Bangla - নারীবিষয়ক গল্প - ভ্রমণ

পাতার গান, পাহাড়ের টান

Spread the love

মেঘলা দত্ত


পর্ব ১: চায়ের প্রথম ঘ্রাণ

ট্রেনটা শিলিগুড়ি জংশন ছাড়তেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হলো। জানালার কাচে ফোঁটা ফোঁটা জল জমে, আড়ালে রেখে দিচ্ছিল সবুজে ঢাকা পাহাড়ের পেছনের দৃশ্যগুলো। রুদ্রর মনে হচ্ছিল এই যাত্রাটা ঠিক আর দশটা অফিস ট্রিপের মতো নয়। এবার সে এসেছে ডুয়ার্সের ‘টি-ট্যুরিজম’ প্রজেক্ট নিয়ে একটি রিপোর্ট বানাতে। ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুমোদন পাওয়া এই কাজটি তাকে দারুণ এক অভিজ্ঞতা দেবে বলেই সে আশা করছিল।

সঙ্গে ছিল একটা নোটবুক, ক্যামেরা, আর পুরোনো চায়ের কৌটো—যেটা ছিল তার ঠাকুমার। এই কৌটোটার একটা ইতিহাস ছিল, যেটা রুদ্র কোনোদিন ঠিকমতো জানত না। শুধু জানত, সেই কৌটোটা পেলেই ঠাকুমা বলতেন, “এইখানেই আছে সময়ের ঘ্রাণ।”

ট্রেন থেকে নেমেই গা ছমছমে একটা অনুভূতি হলো। নতুন জায়গা, অচেনা গন্ধ। গাইড হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল স্থানীয় একজন, নাম—নয়নিকা। নাম শুনেই রুদ্রর মনে হয়েছিল, মেয়েটা নিশ্চয়ই বইয়ের পাতার কেউ—একজন নায়িকা, যার চোখে পাহাড়ের রহস্য লুকানো থাকে।

নয়নিকা এসে দাঁড়াল ছোট্ট এক গাড়ি নিয়ে। সাদা শাল-কাপড়ে মোড়া, চোখে গভীরতা, কণ্ঠে নরম মিঠে হাসি। “আপনি নিশ্চয়ই রুদ্র সেন?”
“হ্যাঁ, আপনি নিশ্চয়ই নয়নিকা?”

গাড়িতে উঠতেই নয়নিকা বলল, “এই ট্রিপে আপনি শুধু চা-কেনার জায়গা দেখবেন না, চা নিয়ে জীবনের গল্পও শুনবেন।”

“গল্প?”

“হ্যাঁ। আমাদের চা-বাগানগুলো শুধু ব্যবসা নয়, ইতিহাস, আবেগ আর প্রতিরোধের চিহ্ন বহন করে। আপনি সেসব শুনতে চাইলেই বুঝবেন, পাতার ঝাঁঝ কতটা গভীর।”

রুদ্র একটু অবাক হলেও চুপ করেই শুনছিল। গাড়ি চলছিল ভিজে রাস্তায়, মাঝে মাঝে চা-বাগানের সবুজ ঢেউ চোখে পড়ছিল। শালগছ, ঘাসে ঢাকা জমি, আর তার মাঝে মাঝে দৃষ্টিসীমা হারিয়ে যাওয়া শ্রমিকের দল। নয়নিকা হঠাৎ বলল, “আপনি আগে কখনো চা-বাগানে গেছেন?”

“না, এই প্রথম।”

“তাহলে আপনি জানেন না চা গাছ কথা বলে।”

রুদ্র হেসে বলল, “চা গাছ কথা বলে? কীভাবে?”

“চোখ থাকলে বোঝা যায়। প্রতিটি পাতা যেভাবে হাতের ছোঁয়া চায়, যেভাবে দুপুরে ঝিমিয়ে পড়ে, সন্ধ্যায় আবার জেগে ওঠে—সবকিছুর এক একটা মানে আছে।”

গাড়ি থামল একটি পুরনো বাংলোয়। কাঠের দরজা, সিঁড়ি বেয়ে উঠলে বারান্দা, আর চারপাশে খোলা প্রান্তর। বাংলোর নাম ছিল—পাতাঝরা নিবাস।

রুদ্র ঘরটায় ঢুকে জানালার ধারে বসতেই দেখল একটা পুরনো রেকর্ড প্লেয়ার রাখা। পাশে টেবিলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। নয়নিকা বলল, “এই বাড়িতে একসময় এক ব্রিটিশ সাহেব থাকতেন। তিনি নাকি প্রথম এই অঞ্চলে ‘টার্মারিক টি’ তৈরি করেছিলেন। পরে অবশ্য লোকজন বলত, তার তৈরি চায়ের মধ্যে ছিল এক ধরনের ‘স্মৃতির মাদকতা’। একবার খেলেই মানুষ নাকি পুরনো কথা ভুলে যেত।”

রুদ্র হেসে বলল, “এ তো মজার কল্পনা!”

নয়নিকা বলল, “এটাই তো টি ট্যুরিজমের আসল রোমাঞ্চ। আপনি শুধু চা খাচ্ছেন না, একেক সময় একেক সময়ের গল্প খাচ্ছেন। একেক কাপ চা একেক জীবন স্পর্শ করে যায়।”

রুদ্র মনে মনে ভাবল—এই মেয়েটি শুধু গাইড নয়, যেন গল্পের একজন কাহিনিকার।

সন্ধে গড়িয়ে রাত নামল। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল সুগন্ধী চায়ের গন্ধ। বাংলোর বারান্দায় বসে নয়নিকা আর রুদ্র দু’জনে কথা বলছিল। হঠাৎ নয়নিকা রুদ্রকে একটা কৌটো দেখিয়ে বলল, “আপনার কৌটোটা তো আমার ঠাকুরদার বানানো। উনি একসময় কাঠের কাজ করতেন। ওই কাঠের কৌটোতে কেবল চা থাকত না, থাকত প্রতিটি চাষির স্পর্শ।”

রুদ্র তাকিয়ে দেখল—হ্যাঁ, ওই কাঠের গায়ে ছিল কয়েকটা খোঁচা খোঁচা দাগ, যেন কেউ নাম লিখে মুছে দিয়েছে। রুদ্র বলল, “তাহলে আমাদের এই যাত্রা পুরোনো গল্পের এক সেতু?”

নয়নিকা হেসে বলল, “না রুদ্রবাবু, এটা শুরু মাত্র।”

রাত গভীর হচ্ছিল। দূরের চা-বাগান থেকে যেন হালকা গান ভেসে আসছিল। হাওয়ায় চায়ের পাতার গন্ধের সঙ্গে মিশে ছিল ইতিহাসের ঘ্রাণ।

আর রুদ্র বুঝল—এই যাত্রায় সে শুধু একজন পর্যটক নয়, একজন শ্রোতা। প্রতিটি পাতার ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে এমন কিছু যা শুধু চোখে নয়, মনে শোনা যায়।

পর্ব ২: পাতার নিচে যে গল্প

রাতটা অদ্ভুত ছিল। বাংলোর জানালায় বসে রুদ্র দেখছিল কুয়াশায় ঢাকা পাহাড় আর দূরে আলো জ্বলা চা-বাগান। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, গায়ে চাদর জড়িয়ে নয়নিকা এনে দিয়েছিল গরম জলপাই চা—এক ধরনের স্থানীয় ফিউশন চা, যাতে ছিল জলপাই পাতার নির্যাস আর লালচে পাহাড়ি ফুলের মিশ্রণ।

“এটা খুবই স্পেশাল,” নয়নিকা বলল, কাপটা এগিয়ে দিয়ে। “এই চায়ের রেসিপিটা আগে শুধু নবদ্বীপ বাগানের এক বৃদ্ধ কুশলী জানতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর অনেকদিন চা-টা হারিয়ে গিয়েছিল। আবার আমরা গবেষণা করে বানাতে পেরেছি।”

রুদ্র চায়ের চুমুক দিয়ে অবাক হল। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল—না, ঠান্ডায় নয়। ওই স্বাদে যেন পুরোনো কিছু জেগে উঠছিল। মনে হচ্ছিল কেউ ডাকছে দূর থেকে, কোনো ছায়া কণ্ঠে, কোনো হারানো দুপুরে।

নয়নিকা একদৃষ্টে রুদ্রকে দেখতে দেখতে বলল, “এই চায়ের নাম আমরা দিয়েছি—‘স্মৃতির ছায়া’।”

“তুমি বারবার বলছ—চা শুধু চা নয়, একটা গল্প। তুমি নিজে কি কখনো এসব গল্পের ভেতরে গিয়েছ?”

নয়নিকা হেসে বলল, “আমি একটা গল্পেই তো জন্মেছি, রুদ্র। আমার ঠাকুরদা ছিলেন এক চা-চাষি, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তিনি ব্রিটিশ সাহেবদের চোখে ধুলো দিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলের নারী চা শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গোপনে খাবার আর খবর পৌঁছে দিতেন। আর আমার ঠাকুমা ছিলেন প্রথম স্থানীয় মহিলা যিনি নিজে চা মিশিয়ে বিশেষ একটি ব্লেন্ড তৈরি করেছিলেন।”

“তার নাম কী ছিল?”

“পাহাড়ি চুম্বন।” নয়নিকা একটু লাজুক মুখে বলল, “আর আমার মায়ের নামও ওই চায়ের নামেই—চুম্বনা।”

রুদ্র খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হচ্ছিল সময় যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। এরপর সে বলল, “কাল আমি কোথায় যাব? কোন বাগান আগে দেখা হবে?”

নয়নিকা বলল, “কাল সকালে আমরা যাব ‘মুর্মু টি এস্টেট’-এ। ওটা এই এলাকার সবচেয়ে পুরোনো বাগান। আর ওখানে রয়েছে একটা বিশাল ‘হেরিটেজ টি প্রসেসিং ইউনিট’। তবে সেখানকার সবচেয়ে রহস্যময় জিনিস হল একটা পাথরের খোদাই—যেটা কেউ জানে না কে তৈরি করেছিল। কেউ বলে এক ব্রিটিশ সাহেব, কেউ বলে এক প্রেমিক চা-চাষি।”

রুদ্র বলল, “তোমার গলা শুনে মনে হয়, তুমি সব গল্প জানো। এমন করে বলো, মনে হয় প্রতিটি পাতার নিচে যেন তুমি নিজেই শুয়ে আছো, স্মৃতির মতো।”

নয়নিকার মুখটা এক মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গেল। “তোমরা শহরের লোকজন গল্প শুনতে ভালোবাসো, কিন্তু যারা গল্পের মধ্যে বাস করে, তাদের পক্ষে এগুলো বলা সহজ নয়। আমি একবার ভুল করে একটা চা-বাগানের মাটিতে পা দিয়েছিলাম, যেখানে একসময় শ্রমিক বিদ্রোহ হয়েছিল। আমি শুধু জানতাম সেখানে গিয়ে কেউ যায় না। কিন্তু আমি গিয়েছিলাম, আর যেদিন ফিরে এলাম, সেদিন থেকেই আমার বাবার মুখে কথা বন্ধ হয়ে গেল। ডাক্তাররা কিছুই বলতে পারেনি।”

রুদ্র চুপচাপ হয়ে গেল। বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গিয়েছিল। হাওয়া বইছিল না, শুধু পাতা কাঁপছিল।

“সেই থেকে আমি বুঝে গেছি,” নয়নিকা বলল, “প্রতিটি চা-বাগান শুধু শ্রম আর সৌন্দর্য নয়, একটা ভাষা। যে ভাষা শুধু শরীর নয়, আত্মাকেও ছুঁয়ে যায়।”

রুদ্র জানালার বাইরে তাকাল। দূরের অন্ধকারে হঠাৎ যেন কোনো আলো ভেসে উঠল—লালচে একটা আভা। সে বলল, “ওটা কী?”

নয়নিকা বলল, “ওটা ‘আলো বাগান’। অদ্ভুত নাম, তাই না? ওখানে একসময় এক টী-টেস্টার আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী বিশ্বাস করতেন, তাঁর স্বামী এখনো সন্ধ্যেবেলায় চায়ের ঘ্রাণে ফিরে আসে।”

“তাহলে কাল ওখানেও যাব?”

“না। ওখানে কেউ যায় না। ওখানে চা চাষ হয় না এখন। শুধু বাতাসে তার ঘ্রাণ ছড়িয়ে থাকে।”

রুদ্র হঠাৎ অনুভব করল, সে এই ট্যুরে এসে পড়েছে এক চা-আবিষ্ট জাদুপুরীতে, যেখানে প্রতিটি পাতায় অতীতের কেউ কথা বলে, প্রতিটি কাপে কেউ অপেক্ষা করে।

সে নিজের ব্যাগ খুলে ঠাকুমার সেই পুরোনো কৌটোটা বের করল। খোলার সময় একটা হালকা শব্দ হলো। কৌটোটা ভেতরে খালি, অথচ তার মনে হলো যেন ঘ্রাণ ছড়ালো এক পুরোনো সময়ের—কোনো স্নিগ্ধ দুপুর, ঠাকুমার গল্প বলা সময়।

“তুমি জানো?” নয়নিকা বলল, “এই কৌটোটা একবার পাহাড়ি বউদের সমিতির প্রতীক ছিল। প্রত্যেক চা-বাগানের শ্রমিক নারী, যাঁরা দিনের পর দিন কুয়াশায় ভিজে, চড়া রোদে পাতা তোলে, তাঁরা এইরকম কৌটো নিজের করে রাখতেন। এতে শুধু চা নয়, নিজেদের নাম, গল্প, স্বপ্ন রাখতেন।”

“তাহলে আমার ঠাকুমাও নিশ্চয়ই তাঁদের একজন ছিলেন?”

নয়নিকা মাথা নেড়ে বলল, “হয়তো, অথবা আরও গভীর কিছু। আমি কাল মুর্মু বাগানে একজনকে দেখাব, যিনি হয়তো তোমার ঠাকুমাকে চিনতেন।”

রুদ্র বলল, “তুমি কি জানো আমার ঠাকুমার নাম?”

নয়নিকা একটু চুপ করে থেকে বলল, “জানি না। কিন্তু আমি তার কৌটো চিনেছি। তার হাতের ছাপ এখনও কাঠে লেগে আছে।”

রাত্রিটা এবার আর স্বাভাবিক লাগছিল না। বাংলোর দেয়াল যেন শোনাচ্ছিল সেসব শব্দ—পাতা ছেঁড়ার আওয়াজ, রিকশার চাকা গড়ানোর ধ্বনি, আর একটা শীর্ণ কণ্ঠে বলা গল্প—“চা শুধু পানীয় নয়, এ এক জীবন।”

রুদ্র জানত, তার রিপোর্ট তৈরির কাজ শুরু হবে কাল। কিন্তু সে তখনই জানত, এ রিপোর্ট আর শুধু সরকারি ফরম্যাটে হবে না। এ হবে একেকটি পাতার গভীর স্মৃতির লিখিত দলিল।
আর নয়নিকা? সে কেবল গাইড নয়, সময়ের এক সাক্ষী।

পর্ব ৩: মুর্মু বাগানের মুখ

পরদিন সকালে বাংলোর জানালায় রোদ এসে পড়তেই রুদ্র ঘুম ভাঙল। সে বারান্দায় এসে দাঁড়াল, দেখল নয়নিকা আগে থেকেই তৈরি। গায়ে নীল রঙা হাতকাটা শাল, মাথার চুল খোঁপা করা, হাতে নোটবুক আর একটা পেন। “চলো,” সে বলল, “আজ আমরা যাব এমন এক জায়গায়, যেখানে চায়ের পাতার নীচে লুকিয়ে আছে এক বিদ্রোহ, এক প্রেম, আর হয়তো তোমার প্রশ্নের উত্তর।”

গাড়ি চলল। চারপাশের রাস্তা যেন জেগে উঠেছে সকালবেলায়। রাস্তার ধারে কুয়াশা ভেদ করে দেখা যাচ্ছে নরম রোদে ধোয়া চা-বাগান। পাতা তোলা শুরু হয়ে গেছে। ঘাড় নিচু করে ছিপছিপে মেয়েরা, তাদের মাথায় বাঁশের ঝুড়ি। কেউ কেউ হাসছে, কেউ গান গাইছে—একটা মিহি, পাহাড়ি সুর।

“ওরা কী গান গাইছে?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।

নয়নিকা বলল, “এটা একটা পুরোনো চা-বাগানের মেয়ে বিদ্রোহীদের গান। কথাগুলো এরকম—
‘পিঁপড়ের মতো তুলি পাতা,
কিন্তু নাম তো কেউ জানে না।
আমরা কুয়াশার কন্যারা,
ঘ্রাণে রাখি ভালোবাসা।’”

রুদ্র শুনে থমকে গেল। মনে হল যেন এই গান তার কানে বহুদিন আগে কেউ গেয়েছিল—অথচ মনে করতে পারছিল না কে।

গাড়ি একসময় ঢুকল ‘মুর্মু টি এস্টেট’-এর ভেতরে। বিরাট চা-বাগান, তার ঠিক মাঝে এক বিশাল পুরোনো প্রসেসিং ইউনিট, যার ইটগুলো কেমন লালচে ধাতব রঙের হয়ে আছে—সময়ে ক্ষয়ে যাওয়া এক সাক্ষ্য যেন। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল, কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছেন, কেউ কেউ বাঁশ দিয়ে পাতাগুলো মাড়িয়ে নিচ্ছেন।

“এই ইউনিটটা ১৮৯৭ সালে তৈরি,” নয়নিকা বলল। “তখন ব্রিটিশরা এই বাগানের নাম দিয়েছিল ‘ডেল্টন প্ল্যান্টেশন’। মুর্মু পরিবার পরে এটি কিনে নেয়, কিন্তু পুরোনো স্মৃতি মুছে যায়নি।”

তারা ভেতরে ঢুকল। ধাতব গন্ধ, পুরোনো কাঠের মেঝে, দেওয়ালে কিছু বিবর্ণ ছবি—চা তৈরির প্রথম প্রক্রিয়া, হাতে লেখা কিছু নোট, আর একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছেঁড়া পুঁথি। নয়নিকা এগিয়ে গিয়ে সেই পুঁথির নিচে আঙুল রেখে বলল, “এটা হলো জয়নাব মুর্মুর চিঠি। তিনি এই ইউনিটের প্রথম স্থানীয় ম্যানেজার ছিলেন। কিন্তু তার পরিচয় এত সহজ ছিল না।”

“মানে?”

“তিনি ছিলেন এক চা শ্রমিকের মেয়ে। তাঁর মা ছিল একজন পাতার রক্ষক—তাদের কাজ ছিল বিশেষ মানের পাতার রেকর্ড রাখা। একদিন ব্রিটিশ সাহেবদের কাছে সেই নারী দাবি করেন—নারীরা শুধু শ্রমিক নয়, মাটির গল্প বোঝে। তাঁরা নিজের মতো চা বানাতে চায়। সাহেবরা হাসে। আর তখন থেকেই শুরু হয় এক গোপন আন্দোলন—নারীদের ‘অ্যাণ্ডারগ্রাউন্ড টি ব্লেন্ড’ বানানো।”

“এ তো রীতিমতো গুপ্তচর কাহিনি!” রুদ্র হেসে বলে উঠল।

“ঠিক তাই। কিন্তু এই ব্লেন্ড কেউ কোনোদিন খায়নি। কারণ সেই চা ‘ভুলে যাওয়ার চা’—পান করলেই মানুষ পুরোনো কথা ভুলে যেত। তাই বলা হত, এই চা শুধু বিদ্রোহের নয়, এক প্রতিজ্ঞার প্রতীক।”

রুদ্র ভাবল, চা কীভাবে এত গল্পের বাহক হয়ে উঠতে পারে? এক কাপ চা তো তার কাছে কেবল আরাম বা স্বাদ ছিল—এমন ইতিহাস ও কখনো ভাবেনি।

তারা ইউনিটের পাশের এক পুরোনো ঘরে ঢুকল। সেখানে একটা কাঠের টেবিল, পেছনে লোহার আলমারি আর মেঝেতে কিছু বাক্স। নয়নিকা একটা বাক্স খুলল, ভেতর থেকে বার করল একটা কাঠের সিন্দুক। খুলতেই বেরোল কিছু পুরোনো চিঠি, আর একটা ছবি।

রুদ্র সেই ছবিটা হাতে নিল। তিনজন নারী—দুইজন হাসছেন, আর মাঝখানে এক বৃদ্ধা, যার চোখের মধ্যে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা। ছবির পেছনে লেখা ছিল—“চুম্বনা, তার মা আর পত্রলেখা।”

“চুম্বনা? এ কি তোমার মা?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ,” নয়নিকা হেসে বলল, “আর মাঝখানে যিনি, তিনি ছিলেন পত্রলেখা, তোমার ঠাকুমা।”

রুদ্রের চোখ বিস্ফারিত। “তুমি কী বলছ? এটা কি নিশ্চিত?”

“তোমার কৌটো দেখে আমি বুঝেছিলাম। আমার মা বলত, পত্রলেখা ছিলেন এক ‘চায়ের সন্ন্যাসিনী’। তিনি চা তৈরি করতেন নিজের ছন্দে, কারও বাধা মানতেন না। আর তিনি একদিন হঠাৎ হারিয়ে যান।”

“তাহলে… উনি আমার ঠাকুমা? কিন্তু আমরা কিছু জানি না! শুধু জানতাম তিনি চা ভালোবাসতেন, নিজের ঘরে একটা কৌটো রাখতেন।”

“এই কৌটোই ছিল তাঁর ‘শেষ ব্লেন্ড’—যেটা তিনি একা বানিয়েছিলেন। তার নাম ছিল—‘তৃতীয় স্বাদ’। এর কোনো কেমিক্যাল ফর্মুলা নেই, শুধু অনুভব। একবার চুমুক দিলেই তুমি বুঝবে—কোন কথা বলা হয়নি।”

রুদ্র কিছু বলল না। তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন চলছিল। যেন তার শিরায় প্রবাহিত হচ্ছে চায়ের পাতার স্মৃতি। সে অনুভব করছিল, তার ভেতরে কোথাও জমে থাকা বহু বছরের ঘ্রাণ জেগে উঠছে।

“আমার ঠাকুমা কি আর কখনও এখানে ফিরেছিলেন?” ধীরে ধীরে সে জিজ্ঞেস করল।

নয়নিকা বলল, “১৯৭৫ সালে একদিন একজন বয়স্কা মহিলা এসেছিলেন বাংলোর বারান্দায়। বলেছিলেন—‘এক কাপ তৃতীয় স্বাদ চাই।’ কিন্তু কেউ চিনতে পারেনি। তিনি চুপচাপ একটা চিঠি রেখে গিয়েছিলেন—সেই চিঠিই এখন ঐ সিন্দুকে আছে।”

রুদ্র সেই চিঠিটা হাতে নিল। কাগজ ঝুরঝুরে, লেখাগুলো ধূসর হয়ে গেছে, কিন্তু কয়েকটি শব্দ স্পষ্ট—
“যদি কেউ এই পাতার নিচে পৌঁছায়, জেনে নিও, আমি অপেক্ষা করেছিলাম।
আমি শুধু চা চাষ করিনি, এক স্বপ্নের বীজ রেখেছিলাম মাটির গভীরে।
আমার নাম পত্রলেখা, আমি ফিরে আসব এক কাপ চায়ের মধ্যে…”

রুদ্র চিঠিটা বুকের কাছে টেনে ধরল। তার ঠাকুমা ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি। এখন, এত বছর পর, সে এসে বুঝতে পারছে।

“আমি এখন বুঝতে পারছি,” সে বলল, “এই ট্যুরটা শুধু পর্যটন নয়, এক স্মৃতির যাত্রা। আমি যেন নিজের পূর্বপুরুষদের গন্ধ খুঁজতে এসেছি। আর তুমি, নয়নিকা, তুমি তো আমার গাইড নও, তুমি তো… একটা সেতু।”

নয়নিকা হাসল। হালকা হাওয়ায় তার শালের আঁচল উড়ে গেল। “স্মৃতি ফিরে আসে রুদ্র, শুধু তার জন্য শোনার কান আর খোলা মন দরকার। তুমি হয়তো সেই প্রথম লোক, যে সত্যি শুনতে এসেছ।”

চা-বাগানের পাতা বাতাসে দুলছিল। সূর্য ওঠার আলোয় তারা ঝিলমিল করছিল, যেন এক অদ্ভুত ভাষায় বলছে—”আমরা ছিলাম, আছি, থাকব… এক চুমুকে।”

পর্ব ৪: তৃতীয় স্বাদের খোঁজে

রাত্রে ফিরে এসে রুদ্র একটুও ঘুমোতে পারল না। বারান্দায় বসে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছিল তার মাথায়। সে কী সত্যিই এসে পৌঁছেছে তার ঠাকুমার স্মৃতির কাছে? না কি এই সবই একটা সাজানো কাহিনি? কিন্তু ছবিটা? সেই চিঠিটা? সবই তো প্রমাণ। আর নয়নিকার চোখের ভাষা মিথ্যে হতে পারে না।

সে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিল—আগামীকাল সে চা বানাবে। সে চায় সেই ‘তৃতীয় স্বাদ’কে অনুভব করতে। নয়নিকার কথায়, সেই স্বাদে লুকিয়ে আছে কিছু না বলা কথা, কিছু অপরিচিত আবেগ। কিন্তু কীভাবে সে তৈরি করবে এই চা? কোনো রেসিপি নেই, কোনো পদ্ধতি নেই। শুধু একটা ইঙ্গিত—এক কাপ চা, যার স্বাদ কথা বলে।

পরদিন সকালে নয়নিকা জানাল, আজ তারা যাবে পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট বাগানে—‘অরুণোদয়’। এই বাগানটা সকালের আলোতেই কাজ করে, দুপুরের পর বন্ধ হয়ে যায়। ওখানকার পাতার স্বাদ সবচেয়ে বেশি খাঁটি বলে বিশ্বাস।

গাড়ি যখন পাহাড় বেয়ে উঠছিল, চারপাশে দেখা যাচ্ছিল ঘন কুয়াশা আর তার ফাঁকে ফাঁকে চা গাছের সারি। নয়নিকা জানাল, এই বাগান একসময় একটা আশ্রম ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে, কিছু সন্ন্যাসী এখানে বসবাস করতেন। পরে স্থানীয়রা এখানে চা চাষ শুরু করে। চায়ের সঙ্গে ধ্যান, প্রার্থনা আর রাত্রিকালের মন্ত্র জড়িয়ে গিয়েছিল। এখনো অনেক চা-পাতা সংগ্রহের আগে বাগানের শ্রমিকেরা প্রার্থনা করে।

“তোমার ঠাকুমা এখানে এসেছিলেন একবার,” নয়নিকা বলল। “তিনি এই বাগানের এক নারী সাধিকার কাছ থেকে একটি বিশেষ ফুল পেয়েছিলেন—‘শ্বেতকামিনী’। সেই ফুল নাকি চায়ের পাতার সঙ্গে মেশালে এক অদ্ভুত সুগন্ধ দেয়, যা কোনো রকমে বোঝা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।”

“তাহলে আমাদের সেই ফুল খুঁজতে হবে,” রুদ্র উত্তেজনায় বলল।

“খুঁজে পেতে গেলে সময় লাগে। এই বাগানে কেউ জোর করে কিছু নেয় না। যা পাওয়ার, সেটা আপনিই আসে,” নয়নিকা শান্ত গলায় বলল।

তারা বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ল। পাতাগুলো যেন চকচক করছিল ভোরের রোদের আলোর নিচে। রুদ্র এক জায়গায় থেমে পাতার ওপর হাত রাখল। নরম, স্নিগ্ধ, যেন কারও শ্বাস নিচ্ছে ধীরে ধীরে। নয়নিকা বলল, “এই চায়ের পাতাগুলো কোনোদিন কাঁটা হয় না। শুধু মাটির গন্ধে, সময়ের ছন্দে যখন তারা নত হয়, তখনি তোলা হয়।”

তারা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাল একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরের সামনে। বাইরে কাঠের বোর্ডে লেখা—‘স্মৃতির গন্ধ যখন চায়ের ভাপে মিশে যায়, তখন জন্ম হয় তৃতীয় স্বাদ।’
ভেতরে বসেছিলেন এক বৃদ্ধা, চোখ বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন। মাথায় সাদা চুলের জটা, পরনে কাঁচা সাদা শাড়ি, হাতে একটা কাঠের কাঠি। নয়নিকা ধীরে গিয়ে তার সামনে বসে বলল, “মা, উনি এসেছেন ‘তৃতীয় স্বাদের খোঁজে’। উনি পত্রলেখার নাতি।”

বৃদ্ধা চোখ খুললেন। তার চোখ দুটি গভীর, স্থির, যেন পাহাড়ের নীরবতা। তিনি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি যে চায়ের খোঁজে এসেছ, তা তুমি কি সত্যিই বুঝেছ?”

রুদ্র মাথা নোয়াল। “না মা, আমি জানি না। শুধু অনুভব করছি… কিছু ডাকছে।”

বৃদ্ধা ধীরে উঠে গিয়ে এক চ্যাংড়া কাঠের বাক্স থেকে একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি বের করলেন। শিশির মধ্যে ছিল শুকনো ফুল—হালকা সাদা, গোলাপি আভায় মিশে। “এই হলো শ্বেতকামিনী। এটি একবারই ফুটে, আর তারপরে হারিয়ে যায়। এর গন্ধ দিয়ে চায়ের পাতার স্মৃতি জাগে।”

রুদ্র শিশিটা হাতে নিয়ে গন্ধ নিল। হঠাৎ যেন তার মনে পড়ল এক পুরোনো দুপুর—ঠাকুমা তখন বারান্দায় বসে চা বানাচ্ছেন, গরম জলে পাতার গন্ধ উঠছে, আর পেছনের ঘরে বেজে চলেছে কোনো রেডিও নাটক। সে বুঝতে পারছিল না, স্মৃতিটা তার নিজের নাকি ঠাকুমার হয়ে তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে।

বৃদ্ধা বললেন, “তৃতীয় স্বাদ তৈরি করতে হলে শুধু পাতা আর ফুল নয়, দরকার একটা অনুভব—একটা না বলা কথা, একটা অপেক্ষার স্মৃতি। তুমি যদি চাও, আমি তোমায় বানাতে শিখিয়ে দিতে পারি। তবে এক শর্তে।”

“কী শর্ত?”

“তুমি চা বানিয়ে নিজে খেতে পারবে না। অন্য কাউকে খাওয়াতে হবে, যে তোমার জীবনের ভেতরের অর্ধেক কথা জানে, কিন্তু তাকে কোনোদিন বলা হয়নি।”

রুদ্র চমকে উঠল। তার মুখে একটাই নাম এল—নয়নিকা।
সে কিছু না বলে চোখ ফেরাল, আর বৃদ্ধা হেসে বললেন, “তুমি তো জানো কে হবে সে।”

সেদিন বিকেলে তারা ফিরে এল বাংলোয়। নয়নিকা কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু বলল, “কাল ভোরে চলবে আমরা কুন্দবনির দিকে—ওইখানে রয়েছে এক পরিত্যক্ত চা ঘর, যেখানে প্রথম এই ফুল দিয়ে চা বানানো হয়েছিল।”

রুদ্র নিজের ঘরে গিয়ে শিশিটা রাখল সেই কৌটোতে, ঠাকুমার শেষ উপহার। তারপর জানালার পাশে বসে ভাবতে লাগল—এই যাত্রা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। সরকারি ফাইলের বদলে জমছে একেকটা চিঠি, ক্যামেরার বদলে খুলছে অনুভূতির জানালা।
এবার তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন—যে স্বাদ কথা বলে না, তা কি সত্যিই বলে?

পর্ব ৫: কুন্দবনির নিঃশব্দ চা

ভোর চারটেয় নয়নিকা দরজায় কড়া নাড়তেই রুদ্র জেগে উঠল। বাইরে অন্ধকার, কিন্তু আকাশের গায়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে গেরুয়া আভা। রুদ্র প্রস্তুত ছিল। ব্যাগে ক্যামেরা, সেই পুরোনো কৌটো, আর একটি খালি নোটবুক। মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল—আজ সে যাবে ‘কুন্দবনি’, সেই পরিত্যক্ত চা ঘরে, যেখানে শ্বেতকামিনী ফুল দিয়ে প্রথমবার বানানো হয়েছিল এক জাদুকরী চা।

“আমরা কি একা যাচ্ছি?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।

“না,” নয়নিকা বলল, “আরও একজন আসছেন। তিনি আমাদের ওখানে পথ দেখাবেন। ওনার নাম শশী মিস্ত্রি। উনি আগে কুন্দবনির দেখভাল করতেন, এখন থাকেন এক পাহাড়ি গ্রামে। বয়স হয়েছে, হাঁটা ধীর, কিন্তু স্মৃতি তীক্ষ্ণ।”

গাড়ি ছোটো ছোটো পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে চলছিল। পাইন গাছের সারি, মাঝে মাঝে ঝরনার শব্দ, আর সেই নিরবতা—যা শহরের কোনো ঘুমন্ত রাতেও পাওয়া যায় না। রুদ্র জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “জানো, আমি যখন ছোট ছিলাম, চা মানেই ছিল ঠাকুমার রান্নাঘরের সেই মুঠো গন্ধ। এখন দেখছি, একেক পাতা একেক জীবন খুলে দিচ্ছে।”

নয়নিকা হেসে বলল, “তুমি চায়ের শব্দ শুনতে শিখে গেছ।”

“কী বললে?”

“হ্যাঁ, চায়ের পাতা শব্দ করে না ঠিক, কিন্তু তার ভেতরে থাকা গল্পেরা গুঞ্জন তোলে। যারা মন দিয়ে শুনতে পারে, তারাই সেই গুঞ্জনে প্রবেশ করতে পারে।”

কুন্দবনিতে পৌঁছাতে ঘণ্টাখানেক লাগল। তারা নামতেই দেখতে পেল এক বৃদ্ধ হেঁটে আসছেন লাঠি ভর করে। মাথায় টোপর, গায়ে জর্জেটের পুরোনো সোয়েটার, আর মুখে ফেলে রাখা গালভরা দাড়ি।

“আপনারাই কি রুদ্রবাবু?”
“হ্যাঁ, আপনি শশী মিস্ত্রি?”

“হুঁ… আমি একসময় পাতার পাহারাদার ছিলাম। এখন স্মৃতির পাহারাদার। চলুন, আপনাদের নিয়ে চলি সেই ঘরের দিকে, যেখানে প্রথম শ্বেতকামিনী ফুটেছিল।”

তারা তিনজন হাঁটতে শুরু করল পাহাড়ি ঢালে, ছোটো ছোটো গাছ, কচি পাতা, আর তার মাঝে মাঝে শীতের কুয়াশা। রুদ্র যেন নিজেকে কোনো অলীক যাত্রায় ভাবছিল। এ কি আদৌ বাস্তব? এক সরকারি প্রজেক্ট কভার করতে এসে সে কি এখন তার নিজের অতীতের খোঁজে ঘুরছে?

পাহাড়ের গা ঘেঁষে একটা কাঠের ঘর। জানালার কাঁচ ভাঙা, দরজা খোলা, ভেতরে শুধু ধুলোর স্তর। অথচ সেখানে পা রাখতেই রুদ্রর মনে হলো, কোনো সুগন্ধ বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে—মিশ্র কিছু: কাঁচা পাতা, শুকনো ফুল, আর ধূপের গন্ধ।

“এই ঘরেই এক সন্ধ্যায় পত্রলেখা দেবী বানিয়েছিলেন তাঁর শেষ চা,” শশী মিস্ত্রি বললেন।

“তাঁর প্রথম স্বাদ ছিল আগুনের মতো, দ্বিতীয়টা ছিল চোখের জল… আর তৃতীয় স্বাদ? সেটা বানানোর পর তিনি আর কাউকে দেখাননি। শুধু বলেছিলেন, ‘এ এক সম্পর্কহীন ভালোবাসা।’”

নয়নিকা তখন ঘরের কোণে একটা ছোটো পাথরের থালা পরিষ্কার করছিল। তারপর বলল, “তুমি তৈরি তো?”

রুদ্র মাথা নাড়ল। শশী মিস্ত্রি একটা শুকনো কাঠের স্টোভ জ্বালাল। নয়নিকা তুলে আনল একটা মাটির হাঁড়ি, কিছু শুকনো পাতা আর শ্বেতকামিনীর পাপড়ি।

“এই চা বানানোর নিয়ম শুধু একটাই—যা বলো না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,” নয়নিকা বলল।

রুদ্র পাতাগুলো হাতে নিয়ে মৃদু করে গন্ধ নিল। পাতার মধ্যে ছিল একধরনের গরম আশ্চর্য ঘ্রাণ—যেন কৈশোরে ফেলে আসা প্রেমপত্রের ভাঁজে থাকা আতরের ছাপ। সে হালকা করে জল গরম করল, তারপরে ধীরে ধীরে পাতা ফোটাতে লাগল। নয়নিকা তখন পাশ থেকে একটানা বলে চলছিল—“মনে রেখো, এটা শুধু চা নয়, এটা একটা অভিজ্ঞতা। এটা নিজে খাবা না—আমার দিকে এগিয়ে দেবে।”

রুদ্র মাথা নিচু করল। মনে মনে বলল, এই চুমুকে আমি ঠাকুমাকে ফিরিয়ে আনছি। এই ঘ্রাণে আমি হারিয়ে যাওয়া কথাগুলোকে টেনে আনছি।

চা তৈরি হয়ে গেল। হালকা রঙের, প্রায় জলীয়, কিন্তু গন্ধে অদ্ভুত গভীরতা। সে কাপটা ধরে নয়নিকার দিকে বাড়াল। নয়নিকা একবার তাকাল তার চোখের দিকে—সেখানে ছিল হাজারটা অপ্রকাশিত কথা।

চা খেয়ে সে চুপ করে বসে রইল মিনিটখানেক। তারপর বলল, “তুমি জানো, এই কাপটা যেন আমাকে কিছু শুনিয়ে গেল—একটা আকাশ, যেখানে কেউ কাউকে না বলেই ভালোবেসেছিল।”

রুদ্র তখন জানত না—এই মুহূর্তটা তাকে বদলে দিচ্ছে। একটা কাপ, একটা ফুল, আর এক চা বানানো ঘটনার মধ্যে সে হারিয়ে ফেলেছে তার সাংবাদিক সত্তা। এখন সে আর কোনো ‘স্টোরি কাভার’ করছে না, সে নিজেই হয়ে উঠেছে গল্পের একটা পাতা।

শশী মিস্ত্রি একটা ছোট বাক্স রুদ্রর হাতে দিলেন। “এটা পত্রলেখা তোমার জন্য রেখে গিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন, যখন কেউ ঠিকভাবে সেই চা বানাতে পারবে, তখন এটা তাকে দিও।”

রুদ্র বাক্সটা খুলল। ভেতরে একটি চিঠি, আর তার নিচে একটি শুকনো চা ফুল—অন্য রকম, গোলাপি রঙের। চিঠিতে লেখা ছিল—
“আমি জানতাম, তুই একদিন আসবি। আমার চায়ের ঘ্রাণ তোকে ডাকবে। এই ফুলটা দিয়ে তুই বানাস ‘চতুর্থ স্বাদ’। ওর নাম আমি দিইনি—তুই দিস। হয়তো তুই সেই প্রথম মানুষ, যে ভালোবাসা ছুঁয়েও কিছু না বলে ফিরে যাবে। তাতেই হয়তো জন্ম নেবে এক নতুন সম্পর্ক।
—তোর পত্রলেখা ঠাকুমা।”

রুদ্রর চোখ ঝাপসা হয়ে এল। নয়নিকা তার পাশে বসে হাত ধরল। দু’জনেই জানত—এই যাত্রা শেষ নয়, বরং শুরু।

পর্ব ৬: চতুর্থ স্বাদের নাম

সন্ধে হয়ে এসেছে। কুন্দবনির সেই পুরনো চা ঘরে হালকা অন্ধকার নেমেছে, কিন্তু তার মাঝেও আলো যেন থেকে যাচ্ছে—চায়ের ঘ্রাণে, শব্দহীন কথোপকথনে, আর দু’জন মানুষের চোখে জমে থাকা অসমাপ্ত অনুভবে। রুদ্র সেই গোলাপি চা ফুলটা হাতে নিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। এই ফুল নাকি শুধু একবার ফোটে, আর তারপর চায়ের মধ্যে মিশে গিয়ে তার নিজস্বতা হারিয়ে দেয়। অথচ সেই হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই জন্ম নেয় নতুন কিছু—একটা নতুন স্বাদ, একটা নতুন ভাষা।

“তুমি কিছু বলছ না,” নয়নিকা নরম গলায় বলল।

“কি বলব?” রুদ্র ধীরে বলল। “এই ফুলটা আমার ঠাকুমা রেখে গিয়েছেন, কিন্তু তার নাম আমি দিতে পারি—ওই চিঠিতে লেখা আছে। আমি ভয় পাচ্ছি, নয়নিকা। একটা নাম দিয়ে ফেললেই তো সব স্থির হয়ে যায়। একরকম দায় তৈরি হয়, জানো?”

নয়নিকা একটু হেসে বলল, “নাম শুধু স্থিরতা নয়, কখনো কখনো তা মুক্তিও দেয়। তুমি হয়তো জানো না, এই চা বাগানে অনেক নারী আছে, যারা নিজেরা নিজেদের নতুন নাম দিয়েছে—তাদের স্বামীরা দিয়ে গিয়েছিল অন্য নামে, গ্রামের সমাজ দিয়েছিল আরও এক নাম, কিন্তু ওরা নিজেরাই বেছে নিয়েছে নিজেদের পরিচয়।”

রুদ্র উঠে দাঁড়াল। সে বাইরে বেরিয়ে এল ঘরের বারান্দায়। দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গা বেয়ে নামা কুয়াশা, যেন কেউ ধীরে ধীরে সাদা শাড়ি পরে হেঁটে আসছে। তার মনে পড়ল পত্রলেখার চিঠির লাইন—“তুই হয়তো সেই প্রথম মানুষ, যে ভালোবাসা ছুঁয়েও কিছু না বলে ফিরে যাবে…”

সে জানে, নয়নিকা এখন ঘরের ভেতরে বসে আছে। তার চোখ হয়তো জলমাখা, হয়তো নয়। কিন্তু তাদের দুজনের মধ্যে কিছু একটা বদলেছে। সেই ‘তৃতীয় স্বাদ’—যেটা কথা বলে না, শুধু অনুভব—সেই অনুভব তাদের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

রুদ্র সেই চা ফুলটা হাতে নিয়ে বলল, “আমি যদি নাম দিই, তবে সেটা হবে… নির্বাক চুম্বন।”

নয়নিকা তখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। “কেন এই নাম?”

“কারণ এই চা সেই অনুভব, যা চিৎকার করে না, কিন্তু প্রতিদিন বুকের ভেতরে বাজে। একটা সম্পর্ক, যেটা নামহীন, অথচ গভীর। তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক যেমন… কোথাও কোনো স্পষ্ট উচ্চারণ নেই, কিন্তু একটা শব্দহীন ভাষা তৈরি হয়েছে।”

নয়নিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তাহলে আজ রাতেই তৈরি কর এই চা। আমি খেতে চাই সেই স্বাদ, যেটা তুমি নিজে নাম দিয়েছ।”

শশী মিস্ত্রি তখন দরজায় এসে দাঁড়ালেন। “চা বানানোর সময় এসেছে। কিন্তু মনে রেখো, এই চা বানাতে গেলে তোমার নিজের একটা কথা দিতে হবে। এমন কিছু, যা তুমি আজ পর্যন্ত কাউকে করোনি।”

রুদ্র মাথা নিচু করল। তারপর ধীরে বলল, “আমি একটা কথা আজ স্বীকার করতে চাই… আমি কখনোই আমার ঠাকুমাকে গুরুত্ব দিয়ে চিনিনি। তাঁকে সবসময়ই এক রহস্যময় বয়স্কা বলে ভেবেছি, যিনি শুধুই চা বানান। কিন্তু এখন বুঝেছি, তাঁর হাতের পাতায় ছিল সময়ের ভাষা। আমি চাই, আজ তাঁর আত্মাকে এই চায়ের মধ্যে দিয়ে একটা চুম্বন পাঠাই।”

নয়নিকা হালকা করে তার হাতে ছুঁয়ে দিল। “তাহলে বানাও। আমি আজ অপেক্ষায় থাকব।”

রুদ্র সেই গোলাপি ফুলটাকে আলতো করে ফোটানো জলে ছাড়ল। জলটা রং বদলাতে শুরু করল—হালকা লাল, তারপরে ধীরে ধীরে একধরনের ম্লান গোলাপি। পাতা ছড়াল নিজের মতো করে, আর তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরের প্রতিটি কোণে। বাতাসে যেন গাওয়া হতে লাগল কোনো গান—যার কথা কেউ জানে না, শুধু তার সুর থেকে যায়।

চা বানিয়ে সে এক কাপ হাতে নিয়ে নয়নিকাকে এগিয়ে দিল। নয়নিকা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করল। চুমুক দিতে গিয়েও থেমে গেল একবার, তারপর ধীরে চা ঠোঁটে ছুঁইয়ে বলল, “এই চা আমাকে নিয়ে গেল একটা মাঠে… যেখানে কুয়াশায় ভিজে দাঁড়িয়ে আছি আমি, আর সামনে দাঁড়িয়ে এক লোক, তার মুখ অস্পষ্ট। সে কিছু বলছে না, আমি শুনতে পাচ্ছি না, তবু বুঝতে পারছি… সে আমায় ভালোবাসে।”

রুদ্র চুপ করে শুনছিল। নয়নিকা আবার বলল, “এই চা আমাকে সেই জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কিন্তু অপেক্ষা আছে। যেখানে না বলাটাই সবথেকে বেশি বলা।”

রুদ্র এবার ধীরে বলল, “এই চুম্বন শব্দহীন… কারণ এই ভালোবাসা কারও কিছু ছিনিয়ে নেয় না, কেবল পাশে থাকে।”

তারা দুজনেই জানত, আজ রাতে তারা ঘুমোবে না। পাহাড়ের বাতাসে, চায়ের সুগন্ধে, আর ঠাকুমার রেখে যাওয়া ফুলের ঐশ্বর্যে, তারা দুজনে নতুন এক অধ্যায়ের মুখোমুখি।
কোনো বাঁধন নয়, কোনো সামাজিক সংজ্ঞা নয়, কেবল দুটো মানুষ… যারা একই চায়ের ভাপে নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে।

রুদ্র তখন নিজের নোটবুক খুলল। প্রথম পাতায় লিখল—
“চতুর্থ স্বাদ—নির্বাক চুম্বন।
এক কাপ চা, যা কোনো কথার চেয়ে বেশি বলে।
যার তাপে চোখ ভিজে যায়, অথচ জ্বলে না।
যার ঘ্রাণ মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা সবসময় মুখে বলে না, অনেকসময় শুধু পাশে বসে থাকে। নিঃশব্দে।”

পর্ব ৭: পাতার পেছনের মুখগুলো

পরদিন ভোরে, পাহাড়ের কোলে পাখির ডাকের মধ্য দিয়ে নয়নিকার গলা ভেসে এল, “তুমি কি তৈরি?”
রুদ্র চোখ মেলল। সে বুঝে গেল, এই যাত্রা এখন আর তার একার নয়। এই যাত্রা একটা সম্পর্কের, একটা উত্তরাধিকার খোঁজার, আর একটা নতুন সত্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াবার।

আজ তারা যাবে পাহাড়ের এক অচেনা দিকে—নয়নিকার শিকড়ের গ্রামে। একটা জায়গা যেখানে চা-পাতার নিচে লুকিয়ে আছে না বলা নাম, চাপা ইতিহাস, মুখবিহীন মানুষদের কথা। জায়গাটার নাম বেতোঝাড়ি—যেখানে একসময় আদিবাসী নারী শ্রমিকদের জন্য একটা ছোট্ট চা গবেষণাগার ছিল, সম্পূর্ণ স্থানীয় উদ্যোগে।
নয়নিকার মা, চুম্বনা, সেখানকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আর পত্রলেখা, রুদ্রর ঠাকুমা, ছিলেন নেপথ্য নির্দেশক।

রাস্তা ছিল এবড়ো-খেবড়ো, মাঝেমাঝে গাছের ছায়ায় ঢেকে থাকা। রুদ্র জানালার কাঁচ খুলে দিল—বাতাসে আজ অন্যরকম ঘ্রাণ। কাঁচা মাটি, কুয়াশায় ভেজা গাছ, আর একদম হালকা সুগন্ধ, যেন পুরোনো কাগজে লেখা চিঠির মতো।

নয়নিকা চুপ করে বসে ছিল। রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি আজ কথা বলছ না কেন?”

“কারণ আজকের দিনটা কোনো গাইডের নয়। আজ আমি শুধু একজন মেয়ে, যে তার মায়ের মুখ খুঁজতে চলেছে। আর তুমি একজন নাতি, যে তার ঠাকুমার ছায়াকে ধরতে চাইছ। এই যাত্রায় আমাদের দুজনের মুখ একইরকম নিঃশব্দ।”

তারা যখন বেতোঝাড়ি পৌঁছাল, তখন বেলা প্রায় এগারোটা। সূর্য কড়া রোদের চেয়ে মিঠে আলো ঢালছিল। ছোট ছোট টিনের ছাউনি ঘর, বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কাঠের গেট। তার গায়ে লেখা—“পাতার পেছনে মুখ, মুখের পেছনে ইতিহাস।”
ঘরের ভেতরে গিয়েই তারা দেখতে পেল এক বৃদ্ধা মাটি ছাঁকছেন, আর পাশে একটা চা শুকানোর ট্রে রাখা।
“মা,” নয়নিকা ধীরে বলল।

বৃদ্ধা মুখ তুললেন। চুল পুরো সাদা, চোখে ভারি চশমা, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
“চুম্বনা?” তিনি একটু ঝুঁকে এসে নয়নিকার গাল ছুঁয়ে বললেন, “তুই এসেছিস?”

“না মা, আমি নয়নিকা… চুম্বনার মেয়ে।”

বৃদ্ধার মুখে নেমে এল অদ্ভুত আলো-আঁধারি। তিনি যেন কিছু একটা মনে করতে গিয়ে থেমে গেলেন। তারপর ধীরে মাথা নাড়লেন।
“চুম্বনা ছিল বাতাসের মতো, ধরা যেত না। সে সবসময় চাইত নিজেকে দিয়ে অন্যদের চা বানাতে শিখিয়ে দিতে।”

নয়নিকা বলল, “এনি মাসি, আপনি কি আমার মাকে চিনতেন?”

“চিনতাম। পত্রলেখা আর চুম্বনা—তারা দু’জন মিলে একটা বিশেষ চা বানিয়েছিল একবার। নাম ছিল ‘পাতার আত্মজ’। সেই চা কেউ বিক্রি করেনি, শুধু মাটিতে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। কারণ তারা বিশ্বাস করত, কিছু কিছু স্বাদ শুধুই পৃথিবীর জন্য, মানুষের জিভের জন্য নয়।”

রুদ্র প্রথমবার সেই নাম শুনল—‘পাতার আত্মজ’। একটা চা, যা কেউ খায়নি, কেউ চুমুক দেয়নি, শুধু মাটিতে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল পৃথিবীর সুরক্ষায়।

এনি মাসি একটা কাঠের আলমারি খুলে একটা পুরোনো নথিপত্র বের করলেন। তার মধ্যে ছিল কিছু হাতে লেখা পাতা, কিছু পুরোনো রেসিপি, আর একটি ছোট পুঁটলি।

পুঁটলি খুলতেই বের হল সাদা পাতায় মোড়া এক মিনি চা কেক। রুদ্র অবাক হয়ে তাকাল।

“এটাই সেই চা,” এনি বললেন। “তোমার ঠাকুমা এই একটুকরো রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যদি কোনোদিন তার বংশধর এসে এই জায়গায় পা রাখে, তখন এটা তার হাতে তুলে দিতে।”

রুদ্র কাঁপা হাতে চা কেকটা হাতে নিল। মনে হচ্ছিল, তার আঙুলের ছোঁয়ায় সেই চায়ের ভেতরে থাকা অতীতের শব্দগুলো কেঁপে উঠছে।

নয়নিকা তখন বলল, “আমি একটা সত্যি জানতে চাই, এনি মাসি। আমার মা হঠাৎ করে কেন এই জগত থেকে সরে গেলেন?”

এনি একটু চুপ করে থাকলেন, তারপর বললেন, “কারণ এক রাতে, কেউ এসে বলেছিল—তুমি যা বানাও, সেটা বাজারে বেচার নয়। এটা মানুষের কল্পনা বদলে দিতে পারে, স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে পারে, এমনকি ভুলেও যেতে দিতে পারে। সেই ক্ষমতা ব্যবসার জন্য নয়। তোমার মা সেই ভয় পেয়েছিলেন। তিনি চুপ করে চলে গিয়েছিলেন। আর ফিরে আসেননি।”

নয়নিকার চোখে জল এসে গেল। “আমি শুধু জানতে চাই, তিনি কোথায় আছেন?”

“সে উত্তর আমি জানি না। তবে একটা কথা মনে রাখিস—মায়ের তৈরি চায়ের ঘ্রাণ শুধু মাটিতে থাকে না, মেয়ের শরীরেও জমে। তুই চাইলে সেই গন্ধ টেনে আনতে পারবি।”

রুদ্র এই কথাগুলো শুনে ভাবছিল—এই চা, এই গল্প, এই মানুষগুলো, সবাই একেকটা স্তব্ধ সংগীতের মতো। তারা চেঁচায় না, জোর করে কিছু প্রমাণ করে না, কিন্তু একবার মন দিয়ে শোনো—তাহলেই শুনতে পাবে তাদের গলার ভাঙা ভাঙা সুর।

এনি মাসি এক কাপ হালকা লালচে চা বানিয়ে তিনজনকে দিলেন। চায়ের নাম ছিল ‘পাহাড়ি ধ্বনি’। রুদ্র এক চুমুক দিতেই বুঝল, এই চায়ের স্বাদ চিনি বা পাতায় নেই, আছে সময়ের গন্ধে, স্পর্শের ভাষায়।

“তোমার ঠাকুমা বলতেন,” এনি মাসি মৃদু হেসে বললেন, “একটা ভালো চা কখনোই কেবল চা থাকে না। সেটা একটা চিঠি হয়ে যায়, একটা স্বপ্ন হয়ে যায়, বা একটাই না বলা কথা হয়ে থাকে কোনো শেষ বিকেলের আলোয়।”

রুদ্র মনে মনে বলল, আমার লেখার কাজ শেষ হয়নি। এই চায়ের পেছনের মুখগুলোকে কেবল ডকুমেন্টারি করলেই হবে না, তাদের কথা আমায় লিখে যেতে হবে এমনভাবে, যেন তারা নিজেরাই বলতে পারে—আমরা ছিলাম, আছি, থাকব।

পর্ব ৮: চায়ের ফাঁকে জমে থাকা অনুপুঙ্খ

বেতোঝাড়ি থেকে ফেরার সময় পাহাড়ে সূর্য ঢলে পড়ছিল। আলোটা ছিল গাঢ় সোনালি, যেন পাতার গায়ে মেখে থাকা গল্পগুলোকে জ্বেলে দিতে চাইছে। নয়নিকা নিরুত্তর, চুপ করে গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে। তার চোখে ছিল কোনও অনুজ্ঞাহীন জিজ্ঞাসা—একটা সন্ধ্যা, যার উত্তর কেউ জানে না।

রুদ্র জানত, আজ যা যা জানা গেল, তা শুধু একেকটা নাম নয়। এ ছিল না বলা ইতিহাস, হারিয়ে যাওয়া নারীচরিত্রদের কথা—যাঁরা শুধু চা-পাতা তুলতেন না, একটা স্বপ্ন বুনতেন। এমন এক স্বপ্ন, যেখানে চা মানে ছিল আত্মপরিচয়ের মুক্তি।

“তুমি ঠিক আছ?” সে নয়নিকাকে জিজ্ঞেস করল।

“না,” নয়নিকা মাথা নাড়ল, “ঠিক নেই। আমি ভেবেছিলাম, আমার মা কোনও এক আশ্রমে আছেন, হয়তো চুপ করে কাটাচ্ছেন সময়। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তিনি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন এই ভয়ের জন্য—নিজের তৈরি জিনিসের ক্ষমতা দেখে। সে তো কোনো অপরাধ নয়, রুদ্র।”

রুদ্র আস্তে বলল, “অপরাধ নয়, কিন্তু খুব একা করে দেয়। আমি জানি, কারণ আমার ঠাকুমাও সেই একাকীত্বকে বেছে নিয়েছিলেন।”

তারা ফিরল বাংলোয়। অদ্ভুতভাবে, বাড়িটা আজ যেন অন্যরকম লাগছিল—দেয়ালগুলো যেন শুনে ফেলেছে দিনের সমস্ত কথা। ঘরের কোণে বাতাসে ভাসছে চায়ের ঘ্রাণ, কিন্তু তার মধ্যে কোথাও যেন এক চাপা কান্না, এক বোবা অভিমান।

রুদ্র রাতের খাবার না খেয়েই উঠে গেল ছাদে। আকাশ ছিল পরিষ্কার। অগণিত তারা, আর তাদের মাঝখানে হালকা চাঁদের আলোয় পাহাড়ের রেখা। হাতে ছিল নোটবুক, কিন্তু লিখতে পারছিল না। পৃষ্ঠাগুলো ফাঁকা থেকে যাচ্ছিল।
কিন্তু তার মাথার মধ্যে লিখে চলেছে শব্দ—নয়নিকা, চুম্বনা, পত্রলেখা, পাতার আত্মজ, নির্বাক চুম্বন, পাহাড়ি ধ্বনি…

এ যেন কোনো রিপোর্ট নয়, এ যেন একটা দীর্ঘ স্মৃতিপত্র, যেখানে প্রতিটি লাইনের নিচে জমে আছে চোখের জল।

নয়নিকা ছাদে এসে দাঁড়াল। হাতে এক কাপ চা—নতুন বানানো, মাটি দিয়ে তৈরি কাপে।

“নাও,” সে বলল। “এটা আমি বানিয়েছি। নাম দিয়েছি ‘আনুপুঙ্খ’। কারণ তুমি তো বলেছিলে, চা একটা কথা নয়, অনেক কথা একসঙ্গে।”

রুদ্র চুমুক দিয়ে চুপ করে রইল। তার গলায় কিছু আটকে যাচ্ছিল। সেই চায়ের স্বাদ কেমন ছিল বোঝানো যাবে না, কারণ সেটা কোনো স্বাদের মধ্যেও ছিল না—তা ছিল একটা স্পর্শ, একটা ফিসফিসে আশ্বাস, যে কেউ পাশে আছে।

“তুমি চলে গেলে আমি কী করব?” নয়নিকা হঠাৎ বলল।

রুদ্র তাকিয়ে বলল, “তুমি তো আমার লেখার মধ্যে থেকে যাবে। আমি যখনই লিখব, তোমার চায়ের নাম, তোমার মা, তোমার হাতের স্বাদ… সব থেকে যাবে। লেখায় কেউ মরে না, জানো?”

নয়নিকা আস্তে হেসে বলল, “তবে একটা কথা বলি?”

“বলো।”

“আমি কখনোই চাইনি তোমার জন্য কিছু হই। তুমি এসে গেলে, আমি হয়েছি। নিজের অজান্তেই। আমি তো বরাবর চা-পাতার গন্ধে মানুষ চিনতাম, কিন্তু তুমি এসেছ গন্ধের বাইরে—সরাসরি হৃদয়ের দিকে।”

রুদ্র একটা কথা বলবে, এমন সময় বাইরে থেকে এক চাপা শব্দ এল—কোনও গাড়ি থামছে। তারা দু’জন নিচে নামল। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মধ্যবয়সী মহিলা। পরনে সাদা বডি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে একটি কাঠের কৌটো।

“আমি কি… নয়নিকা?” মহিলা বললেন।

নয়নিকা থমকে গেল।

“তুমি কে?”

“আমি… চুম্বনা। তোমার মা।”

রুদ্র যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেল। নয়নিকার মুখে বিস্ময়ের ছায়া ছড়িয়ে পড়ল, তারপর সে ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“তুমি কেন এসেছ এখন?”

চুম্বনা বললেন, “কারণ আমি আজ জানলাম, আমার মেয়ে নিজের তৈরি চায়ের নাম দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, আমার মেয়েও আমায় ভুলে যাবে। কিন্তু না। তুমি চায়ের নাম দিয়েছ—‘আনুপুঙ্খ’। সেই শব্দটা আমার স্বামীর প্রিয় শব্দ ছিল। আমি বুঝে গেছি, তুমি সেই স্বপ্নের উত্তরসূরি।”

নয়নিকা কিছু বলল না। সে কেবল মায়ের চোখে চোখ রাখল, আর চোখের কোণ দিয়ে দুই ফোঁটা জল পড়ে গেল মাটিতে।

চুম্বনা বললেন, “তোমার ঠাকুমার লেখা আমি পড়েছি। রুদ্র, তুমি তা ছড়িয়ে দিও। এই পাহাড়ি নারীদের কথা শহর জানে না। তারা জানে শুধু দার্জিলিং, আসাম, নিলগিরি… কিন্তু জানে না—এই চা বানানোর পেছনে কারা ছিল, কেন তারা ছিল, আর কীভাবে তারা নিজেদের হারিয়ে দিয়েও রেখে গেছে একটি ঘ্রাণ। তুমি দয়া করে এই ঘ্রাণটাকে লিখে দিও।”

রুদ্র মাথা নোয়াল। “আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, চায়ের ফাঁকে জমে থাকা অনুপুঙ্খ আমি লিখব। প্রতিটি নাম, প্রতিটি স্বাদ, প্রতিটি স্পর্শ…”

চাঁদের আলোতে তিনটি মুখ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। তিন প্রজন্ম—যারা চায়ের গল্প বলছে না, নিজেরাই চা হয়ে উঠেছে।

পর্ব ৯: পাতায় লেখা প্রতিশ্রুতি

রাত্রির গভীরে বাংলোর ভেতর যেন কোনও শব্দ নেই, অথচ মনে হচ্ছিল প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি জানালা, এমনকি চায়ের কাপগুলোও এক-একটি কথা বলে চলেছে। চুম্বনা এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর হারানো অতীতের মুখোমুখি, আর নয়নিকা—যে কখনো কল্পনাও করেনি, একদিন মাকে সামনে বসে দেখতে পাবে, সেই মুহূর্তটাকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করছে।

রুদ্র তখন নিজের ঘরে বসে নোটবুক খুলে বসেছে। লেখা শুরু করেছে একেবারে নতুনভাবে। আর এটা কেবল রিপোর্ট নয়—এ ছিল এক নরম, প্রামাণ্য উপন্যাস, যার ভেতর দিয়ে একেকটা নাম, একেকটা স্বাদ, একেকটা সময় বেঁচে উঠবে।

“Tea is not just a drink. It is a language.
A tongue that brews memory,
sips silence,
and swirls secrets into a cup.”

এই লাইনটা লিখেই সে থামল। বাইরে চুপচাপ বাতাস বইছে। কখন যে বৃষ্টি নেমেছে, সে খেয়াল নেই। জানালার কাঁচে একফোঁটা জল এসে পড়ে গড়িয়ে পড়ল—ঠিক যেমনভাবে নয়নিকার চোখের জল নেমে গিয়েছিল যখন তার মা তাকে নাম ধরে ডেকেছিলেন।

চুম্বনা আর নয়নিকা তখন একসঙ্গে বসে। মা-মেয়ের মাঝে থাকা সমস্ত ফাঁক যেন চায়ের ভাপে গলে যাচ্ছে। মাঝখানে রাখা এক কাপ চা—‘আনুপুঙ্খ’। সেই চায়ের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুনর্মিলনের অদৃশ্য ঘ্রাণ।

“তুমি কেন চলে গেছিলে, মা?” নয়নিকা অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর জিজ্ঞেস করল।

চুম্বনা বললেন, “কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম নিজের ক্ষমতাকে। আমি জানতাম, আমার বানানো চা শুধু স্বাদের নয়, স্মৃতির বাহক হয়ে উঠছে। কেউ ভুলে যাচ্ছে, কেউ মনে পড়ছে, কেউ আবার নিজের অতীতের ছায়া খুঁজে পাচ্ছে। এই চায়ের ক্ষমতা যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে সেটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। তাই আমি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।”

“তুমি আমাদের ছেড়ে গিয়েছিলে,” নয়নিকা বলল, চোখ নামিয়ে।

“হ্যাঁ, কিন্তু আমি প্রতিদিন এই বাংলোর বারান্দার দিকেই তাকিয়ে থেকেছি। পাহাড়ের ওপারে থাকতাম ঠিক, কিন্তু জানতাম, একদিন আমার মেয়ে নিজের মতো করে চায়ের নাম দেবে। সেই নাম দিয়েই আমি চিনে নেব, সে আমায় খুঁজে পেয়েছে।”

রুদ্র ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই গল্পটা শুধু এক পরিবারের নয়। এটা একটি জাতির, একটি জাতিগোষ্ঠীর, যারা চা-বাগানে রক্ত আর ঘাম দিয়ে লিখেছে ইতিহাস। কিন্তু আমরা শুধু জানতে পেরেছি কোন ব্র্যান্ড ভালো, কোন দাম কত, কোন প্যাকেট চকচকে। কেউ জানতে চায়নি, কে বানাল সেই চা? কীভাবে বানাল? কেন বানাল?”

চুম্বনা একটু হাসলেন। “তাই তো তোকে ডাকলাম, রুদ্র। তুই শুধুই এক লেখক নোস, তুই একজন ফেরিওয়ালা—স্মৃতির ফেরিওয়ালা। তুই এই গল্পগুলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দিবি।”

রুদ্র মাথা নোয়াল। “আমি তো আমার ঠাকুমাকেও চিনতাম না। কিন্তু এখন বুঝি, তিনি শুধু চা বানাতেন না, চুপ করে একটা জগৎ বানিয়েছিলেন। সেই জগৎ আমি এখন টের পাচ্ছি নিজের ভেতরে। যেন শরীরে, শিরায়, হাড়ের ভাঁজে চায়ের পাতার ঘ্রাণ জমে আছে।”

চুম্বনা ধীরে এগিয়ে এসে রুদ্রর হাতে একটা কাগজ দিলেন। “এই নাও। পত্রলেখার শেষ চা রেসিপি। কোনোদিন কোথাও লেখা হয়নি। শুধু এই একটুকরো কাগজে ছিল। ও বলে গিয়েছিল—‘যে বুঝতে পারবে, সে-ই পাবে।’ আমি জানতাম, সেটা তুইই হবি।”

রুদ্র কাগজটা হাতে নিল। পাতলা কাগজে কালি ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কিন্তু শব্দগুলো এখনো স্পষ্ট—

“তৃতীয় স্বাদ জাগে শ্বাসের ফাঁকে,
চতুর্থ গড়ে ওঠে সম্পর্কের ছায়ায়,
পঞ্চম আসবে তারপরে—
যখন দুজন মানুষ একসঙ্গে চা বানাবে,
কথা বলবে না, কিন্তু বোঝাবে।
তাদের চোখে থাকবে জল,
আর হাতে থাকবে কাপ।”

রুদ্র ধীরে ধীরে বলল, “পঞ্চম স্বাদ… তাহলে এখনও সেটা তৈরি হয়নি।”

নয়নিকা বলল, “হয়তো আজ, এই বাংলোর রান্নাঘরে, আমরা সেটা তৈরি করতে পারি। তুমি আর আমি। কথা না বলে, শুধু ঘ্রাণে আর স্পর্শে।”

রাত তখন গভীর। বৃষ্টির ফোঁটা ছাদের টিনে পড়ছে। চুল্লিতে আগুন জ্বলছে। নয়নিকা চা পাতা ভিজিয়ে রেখেছে। রুদ্র জল ফুটিয়ে নিচ্ছে। দুজনেই চুপ।

তারা একসঙ্গে বানাল চা। হাতে হাতে নয়, হৃদয় দিয়ে। আর যখন কাপগুলো সামনে এল, তারা চুপ করে তাকাল একে অপরের চোখে।

এই চা-র কোনো নাম নেই। কেউ কিছু বলল না। কিন্তু তাদের চোখে ছিল একটাই প্রতিশ্রুতি—এই চা কারওর নয়, শুধু তাদের দুজনের।

পত্রলেখা তার চিঠিতে বলেছিলেন—“যখন দুইজন মানুষ একসঙ্গে চা বানাবে, তখন সেই চা ছুঁয়ে যাবে ভবিষ্যৎকে।”

সেই রাতে, পাহাড়ের কোলে, এক পুরনো বাংলোর রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে, নয়নিকা ও রুদ্র একসঙ্গে ভবিষ্যৎকে ছুঁয়ে ফেলেছিল।

পর্ব ১০: পঞ্চম স্বাদের জন্ম

সকালে আলো ফুটতেই রুদ্র বাংলোর বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দূরের পাহাড় এখনো কুয়াশায় ঢাকা, কিন্তু বাতাসে আজ অন্যরকম স্নিগ্ধতা। যেন রাতের চা-ঘ্রাণ এখনো ভাসছে তার শ্বাসে, স্পর্শে, অনুভবে।

পাশের জানালার ছায়ায় নয়নিকার অবয়ব ফুটে উঠেছে। চুল খোলা, হাতে সেই কাঁচের কাপটা—যেটায় তারা একসঙ্গে বানিয়েছিল তাদের প্রথম চা, যে চায়ের কোনো নাম নেই। রুদ্র জানত, তারা হয়তো সেটাকেই বলে “পঞ্চম স্বাদ”—যেখানে স্বাদ, শব্দ, স্পর্শ মিলেমিশে তৈরি করে এমন কিছু, যা কেবল অনুভবে জন্মায়, ভাষায় নয়।

চুম্বনা তখন রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, “তোমরা তৈরি হয়ে যাও। আজ তোমাদের দুজনের একটা দায়িত্ব আছে।”

“কি দায়িত্ব, মা?” নয়নিকা জিজ্ঞেস করল।

“আজ তোমাদের যেতে হবে চিরপ্রপাত-এ। ওখানে রয়েছে একটা পুরনো রিট্রিট সেন্টার। সেখানে কোনো বানিজ্যিক চা নেই, শুধু চা নিয়ে নিরীক্ষা। সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই, কিন্তু কয়েকজন গবেষক সেই জায়গাটায় চায়ের ওপর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রিসার্চ চালাচ্ছেন। তারা জানতে চায়—চা শুধু পণ্য নয়, একটা পার্সোনাল আর্কাইভ। তারা তোমাদের দেখাতে চায়, কীভাবে একেকটা পাতা হয়ে উঠতে পারে একটা জাতিগোষ্ঠীর কাহিনি।”

নয়নিকা আর রুদ্র গাড়িতে উঠল। এই যাত্রা ছিল নতুন কিছু শেখার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি—নিজেদের মধ্যেকার অনুচ্চারিত অনুভবগুলোকে স্পষ্ট করে তোলার।

চিরপ্রপাতের দিকে যেতে যেতে রুদ্র ভাবছিল—এই ট্যুর যে একসময় অফিস থেকে পাওয়া একটা ছোট প্রজেক্ট ছিল, এখন তা হয়ে উঠেছে এক ব্যক্তিগত বিপ্লব। সে লিখবে, অবশ্যই লিখবে। কিন্তু সেটা শুধু তথ্যভিত্তিক ফিচার নয়—হবে এমন এক লেখা, যেটা মানুষকে ভাবতে শেখাবে—তারা চা খাচ্ছে তো বটে, কিন্তু সেই চায়ের পেছনে যে নারীরা ছিল, যারা দিনে বারো ঘণ্টা মাথা নিচু করে কুয়াশায় পাতা তুলত, তারা কোথায়? তাদের নাম কোথাও নেই কেন?

চিরপ্রপাত পৌঁছে তারা দেখল একটা অদ্ভুত জায়গা—পাহাড়ের গায়ে তৈরি কাঠের কটেজ, সামনে বিশাল খোলা প্রান্তর, আর একপাশে কুয়াশায় ঢাকা একটা প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। ভেতরে কিছু বই, স্কেচ, চা রুট ম্যাপ, আর দেয়ালে একটা অদ্ভুত চার্ট—“Emotion-Infused Tea Matrix”—যেখানে লেখা:

“Tea that forgets. Tea that remembers.
Tea that speaks. Tea that silences.
Tea that becomes you.”

একজন মধ্যবয়সী গবেষক এলেন। নাম অনিল বরকাকতি। মৃদু গলায় বললেন, “আপনারা রুদ্র আর নয়নিকা তো? আপনারা ‘পত্রলেখা ও চুম্বনার শিষ্য’ বলেই পরিচিত হচ্ছেন এখানে।”

“আমরা…?!” নয়নিকা অবাক।

“হ্যাঁ। আপনারা তো এমন এক অভিজ্ঞতায় পৌঁছেছেন, যেটা আমরা শুধু কাগজে পড়ে এসেছি। আমরা চাই, আপনারা আমাদের সঙ্গে এক্সপেরিমেন্টাল টি-মেকিং সেশনে যোগ দিন। কিন্তু শর্ত একটা—আপনাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, যেটা আপনাদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন, সেটা আমরা চায়ে অনুভব করতে চাই।”

রুদ্র আর নয়নিকা চুপ করে একে অপরের দিকে তাকাল। কিছু না বলেই সম্মতি দিল। তারা জানত, ভাষার বাইরে দিয়ে বোঝানোই আসল চ্যালেঞ্জ।

তাদের সামনে দেওয়া হল ছয় রকম চা পাতা, তিন রকম ফুল, দুই রকম মাটি, আর এক বাটি জল। বরকাকতি বললেন, “এখানে কোনও রেসিপি নেই। নিজের মতো করে তৈরি করুন এমন এক চা, যা আপনাদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে।”

রুদ্র পাতাগুলো নেড়ে দেখল। নয়নিকা নিজের হাতের তালুতে কিছু শুকনো পাপড়ি রাখল। তারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুরু করল—কোনো কথা ছাড়া, একে অপরের দিকে তাকিয়ে, চোখ দিয়ে নির্দেশ পাঠিয়ে, জলে ছড়িয়ে দিল স্মৃতি, দুঃখ, প্রেম, ভুল বোঝাবুঝি, আর এক চুমুক নিঃশ্বাসে লুকিয়ে থাকা প্রতিশ্রুতি।

চা তৈরি হল। তারা কাপ বাড়িয়ে দিল গবেষক অনিলের হাতে। তিনি এক চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন।

“এই চা… কোনো স্বাদ বলে না। এটা একটা প্রশ্ন রেখে যায়,” তিনি ধীরে বললেন। “এই চা জানতে চায়—তুমি কি কাউকে চুপচাপ ভালোবেসেছ? তুমি কি কারও মুখে ‘ভালোবাসি’ না শুনেও তার পাশে বসে থেকেছ?”

তারপর অনিল মাথা নাড়িয়ে বললেন, “এই চা আমাদের দরকার ছিল। এই চা ‘পঞ্চম স্বাদ’—আমরা এতদিন ধরে যার খোঁজ করছিলাম।”

তারা চায়ের কাপ দুটো একটা কাঠের বাক্সে রেখে লিখে রাখল—“Created by R & N. Not to replicate, only to remember.”

সন্ধেবেলা তারা ফিরে এলো বাংলোয়। চুম্বনা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। দু’জনকে দেখে হাসলেন। “তোমরা আজ একটা দরজা খুললে,” বললেন তিনি। “যেখানে চা শুধু চা নয়, ভালোবাসার অনুবাদ।”

রুদ্র বলল, “আমার লেখা শেষ হয়নি। আমি এখন জানি, কীভাবে এই ট্যুরকে রূপ দেব এক মানবিক নথিতে। ‘পাতার গান, পাহাড়ের টান’—এই নামেই প্রকাশ পাবে।”

নয়নিকা বলল, “তুমি ফিরে যাবে?”

“হ্যাঁ,” রুদ্র বলল। “কিন্তু রেখে যাব একটা কাপ, যেখানে তুমি প্রতি সকালে সেই চা বানাবে—যেটার স্বাদ বলার নয়, বোঝার।”

তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। কোনো কথা নেই। শুধু সেই মৃদু ভেজা বাতাস, চায়ের ঘ্রাণ, আর পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া এক অনুচ্চারিত ভালোবাসা।

পর্ব ১১: যে চা চুপচাপ বলে দেয় সব কথা

শেষ রাতের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। বাংলোর বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে আছে জলের হালকা ধোঁয়া আর চায়ের ঘ্রাণ। নয়নিকা দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের দিকে মুখ করে, হাতের মুঠোয় এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। রুদ্র আজই ফিরে যাবে শহরে। এই পাহাড়, এই পাতা, এই ঘ্রাণ—সবকিছু পিছনে ফেলে রেখে যেতে হবে।

রুদ্র এসে দাঁড়াল নয়নিকার পাশে। চুপচাপ, কোনও শব্দ ছাড়াই।

“আজ চলে যাচ্ছ?” নয়নিকা জিজ্ঞেস করল, চোখ না ঘুরিয়েই।

“হ্যাঁ। রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু শুধু রিপোর্ট জমা দেব না, একটা বই জমা দেব… এক কাপ চায়ের মতো বই। নাম রেখেছি পাতার গান, পাহাড়ের টান।”

নয়নিকা হেসে ফেলল। “তুমি তো বলেছিলে, চায়ের স্বাদ বলে না, বোঝায়। তাহলে তোমার বইও কি বোঝাবে?”

“না। আমার বই বলবে। বলবে সেইসব মুখের কথা, যাদের কেউ কখনও প্রশ্ন করেনি। সেই নারীদের কথা, যারা হাজার বছর ধরে মাথা নিচু করে কুয়াশায় পাতা তুলেছে। বলবে তোমার, চুম্বনার, আর পত্রলেখার গল্প। আর… আমাদের গল্পও।”

নয়নিকার গলা একটু কেঁপে গেল। সে আস্তে করে বলল, “তুমি কি আর ফিরবে না?”

রুদ্র এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, তারপর বলল, “আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু তোমার বানানো ‘আনুপুঙ্খ’ আমার সঙ্গে থাকবে। আর আমি জানি, প্রতিদিন সকালবেলা যখন তুমি সেই কাপটা হাতে নেবে, আমিও তখন কোথাও, কোনওভাবে সেই কাপ ছুঁয়ে থাকব। সম্পর্ক তো সবসময় থাকার কথা নয়, অনেক সময় শুধু জানিয়ে দেওয়া—‘আমি বুঝি’—এটাই যথেষ্ট।”

নয়নিকা ধীরে কাপটা বাড়িয়ে দিল রুদ্রর হাতে।

“তুমি জানো?” সে বলল, “এই কাপের প্রতিটা দাগ, প্রতিটা আঁচড়, প্রতিটা চুমুক… সবই আমি মুছে ফেলিনি। রেখেছি। কারণ, যে সম্পর্ক একদিন স্মৃতিতে পরিণত হয়, তার সবচেয়ে সুন্দর দাগগুলো থাকে চোখে নয়, এই কাপে।”

রুদ্র চা খেল। স্বাদ কিছু না—কিন্তু তাপ যেন ভেতরটা উষ্ণ করে তুলল। তার মনে হচ্ছিল, এই পাহাড়, এই বাংলা, এই কুয়াশা, সবকিছু সে একবারে নিজের ভিতর তুলে নিচ্ছে, যেন তার লেখায়, তার নিঃশ্বাসে তারা থেকে যায় চিরদিন।

চুম্বনা এসে বারান্দায় দাঁড়ালেন।

“তোমরা দুজন যা করেছ, সেটা শুধু চা বানানো নয়। একটা ভাষা বানিয়েছ। একটা সম্পর্কের নতুন ব্যাকরণ। পত্রলেখা একদিন বলেছিলেন, ‘যখন মানুষ কথা না বলে ভালোবাসবে, তখন জন্ম নেবে পঞ্চম স্বাদ।’ আজ সেটা সত্যি হল।”

রুদ্র মাথা নিচু করে বলল, “আমি শুধু ভাগ্যবান ছিলাম, এই পাহাড় আমাকে ডাক দিয়েছিল।”

চুম্বনা একটা কাঠের কৌটো এগিয়ে দিলেন রুদ্রকে।

“এখানে কয়েকটা চা পাতা আছে, যারা শুধুই পাহাড়ের বাতাসে শুকিয়েছে, মানুষের স্পর্শে নয়। এগুলোকে বানালে শুধু স্বাদ নয়, মানুষের হৃদয় শুনতে পারবে।”

রুদ্র কৌটোটা হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করল। যেন শব্দহীন কোনও প্রতিজ্ঞা করল সে নিজের ভিতরে।

ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল বাংলোর সামনে। সুটকেস উঠল গাড়িতে। নয়নিকা এক পা পিছিয়ে গেল। কিছু বলল না, চোখে জলও এল না। কিন্তু তার দাঁড়িয়ে থাকা শরীরটাই যেন বলে দিল—তুমি এসেছ, ছিলে, থাকছো। শুধু গিয়েছ না।

গাড়ি চলতে শুরু করল। পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা তখন পাতলা হয়ে আসছে। সূর্য উঠেছে। কিন্তু গাড়ির ভেতর রুদ্রর মনে হচ্ছিল—এই যাত্রাটা যেন শেষ নয়। বরং সে সেই পথ ধরেছে, যা তাকে নিয়ে যাচ্ছে আরও গভীরে—নিজের শিকড়ের কাছে, চায়ের পাতায় লেখা ইতিহাসের কাছে।

তার নোটবুকে লেখা শেষ লাইনটা সে পড়ে ফেলল গাড়িতে বসে:

“এক কাপ চা দিয়ে সব বলা যায় না।
কিন্তু এক কাপ চা দিয়ে সব বোঝানো যায়।
তোমাকে আমি বুঝেছিলাম, তাই বলিনি।”

সেই বছর ডিসেম্বরে বইমেলায় প্রকাশ পেল রুদ্র সেনের বই: পাতার গান, পাহাড়ের টান।
প্রচ্ছদে ছিল একটা মাটির কাপ—ভেতরে ধোঁয়া ওঠা চা, আর পেছনে পাহাড়ের রেখা।
ভিড়ের মধ্যে এক নারী দাঁড়িয়ে বইটা হাতে নিলেন, হালকা হেসে ফিসফিস করে বললেন—

“এই চা আমি বানিয়েছিলাম একদিন।
এখন সে চা হয়ে গেছে কারও গল্প।”

শেষ

1000024730.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *