তৃষা বসু
অধ্যায় ১
নয়নের শৈশব কেটেছে পদ্ম নদীর তীরের সেই ছোট্ট গ্রামে, যেখানে সকালবেলায় নৌকায় করে জেলে নামত, দুপুরে মাঠে গরু চরাত আর বিকেলে নদীর ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখত। ছেলেবেলা মানেই ছিল দুষ্টুমি, কাদামাটি, আর নদীর জলে পা ভিজিয়ে শাপলা-পদ্মফুল খুঁজে আনা। গ্রামের স্কুলের রঙচঙে টিনের ছাউনি আর কাঠের বেঞ্চগুলোতে নয়ন পড়ত, কিন্তু মন পড়ে থাকত নদীর পাড়েই। একদিন সেই স্কুলের পথেই দেখা হয় লিপির সঙ্গে—একটি নতুন মেয়ে, যাকে দেখে প্রথমেই নয়নের মনে হয়েছিল, এ যেন নদীর ধারের কোনো পদ্মফুল। লিপির চোখে ছিল এক ধরনের নরম আলো, চুল দু’পাশে বিনুনি করে বাঁধা, আর হাতে ধরা বইয়ের পাতা নাড়তে নাড়তে যখন হাওয়া বইত, তখন নয়নের মনে হতো সেই পাতাগুলো যেন তার বুকের ভেতরও কিছু না কিছু লিখে দিচ্ছে। প্রথম দেখা থেকে তারা একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করল স্কুলে, পথে কখনো কোনো কথা হতো না, শুধু নয়ন লুকিয়ে লুকিয়ে লিপির দিকে তাকাত আর লিপি মাঝে মাঝে মৃদু হেসে তাকাত নয়নের চোখে। সেই হাসিই ছিল নয়নের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কথা, যা সে কারো সঙ্গে ভাগ করে নিত না। প্রতিদিনের এই নীরব সহযাত্রা ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধতে লাগল তাদের, যেটা ছিঁড়ে ফেলার মতো সাহস তখনও কারোর ছিল না।
দিনগুলো একে একে এগোতে লাগল, বর্ষা এলো, আর পদ্মফুলের মৌসুমে নদীর ধারে যেন লাল আর সাদা ফুলের মেলা বসে গেল। এক বিকেলে নয়ন একা একা নদীর ঘাটে বসে ছিল, আর দেখল লিপিও এসেছে। কিশোর নয়ন সেদিন অদ্ভুত এক সাহস নিয়ে এগিয়ে গেল লিপির দিকে; কাঁদা মাখা পায়ে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে হাতের আড়ালে রাখা একটি টাটকা পদ্মফুল লিপির দিকে বাড়িয়ে দিল। লিপি প্রথমে চমকে তাকাল, তারপর মুখ নামিয়ে লাজুক হেসে বলল, “আমাকে দেবে?” নয়ন শুধু মাথা নেড়ে বলল, “এটা তোমার জন্যই তুলেছি।” লিপির মুখের সেই হাসি আর নয়নের কণ্ঠের কেঁপে ওঠা—দুজনের মাঝের সমস্ত নীরবতা ভেঙে দিয়ে প্রথমবারের মতো বুঝিয়ে দিল, কী এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে তাদের ভিতরে। পদ্মফুলটা লিপি বুকে চেপে রাখল, আর নয়ন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, কোনোদিনও তাকে একা ফেলে যাবে না। নদীর ঢেউ তখন দূরে টলমল করছিল, আর আকাশের নরম রোদ লিপির মুখে পড়ে তাকে যেন আরও কোমল আর আলোকিত করে তুলেছিল। সেদিন থেকে পদ্মফুল শুধু একটা ফুল নয়, হয়ে উঠল নয়ন আর লিপির শৈশব প্রেমের নীরব সাক্ষী, আর সেই নদীর ঢেউ যেন প্রতিদিন তাদের গোপন প্রতিশ্রুতি বয়ে নিয়ে চলত।
এভাবে বছরের পর বছর কেটে গেল। লিপি আর নয়নের বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে লাগল তাদের অনুভূতি। স্কুল থেকে ফেরার পথে নদীর পাড়ে বসে দু’জনে গল্প করত, স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে কোথায় যাবে, কী করবে। নয়ন ভাবত, একদিন লিপিকে নিয়ে এই নদীর ওপারে চলে যাবে, যেখানে নতুন পৃথিবী গড়বে শুধু তাদের জন্য। লিপিও লুকিয়ে লুকিয়ে সেই স্বপ্নগুলো আঁকত মনে, কিন্তু কখনো প্রকাশ করত না। নদীর পাড়ের সেই বিকেলগুলো, কাঁচা রাস্তার ধুলো, পদ্মফুলের নরম পাঁপড়ি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক স্বপ্নের বুনন, যা তাদের শৈশবকে করেছিল রঙিন আর আশায় ভরা। তবু দূরে এক অজানা আশঙ্কা বয়ে চলত পদ্ম নদীর ঢেউয়ের মতোই—যা তারা তখনো বুঝতে পারেনি, কিন্তু সময় এসে সেই আশঙ্কাকে বাস্তবে পরিণত করতে দেরি করেনি। তাদের জানা ছিল না, এক ভয়াবহ বর্ষার রাত তাদের জীবনের গল্পকে একেবারে নতুন মোড়ে নিয়ে যাবে, আর সেই পদ্মফুলের প্রতিশ্রুতি হয়তো তখনও থেকে যাবে শুধু স্মৃতির পাতায়।
অধ্যায় ২
বর্ষা দিনের এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে নয়ন আর লিপি নদীর পাড়ে বসে ছিল, আকাশে মেঘের ভারী ছায়া, আর নদীর ঢেউ যেন একটু বেশিই উথলে উঠছিল। মাটিতে নরম কাদায় পা ডুবিয়ে নয়ন একরাশ পদ্মফুল তুলেছিল সকালে, যেগুলো এখনো তার কোলের কাছে রাখা, আর লিপি দূর থেকে অবাক চোখে দেখছিল নয়নের সেই নিষ্ঠা। দু’জনেই জানত, কিছু একটা বলার আছে, কিন্তু কে আগে বলবে, সেই দ্বিধায় আটকে ছিল তাদের নিঃশ্বাস। হঠাৎ নয়ন নীরবতা ভেঙে বলল, “লিপি, যদি একদিন সবকিছু বদলে যায়, নদী যদি আমাদের আলাদা করে দেয়, তবু তুমি কি আমায় মনে রাখবে?” লিপির চোখ ভিজে উঠল, সে চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল নয়নের চোখে, তারপর এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল, “তুমি যদি আমায় কথা দাও, আমিও কথা দিই—যেখানে থাকি, তোমাকেই মনে রাখব।” সেই মুহূর্তে নয়ন লিপির দিকে বাড়িয়ে দিল একটি টাটকা পদ্মফুল, যার পাঁপড়ি তখনো বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে ছিল; লিপি সেই ফুল হাতে নিয়ে বুকে চেপে ধরল, যেন সেটাই তাদের ভালবাসার একমাত্র চিহ্ন।
সেদিন নদীর ঢেউয়ের শব্দে মিলিয়ে গিয়েছিল তাদের স্বর, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে গেঁথে গিয়েছিল সেই প্রতিজ্ঞা। নয়নের কাছে পদ্মফুল হয়ে উঠল লিপিকে ভালোবাসার প্রতীক, আর লিপির কাছে নয়ন মানেই নদীর পাড়ে দাঁড়ানো সেই ছেলেটি, যার হাতে থাকে পদ্মফুল আর চোখে থাকে অদ্ভুত এক নির্ভরতার আলো। তারা দু’জনেই তখনও বুঝতে পারেনি প্রেম মানে ঠিক কী, কিন্তু হৃদয়ের ভিতরে একরকম নীরব বোঝাপড়া গড়ে উঠেছিল—যা কোনো শব্দে প্রকাশ করার দরকার পড়েনি। বৃষ্টি থামার পর নয়ন আর লিপি গ্রামের কাঁচা রাস্তায় হেঁটে ফিরছিল, পায়ের তলা কাদা, চারপাশে ভিজে পাটক্ষেত আর দূরে রোদ ফুঁটে ওঠা আকাশ; সেই পথে হাঁটার সময় লিপি হঠাৎ বলেছিল, “যদি কখনো আমরা একে অপরকে হারিয়ে ফেলি, তুমি কি আবার খুঁজে পাবে আমাকে?” নয়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল, “পদ্মফুলের মতোই খুঁজে নেব, কারণ তুমি হারিয়ে যেতে পারো না।” লিপির মুখে লাজুক হাসি ফুটেছিল, আর নয়ন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল—যত ঝড়ই আসুক, সে এই মেয়েকে ছেড়ে যাবে না কোনোদিন।
তাদের সেই কাঁচা প্রতিজ্ঞা আর নদীর পাড়ের দুপুরগুলো মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক শৈশবের স্বপ্ন, যেখানে কোনো বাস্তব জটিলতা ঢুকে পড়েনি তখনো। পদ্মফুল আর নদীর ঢেউ যেন সাক্ষী ছিল সেই প্রেমের, যা ছিল নিঃশব্দ আর নিঃস্বার্থ। কিন্তু দূরে দূরে মেঘ জমছিল, নদীর স্রোত আরও চঞ্চল হয়ে উঠছিল, আর সময়ের ঢেউ অজান্তেই এগিয়ে আসছিল তাদের জীবনের ওপর। নয়ন আর লিপি তখনো জানত না, এক ভয়াবহ বন্যার রাতে সবকিছু ভেঙে যাবে, আর পদ্মফুলের প্রতিশ্রুতি তখনও রয়ে যাবে—কিন্তু শুধু স্মৃতির মধ্যে, দু’জনের হৃদয়ের গোপন কোণে লুকানো এক অদৃশ্য পাঁপড়ি হয়ে।
অধ্যায় ৩
বর্ষার শেষ দিকে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠতে লাগল, গ্রামের মানুষজন আতঙ্কে দিন গুনতে লাগল কখন সেই পানি বাড়তে বাড়তে ঘর-বাড়ির চৌকাঠে এসে পৌঁছায়। নয়নের মা প্রতিদিন রাতে ছোট্ট মাটির ঘরের জানালা দিয়ে পদ্ম নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত, যেন নদীর রুদ্ররূপের পূর্বাভাস পেতে চায়; নয়ন তখনো বুঝত না এই অদ্ভুত নীরবতার মানে, শুধু টের পেত, কিছুর জন্য বড় বিপদ আসছে। একদিন বিকেলে নয়ন ছুটে গেল নদীর পাড়ে, যেখানে লিপি দাঁড়িয়ে নদীর স্রোত দেখছিল, চোখে ছিল অজানা আতঙ্ক। লিপি কাঁপা গলায় বলল, “বাবা বলছে, এবার হয়তো আমাদের শহরে চলে যেতে হবে।” নয়নের বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল, কিন্তু সে লিপির মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “তুমি কোথায় যাবে লিপি? তুমি জানো না, আমি ছাড়া তুমি কই যেতে পারো না।” লিপির চোখে ভিজে ভিজে আলো ফুটল, সে নিচু গলায় বলল, “তোমার দেয়া পদ্মফুল আমি নিয়ে যাব, তবু…” বাক্য শেষ করার আগেই নদীর ওপার থেকে হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে আকাশ কেঁপে উঠল, আর সেই শব্দের রেশে তাদের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত কথা হারিয়ে গেল নদীর গর্জনে।
রাতের বেলা গ্রামের মাটি কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল নদীর বানের জলে, নয়ন দেখল তাদের উঠোন পর্যন্ত পানি উঠে গেছে, মা বারবার বলছে ঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে, কিন্তু নয়নের মন পড়ে আছে লিপির কাছে—লিপি কি ঠিক আছে? কাঁদতে কাঁদতে নয়ন বাড়ির বাইরে যেতে চাইল, কিন্তু মা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন কোনো ভাবেই এই ছেলেকে হারাবে না। সেই রাতের বন্যা গ্রামের অনেক কিছুকে ভাসিয়ে নিল—কাঁচা ঘর, উঠোন, খেত, মানুষের স্মৃতি, স্বপ্ন; আর ভাসিয়ে নিল নয়ন আর লিপির সেই রঙিন শৈশবের দিনগুলোও। সকালে যখন পানি নামতে শুরু করল, নয়ন ছুটে গেল লিপিদের বাড়ির দিকে, কিন্তু সেখানে শুধু ভাঙা বেড়া আর ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপ; লিপি চলে গেছে, কোথায় গেছে নয়ন জানে না, শুধু নদীর কাদায় চাপা পড়ে থাকা একটা মলিন চুলের ফিতে আর ভাঙা খড়ের ঘরের ভেতর ফেলে যাওয়া খেলনা দেখে নয়নের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল।
সেই কান্না শুধু লিপিকে হারানোর নয়, ছিল নিজের ছোটবেলাকে হারানোরও কান্না, পদ্মফুলের প্রতিশ্রুতি ভেঙে যাওয়ার কান্না। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নয়ন প্রথমবার বুঝল, পদ্ম নদী শুধু তাদের খেলার সাথী নয়, কখনো কখনো তা কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়। লিপি চলে গেল শহরে, নয়ন রয়ে গেল গ্রামে; কিন্তু পদ্মফুল আর সেই নীরব প্রতিজ্ঞা নয়নের বুকের ভেতর থেকে গেল, গোপনে লুকিয়ে রাখা একটুকরো স্বপ্ন হয়ে, যা ভাসিয়ে নিতে পারল না কোনো বন্যার ঢেউ। আর নদীর ঢেউ তখনো অনর্গল বয়ে চলল, যেন কিছুই হয়নি, আর নয়নের চোখের পানিও মিলিয়ে গেল সেই নদীর রুদ্ররূপের সঙ্গে।
অধ্যায় ৪
বন্যার পরের গ্রাম ছিল একেবারে অন্যরকম—কাদায় ভরা উঠোন, ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি আর মানুষের চোখে চোখে আতঙ্কের ছায়া। নয়ন প্রতিদিন স্কুলের পথ ধরে হেঁটে যেত, কিন্তু পাশে আর লিপি থাকত না, সেই শূন্যতাটা চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দিত লিপির অনুপস্থিতি। লিপির ফেলে যাওয়া সেই ছোট্ট ফিতেটা নয়ন এখনো বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখত, আর প্রতিরাতে পদ্ম নদীর ঢেউয়ের শব্দ শুনে মনে করত সেই শৈশবের প্রতিজ্ঞার কথা, যখন লিপির হাতে সে পদ্মফুল তুলে দিয়েছিল। প্রথম প্রথম নয়ন ভেবেছিল লিপি হয়তো ফিরবে, হয়তো এই নদীর পাড়ে আবার দেখা হবে, কিন্তু মাস গড়াতে গড়াতে নয়ন বুঝে গেল, লিপি আর ফিরবে না—তাদের জীবন এখন দুই ভিন্ন দিকের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
নয়নের মা তাকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করত, বলত, “মেয়ে তোকে মনে রাখলে একদিন ঠিকই ফিরে আসবে।” কিন্তু নয়ন কারো সঙ্গে আর এই নিয়ে কথা বলত না, শুধু নীরবে নিজের পড়াশোনায় মন দিত আর কাজের ফাঁকে নদীর পাড়ে গিয়ে বসত, যেখানে একসময় লিপির সঙ্গে বসে স্বপ্ন দেখত। পদ্ম নদীকে সে তখন নতুন করে চিনতে শিখল—নদী শুধু তাদের খেলার সাথী নয়, নদী এক ভয়ংকর বাস্তবতার নাম, যা চাইলেই সবকিছু কেড়ে নিতে পারে। তবু এই নদীর দিকেই প্রতিদিন নয়নের মন ছুটে যেত, কারণ নদীর ঢেউয়ের গর্জনের মধ্যে আজও লিপির হাসির প্রতিধ্বনি শুনতে পেত সে। বছর কেটে গেল, নয়ন স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হলো, শহরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগল, আর প্রতিদিন মনে মনে লিপির মুখটাকে আঁকতে চেষ্টা করত, যাতে একদিন ভুলে না যায় সেই চোখের চাহনি, সেই লাজুক হাসি।
শহরে পড়তে গিয়ে নয়ন নতুন বন্ধু পেল, নতুন জীবনের স্বাদ পেল, তবু রাতের নির্জনে বা একলা হোস্টেল রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে সে পদ্ম নদীর কথা ভাবত, আর ভাবত লিপির কথা—যে হয়তো এই শহরের কোনো এক প্রান্তেই আছে, হয়তো রিকশায় যাচ্ছে, হয়তো ট্রামে বসে আছে, অথচ নয়নের খবর জানে না। একদিন কলেজের নোট খুঁজতে গিয়ে নয়নের হাতে পড়ল সেই পুরনো ফিতেটা; তখন সে বুঝল, জীবনের যতই নতুন অধ্যায় আসুক, লিপির স্মৃতি আর সেই শৈশবের প্রতিজ্ঞা তার বুকের ভেতর থেকে যাবে—নদীর ঢেউয়ের মতোই, কখনো দেখা যায়, কখনো অদৃশ্য থাকে, কিন্তু কোনোদিন পুরোপুরি মিলিয়ে যায় না। নয়ন জানত না লিপিও কি তাকে মনে রেখেছে, নাকি হারিয়ে ফেলেছে শৈশবের সেই গল্প; শুধু জানত, এই শহরে থাকলেও, সে একদিন পদ্মফুলের মতোই লিপিকে আবার খুঁজে বের করবে।
অধ্যায় ৫
নয়নের মতোই লিপির জীবনও বদলে গিয়েছিল সেই বন্যার রাতের পর; শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, কোলাহলের মধ্যে লিপি নতুন জীবন গড়তে শুরু করেছিল, কিন্তু গ্রামের নরম বিকেল, পদ্মফুলের ঘ্রাণ আর নয়নের সেই দুষ্টু হাসি প্রতিদিন তার স্মৃতির অন্ধকার কোণায় উঁকি দিত। বড় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যান, কাঁচাবাজারের চিৎকার, আর হোস্টেলের ছোট্ট ঘর—সবকিছুতেই লিপি একফোঁটা গ্রাম খুঁজে নিত, আর মনে মনে বলত, “নয়ন যদি এখানে থাকত…” নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর লিপির চারপাশে নতুন বন্ধুবান্ধব তৈরি হল, পড়াশোনা আর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে উঠল, কিন্তু রাতের বেলা যখন জানালা দিয়ে দূরের আলো দেখত, নয়নের সেই কথা মনে পড়ত—“তুমি যদি কখনো হারিয়ে যাও, আমি আবার খুঁজে নেব।” লিপি জানত, নয়ন বলেছিল মনের কথা, আর সে-ও প্রতিজ্ঞা করেছিল মনে মনে; তবু বাস্তবের কঠিন ঢেউ সেই প্রতিজ্ঞাকে প্রতিদিন একটু একটু করে দুরে সরিয়ে দিচ্ছিল।
বছর কয়েকের মধ্যে লিপি শহরের কলেজে ভর্তি হল, পড়াশোনা চালিয়ে গেল, আর নিজের স্বপ্ন বুনতে লাগল শিক্ষিকা হওয়ার; একদিন নয়নকে লিখবে এমন কিছু চিঠিও লিখেছিল, কিন্তু কখনো পোস্ট করতে পারেনি। কলেজে একবার এক বন্ধুর মুখে পদ্মফুলের কথা শুনে মুহূর্তের জন্য লিপির মনে হয়েছিল, নয়ন হয়তো কাছেই আছে, হয়তো কোনোদিন এই ভিড়ের শহরে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে; কিন্তু প্রত্যেকবারই সে নিজের মনকে বোঝাত, “ও হয়তো ভুলে গেছে, হয়তো আর মনে নেই।” তবু এক নিঃশ্বাসে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা পদ্মফুলের স্মৃতি, আর নয়নের দেয়া সেই প্রথম উপহার লিপিকে ভেতরে ভেতরে শক্ত করে রাখত। লিপি বাইরে থেকে কঠিন আর আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল, কিন্তু মনের গভীরে একটা ছোট্ট মেয়ে লুকিয়ে ছিল, যে এখনও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নয়নের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে।
একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় লিপি একা রিকশায় বসে থাকল, রাস্তার আলোর ভেতর দিয়ে ছুটে চলা শহর দেখে মনে হল—এ শহরে লাখ লাখ মানুষ, তবু সবাই কারো না কারো জন্য অপেক্ষা করে। লিপি জানত, সেই অপেক্ষা হয়তো শেষ হবে না, তবু সে ছাড়তে পারত না নয়নের মুখের সেই হাসি, সেই কাঁপা গলার প্রতিজ্ঞা, আর পদ্মফুলের গন্ধ। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, তবু লিপির কাছে নয়ন এখনো নদীর পাড়ের সেই ছেলেটিই, যে একদিন বলেছিল—যত দূরেই থাকো, আমি তোমাকে খুঁজে নেব। আর লিপিও মন দিয়ে ঠিক করেছিল—নয়ন যদি একদিন ফিরে আসে, সে কোনো প্রশ্ন করবে না, শুধু হাতে হাত ধরে হাঁটবে সেই পুরনো পথ ধরে, আবার নতুন করে শুরু করবে পদ্মফুলের প্রতিশ্রুতির গল্প।
অধ্যায় ৬
শহরের ব্যস্ততা, কোলাহল আর ট্রাফিকের হর্নের ভেতর দিয়ে কেটে যাচ্ছিল নয়নের জীবন, কিন্তু মনের গভীরে লিপির স্মৃতি কখনো ম্লান হয়নি। প্রতিদিন সকালে আয়নায় মুখ দেখার সময় নয়ন ভাবত—লিপি এখন কোথায়? সে কি আমায় একটুও মনে রাখেনি? এভাবে বছরের পর বছর কেটে গেল, আর একদিন হঠাৎই শহরের এক বইমেলায় নয়ন বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিল, যেখানে মানুষের ভিড়, স্টলে স্টলে বইয়ের গন্ধ আর কাগজের পাতা ওলটানোর শব্দে ভরে গিয়েছিল চারপাশ। নয়নের মন সেদিনও ঠিকঠাক ছিল না; চোখে ভেসে উঠছিল লিপির মুখ, আর মনে মনে ভাবছিল, এমন ভিড়ের মধ্যে যদি হঠাৎ তাকে দেখা যায়! সে জানত, এ স্বপ্ন, তবু স্বপ্নই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। ঠিক তখনই একটা স্টলের সামনে চোখ আটকে গেল—সাদা সালোয়ার কামিজ পরে চুল পেছনে বেঁধে রাখা এক মেয়ের দিকে, যার কাঁধে রাখা ব্যাগ আর বইয়ের প্রতি মনোযোগ দেখে নয়নের বুক কেঁপে উঠল। অদ্ভুত চেনা মনে হচ্ছিল তাকে, আর দু’পা এগিয়ে যেতেই নয়ন বুঝতে পারল—এ সেই লিপিই!
লিপি প্রথমে তাকায়নি নয়নের দিকে, বইয়ের পাতা উল্টোতে উল্টোতে হঠাৎ চোখ তুলতেই নয়নের চোখের সঙ্গে চোখ মেলাল; মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল। লিপির চোখ বড় বড় হয়ে গেল, আর নয়নের চোখে জমে থাকা বছরের পর বছর আগের না বলা কথাগুলো ভিড় করে উঠল। দু’জনেই কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল—চারপাশের ভিড়, দোকানদারদের ডাক, দূরের মাইকে ঘোষণা—সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক নীরবতা তৈরি হল শুধু তাদের জন্য। নয়ন আস্তে করে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তুমি লিপি, না?” লিপির ঠোঁটে ধরা পড়া হালকা কাঁপা হাসি, আর সেই চোখের গভীরতায় লুকানো জল দেখে নয়ন বুঝে গেল, সে ভুল করেনি। লিপি আস্তে করে বলল, “নয়ন?” সেই একটুকু শব্দে যেন জমে থাকা সব বছর, সব না বলা কথা একসাথে বলে ফেলা হল।
দু’জনেই জানত, এই পুনর্মিলন সহজ হবে না। এতো বছর পরে কত কিছু বদলে গেছে, তবু দু’জনের চোখে সেই পুরনো নদীর পাড়, পদ্মফুলের প্রতিশ্রুতি আর ভিজে কাদায় পায়ের ছাপেরা ফিরে আসছিল। নয়ন লাজুক গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কেমন আছ?” লিপি হেসে বলল, “ভাল, কিন্তু অনেক কিছুই ফেলে এসেছি।” সেই মুহূর্তে নয়নের চোখে স্পষ্ট হয়ে গেল—তারা দু’জনই তাদের শৈশব, নদীর পাড়ের দিনগুলো আর সেই একগুচ্ছ পদ্মফুল হারিয়েছে; তবু কিছুই পুরোপুরি হারায়নি, বরং হৃদয়ের গভীর কোনো গোপন জায়গায় রয়ে গেছে সেই প্রেম, যা এতো বছর পরও অজানা পুনর্মিলনের মুহূর্তে তাদের নিঃশ্বাস থামিয়ে দেয়। দু’জনের মধ্যে তখন শুধু একটাই ভাবনা ঘুরছিল—এত বছর পরও কেন এই চোখের চাহনি এখনো এত চেনা মনে হয়? আর পদ্মফুলের প্রতিশ্রুতি কি আসলেই এত শক্তিশালী হতে পারে?
অধ্যায় ৭
বইমেলায় সেই হঠাৎ দেখা হওয়ার পর নয়ন আর লিপি কয়েকবার দেখা করল; কফির কাপে ভিজল পুরনো গল্প, অচেনা শহরের রাস্তায় হাঁটার ছন্দে ফিরে এল হারিয়ে যাওয়া শৈশবের পদ্মফুলের স্মৃতি। তবু তাদের মধ্যে জমে থাকা বছরের ব্যবধান, অভিমান আর না বলা কথাগুলো যেন দেয়াল তৈরি করে রেখেছিল। নয়ন লিপির মুখের দিকে তাকিয়ে অনেকবার বলতে চেয়েছিল, “আমি আজও তোমায় ভালোবাসি,” কিন্তু প্রতিবার কথাগুলো গলা পর্যন্ত এসে আটকে যেত। লিপির চোখেও ভিজে থাকা আলো স্পষ্ট ছিল, তবু সে নিজেও কিছু বলত না; শুধু একরাশ স্মৃতি নিয়ে মৃদু হাসত, আর নয়ন অনুভব করত সেই হাসির আড়ালেও লুকিয়ে আছে দুঃখ আর দ্বিধা।
নয়ন ভেবেছিল একদিন সাহস করে লিপিকে সব বলবে—সেই প্রথম পদ্মফুল দেওয়ার গল্প থেকে শুরু করে বন্যার রাতে হারিয়ে যাওয়ার পর কত রাত নির্ঘুম কেটেছে, কেমন করে এখনো সে লিপির কথা ভাবে প্রতিটা শ্বাসে। কিন্তু মুখ খুলতে গেলেই বুঝত, এত বছর পরে লিপির জীবনেও তো অনেক কিছু বদলেছে, হয়তো কেউ আছে যার হাত ধরে সে নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। লিপির মুখে নয়ন কখনো কারো নাম শোনেনি, তবু নিজের মনে তৈরি হওয়া আশঙ্কা আর হঠাৎ ফিরে আসা লাজুক প্রেম একসাথে তাকে থামিয়ে রাখত। লিপিও নয়নের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে থমকে তাকাত, হয়তো বলার চেষ্টা করত কিছু, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চোখ নামিয়ে নিত, আর দু’জনের মধ্যে থেকে যেত একরাশ নীরবতা—যা ভাঙা হয় না, শুধু হৃদয়ে ভার হয়ে বসে থাকে।
সেই নীরবতার মধ্যেই একদিন নয়ন লিপিকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “তুমি কি এখনো পদ্ম নদীর কথা মনে করো?” লিপির চোখ দু’ফোঁটা জলে ভিজে উঠেছিল, সে আস্তে করে বলেছিল, “মনে পড়ে, খুব মনে পড়ে… বিশেষ করে পদ্মফুলের কথা।” সেই উত্তর শুনে নয়নের বুকের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো একটু নড়েচড়ে উঠেছিল, তবু কোনো ঘোষণা হয়নি, কোনো নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। শহরের আলো, শব্দ আর মানুষের ভিড়ের মধ্যে তারা দু’জনেই বোঝার চেষ্টা করছিল—এত বছর পর কি পুরনো প্রেম আবার নতুন করে জন্মাতে পারে, নাকি সেই প্রেম শুধু নীরবতা আর না বলা কথার মধ্যে আটকে থাকবে চিরদিনের মতো? পদ্ম নদীর ঢেউয়ের মতোই এই দ্বিধা আর নীরবতা বয়ে চলল তাদের মধ্যে, যেন পুরনো প্রতিশ্রুতিকে আবারও পরীক্ষা করছে সময়।
অধ্যায় ৮
শহরের এক ব্যস্ত বিকেলে, ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নয়ন আর লিপি হঠাৎ সেই পুরনো নদীর কথা তুলল। নয়নের গলায় ছিল কাঁপা কাঁপা স্পর্শ, “তুমি কি মনে রেখেছো, সেই দিনটা… আমি তোমাকে প্রথম পদ্মফুল দিয়েছিলাম?” লিপি থমকে দাঁড়াল, চোখের কোণে জমে থাকা জল লুকোতে চেষ্টা করল, তারপর আস্তে করে বলল, “মনে আছে, এখনো স্পষ্ট মনে আছে। আমি ভেবেছিলাম, তোমার মতো কেউ আর কোনোদিন আমাকে ওভাবে কিছু দেবে না।” নয়ন কিছুক্ষণের জন্য চুপ করল, তারপর ধীর স্বরে বলল, “আমি আসলে বলতে চাই… তখন শুধু বন্ধুত্ব ছিল না, তার চেয়েও কিছু বেশি ছিল।” লিপির মুখের দিকে তাকিয়ে নয়ন দেখল—লিপির চোখও বলছে সেই একই কথা, যা ভাষায় প্রকাশ পায়নি এতগুলো বছর।
তারা দু’জনেই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাল শহরের এক ছোট্ট পার্কে, যেখানে হাওয়ায় ভেসে আসছিল নানান ফুলের গন্ধ। লিপি ধীরে ধীরে নিজের ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করল এক টুকরো মলিন কাপড়ে মোড়া কিছু; নয়ন অবাক হয়ে দেখল, সেটি সেই পুরনো পদ্মফুল, যা একদিন নয়ন লিপিকে দিয়েছিল। ফুলটি শুকিয়ে গিয়েছে, রঙও ফিকে হয়ে গেছে, তবু পাঁপড়িগুলো অদ্ভুতভাবে টিকে আছে। নয়নের চোখ ভিজে এল, আর লিপি আস্তে করে বলল, “আমি ভাবতাম, যদি কখনো আবার তোমাকে দেখি, এই ফুলটাই দেখাবো, যাতে তুমি বুঝতে পারো, আমি তোমাকে কোনোদিন ভুলি নি।” নয়ন কিছু বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু গলায় আটকে গেল; তার চোখের জল মুখ বেয়ে পড়ে গিয়ে শুকনো পদ্মফুলের উপর টুপ করে পড়ল, আর সেই ছোট্ট ফোঁটা যেন আবার নতুন করে বাঁচিয়ে তুলল তাদের পুরনো স্মৃতি।
সন্ধ্যার আলো নিভে আসছিল, চারপাশে ল্যাম্পপোস্টের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল, আর নয়ন আর লিপি সেই পদ্মফুলের দিকে তাকিয়ে ছিল—যেন এত বছর পরও প্রেম রয়ে গেছে, শুধু ভাষা বদলে গেছে। নয়নের মনে হল, এই শুকনো পদ্মফুল আসলে তাদের না বলা ভালোবাসার নিঃশব্দ সাক্ষী, যা কখনোই মারা যায়নি। লিপি বলল, “জানি না, আমাদের আবার সব শুরু করা ঠিক হবে কিনা… তবু মন চায়।” নয়ন ধীরে ধীরে লিপির হাত স্পর্শ করল, আর মনে মনে বলল—প্রতিশ্রুতি হয়তো সময়ের কাছে হেরে যায়, কিন্তু পদ্মফুলের মতোই প্রকৃত ভালোবাসা শুকিয়ে গেলেও হারায় না, বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীরে, যতদিন পর্যন্ত না কেউ সাহস করে আবার ছুঁয়ে দেখে সেই স্মৃতি।
অধ্যায় ৯
নয়ন আর লিপির মধ্যে কথা আর নীরবতার সেই লম্বা ভ্রমণের পর একদিন নয়ন প্রস্তাব দিল, “চলো, একবার নদীর পাড়ে যাই, যেখানে সবকিছু শুরু হয়েছিল।” লিপির চোখে প্রথমে একটু দ্বিধা ভেসে উঠেছিল, তারপর সেই দ্বিধাকে ছাপিয়ে গেল এক ধরনের নরম, অচেনা আনন্দের আলো। দু’জনেই ঠিক করল, ছুটির দিনে ট্রেনে করে ফিরে যাবে সেই ছোট্ট গ্রামে, পদ্ম নদীর কাছে, যেখান থেকে তাদের গল্পের প্রথম পাতা লেখা হয়েছিল। যাত্রার পথে নয়নের চোখ জানালার বাইরে ছুটে চলা ধানক্ষেত, তালগাছ, কুয়াশায় ঢাকা মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—এত বছর পর কেনও এই ফেরা? আর লিপি জানত, উত্তর লুকিয়ে আছে সেই শুকনো পদ্মফুল আর হারিয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতির ভেতর।
গ্রামে পৌঁছানোর পর তারা হাঁটতে হাঁটতে গেল সেই নদীর পাড়ে। নদী এখনো একইভাবে বয়ে চলেছে, ঢেউয়ের ছন্দ এখনো সেই পুরনো গান গাইছে, তবু চারপাশের অনেক কিছুই বদলে গেছে—ভাঙা ঘাট মেরামত হয়েছে, নতুন ঘর উঠেছে, মানুষ বদলেছে। কিন্তু নদীর গন্ধ আর ভিজে কাদামাটির গায়ে লেগে থাকা স্মৃতিগুলো ছিল একেবারে আগের মতো। নয়ন ধীরে ধীরে নদীর পাড়ে নেমে একটা পদ্মফুল তুলল, যেটার রঙ ছিল হালকা গোলাপি আর পাঁপড়িগুলো আর্দ্র সকাল দেখে টলটল করছিল। সে লিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, আর হাত বাড়িয়ে বলল, “যদি তুমি আজও চাও, আমি আবার এই পদ্মফুল তোমাকে দিচ্ছি—নতুন করে।” লিপির চোখে সেই মুহূর্তে একসাথে ফিরে এলো পুরনো বিকেল, নদীর ঢেউ, কিশোর নয়নের লাজুক হাসি, আর সেই ভয়াবহ রাতের আতঙ্ক; সে চোখ ভিজে আসা সত্ত্বেও হাত বাড়িয়ে পদ্মফুলটা নিল, আর আস্তে বলল, “আজও চাই… বরং, আগের থেকেও বেশি চাই।”
দু’জনেই কিছুক্ষণ নীরবে নদীর ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। চারপাশের নীরবতায় যেন তাদের বুকের ধুকপুকানির শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। নয়ন বলল, “জানি না, আমরা নতুন করে শুরু করতে পারব কি না, কিন্তু একটা কথা জানি—তুমি ছাড়া আমার কোনো গল্প শেষ হয় না।” লিপিও আস্তে বলল, “এ নদীর মতোই তুমিও ছিলে আমার জীবনের গভীরে, শুধু আমি সাহস করে বলতে পারিনি।” নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে তারা বুঝতে পারল, প্রেম আসলে কেবল স্মৃতিতে বেঁচে থাকে না; সুযোগ পেলে, সাহস পেলে, সেটা আবার নতুন করে জন্ম নেয়, নতুন প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে। পদ্মফুলের নরম পাঁপড়ির মতো সেই প্রেম আবার জীবন্ত হয়ে উঠল, নদীর ঢেউয়ের মতোই অবিরাম বয়ে চলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
অধ্যায় ১০
নদীর পাড়ের সেই সকালটায় নয়ন আর লিপির মধ্যে কোনো শব্দের দরকার ছিল না—দু’জনের চোখেই স্পষ্ট লেখা ছিল শৈশবের সেই প্রথম প্রেমের না বলা গল্প, যা এত বছর পরেও শুকিয়ে যায়নি। বাতাসে ভেসে আসছিল কাদা, জল আর পদ্মফুলের গন্ধ, আর নদীর ঢেউ যেন তখনও তাদের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। নয়ন আস্তে করে লিপির হাত ধরল, স্পর্শটুকু এত বছর পরও অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হল—যেমন শৈশবে প্রথমবার লাজুক হয়ে হাত ছুঁয়েছিল। লিপির চোখ ভিজে উঠল, আর সে আস্তে বলল, “এতদিন কেন বলোনি, নয়ন?” নয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভেবেছিলাম, হয়তো তুমি ভুলে গেছ… হয়তো তোমার জীবনে আমি আর জায়গা পাইনি।” লিপি মাথা নেড়ে বলল, “ভুলিনি… শুধু ভয় পেয়েছিলাম—যদি তোমার চোখে সেই পুরনো নয়নকে আর না দেখি।”
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দু’জনের মধ্যে জমে থাকা বছরের নিরবতা ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল, আর নয়ন বলল, “চলো, নতুন করে শুরু করি… সেই দিনের মতোই, আবার পদ্মফুল দিয়ে।” সে আবারও লিপির হাতে একগুচ্ছ তাজা পদ্মফুল দিল, যেটা এই নদীরই বুক থেকে তোলা—যেমন শৈশবে দিয়েছিল, কিন্তু এবার আর লাজুক নয়, বরং এক দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে। লিপি হাত কাঁপতে কাঁপতে সেই ফুল নিল, আর চোখ বন্ধ করে সেই প্রথম প্রতিশ্রুতির কথা মনে করল, যা এক ভয়াবহ বন্যার রাতে ভেঙে গিয়েছিল। নয়নের স্পর্শে আর পদ্মফুলের গন্ধে সে টের পেল—হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো বদলে গেলেও ভালোবাসা কখনো মরে যায় না; সেটা শুধু রূপ বদলায়, অপেক্ষা করে ফিরে আসার।
দু’জন একসাথে নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখল—জীবনের প্রথম প্রেমের মতোই সহজ আর কোমল। ঢেউয়ের শব্দের মধ্যে নয়ন বলল, “এই নদী আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু আবার আমাদের ফিরিয়েও দিল।” লিপি মাথা নাড়ল, আর ধীরে ধীরে নয়নের কাঁধে মাথা রাখল। নদীর স্রোত বয়ে চলল, সূর্য ডুবে গেল, কিন্তু পদ্মফুলের প্রতিশ্রুতি এবার আর কেবল শৈশবের স্মৃতি হয়ে থাকল না; সেটা পরিণত হল জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রথম বাক্যে—যেখানে দুইটি হারিয়ে যাওয়া মন আবার এক হয়ে লিখল তাদের প্রেমের গল্প, যা নদীর ঢেউয়ের মতোই চিরন্তন।
সমাপ্ত




