সুদীপ্তা চক্রবর্তী
পর্ব ১: বৃষ্টিভেজা স্টেশন আর নোনতা হাওয়া
রাতের ট্রেনটা ঠিক সময়েই ছাড়ে, কিন্তু মনের ভেতর যেন কিছুই ঠিক সময়ে হচ্ছিল না। জানলার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম—কালো আকাশের মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি, আর ট্রেনের ছুটে চলা শব্দ যেন নিজের মনকেও ছুটিয়ে নিচ্ছে কোথাও। পাশে কেউ নেই, শুধু একটা ব্যাগ আর বুক পকেটে ভরা কিছু অপূর্ণ কবিতা। আমার দিঘা যাত্রা শুরু হলো একটা ভাঙা সন্ধ্যা থেকে, বৃষ্টির সঙ্গে যার পুরোনো বোঝাপড়া ছিল।
ট্রেনের কামরায় হালকা আলো, কিছু আধো ঘুমে থাকা মুখ, আর আমি। রাত বাড়তে বাড়তে বৃষ্টি বাড়লো। জানালার কাঁচে পড়ে থাকা জলের ফোঁটাগুলো একসঙ্গে গড়িয়ে চলছিল, ঠিক যেমন করে পুরোনো স্মৃতিগুলো জড়াজড়ি করে মনের জানালা দিয়ে ঝরে পড়ে। দিঘা—এই শব্দটা আমার কাছে শুধু একটা গন্তব্য নয়, বরং একটা আত্মবিশ্বাসহীন ভোরের প্রতিশ্রুতি। কখনো গিয়েছি বন্ধুর সঙ্গে, কখনো পরিবারের সঙ্গে, কিন্তু এবার একা।
সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ট্রেন দিঘা স্টেশনে পৌঁছল। বাইরের আকাশ ধূসর, হালকা বৃষ্টির ধারা তখনো নেমে আসছে শহরের ঘুমন্ত মুখে। প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই এক ধরণের শান্তি ছুঁয়ে গেল—যেন একরাশ নোনতা হাওয়া বলে উঠল, “ফিরে এসেছো?” ট্রেন থামতেই মানুষজন নেমে গেল, কোলাহল একটু হলেও তৈরি হলো, কিন্তু আমার ভেতরটা তখনো নিঃশব্দ।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা অটো ধরলাম নিউ দিঘার দিকে। রাস্তা ফাঁকা, রিকশার চাকায় জলের ছিটে। আশেপাশের দোকানগুলো তখনও খোলেনি। কাঁচা-পাকা বাড়ির ছাদে বৃষ্টির টিপটিপ আওয়াজ, গাছের পাতায় জমে থাকা জল ঝরে পড়ছে একেকটা ঢেউয়ের মতো। হোটেলে পৌঁছে রিসেপশন পেরিয়ে ঘরের চাবি হাতে পেলাম। ঘরটা সাদামাটা, কিন্তু জানালার বাইরে সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়—এটাই আমার চাওয়া ছিল।
কাপড় বদলে চুপচাপ জানালার সামনে বসলাম। জানালার কাঁচে হাত রেখে দেখছিলাম, কীভাবে বৃষ্টি আর বাতাস একসঙ্গে নাচছে। ঠিক নিচে একটা ছোট চায়ের দোকান দেখা যায়, ছাতার নিচে এক ভদ্রলোক চুলায় জল বসিয়েছেন, ধোঁয়ার সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে তার মুখের রেখাগুলো।
সকাল আটটা নাগাদ আমি বেরোলাম সৈকতের দিকে। ছাতা নিইনি, শুধু একটা পাতলা শাল গায়ে জড়িয়ে নিলাম। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো—শহর থেকে কেটে পড়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না। চারদিকে সাগরের শব্দ, একটা কুয়াশার ধরা-ছোঁয়ায় থাকা আবহ, আর আমার নিঃসঙ্গ হাঁটা—সব মিলে যেন একটা সিনেমার শট তৈরি হচ্ছিল।
নিউ দিঘার সৈকতে পৌঁছনোর পর হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। সমুদ্র তখনো কিছুটা আড়ালে, কিন্তু তার শব্দ পৌঁছচ্ছে—তীব্র নয়, বরং ধীরে ধীরে সুর বাঁধা কোনো প্রার্থনার মতো। পায়ের নিচে বালি নরম, কিছু জায়গায় কাদা। আমি জুতো খুলে ফেললাম। পায়ের তলায় সেই শীতল আদ্রতা ছুঁয়ে গেল মনকেও।
সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়াতেই একটা ঢেউ এসে ছুঁয়ে গেল আমার পায়ের পাতা। আমি একটু পিছিয়ে গেলাম। আকাশ তখনও ধূসর, সূর্যের মুখ দেখা যায় না, কিন্তু ঢেউয়ের গায়ে আলো যেন নিজেই খেলা করে চলেছে। দূরে কয়েকজন জেলে নৌকা ঠেলছেন, তাদের গলার আওয়াজ স্পষ্ট নয়, যেন ছায়ার মতো ভেসে আসছে।
একটা ছোট দোকানে গিয়ে একটা গরম চা নিলাম। ভেতর থেকে ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে সৈকতের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দোকানদার বলল, “এই সময় খুব কম লোক আসে দিদি। কিন্তু সমুদ্রটা বর্ষায় সবচেয়ে সুন্দর।” আমি মাথা নেড়ে হাসলাম, কিছু বলিনি। সত্যিই তো, এই নির্জনতা, এই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একাকীত্ব—এটাই তো ছিল আমার খোঁজ।
চা শেষ করে সৈকতের দিকে আবার এগিয়ে গেলাম। একটু দূরে একটা কুড়িয়ে পাওয়া শামুক হাতে তুলে নিলাম—রঙচটা, কিন্তু সুন্দর। মনে হলো, এই ছোট্ট খোলটাই বুঝি আমার ভেতরের শূন্যতাকে ঢেকে রাখতে চায়।
ফিরে এসে হোটেলের বারান্দায় বসে একরাশ ভাবনার মধ্যে হারিয়ে গেলাম। ভেজা হাওয়া চুল এলোমেলো করে দিলো। চোখ বন্ধ করে সেই ঢেউয়ের গর্জন শুনছিলাম—ভিতর থেকে যেন একটা অজানা সুর বেরোচ্ছে।
প্রথম দিনের প্রথম সকালেই দিঘা আমাকে ভরিয়ে দিল। নীরবতার মধ্যেও কত শব্দ, একাকীত্বের মধ্যেও কত আলাপ—বর্ষার দিঘা যেন আত্মার আয়না।
পর্ব ২: সমুদ্রের সামনে একলা চা
সকালটা অনেকটা ধোঁয়াশার মধ্যে গড়িয়ে গেল। হোটেলের ঘরের জানালা দিয়ে দেখা সমুদ্রটা যেন কাছে আসতে চাইছে, কিন্তু আমি তখনও ঘর পেরিয়ে পুরোপুরি তার সামনে দাঁড়াইনি। তবু একটা টান ছিল, মনের গোপন কোথাও জমে থাকা এক চেনা ঘ্রাণের মতো।
সকাল ন’টার পর একটু রোদ উঠল, যদিও সেটা বর্ষার রোদ—চোখ ধাঁধানো নয়, বরং ম্লান, গায়ে-মাখা আলো। হাঁটা দিলাম সৈকতের দিকে, হাতে শুধু একটা চটের ব্যাগ আর মানিব্যাগ। রাস্তার পাশে দোকানগুলো ধীরে ধীরে খোলার চেষ্টা করছে। তাজা মাছ আসছে, ঢাকনা খুলছে কাঁচের বোতলের, পুজোর ধূপ জ্বলছে। কিন্তু আমি লক্ষ্য হারাচ্ছি সমুদ্রের শব্দে—একটা বিশাল কিছু যেন ডাকছে আমায়, আবার গিলে ফেলতেও চাইছে।
সৈকতের ধারে গিয়ে চুপ করে দাঁড়ালাম। পা ফেলে দিলাম বালির ওপর। কাদা নেই এখানে, শুধুই সোনালি বালি—বর্ষায় আরও বেশি কোমল আর ভেজা। ঢেউ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, আবার সরে যায়। ঠিক যেন কেউ কাছে এসে কিছু বলতে গিয়েও ফিরে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে রইলাম মিনিট দশেক, শুধু শুনছিলাম। চোখ বন্ধ করলেই কানে আসছে ঢেউয়ের ঢেউ খেলা, আর মনে হচ্ছে—এ যেন কোনো না বলা কথার সুর।
একটা ছোট কাঠের বেঞ্চ খালি ছিল। বসলাম সেখানে। এক কোণে ছাতার নিচে একটা চায়ের দোকান। বয়স্ক এক মানুষ, গায়ের গামছা ভেজা, চোখে মোটা চশমা। আমি ইশারা করতেই হেসে চা ধরিয়ে দিলেন।
“এই সময়ে খুব কম মানুষ আসে, দিদি,” বললেন তিনি, কাপটা এগিয়ে দিতে দিতে।
আমি হাসলাম, “বর্ষায় দিঘা অনেক বেশি সুন্দর লাগে।”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, এই সময়টা সমুদ্রের আসল রূপ দেখা যায়। লোকজন নেই, শব্দ নেই, শুধু ঢেউ আর হাওয়া।”
চায়ের কাপে ভর করে উঠছে ধোঁয়া। চুমুক দিলাম। নোনতা হাওয়া আর গরম চায়ের তীব্রতা একসঙ্গে মিশে একটা অদ্ভুত অনুভব তৈরি করল। চা-ওয়ালার পাশে আরও কিছু মানুষ বসে আছে—কেউ ছাতা মেরামত করছে, কেউ খালি পা রেখে চুপচাপ সিগারেট টানছে।
চায়ের কাপ শেষ করে আবার হাঁটা দিলাম বালির ওপর দিয়ে। ঢেউয়ের দিকে এগিয়ে গেলাম যতটা সম্ভব। তারপর দাঁড়িয়ে রইলাম। আকাশে তখন মেঘ জমতে শুরু করেছে আবার। কিন্তু আলো আর ছায়ার মিশ্রণে সমুদ্রের রঙ বদলে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। কখনো ধূসর, কখনো সবুজাভ, আবার কখনো একেবারে কালচে নীল।
একটা ছোট বাচ্চা বালিতে বসে ঝিনুক কুড়াচ্ছে। তার মা একটু দূরে বসে, পলিথিন দিয়ে মাথা ঢেকেছে। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “পাচ্ছো কিছু?”
বাচ্চাটা মাথা নাড়ল, “দেখুন তো, এটা সুন্দর?”
একটা সাদা ঝিনুকের খোল, অর্ধেক ভাঙা, তবু তার গায়ে সূর্যের আলো পড়ে যেন চকচক করছে।
আমি বললাম, “খুব সুন্দর। মনে রেখো, কিছু জিনিস ভাঙলেও তার সৌন্দর্য হারায় না।”
তার মা হেসে বললেন, “আপনি কি লেখিকা?”
আমি চমকে উঠলাম। “না তো! আপনি কেন বললেন?”
“এই কথাটা এমন করে কেউ লেখে…”
আমি মৃদু হাসলাম। কথাটা নেহাতই হাওয়ায় বলা, কিন্তু কেউ শুনে ফেললে তার একটা ব্যাখ্যা তৈরি হয়। জীবন বোধহয় সেটাই—অনেক কিছু বলা হয় নিজের মতো, কিন্তু কেউ শুনে নিলে তা কবিতা হয়ে যায়।
সমুদ্র তখন একটু রেগে উঠছে। বৃষ্টির ঝিরিঝিরি ধারা আবার ফিরে এল। ছাতা না থাকলেও পিছিয়ে এলাম না। কাঁধে শালটা চাপিয়ে দিলাম, হাত পকেটে। স্যান্ডেলের ফাঁক দিয়ে বালির ভেজা স্পর্শ যেন মনে খোদাই হয়ে থাকল। কিছু পাখি হঠাৎ উড়ে গেল সমুদ্রের দিক থেকে, যেন বিদায় জানিয়ে গেল এই মুহূর্তটাকে।
একটা ছোট দোকান থেকে একটা পাকা পেয়ারা নিলাম। ছুরি দিয়ে কেটে, লবণ-লঙ্কা দিয়ে মুখে দিলাম। আহা, এইটুকু টক-নোনতা স্বাদেই কি যেন এক ভরপুর সুখ! মায়ের মতো কেউ বলত, “বর্ষায় এইসব খেও না, ঠান্ডা লাগবে।” কিন্তু আজ কেউ নেই বারণ করতে, কেউ নেই আদর করে ঠান্ডা সারিয়ে দিতে—তবু বর্ষার পেয়ারা যেন আমার সঙ্গে একান্ত।
ফিরে আসার পথে হঠাৎ দেখি একটা লোকাল ছেলেটা হাততালি দিয়ে গান ধরেছে—পুরোনো বাউল গান। “মন রে, তুমি কেনে ঘর ছাড়িলে…” আমি একটু দাঁড়ালাম। তার চোখে কোনো চাহনি নেই, মুখে কোনো দাবি নেই, শুধু ভিজে কাপড়ে গলায় সুর।
আমার মনে হচ্ছিল, আমি সত্যিই যেন নিজের ঘর ছেড়ে কিছু খুঁজতে বেরিয়েছি—নাম নেই তার, ঠিকানা নেই, শুধু একটা নরম ঢেউয়ের মতো টান।
হোটেলে ফিরতে ফিরতে আবার বৃষ্টি বাড়ল। বারান্দায় বসে গায়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ভাবছিলাম—এই এক কাপ চা, এই ঢেউয়ের ধ্বনি, এই একলা বৃষ্টি—সবই তো জীবনের সেই ক্ষণিক শান্তি, যা আমরা শহরের কোলাহলে হারিয়ে ফেলি।
পর্ব ৩: তালসারির পথে বৃষ্টিঘেরা রিকশা
দিঘার বৃষ্টি আমার রোজকার একঘেয়ে গৃহস্থ জীবন থেকে যেন আলাদা এক জানালা খুলে দিয়েছে। সকালে উঠে দেখি জানালার বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু মন আজ অন্যরকম। হঠাৎ করেই মনে হলো, আজ নিউ দিঘা পেরিয়ে একটু দূরে যাওয়া যাক—তালসারি, যেখানে সমুদ্র, নদী আর বন একসাথে মিশেছে এক রহস্যময় অথচ নরম আলোয়।
রিসেপশনের লোকটা বলল, “তালসারি যাবেন? বৃষ্টি আছে, কিন্তু রিকশা পাবেন। জায়গাটা বর্ষায় একদম কবিতা হয়ে ওঠে।” আমি হেসে মাথা নেড়ে বললাম, “ঠিক সেইজন্যই তো যেতে চাই।” একটা ব্যাটারিচালিত রিকশা ঠিক করে দিল সে। চালক বছর পঁয়ত্রিশের, নাম বলল ‘মনোরঞ্জন’। মুখে দাড়ি, কাঁধে গামছা, চোখে হাসি।
“আপনি একা যাচ্ছেন ম্যাডাম?”
“হ্যাঁ। একটু নির্জনতায় থাকতে ভালো লাগে।”
“তাহলে তালসারি একদম ঠিক জায়গা। নদীটার নাম বুঝি জানেন না?”
“না। কী নাম?”
“সুবর্ণরেখা।”
সুবর্ণরেখা। কী সুন্দর নাম! মনে হলো, এই নামের মধ্যেই রয়েছে একটা গল্প। একটা স্বর্ণালি রেখা, যা কোনো সময়ের পটে হঠাৎ চলে যায় সমুদ্রে মিলিয়ে। রিকশা ছুটতে শুরু করল। কাঁচা-পাকা রাস্তা, মাঝে মাঝে বড়ো গর্তে পানি জমে আছে, তবুও মনোরঞ্জনের হাত যেন সুরে বাঁধা—রিকশা চলছিল ছন্দে, হালকা দুলুনিতে।
রাস্তার দু’পাশে নারকেল গাছ, শিউলি গাছের নিচে পড়ে থাকা সাদা ফুল আর মাঝে মাঝে জঙ্গল ছুঁয়ে যাওয়া বাতাস। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের আওয়াজ হারিয়ে গেল। শুধু বৃষ্টির শব্দ, রিকশার চাকা আর দূরের গরুর গাড়ির ঘণ্টা।
“তালসারি আসছে,” মনোরঞ্জন বলল।
একটা ফাঁকা জায়গা, হাতে গোনা কয়েকটা চায়ের দোকান, আর দূরে দেখা যাচ্ছে সুবর্ণরেখা নদীর মোহনা। নদীটা তখন পূর্ণ জোয়ারে, আর ঠিক তার গা ঘেঁষে বন। ওপারে ওড়িশার অংশ, সবুজে ঢাকা। আমি কিছু না বলে নদীর ধারে হাঁটতে লাগলাম। বৃষ্টি তখন হালকা, বাতাস ভিজে কিন্তু তাজা।
কাদা পেরিয়ে একটু বালির জমিতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামনে সুবর্ণরেখা ঢুকে যাচ্ছে সমুদ্রে। দুই জল একসাথে মিশে গিয়ে এক আশ্চর্য ধ্বনি তৈরি করছে, যেন তারা পরস্পরের চেনা অথচ অচেনা। এমন এক ভৌগোলিক প্রেম—যেখানে নদী তার যাত্রাপথের শেষ দেখে সমুদ্রের অনন্ততায় মিশে যায়।
দূরে কিছু মৎস্যজীবী নৌকা ঠেলছে, জল ঠেলে যাচ্ছে তাদের হাঁটু। জালের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা, মাথায় বাঁশের টুপি। কতটা একাকীত্বে দিন কাটে তাদের! অথচ এই প্রকৃতির মধ্যেই যেন তারা সবচেয়ে বেশি জড়ানো। তারা শব্দ করে না, মেঘও নয়, কিন্তু তাদের নৌকা যেন একটা সুর বাঁধে নদীর ভেতর।
হঠাৎ এক চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, একটা ছোট ছেলে পলিথিনে মোড়া কলম আর ডায়েরি বিক্রি করছে। চোখে হাসি, গলায় ভেজা জামা। আমি তার কাছ থেকে একটা ছোট ডায়েরি কিনে নিলাম।
“কী লিখবেন এটায়?” সে জিজ্ঞেস করল।
“এই মুহূর্তটা,” আমি বললাম।
বসে চা খেলাম তালপাতার কাপেই। গরম জল, একটু কড়া, তবু সেই বৃষ্টির সঙ্গে মিশে সে চা ছিল যেন শরীর-মন উষ্ণ করে দেওয়া এক মুহূর্তের বন্ধন।
চা খেয়ে আবার হাঁটতে লাগলাম নদীর দিকে। কোথাও কোনো দাগ নেই, কেবল বালির ওপর পায়ের ছাপ আর পেছনে জলে মিশে যাওয়ার শব্দ। তালসারির এই দুপুরটা কোনো শব্দ করে নয়, চুপিচুপি আমার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই জায়গার নির্জনতা, বৃষ্টির পরশ, আর সুবর্ণরেখার শেষ নিঃশ্বাস—সব মিলে একটা গভীর অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।
ফিরতি রাস্তায় মনোরঞ্জন বলল, “আবার আসবেন তো, ম্যাডাম?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম, “হ্যাঁ, আসব। কারণ কিছু জায়গা, একবার দেখলেই মন ভর্তি হয় না।”
দিঘায় ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেছে। বৃষ্টি কমেছে, আকাশে ছেঁড়াপাওয়া রোদ। কিন্তু মনটা তখনো তালসারির ভেজা বাতাসে ভেসে আছে। মনে হচ্ছিল, আমি একটা জলরেখায় হেঁটেছিলাম—যার নাম সুবর্ণরেখা।
পর্ব ৪: হোটেলের বারান্দায় ভেজা দুপুর
তালসারি থেকে ফিরে এসে ক্লান্ত শরীরটা একরকম জলের মতো গলে গিয়েছিল বিছানায়। ঘরের মধ্যে তখনও ভিজে গন্ধ, জানালার কাচে কিছু ফোঁটা জমে আছে—বৃষ্টির অবশিষ্ট চিহ্ন। কিন্তু ভিতরটা ছিল অদ্ভুতভাবে শান্ত। তালসারির নির্জনতা আর সুবর্ণরেখার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মুহূর্তগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
হোটেলের ঘরের দেয়ালে হালকা সাদা আলো। ঘড়ি বলছে দুপুর একটা পার হয়ে গেছে, কিন্তু বাইরে দেখে বোঝার উপায় নেই। মেঘলা আকাশে আলো যেন মুখ লুকিয়েছে। আমি একটা সাদা কুর্তি পরে, নীল শাল গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় এসে বসলাম। বারান্দার একপাশে একটা ছোট টেবিল, তাতে রাখা জল ভর্তি গ্লাস, আর জানালার বাইরে দেখা যাচ্ছে সমুদ্ররেখা, আজ একটু বেশি ছায়াময়।
হোটেলের কিচেন থেকে একটা ফোন এল—“ম্যাডাম, দুপুরের খাবার রেডি। আপনি ঘরে নেবেন না বারান্দায়?”
আমি বললাম, “বারান্দায় এনে দিন। আর একটু খিচুড়ি হলে ভালো হয়।”
খুব সাধারণ অনুরোধ, কিন্তু আজ যেন মনে হল এই সাধারণতাই আমার প্রয়োজন। একটু পরে ছোট স্টাফ ছেলেটি এসে রেখে গেল একটা ট্রে—মাটির হাড়িতে গরম গরম খিচুড়ি, পটল ভাজা, সাদা টক দই আর সঙ্গে লঙ্কা-লবণ-মাখা কাঁচা পেঁয়াজ। এমন একটা সাদামাটা খাবার, অথচ আজ তার মধ্যেই যেন সব অভিজাততা লুকিয়ে।
প্রথম চামচ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ বুজে গেল। গরম ভাপে ভিজে উঠল গলা, আর ভেতরে জমে থাকা ক্লান্তিটা যেন একটু একটু করে গলে গেল। তালসারির ভেজা জুতো তখন বারান্দার কোণে, আর আমি চুপচাপ বসে খাচ্ছি। কাঁটা চামচের নেই কাজ এখানে—হাত দিয়েই চালের ভেজা গন্ধ আর দইয়ের ঠান্ডা ছোঁয়া নিয়ে খেয়ে চলেছি।
খাওয়া শেষে চেয়ারটা একটু পিছিয়ে বসলাম। সামনে বৃষ্টি নামল আবার। এতক্ষণ পর বুঝলাম—এই জায়গাটায় সময় থেমে থাকে না, বরং আস্তে আস্তে ঢেউয়ের মতো বদলায়। রোদ আসে, সরে যায়, বৃষ্টি পড়ে, আবার থামে, যেন প্রকৃতিই তার কবিতা লেখে দিনের ফাঁকে ফাঁকে।
হাতের মুঠোয় সেই ছোট ডায়েরি, যা কিনেছিলাম তালসারির ছেলেটার কাছ থেকে। কলমটাও সাথে ছিল। প্রথম পাতায় শুধু একটা লাইন লিখলাম—
“এই দুপুরে কেউ নেই, তবু সমুদ্রের পাশে আমি একা নই।”
এই লেখাটা লিখেই আবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। মাথার ওপরে ছাউনি থেকে টুপটাপ জল পড়ছে, কিন্তু আমি নির্লিপ্ত। নিচের রাস্তায় কিছু মানুষ ছাতা মাথায় হাঁটছে, এক ভদ্রলোক কাঁধে পলিথিন ঝোলানো, আর এক মহিলা বাচ্চার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন বালির দিকে।
বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে একটা শাল জড়িয়ে একটু ঝুঁকে বাইরে তাকালাম। সমুদ্রের মুখ যেন আজ একটু বেশি চুপ। ঢেউ আছে, কিন্তু গর্জন নেই। বৃষ্টির ফোঁটা সেই শব্দগুলো ঢেকে দিয়েছে। মনে হলো—সমুদ্র যেন আজ মনের মতোই নিরুত্তর।
একটা ঢেউ হঠাৎ বেড়ে এল, অনেকটা ভেতরে এসে ফেটে গেল। সেই শব্দটা কানে এল বড় গম্ভীরভাবে। মনে হলো, এই ঢেউ যেন প্রশ্ন করছে, “তুমি কি ভালো আছো?” আমি মুখে কিছু বললাম না, শুধু চোখ বন্ধ করে একটু হেসে ফেললাম।
ঠিক তখনই হোটেলের পাশের ঘরে কেউ হারমোনিকায় বাজাতে শুরু করল। একটা পুরোনো সুর, যেন রবি ঠাকুরের কোনো গান, যেটার কথা মনে পড়ছে না কিন্তু সুরটা গেঁথে আছে অনেকদিনের। আমি একমুহূর্ত থেমে শুনলাম। গান না হলেও, সেই সুরটা যেন এই দুপুরের বৃষ্টি আর আমার একাকীত্বের মধ্যে মিশে একরকম সম্পর্ক তৈরি করল।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল—কলকাতা থেকে মা। “খুব বৃষ্টি পড়ছে কলকাতায়, তুই ভালো আছিস তো?”
আমি বললাম, “খুব ভালো আছি। বরং এই প্রথম মনে হচ্ছে, নিজের সঙ্গে আছি।”
মা একটু চুপ করে থেকে বলল, “তা হলে ঠিক আছে, ফিরে এসে গল্প করিস।”
হ্যাঁ, আমি ফিরব। কিন্তু তার আগে এই ভেজা দুপুরটা আমার সঙ্গে থাকবে—চা-এর কাপে, খিচুড়ির গন্ধে, আর সেই হারমোনিকার সুরে। দিঘার এই হোটেলের বারান্দা যেন একটা অস্থায়ী ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটা আর মনের কুয়াশা একসাথে গলে যাচ্ছে।
পর্ব ৫: লোকাল বাজারে সমুদ্রের গন্ধ
বিকেলের দিকে বৃষ্টি খানিকটা কমে এলে বারান্দা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল স্টাফ বলল, “দিদি, আজ শুক্রবার, বাজার জমবে। মাছ, ঝিনুক, হাতের কাজ—সব পাবেন। ঘুরে আসুন।”
আমি বললাম, “চাই-ই তো, শহরের কোলাহল ছাড়া একটা প্রাণবন্ত ভিড়ও দরকার মাঝে মাঝে।”
ছাতা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তায় জমে থাকা জলের গর্ত এড়িয়ে, একপাশ দিয়ে সাবধানে চললাম। বাতাসে তখন একটা ঠান্ডা ভিজে গন্ধ—যা কেবল দিঘারই হতে পারে। সমুদ্র আর মানুষের মিশ্রণে তৈরি এক আশ্চর্য স্বাদ, যা কোনও শহরে মেলে না। রাস্তার ধারে ছোট ছোট দোকানগুলো রঙিন প্লাস্টিক শেডে ঢাকা, কোথাও কোথাও জল টপ টপ করে পড়ছে।
বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিশাল মাছের ভান্ডার। বিশাল সব কাঁকড়া, কুচো মাছ, পমফ্রেট, বেটকি—আর তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে লোকজন দরাদরি করছে। গলায় মোটা সোনার চেন পরা এক মহিলা খিলখিল করে হাসছেন—“এইটা কত বললেন? আরে ভাই, কলকাতায় তো এর চেয়ে কমে পাই!” বিক্রেতা ঠোঁটে একটা বিরক্তির হাসি রেখে বলল, “ম্যাডাম, দিঘার টাটকা মাছ, দরকার হলে টেস্ট করেই নিন!”
এই ঠাট্টা-মশকরা, এই বাজারের শব্দ, পায়ের নিচে কাঁদা আর মাথার ওপরের ভেজা আলো—সব মিলিয়ে যেন জীবনের এক চেনা ছন্দে ঢুকে পড়েছি। আমি মাছ কিনতে আসিনি, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলাম। একটা বেটকি মাছ ঝলকে উঠল আলোয়, আর তার গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা—একটুও গা ছুঁয়ে গেল মনে।
বাজারের একটু ভিতরের দিকে ছোট ছোট ঝিনুক আর সি-শেল বিক্রির দোকান। এক দোকানের সামনে থেমে গেলাম। মালিক এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, গলায় একটা সুতোর মালা, মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি।
“দেখুন তো ম্যাডাম, এই ঝিনুকটা, নিজের হাতে তুলেছি। এর রঙ নিজেই বদলায় রোদে-বৃষ্টিতে।”
আমি বললাম, “আপনি কি নিজে সাগরে যান?”
“হ্যাঁ, সন্ধ্যের ঢেউ এলে একটু দূরে গিয়ে সংগ্রহ করি। একসময় মাছ ধরতাম, এখন ঝিনুক তুলে সাজাই।”
আমি একটা ছোট্ট সাদা ঝিনুক নিলাম, গায়ে হালকা নীল রেখা। দাম মাত্র পঁচিশ টাকা, তবু দোকানদার এমন ভাবে তুলে দিল, যেন একটা ইতিহাস দিচ্ছে হাতে।
“এইটা রাখবেন একটা কাগজে মুড়ে, আর মাঝে মাঝে রোদে রেখে দেবেন,” বলল সে।
আমি হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, এরা যে শুধু বিক্রি করে তাই নয়—তারা নিজেদের সময়টাও আমাদের দেয়। প্রতিটা জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা গল্প, একটা প্রেক্ষাপট, একটা অপেক্ষা।
বাজারের শেষ প্রান্তে পৌঁছলাম। সেখানে হস্তশিল্পের স্টল, নারকেল দিয়ে তৈরি ল্যাম্প, কাঠের অলংকার বক্স, আর হাতে আঁকা কাঁসার থালা। এক জায়গায় চোখ আটকে গেল—একটা পুঁতির মালা। গাঢ় নীল আর সাদা পাথরের মাঝখানে একটা ছোট্ট শঙ্খ ঝুলছে। মালিক বলল, “এইটা ‘সাগরের চোখ’ নামেই বিক্রি হয়। পরলে মন শান্ত থাকে।”
আমি হাসলাম। শান্তি কি পাথরে থাকে? নাকি এমন বাজারে, যেখানে শোরগোলের মধ্যেও একটা আলাদা নির্জনতা থাকে?
একটা মালা কিনে ফেললাম। ঝিনুকের সঙ্গে এইটাও রাখব। মনে হলো, বাড়ি ফিরলে হয়তো এইসব জিনিসগুলোই বলে দেবে, দিঘার দুপুরগুলো কেমন ছিল।
বাজার থেকে বেরিয়ে চায়ের দোকানে ঢুকলাম। টিনের ছাদে বৃষ্টির ফোঁটা আবার জোরে পড়ছে, গন্ধটা আবার তাজা হল। দোকানের লোক বলল, “কাটিং দেব, না পুরোটাই?”
আমি বললাম, “পুরোটাই দিন। আজ একটু বেশি দরকার।”
চা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে বাজারের ব্যস্ততা দেখছিলাম। কত মুখ, কত গল্প, কত চেনা অচেনা স্পর্শ! একজন ছাতা ধরে একটা পুরোনো হিন্দি গান গাইছে—“জিন্দাগি কা সাফর, হ্যায় ইয়ে ক্যায়সা সাফর…”
সত্যিই তো, জীবন একটা সফরই তো—যেখানে বাজারের কোলাহল আর সমুদ্রের নীরবতা পাশাপাশি থাকে।
চা শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছিলাম। পথটা তখনও কাদা, কিন্তু মনটা একেবারে পরিষ্কার। কিছু মুহূর্ত জমা হলো আমার ব্যাগে—একটা ঝিনুক, একটা মালা, আর কিছু হাসিমুখ। সেগুলো হয়তো আর কোনোদিন কাজে লাগবে না, কিন্তু মনে থাকবে—একটা ভেজা বিকেলে, সমুদ্রের গন্ধ মিশে ছিল বাজারের প্রতিটা দামে।
পর্ব ৬: বিদায়ের আগে এক ফোঁটা ঢেউ
শেষ রাতটা দিঘার ঘরে কাটল এক নিঃশব্দের ভেতর। বৃষ্টির শব্দ থেমে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু জানালার কাচে সেই ফোঁটা-রেখা রয়ে গেছে—যেমন থেকে যায় কারও ছোঁয়ার দাগ, সময় মুছে দিলেও। বারান্দার দরজা খোলা রেখেই শুয়ে পড়েছিলাম, এক হাতে মাথা রেখে, অন্য হাতে ছোট্ট সেই ডায়েরিটা উলটে-পালটে দেখছিলাম।
সকালে ঘুম ভাঙতেই জানালা দিয়ে রোদের রেখা এসে পড়েছে বিছানায়। আজ সূর্য উঠেছে এক নতুন আলো নিয়ে—মেঘ কেটে গিয়েছে অনেকটা। আজই ফিরতে হবে, ট্রেন দুপুর একটা নাগাদ। সময় কম, অথচ মনের ভিতর একরাশ ভার। বিদায় বলা সবসময়েই কঠিন, বিশেষ করে যে জায়গা আপনাকে আপন করে নেয়, নীরবে।
চা-এর কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় বসলাম। নিচে রাস্তা প্রায় ফাঁকা, শুধু দু’একটা অটো দাঁড়িয়ে, ডেকে উঠছে যাত্রী খুঁজে। আকাশে সাদা পাখি উড়ছে ঢেউয়ের ওপর দিয়ে, যেন বিদায় জানাচ্ছে আমায়। শেষবারের মতো সৈকতের দিকে হেঁটে যেতে ইচ্ছে হল।
ছোট্ট ব্যাগে দরকারি জিনিস গুছিয়ে ব্যালকনির রেলিংয়ে রাখা সেই ঝিনুক আর মালাটা আলতো করে তুলে ব্যাগে রাখলাম। তেমন কিছু দামি নয়, তবু যেন মনে হচ্ছিল এগুলোর মধ্যেই জমে আছে গোটা ট্রিপের অভিজ্ঞতা—বৃষ্টি, ঢেউ, বাজারের হইচই, তালসারির নদী, একলা দুপুরের খিচুড়ি।
সৈকতে পৌঁছনোর সময় প্রায় সকাল সাড়ে ন’টা। রোদ উজ্জ্বল হলেও বালির গায়ে এখনো ভেজা বাকি। পা রাখতেই ঠান্ডা লাগল, কিন্তু সেই পুরোনো টান আবার অনুভব করলাম। ঢেউ আসছে, যাচ্ছে, কিন্তু আজ আর ভয় নেই। বরং একটা ছুঁয়ে দেওয়া বন্ধুত্ব যেন তৈরি হয়ে গিয়েছে।
একটা ঢেউ এসে হালকা ছুঁয়ে গেল পায়ের পাতা। আমি চোখ বন্ধ করলাম। মনে হচ্ছিল, সমুদ্র বলছে, “ভালো থাকিস, আবার আসিস।”
আমি নিরুত্তর, তবু মনে মনে বললাম, “আসব। কারণ তোর মতো কেউ শোনে না আমার ভেতরের গল্প।”
একপাশে কিছু লোক সেলফি তুলছে, বাচ্চারা খেলছে বালিতে, এক বৃদ্ধ দম্পতি হাত ধরে বসে আছেন একটা কাঠের বেঞ্চে। এত চেনা ছবি, অথচ এত নিজস্ব। মনে হচ্ছিল, প্রত্যেকেই যেন এখানে এসে এক টুকরো নির্জনতা খুঁজে পায়, কিংবা হয়তো হারায় নিজেকে অল্প সময়ের জন্য।
শেষ চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসেছিলাম সেই পুরোনো দোকানে। দোকানদার আমাকে দেখে হাসলেন।
“কাল ফিরছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আবার আসবেন তো?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “যখন মন খুব চুপ করে যাবে, তখন চলে আসব।”
চা শেষ করে, ঢেউয়ের দিক থেকে একবার তাকালাম। একটু দূরে নুড়ি আর শামুক ছড়িয়ে আছে। একটা বাচ্চা মেয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছে। আমি একটা ছোট্ট নুড়ি তুলে নিজের ব্যাগে রাখলাম। এটা হয়তো কিছুই নয়, কিন্তু এই বিদায়ের দিনে একফোঁটা ঢেউ হয়ে থাকবে।
ট্রেন যখন দিঘা স্টেশন ছাড়ল, জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই নারকেল গাছ, সেই ফাঁকা মাঠ, সেই ভেজা ছায়া—সব পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটা অনুভূতি সঙ্গে রয়ে গেল।
এই কয়েকদিনে আমি শুধু দিঘা দেখিনি—আমি নিজেকেও নতুন করে চিনেছি। নিঃশব্দ বারান্দা, তালসারির নদী, সমুদ্রের কাছে বসে থাকা একলা দুপুর, লোকাল বাজারের উত্তাপ—সব মিলিয়ে জীবনের একটা অনুচ্চারিত অধ্যায় খুলে গিয়েছে।
দিঘা আমার কাছে একটা ঠিকানা হয়ে থাকল, যেখান থেকে ফেরা যায় নিজের ভেতরে, আবার ফিরে আসাও যায়, নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে নিয়ে।
বিদায়ের ঠিক আগের ঢেউটা যেমন—কিছু বলে না, শুধু একবার ছুঁয়ে দিয়ে যায়।




