Bangla

তৃষ্ণাঘাটের উপকথা

Spread the love

ভারতের উত্তরবঙ্গের শেষপ্রান্তে, শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে এক নিভৃত পাহাড়ি গ্রাম — তৃষ্ণাঘাট। নামটি শুনেই বোঝা যায়, একসময় এখানে পানীয় জলের অভাব ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এই নাম এসেছে এখানকার একটি পুরনো প্রবাদ থেকে — “তৃষ্ণার শেষ আশ্রয়ঘাট”। কারণ, বহু শতাব্দী আগে এখানকার এক প্রাকৃতিক ঝর্ণা নাকি প্রাণ বাঁচিয়েছিল মহামারিতে আক্রান্ত একটি গোটা সম্প্রদায়কে।

গ্রামটির অবস্থান ডুয়ার্সের ঘন সবুজের মধ্যখানে, চারদিকে শাল, সেগুন, মহুয়া আর বার্নিশ গাছ। দূরে দেখা যায় পাহাড়ের নীলচে রেখা, যেন প্রকৃতি নিজ হাতে আঁকা ছবি। আজও এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পৌঁছায় না ঠিকমতো, কিন্তু পাহাড়, মেঘ, আর জঙ্গলের আলিঙ্গনে এখানকার মানুষজন যেন অন্য জগতের বাসিন্দা।

তৃষ্ণাঘাটের ইতিহাস বহু প্রাচীন। কথিত আছে, অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এক তামাং গোত্রের মানুষ নেপালের রুইলিতে মহামারী থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছিলেন এই অঞ্চলে। তারা এই ছোট্ট উপত্যকা খুঁজে পেয়ে এখানে বসতি গড়ে তোলেন। তখন এই জায়গার নাম ছিল ‘ছুমি থাং’ — তামাং ভাষায় যার মানে ‘জলের মাটি’। ১৮৩০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চল ঘুরে দেখে এখানে একটি সাময়িক ছাউনি তৈরি করে। ব্রিটিশরা এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একটি ‘ফরেস্ট রিট্রিট’ বানায়, যার ধ্বংসাবশেষ আজও বনদপ্তরের অন্তর্গত এলাকায় পড়ে আছে।

এই গ্রামের প্রধান জনগোষ্ঠী তামাং, লেপচা, ও কিছু অংশে রাজবংশী সম্প্রদায়। এখানে বাংলা, নেপালি ও লেপচা ভাষার সহাবস্থান। গ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন মূলত বৌদ্ধ এবং স্থানীয় লোকবিশ্বাসে আবিষ্ট।

তেমাল ছোবা, অর্থাৎ পূর্ণিমার রাতে ‘জলদেবীর’ পুজো এখানে বহু পুরনো রীতি। গ্রামের মধ্যিখানে যে ঝর্ণাটি বয়ে চলেছে, তাকে তারা দেবী রূপে পূজা করে, বিশ্বাস করে — এই জলই তাদের পূর্বপুরুষদের প্রাণরক্ষা করেছিল। পূজার রাতে সবাই সাদা পোশাক পরে, বাঁশের মশাল নিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে জলদেবীর উদ্দেশ্যে গান গায় — “ওই ঝর্ণা, আমাদের তৃষ্ণা হরণ করো…”

এছাড়াও এখানে ‘মুনলুং উৎসব’ নামের এক ধরণের নববর্ষ পালিত হয়, যেখানে শিশুদের জন্য লোককথার নাটক, বড়দের জন্য বনের ফলমূল আর মদ্যপান চলে রাতভর।

তৃষ্ণাঘাটে প্রায় ১২০টি পরিবার বাস করে। জীবিকা মূলত কৃষি, চা-বাগানে কাজ ও পর্যটকদের জন্য হোমস্টে চালানো। কেউ কেউ কাঠ ও বাঁশের হস্তশিল্পও তৈরি করে। এখানকার মানুষজন অত্যন্ত আন্তরিক, অতিথিপরায়ণ ও পরিশ্রমী। বেশিরভাগ ঘরই কাঠ ও পাথরের তৈরি। ঘরের পাশে ফুলের বাগান, পেছনে ধানক্ষেত বা আদা, হলুদ ও চামেলির চাষ।বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একজন মানুষ — থিমবা গুরুং। তিনি ৭৮ বছর বয়সী একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, যিনি স্থানীয়দের মাঝে একজন জ্ঞানী ও পরামর্শদাতা রূপে পরিচিত। তিনি বহু পুরনো লোককথা মুখস্থ জানেন, এবং শিশুরা সন্ধ্যায় তাঁর ঝুপড়িতে বসে গল্প শোনে।

তৃষ্ণাঘাটের আদি কাহিনিগুলির মধ্যে একটি রহস্যময় গল্প আজও লোকমুখে ফেরে — “জলপাহাড়ের ডাক”। প্রায় ১০০ বছর আগে, গ্রামের পাশের পাহাড়ে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ধ্যান করতে গিয়ে আর ফেরেননি। তাঁর নাম ছিল নামগিয়াল লামা। লোকেরা বলে, তিনি নিজেই তৃষ্ণাঘাটের ঝর্ণায় বিলীন হয়ে ‘জলদেবী’র অংশ হয়ে যান। প্রতি দশ বছরে একবার পূর্ণিমার রাতে ঝর্ণার ধার থেকে নাকি এক স্নিগ্ধ সঙ্গীত ভেসে আসে — ঠিক যেন এক লামার মন্ত্রোচ্চারণ। কেউ কেউ বলে, যে সেই রাতে ঝর্ণার জল মুখে দেয়, তার সমস্ত রোগ সেরে যায়।সাম্প্রতিক কালে এক পর্যটক — কলকাতার গবেষক অনিন্দ্য বসু — এই গল্প শুনে গবেষণার ছলে এখানে কিছুদিন থাকেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল রহস্যজনক। তিনি বলেন, “এক রাতে সত্যিই আমি ঝর্ণার ধারে সঙ্গীত শুনতে পেলাম। ঠিক যেন জল নিজেই গান গাইছে। আমি ক্যামেরায় কিছু ধরার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পরদিন তা আর দেখতে পাইনি। শুধু ক্যামেরায় দেখা যায় ঘন কুয়াশা আর এক রহস্যময় আলো।” এই ঘটনার পর থেকেই আবার সেই কাহিনির প্রতি গ্রামের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। অনিন্দ্য বাবু সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন তাঁর বই — “Himalayan Whispers: A Tale from Trishna Ghat”।

গত দশ বছরে কিছু পরিবর্তন এসেছে তৃষ্ণাঘাটে। সরকারিভাবে বিদ্যুৎ এসেছে, একটি ছোট প্রাইমারি স্কুল হয়েছে। কিছু হোমস্টে ব্যবসা শুরু হয়েছে, যার ফলে বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ বেড়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধা।

থিমবা গুরুং বলেন — “আমরা চাই না যে তৃষ্ণাঘাট হয়ে উঠুক দার্জিলিংয়ের মতো। আমরা ছোট, সরল, তবু গর্বিত। এখানে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা জীবনের মধ্যেই আমাদের সুখ। যদি এখানে শপিং মল হয়, তাহলে হারিয়ে যাবে আমাদের মন্ত্র, আমাদের জলদেবী, আমাদের গান…”

এ কথা শুনে গ্রামের তরুণ প্রজন্ম কিছুটা দ্বিধায়। তারা যেমন আধুনিকতার স্বাদ পেতে চায়, তেমনই ঐতিহ্য ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষাও প্রবল। এই দ্বন্দ্বই হয়তো তৃষ্ণাঘাটের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে।

তৃষ্ণাঘাট হয়তো ভারতের কোনো সরকারী মানচিত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু যারা একবার এখানে আসে, তারা বারবার ফিরে আসতে চায় — প্রকৃতির শান্তি, মানুষজনের আন্তরিকতা, আর ইতিহাসের নিঃশব্দ দোলার জন্য। বছর ঘুরে আবার সেই ‘তেমাল ছোবা’ উৎসব আসবে। মশালের আলোয় আলোকিত হবে ঝর্ণার ধারে ছোট্ট পথ। শিশুদের মুখে ভেসে উঠবে থিমবা গুরুংয়ের গল্প, আর পাহাড়ের কোলে মিশে যাবে সেসব উপকথা, যাদের কোনো লিখিত ইতিহাস নেই — আছে শুধু স্মৃতি আর বিশ্বাসের বুকের গভীরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *