Bangla - প্রেমের গল্প

নিভৃতে তুমি

Spread the love

নন্দিনী বন্দোপাধ্যায়


বৃষ্টি পড়ছে। শ্রেয়ার স্কুলের জানালার কাচে জল জমে ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে নিচের দিকে। মনে হচ্ছে যেন সে নিজেই গলে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে। ক্লাসঘরের মেঝেতে বাচ্চাদের চিৎকার-হাসির শব্দ, টিফিনের গন্ধ, চকধুলোর গন্ধ—সবকিছু মিলেমিশে এক অলৌকিক ঘোর তৈরি করেছে।

তবে আজকের সকালটা ছিল একটু অন্যরকম।

“নতুন শিক্ষক এসেছেন, ইংরেজি পড়াবেন। অর্ণব চক্রবর্তী। খুব মেধাবী ছেলেটি, দিল্লি থেকে এসেছে,” হেডমিসট্রেস বলেছিলেন সবার সামনে।

অর্ণব প্রথম যেদিন শ্রেয়াকে দেখেছিল, তার সালোয়ার কামিজের গায়ে জলছাপ লেগে ছিল, আর ভেজা চুল খোঁপায় আটকানো। ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি, হঠাৎ চোখাচোখি। তখনই একটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা ঢুকে পড়ে অর্ণবের শরীরে। শ্রেয়া তখনও জানতেন না, এই ঠাণ্ডার আড়ালেই এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে আছে।

সেদিন লাঞ্চ ব্রেকে ওদের আলাপ হয়। খুব সাধারণ কথাবার্তা—“আপনি আগে কোথায় ছিলেন?” “শিক্ষার্থীরা কেমন?” “সিটি লাইফ কেমন লাগে?” ইত্যাদি। কিন্তু কথার আড়ালে কোথাও যেন একটা অসমাপ্ত স্পর্শ খুঁজে ফিরছিল দুজনেই।

শ্রেয়া, যিনি গত আট বছর ধরে অর্জুনের সঙ্গে সংসার করছেন, এখন প্রায় রুটিনে পরিণত হয়েছেন। সকালে উঠে ছেলের স্কুল, নিজের অফিস, দুপুরে দ্রুত খাওয়া, রাতের রান্না—এভাবেই কাটে দিন। অর্জুন, একজন কন্সালট্যান্ট, বাড়িতে থাকেন কম। থাকলেও থাকে যেন তার অনুপস্থিতির মতো। একটা সময় শ্রেয়া চেয়েছিল গভীর কথা, শরীরের উষ্ণতা, চোখের ভাষা। এখন সে চায় শুধু নীরবতা ভাঙুক কেউ।

অর্ণব, যিনি সদ্য ত্রিশ পেরিয়েছেন, চোখে হালকা চশমা, শব্দ চয়ন সুন্দর, এবং শরীরী ভাষায় যেন ভদ্রতা আর কামনার সূক্ষ্ম মিশেল। শ্রেয়া সেটা প্রথম বুঝেছিল, যেদিন অর্ণব ক্লাসের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল, এবং তার ঠোঁটের কোণে সেই অদ্ভুত হাসি। চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা রোদ। সেই হাসি শ্রেয়ার হৃদয়ে ঝড় তুলেছিল।

একদিন বিকেলে, স্কুল ছুটির পর, দুজনেই লাইব্রেরির করিডরে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, হালকা ঠাণ্ডা। অর্ণব বলে উঠেছিল—

“আপনি জানেন, কিছু জানালার কাঁচ এত পরিষ্কার হয় যে তাতে নিজেকেই দেখতে পাওয়া যায়, আবার কিছু জানালা থাকে যা ভেতরের আলো ধরে রাখে… আপনি জানেন আপনি কোন জানালার মতো?”

শ্রেয়া কিছু বলে না, কেবল চোখ মেলে তাকায়। অনেকদিন পর কেউ তাকে এইভাবে দেখে—মেয়ের মতো, নারীর মতো।

সে রাতে বাড়ি ফিরে অর্জুন টিভিতে চোখ গুঁজে বসেছিল। শ্রেয়া সেদিকে তাকিয়েও না তাকিয়ে চলে যায় বাথরুমে। জলচৌকাঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে নিজেকে দেখে। চুল খোলা, চোখে ক্লান্তি, গলায় হালকা একটুখানি কাঁপন।

“আমি কি এখনো কাম্য?”—মনের গভীরে প্রশ্নটা যেন নিজেই শোনে।

পরদিন, শ্রেয়া অফিসের ক্যান্টিনে বসে ছিল একা। অর্ণব এসে পাশে বসে। একটা নরম নীল শার্ট পরেছিল সে। কফির কাপটা হাতে তুলে দিতে গিয়ে হালকা করে তার আঙুল ছুঁয়ে যায় শ্রেয়ার। বিদ্যুৎ খেলে যায় শরীরে।

“শ্রেয়া ম্যাম, আপনি কি বিশ্বাস করেন ভাগ্যে?”

শ্রেয়া তাকায়, বলে—

“বিশ্বাস করতাম একসময়। এখন শুধু সময়ের ওপরে ভরসা করি।”

অর্ণব একটু হেসে বলে—

“তাহলে কি আমাদের এই দেখা সময়ের খেলা?”

শ্রেয়া চুপ করে যায়। কিন্তু তার চোখ বলে দেয়—সে কথা বলতে চায়। বহুদিন ধরে চেপে রাখা কথা।

রাতের বেলা শ্রেয়া বিছানায় শুয়ে অর্জুনের দিকে তাকায়। অর্জুন ঘুমিয়ে গেছে। তার মুখে কোনো উত্তেজনা নেই, নেই কোনো আকাঙ্ক্ষার রেখা। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে শ্রেয়া। মোবাইলে খোলা থাকে মেসেঞ্জার—সেখানে অর্ণবের নাম, আর তাতে লেখা,

“আজ আপনার চোখে অদ্ভুত আলো ছিল…”

শ্রেয়া উত্তর দেয় না। কিন্তু তার ভিতরে কী যেন খুলে যায় ধীরে ধীরে।

একটি জানালা, যার কাচে ধুলো ছিল এতদিন। আজ সেই কাচে প্রথমবার নিজেকে দেখে সে, কামনাময়, অপরাধবোধহীন, এক নারী হিসেবে।

স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতেই শ্রেয়া অনুভব করল, যেন বাতাসে একটা অন্যরকম গন্ধ। শীতল, অথচ জ্বালাময়। অর্ণব সেই সকালে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করল—

“শুভ সকাল, ম্যাম।”

শ্রেয়া মাথা হেঁট করে হেঁসে নেয়, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ না তুলে সোজা চলে যায় টিচার্স রুমে। তার বুকের মাঝে একটা অজানা কাঁপুনি বাজতে থাকে। যেন কোনো নিষিদ্ধ সুর শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন একটু একটু করে।

সেদিন ছিল স্কুলের বার্ষিক নাটকের প্রস্তুতির প্রথম রিহার্সাল। হেডমিসট্রেস বলেছিলেন, শ্রেয়া ও অর্ণব দুজনেই কো-অর্ডিনেট করবেন। নাটকটির নাম “আলোকছায়া”, যেখানে সম্পর্ক, দূরত্ব, আর আকাঙ্ক্ষার গভীর ছায়া রয়েছে।

মঞ্চে ক্লাস টেনের বাচ্চারা দাঁড়িয়ে। অর্ণব নির্দেশনা দিচ্ছিল, আর শ্রেয়া পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে তার কথা শুনছিল। হঠাৎ এক ছাত্রের সংলাপ ভুল হওয়ায় সে ছুটে যায় সামনে। শ্রেয়াও অটোমেটিকভাবে এক পা এগিয়ে আসে, অর্ণবের হাতের সঙ্গে হাত লেগে যায়। খুব হালকা, অথচ বিদ্যুৎসম।

দুজনের চোখ মিলল—এক মুহূর্ত, যেন কয়েক মিনিটের সমান। অর্ণব চট করে হাত সরিয়ে নেয়, কিন্তু সেই ছোঁয়ার কাঁপন এত সহজে যায় না।

দুপুরবেলা রিহার্সাল শেষে শ্রেয়া অর্ণবকে ডেকে বলে,

“চলো, একটু বাইরে গিয়ে চা খাই। স্কুলের চা তো বোঝাই যায়…”

অর্ণব অবাক, কিন্তু খুশি। স্কুলের বাইরের ছোট্ট এক চায়ের দোকানে দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল।

“আপনি খুব শান্ত,” অর্ণব বলল।

“আর তুমি খুব অস্থির,” শ্রেয়া মুচকি হেসে জবাব দেয়।

একটু চুপ করে থেকে অর্ণব বলে,

“আপনাকে প্রথম দিন থেকেই দেখছি, জানেন? মনে হয়, আপনি নিজেকে ভুলে গেছেন। আপনি আসলে কতটা সুন্দর, তা জানেন তো?”

শ্রেয়ার কাঁধ গুছিয়ে নেয় সে কথা শুনে। সেই বহুদিন আগে এমন কথা বলেছিল কেউ—হয়তো কলেজে, কিংবা প্রথম প্রেমে। তারপর কেবল গৃহিণীর ভূমিকা, মায়ের ভূমিকা, শিক্ষিকার ভূমিকা—নারী হিসেবে আর কেউ তাকে ডাকেনি।

চা শেষ করে দুজন ফিরে আসে স্কুলে। কিন্তু তাদের চোখে, গলায়, আর চলনে—ছিল এক অমোঘ, অস্বীকারযোগ্য সুর।

সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে শ্রেয়া রান্নাঘরে কাজ করছিল। ছেলের হোমওয়ার্ক, রান্না, টিফিন গুছোনো, সবই চলছিল একসাথে। অর্জুন ফিরল অনেক রাতে। মুখে ক্লান্তি, হাতে ল্যাপটপ।

শ্রেয়া বলল,

“আজ একটু আগে খেতে পারো না? আমি অপেক্ষা করছিলাম…”

অর্জুন কপালে হাত বুলিয়ে বলল,

“আজ মাথাটা ধরেছে। খেয়ো তুমি।”

কথাটা শুনে শ্রেয়া আর কিছু বলে না। সে রাতে বিছানায় শুয়ে যখন লাইট অফ করল, তখন তার ভিতরে চলছিল ঝড়। সে মোবাইলটা হাতে নিল। মেসেঞ্জারে অর্ণব।

শ্রেয়া: “আজ নাটকে ছেলেমেয়েরা ভালো করল। তুমি তো বেশ সিরিয়াস ডিরেক্টর!”

অর্ণব: “তোমার পাশে থাকলে সব কিছুতেই সিরিয়াস হয়ে যাই।”

শ্রেয়া: “তুমি সব সময় এত বলতে পারো কীভাবে?”

অর্ণব: “তুমি যদি আমার পাশে থাকো, বলাও সহজ হয়। ছোঁয়াও…”

শ্রেয়া কিছুক্ষণ কিছু লিখতে পারে না। তারপর ধীরে ধীরে আঙুল চলে মোবাইল স্ক্রিনে—

“তোমার হাতের ছোঁয়া আজও মনে আছে।”

নিরবতা দীর্ঘ হয়। উত্তরের অপেক্ষায় থাকে সে। অর্ণব লেখে—

“শুধু হাতেই থেমে থাকব না একদিন…”

শ্রেয়া মোবাইলটা বিছানায় নামিয়ে রাখে। ঘর নিস্তব্ধ, পাশের মানুষ ঘুমিয়ে, আর তার শরীর জেগে ওঠে। সেই ছোঁয়া, সেই কথা, আর এক অজানা কামনার আলতো শিহরণ নিয়ে সে চোখ বন্ধ করে।

সে জানে, এই ছোঁয়া ভবিষ্যতের একটা দরজার কপাট, যা খুললে আর ফিরে যাওয়া যায় না।

সকালটা অন্যরকম ছিল। শ্রেয়া আজ একটু আগেই স্কুলে পৌঁছেছে। স্টাফরুম প্রায় ফাঁকা, জানালার পাশে বসে সে নিজের নোটবুক খুলল। পাতাগুলো পুরোনো, কালচে হলুদ। এই নোটবুকটি কেউ জানে না—না অর্জুন, না অর্ণব। এখানে সে লিখে রাখে নিজেকে—যা বলা যায় না, যা বলা উচিত নয়, তা-ই।

নিচু গলায় সে পড়ে:

“এই শরীর, এই ছোঁয়া, এই হৃদয়—সবই তো একদিন জেগে উঠেছিল। তবে কবে যেন শিখেছি নিজেকে আড়াল করতে। আজ সেই আড়াল একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। অর্ণব… তুমি একটা দরজা খুলেছ। যে দরজার চাবি আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম বহু বছর।”

শ্রেয়া বুঝে যায়, সে কোথাও আটকে পড়ছে। ভালোবাসার নয়, কামনার গোলকধাঁধায়। কিন্তু কামনা কি দোষের? এক নারীর চেতনার ভিতরেও তো এক উত্তাল সমুদ্র থাকে, যা কেউ দেখে না।

ঠিক তখনই দরজায় নরম ধাক্কা। অর্ণব ঢোকে। “আজ এত সকাল?”

“তুমি?”

“তুমিও তো!”

হালকা হাসি বিনিময় হয়। তারপর চুপচাপ পাশে বসে। চোখ পড়ে যায় শ্রেয়ার খোলা নোটবুকের পাতায়। সে তাড়াতাড়ি বন্ধ করে ফেলে।

“ডায়েরি?” অর্ণব প্রশ্ন করে।

“না… মানে হ্যাঁ… পুরোনো কিছু লেখা।”

“আমি পড়তে পারি?”

শ্রেয়া চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, “না।”

অর্ণব হাসে। “তাহলে তো জানতে ইচ্ছে হয় আরও।”

সেদিনের ক্লাস, রিহার্সাল, মিটিং—সব যেন কাটে এক আলগা ধোঁয়ায়। শ্রেয়া বুঝতে পারে, স্কুল তার জীবনের একমাত্র পৃথিবী ছিল—এখন তার মধ্যে আরও একটি বিশ্ব ঢুকে পড়েছে। এই বিশ্বে কেবল দু’জন মানুষ—সে আর অর্ণব। আর মাঝখানে জমে উঠছে এক বইভরা গোপন অধ্যায়।

রাতের খাবার টেবিলে অর্জুন বলে, “সোনু’র স্কুল ট্রিপ আছে। ওর ফর্মে সাইন দেবে?”

“আমি আজ ক্লান্ত। কাল দিই?”

“তুমি এখন কেমন গম্ভীর হয়ে গেছ।”

শ্রেয়া উত্তর দেয় না। অর্জুনের চোখে তার প্রতি কোনো কৌতূহল নেই। অথচ অর্ণবের এক চোখের দৃষ্টিতে কত প্রশ্ন, কত স্নেহ, কত হঠাৎ উত্তাপ।

রাতে আবার সে খুলে নেয় সেই নোটবুক। আজকের দিনটা লিখে রাখে:

“আজ ও আমার নোটবুক পড়তে চাইল। আমি না করে দিলাম। কিন্তু একটা অদ্ভুত ইচ্ছা হচ্ছিল—সবটা খুলে বলি। নিজের সব দহন, সব আর্তি, সব ইচ্ছা তার সামনে মেলে ধরি। আমি জানি না ও কেমন মানুষ, কিন্তু তার পাশে থাকলে নিজেকে কম অপরাধী মনে হয়। এমন একটা পুরুষ… যে শুধুই চায়নি কিছু, বরং কিছু বোঝে।”

পরদিন রিহার্সালের মাঝখানে, হঠাৎ লাইট চলে যায়। হল অন্ধকার। ছাত্রছাত্রীরা চেঁচামেচি শুরু করে। শ্রেয়া মোবাইলের টর্চ জ্বালায়। অর্ণব এসে পাশে দাঁড়ায়।

“আসুন, ছেলেমেয়েদের বসতে বলি।”

হঠাৎ অর্ণবের হাত এসে শ্রেয়ার হাত ছোঁয়। চুপিচুপি, গভীরভাবে। সেই ছোঁয়ায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। ঘোরের মধ্যে শ্রেয়া হাত সরায় না। বরং কিছুক্ষণ পরে হাত ধরে রাখে। কাঁপতে কাঁপতে বলে, “এই ছোঁয়া আমার আদরে নেই বহুদিন।”

অর্ণব কিছু বলে না। শুধু ধীরে ধীরে আঙুলে আঙুল জড়িয়ে রাখে। আলো ফিরে আসে। কিন্তু সেই মুহূর্তে শ্রেয়ার ভিতরের আলো নিভে যায় না। এক উষ্ণতা তার দেহে রয়ে যায়।

সেদিন বিকেলে শ্রেয়া বাড়ি ফিরে প্রথম কাজ করে সেই নোটবুক খুলে লেখা:

“আজ অন্ধকারে ওর হাত ধরলাম। প্রকাশ্যে, গোপনে। সেটা প্রেম না কামনা, জানি না। জানি শুধু, আমার ভিতরে একটা কিছুর দরজা খোলা রেখেছে সে। অর্জুনের সঙ্গে জীবন কাটাতে কাটাতে ভুলে গেছি আমার শরীর, আমার তৃষ্ণা, আমার স্বর। আজ আবার সে ফিরছে। আমি ভয় পাই, আবার ইচ্ছেও করি।”

নোটবুকের পাতায় পাতায় জমে উঠছে এক একান্ত সংসার—যার কোনো ঠিকানা নেই, তবু গভীর। শ্রেয়ার এখন এই লেখার ভেতরেই আশ্রয়, কারণ বাইরের জগতে সে যা নয়, এখানে তা হতে পারে।

নোটবুক তার গোপন আত্মপ্রেম। আর এই প্রেমে আজ অর্ণব এসে পড়েছে…

সকালটা ছিল হালকা মেঘলা, কিন্তু শ্রেয়ার মন যেন ঝকঝকে। সে আজ বিশেষ সাজে এসেছে স্কুলে। পরেছে নীল কুর্তি, ছোট্ট রুপোর দুল, আর ঠোঁটে হালকা গন্ধমাখা লিপস্টিক।

অর্ণব আজ স্কুলে ঢুকেই থমকে যায়। “আজ… আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আপনাকে।”

শ্রেয়া হেসে বলে, “তুমি আগে কখনো এভাবে বলোনি।”

“আজ বললাম। বলা দরকার ছিল। নীল আপনাকে মানায়। যেমন গভীরতা, তেমন রহস্য।”

সেই কথায় শ্রেয়ার গালে একটা রঙ লেগে যায়—লজ্জা, উত্তেজনা, আনন্দ, আর একটু অপরাধবোধও। কিন্তু সে নিজেকে পাল্টে ফেলতে চায় না। এতদিন যা যা চেপে রেখেছিল, আজ সেইসব বেরিয়ে আসছে রঙের মতো।

রিহার্সালের ফাঁকে, শ্রেয়া একবার চা আনতে গিয়েছিল। ফেরার সময় দেখে অর্ণব একা বসে আছে করিডোরে, চোখ তার মোবাইলে।

“তুমি কিছু খাবে?”

“চা খেতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু তুমি চলে গেলে আমিও আর উঠিনি।”

শ্রেয়া এগিয়ে এসে তার পাশে বসে। “এই বসাটাও কি এখন লুকিয়ে করতে হয়?”

“না। কিন্তু জানো, আমি যখন তোমার পাশে থাকি, তখন নিজের একটা আলাদা সত্তা খুঁজে পাই। যেন আমি শুধু একজন শিক্ষক বা স্বামী নই—আমি একজন মানুষ, যার কামনা আছে, অনুভব আছে।”

শ্রেয়ার হাতে তখন ছিল দুটো কাগজের কাপ। এক কাপ তার হাতে দিল, আরেক কাপ নিজের।

“তুমি কি কখনো অর্জুনকে ভালোবেসেছিলে?” অর্ণব হঠাৎ জিজ্ঞেস করে।

শ্রেয়া চুপ করে থাকে।

“ভেবো না, আমি কিছু দাবি করছি। আমি শুধু জানতে চাই, তুমি নিজেকে কীভাবে দেখো এখন?”

“আমি এতদিন একটা ঘরে বন্দি ছিলাম, যেটার দেওয়াল আমি নিজেই তুলেছিলাম। আজ মনে হচ্ছে, সেই দেওয়াল ভেঙে ফেলতে চাই। নীল জামাটা পরার মধ্যে যে স্বাধীনতা আছে, সেটা বুঝতে পারছিলাম না আগে।”

অর্ণব তার হাত ছোঁয় আবার। এবার আর কোনো অন্ধকার নেই। আলোতেই। দিনের আলো, মানুষজনের ভিড়, অথচ এত গোপন এক মুহূর্ত।

সেই রাতেই শ্রেয়া তার নোটবুক খোলে:

“আজ সে আমার হাত ধরল আলোর মধ্যে। আমি ভাবতাম, এমন অনুভব কেবল গোপনে হয়। কিন্তু আজকের ছোঁয়া ছিল প্রকাশ্য, সাহসী। আমি জানি, এই পথ সোজা নয়। অর্জুনের মুখ, ছেলের দৃষ্টি, সমাজের কানাঘুষো—সবই জানি। তবু এই মুহূর্ত, এই সত্য, এই আমি—আমি হারাতে চাই না।”

রাত বাড়ে। ঘরের আলোর নিচে অর্জুন বলে, “তুমি আজকাল নিজেকে নিয়ে খুব ব্যস্ত, তাই না?”

শ্রেয়া উত্তর দেয় না। সে জানে, অর্জুনকে আর কিছু বোঝানো যাবে না। সে যে প্রশ্ন করে, তার উত্তর চায় না। শুধু নিয়ন্ত্রণ চায়।

পরদিন স্কুলে গিয়ে শ্রেয়া দেখে অর্ণব ক্লাস নিচ্ছে। জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে সে দেখে—এই মানুষটা একটানা কিছু বলে যাচ্ছে, অথচ তার চোখে কিছু অস্থিরতা আছে। ক্লাস শেষ হতেই শ্রেয়া যায় তার কাছে।

“চলো একটু হাঁটি।”

স্কুলের মাঠ পেরিয়ে তারা হাঁটে পাশের গাছতলায়। কেউ নেই।

“তুমি কি ভয় পাও?” অর্ণব জিজ্ঞেস করে।

“ভয় পাই। তবু যেতে চাই আরও দূরে। কারণ যা শুরু হয়েছে, তা থামাতে পারি না।”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “আমি তোমার জন্য নতুন কিছু বানাচ্ছি। একটা গানের লাইন ভেবেছি।”

সে গুনগুন করে গায়:

“যে নীল পোশাকের দিনে, তুমি হাঁটলে আমার পাশে—সেই দিন থেকেই আমি অন্য কেউ হয়ে গেছি…”

শ্রেয়া হেসে ফেলে, চোখ ভিজে যায়। আজ নীল পোশাক শুধু একটি জামা নয়—একটি ঘোষণা, একটি সাহস, একটি আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এবং সেই আকাঙ্ক্ষার শরীরে আজ শ্রেয়া নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাচ্ছে। স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পর প্রায়ই শ্রেয়া একা ছাদে উঠে আসে। আজ সন্ধ্যা নামছে ধীরে, আর ছাদে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দূরে পাখিরা ফিরছে বাসায়, আর পেছনের গলির চায়ের দোকানে চলছে শেষ কাপে চুমুক দেওয়া। অর্ণব সেদিনই বলেছিল, “তোমার বাড়ির ছাদটা দেখিনি তো কখনো!”

শ্রেয়া কিছু বলেনি তখন। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই সে মেসেজ করে বসে:

“আজ সন্ধ্যেটা ছাদে কাটাতে চাও?”

অর্ণবের উত্তর আসে একটাই শব্দে—“হ্যাঁ।”

আধঘণ্টা পরে, অর্ণব এসে পৌঁছয় শ্রেয়ার পুরনো বাড়ির গেটে। চুপিচুপি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠে, আর দেখে শ্রেয়া দাঁড়িয়ে আছে রেলিং-এ হেলান দিয়ে। পরনে হালকা শাড়ি, খোলা চুল, চোখে একটু কাজল ।

“এই ছাদটাই তোমার?” অর্ণব বলে ওঠে। “কী অদ্ভুত, এত কাছাকাছি ছিলাম আর এখানে আসিনি কখনো।”

“সবকিছু তো সবসময় প্রকাশ পায় না, তাই না?”

ছাদের দেয়ালের পাশে দুটো লোহার চেয়ার রাখা। শ্রেয়া বসে, অর্ণব তার পাশে। সন্ধ্যার আলো গাঢ় হতে থাকে, ছাদের এক কোণে রাখা ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দেয় শ্রেয়া। আলো হালকা, যেন স্বপ্নের মতো।

“এই আলোয় তোমাকে একদম সিনেমার মতো লাগছে,” অর্ণব বলে।

“আমার তো সবটাই সিনেমা মনে হচ্ছে এখন—তোমার আসা, আমাদের দেখা, এই চুপচাপ সন্ধ্যা।”

একটু নীরবতা আসে। তারপর হঠাৎ, অর্ণব তার হাত ধরে ফেলে। “তুমি জানো, আজ আমি তোমাকে শুধু দেখতে আসিনি।”

শ্রেয়া চমকে ওঠে না। শুধু তার চোখ দুটো আরও গভীর হয়।

“আমি জানি,” সে বলে, “আমি বুঝেছিলাম।”

অর্ণব তার মুখের দিকে এগিয়ে যায়, শ্রেয়ার ঠোঁটের কাছে থেমে যায় মুহূর্তখানেক। “তুমি চাইলে আমি থেমে যাব।”

“থেমো না,” শ্রেয়া ফিসফিস করে।

ওরা একে অপরকে চুমু খায়। প্রথমবার, কিন্তু মনে হয় যেন অনেক জন্মের পরিচয়। হাওয়া বয়ে যায়, শাড়ির আঁচল ওড়ে, ছাদের বাতাস গা ছুঁয়ে যায়। তাদের ঠোঁট ছুঁয়ে থাকা মানেই যেন এক গোপন দরজা খুলে যাওয়া।

এরপর কিছু শব্দহীন মুহূর্ত, কিছু দম বন্ধ করা স্পর্শ, কিছু নিঃশব্দ আবেগ—যা কেবল শরীরে নয়, মনে ঢ…

সকালের আকাশ ছিল রোদে ভরা, কিন্তু দুপুর গড়াতেই হঠাৎ করে মেঘ জমতে শুরু করল। শ্রেয়া বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, ধূসর মেঘে ঢাকা পড়ছে চারদিক। তার মনের মতোই যেন আবহাওয়া আজ একটু আবেগী, একটু ভেজা।

অর্ণব মেসেজ করে লিখেছে, “আজ যদি একটু সময় পাও, তোমার বাড়ির বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখতে চাই।”

শ্রেয়ার মনে হাসি আসে। সে জানে, আজকের বিকেলটা অন্যরকম হতে চলেছে। জানে, অর্ণব শুধু বৃষ্টি দেখতে আসছে না, আরও কিছু খুঁজে ফিরছে—হয়তো নিজের ভালোবাসার নিশ্চয়তা, হয়তো শরীরের ঘন ঘন ছোঁয়ার মধ্যে হৃদয়ের নীরব আর্তি।

বৃষ্টি পড়তে শুরু করে ঠিক তিনটে নাগাদ। অর্ণব এসে পৌঁছায় ছাতা হাতে, ভিজে জামা গায়ে। শ্রেয়া দরজা খুলে দেয়, তারপর দুজনে চলে আসে পুরনো বারান্দায়—যেখানে কাঠের চেয়ার রাখা, দেওয়ালে লতানো মানিপ্লান্ট, আর জানলার পাশে একটা ছোট টেবিল।

“তুমি তো ভিজে গেলে পুরো,” শ্রেয়া বলে।

“ভিজতেই এসেছি,” অর্ণব হাসে। “তোমার গায়ে একটু গন্ধ আছে… ঠিক বৃষ্টির আগের মাটির মতো।”

শ্রেয়া চুপ করে থাকে। অর্ণব তার ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, তারপর ধীরে ধীরে তার গালে আঙুল রাখে। “তুমি জানো, এই মুহূর্তটা আমার কাছে সবচেয়ে বাস্তব।”

বৃষ্টির শব্দে আশেপাশের শহর হারিয়ে যায়। শুধু তাদের বারান্দাটা যেন এক নিজস্ব পৃথিবী।

চেয়ারে বসে দুজন পাশাপাশি। শ্রেয়ার পরনে আজ হালকা সবুজ সুতির শাড়ি, ঠোঁটে একটুও রঙ নেই, কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি। অর্ণব তার পাশে বসে একটু ঝুঁকে পড়ে। “তোমার গলার পাশে এই তিলটা… আমি তো একদিন কবিতাও লিখেছিলাম এটা নিয়ে,” সে ফিসফিস করে।

“মিথ্যে,” শ্রেয়া হেসে বলে।

“না গো, সত্যি। তুমি শুধু পড়োনি।”

অর্ণব তার গলায় চুমু খায়। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস আসে শ্রেয়ার ঠোঁট থেকে। সে চোখ বন্ধ করে বলে, “আজ না হয়, একটু দীর্ঘ হোক আমাদের দুপুরটা।”

তাদের হাত জড়িয়ে পড়ে একে অপরের কোমরে। চেয়ারের বাঁদিকে রাখা শালটা অর্ণব টেনে নিয়ে ওদের গায়ে রাখে।

বৃষ্টি তখন আরও জোরে পড়ছে। জানলার কাচে ফোঁটা ফোঁটা ধারা, আর অর্ণব শ্রেয়ার গায়ে ঠোঁট ছোঁয়াতে থাকে—ধীরে, পরিপূর্ণ, গভীরভাবে।

“তুমি কি কখনো ভয় পাও না?” অর্ণব জিজ্ঞেস করে।

“পাই,” শ্রেয়া স্বীকার করে। “কিন্তু তোমার চোখে চোখ রাখলে সব ভয় দূরে চলে যায়।”

তারপর যে মুহূর্ত আসে, তা আর শব্দে বর্ণনা করা যায় না। শরীর থেকে শরীরে প্রবাহিত হয় এক সুর—ভিজে বিকেলের গোপন সঙ্গীত, যা কেবল প্রেমিক আর প্রেমিকা বোঝে। তারা জড়িয়ে থাকে বারান্দার কোণায়, বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে তাদের নিঃশ্বাসের ওঠানামা, তাদের চাপা আর্তনাদ।

“তুমি যখন চুমু খাও, মনে হয় আমি সম্পূর্ণ হচ্ছি,” শ্রেয়া বলে।

অর্ণব বলে, “তুমি এমনিতেই সম্পূর্ণ। আমি শুধু তোমার ভেতরের আলোটা ছুঁয়ে দেখি।”

তারপর এক দীর্ঘ চুমু। যেটা বৃষ্টির মতো ধীরে নামে, ধীরে মিশে যায় রক্তে। শ্রেয়ার চোখে তখন শুধু অর্ণবের প্রতিবিম্ব, আর অর্ণবের মনে শ্রেয়ার দেহে ঘাম আর বৃষ্টির ফোঁটার মেশানো গন্ধ।

বিকেল গড়িয়ে যায় সন্ধ্যায়। ওরা চুপচাপ বসে থাকে, মাঝেমধ্যে চোখে চোখ রাখে, মাঝেমধ্যে ঠোঁট ছোঁয়ায় ঠোঁটে। কিছু শব্দ নেই, কিছু প্রতিজ্ঞা নেই—তবুও অদ্ভুত এক স্থিরতা, যেন বৃষ্টির মধ্যেই গড়ে ওঠে তাদের নিজস্ব বাসা।

অর্ণব একসময় উঠে দাঁড়ায়। “চললাম,” সে বলে।

“চলে যেও না,” শ্রেয়া বলে, ধরা গলায়।

“থাকতে পারব না, কিন্তু ফিরে আসব। বারবার, যতবার তুমি ডাকবে।”

সেই রাতে শ্রেয়া তার ডায়েরিতে লেখে:

“আজ বারান্দায় প্রথমবার ওর ঠোঁটের নিচে আমি নিজের নাম খুঁজে পেলাম। বৃষ্টির মধ্যে যেভাবে আমরা একে অপরকে ছুঁয়ে ছিলাম, তা কোনও কবিতায় লেখা যায় না। আমি আর আমার ইচ্ছেগুলো আজ একই কুঞ্জে বসবাস করছে—একটু ভেজা, একটু গোপন, কিন্তু পুরোপুরি সত্যি।”

রবিবার দুপুর। শহরের ব্যস্ততা যেন একটু থেমে গেছে। শ্রেয়ার চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, যেটা সে খুব ভালোবাসে—একটা নির্জনতা, যেন আত্মার দরজা খুলে বসে থাকার জন্য উপযুক্ত সময়। তার পরনে আজ ঢিলেঢালা একটা কুর্তি, চুল খোলা, চোখে চশমা, আর ঠোঁটে একটুও প্রসাধন নেই। তবুও অর্ণবের চোখে সে পৃথিবীর সবচেয়ে কামনাস্পদ নারী।

আজ তারা দেখা করবে শ্রেয়ার এক বান্ধবীর ফাঁকা ফ্ল্যাটে। বন্ধুটির বাপের বাড়ি কৃষ্ণনগরে, ফ্ল্যাটটা এখন তালাবন্ধ থাকলেও চাবিটা আছে শ্রেয়ার কাছে। সেখানে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা ভিন্ন জগতের দরজাও খুলে যায় তাদের জন্য।

ঘরটা বড় নয়, কিন্তু জানালাটা খোলা। জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে, পর্দা উড়ছে একদিকে। শ্রেয়া বিছানার চাদর ঠিক করে দেয়, অর্ণব তার পেছনে এসে দাঁড়ায়।

“তুমি জানো, আমি তোমায় কবে থেকে চাইছি?” অর্ণব ফিসফিস করে।

শ্রেয়া মৃদু হেসে বলে, “জানি না। জানতেও চাই না। আমি চাই, এখনটা শুধু থাকুক—এই মুহূর্তটা।”

অর্ণব তার ঘাড়ে ঠোঁট রাখে, তারপর নিচে নেমে আসে গলার কাছে, বুকে। শ্রেয়া শ্বাস ফেলে, গলায় এক ধরনের কম্পন আসে। তার হাত অর্ণবের ঘাড়ে, নখ গেঁথে ধরে।

“তুমি আমার স্বপ্নের থেকেও বেশি বাস্তব,” অর্ণব বলে, তার কুর্তির বোতাম খুলতে খুলতে।

শ্রেয়ার দেহে আগুন জ্বলে ওঠে। সে আর কোনও শব্দ করে না, শুধু অনুভব করে—অর্ণবের হাত, তার ঠোঁট, তার গন্ধ। বিছানার চাদর যেন সাক্ষী হয় এক নিষিদ্ধ অথচ প্রগাঢ় ভালবাসার।

তাদের শরীরের ভাষা তখন গল্প বলছে। অর্ণবের হাত চলে যাচ্ছে শ্রেয়ার পিঠে, কোমরে, উরুতে। শ্রেয়ার ঠোঁট কাঁপে, চোখ বুঁজে আসে, আর শরীর ধীরে ধীরে মিশে যায় অর্ণবের দেহে। নিঃশ্বাসের ছন্দে ওঠানামা করে দুটি শরীর, যেন একটা গোপন নদীর স্রোত বইছে ভিতরে ভিতরে।

এই মুহূর্তে কোনো সমাজ নেই, কোনো নাম নেই, শুধু শরীরের অভ্যন্তরে গভীর এক আর্তি। তাদের যৌনতা কেবল কামনায় নয়, প্রেমের গভীর উপলব্ধিতে মিশে থাকে। যেন প্রতিটি ছোঁয়াতেই এক চিলতে ইতিহাস লেখা হচ্ছে—ভালোবাসার, অপেক্ষার, আর স্বপ্নভঙ্গের।

ঘরটা তখন গন্ধে ভরে যায়—চামড়ার, ঘামের, আর শরীর-দেওয়া সুখের। একসময় সবকিছু থেমে যায়। শ্রেয়া শুয়ে থাকে অর্ণবের বুকে, তার চুল এলোমেলো, ঠোঁট লাল, চোখ আধখোলা। অর্ণব তার কপালে চুমু খায়।

“আমরা কী করছি?” শ্রেয়া বলে চুপচাপ।

“ভালোবাসছি। আর কিছু নয়।”

“তবে কেন এত লুকোচুরি?”

“কারণ সত্যি জিনিসগুলো সবসময়ই একা থাকে, গোপনে থাকে। লোকে বোঝে না।”

তারা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের গাছের পাতা নড়ে, একটা কাক ডাকে দূরে। এ যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, বাস্তব জীবনেরই এক খণ্ড সত্যি।

“তুমি কি কখনো কাউকে ছেড়ে যাওনি?” শ্রেয়া জানতে চায়।

“গেলেও থেকেছি,” অর্ণব বলে। “যার কাছে ফিরতে চাও, সে-ই আসল। তুমি জানো তো, আমি তোমার কাছে বারবার ফিরতে চাই।”

বিকেল নেমে আসে ধীরে ধীরে। অর্ণব উঠে জানালাটা বন্ধ করে, শ্রেয়ার গায়ে একটা শাল জড়িয়ে দেয়। সে আবার শ্রেয়ার পাশে শুয়ে পড়ে।

“তোমার শরীরটা যেন একটা কবিতা,” অর্ণব বলে। “প্রতিবার পড়ার মতো, অথচ কখনো শেষ হয় না।”

শ্রেয়া হেসে ফেলে, “আর তোমার হাত যেন প্রতিটি লাইনের অর্থ বোঝে।”

আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর শ্রেয়া বলে, “আমি জানি, এই সম্পর্ক একদিন শেষ হবে।”

অর্ণব চমকে ওঠে। “কেন বলছো এমন?”

“কারণ যা গোপন, তা চিরকাল থাকে না। আর সত্যিকারের প্রেমও সব সময় সমাজ টিকিয়ে রাখতে পারে না।”

অর্ণব তার মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তারপর ধীরে বলে, “তবুও আমি থাকব—যতক্ষণ পারি, যতটা পারি। এই দুপুরটা আমার থাকবে, চিরকাল।”

তারপর তারা আবার জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। শরীর আর আত্মা মিলে এক নিঃশব্দ সমাপ্তির দিকে এগোয়, যেখানে ভাষার দরকার পড়ে না। এই নির্জন দুপুর, এই ফাঁকা ফ্ল্যাট, আর তাদের নগ্ন ভালোবাসা—সব মিলিয়ে যেন এক পরিপূর্ণ মুহূর্তের সৃষ্টি হয়।

বাইরে আলো কমছে। ভিতরে আলো জ্বলছে—কেবল দুটি চোখে, দুটি দেহে, দুটি হৃদয়ে।

শ্রেয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তার চোখে এক ধরনের ঝলক আছে—না সেটা পুরোপুরি প্রেমের, না পুরোপুরি দুঃখের। চুল এলোমেলো, গালে এখনো অর্ণবের ঠোঁটের ছাপ মিশে আছে। আয়নায় সে নিজেকে দেখে, আর নিজের চোখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ খুঁজে পায়।

একটা ফোন এসে পড়ে—অর্জুন। তার স্বামী। ভদ্র, নিয়মিত, দায়িত্ববান, কিন্তু কোথাও যেন অদৃশ্য। ফোনের ওপাশে শুধুই জিজ্ঞেস, “আজ দেরি হবে তোমার?”

শ্রেয়া বলে, “হ্যাঁ, একটা মিটিং ছিল। বেরোচ্ছি।”

অর্ণব তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায়। শহরের দূর আলোকবিন্দুগুলোকে সে দেখে, যেন এ শহর তাদের জন্য নয়, শুধুই নির্জনতা ও সংবেদনের জন্য। সে শ্রেয়াকে পেছন থেকে দেখে—একটা ক্লান্ত নারী, যার ভিতরে যুদ্ধে চলছে প্রেম আর দায়িত্বের।

“তোমার কি কখনো মনে হয় না, আমরা ভুল করছি?” শ্রেয়া বলে।

অর্ণব মুচকি হাসে, “ভুল আর ঠিক সবটাই সমাজের বানানো। তোমার শরীর তো বলে, এটা ভুল নয়।”

শ্রেয়া উঠে এসে তার বুকের ওপর হাত রাখে। “তবুও আমার মন কেমন হালকা হয় না, জানো?”

অর্ণব তার চোখের দিকে তাকায়। “তুমি জানো, আমি কাউকে ঠকাচ্ছি না। আমি শুধু ভালোবাসতে চাচ্ছি। তা সে যেভাবেই হোক।”

এই কথাগুলো শ্রেয়া বহুবার শুনেছে। তবুও, প্রত্যেকবার যেন নতুনভাবে কাঁপিয়ে তোলে তাকে।

“তুমি কি কখনো আমাদের নিয়ে কিছু ভাবো?”

“ভেবে লাভ কী? তোমার স্বামী আছে, আমার একটা নিছক জীবন। আমাদের জায়গাটা শুধুই এইসব আড়ালে।”

এই কথায় শ্রেয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে আবার আয়নার সামনে যায়। নিজেকে দেখে, আর ভাবে, এই মানুষটাকে সে কতটা চিনে? যাকে সে দিনের আলোয় বলে স্বামী, আর রাতের ছায়ায় ডাকে প্রেমিক—এই দ্বৈততা কি আসলে তাকেই গিলে ফেলছে না?

“তোমার চুল ভিজে গেছে,” অর্ণব বলে, তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে।

শ্রেয়া হেসে ফেলে, “তোমার সিগারেটের ধোঁয়া আমার ঘাড়ে লাগছে।”

“তাহলে এইভাবে থাকি,” সে বলে, আরও কাছে আসে। আয়নার প্রতিচ্ছবিতে তারা দুজন—একটি নারী, একটি পুরুষ, আর তাদের শরীরের মাঝে একটা ঝুলন্ত নৈতিকতা।

“চলো কোথাও চলে যাই,” হঠাৎ শ্রেয়া বলে।

অর্ণব থমকে যায়। “কোথায়?”

“যেখানে কেউ চিনবে না। কোনো পরিচয় থাকবে না। শুধু তুমি আর আমি। একটাই ঘর, একটা আয়না, একটা বিছানা।”

অর্ণব চুপ করে থাকে। সে জানে, এটা বলার কথা—বাস্তবের নয়। তবে কথার মাঝেও একটা আশা থাকে, একটা প্রয়াস থাকে মুক্তির।

শ্রেয়া হঠাৎ করেই বলে, “তুমি কি আমার চেয়ে বড় কিছু চাও?”

“না,” অর্ণব বলে। “আমি শুধু চাই, তুমি আমার চোখে তাকাও। আর কখনো না বলো—‘ভুল করছি’। তুমি ঠিক করছো, কারণ তুমি ভালোবাসছো।”

আয়নার সামনে দুজনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। ঘরের বাতাসে একটা ভারী ভাব। তাদের প্রেম যেন এক শীতল জলে ভেজা কাপড়—শুকোয় না, তবে দাগ ফেলে যায়।

শ্রেয়া এবার আলতো করে বলে, “তুমি জানো তো, আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারব না। আর তন্ময়কে ছেড়ে আসাও অসম্ভব। আমি কোথাও আটকে আছি, যেখান থেকে পালানোর পথ নেই।”

অর্ণব তার হাত ধরে। “তাহলে এই বাঁধনেই থাকি না, যেটা আমাদের তৈরি। সমাজেরটা না, অন্য কারও না—শুধু আমাদেরটা।”

ঘরের বাতাসে আবার আগুন জ্বলে ওঠে। তারা আবার একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলে, যেন স্পর্শই তাদের ভাষা।

আয়নায় ভেসে ওঠে শরীর, ভেসে ওঠে চোখে চোখ রাখা প্রেম। আর এই অধ্যায় শেষ হয় এক লাল আলোয়, যা রক্ত নয়, প্রেমের রং।

সান্ধ্য বাতাসে শহর একটু ধীর, একটু ভাঙাচোরা। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে শ্রেয়া জানে, এই ট্রেন না ধরলে হয়তো আর কোনো ট্রেন থাকবে না আজ। অর্ণব তার পাশে, গা ঘেঁষে নয়, একটু দূরে। আজ তাদের মাঝে দূরত্ব বেশি। আজ কোনো চুম্বন নেই, নেই হালকা হাসি—আজ শুধু দীর্ঘশ্বাস।

“তুমি কি ঠিক করেই নিয়েছো?” অর্ণব জিজ্ঞেস করে।

শ্রেয়া চোখ নামিয়ে বলে, “হ্যাঁ। অর্জুন সন্দেহ করতে শুরু করেছে। আমি পারছি না আর।”

অর্ণব তার ঠোঁট কামড়ায়, যেন কিছু আটকাতে চাইছে। “তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?”

“ভালোবাসি বলেই তো শেষ করতে চাই,” শ্রেয়া বলে। “প্রতিদিন এই লুকিয়ে দেখা, পালিয়ে থাকা, ভালোবাসা হয়ে যায় একটা বোঝা।”

ট্রেন আসে। ধীরে ধীরে। ধাতব চাকার ঘর্ষণে তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে। অর্ণব হঠাৎই শ্রেয়ার হাত চেপে ধরে।

“তুমি চলে গেলে, আমি বাঁচব না। তুমি জানো না, আমি কীভাবে তোমায় ভালোবাসি।”

শ্রেয়া চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “তুমি ভালোবাসো ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসারও একটা সময় থাকে, একটা পরিণতি। আমরা পরিণতিহীন। আমাদের গল্পটা শুধুই অনুভবের, কোনো ভবিষ্যৎ নেই।”

ট্রেনের দরজা খোলে। শ্রেয়া পা বাড়ায়, কিন্তু অর্ণব তার হাত টেনে ধরে। “আমার একটা কথা শুনবে?”

“বলো।”

“চলো, একবার। একবার শুধু চলেই যাই কোথাও। অর্জুন, সংসার, দায়িত্ব—সব ফেলে। কিছুদিনের জন্য।”

শ্রেয়ার চোখে জল আসে। “এত সাহস কি আছে আমাদের? আমরা কি সত্যিই পারি সব ছেড়ে চলে যেতে?”

অর্ণব বলে, “আমরা যদি আজ না যাই, তাহলে আর কোনোদিন পারব না।”

ট্রেনের সাঁই সাঁই শব্দে কথাগুলো চাপা পড়ে যায়। শ্রেয়ার চোখে অস্থিরতা, আর অর্ণবের চোখে এক ধরনের নির্লজ্জ ভালোবাসা। ঠিক সেই মুহূর্তে, তারা বুঝতে পারে—এই সম্পর্ক শেষ হবে না ভালোবাসার অভাবে, শেষ হবে সাহসের অভাবে।

শ্রেয়া উঠে দাঁড়ায়। “আমি যাই। যদি একদিন সাহস পাই, ফিরে আসব।”

অর্ণব চুপ। কেবল তার চোখের মধ্যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।

শ্রেয়া ট্রেনে উঠে যায়। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ট্রেন চলতে শুরু করে। অর্ণব দাঁড়িয়ে থাকে, সেই চেনা প্ল্যাটফর্মে, চোখের সামনে চলে যাওয়া ভালোবাসা দেখে।

আর সেই মুহূর্তে—একটা কথা, একটা চুম্বন, একটা দৌড়—সবই অতীত হয়ে যায়।

১০

তিন বছর কেটে গেছে। শহরের চেনা অলিগলি বদলে গেছে, কিন্তু শ্রেয়ার ভেতরে এখনও অর্ণব রয়ে গেছে আগের মতোই। অর্জুন এখন বিদেশে, চাকরির সূত্রে। সম্পর্কটা কাগজে কলমে টিকে আছে, অথচ বাস্তবে নিঃসাড়। শ্রেয়া এখন একা। একদম একা।

এক সন্ধ্যায়, বইমেলার ভিড়ে হেঁটে চলেছে শ্রেয়া। বাতাসে জলকণার গন্ধ, পুরনো বইয়ের গন্ধ, আর কোথাও যেন অর্ণবের ঘ্রাণ—এই তিন মিলিয়ে মনটা ভারি হয়ে ওঠে। হঠাৎই একটা স্টলে চোখ আটকে যায়। স্টলের নাম—“চুপকথা”।

একটা বইয়ের নাম, “নিভৃতে তুমি।” লেখক—অর্ণব সেনগুপ্ত।

শ্রেয়া যেন থমকে যায়। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বুকের এক কোনায় লুকানো ভালোবাসা, অপরাধবোধ আর ক্ষত—সব একসাথে ঢেউ তোলে। বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা,

“তোমার জন্য। যে ভালোবাসা ছিল, আছে, আর কোনোদিন ফুরোবে না।”

শ্রেয়া বইটা কিনে ফেলে। রাতে বাড়ি ফিরে একটা নিঃসঙ্গ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে। পাতায় পাতায় যেন নিজের গল্প, নিজের দুঃখ, নিজের ছায়া খুঁজে পায় সে। অর্ণবের ভাষায় এখনো তার জন্য তৃষ্ণা ঝরে পড়ে। ভালোবাসার কোনো অভিযুক্ত নেই, নেই কোনো বিচার, কেবল আছে একটানা টান—যেটা বন্ধ করা যায় না।

বইটা পড়ে শেষ করে সে। পরের দিন সকালে অর্ণবের পুরনো ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠায়। খুব ছোট চিঠি।

“বই পড়েছি। এখনো কি তুমি ওই ক্যাফেতে যাও? –শ”

এক সপ্তাহ পর। দুপুর তিনটে। সেই পুরনো ক্যাফে। কাঠের টেবিল, ঝুলন্ত হলুদ আলো, জানালার পাশে সেই চেনা টেবিল। অর্ণব বসে আছে। নিঃশব্দে কফির কাপ ঠোঁটে তুলছে বারবার, যদিও চুমুক নেই। প্রতীক্ষা তার অভ্যাস হয়ে গেছে।

ঘণ্টাখানেক পর দরজার ঘন্টি বেজে ওঠে। হালকা সবুজ কুর্তিতে শ্রেয়া ঢোকে। চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে নরম একটা হাসি।

দুজনের চোখে চোখ পড়ে। কোনো কথা হয় না, শুধু এক দীর্ঘ মুহূর্তের নিস্তব্ধতা, যেটা ভাষার চেয়ে অনেক বেশি বলিষ্ঠ। তারপর শ্রেয়া ধীরে ধীরে হাঁটে, এসে বসে অর্ণবের সামনের চেয়ারে।

“তুমি বই লিখেছো,” শ্রেয়া বলে।

“তুমি এসেছো,” অর্ণব জবাব দেয়।

“তুমি জানো না, আমি কতবার এসেছি এই শহরে… চুপিচুপি। তোমায় দেখতে, তোমার কোনো খবর পেতে।”

“আমি জানতাম না। শুধু আশা করতাম একদিন তুমি ফিরে আসবে।”

দুজনেই চুপ। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে। ভিতরে একটা গান বাজছে—মিলানোর নয়, বিচ্ছেদের নয়—বরং সেই গান যেটা একটা অসমাপ্ত গল্পের পাতায় ঠিকঠাক বসে যায়।

শ্রেয়া ধীরে ধীরে বলে, “তুমি কি এখনো ভালোবাসো?”

অর্ণব এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর হালকা হাসে, “আমি ভালোবাসা থামাতে শিখিনি। আমি শুধু তোমায় লেখা শিখেছি।”

শ্রেয়ার চোখে জল আসে। “তুমি যদি তখন আমাকে একটা ফোন করতে… হয়তো পালিয়ে যেতাম। তোমার সঙ্গে।”

“আমি সাহস পাইনি। আমি ভেবেছিলাম তুমি ভালো থাকবে।”

“আমরা কেউ ভালো থাকিনি, অর্ণব।”

বাইরে বৃষ্টি একটু ঘন হয়ে আসে। শ্রেয়া জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, “চলো কোথাও চলে যাই। আজ না হয় একবার সত্যিই পালাই। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই।”

অর্ণব কিছু বলে না। শুধু উঠে দাঁড়ায়, টেবিলের ওপর টাকা রেখে, হাত বাড়ায় শ্রেয়ার দিকে। শ্রেয়া সেই হাত ধরে। এত বছর পরেও সেই স্পর্শে গা কেঁপে ওঠে।

দুজন বাইরে আসে। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো ছাতা নেই। রাস্তার পাশে এক ট্যাক্সি দাঁড় করায় অর্ণব।

“কোথায় যাবো?” ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে।

শ্রেয়া ও অর্ণব একসাথে বলে, “স্টেশন।”

ট্যাক্সি ছুটে চলে। শহরের আলোগুলো ঝাপসা হয়ে যায় বৃষ্টির ফোঁটায়। গাড়ির ভিতরে অর্ণব শ্রেয়ার হাত ধরে রাখে শক্ত করে, যেন আর কখনো ছাড়বে না।

স্টেশনে এসে তারা একটা ট্রেনের টিকিট কাটে—গন্তব্য জানা নেই, ঠিকানাহীন ভালোবাসার মতোই।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে, শ্রেয়া বলে, “এইবার যদি সাহস না করি, তাহলে কোনোদিন করব না।”

অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে বলে, “এইবার আমরা পালাচ্ছি না। এইবার আমরা ফিরছি—নিজেদের কাছে।”

ট্রেন আসে। দুজনেই উঠে পড়ে। জানালার পাশে বসে, শ্রেয়া মাথা রাখে অর্ণবের কাঁধে। বাইরে ভিজে শহর, ভিতরে জ্যামিতির মতো নিখুঁত এক নিভৃতে ভালোবাসা।

এইবার কোনো লুকোচুরি নেই। কোনো অনুশোচনা নেই। শুধু তারা দুজন, আর একটা জীবন, যা আবার নতুন করে শুরু হলো।

শেষ

 

WhatsApp-Image-2025-06-02-at-3.32.31-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *