Bangla - প্রেমের গল্প

নামহীন এক সম্পর্ক

Spread the love

ঐন্দ্রিলা ঘোষ


পর্ব ১

কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের পাশে পুরনো এক নাট্যমঞ্চ—‘অভিনয়তীর্থ’। কাঠের চেয়ারগুলো বেশিরভাগই চিড় খাওয়া, আলো আধারির খেলায় ঘরটা যেন কোনও এক অদৃশ্য গল্পের প্রেক্ষাগৃহ। সেখানেই প্রথম দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে।

ঋভু তখন সদ্য বাইশে পা দেওয়া, ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। নাটকে আগ্রহ ছিল, কিন্তু কখনও সিরিয়াস কিছু করেনি। বন্ধুদের সঙ্গে ফাঁস কাটানোর উদ্দেশ্যেই এসেছিল ওয়ার্কশপে। কিন্তু যেই মুহূর্তে মঞ্চে দাঁড়ালেন তিনি, সবাই যেন নিঃশব্দে থেমে গেল।

সাদা কুর্তার ওপর হালকা নীল শাল, পায়ে হাওয়াই চটি, চোখে গাঢ় কাজল—এবং সেই চোখজোড়া, যেন অনেক জন্মের ক্লান্তি আর অভিমান নিয়ে জমে আছে। নাম বললেন নিজের মতো করে—“আমি ঈশানী সেন। নাট্যকার, নির্দেশক। আগামী দুই সপ্তাহ তোমাদের সঙ্গে থাকব। নিজেকে আবিষ্কারের খেলা খেলব আমরা।”

ঋভু কিছুতেই চোখ সরাতে পারছিল না। সেই মুহূর্তে তার মনে হল—এই মানুষটার শরীর নয়, চোখ দুটোতেই লুকিয়ে আছে তার আত্মজীবনী।

ওয়ার্কশপ শুরু হল এক অদ্ভুত নিয়মে—কোনও স্ক্রিপ্ট নেই, সংলাপ নেই, শুধু শরীর আর নিঃশ্বাস নিয়ে কাজ। হাঁটতে হাঁটতে থেমে যাওয়া, চোখ বুঁজে কারও সামনে দাঁড়ানো, নিজের গলার আওয়াজে অপরিচিত হয়ে ওঠা—এইসব অনুশীলন।

ঋভু আগে কখনও এমন নাট্যচর্চা দেখেনি। প্রথম দিনেই এক অনুশীলনে, ঈশানী বললেন, “চোখ বন্ধ করো। ভাবো তুমি অপেক্ষা করছো এমন কারও জন্য, যে আর কোনওদিন ফিরবে না।”

ঋভু চোখ বন্ধ করল। হঠাৎ তার মনের মধ্যে মায়ের মুখ ফুটে উঠল—শেষবার যখন বাড়ি ফিরেছিল, মায়ের চুলে সাদা দাগ দেখা গিয়েছিল। সেই ছবি কিছুতেই ভুলতে পারেনি সে।

“এবার যার কথা মনে পড়ছে, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াও,” ঈশানীর কণ্ঠে নির্দেশ।

ঋভু এগিয়ে গেল। না, সে মায়ের সামনে নয়, ঈশানীর সামনে দাঁড়াল। তার হাত কাঁপছিল, চোখে অজান্তে জল এসে পড়ছিল। ঈশানী চমকে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। শুধু হাত বাড়িয়ে ঋভুর কাঁধে আলতো হাত রাখলেন।

“ভালো করেছো,” ধীরে বললেন তিনি।

ঋভু বুঝতে পারল—কোনও এক গভীর স্তরে তারা কথা বলছে, যেখানে ভাষা নিষ্ক্রিয়।

পরবর্তী কয়েকদিনে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বোঝাপড়া তৈরি হতে থাকল। ঈশানী ওকে একটু আলাদা করে সময় দিতেন, কখনও জিজ্ঞেস করতেন, “তুমি কোন লেখককে পড়ো?”, “তোমার ভয় কীসের?”, “তুমি কাকে কখনও ভুলতে পারবে না?”—এইসব প্রশ্ন, যেগুলো সাধারণত মানুষ নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে ভয় পায়।

ঋভু ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, সে প্রেমে পড়ছে। কিন্তু সেটা শরীরের প্রেম নয়, কিংবা কোনও রোমান্টিক কল্পনার মতো নয়। এটা যেন কোনও পরিণতির প্রয়োজনহীন আত্মিক এক ঘনিষ্ঠতা। এক টান, যেটা সে নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারছে না।

এক সন্ধ্যায়, rehearsal শেষে সবাই চলে যাওয়ার পর, ঈশানী একা বসেছিলেন মঞ্চে। আলো ঝিমঝিম করছিল, বাতাসে পুরনো কাঠের গন্ধ।

ঋভু পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। “আপনি কাঁদছিলেন?” জিজ্ঞেস করল সে।

ঈশানী একটু চমকে তাকালেন, তারপর হেসে বললেন, “এই মঞ্চটাই আমার নিরাপদ জায়গা। এখানে কান্না করলে কেউ বোঝে না, ভাবে অভিনয় করছি।”

ঋভু বলল, “আমি বুঝেছি। কারণ আপনি কখনও অভিনয় করেন না। আপনি শুধু নিজেকে খুলে দেন।”

ঈশানী তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “তুমি খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছো, ঋভু।”

ঋভু প্রশ্ন করল, “খারাপ?”

ঈশানী মাথা নাড়লেন, “না। কিন্তু মনে রেখো, বয়সের ফারাক কেবল শরীরের নয়, সময়েরও। আমি এমন অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাঁচি, যা তোমার কাছে এখনও অধরা। সেই ফাঁকটা সবসময় থেকে যাবে।”

ঋভু বলল, “তবু কেউ যদি চাই, সেই ফাঁকটায় দাঁড়িয়ে থাকতে?”

ঈশানী তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা হলে তাকে ভেবেচিন্তে ভালোবাসতে হয়।”

দ্বিতীয় সপ্তাহে নাটকের স্ক্রিপ্ট এল। ঈশানীর লেখা এক নতুন নাটক—নাম “প্রতীক্ষা”।
এক নারী, যে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে বছরের পর বছর, সেই ট্রেনের জন্য যা তার ভালোবাসা নিয়ে যায়নি, আবার ফিরিয়েও আনেনি। সেই নারীর চরিত্রে একজন সিনিয়র ছাত্রী, আর পুরুষ চরিত্রে—ঋভু।

ঋভু বলল, “আপনি জানেন তো, আমি এমন প্রেম অনুভব করিনি কখনও?”

ঈশানী বললেন, “তোমার চোখ বলে অন্য কথা। অভিনয় শিখতে হলে প্রথমে অনুভব করতে জানতে হয়। আর তুমি জানো—প্রতীক্ষা কেমন যন্ত্রণা।”

ঋভু আর প্রশ্ন করেনি। সে জানত, ঈশানী বুঝে ফেলেছেন অনেক কিছু। হয়তো বেশিই বুঝেছেন।

ওয়ার্কশপের শেষ দিন, পারফরম্যান্স শেষে করতালিতে ভরে উঠল হলঘর।
ঋভু ঈশানীর পাশে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এই নাটকটা আমাদের গল্প ছিল, তাই না?”

ঈশানী হেসে বললেন, “আমাদের গল্প? কে জানে সেটা কী! গল্প তো তখনই হয়, যখন তার শুরু থাকে, মাঝখান থাকে, আর শেষ হয়। আমরা তো এখনও নাম দিইনি। শুধু একটা সম্পর্ক, যার কোনও সংজ্ঞা নেই।”

ঋভু বলল, “তাহলে সেটাই হোক নাম—নামহীন এক সম্পর্ক।”

ঈশানী কিছু বললেন না। শুধু তার চোখে একটা মৃদু স্বীকারোক্তি ভাসছিল।

সেদিন রাতের অন্ধকারে, কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানগুলো যখন একে একে বন্ধ হচ্ছিল, তখন দুই প্রজন্মের দুই মানুষ—চুপচাপ পাশাপাশি হাঁটছিলেন, সেইসব কথাহীন কথার মধ্যে দিয়ে।

পর্ব ২

ওয়ার্কশপ শেষ হয়ে যাওয়ার পরদিন সকালে ঋভুর মনে হচ্ছিল যেন কেউ একটানা পেছন থেকে ডাকছে, অথচ সে ঘুরেও তাকাতে পারছে না। ঈশানীর মুখটা, সেই মঞ্চের আলো, করতালির মুহূর্ত—সবকিছু মিলেমিশে একটা নির্জন সুরে ঢুকে গিয়েছে তার ভিতরে।

কলেজের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুরা যখন ফেস্টের মেমস নিয়ে ব্যস্ত, তখন ঋভু শুধু একটা নাম্বার বারবার দেখতে থাকে ফোনে—ঈশানী সেন। আর একটা মেসেজও টাইপ করে রেখেছে বহুবার—”আজ কি দেখা যাবে?”—কিন্তু প্রতিবার পাঠানোর আগেই মুছে ফেলে।

অবশেষে বিকেল চারটের দিকে একটা ছোট্ট মেসেজ এল ওর ফোনে—
“আজ যদি সময় পাও, গলসি ক্যাফে-তে দেখা করো। পাঁচটায়।”

ঋভুর বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনা জমে উঠল। গলসি ক্যাফেটা খুব ছোট, একেবারে কলেজ স্ট্রিটের পাশের গলির মাথায়। পুরনো কাঠের চেয়ার, দেয়ালে শঙ্খ ঘোষ, তসলিমা আর রবি ঠাকুরের মুখ, আর ধোঁয়া উঠতে থাকা কাপে পুরনো সময়ের গন্ধ।

ঋভু সেখানে পৌঁছাতেই দেখল, ঈশানী একটা জানালার পাশে বসে আছেন। পরনে আজ একেবারে সহজ পোশাক—খয়েরি শাড়ি, হাতখোলা ব্লাউজ, চোখে ফ্রেমহীন চশমা। এত কাছ থেকে তাকে দেখে হঠাৎ করেই বয়সটা যেন হারিয়ে গেল, আর তার বদলে দাঁড়িয়ে রইল এক নারী—যার চোখে এখনও অসংখ্য অপ্রকাশিত নাটকের সংলাপ।

“তুমি এসেছো,” ঈশানী বললেন, আর তার গলায় আশ্চর্য এক প্রশ্রয়ের সুর।
“আপনি ডাকবেন আর আমি আসব না?” ঋভু হেসে বলল।

ক্যাফের বাইরের রোদের আলো তার মুখে পড়ে গিয়েছিল। ঈশানী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর ধীরে বললেন, “তুমি জানো, এই বয়সে এসে কেউ যদি এইরকম দেখায়, সেটা ভয়ের বিষয়। কারণ মানুষ তখন নিজের ভিতরটা খুলে ফেলতে শেখে না আর। কেবল একটা মুখোশ পরে থাকে। আর তুমিই সেই ছেলেটা, যে প্রথম দিনেই আমার সেই মুখোশটা চিনে ফেলেছিল।”

ঋভু কিছু বলল না। শুধু কফির কাপের দিকে তাকিয়ে রইল। কাপের ভেতরের ধোঁয়া যেন তার মনের কথা বলে দিচ্ছিল—এই মুহূর্তটা যেন কখনও শেষ না হয়।

“ঈশানী দি,” অবশেষে সে বলল, “আমি জানি, এই সম্পর্কের কোনও সংজ্ঞা নেই। আমি জানি, এর একটা শেষ আছে, বা হয়তো শুরুও নেই। তবু, আমি থাকতে চাই। যতদিন আপনার পাশে থাকার সুযোগ পাব, আমি থাকব।”

ঈশানী একটু থেমে বললেন, “এই কথাটা বলার আগে একবারও ভয় করল না?”
ঋভু মাথা নাড়ল, “ভয় পেলে তো কেউ মঞ্চে দাঁড়ায় না। আপনি নিজেই শিখিয়েছেন।”

ঈশানী এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, “তবে শোনো, ঋভু। আমি একা থাকি বহু বছর ধরে। আমার সংসার ভেঙে গিয়েছে অনেক আগেই। কোনও সন্তান নেই, নেই কোনও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। আমার জীবন যতটা খোলা মনে হয় বাইরে থেকে, ভিতরে ততটাই সঙ্কুচিত। আমি সেই নারী, যে মাঝেমাঝে নিজের সঙ্গেও কথা বলতে ভয় পায়। তুমি নিশ্চিত, তুমি সেই স্তব্ধতার ভেতরে হাঁটতে চাও?”

ঋভু চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি আপনার স্তব্ধতা চাই। শব্দ চাই না।”

এই কথাটার পর ক্যাফে-র ছোট টেবিলটা যেন আরও ছোট হয়ে এলো। তাদের মধ্যে দূরত্ব নেই বললেই চলে।

ঈশানী এবার প্রথমবার তার হাত ছুঁয়ে বললেন, “তুমি জানো, আমি তোমার চেয়ে আঠারো বছরের বড়?”
“হ্যাঁ। আর আমি সেটা গর্ব করে বলি। কারন তুমি আঠারোটা বছর আগেই জন্ম নিলে, তা বলে তো আমার অনুভব আটকে যাবে না।”

ঈশানী এবার একটু হেসে ফেললেন—সেই হাসি, যেটা হয়তো কোনও চরিত্রের মুখে আগে বসিয়েছিলেন, কিন্তু নিজের মুখে অনেক বছর পর ফিরল।

ঋভু তার হাত শক্ত করে ধরল। “আমার মনে হয়, আমি বাঁচতে শিখছি,” সে বলল।
ঈশানী আবার ফিসফিস করে বললেন, “আমারও।”

সেদিনের বিকেলটা যেন এক অঘোষিত চুক্তির সাক্ষী রইল। না, তারা কোনও প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথা বলেনি। কোনও চুম্বন, আলিঙ্গন, এমনকি ‘ভালোবাসি’ বলাও হয়নি। কিন্তু তাদের চোখে, হাওয়ার ভেতরে, কফির গন্ধে ছড়িয়ে রইল এক অসম বয়সের, অথচ অসম্ভব গভীর এক সংযোগ।

ওরা এরপর নিয়মিত দেখা করতে লাগল। কোনও শারীরিক সম্পর্ক ছিল না তাতে, ছিল শুধু নৈঃশব্দ্যের বন্ধন। মাঝে মাঝে কলেজের পর ঋভু চলে যেত ঈশানীর নাটকের রিহার্সাল দেখতে। সেখানেও তাদের সম্পর্ক ছিল ছায়ার মতো—সবসময় পাশে, অথচ কেউ ধরতে পারত না।

একদিন রাতে, থিয়েটারের শেষে ঈশানী বললেন, “তোমার বাবার সঙ্গে কখনও কথা হয়?”
ঋভু বলল, “আমার বাবা নেই। মা একা মানুষ করেছেন আমাকে।”
ঈশানী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তাহলে বোঝো, একা থাকা কাকে বলে।”
“আর আপনি বোঝেন, একা থাকা মানে সবসময় খারাপ কিছু নয়,” ঋভু জবাব দিল।

ঈশানী তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর এক নিঃশব্দ আলোর মতো তার মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

সেই রাতে, যখন কলকাতার বাতাসে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল, যখন ট্রামের ঘণ্টা ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছিল, তখন তারা দুজন পাশাপাশি হাঁটছিলেন কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানগুলোর মাঝ দিয়ে। কেউ কিছু বলছিল না, কিন্তু তাদের হাঁটার ছন্দটা যেন একসাথে লেখা কোনও কবিতার মতো।

এই সম্পর্কের নাম নেই। কিন্তু তাতে কি সত্যিই কোনও ফারাক পড়ে?
ভালোবাসা তো সবসময় সংজ্ঞায়িত হয় না। কখনও কখনও, শুধু একসাথে থাকা, একই আকাশের নিচে নিঃশ্বাস ফেলা—তাতেই হয়ে ওঠে এক নামহীন প্রেমের স্বীকৃতি।

পর্ব ৩

ঈশানী একা থাকতেন গড়িয়াহাটের এক পুরনো বাড়ির দ্বিতীয় তলায়। লিফট নেই, রেলিংয়ের রঙ উঠে গেছে, ছাদের কোণে স্যাঁতসেঁতে দাগ। কিন্তু ঘরে ঢুকলেই বোঝা যেত, এই জায়গা কেবল থাকার জন্য নয়—এটা একজন শিল্পীর নীরব আশ্রম।

বইয়ের আলমারি, দেয়ালে নাটকের পোস্টার, কাঠের তাকজোড়া পুরনো রেকর্ড প্লেয়ার, আর তার পাশে সাজানো রবীন্দ্রসংগীতের ভিনাইল ডিস্ক। জানালার পাশে রাখা আয়নার নিচে একটা ছোট টেবিল, যেখানে ঈশানী লিখতেন। টেবিলের মাথায় ঝুলে থাকা টানা তারে ঝুলে ছিল কিছু মুখোশ—যার একটায় ছিল রঙচটা রক্তরঙা ঠোঁট, আরেকটায় বোধহয় অশ্রু আঁকা চোখ।

ঋভু প্রথমবার যখন এই ঘরে ঢুকেছিল, চুপ করে চারপাশটা দেখছিল। ঈশানী একটা নীলকাঠি জ্বালাতে জ্বালাতে বলেছিলেন, “এই ঘরটাই আমার নাট্যমঞ্চ। এখানে আমি নিজেকে সাজাই, ভাঙি, আবার গড়ি।”

ঋভু আলতো করে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি কখনও কাউকে এই ঘরে এনেছেন?”
ঈশানী একটু হেসে বলেছিলেন, “তুমি প্রথম। এর আগে কেউ এসেও প্রবেশ করেনি। নাটক দেখা আর নাটকের মধ্যে ঢোকা এক জিনিস নয়, ঋভু।”

ঋভু জানত না, এই কথার ওজন কতখানি। কিন্তু সে অনুভব করেছিল—আজ এই সন্ধ্যেটা কোনও এক অলিখিত পালার শুরু।

ঈশানী চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বসে পড়লেন খাটের পাশে। আলগা করে খোলা চুল, চোখে স্নিগ্ধ ক্লান্তি, আর কণ্ঠে সেই চিরচেনা শান্ত গাম্ভীর্য।
“তুমি জানো, ঋভু,” তিনি বললেন, “তোমার বয়সে আমি একবার প্রেমে পড়েছিলাম। আমার গুরু ছিলেন তিনি—আমার নাট্যগুরু। বয়সে অনেক বড়, বিবাহিত, কিন্তু আমার পৃথিবীটা তখন শুধু তাঁর মুখ ঘিরেই ছিল। তখনো বুঝতাম না, ভালোবাসা মানে কী। আমি ভেবেছিলাম, তাঁকে ভালোবাসি বলেই তাঁকে পেতে হবে। তিনি বলেননি ‘ভালোবাসি’, শুধু বলেছিলেন—‘তুমি প্রতিভাবান। নিজেকে হারিয়ে ফেলো না আমার মতো ভুলে।’ তারপর আর কোনওদিন দেখা হয়নি।”

ঋভু চুপ করে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, ঈশানীর এই স্মৃতিগুলো যেন ভেজা মেঝের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল, যাকে যত মুছো, তত ছড়িয়ে পড়ে।

“তাহলে আপনি ভয় পান?” ঋভু ফিসফিস করে বলল, “আবার সেই ভুল করতে?”
“না,” ঈশানী কাঁপা গলায় বললেন, “ভয় পাই, যদি আবারও কোনও নিষ্পাপ মন আমাকে ভালোবেসে ফেলে। আমি তো জানি, এই বয়সে এসে আমি কী দিতে পারি, আর কী পারি না। সমাজের চোখে আমি হয়ত ‘চলার পথে দাঁড়িয়ে থাকা’ একজন নারী। আর তুমি? তুমি তো শুরু করেছ মাত্র।”

ঋভু উঠে গিয়ে ঈশানীর মুখোমুখি বসল। বলল, “আমি কোনও সামাজিক সমীকরণে বিশ্বাস করি না। আপনি যদি বলেন, এটা সত্যি নয়, আমি বেরিয়ে যাব। কিন্তু যদি একটিবার বলেন, এই সম্পর্কটা আপনাকেও ছুঁয়েছে… আমি থেকে যাব।”

ঈশানীর চোখে জল টলমল করছিল। “ছুঁয়েছে? ঋভু, তুমি জানো না, কতদিন পর একটা রাত এমন এল, যেখানে আমি নিজের কথা বলার সাহস পেলাম, কারও সামনে। তুমি হয়তো জানো না, আমি প্রতিটি চিঠি তোমার হয়ে অপেক্ষা করি, প্রতিটি ফোনের আওয়াজে ভাবি—এই বুঝি তুমি…”

ঋভু তার হাতটা ধীরে ধরে বলল, “তাহলে বলুন, নামহীন হলেও এই সম্পর্কটা সত্যি। অন্য কারও বোঝার দরকার নেই, আপনিই যদি স্বীকার করেন।”

ঈশানী চোখ বন্ধ করে মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, এটা সত্যি। হয়তো সমাজের চোখে এই সম্পর্ক অস্বাভাবিক, তবু এটাই আমার সবচেয়ে সত্যি জায়গা।”

সেই রাতেই প্রথমবার তাদের মধ্যে স্পর্শ এসেছিল—অতি নরম, অতি মৃদু, যেন কারও হাত একখণ্ড বৃষ্টিভেজা পাতায় পড়ে আর একটা শব্দ করে না। শুধু স্পর্শ, কোনও দাবি নয়, কোনও প্রতিশ্রুতি নয়—কেবল সেই মুহূর্তের পূর্ণতা।

এরপর তাদের দেখা হত নিয়মিত। ঈশানী এখনও নাটক শেখাতেন, আর ঋভু নাটকের চেয়ে বেশি শিখত তার নীরব অভিমান, তার হেসে উড়িয়ে দেওয়া ব্যথা, আর তার চোখে লুকিয়ে থাকা ছেলেবেলার স্বপ্নগুলো।

ঈশানী মাঝে মাঝে বলতেন, “তুমি যখন থাকো, আমার ভেতরের নাটকগুলো আর ভয় পায় না। তারা আবার মঞ্চ চায়।”

ঋভু বলত, “আপনি যখন থাকেন, আমার দিনগুলো আর সময় মাপে না। তারা কেবল জীবন গোনে।”

তাদের ভালোবাসা ছিল একটা বোধের মতো—যার ব্যাকরণ ছিল না, নিয়ম ছিল না, কিন্তু তবু সে ছিল। স্পষ্ট, গভীর, অথচ অস্পষ্ট সংজ্ঞাহীন।

একদিন সন্ধ্যায়, যখন মেঘলা আকাশের নিচে শহর আলতো আলোয় ডুবছিল, ঈশানী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই সম্পর্ক কোথায় যাবে, ঋভু?”
ঋভু বলল, “যেখানে সময় থেমে থাকবে।”
“সময় থামে?”
“যদি ভালোবাসা সত্যি হয়, সময় থেমে থাকে। অন্তত তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।”

ঈশানী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তাহলে আমরাও থাকি। কোনও নাম দিই না। কোনও ভবিষ্যৎও না। শুধু থেকে যাই—এই অসম্ভব আর সহজ প্রেমে…”

পর্ব ৪

নাটকের নতুন স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ শুরু করেছিলেন ঈশানী। নাম রেখেছিলেন “আলোর নিচে ছায়া”। গল্পটা ছিল এক বয়স্ক নাট্যপরিচালিকা আর এক তরুণ অভিনেতার মধ্যকার এক আবেগময় সম্পর্ক নিয়ে, যেটা মঞ্চের আলোয় না এসে থেকে যায় ছায়ার আড়ালে।

ঋভু প্রথমেই বলেছিল, “এই গল্পটা আমাদের নয় তো?”
ঈশানী হেসে বলেছিলেন, “হয়তো। কিন্তু আমি তো নাট্যকার। সবসময় সত্যি লিখি না। কখনও কখনও, যা বলার সাহস পাই না, সেটাই লিখে ফেলি।”

ঋভু জানত—এই নাটকটা তাদের দুজনের নিঃশব্দ প্রতিবাদ। সমাজের দিকে না তাকিয়ে, কোনোরকম ঘোষণা না দিয়ে, শুধু একটা ভেতরের স্বীকৃতি।

সেই সময় থেকেই দুজনের মধ্যে আরও একধরনের নৈকট্য তৈরি হয়। রিহার্সালের সময়ের বাইরে, তারা একসাথে বইয়ের দোকানে যেত, রবীন্দ্রসদনে সিনেমা দেখত, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শহরের গল্প করত।

ঈশানী বরাবর নীরব মানুষ, কিন্তু ঋভুর সঙ্গে যেন তার সমস্ত চুপ করে থাকা কথাগুলো বেরিয়ে আসত। তিনি হঠাৎ বলে ফেলতেন, “জানো, আমি ছোটবেলায় একবার নৌকাডুবি দেখেছিলাম, তারপর থেকেই জলের ওপর ভরসা করতে পারি না।”
অথবা, “আমার প্রথম লেখা কবিতাটা আজও আমার ডায়েরিতে নেই—কারণ আমি জানতাম, যাকে উৎসর্গ করেছিলাম, সে কখনও পড়বে না।”

ঋভু এইসব কথা শুনে চুপ করে থাকত না। সে নিজের কথাও বলত। বলত, কীভাবে বাবার না-থাকা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, কীভাবে নিজের মাকে সে ভালোবাসে অথচ সব কিছু বলতে পারে না, কীভাবে তার জীবন যতটা সহজ দেখায়, ভেতরে ততটাই তোলপাড়।

ঈশানী তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন অনেকক্ষণ, তারপর ধীরে বলতেন, “আমরা যেন আমাদের অতীতকে নিয়ে একে অপরের পাশে হাঁটি। কেউ কাউকে ছাড়াতে পারি না, শুধু হাতটা ধরে রাখি যাতে পড়ে না যাই।”

ঋভুর বন্ধুরা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত—“তুই কি সত্যিই ঈশানী সেনের সঙ্গে… মানে… প্রেমে?”
ঋভু হেসে বলত, “ওটা প্রেম না, প্রেমের চেয়েও বেশি। ঠিক বোঝাতে পারব না।”
আর তারা বলত, “উফ, তোকে তো বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছে রে!”
ঋভু শুধু মুচকি হাসত।

কিন্তু সমাজ চুপ করে থাকে না।
একদিন কলেজের নাট্যগ্রুপের এক সদস্য হঠাৎ রিহার্সালের শেষে বলেই ফেলল, “ঋভু, আজকাল কিন্তু তুই গুরুদক্ষিণা একটু বেশিই দিচ্ছিস দেখছি!”
ঘরটা হঠাৎ চুপ হয়ে গিয়েছিল। ঈশানী কোনও কিছু বলেননি। শুধু উঠে চলে গিয়েছিলেন বাইরে।

ঋভু সেদিন রাতেই গড়িয়াহাটের সেই বাড়িতে ছুটে গিয়েছিল। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঈশানী—কিন্তু মুখে কোনও অভিমান, কোনও অভিযোগ ছিল না।
“তোমার কিছু বলার আছে?” তিনি শুধু এতটুকু বলেছিলেন।

ঋভু বলেছিল, “আছে। আমি জানি না কেন মানুষ এমন ভাবে। কিন্তু আমি জানি, আমি তোমাকে সম্মান করি। ভালোবাসি—কোনও লুকোনো, গোপন, অসম্মানজনক কিছু নয়। আমি জানি, আমাদের যা আছে, তা গভীর। সমাজ যদি দেখে না, সেটার দোষ আমাদের নয়।”

ঈশানী ধীরে তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “তুমি এখনও এত নিঃশর্তভাবে বলো! কেমন করে পারো, ঋভু?”
ঋভু বলেছিল, “কারণ আপনি আমার আত্মার আয়না। আপনার দিকে তাকিয়ে আমি নিজেকে দেখি। আর সে আমি আমাকে ভালোবাসি।”

সেদিন রাতে তারা একসঙ্গে জানালার ধারে বসে ছিল। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছিল। ঈশানী বলেছিলেন, “তুমি জানো, আমি কখনও দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়ব বলে ভাবিনি। তোমাকে পাওয়ার পর মনে হয়, আমি শুধু পড়িনি—নামহীন হয়ে গেছি। এখন আমি তোমার চোখে নতুন করে জন্ম নিই প্রতিদিন।”

ঋভু বলেছিল, “তাহলে আজ থেকে প্রতিদিন নতুন করে প্রেম করব আমরা। কোনও ঘোষণা নয়, কোনও গলায় মালা নয়। কেবল পাশে থাকা।”

তারপর একটা দীর্ঘ সময় তারা চুপ করে থেকেছিল।
সেই চুপ থাকার মধ্যেও ছিল আশ্চর্য এক শব্দ—যেটা কেবল প্রেমিক নয়, আত্মার সঙ্গীরাই বোঝে।

পরদিন থেকে নাটকের রিহার্সাল আবার শুরু হল। ঈশানী আগের চেয়ে আরও গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন। মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকতেন ঋভুর দিকে, আর তারপর একমনে মঞ্চের দিকে ঘুরে যেতেন।

ঋভু বুঝে গিয়েছিল—তাদের সম্পর্ক এখন এক পরীক্ষার সময় পেরিয়ে এসেছে। এখন সেটার ভিত মজবুত। এখন কেউ কিছু বললেও তারা ভাঙবে না।

তাদের এই ‘নামহীন সম্পর্ক’ এখন আর শুধু আবেগ নয়, একটা বিশ্বাস।
যে বিশ্বাস বলে—প্রেম বয়স দেখে না।
প্রেম সমাজ বোঝে না।
প্রেম কেবল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে পাশে—যখন সবাই মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

পর্ব ৫

নাটকটির রিহার্সাল এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। নাম—“আলোর নিচে ছায়া”—তখন শহরের নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে ফেলেছে। ঈশানী নিজে এতটা উৎসাহ নিয়ে কোনও কাজ অনেকদিন করেননি। প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি মঞ্চ নির্দেশ, আলো-আঁধারির প্রতিটি খেলা তিনি নিখুঁতভাবে গড়ে তুলছিলেন, যেন ওটাই তাঁর শেষ প্রযোজনা।

ঋভু মূল চরিত্রে। কিন্তু মঞ্চে সে কেবল চরিত্র নয়, সে যেন ঈশানীর ভেতরে জমে থাকা গল্পের প্রতিচ্ছবি। প্রতিবার অভিনয়ের সময় সে দেখে—ঈশানীর চোখে একরাশ স্মৃতি, একরাশ ভয়, আর একরাশ নির্ভরতা।

একদিন দুপুরে মঞ্চে আলো বসানো হচ্ছিল। টেকনিশিয়ানরা উঠে গেছে ট্রাসে। ঈশানী তখন এক কোণে বসে আলোচনার কাগজে লিখছেন। ঋভু চুপচাপ গিয়ে পাশে বসল।

“তুমি ক্লান্ত?” ঈশানী না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“না,” ঋভু বলল, “তবে আপনাকে দেখে ভয় পাচ্ছি। এতটা নিঃশ্বাস বন্ধ করে কাজ করছেন যেন কিছু ধরেই ফেলতে চাইছেন—যেন কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।”

ঈশানী থেমে গেলেন। কাগজ রেখে বললেন, “এই নাটকটা আমার নিজের গল্প, তুমি জানো। কিন্তু শুধু আমার নয়। এটা সেইসব মানুষেরও গল্প, যারা বয়স, সম্পর্ক, পরিচয়—এই সবকিছুর দেয়াল পেরিয়ে কারও পাশে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু পারে না। তাই আমি চেয়েছিলাম, যদি শেষবার কাউকে ভালোবাসার কথা বলতে পারি—মঞ্চে হোক, কল্পনায় হোক, সত্যি তো বলা হয়নি জীবনে।”

ঋভু বলল, “আপনি তাহলে নাটক দিয়ে যা বলা হয়নি, তা বলছেন?”

“হ্যাঁ,” ঈশানী মৃদু গলায় বললেন, “কারণ জীবনে অনেক সময় সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু কিছু কথা থেকে যায় অসমাপ্ত। আমি চাই না আমার ভালোবাসাটাও সেই অসমাপ্ততার তালিকায় যোগ দিক।”

ঋভু তার দিকে ঘুরে তাকাল, “তাহলে আপনি বলুন, ঈশানী। জীবনে একবার—সরাসরি বলুন।”

ঈশানী তাকিয়ে রইলেন। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, ঋভু। কিন্তু সেটা আমার বয়স অনুযায়ী নয়, তোমার বয়স অনুযায়ীও নয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি কারণ তুমি আমাকে সাহস দিয়েছ আবার শুরু করার। তুমি আমার আয়নার মতো। আমি আমার হারিয়ে যাওয়া যৌবন, সাহস, স্বপ্ন—সবকিছু তোমার চোখে দেখি।”

ঋভুর চোখে জল এসে গিয়েছিল। এতটা সরল, এতটা স্বচ্ছ স্বীকারোক্তি সে কল্পনাও করেনি।

সে বলল, “আমি তো এতদিন ধরে এটাই শুনতে চাইছিলাম। আমি জানতাম, আপনি বুঝতে পারেন, কিন্তু বলতে ভয় পান। এখন আমি শান্ত।”

ঈশানী হেসে ফেললেন। “শান্ত? প্রেমে পড়ে কেউ শান্ত থাকে নাকি?”

ঋভু বলল, “আপনার প্রেমে পড়ে মানুষ যুদ্ধজয়ী সৈনিক হয়ে যায়। ভাঙা বুক নিয়ে হাসতে শিখে।”

সেই বিকেলটা যেন গলে গিয়েছিল শব্দ আর স্পর্শের মাঝখানে।
আর তারা যেন এক অলিখিত চুক্তির দিকে এগোচ্ছিল—যেখানে ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু তার কোনও সামাজিক নাম থাকবে না।

রিহার্সালের শেষ দিন ছিল সেই নাট্যজগতের অনেক বর্ষীয়ান মানুষদের আমন্ত্রণে। ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে এক প্রবীণ নাট্যকার বললেন, “ঈশানী, তোমার ছেলেটা দারুণ অভিনয় করছে। ও কে?”
ঈশানী হেসে বললেন, “আমার ছাত্র।”

একটা মুহূর্তের জন্য ঈশানীর মুখটা থমকে গিয়েছিল। ঋভু দূর থেকে সেটা লক্ষ্য করেছিল।
ঈশানী তখন ‘ছাত্র’ বললেও তার চোখে যে গোপন কিছু লুকিয়ে আছে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল।

ঋভু সেই রাতে বাড়ি ফেরার সময় আর নিজেকে আটকাতে পারেনি। ফোন করল—“আপনি শুধু ছাত্র বললেন। আপনি বললেন না, সে আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

ঈশানীর গলায় নির্ভরতা আর দ্বিধার মিশেল, “আমি ভয়ে বলিনি। ভেবেছি, এই সম্পর্কটা হয়তো বুঝবে না কেউ। আমাদের ভালোবাসা শুধু নিজেদের মধ্যে থাকলেই কি কম হয়ে যায়?”

ঋভু বলল, “না, কম নয়। কিন্তু আমি চাই, আপনি নিজেকে গোপন না করেন। আমি চাই, আপনি সাহস পান নিজের জীবনের সত্যিটাকে ধরে রাখতে। কারণ সেই সাহসটাই আমাকে আপনার প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে।”

ঈশানী তখন চুপ করে ছিলেন। কিন্তু তার চোখে তখন এক নতুন আলো জ্বলছিল—যেটা হয়তো কোনও কনভেনশন বা শংসাপত্র নয়, কিন্তু এক নিজস্ব স্বীকারোক্তি।

এর পরের দিন মঞ্চে ছিল তাদের প্রিমিয়ার শো। দর্শকভরা হলঘর, উষ্ণ আলো, আর শ্রদ্ধা মেশানো নীরবতা। নাটক শুরু হল, আর ঋভু মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই চরিত্রটা হয়ে উঠল—যে চিঠি লেখে, কিন্তু পাঠায় না; যে প্রেম করে, কিন্তু বলে না।

আর সেই নাটকের এক পর্যায়ে ঈশানীর লেখা সংলাপ ছিল—
“ভালোবাসা কখনও মুখে বলা হয় না। সে দাঁড়িয়ে থাকে—একটা নামহীন সম্পর্ক হয়ে। যতদিন পর্যন্ত কেউ তাকে স্বীকার না করে, সে বেঁচে থাকে, নিঃশব্দে।”

ঋভুর চোখ তখন মঞ্চ ছেড়ে চলে গিয়েছিল—ঈশানীর দিকে।
ঈশানী বুঝলেন। তিনি একটুখানি মাথা নোয়ালেন।
আর সেদিন, সেই হাইড্রোজেন আলোর নিচে, তারা দুজন নামহীন একটা প্রেমকে আলোতে নিয়ে এসেছিল।

পর্ব ৬

নাটকটি শহরের নানা মঞ্চে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রতি শো-তেই উপচে পড়ছে দর্শক, প্রশংসা কুড়োচ্ছে অভিনয় আর নির্দেশনার জন্য। ঈশানী আর ঋভু, পর্দার বাইরে এবং ভিতরে—দুটো চরিত্রেই আরও বেশি কাছাকাছি আসছে।

কিন্তু সাফল্য, যেটা বাইরের চোখে শুধুই আলো, অনেক সময় ভিতরে জমিয়ে তোলে ছায়া।

একদিন এক প্রখ্যাত পত্রিকার সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে আসে। প্রশ্ন করে, “ঈশানীদি, এতদিন পরে আবার ফিরে এসে এত শক্ত নাটক, এত শক্ত নির্দেশনা—সত্যিই সাহসের কাজ। আপনার মূল প্রেরণা কে?”

ঈশানী তখন হাসতে হাসতেই ঋভুর দিকে তাকিয়েছিলেন। চোখে এক মুহূর্তের তীব্র নরম ভাব। কিন্তু উত্তরটা নিরপেক্ষ রেখেছিলেন—
“সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসা ইচ্ছাটাই আমার প্রেরণা।”

ঋভুর বুকটা কেমন যেন চেপে ধরেছিল সেই উত্তর শুনে।
সে ভেবেছিল, ঈশানী হয়তো বলবেন, “আমার ছাত্র, আমার সহঅভিনেতা, আমার…”—না বললেও এমন কিছু যা ইশারায় হলেও তাঁকে ছুঁয়ে যেত।

রাতটা কেটেছিল অনিদ্রায়।
ঋভু বুঝতে পারছিল না—কেন এমন এক সম্পর্কের ভিতরে থেকেও ঈশানী বাইরের জগতে এতটা নিঃশব্দ থাকেন?
সে কি লজ্জা পান?
না কি বিশ্বাস করেন না এই ভালোবাসায়?

পরদিন সকালেই গড়িয়াহাটের বাড়িতে হাজির হয়েছিল সে।
ঈশানী জানালার পাশে বসে চুল বাঁধছিলেন। চুপ করে শুনলেন ঋভুর কথাগুলো—

“আপনি কেন বললেন না আমার কথা? শুধু বললে, ‘সময়ই প্রেরণা’? আমি কি আপনার সময়ের ছায়াও নই?”

ঈশানী আয়নাটা থেকে চোখ সরালেন না। ধীরে বললেন, “তুমি আমার সময়ের অনেক ঊর্ধ্বে। তুমি সেই জায়গায় আছ, যেটা গোপন রাখলেই সে টিকে যায়। সবকিছু বলতে নেই, ঋভু।”

ঋভু বলল, “আপনি বুঝতে পারছেন না। আমি লুকিয়ে থাকতে পারি, আপনাকে ছুঁয়ে থাকা ছায়া হয়ে থাকতে পারি। কিন্তু ভালোবাসা যদি মুখে বলা না যায়, স্বীকৃতি না পায়, তাহলে সে একসময় সন্দেহে ভরে ওঠে।”

ঈশানী এবার উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে ছিল ক্লান্তি, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল গাঢ় অভিজ্ঞতা।

“তুমি ভাবছ, আমি তোমায় মানতে ভয় পাই। না, ঋভু। আমি ভয় পাই তোমায় হারাতে।
এই সমাজ খুব নৃশংস। তারা বয়স দেখে, শরীর দেখে, সম্পর্কের ছক কষে।
তারা প্রেম বোঝে না—তারা বোঝে চিহ্ন।
আমি চাই না, তুমি কেবল ‘ঈশানীর প্রেমিক’ হয়ে থেকে যাও। তুমি ঋভু—একজন শক্তিশালী অভিনেতা, নিজস্ব পরিচয়ের মানুষ। আমি চাই না আমার নামের ছায়ায় তোমার মুখ হারিয়ে যাক।”

ঋভু তখন কিছু বলেনি। কেবল জানালার ধারে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিয়েছিল গভীরভাবে।

তারপর বলেছিল, “আপনি জানেন? এই প্রেমটা শুধু আপনার জন্য নয়। এ আমারও আত্মপরিচয়ের জায়গা। আমি এই সম্পর্ককে আমার ভিতর আঁকতে পেরেছি বলেই, আমি আজ এতটা সাহসী। আপনি হয়তো আমার জন্য লড়তে ভয় পান, কিন্তু আমি তো আপনাকে স্বীকার করতে ভয় পাই না। আমার ভালোবাসা আপনার চেয়ে ছোট নয়, ঈশানী।”

ঈশানীর চোখে জল এসেছিল। খুব কম সময়েই তাঁর চোখে এমন স্বীকারোক্তি দেখা যেত।

সেই সন্ধ্যায় তারা একসাথে হাঁটতে বেরিয়েছিল। গড়িয়াহাট থেকে দেশপ্রিয় পার্ক হয়ে রাসবিহারী মোড় পর্যন্ত। কেউ কিছু বলেনি। কিন্তু ঋভুর মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পদক্ষেপে তারা কাছাকাছি আসছে আবার নতুন করে।

পার্কের বেঞ্চে বসে ঈশানী বললেন, “তুমি চাইলে সম্পর্কটা এইখানে থামিয়ে দিতে পারো। আমি চাই না আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা একদিন অভিমান হয়ে উঠুক।”

ঋভু তার কাঁধে হাত রাখল। বলল, “এই সম্পর্ক থামিয়ে দেওয়া যায় না। এটাতে কোনো শুরু ছিল না, কোনো দাবি ছিল না, আর তাই শেষও হয় না। এটা একটা নদীর মতো, যেখানে দুটো তীর দূর থেকেই একে অপরকে ভালোবাসে।”

ঈশানী ধীরে মাথা নোয়ালেন তাঁর কাঁধে। দুজন চুপ করে বসে রইল সেই পার্কে, যেখানে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছিল শরতের গন্ধ, পাতা ঝরার শব্দ, আর নিঃশব্দ এক প্রেম।

তাদের সম্পর্কের নাম নেই, প্রয়োজনও নেই।
কিন্তু তার অস্তিত্ব ছিল—
প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি অভিমান ভরা চুপ করে থাকা কথায়,
আর প্রতিবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে সংলাপ বলার মধ্যেও।

পর্ব ৭

শরৎকালের শেষভাগ তখন। শহরের বাতাসে হালকা শীত, সন্ধ্যার পর কুয়াশার মতো নরম আবরণ পড়ে পথঘাটে। নাটকের শো চলছেই—দর্শকপ্রিয়তা পেরিয়ে ‘আলোর নিচে ছায়া’ এখন হয়ে উঠেছে এক সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

কিছু সংবাদপত্র হেডলাইন ছাপে—
“বয়সের বৈপরীত্যে ভালোবাসা? ঈশানী সেনের নাটকে সাহসী ইঙ্গিত!”
“ঈশানী সেন কি নিজের জীবনের গল্প বলছেন?”

ঋভুর নামও উঠে আসে। প্রথমে পারফরম্যান্সের জন্য প্রশংসা, তারপর জল্পনা—নাট্যকার ও নায়ক কি সত্যিই একে অপরের প্রেমিক?

ঈশানী এইসব নিয়ে বিশেষ কিছু বলেন না। তিনি জানেন, শোরগোল আসবেই। কিন্তু ঋভুর উপর এর প্রভাব পড়ে।
কলেজে ছেলেমেয়েরা ঠাট্টা করে, শিক্ষকেরা চোখ রাঙায়, বন্ধুরা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—
“তুই কি সত্যিই ওর সঙ্গে?”
“কী করবি শেষে? বিয়ে করবি?”

ঋভু উত্তর দেয় না। সে আর এখন আর রেগে যায় না, তর্কও করে না। শুধু হাসে।
সে জানে, তার আর ঈশানীর মধ্যে যা আছে, সেটা শব্দের বাইরে।

কিন্তু একদিন কলেজের এক নাট্যশিক্ষক তাকে ডেকে স্পষ্ট বললেন, “তুমি একজন সম্ভাবনাময় ছাত্র। তোমার পথ অনেক বড়। তুমি কেন এমন একটা বিতর্কিত সম্পর্কে নিজের ভবিষ্যৎ জড়াচ্ছ?”

ঋভু চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, “যে সম্পর্ক আমাকে সাহস দিয়েছে নিজেকে আবিষ্কার করতে, সেটাই তো আমার ভবিষ্যতের ভিত্তি। সেটা বিতর্কিত হলে তাতে আমার দোষ কোথায়?”

শিক্ষক বললেন, “সবাই তা বোঝে না, ঋভু। আর শিল্পীরা যতই সাহসী হোক, সমাজ তাদের স্বাধীনতা দেয় না।”

ঋভু মাথা নিচু করে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা ক্লান্তি তাকে গিলে খাচ্ছিল।

সে রাতে গড়িয়াহাটের সেই ঘরে যখন সে এল, ঈশানী একা বসে ছিলেন। জানালার বাইরে ল্যাম্পপোস্টের আলো পড়েছে তার চোখের নিচে—সেই চোখ, যেটা একসময় স্বপ্ন দেখত, এখন আর দেখে না।

ঋভু তার সামনে এসে বলল, “আজ আমি খুব ক্লান্ত।
কোনও সংলাপ চাই না।
কোনও ব্যাখ্যা চাই না।
শুধু আপনার হাতটা চাই।”

ঈশানী ধীরে তার হাত ধরে বললেন, “আজ আমি ভেবেছিলাম, হয়তো তুমিই আর আসবে না।”

ঋভু অবাক হয়ে তাকাল, “আপনি কি এখনও সন্দেহ করেন আমার প্রেমে?”

“না, সন্দেহ করি না। ভয় পাই।
ভয় পাই, যদি কোনও একদিন তুমি নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চাও, যদি আমি বোঝা হয়ে যাই তোমার কাছে।”

ঋভু হেসে বলল, “আপনি জানেন, পাহাড়ে উঠতে গেলে লোকজন বোঝা কমায়।
কিন্তু কেউ কেউ আছে, যারা বোঝাটাকেই ভালোবাসে—কারণ সেটা তাদের শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। আপনি আমার বোঝা নন, ঈশানী। আপনি আমার ভার। যে আমাকে মাটিতে রাখে।”

ঈশানী উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
এই প্রথম এতখানি।
এই প্রথম ঈশানী নিজে থেকে।
কোনও নাট্যদৃশ্য নয়, কোনও নিঃশব্দ নয়—একটা বাস্তব আলিঙ্গন, যেখানে তাদের দুই শরীরের তাপ মিলেমিশে এক হয়ে গেল।

তারপর তারা অনেকক্ষণ একসঙ্গে বসে থাকল।
ঋভু বলল, “চলো না, কোথাও যাই। দূরে কোথাও। এই শহর থেকে বেরিয়ে।
যেখানে কেউ চেনে না, কেউ ট্যাগ দেয় না—আমরা শুধু আমরা হতে পারি।”

ঈশানী একটু হাসলেন, “তুমি ভাবছো, আমি সব ছেড়ে যেতে পারব?”
“না,” ঋভু বলল, “আমি চাই, আপনি বাঁচুন। আপনি বাঁচলে তবেই আমি বাঁচব। শুধু মাঝে মাঝে ভাবি, এই শহরটা আমাদের গল্পটা বোঝে না। বড্ড বেশি বিচার করে।”

ঈশানী একটুখানি চুপ থেকে বললেন, “তাহলে চল।
একটা ছোট ট্রিপ।
কোনও নাটক নেই, স্টেজ নেই, পরিচয় নেই—শুধু আমি আর তুমি।
আমরা কে—তা ভুলে গিয়ে, শুধু যা অনুভব করি, সেটা নিয়ে থাকি।”

ঋভুর মুখে আলো ফুটে উঠল।

তারা ঠিক করল—উত্তরবঙ্গে যাবে। কালimpong, দার্জিলিং, কিংবা কোনও ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম।
কোনও প্ল্যান ছাড়া, কোনও গন্তব্য ছাড়া—শুধু চলা।

ঈশানী বললেন, “তোমার মায়ের কী বলবি?”
ঋভু বলল, “যা সত্যি। বলব, একটা মানুষকে নিয়ে বেরোচ্ছি, যিনি আমাকে ভালোবাসেন।
যদি না বোঝে, বোঝাব।
আমি আর পালিয়ে বাঁচতে চাই না, ঈশানী।”

ঈশানী চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন।
তার চোখে ছিল গর্ব, বিস্ময়, আর একধরনের শান্তি—
যেটা কেবল সেই মানুষ অনুভব করে, যে নিজের অসম প্রেমে একটুও লজ্জা না পেয়ে, বরং গর্ব করে তাকে ধারণ করতে পারে।

ঈশানী ফিসফিস করে বললেন, “ঋভু, তুমি আমার অসম্পূর্ণ জীবনের সবচেয়ে পরিপূর্ণ অধ্যায়।”

ঋভু হাসল, “তাহলে চলো, সেই অধ্যায়টা আমরা পাহাড়ে গিয়ে লিখে ফেলি—নামহীন, তবু সবচেয়ে সত্যি।”

পর্ব ৮

শীত তখন ধীরে ধীরে নামছিল শহরের শরীরে। ফেলে আসা শরৎ আর আসন্ন শীতের মাঝখানে কুয়াশা যেমন জড়োসড়ো, ঠিক তেমনই এই প্রেমটাও এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

ঈশানী আর ঋভু পাহাড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেউ কাউকে নিয়ে পালায়নি—তারা কেবল নিজেদের খুঁজে নিতে চেয়েছে, সেই জায়গায় যেখানে পরিচয়ের গণ্ডি আর সমাজের ট্যাগ নেই।

কলকাতা স্টেশনের ‘পাহাড়ি লিংক এক্সপ্রেস’-এ ওঠার সময় দুজনেই কেমন নিঃশব্দ। কাউকে না জানিয়ে যাওয়া, কোনও প্রথা না মেনে শুধু দুজনের সিদ্ধান্তে জীবন এগিয়ে নেওয়া—এই এক অদ্ভুত স্বাধীনতা।

ঈশানীর কাঁধে একটি বোনা শাল, চোখে হালকা সানগ্লাস, মুখে স্বাভাবিকতা। আর ঋভুর মুখে চাপা উত্তেজনা, বুকের ভিতর এক অদ্ভুত আনন্দের কাঁপুনি।

ট্রেন ছাড়তেই জানালার পাশে বসে ঈশানী বললেন, “তুমি ঠিক জানো তো, আমরা কী করতে চলেছি?”

ঋভু হাসল, “জানি না। জানি শুধু, আপনার সঙ্গে যে কোনও জায়গা আমার ঠিকানা।”

ঈশানী তাকিয়ে বললেন, “তোমার বয়সের প্রেমিকারা এখন হয়তো মল-এ সিনেমা দেখছে, হোস্টেলে ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে দিচ্ছে ছবি। আর তুমি এই ছেলেমানুষি জীবন ছেড়ে চলে এসেছ আমার সঙ্গে পাহাড়ে।”

ঋভু তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি ইনস্টাগ্রাম-যোগ্য কিছু চাইনি। আমি শুধু এমন কাউকে চেয়েছিলাম, যার সঙ্গে চুপ করে জানালার পাশে বসেও প্রেম হতে পারে।”

ঈশানী মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকালেন। মেঘের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলছিল, দূরে হিমালয়ের সাদা টুকরো ধরা পড়ছিল হালকা রোদে।

পাহাড়ি স্টেশনে পৌঁছে তারা একটা ছোট্ট গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ল কালিম্পংয়ের কাছের এক গ্রামে—দেওলো। চারপাশে চা বাগান, পাইন গাছ, আর অদ্ভুত নীরবতা।

একটি হোমস্টেতে উঠেছিল তারা। কাঠের তৈরি ছিমছাম ঘর, জানালা দিয়ে সূর্য ওঠা দেখা যায়, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে ধোঁয়া আর গন্ধের মায়া।

ঈশানী প্রথমদিনেই বলেছিলেন, “এই ক’দিন নাটক নিয়ে কোনও কথা নয়, সামাজিক চাপ নয়, অতীত নয়। শুধু এখন।”

ঋভু মাথা নেড়েছিল।
“তবে একটা প্রশ্ন করি?”
“করো।”
“এই আমাদের সম্পর্কটাকে আপনি কী বলবেন? প্রেম? বন্ধুত্ব? সহযাত্রী?”
ঈশানী একটু ভাবলেন।
তারপর বললেন, “আমি বলব—তোমার চোখের আয়নায় আমি নিজের অস্তিত্ব দেখি। আর সেটা যদি প্রেম না হয়, তবে আর কিছুতেই বিশ্বাস করি না।”

ঋভু চুপ করে গিয়েছিল।

পরদিন সকাল। পাইন বনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা হারিয়ে গিয়েছিল পাহাড়ি রাস্তায়। ঝিরঝিরে ঠান্ডা হাওয়া, গায়ে চেপে থাকা শীতের প্রথম কামড়, আর তবু দুজনের আঙুলে আঙুলের মাঝে জড়ানো উষ্ণতা।

ঈশানী বললেন, “জানো, পাহাড়ে আসলে মনে হয়—সবকিছু ছোট হয়ে যায়।
আমাদের ভাবনাগুলো, দুঃখগুলো, এমনকি ভালোবাসাগুলোকেও ক্ষুদ্র মনে হয় এই বিশালতার সামনে।”

ঋভু বলল, “কিন্তু আমি ঠিক উল্টোটা অনুভব করি। এখানে আপনাকে আমার আরও বেশি নিজের লাগে। শহরে আপনি যেন একটা মুখোশ পরে থাকেন, এখানে আপনি সেই মুখোশ খুলে ফেলেছেন।”

ঈশানী থমকে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ।
এই মুখোশটাই তো আমি অনেক বছর ধরে পরেছি।
সবার জন্য আমি একজন সৃজনশীল নাট্যকার, একজন একাকী প্রাক্তন স্ত্রী, একজন মধ্যবয়স্কা।
কিন্তু এখানে আমি কেবল একজন নারী। যে প্রেম পায়, যে ভালোবাসে, যে রোজ ভোরে উঠে তোমার মুখ দেখতে চায়।”

ঋভু তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনি জানেন, এই আপনিই সবচেয়ে সুন্দর। এই মুখোশহীন, নিরাবরণ, নিঃসংকোচ ঈশানী।”

ঈশানী হেসে ফেললেন। সেই হাসি পাহাড়ের বাতাসে মিলিয়ে গেল।

সন্ধেবেলা তারা ছোট্ট কাঠের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। দূরে পাহাড়ের ঢালে আলো জ্বলে উঠছিল গ্রামে গ্রামে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঈশানী বললেন, “আমার ভয় করে।
যখন ফিরে যাব, তখন আবার সেই সমাজ, সেই প্রশ্ন, সেই মুখোশ।
তুমি পারবে তো আমার পাশে দাঁড়াতে?”

ঋভু তার কাঁধে মাথা রাখল। বলল, “আমি পাশে দাঁড়াইনি কখনও। আমি তো আপনার ভিতরেই আছি। যেখানে আপনি যাবেন, আমি সেখানেই থাকব।
আপনার চোখে যদি একফোঁটা জল আসে, আমার বুকেই তা পড়ে।”

ঈশানীর চোখ ছলছল করছিল। তিনি বললেন, “তুমি আমাকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছ।
এই বয়সে এসে আমি ভেবেছিলাম, বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।
তুমি প্রমাণ করেছ—ভালোবাসা বয়স চেনে না, চেনে শুধু হৃদয়ের ভাষা।”

ঋভু তার হাতে হাত রেখে বলল, “তবে আজ থেকে আমরা কোনও ব্যাখ্যা দেব না কারও কাছে।
আমরা শুধু থাকব—এই নামহীন সম্পর্কে, যে কেবল আমাদের জানে।”

পাহাড়ের চাঁদ সেই রাতটাকে চুপচাপ সাক্ষ্য দিয়ে রাখল।
আর তাদের হৃদয়ের ভেতর গেঁথে গেল এক পাহাড়ি প্রতিজ্ঞা—
ফিরেও যেন তারা ভুলে না যায় এই কয়েকদিনের নিঃশব্দ প্রেমের রূপ।

পর্ব ৯

পাহাড়ি সকালগুলো অদ্ভুতভাবে স্নিগ্ধ। ঠান্ডা হাওয়া, মেঘে ঢাকা সূর্য, আর দূরে পাহাড়ের ঢালে গায়ে গায়ে লেগে থাকা ঘরগুলো যেন নিজস্ব ভাষায় প্রেমের গল্প বলে।

ঈশানী আর ঋভু সেই সকালে একসঙ্গে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল কাঠের বারান্দায়। কারও মুখে কোনও কথা নেই। শুধু গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল আর মাঝে মাঝে কোনো দূর পাহাড়ে বাজতে থাকা ঘণ্টার শব্দ কানে আসছিল।

ঈশানী হঠাৎ বললেন, “তুমি জানো, কাল রাতের পর থেকে আমার ভিতরটায় কিছু বদলে গেছে।”
ঋভু তাকাল, “কী রকম?”
“আগে ভাবতাম, আমাদের সম্পর্ক যেন একটা বিপরীত দিকে বইতে থাকা নদী—যে নদীর এক তীরে আমি, আর অন্য তীরে তুমি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমরা আসলে একই জলের ভিতর, শুধু স্রোতের রঙ আলাদা।”

ঋভু একটুখানি হাসল, “তাহলে আজ থেকে চল আমরা জলের ভাষা শিখি।
ভাষা যেটা না উচ্চারণে, না লেখায়—শুধু স্পর্শে।”

ঈশানী চুপ করলেন। তাঁর চোখে তখন একধরনের সাহস।
একটা নরম, কিন্তু দৃঢ় আত্মবিশ্বাস যা বয়সের নয়, সম্পর্কের নয়—শুধু বোঝাপড়ার ফল।

তারা ঠিক করল, আজ পাহাড়ে হেঁটে যাবে আরও উপরের দিকে—সেই জায়গায়, যেখানে মেঘ নামে চোখের সামনে, আর গাছেরা মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

রাস্তাটা খাড়া, পাথুরে, তবু দুজনের হাতে হাত রেখে হাঁটা যেন ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে ঈশানী হাঁপিয়ে যেতেন। ঋভু থেমে যেত সঙ্গে সঙ্গে।
“কী হল?”
“শ্বাস কষ্ট হচ্ছে একটু।”
“আমার হাতটা ধরুন। আপনি যদি পড়ে যান, আমি নিজেকেও ফেলব। কিন্তু আপনাকে ভাঙতে দেব না।”

ঈশানী একটুও হেসে ফেললেন না। বরং সেই মুহূর্তে যেন তাঁর ভিতরের সমস্ত ব্যথা, ক্লান্তি, অসমাপ্ততা যেন ঋভুর হাতে এসে নরম হয়ে গেল।

অবশেষে তারা পৌঁছাল এক ভাঙা মঠের ধারে। বহু পুরনো, কেউ আর এখানে আসে না। চারপাশে শাল গাছ, পাথর, আর পাহাড়ি ফুল। ভেতরে বসার জায়গা নেই, কেবল মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ধূলি আর সময়।

ঈশানী বললেন, “এইখানে বসি?”
“এইখানেই তো ঠিক আমাদের জায়গা,” বলল ঋভু।

তারা বসে পড়ল। পাশেই একটা ছোট পাথরের চাতাল।
ঈশানী বললেন, “জানো, একসময় ভাবতাম, আমি আর কারও সঙ্গ পাব না। জীবনটা তো একরকমভাবে ভরে উঠছিল—নাটক, ছাত্র, একা ঘুম, একা চা, একা আত্মপক্ষ সমর্থন।”

ঋভু বলল, “তবে এখন?”

“এখন মনে হয়, আমি যেন হঠাৎ এক ভুল ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েছিলাম, আর সেই চিঠিটা খোলার জন্য তুমি ঠিক সময়ে চলে এসেছ। তুমি যদি একটু দেরি করতে, হয়তো আমি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতাম।”

ঋভু তার হাত ধরল, “ভালোবাসার চিঠি কোনো ঠিকানায় যায় না। সেটা হাতে হাতে আসে, চোখে চোখে লেখা হয়।”

সেই মুহূর্তে হালকা বৃষ্টি নামল। পাহাড়ি হাওয়া আরও ঠান্ডা হয়ে এল।
ঈশানী শালের কোণায় মুখ ঢেকে বললেন, “চলো না, ফিরে যাই?”

“এখনই?”
“না, শহরে নয়। ফিরে যাই আমাদের মধ্যে। যেন আজকের এই নির্জনতা মনে থেকে যায় শহরের কোলাহলের মধ্যেও।”

ফেরার পথে তারা কেউ কথা বলেনি। পাহাড়ের পথ নেমে আসছিল, ঠিক তেমনই যেন তাদের সম্পর্ক এক গভীর অনুভবের ঢালে নামছিল—আরও স্থির, আরও নির্ভরশীল।

হোমস্টেতে ফিরে ঈশানী একটি চিঠি লিখতে বসলেন। ঋভু জিজ্ঞেস করল না কাকে, কেবল জানালার পাশে বসে তার লেখা দেখতে থাকল।

চিঠি শেষ হলে ঈশানী বললেন, “এটা আমি লিখলাম নিজেকে। অনেকদিন পর। যাতে মনে থাকে, আমি একদিন পাহাড়ে এসে নিজেকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, কারণ কেউ আমায় ভালোবাসতে শিখিয়েছিল। যদি ভবিষ্যতে কখনও আবার আমি হারিয়ে যাই, এই চিঠিটা আমাকে মনে করিয়ে দেবে।”

ঋভু বলল, “তাহলে আমিও লিখি।”
সে নিজের ডায়েরির এক পৃষ্ঠায় লিখল—
“যেদিন আমি ভয় পেতে শুরু করব, সেদিন মনে করব ঈশানী নামের এক নারী পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘তুমি যদি পড়ে যাও, আমি আমার বাকি জীবনটা তোমায় ধরে রাখব।’”

তারা চিঠি দুটো ভাঁজ করে একসঙ্গে রাখল একটা ছোট কাঠের বাক্সে, হোমস্টের বুকশেলফের পিছনে।
ঈশানী বললেন, “এই বাক্সটা হয়তো একদিন কেউ খুঁজে পাবে না। হয়তো হারিয়ে যাবে। কিন্তু আমরা জানি, এই বাক্সে একটা অসম্ভব প্রেম লুকিয়ে আছে।”

ঋভু বলল, “এটা আমাদের ভবিষ্যতের সাক্ষ্য। যখন আমরা একে অপরকে হয়তো আবার হারিয়ে ফেলব, তখন এই বাক্সটাই বলবে—আমরা ছিলাম। নামহীন, তবু সত্যি।”

সেই রাতের আকাশে তারা ছিল না। ছিল শুধু কুয়াশা।
আর সেই কুয়াশার ভিতর তাদের প্রেম ছিল জ্বলন্ত একটি আগুনের মতো, যেটা বাইরে থেকে দেখা যায় না, তবু তার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়ের গহীনে।

পর্ব ১০

ফেরার সময় হয়ে এসেছিল। পাহাড়ের সকালে রোদ ছিল না, মেঘ ছিল না—শুধু ধূসর আলো আর হালকা ঠান্ডা বাতাস। যেন প্রকৃতি নিজেও বুঝে গেছে—এদের বিদায়ের সময় এসে গেছে।

হোমস্টের দিদিমা দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, “এখানকার মতো শান্তি আর কোথাও পাবে না। আবার এসো।”
ঈশানী মাথা নত করলেন। তাঁর চোখে জল ছিল না, কিন্তু ঋভু জানত—এই বিদায়টা শুধু পাহাড় থেকে নয়, একটা ছোট, গোপন জগত থেকে ফিরে আসা।

ট্রেন ছাড়ার আগে তারা আবার সেই ছোট স্টেশনটায় ঘুরে বেড়াল। স্টলের চায়ের কাপে দুজন একসঙ্গে শেষ চুমুক দিল। কোনও পরিকল্পনা নেই, কোনও প্রতিজ্ঞাও নয়—শুধু একসঙ্গে একটা মুহূর্ত বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।

ঈশানী বললেন, “জানো, আমি চাই না এই গল্পটা কল্পনা হয়ে থাকুক। আমি চাই, এ যেন এমন কিছু হয়, যেটা মনে করলে বুকটা হালকা হয়ে আসে, বোঝা নয়।”
ঋভু বলল, “তাহলে চল, এই গল্পটা আমরা রেখে দিই আমাদের ভেতরে। না বলি, না লেখি, না দাবি করি। তবু যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে বাঁচে।”

কলকাতায় ফিরে আসার পরেই বাস্তব আবার তাদের ঠেলে দিল নিজের দিকে।

ঈশানীর নাট্যদল নতুন প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে।
ঋভুর ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম আসছে।
দিনগুলো আবার ক্যালেন্ডারের পাতা হয়ে উঠল।
রিহার্সাল, ক্লাস, মিটিং, আলোচনার মধ্যে তারা হারিয়ে গেল একেবারে না হলেও, আগের মতো প্রতিটি মুহূর্ত একসঙ্গে থাকা আর সম্ভব হল না।

তবে প্রতিদিন রাতে একটুখানি চ্যাট, একটুখানি ফোন—”খেয়েছো?”
“আজ মঞ্চে কি করেছো?”
“আমার খুব মনে পড়ছে তোমাকে”
এই শব্দগুলোর মধ্যেই তারা একে অপরকে আগলে রাখত।

কিন্তু সম্পর্ক সবসময় একরৈখিক থাকে না।
সমাজ ধীরে ধীরে প্রশ্ন তোলে।
ঈশানীর আশপাশের বন্ধুরা বলতেন, “তুমি কি ওকে ধরে রাখছো?
তোমার বয়সটা কি ভুলে যাচ্ছো?”
আর ঋভুর বন্ধুরা বলত, “তুই আর সামনে কোথাও পাবি না। সবাই তোকে ঈশানীর ছায়া ভাববে!”

এইসব কথা দুজনেই শুনত, কিন্তু দুজনেই কাউকে বলত না।

তবে একটা দিন এসেই গেল, যখন তারা চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করতে পারল না।

ঈশানী বললেন, “আমাদের মধ্যে সব আছে, ঋভু—ভালোবাসা, বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা।
তবু একটা ভয় আছে, যে সময় তোমায় নিজের গল্পে ডাকবে—তুমি কি পারবে সেদিন আমাকে নিয়েই চলতে?”

ঋভু বলল, “আপনি সেই মানুষ, যাঁর ছায়াতেই আমি আলো চিনেছি। আমি চাই, আপনি সঙ্গে থাকুন।”

ঈশানী দীর্ঘক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর বললেন, “আমি পাশে থাকব, কিন্তু সামনে থাকব না। আমি এমন এক জায়গায় থাকব, যেখান থেকে তুমি যখন ফিরে তাকাবে, আমায় দেখতে পাবে—কিন্তু আমি তোমার পথ আগলে দাঁড়াব না।”

ঋভু কিছু বলল না। সে জানত, এই কথার ভিতর কোনও অভিমান নেই। ছিল কেবল এক অদ্ভুত, নরম আত্মত্যাগ।

তারপরও তারা দেখা করত।
ঈশানী নতুন নাটকের স্ক্রিপ্টে ঋভুর লেখা কিছু সংলাপ রেখে দিলেন।
ঋভু একদিন খেয়াল করল, এক পুরনো দৃশ্যে লেখা আছে—
“ভালোবাসা যদি সত্যিই চায় পাশে থাকতে, সে কখনও বাধা দেয় না। শুধু সেই জায়গাটুকু আগলে রাখে, যেখানে তুমি হারিয়ে গেলে নিজেকে খুঁজে পাবে।”

ঋভুর চোখ ভিজে উঠল।

শেষদিনে, তারা গড়িয়াহাটের সেই ঘরে একসঙ্গে বসেছিল।
ঈশানী বললেন, “আমাদের এই নামহীন সম্পর্কটা কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?”

ঋভু মাথা নাড়ল, “না। এই সম্পর্কটা শেষ হয় না। এটা থেমে থাকে—সময় মতো আবার জেগে ওঠে।
যদি কোনোদিন তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়ো, যদি একা লাগতে শুরু করে, আমি চাই তুমি জানো—একজন মানুষ আছ, যে তোমায় সেই আগের মতো ভালোবাসে। ঠিক যেমন তুমি ছিলে, ঠিক যেমন তুমি আছো।”

ঈশানী বললেন, “তুমিও যদি একদিন খুব কষ্ট পাও, মনে রেখো—তোমার ভেতরে একটা পাহাড় আছে, যেখানে আমরা একসঙ্গে হেঁটেছিলাম। সেই পাহাড় কখনও তোমাকে ছেড়ে যাবে না।”

সেদিন তারা বিদায় নিল।
কোনও নাটকীয়তা নয়, কোনও চোখ ভেজানো দৃশ্য নয়।
শুধু একবার দীর্ঘ চেয়ে থাকা, একবার আলতো ছুঁয়ে দেওয়া, আর একটা মৃদু হাসি।

তারপর সময় গড়িয়ে গেল।

ঋভু পরে নামকরা থিয়েটার করল। অভিনয়, নাট্যলেখা—সবেতেই তার নাম ছড়িয়ে পড়ল।
ঈশানী একটু একটু করে আড়ালে চলে গেলেন।
তবু কোনও ফেস্টিভ্যালে গেলে ঋভু এখনও খোঁজ রাখে,
যদি কারও পেছনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ শাড়ির আঁচলে মুখ ঢাকা দেওয়া একজন নারী থাকে—
যিনি একসময় তার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নামহীন সম্পর্ক হয়ে উঠেছিলেন।

ঈশানীও মাঝেমাঝে একা রাতে পুরনো চিঠিটা বের করে পড়েন।
সেই বাক্সে রাখা দুটো চিঠি।
যেখানে কোনও সম্বোধন নেই, তবু সব কথা লেখা আছে।

এই গল্পের কোনও পরিণতি নেই।

কারণ এই গল্পটা প্রেমের নয়—
এই গল্পটা সেইসব সম্পর্কের, যাদের কখনও নাম হয় না,
কিন্তু যাদের ছায়া চিরকাল বুকের ভিতরে জেগে থাকে।

শেষ

1000018877.jpg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *