Bangla - ভূতের গল্প

দেউলতলার মৃতবধূ

Spread the love

সুনন্দা সোম


বীরভূমের দেউলতলা গ্রামটি যেন সময়ের গতির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে ঢেউখেলানো মাঠ, মাটির ঘর, পাখিদের ডাক আর নিরিবিলি দুপুর—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তির আবহাওয়া। কিন্তু এই শান্ত গ্রামটির বুকেই দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন মন্দির, যেন ইতিহাসের এক নিঃশব্দ সাক্ষী। কেউ কেউ বলে মন্দিরটির বয়স চারশো বছরেরও বেশি, আবার কেউ বলে আরও প্রাচীন। দিনের বেলায় এখানে গ্রামের মানুষ আসে পুজো দিতে, গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়, মন্দিরের চাতালে বসে বাচ্চারা খেলা করে। কিন্তু সূর্য ডুবে গেলেই সবকিছু যেন পাল্টে যায়। মন্দিরটিকে ঘিরে এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে, এমন নীরবতা যেন কেউ অদৃশ্য হয়ে সারা পরিবেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গ্রামবাসীরা তখন যতটা সম্ভব দূরে সরে যায়, কেউই সন্ধ্যার পর মন্দিরের দিকে পা বাড়াতে সাহস করে না।

পূর্ণিমার রাত হলে এই নীরবতা ভেঙে যায় অন্য এক ভৌতিক সুরে। গ্রামের অনেকে জানিয়েছেন, সেই রাতে মন্দিরচত্বর থেকে ভেসে আসে অচেনা এক বাঁশির সুর। সুরটি মধুর, আবার কোথাও যেন বিষাদের রং মাখা, এমন এক সুর যা শোনার পর বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে। শুধু বাঁশি নয়, কখনো কখনো মন্দিরের ভেতরে ছায়ার মতো কারও চলাফেরার শব্দ পাওয়া যায়—পায়ের চাপা ধ্বনি, গলার নিচু গুঞ্জন, কিংবা ভিজে কাপড়ের খসখস আওয়াজ। যারা দূর থেকে দেখেছে, তারা বলে, পূর্ণিমার আলোয় মন্দিরের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সাদা শাড়ি পরা এক নারীমূর্তি। কখনো সে কাঁদছে, মুখ ঢেকে অশ্রু মুছছে, কখনো আবার ঠোঁটে এক চাপা হাসি। অদ্ভুতভাবে তার চোখে যেন একই সঙ্গে বেদনা আর রহস্য। গ্রামের ছেলেরা মাঝে মাঝে কৌতূহলবশত গিয়ে দাঁড়িয়েছে দূর থেকে দেখতে, কিন্তু কাছে যেতে সাহস করেনি। তারা বলে, সেই মূর্তি কখনো হাত বাড়িয়ে ডাকছে, যেন কাউকে কাছে টেনে নিতে চাইছে। ভয়ে গা হিম হয়ে আসে, অথচ সেই রহস্যময় ডাকের টান এড়ানোও যায় না।

গ্রামের প্রবীণরা বলেন, এই মন্দির শুধু পূজার জায়গা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসমাপ্ত এক বিয়ের কাহিনি। বহু পুরোনো কাহিনি, যা এখনও গ্রামবাসীদের মধ্যে ফিসফিস করে ঘোরে। বৃদ্ধরা যখন রাতের আড্ডায় হুঁকো টানেন, তখন অনেকে বলে ওঠেন, “সে বধূর চোখের জল এখনও শুকোয়নি।” আবার কেউ বলে, “পূর্ণিমার রাতেই ওর কান্না শোনা যায়।” এইসব গল্প শিশুদের ভয়ে তটস্থ করে তোলে, আর যুবকেরা মনে করে, হয়তো এ শুধু কুসংস্কার। কিন্তু রাত নামলেই, বিশেষ করে পূর্ণিমার আলোয় ভেসে আসা সেই বাঁশির সুর শোনামাত্রই বুক কেঁপে ওঠে, আর মন্দিরকে এড়িয়ে যেতে মন চায়। অদ্ভুত বিষয় হলো, মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে কেউ সাহস করে না, অথচ দূরে বসে তার দিকে তাকাতে থেকে যায় সবার কৌতূহল। মন্দির যেন নিজেই নিজের মধ্যে এক রহস্য লুকিয়ে রেখেছে—একটি অশান্ত আত্মা, একটি অসমাপ্ত কাহিনি, আর এক অনন্ত নীরবতা, যা গ্রামের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবেই দেউলতলার মন্দির রাতের পর রাত গ্রাস করে আছে ভয়, বিস্ময় আর অজানার ছায়া।

***

দেউলতলার গ্রামে পূর্ণিমার রাত মানেই এক অদ্ভুত আতঙ্ক আর কৌতূহলের মিশেল। গ্রামের প্রবীণরা বারবার সাবধান করে দিলেও, তরুণদের মনে ভয় যতটা, কৌতূহল তার থেকেও বেশি। বিশেষ করে সেই রাতগুলোতে, যখন চাঁদ সাদা আলোয় মন্দিরচত্বর ভরিয়ে তোলে আর দূর থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসে। সেইরকম এক পূর্ণিমার রাতে গ্রামের চারজন যুবক—শুভাশিস, রণজিত, সজল আর অভীক—নিশ্চয়তা পেল যে আজ তারা চোখে না দেখলে শান্তি পাবে না। তারা নিঃশব্দে মন্দিরের দিকে এগোল, মাটির পথ বেয়ে ঝোপঝাড় পেরিয়ে যখন তারা মন্দিরের সিঁড়ি থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়াল, তখনই হঠাৎ বুক কেঁপে উঠল। সেখানে, অদ্ভুত স্বচ্ছ আলোয়, সাদা শাড়ি পরা এক নববধূ বসে আছে। সে সিঁড়ির এক কোণে মাথা নিচু করে অশ্রু মুছছে, তার কাঁধ কাঁপছে, যেন এক গভীর শোকে ভেঙে পড়েছে। কয়েক মুহূর্ত তারা দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকল, কানে শুধু শোনা গেল সেই মৃদু কান্নার শব্দ, যা রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছিল।

কিন্তু হঠাৎই দৃশ্য পাল্টে গেল। নববধূটি ধীরে ধীরে মুখ তুলল, তার ঠোঁটে ফুটল এক অদ্ভুত হাসি। সেই হাসি ছিল না সম্পূর্ণ আনন্দের, না সম্পূর্ণ দুঃখের—বরং দুইয়ের মাঝামাঝি এক বিভীষিকাময় অভিব্যক্তি, যা দেখে চারজনের গা শিউরে উঠল। নববধূটি দাঁড়িয়ে পড়ল, সাদা শাড়ি বাতাসে হালকা উড়ল, আর সে হাত বাড়িয়ে যেন কাউকে ডাকতে লাগল। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, ভিজে গাল দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু চাঁদের আলোয় চকচক করছিল। যুবকেরা যেন পাথর হয়ে গেল, পা নড়ল না, অথচ বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন এত জোরে বাজছিল যে নিজেরাই শুনতে পাচ্ছিল। একসময় শুভাশিস হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, “ও ডাকছে… আমাদের ডাকছে…” বাকিরা আতঙ্কে কেঁপে উঠল, অভীক পেছন দিকে টান দিল, রণjit বিড়বিড় করে বলল, “চলো পালাই… এ তো মানুষ নয়।” কিন্তু তাদের পা যেন আটকে গেল—ভয় আর অদ্ভুত এক টানের টানাপোড়েন তাদের ভিতরে তোলপাড় করতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত সাহস ভাঙল সজলের। সে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “ভাগো!” চারজন একসঙ্গে ছুটে পালাল আঁকাবাঁকা পথ ধরে। পিছনে তাকাবার সাহস কারও ছিল না, তবে প্রত্যেকেই অনুভব করছিল যে সেই বধূর চোখ তাদের দিকে নিবদ্ধ, সেই হাত এখনো বাড়ানো, সেই কান্নাভেজা হাসি তাদের কানে বাজছে। গ্রামে ফিরে আসার পরও তারা কাঁপছিল, ঘামে ভিজে উঠেছিল শরীর। অনেক রাত অবধি তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল—কে ছিল সে? কেন সাদা শাড়ি পরে মন্দিরের সিঁড়িতে বসেছিল? সে কি সত্যিই মৃত বধূ, যার অসমাপ্ত বিয়ের গল্প প্রবীণরা বলে এসেছে যুগের পর যুগ? নাকি অন্য কোনো অলৌকিক শক্তির খেলা? ভয় তাদের গ্রাস করেছিল, কিন্তু সেই সঙ্গে মনে হচ্ছিল, এক অদ্ভুত প্রশ্ন তাদের অস্থির করে তুলেছে—সে কেন ডাকছিল? আর যদি সত্যিই ডাকের জবাব দেওয়া যেত, তাহলে কি ঘটত? এ প্রশ্নের উত্তর তাদের কেউ দিতে পারল না, শুধু এতটুকু বুঝল—দেউলতলার মন্দির আর তার সাদা শাড়ির বধূর রহস্য এভাবে চুপ করে যাবে না।

***

দেউলতলার গ্রামে যখনই নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়, তখন থেকেই তারা প্রবীণদের মুখে শোনে এক চিরকালীন করুণ কাহিনি—জমিদারের কন্যার অসমাপ্ত বিয়ে। বলা হয়, প্রায় একশো বছর আগে জমিদার মহাশয়ের ঘরে জন্মেছিলেন এক কন্যা, নাম তার চন্দ্রপ্রভা। সৌন্দর্য, রূপ, শিক্ষায় সে সমগ্র গ্রামেই অদ্বিতীয়া ছিল। তার হাসি যেন দীপ্ত সূর্যের মতো চারদিক আলোকিত করত, আর তার চোখে সবসময় ফুটে থাকত এক অদ্ভুত স্বপ্নালু দৃষ্টি। জমিদার পরিবারের কন্যা হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তাকে নিয়ে গ্রামে নানা গুজব রটত—কেউ বলত, সে দেবী লক্ষ্মীরই অবতার, কেউ আবার ঈর্ষায় তাকে অপয়া বলত। যাই হোক, বয়স যখন ষোলো পেরোল, তখনই তার বিয়ের প্রস্তাব আসে পাশের রাজপরিবার থেকে। বরের বংশগৌরব, সম্পদ ও যশ-খ্যাতি সবই জমিদারকে সন্তুষ্ট করে, আর তিনি ধুমধাম করে কন্যার বিয়ের আয়োজন শুরু করেন।

সেদিনের সেই আয়োজন আজও প্রবীণদের স্মৃতিতে অম্লান। আলোকসজ্জায় গোটা দেউলতলা আলোকিত হয়েছিল, যেন গ্রামটি মেলা প্রাঙ্গণে পরিণত হয়েছিল। রঙিন আলোয় সেজে উঠেছিল মন্দিরচত্বর, সানাই বেজে উঠেছিল, আর পিঁড়ি বসেছিল সোনালি আলপনার ওপর। গ্রামবাসীরা কেউ অতিথি সেবায় ব্যস্ত, কেউবা আনন্দে গান গাইছিল। চন্দ্রপ্রভা লাল বেনারসি শাড়ি পরে বসেছিল ঘরের ভেতর, তার চোখে লজ্জা আর আশার মিশেল, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি। চারদিকে আনন্দের ঢেউ, কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ততই এক অদ্ভুত শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল। বরপক্ষের পালকী যে সময় আসার কথা ছিল, সেই সময় পেরিয়ে গেল, ঘন্টা দু’ঘন্টা কেটে গেল, তবু তাদের দেখা মিলল না। উদ্বেগ ধীরে ধীরে আতঙ্কে পরিণত হলো—কেউ কোনো খবর নিয়ে ফিরল না। রাত বাড়তে লাগল, অতিথিরা গুঞ্জন করতে শুরু করল, আর চন্দ্রপ্রভার চোখে ভয়ের ছায়া গাঢ় হয়ে উঠল। অবশেষে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হলো সত্য—বরপক্ষ আসছে না।

চন্দ্রপ্রভার জীবনে সেই মুহূর্ত যেন মৃত্যুর থেকেও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। জমিদারের সম্মান ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল, গ্রামবাসীরাও হতবাক হয়ে গেল। কিন্তু সবচেয়ে ভীষণ আঘাত খেল চন্দ্রপ্রভা নিজে। সে ভেবেছিল আজ থেকে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হবে, কিন্তু হঠাৎ করেই সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে পড়ল। তার চোখে জল থামছিল না, আর সেই অপমান, সেই দুঃখ তাকে মুহূর্তে ভেঙে দিল। প্রবীণরা বলেন, সে সেদিন ভোরেই মন্দিরে গিয়ে আত্মহত্যা করে—কেউ বলে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে, কেউ বলে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে, আবার কেউ বলে মন্দিরের শিবলিঙ্গের সামনে বিষপান করে। যেভাবেই হোক, চন্দ্রপ্রভার মৃত্যু গ্রামজুড়ে এক ভয়াবহ শোকের আবহ সৃষ্টি করল। কিন্তু সেই মৃত্যুই যেন তাকে চিরস্থায়ী করে তুলল। তারপর থেকেই পূর্ণিমার রাতে মন্দিরচত্বর ভরে ওঠে বাঁশির সুরে, কান্না-হাসির মিশ্র শব্দে। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করে, চন্দ্রপ্রভার আত্মা আজও ঘুরে বেড়ায়—সে বধূর সাজে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে, হয়তো অপেক্ষা করে সেই বরের জন্য, যে কোনোদিন আর আসেনি। আর তাই তাকে বলা হয় “দেউলতলার মৃতবধূ”—এক অসমাপ্ত বিয়ের কাহিনির অনন্ত প্রতিধ্বনি।

***

কলকাতার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গবেষক অনিন্দ্য চৌধুরী লোকগাথা ও প্রাচীন দলিল নিয়ে পড়াশোনা করছিল। লোককথার ভেতর লুকিয়ে থাকা সামাজিক বাস্তবতা আর ঐতিহাসিক সত্য উদঘাটন ছিল তার নেশা। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে খুঁজতে খুঁজতে সে পেয়ে যায় বীরভূম জেলার দেউলতলা গ্রামের নাম। সেখানে লেখা ছিল—“দেউলতলার মন্দিরচত্বরে পূর্ণিমার রাতে এক মৃতবধূর আত্মা দেখা যায়।” প্রথমে বিষয়টিকে নিছক গুজব ভেবেছিল অনিন্দ্য, কিন্তু পরে গ্রামের প্রবীণদের সাক্ষাৎকার এবং কিছু পুরনো সংবাদপত্রের কাটিং তার হাতে এলে কৌতূহল জাগে। সে বুঝতে পারে, এ কোনো সাধারণ লোকগাথা নয়, বরং এর পেছনে এক সত্য ঘটনা লুকিয়ে আছে, যা সময়ের পরতে চাপা পড়ে গেছে। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে সেই অজানা রহস্য তাকে টেনে নিয়ে যায়, আর অবশেষে এক শরৎ সন্ধ্যায় সে সিদ্ধান্ত নেয় দেউলতলায় যাত্রা করার। কলকাতার ভিড়-ভাট্টা, কোলাহল, ব্যস্ততার পর যখন সে ট্রেন থেকে নেমে গ্রামের পথে হাঁটতে থাকে, তখন তার মনে হয় যেন সে অন্য এক জগতে প্রবেশ করছে—যেখানে সময় থেমে আছে, আর প্রতিটি গাছে, প্রতিটি মাটির ঘরে ইতিহাসের ছাপ লুকিয়ে আছে।

দেউলতলায় পৌঁছে অনিন্দ্য প্রথমেই মন্দিরটি দেখতে যায়। প্রাচীন ইটের গাঁথুনি, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল, ফাটা সিঁড়ি আর ভেতরে অর্ধেক ভাঙা প্রতিমা দেখে তার মনে হয় যেন ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দিনের আলোয় মন্দিরটিকে নিরীহ মনে হলেও, ভেতরে পা রাখতেই তার শরীরে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে সে জানতে পারে মৃতবধূর গল্প—কেউ বলে চন্দ্রপ্রভা নিজের অপমানে আত্মহত্যা করেছিল, কেউ বলে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। অনিন্দ্য একে একে খুঁজে বের করে গ্রাম্য দলিল, পুরনো চিঠিপত্র আর জমিদার পরিবারের নথি। তাতে আংশিক প্রমাণ মিললেও রহস্যের পুরো উত্তর মেলে না। দিন কাটতে থাকে তার অনুসন্ধানে—কখনো প্রবীণ বৃদ্ধের আড্ডায় বসে শোনা গল্প, কখনো গ্রামের স্কুলশিক্ষকের কাছে পাওয়া কাগজের টুকরো। প্রতিটি তথ্য যেন ইতিহাসের অন্ধকারে একটি ছোট্ট প্রদীপ জ্বালায়, কিন্তু একই সঙ্গে অচেনা ভয়ও জন্ম দেয়। কারণ গ্রামবাসীরা স্পষ্ট সতর্ক করে দেয়—“পূর্ণিমার রাতে মন্দিরে যেও না। ও বধূ এখনও ডাক দেয়।” অনিন্দ্য এসব কুসংস্কার ভেবে হেসে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত কৌতূহল জমতে থাকে।

অবশেষে আসে সেই পূর্ণিমার রাত। আকাশে ঝলমল করছে সাদা চাঁদ, গ্রাম নিস্তব্ধ, কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। অনিন্দ্য একা মন্দিরের সিঁড়িতে বসে ডায়েরিতে নোট লিখছিল। হঠাৎ চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠল, বাঁশির সুর ভেসে এলো কানে, আর তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। দূরে গ্রামের কেউ নেই, কেবল সে আর প্রাচীন মন্দির। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল—সিঁড়ির অন্য প্রান্তে সাদা শাড়ি পরা এক নববধূ বসে আছে, মাথা নিচু, অশ্রু ঝরছে গাল বেয়ে। অনিন্দ্যের বুক ধড়ফড় করতে লাগল, কিন্তু সে ভয়ে পালাল না। বরং চোখ মেলল, নোটবই শক্ত করে ধরল, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—আজ রাতে সে সত্যিকারের ইতিহাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। মৃতবধূর গল্প কি নিছক লোকগাথা, নাকি চন্দ্রপ্রভার অসমাপ্ত বিয়ের করুণ প্রতিধ্বনি? তার উত্তর হয়তো এই পূর্ণিমার রাতেই মেলে যাবে।

***

মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা যেন দেউলতলার মন্দিরের চারপাশকে আরও অচেনা করে তুলেছিল। বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা ভেসে বেড়াচ্ছিল, যেন অদৃশ্য কারও নিঃশ্বাসে চারদিক ঘিরে আছে। হঠাৎ করেই মন্দিরের ভেতর থেকে শোনা গেল ঘণ্টাধ্বনি—একটা নয়, বারবার টুং টাং শব্দে প্রতিধ্বনিত হলো চারিদিক। অনিন্দ্য চমকে উঠে তাকাল। মন্দিরে তো সে একাই, তাহলে এই শব্দের উৎস কোথায়? চোখ মেলে তাকিয়ে সে দেখল, মন্দিরের দরজার সামনে ধোঁয়ার মতো কুয়াশার ভেতর থেকে আস্তে আস্তে এক মূর্তি গড়ে উঠছে। সাদা শাড়ি পরা এক বধূ, হাতে শাখা, মাথায় সিঁদুরের আভা, কিন্তু চোখে জল আর ঠোঁটে এক অদ্ভুত হেসে ওঠার ভঙ্গি। অনিন্দ্যের বুকের ভেতরটা ধপাধপ করতে লাগল, তার শরীর হিম হয়ে এলো। ভয়ে সে এক পা পিছিয়ে গেলেও চোখ সরাতে পারল না। মেয়েটি যেন শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন শত বছরের আক্ষেপ তার চোখে জমে আছে।

মুহূর্তের ভেতরেই সেই বধূর ঠোঁট নড়ল, আর কানে এল ভেজা সুরে উচ্চারিত শব্দ—“আমাকে ফিরিয়ে দাও… আমার বিয়ে সম্পূর্ণ হয়নি…”। অনিন্দ্যের রক্ত হিম হয়ে গেলেও কণ্ঠস্বরের করুণ আবেদন তাকে বিচলিত করে দিল। সে বুঝতে পারল, এ কেবল ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং গভীর বেদনার বহিঃপ্রকাশ। মেয়ে যেন কোনও বন্ধন, কোনও অসমাপ্ত শপথ থেকে মুক্তি চাইছে। ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে অনিন্দ্য কিছু বলতে পারছিল না, কেবল তাকিয়ে রইল। বধূর দৃষ্টি এতটাই গভীর, এতটাই আকুল যে, তাতে অদ্ভুতভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ল সে। মনে হলো, যদি এই মুহূর্তে সে কিছু না করে, তবে সেই চোখের জল চিরকাল তার ভেতরে দগদগে ক্ষতের মতো থেকে যাবে। অথচ, তার হৃদয় বলছে—এ এক অলৌকিক ঘটনা, যার ব্যাখ্যা তার বিদ্যাচর্চার বাইরে।

অনিন্দ্য ধীরে ধীরে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল। সে ভাবল, এতদিন গ্রামবাসীদের মুখে যে বধূর কাহিনি শুনেছে, তা হয়তো নিছক লোকগাথা নয়। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, এই আত্মা সত্যিই মুক্তি চাইছে। বধূর হাত সামান্য এগিয়ে এল তার দিকে, যেন অনিন্দ্যের কাছেই চূড়ান্ত আশ্রয় খুঁজছে। অনিন্দ্যের ভেতর আতঙ্ক ও কৌতূহলের দ্বন্দ্বে যুদ্ধ শুরু হলো। সে জানে, ভয় পেয়ে পালালে সত্য আর জানা যাবে না, আবার স্পর্শ করলে অজানা বিপদের সম্ভাবনাও কম নয়। তবুও বধূর অসহায় আর্তির টানে তার বুকের ভেতর কাঁপতে কাঁপতে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা জন্ম নিল। হয়তো এই অসমাপ্ত বিয়ের রহস্যই তাকে এতদূর টেনে এনেছে। মন্দিরের ভেতরে চারপাশে অদৃশ্য শক্তি যেন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছিল, আর অনিন্দ্য বুঝতে পারছিল—এই রাতই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

***

ভোরবেলার নরম আলোয় দেউলতলার মন্দির চত্বর যেন অন্য রকম লাগছিল অনিন্দ্যের কাছে। রাতের বিভীষিকা, ঘণ্টাধ্বনি আর সাদা শাড়ি পরা বধূর চোখের জল এখনও তার মনে ঝড় তুলছিল। সে নিজের নোটবুক খুলে কিছু লিখছিল, এমন সময় গ্রামের পুরোহিত অচিন্ত্যমণি ঝাড়বাতি হাতে মন্দিরে এলেন। বয়স হয়েছে, চুল-দাড়ি সব সাদা, কিন্তু চোখে অদ্ভুত জ্যোতি। তিনি অনিন্দ্যের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “তুমি যা দেখেছ, তা এই গ্রামে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভিশাপের ছায়া।” অনিন্দ্য বিস্ময়ে চুপ করে গেল। পুরোহিত বসে ধীরে ধীরে বললেন, বহু বছর আগে জমিদারের কন্যার বিয়ে স্থির হয়েছিল, কিন্তু বরপক্ষ আর আসেনি। সবাই ভেবেছিল অপমান সইতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু সত্যি তার থেকেও ভয়ংকর। মেয়েটিকে প্রতারণা করা হয়েছিল—বরপক্ষ অর্থের লোভে অন্যত্র বিয়ে করে। সেই বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে না পেরে কন্যাটি নিজের কক্ষেই প্রাণ দেয়। তার মৃত্যু ছিল আত্মহত্যা নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতার শিকার এক নির্দোষ প্রাণের শেষ আর্তনাদ।

পুরোহিতের গলা যেন কেঁপে উঠল, “মৃত্যুর আগে সে শাপ দিয়েছিল—যে এই অসমাপ্ত বিয়ের দায় বহন করেছে, তার বংশ ধ্বংস হবে। আর যতদিন না তার বিয়ে সম্পূর্ণ হয়, ততদিন মন্দিরের গায়ে এই শাপের ছায়া ঘুরে বেড়াবে।” অনিন্দ্য হঠাৎ ভ্রূ কুঁচকে বলল, “তাহলে পূর্ণিমার রাতে যে আত্মাকে আমি দেখেছি, সে আসলে মুক্তি চাইছে?” পুরোহিত মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, সে আজও তার সাজঘরে বসে আছে, অপেক্ষা করছে—যেন কেউ এসে পিঁড়িতে বসাবে তাকে, সিঁদুর পরাবে। তখনই তার মুক্তি সম্ভব।” অনিন্দ্যের মনে আরও প্রশ্ন জাগল। কেন মন্দিরের ভেতরেই আত্মা দেখা দেয়? কেনই বা পূর্ণিমার রাতেই? পুরোহিত বললেন, “মন্দিরে তার বিয়ের পূজার আয়োজন হয়েছিল। সেদিন থেকে এই মন্দিরই হয়ে উঠেছে তার বদ্ধশ্মশান। পূর্ণিমার আলোয় আত্মারা শক্তি পায়, তাই সেই রাতেই তার আকুলতা প্রকাশ পায়।” অনিন্দ্যের মনে শিহরণ বয়ে গেল, যেন ইতিহাসের প্রতিটি শব্দ তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে।

এই সব শুনে অনিন্দ্যের মনে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব শুরু হলো। সে ইতিহাস পড়তে এসেছে, দলিল-দস্তাবেজ খুঁজতে এসেছে, কিন্তু এখন যা জানছে তা নিছক ইতিহাস নয়—এ এক অভিশপ্ত প্রতিশোধের কাহিনি। তার ভেতর কৌতূহলের সঙ্গে এক ভয়ও জন্ম নিল। যদি সত্যিই অসমাপ্ত বিয়ে সম্পূর্ণ করার মাধ্যমে আত্মা মুক্তি পায়, তবে কে করবে সেই বিয়ে? আর আদৌ কি তা সম্ভব? পুরোহিত যেন তার মনের কথা পড়ে ফেললেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “মুক্তি সহজে আসবে না। যিনি এগোবেন, তাকে ভয়, অশরীরী শক্তি আর মৃত্যুর হুমকি সয়ে যেতে হবে। অনেকেই চেষ্টা করেছে, কিন্তু কেউ শেষ করতে পারেনি।” মন্দিরের নিস্তব্ধতা হঠাৎ আরও ভারী হয়ে উঠল। অনিন্দ্য বুঝতে পারল, সে শুধু ইতিহাসের রহস্য নয়, এক অসমাপ্ত জীবনের শাপের মধ্যে পা দিয়ে ফেলেছে। আর এখান থেকে ফিরে যাওয়া হয়তো আর সম্ভব নয়।

***

অনিন্দ্যের দিন কেটে গেল মন্দিরের প্রাচীন দলিল, নথি আর গ্রামবাসীদের মুখে শোনা কাহিনি নিয়ে। গ্রাম্য পুরোহিতের কাছে পাওয়া সংকেতই তাকে নতুন আলোয় দাঁড় করাল। বহু খোঁজাখুঁজির পর এক জরাজীর্ণ কাগজের পাঁজি খুলে সে আবিষ্কার করল—বধূর নাম ছিল চন্দ্রপ্রভা। নামটির সঙ্গে সঙ্গেই যেন এক ঝলক আলো ভেসে উঠল তার মনে। চন্দ্রপ্রভা—যেন পূর্ণিমার আলোই বাঁধা পড়ে আছে তার জীবনের সঙ্গে। দলিলে লেখা ছিল সেই অসমাপ্ত বিয়ের সমস্ত প্রস্তুতির বিবরণ—কোন ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল মণ্ডপ, কোন মন্ত্র পড়ার কথা ছিল পুরোহিতের, আর কোন সময়ে বরপক্ষ পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে এসেছিল শূন্যতা। অনিন্দ্য সেই নথি হাতে নিয়ে এক সিদ্ধান্তে উপনীত হলো—এবার সে-ই পূর্ণ করবে অসমাপ্ত পিঁড়ির কাহিনি। এ শুধু এক ইতিহাসের অনুসন্ধান নয়, এ এক মুক্তির চাবিকাঠি। গ্রামবাসীদের বিস্ময়, আতঙ্ক আর কুসংস্কারকে উপেক্ষা করে সে বলল, “আমি চন্দ্রপ্রভাকে মুক্তি দেব।” অচিন্ত্যমণি পুরোহিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “যা শুরু করবে, শেষ করতে হবে। নইলে তোমার উপরেও আসবে তার শাপের ছায়া।”

পূর্ণিমার রাত এলো। দেউলতলার আকাশে বিশাল চাঁদ যেন রুপালি দীপশিখা ছড়িয়ে দিল। মন্দিরচত্বর সেজে উঠল সাদা ফুলে। গ্রামের নারীরা ভয় পেয়ে দূরে দাঁড়াল, পুরুষেরা মশাল হাতে জড়ো হলেও কেউ কাছে এল না। অনিন্দ্য নিজের হাতে তুলসী আর বেলপাতা দিয়ে পূজার স্থান প্রস্তুত করল। মন্দিরের দরজার সামনে পিঁড়ি বসানো হলো—অর্ধেক সাজানো সেই পিঁড়ি, যা বহু বছর আগে অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল। তার উপর ছড়ানো হলো শ্বেতচন্দন, আর পাশে রাখা হলো সিঁদুরের কৌটো। দীপ জ্বলে উঠল, আর তার আলোয় মন্দিরচত্বর যেন অন্য জগতে রূপ নিল। বাতাসে ভেসে এলো অচেনা বাঁশির সুর, মন্দিরের ঘণ্টা একবার বেজে উঠল। হঠাৎ দেখা গেল—মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে নামছে এক সাদা শাড়ি পরা বধূ। মুখ ঢেকে আছে আঁচলে, কিন্তু তার পদক্ষেপে যেন কেঁপে উঠছে চারদিক। অনিন্দ্যের বুক কাঁপলেও সে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। বধূ এসে ধীরে ধীরে পিঁড়িতে বসল। মুখ থেকে আঁচল সরতেই দেখা গেল অশ্রুসিক্ত দুটি চোখ, আর ঠোঁটে মৃদু এক হাসি। যেন বহু যুগ পরে পাওয়া আশ্বাস তার চোখে।

অনিন্দ্য পুরোহিতের উচ্চারিত মন্ত্র পড়ে শুরু করল প্রতীকী বিয়ে। মন্ত্রের সুরে হাওয়ায় অদ্ভুত কম্পন জেগে উঠল। চারপাশের গাছপালা হঠাৎ কেঁপে উঠল, দূরে কুকুরেরা হাউহাউ করে উঠল। কিন্তু বধূ শান্তভাবে বসে রইল, চোখ নিবদ্ধ অনিন্দ্যের দিকে। সে মন্ত্র উচ্চারণ করে সিঁদুর হাতে তুলে নিল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, বধূর ছায়া আর নেই—সে যেন রক্তমাংসের মানুষ, যে অপেক্ষা করছে বহুদিনের অসমাপ্তির পূর্ণতার জন্য। অনিন্দ্য হাত বাড়াতেই হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা এসে প্রদীপগুলো নেভাতে চাইল, কিন্তু পুরোহিতের কণ্ঠে তখন আরও জোরালো মন্ত্রধ্বনি। অনিন্দ্য সিঁদুর কপালে ছোঁয়াতেই বধূর চোখ বেয়ে ঝরে পড়ল দু’ফোঁটা অশ্রু, কিন্তু সেই অশ্রু হাসির সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল। পূর্ণিমার আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আর মনে হলো পিঁড়ি থেকে ধীরে ধীরে আলো বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। গ্রামবাসীরা বিস্ময়ে দেখল—যে বধূর অশরীরী উপস্থিতি এতদিন ভয় জাগাত, সে আজ শান্ত, প্রশান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল চন্দ্রালোকে। কিন্তু ঠিক তখনই হঠাৎ করেই পিঁড়ি কেঁপে উঠল, যেন অসমাপ্তির অর্ধেক এখনো থেকে গেছে। অনিন্দ্যের মনে এক দ্বিধা জাগল—এ কি সত্যিই শেষ হলো, নাকি মুক্তির পথের শুধু প্রথম ধাপ পূর্ণ হলো?

***

পূর্ণিমার আলোয় ঘেরা দেউলতলার প্রাচীন মন্দিরে যখন শেষ মন্ত্রধ্বনি মিলিয়ে গেল, তখন চারদিক যেন নিস্তব্ধতার কুয়াশায় ঢেকে গেল। অনিন্দ্যের কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত সেই শেষ শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই পিঁড়ির উপর বসে থাকা সাদা শাড়ি পরা বধূ ধীরে ধীরে মাথা নুইয়ে দিল। তার চোখে তখনও ভাসছে অশ্রুর ঝিলিক, ঠোঁটে ফুটে উঠেছে এক মায়াবী হাসি। গ্রামের লোকেরা দূরে দাঁড়িয়ে একে একে হাঁটু মুড়ে প্রণাম জানাতে লাগল, যেন সত্যিই তারা এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হলো। তাদের চোখে চন্দ্রপ্রভা যেন মুক্তি পেল—তার আত্মা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পূর্ণিমার আলোয়, বাতাসে ভেসে উঠল এক শান্তির পরশ। ঘণ্টাধ্বনি আর বাঁশির সুর থেমে গিয়ে যেন মন্দিরে ফিরল শান্ত নিস্তব্ধতা। কিন্তু এই নীরবতার ভেতরেই অনিন্দ্যের বুক কেঁপে উঠল। কারণ, যখন সবার চোখ ছিল মিলিয়ে যাওয়া রূপটার দিকে, তখন তার কানে এল এক মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠস্বর—চন্দ্রপ্রভার কণ্ঠ, যা শুধু অনিন্দ্যই শুনতে পেল। সে বলল, “বিয়ে তো হলো, কিন্তু বর তুমি নও… আমি কি সত্যিই মুক্তি পেলাম?” কথাগুলো যেন বরফের শলাকার মতো অনিন্দ্যের অন্তরে বিঁধে রইল।

গ্রামবাসীরা আনন্দে মেতে উঠল। কারো চোখে জল, কারো মুখে হাসি। তারা ভাবল, শতাব্দীর অভিশাপ ঘুচে গেল অবশেষে। কেউ কেউ আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “দেউলতলা মুক্ত! মৃতবধূ এবার শান্তি পেল।” পুরোহিত অচিন্ত্যমণিও গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে চুপ করে মন্দিরের গর্ভগৃহের দিকে তাকালেন। কিন্তু অনিন্দ্যের চোখে কোনো শান্তি নেই। তার মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই শেষ বাক্য। যদি চন্দ্রপ্রভা সত্যিই মুক্তি পেয়ে থাকে, তবে কেন বলল এ কথা? বিয়ের মন্ত্র, সিঁদুর—সবই তো হলো, তবে কিসের ঘাটতি থেকে গেল? অনিন্দ্য বুঝতে পারল, সে ইতিহাসে আর অভিশাপে নয়, বরং এক অমীমাংসিত সত্যে জড়িয়ে পড়েছে। বধূর আত্মা যদি মনে করে বর সে নয়, তবে কাকে খুঁজছে সে? তার প্রকৃত বর? নাকি সেই বিশ্বাসঘাতক, যে প্রতারণা করে তার জীবন ধ্বংস করেছিল? আর যদি সেই প্রতারকই হয়, তবে কীভাবে সে শান্তি পাবে, যখন প্রতিশোধ তার আত্মাকে বেঁধে রেখেছে?

রাত ক্রমশ গভীর হলো, মন্দিরে জ্বলা প্রদীপের আলো নিভে গেল একে একে। চাঁদের আলোয় ভিজে থাকা মাটিতে অনিন্দ্য দাঁড়িয়ে রইল, তার চারপাশে যেন ছায়ারা ফিসফিস করছে। গ্রামের লোকেরা ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরতে শুরু করল, তাদের মুখে স্বস্তি, কিন্তু অনিন্দ্যের চোখে প্রশ্ন। মন্দির আবার নীরব হয়ে উঠল, তবে এই নীরবতা আর শান্তির নয়—এ যেন এক গোপন রহস্যের ভারে স্তব্ধ হয়ে থাকা। অনিন্দ্য বুঝতে পারল, এই গল্প এখানেই শেষ নয়। চন্দ্রপ্রভার অসমাপ্ত কণ্ঠ যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আরও গভীর কোনো অজানার দিকে। ইতিহাসের পাতায় যত নাম-তারিখই লেখা থাকুক না কেন, তার অন্তরজগতে এখনো গুঞ্জন করছে সেই প্রশ্ন—“আমি কি সত্যিই মুক্তি পেলাম?” মন্দিরের প্রাচীর যেন সেই প্রশ্নকে বন্দি করে রেখেছে, আর অনিন্দ্য জানে, সে ছাড়া আর কেউ সেই উত্তর খুঁজে পাবে না। দেউলতলার রাত আবারও নেমে এলো, নীরবতায় ঢাকা পড়ে গেল সব, রেখে গেল কেবল এক অমীমাংসিত রহস্য।

****

1000065509.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *