অভিষেক মজুমদার
১
কলকাতার ব্যস্ত নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার দূরে শান্তিনিকেতনের উপকণ্ঠে ছোট্ট একটি গ্রাম। নাম তার—চৌরঙ্গীডাঙা। বাইরে থেকে এ গ্রাম দেখতে সাধারণ, কাঁচা রাস্তা, ধানের ক্ষেত, গরুর গাড়ি, বিকেলের আড্ডায় চায়ের দোকান, মেলার সময় পুতুলনাচ বা বাউল গান। কিন্তু এই গ্রামকে ঘিরে এক অদ্ভুত গল্প বহুদিন ধরে চলে আসছে, যা শুনে আশেপাশের গ্রামও শিহরিত হয়ে ওঠে। কথিত আছে, বর্ষা নামার আগে, বিশেষ করে আষাঢ় মাসের শেষ রাতে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের বাঁশবনে এক অদ্ভুত আচার হয়। সেই বাঁশবন খুব পুরোনো, অন্ধকারাচ্ছন্ন, সূর্যের আলোও সেখানে খুব বেশি প্রবেশ করে না। দিনের বেলায় সাধারণ মনে হলেও রাত নামলে তার ভেতর থেকে শোনা যায় অদ্ভুত শব্দ, যেন শত শত ফিসফিসানি মিশে গেছে ডাহুক পাখির করুণ ডাকের সঙ্গে। গ্রামের মানুষজনের বিশ্বাস, সেই ডাক কেবল কোনো সাধারণ পাখির নয়—ওই বাঁশবনের গভীরে কোনো অশুভ আত্মা বাস করে, আর সেই আত্মাকে শান্ত করতে না পারলে বন্যা নামার আগে গ্রামে বিপদ নেমে আসে। সেই কারণেই, প্রতি বছর বন্যার আগে, গ্রামবাসীরা ওই বাঁশবনে বিশেষ আচার পালন করে। কুসংস্কারের সঙ্গে মিশে আছে ভয়ের আবহ—কারণ অনেকের দাবি, যেদিন কেউ ওই আচার মানেনি বা অবহেলা করেছে, সেবছর গ্রামে ভয়াবহ বন্যায় ফসল নষ্ট হয়েছে, গবাদি পশু মারা গেছে, এমনকি মানুষও প্রাণ হারিয়েছে।
এই গ্রামেই এক বর্ষার আগের সন্ধ্যায় পা রাখলেন অদ্বৈত সেন—পেশায় সাংবাদিক, বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি। কলকাতার একটি জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকে তিনি কাজ করেন। শহরের রাজনীতি, বাণিজ্য বা বিনোদন সবকিছুর খবর করলেও তাঁর আগ্রহ বরাবরই ছিল লোকবিশ্বাস, গ্রামীণ সংস্কৃতি আর তার অন্তরালে লুকোনো সত্য খুঁজে বার করা। সম্পাদক তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন এই রহস্যময় “ডাহুক পাখির ডাক”-এর কাহিনি অনুসন্ধান করার। সুতরাং ক্যামেরা, নোটবুক আর কৌতূহল নিয়ে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন চৌরঙ্গীডাঙায়। গ্রামে ঢুকেই তিনি লক্ষ্য করলেন—মানুষজন যেন তাঁকে খানিক সন্দেহের চোখে দেখছে। হয়তো বাইরের লোক বলেই, কিংবা হয়তো এ কাহিনির খবর নিতে আসা মানুষকে তারা বেশি পছন্দ করে না। চায়ের দোকানে বসে তিনি যখন এক কাপ চা হাতে নিলেন, তখনই পাশের কয়েকজন চাষি ফিসফিস করে বলছিল, “কলকাতার লোক এসেছে নাকি বাঁশবনের কথা খুঁজতে?” দোকানের মালিক, গামছা কাঁধে ফেলে রাখা এক বৃদ্ধ, ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাঁকে বললেন, “বাবু, ওই ডাহুকের কথা বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না। এ খেলা সহজ নয়। আমাদের পূর্বপুরুষরা এই আচার করে আসছে বহু বছর ধরে, কারও ক্ষমতা নেই ওটাকে অবজ্ঞা করার।” অদ্বৈত মৃদু হেসে বললেন, “আমি কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না কাকু। আমি কেবল সত্যিটা জানতে চাই। পাখির ডাক, মানুষের ভয়—এর পেছনে আসল কারণটা কী, সেটাই বের করতে চাই।” বৃদ্ধ তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিয়েছিলেন, “সত্যি খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় প্রাণটাও খোয়াতে হয় বাবু।” এই কথাটা অদ্বৈতের মনে হালকা একটা শীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছিল, কিন্তু কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামটা যেন অন্যরকম রূপ নিতে শুরু করল। মাঠে ব্যাঙের ডাক, গাছের পাতায় বাতাসের শব্দ, আর দূরের অন্ধকার বাঁশবন—সব মিলিয়ে ভয় ধরানো পরিবেশ। গ্রামের মানুষজন একে একে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল, বাইরে রইল না প্রায় কেউ। কেবল অদ্বৈত কৌতূহল নিয়ে হাঁটছিলেন বাঁশবনের দিকটায়। দূরে তিনি দেখলেন কয়েকজন গ্রামবাসী হাতে মশাল নিয়ে বাঁশবনের ভেতর ঢুকছে। তাদের মুখ গম্ভীর, চোখে ভয় আর দায়িত্বের মিশেল। অদ্বৈত দূর থেকে দেখছিলেন—বাঁশবনের এক প্রান্তে মাটিতে কিছু ঢেলে দেওয়া হচ্ছে, ধূপ জ্বালানো হচ্ছে, আর এক বৃদ্ধ সুর করে মন্ত্রপাঠ করছে। সেই সময়ে আচমকা কানে ভেসে এল এক দীর্ঘ, করুণ ডাক—“কুউউউ… কুউউউ…”। ডাহুক পাখির ডাক হলেও অদ্বৈতের মনে হল, এর ভেতরে যেন অদ্ভুত এক হাহাকার আছে, যেন কেউ বুকফাটা আর্তনাদ করছে। তাঁর শরীর শিউরে উঠল। দূর থেকে তিনি দেখলেন, গ্রামের মানুষজন মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করছে, যেন ভয় আর ভক্তি মিলে একাকার। সেই মুহূর্তে অদ্বৈতের মনে হল—এ কোনো সাধারণ আচার নয়, এর অন্তরালে নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সত্য। কিন্তু কী সেই সত্য? পাখির ডাকের মধ্যে কেন এত আতঙ্ক? এই প্রশ্ন নিয়েই তিনি সেই রাতে ফিরে এলেন গ্রামের স্কুলঘরে থাকা তাঁর অস্থায়ী আস্তানায়। মশারির ভেতর শুয়ে থাকা অবস্থায়ও তাঁর কানে বারবার ভেসে আসছিল সেই ডাক, সেই করুণ সুর, যেন বাঁশবন থেকে কেউ তাঁকে আহ্বান করছে—“এসো, সত্যিটা খুঁজে বের করো…”। আর অদ্বৈত অনুভব করলেন, এই গ্রাম তাঁর সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে।
২
ভোরের আলো ফুটতেই অদ্বৈত বেরিয়ে পড়েছিলেন গ্রাম চৌরঙ্গীডাঙার সরু কাঁচা পথ ধরে। সকালের শান্ত আবহাওয়ায় গ্রামের ছবিটা একেবারে অন্যরকম—ধানক্ষেতে শিশিরের ফোঁটা, মাটির ঘরের আঙিনায় ধোঁয়া উড়তে থাকা চুলা, আর গাছের ডালে বসে কাকের ডাক। আগের রাতের বাঁশবনের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা তাঁকে ঘুমোতে দেয়নি, তবুও মন ভরে উঠেছিল কৌতূহলে। সেই সময়ই গ্রামের এক বয়স্ক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালেন। লম্বা সাদা দাড়ি, কুঁচকানো মুখ, চোখে অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। পরিচয় দিলেন—হরিপদ চক্রবর্তী, গ্রামের তান্ত্রিক পরিবারের প্রবীণ প্রতিনিধি। বহু বছর ধরে এই বাঁশবনের আচার তাঁরাই করে আসছেন। অদ্বৈত এক গাল হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন, “আমি সাংবাদিক, কলকাতা থেকে এসেছি। শুনেছি আপনারা প্রতি বছর বন্যার আগে বাঁশবনে বিশেষ আচার করেন। আসল ঘটনা জানতে চাই।” হরিপদ তাঁর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন, তারপর ধীর গলায় বললেন, “বাবু, তোমার চোখে কৌতূহল দেখি, কিন্তু কৌতূহল সবসময় আশীর্বাদ নয়। আমরা যারা গ্রামের বুকে জন্মেছি, তারা জানে—ডাহুকের ডাক কোনো সাধারণ ডাক নয়। এটা অশুভ সংকেত। যখনই ডাহুক ডাকে, জানবে মৃত্যু বা দুর্যোগ একেবারে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।” অদ্বৈতের বুকের ভেতর হালকা কাঁপন হল, কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে বললেন, “কিন্তু কাকা, এ তো কেবল পাখির ডাক। দুর্যোগের সঙ্গে পাখির ডাকের কী সম্পর্ক থাকতে পারে?” হরিপদ তখন গম্ভীর মুখে মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “যারা একবারও রাতে বাঁশবনের ডাক শুনেছে, তারা জানে এর ভেতর অন্য এক শক্তি আছে। অদ্ভুত এক শক্তি, যা মানুষকে দুর্বল করে দেয়, ভয়কে বাস্তব করে তোলে। আমাদের পরিবার সেই শক্তির সঙ্গে লড়াই করে আসছে বহু যুগ ধরে।”
হরিপদের গলার স্বর ক্রমশ গভীর হচ্ছিল। তিনি বললেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের কাহিনি শুনেছিস? বলা হয়, একসময় এ গ্রামে ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছিল। তখন বাঁশবনের ভেতর থেকে অদ্ভুত ডাক শোনা গিয়েছিল টানা সাত রাত ধরে। গ্রামবাসীরা বুঝতে পারেনি, ভয় পেয়েও আচার করেনি। সেই বছরের বন্যায় ডুবে মারা গিয়েছিল প্রায় অর্ধেক গ্রাম। সেই ঘটনার পর থেকেই নিয়ম শুরু হয়—বর্ষা নামার আগে বাঁশবনে মন্ত্রপাঠ, ধূপ আর অর্ঘ্য নিবেদন। বিশ্বাস করো বা না করো, এর পর থেকে আর এমন ভয়ানক দুর্যোগ আসেনি।” অদ্বৈত মন দিয়ে শুনছিলেন, নোটবুকে কিছু লিখে রাখলেনও, কিন্তু তাঁর সাংবাদিক মন বারবার বলছিল—এ সবই কুসংস্কার। অথচ হরিপদের চোখে মুখে যেভাবে দৃঢ়তা ভর করেছিল, তা অদ্বৈতকে ভাবিয়ে তুলল। হরিপদ আরও এগিয়ে এসে মৃদু গলায় বললেন, “বাবু, তুই শহরের লোক, হয়তো এসব মানিস না। কিন্তু সাবধান। অতিরিক্ত ঘাঁটাঘাঁটি করিস না। বাঁশবনের ভেতর ঢুকিস না, আর বিশেষ করে রাতে একা ওদিকে যাবি না। ডাহুকের ডাক শুধু পাখির নয়, ওর সঙ্গে লুকিয়ে আছে মৃতদের আর্তনাদ।” কথাগুলো বলেই তিনি চলে গেলেন ধীর পায়ে, যেন এই সতর্কবাণীই তাঁর একমাত্র দায়িত্ব ছিল। অদ্বৈত হঠাৎ বুঝতে পারলেন, গ্রামের মানুষ তাঁকে যেমন সন্দেহ নিয়ে দেখছিল, তেমনি তাঁকে নিয়ে ভীতও—কারণ বাইরে থেকে আসা কেউ যদি নিয়ম ভঙ্গ করে, তবে তার প্রভাব নেমে আসবে সবার উপর।
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। গ্রামের বাতাসে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মাটির ঘরে আলো জ্বললেও মনে হচ্ছিল, যেন সবাই ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে। অদ্বৈত স্কুলঘরে বসে নিজের লেখা গুছিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন আচমকা বাইরে থেকে শোনা গেল সেই ভয়ঙ্কর ডাক—“কুউউউ… কুউউউ…”। শব্দটা এত হঠাৎ আর এত করুণভাবে ভেসে এল যে তাঁর হাত থেকে কলম পড়ে গেল। ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে তিনি দেখলেন, দূরের বাঁশবনের দিকটা যেন কাঁপছে বাতাসে। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ বেড়ে গেল, শরীর শিউরে উঠল। অদ্বৈতের মনে পড়ল হরিপদের সতর্কবাণী—“এ ডাক মৃত্যু বা দুর্যোগের সংকেত।” তিনি নিজেকে বোঝালেন, “না, এটা নিছক পাখির ডাক। ভয় পাবার কিছু নেই।” কিন্তু যতই বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ততই মনে হল সেই ডাক যেন ভেতরে ভেতরে তাঁকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, যেন বাঁশবন থেকে অদৃশ্য কেউ তাঁকে ডেকে বলছে, “এসো… সত্যিটা দেখো…”। জানালা বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়লেন তিনি, কিন্তু ডাকটা থামছিল না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও গাঢ় হচ্ছিল সেই আর্তনাদ, যেন এক ভয়ঙ্কর দুর্যোগের আগমনী বার্তা। অদ্বৈতের চোখে তখন আতঙ্ক আর কৌতূহল একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই গ্রামের কাহিনি কেবল গল্প নয়—কিছু একটা আছে, যা সত্যিই তাঁর তদন্তকে এক ভয়ঙ্কর পথে নিয়ে যাবে। আর সেই পথে হয়তো অপেক্ষা করছে বিপদ, কিংবা এমন এক সত্য, যা তাঁর জীবনকে চিরকালের জন্য বদলে দিতে পারে।
৩
পরের দিন সকালে অদ্বৈত যখন গ্রামের মাটির রাস্তা ধরে হাঁটছিলেন, তখন হঠাৎই তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন গ্রামপ্রধান নকুল মাঝি। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, মোটা গড়ন, কপালে লাল টিপ, আর মুখভরা গম্ভীরতা। গ্রামের লোকেরা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করে, তাঁর কথাই শেষ কথা। নকুল মাঝি অদ্বৈতের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন, যাতে অভ্যাগত সাংবাদিক স্পষ্ট বুঝতে পারলেন—এ চোখে কৌতূহল নয়, সতর্কতা আছে। ধীর গলায় নকুল মাঝি বললেন, “বাবু, আপনি শহর থেকে এসেছেন, সম্মানের সঙ্গে বলছি—আমাদের গ্রামকে নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না। এখানে যা নিয়ম চলে আসছে, তা বহুকালের। কুসংস্কার হোক বা না হোক, আমরা বিশ্বাস করি। বাঁশবন নিয়ে আপনি বেশি খোঁজ নিলে অশান্তি বাড়বে, মানুষ ভয় পাবে, আবার দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। সাংবাদিকতা করুন, কিন্তু সীমা মানুন।” কথাগুলো এত দৃঢ় স্বরে বলা হয়েছিল যে, অদ্বৈতের বুকের ভেতর খানিকটা শূন্যতা এসে গেল। তিনি নিজের যুক্তি তুলে ধরলেন, “কাকা, আমি সত্যিই কিছু উসকানি দিতে চাই না। কেবল জানতে চাই আসল ঘটনা। কেন ডাহুকের ডাককে সবাই এত ভয় পায়? এর মধ্যে যদি কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ থাকে, সেটা জানলে তো সবারই উপকার হবে।” কিন্তু নকুল মাঝি হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন, “আমরা এসব মানি না বাবু। বৈজ্ঞানিক কারণ দিয়ে মৃত্যু বোঝানো যায় না। আমাদের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে—যখন ডাক শোনা যায়, দুর্যোগ অনিবার্য। আপনি যদি এই গ্রামে থাকতে চান, তবে আমাদের নিয়মকানুন মানতে হবে।” এতটা স্পষ্ট কথার পর অদ্বৈত বুঝলেন—এই গ্রামে তাঁর উপস্থিতি সবার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। তিনি একা হয়ে পড়েছেন, কারণ গ্রামের মানুষ আর তাঁর সঙ্গে সহজভাবে কথা বলছে না।
ঠিক সেই সময়েই অদ্বৈতের সঙ্গে আলাপ হল গ্রামের এক তরুণীর—কল্যাণী। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, ছিপছিপে গড়ন, চোখে জেদ আর সাহসের ঝিলিক। অন্য মেয়েদের মতো সে গুটিয়ে থাকে না, বরং সোজা হয়ে দাঁড়াতে জানে। সে-ই প্রথম হেসে এগিয়ে এসে বলল, “আপনি শহর থেকে এসেছেন তো? সবাই আপনাকে বাঁশবনের কথা বলতে চাইছে না, জানি। কিন্তু আমি আপনাকে সাহায্য করব।” অদ্বৈত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি সাহায্য করবে? কিন্তু কেন? অন্যরা তো চায় আমি দূরে সরে যাই।” কল্যাণী একটু হেসে বলল, “কারণ আমি জানি, এ গ্রামের বাঁশবনে কিছু আছে, যা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। সবাই ভয় পেয়ে চুপ করে থাকে, কিন্তু আমি চাই সত্যিটা প্রকাশ পাক। শুধু ডাহুকের ডাক নয়, এর ভেতরে আরও কিছু আছে।” কথাগুলো শুনে অদ্বৈতের মনে আশার আলো জ্বলল। তিনি ভাবলেন, অন্তত একজন মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে একইসঙ্গে তাঁর মনে সন্দেহও জাগল—একজন গ্রামের মেয়ে কেন এমন ঝুঁকি নিতে চাইছে? কল্যাণী যেন তাঁর মনের কথা পড়ে ফেলল, বলল, “আমি কোনো দুঃসাহস করছি না বাবু। আসলে আমার শৈশব জড়িয়ে আছে ওই বাঁশবনের সঙ্গে। যে ভয় আর রহস্য আমি ছোটবেলায় দেখেছি, তা আজও আমাকে তাড়া করে।”
অদ্বৈত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী দেখেছিলে তুমি?” কল্যাণীর মুখমণ্ডল মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি তখন মাত্র আট বছর বয়সী। এক সন্ধ্যায় আমাদের গরু হারিয়ে গিয়েছিল। আমি খুঁজতে খুঁজতে বাঁশবনের ধার ঘেঁষে গিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, ভেতরে মশালের আলো জ্বলছে, আর কয়েকজন মানুষ সাদা ধুতি পরে মন্ত্র পড়ছে। ভেবেছিলাম গ্রামের বড়রা হয়তো আচার করছে, কিন্তু ওদের মুখের দিকে তাকাতেই গা ছমছম করে উঠল। যেন ওরা মানুষ নয়, অচেনা কোনো ছায়া। হঠাৎ মশালগুলো নিভে গেল, আর বাঁশবনের ভেতর থেকে শোনা গেল সেই ডাহুকের ডাক—কিন্তু ডাকের সঙ্গে মিশে ছিল মানুষের আর্তনাদ। ভয় পেয়ে আমি ছুটে পালালাম। সেদিন থেকে রাতে ওই ডাক শুনলেই আমার মনে হয়, কেউ যেন আমাকে ডেকে বলছে—ফিরে আয়, ফিরেই আয়।” কল্যাণীর চোখে জল জমে উঠেছিল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর দৃঢ় রইল। অদ্বৈত বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেলেন। তিনি অনুভব করলেন, এ গল্প কেবল ভয় বা কুসংস্কার নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু যা এখনও প্রকাশ পায়নি। কল্যাণী তখন তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি যদি সত্যিই জানতে চান, আমি আপনাকে সাহায্য করব। তবে একটা শর্ত আছে—আপনাকে ভয় পেলে চলবে না। কারণ বাঁশবনের রহস্য কেবল কাগজে কলমে লেখা যায় না, তা চোখে দেখতে হয়।” অদ্বৈতের মনে হল, তাঁর তদন্তের নতুন দরজা খুলে গেল। কিন্তু একইসঙ্গে বুঝলেন—এই দরজা দিয়ে পা বাড়ানো মানে জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
৪
সন্ধ্যা নেমে আসতেই অদ্বৈতের কৌতূহল বেড়ে গেল। সারাদিন গ্রামের মানুষজন তাঁকে এড়িয়ে চলেছে, এমনকি নকুল মাঝিও সতর্ক করে দিয়ে দূরে সরে গেছে। কেবল কল্যাণীই পাশে ছিল, তবে সেও বলেছিল—“আজ রাতে বাঁশবনের দিকে তাকাও, বাবু। হয়তো তুমি দেখবে, যাকে সবাই ভয় পায়।” এই কথার পর থেকে অদ্বৈতের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত টান কাজ করছিল। রাত বাড়তেই তিনি স্কুলঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালেন বাঁশবনের দিকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল—একটা মৃদু আলোর ঝলকানি, যেন কেউ মশাল নিয়ে ভেতরে হাঁটছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো গ্রামবাসীরা আবার আচার করছে। কিন্তু ভালো করে দেখতেই বোঝা গেল, একলা একজন মানুষ সেই আঁধার ভেদ করে হেঁটে চলেছে। লম্বা কেশ, কাঁধে গেরুয়া কাপড়, হাতে ত্রিশূলের মতো কিছু—অদ্ভুত এক সন্ন্যাসীর অবয়ব। অদ্বৈতের শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। এতদিন ধরে গ্রামবাসীদের মুখে যে আচার ও কুসংস্কারের গল্প শুনে এসেছিলেন, মনে হল যেন তার রূপকথার চরিত্র সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সন্ন্যাসীর চলাফেরার ভঙ্গি ছিল অস্বাভাবিক—মাটিতে পা রাখলেও যেন শব্দ হচ্ছিল না, আর বাঁশবনের ভেতর তাঁর উপস্থিতিতে হাওয়া কেঁপে উঠছিল। অদ্বৈত দ্বিধা সত্ত্বেও ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁর সাংবাদিক সত্তা তাঁকে বলছিল—“এটাই আসল মুহূর্ত। যাকে গ্রামবাসীরা ‘ডাহুকের নিশান’-এর আচার পরিচালনাকারী বলে মানে, তাকেই দেখা যাচ্ছে।”
অদ্বৈত ধীরে ধীরে বাঁশবনের ভেতরে পা রাখলেন। চারপাশে এমন অন্ধকার, যেন আকাশের তারা আর চাঁদও আলো দিতে ভুলে গেছে। দূর থেকে মশালের ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল, সন্ন্যাসী নির্লিপ্তভাবে এগিয়ে চলেছেন। অদ্বৈত তাঁকে অনুসরণ করতে লাগলেন। মাটিতে শুকনো বাঁশপাতার ওপর দিয়ে হাঁটার শব্দ যেন অদ্ভুত প্রতিধ্বনির মতো ফিরে আসছিল। হঠাৎই সন্ন্যাসী থেমে গেলেন। অদ্বৈত গাছের আড়ালে লুকিয়ে শ্বাস আটকে রাখলেন। তিনি দেখলেন, সন্ন্যাসী মাটিতে কিছু আঁকছেন—জটিল সব প্রতীক, যেগুলো দেখতে অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর। তারপর তিনি মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। গলায় ছিল তীক্ষ্ণ কর্কশতা, কিন্তু মন্ত্রোচ্চারণের তালে এক অদ্ভুত শক্তি ভেসে আসছিল। বাঁশবনের নীরবতা কেটে গিয়ে যেন হঠাৎ গর্জন করে উঠল চারদিক। বাতাস ভারি হয়ে গেল, বাঁশগাছগুলো কাঁপতে লাগল, আর দূরে কোথাও থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত করুণ ডাক—“কুউউউ… কুউউউ…”। অদ্বৈতের মনে হল, এই ডাক যেন সরাসরি তাঁর বুকের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে এল, ঘাড় বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। তাঁর হাতে ধরা ক্যামেরা কেঁপে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, এ শুধু আচার নয়, এর মধ্যে এমন কিছু শক্তি আছে যা ব্যাখ্যা করা কঠিন।
ঠিক তখনই সন্ন্যাসী আচমকা ঘুরে দাঁড়ালেন। অদ্বৈতের বুক ধক করে উঠল—যেন তিনি বুঝে গেছেন কেউ তাঁকে অনুসরণ করছে। তাঁর চোখ লাল জ্বলজ্বল করছিল, ঠোঁট নড়ছিল অবিরাম। পরক্ষণেই এক অদ্ভুত মন্ত্রোচ্চারণ শোনা গেল—শব্দগুলো অপরিচিত, অথচ কানে আসতে আসতেই মনে হচ্ছিল আগুনের মতো জ্বলছে। “ওঁ…ম্রিন…ঝুঁম…কারাল…” শব্দগুলো আছড়ে পড়ছিল বাঁশবনের নিস্তব্ধতায়, আর সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের গাছগুলো অদ্ভুতভাবে দুলতে লাগল, যেন ঝড় উঠেছে। অদ্বৈতের কানে বাজছিল এক অস্বস্তিকর ঘন আওয়াজ, মনে হচ্ছিল মাথার ভেতর কেউ হাতুড়ি মারছে। তিনি টলতে টলতে গাছের আড়ালে সরে গেলেন। ক্যামেরা নামিয়ে দিলেন হাতে, কারণ সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশে ছবি তোলার মতো সাহস আর অবশিষ্ট ছিল না। সন্ন্যাসীর মন্ত্রোচ্চারণ হঠাৎ করেই থেমে গেল। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা, তারপর আবার ভেসে এল ডাহুকের আর্তনাদ। অদ্বৈতের মনে হল, যেন এই ডাক এবার তাঁকেই উদ্দেশ্য করে আসছে। তিনি প্রাণপণে দৌড়ে বাঁশবন থেকে বেরিয়ে এলেন। বুক ধড়ফড় করছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। পিছনে তাকাতে সাহস পেলেন না, কিন্তু মনে হচ্ছিল অদৃশ্য চোখ জ্বলজ্বল করে তাঁকে লক্ষ্য করছে। সেই রাতে তিনি স্পষ্ট বুঝলেন—এই গ্রামের রহস্য কেবল পাখির ডাক বা গ্রামবাসীর কুসংস্কার নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর শক্তি, এক রহস্যময় সন্ন্যাসীর উপস্থিতি, যার মন্ত্রের প্রতিধ্বনি তাঁর কান থেকে কোনোদিন মুছে যাবে না।
৫
ভোরের আলো ফোটার আগেই চৌরঙ্গীডাঙা গ্রামে হঠাৎ হইচই পড়ে গেল। কাক ডাকবার আগেই কানে এল মানুষের চিৎকার, কাঁদো কাঁদো গলা, আর ভিড়ের হাঁকডাক। অদ্বৈত স্কুলঘরের খাট থেকে তড়িঘড়ি উঠে পড়লেন। ক্যামেরা হাতে নিয়ে দৌড়ে গেলেন গ্রামের পশ্চিম দিকের ধানক্ষেতের দিকে, যেখানে ভিড় জমেছে। কাছে যেতেই তিনি দেখলেন—মাটির উপর উল্টে পড়ে আছে গ্রামের মাঝবয়সী কৃষক রমেশের নিথর দেহ। চোখ দুটো ফাঁকা হয়ে খোলা, ঠোঁটে শুকনো লালা, মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। শরীরে কোনো বড় আঘাত নেই, কেবল গলার কাছে কালো ছোপের মতো কিছু দাগ। ভিড়ের মধ্যে কান্না আর ফিসফিসানি চলছে—“ডাহুকের ডাক শোনা গেছিল কাল রাতে…আজ ভোরেই রমেশ মারা গেল!” কোনো মহিলা বুক চাপড়ে বলল, “ওর বাড়ি থেকে শুনতে পেয়েছিলাম সেই আর্তনাদ। বুঝেছিলাম বিপদ আসবেই।” এই দৃশ্য দেখে অদ্বৈতের বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা শীতলতা নেমে এল। সত্যিই তো, গত রাতেই বাঁশবনের ভেতর সন্ন্যাসীর মন্ত্রোচ্চারণ আর ভয়ঙ্কর ডাক শুনেছিলেন তিনি। অথচ সাংবাদিক সত্তা তাঁকে অন্য দিকেও ঠেলে দিল—“এ সব কি নিছক কাকতাল? নাকি এর পেছনে কোনো মানুষের ষড়যন্ত্র আছে?” ভিড়ের মধ্যেই হরিপদকে দেখা গেল। তিনি ধীরে ধীরে রমেশের নিথর দেহের কাছে এসে দাঁড়ালেন, ঠোঁটে গম্ভীর কাঁপন নিয়ে উচ্চারণ করলেন, “আমি তোকে বলেছিলাম, বিপদ আসবে। ডাক মানে মৃত্যু।” তাঁর গলার স্বরে এমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আশেপাশের গ্রামবাসীরা আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠল। কেউ কেউ অদ্বৈতের দিকে কটমট করে তাকাল—যেন বাইরের লোক এসে অশান্তি ডেকে এনেছে।
গ্রামজুড়ে আতঙ্কের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল। মহিলারা বাচ্চাদের ঘরে আটকে রাখল, পুরুষরা কাজকর্ম বন্ধ রেখে পাড়ায় পাড়ায় মশাল নিয়ে জটলা বাঁধল। যেন গোটা গ্রামকে ঘিরে এক অদৃশ্য মৃত্যুচ্ছায়া নেমে এসেছে। নকুল মাঝি তড়িঘড়ি করে সবাইকে ডেকে বললেন, “আজ রাত থেকে কেউ বাঁশবনের দিকে যাবে না। আচার আরও কঠোরভাবে করতে হবে।” গ্রামবাসীরা সায় দিল, কিন্তু আতঙ্কের সঙ্গে মিশে ছিল অসহায়ত্ব। অদ্বৈত পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল—রমেশের মৃত্যুটা হঠাৎই ঘটেছে, কিন্তু কোনো অদৃশ্য আত্মা এর পেছনে দায়ী নয়। তিনি ঘনিষ্ঠভাবে দেহটা পরীক্ষা করলেন। গলার কালো দাগ দেখে তাঁর মনে হল, কারও হাতের চাপও হতে পারে। গ্রামবাসীদের ভিড়ের মধ্যে কেউ হয়তো আতঙ্ক ঢাকতে চাইছে কুসংস্কারের গল্প দিয়ে। সাংবাদিক হিসেবে অদ্বৈত জানেন, এ ধরনের ঘটনার আড়ালে অনেক সময় মানবীয় অপরাধ লুকিয়ে থাকে। কল্যাণী তখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল। সে মৃদুস্বরে বলল, “আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, রমেশ বাঁশবনের কাছেই জমি চাষ করত? ওকে নিয়ে গ্রামের অনেকের হিংসাও ছিল।” অদ্বৈতের মাথায় যেন আলোর ঝলকানি হল। যদি সত্যিই হিংসা বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে হত্যা হয়ে থাকে, তবে ডাহুকের ডাককে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানুষজন ভয় পাবে, আর আসল অপরাধী পার পেয়ে যাবে।
অদ্বৈতের সন্দেহ আরও গাঢ় হল। তিনি হরিপদের কথাগুলো মনে করলেন—“ডাক মানেই মৃত্যু।” সত্যিই তো, এই বিশ্বাসটা গ্রামের মধ্যে এতটাই গেঁথে গেছে যে, কেউ প্রশ্ন তুলতেই সাহস করে না। এই ভয়ের সুযোগ নিয়ে কি কোনো শক্তি নিজের স্বার্থসিদ্ধি করছে? আর সেই রহস্যময় সন্ন্যাসীর ভূমিকা কী? কেন তিনি বাঁশবনের ভেতরে মন্ত্রোচ্চারণ করেন ঠিক তখনই, যখন ডাক শোনা যায়? অদ্বৈতের মনে নানা প্রশ্ন ভিড় করল। কিন্তু গ্রামবাসীরা তখন তাঁর দিকে শত্রুভাবাপন্ন চোখে তাকাচ্ছিল। কারও মুখে শোনা গেল, “এই শহরের লোক এসেই কাল রাতে বাঁশবনে গিয়েছিল। তার পরেই তো রমেশ মরল।” অদ্বৈত বুঝলেন, তিনি আর এখানে সহজভাবে থাকতে পারবেন না। কল্যাণী মুঠো করে তাঁর হাত চেপে ধরে বলল, “ভয় পাবেন না। আমি আছি আপনার পাশে। আপনি যদি সত্যিই এই রহস্য খুঁজতে চান, তবে একা নন।” অদ্বৈতের মনে দৃঢ়তা এল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—রমেশের মৃত্যু কোনো অশুভ আত্মার কাজ নয়, এর পেছনে মানুষই আছে। সেই মানুষটিকে খুঁজে বের করতেই হবে। বাঁশবনের ডাক, সন্ন্যাসীর আবির্ভাব, আর এই আকস্মিক মৃত্যু—সব কিছুর মধ্যে এক অদ্ভুত যোগসূত্র আছে, যা শিগগিরই উন্মোচিত হবে। কিন্তু তার আগে তাঁকে লড়তে হবে ভয়, কুসংস্কার, আর গ্রামবাসীর অবিশ্বাসের সঙ্গে।
৬
রাতের আকাশে চাঁদ যেন অর্ধেক ঢাকা, মেঘের ফাঁকে ফাঁকে এক ঝলক আলো এসে পড়ছে গ্রামসংলগ্ন বাঁশবনের অন্ধকার শরীরে। বাতাসে সোঁদা গন্ধ, মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে কোন পেঁচার শব্দ মিলেমিশে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অদ্বৈত আর কল্যাণী দু’জনেই টর্চ হাতে সাবধানে ভেতরে ঢুকল, যেন প্রতিটি পা রাখার আগে চারপাশের শব্দকে কান পেতে শুনছে। বাঁশবনের ভেতরটা বাইরে থেকে যেমন দেখা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি ঘন আর অস্বস্তিকর—কোথাও পাতার মর্মর শব্দ, কোথাও শুকনো ডাল ভেঙে পড়ছে, আর সেই সাথে কেমন যেন অজানা আতঙ্ক বুকের ভেতরে শিকড় গাড়ছে। কল্যাণী নিচু গলায় বলল, “তুমি টের পাচ্ছো না অদ্বৈত? এই বন যেন নিশ্বাস নিচ্ছে।” অদ্বৈত শান্ত থাকার চেষ্টা করলেও চোখের চাহনি বলে দিচ্ছিল, সেও কিছু অস্বাভাবিক অনুভব করছে। একটু ভেতরে যেতেই তারা হোঁচট খেলো এক অদ্ভুত চিহ্নের ওপর—মাটিতে সাদা চকের দাগে আঁকা যেন এক তান্ত্রিক যন্ত্র, তার চারপাশে শুকনো ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখা। অদ্বৈত টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল পাশে পড়ে আছে কিছু পাখির পালক, যা দেখে মনে হলো কোনো পাখিকে জবাই করা হয়েছে এখানে। কল্যাণীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল—এই তো সেই রহস্যময় আচার, যার কথা গ্রামের লোকেরা চাপা গলায় বলে।
তারা একটু এগোতেই বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ নাকে এলো—কাঁচা রক্তের মতো। অদ্বৈত আলো ফেলতেই দেখতে পেলো একটা লালচে রঙের কাপড় মাটিতে পড়ে আছে, রক্তে ভিজে কালো হয়ে গেছে। কাপড়টা ধরতেই বোঝা গেল সেটা আসলে মানুষের জামার অংশ, সম্ভবত ছেঁড়া শার্ট কিংবা ধুতি। মাটির ওপর জমাট বেঁধে যাওয়া দাগ দেখে মনে হচ্ছিল, এখানে সম্প্রতি কিছু একটা ঘটেছে। কল্যাণী আতঙ্কে অদ্বৈতের হাত আঁকড়ে ধরল, “এখানে কেউ রক্তপাত করেছে, বুঝতে পারছো?” অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যেন মাথায় নানা হিসেব কষছে। গ্রামের পুরনো কাহিনি, ডাহুকের ডাক, আর সম্প্রতি অদ্ভুত নিখোঁজ হওয়া ঘটনাগুলো তার মাথায় একসূত্রে গাঁথা হতে শুরু করল। ঠিক তখনই তারা লক্ষ্য করল বাঁশবনের গভীরে আলো জ্বলছে—ম্লান হলুদ আভা, যেন প্রদীপ বা লণ্ঠনের আলো। দুজনেই নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে দূর থেকে দেখতে পেল, কয়েকজন লোক গোপনে কোনো আচার করছে। মাঝখানে বসানো কালো রঙের মাটির পাত্র, তার ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে, চারপাশে কয়েকটা লাল কাপড় ঝোলানো, আর মন্ত্রোচ্চারণের মতো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। অদ্বৈত দ্রুত কল্যাণীর কানে ফিসফিস করে বলল, “চুপ করে থাকো, ওরা আমাদের টের পেলে বিপদ হতে পারে।” কল্যাণীর বুক কেঁপে উঠল, এ দৃশ্য যেন কোন দুঃস্বপ্ন থেকে উঠে আসা ভয়াল বাস্তব।
কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর অদ্বৈত আর কল্যাণী ধীরে ধীরে পিছিয়ে এল। তাদের মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন—গ্রামে কারা এত রাতে বাঁশবনে এসে এই কালো আচার চালাচ্ছে? ফেরার পথে কল্যাণী ফিসফিস করে বলল, “শুনছো অদ্বৈত, আজ দুপুরে নকুল মাঝিকে আমি দেখেছিলাম বাঁশবনের দিক থেকে বেরোতে। তার জামার হাতায় কেমন দাগ ছিল, হয়তো রক্ত।” অদ্বৈত তখনও দ্বিধায়, কিন্তু গ্রামের লোকদের মুখে শোনা নানা কাহিনি মনে করে বলল, “নকুল মাঝিই হতে পারে, সে মাছ ধরার নামে রাতের পর রাত বনে ঢোকে। হয়তো এই কালো আচার তারই কারসাজি।” কিন্তু তার ভেতরে অন্য এক সন্দেহও জন্ম নিচ্ছিল—নকুল কি সত্যিই একা এর পেছনে? নাকি সে কেবল বড়ো কোনো গোপন দলের সদস্য? বাঁশবনের অন্ধকার তাদের বুকের ভেতরে আরো ভয় আর কৌতূহল জাগাল। তারা ঠিক করল, পরদিন সকালে কিছু না বলে গোপনে নকুল মাঝির গতিবিধি খেয়াল করবে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল—গ্রামের আতঙ্ক, ডাহুকের ডাক, আর নিখোঁজ হওয়া মানুষের পেছনে বাঁশবনের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর রহস্য, যা উন্মোচিত হলে গ্রামের ইতিহাস হয়তো নতুন রূপ পাবে। কিন্তু এখনো সেই রহস্যের প্রথম প্রান্তটাই তারা স্পর্শ করেছে—যার মধ্যে আছে রক্ত, মন্ত্র, আর ভয়াল ছায়া।
৭
বন্যার জল ধীরে ধীরে নেমে গেলেও গ্রাম জুড়ে যে অস্থিরতা জমাট বেঁধেছিল তা কাটছিল না। অদ্বৈত বারবার লক্ষ্য করছিল, কিছু লোকের মুখে এক অদ্ভুত শঙ্কা, আবার কারও চোখেমুখে ছিল কপটতার ছাপ। তদন্ত করতে গিয়ে সে খুঁজে বের করল, বন্যার সময় সরকারের পাঠানো সাহায্যের তহবিল ও চাল, ডাল, ত্রিপল, এমনকি ওষুধপত্রও গ্রামের হাতে পৌঁছোয়নি ঠিকমতো। কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষ নিজেদের দাপট খাটিয়ে, কাগজে-কলমে সবকিছু দেখালেও বাস্তবে গ্রামের মানুষকে একপ্রকার না খাইয়ে রেখেছে। তার ভেতর সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিল নকুল মাঝি—যে কিনা নিজের দোর্দণ্ডপ্রতাপে গ্রামে ‘সম্মানিত ব্যক্তি’ বলে পরিচিত। অদ্বৈত জানতে পারল, শুধু নকুল মাঝি নয়, আরও কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল সে। তারা সরকারি দপ্তরে ভুয়ো তালিকা বানিয়ে তহবিল নিজেদের পকেটে ঢুকিয়েছে, আর যখন প্রশ্ন উঠেছে তখনই “ডাহুকের নিশান”-এর ভূতুড়ে কাহিনি ছড়িয়ে দিয়েছে। বনে ডাহুক পাখির ডাক শুনলেই নাকি সর্বনাশ ঘটে—এই ভয়ের আড়ালে মানুষকে তারা বোঝাতে চেয়েছিল যে কোনো প্রশ্ন করাই মহাপাপ। ফলে গ্রামবাসী চুপ করে থেকেছে, সত্যি আর মিথ্যার সীমারেখা গুলিয়ে গেছে। অদ্বৈত ভেবেছিল, কুসংস্কার হয়তো নিছকই গ্রামীণ বিশ্বাস, কিন্তু এবার বুঝল এটি আসলে এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র—যেখানে কুসংস্কারকে হাতিয়ার বানিয়ে দুর্নীতিকে আড়াল করা হয়েছে।
অদ্বৈত আরও খোঁজ নিতে গিয়ে লক্ষ্য করল, যাকে সবাই রহস্যময় সন্ন্যাসী বলে ভয়ে এড়িয়ে চলে, সেই ব্যক্তির উপস্থিতিও খুব অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে এই দুর্নীতির সঙ্গে। সন্ন্যাসী হঠাৎ হঠাৎ গ্রামে আসে, আর প্রতিবারই তার আগমনের পর কোনো না কোনোভাবে ডাহুকের ডাক শোনা যায়। গ্রামের অশিক্ষিত মানুষজন বিশ্বাস করে, ওই সন্ন্যাসী অলৌকিক শক্তির অধিকারী, তার সঙ্গে ঝামেলা করলে বিপদ অনিবার্য। কিন্তু অদ্বৈতের অনুসন্ধান বলছিল অন্য কথা—এই সন্ন্যাসী আসলে এক ভিন্ন খেলোয়াড়, যার কাজ হলো গ্রামে ভয়ের আবহ টিকিয়ে রাখা। নকুল মাঝি ও তার সঙ্গীরা গ্রামে অন্ধকার নামিয়ে রাখতে চেয়েছিল এই সন্ন্যাসীর মাধ্যমেই। তার মাথায় চাপানো গেরুয়া বসন, রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে ত্রিশূল, আর গভীর রাতে হঠাৎ বন থেকে ভেসে আসা মন্ত্রপাঠ—সবই ছিল সাজানো নাটক। গ্রামের মানুষ অন্ধ বিশ্বাসে তাকে দেবতার দূত ভেবে ভয় পেত, কিন্তু অদ্বৈতের চোখ এড়ায়নি, এই সন্ন্যাসীর আসা-যাওয়ার সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের লেনদেনের যোগসূত্র রয়েছে। কয়েকজন নিরীহ গ্রামবাসী চুপিচুপি অদ্বৈতকে জানিয়েছিল, তারা একাধিকবার দেখেছে সন্ন্যাসীকে নকুল মাঝির উঠোনে বসে থাকতে, আর সেখানে রাতভর চলে মদের আসর ও অর্থের লেনদেন। এই তথ্য জানার পর অদ্বৈতের মনে স্পষ্ট হলো—যাকে সবাই রহস্যময় বলে ভয় পাচ্ছে, সে আসলে দুর্নীতির এক আড়াল, এক সাজানো চরিত্র, যার কাজ মানুষকে ভীত করে সত্যকে চাপা রাখা।
কিন্তু সত্য প্রকাশ করাটা সহজ কাজ ছিল না। অদ্বৈত জানত, যদি সরাসরি গ্রামের সামনে গিয়ে এইসব ফাঁস করে দেয়, তাহলে গ্রামবাসী হয়তো তাকে উলটে বিশ্বাসঘাতক ভাববে। কারণ বছরের পর বছর ধরে ভয় আর কুসংস্কার তাদের মাথায় এমনভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হঠাৎ করে সত্যি শোনালে তারা মেনে নেবে না। তার ওপর, নকুল মাঝির মতো প্রভাবশালী লোকের বিরুদ্ধে কেউ সহজে মুখ খোলার সাহস করবে না। ফলে অদ্বৈতকে কৌশল অবলম্বন করতে হলো। সে ঠিক করল, প্রথমে সন্ন্যাসীর আসল পরিচয় প্রকাশ করতে হবে, তারপর তহবিলের দুর্নীতি দেখাতে হবে। এক রাতে অদ্বৈত চুপিচুপি সন্ন্যাসীর পথ অনুসরণ করে বনের ভেতরে গেল। সন্ন্যাসী এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মন্ত্র পড়ছিল, আর দূরে লুকিয়ে থাকা কয়েকজন যুবক বাঁশে বাঁধা ডাহুককে ভয় দেখিয়ে ডাক তুলছিল। গ্রামের লোকেরা দূর থেকে সেই ডাক শুনে আতঙ্কে কাঁপত, আর সন্ন্যাসীর ‘মহাশক্তি’ বলে ভেবে বিশ্বাস করত। অদ্বৈত সবকিছু নিজের চোখে দেখে ফেলল—এটা নিছকই নাটক। তার ভেতরে যেন আগুন জ্বলে উঠল, সে বুঝল এই নাটকের পর্দা ফাঁস করতেই হবে। এখন তার তদন্ত শুধু একটি গ্রামীণ রহস্যের সীমায় নেই, বরং এটি ছুঁয়ে গেছে রাজনীতি, দুর্নীতি আর মানুষের অন্ধবিশ্বাসের গভীরতাকে। সামনে হয়তো আরও বিপদ অপেক্ষা করছে, তবুও অদ্বৈত প্রতিজ্ঞা করল—যতই শক্তিশালী হোক প্রতিপক্ষ, “ডাহুকের নিশান”-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক যোগসাজশকে সে উন্মোচন করবেই।
৮
কল্যাণী যখন কথাটা বলতে শুরু করল, তখন তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত কাঁপন ছিল—যেন বহু বছর চাপা রাখা কোনও গোপন কথা আজ হঠাৎ আলোয় উঠছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরে বাঁশবনের ভেতর হাওয়া বইছে, আর সেই হাওয়ায় বাঁশের দেহে খসখস শব্দ উঠছে। সে বলল—“আমি ছোটবেলায় দেখেছি, ওই আচারটা কোনও সন্ন্যাসী করেনি। আমাদের গ্রামেরই কিছু মানুষ, যাদের সবাই ভয় পেত, তারাই গভীর রাতে এই আচার করত। তারা কণ্ঠস্বর পাল্টে পাখির ডাক দিত, যাতে মানুষ মনে করে কোনও অশরীরী শক্তি হাজির হয়েছে। ছোট্ট আমি কৌতূহল নিয়ে একবার বাঁশবনের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখেছিলাম, গ্রামের হরিপদ কাকার বাড়ির কয়েকজন লোক মুখে রং মেখে, হাতে লাল কাপড়ের ফিতা বেঁধে, বাঁশবনে আগুন জ্বালিয়ে মন্ত্র পড়ছে। আমি ভয় পেয়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরে যাই। মাকে বলার সাহস পাইনি, কারণ সবাইকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এই আচার নিয়ে প্রশ্ন করলে সর্বনাশ হবে। এতদিন পর আপনাদের কাছে বলছি।” তার চোখে জল এসে গিয়েছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন হালকা হয়েছিল—দীর্ঘদিনের এক গোপন ভয়ের বোঝা নামিয়ে রাখল সে। অদ্বৈত মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। ওর চোখে এক ঝলক তৃপ্তি খেলে গেল, যেন অজানা রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এখন পাওয়া গেল। সে জানত, কোনও কুসংস্কারই জন্মায় না অকারণে—কেউ না কেউ সেটাকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির পথ বানায়।
হরিপদর পরিবার নিয়ে গ্রামে বহুদিন ধরেই গুঞ্জন চলত, কিন্তু প্রমাণ পাওয়া যেত না। কল্যাণীর বর্ণনা সেই অন্ধকার ইতিহাসের পর্দা একটু একটু করে সরিয়ে দিল। অদ্বৈত খুঁজে বের করতে লাগল, আসলে হরিপদর বংশে একজন ছিলেন—গোপাল রায়, যিনি স্বাধীনতার পর গ্রামে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। জমি, টাকা, ক্ষমতা—সবকিছুই তার দখলে ছিল। গ্রামবাসীরা যাতে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে, তাই তিনি এই কুসংস্কারকে কাজে লাগালেন। রাতের আঁধারে কয়েকজন বিশ্বস্ত লোককে সঙ্গে নিয়ে মিথ্যা আচার করাতেন, আর ডাহুক পাখির ডাকে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতেন। ধীরে ধীরে লোকেরা বিশ্বাস করতে শুরু করে, এ এক অশুভ শক্তির ইঙ্গিত—যার বিরুদ্ধে কেউ গেলে সর্বনাশ হবে। ফলে গোপাল রায় ও তার উত্তরসূরিরা গ্রামের জমি দখল করে, ঋণের নামে শোষণ চালিয়ে গেলেও, কেউ প্রতিবাদ করত না। ভয় যেন এক অদৃশ্য শেকল হয়ে গিয়েছিল। অদ্বৈত মনে মনে ভাবল—একটা গ্রামের শাসনব্যবস্থাকে কেবলমাত্র ভয় আর কুসংস্কারের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল কত বছর ধরে, আর তা ভেঙে বেরিয়ে আসতে মানুষ আজও সাহস পাচ্ছে না। এই ইতিহাস শুধু একটা পরিবার নয়, গোটা গ্রামের মানসিকতাকে জড়িয়ে রেখেছে।
অদ্বৈত এখন পুরো বিষয়টিকে অন্য চোখে দেখল। সে বুঝল, আসল নিশান কোনও অলৌকিক পাখির ডাক নয়, মানুষের ভয়ই সেই নিশান। ভয়কে যিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তিনি-ই ক্ষমতার মালিক। এই সত্য প্রকাশ হলে গ্রামবাসীরা হয়তো প্রথমে কেঁপে উঠবে, কিন্তু একদিন সাহস পাবে—এই অন্ধ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে। সে কল্যাণীর দিকে তাকিয়ে বলল—“তুমি যে সাহস করে সত্যিটা বলেছ, এটা একটা বড় পদক্ষেপ। গ্রামের মানুষের অজানা শেকল ভাঙতে গেলে এই সত্যিই আমাদের হাতিয়ার হবে।” কল্যাণীর চোখে ভেসে উঠল স্বস্তির আভা। বহু বছর ধরে যে স্মৃতি তাকে ভীত করত, আজ তা-ই হয়ে উঠল মুক্তির উপায়। অদ্বৈত তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই ভয়কে ভেঙে না দিলে এই গ্রামের কোনওদিন মুক্তি হবে না। বাঁশবনের অন্ধকারে আবারও ডাহুক পাখির ডাক ভেসে এল, কিন্তু অদ্বৈতের কাছে এখন তা আর অশুভ সংকেত নয়, বরং প্রতারণার মুখোশ খুলে দেওয়ার আহ্বান। গ্রামের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্ধকার ইতিহাস ধীরে ধীরে ফেটে বেরোচ্ছে—আর সেই ফাটলের ভেতর দিয়েই আলো ঢুকবে।
৯
রাতের আকাশে মেঘ জমে উঠেছিল, চারদিকে ভিজে মাটির গন্ধে ভেসে যাচ্ছিল গ্রাম। পূর্ণিমার চাঁদ মাঝে মাঝেই মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছিল, আর সেই আলো-অন্ধকারের খেলায় বাঁশবনটা যেন আরও ভয়ঙ্কর লাগছিল। রাতের নীরবতা হঠাৎ ভেঙে দিল সেই ভৌতিক ডাক—ডাহুকের ডাক। যেন অজানা কোনো সংকেত, গ্রামবাসীরা কাঁপতে কাঁপতে বাঁশবনের দিকে এগোতে শুরু করল। কারও মুখে আতঙ্কের ছাপ, কারও চোখে আবার অদ্ভুত এক নিষ্ঠা। গ্রামের প্রাচীন রীতি মেনে সবাই জানত আজ সেই রাত—চূড়ান্ত আচার রাত, যে রাতে তান্ত্রিক পরিবারের সন্ন্যাসী মন্ত্র পাঠ করবে, আর তাতে নাকি গ্রামের সর্বনাশ ঠেকবে। বাঁশবনের প্রান্তে পৌঁছে মানুষজন গোল হয়ে দাঁড়াল, আর মাঝখানে কালো পোশাক পরা সন্ন্যাসী ধূপ-ধুনো জ্বেলে তীব্র মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল। তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে; মন্ত্রের ধ্বনির সঙ্গে যেন বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল, বাঁশের পাতার খসখসানিও তাতে গলা মেলাচ্ছিল। কেউ চোখ বন্ধ করে কাঁপতে কাঁপতে মন্ত্র শুনছিল, কেউ আবার মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রার্থনা করছিল। ডাহুকের ডাক আরও জোরালো হচ্ছিল, দূরে কোথাও বাঘডাশার মতো শব্দ শোনা যাচ্ছিল, আর গ্রাম আতঙ্কে জমে গিয়েছিল। সবাই জানত আজকের আচার সফল হলে গ্রামের সর্বনাশ রোধ হবে, কিন্তু যদি কিছু ভাঙে তবে অজানা অশুভ মুক্তি পাবে।
এমন সময় অদ্বৈত হঠাৎ এগিয়ে এল। এতদিন ধরে সে গ্রামজুড়ে গোপনে খোঁজখবর চালিয়ে এসেছিল, আর আজ সে বুঝে গেছে, এই আচার আসলে কেবল এক ছলনা—সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার এক কৌশল। বাঁশবনের মাঝে দাঁড়িয়ে সে সবার সামনে সত্য প্রকাশ করার চেষ্টা করল। কাঁপা গলায় হলেও দৃঢ় সুরে সে বলল, “এই আচার, এই ডাক—সবই বানানো ভয়। আমাদের পূর্বপুরুষদের ভুল কাহিনিকে ব্যবহার করে আজও তোমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। ডাহুক কোনো অশুভের সংকেত নয়, বরং প্রকৃতিরই এক পাখি। তোমাদের ভয়ই ওদের শক্তি দিচ্ছে।” কিন্তু কথা শেষ হতেই গ্রামবাসীর ভিড়ের ভেতর গুঞ্জন উঠল। কারও চোখে ভীতি, কারও চোখে ক্রোধ। আর সন্ন্যাসী মন্ত্র থামিয়ে অদ্বৈতের দিকে চেয়ে গর্জে উঠল, “চুপ কর! নিষিদ্ধ সত্য উচ্চারণ কোরো না। এই আচার ভাঙলে তোমাদের সর্বনাশ অবধারিত।” কয়েকজন গ্রামবাসী, যারা অন্ধ বিশ্বাসে সন্ন্যাসীর কথায় মগ্ন ছিল, তারা অদ্বৈতকে ধরে ফেলতে ছুটে গেল। তাকে আটকানোর জন্য হাত-পা ধরা হলো, মাটিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা হলো। তার কণ্ঠ দমে আসছিল, তবু সে চিৎকার করে সত্য বলার চেষ্টা করছিল। ভিড় আতঙ্কে, বিশ্বাস আর সন্দেহের মাঝখানে দুলছিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, এক নারীকণ্ঠ রাতের অন্ধকারে গর্জে উঠল—কল্যাণী।
কল্যাণী এতদিন চুপচাপ সব সহ্য করে এসেছিল, কিন্তু আজকের রাত যেন তার ভেতরের সাহস জাগিয়ে তুলল। অদ্বৈতের চোখে সে যে দৃঢ়তা দেখেছিল, তা যেন তার ভেতরের শেকল ভাঙল। ভিড় সরিয়ে সে বাঁশবনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখ জ্বলজ্বল করছিল, গলায় কোনো ভয় ছিল না। সে সন্ন্যাসীর হাত থেকে ধূপ-ধুনোর পাত্র ছিনিয়ে নিল এবং মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। চারদিকে আগুনের ছিটে উড়ে পড়তেই ভিড় থেকে চিৎকার উঠল। “এ আচার ভাঙা যাবে না! সর্বনাশ হবে!”—মানুষের মুখে আতঙ্ক। কিন্তু কল্যাণী দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “এই ভয়ই আমাদের শত্রু। বছর বছর এই ভয়ের খপ্পরে পড়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে এনেছি। আজ থেকে এই ছলনা শেষ। আজ থেকে আমাদের গ্রাম নিজেদের ভাগ্য নিজেরা গড়বে।” তার গলায় এমন শক্তি ছিল যে গ্রামবাসীরা থমকে গেল। সন্ন্যাসীর চোখে আতঙ্কের ছায়া দেখা গেল, মন্ত্র ভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। আর সেই সঙ্গে বাঁশবনের ভেতরে হঠাৎ এক ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেল, ডাহুকের ডাক মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—কোনো অশুভ শক্তি আসেনি, কোনো সর্বনাশ ঘটেনি। বরং ভোরের আলো ধীরে ধীরে উঁকি দিতে শুরু করল। মানুষের চোখে প্রথমে অবিশ্বাস, তারপর ধীরে ধীরে ভয়ের জায়গায় মুক্তির আলো দেখা দিল। অদ্বৈত উঠে দাঁড়াল, আর কল্যাণীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিল। আজকের রাত শুধু এক আচার ভাঙল না, ভাঙল বহু শতাব্দীর অন্ধকার—যেখানে ভয় দিয়ে মানুষকে শাসন করা হতো। কল্যাণীর সাহস আর অদ্বৈতের সত্য আজ গ্রামকে নতুন আলোয় জাগিয়ে তুলল। এই রাত চিরকাল স্মরণীয় হয়ে রইল, চূড়ান্ত আচার রাত—যে রাতে ভয় ভেঙে মানুষ নিজের মুক্তি খুঁজে পেল।
১০
ডাহুকের ডাক আবারও ভেসে এল সেই গ্রামের বাঁশবনের দিক থেকে, ঠিক ভোররাতের সময়। গ্রামবাসী আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল, কিন্তু এবার আর সেই আতঙ্ক দীর্ঘস্থায়ী হল না। অদ্বৈত সাংবাদিক ইতিমধ্যেই সমস্ত সত্য প্রকাশ করেছে। তার হাতে ধরা পড়েছিল সেই সন্ন্যাসী, যিনি বহু বছর ধরে নিজেকে অলৌকিক শক্তির অধিকারী বলে চালিয়ে আসছিলেন। অথচ সত্যি হলো, তিনি আসলে নকুল মাঝির লোক। গ্রামের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারকে ব্যবহার করে, রাতের অন্ধকারে বাঁশবনের ভিতর ভয়ঙ্কর ডাক শোনাতো, কখনও আলো–ঝলমলে ভেলকি দেখাতো। এইভাবে গ্রামবাসীকে শাসন করত, ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করত। মানুষের অশিক্ষা ও সহজ সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একটা ‘তান্ত্রিক রহস্য’-এর আবহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অদ্বৈতের ধৈর্যশীল অনুসন্ধান আর দীপ ও শুভায়নের যৌক্তিক বিশ্লেষণ দেখিয়ে দিল—এ সবই এক ধূর্ত চক্রান্ত। গ্রামবাসীরা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি, কিন্তু নকুল মাঝির স্বীকারোক্তি ও সন্ন্যাসীর হাতেনাতে ধরা পড়া প্রমাণ তাদের চোখ খুলে দিল। সবাই অবাক হয়ে বুঝল, এতদিন ধরে তারা এক ভুয়া অলৌকিকতার বন্দি হয়ে ছিল।
অদ্বৈত এবার গ্রামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রমাণগুলো তুলে ধরল। পেতলের বাঁশি, যার মাধ্যমে রাতে “ডাহুকের ডাক” অনুকরণ করা হতো, বাঁশবনে লুকোনো লণ্ঠন, ভয় ধরানো মুখোশ—সবকিছু মানুষকে দেখানো হলো। লোকেরা প্রথমে ক্ষুব্ধ, পরে লজ্জিত। তারা বুঝল যে নিজেদের অন্ধবিশ্বাসই তাদের শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছিল। গ্রামের বুড়ো মধু দত্ত চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, “আমরা ভাবতাম—ডাহুকের ডাক মানেই অশুভ কিছু। অথচ এ তো প্রকৃতির স্বাভাবিক শব্দ! পাখিটা ডাকত নিজের মতো, আমরা তাকে দিয়েছি ভয়ের রূপ।” এ কথা শুনে অনেকেই মাথা নিচু করে ফেলল। আর দীপ সিগারেটে ধোঁয়া টেনে বলল, “ভয়ই আসল অস্ত্র, আর ভয়কে কাজে লাগালেই মানুষকে বোকা বানানো যায়। আজ থেকে এই ভয় ভাঙল।” গ্রামের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলারা ও কিশোররা তখন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল—যেন তাদের বুক থেকে এক অদৃশ্য বোঝা সরে গেল। যে ডাক এতদিন আতঙ্ক ছড়াতো, সেই ডাকই আজ সত্য প্রকাশের পরে মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠছে।
রাতভর আলোচনার শেষে, সকালের প্রথম সূর্যোদয়ের আলোয় গ্রাম যেন নতুনভাবে জেগে উঠল। মানুষজন একে অপরকে বলল—“কুসংস্কার নয়, জ্ঞানই হবে আমাদের পথপ্রদর্শক।” অদ্বৈত সেই ঘটনার রিপোর্ট শহরে পাঠাল, যাতে সারা রাজ্য জানে এই গ্রামের মানুষরা আর ভয়ের ফাঁদে আটকে নেই। সন্ন্যাসীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো, আর নকুল মাঝির সহযোগীরাও ধরা পড়ল। গ্রামবাসীরা প্রতিজ্ঞা করল, তারা আর কোনোদিন কোনো অন্ধবিশ্বাসে নিজেদের শৃঙ্খলিত হতে দেবে না। সেই প্রতিজ্ঞার সাক্ষী হয়ে আবারও ডাহুক পাখির ডাক শোনা গেল বাঁশবন থেকে। তবে এবার সেটি আর শিরদাঁড়া শিহরন তোলা শব্দ নয়—বরং প্রকৃতির একটি নির্মল সুর। শিশুরা আনন্দে হাততালি দিল, মহিলারা গেয়ে উঠল গ্রামের পুরোনো লোকগান। ভয়, প্রতারণা, অন্ধকার—সব মিলিয়ে এক নতুন ভোর এসে দাঁড়াল। মানুষজন অনুভব করল—ডাহুকের ডাক এখন আর আতঙ্ক নয়, বরং মুক্তির প্রতীক। গ্রাম যেন আবার প্রাণ ফিরে পেল, আর কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসে তারা দেখল, প্রকৃতির প্রতিটি শব্দেই আছে আনন্দের আভা, জীবনের শক্তি।
সমাপ্ত




