ভাস্কর সেনগুপ্ত
হিমালয়ের অন্তহীন তুষারশৃঙ্গ আর অন্ধকার বনপথের গভীরে, এমন এক অচেনা অঞ্চল রয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষ কোনোদিন পা রাখে না। সেখানে বাতাসও যেন রহস্য বয়ে আনে—দিনের আলো কম টিকে থাকে, আর রাত নামলেই পাহাড়ের বুক থেকে ভেসে ওঠে অদ্ভুত সুর, যেন অচেনা কোনো ভাষায় কেউ প্রার্থনা করছে। এই জনমানবশূন্য অরণ্যের মাঝে গড়ে উঠেছিল এক শতাব্দীপ্রাচীন তান্ত্রিক সম্প্রদায়, যাদের অস্তিত্বের কথা শুধু কিছু কিংবদন্তি আর মিথে টিকে আছে। তারা নিজেদের আলাদা করে রেখেছে সভ্যতার চোখ থেকে, কারণ তারা জানে, তাদের জ্ঞান যদি বাইরের জগতে পৌঁছে যায়, তবে সেটি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। তাদের গুরুগম্ভীর মঠ গড়ে উঠেছে প্রাচীন পাথরের ওপর, যেগুলিতে খোদাই করা আছে অজানা প্রতীক, আর দেয়ালে ঝুলছে হাড়, খুলি আর শুকনো ভেষজের মালা। চারপাশে আগুন জ্বালানো কুণ্ড, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন ধোঁয়া বেরিয়ে আসে, সেই ধোঁয়ার গন্ধে একদিকে ভয় জাগে, অন্যদিকে এক অদ্ভুত সম্মোহন সৃষ্টি হয়।
এই সম্প্রদায়ের প্রধান বিশ্বাস “দেহত্যাগ” নামক সাধনায়। তাদের মতে, মানুষের আত্মা কোনো খাঁচায় বন্দি পাখির মতো, যে খাঁচা হলো দেহ। নির্দিষ্ট পূর্ণিমার রাতে, যখন চন্দ্রালোকে পাহাড় রূপালী হয়ে ওঠে, তখন মহাশক্তির দ্বার খুলে যায়। সেই সময় সঠিক মন্ত্রোচ্চারণ আর কঠোর সাধনার মাধ্যমে আত্মাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। সাধকের আত্মা এক অদৃশ্য স্রোতে ভেসে গিয়ে অন্য দেহে প্রবেশ করতে পারে, যেন এক নদী নতুন খাতে প্রবাহিত হলো। তবে এই সাধনা শুধুমাত্র নিঃস্বার্থ, লোভহীন আর আত্মসংযমে পারদর্শী মানুষের পক্ষে সম্ভব। যাঁরা কেবল নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এই সাধনায় প্রবেশ করেন, তাঁরা আত্মার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভয়ংকর ফাঁদে আটকে পড়েন—এই ছিল সম্প্রদায়ের গুরুদের সতর্কবাণী। তাদের প্রাচীন শাস্ত্রে লেখা আছে বহু গল্প, যেখানে অপূর্ণ সাধনা বা লোভের কারণে অনেক সাধক দেহহীন আত্মা হয়ে চিরতরে ভাসতে থেকেছে অদৃশ্য জগতে। এই গল্পগুলো শিষ্যদের মনে ভয় আর ভক্তি দুই-ই জন্ম দেয়, যেন তারা বুঝতে পারে এই সাধনা কোনো খেলা নয়, এটি জীবন-মৃত্যুর সীমানা অতিক্রম করার পথ।
তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের গোপন আচারগুলো বাইরের মানুষের কল্পনারও বাইরে। নির্দিষ্ট রাতে তারা পাহাড়ের গুহার গভীরে একত্রিত হয়, যেখানে মশাল জ্বলে, ঢাকের শব্দ কেঁপে ওঠে, আর গুরু উচ্চারণ করেন অচেনা মন্ত্র। চারপাশে বসে থাকা শিষ্যরা চোখ বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন হয়, তাদের নিশ্বাস ধীরে ধীরে এক ছন্দে মিশে যায়, যেন তারা শরীরের সীমা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। গুহার দেয়ালে প্রতিফলিত আগুনের আলোতে তাদের মুখ ভৌতিক মনে হয়—কেউ হাসছে, কেউ কাঁপছে, আবার কেউ হঠাৎ চিৎকার করে উঠছে। এই সবকিছুর মাঝেই গুরু বারবার মনে করিয়ে দেন, “আত্মা হলো মুক্তির পথ, কিন্তু লোভে যদি তাকে বেঁধে ফেলো, তবে সে-ই হবে তোমার বিনাশ।” এই গোপন সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের আচার-অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে, বাইরের চোখ এড়িয়ে। কোনোদিন কেউ যদি অচেনা পথ ধরে হঠাৎ এখানে এসে পড়ে, তবে সে হয় আর ফিরতে পারে না, নয়তো ফিরে গেলেও তার চোখে ভেসে থাকে এমন সব দৃশ্য যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। হিমালয়ের বুকের এই গোপন কোণ তাই আজও রহস্য আর আতঙ্কে আচ্ছন্ন, যেখানে “দেহত্যাগ” নামক অদ্ভুত সাধনা এক অন্ধকার কিংবদন্তির মতো প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
–
কলকাতার বুকে বহু প্রাসাদোপম বাড়ি, উঁচু দালান আর অট্টালিকা থাকলেও রথীন মিত্রের প্রাসাদ ছিল সবচেয়ে বিলাসবহুল। ব্যবসায়িক মেধা, নির্দয় নীতি আর অগাধ ধনসম্পদ তাকে শহরের প্রভাবশালী ধনকুবেরদের একজন করে তুলেছিল। কিন্তু যতই অর্থ আর প্রভাব বাড়তে লাগল, তার অন্তরে ততই ভয় চেপে বসতে লাগল—মৃত্যুভয়। সোনার গদি, অমূল্য রত্ন, বিদেশ থেকে আনা গয়না, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতা—কোনো কিছুই তাকে আশ্বস্ত করতে পারছিল না, কারণ তার শরীর ধীরে ধীরে বয়সের ভারে নত হচ্ছিল। আয়নায় তাকালেই সে দেখতে পেত চুলে পাক ধরছে, কপালের ভাঁজ ঘন হচ্ছে, চোখের তলদেশে কালি জমছে। এই দৃশ্য তাকে আতঙ্কিত করত। কারণ রথীন জানত, তার গড়া সাম্রাজ্য, তার অগণিত ধন, তার ক্ষমতা—সবই একদিন তার হাতছাড়া হবে, যদি সে মৃত্যুর কাছে হার মেনে নেয়। সে রাত জেগে বসে থাকত নিজের অন্ধকার ঘরে, জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবত—কোনো উপায় কি নেই, যার মাধ্যমে সে চিরকাল বেঁচে থাকতে পারবে? চিকিৎসক, যোগী, ওঝা—অসংখ্য মানুষের শরণাপন্ন হয়েও সে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আয়ুর্বেদ থেকে শুরু করে বিদেশি ওষুধ—সব কিছু চেষ্টা করেও সে বুঝতে পারল, মৃত্যুর ছায়া তার জীবন থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়। অথচ রথীনের মন তা মেনে নিতে রাজি ছিল না; সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠেছিল, যেভাবেই হোক অমরত্বের চাবিকাঠি তাকে খুঁজে পেতেই হবে।
এই অন্তর্দ্বন্দ্ব আর লোভের চূড়ান্ত পর্যায়ে, একদিন এক অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হয় রথীন। দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে বসে ছিল এক জীর্ণ, অচেনা সন্ন্যাসী। তার চোখ অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ, যেন ভেতরের সব গোপন কথা পড়ে নিতে পারে। সাধারণত রথীন এমন মানুষকে পাত্তা দিত না, কিন্তু সেই সন্ন্যাসীর দৃষ্টি তাকে টেনে নিল। হঠাৎই সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বলল, “তুমি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছো।” রথীন চমকে উঠল—কেউ তো তাকে এ কথা কখনো বলেনি। সন্ন্যাসী আরও বলল, “তোমার সব আছে, শুধু সময় নেই। তুমি সময় কিনতে চাও, তাই না?” রথীন হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই সন্ন্যাসী ফিসফিস করে এক গোপন সাধনার নাম উচ্চারণ করল—“দেহত্যাগ।” সে জানাল, এমন এক প্রাচীন তান্ত্রিক পদ্ধতি আছে, যেখানে আত্মা দেহ থেকে বেরিয়ে অন্য দেহে প্রবেশ করতে পারে। মানে, মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে অন্য শরীরের ভেতর দিয়ে নতুন জীবন শুরু করা সম্ভব। রথীনের বুক কেঁপে উঠল, তার চোখে ঝিলিক পড়ল অদ্ভুত এক লোভের। এতদিন যেটা তার কল্পনায় ছিল, এবার যেন বাস্তব রূপ পেল। সে সন্ন্যাসীকে নানা প্রশ্ন ছুড়ে মারল, কিন্তু সন্ন্যাসী শুধু হেসে বলল, “এ জ্ঞান সবার জন্য নয়, কেবল যাদের নিয়তি ডাকে তারাই এ পথে পা রাখতে পারে।” এই রহস্যময়তা রথীনের মনে এক গভীর আগুন জ্বালিয়ে দিল। সে আর কোনো উত্তর পেল না, কারণ সন্ন্যাসী হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল, যেন কখনো ছিলই না। কিন্তু সেই অল্প কয়েকটি বাক্য রথীনের জীবনের গতিপথ পাল্টে দিল।
সেদিনের পর থেকে রথীনের মনে কেবল একটিই চিন্তা দানা বাঁধতে লাগল—কীভাবে সে “দেহত্যাগ”-এর গোপন সাধনা আয়ত্ত করতে পারে। সে জানত, টাকা দিয়ে সে অনেক কিছু কিনতে পারে, মানুষ কিনতে পারে, ক্ষমতা কিনতে পারে, এমনকি জ্ঞানকেও কিনে নিতে পারে। তার অহংকার তাকে বিশ্বাস করাল, যদি এ সাধনা পৃথিবীতে সত্যিই থেকে থাকে, তবে তিনিই হবেন প্রথম ধনকুবের যিনি অমরত্ব অর্জন করবেন। রাতের পর রাত সে প্রাসাদের নির্জন লাইব্রেরিতে বসে প্রাচীন তন্ত্রগ্রন্থের খোঁজ করতে লাগল, বিশ্বস্ত গুপ্তচরদের পাঠাল হিমালয়ের গভীরে, যেখান থেকে এই জ্ঞানের উৎস নাকি শুরু হয়েছিল। রথীনের মুখে ক্রমশ বাড়তে লাগল এক অদ্ভুত উন্মাদনার ছাপ, তার চোখে যেন ঘুম আর শান্তি হারিয়ে গেল। ব্যবসা, পরিবার, রাজনীতি—সবকিছু থেকে দূরে সরে গিয়ে সে কেবল এই রহস্যের পেছনে দৌড়াতে লাগল। তার ভেতরের ভয় এখন রূপ নিল এক ভয়ংকর লোভে, যা আর থামানো সম্ভব নয়। কলকাতার অট্টালিকার ভেতরে বসে সে ঠিক করল—অন্যরা যাই ভাবুক, সে মৃত্যু জয়ের পথ খুঁজে বের করবেই। আর সেই পথে প্রথম আলো জ্বালিয়ে দিল এক রহস্যময় সন্ন্যাসীর বলা নাম—“দেহত্যাগ।”
–
একটি অন্তর্মুখী মনস্তাত্ত্বিক যাত্রার সূচনা, যেখানে ধনকুবের রথীন মিত্রের চরিত্র আরও গভীরভাবে উন্মোচিত হয়। রথীন জীবনের শেষ দিকে প্রবেশ করলেও তার মানসিক লোভ ও মৃত্যুভয় তাকে শিথিল করতে পারে না; বরং সে আরও তীব্রভাবে অমরত্ব ও দেহত্যাগের সন্ধানে প্রবেশ করে। এই অধ্যায়ে দেখা যায়, রথীন কোনো বাহ্যিক আভিজাত্য বা ভৌগোলিক অন্বেষণের মাধ্যমে নয়, বরং প্রাচীন তন্ত্র-গ্রন্থের পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকা জ্ঞানকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। এই গ্রন্থের প্রতিটি অক্ষরে রয়েছে সতর্কতা ও চরম বিপদের ইঙ্গিত—যেখানে বলা হয়েছে, দেহত্যাগ সম্ভব হলেও শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি সফল হতে পারে যার মানসিক নিয়ন্ত্রণ অপরিসীম এবং যার আত্মা শুদ্ধ। রথীনের মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া দেখানো হয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে, যেখানে তার লোভ, ভয়, এবং কৌতূহল একত্রে ঘূর্ণায়মান। গ্রন্থে প্রতিস্বরূপ সতর্কবার্তা যেমন তাকে ভয় দেখাচ্ছে, তেমনই রথীন তা উপেক্ষা করে নিজের আত্মপ্রমাণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখানে লেখক শুধু একটি কাহিনী বলছেন না, বরং পাঠককে এক দার্শনিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছেন—মানব লোভ এবং মৃত্যুভয়ের মধ্য দিয়ে যে চরম আত্মসংযম অর্জন সম্ভব, তা কি বাস্তবসম্মত, নাকি কেবল কল্পনাপ্রসূত?
রথীনের মনোবিকাশ এই অধ্যায়ে আরও গভীর হয়ে ওঠে। প্রাচীন তন্ত্র-গ্রন্থের প্রতিটি অনুচ্ছেদ তাকে নতুন ভয়, নতুন লোভ, এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে টেনে নিয়ে যায়। সে বুঝতে শুরু করে যে, দেহত্যাগ কোনো সাধারণ সাধনা নয়; এটি একটি চরম মানসিক পরীক্ষা, যেখানে সাধকের সমস্ত কাম, অহংকার এবং ভয়কে পরাস্ত করতে হবে। গ্রন্থে বর্ণিত নিয়মাবলী, মন্ত্র, এবং শাস্ত্রীয় নির্দেশাবলী রথীনের মনে কৌতূহল জাগায়, তবে সেই সঙ্গে ভয়ও তৈরি করে। প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন তাকে তার নিজের সীমারেখার দিকে ঠেলে দেয়—এক দিকে চিরঞ্জীবিত হওয়ার লোভ, অন্য দিকে সম্ভাব্য ধ্বংস ও মৃত্যুর ভয়। রথীন প্রতিটি সূক্ষ্ম বিবরণ অধ্যয়ন করে, কখনও স্বপ্নে, কখনও অচেতন মননে তন্ত্রের জটিল চক্রগুলি পরীক্ষা করে। এটি কেবল একটি পাঠ নয়; এটি তার মানসিক ও আত্মিক দৃঢ়তা যাচাই করার একটি দারুণ কৌশল। তবে তার এই যাত্রায় একটি অন্তর্নিহিত বিপদ রয়েছে—লোভী মন মানুষের জন্য তন্ত্র কখনোই নিরাপদ নয়। এই বিপদকে উপেক্ষা করেই রথীন এগোচ্ছে, যা তার চরিত্রকে আরও জটিল এবং পাঠককে আরও উত্তেজিত করে তোলে।
রথীন শুধু তন্ত্রের আধ্যাত্মিক দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে না, বরং নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছে। সে নিজেকে একাকী, নিঃসঙ্গ, এবং বিশ্বের ব্যস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি অন্তর্মুখী সাধনায় নিযুক্ত। প্রতিটি ধাপ তাকে আত্মসংযম এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। গ্রন্থে বর্ণিত নিয়মাবলী কঠোর—যেখানে শুধু সাধনার নিয়ম মানলেই নয়, নিজের পাপ, লোভ, এবং ভয়কে দমন করতেও হয়। রথীনের একাগ্রতা, আত্মবিশ্বাস, এবং অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের মাধ্যমে একটি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রার চিত্র ফুটে ওঠে। এই অধ্যায়টি পাঠককে শুধু রথীনের লোভ এবং আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছে না, বরং মানুষ কতটা নিজের অন্তর্দৃষ্টি ও স্বচ্ছন্দ মনোসংযমের মাধ্যমে চরম প্রাপ্তির দিকে যেতে পারে তা ভাবতে বাধ্য করছে।
–
রথীন মিত্রের দেহত্যাগ সাধনার পরবর্তী ধাপকে চিত্রিত করে, যেখানে কাহিনী আরও গভীর ও রহস্যময় হয়ে ওঠে। রথীন, দীর্ঘ প্রস্তুতির পর, তার প্রাচীন তন্ত্র-গ্রন্থে উল্লিখিত চরম সাধনার পথের বাস্তবায়ন শুরু করতে চায়। কিন্তু এই পথ একা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে জানতে পারে, এমন কোনো অভিজ্ঞ তান্ত্রিক ছাড়া দেহত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। ঠিক এই মুহূর্তে শহরে প্রবেশ করেন আচার্য ভৈরব—এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব, যার কথা শহরের তান্ত্রিক মহলে শোনা গেছে। ভৈরব নিজেই এমন এক সাধক, যিনি দেহত্যাগের জটিল সাধনায় পারদর্শী, তবে তার আগমনের উদ্দেশ্য মোটেও প্রকাশ্যে আসে না। রথীন, যিনি ইতিমধ্যেই নিজের লোভ ও মৃত্যুভয়কে এক প্রকার স্তিমিত করেছে, ভৈরবের উপস্থিতিকে দেখে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা ও আশঙ্কার মিশ্রণ অনুভব করে। তার মনে একদিকে আশার আলো জ্বলে—কারণ অবশেষে সে একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক পেয়েছে—অন্যদিকে ভীতির ছায়াও উঁকি দেয়, কারণ তান্ত্রিকের প্রকৃত উদ্দেশ্য অজানা। রথীনের চরিত্রের মানসিক জটিলতা এই অধ্যায়ে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে; সে একদিকে তার চরম লোভ ও অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণের তীব্র ইচ্ছা রাখে, অন্যদিকে ভৈরবের উপস্থিতি তাকে সতর্ক করে, যেন কোনো ভুল সিদ্ধান্তের বিপদ তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
রথীন ভৈরবকে প্রলুব্ধ করতে প্রচুর অর্থের প্রস্তাব দেয়। এই প্রলুব্ধি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এতে তার ব্যক্তিগত অহংকার, ক্ষমতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুর চরম আকাঙ্ক্ষাও মিশে আছে। ভৈরব প্রাথমিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। সে জানে, দেহত্যাগের প্রক্রিয়ায় রথীনের মতো লোভী ও শক্তিশালী ব্যক্তিকে পথ দেখানো বিপদজনক হতে পারে। তবুও, তার নিজের গোপন উদ্দেশ্য, যা প্রকাশ্যে আসে না, তাকে শেষমেষ রথীনের প্রস্তাবে রাজি করে তোলে। এই দ্বন্দ্বই অধ্যায়ের কেন্দ্রে থাকে—ভৈরবের দ্বিধা, রথীনের লোভ এবং দুইজনের মধ্যে মানসিক কৌশল ও প্রলুব্ধির খেলা। পাঠক এই পর্যায়ে দেখতে পান কেবল এক সাধারণ অর্থনৈতিক বা ক্ষমতার লেনদেন নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিক ও মানসিক পরীক্ষার এক সূক্ষ্ম দিক। ভৈরব রথীনের প্রতি এক ধরনের রহস্যময়তা এবং শক্তি অনুভব করে, যা তাকে তার নিজের নৈতিক সীমা এবং গোপন অভিপ্রায়ের সঙ্গে খেলে যেতে বাধ্য করে।
রথীন এবং ভৈরবের মধ্যে সম্পর্কটি শুধুমাত্র গোপন অর্থের লেনদেনের সীমায় থাকেনি; এটি একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগে রূপ নেয়। রথীন ভৈরবের উপস্থিতি থেকে প্রেরণা পান, যা তাকে তার চরম সাধনার পথে আরও দৃঢ় করে। অন্যদিকে ভৈরবও রথীনের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা ও তার গভীর লোভকে বোঝার চেষ্টা করে, যা তার নিজের গোপন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়ক। এখানে পাঠক দেখতে পান কেবল সাধনার প্রস্তুতি নয়, বরং দুটি শক্তিশালী মানসিক চরিত্রের মধ্যে একধরনের প্রভাব ও উত্তেজনার খেলা। রথীন তার লোভ ও ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে, আর ভৈরব তার দ্বিধা ও পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এই অধ্যায় কেবল একটি নতুন চরিত্রের আগমনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি, বরং এটি কাহিনীকে আরও গভীর, রহস্যময় ও মানসিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ করেছে।
–
রথীন মিত্রের দেহত্যাগ সাধনার চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিকে পাঠককে নিয়ে যায়, যেখানে আধ্যাত্মিক উত্তেজনা ও রহস্যময়তা একত্রিত হয়ে একটি ভয়ঙ্কর, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী পরিবেশ সৃষ্টি করে। শহরের ভিড় এবং গলফুলের আলো থেকে বিচ্ছিন্ন এক নির্জন অট্টালিকায় সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়। রথীন, দীর্ঘদিনের মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির পর, এখানে একধরনের স্থির, কিন্তু তীব্র উত্তেজিত অবস্থায় পৌঁছে। অট্টালিকার প্রতিটি কোণ যেন তার মানসিক অবস্থা প্রতিফলিত করছে—অন্ধকারের গভীরতা, মোমবাতির নাচানো আলো, রক্তমাখা যজ্ঞকুণ্ডের উষ্ণতা, এবং ভৈরবের মন্ত্রোচ্চারণের প্রতিধ্বনি একত্রে এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে যা পাঠককে স্রেফ রহস্য ও ভয়কে অনুভব করতে বাধ্য করে। প্রতিটি উপাদান—মোমবাতি, যজ্ঞকুণ্ড, মন্ত্র—কেবল পবিত্রতা নয়, বরং একধরনের চাপ সৃষ্টি করছে যা রথীন এবং উপস্থিত সবাইকে তার নিজের সীমারেখার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রথীনের দেহ এবং মন দুটোই এখন চরম প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; যেন একটি চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য তাকে পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এই অধ্যায়ে রথীনের মানসিক অবস্থার সূক্ষ্ম চিত্রায়ণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সে জানে যে দেহত্যাগ কোনো সহজ কাজ নয়, বরং এটি তার লোভ, ভয় এবং নিজের সীমারেখাকে চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া। মোমবাতি জ্বালানো থেকে শুরু করে রক্তমাখা যজ্ঞকুণ্ডে আগুন প্রজ্জ্বলন—প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা তার জন্য মানসিকভাবে একটি ধাপ অতিক্রমের সমান। ভৈরব তান্ত্রিক হিসেবে প্রতিটি ধাপ তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, এবং রথীনকে প্রয়োজনীয় মানসিক শক্তি ও কেন্দ্রীকরণে সহায়তা করছে। মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি ধীরে ধীরে রথীনের মনকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিকতার সীমা মিলেমিশে যায়। অধ্যায়ের মাধ্যমে পাঠক দেখতে পান কেবল একটি আধ্যাত্মিক সাধনার আয়োজন নয়, বরং রথীনের মানসিক উত্তেজনা, ভয়, এবং তীক্ষ্ণ প্রত্যাশা একে একে ফুটে উঠছে। এই প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে রথীন তার মানসিক শক্তি, ধৈর্য এবং আত্নসংযমের সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিচ্ছে, যা তাকে দেহত্যাগের চূড়ান্ত মুহূর্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পুরো অট্টালিকা এক রহস্যময় এবং ভারী পরিবেশে ডুবে আছে। বাতাস যেন নিজেই মন্ত্র ও আগুনের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং শব্দ রথীনের মানসিক চাপকে আরও তীব্র করছে। রক্তমাখা যজ্ঞকুণ্ড, নীরবতার ভাঙা ধ্বনিসহ মন্ত্রোচ্চারণ, এবং মোমবাতির নরম আলো—এই সব মিলিয়ে এমন এক আধ্যাত্মিক এবং অশুভ মেলবন্ধন তৈরি করেছে যা পাঠককে ভীত, উত্তেজিত এবং মানসিকভাবে সজাগ করে রাখে। রথীনের দেহ এবং মন পুরোপুরি প্রস্তুত, যেন এই রাতে তার জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে সীমারেখা লঘুচাপের মতো ঝুলে আছে। এই অধ্যায় শুধু দেহত্যাগের পূর্ব প্রস্তুতি নয়, বরং রথীনের মানসিক, আধ্যাত্মিক এবং আভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের এক গভীর প্রতিফলন।
–
রথীন মিত্রের দেহত্যাগ সাধনার চূড়ান্ত মুহূর্তকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যেখানে পাঠক কেবল রহস্য ও ভয় নয়, বরং আধ্যাত্মিক উত্তেজনা ও মানসিক রূপান্তর অনুভব করে। পূর্ণিমার রাতের অট্টালিকায় মন্ত্রোচ্চারণের তীব্র ধ্বনি রথীনের চারপাশের পরিবেশকে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা ও ভারী উত্তেজনায় পূর্ণ করেছে। অধ্যায়ের শুরুতেই পাঠককে দেখানো হয় রথীনের দেহের প্রতিক্রিয়া—দেহ কেঁপে উঠছে, হৃদযন্ত্র দ্রুত স্পন্দন করছে, এবং তার মানসিক চেতনা এমন এক সীমায় পৌঁছেছে যেখানে বাস্তব এবং অপ্রকৃতির রেখা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রের প্রতিটি উচ্চারণ যেন তার ভিতরে প্রবাহিত শক্তিকে আরও তীব্র করছে, যা তার আত্মাকে তার দেহের সীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করছে। রথীনের জন্য এটি এক চরম মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরীক্ষা; তার লোভ, ভয়, এবং চরম আকাঙ্ক্ষা এক সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। হঠাৎ একটি মুহূর্ত আসে, যেখানে রথীন অনুভব করে যে তার দেহ হালকা হয়ে গেছে, যেন বাতাসে ভেসে যাচ্ছে। এই অনুভূতি তার জন্য এক অদ্ভুত মিশ্রণ—ভয়, বিস্ময় এবং এক ধরনের মুক্তির অনুপ্রেরণা।
এই অধ্যায়ে রথীনের মানসিক জগৎ এবং অভ্যন্তরীণ চেতনার সূক্ষ্ম বিবরণ পাঠককে আধ্যাত্মিক যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করে। রথীন অনুভব করে, তার দেহ শারীরিকভাবে মাটিতে পড়ে আছে, কিন্তু তার চেতনা অন্য এক স্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। আয়নার সামনে নিজের মৃত দেহ দেখতে পেয়ে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি ও বিস্ময় তৈরি হয়। এই মুহূর্তে পাঠক বুঝতে পারে যে, রথীন বাস্তব এবং অমরত্বের মধ্যবর্তী এক সূক্ষ্ম সীমায় পৌঁছেছে। তার দেহ ও আত্মার মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল, তা ভেঙে গেছে, এবং আত্মা নতুন মাত্রায় ভেসে বেড়াচ্ছে। রথীন নিজেকে একটি পর্যবেক্ষক হিসেবে দেখতে পায়, যেখানে সে নিজের দেহ, অভ্যন্তরীণ লোভ, এবং মৃত্যুর প্রক্রিয়াকে একই সঙ্গে উপলব্ধি করছে। এটি কেবল শারীরিক বিচ্ছেদ নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক রূপান্তর, যা রথীনের মানসিক ও চেতনাকে চরমভাবে পরিমার্জিত করছে।
রথীনের আত্মা তার দেহ ছেড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে, আকাশের দিকে অদৃশ্যভাবে উড়তে চায়, এবং পূর্ণিমার আলো তাকে এক অদ্ভুত শান্তি এবং মুক্তির অনুভূতি দিচ্ছে। এই স্তরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রথীনের মানসিক উত্তেজনা এবং ভয় ধীরে ধীরে স্থির হয়ে আসে। সে উপলব্ধি করে যে, লোভ ও মৃত্যুভয়কে পরাজিত করার মাধ্যমে সে আধ্যাত্মিক মুক্তির এক নতুন মাত্রায় প্রবেশ করেছে। আয়নার সামনে পড়ে থাকা মৃত দেহ এবং ভেসে বেড়ানো আত্মার মিলন এক অদ্ভুত দ্বৈত দৃশ্য তৈরি করেছে, যা পাঠককে মানব মন, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং মৃত্যুর সীমারেখার মধ্যে প্রবেশ করাতে বাধ্য করে। “আত্মার বিচ্ছেদ” অধ্যায়টি কেবল রথীনের দেহত্যাগের চূড়ান্ত মুহূর্ত নয়, বরং আধ্যাত্মিক উত্তেজনা, মানসিক রূপান্তর, এবং মৃত্যুর প্রক্রিয়াকে দার্শনিকভাবে অনুভব করার এক বিস্তৃত চিত্র। রথীন সেই সীমা অতিক্রম করেছে যেখানে জীবন ও মৃত্যু, লোভ ও শুদ্ধি, বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিকতা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে এক অনন্য যাত্রার সৃষ্টি করেছে।
–
রথীন মিত্রের দেহত্যাগ সাধনার পরবর্তী এবং সবচেয়ে জটিল অধ্যায়, যেখানে তার আধ্যাত্মিক যাত্রা শুধু মৃত্যুর সীমা অতিক্রম করছে না, বরং নতুন দেহে প্রবেশের চরম পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। পূর্ণিমার রাতের দেহত্যাগের পর আত্মা তার চেতনাকে এক নতুন দিশায় নির্দেশিত করতে চায়, যেখানে সে নিজেকে এক তরুণ, শক্তিশালী এবং সুস্থ দেহে স্থানান্তর করতে পারে। রথীন এই সম্ভাবনা এবং আকাঙ্ক্ষার প্রতি গভীরভাবে আবদ্ধ, কারণ তার লোভ এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা এখন শুধু মানসিক মুক্তি নয়, বরং শারীরিক অনন্ততায় রূপান্তরিত হতে চায়। এই অধ্যায়ে পাঠক প্রথমবার দেখতে পান কেবল আত্মার মুক্তি নয়, বরং একটি চরম আধ্যাত্মিক এবং মানসিক লড়াই শুরু হচ্ছে। শহরের বাইরে বন্দি রাখা যুবকটির দেহের ওপর সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে—শরীরটি সুস্থ এবং শক্তিশালী, যাতে রথীনের আধ্যাত্মিক শক্তি সহজে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু প্রথম মুহূর্তেই রথীনের আত্মা অদ্ভুত প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। অনুভূতি একরকম বিভ্রান্তিকর: মনে হয়, ওই দেহে ইতিমধ্যেই একটি অন্য শক্তি উপস্থিত, যা প্রবেশের চেষ্টা বাধাগ্রস্ত করছে।
এই অধ্যায়ে রথীনের মানসিক উত্তেজনা এবং ভয়ের সূক্ষ্ম বিবরণ পাঠককে গভীরভাবে সংযুক্ত করে। রথীন জানে যে, যদি সে ওই যুবকের দেহে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার চরম সাধনার পরিশ্রম বৃথা যাবে। আত্মার প্রবাহ এবং দেহের প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। মনে হয়, যুবকের শরীর শুধু শারীরিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও মানসিকভাবেও শক্তিশালী—একটি ইতিমধ্যেই প্রভাবশালী চেতনাকে ধারণ করছে। রথীন এই পরিস্থিতিতে তার অভ্যন্তরীণ লোভ, অহংকার এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছে। প্রতিটি মুহূর্তে তার মন এবং আত্মা দুই একরকম চাপের মধ্যে দোলায়মান—এক দিকে নতুন দেহে প্রবেশের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্য দিকে অদ্ভুত প্রতিরোধের তীব্র অভিজ্ঞতা। এই দ্বন্দ্ব শুধু রথীনের শক্তি পরীক্ষা করছে না, বরং পাঠককে আধ্যাত্মিক ও মানসিক সংঘাতের জটিলতা অনুভব করাচ্ছে।
রথীন প্রতিরোধকে কাটিয়ে উঠতে নানা কৌশল প্রয়োগ করছে—মন্ত্রোচ্চারণ, ধ্যান, মানসিক কেন্দ্রীকরণ এবং শক্তির সুষম ব্যবহার। কিন্তু প্রতিটি প্রচেষ্টা যেন তাকে আরও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। সে অনুভব করছে, শুধুমাত্র নিজের আধ্যাত্মিক শক্তি যথেষ্ট নয়; যুবকের দেহের মধ্যে যে অন্য শক্তি বিরাজ করছে, তা তাকে সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে। এটি কেবল দেহে প্রবেশের সমস্যা নয়, বরং রথীনের মানসিক লোভ, ভয় এবং চরম আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার সাথে একটি সংঘর্ষ। এই অধ্যায়টি পাঠককে আধ্যাত্মিক উত্তেজনা, দেহ ও আত্মার জটিল সম্পর্ক, এবং চরম লোভ ও শুদ্ধতার মধ্যকার সূক্ষ্ম দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়।
–
রথীন মিত্রের জন্য এক ভয়ঙ্কর মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংকটকে চিহ্নিত করে, যেখানে তার চরম লোভ, অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা এবং আধ্যাত্মিক দেহত্যাগের পরিণতি একত্রিত হয়ে নতুন মাত্রা লাভ করে। অধ্যায়ের শুরুতেই ভৈরব, রহস্যময় এবং পরিপক্ব তান্ত্রিক হিসেবে, রথীনের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এবং তত্ত্ব প্রদর্শন করে। সে হেসে বলতে থাকে যে, দেহত্যাগের প্রকৃত নিয়ম কেউ লোভের দ্বারা ভেঙে দিতে পারে না। রথীনের লক্ষ্য ছিল নতুন তরুণ দেহে প্রবেশ করে শারীরিক অমরত্ব লাভ করা, কিন্তু ভৈরব জানিয়ে দেয় যে, এমন চক্রান্তে আত্মা ফাঁদে আটকে পড়ে, যা একধরনের আধ্যাত্মিক বাঁধন। এই মুহূর্তে রথীনের মানসিক জগৎ অস্থির হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে যে, তার প্রচেষ্টা শুধু ব্যর্থ হয়নি, বরং এর ফলে সে এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে বন্দি হয়ে পড়েছে যেখানে লোভ এবং আকাঙ্ক্ষা তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু মুক্তি বা পূর্বাবস্থায় ফেরার কোনো পথ নেই। এই অধ্যায়টি পাঠককে কেবল আধ্যাত্মিক উত্তেজনা নয়, বরং মানসিক দ্বন্দ্ব, অপরাধবোধ এবং নীরব হতাশার সঙ্গে পরিচয় করায়।
রথীনের মানসিক এবং আত্মিক অবস্থার বর্ণনা অধ্যায়ে গভীরভাবে ফুটে ওঠে। সে অনুভব করে, তার লোভ এবং শারীরিক অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তাকে একটি অদৃশ্য ফাঁদে আবদ্ধ করেছে। প্রতিটি মুহূর্তে সে নিজের সিদ্ধান্ত ও ক্রিয়ার ফলের সঙ্গে মুখোমুখি হচ্ছে। ভৈরবের ব্যঙ্গাত্মক হাসি এবং সতর্কবার্তা রথীনের মানসিক উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে। মনে হচ্ছে, রথীন নিজেকে এবং তার পরিচিত বাস্তবতাকে হারিয়ে ফেলেছে—না সে পুরোপুরি জীবিত, না সে তার চাওয়া শারীরিক অমরত্ব অর্জন করতে সক্ষম। এই দ্বন্দ্ব শুধু আধ্যাত্মিক নয়, বরং রথীনের মানসিক ও নৈতিক চেতনার প্রতিফলন। সে তার অতীত লোভ, অহংকার এবং মৃত্যুভয়ের সঙ্গে লড়াই করছে, এবং উপলব্ধি করছে যে, আধ্যাত্মিক ক্ষমতা এবং দেহত্যাগের পথ শুধুমাত্র শুদ্ধ মন এবং আত্মবিশ্বাসী চেতনাধারীর জন্য খোলা। এই অধ্যায়ে পাঠক রথীনের ব্যর্থতার মর্ম এবং লোভের চূড়ান্ত পরিণতি অনুভব করতে পারে।
অধ্যায়ের শেষাংশে দেখা যায়, রথীন তার পুরোনো শরীরে ফিরে যেতে না পারার সত্যটি উপলব্ধি করছে। এই উপলব্ধি তার জন্য এক ধরণের মানসিক বিপর্যয়—সে বুঝতে পারছে, তার লোভ এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তাকে এমন এক স্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে মুক্তি এবং পুনঃপ্রবেশের পথ বন্ধ। ভৈরবের উপস্থিতি এবং তার জ্ঞানের প্রভাব রথীনের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা তাকে তার ভুলের গুরুতরতা উপলব্ধি করাচ্ছে। আত্মা একদিকে স্বচ্ছ, হালকা এবং মুক্ত, অন্যদিকে দেহ এবং লোভের ফাঁদে বন্দি—এই দ্বৈত বাস্তবতা রথীনের মানসিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রাকে গভীরভাবে জটিল করে তুলছে।
–
রথীন মিত্রের আধ্যাত্মিক যাত্রার পরবর্তী ধাপকে কেন্দ্র করে, যেখানে তার আত্মা এখন নিখুঁতভাবে দেহহীন হয়ে গেছে, কিন্তু সেই মুক্তি এক রকম ভয়ংকর শাপে রূপান্তরিত হয়েছে। পূর্ণিমার রাতের দেহত্যাগ এবং ভৈরবের সতর্কবার্তার পর, রথীনের আত্মা তার শারীরিক দেহ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে ছায়ার মতো ভেসে বেড়ায়। এই অধ্যায়ে পাঠককে প্রথমবার দেখানো হয় রথীনের দেহহীন অবস্থার মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব। সে তার চারপাশকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে—সবকিছু ভেসে ওঠা, স্থিরতার পরিবর্তে অচল এবং অদৃশ্যতার ছোঁয়া যেন প্রতিটি পদক্ষেপকে এক অদ্ভুত জটিলতায় আবদ্ধ করছে। তার নিথর দেহ এখন শহরের এক নির্জন কক্ষে পড়ে আছে, আর ব্যবসায়-সম্পদ এবং ভোগের উত্তরাধিকারীরা তা কুক্ষিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যস্ত। রথীনের চোখে, এই দৃশ্য এক ধরনের তীব্র ফাঁকি এবং ক্ষতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছে, যা তার লোভ, অহংকার এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষাকে আরও জটিল করে তোলে।
রথীনের দেহহীন অবস্থা কেবল শারীরিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সামাজিক এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলনও। সে চেষ্টা করে অন্য কোনো দেহে প্রবেশ করতে, কিন্তু প্রতিটি চেষ্টা বিপর্যয়ে শেষ হয়। যে যুবকের দেহে প্রবেশের আগেই ভৈরব সতর্ক করেছে, সেই প্রতিরোধ এখানে আরও দৃঢ় এবং ভয়ংকর রূপে আসে। রথীনের আত্মার প্রতি প্রতিটি দেহ যেন জানে তার উদ্দেশ্য—মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পালাচ্ছে, কেউ তাকে স্বীকার করছে না। তার অস্তিত্ব যে অন্যের চোখে অদৃশ্য এবং ভয়ংকর, তা তাকে মানসিকভাবে একাকী এবং বিচ্ছিন্ন করে। এই অধ্যায়টি পাঠককে রথীনের অভ্যন্তরীণ ভীতির সঙ্গে পরিচয় করায়—একটি শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, যিনি জীবদ্দশায় ধন, ক্ষমতা এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চেয়েছিলেন, এখন তার অস্তিত্ব একটি নীরব শাপে রূপ নিয়েছে। এই শাপের ভেতরে রয়েছে এক ধরনের আধ্যাত্মিক দার্শনিক তীক্ষ্ণতা, যা লোভ, অহংকার এবং মৃত্যুর পরিণতির মধ্যকার জটিল সম্পর্ককে ফুটিয়ে তোলে।
অধ্যায়ের শেষাংশে রথীনের আত্মা ভেসে বেড়াচ্ছে শহরের ভীতিকর নিঃশব্দে, এবং প্রতিটি পদক্ষেপে তার নিজের বিচ্ছিন্নতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে তার নিথর দেহ, ভোগের উত্তরাধিকারী, এবং অন্য মানুষের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বিরূপতা লক্ষ্য করছে, যা তাকে শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে এক একাকী পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আত্মার দেহহীন ভ্রমণ এখন এক অভ্যন্তরীণ যাত্রায় রূপ নিয়েছে, যেখানে রথীনের লোভ এবং অহংকার তার মুক্তি নয়, বরং শাপের অংশ হয়ে উঠেছে। তার অস্তিত্ব এক অদৃশ্য শক্তি হিসেবে ভেসে বেড়াচ্ছে, যা কারো চোখে দৃশ্যমান নয়, কেউ তাকে স্বীকার করছে না, এবং তার আত্মা এখন এক ভয়ঙ্কর একাকীত্বের বন্দী।
–
রথীন মিত্রের আধ্যাত্মিক যাত্রার চরম পরিণতি এবং তার মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিপর্যয়ের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। পূর্ণিমার আলোয় শহরের বাইরে এক নির্জন অট্টালিকায় সব আয়োজন শেষ হওয়ার পর, রথীনের আত্মা তার দেহহীন অবস্থায় ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু সে কোথাও স্থির বা শান্ত নয়। ভৈরব যজ্ঞকুণ্ডের সামনে বসে এক অদ্ভুত শান্তি এবং নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ করছে। তিনি ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলেন, “আত্মা কখনো কেনা যায় না।” এই বাক্যটি রথীনের জন্য এক চরম বাস্তবতা এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রতীক। এখানে পাঠক দেখতে পান যে, রথীনের সমস্ত প্রচেষ্টা, অর্থ, লোভ এবং মৃত্যুভয়ের প্রতি আকাঙ্ক্ষা তাকে মুক্তি দেয়নি, বরং তাকে এমন এক অদ্ভুত স্তরে পৌঁছে দিয়েছে যেখানে আত্মা স্বাধীন নয়, বরং চিরন্তন ফাঁদে বন্দি। রথীনের মানসিক অবস্থা অধ্যায়ের শুরুতেই একটি তীব্র দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রবেশ করে—সে বুঝতে পারে যে, তার চরম লোভ এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তাকে শাশ্বতভাবে ফাঁদে আটকে দিয়েছে।
এই অধ্যায়ে পাঠক রথীনের মানসিক বিভ্রান্তি, ভয় এবং হতাশা গভীরভাবে অনুভব করতে পারে। রথীনের আত্মা যেন এক অচেনা স্তরে আটকে গেছে—না সে জীবিত, না সে মৃত। সে ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তার চারপাশের বাস্তবতা এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ অসম্ভব। মানুষের চোখে সে অদৃশ্য; যেখানে রথীনের স্বাভাবিক লোভ, অহংকার এবং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা তাকে জীবনের স্বাদ দিয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা এখন তার শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তে সে বুঝতে পারছে, আধ্যাত্মিক শক্তি এবং চরম সাধনার ফলপ্রসূতা নির্ভর করে শুদ্ধতা এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণের উপর, যা তার লোভী চরিত্রে কখনোই পুরোপুরি উপস্থিত ছিল না। রথীনের এই চিরন্তন বন্দিত্ব শুধু শারীরিক বা আধ্যাত্মিক নয়; এটি তার লোভ, অহংকার এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষার সরাসরি ফল। ভৈরবের উপস্থিতি এবং তার কথাগুলি একটি দার্শনিক শিক্ষা হয়ে ওঠে—মানব লোভ ও আত্মার স্বাধীনতার মধ্যে যে সীমারেখা, তা অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
অধ্যায়ের শেষাংশে পূর্ণিমার আলো কেবল যজ্ঞকুণ্ডকে নয়, বরং রথীনের চিরন্তন ফাঁদকে আলোকিত করছে। রথীনের আত্মা ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কোথাও শান্তি নেই, কোথাও মুক্তি নেই। সে এক অদ্ভুত স্তরে আটকা পড়ে, যেখানে সময়, স্থান এবং বাস্তবতার সমস্ত সীমা অর্থহীন। এই চিরন্তন বন্দিত্ব তার জন্য এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও মানসিক কারাবাসে পরিণত হয়েছে, যেখানে রথীন কোনোরূপ স্বাধীনতা বা পূর্ণতা অনুভব করতে পারছে না। “চিরন্তন বন্দিত্ব” অধ্যায়টি পাঠককে মানব লোভ, অহংকার, এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষার ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এটি শুধু রথীনের আধ্যাত্মিক পরিণতি নয়, বরং একটি দার্শনিক সতর্কবার্তা—আত্মার স্বাধীনতা কোনো বাহ্যিক জিনিসের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা যায় না; যদি লোভ এবং অহংকার প্রাধান্য পায়, তবে মানুষের চরম আকাঙ্ক্ষা তাকে চিরন্তন ফাঁদে আবদ্ধ করে, জীবিত এবং মৃত—দুই অবস্থার মাঝখানে। এই অধ্যায় রথীনের পুরো যাত্রার চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে আধ্যাত্মিক সত্য, লোভ, এবং মৃত্যুর সীমা একত্রিত হয়ে পাঠককে গভীর ভাবনায় ফেলে।
***




