Posted in

নীল রাত্রির লেপচাজগৎ

Spread the love

সুকান্ত রাহা


লেপচাজগৎ—একটি নাম, যা উচ্চারণ করলেই মন যেন শীতল হিমালয়ী বাতাসে ভরে ওঠে। এই নামের মধ্যেই জড়িয়ে আছে পাইনবনের গাঢ় সবুজ, কুয়াশার মতো মায়া, আর সেই নীরবতা যা কেবল পাহাড় জানে। কলকাতার ক্লান্ত, কংক্রিট-ভেজা দিনগুলো পেরিয়ে, আমি এসেছিলাম এখানে—একটি নির্জন আশ্রয়ের সন্ধানে।

সকালটা ছিল জানুয়ারির শেষ ভাগে, শীত এখনো রয়ে গেছে হাড়ে-মজ্জায়। দার্জিলিং থেকে ছোট একটি গাড়িতে চড়ে কুয়াশা ভেদ করে আমি পৌঁছালাম লেপচাজগৎ—দার্জিলিংয়ের কোলঘেঁষা অথচ পর্যটকদের চোখ এড়িয়ে থাকা এক অপার বিস্ময়। এই গ্রাম যেন নিজের সৌন্দর্য আড়াল করে রাখে, কেবল সেইসব মানুষের জন্য, যারা তাকে খুঁজতে জানে।

গেস্ট হাউসটির নাম ‘উত্তরধ্বনি’। কাঠের তৈরি এক পুরোনো বাংলো—ছাদে শুকনো পাইনপাতার স্তর, জানালায় কাচের ফাঁকে ফাঁকে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে। সুরেন লেপচা, বছর চল্লিশের এক গম্ভীর অথচ হাস্যোজ্জ্বল স্থানীয় মানুষ, দরজা খুলে দিলেন।

—“লিখতে এসেছেন?”
আমি মাথা নাড়ালাম।
—“তবে এই জায়গা আপনাকে ফিরিয়ে দেবে কিছু… হয়তো আপনি জানেন না, আপনি ঠিক কী হারিয়েছেন।”

এই ছিল আমার পরিচয়পর্ব। কথার ভেতর একটা গুপ্ত রহস্য ছিল, যেন কেউ আগে থেকেই বুঝে ফেলেছে আমি কী নিয়ে ভুগছি। সুরেনের কথায় ছিল এক ধরনের ঋজুতা—যা কেবল পাহাড়ি মানুষেরাই বহন করে।

ঘরের জানালা খুলতেই দেখি—পাহাড় নেমে গেছে গভীরে, সেখানে গাঢ় সবুজ বন। পাইন গাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, যেন কেউ চিরকাল অপেক্ষায় আছে। বাতাসে ভাসছে শুকনো কাঠ পোড়ানোর গন্ধ—পুরনো, পরিচিত, তবু নতুন করে ছুঁয়ে যায়।

আমি চুপচাপ বিছানার পাশে বসে ছিলাম। শহরের জীবন আমার শরীরে ক্লান্তির বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিল, লেখার প্রতি এক অনিচ্ছা, একধরনের ভীতি জন্ম নিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, শব্দেরা যেন ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু এখানে, এই স্নিগ্ধ নির্জনতায় বসে, হঠাৎ মনে হল—না, শব্দেরা মরে না, তারা কেবল অপেক্ষা করে উপযুক্ত নিস্তব্ধতার।

সন্ধ্যার আগে একটু হেঁটে বেরোলাম। পথ ধরে নামলে একটা ছোট দোকান দেখা যায়, যার সামনের বারান্দায় পাইন কাঠ জ্বলে। কুয়াশা জমেছে হালকা করে, কানে আসছে মৃদু ঘণ্টাধ্বনি—বোধহয় কাছেই কোনো গুম্ফায় বৌদ্ধ ভিক্ষুর প্রার্থনা চলছে।

চায়ের দোকানে বসে চায়ের কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে বুঝতে পারলাম—এই শীতলতায় সবচেয়ে উষ্ণ জিনিসটি আসলে চায়ের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া নিরবতা। দুজন পাহাড়ি মানুষ পাশের বেঞ্চে বসে কথা বলছে, কিন্তু তাদের কথার ভেতরেও এমন এক ধীরতা, যা শব্দকে ছাপিয়ে যায়।

রাতে ঘরে ফিরে কাঠের উনুনে আগুন জ্বালালাম। আগুনের আলো ঘরের কোণে কোণে লালছায়া ছড়াল। সেই আলোর মধ্যে আমি হাত বাড়িয়ে তুললাম আমার পুরনো নোটবুকটা—হলুদ হয়ে যাওয়া পাতায় ধুলো জমেছে, কিন্তু সেই ধুলোতেও লেখা আছে কিছু অপূর্ণ লাইন।

লেখা শুরু করলাম। দীর্ঘদিন পর হাতে কলম তুলে নিলাম, যেন নিজেকে ছুঁয়ে দেখলাম নতুন করে। প্রথম লাইনে লিখলাম:

“এই পাহাড়ি নিঃশব্দতা শুধু নীরবতা নয়—এ এক উচ্চারণহীন আহ্বান। যেখানে শব্দেরা জন্ম নেয়, আবার মরে যেতে যেতে রচে কবিতা।”

সেই রাতে আমি ঘুমালাম চুপচাপ, এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। জানালার বাইরে তখনো কুয়াশা ঝুলে, পাইন গাছের ছায়ায় জড়ানো এক অচেনা সৌন্দর্য। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, কিন্তু আমার ভেতরের সময় সেখানে থেমে গেছে।

এই তো শুরু—লেখার, নির্জনের, পাহাড়ের আর নিজের ভিতর ফিরে পাওয়ার।

***

দ্বিতীয় সকালে ঘুম ভাঙল এক পাখির ডাকে, যার নাম জানি না। তার কণ্ঠে ছিল না কোনো জোর, বরং এক আশ্চর্য ধৈর্য। মনে হচ্ছিল, এই ডাক কোনো মানুষকে উদ্দেশ করে নয়—বরং নিজেকেই স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা। ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা বেজে পঁচিশ। জানালার বাইরে সোনালি রোদের ভেতর দিয়ে ঘন কুয়াশা ছুটে চলেছে, যেন এক চুপচাপ পালানো দৃশ্যপট।

আমি কেবল উলের চাদর গায়ে জড়িয়ে ধীরে ধীরে উঠে পড়লাম। গেস্ট হাউসের রান্নাঘরে তখন চায়ের জল বসেছে, আর সুরেন লেপচা হালকা গলায় হুইসল করছে কোনও পুরনো পাহাড়ি গান। আমি কাপে গরম চা নিয়ে সামনে খোলা বারান্দায় বসলাম। পাইন গাছের সারি আমার ঠিক চোখের সমান্তরালে, যেন কোনো মহাকাব্যিক বৃক্ষরাজি পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই নিঃসঙ্গ লেখকের নিঃশব্দ উপাখ্যানের সামনে।

পাইন গাছের গায়ে সূর্যের আলো খেলে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করছিলাম—এই গাছগুলো কতকটা মানুষের মতোই। চুপচাপ, দীর্ঘ, নিঃশব্দে সহ্য করে যাওয়া সবকিছু। একেকটা গাছ যেন একেকটা জীবনের প্রতিচ্ছবি—ধীর, ধৈর্যশীল, গভীরভাবে জড়ানো শেকড়ের সঙ্গে। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি, আর মনে হয় তারা আমাকে কিছু বলতে চায়—অথবা আমিই শুনতে চাই এমন কিছু, যা আমার অন্তর্গত নীরবতায় সুর তোলে।

সেইদিন সকালটা কাটালাম হেঁটে হেঁটে। গেস্ট হাউসের পেছনের দিকে উঠে গেছে একটি ছোট ট্রেইল, পাথরের গায়ে গায়ে ভাঙা পাতার স্তর। সেই পথে হেঁটে চললাম আমি, সঙ্গে কেবল আমার ছায়া, আর মাঝে মাঝে পাইন পাতা ভেদ করে আলোছায়ার খেলা। কিছুদূর গিয়ে একটি ফাঁকা জায়গায় পৌঁছলাম—একধরনের উপত্যকা, যার মাঝখানে এক প্রাচীন পাথর পড়ে আছে। ওই পাথরটা যেন বহুবছরের ধ্যানরত এক ঋষি।

আমি সেখানে বসে পড়লাম। চারদিকে পাখিদের ডাক, দূরে কোনো গরুর গলার ঘণ্টা বাজছে, আর পাইন গাছের মাথা থেকে ঝরে পড়ছে শুকনো সুগন্ধি ছায়া। আমি চুপচাপ শুয়ে রইলাম ওই পাথরের উপর, আকাশের দিকে চেয়ে। তখন মনে হল—এই শূন্যতা আসলে ভয়ংকর নয়। বরং এই শূন্যতাই তো প্রয়োজন ছিল আমার।

লেখালেখি জীবনের শুরুতে, আমি বিশ্বাস করতাম শব্দই শেষ কথা। শব্দ দিয়ে সব বলা যায়, সব বোঝানো যায়। কিন্তু লেপচাজগতের এই মুহূর্ত আমাকে শিখিয়েছে, কিছু কিছু অনুভব শব্দের ঊর্ধ্বে। এই নিঃশব্দতা, এই পাইনবনের গাঢ়তা, এই পাথরের প্রাচীনতা—সব মিলিয়ে এক অবর্ণনীয় উপলব্ধি।

আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল। ছেলেবেলায় একবার বাবার সঙ্গে কালিম্পং গিয়েছিলাম। সেখানেও এমন এক পাথরের ধারে বসেছিলাম, তখন কিছুই বুঝতাম না—তবু মনে হয়েছিল, পাহাড়ের গায়ে কিছু লেখা আছে, যা কেউ পড়তে পারে না। আজ, এত বছর পর, সেই অনুভব আবার ফিরে এল। যেন এই পাথর, এই গাছ, এই বাতাস—সব কিছু মিলে আমার ভিতরের হারিয়ে যাওয়া ছেলেটিকে ডেকে আনছে।

হঠাৎ পকেট থেকে ডায়েরিটা বের করলাম। কোনো লেখা ছিল না তাতে এখনো। কিন্তু শব্দেরা যেন ভিতরে ভেতরে জেগে উঠছে। কলম হাতে তুলে আমি লিখলাম—

“একেকটা গাছ একেকটা পুরুষ—নিঃশব্দ, উচ্চকিত নয়, কিন্তু নিজের ভিতর বয়ে চলেছে শতাব্দীর গল্প। আমি আজ তাদের একজন হয়ে উঠতে চাই।”

বিকেলের দিকে ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে। সুরেন কিছু না বলেই বুঝে গেল আমি কোথায় ছিলাম। তিনি শুধু বললেন, “ওখানে গেলে মানুষের ভিতরকার ব্যথাগুলো কাঁটার মতো খুলে পড়ে যায়। নতুন করে জন্ম নেয় কিছু।”

সেই রাতে আগুনটা বেশ ভালো জ্বলছিল। আমি কাগজে কলম ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বুঝে যাচ্ছিলাম—আমি আবার লিখছি। সত্যিকারের লেখা—যেখানে শব্দ আসে হাওয়ার মতো, আর তারা কিছু চাপায় না, কেবল উন্মোচিত করে।

***

সেই দিনটির দুপুর ছিল অদ্ভুত। সূর্য উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু আলো যেন হাওয়ার ভেতরেই আটকে ছিল কোথাও। পাহাড়ি হাওয়ার ভিতরে কুয়াশার গন্ধ মিশে গিয়েছিল, আর চারদিকে একপ্রকার ভেসে থাকা হিম—যেন আঙুল ছুঁলে গলে যাবে আবার স্পর্শ না করলেও সে রয়ে যাবে।

আমি তখন বারান্দায় বসে ছিলাম, আমার সামনে এক কাপ লিকার চা, আর পাশে খোলা ডায়েরি। চোখে ছিল কিছু লেখা না-পারার ক্লান্তি, আর মাথার ভেতর ঘুরছিল এক নারী—মেঘমালা।
তার নাম এখনো মনে হলে বুকের ভিতরে এক ঠান্ডা নদী বয়ে যায়।

সে ছিল আমার কলেজ জীবনের প্রিয়তমা। কাব্য ভালোবাসত, নোটবুকের পাতায় পাতা ছিঁড়ে চিঠি লিখত। একদিন বলেছিল, “তুমি হয়তো একদিন পাহাড়ে গিয়ে নিজেকে খুঁজবে, আর আমি তখন সমুদ্রে দাঁড়িয়ে তোমার প্রতিধ্বনি শুনব।” আমি হেসেছিলাম সেই সময়—সত্যি বলতে, আমি বিশ্বাস করতাম না যে মানুষ নিজেকে হারায়, অথবা খুঁজে পায়। কিন্তু আজ, এই হিমে ঢাকা দুপুরে, সেই কথাগুলো যেন চারপাশের মেঘের সঙ্গে মিলেমিশে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।

দুপুরে একটু পায়ে হেঁটে নিচে নেমে এলাম। পাথরের গায়ে ভেজা আর হালকা কুয়াশার পুরু চাদর। গাছের গায়ে শিশির জমে ছিল—আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখলে জমাট একটা ঠান্ডা কেঁপে ওঠে গায়ে। তখন হঠাৎ করেই শুনলাম একটা মন্দ সুর—পাহাড়ের উপর দিয়ে হাওয়া যেভাবে বয়ে যায়, তাতে একরকম বাঁশির সুর হয় কখনো কখনো। অথচ কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে না। সেই সুর যেন আমার ভিতরের কোনও গল্পকে জাগিয়ে তুলল।

একটি ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে আমি পৌঁছালাম এক খোলা জায়গায়। চারদিক ঢেকে আছে মেঘে, অথচ নিচের বনভূমির রেখাগুলো আবছা ভেসে আছে। পাথরে বসে আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, আর সেই হাওয়ার ভেতর কেমন যেন একটা হাতের ছোঁয়া—যেন মেঘমালার হাত!

আসলে স্মৃতি কখনো সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না। তারা বরং সময়ের সঙ্গে রঙ বদলায়। যে ব্যথা একসময় কেঁদে ফেলত, আজ সেই ব্যথাই কেবল এক ঠান্ডা হিমেল হাওয়া—যা এসে ছুঁয়ে দিয়ে চলে যায়।

সেই দুপুরে আমি লেখালেখির জন্য আর ডায়েরি খুলি না। বরং বসে থাকি নিঃশব্দে। এই পাহাড়ি স্থবিরতা যেন আমার মনে বসে থাকা হাজার শব্দকে ছেঁকে নিচ্ছে—কি রেখে যাবে, কি সরিয়ে দেবে, তা বেছে নিচ্ছে প্রকৃতিই।

একসময় ফিরে আসি গেস্ট হাউসে। সুরেন তখন চুলার সামনে বসে মোমো বানাচ্ছেন। আমাকে দেখে বলেন, “আজ মেঘ নেমে এসেছে একদম নিচে। এমন দিনে কেউ কেউ পুরোনো জিনিস মনে করে ফেলে।”

আমি হেসে বলি, “তাই তো! হয়তো পাহাড় মানুষকে তার ভুলে যাওয়া গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয়।”

রাতের খাওয়া সেরে আমি আবার ডায়েরি খুলি। তাতে প্রথমবার লিখি মেঘমালার নাম। বহু বছর ধরে আমি চেষ্টা করেছি তাকে লিখে ফেলতে, কিন্তু পারিনি। সে যেন রয়ে গিয়েছিল সব গল্পের পেছনে, সব কবিতার ফাঁকে।

সেই রাতে আমি লিখি:

“মেঘে ঢাকা দুপুরে আমি তোর নাম লিখে রেখেছি, হাওয়ার কাছে। যদি কখনো সে তোমার দিকেও বয়, তাহলে বুঝে নিও—আমি এখনো একা, কিন্তু আর নিঃসঙ্গ নই।”

ঘুম আসতে দেরি হয়। জানালার ওপারে মেঘ জমে আছে এখনো, পাহাড়ের কোলে যেন কোনো এক লুকোনো স্তব্ধতা। কিন্তু আমি জানি, এই স্তব্ধতার মধ্যেই শব্দেরা গড়ে উঠছে, আর আমার ভিতরের লেখক ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।

***

লেপচাজগতের সন্ধ্যা আসে নিঃশব্দে, যেন হাওয়ার পায়ের শব্দ নেই, আর সূর্যের বিদায়-আলো হারিয়ে যেতে যেতে কেবল রয়ে যায় কাঠের ঘরের গায়ে পড়া ম্লান হলুদ আভা।
সে সন্ধ্যা শহরের মতো চেঁচিয়ে আসে না। এখানে রাত নামা মানে কোনো শেষ নয়, বরং এক দীর্ঘ শুরু—নিজের গভীরে নেমে যাওয়ার।

সেদিন বিকেলেই প্রথম লক্ষ করলাম—গেস্ট হাউসের কাঠের দেয়ালগুলো যেন নিঃশব্দে কথা বলে। আগুনের পাশে বসে যখন আমি চা খাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ একটি ক্র্যাক… এক অতি সূক্ষ্ম শব্দে চমকে উঠলাম। সুরেন হেসে বলল, “ওটা ঘরের কথা… কাঠের শরীরও বয়স বাড়লে কাঁদে, হেসে ওঠে।”

বাইরে তখন হালকা কুয়াশা, দূরের আলো একেবারে আবছা। পাহাড়ের বুক বেয়ে নামা পথগুলো হারিয়ে যাচ্ছে কুয়াশার বুকে। কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল। সেই ডাকে ভয় ছিল না, ছিল একধরনের আত্মীয়তা—যেন পাহাড়ও তার বাসিন্দাদের সন্ধ্যা নামার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

আমি গেস্ট হাউসের বারান্দা ছেড়ে কিছুদূর হাঁটতে বেরোলাম। সঙ্গে আমার পুরনো ছাতা, গায়ে হালকা কোট। কুয়াশা তখন নেমে আসছে ঘাড় বরাবর। যে রাস্তাটা দুপুরে এতখানি আলোকোজ্জ্বল ছিল, সন্ধ্যায় সে রূপ নিয়েছে এক ধোঁয়াটে ধাঁধায়।

কোনো মানুষ নেই পথে। একটাও গলা নেই, একটাও চিৎকার নেই।
শুধু পায়ের নিচে শুকনো পাইনপাতা মচমচ করে ওঠে। এই শব্দই তখন আমার একমাত্র সঙ্গী।

তখনই হঠাৎ একটা দৃশ্য চোখে পড়ল। বাঁদিকে পাথরের নিচে ছোট একটা মন্দির—একটা পাহাড়ি দেবীর স্থান, নাম লেখা নেই কোথাও। দুটো ধূপের কাঠি জ্বলছে, কেউ কবে রেখে গেছে তা বোঝা যায় না। এই ধরণের মন্দিরে কোনো চাঁদোয়া থাকে না, থাকে কেবল খোলা আকাশের নীচে পাহাড় আর মানুষের প্রার্থনা।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। অন্ধকারের গায়ে আগুনরঙা ধূপের আলো এক আশ্চর্য আবেশ তৈরি করছে। মনে হল, এই আলো আমি আগে কোথাও দেখেছি। হ্যাঁ—কলেজের দিনগুলিতে, মেঘমালা একবার আমার জন্য একটি মোমবাতি জ্বালিয়েছিল, জন্মদিনে, হোস্টেলের ছাদে।
সেই মোমবাতির আলো, আর এই পাহাড়ি ধূপের আলো—দুটিই আলাদা, অথচ একইরকম নিঃশব্দ।

ফিরে আসার পথে, পথের বাঁকে হঠাৎই একটা বয়স্ক পুরুষ দেখা দিলেন। মুখে শীতের টুপি, হাতে লাঠি। আমি সালাম করলাম, উনি তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “আপনি কি লেখেন?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, মানে চেষ্টা করি।”
তিনি মাথা নাড়লেন, “তবে আপনার মন এখনও থিতু হয়নি। পাহাড়ে যে মানুষ আসে, সে যদি ভিতর থেকে খালি থাকে, পাহাড় সেটা বুঝে ফেলে।”

এই বাক্যটা আমায় খানিক ধাক্কা দিল। আমি ভাবলাম, আমার কি সত্যিই ভিতরটা এখনো ছড়ানো ছিটানো? এই যে এত নিঃশব্দতা, এত একাকীত্ব—এ কি আমার মনকে গেঁথে রাখছে, না ভাসিয়ে দিচ্ছে?

রাতে ফিরে এসে আগুন জ্বালিয়ে বসলাম। সুরেন এসে বলল, “আজ আপনি একটু অন্যরকম লাগছে।”
আমি বললাম, “মনে হয় পাহাড় আমার ভেতরের শব্দগুলোকে শুনে ফেলেছে।”
সুরেন চুপ করে রইল। তারপর বলল, “সব লেখক এটাই চায়। শব্দ নয়, শব্দেরও ভিতরে যে গন্ধটা থাকে, সেইটাকে ছুঁতে।”

সে রাতে আর কেউ থাকল না গেস্ট হাউসে। বাকি ঘরগুলো খালি। পাহাড়ের বুক জুড়ে যেন আমি আর এই কাঠের ঘরটাই আছি—আর আছি শীত, কুয়াশা, আগুনের টুকরো আলো।

বিছানায় শুয়ে আমি কানে শুনছিলাম কাঠের ক্র্যাক শব্দ—বেশিক্ষণ পরপর না, যেন নিঃশ্বাসের ছন্দে। মনে হল, এই শব্দেরও একটা জীবন আছে।
আমি ডায়েরি খুলে লিখলাম—
“যে ঘর রাতে জেগে থাকে, তার চেয়েও বেশি জেগে থাকে সেই মানুষ, যে তার শব্দ শুনতে পায়। আমি আজ শব্দের চেয়ে শব্দহীনতাকে ভালোবাসতে শিখছি।”

চোখ বন্ধ করার আগে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল—মেঘমালা, আমার জন্মদিনের সন্ধ্যায় আমার নামের আদ্যাক্ষর বানিয়ে রাখা আলোয় বসে বলেছিল, “তুমি চুপ থাকলে আমি ভয় পাই না, কারণ জানি, তোমার ভিতরে তখন শব্দেরা জন্ম নিচ্ছে।”

আজ যেন সেই কথাটাই পাহাড়ের কাছ থেকে শুনলাম। কুয়াশা আমার কপালে লেগে ছিল, আর সেই স্পর্শেই বুঝলাম—এই পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে শব্দ ছুঁয়ে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে নিঃশব্দ হয়ে ওঠে।

***

সকালটা ছিল অস্বাভাবিক রকম নীল। আগের দিন রাতের কুয়াশা একটুও রয়ে যায়নি, যেন আকাশ নিজেই নিজেকে ধুয়ে-মুছে তৈরি করেছে নতুন করে। আকাশের সেই ঊজ্জ্বলতা আমার চোখে এসে এমনভাবে লাগছিল, যেন কোনো অতীতের দরজা খুলে যাচ্ছে।

আমি যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, ঠিক তখনি মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল একটি ঈগল। তার ডানার শব্দ হালকা, কিন্তু মস্তিষ্কে যেন বাজিয়ে গেল এক নির্দিষ্ট ছন্দ। সেই শব্দ শুনেই মনে হল, আমি আগে এ রকম এক সকালের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কোথায় যেন—হয়তো রাজস্থানের মরুভূমিতে, অথবা শিলং-এর কোনও পাহাড়ি ছাউনিতে। কিন্তু আজকের সকালের মধ্যে একটা বাড়তি কিছু ছিল—সেই ডানার শব্দ যেন স্মৃতি খুলে দেওয়ার চাবির মতো।

সুরেন সেদিন ভোরে কোথাও গিয়েছিল, চা বানাবার লোকও আসেনি। আমি কেটলিতে নিজেই জল বসালাম। কাঠের রান্নাঘরের জানালার বাইরে পাইন পাতায় আলোর খেলা শুরু হয়ে গেছে, আর ছোট ছোট চড়াই ডাকছে একটু অন্যরকম গলায়।

চায়ের কাপ নিয়ে আমি চলে গেলাম গেস্ট হাউসের পেছনের দিকে। সেখানে একটা ছোট গুদামঘর আছে, অনেকদিনের পুরনো কাঠ, চাবি লেগে থাকে না। আগেরদিন সন্ধ্যায়ই ভাবছিলাম জায়গাটা ঘুরে দেখব।

দরজা ঠেলেই ভেতরে ঢুকলাম। একটু ধুলো, কিছু কাঠের বাক্স, পুরনো ক্যালেন্ডার, কয়েকটা ছেঁড়া বালতি, আর এক কোনে পড়ে থাকা ধূলিমাখা লোহার ট্রাঙ্ক। কে জানে কবে থেকে ওখানে আছে। চুম্বকের মতো আমি এগিয়ে গেলাম।

চাবি ছিল না, কিন্তু অনেক পুরনো ট্রাঙ্কের মতো এটাও একটুখানি চাপ দিতেই খসে খুলে গেল।

ভেতরে ছিল কিছু পুরনো কাগজপত্র, কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো পুরনো পাহাড়ি ছবির প্রিন্ট, দুটো ধূসর নোটবুক—আর, আশ্চর্যজনকভাবে, পাঁচটা পোস্টকার্ড। হাতে তুলে নিতেই মনে হল, যেন কেউ আমাকে দিয়ে পড়াতে চেয়েছে এগুলো, যেন এগুলো আমারই লেখা, অথবা আমারই প্রতীক্ষা করছিল এতদিন ধরে।

পোস্টকার্ডগুলো চমকে দেওয়ার মতো। লেখা ছিল হাতে, ইংরেজিতে, কিন্তু খুব পরিমিত।
প্রথমটি লেখা ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে:
“The skies here remind me of your silences. I wish I could say what you never let me.”

দ্বিতীয়টি –
“The trees are taller than your promises. Still, I believe they’ll hold.”

আর তৃতীয়টি –
“Your absence has shape here. It walks beside me like a wind I can’t touch.”

সেই মুহূর্তে মনে হল, এই কার্ডগুলো কোনো নারী লিখেছে, কারও জন্য যে পাহাড়ে একাকী থেকেছে কখনো। কে সেই প্রাপক? কে সেই প্রেরক? এবং, কেন এই পোস্টকার্ডগুলো আজও রয়ে গেছে এখানে?

আমার মাথায় বিদ্যুতের মতো একটা চিন্তা খেলে গেল—হয়তো এই গেস্ট হাউসে, এই ঘরেই, একসময় এক নারী লেখিকা এসেছিলেন, যার ভিতরেও ছিল শূন্যতা, নির্জনতা, আর এক অনুচ্চারিত প্রেমের গল্প। আর এখন, সেই একই ঘরে, বহু বছর পর, আমি দাঁড়িয়ে আছি এক পুরুষ লেখক হয়ে।

আমি নিজেকে কেমন যেন আয়নায় দেখলাম—তবে সেই আয়নায় একটা নারী প্রতিবিম্বও ছিল।

তখন হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল।
মেঘমালা একবার একটা কথা বলেছিল—“আমরা প্রত্যেকে একেকটা চিঠি, যাকে কেউ কখনও পোস্ট করেনি। কিংবা করেছে, কিন্তু ঠিকানায় পৌঁছায়নি।”

আজ এই পোস্টকার্ডগুলো যেন তার সেই কথারই প্রত্যয়।

আমি সেদিন ট্রাঙ্ক থেকে কেবল পোস্টকার্ডগুলোই বের করলাম। বাকিটুকু যেমন ছিল তেমনই রেখে দিলাম, যেন অতীতের ইতিহাসে আমি কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ না করি।

ফিরে এসে বারান্দায় বসলাম। আকাশ তখনো নীল, যেন ঈগলের ডানা তার মধ্যে দিয়ে উড়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। আমি কাগজ নিয়ে বসে গেলাম। এই প্রথম বার মনে হল, আমি শুধু নিজের গল্প লিখছি না—লিখছি অন্যদের হয়ে, যাদের কণ্ঠ থেমে গেছে, কণ্ঠরোধ হয়ে গেছে হয়তো সময়ের চাপে।

আমি লিখলাম—
“There are postcards in this world that find us, even when they are not meant for us. They carry old winds, folded silences, and stories waiting for someone to give them a body.”

লেখা থামিয়ে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তখন মনে হল, লেখালিখির চেয়েও বড় কিছু হয়তো গ্রহণ করার ক্ষমতা। আমি যেন আজ সেই অর্থে একজন শ্রোতা হয়ে উঠেছি—সেইসব চিঠির, সেইসব না-বলা কথার, যারা বহু বছর ধুলোয় চাপা পড়ে থেকেও অপেক্ষা করছিল শুধু একজোড়া চোখ আর মন যা তাদের মানে দিতে পারবে।

সন্ধ্যার দিকে যখন সুরেন ফিরে এল, আমি তাকে পোস্টকার্ডগুলোর কথা বললাম।
সে একটু হাসল, বলল, “আজ্ঞে, শুনেছি আগে একজন মিসেস কুটিয়াল থাকতেন এখানে, তাঁর স্বামী সেনাবাহিনীতে ছিল। উনি খুব লিখতেন, একা থাকতেন। কার্ডগুলো তাঁরই হতে পারে।”

আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।
যেন অতীত হঠাৎ আমার আশেপাশে গাঢ় হতে শুরু করেছে, আর আমি নিজেই হয়ে উঠেছি তার এক অবচেতন উত্তরাধিকারী।

সেই রাতের ঘুমটা অনেক দেরিতে এল।
ঘুমের ভেতর আমি দেখলাম এক নারী, উলের চাদরে ঢাকা, চুল খোলা, কাঠের ঘরের জানালার পাশে বসে লিখছেন। তার হাত থেমে থেমে চলছে, আর বারান্দার বাইরে পাহাড়ের আকাশে এক ঈগল চক্কর দিচ্ছে।

তার চোখে যে দৃষ্টি, তা যেন বলে,
“কেউ পড়বে… কেউ একদিন ঠিকই বুঝবে…”

আর আমি সেই পাঠক।

***

সেই সকালটা ছিল নিস্তব্ধতার নিখুঁত সংজ্ঞা। বাতাস হালকা ধূসর, যেন ধোঁয়া নয়, শব্দহীন এক ধরণের আবরণ যা শব্দকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় কিন্তু কোথাও ধাক্কা খায় না। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি, পাইন গাছের পাতায় জল জমেছে, আর কুয়াশা পেছনের পাহাড়গুলোকে ঢেকে রেখেছে এক বর্ণহীন পর্দায়।

আজ আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করছিল না। মনে হচ্ছিল, বারান্দায় বসে থাকি সারাটা দিন। হাতে কাগজ-কলম, পাশে চায়ের কাপ, দূরে কিছুই নেই—শুধু পাহাড় আর আমি।

সুরেন চুপচাপ এসে বলল, “বাবু, আজ বেশ ঠান্ডা। বেশি বেরোবেন না।”

আমি হেসে বললাম, “বেরোবার কথা ভাবছি না। আজ শুধু লিখব।”

সেইবারান্দা—যেখান থেকে দূরের পথগুলো, পাহাড়ের ঢাল, পাখিদের ওড়া সব দেখা যায়—সেই জায়গাটাই হয়ে উঠল আজকের আমার লেখার ঘর। আমি জানি না কী লিখতে চাই। মনে হচ্ছিল শুধু শব্দ সাজাতে ইচ্ছে করছে, ঠিক সেইভাবে যেমন শিশির জমে পাইন পাতায়—যথাযথ, বিনম্র, শব্দহীন।

হঠাৎই মনে পড়ল, অনেকদিন কোনো কবিতা লেখা হয়নি। গতকালকার সেই পোস্টকার্ডের কথাগুলো এখনও মাথায় বাজছে।

‘Your absence has shape here.’

আমি ভাবলাম, অনুপস্থিতিরও কি রূপ হয়? পাহাড়ে এসে যেন এই ধারণা সত্যি মনে হয়। একজন মানুষ না থেকেও যে উপস্থিত থাকে, সেই উপস্থিতির শব্দই হয়তো এই কুয়াশা।

ডায়েরি খুলে লিখতে শুরু করলাম। শুরুটা ঠিক কবিতা ছিল না, ছিল টুকরো অনুভব—

“বারান্দার ধোঁয়ায় গলে যাওয়া একটি নামহীন কবিতা, যে কবিতায় তুমি নেই, তবুও আছ— মেঘের ছায়ার মতো, স্পর্শে অনুপস্থিত।”

লিখে থামলাম। এত সহজভাবে অনুভূতিকে ধরতে পারব, ভাবিনি। পাহাড়ের এই নীরবতাই যেন শব্দের ভিতরকার গন্ধটাকে টেনে এনে সামনে বসিয়েছে। মনে হচ্ছিল, শব্দ নয়, আমি যেন গন্ধ লিখছি, ছায়া আঁকছি।

সেইসময় বারান্দার ঠিক একপাশে একটা নতুন শব্দ কানে এলো। পাথরের উপর জুতোর ঘর্ষণের শব্দ, তারপর হালকা কাশি। মাথা ঘুরিয়ে দেখি, একটা বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে—কালচে কোট, চোখে চশমা, হাতে একটা ছোট নোটবুক।

আমি উঠে দাঁড়াতে উনি বললেন, “বসুন, বসুন। আমি নীচের বাগানে কাজ করি। শুনেছি আপনি লেখেন।”

আমি একটু লাজুক গলায় বললাম, “কিছু লেখার চেষ্টা করি।”

উনি মৃদু হাসলেন, তারপর বললেন, “পাহাড়ে যারা লেখে, তারা শুনতেও জানে। আমি মাঝে মাঝে কিছু ছড়া লিখি পাহাড় নিয়ে। আপনি যদি একদিন পড়ে শোনান, খুশি হব।”

আমি মাথা নাড়লাম। তিনি নাম বললেন ‘রিনচেন দা’। পাহাড়ের একজন নির্জন ছায়াকবি, যিনি নিজের কবিতা নিজের মতো করে বাঁচান।

আমার মনে হল, এই মানুষটির উপস্থিতি যেন আমার লেখায় আরও একটা পরত যোগ করে দিল।

তিনি চলে যাওয়ার পর আমি ডায়েরির পাতা ফের উল্টাতে লাগলাম। এবার যে লাইনগুলো এল, তারা যেন ধীরে ধীরে আমার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল—

“যখন তুমি কাছে ছিলে, আমি শব্দ খুঁজে পেতাম না, আজ তুমি নেই, শব্দেরা সারি বেঁধে আসে জানলার কুয়াশা ছুঁয়ে।”

লেখার মধ্যেই হঠাৎ দূরের এক ঘুঘুর ডাক ভেসে এল। আমি জানি না কেন, মনে হল এ ডাক কোনও পাহাড়ি ভাষার নামহীন বাক্য—যা কেবল অনুভবে ধরা যায়।

চা ঠান্ডা হয়ে এসেছে, ডায়েরির পাতা সাদা থাকছে না। শব্দেরা নিজে থেকেই চলে আসছে, যেন তারা এতদিন অপেক্ষা করছিল এই পাহাড়ি নীরবতার, এই কুয়াশার, এই বারান্দার জন্য।

কবিতা নামহীন থেকে যাচ্ছে, যেমন অনেক প্রেম, অনেক অপেক্ষা, অনেক চিঠিও থাকে। কিন্তু তবু সেগুলো লেখা হয়, কারণ লিখতে না পারলে ভিতরটা ফেটে যেত।

সন্ধ্যা নামতে নামতে, আমি সেই কবিতাগুলোর পাতা গুছিয়ে রাখলাম। আগুন জ্বলল, আবার সেই কাঠের ঘর শব্দ করতে লাগল—ক্র্যাক… ক্র্যাক… যেন তারও বলার ছিল কিছু।

আমি শুয়ে পড়ার আগে শেষ লাইনটা লিখলাম—

“তুমি যদি কোনওদিন ফিরে আসো, এই কবিতার ভিতরে খুঁজে নিও আমাকে।”

বারান্দা তখন অন্ধকার। আমি জানি, কোথাও, কেউ, হয়তো সেই কবিতার শব্দে কান পেতে আছে।

***

পাহাড়ি সন্ধ্যাগুলোতে যখন চারপাশের শব্দ নিঃশেষ হতে শুরু করে, তখন একটা ভেতরের আলো জ্বলে ওঠে। সেদিন সন্ধ্যায় আমি বারান্দায় বসে ছিলাম, সামনে চায়ের কাপ, পাশে রিনচেন দার দেওয়া ছোট্ট হ্যান্ডবাউন্ড নোটবুক।

আকাশ তখন ঘন ধূসর নীল, ঠিক সেই রঙ যেটা ছবিতে আঁকা যায় না। বাতাসে এক ধরনের টান ছিল, যেটা কেবল পাহাড়ে অনুভব করা যায়—যেন প্রকৃতি কারও অপেক্ষায় আছে।

তখনই হঠাৎ সিঁড়ির ধারে চোখ পড়ল—একটা পুরনো খামহীন চিঠি পাথরের উপর পড়ে আছে। কেউ ফেলেছে? উড়ে এসেছে? না কি কোনো পুরনো বাতিল বইয়ের পাতা?

তুলে নিতেই অনুভব করলাম, কাগজটা সাদা নয়—হালকা বাদামি, প্রান্ত ছেঁড়া ছেঁড়া। হাতে লেখা, কালি হালকা নীল, কিন্তু অক্ষরগুলো এখনো স্পষ্ট।

চিঠির কোনো সম্বোধন নেই, প্রাপকও নেই। শুধু লেখা:

“তুমি যে নাম বলোনি, আমি তাতেই তোমাকে চিনি। তোমার নীরবতাই আমার শব্দের শিকড়, যখন পাহাড় কাঁপে, তখনও তুমি আমার ভিতর নিঃশব্দে হাঁটো।

আজ যদি আমি ফিরে যাই, জানো, আমার কাঁধে থাকবে তোমার প্রতীক্ষা। তুমি চিঠি লেখো না—কিন্তু আমি পাই। এই পাহাড়ই আমার ডাকবাক্স।”

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। চিঠিটা যেন আমারই মনের কথা—যেন বহু বছর আগে কেউ আমার অনুভব লিখে রেখে গেছে এই পাহাড়ের গায়ে।

সেই মুহূর্তে আমি বিশ্বাস করলাম, পৃথিবীতে কিছু লেখা মানুষের থেকে নয়, আসে বাতাস, মেঘ বা অরণ্য থেকে। সেইসব লেখা খামবিহীন থাকে, ঠিকানা ছাড়াই পৌঁছে যায় ঠিক জায়গায়।

আমি চিঠিটা নিজের ডায়েরির ভেতরে রেখে দিলাম। এরপর অনেকদিন হয়তো এমন লেখা আর পাব না, কিন্তু আমি জানি, আমার চারপাশে এখনো অনেক চিঠি ভেসে বেড়ায়—শব্দহীন, অথচ পাঠযোগ্য।

পাহাড়ের সেদিনের রাতটা ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু আমার ভিতর লেখায় ভরে উঠছিল। পরদিন সকালেই লিখলাম—

“চিঠির খামে ঠিকানা না থাকলেই, পৌঁছায় ঠিক সেসব হৃদয়ে, যারা অপেক্ষা করে নীরবে— অরণ্যের আড়ালে, পাথরের নিচে, একবার শুধু খোলা হাওয়ার শব্দে।”

আমি সেই পাঠক—যে চিঠি পায়, লিখে না, অথচ পড়ে যায় নিঃশব্দে।

***

সকালবেলা ঘুম ভাঙল এক অদ্ভুত কোলাহলে। দূরে পাহাড়ের কোলে কে যেন গলা ছড়িয়ে গান গাইছে। সুরটা পরিচিত নয়, তবু অচেনা মনে হয়নি। জানালার কাচে জল জমে কুয়াশার একটা স্তর গড়ে তুলেছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের প্রথম আলো আসছে, কিন্তু পুরোপুরি রোদ নামেনি এখনও।

আজ আমার মনে হল, আমি যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি। একটা অদ্ভুত অনুভূতি—যেখানে আত্মা বুঝে ফেলে সে ঠিক কোন ঘরের অতিথি নয়। আমি যে কটেজে ছিলাম, তার চারপাশ আজ যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি অচেনা লাগছিল।

সুরেনের মুখ আজ সকাল থেকে দেখা যায়নি। চা নিয়ে এল অন্য একজন, নাম বলল বিকাশ। বলল, “সুরেনদা শহরে গেছে, দুপুরে ফিরবে।”

চা হাতে নিয়ে আমি আবার সেই বারান্দায় বসলাম। ভাবছিলাম, এতদিন ধরে পাহাড়ে থেকে থেকেও আমি কি আদৌ এর কোনও খাঁটি রূপ চিনতে পেরেছি? এই নিঃশব্দতা, এই ছায়া, এই ঘন কুয়াশা—তারা কি আমাকে গ্রহণ করেছে? নাকি আমি কেবল দর্শক হয়েই থেকে গেছি?

কয়েকদিন আগে যে চিঠিটা পেয়েছিলাম, সেটাও বের করলাম। খাম ছিল না, নাম ছিল না, তবু প্রতিটি অক্ষর মনে হচ্ছিল আমার চেনা। চিঠির ভাষায় এমন কিছু ছিল, যা কেবল অন্তরের পাঠকই বুঝতে পারে। আমি জানি না, চিঠিটা কে লিখেছিল, কিন্তু এটুকু জানি, এমন লেখার জন্ম মানুষের হাতে হলেও, প্রেরণা আসে প্রকৃতি থেকে।

আমি ভাবতে শুরু করলাম, সত্যিকারের হারিয়ে যাওয়ার মানে কী? শহরের কোলাহলে না থাকলে কি আমরা হারিয়ে যাই? নাকি সত্যিকারের হারিয়ে যাওয়া মানে নিজের চেনা ছায়াকেও অচেনা মনে হওয়া?

লেপচাজগতে আসার পর থেকেই আমি নিজের ভেতরের অনেক শব্দের সন্ধান পেয়েছি, কিন্তু কিছু কিছু শব্দ হারিয়ে গেছে চিরতরে। আমি একসময় যা লিখতাম, সেই ছন্দ ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু আগের মতো সজীব নয়। যেন এক রকম স্মৃতির ছায়া হয়ে এসেছে।

আজ দুপুরে, রিনচেন দা এলেন হাতে ছোট্ট একটা পুঁথি নিয়ে। বললেন, “বাবু, এটা আমার ঠাকুরদার লেখা। তিব্বতি ভাষায়। আপনি পড়তে পারবেন না বোধহয়, কিন্তু এর ভিতরে একটা গল্প আছে, যা হয়তো আপনি আপনার ভাষায় বলতে পারবেন।”

আমি বইটা হাতে নিলাম। পাতাগুলো পাতলা, জলে ভিজে গেলে মিশে যাবে এমন। কালি হালকা লালচে। কোনো ছবি নেই, কেবল অক্ষরের সারি। আমি কিছুই বুঝলাম না, কিন্তু বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি বয়ে গেল।

রিনচেন দা বললেন, “গল্পটা এক লোকের, যে পাহাড়ে এসেছিল নিজের হারানো কণ্ঠস্বর খুঁজতে। সে গান গাইতে পারত, কিন্তু একসময় তার গলা চুপ হয়ে যায়। পাহাড়ে এসে সে প্রতিদিন গাছেদের কাছে গাইতে থাকল—শেষমেশ একদিন সে গলা ফিরে পেল, কিন্তু তখন আর কেউ ছিল না শোনার জন্য।”

আমি নির্বাক হয়ে বসে রইলাম। মনে হচ্ছিল, গল্পটা আমারই মতো—কিংবা আমাদের সবারই। আমরা নিজেদের হারানো কিছু খুঁজতে যাই, কিন্তু যখন সেটা ফিরে আসে, তখন হয়তো আমরা বদলে গেছি। তখন আর সেই আগের ‘আমি’ থাকে না।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। দূরে কোনো মন্দির থেকে ঘণ্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমি চিঠিটা, রিনচেন দার বইটা, আর নিজের ডায়েরি খুলে আবার লিখতে শুরু করলাম।

“হারিয়ে যাওয়া একটাই নয়, রকমফের আছে অনেক। কখনো নিজেকে হারাই, কখনো শব্দকে, আর কখনো হারাই এমন কাউকে, যার নাম মনে রাখিনি, তবু যার অনুপস্থিতি আমাকে ছায়ার মতো জড়িয়ে রাখে।”

পাহাড়ের সন্ধ্যা আমাকে আজ এই লেখার ভেতর ডুবিয়ে রাখল। আমি জানি, এখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসেই হারানোর, ফিরে পাওয়ার, আর আবার হারিয়ে যাওয়ার গল্প লুকিয়ে আছে।

আমি সেই গল্পেরই একজন যাত্রী।

***

সকালবেলার কুয়াশা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ধীরে ধীরে উঠছে। লেপচাজগতের নীরবতা আজ যেন আরও গভীর, আরও নিবিড়। বারান্দায় বসে আমি সেই নিঃশব্দতাকে মুঠোয় বন্দী করার চেষ্টা করছিলাম — যেন শব্দহীনতার মাঝেও কোথাও লুকিয়ে থাকে জীবনের স্পন্দন। এই স্পন্দনই হয়তো শূন্যতা, যা আমার অন্তরজগৎকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু অনুভূতি যেন তরঙ্গিত।

শূন্যতা — কথাটির অর্থ অনেকগুণ বেশি। এটি জীবনের এক অদ্ভুত ফাঁকা জায়গা, যেখানে কোনো কিছুর অভাব রয়েছে, অথচ সেই অভাবই যেন নতুন কিছু গড়ে তোলে। আমি ভাবলাম, আমার জীবনের এই লেপচাজগত-যাত্রায়, কতবার আমি শূন্যতার মুখোমুখি হয়েছি — কোনো স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়ার পরে, কোনো মানুষের ছায়া মুছে যাওয়ার পরে, কিংবা নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে ডুবে থাকা সময়গুলোতে।

রিনচেন দার মুখোমুখি বসে যখন আমি এই ভাবনার কথা বললাম, সে একটি নিরীহ হাসি দিলো এবং বললো, “শূন্যতা মানে শেষ নয়, নতুন সূচনার সোপান। পাহাড়ের নীরবতায় তুমি যদি শুনতে শিখো, তাহলে শূন্যতাকেও সুরে পরিণত করতে পারো।”

তার কথা মাথায় রেখে আমি আরো গভীর ভাবনায় ডুবে গেলাম। শূন্যতা আমার কাছে কেবল কোন কিছুর অভাব নয়, বরং আত্মার সেই নির্জনতা যা আমাকে আমার নিজের সঙ্গে মুখোমুখি করেছে। আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি সেই ফাঁকা জায়গায় — যেখানে অজানাকে জানার চেষ্টা, যেখানে স্মৃতির ক্ষত আবার জীবনের আলোতে মাখামাখি হয়।

আমি লিখতে বসলাম, শব্দগুলো কাগজে সাজাতে সাজাতে মনে হল, এই শূন্যতা এক ধরণের জীবন পাঠ যা আমরা সবাইকে নিতে হয়, হয়তো একদিন, হয়তো বারবার।

“শূন্যতার মাঝে লুকানো থাকে,
একটি অন্যরকম জীবনধারা,
যেখানে হারিয়ে যাওয়ার গল্পে,
গড়ে ওঠে নতুন আশা।”

দুপুরের ধূপ যখন পাহাড়ের গা গরম করে, তখন আমি বারান্দায় বসে কেবল ভাবলাম না, বরং অনুভব করলাম — জীবন এবং শূন্যতার এই অবিচ্ছেদ্য সংযোগ। আমি খেয়াল করলাম, জীবনযাপন মানেই এক ধরণের খুঁজে পাওয়া এবং হারিয়ে যাওয়ার খেলা। আমরা হারিয়ে যাই পুরনো স্বপ্নের ছায়ায়, হারিয়ে যাই পরিচিত কিছু থেকে; কিন্তু সেই শূন্যতা থেকে জন্ম নেয় নতুন চিন্তা, নতুন আবেগ।

রাত্রির নীরবতায়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঝিলমিল তারা আমার আত্মার অন্ধকারে হালকা আলো ফেলছিল। সেই আলোয় আমি দেখতে পেলাম আমার ভেতরের ছায়াগুলো — যেগুলো হয়তো আগে ভয় পেতাম, এখন তারা আমার গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি কাগজ খুলে আবার লিখলাম—

“শূন্যতা মানে না শুধুই অভাব,
এটি আত্মার খোলা আকাশ,
যেখানে একাকীত্বের গান বাজে,
আর জীবনের ছায়া নাচে।”

এই ভাবনাগুলোতে ডুবে থাকলাম দীর্ঘক্ষণ। পাহাড়ের নীচে, একদূরে মন্দির থেকে ঘণ্টার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, জীবনের প্রতিটি শূন্যস্থানই এক নতুন শুরু। এই শূন্যতা আমাদের ভিতরে শক্তি যোগায়, যা আমাদের পুরনো স্মৃতি আর যন্ত্রণার অন্তরালে গড়ে তোলে নতুন বিশ্বাস।

তবে আমি জানি, এই শূন্যতার অন্ধকার কেবল সেই মানুষের জন্য নয়, যিনি ভয় পায় হারিয়ে যেতে; বরং সেই মানুষের জন্য, যিনি জানেন হারানো মানেই জীবনের অন্য রূপ খুঁজে পাওয়া। এই যাত্রায় আমি নিজেকে এক অবিচ্ছিন্ন স্রোতে হারিয়ে দিয়েছি, কিন্তু সেই স্রোতে আমি নতুন কিছু পেয়েছি — নিজের পরিচয়ের এক নতুন রূপ।

শূন্যতার গল্প লিখতে লিখতে আমি উপলব্ধি করলাম, জীবন আর শূন্যতা দু’টোই একে অপরের প্রতিচ্ছবি। একটির অভাবে আরেকটি স্ফূর্ত হয়ে ওঠে। এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য খুঁজে পেতেই হয় আমাদের জীবনের মূল অর্থ।

অতঃপর, আমি সেই রাতে চিরদিনের মতো বারান্দায় বসে পাহাড়ের বাতাসে ভেসে যাই। আমার মনে হয়, এই শূন্যতার মধ্য দিয়েই আমি জীবনের এক গভীর সত্যের সাক্ষী হয়েছি — যে সত্য যা ভাষায় প্রকাশের অতীত, কিন্তু অনুভূতির মর্মে অক্ষুণ্ণ।

***

লেপচাজগৎের শেষ সন্ধ্যায়, পাহাড়ের গা থেকে সোনালী আলো খসে পড়ছিল, আর বাতাসে মধুর গন্ধ ভাসছিল। বারান্দায় বসে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, এমন একটা দীর্ঘ যাত্রার শেষে দাঁড়িয়ে, যার প্রতিটি মুহূর্তে আমি খুঁজে পেয়েছি নিজের অজানা অন্দরের ছবি। এই গ্রাম, এই পাহাড়, এই নীরবতা — সব মিলিয়ে এক রূপকথার মতো হয়ে উঠেছিল, যা আমাকে বদলে দিয়েছে, আমাকে নতুন করে গড়ে তুলেছে।

আমি যখন প্রথম এই গ্রামে এসেছিলাম, তখন ছিল এক অজানা, অচেনা পথের শুরু। শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে, নিজেকে খুঁজে পেতে আমার প্রয়োজন ছিল একটা নিরিবিলি আশ্রয়। আর লেপচাজগৎ সেই আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। এখানকার প্রত্যেক গাছ, প্রত্যেক ঝর্ণা, প্রত্যেক মানুষের মুখ যেন একটা নিঃশব্দ ভাষায় আমার সঙ্গে কথা বলেছিল।

প্রতিটি দিন কাটিয়ে, আমার ভেতর জন্ম নিয়েছিল একরকম ভাবনার প্রবাহ। পাহাড়ের বাতাসে মিশে যাওয়া সেই ভাবনা আমাকে এনে দিয়েছিল জীবনকে নতুন করে বুঝার শক্তি। শহরের ব্যস্ততায় যখন আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম, এখানে এসে আমি পেয়েছিলাম নিজেকে। সেই উপলব্ধি এক মধুর শান্তি এনে দিয়েছিল, যা আজও আমার হৃদয়ে ঝলমল করে।

লেপচাজগৎ আমাকে শিখিয়েছে সময়ের মূল্য, প্রকৃতির গভীরতা এবং মানুষের অন্তরের জটিলতা। প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন তারা থেমে যায়, ফিরে তাকায়, আর নিজের ভিতরের কথা শোনে। আমার জীবনের সেই অধ্যায়গুলো এখানে বসে আমি নতুনভাবে লিখেছি।

স্মৃতির পাতায় ফিরে তাকালে, এক এক করে জীবনের নানা অধ্যায় ঝলকে ওঠে — হাসি, কান্না, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা। আমি বুঝতে পারি, এই সবই আমার যাত্রার অংশ, যা আমাকে আজকের আমি বানিয়েছে।

আমি বারান্দায় বসে, পাহাড়ের দূরত্বে সূর্যাস্তের শেষ রঙা আভায় চোখ মেললাম। মনে হল, এই আলোয় আমার স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছে। প্রতিটি স্মৃতি যেন একটা নরম আভা, যা আমার জীবনের অন্ধকারকে আলোকিত করে।

আমার লেখার পথে এই যাত্রা ছিল এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে এসে, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা, নিজের সঙ্গে সময় কাটানো, সবকিছু মিলিয়ে আমাকে নতুন করে জীবন ভালোবাসতে শিখিয়েছে। এখানকার মানুষগুলো, তাদের গল্প, পাহাড়ের বুকে প্রতিধ্বনিত হাওয়া, সব মিলিয়ে এক অনবদ্য কাব্য গঠন করেছে আমার জীবনের।

এই স্মৃতিকথার প্রতিটি অধ্যায়ে আমি চেষ্টা করেছি সেই গভীর অনুভূতিগুলো ধরা, যা আমাকে আজকের আমি করেছে। পাহাড়ের নিস্তব্ধতায়, সেই শূন্যতার মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি জীবন, খুঁজে পেয়েছি নিজেকে।

এখন, যখন এই যাত্রা শেষ হতে চলেছে, আমি জানি এই স্মৃতি আর অনুভূতি আমার সঙ্গে সব সময় থাকবে। লেপচাজগৎ শুধু একটা জায়গা নয়; এটা আমার আত্মার এক অমলিন অধ্যায়, যা কখনো মুছে যাবে না।

পাহাড়ের বাতাসে ভেসে যাওয়া গান শুনতে শুনতে, আমি মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাই — এই গ্রাম, এই সময়, এবং এই জীবনের জন্য।

শেষ হয়ে গেল আমার সেই দিনগুলো, কিন্তু শুরু হল নতুন পথচলা — নিজের ভেতর থেকে সৃষ্ট এক নতুন জীবনের।

শেষ

1000017060.jpg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *