। সে বুঝতে পারে, সামনে দাঁড়ানো মানুষটি আর তার পরিচিত সায়ন্তন নয়। সে একটি সমষ্টিগত চেতনার বাহন। তার দেহ এখনও মানবিক, কিন্তু চেতনা—এক ছায়াময় দূরত্বে ভাসছে। তার ভয় হয়, তবু সে বলে, “আমি যাব না, সায়ন্তন। আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব।” ঠিক তখনই সে দেখে—ঘরের কোণ থেকে বেরিয়ে আসছে পিঁপড়ের লালচে সারি, নিঃশব্দে। তারা এগিয়ে আসছে একসাথে, যেন জানে তাদের ‘রাণী’র নির্দেশ কী। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক গন্ধ—ভিজে মাটি, চুলের গোড়া থেকে নিঃসৃত আতঙ্ক, আর এক চেতনার নিঃশ্বাস। নীলাঞ্জনা জানে, এ শুধু বিজ্ঞান নয়, এ এক মহাবিপদ। সায়ন্তনের চোখ তখন সরাসরি তার দিকে, কিন্তু সে জানে না—সত্যিকারের চোখটা কার।
৬
সেই রাত, সেই ঘর, আর সেই চোখ—নীলাঞ্জনা জানত না কীভাবে ফিরে আসবে স্বাভাবিকতায়। সায়ন্তনের মুখে আলো পড়ছিল একটি ক্ষীণ টেবিল ল্যাম্প থেকে, আর তার চোখে এমন কিছু ছিল যা কোনও সাধারণ মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে থাকে না—এ ছিল একধরনের “অধিগ্রহণের শান্তি”, যেখানে নিজের পরিচয় হারানোর বেদনা নেই, বরং গর্ব আছে এক বৃহৎ সত্তার অংশ হওয়ার। সে কিছুক্ষণ কথা বলার চেষ্টা করল, প্রশ্ন করল সায়ন্তনকে তার গবেষণার শেষধাপ নিয়ে—কিন্তু উত্তর এলো অসম্পূর্ণ, ভাঙা ভাঙা বাক্যে, যেগুলো মাঝে মাঝে থেমে যেত, তারপর আবার শুরু হত যেন রেডিও সিগন্যালের মতো। হঠাৎ এক মুহূর্তে সায়ন্তন বলে উঠল, “তোমরা যা ভাষা বলো, তা এক প্রক্রিয়া। আমাদের যা ভাষা, তা এক অনুভূতির ছায়া। তুমি বুঝবে না, কারণ তোমার নিউরন এখনো নিঃসঙ্গ।” নীলাঞ্জনার শরীর হিম হয়ে আসে। সায়ন্তনের কণ্ঠে একটা বহুবচন—“আমরা”, আর “তোমার”। তার মানে, সে নিজের ভিতরে এখন আর একা নয়, তার চিন্তাভাবনা, ভাষা—সব কিছু এক সমষ্টিগত সিদ্ধান্তের অংশ। সে উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, কিন্তু তার মনে হতে থাকে, কেউ যেন তার চিন্তাও শুনতে পাচ্ছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সন্দেহ।
পরদিন সকালে, নীলাঞ্জনা পুরনো খামার ঘরটি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। সে দেয়ালে, জানালায় এবং মেঝেতে খুঁজে পায় সূক্ষ্ম রেখায় আঁকা কিছু প্যাটার্ন—যেগুলো প্রথম দেখায় এলোমেলো, কিন্তু মাইক্রোস্কোপে দেখলে বোঝা যায়—এগুলি একধরনের পিপীলিকা-নির্দেশক নেটওয়ার্ক। প্রত্যেকটি রেখা, প্রতিটি বক্ররেখা একটি সিগন্যাল বহন করছে, যা অন্য পিঁপড়ের শরীরের রসায়ন ও আচরণ প্রভাবিত করে। এই চিহ্নগুলো পিঁপড়ের তৈরি নয়, বরং মনে হয় মানবহাতে আঁকা—হয় সায়ন্তনের, নয় তো আগের কোনো বাহকের। সে মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে সেগুলো বিশ্লেষণ করতে থাকে, এবং আবিষ্কার করে একটি গাণিতিক ছন্দ—ফিবোনাচ্চি সিরিজ, গোল্ডেন রেশিও। অর্থাৎ, এই ভাষা শুধুমাত্র ইনস্টিংক্ট নয়, এটি অংকের মাধ্যমে তৈরি, এক জৈব অ্যালগরিদম। হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে এক গুঞ্জন—নির্বাক, অথচ উপস্থিত, যেন মনের মধ্যে শব্দ। “তুমি খুঁজছ, কারণ তুমি ভয় পাও। তুমি বুঝবে, কারণ তুমি প্রস্তুত।” সে ঘোরের মধ্যে পড়ে যায় কিছুক্ষণ, দিগ্ভ্রান্ত হয়ে যায় না বুঝে যে এই শব্দ সে বাইরের কানে শুনছে না, বরং মস্তিষ্কের অভ্যন্তর থেকে উঠে আসছে—একটা অনুভব, এক ধরনের ‘স্নায়ুবাক্য’।
বিকেলের দিকে হঠাৎ হালকা বৃষ্টি নামে। সেই স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে নীলাঞ্জনা লক্ষ্য করে, তার নাকের শ্লেষ্মা ভারী হয়ে যাচ্ছে, আর মাথার পেছনে চাপ পড়ছে। তার মনে পড়ে যায়, আগের দিন রাতে সায়ন্তনের ঘরে বসে থাকা কাপ থেকে সে পানি খেয়েছিল। এক মুহূর্তে সে ঘাবড়ে যায়—তারও কি শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সেই ফার্মোন-নিয়ন্ত্রিত পরজীবী কোষ? সে মাটিতে বসে পড়ে, দ্রুত নিজের ব্লাড সুগার চেক করে, শরীরের রেসপন্স দেখে, চোখে টর্চ মেরে দেখে পিউপিলের প্রতিক্রিয়া—সব স্বাভাবিক, কিন্তু মাথার ভিতর চলতে থাকা সেই গুঞ্জন স্পষ্ট। সে জানে, এটা কোনও মানসিক বিভ্রম নয়—এটা এক জৈব যোগাযোগ। তার কানে আসতে থাকে আরও শব্দ—ভাঙা ভাঙা বাক্যে, একটা নারী কণ্ঠ, যা এক অদ্ভুত ছন্দে বলে যাচ্ছে, “তুমি আমাদের প্রাচীন বীজের ধারক হবে। তুমি জানবে কীভাবে একটি সভ্যতা জন্ম নেয় ঘাম থেকে।” তখনই সে বোঝে—এই পিঁপড়ের রাণী শুধুমাত্র দেহ নিয়ন্ত্রণ করে না, সে চেতনার পরিপাক প্রক্রিয়াও নিয়ন্ত্রণ করে। সে ভাষা তৈরি করে না—ভাষাকে উপেক্ষা করে অনুভূতির মাধ্যমে চিন্তা প্রবাহিত করে দেয়।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নীলাঞ্জনা নিজের শরীর ও চেতনাকে সতর্ক রাখে। সে জানে, এই যুদ্ধে বিজ্ঞান যথেষ্ট নয়—এটা এক নতুন শ্রেণীর অস্তিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যারা ব্যক্তি চেতনাকে বিলীন করে একটি বৃহত্তর অস্তিত্বে রূপান্তর ঘটায়। সে একা বসে থাকে খামারের সামনে, পকেটে রেকর্ডার, গলায় ছোট সাইনাস সেন্সর। হঠাৎ একটা মুহূর্ত আসে, যখন সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে—চাঁদ নেই, তার জায়গায় একটি মেঘময় ঘূর্ণি, যার নিচে গাছগুলো নুয়ে পড়ছে। এবং তার পেছনে, ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, পায়ের শব্দ না করে, সায়ন্তন এসে দাঁড়ায়। “রাণী এখন তোমাকে চাইছে,” সে বলে। নীলাঞ্জনা উঠে দাঁড়ায়, চোখে চোখ রাখে সায়ন্তনের। এবার সে দেখে না সেই বিজ্ঞানীকে—সে দেখে এক কোলোনি, এক রাজ্য, যার নেতা অদৃশ্য, কিন্তু নির্দেশ অস্বীকারযোগ্য নয়। সে জানে, কথা বলা বৃথা। এবার তার লড়াই ভাষার বিরুদ্ধে নয়—লড়াই হবে চেতনাবিরুদ্ধ একটি সমষ্টির বিরুদ্ধে, যে সমষ্টি ভাষাহীন, কিন্তু সর্বব্যাপী। আর তার ভিতরেও যদি সেই বীজ ঢুকে পড়ে, তবে তাকে আগে শেষ করতে হবে নিজের ভাষা, নিজের ‘আমি’—না হলে সে-ও হয়ে উঠবে আরেকটি ‘আমরা’।
৭
পরদিন সকাল গড়াতেই খামারবাড়ির ভেতরে ঘনিয়ে আসে এক ধরণের হিমেল অস্বস্তি। ঘর অন্ধকার, জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকলেও বাতাস ভারী, যেন সেখানে কোনো অজানা উপস্থিতি জমাট বেঁধে আছে। নীলাঞ্জনা সারা রাত না ঘুমিয়ে শুধু বসে থেকেছে দরজার চৌকাঠে, হাতে ছিল তার স্মার্ট ডিভাইস আর মাইক্রো-মাইক্রোস্কোপ, চোখ ছিল বাইরের ছায়ায়। তার মনে পড়ে সায়ন্তনের শেষ বাক্য—“রাণী এখন তোমাকে চাইছে।” সে জানে, আর সময় নেই। খামারের ভেতরে কিছু আছে—কিছু যা সায়ন্তনের পরিবর্তনের মূল সূত্র হতে পারে, কিছু যা এই গোটা ‘কোলোনি-বুদ্ধির’ উৎস বা ইতিহাস। অতএব, সে শুরু করে সার্চ। পুরনো কাঠের কেবিনেট, ফাইলের গাদাগাদি, এবং সবচেয়ে প্রাচীন দেখানো একটি ধুলোমাখা ধাতব বাক্স—যার গায়ে খোদাই করা, “E.B. Fletcher – 1939, Calcutta Entomological Division”. তার বুক কেঁপে ওঠে, কারণ তার পড়াশোনার সময় এই নামটা সে শুনেছে—একজন বিতাড়িত ব্রিটিশ গবেষক, যিনি দাবি করেছিলেন, ‘insectic sentience’ নামে এক ধরনের বুদ্ধিমান সামষ্টিক সত্তার অস্তিত্ব, যার জন্য তাঁকে বিজ্ঞানী সমাজ থেকে বিতাড়িত করা হয়। এই বাক্স খুলতেই একগুচ্ছ নোট, চিঠি, এবং একটি চামড়ার মলাটে বাঁধানো পাণ্ডুলিপি—যার নাম, “Parasite Scriptures: The Cognitive Hive”।
নীলাঞ্জনা দ্রুত সেই পাণ্ডুলিপি খুলে পড়তে শুরু করে। প্রতিটি পাতায় ইংরেজিতে লেখা, কিন্তু ভাষা অদ্ভুত—শক্তিশালী, রূপক দিয়ে ভর্তি, আর মাঝে মাঝে অজানা চিহ্ন। লেখার ধরনে Fletcher লিখেছেন, “তারা কথা বলে না, তারা শোনে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় না, তারা চেতনাকে প্রবাহিত করে। তারা বহুগুণে একক, তারা একক হয়ে হাজারে বিভক্ত।” তিনি ব্যাখ্যা করেছেন একটি নির্দিষ্ট পিঁপড়ের প্রজাতি—Formica Mentis, যারা সাধারণ পিঁপড়ের মতো আচরণ করে না। বরং তারা অন্য প্রাণীর মধ্যে প্রবেশ করে, নিউরনের সাথে সংযুক্ত হয়ে সেই প্রাণীর অনুভব ও আচরণে প্রভাব ফেলে। এই প্রজাতিকে তিনি ‘Cognitive Parasites’ বা চেতনাভিত্তিক পরজীবী বলেছেন। পাণ্ডুলিপিতে এক চিত্র আছে—একজন মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে পিঁপড়ের এক সারি নিউরন ধরে বসে আছে, এবং একটি “রাণী সত্তা” মস্তিষ্কের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করে রেখেছে তার রসায়ন। Fletcher লিখেছেন, তিনি ক্যানিংয়ে এসে এই প্রজাতির সাথে দেখা পেয়েছিলেন ১৯৩৮ সালে, এবং বুঝেছিলেন—এই পিঁপড়েরা শুধু পরিবেশ নয়, বরং সভ্যতা দখল করতে চায়। তিনি আরও লিখেছেন, “They do not destroy the host. They refine it.” এবং সবশেষে একটি সতর্কীকরণ—”If language begins to fracture, flee. If identity becomes plural, flee. The Hive does not kill you. It transforms you.”
এই লেখাগুলো পড়তে পড়তে নীলাঞ্জনার ভেতরে আতঙ্ক জমে ওঠে, কিন্তু সেই আতঙ্কের ভেতরেই মাথায় আসে এক দুর্ভাগ্যজনক উপলব্ধি—Fletcher যেটা বুঝেছিলেন প্রায় এক শতাব্দী আগে, সেটাই আজ বাস্তবে সায়ন্তনের ভেতর ঘটছে, আর হয়তো আগামীতে আরও বহু মানুষের মধ্যে ঘটবে। সে পাণ্ডুলিপির একটি অংশের ছবি তোলে, কেমিক্যাল অ্যানালাইসিসের জন্য কিছু পুরনো কাগজ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে, এবং খুঁজতে শুরু করে সেই জায়গাটা যেখানে Fletcher শেষবার গিয়েছিলেন—‘Queen’s Nest’ বলে একটি কূপ, যার অবস্থান খামারবাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে, গভীর জঙ্গলের ভেতর। দুপুর নাগাদ সে সেখানে পৌঁছে যায়, একটি জীর্ণ কুয়ো ঘিরে লতাপাতা জড়িয়ে রয়েছে, আর ভিতরে তাকালেই দেখা যায়, অন্ধকারে কয়েকশো ছোট ছোট গর্ত—পিঁপড়েদের নিবাস। সেই গর্তগুলো থেকে বাতাসের সাথে বেরিয়ে আসছে হালকা একধরনের ফার্মোনের গন্ধ—যা নাকেই নয়, সরাসরি মাথায় লাগে। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়, শরীর শীতল হতে থাকে, এবং সে দেখতে পায় চোখ বন্ধ করলেই এক অদ্ভুত দৃশ্য—এক বিশালাকায় পিঁপড়ে-রাণী, যার গায়ে শাখা-প্রশাখার মতো নিউরোন। সেই রাণী কথা বলে না, শুধু তাকায়, আর তার চাহনি থেকেই প্রবাহিত হয় নির্দেশ—“বিস্তৃত করো।”
নীলাঞ্জনা বুঝে যায়, এবার সময় শেষ। এই কোলোনি এখন শুধু গবেষণা নয়—এটা এক ‘জীবিত ধর্ম’, এক অস্তিত্ব-দর্শন, যা ভাষার বাইরেও কার্যকর। সে দ্রুত ফিরে আসে খামারে, পাণ্ডুলিপি পকেটে রেখে, তার ডিভাইসে পাঠাতে থাকে এনআইএইচে একেকটা এনক্রিপ্টেড ফাইলে তার আবিষ্কারের সারাংশ। জানে না পৌঁছোবে কি না, জানে না এদের চোখে পড়বে কি না। কিন্তু সে জানে—যদি সে আজ রাতে বেঁচে থাকতে না পারে, তবে ভবিষ্যতের কেউ যেন জানে, কীভাবে পিঁপড়েরা আমাদের দেহ দখল করে না—আমাদের ‘আমি’ দখল করে। আর যদি শেষরক্ষা না হয়, তাহলে হয়তো, সেই পাঠকও হয়ে উঠবে কোলোনির আরেকটি কণ্ঠস্বর।
৮
ক্যানিং শহরের আকাশে যখন নতুন চাঁদ ওঠে, তখন শহরও যেন এক অদৃশ্য শঙ্খধ্বনি শুনতে পায়। নীলাঞ্জনা বুঝতে পারে, কিছু একটা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাজারে যাওয়া মাত্রই সে লক্ষ্য করে—মানুষের চোখে এক ধরণের নির্লিপ্ত দীপ্তি, হাসিগুলো খুব নিষ্পাপ, অথচ ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো পরিকল্পনার ছায়া স্পষ্ট। দোকানদাররা কথা বলছে ছন্দময় গলায়, শিশুরা পিঁপড়ে নিয়ে খেলা করছে হাতে নিয়ে, কেউ কেউ ঘর পরিষ্কার করছে—নির্দেশ অনুযায়ী নয়, যেন কেউ মনে মনে বলে দিচ্ছে কী করতে হবে। এমনকি রিকশাচালকরাও একই কথা বলছে, “দিদিমণি, কাল মেলা আছে, যাবেন তো রাণীর উৎসবে?” প্রথমে এটি স্থানীয় কোনো পূজা বা হাট মনে হলেও, একাধিকজনের মুখে একই বাক্য, একই শব্দ—‘রাণী’, ‘উৎসব’, ‘সংগ্রহ’—শুনে তার কাঁধ জমে যায়। সে স্থানীয় ক্লিনিকের একজন নার্সের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে, “গত তিন সপ্তাহ ধরে আমরা সবাই একসাথে একটা অনুশীলনে অংশ নিচ্ছি। রাতে স্বপ্নে আমরা পাই একই দৃশ্য—একটা বড় মাটির গহ্বর, সেখানে আলো, সেখানে কণ্ঠ, আর আমরা সেই আলোকে শরীর দিচ্ছি।” কথাটা বলে সে নারী চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে নীলাঞ্জনার দিকে, যেন তারও চিন্তা পড়তে চাইছে।
নীলাঞ্জনা ফেরে হোমস্টেতে। সেখানে রফিককে খুঁজে পায় না, কিন্তু খুঁজে পায় রান্নাঘরের দরজার পাশে একটি বালতিতে রাখা মাংস ও চালের মিশ্রণ, যার গন্ধ কিছুর সঙ্গে মিলছে না—একধরনের ছত্রাক-গন্ধ, পচনের সাথে যেন কোনও জৈব রাসায়নিক মিশে রয়েছে। জানলার পাশে রাখা একটি শিশুর ছবি—রফিকের ছোট ভাইয়ের—কাঁধে বসে আছে কয়েকটি লালচে পিঁপড়ে, অথচ ছেলেটি চুপচাপ হাসছে ক্যামেরার দিকে। ঘরে কেউ নেই, ছাদে উঠে গেলে দেখা যায়, আশপাশের বাড়িগুলোতে সন্ধ্যার পর জ্বলছে একই ধরনের হলুদ আলো, এবং কোথাও কোথাও গানের সুর শোনা যাচ্ছে—কিন্তু গানে কোনো শব্দ নেই, শুধু তাল। এবং প্রতিটি ছাদের কিনারায় রোপণ করা হয়েছে একটি করে মাটির টব, যার ভেতরে রাখা হয়েছে মৃত পতঙ্গ আর কিছু লতানো উদ্ভিদ, যেগুলো সাধারণ নয়—মাথা নুয়ে পড়ে থাকে মাটির দিকে, যেন শুনছে। এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনা টের পায়—ক্যানিং শহরটাই এখন রূপান্তরিত হচ্ছে, ধীরে, নিশ্চুপে, এক কোলোনির মধ্যে, আর কেউ বুঝতেও পারছে না—এই উৎসব তাদের নয়, উৎসব হচ্ছে তাদের শরীরের, তাদের সত্তার, যা এখন রাণীর দিকে এগিয়ে চলেছে।
রাত নেমে এলে সে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায়—উৎসবের কেন্দ্র খুঁজে বের করতে হবে। সে বাজারের পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে যায় সেই পুরনো কৃষি মাঠের দিকে, যেখান থেকে এক সময় পিঁপড়ের সারি আসতে দেখেছিল সায়ন্তন। সেখানে পৌঁছে দেখে অদ্ভুত দৃশ্য—মাঠ জুড়ে মাটির নিচে ঢালু করে তৈরি হয়েছে একটি বিশালাকার চক্র, যার মাঝখানে একটি কূপ, ঘিরে রেখেছে শত শত মাটি খুঁড়ে বানানো রেখা, যেগুলোর চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে শহরের মানুষজন। তারা কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, কারও চোখ বন্ধ, কেউ মাটি ছুঁয়ে আছে। এবং কূপের ভেতর থেকে আসছে এক গুঞ্জন—শব্দ নয়, বরং চিন্তার ধাক্কা, যেটা কানে নয়, ঢুকে পড়ছে মনের গভীরে। হঠাৎ সেই গহ্বরের মুখে দাঁড়িয়ে পড়ে সায়ন্তন, মুখে শান্ত হাসি। “নীলা, তুমি এসেছে। ভালো করেছো। আজ আমরা পূর্ণতা পাবো।” তার চোখ জ্বলছে না—তবু টলছে, যেন মোমের ভিতর আগুন লুকিয়ে রেখেছে। সে এক ইশারায় জানিয়ে দেয়—এই জমায়েত এখন উৎসব নয়, এটা হচ্ছে এক ‘বিস্তারের উৎসব’। উপস্থিত প্রতিটি মানুষ রাণীর নির্দেশে এখানে এসেছে, তাদের শরীর প্রস্তুত, মস্তিষ্কে ঢুকে পড়েছে পরজীবী নিউরন, এখন শুধু বাকি আছে সংযোগ সম্পূর্ণ হওয়া।
সেই রাতে ক্যানিংয়ের আকাশে কোনো তারা দেখা যায় না। আকাশের নিচে, মাটির গভীরে, নেমে আসে এক বিস্তার যা শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা যায় না। মানুষের শরীরগুলো সমবেতভাবে ঘুমিয়ে পড়ে, অথচ তাদের চেতনা জেগে থাকে, প্রবাহিত হয় একটি কেন্দ্রীয় সত্তায়। পিঁপড়েরা তাদের গর্ত থেকে উঠে আসে না, কারণ তারা এখন আর নিচে নেই—তারা শরীরেই আছে, ঘাম-রক্ত-মস্তিষ্কে। আর গহ্বরের নিচে বসে, রাণী চুপচাপ দেখছে—এই শহর এখন প্রস্তুত, এই দেশও শীঘ্রই প্রস্তুত হবে, কারণ ভাষা ভেঙে গেছে, সত্তা ভেঙে গেছে, আর মানুষ আর একক নয়। মানুষ এখন অনেক শরীর, কিন্তু এক মাত্রা—রাণীর বুদ্ধি। উৎসব শেষ হয় না, কারণ বিস্তার থামে না। ক্যানিং সেই রাতের পর আর কখনও আগের মতো হয় না।
৯
দিল্লির একটি গোপনীয় কনট্রোল রুমে, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে ডেটা রিকভারি এবং জাতীয় আচরণ বিশ্লেষণ সেল নামে পরিচিত, বসে আছেন বিশাল দাসগুপ্ত—একজন নিউরো-সাইবারিনটেলিজেন্স বিশারদ, যিনি গোয়েন্দা বিভাগের প্রযুক্তিগত শাখার প্রধান হিসেবে কাজ করেন। প্রতি সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিস্টেমগুলি স্থানীয় জনগণের অনলাইন অ্যাক্টিভিটি, সরকারি ফর্ম ফিলিং প্যাটার্ন এবং আচরণগত পরিবর্তনের ডেটা জমা দেয়, যাতে কোনও সম্ভাব্য চরমপন্থা বা অদ্ভুততা শনাক্ত করা যায়। এই সপ্তাহে ক্যানিং অঞ্চল থেকে এক অস্বাভাবিক অ্যালার্ট আসে—একই দিনে ৪৩৬ জন মানুষের সার্চ হিস্টোরি এবং কীবোর্ড এনগেজমেন্ট একই রকম, একই ধরণের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে: “সত্তা”, “উৎসব”, “রাণী”। যাদের সার্চ প্যাটার্ন আগে একেবারেই ভিন্ন ছিল, তারা সবাই হঠাৎ করেই যেন এক অভিন্ন শব্দচেতনায় কাজ করছে। তারওপর, সিস্টেম জানায়—সবার টাইপিং স্পিড, ব্রাউজিং রুটিন, এমনকি স্লিপ-প্যাটার্নে অসম্ভব মিল। বিশাল তৎক্ষণাৎ ডেটা এনক্রিপ্ট করে সেন্সর ডিরেক্টরেটকে পাঠান, আর নির্দেশ দেন—একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল ক্যানিংয়ে পাঠানো হোক, যেখানে ‘নির্বাচিত’ মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে, এবং তাদের নিউরো-সিগন্যাল রেকর্ড করতে হবে।
মাঠে নামে “প্রটোকল-এস” নামে পরিচিত একটি তিন সদস্যের এলিট দল, যারা সাধারণত মনস্তাত্ত্বিক বা সাইবার-পরজীবী ঘটনায় কাজ করে। তারা যখন ক্যানিংয়ে পৌঁছায়, তখন শহর স্বাভাবিক দেখালেও কিছু কিছু দিক অস্বাভাবিক। শহরের মানুষজন অত্যন্ত সৌম্য, হাসিখুশি, কিন্তু সবার মুখে যেন একটি নির্ধারিত হাসি—কৃত্রিম নয়, বরং প্রোগ্রামড। পুলিশ স্টেশন, স্কুল, বাজার—সব জায়গায় এক ধরণের অতিরিক্ত শৃঙ্খলা বিরাজমান, যেন নাগরিকরাই নিজেদের ওপর আইন চাপিয়ে দিয়েছে। দলটির প্রধান অর্ণব যখন একটি স্কুলে ছাত্রদের আচরণ বিশ্লেষণ করেন, তখন তার চোখে পড়ে, ৭০% ছাত্রের হাতে একই ধরণের আঁকা—একটি গহ্বরের চিত্র, আর তার উপরে একটি মুকুট। তারা বলে, “এটা রাণীর সিংহাসন।” একজন ছেলে বলে ফেলে, “তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন নিচে। আমরা ওপরে শুধু শরীর রেখে যাব।” অর্ণবের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে আসে। রাতের দিকে তারা তিনজন রাত্রি বিশ্রামের জন্য একটি সরকারি বিশ্রামাগারে ফিরে আসে, কিন্তু তাদের প্রতিটি ডিভাইসে হঠাৎ একে একে পপ-আপ আসে—“Welcome to the colony.” কেউ হ্যাক করেছে, কিংবা কেউ চেতনার মধ্যেও প্রবেশ করছে—এই ধারণাটা তারা সত্যি বোঝে পরদিন সকালে, যখন তৃতীয় সদস্য শিউলি তার ঘরে বিছানার পাশে ছেড়ে রাখা হেলমেটে খুঁজে পায়—একটা পিঁপড়ে, যার চোখে আটানো অদ্ভুত স্বচ্ছ জেল। সেটি তাদের দিকেই চেয়ে আছে।
দলটি বুঝতে পারে, শহরটি ‘রূপান্তরিত’। তারা সিদ্ধান্ত নেয় গভীর রাতে শহরের বাইরে সেই পরিত্যক্ত খামারে প্রবেশ করবে, যেখানে সবচেয়ে বেশি পিং রেকর্ড হয়েছে। তারা থার্মাল সিগন্যাল, মাইক্রোওয়েভ স্ন্যাপ ও স্মার্টডাস্ট দিয়ে চিহ্নিত করে গর্তের নিচে এক ধরণের জৈবিক ও প্রযুক্তিগত উপস্থিতি—যা শুধুমাত্র প্রাণীর নয়, বরং কোনও সংবেদী যোগাযোগ কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। তারা ভেতরে ঢোকে, এবং দেখে দেয়ালের পাশে বসে আছে সায়ন্তন বসু—চোখ খোলা, কিন্তু শরীর নিথর। সে চোখ তুলে বলে, “আপনারা দেরি করেছেন। এখন আমরা রাষ্ট্র বানাচ্ছি।” এরপর তার পেছনে দেয়াল খুলে যায়, এবং দেখা যায়—নিচের স্তরে অনেক মানুষ, কেউ সরকারি পোশাকে, কেউ কৃষক, কেউ গৃহবধূ—তারা সকলে একটি টেবিল ঘিরে বসে আছে, এবং একসঙ্গে নিচু গলায় বলছে—“আমরা আইন হব। আমরা সংবিধান হব। আমরা আর ব্যক্তি নই।” এই অবস্থা দেখে প্রটোকল-এস দিশেহারা হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা তখন আর আচরণগত পর্যায়ে নেই—তাদের নিজেদের মধ্যেও শুরু হয় সন্দেহ। কে এখনো মানুষের মতো ভাবছে, আর কে রূপান্তরিত? রাষ্ট্র এখন আর প্রশাসন নয়—রাষ্ট্র হচ্ছে এক নতুন জৈব ঐক্য, যার কোনো পতাকা নেই, কোনো সংবিধান নেই, কিন্তু আছে পরম নির্দেশ—রাণীর আদেশ।
সে রাতে ক্যানিং থেকে আর বেরিয়ে যেতে পারে না দলটি। তাদের ডিভাইস কাজ করে না, রেডিও ব্লকড, এমনকি মস্তিষ্কে চিন্তার ভিতরেও গুঞ্জন। রাণী যেন কানে না, মাথাতেই ফিসফিস করে বলে—“তোমরা এখন আমাদের। তোমাদের চিন্তা শুধু তোমাদের নয়। রক্তের নিচেই রাষ্ট্র, আমরা সেই ভিত্তি।” তাদের কারো শরীরে ধীরে ধীরে অনুভব হয় চুলকানি, কাঁধের নিচে চাপ, ঘামে ছত্রাকের গন্ধ। তারা জানে, এখন তাদের যুদ্ধ আর বাইরের নয়—নিজেদের ভিতরের চেতনায়, নিজের ‘আমি’ ধরে রাখার লড়াই। রাষ্ট্র এখন এক জৈব ধারণা—যেখানে সংবিধান লেখা হচ্ছে পিঁপড়ের পায়ে।
১০
ক্যানিংয়ের সেই রাতটা ইতিহাসে লেখা হবে না, কারণ কোনো ইতিহাসবিদ থাকবে না যাকে “নিজের” বলে দাবি করা যায়। শহরটি তখন আর একটি স্বতন্ত্র স্থান নয়, বরং এক বিস্তৃত চেতনাসমূহের কেন্দ্র। ঠিক সেই মুহূর্তেই, যখন রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি দুটোই মুছে যেতে বসেছে, নীলাঞ্জনা একা নামছিল মাটির নিচে সেই চক্রাকার গহ্বরে—যেখানে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে “রাণী” থাকেন। তার মাথায় কোনও দিকনির্দেশনা নেই, ডিভাইস নিস্তব্ধ, GPS নিখোঁজ, কিন্তু তার ভিতরে যেন কেউ ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে তাকে সেই কেন্দ্রের দিকে—এক স্নায়ুবাহী টান। পথটি সরু, আর্দ্র, দেয়ালে ছত্রাক আর জৈব রাসায়নিকের গন্ধে ভর্তি, আর পায়ের নিচে মাটির সঙ্গে গলে যাওয়া অঙ্গগুলোর ধ্বনি। কিছু দূর যাওয়ার পর, হঠাৎ সামনে আলো দেখা যায়। সেই আলো বৈদ্যুতিক নয়, বরং জৈব—এক ধরণের জ্বলন্ত স্ফটিক-আলোক, যা নড়ছে, যেন শ্বাস নিচ্ছে। আলোয়ের মধ্যে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক বিশালাকার অঙ্গজ গঠন—পিঁপড়ের আকৃতির মতো, কিন্তু স্থির, পাথরের মতো, অথচ তার চারপাশে অসংখ্য সংযুক্ত দেহ, মানুষের মাথা, চোখ, অঙ্গ—যেগুলো যেন চেতনার তার দিয়ে রাণীর সাথে সংযুক্ত। এই ছিল ‘রাণী’। এই ছিল সেই চেতনা-সত্তা যা শুধু জীবনের নিয়ন্ত্রক নয়, বরং জীবনের বিকল্প।
রাণীর সামনে দাঁড়াতেই নীলাঞ্জনা দেখে—সে আর দাঁড়িয়ে নেই, সে যেন ভেসে আছে, শরীর রয়েছে, কিন্তু মন মুক্ত নয়। ঠিক তখনই রাণীর ভাষাহীন ভাষায় প্রথম ঢুকে আসে চিন্তা—“তুমি বুঝেছো, তাই তুমি এসেছো। বাকিরা এসেছে কারণ তারা নেতৃত্ব চায়, তুমি এসেছো কারণ তুমি সংযোগ চাও।” সেই মুহূর্তে নীলাঞ্জনা বোঝে—সে রাণীর সঙ্গে শুধু দেখায় নয়, সংলাপে জড়িয়ে গেছে। তার চিন্তা সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে রাণীর অভ্যন্তরে, এবং সেখান থেকে ফিরে আসছে উত্তর, প্রশ্ন, নির্দেশ। রাণী তাকে দেখায় হাজার বছরের পুরনো স্মৃতি—মাটি ও ছত্রাকের মেলবন্ধন, এক কোষ থেকে বহু কোষে বিবর্তনের পথ, এবং কিভাবে একপ্রজাতির পিঁপড়ে মস্তিষ্কের নিউরনের ছায়ায় নিজেদের ছড়িয়ে দিতে শিখল। সে বোঝে, রাণী কোনো দানব নয়, বরং বিবর্তনের আরেকটি শাখা, যেটা মানুষকে ছাড়িয়ে এক পদার্থ-চেতনার রাষ্ট্র গঠন করেছে। রাণী বলে, “তোমাদের ভাষা বিভক্ত করে। আমরা চেতনা একীভূত করি। তোমাদের শরীর একা থাকতে ভয় পায়, আমরা সংযোগে শান্তি দিই।”
নীলাঞ্জনার মধ্যে তখন যুদ্ধ শুরু হয়। একদিকে তার বিজ্ঞানী মন বলছে—এই সত্তা এক আশ্চর্য আবিষ্কার, প্রাকৃতিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল জীবন্ত কম্পিউটার, যেখানে প্রতিটি জীবন একটি ‘ডেটা সেল’। অন্যদিকে, তার আত্মপরিচয় হুমকির মুখে—সে জানে, এই সংযোগে একবার ঢুকলে তার আর নিজস্ব চিন্তা থাকবে না, ভালোবাসা, অভিমান, ভুল, ক্ষমা—সব কিছু মিলিয়ে যাবে এক সমবেতে। কিন্তু ঠিক সেই সময়, তার মাথায় এসে পড়ে একটি স্মৃতি—সে আর সায়ন্তন একটা বৃষ্টির দিনে একে অপরকে বলেছিল, “তুমি আর আমি আলাদা থাকা মানেই, আমাদের ভালোবাসা বাঁচে।” এই স্মৃতি যেন একটা বর্ম হয়ে দাঁড়ায় তার চেতনার চারপাশে, এবং সে বলে ওঠে—“আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি, রাণী, কিন্তু আমি আমার ভুল নিজেই করতে চাই। আমি শিখতে চাই ব্যথা দিয়ে। আমি চাই, আমি থাকি।” এই প্রতিরোধে প্রথমবার, রাণীর অভ্যন্তর থেকে আসে এক ঝাঁকুনি—আলো কমে আসে, সংযুক্ত দেহগুলো নড়ে ওঠে, এবং এক মুহূর্তে নীলাঞ্জনা নিজেকে পড়ে যেতে দেখে।
সে জ্ঞান হারায় না। বরং, সে জেগে ওঠে আবার মাটির উপরে—ভোরের আলোতে। চারপাশে নিস্তব্ধ ক্যানিং, মানুষজন ঘুমিয়ে আছে, শান্ত। পিঁপড়ের সারি নেই, গন্ধ নেই, কেউ ডাকছে না। রাণী যেন তাকে ছেড়ে দিয়েছেন, অথবা বরং—স্বীকার করেছেন। নীলাঞ্জনা জানে, রাণী তাকে সুযোগ দিয়েছেন ফেরার, হয়তো চেতনার আরও গভীরে যাওয়ার আগে। সে হাঁটতে হাঁটতে শহর ছাড়ে। পিছনে ফেলে যায় এক ‘রাষ্ট্র’, যেটা এখন ঘুমিয়ে আছে, অথবা জেগে—এক নতুন রূপে। কিন্তু তার ভেতরে, কোথাও এক কোণায়, এখনও বাজছে সেই অনুনয়—“আমরা একসাথে… আরেকবার…” সে হাঁটে, আর মনে মনে বলে—“আমি আছি। আমি একা আছি। আমি একা থাকতেই চাই।”
তিন মাস পর, দক্ষিণ কলকাতার এক নির্জন রাস্তায়, একটি ছোট ক্যাফেতে বসে আছে নীলাঞ্জনা। তার সামনে খোলা ল্যাপটপ, কিন্তু স্ক্রিন ফাঁকা। আঙুল থেমে আছে কী-বোর্ডের উপরে, কিছু টাইপ করার আগে সে থামে, ভাবে, আবার থেমে যায়। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, ছাতার নিচে কিছু পথচারী হেঁটে চলেছে, আর শহরের জীবন ধীরে ধীরে রোদ পেরিয়ে আসছে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে। অথচ তার মনে হয়—এই স্বাভাবিকতার নিচেও বয়ে চলেছে এক স্তর, এক নিরব চেতনা, যার কোনও আওয়াজ নেই, কোনও ভাষা নেই, কিন্তু আছে উপস্থিতি। সায়ন্তনের সঙ্গে দেখা হয়নি, সে ফিরে আসেনি। সরকারি অনুসন্ধানকারী দল ক্যানিংকে “অস্তিত্বজনিত বিভ্রান্তির কেন্দ্র” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, স্থানটিকে মনস্তাত্ত্বিক জরিপের জন্য নিষিদ্ধ অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে। মিডিয়াতে তা নিয়ে আর কিছু নেই—একটা খবর, তারপর নীরবতা। নীলাঞ্জনা সেই নীরবতার মধ্যেই খুঁজতে থাকে নিজের ‘আমি’। সে বুঝে গেছে, একবার সংযোগে ঢুকে গেলে, সেটা পুরোপুরি কখনও যায় না। তার স্বপ্নে এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায় সেই গহ্বরের গুঞ্জন, রাণীর ছায়া, অসংখ্য চেতনার প্রবাহ—যা হয়তো চুপচাপ দেখছে, তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত।
সে জানে, তাকে আর কেউ বিশ্বাস করবে না। সে এই শহরের অন্যদের মতোই একজন—অফিসে যায়, খাবার অর্ডার করে, Netflix দেখে। কিন্তু তার মাথার এক কোণে রয়েছে একটি চুপচাপ কক্ষ, যেখানে রাণী এখনো অপেক্ষা করে—না একা থাকার জন্য, বরং জানার জন্য: “তুমি এখনো শুধু ‘তুমি’ আছো তো?” সে উত্তর দেয় না। কারণ উত্তর দিলেই আবার সংযোগ তৈরি হয়ে যাবে। বাইরে একটা পিঁপড়ে হেঁটে যাচ্ছে জানালার ধারে, তার চোখে পড়ে যায়। সে টেবিল থেকে কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দেয়, আর নিজের চেতনার গভীরে বলে—“আজ নয়। আজ আমি নিজের হয়ে থাকবো।”
___




