রিনি হালদার
অধ্যায় ১
সকালের রোদটা জানালার পর্দা ভেদ করে ক্লাসরুমের মেঝেতে ছায়া ফেলেছিল। জানালার গ্রীল দিয়ে একটা কাক মুখ বাড়িয়ে দেখছিল যেন সেও নতুন ক্লাসে কারা ঢুকছে দেখবে বলে এসেছে। ক্লাস ইলেভেন ‘সি’ সেকশন, শহরের অন্যতম নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল – সাউথ সিটি হাই।
ছেলেমেয়েদের গুঞ্জন, চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসা, কেউ কেউ নতুন বইয়ে কভারে নীল প্লাস্টিক দিচ্ছে, কেউ আবার একে অপরের স্কুল লাইফের ‘রিওপেনিং’ রিউনিয়ন নিয়ে হইচই করছে। তার মাঝখানে বসে অর্ণব সেন, জানালার পাশে একেবারে শেষ বেঞ্চে, মাথা নামিয়ে মোবাইলে একটা থিয়েটার স্ক্রিপ্ট পড়ছিল। ছেলেটা এমনিতে খুব বেশি কারো সঙ্গে মেশে না, কিন্তু স্কুলের থিয়েটার ক্লাবে ওর নাম সবাই জানে।
“শোন না, এইবারের ফেস্টে আমাদের স্কুলই ‘শেষ পাতার গল্প’ নাটকটা করবে,” পেছন থেকে রিয়া মুখার্জি বলল।
অর্ণব চোখ না তুলেই বলল, “জানি, স্ক্রিপ্টটা আমার হাতেই আছে। সোমা ম্যাম কালই দিলেন।”
রিয়া হাসল। ওর এই আত্মবিশ্বাসটাই যেন কিছুটা বিরক্তিকর আবার আকর্ষণীয়ও।
ঠিক তখনই ক্লাসের দরজার পাশে একজন দাঁড়াল। হালকা হলুদ সালোয়ার, খোলা চুল, মুখে একটা অচেনা ভাব। ক্লাসের সকলে কিছুক্ষণ চুপ। মেয়েটি ভেতরে ঢুকতেই সোমা ম্যামও এসে পড়লেন।
“Everyone, this is Isha. Isha Chattopadhyay. Just transferred from Indus Valley School. Please make her feel welcome,” বলেই ম্যাম তাকিয়ে থাকলেন অর্ণবের দিকেই।
“Arnab, she’ll sit beside you. There’s no other seat.”
অর্ণব মুখ তুলল। ঈশার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রথমবার একটু থমকে গেল। অচেনা, কিন্তু চোখদুটো যেন কী এক পরিচিত শূন্যতার কথা বলছে। ঈশা চুপচাপ এসে অর্ণবের পাশের চেয়ারে বসে পড়ল। কারো সঙ্গে কথা না বলে। অর্ণবও কিছু বলল না।
পরের ঘণ্টাগুলো কেটে গেল ক্লাস আর পড়ার ভিড়ে। কিন্তু ঈশা বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছিল। যেন বাইরের রোদ, বাইরের হাওয়ায় ওর জন্য কোনও বার্তা আছে। অর্ণব সেটা লক্ষ করলেও কিছু বলল না। সে কেবল খেয়াল করল – ঈশার খাতার এক কোণে ছোট ছোট করে লেখা –
“Sometimes, it’s the silence that screams the loudest.”
उत्तर রিহার্সাল রুম, দুপুর ২টা।
স্কুল থিয়েটার ক্লাবের অডিশন চলছে। অর্ণব নিজের সংলাপ বারবার পড়ছে, যদিও সে জানে ও-ই হবে নায়ক। সোমা ম্যাম, রিয়া ও কয়েকজন সিনিয়র বিচারক মিলে বেছে নিচ্ছেন কারা অভিনয় করবে। মেয়েদের অডিশন চলছে – কেউ সংলাপ ভুলে যাচ্ছে, কেউ খুব মেকি অভিনয় করছে।
ঠিক তখন, ঈশা ধীরে ধীরে ঘরে ঢোকে। কেউ ওকে অডিশনের লিস্টে দেখেনি।
“Yes?” সোমা ম্যাম জিজ্ঞেস করলেন।
“May I audition, Ma’am?” ঈশার কণ্ঠস্বর একরাশ আত্মবিশ্বাসে ঢাকা।
অর্ণব প্রথমবার ঈশার কণ্ঠে সেই জড়তা খুঁজে পেল না, যা ক্লাসে ছিল।
“Script পড়ে নিয়েছ?”
“Yes. Page 14. Rini’s monologue.”
ঘরে হঠাৎ এক ধরনের নীরবতা। ঈশা সংলাপ বলা শুরু করে – “আমি জানি না এই শহরটা আমাকে চায় কি না। আমি জানি না, এই মুখগুলো, এই আলোগুলো – সত্যিই কি আমার জন্য?”
তার কণ্ঠে কোনও নাটকীয়তা নেই। তবু প্রত্যেকটি শব্দ ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা খায়, প্রত্যেকটা চোখ তাকে দেখতে থাকে। রিয়া একবার অর্ণবের দিকে তাকায়, সে স্থির। যেন এমন পারফরম্যান্স সে ভাবেনি।
অডিশনের শেষে, ঈশা ধীরে বেরিয়ে যায়। কেউ হাততালি দেয় না, কেউ প্রশ্ন করে না, কিন্তু ঘরটা হঠাৎ কেমন থেমে যায়।
इस সন্ধ্যায়, থিয়েটার ক্লাবের মিটিং।
সোমা ম্যাম বললেন, “Lead female role – Rini – will be played by Isha.”
রিয়া একটু কেশে উঠে বলল, “But she’s new… she doesn’t even know the stage!”
“She knows the emotion,” ম্যামের চোখে দৃঢ়তা।
অর্ণব কিছু বলে না। শুধু জানালার বাইরের রোদটা যে কবে ঝাপসা হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে পারে। পরদিন ক্লাসে ঈশার পাশে বসেই অর্ণব বলল,
“কালকের অডিশনে… impressive ছিলে।”
ঈশা চুপ। তার মুখে না হাসি, না অবজ্ঞা।
“Thanks,” একমাত্র এই শব্দটাই আসে তার ঠোঁট থেকে।
অর্ণব বুঝতে পারে, মেয়েটা সাধারণ নয়। এই সম্পর্ক, এই অভিনয় – সবটাই হয়তো এক অদ্ভুত জটিলতায় গাঁথা হতে চলেছে।
অধ্যায় ২
সাউথ সিটি হাই-এর থিয়েটার ক্লাব রুমটা দুপুরের পর যেন আলাদা একটা প্রাণ পেয়ে যায়। ঘর জুড়ে দেয়ালের গায়ে লেগে থাকা পুরনো নাটকের পোস্টার, পাশেই সাজঘরের একটা কোণা – যেখানে মুখে ট্যালকম পাউডার আর আইলাইনার মিশে থাকে অভিনয়ের স্মৃতির সঙ্গে। এই ঘরটাই স্কুল ফেস্টের নাটকের মঞ্চ-প্রস্তুতির আঁতুড়ঘর।
আজ ছিল মূলত দ্বিতীয় রাউন্ড অডিশন। অর্ণব প্রথম থেকেই জানত সে ‘নায়ক’ রূপী অয়নের ভূমিকায় পাকা। থিয়েটার ক্লাবের সিনিয়র, নির্দেশক এবং শিক্ষকরা তার অভিনয়ের ধার আর মঞ্চে উপস্থিতির জন্যই বেছে নিয়েছে তাকে। তবু, ওর মধ্যে একটা অস্বস্তি, একটা কৌতূহল কাজ করছিল – ঈশা আজ রিহার্সালে আসবে তো?
পাশের বেঞ্চে বসা রিয়া মুখার্জি নিজের স্ক্রিপ্টে চোখ বুলাচ্ছিল। আজ সে অডিশন দেবে ‘রিনি’-র জন্য, অর্থাৎ নাটকের নায়িকার জন্য। রিনির চরিত্রটা আবেগপ্রবণ, দ্বিধাগ্রস্ত আর সাহসী – একেবারে সেই ধরণের যেখানে চোখের ভাষা, সংলাপের টান, আর চুপ করে থাকার মধ্যেও গভীরতা থাকতে হবে।
সায়ন, অর্ণবের ছোটবেলার বন্ধু, আজ নির্দেশনার কাজে আছে। কিন্তু ওর মুখে যেন খটকা। ঈশার আগমনের পর থেকেই ও একটু বদলে গেছে। একরকম চাপা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হয়েছে যা অর্ণব ধরতে পারছে।
রিয়া উঠল অডিশনের জন্য।
সংলাপ:
“আমি তোমার চোখের ভাষা পড়তে পারি, অয়ন। তুমি কিছু না বললেও, আমি শুনতে পাই তোমার ভেতরের কণ্ঠ। তবু কেন তুমি দূরে থাকো? কেন এই শহরের ভিড়ে হারিয়ে যাও?”
রিয়ার চোখে জল আনার চেষ্টা, গলার কাঁপুনি – সবই ছিল। কিন্তু তবু কিছু একটা যেন নকল নকল লাগছিল।
অর্ণব চোখ নামিয়ে স্ক্রিপ্টে চোখ বোলাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঈশা ঢুকল। হালকা নীল কুর্তি, খোলা চুল, চোখে সেই অদ্ভুত নির্লিপ্তির ছায়া। কেউ ওকে ডাকেনি আজ, তবু সে এসেছে।
“আমিও আরেকটা অংশ পড়তে পারি, ম্যাম?”
সোমা ম্যাম একটু দ্বিধায় পড়লেন, কিন্তু মাথা নাড়লেন সম্মতির জন্য।
“Page 22,” ঈশা বলল।
“Scene between Ayon and Rini – after the separation.”
অর্ণব একটু থমকাল। এই দৃশ্যটি হলো নাটকের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য, যেখানে দুজনের ভালোবাসার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি, এবং শেষবারের মতো মিলনের প্রচেষ্টা ফুটে ওঠে।
ঈশা সংলাপ বলতে শুরু করল।
“তুমি চলে যাবে, আমি জানতাম। কিন্তু জানতাম না এই ভাবে… চুপচাপ, একটা শব্দ না বলে। জানতাম না, তুমি আমার স্মৃতির মতো এত হালকা হয়ে যাবে, যাকে ছুঁতে গেলেই ফসকে যায়…”
ঘরটা নিস্তব্ধ। কেউ শব্দ করে না। ঈশার কণ্ঠে ছিল না অভিনয়, ছিল কেবল অনুভব। একটা দৃষ্টি, একটা নিঃশ্বাস—মঞ্চে নয়, বাস্তবেই যেন রিনি দাঁড়িয়ে আছে।
অর্ণব বুঝে উঠতে পারে না, সে অয়নের চরিত্রে আছে, নাকি বাস্তবেই ঈশার দিকে টান অনুভব করছে।
অডিশনের শেষে সোমা ম্যাম স্পষ্ট করে ঘোষণা করলেন—
“Lead roles – Ayon: Arnab. Rini: Isha.”
রিয়ার মুখটা থমথমে। সায়নের মুখেও একটা কঠিন অভিব্যক্তি।
রিহার্সালের প্রথম দিন।
সেট তৈরি হচ্ছে না, তবু সংলাপ পড়া শুরু। ঈশা প্রথমে কিছুটা গুছিয়ে উঠতে পারে না। অর্ণব ওকে সাহায্য করে, এমনকি এক জায়গায় হাতে-ধরার মুহূর্তে ঈশা চমকে ওঠে।
“Relax,” অর্ণব ফিসফিস করে বলে।
“তুমি অভিনয়ে খুব ভালো, কিন্তু মানুষকে কাছে আসতে দিচ্ছো না।”
ঈশা কিছু বলে না। চোখ নামিয়ে রাখে।রাতের দিকে, অর্ণব তার ডায়েরিতে লেখে:
“সে আমার সংলাপ বুঝে ফেলে, অথচ আমার চাওয়া বোঝে না। ঈশা চরিত্র নয়, যেন এক রহস্য। অভিনয় যখন বাস্তব হয়ে ওঠে, তখন মঞ্চ কাঁপে, নাকি মন?”
পরদিন রিহার্সাল শুরু হতেই রিয়া একটা সরাসরি মন্তব্য করে বসে—
“সবাই জানে, ঈশা ভালো অভিনেত্রী। কিন্তু রিনির চরিত্রটা কেবল সংলাপে নয়, অনুভবে তৈরি হয়। সেটা কি একটা ট্রান্সফার স্টুডেন্ট জানবে?”
ঘরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা। ঈশা উঠে দাঁড়িয়ে বলে—
“আমি জানি না আমি পারব কিনা। কিন্তু চেষ্টা করব। শুধু এটুকু বলি—আমার জীবনের অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। এই চরিত্রটা আমি নিজের মতো করেই খুঁজব। অভিনয়টা আমার কাছে ছদ্মবেশ নয়, বাঁচার একটা উপায়।”
অর্ণব তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
এই প্রথমবার সে অনুভব করে—এই মেয়ে শুধু মঞ্চের নয়, মনেরও একটা কোণ দখল করে নিচ্ছে।
শেষ দৃশ্যের রিহার্সাল চলছিল। ঈশা এক লাইন ভুল করে ফেলে।
“তুমি আমায় ছেড়ে চলে যেতে পারো না, আমি—”
অর্ণব হঠাৎ বলে ওঠে, “Stop!”
সবাই চমকে তাকায়।
“তুমি অনুভব করছ না। সংলাপটা বলার আগে একটা থেমে যাওয়া দরকার ছিল। তুমি ব্যথা পাওনি, তাহলে কথাগুলো ব্যর্থ হবে।”
ঈশা চুপ করে শোনে। তারপর চোখ বন্ধ করে আবার বলে—
“তুমি আমায় ছেড়ে চলে যেতে পারো না… আমি এখনও তোমায় অনুভব করি…”
ঘর নিস্তব্ধ।
রিয়া জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। সায়নের ঠোঁট শক্ত করে চেপে যায়। অর্ণব তখন নিজেই জানে না—এই মুহূর্তটা অভিনয়ের কিনা।
সন্ধ্যায় রিহার্সালের শেষে সায়ন অর্ণবকে একা ডেকে বলে—
“তুই বুঝতে পারছিস না, কিন্তু ও অভিনয় করছে না রে। ওকে কিছু একটার থেকে পালাতে হচ্ছে, তাই নাটকের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। তোকে সাবধানে থাকতে হবে।”
অর্ণব চুপ করে থাকে। ও জানে, সায়ন ঈশার ব্যাপারে অতিরিক্ত কেয়ার করে। হয়তো ভালোলাগাও আছে। কিন্তু ঈশা কি তা জানে?
অধ্যায় শেষ হয় যখন রিয়া নিজের ডায়েরিতে লেখে—
“রিনির চরিত্রটা আমি হয়তো পাইনি, কিন্তু নাটকের বাইরে শুরু হতে থাকা কাহিনীটা অনেক বেশি নাটকীয়। ঈশা জানে না, ওর চারপাশে কতগুলো মুখোশ পড়ে থাকা চরিত্র হাঁটছে…”
অধ্যায় ৩
স্কুলের মাঠের পাশের সেই পুরনো থিয়েটার ঘরটা দুপুরের পর একেবারে অন্য রকম হয়ে যায়। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকা আলো যেন ছায়া ফেলে প্রতিটি মুখে, প্রতিটি সংলাপে। অর্ণব জানত, এই ঘরেই সে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে বারবার। কিন্তু আজকাল, ঈশাকে পাশে পেলেই যেন অনুভবগুলো অচেনা হয়ে যায়।
রিহার্সাল শুরু হয়েছিল চূড়ান্ত দৃশ্যের অনুশীলন দিয়ে। চরিত্র অনুযায়ী অয়ন ও রিনি—মানে অর্ণব ও ঈশা—এখন পরস্পরের কাছাকাছি, কিন্তু কনফ্লিক্ট গভীর। সংলাপ ছিল:
“তুমি সব ফেলে চলে যাবে, ঠিক আছে। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে একবার তাকিয়ে দেখো, আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।”
অর্ণব সংলাপ বলে, চোখে একরাশ সত্যতা। ঈশা স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়। কেউ স্ক্রিপ্টে তা লেখেনি।
সায়ন, যিনি আলো-ছায়ার কাজ করছিল, বলে ওঠে, “Cut! ঈশা, তুমি স্ক্রিপ্ট ফলো করোনি।”
ঈশা শান্ত কণ্ঠে বলে, “আমি শুধু ওর চোখে দেখে বুঝতে পারছিলাম, রিনি আর দাঁড়াতে পারে না। ওর পিঠ ঘোরানোই তার ভাষা।”
রিয়া গম্ভীর গলায় বলে, “এটা যদি নিজে নিজে ডিসিশন নিতে শুরু করো, তাহলে নাটক আর নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।”
অর্ণব চুপ থাকে। সে জানে, ঈশার ব্যাখ্যা ভুল নয়।
সন্ধ্যায় রিহার্সাল শেষে অর্ণব স্কুলের ছাদে উঠে যায়। তার প্রিয় জায়গা, শহরটাকে ওপর থেকে দেখতে দেখতে সে ভাবতে ভালোবাসে। একটু পরেই পেছনে শব্দ হয়।
“তুমিও ছাদে আসো?”
ঈশা।
অর্ণব হেসে বলে, “খালি শহরটা একটু অন্যরকম লাগে ওপর থেকে। রিনির মত।”
ঈশা হাসে না, বলে, “তুমি জানো, আমি আগে কখনও নাটকে অভিনয় করিনি।”
অর্ণব অবাক, “তুমি সিরিয়াস? তোমার তো পারফরম্যান্স… একেবারে প্রফেশনাল!”
“না। আমি একটা স্কুলে পড়তাম, ওখানে কেউ কাউকে শুনত না। কেউ চুপ থাকলে, ধরে নিতো সে দুর্বল। আমি সেই দুর্বলদের একজন ছিলাম।”
অর্ণব ধীরে ধীরে পাশে এসে দাঁড়ায়। হাওয়া বইছে, রাতের আলো মিশে যাচ্ছে চুলে।
“তাই অভিনয় শিখলাম, নিজের মতো করে। যাতে অন্তত মঞ্চে দাঁড়ালে কেউ বোঝে, আমি কিছু একটা বলতে চাই।”
সেই রাতে অর্ণব নিজের মোবাইলে একটা ভয়েস রেকর্ড করে রাখে।
“ঈশা শুধু রিনি নয়। ও নিজেই একটা নাটক। এবং আমি তার দর্শক হয়ে যাচ্ছি, অভিনেতা নই।”
পরের দিন রিহার্সালে একটা নতুন ধাপ যোগ হয়—“Improvisation Exercise।” সোমা ম্যাম বললেন, “কোনো সংলাপ ছাড়াই তোমরা একে অপরের অনুভূতি প্রকাশ করো। চোখ দিয়ে, নীরবতায়।”
অর্ণব ও ঈশাকে একসঙ্গে দাঁড় করানো হয়। তাদের কাছে কোনো স্ক্রিপ্ট নেই। কেবল একে অপরের দিকে তাকাতে হবে।
প্রথমে দুজনেই স্থির থাকে। তারপর অর্ণব এগিয়ে যায়। চোখে প্রশ্ন—“তুমি কি থাকবে?”
ঈশার চোখে উত্তর—“আমি ছিলাম, আছি… কিন্তু থাকতে পারবো না।”
এই দৃশ্য দেখে ক্লাব রুম নিঃশব্দে থেমে যায়। রিয়া জানে, এটা অভিনয় নয়।
সায়ন পরের দৃশ্যের সময় আলোর রোশনি ম্লান করে দেয়, যেন ইচ্ছে করে আলো কমিয়ে দেয় চরিত্রদুটোর ঘনিষ্ঠতাকে ঢাকতে।
সন্ধ্যায় স্কুলের বাইরের ক্যাফেতে অর্ণব, ঈশা, সায়ন ও রিয়া একসঙ্গে চা খেতে যায়। আড্ডা, হালকা ঠাট্টা, কিন্তু ভিতরে ভিতরে টানাপোড়েন।
সায়ন ঈশাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি থিয়েটারটা এত সিরিয়াসলি নিচ্ছো কেন?”
ঈশা হালকা হেসে বলে, “কারণ বাস্তব জীবন আমাকে অভিনয় শিখিয়েছে। থিয়েটার কেবল রিহার্সাল নয়, প্রতিদিনই একটা নতুন দৃশ্য।”
রিয়া মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকায়। অর্ণব ঈশার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে—“তুমি নিজেই একটা মঞ্চ, ঈশা।”
কয়েকদিন পরে, রিহার্সালের মাঝে রিনির চরিত্রে একটি নতুন সংলাপ যোগ হয়। অর্ণব তা পড়ে অবাক—
“তুমি যদি আমায় ভালোবাসো, তবে মঞ্চের শেষে আমাকে একবার ছুঁয়ে দিও। সে ছোঁয়া আমার বাস্তবের উত্তর হবে।”
স্ক্রিপ্টে এটা ছিল না।
রিয়া চুপচাপ বলে, “স্ক্রিপ্ট সোমা ম্যাম নিজে বদলেছেন। বললেন, কিছু বাস্তব অনুভব যোগ করা দরকার।”
অর্ণব ঈশার দিকে তাকায়। ঈশা মাথা নিচু করে বইয়ে চোখ গুঁজে থাকে। কিন্তু তার চোখের পাতায় একটা অন্যমাত্রার স্পর্শ খেলা করে।
রাতে ঈশা তার নিজের পুরনো ডায়েরির একটা পাতা ছিঁড়ে জানালার বাইরে উড়িয়ে দেয়। সেই পাতায় লেখা ছিল—
“ভালোবাসা শব্দ নয়, থিয়েটারের একটা দৃশ্য। কিন্তু সব দৃশ্যের শেষ নেই।”
অধ্যায় ৪
সকালের আলো যখন ক্লাসরুমের জানালায় ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন অর্ণব খেয়াল করল—ঈশা আজ এসেছে খুব তাড়াতাড়ি। সে সাধারণত সবার পরে আসে, কারো সঙ্গে খুব একটা কথা বলে না। কিন্তু আজ তার চোখে ক্লান্তির ছাপ, যেন সারারাত ঘুম হয়নি।
অর্ণব ধীরে ধীরে গিয়ে বলল, “সব ঠিক আছে তো?”
ঈশা তাকাল না, বলল কেবল, “শুধু একটু ঘুম কম হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু অর্ণব জানত, ওর কণ্ঠের ফাঁকে কিছু একটা চেপে আছে। সেই চাপা কষ্ট ওর চোখের নিচের কালি, ক্লান্তির রেখা আর ঠোঁটের নিস্তেজতায় স্পষ্ট।
দুপুরের রিহার্সালে আজ তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান দৃশ্য—‘অয়ন ও রিনির বিচ্ছেদ’। এটা সেই মুহূর্ত, যেখানে নাটক সবচেয়ে আবেগময় হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যের সংলাপ:
“তুমি বলেছিলে, সবকিছু ঠিক হবে। এখন যখন যাচ্ছ, কাকে বলব, আমি বিশ্বাস করি?”
অর্ণব প্রথমবার সংলাপ বলতে গিয়ে থেমে যায়। সে চুপ করে ঈশার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঈশাও কিছু বলে না, কেবল তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। সেই চাহনি যেন দুইটা অচেনা যন্ত্রণা ভাগ করে নিচ্ছে।
সায়নের কণ্ঠে বিরক্তি—“Cut! আবার শুরু করো!”
কিন্তু অর্ণব হঠাৎ বলে ওঠে, “আমি সংলাপ চাই না। আমি ওকে একটা প্রশ্ন করতে চাই—রিনি নয়, ঈশাকে।”
ঘরটা স্তব্ধ।
“তুমি সত্যি কি কাউকে হারিয়েছো, ঈশা?”
ঈশা চমকে ওঠে। কারো সামনে এমনভাবে নিজের জীবনের প্রশ্ন কেউ তোলে না, অন্তত স্কুলে তো নয়। কিন্তু অর্ণবের চোখে সে কিছু একটা দেখে—একটা বিশ্বাস।
দীর্ঘ নীরবতার পর ঈশা বলল, “হ্যাঁ। আমার বাবা হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যান। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আর আমার মা? তিনি নিজের ব্যথা ভোলার জন্য আমাকে বোঝার সময় পাননি।”
রুমটা নীরব। রিয়া, সায়ন, সবাই চুপ। এই মুহূর্তটা স্ক্রিপ্টে ছিল না।
অর্ণব ধীরে বলল, “আমার মা চলে গেছেন অন্য শহরে। বাবার সঙ্গে থাকি, কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা গৃহস্থালি আর ডিউটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কাউকে কখনও বলতে পারিনি।”
ঈশা প্রথমবার একটু হেসে বলল, “তুমি তো সংলাপ ছাড়াই ভালো অভিনয় করো।”
অর্ণবের উত্তর, “কারণ আমি অভিনয় করি না, অনুভব করি।”
সেদিন সন্ধ্যায় অর্ণব একটা ছোট্ট চিরকুট পেল নিজের ডেস্কে। ঈশার হাতের লেখা:
“একটা ছায়া সবসময় সঙ্গে থাকে। তুমি হয়তো প্রথম আলো, যে ছায়াটাকে ভয় পায়নি।”
ওই মুহূর্তে অর্ণব অনুভব করল—এই গল্পটা শুধু নাটকের না, এটা বাস্তব। আর ও নিজেও এই গল্পের চরিত্র হয়ে উঠছে।
পরদিন ক্লাসের বিরতিতে রিয়া একা ঈশার সামনে এল। মুখে একটা অচেনা দৃঢ়তা।
“তুমি অর্ণবের খুব কাছাকাছি চলে যাচ্ছ, জানো তো?”
ঈশা শান্তভাবে জবাব দিল, “হয়তো। কিন্তু ওর সঙ্গে থাকলে নিজেকে মঞ্চে লাগেনা।”
রিয়া বলল, “মঞ্চটাই তো সব ঈশা। অভিনয়, সংলাপ, আলো… এসব যদি বাস্তবকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে?”
ঈশার মুখে কিছু একটা নড়ল, কিন্তু উত্তর দিল না। কারণ তার ভিতরেও একটা দ্বিধা কাজ করছিল।
স্কুল ফেস্টের দিন এগিয়ে আসছিল। একদিন রিহার্সালের শেষে সোমা ম্যাম নাটকের স্ক্রিপ্টে একটি নতুন দৃশ্য যোগ করেন।
শেষ দৃশ্যে রিনি আর অয়নের মধ্যে একটি চুপচাপ মুহূর্ত। কোনো সংলাপ নেই। কেবল চোখে চোখ রেখে তারা কিছু ‘বলে’ যাবে দর্শকের কাছে। কিছুটা ইম্প্রোভাইজড।
সায়ন ম্যামের কাছে সরাসরি বলে, “এই দৃশ্যটা অপ্রয়োজনীয়।”
সোমা ম্যাম বললেন, “জীবনে সব অনুভব প্রকাশ হয় না শব্দে, সায়ন। কিছু কিছু অনুভব কেবল চোখের ভাষায় থাকে।”
সায়ন চুপচাপ চলে যায়। সে বুঝতে পারছিল, ঈশা শুধু অভিনয় নয়, বাস্তবেও অর্ণবের পাশে চলে যাচ্ছে। আর সে নিজে সেই ছায়া হয়ে রয়ে যাচ্ছে।
রাতের দিকে অর্ণব একটি মেসেজ পায়—
“কাল বিকেল ৫টা। মঞ্চ ছাড়াও একটা রিহার্সাল দরকার। আমাদের দু’জনের জন্য। —ঈশা”
স্কুল মাঠের এক কোণায় তারা দেখা করে। আলো নেই, মঞ্চ নেই, কেবল দুইটি মুখ।
ঈশা ধীরে ধীরে বলে, “তুমি কখনও অনুভব করেছো—কাউকে দেখে মনে হয়, তার মধ্যেই নিজের অর্ধেক হারিয়ে যাওয়া অংশটা আছে?”
অর্ণব কিছু বলে না, শুধু পাশে বসে।
“তোমার মধ্যে আমি সেই অর্ধেক খুঁজে পাই। তাই হয়তো ভয় লাগে। যদি আবার হারিয়ে ফেলি?”
অর্ণব ধীরে হাত বাড়িয়ে ঈশার হাত ধরে বলে, “এইবার যদি হারাও, তাহলে দু’জনেই হারাবো। কারণ আমি আর তোমায় চরিত্র বলে দেখি না।”
ঈশার চোখে জল জমে, কিন্তু ঠোঁটে একটা নিঃশব্দ হাসি।
“মঞ্চের আলো নিভে গেলেও, যদি একটা হাত অন্য হাত খুঁজে পায়—তবেই গল্পটা শেষ হয় না। ওটা শুরু হয়।”
অধ্যায় ৫
স্কুলের অডিটোরিয়ামে সকালটা শুরু হয়েছিল রিহার্সালের প্রস্তুতি দিয়ে, কিন্তু অর্ণবের মাথায় শুধু আগের সন্ধ্যার কথাগুলো ঘুরছিল। ঈশার সেই চুপচাপ স্বীকারোক্তি, “তোমার মধ্যে আমি আমার অর্ধেক খুঁজে পাই” — এই লাইনটা স্ক্রিপ্টে ছিল না, তবু কেন যেন এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল, যেন এক জীবনের জমানো সংলাপ অবশেষে কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে।
ঈশা আজ একটু দেরি করে এসেছে। হালকা গোলাপি সালোয়ার কামিজ, চোখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও মুখে এক শান্ত অভিব্যক্তি। অর্ণব কিছু বলার আগেই সোমা ম্যাম ঘোষণা করলেন—
“আজ আমরা প্রেম দৃশ্যের রিহার্সাল করবো। যেখানে অয়ন ও রিনি প্রথমবার নিজেদের অনুভব স্বীকার করে।”
রিয়ার চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল। সায়ন ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল।
সোমা ম্যাম যোগ করলেন, “এই দৃশ্যে চোখের ভাষা, নীরবতা, আর শেষটা থাকবে এক অভিব্যক্তির চুম্বনে।”
সেই শব্দটা শোনার পর মুহূর্তে কেমন যেন থেমে গেল চারপাশ। রিয়া নিচু স্বরে বলল, “তুমি কি সত্যিই করবা ওর সঙ্গে? মঞ্চে হলেও?”
ঈশা শান্ত গলায় বলল, “যদি চরিত্রের প্রয়োজন হয়, তবে করব। অভিনয় তখনই সত্য হয়, যখন তুমি নিজেকে হারাও।”
অর্ণবের গলায় রূঢ়তা: “আমি কোনও চুমু চাই না, যদি তুমি নিজেকে না পাও।”
ঈশা তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। কিন্তু চোখের গভীরে ছিল একরাশ প্রশ্ন—এই সম্পর্কটা কোথায় দাঁড়িয়ে?
রিহার্সাল শুরু হলো। সবাই নিরব, শুধু দুইটা চরিত্র—অয়ন ও রিনি—মঞ্চে। সংলাপের বাইরে গিয়েই ঈশা বলল—
“তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তবে অভিনয় বন্ধ করো। সত্যি বলো—তুমি আমাকে ভালোবাসো কিনা।”
অর্ণব থমকে গেল। এই লাইন তো স্ক্রিপ্টে নেই!
সে কিছু না বলে এগিয়ে গেল ঈশার দিকে। ধীরে হাতে হাত ধরল, চোখে চোখ রেখে বলল—
“যদি বলি, আমি রিনিকে ভালোবাসি না, আমি ঈশাকে ভালোবাসি… সেটা অভিনয় হবে?”
ঘরে নিস্তব্ধতা। রিয়া মুখ ফিরিয়ে নেয়, সায়নের মুখে অসহায় রাগ।
ঈশা একটুও পিছিয়ে না গিয়ে বলল, “তাহলে চলো, নাটক শেষ করি, তারপর কথা বলব।”
রাতে, অর্ণব বারান্দায় বসে ছিল। আকাশে পূর্ণিমা, চাঁদের আলো জানালায় পড়ে একটা কবিতার মতো দৃশ্য তৈরি করছিল।
ঈশার মেসেজ এল—
“আমার সব অনুভব সত্যি, অথচ আমি নিজেই বুঝি না ওগুলো অভিনয় না বাস্তব। তুমি কি পারবে আমাকে না ছুঁয়ে অনুভব করতে?”
অর্ণবের উত্তর—
“ভালোবাসা কি শুধু ছোঁয়ার ব্যাপার? আমি তো প্রতিদিন অনুভব করি, যখন তুমি দূরে দাঁড়িয়ে তাকাও।”
পরদিন ক্লাসে রিয়া ঈশাকে একা পেয়ে বলে—
“তুমি জানো তো, অভিনয়ের দোহাই দিয়ে যদি কারো হৃদয়ে ঢুকো, তার মর্মান্তিক পরিণাম হয়?”
ঈশা বলল, “তুমি কি বলছ, আমি নাটক করছি?”
রিয়া জবাব দিল, “হয়তো তুমি করছ না, কিন্তু অর্ণব তো করছে না—ওর জন্য এটা বাস্তব। আর সায়ন? ও তো তোদের ছায়ার মধ্যেও হারিয়ে যাচ্ছে।”
ঈশা কিছু বলল না, শুধু মুখ ফিরিয়ে নিল। তার চোখে জলের রেখা।
সেদিন সন্ধ্যায় সায়ন অর্ণবকে বলে, “ভাই, অভিনয়ের বাইরে বেরিয়ে এস। আমি তোকে জানি—তুই সহজে পড়ে যাস। কিন্তু ঈশা কি তোর মতো ভাবে?”
অর্ণব বলল, “আমি জানি না ও কী ভাবে। কিন্তু আমি জানি, ওর চোখে যখন দেখি, তখন আমি চরিত্র না—আমি আমি।”
সায়ন মাথা নিচু করে চলে যায়।
রিহার্সাল শেষে অর্ণব ও ঈশা একা দাঁড়িয়ে।
অর্ণব ধীরে এগিয়ে গিয়ে ঈশার হাতে একটা ছোট চিরকুট দেয়।
চিরকুটে লেখা:
“তুমি যদি অনুভব করো, তবে উত্তর দিও মঞ্চে নয়—নিজের মতো করে, নিজের ভাষায়। সংলাপ ছাড়া। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেও বুঝবো।”
ঈশা চোখ বন্ধ করে, চিরকুট হাতে রাখে নিজের বুকের কাছে।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে—একটা নিঃশব্দ ভালোবাসা ছুঁয়ে যায় বাতাস।
অধ্যায় ৬
স্কুল ফেস্টের দিনটা শুরু হয়েছে উত্তেজনায়, ভয়ে আর প্রতীক্ষায়। চারদিকে স্টলে সাজানো আলপনা, ব্যানারে লেখা নাটকের নাম — “শেষ পাতার গল্প”। অডিটোরিয়ামের বাইরে জড়ো হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক, মঞ্চের পেছনে চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
অর্ণব কপালে ঘাম মুছছে। মঞ্চে ওঠার আগে সে কখনোই নার্ভাস হয় না, কিন্তু আজ যেন নিজের দেহে নিজেকে আটকে পড়েছে। তার মনে পড়ছে ঈশার সেই কথাগুলো, সেই চোখের চাহনি, সেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা — যা ছিল না কোনও সংলাপে, কোনও রিহার্সালে।
ঈশা আজ আসবে তো?
পেছনে দাঁড়িয়ে সায়ন চাপা গলায় বলে, “ও আসবে। ওর অভিনয় শুরু হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু তুই প্রস্তুত তো, শেষ দৃশ্যের জন্য?”
অর্ণব বলল, “যদি বাস্তব ভালোবাসা অভিনয়ের মতো সুনির্দিষ্ট হতো, তাহলে প্রশ্ন উঠত না।”
ঘণ্টা পড়ল। অডিটোরিয়ামের আলো নেভে, পর্দা উঠছে। দর্শকশালার নিঃশব্দ চাহনি গড়িয়ে পড়ছে মঞ্চে।
নাটক শুরু হয়েছে। অর্ণব, ঈশা, রিয়া, সবাই চরিত্রে ঢুকে পড়েছে। সংলাপগুলো জীবন্ত। দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ। প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি অভিব্যক্তি যেন নিখুঁত।
শেষ দৃশ্যের আগের মুহূর্তে, গ্রীনরুমে ঈশা চুপ করে বসে আছে। রিয়া এসে তার পাশে বসে বলে,
“চূড়ান্ত দৃশ্যে তুমি কী করছ, সেটা তোমার ওপর। কিন্তু মনে রেখো, মঞ্চে কোনো ভুল ছাড়ে না।”
ঈশা তাকায় না। কিন্তু তার হাতে শক্ত করে ধরা অর্ণবের দেওয়া চিরকুট।
মঞ্চের আলো ম্লান, পর্দা উঠে যায় চুপচাপ। ‘শেষ দৃশ্য’।
রিনি আর অয়নের বিচ্ছেদের পরের মুহূর্ত। সব কিছু বলা শেষ, কেবল একবার চোখে চোখ রাখা, একটুখানি স্পর্শ।
ঈশা এগিয়ে আসে। সংলাপ বলে—
“তুমি চলে গেলে। আমি চুপ করেছিলাম। কিন্তু আজ বলতে চাই—ভালোবাসা শব্দ নয়, সে এক নীরবতা। আমি সেই নীরবতায় আজও হাঁটি।”
অর্ণব এগিয়ে এসে তার দিকে হাত বাড়ায়। নাটক অনুযায়ী, আজ প্রথমবার তাদের ছোঁয়া।
তবে সেদিন…
ঈশা হঠাৎ তার কাঁধে মাথা রাখে। সংলাপ নেই। কেবল চোখ বুজে থাকে।
অর্ণব একটুও দ্বিধা না করে হাত রাখে ওর পিঠে। মঞ্চে আলো ঝিম ধরে।
তবে ঠিক সেই মুহূর্তে—
সায়ন হঠাৎ আলো নিভিয়ে দেয়।
বেশ কিছু সেকেন্ড অন্ধকার। দর্শকদের গুঞ্জন।
আলো আবার আসে। মঞ্চে কেবল দু’জন—অর্ণব ও ঈশা, কাছাকাছি।
তাদের মুখে সংলাপ নেই, কিন্তু তাদের অভিব্যক্তিতে এমন কিছু ছিল যা সবার বুক ছুঁয়ে যায়।
দর্শকদের মধ্যে হঠাৎ করে উঠে আসে হাততালি, বাঁধভাঙা অভিব্যক্তি। ক্ল্যাপিং থামে না।
পেছনে রিয়া সায়নের দিকে ঘুরে বলে, “তুমি আলো নিভিয়ে দিলে কেন?”
সায়ন চুপ করে থাকে। তার চোখে অভিমান আর পরাজয়ের ছায়া।
নাটক শেষে সোমা ম্যাম ঈশার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“এই শেষ দৃশ্যটার জন্যই নাটকটা সত্যি হয়ে উঠল।”
ঈশা মাথা নিচু করে বলে, “আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না—আমার অভিনয় কবে শেষ হয়েছিল।”
রাতের দিকে অর্ণব আর ঈশা স্কুল মাঠে দেখা করে।
আলো কম, চারপাশ নিস্তব্ধ।
অর্ণব বলে, “আজ মঞ্চে তুমি যা করেছ, সেটা কি রিনি করেছিল, না ঈশা?”
ঈশা ধীরে উত্তরে বলে,
“রিনি আমার একটা অংশ। কিন্তু আজ যা হয়েছিল, সেটা ছিল ঈশার।”
“তবে…?”
“তবে আমি এখনও জানি না এটা প্রেম, না অভিনয়। কিন্তু জানি—তুমি থাকলে অভিনয় করতেও ভালোবাসা হয়।”
অর্ণব কিছু বলে না। কেবল ঈশার হাত ধরে।
সেই মুহূর্তে, ঈশা চোখ বুজে চিরকুটটা তার বুকের কাছ থেকে বের করে অর্ণবের হাতে দিয়ে দেয়।
চিরকুটে লেখা ছিল:
“যদি তুমি অনুভব করো—তবে পর্দা নামার পরেও গল্পটা চলবে। আমি অপেক্ষা করব, স্ক্রিপ্টের বাইরে।”
অধ্যায় ৭
নাটক শেষ হয়েছে, ফেস্টের ব্যস্ততা পেরিয়ে আবার স্কুল তার চিরচেনা ছন্দে ফিরেছে। কিন্তু যারা ‘শেষ পাতার গল্প’-এর অংশ ছিল, তাদের জন্য যেন কিছুই আর আগের মতো নেই।
অর্ণব ক্লাসে বসে খাতা খুলে লেখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও। ঈশা, যাকে নিয়ে এই কয়েক সপ্তাহে জীবনের গল্প লেখা শুরু করেছিল, হঠাৎ কেমন যেন নির্লিপ্ত হয়ে পড়েছে। ও চোখে চোখ রাখছে না, আড্ডায় আসছে না, এমনকি রিহার্সালের কথা তুললে কেবল হাসি দিয়ে এড়িয়ে যায়।
একদিন দুপুরে সায়ন হঠাৎ এসে বলল, “প্রপস রুমে একটু আয়।”
অর্ণব অবাক, “কেন?”
“একটা জিনিস দেখাতে হবে তোকে।”
প্রপস রুম—স্কুলের পুরনো একটি ঘর যেখানে নাটকের সাজসজ্জা, পোশাক, ফেলে রাখা কস্টিউম আর বাতিল পাণ্ডুলিপি স্তূপ হয়ে থাকে।
ঘরে ঢুকেই সায়ন একটি পুরনো কাঠের ড্রয়ার খুলে একখানা কাগজ বের করল।
“দেখ, এটা ফেস্টের আগের দিন সন্ধ্যায় প্রপস রুমে ঈশা রেখে গিয়েছিল। আমি জানতাম না ও কী লিখেছে। কিন্তু কাল সন্ধ্যায় হঠাৎ পড়ে দেখি—এটা চিঠি, কারোর উদ্দেশ্যে লেখা, হয়তো তোর।”
অর্ণব কাগজটা খুলল।
চিঠিতে লেখা—
“তুমি যদি ভাবো, আমি সবটা জানতাম—তবে ভুল ভাবো। আমি জানতাম না কীভাবে কেউ আমাকে সত্যি করে দেখতে পারে। ভয় পেতাম, এখনও পাই। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, মঞ্চটা শেষ না হোক, কারণ তার মানেই হয়তো তোমার সঙ্গে দেখা শেষ হয়ে যাবে। আমি আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারি না—তুমি অয়ন ছিলে, না অর্ণব। কিন্তু জানি, দু’জনেই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলে।”
চিঠি অসমাপ্ত। নিচে স্বাক্ষর নেই।
অর্ণব নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।
সায়ন তখন বলে ওঠে, “তোকে একটা সত্যি বলি? আমি ঈশাকে প্রথম দেখে ফেলে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু কখনও বলতে পারিনি। কারণ জানতাম, তুই ওর চোখে যা দেখিস, আমি সেটা দেখতে পাই না। আর এখন তুই যদি থেমে যাস, তবে সেটা হবে ভুল।”
ঈশার সঙ্গে দেখা হয় সেদিন বিকেলে, স্কুল লাইব্রেরির পেছনের করিডোরে।
অর্ণব চুপ করে তার পাশে দাঁড়ায়।
“তুমি চিঠিটা লিখেছিলে?”
ঈশা চমকে তাকায়, তারপর আবার চোখ নামিয়ে ফেলে।
“সব কিছু বলা যায় না, অর্ণব। কিছু অনুভব… শুধু ফিসফাস হয়ে থাকে।”
“তুমি কি আমাকে ভুলে যেতে চাইছ?”
“আমি চাই—তুমি আমার অভিনয়টা ভুলে যেও না। কারণ তাতেই আমি ছিলাম সত্যি।”
অর্ণব বলল, “আমি তোর অভিনয় নয়, সেই অভিব্যক্তিটা ভালোবেসেছি—যেটা সংলাপ ছাড়াই চোখে ছিল।”
ঈশা তখন হঠাৎ বলে উঠল, “তুমি জানো, আমি কেন আগের স্কুল ছেড়েছিলাম?”
অর্ণব চমকে গেল, “না। কিন্তু বলো।”
“ওখানে একটা নাটকে অভিনয় করেছিলাম। নায়িকা ছিলাম, এবং সেই নাটকে, সেই শেষ দৃশ্যে, একটা ছেলেকে চুমু খেতে হয়েছিল। ওটা মঞ্চে ছিল, চরিত্রে ছিল। কিন্তু স্কুলে, লোকজন সেটা নিয়ে এমন কথা বলতে লাগল… ছেলেটাও বলেছিল, আমি তাকে ইচ্ছা করে ‘used’ করেছি। তারপর থেকে আমি মঞ্চকে ভয় পেতে শুরু করেছিলাম।”
অর্ণব ধীরে ঈশার হাতটা ধরল, “এইজন্যই তুমি এত সংবেদনশীল, এত রক্ষণশীল?”
ঈশা মাথা নিচু করে বলে, “তুমি যদি ভেবো, আমি অভিনয় করেছি, তবে করিনি। কিন্তু বিশ্বাস করতেও ভয় পাই।”
পরদিন স্কুলে একটি নতুন পোস্টার টানানো হয়—
“District Inter-School Theatre Meet”
স্কুলের নাম পাঠানো হয়েছে—নাটক: ‘শেষ পাতার গল্প’।
নাম: Direction – Soma Ma’am
Lead Actors: Arnab Ghosh & Isha Roy
অর্ণব অবাক। ঈশা তো বলেছিল, সে আর অভিনয় করবে না।
সোমা ম্যাম এসে জানালেন, “ঈশা নিজেই আমার কাছে গেছে। বলেছে, সে আবার একবার মঞ্চে ফিরতে চায়—এইবার নিজের মতো করে, নিজের ভাষায়।”
সেদিন প্রপস রুমে অর্ণব যায় একা।
পুরনো পোশাকের স্তূপে একটি ছোট চিরকুট পড়ে থাকে।
চিরকুটে লেখা:
“আমি ফিরছি, কিন্তু এবার সংলাপ নিয়ে নয়—ফিসফাস নিয়ে। যদি তুমি শুনতে পারো, তবে পাশে থাকো। —ঈ”
অর্ণব চুপ করে হাসে।
এইবার সে জানে—নাটক আবার শুরু হবে। কিন্তু এইবার… সে আর চরিত্র নয়, সে প্রেমিক।
অধ্যায় ৮
শীতের ভোরে স্কুলের করিডোরে ঈশা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। হাতে নাটকের স্ক্রিপ্ট, কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা। অর্ণব ঠিক তার পেছনে এসে বলে উঠল, “আজ rehearsals নয়, café-tea-day?”
ঈশা হাসে। “তুমি চুপচাপ ভালোবাসা করো, খুব কৌশলে। কিন্তু আমার ভিতরে এখনও থরে থরে ভয়।”
“ভয় থাকলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, পালানো যায় না।”
ঈশা মাথা নিচু করে বলে, “চলো।”
ওরা স্কুল ক্যান্টিনের পেছনে এক ফাঁকা বেঞ্চে বসে। বাতাসে হালকা হেলান দিয়ে সময় কেটে যায়। কথা হয় নাটক নিয়ে, জীবনের চাহিদা নিয়ে, এবং মাঝেমাঝে চুপচাপ থেকেও।
ঈশা ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল, নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিল অর্ণবের চোখে।
তবে শান্ত জলও কখনও কখনও গর্জে ওঠে।
এক সপ্তাহ পর, স্কুলের ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে হঠাৎ একটা অজ্ঞাত নম্বর থেকে ভিডিও আসে—
নাটকের শেষ দৃশ্য, যেখানে ঈশা অর্ণবের কাঁধে মাথা রেখেছিল।
ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল এমন যেন ইচ্ছা করে ব্যক্তিগত মুহূর্তকে রেকর্ড করা হয়েছে। ভিডিওর নিচে লেখা—
“Real life or rehearsal?”
গ্রুপে গুঞ্জন, কটূক্তি, হাসাহাসি।
“ওই তো প্রেমের নাটক!”
“মঞ্চ তো অজুহাত!”
ঈশা ক্লাসে ঢুকেই একরাশ হাসির মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে যায়—ঘটেছে কিছু একটা।
অর্ণব ছুটে আসে, “ভিডিওটা… কে করল জানি না, কিন্তু আমি—”
“থামো,” ঈশা বলে ওঠে। “তুমি ভিডিও করনি, জানি। কিন্তু এরকমটা আবার… আমি সহ্য করতে পারি না।”
সে বেরিয়ে যায় ক্লাস থেকে।
রিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল এক কোণে। সায়ন এসে বলল, “তুই কী করলি রে?”
রিয়া ধীরে বলল, “আমি ভিডিও করিনি। কিন্তু হ্যাঁ, হয়তো কারো সঙ্গে বেশি কথা বলেছি।”
সায়নের চোখে অবিশ্বাস। “তুই কী এতটাই নিচে নেমে গেছিস?”
রিয়া ফুঁসে ওঠে, “আমার জন্য কেউ কখনও মঞ্চে হাত ধরেনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম—একবার অন্তত আলোটা আমার ওপর পড়ুক।”
ঈশা দুইদিন স্কুলে আসেনি।
অর্ণব রাতে তার বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গেট বন্ধ। জানালার আলোও নেভানো।
একটা ছোট চিরকুট রেখে আসে গেটের নিচে—
“তুমি যদি দূরে যাও, আমি আর মঞ্চে উঠবো না। তুমি ছিলে বলেই সংলাপ মুখস্থ করতাম না—আমি বলতাম, কারণ তুমি শুনতে।”
তৃতীয় দিন সকালে, ঈশা আসে স্কুলে। মুখে একরাশ নিঃস্পৃহতা।
রিহার্সালে সোমা ম্যাম বলেন, “নতুন নাটক ঠিক হয়েছে—‘ছায়া-আলো’। এবার তোমরা দু’জনেই আবার লিড। কিন্তু এবার রোম্যান্স নয়—বিচ্ছেদের গল্প। পারবে?”
ঈশা সোজা তাকিয়ে বলেন, “বিচ্ছেদ মানেই তো দূরত্ব নয়। অনেক সময় সেটা সত্যির মুখোমুখি হওয়া।”
সোমা ম্যাম শুধু বলেন, “তবে রিহার্সাল আজ সন্ধ্যায়। প্রস্তুত থেকো।”
সন্ধ্যায় অডিটোরিয়ামের প্রপস ঘরে সায়ন অর্ণবকে বলে, “ভিডিওর অ্যাঙ্গেল দেখে বুঝতে পারিস, কেবল ক্লাসরুম থেকে এমন হতে পারে না। এটা ইচ্ছাকৃত। হয়তো কেউ চাইছিল ঈশা আবার পালাক, যেমন আগেও পালিয়েছিল।”
অর্ণব চুপ করে থাকে।
সায়ন এরপর যোগ করে, “কিন্তু ও এবার পালাবে না। কারণ তুই আছিস।”
রিহার্সাল শুরু। নতুন নাটকের নাম ‘ছায়া-আলো’।
চরিত্রের নাম ‘আরণ্য’ ও ‘মায়া’।
প্রথম দৃশ্য—মায়া বলে,
“তুমি আমাকে সত্যি দেখেছিলে, না নাটকের আলোয়?”
অর্ণব (আরণ্য) উত্তর দেয়,
“আলো তো চোখে পড়ে, কিন্তু ছায়ায় আমরা নিজেদের দেখি।”
ঈশা এবার সংলাপ বলে না। এগিয়ে এসে বলে—
“তাহলে আমি এবার ছায়া হবো। তুমি আলোর নিচে থেকো। কিন্তু মনে রেখো, ছায়া ছাড়া আলো বোঝা যায় না।”
পেছন থেকে সোমা ম্যামের ধ্বনি—
“Excellent. কিন্তু এই অনুভূতিটা তোমাদের দু’জনের গল্প, না চরিত্রের?”
ঈশা এবার কেবল তাকিয়ে থাকে অর্ণবের দিকে।
কোনো উত্তর নেই।
অধ্যায় ৯
স্কুলের নতুন নাটকের প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে। ‘ছায়া-আলো’ নাটকের মধ্যে আর্নব ও ঈশা প্রতিদিনের সংলাপের বাইরে গিয়ে নিজেদের অনুভব দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছে মঞ্চ। অথচ ঈশা যেন কেমন ছায়ায় পরিণত হয়েছে—চুপচাপ, গম্ভীর, আরেকবার যেন কোথাও সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অর্ণব বুঝতে পারছিল কিছু একটা ঘটতে চলেছে। প্রতিটি রিহার্সালের শেষে সে আরও একবার ঈশার চোখে খোঁজে সেই স্পর্শ, সেই অচলাবস্থা—যেটা সম্পর্কের শেষ বা শুরুর আগে আসে।
একদিন সন্ধ্যায় ঈশা হঠাৎ স্কুল ছাড়ার সময় অর্ণবকে বলে—
“আগামী সপ্তাহে আমার বাবা-মা আমাকে হায়দরাবাদ পাঠাচ্ছেন। মায়ের কাছে।”
অর্ণব থমকে যায়।
“চিরতরে?”
“হয়তো। হয়তো না। জানি না। কিন্তু জানি, আমি এখানে থাকলে কেউ আমায় ঈশা হতে দেবে না। সবাই শুধু চরিত্র খোঁজে আমার মধ্যে।”
অর্ণব চুপ করে বলে, “আমি তো খুঁজি শুধু… তুই।”
ঈশা চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে, “তুমি তো অর্ণব। অর্ণব মানে সংলাপ, অনুভব, আলো… আমি কি থাকলেও সেই অর্ণব থাকবে?”
সেই রাতেই অর্ণব একা মাঠে বসে, আকাশের দিকে তাকিয়ে, ফোনে রেকর্ড করে:
“ঈশা, নাটক শেষ হলে সবাই চলে যায়। শুধু কিছু সংলাপ থেকে যায় মঞ্চে। যদি তুই চলে যাস, আমি সেই সংলাপগুলোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচব। কিন্তু যদি কখনও ফিরিস… একটিবার… আমি তখনও থাকব। চরিত্র হয়ে নয়, মানুষ হয়ে। প্রেমিক হয়ে। বন্ধু হয়ে। দর্শক হয়ে। যেভাবেই তুই চাইবি।”
সে রেকর্ড পাঠায় না।
দু’দিন পরে ‘ছায়া-আলো’-এর চূড়ান্ত মঞ্চায়নের দিন। ঈশা সকালবেলা স্কুলে আসে না। সবাই ভাবছে—ও কি আদৌ আসবে?
অর্ণব নির্বাক। সোমা ম্যাম একটু পরে এসে বলেন, “Isha has officially withdrawn from the play.”
হঠাৎ করেই নাটকের আলো নিভে যায় যেন।
সায়ন এগিয়ে এসে বলে, “তুই একা পারবি তো?”
অর্ণব হাসে, “একা হলে ছায়া-আলো হয় না, শুধু অন্ধকার হয়।”
পাঁচ মিনিট বাকি শো শুরুতে।
ঠিক তখন অডিটোরিয়ামের পেছনের দরজা খুলে আসে ঈশা। চোখে ক্লান্তি, মুখে চাপা রাগ, কিন্তু পায়ে দৃঢ়তা।
সে সোজা গিয়ে সোমা ম্যামকে বলে, “আমি ফিরেছি। শেষ সংলাপটা আমার নিজের মতো বলব।”
অর্ণব তাকিয়ে থাকে ওর দিকে—চোখে জল।
নাটক শুরু হয়।
সব কিছু চলে যায় ঠিকঠাক। আর আসে সেই দৃশ্য—‘আরণ্য ও মায়া’র শেষ সাক্ষাৎ।
স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী, মায়া চলে যাবে—কিন্তু এবার ঈশা সংলাপ বদলে দেয়।
“আমি আসছি না আর। আমি যাচ্ছি, কিন্তু যাবার আগে একটা শেষ কথা—তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমার ছায়াটাকে মনে রেখো। কারণ আলো বদলালেও ছায়া ঠিক সেই রকমই থেকে যায়।”
অর্ণব থমকে যায়। এই সংলাপ ছিল না।
সে ধীরে বলে, “তুই থাকিস আমার প্রতিটি আলোর পাশে, যেটুকু অন্ধকার আমি লুকাতে পারি না।”
আলো নিভে যায়।
পর্দা নামে।
নাটক শেষ। সবার করতালি, প্রশংসা, আনন্দ।
কিন্তু ঈশা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলে, “এটাই ছিল আমার শেষ সংলাপ। আর আমি জানি, তুই সেটা শুনেছিস।”
অর্ণব মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ। আমি শুনেছি। কিন্তু এটা কি নাটকের সংলাপ, না আমাদের জীবনের?”
ঈশা কেবল হাসে।
“যদি তুই জীবন ভাবিস, তবে আমি অভিনয় থামিয়ে দিচ্ছি। আর যদি নাটক ভাবিস, তবে… গল্পটা শেষ। কারণ পরবর্তী দৃশ্য আর আমি লিখব না।”
সে হেঁটে চলে যায় অন্ধকার করিডোরে।
অধ্যায় ১০
ছয় মাস কেটে গেছে।
স্কুলের সেশন শেষ, সব বন্ধুরা আলাদা পথে। কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং, কেউ মেডিকেল, কেউ পাড়ি দিচ্ছে ভিন্ন শহরে, কেউ দেশের বাইরে।
ঈশা হায়দরাবাদ চলে গেছে। চুপচাপ, কোনও বিদায় ছাড়াই। অর্ণব প্রথম কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করেছিল প্রতিটি ফোনের রিং, প্রতিটি ইনবক্সের আওয়াজে। কিন্তু না, ঈশা আর লিখে না, ফোনেও আসে না।
অর্ণব এখন কলেজের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু মনে পড়ে—শেষ দিনের সেই নাটকে ঈশা বলেছিল, “আমি আর সংলাপ লিখব না।”
তবু সে রোজ নিজের ডায়েরিতে কিছু না কিছু লিখে রাখে। যেন ঈশা পড়বে, কোনও একদিন।
একদিন পুরনো স্কুলে ফিরে যায় অর্ণব। শ্রেণিকক্ষ গুলো নীরব, করিডোর ফাঁকা। অডিটোরিয়ামের পর্দা নামানো, প্রপস রুম তালাবদ্ধ। তারপর সে খুঁজে পায় একটি পুরনো কফির কাপ—যেটা ঈশা রিহার্সালের সময় রেখে গিয়েছিল।
হাতের কাপটা আঁকড়ে ধরে সে হঠাৎ বলে ওঠে—
“তুই সত্যিই চলে গেছিস, ঈশা? নাকি এখনও কোথাও দাঁড়িয়ে আছিস—পর্দার পেছনে?”
তিন মাস পর। কলকাতা বইমেলায় অর্ণব ঘুরছে। হঠাৎ ‘ছায়া-আলো’ নামক এক ছোট নাট্যগ্রন্থ চোখে পড়ে। কভারে লেখা:
নাটক: ছায়া-আলো
সংলাপ ও ভাবনা: ঈশা রায়
সে খুলে পড়তে থাকে। অনেকটা পরিচিত, অনেকটা ভিন্ন।
তবে একটি পাতায় হঠাৎ চোখ আটকে যায়। সেখানে লেখা—
“শেষ সংলাপ যদি না বলাই থাকে, তবে দর্শকও হয়তো কখনও সবটা বুঝবে না। আমি একদিন ফিরব, যদি কেউ তখনও অপেক্ষা করে।”
অর্ণব বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা খায়। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসে সে সেই পুরনো চিঠিটা খুঁজে বার করে যেটা ঈশা প্রপস রুমে রেখেছিল।
সেই অসমাপ্ত চিঠি।
সে নিজের কলমে নিচে যোগ করে—
“…আমি অপেক্ষা করব, যেমন দর্শক বসে থাকে শেষ পর্দা নামার পরেও, আশা নিয়ে—হয়তো encore হবে। তুই শুধু একবার মঞ্চে ফিরিস।”
এক বছর পর। কলকাতার এক কলেজ ফেস্টে নাটকের প্রতিযোগিতা। অর্ণব এখন কলেজ থিয়েটারের অংশ। নাটক ‘শেষ পাতার গল্প’ নতুন করে মঞ্চস্থ হচ্ছে। অর্ণব এখন পরিচালক, কিন্তু মঞ্চে ওঠে না।
মঞ্চে নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। তবু স্ক্রিপ্টে অর্ণব রেখে দিয়েছে সেই শেষ সংলাপগুলো।
নাটক শেষে, অডিটোরিয়ামের শেষ সারিতে দাঁড়িয়ে applause শুনছে অর্ণব।
হঠাৎ পাশের সিটে এক মেয়েকে দেখতে পায়।
হালকা নীল ওড়নায় ঢাকা মুখ, চোখে একান্ত চেনা দীপ্তি।
ঈশা।
চোখাচোখি হতেই ঈশা মৃদু হাসে।
কিছু বলে না।
অর্ণবও না।
কিন্তু চোখে চোখে একটা সংলাপ হয়—
“তুই ফিরেছিস। নাটকে নয়, জীবনে।”
ঈশা ফিসফিস করে বলে—
“Encore.”
—
(শেষ)




