বিশ্বরূপ সাহা
কলকাতার হাওয়া তখনো গরম, তবু একধরনের অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে ধরেছিল অরুণাভ চৌধুরীকে। তিন মাস আগেই একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে তার সর্বশেষ ডকুমেন্টারি প্রশংসা কুড়িয়েছিল, কিন্তু সে সাফল্য তাকে আর আলোড়িত করত না। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনে, একদিকে ভেঙে যাওয়া বিয়ে, অন্যদিকে বাবার আকস্মিক মৃত্যু—সব মিলিয়ে সে যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল। এই মুহূর্তে তার একটাই প্রয়োজন—নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, শহরের কোলাহল থেকে দূরে, এমন এক জায়গায় যেখানে না আছে নেটওয়ার্ক, না আছে মানুষের হুড়োহুড়ি, কেবল নিস্তব্ধতা আর অজানা ইতিহাসের গন্ধ। আর এই আকাঙ্ক্ষাই তাকে টেনে এনেছিল বীরভূমের গভীরে অবস্থিত নিঝুম নামের এক ছোট্ট গ্রামে। এই গ্রাম সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা ছিল না, কেবল লিপিকার দিদিমার পুরনো একটা চিঠি আর কিছু গুজব ছাড়া। অরুণাভ ঠিক করেছিল, এখানেই সে তার পরবর্তী প্রজেক্টের রসদ খুঁজে বের করবে। সেভাবেই এক ঝাঁপসা ভোরে ব্যাগ গুছিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছিল, ক্যামেরা, ড্রোন আর নোটবুক নিয়ে। গ্রামের কাছে এসে রাস্তাও শেষ—টোটোও যায় না; শেষটা পায়ে হেঁটে।
গ্রামে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই অরুণাভ বুঝতে পারে, নিঝুম নামটা শুধু নামমাত্র নয়, সত্যিই যেন পুরো গ্রামটিকে একটা ভারি নীরবতা গিলে নিয়েছে। দুপুরের রোদে শুকনো ধুলোর রাস্তা, দুপাশে পুরনো কুঁড়েঘর, মাঝেমাঝে পাঁশুটে গরু দাঁড়িয়ে থেকে থেকে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইলের সিগন্যালও কাজ করে না। এমনকি গ্রামের মানুষগুলোর মধ্যেও একটা অদ্ভুত নিঃশব্দতা কাজ করে। মুখে কথা নেই, চোখে একধরনের অবিশ্বাস। কেউ যেন বাইরের কাউকে সহজে মেনে নিতে চায় না। এক বৃদ্ধ, হরাধন পাত্র, থ্যাবড়া পাগড়ি আর কুঁচকানো চোখে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে একটা খালি ঘর দেখিয়ে দেন—পুরনো স্কুলবাড়ি, এখন আর স্কুল চলে না, রাতে থাকতে চাইলে ওখানেই থাকা যায়। অরুণাভ ধন্যবাদ জানায়, জিনিসপত্র রেখে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখে। কোথাও কোনো সঙ্গীতের চিহ্ন নেই, অথচ এতটাই স্থবির সবকিছু যে মনে হয়, বহু আগে এখানে কেউ হয়তো গান গাইত।
সন্ধ্যা নামতেই গ্রামের রং বদলাতে থাকে। দূরে কোথাও কেউ ধূপ জ্বালিয়েছে, হালকা ধোঁয়া বাতাসে ভেসে আসে। অরুণাভ তার ক্যামেরা ব্যাগ থেকে একটা লেন্স বার করে স্কুলঘরের খোলা জানালা দিয়ে গ্রামটাকে ক্যাপচার করতে থাকে। সে কিছু ছবি তুলতে তুলতেই আচমকাই কানে আসে এক শব্দ—একটা পুরনো হারমোনিয়ামের সুর। প্রথমে ভাবে পাশের কোন ঘরে কেউ হয়তো গান করছে। কিন্তু চারদিকে তো কেউ নেই! সুরটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, একটা পরিপাটি গানের ছন্দে মিশে যায়—আর ঠিক তার পরেই ভেসে আসে এক নারীকণ্ঠের করুণ কান্না, যেন কোথাও কেউ বুকফাটা যন্ত্রণায় কেঁদে চলেছে। অরুণাভ হতভম্ব হয়ে জানালা বন্ধ করতে যায়, কিন্তু সুর যেন গায়ে গায়ে মিশে থাকে, হাওয়ার মত! অন্ধকারে তার চোখ পড়ে স্কুলঘরের সীমানার ঠিক বাইরে—একটা অস্পষ্ট সাদা ছায়ামূর্তি দূরে দাঁড়িয়ে। চোখের পলক পড়ার আগেই সেটা মিলিয়ে যায়। অবিশ্বাস আর কৌতূহলের এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারে—এখানে কিছু একটা আছে, এবং তা তার অভিজ্ঞতার বাইরে।
রাত গভীর হলে অরুণাভ ব্যাগ খুলে তার ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে বসে। সে জানত সে কোনো হ্যালুসিনেশন দেখেনি, কিন্তু ক্যামেরা কি তা ধরতে পেরেছে? কিছু সময় পর এক ঝলকে দেখতে পায়, জানালার ফ্রেমের মাঝে এক সাদা অবয়বের ছায়া, অস্পষ্ট, কিন্তু রূপময়। তার পরেই ক্যামেরার অডিও ট্র্যাকে আসে সেই হারমোনিয়ামের সুর—ক্লাসিকাল, পুরনো দিনের রাগাশ্রয়ী কিছু একটা, সঙ্গে মৃদু হাহাকার। শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। এই সুর কে বাজাচ্ছে, কোথা থেকে আসছে? বিদ্যুৎহীন, নেটওয়ার্কবিহীন এই গ্রামের ঠিক মাঝখানে কে সেই গায়িকা, যার হাহাকার এখনো বাতাসে বাজে? একদিকে ভয়, অন্যদিকে সিনেম্যাটিক উত্তেজনা—সে বুঝতে পারে, এই নিঝুম গ্রাম আসলে এক অমীমাংসিত গল্পের আস্ত কবরখানা, যেখানে হয়তো সে নিজেও আর সহজে ফিরে যেতে পারবে না। অরুণাভ চুপচাপ ক্যামেরা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু সে জানে—এই গল্প তাকে হাতছানি দিচ্ছে। আর সে একজন চিত্রপরিচালক, যাকে সত্যির গভীরে ঢুকেই ফিরতে হবে।
***
পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই অরুণাভ বুঝতে পারল, গ্রামটা দিনের আলোয় যেমন নির্জন, রাতের ঘোরে তার থেকেও বেশি রহস্যময়। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে, চারপাশটা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। স্কুলঘরের পাশের বাঁশবনটা যেন নিঃশব্দে কাঁপছে। দূরে একজন বৃদ্ধ—হরাধন পাত্র—একগাল বিড়বিড় করে হেঁটে যাচ্ছেন, যেন কোনো প্রাচীন মন্ত্র জপছেন। অরুণাভ তার পেছনে ছুটে গিয়ে কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করল, “হরাধনদা, আপনি কি কাল রাতে কোনো গান শুনেছিলেন?” বৃদ্ধ থমকে দাঁড়ালেন, একটা কাঠের লাঠি মাটিতে ঠুকে বললেন, “ও সুর না শুনলেই ভালো। যার কানে একবার ঢোকে, তার মনের মধ্যে ঢুকে পড়ে, আর ফিরতে দেয় না।” মুখে হাসি নেই, চোখে একরাশ সতর্কতা। অরুণাভ আর জিজ্ঞাসা করল না কিছু, শুধু বুঝে গেল—এই গ্রামে গান মানেই ভয়, এই সুর একধরনের শোক, যে অতীতের ভেতর চাপা পড়ে থাকলেও পুরো গ্রামজুড়ে তার প্রতিধ্বনি বাজে।
গ্রামের রাস্তা ধরে হেঁটে চলতে চলতে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় লিপিকার সঙ্গে—গ্রামের এক তরুণী, যাকে আগের দিন একঝলক দেখেছিল ধানক্ষেতের পাশে। লিপিকা তাকে দেখে অবাক হলেও হাসে, অরুণাভ নিজেকে চিত্রপরিচালক বলে পরিচয় দিলে মেয়েটা বলল, “আপনার মতো লোক এইখানে আসে না, কণিকার কথা শুনে এসেছেন না?” নামটা শোনামাত্রই অরুণাভ থমকে যায়—এই নামটা তার ক্যামেরার অডিওতে আসেনি, অথচ এই নামটা শুনে যেন শরীরের ভেতর দিয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। লিপিকা বলে, “আমার দিদিমা বলত, কণিকা দিদি খুব ভালো গান গাইতেন। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। কিন্তু একদিন হঠাৎ সব বদলে গেল।” অরুণাভ জানতে চায়, “কি হয়েছিল?” লিপিকা তখন ছোট্ট একটা কথাই বলে, “ওঁকে হারিয়ে দিয়েছিল এই গ্রামেরই কিছু মানুষ, আর তারপর থেকে তিনি রাত হলে ফিরে আসেন। সুরে, ছায়ায়।” কথাটা বলেই সে নিচু স্বরে বলে, “তবে কেউ নাম করে না, ভয় করে। আপনি কণিকার ছবি করতে এসেছেন?”
সেই বিকেলে অরুণাভ গ্রামের বাইরে থাকা পুরনো বটগাছের নিচে বসে থাকে, তার ক্যামেরা হাতে। পেছনের স্কুলঘরটা ধীরে ধীরে ঢেকে যায় ছায়ায়। পাখির ডাক থেমে আসে। সেই মুহূর্তে সে শুনতে পায়—আবার সেই হারমোনিয়ামের সুর, এবার আরও স্পষ্ট। তীক্ষ্ণ, কিন্তু বিষণ্ণ, যেন সুরটা কেঁদে উঠছে। সে লেন্স তুলে ফোকাস করে দূরে—একটা মেলামেশা ঘর, যা হয়তো একসময় মন্দির ছিল। সেই পরিত্যক্ত মন্দিরবাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক নারী-ছায়া, সাদা শাড়ি, ঢেকে থাকা চুল, এবং ঠায় তাকিয়ে আছে ক্যামেরার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে পড়ে নারীর মুখ—নিতান্ত মায়াবী, কিন্তু ব্যথায় ভরা। ঠিক তখনই একটা কালো কুকুর পাশে এসে দাঁড়ায়, গম্ভীরভাবে তাকিয়ে থাকে ছায়ার দিকেই। পরের মুহূর্তেই, সেই নারী ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়—না গাছের আড়ালে, না ঘরের কোণে, বরং যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
রাতে অরুণাভ ফুটেজ পরীক্ষা করে। ক্যামেরার অডিও ট্র্যাকে এবার শুধুই সুর নয়, আছে একটা মেয়েলি গলা—বলে উঠছে, “আমার গান কেউ শুনতে চায় না… আমাকে থামিয়ে দিয়েছে…” তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে ফিরে তাকায় জানালার দিকে—একটুও বাতাস নেই, কিন্তু হারমোনিয়ামের সুর এখনও যেন ভেসে আসছে। এ কি শুধু আত্মা, নাকি একটা অসমাপ্ত ইতিহাস? কোথা থেকে এসেছে এই রহস্যময় সুর? কে এই কণিকা? সে জানে—এই নারীর কাহিনি, এই ছায়ার কান্না, এবং হারমোনিয়ামের রহস্য তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। এই গল্পটা আর শুধুমাত্র সিনেমার উপাদান নয়, এটা একটা অস্তিত্বের প্রশ্ন, যেটা হয়তো তাকে নিঝুম গ্রামে চিরতরে বেঁধে রাখবে।
***
পরদিন সকালবেলা লিপিকা তাকে ডেকে নিয়ে যায় তাদের বাড়িতে। দাওয়ায় বসে থাকা লিপিকার বৃদ্ধা দিদিমা—শোভা পিসি, যিনি অতীতের জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছেন—তাকে দেখে অরুণাভ ভেবেছিল, হয়তো কিছুই মনে থাকবে না তাঁর, কিন্তু কণিকার নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিতে আলো জ্বলে ওঠে। “কণিকা ছিল এই গ্রামের সবচেয়ে মধুর কণ্ঠ,” বললেন তিনি, “শুধু গান নয়, মানুষটাও ছিল অনন্যা। কলকাতা থেকে এসেছিল এক বিখ্যাত পরিবার থেকে। সেই সময় জমিদারবাড়ির বড়োবউ গান শিখতে চাইছিলেন, তাই কণিকাকে অনুরোধে এখানে আনা হয়। কিন্তু আমরা কেউ জানতাম না, সেই গান শেখানোর অজুহাতে কণিকাকে ওরা কেমন করে ফাঁসাবে।” অরুণাভ চুপ করে শুনছিল, শুধু মাঝে মাঝে ক্যামেরার রেকর্ড বাটন টিপে রাখছিল। শোভা পিসির কথায় উঠে আসছিল এমন এক নারীর গল্প, যার জীবনটাকে গান দিয়ে শুরু করে হাহাকারে শেষ করে দিয়েছিল এক লোভী সমাজ।
“তাকে যখন প্রথম দেখেছিলাম,” শোভা পিসি স্মৃতিচারণ করলেন, “সাদা জামদানি শাড়ি, হালকা গজর কণ্ঠ, আর একটা হারমোনিয়াম বুকে চেপে ছিল তার সবচেয়ে আপন বন্ধু। আমি তখন মন্দিরবাড়ির রান্নাঘরে কাজ করতাম। সকালে স্নান করে এসে সে মন্দিরে বসে রেওয়াজ করত। সেই সুরে পাখিরাও থেমে যেত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কণিকাকে নিয়ে কানাঘুষো শুরু হলো। জমিদারবাড়ির দায়িত্বে থাকা বিধানবাবু, তখন গ্রামপ্রধান, তাকে নিয়ে অন্যরকম ভাবতে শুরু করেছিল। আমি নিজে অনেকবার দেখেছি, রাতে কণিকার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কান পাতছে। কণিকা খুব সাধারণ মেয়ে ছিল না, সে এসব বুঝত। তারপর…” শোভা থেমে যান। তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। লিপিকা তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলে, “এইখানেই থেমে যান দিদিমা, আপনি আবার ব্যথা পাবেন।” কিন্তু অরুণাভ অনুরোধ করে, “শোনাতে দিন, এটা ইতিহাস—যে হারিয়ে গেলে আমরা কেউ জানব না।”
শোভা পিসি আবার ধীরে ধীরে বলেন, “একদিন কণিকা খুব ভেঙে পড়ে। আমাকে বলেছিল, ‘আমার গান তারা বন্ধ করতে চায়। ওরা চায় আমি শুধু গাই, কিন্তু নিজের ইচ্ছেমতো না। আমার কণ্ঠস্বরটাও যেন ওদের সম্পত্তি।’ তারপরের দিন ছিল নতুন চাঁদের রাত। কণিকা গায়েব হয়ে গেল। সবাই বলল সে নাকি পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, সে যেতে চায়নি, সে হারিয়ে গিয়েছিল। ওর হারমোনিয়ামটা পড়ে ছিল মন্দিরবাড়ির পেছনের ঘাসে, রক্তে ভিজে। কেউ কিছু বলেনি, সবাই চুপ করে ছিল।” অরুণাভ বুঝতে পারে, এ শুধু একটা ট্র্যাজেডি নয়—এ এক জঘন্যতম অন্যায় যা আজও মুছে যায়নি। গ্রাম তার ব্যথা চাপা দিয়েছে, কিন্তু সেই সুর আজও বাতাসে বেজে চলেছে, কণিকার আত্মা আজও ঘুরে বেড়ায়, তার হারানো কণ্ঠস্বর ফিরে পেতে।
সেদিন রাতে অরুণাভ মন্দিরবাড়ির কাছাকাছি একটি উঁচু জায়গায় বসে থাকে ক্যামেরা নিয়ে। চাঁদ উঠেছে, ঘাসে শিশির জমেছে। মন্দিরের গা দিয়ে উঠছে ঠান্ডা ধোঁয়া। হঠাৎ শুনতে পায় সেই সুর—এবার আরও গভীর, আরও ব্যথাতুর। ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে দূরে এক নারীমূর্তি, এবার একেবারে স্পষ্ট। শাড়ির আঁচল বাতাসে ওড়ে, চোখ দুটো জ্বলে ওঠে জলের মত আলোয়। সে হারমোনিয়ামের সামনে বসে আছে, আঙুল সরছে কিন্তু স্পর্শ করছে না—তবু শব্দ হচ্ছে। সে মুখ তুলছে—তার মুখে সেই চিরচেনা বেদনা। এক মুহূর্তে অরুণাভ যেন স্থবির হয়ে যায়। ক্যামেরা ফ্রেমের বাইরে সে নিজেকে দেখতে পায়—কোনো এক ব্যথার সুর যেন তার ভিতরেও ঢুকে গেছে। এই রাত, এই সুর, এই নারী—সব মিলিয়ে সে বোঝে, তার ডকুমেন্টারি নয়, এ যেন তার নিজের আত্মার খোঁজ। কণিকা হারিয়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তার সুর রেখে গেছেন, আর সেই সুরেই সে ডুবে যেতে শুরু করেছে।
***
পরদিন সকালে, ঘুম ভাঙার আগেই এক বিভীষিকাময় স্বপ্নে হঠাৎ চমকে ওঠে অরুণাভ। স্বপ্নে সে দেখেছিল—এক পুরনো মন্দিরের ভেতর অন্ধকারে কণিকা বসে আছেন হারমোনিয়ামের সামনে, অথচ তাঁর আঙুলে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, আর মুখে থেমে যাওয়া সুরের এক চিৎকার। ঘাম ভেজা শরীর নিয়ে সে উঠে বসে জানালার বাইরে তাকায়—দূরে সেই মন্দিরবাড়ির ছায়া। সকালে লিপিকাকে ডেকে আনে, বলে, “আমাকে ঐ মন্দিরটা ভালো করে দেখতে হবে।” লিপিকা একটু দ্বিধায় পড়ে, কিন্তু তারপর রাজি হয়। তারা হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের শেষ প্রান্তে পৌঁছায়, যেখানে একটা প্রাচীন, ধ্বংসপ্রায় মন্দিরবাড়ি বাঁশঝাড় আর ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে আছে। কেউ এখন আর এখানে আসে না—গল্প আছে, যারা রাতে এখানে যায়, তারা নাকি আর ফিরে আসে না।
মন্দিরবাড়ির দরজা পচা কাঠে তৈরি, আধখোলা, আর ভেতরে ঢুকতেই অরুণাভ দেখে, সব কিছুতে ধুলোর স্তর, ছাদের এক কোণ ভেঙে পড়েছে, আর মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরনো জামাকাপড়, ভাঙা পিতলের বাসন, আর কোণার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা হারমোনিয়াম, যা দেখে মনে হয়, কেউ যেন বহু বছর ধরে ছুঁয়েও দেখেনি—তবুও তার উপর পড়ে থাকা ধুলোর ভেতর কয়েকটি স্পষ্ট আঙুলের ছাপ। অরুণাভ এগিয়ে গিয়ে হারমোনিয়ামটা পরীক্ষা করতে যায়, কিন্তু স্পর্শ করার আগেই একটা ঠাণ্ডা হাওয়া যেন তার ঘাড় ঘেঁষে বয়ে যায়। সে পিছনে তাকায়—কেউ নেই। তবুও তার মন বলে, কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ হারমোনিয়ামের ঢাকনা একটু খুলে যায়, নিজে থেকেই। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটুখানি শব্দ, যেন এক রুদ্ধ কান্নার টুকরো সুর। লিপিকা ভয়ে এক পা পিছিয়ে যায়, বলে, “চলুন এখান থেকে। এটা ভালো জায়গা না।”
অরুণাভ পিছিয়ে না এসে বরং এগিয়ে যায়। মন্দিরবাড়ির ভেতর একটা ভাঙা কাঠের বাক্সে সে খুঁজে পায় একটা আধপোড়া চিঠি। কাগজে লেখা, “আমার গান আমার নয়, ওরা তা কেড়ে নিয়েছে… আমি গাই না, গাইতে বাধ্য করে ওরা… আমি পালাতে চাই, কিন্তু দরজা বন্ধ। আমাকে বাঁচাও।” নিচে নাম লেখা নেই, কিন্তু লেখা হাতের অক্ষর থেকে বোঝা যায়, এটা কণিকারই চিঠি। পাশে পড়ে আছে একটি পুরনো গয়নার বাক্স, যার মধ্যে কণিকার ফটো স্লাইড—যেখানে তাঁকে হারমোনিয়ামের পাশে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে, শাড়ি পরা, চোখে দৃঢ়তা, কিন্তু ঠোঁটে একটি চাপা শোক। অরুণাভ ক্যামেরায় সব রেকর্ড করে। এর মধ্যেই একটা অদ্ভুত আওয়াজ—দূরে মন্দিরবাড়ির ছাদের উপর যেন কারা হাঁটছে। তারা চমকে যায়, মাথা তুলে তাকায়—কেউ নেই। কিন্তু ছাদের উপর পড়ে থাকা ছায়া যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে, যখন তারা ফিরে আসে স্কুলঘরে, অরুণাভ নিজেকে খুব একটা ঠিক মনে করে না। একটা অদ্ভুত চেপে থাকা আবেগ তাকে ঘিরে ধরেছে। চিঠির শব্দ, হারমোনিয়ামের সুর, কণিকার মুখ—সব কিছু একসঙ্গে কোলাজের মতো মনের পর্দায় ফুটে উঠছে। সে রাতে ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে বসে, আর তখনই পায় এক বিস্ময়কর দৃশ্য—সে যেই মুহূর্তে হারমোনিয়ামের দিকে হাত বাড়িয়েছিল, তার ঠিক পেছনে এক নারীমূর্তি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে। ফ্রেমে ধরা পড়েছে স্পষ্ট একটা চোখ—অসাধারণ সুন্দর, অথচ কষ্টে ভরা। ক্যামেরা থেমে গেলেও, মনে হল সেই চোখ এখনও তাকিয়ে আছে তার দিকেই। অরুণাভ জানে, সে কণিকার খুব কাছে চলে এসেছে। কিন্তু আরও একটা প্রশ্ন ঘুরছে তার মাথায়—এতদিন পরেও কেন তাঁর আত্মা মুক্ত হয়নি? কণিকার কান্না কিসের? শুধু গান কেড়ে নেওয়ার? নাকি প্রেম, প্রতারণা, আর কোনো না-জানা হত্যার গল্প? নিঝুম গ্রাম এখন কেবল একটা লোকেশন নয়, এটা হয়ে উঠছে একটা জীবন্ত অতীত—যা কথা বলতে চাইছে, গাইতে চাইছে, কিন্তু কেউ শুনছে না। এখন অরুণাভ-ই তার শ্রোতা, তার সাক্ষী।
***
অন্ধকার রাতের গাঢ় ছায়ায় ডুবে থাকা নিঝুম গ্রামের নির্জন প্রান্তরে হঠাৎ একটা গভীর শব্দে কেঁপে উঠল আকাশ। বিজলির ঝলকে মুহূর্তের জন্য দেখা গেল এক বিকৃত মুখ—দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে, চোখে ঘোর লাগা ভয়ার্ত দৃষ্টি, যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে সে। পরিচালক অরিন্দম এক ঝটকায় উঠে বসলেন খাট থেকে। ঘরটা কাঁপছে, বাতাসে যেন আগুনের গন্ধ। সেই মুহূর্তে আবার শোনা গেল হারমোনিয়ামের মৃদু সুর, যেন কোনও পুরনো বাউল গানের টান, আর তার পেছনে এক নারীকণ্ঠের হাহাকার। ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে তিনি দেখলেন গ্রামের মন্দিরের দিকে এক সাদা ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, বাতাস তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, গায়ের শাড়ি ধবল আলোর মতো ঝলমল করছে। বুক ধড়ফড় করতে করতে অরিন্দম দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন, সোজা ছুটলেন সেই দিকটায়, অথচ তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে গেল যখন দেখা গেল, সেই ছায়া মিলিয়ে গেছে পুরনো মন্দিরের চাতালে।
মন্দিরে পা রেখেই একটা অদ্ভুত শীতলতা অনুভব করলেন অরিন্দম। এই জায়গাটা দিনের বেলায়ও কেমন ছমছমে লাগে, আর এখন রাতের নির্জনতায় যেন অতীতের ছায়ারা চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরনো পোড়ো মন্দির, যার দেয়াল ভাঙাচোরা, কোথাও কোথাও লতা জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু দরজার কাছে কিছু একটা যেন পড়ে রয়েছে—একটা পুরনো ছবি, কাচভাঙা ফ্রেমে আটকে থাকা এক নারীর মুখ। সেই মুখই কি তিনি দেখেছিলেন একটু আগে? ছবির নিচে কিছু লেখা ছিল, মাটি আর ধুলোয় ঢাকা পড়ে গেছে। অরিন্দম ধীরে ধীরে ধুলো সরিয়ে দেখলেন—”নির্জরা”। নামটা পড়েই অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল তাঁর শরীরে। গ্রামের একজন বৃদ্ধ তাকে বলেছিল এই নামটা—যে মেয়ে নাকি তিরিশ বছর আগে আত্মহত্যা করেছিল এই মন্দিরের সিঁড়িতে, তার প্রেমিকের বিশ্বাসঘাতকতায়। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, সেই নির্জরা কেন এখনও ফিরে আসে? হারমোনিয়ামের সুর আর তার কান্না এখনও কেন ভেসে আসে রাতে?
পরদিন সকালে গ্রামে আবার আলো ফিরে আসে, কিন্তু অরিন্দমের মন আলোয় ভরেনি। তিনি মন্দির থেকে ফেরার পর রাতভর ঘুমোতে পারেননি। নির্জরার মুখ বারবার ফিরে এসেছে তার কল্পনায়। গ্রামের বয়স্ক মানুষদের কাছে খোঁজ নিতে শুরু করেন তিনি। বৃদ্ধ গোপাল মণ্ডল জানালেন—”সেই সময় নির্জরা ছিল গ্রামের সেরা গায়িকা, এক বাবু লোক শহর থেকে এসে প্রেমের নাটক করেছিল, গান রেকর্ড করার নাম করে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলে যায়। আর নির্জরা এক রাতেই নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে তার মৃতদেহ মন্দিরের চাতালে পড়ে ছিল। তখন থেকেই এই গ্রামে রাত হলে কেউ মন্দিরের ধারেকাছে যায় না।” অরিন্দমের মনে হতে থাকে, সেই শহরের লোক কি এই গ্রামের জন্য কাল হয়ে এসেছিল? আর এখন তার নিজের আগমনও কি সেই কাহিনির পুনরাবৃত্তি?
অরিন্দম এবার সিদ্ধান্ত নিলেন—এই কাহিনির গভীরে পৌঁছাতে হবে। তার ক্যামেরা প্রস্তুত, রেকর্ডার চালু করে তিনি রাতের অপেক্ষায় থাকলেন। হঠাৎ মাঝরাতে আবার শোনা গেল সেই হারমোনিয়ামের সুর। এবার তিনি রেকর্ড করতে শুরু করলেন। কিন্তু হঠাৎই ক্যামেরার স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক মুখ—সেই একই নারী, চোখে দুঃখের ছায়া, ঠোঁটে কাঁপতে থাকা গান। তার চোখ দুটো যেন ফুঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে অরিন্দমের হৃদয়ের গভীরে। ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেল, আলো নিভে গেল ঘরে, চারদিক নিস্তব্ধ। পরদিন সকালবেলায় উঠে তিনি দেখলেন রেকর্ডারে কিছুই নেই, ক্যামেরায় কোনও ফাইলই রেকর্ড হয়নি, অথচ তার মনে গেঁথে গেছে সেই সুর, সেই মুখ, আর সেই হাহাকার—নিঝুম গ্রামে আরও গভীরে ডুবে যাচ্ছেন তিনি, অজানার অতলে।
***
আকাশের গায়ে চাঁদের আলো ভেসে ছিল নিঃশব্দে, আর নিঝুম গ্রামের গা-ছমছমে বাতাসে কেমন এক অজানা ঘ্রাণ। অয়ন দোতলার জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিল নির্নিমেষ, চোখে এক অদ্ভুত আলো, যেন কোনও এক অচিন জগৎ তাকে হাতছানি দিচ্ছে। তার ক্যামেরা টেবিলে নিশ্চুপ পড়ে ছিল, আজ রাতে আর তোলা হবে না ছবি—তাকে চুম্বকের মত টানছে সেই হারমোনিয়ামের সুর, যা একবার নয়, বারবার রাতে তার কানে বাজে। অয়ন জানালার কপাট খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখল, ঠিক পাশের তাল গাছের নিচে কে যেন ছায়ার মত দাঁড়িয়ে, কিছু একটা হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে। চোখ কুঁচকে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এ যেন সেই মহিলা, যাকে সে স্বপ্নে দেখে এসেছে বারবার—দীর্ঘ সাদা শাড়ি, এলোমেলো চুল, আর চোখে শূন্যতা। কিন্তু আজ সে স্বপ্নে নয়, বাস্তবের বুকেই দাঁড়িয়ে।
অয়ন নিচে নেমে এল ধীরে ধীরে, এক হাতে মোবাইলের টর্চ অন করে, আরেক হাতে সিগারেটের আগুন ধরিয়ে ফেলল। বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া আর তালপাতার ঘ্রাণ মিশে গেল এক অদ্ভুত ভাবে। গাছের কাছে পৌঁছনোর আগেই ছায়ামূর্তি সরে গেল, হারিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। অয়ন তার পেছনে ছুটতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল—মাটির মাঝে একটা ছোট্ট কৌটো পড়ে আছে, যেন সদ্য কারও হাত থেকে খসে পড়েছে। কৌটো খুলতেই নাকে এল এক চেনা গন্ধ—গন্ধ শোধিত তেলের, যা পুরোনো গ্রাম্য নাট্যগোষ্ঠীর যন্ত্রে ব্যবহার হত। এই সন্ধান পেয়ে অয়ন ফিরে এল, কিন্তু মনের মধ্যে এক গভীর অনুরণন বাজতে থাকল—কে এই নারী? কেনই বা রাত্রির নির্জনতায় সে হারমোনিয়াম বাজায়?
পরের দিন সকালে গ্রামে একটা আলোচনা শুরু হল। হরিপদ কাকার মুখে শোনা গেল, “এ গাঁয়ে আগে নাটকের দল আসত, হাওড়ার দিক থেকে। মল্লিকা নামের এক সুন্দরী অভিনেত্রী ছিল, যার গলায় যেন সুরের নদী বয়ে যেত। কিন্তু সেই সুর থেমে যায় এক রাত্রে, যখন সে এখানে খুন হয় নাট্যদলের এক সহ-অভিনেতার হাতে—ঈর্ষায়। সেই রাতে হারমোনিয়াম বেজেছিল শেষবার।” এই কাহিনি শুনে অয়ন শিউরে উঠল। সে বুঝতে পারল—সে যার খোঁজে এসেছে, যার ছবি তুলতে চেয়েছে, সে কেবল এক অতৃপ্ত আত্মা নয়, সে কোনও এক নিষ্পাপ সুরের প্রেতরূপ—যার গল্প হারিয়ে গেছে গ্রামের নীরবতায়। তার ক্যামেরা যে ছবিগুলো তুলেছে আগের রাতে, তাতে স্পষ্ট কিছুই ধরা পড়েনি—কিন্তু অয়নের মনে মনে সে অনুভব করল, মল্লিকার প্রেতাত্মা শুধু উপস্থিত ছিল না, সে যেন নিজেকে প্রকাশ করতে চাইছিল।
রাত্রি নামতেই অয়ন আবার প্রস্তুতি নিল। সে জানত আজকের রাত আলাদা হবে। সে হারমোনিয়ামের শব্দ শুনেই উঠে পড়ল, ক্যামেরা হাতে হাঁটতে লাগল সোজা সেই পুরোনো নাট্যমঞ্চের দিকে, যা এখন শুধুই ধ্বংসাবশেষ। সেখানে পৌঁছে দেখে, একটা পুরোনো হারমোনিয়াম পড়ে আছে ধুলোয় ঢাকা, আর তার পাশে বসে কেউ একমনে বাজিয়ে চলেছে—চোখে জল, ঠোঁটে হাহাকার। অয়ন ক্যামেরা তুলতেই বাতাস ঝাপটা দিয়ে এল, আর বাজনা থেমে গেল মুহূর্তে। কাঁপা হাতে সে ক্যামেরা নামাল, আর সামনে তাকিয়ে দেখল—সেই মহিলার মুখ, যাকে সে স্বপ্নে দেখে এসেছে… আর আজ সে বাস্তবের থেকেও বাস্তব। তার ঠোঁটে ছিল শুধু এক বাক্য—“আমাকে ফিরিয়ে দাও আলো।” তখন অয়ন বুঝে গেল—এ কেবল একটা অতৃপ্ত আত্মার গল্প নয়, এ এক শিল্পীর বিনাশ, যার কণ্ঠ কখনো থামেনি, কেবল অপেক্ষা করেছে কে তাকে মুক্তি দেবে… আর সে দায়িত্ব এখন অয়নের উপর।
***
রাতটা যেন কিছু একটা গোপন করে রেখেছিল, কুয়াশার চাদরে মোড়া গোটা নিঝুম গ্রামটা ছিল নিঃশব্দ আর ছায়াচ্ছন্ন। অমিতের শরীরজুড়ে কাঁপুনি ধরেছিল, শুধুমাত্র ঠান্ডায় নয়—ভয়, বিভ্রম আর অজানার হাতছানিতে। আগের রাতের ঘটা ঘটনাগুলো যেন ওর মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল; সেই হারমোনিয়ামের সুর, মেয়েটার আত্মাহুতির আর্তনাদ, আর পাতার ফাঁকে ফাঁকে দেখা এক ভীতিকর ছায়ার অবয়ব। সে রাতে আর ঘুমোনো হয়নি অমিতের, সেজন্য সকালে শরীর একেবারে এলিয়ে পড়েছিল। তবু আজ বিকেলেই ঠিক করেছিল, সে রাত্রে সে সেই পুরনো প্রাসাদে যাবে—মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা ভাঙা মন্দিরের চাতালে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, তা সে দেখবেই।
রাত্রি নেমে এলে মধুসূদন তাকে বাধা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু অমিতের চোয়াল শক্ত—চোখে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। হাতে একটা টর্চ আর ক্যামেরা নিয়ে সে বেড়িয়ে পড়ল সেই ধূসর পথ ধরে, চারদিক নিস্তব্ধ। মাঝেমাঝে কেবল পাখির ডাক, দূরের শেয়ালের ডাক, আর নিজের পায়ের আওয়াজ। একসময় সে পৌঁছল সেই পুরনো স্থাপত্যে। চাঁদের আলোয় ভাঙাচোরা পাথরের গায়ে একটা ধূসর দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, আর ঠিক সেই সময়েই আবার ভেসে এল সেই সুর—হারমোনিয়ামের, একেবারে হৃদয়বিদারক অথচ কেমন যেন টান-ধরা। অমিত বুঝতে পারল সে একা নয়, কেউ আছে এই ধ্বংসাবশেষের ভেতরে। ভয়ের বদলে এবার অদ্ভুত এক শীতল কৌতূহল ওকে আচ্ছন্ন করল। ধীরে ধীরে সে এগোলো ভেতরের দিকে।
সেই ঘর, যেখান থেকে অমিত প্রথম রাতে সুর শুনেছিল, এখন খোলা। দরজাটা অল্প খোলা ছিল, আর ভেতরে ছিল সাদা ধবধবে ধূলোমাখা আসবাব, এক কোণে ছেঁড়া পর্দা দুলছে, যেন কারও নিঃশ্বাসে। হঠাৎ একটা শব্দ—টং! হারমোনিয়ামের বোতাম টিপে যেন কেউ সুর তুলেছে। অমিত ক্যামেরা অন করল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্যামেরার স্ক্রিন ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। আর তখন সে দেখতে পেল, এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়ে—যার চুল মুখ ঢাকা, পরনে ধূসর শাড়ি, পায়ে নেই কোনও শব্দ। সে নিঃশব্দে হারমোনিয়ামে হাত রাখল আবার, আর অমিত দেখল, মেয়েটার পেছনে একটা ছায়া—আরও দীর্ঘ, আরও গাঢ়, যেন অন্য কোনও অস্তিত্ব ওকে গ্রাস করছে। ঘরের বাতাস ভারী, এক প্রচণ্ড ঠান্ডা যেন গায়ে সেঁটে বসেছে।
কিছুক্ষণ পর, মেয়েটা মুখ তুলল, আর অমিত দেখে, তার চোখ নেই—শুধু ফাঁকা দুটো গহ্বর। এক ঝলকেই সে যেন বুঝে ফেলল, এ শুধু অতৃপ্ত আত্মা নয়, এ কোনও দুঃসহ অতীতের ছায়া, যা আজও নিঝুম গ্রামকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মেয়েটা একবার হাহাকার করল—তীব্র, করুণ। অমিত ছুটে বেরিয়ে এল ঘর থেকে, কিন্তু পিছন থেকে শোনা গেল একটা কণ্ঠস্বর, ধীরে ধীরে ফিসফিসিয়ে বলা, “আমাকে দেখা বন্ধ করো না…”। সেই রাতে গ্রামে ফিরে অমিত কিছু বলতে পারেনি। কেবল জানল, সে আর ফিরে যেতে পারবে না। নিঝুম গ্রামের অভিশাপ এখন তার শরীরজুড়ে, তার চেতনাতেই।
***
অন্ধকারে ঢাকা নিঝুম গ্রামের অজানা ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক ভয়ানক সত্যে। গ্রামের পুরনো লোকগাথা, শঙ্কা আর হারানো আত্মার ক্রন্দন মিশে গেছে রাতের বাতাসে। অভীক যখন চিত্রনাট্য শেষ করে ক্যামেরা গুছিয়ে ফেলছিল, ঠিক সেই সময় মাটির ভেতর থেকে উঠে এলো এক স্তব্ধ কান্নার সুর। গলার আওয়াজে চিনতে ভুল হলো না—সে কণ্ঠ নারীর, সে কণ্ঠ পরির মতো নয়, বরং অভিশপ্ত আত্মার মতো। অভীক দৌড়ে ঘরের বাইরে গিয়ে দেখে দূরের বটগাছটার নিচে আলো জ্বলছে। আগুন নয়, বিদ্যুৎ নয়—এ এক ধরনের নীলাভ আলো, যেন অন্য জগতের কোনো বার্তা। সে ক্যামেরা হাতে ছুটে যায় সেই দিকে। দূর থেকে দেখল এক নারী দাঁড়িয়ে আছে—দীর্ঘ চুল, ভিজে সাদা শাড়ি, চোখে অব্যক্ত কষ্ট। তার দিকে তাকিয়েই ক্যামেরা চালু করলো অভীক। ঠিক তখনই সেই নারী অভীকের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার গল্পটা শেষ করো—আমি এখনো অপেক্ষায় আছি।” মুহূর্তেই ঝড় ওঠে, আলো নিভে যায়, আর অভীক দেখতে পায়, পাশে যে দাঁড়িয়ে ছিল সে কেউ নয়, এই গ্রামের একশো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নাট্যশিল্পী শৈলজাদেবী।
এই শৈলজার গল্প শোনার জন্য অভীক তখন যায় গ্রামের প্রবীণতম মানুষ মাধববাবুর কাছে। তিনি বহুদিন আগে নাট্যদলে কাজ করতেন। তাঁর কাছ থেকেই অভীক জানতে পারে, ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে এই গ্রামে একটি প্রগতিশীল নাট্যগোষ্ঠী ছিল, যার নেত্রী ছিলেন শৈলজা। তিনি সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে একটি নাটক করছিলেন—এক বিধবা মেয়ের আত্মমর্যাদার জন্য লড়াইয়ের কাহিনি। কিন্তু তখনকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ মেনে নিতে পারেনি তার এই সাহস। গ্রামের পুরোহিতের মদতে তাকে ‘ডাইনি’ বলে দেগে দেওয়া হয়। এক রাতে তাকে হরমোনিয়ামের পাশে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তারপর থেকেই প্রতি বছর সেই রাতেই শোনা যায় হারমোনিয়ামের সুর আর নারীর কান্না। অভীক চমকে যায়। সে বুঝে যায়, এই গল্পই তার আসল চিত্রনাট্য—এই মৃত্যুই নয়, এই লড়াইয়ের কথাই সে তুলে ধরবে তার ছবিতে।
গ্রামে এরপর শুরু হয় চিত্রধারণ। গ্রামের মানুষজন প্রথমে ভয় পেলেও পরে একে একে এগিয়ে আসে। অভীক শৈলজার চরিত্রে গ্রামের এক মেয়েকে নেয়, যাকে ছোটবেলা থেকেই কুসংস্কারে জর্জরিত জীবন কাটাতে হয়েছে। সেই মেয়েটির নাম জুঁই। অভীক দেখে জুঁইয়ের চোখে শৈলজারই যন্ত্রণা। অভিনয়ের সময় সে যখন গলায় ফাঁস দেয়ার দৃশ্য করে, অভীক দেখে, আকাশ যেন কালো হয়ে উঠেছে, ঝোড়ো হাওয়া বইছে, পাতা উড়ছে—ক্যামেরার লেন্স কেঁপে উঠছে। শেষ দৃশ্যের শ্যুটিং শেষ হওয়ার পর জুঁই কেঁদে ফেলে, আর বলে—“ওর যন্ত্রণা আমার ভেতর দিয়েই গেছে।” সেদিন রাতেই আবার বাজে হারমোনিয়াম, আবার শোনা যায় সেই কণ্ঠস্বর—তবে এবার আর হাহাকার নয়, বরং একরাশ শান্তি। যেন কেউ মুক্তি পেয়েছে শতাব্দী পেরোনো বেদনার জাল থেকে।
অভীক শহরে ফিরে যায়, ছবিটি মুক্তি পায়, নাম দেয় ‘নিঝুম’। উৎসবে প্রশংসা পায়, জাতীয় পুরস্কারও জেতে। কিন্তু অভীক আর কোনো ছবিতে হাত দেয় না। সে মাঝে মাঝেই ফিরে যায় নিঝুম গ্রামে, সেই পুরনো ভাঙা বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন অপেক্ষা করে আরেকটি বার্তা পাওয়ার। এক রাতে গ্রামের এক বৃদ্ধা বলে—“শৈলজা এবার শান্তিতে আছে, কিন্তু আরও অনেক গল্প আছে… যারা কথা বলতে পারেনি।” অভীক বুঝে যায়, নিঝুম শুধু একটা ছবি নয়, এটা একটা যাত্রা—ভূতের সঙ্গে নয়, ইতিহাসের সঙ্গে, লড়াইয়ের সঙ্গে, কণ্ঠরুদ্ধ আত্মাদের সঙ্গে। সে আবার ক্যামেরা হাতে নেয়, জানে এবার অন্য কোনো গল্প বলার পালা, কোনো আরেক শৈলজার অপেক্ষা আছে, যাকে সময়, সমাজ আর কুসংস্কার চুপ করিয়ে রেখেছে বহু বছর ধরে।
____


