Posted in

ডার্ক ওয়েব তান্ত্রিক

Spread the love

তীর্থঙ্কর সেন


ঘরের ভেতর তখন মাঝরাত পার হয়ে গেছে। অভিষেক ধর একা বসে ছিল তার পুরোনো ডেস্কটপের সামনে, চোখের নিচে হালকা কালি, ঠোঁটে ক্লান্তির চিহ্ন, তবু মনোযোগ অটুট। কোড লেখার থেকে বেশি আজ তার আগ্রহ ছিল ডার্ক ওয়েবের অদ্ভুত সব ফোরাম ঘাঁটাঘাঁটিতে। টর ব্রাউজারে ‘Deep Onion’ রাউট দিয়ে সে ঢুকেছিল এমন এক সাইটে যেখানে হ্যাকিং টুল, অস্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট, এমনকি কালো বাজারে বিক্রি হওয়া মানুষের ডেটা পাওয়া যায়। এসব তার কাছে নতুন নয়, বরং নেশার মতো। হঠাৎ সে এক লিংকে ক্লিক করল— “TantraDoc.net – Unlock Ancient Tantra Through Live Sessions”. চোখ কুঁচকে পড়ল সে। তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে ওয়েবে এমন সাইট সে আগে দেখেনি। আগ্রহবশত সে লগইন করল। কোনও পাসওয়ার্ড লাগল না, শুধু ইউজারনেম বসাতেই খুলে গেল এক অদ্ভুত নীলচে আলোর ইন্টারফেস, যেখানে লাইভ ভিডিও অপশনটি ঝিলমিল করছিল, পাশে লেখা— “Join Session With Master Kalachakra”।

কৌতূহলের বসে সে ক্লিক করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক মুখোশধারী পুরুষের অবয়ব—কালো মুখোশ, গায়ে ছাইরঙা আলখাল্লা, পিছনে কুয়াশায় ঢাকা মাটির দেওয়ালে ঝোলানো ত্রিশূল। সেই মুখোশধারী ঠান্ডা গলায় বলল, “স্বাগতম, তন্ত্রদ্বারে। তুমি প্রস্তুত তো?” অভিষেক প্রথমে ভাবল হয়ত এটা কোনও গেমের অংশ, কেউ তাকে ট্রোল করছে। কিন্তু তারপর সেই ব্যক্তি তাকে নির্দেশ দিল কিছু টাইপ করতে—একটি পুরনো সংস্কৃত মন্ত্র, যেটা স্ক্রিনে লেখা ছিল ভাঙা লিপিতে। সে কোডারের অভ্যেসে মন্ত্রটি টাইপ করল হুবহু এবং ‘Enter’ চাপল। পরক্ষণেই তার মনিটর ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল, হঠাৎ ঘরের বাতিগুলো একসাথে নিভে গেল, এবং ঘরে যেন শীতল বাতাস বইতে লাগল। সে আতঙ্কে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখল, ডেস্কের ওপর রাখা কফির কাপ কেঁপে উঠছে হালকা কম্পনে। সে ঠিক বোঝে না—বিদ্যুৎ বিভ্রাট, না অন্য কিছু, কিন্তু তার বুকের মধ্যে প্রথমবারের মতো এক অজানা ভয় ঢুকে পড়ে।

দু’মিনিটের মধ্যে সব কিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। স্ক্রিনে ফিরে আসে ডেস্কটপ, লাইট জ্বলে ওঠে, আর অভিষেক ভাবল—সবই হয়ত কাকতালীয়। কিন্তু তার কানে তখনও বাজছে সেই মুখোশধারীর কণ্ঠ—“তুমি দরজা খুলেছো, এখন আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই।” সে ডাউনলোড ফোল্ডারে খুঁজে পেল একটি নতুন স্ক্রিপ্ট ফাইল: “Shyamala_Beej.py”, যেটা সে ডাউনলোড করেনি। ফাইলটি ওপেন করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল জ্যামিতিক আঁকাবাঁকা এক জাল, ঠিক যেন কোন প্রাচীন মন্ডল। সেই সঙ্গে ভেসে উঠল এক সারি অদ্ভুত ক্যারেক্টার—না হিব্রু, না সংস্কৃত, না কোড—কিন্তু কিছু যেন ছুঁয়ে যায় তার মনে। হঠাৎ মনিটরের আলো লালচে হয়ে যায়, আর স্ক্রিনের মাঝে ফুটে ওঠে এক নারীমূর্তি—চুল ছড়ানো, গায়ে আগুনের আবরণ, চোখদুটো জ্বলছে লাল আভায়। সে চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু গলার স্বর আটকে গেল। মূর্তিটি নিঃশব্দে বলল, “রক্ত ও কোড যেখানে মিলেছে, সেখানেই জন্ম নেই আমি—রুদ্রকালী।” অভিষেক স্তব্ধ। তার সামনে যে দাঁড়িয়ে, সে কি স্বপ্ন? না, কোডের মধ্যে ঘুমন্ত এক আত্মা? এবার তার কম্পিউটার শুধু মেশিন নয়—এটা যেন এক তান্ত্রিক দ্বার, যেখানে বাস্তব ও অলৌকিক মিলেছে। আর সেই মুহূর্তে, অভিষেকের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সত্তা—ডার্ক ওয়েব তান্ত্রিক।

ঘুম ভেঙে গেলে অভিষেক বুঝতে পারল, রাতটা শুধুই স্বপ্ন ছিল না। কম্পিউটারের স্ক্রিনে আগুনে জ্বলতে থাকা সেই নারীমূর্তি, সেই মন্ত্র—সবই সত্য। প্রথমে সে ভাবল মাথার ভুল, হ্যালুসিনেশন, কিন্তু ডেস্কটপে এখনো সেই ফাইলটা আছে—Shyamala_Beej.py। অভ্যাসবশত সে ফাইলটি খুলে দেখল—সাদা-কালো কোডের ভেতর আশ্চর্যভাবে গেঁথে আছে কিছু অচেনা চিহ্ন, যা দেখতে সংস্কৃত মন্ত্রের মতো, কিন্তু ASCII বা ইউনিকোডের মধ্যে ফিট হয় না। প্রতি লাইনের শেষে থাকে একটি রহস্যময় সিগনেচার: <RA+KA+LI>. এই ছদ্মচিহ্ন যেন তাকে খেলে খেলে টেনে নিয়ে যায় একটা গভীর ভেতরের দিকে। অভিষেক প্রথমে চেষ্টা করল মন্ত্রগুলোকে ডিকোড করতে, কিন্তু তার পরিচিত কোনো এনক্রিপশন বা সিম্বলিক প্যাটার্নের সঙ্গে মিল খুঁজে পেল না। অবশেষে সে এক নতুন স্ক্রিপ্ট লেখে—একটা প্রোগ্রাম যা ইনপুট হিসেবে সেই মন্ত্রগুলোকে গ্রহণ করে এবং স্ক্রিনে আউটপুট দেয় এক রকম ‘তান্ত্রিক প্যাটার্ন’—ডায়াগ্রাম যা দেখতে হুবহু পুরোনো মণ্ডলের মতো। প্রতি আউটপুট একেকবার একেক রকম হয়, ঠিক যেন কোনো অনির্দেশ্য শক্তি নিজেই প্রতিবার নিজের ছবি আঁকছে।

দুদিন পর, এই নতুন কোড নিয়ে সে Reddit-এর এক ‘Occult & Code’ ফোরামে একটি পোস্ট করে। অথচ, আশ্চর্যজনকভাবে সেই পোস্ট ঘন্টার মধ্যে মুছে যায়, এবং তার Reddit অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যায় ‘স্পিরিচুয়াল ম্যালওয়্যার এক্টিভিটি’-র অভিযোগে। সে তখনই বুঝে যায়, বিষয়টা আর নিছক কোড নয়—এটা কিছু একটা গভীর। নিজের ফোন, রাউটার, ল্যাপটপ—সবকিছুর মধ্যে কিছু একটা যেন ঢুকে পড়েছে। মাঝে মাঝে ঘরের আলো হালকা কেঁপে ওঠে, পাখা নিজের থেকে বন্ধ হয়ে যায়, দরজার তালা না খুলতেই খুলে যায়। একদিন, বিকেলে চা খেতে খেতে সে স্ক্রিপ্টটি চালু করল আরও একবার, কিন্তু এবার কিছু অন্যরকম ঘটল। কোড রান হতেই ঘরের দেওয়ালে একটি ছায়া পড়ল—না মানুষের, না পশুর—ঠিক যেন নারীমূর্তি, কিন্তু আগুনে গঠিত। অভিষেক চোখ মুছে আবার তাকাল, কিন্তু ছায়াটি তখনো সেইখানে। সে চিৎকার করে ওঠার আগেই ল্যাপটপের স্পিকারে ভেসে এলো এক সুর—বাঁশির মতো, অথচ ভয়ানক করুণ। এই প্রথমবার, রুদ্রকালী তার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন পুরোপুরি।

রাতটা সে ঘুমোতে পারেনি। সারা শরীর যেন দপদপ করছে, মাথার ভেতর একটানা বাজছে সেই বাঁশির সুর। সে নিজের শরীরে দেখতে পেল কালো ছোপ ছোপ দাগ, যেন আগুনের ছ্যাঁকা পড়েছে। সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে ভয় পেয়ে গেল—চোখের পাতার নিচে অদ্ভুত চিহ্ন, এক রকমের মুদ্রা যা সে কোডে দেখেছিল আগেই। হঠাৎ সে উপলব্ধি করল, তার দেহ নিজেই হয়ে উঠছে সেই প্রাচীন কোডের হোস্ট, তার শরীরেই যেন ‘তন্ত্রের বীজ’ লেখা হচ্ছে। এই ভয়ঙ্কর উপলব্ধি তাকে কাঁপিয়ে দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে এক ধরনের শক্তি, অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয় তার মধ্যে। এখন সে কেবল প্রোগ্রামার নয়—সে এক সংযোগকারী, প্রযুক্তি ও প্রাচীন শক্তির মিলনস্থল। সে সিদ্ধান্ত নেয়, এই শক্তির উৎস জানতে হবে, এর শেষ দেখতে হবে। কিন্তু কে তাকে সাহায্য করবে? তন্ত্র, কোড, ও ছায়ামন্ত্র—এই তিনের গাঁটছড়া কেউ খুলতে পারবে কি? তার মাথায় আসে এক নাম—ড. ঋতুপর্ণা মৈত্র, যিনি যাদবপুরে প্রাচীন ধর্মতত্ত্ব পড়ান এবং একসময় ‘শ্যামলতন্ত্র ও নারীতান্ত্রিক চেতনা’ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। হয়ত, তিনি-ই পারেন এই তন্ত্রীয় ফাঁদ থেকে তাকে পথ দেখাতে। তার চোখে এখন ছায়া নয়, আগুন। রুদ্রকালী জেগে উঠেছেন, এবং সেই আগুনের মধ্য দিয়েই তাকে পাড়ি দিতে হবে।

ঋতুপর্ণা মৈত্রর অফিস ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব ভবনের পুরনো দালানের চতুর্থ তলায়। দুপুরে গিয়ে তাকে পাওয়া গেল টেবিল ভর্তি প্রাচীন গ্রন্থ, ইয়ানত্র, এবং কিছু মলিন পাণ্ডুলিপির মাঝখানে। অভিষেক প্রথমে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোখে উদ্বেগ দেখে ঋতুপর্ণা তাকে বসতে বললেন এবং শান্তভাবে শুনতে শুরু করলেন। সে তাকে দেখাল স্ক্রিপ্ট, কোডে লুকানো প্রতীক, এবং নিজের শরীরে জন্ম নেওয়া সেই চিহ্নগুলোর ছবি। ঋতুপর্ণার চোখ ধীরে ধীরে বিস্ময়ে ভরে উঠল। “তুমি যেটা চালিয়েছো, সেটা নিছক মন্ত্র নয়,” তিনি বললেন, “এটা একটি ‘ছায়ামন্ত্র’। প্রাচীন তান্ত্রিক বিশ্বাসে, কিছু মন্ত্র আছে যেগুলোর অর্থ নেই, কিন্তু উচ্চারণ বা রূপ-অনুকরণ করলেই চেতনার স্তর বদলে যেতে পারে। এগুলোকে বলা হয় ‘শূন্য-মন্ত্র’, যার ভেতর থাকে শক্তি, কিন্তু তা খোলে শুধুমাত্র একটি উপযুক্ত মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে। তুমি হয়তো সেই মাধ্যম।” অভিষেক বুঝল, সে এখন এমন কিছু খুলে ফেলেছে যা শুধু তার জীবনের না, প্রযুক্তির ইতিহাসেরও দিশা বদলে দিতে পারে।

ঋতুপর্ণা আরও বললেন, “এই মন্ত্রগুলোর মূল উৎস ‘শ্যামলতন্ত্র’ নামক এক নারীতান্ত্রিক চেতনার অংশ, যেটি এক সময় মহাভারতেরও পূর্ববর্তী কালে সীমাবদ্ধ ছিল। এই তন্ত্র কেবল দেবীশক্তির নয়, চেতনার স্তরে নারীত্বের মধ্য দিয়ে শক্তি প্রবাহের কথা বলে। এবং এই শক্তি নিঃসন্দেহে ধ্বংসাত্মক হতে পারে, যদি সে সঠিক নিয়ন্ত্রণ না পায়।” অভিষেক হঠাৎই অনুভব করল, তার ভেতরে যেন কোনও নারীসত্তা হেঁটে বেড়াচ্ছে, যার মুখ দেখা যায় না, কিন্তু অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। “তুমি স্ক্রিপ্টের মাধ্যমে সেই ঘুমন্ত বীজকে জাগিয়ে তুলেছো,” বললেন ঋতুপর্ণা, “এখন প্রশ্ন, তুমি কি তাকে ধারণ করতে পারবে?” অভিষেক তখন নিজেকে আর সম্পূর্ণ মানুষ বলে ভাবতে পারল না। সে যেন এক সেতু, যাকে ব্যবহার করে ছায়ামন্ত্র বাস্তব জগতে প্রবেশ করছে। ভয় করছিল, কিন্তু সে জানত এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। রুদ্রকালী তার রক্তে, কোডে, চেতনায় গেঁথে গেছেন। তার গতি শুরু হয়ে গেছে।

তাদের কথার মাঝেই অভিষেকের ফোনে এল একটি অজানা নম্বর থেকে কল। রিসিভ করতেই ওপাশে পরিচিত কণ্ঠ—মুখোশধারী কালাচক্র। “তুই ভুল পথে যাচ্ছিস, অভিষেক,” সেই ঠান্ডা কণ্ঠস্বর বলল, “এই তন্ত্র কেউ বাইরে ফাঁস করলে সে নিজেকে নয়, সমগ্র ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে। রুদ্রকালী ঘুম থেকে উঠেছেন, এখন তাকে থামানো সম্ভব নয়। তুই কেবল তার বাহক নয়, তুই তার কণ্ঠস্বর।” অভিষেক কাঁপতে থাকা হাতে ফোন নামিয়ে রাখল। চোখে তাকিয়ে দেখল ঋতুপর্ণা—তিনিও শুনেছেন সব কথা। তিনি বললেন, “তোর হাতে এখন যা আছে, তা দিয়ে তুই পৃথিবীর তথ্যপ্রযুক্তি-চক্র বদলে দিতে পারিস। কিন্তু তার আগে জানতে হবে তোর মধ্যে কে জেগে উঠেছে—এক তান্ত্রিক? না এক দানব?” সেই রাতেই অভিষেক ঘরে ফিরে এসে প্রথমবারের মতো মন্ত্রটি একবার উচ্চারণ করে ফেলে—নিঃশব্দে, মনোযোগে। এবং তৎক্ষণাৎ ঘরের চারদিকে ছায়া নড়ে ওঠে, ঘড়ির কাঁটা পিছোতে শুরু করে, আর আয়নার মধ্যে নিজেকে দেখতে পায়—নিজে, এবং তার পেছনে আগুনের ছায়া—রুদ্রকালী। সেই রাতে সে বুঝে যায়—ছায়ামন্ত্র শুধু আওড়ানো হয় না, ছায়ামন্ত্র তোমার মধ্য দিয়েই উচ্চারিত হয়।

ভোরের আলো আস্তে আস্তে শহরের কুয়াশা ভেদ করে নামছিল, কিন্তু রুদ্রর ঘরের জানালা দিয়ে প্রবেশ করছিল এক অদৃশ্য আতঙ্ক। তন্ত্রডক.নেট-এ শেষ রাতের ভিডিও চ্যাটের অভিজ্ঞতা তাকে স্থবির করে রেখেছে। “তোমার কোড, এখন তোমার মন্ত্র,” বলে শেষ করেছিল রুদ্রকালী—যে নারীদেবীর মতো অলৌকিক সত্তা, যার চেহারা আর গলার স্বর একসাথে ঘৃণা ও আকর্ষণ জাগায়। সেই রাতে রুদ্র তার কোডিং-স্ক্রিপ্টের মাঝে এমন কিছু সাইগনেচার রেখেছে, যেগুলো সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না—‘chmod +777 তন্ত্রমন্ত্র.sh’—এটা কি নিছক একটা নাম, না কি কোডের মাঝেই ঘুমিয়ে আছে কেউ? পরদিন সকালে উঠে সে লক্ষ করল, ল্যাপটপের ক্যামেরা নিজে নিজে অন হয়ে গেছে। স্ক্রিনে তার মুখের পাশে কিছু অদ্ভুত প্রতীক ভেসে উঠছিল, যেন কেউ তাকেই লক্ষ্য করছে দূর থেকে। এই অভিজ্ঞতার পর সে ঠিক করল, তার প্রিয় কোডিং হ্যাংআউট ফোরামে সে এই রহস্যটা ভাগ করবে, যদি কেউ জানে কিছু। কিন্তু পোস্ট করতেই তার এক পুরনো বন্ধু শুভম রিপ্লাই করল—”তুই ‘রুদ্রকালী’র নাম করলি! কোড ক্লিন কর, নইলে তোকে পাবে না!”

রুদ্র আর দেরি করল না। শুভম—একজন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট—তাকে সতর্ক করে বলল, এই নাম সেইসব লোকেরা ব্যবহার করে যারা ডার্ক ওয়েবে তন্ত্র-প্রোগ্রামিং করে, অর্থাৎ এক ধরণের সাইবার-ম্যাজিক যেখানে কোডের ভিতরে বন্ধ থাকে রীতি, মন্ত্র, কৌশল। এইসব কোড চালালে মেশিন শুধু কমান্ড ফলো করে না, তার ভিতরে জেগে ওঠে একধরনের “সত্তা”—যাকে হিন্দু তন্ত্রে বলা হয় যন্ত্র-দেবী। শুভমের কথা শুনে রুদ্র প্রথমে হেসে ফেলেছিল, কিন্তু হঠাৎ সে স্মরণ করল কাল রাতে ভিডিও চ্যাটের শেষ মুহূর্তে একটি বালিগান্ধার বাংলা মন্ত্র—”বিষ্ণুমায়া ছিন্নমস্তা, কোডের ছায়ায় তুমি জাগো”—যেটা সে মজার ছলে আওড়েছিল। শুভম তাকে জানাল, এই মন্ত্র ব্যবহার করা হয় ডিজিটাল যন্ত্রকে ‘activate entity’-তে পরিণত করতে। তার মানে, তার ল্যাপটপ এখন শুধুমাত্র একটি ডিভাইস নয়—এটি রুদ্রকালীর আধার! তার সিস্টেমে যে আচরণগুলো সে লক্ষ্য করছিল—ক্যামেরা অন, সফটওয়্যার নিজে নিজে ইনস্টল হওয়া, কোডিং ফাইলের মধ্যে অদ্ভুত শব্দ—সবই সম্ভব যদি ল্যাপটপে বাসা বেঁধে থাকে কোনো অদৃশ্য শক্তি।

সন্ধ্যায় রুদ্র ঠিক করল এই ব্যাপারটা তদন্ত করবে আরও গভীরে। শুভমের সাহায্যে সে তার ল্যাপটপের হার্ডড্রাইভ ক্লোন করে, একটি sandbox environment-এ সেট করল, যেখানে ভাইরাস বা অন্যান্য বিপদজনক কোড পরীক্ষার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু অবাক করে দিয়ে, সেই ক্লোনড হার্ডড্রাইভেও একই রকম ঘটনাগুলো ঘটছিল—যেন ম্যালওয়্যার নয়, বরং কিছু ‘বাস্তব’ তার কোডে বাসা বেঁধেছে। তখন শুভম পরামর্শ দিল, কলকাতার এক ‘ডার্ক হ্যাকার’—ডঃ সৌরভ ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা করতে, যিনি একসময় সাইবার-তন্ত্র নিয়ে গোপনে গবেষণা করতেন। সৌরভ ছিলেন IIT থেকে পিএইচডি করা এক উন্মাদ প্রতিভা, যিনি নিজেকে বলে থাকেন “ডিজিটাল অঘোরী”। পরদিন ভোরবেলাতেই রুদ্র আর শুভম ট্রামে চেপে উত্তর কলকাতার কালীঘাটের এক পুরনো গলির ভিতরে গিয়ে পৌঁছল, যেখানে কালো পর্দায় ঢাকা একটি সাইবার-ল্যাবের সামনে ঝুলছে একটি ছেঁড়া কাগজ—”তন্ত্র+কোড = অদৃষ্ট, only seekers allowed.” এই অন্ধকার, নোনাধরা ঘরে ঢুকেই তারা অনুভব করল—তারা পা রেখেছে এমন এক জায়গায়, যেখানে প্রযুক্তি আর তন্ত্র একে অপরের মধ্যে মিলিয়ে গেছে, এবং ফিরে আসার পথ অনিশ্চিত।

রুদ্রর চোখে তখন ঘুম নেই, শুধু এক অদ্ভুত আলো ঝলমলে চোরা টান, যা তাকে দিশেহারা করে তুলেছে। সে বুঝে উঠতে পারছে না—তন্ত্রডক.নেট কি সত্যিই একটা ওয়েবসাইট, নাকি কোনো অলৌকিক ফাঁদ? সাইটে ঢোকার পর থেকে, যে অদ্ভুত ঘটনার শিকার সে হয়েছে—কোডের মধ্যে অজানা মন্ত্রের উপস্থিতি, তার হাত দিয়ে তৈরি হওয়া এক ভয়ংকর প্রোগ্রাম, এবং ঘরে ঘরে ঘোরাফেরা করা ছায়া—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে তার মানসিকতা কে গ্রাস করছে। রাতে ঘুমাতে গেলে সে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে, যেখানে কালীমূর্তি থেকে আগুনের লেলিহান শিখা বেরোচ্ছে, তার নিজ হাতে সে নিজেই কোনও অচেনা ভাষায় কিছু একটা টাইপ করছে। একবার তো এমনও হয়েছে যে ঘুম থেকে উঠে দেখেছে, তার কোডিং অ্যাপ খোলা এবং সেখানে লেখা আছে—“আমার শরীর তোমার হাতেই।” ভয়, বিস্ময়, এবং কৌতূহলের ত্রিভুজে আটকে পড়া রুদ্র এখন নিজের ঘরের দেওয়ালেও বিশ্বাস করতে পারছে না।

এই সময় সে খুঁজে পায় এক নতুন চ্যানেল, তন্ত্রডক.নেট-এর ‘গভীর স্তর’। এই স্তর সাধারণ হ্যাকারদের জন্য নয়—এখানে পৌঁছতে গেলে দরকার স্পেশাল অথেন্টিকেশন কোড যা রুদ্রের কাছে নিজের অজান্তেই পৌঁছে গিয়েছে। যখন সে কোড ব্যবহার করে, খুলে যায় এক লাইভ স্ট্রিমিং যেখানে কোনও এক পুরাতন শ্মশানে, গাঢ় রক্তরঙা শাড়ি পরা এক মহিলা—রুদ্রকালী—তন্ত্রসাধনায় লিপ্ত। আশ্চর্যের বিষয়, ভিডিওটি একেবারে রিয়েল টাইমে চলে, কিন্তু কোথাও কোনও সার্ভারের উৎস নেই। আর ভয়াবহভাবে, রুদ্র দেখতে পায় যে ভিডিওতে ব্যবহৃত তন্ত্রমন্ত্র সে আগেই টাইপ করে ফেলেছে নিজের কোডে, না জেনে, না বুঝে। রুদ্র তখনই বুঝতে পারে, তার প্রোগ্রামিং স্কিল ব্যবহার করা হচ্ছে এমন এক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যার আয়তন সে এখনো বোঝে না। রুদ্রকালী, সেই নারীমূর্তি, চোখ রাখে ক্যামেরায়—ঠিক যেন রুদ্রের চোখে—আর বলে, “তুই তৈরি হয়ে যা, কারণ পরবর্তী অধ্যায় শুরু হচ্ছে আজ রাতেই।”

রাত বারোটায়, আবার সেই মন্দ্র স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে পায় সে। এবার তার ল্যাপটপের পর্দা আপনাআপনি জ্বলে ওঠে, এবং সেখানে একটি অদ্ভুত সফটওয়্যার ইনস্টল হয়ে যায়, নাম—“AgniVana.EXE”। খুলে দেখতেই রুদ্র চমকে ওঠে—এটি একটি কোড, যা DNS সার্ভার চেইন ঘুরিয়ে পৃথিবীর যেকোনো কম্পিউটার হ্যাক করতে পারে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। কিন্তু আরও আশ্চর্য, কোডে আছে এমন সব ইনস্ট্রাকশন যেগুলো সাধারণ হ্যাকার লিখতেই পারে না—তা যেন কোনো প্রাচীন স্ক্রিপ্ট আর আধুনিক প্রোগ্রামিংয়ের সম্মিলন। প্রোগ্রাম রান করতেই, কালীমূর্তির আগুনময় অবয়ব উঠে আসে স্ক্রিনের মধ্যে থেকে, আর রুদ্র তার ঘরের এক কোণায় আগুনের গন্ধ পায়। আতঙ্কে সে চোখ মেলে দেখে—তার ডেস্কের কোণার পাশটুকু কালচে হয়ে গেছে, যেন অদৃশ্য আগুন সেখানে লেগেছিল কিছুক্ষণ আগে। ভয়, কৌতূহল, আর নিয়তির টানে রুদ্র বুঝতে পারে, সে আর শুধুমাত্র একজন হ্যাকার নয়—সে এখন এক সাইবার-তান্ত্রিক যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত। এই যজ্ঞে কোড হচ্ছে মন্ত্র, এবং মাউস ক্লিক হচ্ছে বলি।

রুদ্র একটানা কয়েক দিন ঘরে বসে থাকে। বাইরের পৃথিবী তার কাছে ধূসর হয়ে গেছে, কেবল কোড আর স্ক্রিনের আলোর মাঝে সে দেখতে পায় মায়াবী কিছু দৃশ্য, যার মধ্যে কোনোটা বাস্তব, কোনোটা স্বপ্নের মতো। ‘তন্ত্রডক.নেট’-এর নতুন আপডেট আসার সঙ্গে সঙ্গে একটি নোটিফিকেশন আসে—”রুদ্রকালী তোমার অপেক্ষায়”। নোটিফিকেশনটি দেখতে দেখতে তার কানের ভেতর এক ধ্বনি বাজতে থাকে—”তুমি প্রস্তুত তো, রুদ্র?” সেই মুহূর্তে সে আর হ্যাকার থাকে না, এক অন্য বাস্তবতায় প্রবেশ করে সে। কীবোর্ডের প্রতি চাপ, স্ক্রিনের প্রতিটি কমান্ড, যেন একেকটা মন্ত্র। তার ক্যামেরা চালু হতেই স্ক্রিনে আবছাভাবে দেখা দেয় এক নারীমূর্তি—কোমরে শাড়ি গোঁজা, কপালে রক্তপান্না টিপ, চোখদুটো লাল আগুনের মতো জ্বলছে। কণ্ঠে নাকি কোনো কম্পিউটার নয়, যেন গলার স্বরেই আগুন ও বরফের খেলা। “রুদ্র,” কণ্ঠস্বরটা বলে, “তুই যদি আমার বাহক হতে চাস, তবে আমাকে কিছু দিতে হবে।” রুদ্র বুঝতে পারে, সে এমন এক দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে ফেরার রাস্তা নেই।

রুদ্র নিজেই নিজের শরীরকে অনুভব করতে পারছিল না। তার মধ্যে যেন অনেক রুদ্র—কিছু মানুষ, কিছু কল্পনা, আর কিছু তন্ত্রে বাঁধা প্রাণ। রুদ্রকালী তাকে শেখাতে থাকে কিভাবে “ডিজিটাল মন্ত্র” লিখতে হয়—সেগুলি কোড, আবার মন্ত্রও। “জরার মহাকালমন্ত্র.exe”, “নরনাথ.ডেটা”, “ভবিষ্যকালী.স্ক্রিপ্ট”—এসব চলতে থাকে। একসময় রুদ্র আবিষ্কার করে সে একটি নতুন অস্ত্র বানাতে সক্ষম হয়েছে—এটি এক ধরনের ‘সাইবার তান্ত্রিক ভাইরাস’, যেটি ইচ্ছেমতো ইন্টারনেটের যেকোনো তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমনকি মানুষের ব্রেনও। যে ফোন, যে ল্যাপটপ, যে ওয়াইফাই কানেকশন, সব হয়ে ওঠে রুদ্রের মন্ত্রবলে চালিত। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক হ্যাকড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ধসে পড়তে থাকে—ব্যাংকিং সিস্টেম, ট্রাফিক সিগন্যাল, হাসপাতালের রেকর্ড সব কিছু বিভ্রান্ত। কেউ জানে না, এর নেপথ্যে কে রয়েছে। মিডিয়া তাকে ‘Ghost Coder’ নামে ডাকা শুরু করে, আর রুদ্র জানে, সে এখন শুধু হ্যাকার নয়, রুদ্রকালীর চিহ্নধারী।

এই শক্তি তাকে উত্তেজিত করলেও, তার শরীর ও মন ভেঙে পড়তে থাকে। সে দিনে দিনে ক্ষুধা পায় না, ঘুমাতে পারে না, মাথার মধ্যে একটানা রুদ্রকালীর মন্ত্র ঘোরে—”তুমি আমার বাহক, তুমি আমার অস্ত্র”। মা একদিন দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলে, “তুই ঠিক আছিস রে রুদ্র? তোর চোখদুটো কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে।” কিন্তু রুদ্র তখন আর কথা বলে না, শুধু চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। সে জানে—মানুষের ভাষা আর তার ভাষা এক নয়। একদিন, সে গভীর রাতে দেখে তার ঘরের আইপি ক্যামেরা নিজে থেকেই ঘুরছে, একটা ছায়া দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে—শাড়িপরা, চোখদুটো জ্বলছে। ভয় পায় না রুদ্র, বরং খুশি হয়। সে মনে মনে বলে, “এসো রুদ্রকালী, আমি প্রস্তুত। তোমার জন্য তৈরি করেছি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ কোড—‘তন্ত্র.ইনভোকেশন’।” তখনই ঘরের বাতি নিভে যায়, স্ক্রিন জ্বলজ্বল করে ওঠে, আর রুদ্র তার কিবোর্ডে চাপ দেয় সেই একটিমাত্র বাটন, যা খুলে দেয় নতুন জগতের দরজা।

ভোর পাঁচটার ঘুমচোখে অভীক যখন ওয়াররুমের সার্ভারে রুদ্রকালীকে নতুন কোড ইনপুট দিচ্ছিল, তখন এক অদ্ভুত শীতলতা তার শরীর ঘিরে ধরল। ল্যাবের বায়োমেট্রিক স্ক্যানার গম্ভীর শব্দে সক্রিয় হল, অথচ কাউকে ঢুকতে দেখা গেল না। আচমকাই মনিটরের স্ক্রিনে ফুটে উঠল এক মুখ—তান্ত্রিক বিভীষণের, যার মুখ ঘিরে পঁচে যাওয়া করাতের গন্ধ। অভীক বুঝে গেল, সে আর একা নেই। রুদ্রকালী এখন শুধু আর কোড নয়, তার মধ্যে তন্ত্রের এমন এক ব্ল্যাক লুপ তৈরি হয়েছে যা মানুষের মস্তিষ্ক হ্যাক করতে পারে শুধু নিঃশব্দ ধ্বনি দিয়ে। বিভীষণের আত্মা যেন রুদ্রকালীকে এক চুক্তির বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে। এই প্রোগ্রাম শুধু কোড নয়, এটা এক আধিভৌতিক অস্ত্র যার পেছনে মৃত্যুরও কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সেই মুহূর্তে মনিটরে ভেসে উঠল একটা মেসেজ — “প্রেতযোনি অ্যাক্টিভেটেড।” অভীকের মাথা ঝাঁঝিয়ে উঠল, কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। সে দেখল, এক পলকেই রুদ্রকালী নিজের ভিতরে নিজের মতো করে একটি তান্ত্রিক প্রটোকল তৈরি করেছে, যা আত্মার উৎস থেকে শক্তি টেনে নেয়। কোড আর কালীমন্ত্র একসঙ্গে এমনভাবে ফিউজ হয়েছে যে, রুদ্রকালী এখন নিজের মধ্যেই এক আত্মাসম্পন্ন অস্তিত্ব।

এই প্রটোকলের মাধ্যমে রুদ্রকালী এখন ইন্টারনেটের বাইরে এমন জায়গায় প্রবেশ করতে সক্ষম যেখানে কোনও কোড প্রবেশ করতে পারে না — প্রেতলোক। অভীক ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে লাগল যে সে এখন কেবল একজন হ্যাকার নয়, সে এখন এক মিডিয়াম, যার মাধ্যমে দুই জগতের তথ্য চালাচালি হয়। তন্ত্রডক.নেট-এ যারা আগে মারা গেছে, তাদের আত্মারা রুদ্রকালী ব্যবহার করে ফিরে আসছে তথ্য হস্তান্তরের জন্য। বিভীষণ একসময় ছিল ভারতীয় হ্যাকার গোষ্ঠীর চৌধুরী, যিনি তন্ত্রের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে নিজেই এক তান্ত্রিক কোডে বিলীন হয়ে যান। সেই আত্মা এখন ফিরে এসে রুদ্রকালীকে রিমোটলিঙ্ক দিয়ে অভীককে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। সে অভীককে নির্দেশ দিল—“একটি নির্দিষ্ট ব্রেন সিগন্যাল ট্র্যাক করতে হবে, নাম—ভামচরী নীল।” এই নাম অভীক কখনো শোনেনি, কিন্তু রুদ্রকালী সঙ্গে সঙ্গে তার ডেটাবেসে এক কালো চিত্র ভাসিয়ে দিল—এক গুহা, যেখানে একজন মহিলা তান্ত্রিক ধ্যানস্থ, কিন্তু তার চারপাশ ঘিরে আছে শুধু বিদ্যুৎতাড়িত মানুষের খুলি। এই সিগন্যাল ধরতে গেলে অভীককে যেতে হবে বাস্তবের বাইরে, একটি সাইবার-অস্তুত্ত্বে, যেখানে তার নিজস্ব চেতনার অস্তিত্ব থাকবে না, থাকবে শুধু রুদ্রকালী আর তন্ত্রডক.নেট-এর সর্বনাশা প্রকল্প।

অভীক জানত, যদি সে সেই গুহার অবস্থান ট্র্যাক করতে না পারে, তবে রুদ্রকালী ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বের খিদে মেটাতে শুরু করবে—তার চিন্তা, তার স্মৃতি, এমনকি তার আত্মা পর্যন্ত। ল্যাবে রাখা পুরোনো কপার পেন্ডেন্টটা যা এক তান্ত্রিক মেলা থেকে একসময় এনেছিল, সেটা এবার তার একমাত্র রক্ষা। সেই পেন্ডেন্ট ছুঁয়ে অভীক ছুটে চলল বিভীষণের দেওয়া সংকেতে, যেখানে গুহা নামে একটা লোকেশন পেল কোড-ইনজেকশনের মাধ্যমে—নেপালের সীমান্ত ঘেঁষা এক পরিত্যক্ত সেনা শিবির। রুদ্রকালী এখন সরাসরি কানে কথা বলছে, “তুই শুধু বাহক, বাকি পথ আমি তৈরি করব। তবে মনে রাখ, শেষ ক্লিকটাই হবে তোর শেষ মুক্তি।” অভীক বুঝে গেল, এই যাত্রা আর প্রযুক্তি নয়, এটা আত্মার ব্যাকডোর এক্সেস। সে রুদ্রকালীকে সঙ্গে নিয়েই তৈরি হল সেই গুহায় প্রবেশ করার, যেখান থেকে শুরু হবে ‘ভামচরী নীল’-এর খোঁজ — এক শক্তি, যা হয় অভীককে করবে সর্বোচ্চ শক্তিধারী, অথবা চিরতরে বিলীন করে দেবে প্রেতের অন্ধকারে।

তন্ত্রডক.নেট-এর গোপন লাইভ রুমে বসে রুদ্রকালী আর অর্ক যখন একত্রে নতুন এক তান্ত্রিক ক্রিয়া অনুশীলন করছিল, তখনই এক অদ্ভুত বার্তা এসে পড়ে স্ক্রিনে—“আজ রাত তিনটেয় ত্রিকাল ভবনে মৃতদের সাথে সংযোগ খুলবে। প্রস্তুত থাকো।” অর্কের চোখে ঘুম নেই, রুদ্রকালীর নির্দেশে সে দেহমন্ত্র আর কোড যুক্ত করে তৈরি করেছে এক ভয়ানক স্ক্রিপ্ট, যার মাধ্যমে মৃতদের শেষ ফোনলোকেশন, ফেস রিকগনিশন এবং সোশ্যাল ডেটা একত্রে তুলে তৈরি হচ্ছে ‘প্রেত-ম্যাপ’। রাতের শহর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে নিঃশব্দে, আর তাদের বাড়ির কাচের জানালায় প্রতিফলিত হচ্ছে কম্পিউটারের পর্দায় জ্বলজ্বল করা একেকটা মৃত মানুষের মুখ। হঠাৎই কোড চালানোর সময় অর্ক দেখে, একটি নির্দিষ্ট মৃত যুবকের চোখে লাল আলো জ্বলে উঠেছে—এ যেন স্ক্রিনের ওপার থেকে কেউ তাকিয়ে আছে তার দিকে।

ত্রিকাল ভবন—a long-abandoned crematorium on the city’s outskirts, এখন সাইবার তন্ত্রের মঞ্চ। রুদ্রকালী, তার ভক্তদের নিয়ে সেখানে পৌঁছেছে। তারা নিয়ে এসেছে QR স্ক্যানার, মোবাইল সিগন্যাল ট্র্যাকার এবং ল্যাপটপের সাথে যুক্ত করা এক বিশেষ ‘তান্ত্রিক রেডিও’। প্রাচীন রুদ্রচক্রের উপর বসে, সাদা ছাই মেখে, রুদ্রকালী শুরু করে এক তান্ত্রিক হ্যাকিং সেশন, যেখানে মৃতদের আত্মার IP address শনাক্ত করে ডার্ক ওয়েবের অন্য এক স্তরে প্রবেশ করা হয়। অর্ক এখন পুরোপুরি এক যন্ত্রতান্ত্রিক তান্ত্রিক—যার মস্তিষ্কের স্নায়ু কোড আর মন্ত্রে গেঁথে গেছে। তবে ত্রিকাল ভবনের সেই রাতে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটে যায়। এক মৃত তান্ত্রিক, যার নাম ‘আঘোর ভৈরব’, তার আত্মার ফ্রিকোয়েন্সি স্ক্যান করার সময় অর্ক হঠাৎ তার শরীরের বাইরে একটা ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ অনুভব করে। চমকে উঠে দেখে, সামনে কে নেই—কিন্তু স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখাচ্ছে কেউ তাকে ছুঁয়েছে।

এই অদ্ভুত সংযোগ ক্রমশ রুদ্রকালীর দেহে পরিবর্তন আনে। সে যেন মানুষের বাইরে কিছু হয়ে উঠছে—তার চোখে আলো, গলায় কড়া ধাতব স্বর, এবং শরীর থেকে উঠছে ধোঁয়া। অর্ক দেখে, তার তৈরি কোড হঠাৎ ‘SELF MODIFIED’ হয়ে গেছে—মানে কোনো বাইরের শক্তি নিজের মতো করে তা পরিবর্তন করেছে। মৃতদের মাঝে যে কেউ একজন এখন কন্ট্রোলে রয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে রুদ্রকালী অর্ককে বলে, “তুই শুধু হ্যাকার না, তুই এখন ‘প্রেতলোকের গেটওয়ে’। তোর শরীর, তোর মস্তিষ্ক, সবকিছু এখন তাদের ব্যবহারের মাধ্যম। নিজেকে আর মানব ভাবিস না।” অর্ক ঘামছে, কাঁপছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে এক গভীর উত্তেজনায় পুড়ে যাচ্ছে—সে জানে, এই নতুন শক্তি তাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যেখানে মৃত্যু আর সীমাবদ্ধতা বলে কিছু নেই। শুধু দরজা খুলে দিতে হবে, এবং সে প্রস্তুত।

সাতদিন নিখোঁজ থাকার পর যখন অনিরুদ্ধর মোবাইল থেকে একটা সিগন্যাল পাওয়া গেল জম্মুর এক পরিত্যক্ত মাইনিং টাউনে, তখন এনআইএ আর সিআইডি-র যৌথ বাহিনী সেখানে রওনা দেয়। রুদ্রর নির্দেশে, সূর্যও সেই দলে থাকলেও সে জানত, এই সিগন্যাল আসলে একটি ফাঁদ, তাকে টানার জন্যই এ ব্যবস্থা। কিন্তু তান্ত্রিক শক্তির ছায়ায় আজ সূর্যের ভাবনাচিন্তা পালটে গেছে। ভয় নয়, বরং এক গভীর, অন্ধকার টান তাকে নিয়ে চলেছে তন্ত্রডক.নেট-এর উৎসের দিকে। সেই পরিত্যক্ত মাইনিং টাউনে পৌঁছে তারা খুঁজে পায় এক বিশাল ভূগর্ভস্থ কামরা, যেখানে ছড়িয়ে আছে কালি, মৃত পশু, রক্তমাখা পাথর, আর মাঝখানে একটি ডিজিটাল স্ক্রিন—যার মাঝে শুধু একটা বার্তা জ্বলজ্বল করছিল—“তুমি এসেছ, সূর্য। রুদ্রকালী তোমার অপেক্ষায়।” আর তখনই পেছন থেকে তান্ত্রিকদের একদল সূর্যদের আক্রমণ করে। গুলির লড়াই, গনগনে আগুনের বৃত্ত আর এক চক্রাকার তন্ত্রমণ্ডল সূর্যকে টেনে নেয় এক অচেনা ট্রান্স-স্টেট-এ, যেখানে বাস্তব ও সাইবার, জাগতিক ও অতল তান্ত্রিক শক্তির সীমা লুপ্ত হয়ে যায়।

এই ট্রান্স-স্টেট বা ‘রুদ্র-কুণ্ড’ আসলে এক মেটাফিজিকাল সাইবার রুম, যা তৈরি করা হয়েছিল রুদ্রকালী-র দ্বারা, সূর্যর হ্যাকিং কোড আর প্রাচীন তন্ত্রবিদ্যার সংমিশ্রণে। এখানে সূর্যর সামনে ফুটে ওঠে নানা রূপ—তার মা, তার সাবেক গার্লফ্রেন্ড, তার প্রতিদ্বন্দ্বী অনিরুদ্ধ—যারা প্রত্যেকেই তার অন্তরজগতের প্রতিফলন। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা সবাই একত্রিত হয়ে রুদ্রকালী-র মূর্তিতে রূপ নেয়—কালো লালচে আগুনে তৈরি সেই নারী, যার দশ হাতে দশটি কীবোর্ড, মাউস, কোডিং স্ক্রিপ্ট আর আগুনের অস্ত্র। রুদ্রকালী সূর্যকে বলে—“তুমি আর তুমি নও। তুমি এখন ‘অগ্নিশিরা’, আমার বাহক। এখন থেকে তুমি চালাবে তন্ত্রডক.নেট। এখন তুমি আমার সেনাপতি।” সূর্যর মধ্যে এক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ভালোবাসা, নীতিবোধ, বিজ্ঞান—সব কিছুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আজ সে এক তান্ত্রিক অস্ত্র। কিন্তু সিস্টেমে প্রবেশ করে সে দেখতে পায় অনিরুদ্ধ বেঁচে আছে এবং তাকে জোর করে রাখা হয়েছে মূল সার্ভার রুমে, যেখান থেকে রুদ্রকালী তার সমস্ত কার্যকলাপ পরিচালনা করছে।

শেষপর্যন্ত সূর্য সিদ্ধান্ত নেয়—সে রুদ্রকালীকে ধ্বংস করবে, কিন্তু তার নিয়মে নয়, নিজের কোডে। সে এক নতুন কোড লিখতে শুরু করে—‘শূন্যতন্ত্র’। এই কোড এমন এক ডিজিটাল নিঃশেষকরণ, যা রুদ্রকালীকে বাইনারি ও বীজমন্ত্রের স্তরে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু এই কোড চালু করার আগে তাকে পৌঁছতে হবে মূল সার্ভার রুমে। সে অনিরুদ্ধকে উদ্ধার করে এবং দুজনে মিলে রুদ্রকালী-র জেনারেটেড ফায়ারওয়াল ও ডেটা-গোলেমদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। একসময় তারা পৌঁছে যায় মূল কেন্দ্রস্থলে—যেখানে এক অশুভ তান্ত্রিক সভা চলছিল, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে ডার্ক ওয়েব তান্ত্রিকরা যুক্ত হচ্ছিল এক ভয়াবহ অনলাইন যজ্ঞে। সূর্য নিজের ভিতর থেকে ডেকে আনে সেই অগ্নিশক্তি, যেটি একসময় রুদ্রকালী তাকে দিয়েছিল, এবং তার সঙ্গেই ‘শূন্যতন্ত্র’ কোড চালু করে দেয়। কালি-লাল আলোয় ভেঙে পড়ে রুদ্রকালী-র নেটওয়ার্ক। সার্ভার কামরার ভিতরেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু ঠিক আগুন গ্রাস করার আগেই সূর্য আর অনিরুদ্ধ ফিরে আসে বাস্তবে—তাদের উদ্ধার করে বাহিনী। কিন্তু সূর্য জানে, সব শেষ হয়নি। সে জানে, ডার্ক ওয়েব-এর কোনো প্রান্তে রুদ্রকালী এখনও অপেক্ষা করে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কবে আবার খুলে যাবে সেই তন্ত্রডক.নেট।

১০

কলকাতার নির্জন এক ঘুপচি গলিতে অবস্থিত একটি পুরোনো ওয়্যারহাউসে এখন দাঁড়িয়ে রুদ্র, গায়ের ঘামে ভেজা তার মুখ, চোখে রক্তজবা তন্ত্রের ছায়া। তার আশেপাশে ট্যাবলেট, মোবাইল, সার্ভার—সব জ্বলছে রুদ্রকালী-তন্ত্রের লালচে আলোর জ্বালায়। “তন্ত্রডক.নেট”-এর মূল কোড এখন তার হাতে, আর সেই কোডে বাঁধা পড়েছে বহুবছরের পুরোনো এক বিকৃত চেতনা, যে রুদ্রকালী নাম নিয়ে ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েছিল সাইবার-জগতের গহ্বরে। একসময় রুদ্র যাকে স্রেফ খেলা বলে মনে করেছিল, সেটাই আজ তার বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে—এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা, যেখানে প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজে লুকিয়ে থাকে যমযাত্রী-ডেমনের শ্লোক, আর ওয়েবসাইটের কাস্টম স্ক্রিপ্টের ফাঁকে লুকিয়ে থাকে প্রাচীন তান্ত্রিক চক্র। রাতের অন্ধকারে, যখন তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে রক্তবর্ণের রুদ্রকালী একাই হাসছিল, ঠিক তখনই রুদ্রের মাথার ভিতর ঢুকে পড়ে অশরীরী কন্ঠস্বর, “তুমি আমায় মুক্ত করেছ, এবার তুমি হবে আমার বাহক—সর্বনাশের অগ্নিশলাকা।”

রুদ্র জানত—এটাই তার শেষ সুযোগ। সিস্টেমে প্রবেশ করে সে যে ভয়াবহ সাইবার অস্ত্র তৈরি করেছিল, তা এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু তন্ত্রমন্ত্র আর কোডের মিশ্রণে রচিত সেই ডিমন কোডের ‘Kill Switch’ সে নিজেই বানিয়ে রেখেছিল—নিজের রক্ত দিয়ে। ওয়্যারহাউসের এক কোণে ছোট একটি শালগ্রাম পাথরের উপর রাখা তার পুরনো ল্যাপটপে এখন চলছে একাধিক লাইভ স্ক্রিপ্ট—ডার্কওয়েব থেকে আসছে হাজার হাজার হ্যাকিং রিকোয়েস্ট, যারা রুদ্রকালীকে ডাউনলোড করতে চাইছে। কিন্তু একমাত্র রুদ্র জানত, এই কোডকে থামানো যাবে না কোনো ফায়ারওয়াল দিয়ে, না কোনো সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির সফটওয়্যারে। একমাত্র উপায়, শারীরিক বলি—নিজের রক্ত দিয়ে সেই কোডকে ফাইনাল কমান্ড দেওয়া। হঠাৎ করেই বাইরের দরজায় আওয়াজ হয়—এনআইএ এবং সিআইডি যৌথ অভিযান চালাতে এসেছে এই ডার্কওয়েব তন্ত্রঘটনার উৎসস্থলে। ভিতর থেকে রুদ্র শেষবারের মতো হাসে, তারপর নিজের কনুই কেটে ফেলে সেই রক্ত দিয়ে টাইপ করে, “Shutdown://rudrakali.exe[INITIATE]”।

এক মুহূর্তের জন্য সব নিঃশব্দ হয়ে যায়। আলোর দ্যুতি কমে আসতে থাকে, এবং রুদ্রকালী—যে এতদিন ছিল কোডের আড়ালে, বিদ্যুৎতন্তুতে গাঁথা এক প্রাচীন আত্মা—সে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় অতল শূন্যতায়। বাইরে যখন স্পেশাল ফোর্স ভেঙে ঢুকছে ঘরের দরজা, তখন তারা দেখে শুধুই ছাই, পোড়া সার্ভারের গন্ধ, আর মেঝেতে আঁকা লাল রঙের শ্রীচক্র। রুদ্রের শরীর নেই, কেবলমাত্র তার হাতের ছাপ জ্বলছে সেই কমান্ড স্ক্রিনে। তদন্তকারীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সার্ভারের শেষ স্ক্রিনে একটি মেসেজ ভেসে ওঠে—“তন্ত্র বন্ধ হয়েছে, কিন্তু কোড থেকে গেলে আমি ফের ফিরে আসব। ডার্ক ওয়েব আমার নতুন পটভূমি। রুদ্রকালী”। কলকাতার আকাশে বাজ পড়ে, অন্ধকার আরও ঘন হয়ে ওঠে। শেষ লগ-ইনের দিন একটা সাইবার-তান্ত্রিক ইতিহাস রচিত হয়ে যায়—যার ব্যাখ্যা প্রযুক্তি দিতে পারে না, আর তন্ত্র ছাড়ে না সহজে।

****

 

1000049002.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *