Bangla - রহস্য গল্প

ডায়েরির পাতা নম্বর ১৩

Spread the love

সৌমেন লাহা


পর্ব ১: স্টেশনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া

শিয়ালদহ স্টেশনের বিকেলের ভিড়ে হঠাৎ এক চিৎকার কানে এলো—”রুচি! রুচি কোথায় গেলি?” লোকজন থমকে দাঁড়াল, কেউ মোবাইল বের করল, কেউ ঝুঁকে তাকাল, কিন্তু কারও চোখে কিছু ধরা পড়ল না। মেয়েটির নাম কৃশা সেন। সাংবাদিক। তার ছোট বোন রুচিরা সেন, প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, হঠাৎ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নম্বর ৮ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল। কিছু বলার সুযোগই দিল না। দু’জনে একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল, ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিল, আর সেই ফাঁকেই রুচি যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল।

পুলিশ রিপোর্ট করেও কোনও লাভ হয়নি। কৃশা জানত, পুলিশের হাতে এই কেস দিলে তা জমা থাকবে ফাইলে। তাই সে গেল শহরের এক অদ্ভুত বইয়ের দোকানে—”পুঁথির ঝাঁপি”—যেখানে বসে থাকেন ঋত্বিক সান্যাল। নামেই বইয়ের দোকান, আসলে সেটি ছিল ঋত্বিকের লুকোনো তদন্ত ঘাঁটি। লোকজন জানে, এই দোকানে গিয়ে কেউ বই নিয়ে ফেরে, কেউ উত্তর নিয়ে।

ঋত্বিক তখন রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়ছিলেন, পাশে এক কাপ চা। কৃশার কণ্ঠস্বর থরথর করে উঠল, “আমার বোন হারিয়ে গেছে, ওর নাম রুচিরা। স্টেশন থেকে, আমার চোখের সামনে।” ঋত্বিক চুপ করে শুনছিলেন। তাঁর চোখ ধীরে ধীরে ক্ষিপ্র হয়ে উঠল। “রুচি কি ইদানীং কিছু অদ্ভুত করছিল? কারো সঙ্গে মিশত? কিছু লিখত?”

“ও হঠাৎ একটা নীল ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিল,” কৃশা বলল। “সবসময় লুকিয়ে রাখত। আমি একবার শুধু দেখেছিলাম, ডায়েরির মাঝে কোথাও একটা পাতায় লেখা ছিল—’১৩’। আর নীচে ইংরেজিতে লেখা ছিল—‘He watches.’ ওর হ্যান্ডরাইটিং না।”

ঋত্বিক চুপ করে মাথা হেলাল। একবার ড্রয়ারে হাত দিয়ে নিজের পুরনো কলমটা বের করলেন। বললেন, “ডায়েরিটা কোথায়?”

“হারিয়ে যাওয়ার দিন কলেজে নিয়ে গেছিল। তখন থেকেই ডায়েরি আর মানুষ—দুটোই উধাও।”

ঋত্বিক জানে, যেকোনো অপহরণ মানেই সরল কেস নয়। সে দাঁড়িয়ে বলল, “এই কেসে ভিজে কাগজের গন্ধ পাচ্ছি। একটা পুরনো সত্যি—যা কেউ লুকিয়ে রাখছিল। হয়তো সেই ডায়েরির পাতাতেই লুকিয়ে আছে রহস্যের সূত্র।”

“ডায়েরির পাতা নম্বর ১৩,” কৃশা ফিসফিস করে বলল। “ওটাই কি চাবিকাঠি?”

ঋত্বিক হেসে বলল, “মেয়েটা যদি নিজে না হারিয়ে গিয়ে থাকে, তবে কেউ তাকে চায়। আর সে কেউ—তোমার চেয়ে রুচিরা সম্পর্কে অনেক বেশি জানে।”

পর্ব ২: সেই নীল ডায়েরির ছায়া

রাত তখন দশটা। “পুঁথির ঝাঁপি”র ঝাঁপ নামানো। দোকানের ভিতরে আলো জ্বলছে শুধু একটা ল্যাম্পের তলায়। কৃশা আর ঋত্বিক একসাথে বসে। টেবিলের উপর ছড়ানো কাগজপত্র, পুরনো ম্যাপ, আর কিছু কলেজ ফেস্টের পোস্টার। কৃশা বলল, “গত এক মাস ধরে রুচি খুবই গম্ভীর হয়ে গেছিল। একটা ছেলের কথা বলত মাঝে মাঝে—নাম বলত না। শুধু বলত, সে খুব ‘আলাদা’। অনেক কিছু জানে, পড়ে, আঁকে।”

ঋত্বিক একটা পাতায় চোখ বুলিয়ে বলল, “রুচিরা প্রেসিডেন্সির ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। তাদের বার্ষিক নাট্যোৎসব ছিল গত সপ্তাহেই, তাই তো?”

কৃশা মাথা নাড়ল। “ওই নাটকে রুচিরা পারফর্ম করছিল না, কিন্তু স্ক্রিপ্ট রাইটিং করছিল। সেটাও ডায়েরিতে লিখত। আমি দেখেছি ও late-night কল করত, কার সঙ্গে জানি না। একবার বলেছিল—‘আমার লেখা কেউ চুরি করেছে।’”

ঋত্বিক চশমা নামিয়ে রাখল। “যদি কেউ রুচিরার লেখা ব্যবহার করে নিজের মতো করে কাজে লাগায়, তবে তার কাছে সেই ডায়েরির কপি থাকা উচিত। এমনকি হয়তো মূল ডায়েরিটাই।”

কৃশা ফিসফিস করে বলল, “আর যদি সেই লেখা কারও বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ করে?”

ঋত্বিক তখন উঠে পড়ে বলল, “আমাদের প্রথম গন্তব্য প্রেসিডেন্সি কলেজ। কাল সকাল ৮টায়।”

পরদিন, কলেজ ক্যাম্পাস যেন একটি আলাদা শহর। লাল ইটের ভবন, লম্বা করিডোর, আর নিঃশব্দে চলাফেরা করা ছাত্রছাত্রী। কৃশা পরিচয় করিয়ে দিল রুচিরার বন্ধু রিমঝিমের সঙ্গে। রিমঝিম বলল, “রুচি অনেকদিন ধরে একটা লেখা নিয়ে আতঙ্কে ছিল। বলত, কেউ তার পেছনে লাগছে। ফেস্টের স্ক্রিপ্ট থেকে সে একটা চরিত্র বাদ দিতে চেয়েছিল। নাম ছিল—’দ্য আর্কাইভিস্ট’।”

ঋত্বিক চমকে গেল। “আর্কাইভিস্ট?”

“হ্যাঁ,” রিমঝিম বলল। “রুচিরা বলেছিল, এই চরিত্রটা সত্যিকারের একজনের ওপর ভিত্তি করে লেখা। কলেজের লাইব্রেরির পুরনো বই বিভাগে একজন লোক আছে—সবাই ‘মিস্টার ঘোস্ট’ বলে ডাকে। বছর পঁচিশ-ছাব্বিশের হবে, কোথাও নাম নথিভুক্ত নেই, কিন্তু সে সব জানে। এমনকি কে কোন বই কবে পড়েছে তাও।”

ঋত্বিক বুঝল, খেলা এবার শুরু হয়েছে। একটা ডায়েরি, এক অদ্ভুত চরিত্র, এক হারিয়ে যাওয়া মেয়ে—এগুলো আলাদা নয়। সমস্ত রহস্য গিয়ে ঠেকছে লাইব্রেরির ভেতরকার সেই অচেনা ছায়ার দিকে।

পর্ব ৩: আর্কাইভিস্ট

কলেজের লাইব্রেরি ঘন গাছপালায় ঘেরা। পুরনো লোহার গেট ঠেলে ঢোকার সময়েই একটা গন্ধ ধাক্কা দেয়—পুরনো বই, স্যাঁতসেঁতে কাঠ আর কিছু একটা অদ্ভুত কিছুর গন্ধ, যেন কেউ অনেকদিন ধরে এখানে দাঁড়িয়ে দেখছে। কৃশা চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে, আর ঋত্বিক ধীরে ধীরে হাঁটছে লাইব্রেরির ভেতর দিয়ে। লাইব্রেরিয়ান পরিচয় দিল—“এই লাইব্রেরির পুরনো অংশে সাধারণত কেউ আসে না। তবে এখানে কাজ করে একজন ছেলে, নাম অরিন্দম। ও-ই বই গোছায়, পুরনো আর্কাইভ ঠিকঠাক রাখে। ভীষণ চুপচাপ, কিন্তু কাজে নিখুঁত।”

“অরিন্দম এই মুহূর্তে কোথায়?” ঋত্বিক জানতে চাইল।

“ও তো আজ ছুটিতে!” লাইব্রেরিয়ান বলল।

“ছুটিতে? কেন?”

“বলেছে শরীর খারাপ। তবে গতকাল পর্যন্ত কাজ করেছে।”

ঋত্বিক আর কৃশা সোজা চলে গেল লাইব্রেরির আর্কাইভ সেকশনে। সেখানে বইয়ের স্তূপ, পুরনো পেপার কাটিং, একপাশে ছোট্ট কাঠের টেবিল। সেই টেবিলে রাখা একটা পেন, আর একখানা খাতা। পাতাগুলোতে কেউ একজন ইংরেজি কবিতা লিখে রেখেছে। প্রতিটি কবিতার নিচে একটিই লাইন—”Read before it disappears.”

হঠাৎ কৃশার চোখে পড়ল টেবিলের নিচে পড়ে থাকা একটি পাতাহীন, ছেঁড়া খাতা। তাতে কলমের আঁচড়ে লেখা—“Page 13 holds the name. Do not read aloud.”

ঋত্বিক পাতাটা হাতে নিয়ে বলল, “এটা তো সেই ডায়েরিরই অংশ। কিন্তু এটা এখানে এল কীভাবে?”

“রুচিরা হয়তো এখানে এসেছিল?” কৃশা ধীরে ধীরে বলল।

“না, রুচিরা নয়। এটা কাউকে দেখানোর জন্য ইচ্ছে করেই ফেলে রাখা হয়েছে।” ঋত্বিক স্পষ্ট বলল।

তাদের অজান্তেই একটি ছায়া তখন করিডোরের কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল। কালো হুডি মাথায়, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, হাতে একখানা মোবাইল, যেখানে লেখা—”They are looking. Time to move the page.”

ঋত্বিক বুঝল, সময় নষ্ট করা যাবে না। অরিন্দমের খোঁজ নিতে হবে, তার আগে বুঝতে হবে—এই ‘পাতা ১৩’-এর অর্থ কী? কোন নাম লুকিয়ে আছে সেখানে? আর কেন বলা আছে—উচ্চারণ না করতে? ছায়া তখন লাইব্রেরির বাইরের দেয়াল টপকে মিলিয়ে গেল।

পর্ব ৪: নামহীন ঠিকানা

ঋত্বিক আর কৃশা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে অটো ধরে পৌঁছল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর এক গলির ভেতরে—সেখানে এক পুরনো ভাঙাচোরা বাড়িতে অরিন্দম থাকে বলে খবর পেয়েছে রিমঝিম। ঠিকানা মিলিয়ে তারা দাঁড়িয়ে গেল তিনতলার একটি দরজার সামনে। দরজা বন্ধ। বারবার কলিং বেল চাপলেও কোনও সাড়া নেই। দরজার নিচ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

ঋত্বিক পকেট থেকে ছিটকিনি খোলার একটা পাতলা ধাতব রড বের করল। একটু চেষ্টা করতেই দরজাটা খচ করে খুলে গেল। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল—ঘরটা অন্ধকার, জানলা ঢাকা, বিছানার পাশে ছড়ানো বই, কাগজ, আর দেয়ালের ওপর ইংরেজি হরফে আঁকা ছড়ানো শব্দ—“GUILT,” “EYES,” “THE NAME”—আর এক জায়গায় লাল কালি দিয়ে লেখা—“Don’t trust what you read.”

কৃশা ফিসফিস করে বলল, “এগুলো কি রুচিরার লেখা?”

ঋত্বিক মাথা নাড়ল। “না, কিন্তু রুচিরার ডায়েরি থেকে শব্দ কপি করা হয়েছে। কেউ যেন ওর লেখা অনুসরণ করছে—অথবা, ওর লেখা দিয়েই কিছু এক্সপেরিমেন্ট করছে।”

হঠাৎ তারা খেয়াল করল, ডেস্কের উপর রাখা একটা ছোট ট্রাঙ্কে তালা দেওয়া। ট্রাঙ্কের গায়ে জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা—“Page 13 is inside.”

ঋত্বিক ধীরে ধীরে তার পকেট থেকে প্যাড বার করল, আর তালা ভাঙার সরঞ্জাম বের করল। ট্রাঙ্ক খুলতেই একটা পাতলা কাগজ পাওয়া গেল—একদম গাঢ় কালিতে লেখা সেই ‘পাতা ১৩’।

কিন্তু পাতাটা ছিল অদ্ভুত। লেখাগুলো যেন সরে যাচ্ছে চোখের সামনে। কৃশা পড়ে উঠল—“In the name of silence, she wrote mine. In the name of memory, I erased hers.”

হঠাৎ আলো নিভে গেল। একটা ফিসফিস শব্দ কানে এলো—”তোমরা যা খুঁজছ, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু হারাবে।”

ঋত্বিক ঝট করে টর্চ জ্বালিয়ে তাকাল, কিন্তু ঘরে কেউ নেই। অথচ দরজা বন্ধ। জানলা আটকানো। শব্দটা যেন চারদিক থেকে আসছিল।

“এই পাতাটা শুধু লেখা নয়,” ঋত্বিক ধীরে ধীরে বলল। “এটা একটা ট্রিগার। কেউ এটা লিখেছে… কিংবা লিখিয়েছে… যাতে এটা পড়লেই কিছু খুলে যায়—হয়ত স্মৃতির দরজা, বা আরও খারাপ কিছু।”

পাশের দেয়ালে ছায়ার মত একটা মুখ, তারপরেই মিলিয়ে গেল।

ঋত্বিক বুঝল, কেসটা এখন আর অপহরণের নয়। এটা স্মৃতি, লেখার দখল, আর একজন মানুষের অস্তিত্ব চুরির গল্প।

পর্ব ৫: নিঃশব্দের অভ্যন্তর

ঋত্বিক কাগজটা পলিথিনে মুড়ে ব্যাগে রাখল। ঘরের দেওয়ালে টর্চ ফেলতেই দেখা গেল কিছু কোড লেখা আছে। ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে, গা-ছমছমে রকমের: “MIRROR. MEMORY. MURDER.” নিচে লেখা — “All three began with her. The rest ends with him.”

কৃশা থতমত খেয়ে বলল, “‘Him’ কে?”

ঋত্বিক ধীরে বলল, “এই কেসে কেউ একজন নিজেকে আড়াল করছে, কিন্তু তার অস্তিত্ব চারপাশে ছড়ানো—ছায়ার মতো। রুচিরার লেখার মধ্যে সে নিজেকে ঢুকিয়েছে। ঠিক যেভাবে তুমি বলেছিলে—সে বলত, ‘আমার লেখা চুরি হয়েছে।’”

রাতে তাঁরা ফিরে এলেন পুঁথির ঝাঁপিতে। কৃশা ঘুমে ঢলে পড়লেও ঋত্বিক বসে রইল একা। সে পাতাটা খুলে আবার একবার পড়ল। এবার সে কিছু বুঝতে পারল—একটি নাম বারবার ঘুরে ফিরে আসছে রেফারেন্সে। “Agniv Dey.”

ঋত্বিক দ্রুত রুচিরা আর কৃশার কলেজের পুরনো ফেস্ট বুকলেট ঘাঁটতে শুরু করল। ২০১৯ সালের নাটকের তালিকায় পাওয়া গেল—লিখেছেন রুচিরা সেন, সহলেখক: অগ্নিভ দে।

সে রাতেই ঋত্বিক পৌঁছে গেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের কাছে, যেখানে অগ্নিভ এখন গবেষণা করছে। তার দরজায় টোকা দিতেই এক ক্লান্ত, চশমাপরা যুবক দরজা খুলল। চোখে গাঢ় দাগ, গলার স্বরে ক্লান্তি।

“তুমি অগ্নিভ দে?”

“হ্যাঁ। কে আপনি?”

“আমি ঋত্বিক সান্যাল। আপনার বন্ধু রুচিরা কোথায় জানেন?”

অগ্নিভ একটু থেমে বলল, “আমি আর ও বন্ধু ছিলাম না। ওর লেখায় একটা অন্ধকার ছিল। আমি সাহায্য করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ও বলত—‘আমার লেখা আমারই নয় আর।’ তারপর হঠাৎ একদিন ও আমাকে ব্লক করে দেয়।”

“তাহলে আপনি ওর লেখা ব্যবহার করতেন?”

“একবার করেছিলাম,” অগ্নিভ চুপ করে বলল। “আমি চেয়েছিলাম ওর লেখা আমার নাটকে থাকুক। ওকে বলার আগেই আমি সেটা জমা দিয়েছিলাম। তারপর ও বুঝে গিয়েছিল।”

ঋত্বিক জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি জানেন রুচিরা ‘আর্কাইভিস্ট’ নামে কাউকে নিয়ে লিখছিল?”

অগ্নিভের গলা শুকিয়ে এল। “তোমরা ওকে খুঁজছ। কিন্তু কেউ যদি চায় ও আর ফিরে না আসুক?”

ঋত্বিক এবার নিশ্চিত, কেসটা ভুল বোঝাবুঝি নয়। এটা কারও অস্তিত্ব চুরি করে তাকে মুছে ফেলার সচেতন চেষ্টা। আর সেই চেষ্টা এখনও চলছে—রুচিরার স্মৃতি, লেখা, নাম—সব ধ্বংস করে দেবার জন্য।

পর্ব ৬: পাতা ১৩-র শেষ লাইন

ঋত্বিক আর কৃশা আবার ফিরে এল সেই লাইব্রেরিতে, যেখানে সব শুরু হয়েছিল। এবার তারা অরিন্দমের খোঁজে নয়—তারা এসেছে সেই ‘পাতা ১৩’ ফেরত দিতে। পাতাটার লেখা বদলেছে। আগের অদ্ভুত কবিতার লাইন মুছে গিয়ে এখন লেখা—”She still remembers. But not as herself.”

ঋত্বিক বুঝতে পারল, রুচিরা জীবিত আছে—কিন্তু হয়তো তার স্মৃতি নেই। অথবা তার পরিচয় ভেঙে গেছে এমনভাবে, যে সে আর নিজেকে ‘রুচিরা’ বলে চেনে না।

তারা লাইব্রেরির নিচে গিয়ে অন্ধকার আর্কাইভ ঘরে পৌঁছল, যেখানে দিনের আলো ঢোকে না। আরেকবার সেই পুরনো টেবিলের দিকে তাকাতেই ঋত্বিক বলে উঠল, “এই টেবিল, এই কালি—এখানে কেউ এখনো লেখে। এবং সম্ভবত রুচিরাও এখানে এসেছিল।”

হঠাৎ করেই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা কাঁপা কণ্ঠস্বর এলো—“তোমরা পাতাটা এনেছো?”

ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একজন মেয়ে। চুল এলোমেলো, চোখে ভয় আর অভিমান। কৃশা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল—“রুচি!”

কিন্তু মেয়েটি পেছিয়ে গেল। “আমি রুচি নই। আমি ‘এইমি’। আমি এখানেই থাকি, বইয়ের পাতার ভেতরে।”

ঋত্বিক বলল, “রুচি, তোমার স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়েছে। হয়তো ধীরে ধীরে, হয়তো চাপে। কিন্তু তুমি এখনো নিজের লেখা দিয়ে কথা বলো।”

সে ‘পাতা ১৩’ মেয়েটির হাতে তুলে দিল। মেয়েটি কাঁপা হাতে তা খুলল। চোখে জল এসে গেল। “এই লেখা আমার। কিন্তু আমি কে?”

ঋত্বিক ধীরে ধীরে বলল, “তুমি সেই মেয়ে, যার লেখা অন্য কেউ নিতে চেয়েছিল। যার ভাবনা অন্য কেউ ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু লেখকের পরিচয় লেখা মুছে ফেললে হারায় না। তার ছাপ থাকে কালি আর কণ্ঠে।”

মেয়েটি ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—“আমার নাম… রুচিরা।”

কৃশা তাঁকে জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুই আছিস। তোর লেখা তোর সত্তা।”

বাইরে তখন ভোরের আলো। লাইব্রেরির দরজা খুলে যাচ্ছে।

ঋত্বিক পেছনে তাকিয়ে দেখল, দেওয়ালে শেষ একটা ছায়া মুছে যাচ্ছে—লিখে যাচ্ছে একটিমাত্র লাইন—

“She wrote to remember. He erased to forget. But stories… always remain.”

শেষ

Lipighor_1750396757551.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *