স্নেহাশিষ রায়
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। জাদরেল রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে শহরের স্টেশনে। গরম বাতাসে ছিন্ন কাপড়ের মতো ওড়ানো যাচ্ছে না কোনো মন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ৩২ নম্বর লোকাল ট্রেনের কামরায় যেন আগুনের ঢেউ বইছে। সেই উত্তপ্ত কামরার মধ্যে দিয়ে হাঁটছে দশ বছরের একটি ছেলে—হাতে একগুচ্ছ তালপাতার পাখা। ছোট্ট শরীরে ঘাম জমে রেখার মতো গড়িয়ে পড়ছে, তবে চোখে কোনো ক্লান্তি নেই। তার ঠোঁটে এক মৃদু ডাক—“তালপাতার পাখা নিন… গরমে আরাম… পাঁচ টাকায় একখানা…”। প্রতিটি যাত্রীকে দেখে সে যেন কল্পনা করে, কে কিনবে, কে ফিরিয়ে দেবে। কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ তিরস্কার করে—“যাও যাও, বিরক্ত করো না।” তবু সে এগিয়ে যায়। নাম তার সাগর। শহরের উপকণ্ঠের একটি বস্তিতে জন্ম, মা মারা গেছেন যখন সে সবে হাঁটতে শিখেছে, বাবার কথা কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারে না। তার জগৎ—এই ট্রেনের কামরা, প্ল্যাটফর্মের চা-ওয়ালার গান, আর রোজকার অজানা মুখগুলো। তবে এদের মাঝে একটা জিনিস সে হারায়নি—স্বপ্ন।
রাতের বেলাতে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর, প্ল্যাটফর্মের এক কোণে রেললাইনের ধারে বসে থাকে সাগর। সঙ্গে থাকে তার গুছিয়ে রাখা তালপাতার পাখাগুলো—যেগুলো দিনের শেষে অবিক্রীত থেকে যায়। তখন সে একটুখানি সময় পায় নিজেকে ফিরে পাওয়ার, কল্পনার জগতে ঢোকার। তার একটা ছোট্ট টিনের বাক্স আছে, যার ভেতরে একটা পুরোনো বই—ছেঁড়া পাতার মাঝে ইংরেজি অক্ষর আর বাংলা কবিতার ছেঁড়া ছেঁড়া ছাপ। সে ওই বইটায় প্রতিদিন চোখ রাখে। কোনো স্কুলে যায়নি, কিন্তু চা-ওয়ালা মামা, কিংবা বইওয়ালাদের ঝুড়ি থেকে পড়ে পাওয়া কাগজে সে হরফ চিনেছে। তার কাছে বই মানে জাদু। তার মন চায় ক্লাসরুমে বসতে, টিফিন নিতে, হোমওয়ার্ক করতে—যে জীবন সে শুধু সিনেমায় বা গল্পে পড়ে শুনেছে। সাগরের কাছে তালপাতার পাখা কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়, সে বলে—“এই পাখার বাতাসে আমি আমার স্কুলের ঘ্রাণ পাই।”
সেই সন্ধ্যেবেলা, যখন লোকাল ট্রেনটা আবার প্ল্যাটফর্মে ঢুকল, সাগর উঠে পড়ল। আজ তার চোখে একরাশ তৃষ্ণা। হঠাৎ একটি কামরার কোণায় সে দেখে একটি দম্পতি বসে আছেন—পরিচ্ছন্ন পোশাক, চোখে মায়া, এবং মুখে ক্লান্তি। সাগর সাহস করে এগিয়ে যায়। “পাখা নেবেন দিদি?” মহিলাটি তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, যেন তার চোখ কাঁপে—এই ছেলেটির মুখে এমন কী আছে, যা তাকে থমকে দিল? “তোর নাম কী?” সাগর একটু থতমত খেয়ে যায়—এ প্রশ্ন খুব কম শোনা যায়। “সাগর,” সে মৃদুস্বরে জবাব দেয়। “তুই স্কুলে যাস?” প্রশ্নটা শুনেই সাগরের চোখ নিচু হয়ে যায়। এক মুহূর্ত থেমে সে বলে, “না, যাই না। কিন্তু যেতাম খুব ইচ্ছে করে।” সেই মুহূর্তে দম্পতির চোখে একরকম কষ্ট ছুঁয়ে যায়। মহিলার নাম স্নেহা। পাশে থাকা মানুষটি অভিষেক। দু’জনেই বুঝে যান—এই এক পলকের দেখা এক শিশু হয়তো তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূত্র হতে চলেছে।
–
ট্রেনটা ধীর গতিতে স্টেশন ছাড়ছিল, বাইরে শহরের আলোগুলো এক একটা রেখার মতো ছুটছিল পিছনে। স্নেহা চুপচাপ জানালার পাশে বসে ছিলেন। পাশে অভিষেক, হাতে তাঁর রিপোর্টারদের নোটবুক। তাঁরা দুজনেই সারাদিনের ক্লান্তিতে অবসন্ন, কিন্তু মনটা অদ্ভুত এক অনুভবে আবৃত। শিশুটির মুখটা বারবার চোখে ভাসছিল। স্নেহার মনে হচ্ছিল, এই মুখ যেন কোনো চিত্রকর আঁকেনি—এটা বাস্তবের রং, দারিদ্র্যের রেখা, স্বপ্নের ছোঁয়া আর সহস্র দিনের সূর্যরেখার প্রতিচ্ছবি। সে অভিষেককে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি দেখলে ছেলেটার চোখ? এত ছোট একটা ছেলের মধ্যে এত গভীরতা!” অভিষেক মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, আমি শুধু চোখ দেখিনি… ওর কথার মধ্যে এমন একটা সত্য ছিল, যা আমি বহু বড়লোক মানুষের মুখেও পাইনি।” তারা বুঝতে পারছিলেন, এটা ছিল কেবল এক মুহূর্তের দেখা নয়—এই ছেলেটি তাদের মনে একটা গহ্বর তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে প্রশ্ন উঁকি দেয়: এই শিশুর জীবন কীভাবে এমন হলো? আর কীভাবে বদলানো সম্ভব?
পরের দিন সকালবেলা, স্নেহা ট্রেন ধরার বদলে প্ল্যাটফর্মে ফিরে এলেন। সাদা সুতির শাড়ি পরে, সঙ্গে ছোট একটা ব্যাগ। অভিষেকও পিছু নিলেন। তাঁরা অনেককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, ছেলেটির নাম সত্যিই সাগর, সে থাকে স্টেশন লাগোয়া পুরোনো বস্তিতে—যেখানে খোলা ড্রেন, ঝুপড়ি ঘর আর নেশার গন্ধ মিশে আছে বাতাসে। রোদ ঝলমলে সকালেও সেই বস্তি যেন মেঘে ঢাকা। তারা পা রাখলেন সেই ঘন গলি দিয়ে, যেখানে প্রত্যেকটি দরজায় দারিদ্র্যের ছাপ। একটা কোণার ঘরে তাঁরা দেখতে পেলেন হরিলাল নামের এক বৃদ্ধ—সাদা চুল, ক্ষয়ে যাওয়া দেহ, চোখে অভিজ্ঞতা আর কঠোর বাস্তবের ছাপ। তিনি বললেন, “সাগর? সকালে বেরিয়ে যায় ট্রেনে পাখা বেচতে। রাতে ফিরে আসে। আমি শুধু ওর ঘুম দেখেছি।” হরিলালের কণ্ঠে দুঃখও আছে, অথচ আশা নেই। স্নেহা জিজ্ঞেস করেন, “সে স্কুলে যেতে চায়, আপনি জানেন?” বৃদ্ধ একটু হেসে বলেন, “খিদে পেটে স্কুল? স্বপ্ন দিয়ে পেট ভরে না মা।”
স্নেহা চুপ করে থাকেন। ঠিক তখনই দূর থেকে সাগরকে দেখা যায়—হাতে তার রোজকার ঝুড়ি, ক্লান্ত মুখ, কিন্তু চোখে দীপ্তি। সাগর তাদের দেখে থমকে দাঁড়ায়। তার মনে বিস্ময়—এই ভালো পোশাক পরা মানুষদুটো আবার কেন এসেছে? স্নেহা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন, “আজ তো স্কুলে যাসনি!” সাগর চমকে ওঠে, তারপর মাথা নিচু করে বলে, “আমার তো স্কুল নেই, দিদি।” এই ছোট্ট বাক্যটিতে যেন স্নেহার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তিনি সাগরের কাঁধে হাত রাখেন, “চল, স্কুল খুঁজে বের করি।”
–
সাগরের বস্তির গলি যেন একটা পৃথক পৃথিবী। রঙহীন, কিন্তু গল্পভরা। বাঁধানো রাস্তা নেই, পাকা ছাদ নেই, স্কুলের ঘন্টা নেই—কেবল মানুষের মুখে জমে থাকা ক্লান্তি, হকারদের হাঁক, গালিগালাজ, আর অবিচার। স্নেহা ও অভিষেক পা রাখলেন সেই সরু গলিতে, যেখানে মাটি ভেজা, আর চোখে চোখ পড়তেই মানুষ ফিসফিসিয়ে বলে—”নতুন লোক এসেছে… ওরা কাদের?” কেউ হেসে নেয়, কেউ কটাক্ষ করে। একটা কোণার ঘরে হরিলাল চুপচাপ বসে ছিলেন। তাঁকে দেখে অভিষেক এগিয়ে গিয়ে বলেন, “আমরা সাগরের বন্ধু হতে চাই। ওর একটু পড়াশোনা শেখানোর চেষ্টা করছি।” হরিলাল এক দৃষ্টিতে তাঁদের দিকে তাকান। তার চোখে এক ধরনের সংশয়—বহুবার তিনি সমাজের লোককে দেখে এসেছেন, যারা আসে সাহায্য করতে, আর যায় না ফেরার মতো করে। তিনি একটু হেসে বলেন, “পড়াতে চাইছেন? বেশ কথা। কিন্তু বস্তির ছেলে পড়াশোনায় কী করবে?” স্নেহা বললেন, “মানুষ হবে। শুধু খাবার পেলেই তো বাঁচা নয়।” এই কথা শুনে হরিলালের চোখে একটু আশ্চর্য ফুটে ওঠে, কিন্তু মুখে মুখোশের মতো কঠোরতা।
সাগর সেদিন সন্ধ্যেবেলা যখন ফেরে, তখন তার হাতে মাত্র দুটি পাখা অবিক্রীত। কিন্তু বাড়ির সামনে স্নেহাকে দেখে থমকে যায়। তার চোখে ভয় আর আনন্দ একসঙ্গে খেলে যায়। স্নেহা তাকে ডেকে বলেন, “আজ তোর জন্য কিছু এনেছি।” ব্যাগ থেকে বের করেন একটি খাতা, একটি পেনসিল, আর একটি ছোট গল্পের বই—সুকুমার রায়ের ‘পাগলা দাশু’। সাগরের হাতে ওগুলো দিয়ে তিনি বলেন, “আজ থেকে প্রতি বিকেলে আমরা এক ঘণ্টা করে পড়ব, কেমন?” সাগরের চোখ ছলছল করে ওঠে, বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো যেন বের হতে চায়, কিন্তু বের হয় না। সে শুধু মাথা নাড়ে। সেই রাতে সাগর খাতাখানি বালিশের নিচে রেখে ঘুমায়। পাখার বদলে তার হাতে ছিল কাগজ, অক্ষর, আর নতুন জীবনের সম্ভাবনা।
পরদিন হরিলাল জানালার ধারে বসে দেখছিলেন—স্নেহা কেমনভাবে সাগরকে অক্ষর শেখাচ্ছেন, ছবির গল্প বোঝাচ্ছেন, কবিতার ছন্দে ছেলেটির মুখে এক নতুন আলো ফুটে উঠছে। তিনি চুপচাপ খেয়াল করছিলেন—যে ছেলে রোজ মাটির ধুলোয় গড়াগড়ি খেত, এখন সে মাটিতে বসেই আঙুল দিয়ে অক্ষর আঁকে। পরদিন তিনি নিজেই অভিষেককে ডেকে আনেন এবং বলেন, “আপনি যদি সত্যিই ওকে স্কুলে নিতে পারেন… আমি বাধা দেব না।” অভিষেক হেসে বলেন, “আমরা চেষ্টা করব, কিন্তু শুধু ওর পড়ার ইচ্ছে থাকলেই হবে না, সমাজকে বদলাতে হবে, নিয়মকে নরম করতে হবে।” হরিলাল একবার আকাশের দিকে তাকান—বৃষ্টি নামছে ধীরে ধীরে, সেই বৃষ্টির নিচে তালপাতার পাখাগুলো ভিজে যাচ্ছে, আর তাদের সঙ্গে যেন ধুয়ে যাচ্ছে সমাজের কাঠিন্য।
–
সপ্তাহ ঘুরতেই অভিষেক একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন সাগরকে, তার হাতে নতুন ব্যাগ, ভেতরে স্নেহার দেওয়া খাতা, পেনসিল আর সেই পাগলা দাশুর বই। স্কুলের নাম বিজয় মেমোরিয়াল প্রাইমারি স্কুল, শহরের এক কোণে শীতল একচিলতে ছায়া—যেখানে দেয়ালে আঁকা জাতীয় পতাকা, অক্ষর মেলা, আর জানালায় মরচে ধরা গ্রিল। প্রধান শিক্ষক মৃণাল বাবু প্রথমেই কপালে ভাঁজ ফেললেন, “বস্তির ছেলে তো? বয়স কত?” অভিষেক শান্ত স্বরে বলেন, “১০ বছর, জন্ম সনদ নেই ঠিকই, কিন্তু আমরা ব্যবস্থা করব। ও পড়তে চায়।” মৃণাল বাবু শীতল হাসি দিলেন, “এরা পড়তে চায় মানে? দু’দিনেই পালাবে। ঠিকানা নেই, অভিভাবক নেই, গার্জিয়ানের সই কে করবে?” অভিষেক বললেন, “আমি আর আমার স্ত্রী দায়িত্ব নিচ্ছি। ওকে আমরা দেখাশোনা করব।” মৃণাল বাবু চুপ করলেন কিছুক্ষণ, তারপর গলায় একটা রূঢ়তা এনে বললেন, “ওকে ভর্তি করতে গেলে আমাকে ব্লকের অনুমতি নিতে হবে। মিডডে মিলের জন্য বয়সের প্রমাণ লাগবে। আর… আপনারা সমাজসেবী হলে বাড়িতে পড়ান না কেন?” অভিষেক বুঝে গেলেন—এই স্কুলের দরজা বন্ধ, কেবল ইট-কাঠ দিয়ে নয়, মন দিয়ে।
ফিরে আসার সময় সাগর খুব চুপচাপ ছিল। সে কিছু জিজ্ঞেস করেনি, শুধু একবার স্নেহাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমি কি খুব খারাপ দিদি?” স্নেহা তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “তুই খুব ভালো। স্কুল খারাপ।” কিন্তু এই প্রত্যাখ্যান সাগরের ভিতরটা যেন একটু কাঁপিয়ে দেয়। স্নেহা আর অভিষেক দুজনেই বুঝলেন, এই লড়াই কেবল পড়ানোর নয়, এটি প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। অভিষেক পরদিন তাঁর পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লেখেন—“একটি স্কুল, একটি তালপাতার পাখা এবং একটি বন্ধ দরজা”। লেখাটির প্রতিটি লাইনে ছিল ক্ষোভ, বাস্তব, এবং কষ্ট। তিনি লেখেন, “যে সমাজ স্কুলে যেতে চাওয়া এক শিশুকে অযোগ্য ঘোষণা করে শুধুমাত্র জন্মসনদ না থাকার অজুহাতে, সে সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই অস্বীকার করে।”
নিবন্ধটি প্রকাশের পর এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে—পত্রিকায় ফোন আসে শিক্ষা দপ্তর থেকে। একজন আধিকারিক অভিষেককে বলেন, “আপনার লেখাটা মন ছুঁয়ে গেছে। আমরা চাই আপনি শিশুটিকে আবার নিয়ে আসুন, দরকার হলে বিশেষ অনুমতির ব্যবস্থা করব।” এই আশার কথা নিয়ে স্নেহা-অভিষেক আবার হাজির হন মৃণাল বাবুর ঘরে। এবার যেন একটু নরম গলায় তিনি বলেন, “উপরে থেকে ফোন এসেছে… এখন ভর্তি করতে হবে। তবে মিডডে মিল পাবে না… ওর কাগজপত্র ঠিক নেই।” স্নেহা বললেন, “আমরা কিছু চাই না। শুধু ও যেন ক্লাসে বসতে পারে।” সেই দিন বিকেলে, বহু বছরের পর, সাগর প্রথমবার একটি স্কুলের বারান্দায় পা রাখে। তার চোখে ভয়, কিন্তু বুকের মধ্যে এমন এক স্পন্দন, যা হয়তো সে প্রথম তালপাতার পাখা বানানোর সময় অনুভব করেছিল। এবার সে জানত—পাখার বাতাস আর শুধু শরীর ঠান্ডা করে না, হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে।
–
সাগরের স্কুলে প্রথম দিন। ক্লাসরুমে ঢোকার সময়ই সে অনুভব করেছিল—এই ঘরটা তার চেনা পৃথিবীর চেয়ে আলাদা। চারপাশে ছেলেমেয়েরা পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্মে, ব্যাগে নতুন খাতা, নাম লেখা জলের বোতল। আর সে—একটি পুরোনো জামা পরে, নতুন খাতা হাতে, চোখে অচেনা জায়গার ভীতি। শিক্ষিকা মল্লিকা মিস প্রথমে ওকে একটু অস্বস্তির চোখে দেখেন, তারপর বলেন, “তোমার নাম সাগর? এসো, বসো এখানে।” সাগর ক্লাসরুমের পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসে। আশেপাশে কয়েকটি ছেলে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “ও বস্তির ছেলে… তালপাতার পাখা বেচে।” কারো মুখে বিদ্রূপ, কারো কণ্ঠে তুচ্ছতা। সাগরের চোখ মেঘে ঢাকা হয়ে যায়। সে জানে না, কীভাবে সহ্য করতে হয় এই উপহাস—এই স্কুল তার স্বপ্নের ছিল, কিন্তু এই স্বপ্ন যেন কাঁটার মুকুট হয়ে উঠছে।
ঠিক সেই সময় ক্লাসে এসে ঢোকেন স্নেহা। শিক্ষক মল্লিকা মিস অবাক হয়ে তাঁকে দেখে বলেন, “আপনি তো সাগরের অভিভাবক?” স্নেহা হাসেন, বলেন, “হ্যাঁ, আমি আজ ওর প্রথম দিনটা দেখতে এলাম।” ক্লাসের বাচ্চারা একটু চুপচাপ হয়। স্নেহা বোঝেন, পরিবেশ অদ্ভুত। তিনি মল্লিকা মিসকে বলেন, “এই ছেলেটা আপনারা যেভাবে দেখছেন, ঠিক সেভাবে নয়। ও যে শুধু পাখা বেচে তা-ই নয়, ও কবিতা পড়ে, বই ভালোবাসে। ও আমাদের মতো হতে চায়—যেমন আমরা ছোটবেলায় ছিলাম, হোমওয়ার্ক করে টিফিন খেতাম। একটু সময় দিন, দেখবেন ও আপনাদের হতাশ করবে না।” এরপর তিনি বেরিয়ে যান। সাগর তার চলে যাওয়ার সময় একবার তাকিয়ে দেখে—স্নেহার চোখে ছিল অদ্ভুত এক বিশ্বাস, যেন সেই চোখেই লেখা ছিল—“তুই পারবি।”
এদিকে অভিষেকের প্রতিবেদন শহরে আলোড়ন তোলে। পাঠকরা মন্তব্য করেন, কেউ বলেন, “এই লেখাটা আমার চোখে জল এনেছে।” কেউ বলেন, “আমরা কেন এত নিষ্ঠুর সমাজ গড়েছি?” অভিষেক এক রেডিও চ্যানেলে ডাকা হয়, যেখানে তিনি বলেন, “এই শহরের প্ল্যাটফর্মে যে তালপাতার পাখা বিক্রি করে, সে যদি স্কুলে যেতে চায়, তাহলে প্রশাসন নয়, আমাদের মানসিকতাই সবচেয়ে বড় বাধা।” তিনি আরো বলেন, “সাগরের মতো হাজার হাজার শিশু আছে, যারা কাগজে নাম না থাকায়, কণ্ঠে স্বপ্ন চাপা দিয়ে বেঁচে থাকে। আমাদের কালি দিয়ে তাদের মুখে আলো ফেরাতে হবে।” সেই কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়াতেও—#পাখারপাখনা নামে একটি হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করতে শুরু করে। কেউ স্কুলে গিয়ে সাগরকে চকলেট দেয়, কেউ নিজের খাতা দেয়। সমাজ যেন ধীরে ধীরে চোখ খুলতে শিখছে।
–
সাগরের জন্য প্রতিটি সকাল এখন এক নতুন যাত্রা। ট্রেনের ধোঁয়াটে গন্ধ, পাখার ঝুড়ি, আর প্ল্যাটফর্মের হাঁক—সব তার জীবনে এখনও আছে, কিন্তু তার মধ্যে জুড়ে গেছে আরেকটা ছন্দ—স্কুলের ঘন্টা, বইয়ের পাতার শব্দ, আর স্নেহার মুখের প্রশ্রয়। আগের মতো আর পুরোটা দিন প্ল্যাটফর্মে কাটাতে হয় না। ভোরবেলা দু-একটা ট্রিপ করে পাখা বিক্রি করে সে, তারপর হরিলাল দাদু তাকে তুলে দেন, তার ব্যাগ গুছিয়ে দেন, জলের বোতল দেন হাতে। প্রথমদিকে স্কুলে যাওয়া মানে তার কাছে ছিল এক ভয়মিশ্রিত দায়িত্ব। কিন্তু এখন, বইয়ের পাতায় যখন সে নতুন অক্ষর পড়ে, কবিতা শেখে—তখন তার মনে হয়, সে বুঝি আস্তে আস্তে অন্য এক পৃথিবীতে পা দিচ্ছে।
স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও ধীরে ধীরে তাকে গ্রহণ করতে শুরু করেন। একদিন কবিতার ক্লাসে শিক্ষিকা জিজ্ঞেস করলেন, “কে পাঠ করবে রবীন্দ্রনাথের ‘চাঁদের হাসি’?” সব বাচ্চা মুখ নিচু করে থাকলেও সাগর ধীরে ধীরে হাত তোলে। সে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং জড়ানো কণ্ঠে কবিতা পড়ে—কিন্তু তার স্বরেই ছিল এক অনন্য আত্মবিশ্বাস। শিক্ষিকার চোখে জল এসে যায়। ক্লাস শেষে তিনি বলেন, “তুমি যে শুধু ভালো পড়ো তা নয়, তোমার গলায় সাহস আছে।” এই প্রশংসা যেন সাগরের ভেতরে এক আলো জ্বালায়—সে আর শুধু শিখতে চায় না, সে বুঝে গেছে যে সে পারেও। স্নেহা প্রতিদিন তার খাতা দেখে দেন, ভুল ধরিয়ে দেন, বলেন, “ভুল করছিস, মানে শিখছিস।” সাগরের মুখে তখন একটিই উত্তর—“আমি শিখতে চাই।”
এক সন্ধ্যেয়, হরিলাল দাদু তার বুকে একটা পুরোনো কাপড়ের পুঁটুলি নিয়ে সাগরের সামনে এলেন। খুলে দেখালেন—একটা ব্যবহার করা ইউনিফর্ম, একটু পুরোনো হলেও পরিষ্কার। বললেন, “এটা আমার ছেলে পড়ত একসময়। এখন তুই পরবি।” সাগর চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে। হরিলালের চোখে তখন আবেগ লুকানো নেই, শুধু গভীর মমতা। “তোর স্কুলে তো ইউনিফর্ম পরে সবাই… তুইও পরে যা, আমার নাতি।” সাগর ঝাঁপিয়ে পড়ে দাদুর বুকে। সেই রাতে সাগর বুঝে যায়—শুধু স্নেহা আর অভিষেক নয়, হরিলালও এখন তার পাশে আছেন। সেই রাতের আকাশে মেঘ ছিল, কিন্তু তার মনে একটুকরো রোদ ঝলমলে হয়ে ছিল—ঠিক তালপাতার পাখার নিচে লুকানো বাতাসের মতো।
–
সকালবেলা স্কুলে ঢোকার সময় সাগরের পা দুটো যেন আগের চাইতে আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছে। পুরোনো ইউনিফর্মটাও যেন নতুন হয়ে গেছে তার চোখে, কারণ সেটা ‘দাদুর দেওয়া’। স্নেহা তাকে গেট পর্যন্ত দিয়ে বলেছিলেন, “আজ ক্লাসে নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনাবি, ভুল করলেও ভয় পাবি না।” স্কুলের ছেলেমেয়েরা এখন আগের মতো চোখ বড় করে তাকায় না, কিন্তু ফিসফাস বন্ধ হয়নি। কেউ বলে, “ও তো বস্তি থেকে আসে।” কেউ বলে, “ও তো কবিতা পড়ে? হাসি পায়।” সাগর মুখ নিচু করে ক্লাসে ঢোকে। আজ ক্লাসে কবিতা আবৃত্তির দিন। শিক্ষিকা মল্লিকা মিস ক্লাসে দাঁড়িয়ে বলেন, “আজ আমরা যার লেখা শুনব, সে আমাদের মাঝে নতুন, কিন্তু তার লেখার সাহস খুব বড়।” সাগরের নাম ডাকা হয়।
সাগর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার হাতে কাঁপা কাঁপা খাতা। তার লেখা কবিতার নাম—“আমার পাখা”। সে পড়ে—
“তালপাতায় কাটা আমার ডানা,
জলেভেজা স্বপ্নের মানা।
হাওয়ার ঘ্রাণে ছুটতে চেয়েছি,
একদিন আকাশ ছুঁই—এই চেয়েছি।”
শুরুতেই পেছন থেকে একটা হাসির শব্দ ওঠে। “পাখা দিয়েই আকাশ ছোঁবা?”—একটা ছেলেমেয়ে খিক খিক করে ওঠে। সাগরের গলা কেঁপে যায়। সে চুপ করে যায় মাঝপথে। মল্লিকা মিস থামান না। সাগরের চোখে জল এসে গেছে—কিন্তু সে থামে না। আবার পড়ে—
“জানালার ধারে বসে পড়ি,
ভবিষ্যতের দিকে আমি চড়ি।
আমার পাখা ভাঙা হলেও ঠিক,
ডানায় আমার স্বপ্ন লিখি।”
এইবারে পুরো ক্লাস চুপ। কেউ আর হাসে না। সাগরের কণ্ঠে কাঁপন থাকলেও চোখে ছিল দৃঢ়তা। আবৃত্তি শেষ হতেই মল্লিকা মিস উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেন। ধীরে ধীরে বাকিরাও হাততালি দেয়। সাগরের চোখ ঝাপসা—কিন্তু সেটা অপমানের নয়, জয়যাত্রার অশ্রু। তার জীবনে এটাই প্রথম ‘শ্রদ্ধা’ যেটা বই থেকে নয়, নিজের লেখা থেকে পেয়েছে।
ক্লাস শেষে স্নেহা তাকে নিতে এলে সাগর প্রথমে কিছু বলেনি। শুধু খাতা তুলে দিল। স্নেহা পড়ার পর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “তুই আজ আমাকে গর্বিত করেছিস। মনে রাখিস, কান্না যদি আসে, তো সেটাও সাহসের একটা রূপ।” সাগর মাথা নিচু করে হেসে ফেলে। সেই হাসিতে ছিল বহু দিনের জমে থাকা অপমানের পাথর, আর আজকের প্রাপ্তির আলো। এবার সে জানে, তার পাখা ভাঙা হলেও, তার ডানায় লেখা আছে—“আমি উড়ব।”
–
স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিন। রঙিন পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে চত্বর, মঞ্চে লাগানো হয়েছে আলোকসজ্জা, চারদিকে উচ্ছ্বাস। শিক্ষার্থীরা গলায় গাঁদাফুলের মালা পরে প্রস্তুত, অভিভাবকদের মুখে উৎসাহ আর ক্যামেরা। সবার মাঝে সাগর দাঁড়িয়ে রয়েছে এক কোণে—চুপচাপ, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। তার হাতে একটি তালপাতার পাখা, কিন্তু সেটা সাদামাটা নয়—সে নিজে পেইন্ট করেছে, রঙিন তুলিতে লিখেছে—“স্বপ্নের ডানা”। মঞ্চে উঠার আগে স্নেহা তার পাশে এসে দাঁড়ান, বলেন, “তুই যা করবি, তাতে শুধু তুই নয়, আমরা সবাই উড়বো।” অভিষেক পিছন থেকে হাসেন, ক্যামেরা হাতে বলেন, “এই মুহূর্তটা আমি ধরে রাখতে চাই… কারণ এটা ইতিহাস।”
মঞ্চে সাগরের নাম ঘোষণা হয়—“এইবার আমরা শুনবো পঞ্চম শ্রেণির সাগর মণ্ডলের লেখা কবিতা—‘তালপাতার পাখা ও স্বপ্নের ডানা’। সাগর মঞ্চে উঠে দাঁড়ায়। আলো তার মুখে পড়ে, আর সে দেখে—পুরো অডিটোরিয়ামে কেউ হাসছে না, কেউ কটাক্ষ করছে না, সবাই অপেক্ষা করছে তার কথার জন্য। সে খাতা খুলে না, শুধু মুখস্থ বলে যেতে থাকে—
“আমার পাখা তালপাতার,
ভাঙা নয়, বাঁচার পথচার।
রেলের কামরা, গরমের ধোঁয়া,
তার মাঝেও স্বপ্ন ফোটা।
আমি স্কুলে গেছি, না ছুটেছি?
এই প্রশ্নে নিজেই ভিজেছি।
তবু একদিন ডানায় ভর,
উড়তে শিখেছি মন মজার।”
শব্দ শেষ হতেই হলজুড়ে হাততালি। কেউ উঠে দাঁড়িয়ে তালি দেয়, কেউ চোখ মুছতে থাকে। সাগরের চোখে জল—কিন্তু সেটা কান্না নয়, নীরব বিজয়ের আনন্দ। হরিলাল দাদু মঞ্চের নিচে বসে আছেন, মুখে গর্ব আর মুখরতা। স্নেহা চোখ ভিজিয়ে ফেলেন, অভিষেক ক্যামেরা নামিয়ে শুধু তাকিয়ে থাকেন। মঞ্চ থেকে নামার সময় সাগর অনুভব করে—আজকের দিনের মতন সে কখনোই এতটা ‘পুরো’ ছিল না।
সন্ধ্যে ঘনায়ে এলে অনুষ্ঠান শেষ হয়। সবাই বাড়ি ফেরে। সাগর প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজের হাতে রঙ করা তালপাতার পাখাটি ধরে বলে ওঠে, “তুই জানিস পাখা, আমি আজ সত্যি উড়লাম।” পেছনে স্নেহা আর অভিষেক হাঁটছেন, আর সাগরের পেছনে যেন ছায়ার মতো হেঁটে চলেছে সমাজ, সময়, পরিবর্তন। আজ তালপাতার সেই পাখা কেবল গরমে বাতাস দেয় না—ওটা এখন এক শিশুর স্বপ্নের চাবিকাঠি, এক জাতির বিবেকের প্রতিফলন।
***




