রুমা মণ্ডল
বাহাদুরপুর গ্রামের শেষ মাথায় যে পুরনো অশ্বত্থ গাছটা দাঁড়িয়ে আছে, তার নিচে প্রতিদিন বিকেলের পর থেকে একজন মেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। নাম কেউ জানে না ঠিক, তবে গ্রামের লোকজন তাকে ‘পরী’ বলেই ডাকে। মেয়েটার চেহারায় এমন একরকম মায়া আছে, যেন অনেকগুলো বেদনার রঙে আঁকা হয়েছে তার মুখ, চোখ দুটো এত গভীর যে তাকালেই মনে হয় কিছু একটা হারিয়ে গেছে অনেক দূরে, যা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। গ্রামের ছেলেপুলেরা প্রথমদিকে ভয় পেত ওকে, এমন অচেনা এক মেয়ে, কাঁধে একটা পুরনো ঝোলানো ব্যাগ, কখনো হাসে না, কারও সঙ্গে কথা বলে না, শুধু বসে থাকে। ধীরে ধীরে সবাই ওকে গ্রহণ করে নিয়েছে, কারণ সে কারও ক্ষতি করে না, শুধু বসে থাকে, চোখে তাকিয়ে থাকে সেই দূরের দিগন্তে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, পরী আসলে এই গ্রামেরই মেয়ে, শুধু পনেরো বছর আগের এক ঘটনা তাকে এই গ্রামের স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছিল। পনেরো বছর আগে সে ছিল এই গ্রামেরই হাইস্কুলের ছাত্রী, নাম ছিল পারমিতা, মাথায় ছোট দুই বেণী, পড়াশোনায় ভাল, গান গাইতে পারত অসাধারণ, পুজোর সময় স্কুলে যে নাটক হত, সেখানে সবসময় প্রধান চরিত্রে থাকত পারমিতা। তার বাবার নাম ছিল গোপাল মাঝি, পেশায় ছিলেন মাঠের হাল চাষ করা একজন সাধারণ কৃষক, আর মা সাবিত্রী ছিলেন গৃহবধূ। গরিব হলেও সংসারে শান্তি ছিল, আর ছিল স্বপ্ন—পারমিতা বড় হয়ে কলেজে পড়বে, তারপর হয়তো একটা সরকারি চাকরি পাবে। কিন্তু সেই স্বপ্নে চিড় ধরে যায় এক দুপুরে, যখন পাশের গ্রামের নেতা-সন্তান রণজয় একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে তাকে রাস্তার পাশে থামিয়ে দেয়। রণজয় ছিল বেপরোয়া, রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, গায়ে বল, মুখে সাহস, আর সমাজের চোখে সম্মান। পারমিতার সঙ্গে তার একতরফা প্রেম ছিল, যা পারমিতা কখনো গ্রহণ করেনি। সেদিনের সেই দুপুরে রণজয় প্রথমবার স্পষ্টভাবে বলেছিল—“তুই আমার হবি, তুই না বললেও হবে, আমি ঠিক করে নিয়েছি।” পারমিতা তার চোখে তাকিয়ে ছিল, একটুও ভয় না পেয়ে বলেছিল—“ভালবাসা কারও জোরে হয় না, তুমি যত বড়ই হও, তোমার ক্ষমতা আমার স্বাধীনতাকে ছুঁতে পারবে না।” সেই উত্তর সহ্য করতে পারেনি রণজয়। ঠিক এক সপ্তাহ পর হঠাৎই স্কুলে খবর রটে যায়—পারমিতা নাকি স্কুলের হেডস্যারের ঘরে চুরি করতে গিয়েছিল। তার ব্যাগে পাওয়া যায় কিছু নথিপত্র আর স্কুলের টিফিন মানি। সবাই চমকে যায়, শিক্ষকেরা হতবাক, এমন মেয়ের এমন কাজ! অথচ সেদিনের সেই ঘটনা সাজানো ছিল সম্পূর্ণ। রণজয়ের নির্দেশে দুই চেলাচামুন্ডা রাতের অন্ধকারে স্কুলে ঢুকে ব্যাগে সব ঢুকিয়ে দিয়েছিল। পারমিতাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়, গ্রামে শুরু হয় কুৎসা, “মেয়েমানুষ হয়ে কী সাহস!” “পড়ালেখা শিখে চরিত্রই গেছে!” সব কিছু যেন মুহূর্তে বদলে যায়। গোপাল মাঝি আর সাবিত্রী চুপচাপ মাথা নিচু করে সব সহ্য করেন, কিন্তু রাতের পর রাত মেয়ে কাঁদে, আর বলে—“মা, আমি কিছু করিনি, বিশ্বাস করো।” কিন্তু সমাজ তো শুধু চোখে দেখে না, কানে শোনেও না, হৃদয়ে অনুভব তো করেই না। একদিন রাতে পারমিতা পালিয়ে যায়—কেউ জানে না কোথায়, কেউ খুঁজেও দেখে না। শুধু তার মা কয়েক মাস পর ছেলের মতো ভালবাসা নিয়ে একটা চিঠি খুঁজে পান—“আমি যাচ্ছি, কারণ এই মাটিতে আমার নিঃশ্বাস টেকে না।” তারপর কেটে যায় পনেরোটা বছর। বাহাদুরপুর ভুলে যায় তার সেই ‘অপরাধিনী’কে। নতুন স্কুল, নতুন ছাত্র, নতুন গল্প। কিন্তু সেই পুরনো অশ্বত্থ গাছটা ভুলে না, সে জানত একদিন ফিরে আসবে সে মেয়ে, হয়তো অন্য নামে, হয়তো অন্য পরিচয়ে, কিন্তু ফিরে আসবেই। আর সেই প্রত্যাবর্তনের নামই এখন ‘পরী’। সে আজও গাছের তলায় বসে, চোখে তাকিয়ে থাকে, কেউ জানে না সে কার জন্য অপেক্ষা করে—সে কি কারও প্রতিশোধ নিতে এসেছে? নাকি কারও ক্ষমা চাওয়া শুনতে চায়? নাকি নিজের ভাঙা অতীতকে এই মাটিতেই গেঁথে রেখে নতুন করে জন্ম নিতে চায়? গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা আজকাল ওর পাশে বসে গল্প করে, কেউ কেউ নিজের মনের কষ্টও ভাগ করে নেয়, যেন সে এক বোবা শ্রোতা, যে সব বোঝে, কিছু বলে না। একদিন, সন্ধের দিকে, এক নতুন স্কুল শিক্ষক সেই গাছতলায় হেঁটে আসে, হাতে একটা খাতা আর কলম। সে পরীর পাশে বসে বলে, “তুমি জানো? তোমার মতো চোখ আমি কোথাও দেখিনি। তুমি কি গল্প লেখো?” পরী প্রথমবার একটুখানি হাসে। সেই হাসিতে ছিল না কোনো অভিযোগ, না কোনো অপমান, ছিল শুধু আলো—সেই জোনাকিদের আলো, যারা অন্ধকারেও পথ চিনিয়ে দেয়।
স্কুলশিক্ষকের নাম ছিল অনির্বাণ, বয়সে ত্রিশের কাছাকাছি, সদ্য বদলি হয়ে এসেছেন বাহাদুরপুর হাইস্কুলে। শহুরে ভাবভঙ্গি নেই, বরং কণ্ঠে সহজত্ব আর চোখে একরকম কৌতূহল—যা খুব বেশি লোকের থাকে না। সেই সন্ধেয় পরীর পাশে বসে প্রথম প্রশ্নটা করার পর তিনি আর কিছু বলেননি, শুধু তার খাতা খুলে নিজের লেখা কিছু কবিতা পড়ছিলেন, স্বরটাও খুব নিচু, যেন পরী শুনলে ভালো লাগে এমন ভঙ্গিতে। পরী চুপচাপ শুনছিল, মাঝে মাঝে চোখ তুলছিল তার দিকে, আবার নীচু করছিল। প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে অনির্বাণ উঠে দাঁড়ালেন, বললেন—“তোমার কাছে আবার আসব, যদি বিরক্ত না হও।” পরী কিছু বলল না, শুধু মাথা নিচু করে একটা ছোট্ট হাসি দিল। সেটাই অনির্বাণের কাছে ছিল প্রথম সম্মতি। এরপর প্রতিদিন বিকেল হলেই অনির্বাণ সেই অশ্বত্থ গাছের তলায় গিয়ে বসতেন, গল্প করতেন, কবিতা পড়তেন, কখনও কিছু না বলে কেবল চুপ করে বসে থাকতেন। পরীর মুখের ভাষা খুব কম, কিন্তু চোখ দিয়ে সে অনেক কিছু বলে দিত। ধীরে ধীরে গাঁয়ে আবার গুঞ্জন ছড়াতে লাগল—“নতুন মাস্টারমশাই না কি সেই পাগলি মেয়েটার প্রেমে পড়েছে।” কেউ কেউ নাক সিঁটকোল, কেউ মুখ টিপে হাসল, আবার কেউ কেউ বলল—“এখনকার ছেলেগুলোও অদ্ভুত, গাঁয়ের পাগল মেয়ে ছাড়া কিছু পছন্দ হয় না বুঝি!” কিন্তু অনির্বাণ শুনত না, সে প্রতিদিন পরীর পাশে বসে তার খাতার নতুন কবিতা পড়ে শুনাত। একদিন সে বলল, “তুমি লিখো না কেন?” পরী ধীরে মাথা নাড়ল, বলল, “লিখতে ভুলে গেছি।” সে প্রথম কথা বলল, অনির্বাণ থমকে গেল, তারপর হাসল—“তাহলে মনে করিয়ে দেবো।” সেই দিন থেকে অনির্বাণ তার জন্য প্রতিদিন একটা খালি পাতা রাখত খাতায়, বলত, “আজ লিখবে?” প্রথমদিকে পরী শুধু পাতাটা দেখত, কলম নিত না, কিন্তু একদিন, ঠিক পূর্ণিমার রাতে, হঠাৎ করেই সে কলমটা নিয়ে পাতার ওপর একটা শব্দ লিখল—“ছায়া।” সেই শব্দ দেখে অনির্বাণ চমকে উঠল, বলল, “এই শব্দটা তো আমার কালকের কবিতায় ছিল!” পরী কিছু বলল না, শুধু বলল, “তোমার কবিতাগুলো আমার অতীতের মতো। আমি ভুলে যেতে চাই, তাও পারি না।” প্রথমবার অনির্বাণ বুঝতে পারল—এই মেয়ে কেবল নিঃশব্দ নয়, তার ভেতরে রয়েছে একরাশ বর্ণময় কষ্ট, যাকে ছুঁতে গেলে সময় লাগবে, ধৈর্য লাগবে, ভালোবাসা লাগবে। এরপরের দিনগুলোতে পরী ধীরে ধীরে গল্প করতে শুরু করল, ছোট ছোট বাক্যে, থেমে থেমে, কণ্ঠে ব্যথা, চোখে বিস্ময়। সে বলল—“আমি এই গ্রামেরই মেয়ে ছিলাম একসময়… পারমিতা… আমি হাইস্কুলে পড়তাম… তারপর একদিন সব বদলে গেল।” অনির্বাণ স্তব্ধ হয়ে শুনছিল, কোনো প্রশ্ন করছিল না। পরী বলছিল—“ওরা আমার ব্যাগে কিছু রেখে দিয়েছিল… আমি চুরি করিনি… আমি শুধু না বলেছিলাম… কিন্তু তাও কেউ বিশ্বাস করেনি।” কথাগুলো যেন পাথরের মতো নেমে এল সন্ধ্যার হাওয়ার ওপর। অনির্বাণ ধীরে বলল—“আমি বিশ্বাস করি।” সেই শব্দটা শুনে পরী প্রথমবার অনির্বাণের হাত ছুঁয়ে বলল—“তুমি এই প্রথম ব্যক্তি যে আমাকে শুনছো, না জিজ্ঞেস করে, না বিচার করে।” সেই সন্ধ্যায় অশ্বত্থ গাছটার পাতাগুলো যেন একটু বেশি দুলে উঠেছিল হাওয়ায়, যেন জোনাকি না, কোনো অদৃশ্য শক্তি আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে সেই নীরবতার মধ্যে। তারপর একদিন অনির্বাণ তার স্কুলের এক পুরনো নথি খুলে দেখল—পারমিতা মাঝি, শ্রেষ্ঠ ছাত্রী, জেলাস্তরের প্রতিযোগিতায় প্রথম, পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা মেধা তালিকায়। এই মেয়েটা কীভাবে একজন অপরাধী হয়ে গেল—এই প্রশ্নটা তার ঘুম কেড়ে নিল। সে ঠিক করল, সে এই মেয়ের জন্য কিছু করবে, সমাজের কাছে নয়, তার নিজের কাছে, একজন মানুষ হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে। সে স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক হেডস্যার মথুরেশ বাউরীর সঙ্গে দেখা করল, যিনি এখন অবসরপ্রাপ্ত। মথুরেশ বললেন, “আমি জানতাম ও নির্দোষ, কিন্তু তখন আমারও সাহস ছিল না।” অনির্বাণ বলল, “এখন সময় সাহস দেখানোর।” মথুরেশ ধীরে মাথা নাড়লেন—“তুমি পারবে অনির্বাণ, আমি তোমার পাশে আছি।” গাঁয়ের বাতাস তখন কেমন ভারী হয়ে উঠছিল, যেন পুরনো স্মৃতিগুলো ধুলো ঝেড়ে বেরিয়ে আসছে, আর অশ্বত্থ গাছটা জানে, এবার সেই আলো সত্যিই এক মিছিল হয়ে উঠবে।
বাহাদুরপুর গ্রামটা বাইরে থেকে দেখতে যত শান্ত, ভেতরে তার ততটাই গোলকধাঁধা, মাটির নিচে যেমন শিকড় লুকিয়ে থাকে, তেমনই এই গ্রামের ইতিহাসেও লুকিয়ে আছে কত অন্ধকার অধ্যায়। অনির্বাণ বুঝেছিল এই যুদ্ধ কেবল পরীর জন্য নয়, তার নিজের শিক্ষাগত নীতিবোধেরও এক লড়াই, যেখানে সে একজন ভুল বোঝা, অপমানিত, লাঞ্ছিত মেয়েকে তার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে চায়, আর এই চাওয়াটা দিনে দিনে এমন এক জেদে পরিণত হচ্ছিল যে রাতে ঘুমাতে গেলেও তার চোখের সামনে ভেসে উঠত পরীর মুখ, সেই অভিমানী হাসি আর ‘ছায়া’ শব্দটা। সে স্কুলের পুরনো রেকর্ড ঘেঁটে দেখতে পেল সেই সময়ে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য ছিলেন রণজয়ের বাবা, পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান ভোলানাথ চক্রবর্তী, যাঁর কথায়ই তখন হেডস্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পারমিতাকে বহিষ্কার করার। সে বুঝতে পারল এখানেই রয়েছে সেই চক্রান্তের শিকড়, সমাজের সেই উচ্চাসনে বসা মানুষদের মুখোশের আড়ালে থাকা ক্ষমতার অপব্যবহার। কিন্তু এখনও অবধি কোনও প্রমাণ নেই, কেবল সন্দেহ আর পরীর বলা টুকরো টুকরো কথা। এদিকে গ্রামের মধ্যে একটা নতুন গুঞ্জন শুরু হয়েছে—মাস্টারমশাই না কি সেই পরী পাগলীকে নিয়ে স্কুলে আবার নতুন কিছু করতে চাইছেন। কেউ কেউ মজা করছিল, কেউ বা হুঁশিয়ার করে দিচ্ছিল—“এইসব নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে ভালো হবে না, মাস্টারমশাই।” অনির্বাণ কানে তুলছিল না কিছুই, বরং সে আরও ঘন ঘন পরীর সঙ্গে দেখা করছিল, ওর কথা শুনছিল, নিজের ভাবনা ভাগ করে নিচ্ছিল। এক সন্ধ্যায় পরী বলল—“তুমি জানো, আমি তখন দৌড় প্রতিযোগিতায় স্কুলের হয়ে ব্লক লেভেলে প্রথম হয়েছিলাম… আমার বাবা খুব গর্ব করতেন… আর সেই বাবাই যখন স্কুল থেকে ফোন পেয়ে বলল ‘তুই আবার কী করলি পারু?’, আমি বুঝলাম—আমার সব শেষ।” সে মাথা নিচু করে বলল, “তখন থেকেই আমি কথা বলা ছেড়ে দিই… আর তখন থেকেই আমার নাম হয়ে যায় পরী… কারণ পরী কখনও মাটিতে থাকে না, সে আকাশে ভাসে, বাস্তব ছুঁতে চায় না।” অনির্বাণ হঠাৎ করে বলল, “তাহলে এবার নেমে এসো, পরী, এই আকাশ থেকে মাটিতে, যেখানে তোমার নিজের অস্তিত্ব আছে।” পরী একটু থেমে বলল, “তুমি কি পারবে আমাকে নামিয়ে আনতে?” অনির্বাণ নিঃশব্দে মাথা হেঁট করে বলল, “আমি চেষ্টা করব, যদি তুমি বিশ্বাস করো।” সেই রাতে পরী তার ব্যাগ থেকে একটা পুরনো চিঠি বার করল, অল্প পচে যাওয়া কাগজ, লিখেছিল সে নিজের বাবা-মাকে উদ্দেশ্য করে—“আমি কোনও পাপ করিনি, তবু আমাকে পাপী বানানো হয়েছে। আমি বেঁচে থাকলে তোমরা আর বাঁচতে পারবে না, তাই চলে যাচ্ছি… যদি কখনও বুঝতে পারো আমি নির্দোষ ছিলাম, তাহলে এই চিঠিটা জ্বালিয়ে দিও।” অনির্বাণ চিঠিটা পড়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “এটাই হবে তোমার প্রমাণ, আমরা সবাইকে দেখাবো।” পরী একটু থেমে বলল, “কিন্তু এখন আর কিছুই ফিরে পাওয়া যাবে না, অনির্বাণ, বাবাও নেই, মা চোখে দেখতে পায় না, আর আমি… আমি তো আর পারমিতা নই।” অনির্বাণ বলল, “তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে আবার পারমিতা করে তুলতে পারি।” পরীর চোখে জল এল না, বরং একটা কাঠফাটা হাসি এল—“তুমি একা পারবে?” অনির্বাণ বলল, “একজন শিক্ষক একাই অনেক কিছু পাল্টাতে পারে, যদি তার ছাত্র বা ছাত্রী ফিরে আসতে চায়।” পরী কিছু বলল না, শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। পরদিন স্কুলে বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক সভা ডাকা হল, যেটা সাধারণত সেমিস্টার শেষের আগে হয় না, তাও আবার এত তাড়াতাড়ি। হেডস্যার মথুরেশবাবু বিশেষ অতিথি হিসেবে ডাকা হয়েছেন, কারণ তিনি ছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। সভায় উপস্থিত ছিল প্রধান শিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষকেরা, এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের প্রতিনিধি হিসেবে কেউ একজন। অনির্বাণ সামনে দাঁড়িয়ে পারমিতার সেই পুরনো সাফল্য আর হঠাৎ বহিষ্কারের প্রক্রিয়াটি পড়ে শোনালেন, তারপর সেই চিঠিটি তুলে ধরলেন, যা পারমিতা নিজের হাতে লিখেছিল। অনেকেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন হঠাৎ এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন, নাম তার নিত্যানন্দ পাল, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তিনি বললেন, “আমি সেইদিন স্কুলে ছিলাম না, কিন্তু এই মেয়েটিকে আমি চিনি, জানি, তার চোখে কোনো অপরাধের ছায়া ছিল না, আমি আজও বিশ্বাস করি ও নির্দোষ।” এরপর একে একে আরও কিছু শিক্ষক নিজেদের মত প্রকাশ করলেন, মথুরেশবাবু বললেন, “আমার ভুল হয়েছিল, আমি ওকে রক্ষা করতে পারিনি।” এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই স্কুল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল—পারমিতার নাম আবার স্কুলের রেজিস্টারে পুনঃস্থাপন করা হবে, আর তাকে সম্মান জানিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। অনির্বাণ ফিরে গিয়ে সন্ধ্যায় গাছতলায় পরীকে বলল—“তুমি জিতেছো, পরী, তুমি নিজেকে ফিরিয়ে এনেছো।” পরী ধীরে বলল—“তুমি আমাকে জিতিয়েছো… আমার তো আর কিছু চাওয়া নেই।” অনির্বাণ বলল, “তবে একটা চাই, তুমি আমাকে একটা গল্প লিখে দেবে? যেটা আমি পড়ে দেখব, আর সবাইকে শোনাবো।” পরী একটু ভেবে বলল—“গল্পে যদি চরিত্র হয় একটা জোনাকি, যে আলো জ্বালায়, কিন্তু নিজের পথ খুঁজে পায় না?” অনির্বাণ বলল, “তাহলে সেই জোনাকির জন্য একজন পথপ্রদর্শক রাখো, যে আলো দেখে পথ চেনে না, কিন্তু বিশ্বাস করে।” পরী একটু হেসে বলল, “তুমি কি সেই চরিত্র?” অনির্বাণ বলল, “হয়তো, অথবা তুমিই আমার আলো।”
সেই রাতে অনির্বাণ ঘুমোতে পারেনি, বিছানার একপাশে খোলা খাতায় লেখা পড়ে ছিল পরীর হাতে লেখা গল্পের প্রথম বাক্য—“একটা জোনাকি রাতের আঁধারে উড়তে উড়তে হঠাৎ আলো ভুলে গিয়ে পড়ে যায় এক ছায়ার মধ্যে, যে ছায়া তাকে আগলে রাখে, যতক্ষণ না সে আবার আলো খুঁজে পায়।” লেখাটার ভাষা সহজ, কিন্তু তাতে এমন এক আবেগ ছিল যা অনির্বাণকে নাড়িয়ে দিয়েছিল গভীর থেকে। পরী ধীরে ধীরে নিজের গল্প বলতে শুরু করেছে, লেখার মাধ্যমে, অথচ মুখে এখনো অনেক কথা চেপে যায়—হয়তো এখনও কিছু ভয় আছে, কিছু ব্যথা, যা সময়ের সাথে শুকিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার বদলে গভীরভাবে জমাট বেঁধে আছে। পরদিন স্কুলে অনির্বাণ পরীর সেই লেখা তুলে ধরল শিক্ষক সভায়, বলল, “এই লেখাটা আমাদের সেই প্রাক্তন ছাত্রী লিখেছে, যাকে একদিন সমাজ বঞ্চিত করেছিল। এখন সে ফিরে এসেছে, লেখার মাধ্যমে, নিজের গল্প বলার মাধ্যমে, যা আমাদের সকলের শোনার প্রয়োজন।” শিক্ষকেরা সম্মত হলেন, স্কুলের বার্ষিক সাহিত্যপত্রিকায় এবার ‘পরী’ নামে একটি বিভাগ রাখা হবে, যেখানে সে নিয়মিত লিখবে। এই খবরটা গ্রামের মধ্যে নতুন আলোড়ন তুলল, প্রথমে কেউ কেউ বলল, “কি মজা! পাগলি লেখিকা হয়ে গেছে!” আবার কেউ বলল, “আসলে মেয়েটার তো মাথা খারাপ হয়ে গেছিল, লেখালিখি করলে হয়তো আবার ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু কিছু মানুষ ধীরে ধীরে উৎসাহ দেখাতে লাগল, স্কুলের ছেলেমেয়েরা সেই গাছতলায় গিয়ে পরীর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, কেউ কেউ তার লেখা পড়তে চাইল, কেউ বলল, “আমাকেও একটা গল্প শেখাও দিদি।” পরীর ভেতর যেন এক নতুন জীবন জেগে উঠছিল, চোখে আবার আত্মবিশ্বাসের ছায়া, মুখে একরাশ রোদ উঠে আসছিল বিকেলের শেষ আলোয়। অনির্বাণ প্রতিদিন তাকে নতুন বই এনে দিচ্ছিল—বিভূতিভূষণ, আশাপূর্ণা, মহাশ্বেতা দেবীর লেখা—সে বলত, “তুমি পড়ো, দেখবে তুমি কারও চেয়ে কম নও।” পরী একদিন বলল, “অনির্বাণ, তুমি যদি না থাকতে, আমি কখনই আবার নিজের কথা ভাবতাম না। একসময় তো আমি বিশ্বাস করতাম, আমার অস্তিত্বই ছিল ভুল।” অনির্বাণ বলল, “তাহলে এখন থেকে আমরা দু’জনে মিলে ঠিক করব, তোমার প্রতিটি শব্দই হবে সত্য, প্রতিটি বাক্য হবে বাঁচার প্রমাণ।” সেই সন্ধ্যায় পরী এক নতুন লেখা শুরু করল, গল্পের নাম রাখল ‘জোনাকিদের মিছিল’। সেখানে সে লিখল—“তারা জন্মায় অন্ধকারে, ছোট ছোট ডানায় ভর করে আলো নিয়ে আসে, তাদের কেউ দেখে না, কেউ খোঁজ রাখে না, কিন্তু তারা জানে, প্রতিটি অন্ধকারেই আলো লাগবে, আর সেই আলো তারাই আনবে।” এই লাইনগুলো পড়ে অনির্বাণ নিজের চোখের জল আটকে রাখতে পারেনি, সে বুঝেছিল—পরী এখন শুধু নিজের নয়, এই গ্রাম, এই সমাজের একটি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠছে। সে ঠিক করল স্কুলে একটা ছোট্ট লাইব্রেরি বানাবে, যেখানে শুধু মেয়েদের লেখা থাকবে—চিঠি, ডায়েরি, গল্প, কবিতা, এমনকি যেসব মেয়েরা লেখে না, তারাও যেন এসে শুধু বসে থাকতে পারে। নাম রাখল ‘পরীর পালক’—যেখানে প্রতিটি পালক এক একটি মেয়ের স্বপ্ন। প্রধান শিক্ষক প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিলেন, পরে সম্মতি দিলেন—“যদি এতে মেয়েরা উৎসাহ পায়, তাহলে অবশ্যই।” অনির্বাণ প্রথম বই হিসেবে পরীর লেখা ‘জোনাকিদের মিছিল’ টাইপ করে বাঁধিয়ে রাখল, কভারটা নিজে এঁকে দিল, আর লেখক হিসেবে লিখল—“পরী (যিনি নিজেই এক আলো)।” স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যে কৌতূহল বেড়ে গেল, তারা পরীর সঙ্গে গল্প করতে লাগল, কেউ কেউ খাতা নিয়ে এল, “দিদি, আমিও লিখব, তুমি একটু দেখে দিও।” গ্রামের লোকজন প্রথমদিকে বিরক্ত হলেও আস্তে আস্তে তাদের মুখে মৃদু প্রশংসা শোনা গেল—“মেয়েটা হয়তো সত্যিই কিছু করতে পারবে।” আর সেই সময়েই হঠাৎ রণজয় ফিরে এল গ্রামে, তার বাবা ভোলানাথ চক্রবর্তী গুরুতর অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য ছেলে ফিরেছে। রণজয় গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই সে শুনল—“এই যে সেই মেয়েটা, পরী, না কি নাম, স্কুলে আবার লেখে, পড়ায়, কবিতা লিখে, পাগল বলে যাকে আমরা ভেবেছিলাম, সে এখন সবাইকে শেখাচ্ছে।” রণজয়ের মুখ কঠিন হয়ে উঠল, সে মনে মনে ফুঁসে উঠল—“এই মেয়েটা ফিরে এসেছে? এত সাহস?” সন্ধ্যায় সে গিয়ে অশ্বত্থ গাছের তলায় দাঁড়াল, পরী তখন কয়েকটা বাচ্চাকে গল্প শোনাচ্ছিল। হঠাৎ সবাই চুপ করে গেল, কারণ রণজয় দাঁড়িয়ে, চোখ রক্তবর্ণ, ঠোঁট শক্ত। সে বলল, “তুই ফিরে এসেছিস? সাহস হয়েছে তোদের, আবার এই গ্রামে?” পরী তাকিয়ে ছিল, একটুও না কেঁপে, শান্ত গলায় বলল, “এই গ্রামে আমার জন্ম, আমার ব্যথা, আমার জয়—সব এখানেই, আমি ফিরব না তো কে ফিরবে?” রণজয় দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুই এখনও তোর অপমানের বদলা চাস?” পরী মৃদু হেসে বলল, “না, আমি কাউকে অপমান করিনি, আর যাদের দোষে আমার জীবন নষ্ট হয়েছিল, তারা নিজেরাই অপমানিত। আমি শুধু আলো জ্বালাতে এসেছি, যার চোখে জ্বলন আছে, সে না দেখলেও আলো তো থাকে। তুমি চাইলে বসতে পারো, গল্প শোনাতে পারি, কারণ এবার আমি কাউকে তাড়াই না, যেমন একদিন তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল আমাকে।”
রণজয় কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের এক ঝলক নিয়ে বলল, “তুই তো আগেও বড় বড় কথা বলতি, কিন্তু শেষে তো পালিয়ে গিয়েছিলি।” পরী চুপ করে রইল, তার চোখে কোনও রাগ নেই, নেই প্রতিশোধের আগুন, ছিল শুধু শীতল আত্মবিশ্বাস—যা কাঁটার মতো বিঁধে গেল রণজয়ের মনে, কারণ সে জানত এই মেয়েটা একদিন ছিল এমনই—সত্য বলত চোখে চোখ রেখে, ভয় পেত না, আর সেই না-পাওয়া ভালোবাসা তাকে বাকি জীবন কুড়ে কুড়ে খেয়েছিল। কিন্তু আজ সেই মেয়েটাই দাঁড়িয়ে, সমাজের চোখে পাগল অথচ ভেতরে অটুট, সামনে শিশুরা বসে, তারা বোঝে না অতীতের কালিমা, বোঝে না ক্ষমতার রাজনীতি, তারা কেবল পরীকে দেখে এক নতুন শিক্ষিকা হিসেবে। রণজয় ধীরে পেছন ফিরে চলে গেল, কিন্তু তার মনের মধ্যে শুরু হল একটা দ্বন্দ্ব—সে কি এখনো সেই আগের রণজয়? নাকি এই মেয়েটিকে দেখে তারও ভিতরে কোথাও প্রশ্ন জেগে উঠছে? সে কি ভুল করেছিল? না, তার তো ক্ষমতা ছিল, ছিল প্রভাব, সে চাইলে আবার একইভাবে পরীকে গ্রামছাড়া করতে পারে, কিন্তু এবার কি সেটা হবে এত সহজ? রাতে রণজয় তার বাবার ঘরে বসে শোনে—গ্রামের লোকজন বলছে, “ভোলানাথদা, আপনি তো বড় নেতা ছিলেন, আপনাদের ছেলেটাই একদিন ওই মেয়েটার সর্বনাশ করেছিল, এখন মেয়ে ফিরে এসে সম্মান কুড়োচ্ছে।” সেই কথাগুলো ভোলানাথ শুয়ে শুয়েই শুনতে পেয়েছিলেন, চোখে জল এল তার, তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমরা যদি ভুল করে থাকি, তার ক্ষমা কি হয়?” রণজয় বাবার চোখের জল দেখে প্রথমবার একটু থমকে গেল, নিজেকে প্রশ্ন করল—“আমরা কি সত্যিই অন্যায় করেছিলাম?” অন্যদিকে, পরী প্রতিদিন স্কুলে যেতে শুরু করল—না ছাত্রীর মতো, না শিক্ষক হিসেবেও, বরং একজন আলোর বাহক হিসেবে, যে গল্প বলে, লিখতে শেখায়, সাহস শেখায়। মেয়েরা এখন নিজের সমস্যার কথা বলে পরীকে, কেউ বলে—“দিদি, আমার বাড়িতে বলে মেয়ে হয়ে পড়াশোনা করে লাভ নেই,” কেউ বলে—“বাবা বলেছে বিয়ে দিয়ে দেবে ক্লাস এইট পড়েই,” পরী তাদের শোনায় তার নিজের গল্প, কিভাবে সমাজ তাকে চুপ করাতে চেয়েছিল, আর সে কীভাবে আবার নিজের কণ্ঠ ফিরে পেয়েছে। একদিন সন্ধ্যায় অনির্বাণ বলল, “তুমি জানো, তোমাকে নিয়ে পুরো একটা প্রজেক্ট করা যায়—‘গ্রামীণ নারীর আত্মপুনরাবিষ্কার’, তুমি সাহিত্যে থিসিসের বিষয় হতে পারো।” পরী হাসল, বলল, “আমি তো এখনো নিজেকে পুরোটা চিনতেই পারিনি, থিসিস কি হবে?” অনির্বাণ বলল, “তুমি তো প্রতিদিন নিজের নতুন অংশ খুঁজে পাচ্ছো, সেই খোঁজটাই থিসিস।” সেই সময়েই স্কুলে ঘোষণা হল এক বার্ষিক অনুষ্ঠান, যেখানে নাটক হবে, আবৃত্তি হবে, এবং সাহিত্য পাঠও। পরীর নাম দেওয়া হল—সে পড়বে তার লেখা ‘জোনাকিদের মিছিল’ গল্প থেকে একটি অংশ। প্রথমে সে দ্বিধায় ছিল, মুখে বলেছিল, “আমি পারব না, সবাই এতদিন পেছনে কথা বলেছে, এখন সামনে বসে শুনবে?” অনির্বাণ বলেছিল, “সত্য যখন দাঁড়ায়, মিথ্যা নিজের থেকে বসে পড়ে।” সেই কথা পরী মনে রেখেছিল, আর প্রতিদিন অনুশীলন করত অশ্বত্থ গাছের নিচে। দিনটা যখন এল, গোটা গ্রাম উপস্থিত, ছেলেমেয়েরা, শিক্ষক, অভিভাবক, এমনকি সাংবাদিকও। মঞ্চে পরী উঠে দাঁড়াল, তার মুখে একরকম নিষ্পাপ দীপ্তি, গলায় ছিল কাঁপুনি, কিন্তু চোখে ছিল না ভয়। সে পড়তে শুরু করল—“আমরা যারা আলো জ্বালাই, তারা সবাই জানি, এই আলো বহন করতে গেলে অনেক আঁধারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, আর সেই অন্ধকার যদি সমাজের চোখে জন্মায়, তবে সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা বলতে চাই—তোমরা যা দেখেছো, তা পুরোটা সত্য নয়, কারণ কিছু আলো চোখে দেখা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।” এক মুহূর্তের জন্য গোটা মাঠ নিস্তব্ধ, তারপর শুরু হল করতালি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লোকজন হাততালি দিচ্ছে, চোখে জল কারও কারও, অনির্বাণ পেছনে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে ভাবছে—এই পরীই তো সেই পারমিতা, যাকে একদিন সবাই ভুলে গিয়েছিল, আজ তাকেই ফিরিয়ে এনেছে তার নিজের আলো। কিন্তু সেই মুহূর্তেই একটি ঘটনা ঘটল—রণজয় উঠে দাঁড়াল, মঞ্চের সামনে এগিয়ে এল, বলল, “আমি কিছু বলব।” সবাই স্তব্ধ, কেউ কেউ কৌতূহলী, কেউ আশঙ্কায়। রণজয় বলল, “আমি একদিন এই মেয়েটার সর্বনাশ করেছিলাম, কারণ ও আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল। আমার বাবা আমার হয়ে স্কুলে চাপ সৃষ্টি করেছিল, আর আমি চুপচাপ থাকতাম, ক্ষমতা দেখাতাম, কারণ আমি জানতাম, কেউ ওর কথা বিশ্বাস করবে না। আজ আমি দাঁড়িয়ে স্বীকার করছি—আমি অপরাধী। আমি অনুতপ্ত, আমি চাই—পরী আমায় ক্ষমা করুক।” মাঠ নিঃশব্দ, এমন দৃশ্য কেউ কল্পনাও করেনি। পরী নিচে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে বলল, “ক্ষমা আমি করতে শিখেছি, কারণ না শিখলে বেঁচে থাকতে পারতাম না, কিন্তু ভুল আমি ভুলই রাখব, যাতে কেউ আর কারও সঙ্গে এমন না করে।” সেই দিন গ্রাম বুঝল—শুধু কবিতা নয়, গল্প নয়, পরী নিজেই একটা আন্দোলন, এক আত্মসম্মানের জাগরণ, আর সেই জোনাকিদের মিছিলে আরও অনেকে জড়িয়ে পড়ছে, ছোট ছোট মেয়েরা, যারা এখন আলোর গল্প শুনে নিজের জীবন রচনা করতে শিখছে।
পরীর ক্ষমার সেই ঘোষণা ছিল এক অনন্য নজির, যার প্রভাব শুধু রণজয়ের চোখে জল আনে না, বরং গোটা গ্রামের মনকে কাঁপিয়ে দেয় এমনভাবে যে বহুদিন পর অজস্র মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই এতদিন ভুলের পাশে ছিলাম? সেই দিন থেকেই বাহাদুরপুরের বাতাস বদলে যায়, স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি বাড়ে, অভিভাবকরা এসে পরীর সঙ্গে দেখা করে, কেউ কেউ বলতে থাকে—“আমার মেয়েটার পাশে তুমি একটু থেকো, ওর যেন তুমির মতো ভাগ্য না হয়।” পরী প্রতিদিন স্কুলের ছোট লাইব্রেরি ‘পরীর পালক’-এ বসে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে, লেখালিখি শেখায়, কেবল বাংলা নয়, ইংরেজি, অঙ্ক—যা যা সে নিজে একসময় শিখেছিল, আর তারপর যেগুলো সমাজ কেড়ে নিয়েছিল তার কাছ থেকে। সে আবার নিজের শিক্ষা ফিরিয়ে আনছে, অন্যদের শেখানোর মধ্য দিয়ে। অনির্বাণ ততদিনে স্কুলে তার অবস্থান সুদৃঢ় করে ফেলেছে—ছাত্রছাত্রীরা তাকে ভয় না পেয়ে ভালোবাসে, সহকর্মীরা তাকে শ্রদ্ধা করে, প্রধান শিক্ষক যেকোনো নতুন উদ্যোগে তাঁর পরামর্শ নেন, আর গ্রামের লোকজন তাঁকে এখন শুধু শিক্ষক নয়, এক নতুন আলো হিসেবে দেখে। সেই আলোই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল পরীর ভিতরেও, সে যাকে একসময় হারিয়ে ফেলেছিল—স্বপ্ন, সাহস, প্রেম—সব ফিরে আসছিল এক এক করে, নরম হাওয়ার মতো, ধীরে ধীরে, অশ্বত্থ পাতার ফাঁক গলে। একদিন পরী অনির্বাণকে বলল, “তুমি যদি না থাকতে, তাহলে আমি হয়তো আজও কারও চোখে মুখ লুকিয়ে থাকতাম, সাহস করে উঠতে পারতাম না।” অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল, “তুমি নিজেই এমন যে কেউ পাশে দাঁড়াতে চাইবেই।” তারপর এক দীর্ঘ নীরবতা, সেই নীরবতার মধ্যে প্রথমবার পরী বলল, “অনির্বাণ, তুমি কি জানো, আমি কখনো কাউকে ভালোবাসিনি, আমি তো কাউকে বিশ্বাস করিনি, অথচ আজ তুমি আমার চারপাশে এমন এক ছায়া হয়ে উঠেছ যেটা ছাড়া এখন নিজেকে কল্পনাও করতে পারি না।” অনির্বাণের মুখের রং বদলে গেল, সে একটু থেমে বলল, “আমি একজন শিক্ষক, আর তুমি… আমার অনুপ্রেরণা, আমার গল্পের নায়িকা, তবে…” পরী মাথা নিচু করে বলল, “আমি জানি, এই সম্পর্ক সমাজে হয়তো ঠিক নাম পাবে না, আমি কেবল বলতে চেয়েছিলাম, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।” অনির্বাণ আস্তে করে বলল, “তুমি জানো, আমি প্রতিদিন তোমার জন্য লিখি, আমার খাতায়, যেখানে তুমি এক কবিতার নাম, এক গল্পের হৃদয়।” সেই সন্ধ্যায় তারা দুজন কিছু না বলেই অনেক কিছু বলেছিল, চোখের ভাষা, বাতাসের গন্ধ, নিঃশ্বাসের ছন্দ—সব মিলিয়ে একটা অদৃশ্য প্রেমের সূচনা হয়েছিল, যে প্রেম কোনো প্রথা মানে না, কেবল হৃদয় বোঝে। পরের দিন অনির্বাণ স্কুলে বিশেষ প্রজেক্ট শুরু করল—‘আমার গল্প আমি বলি’—যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা লিখবে, আঁকবে, বলবে। প্রথম দিনে পরী দাঁড়িয়ে বলল, “আমরা মেয়েরা অনেক সময় নিজেদের গল্প বলতে ভয় পাই, কারণ আমাদের শেখানো হয়—মেয়ে মানেই চুপ থাকা, মেনে নেওয়া, সহ্য করা। কিন্তু আজ আমরা নিজেদের গল্প নিজেদের মুখে বলব, আর কেউ আমাদের থামাতে পারবে না।” সেই দিনের গল্প বলার সময় ছোট্ট শ্রেয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার বাবা বলে মেয়েরা নাচ-গান শিখলে চরিত্র নষ্ট হয়, কিন্তু আমি গাইতে চাই, কারণ গানে আমার চোখে জল আসে না, হাসি আসে।” সবাই হাততালি দিল, পরী এগিয়ে গিয়ে শ্রেয়ার মাথায় হাত রাখল, বলল, “তুমি গাই, যতদিন না গলা ফাটে, কারণ তোমার গানই তোমার সাহস।” অনির্বাণ তখন মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে ভেবে চলছিল—এই গ্রামে আলো জ্বলে গেছে, এখন তা নিভবে না। কিন্তু তার ভিতরে এক অদ্ভুত টান শুরু হয়েছে, পরীর প্রতি, যা শুধুই ভালোবাসা নয়, একধরনের গভীর শ্রদ্ধা, এক আশ্চর্য টান, যা সে থামাতে পারছে না। একরাতে সে খাতায় লিখল—“আমি যদি একদিন না থাকি, পরী, তুমি কি তাও জ্বলে উঠবে?” সে প্রশ্নের উত্তর তখন সে জানত না, কিন্তু পরী লিখে রেখেছিল—“তুমি না থাকলেও আমি থাকব, কারণ তুমি আমাকে নিজেই আলো শিখিয়েছো।” এই নির্ভরতা, এই নিরব ভালোবাসার অদ্ভুত মেলবন্ধন একদিকে যেমন সাহস জুগিয়ে চলেছে, অন্যদিকে তাদের জীবনে তৈরি করছে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা—এই সম্পর্ক কোথায় দাঁড়াবে? সমাজ কি তাদের গ্রহণ করবে? কিন্তু আপাতত তারা তা ভাবছে না, কেবল একে অপরের পাশে হাঁটছে, নতুন গল্প লিখছে, নতুন স্বপ্ন বুনছে। পরীর চোখে এখন আগের সেই বিষণ্নতা নেই, রণজয়ের উপস্থিতিও তাকে আর কাঁপায় না, বরং সে এখন জানে—যা কিছু হারিয়ে গিয়েছিল, তা আবার গড়ে তোলা যায়, যদি পাশে কেউ থাকে, যে বিশ্বাস করে—নিঃশর্ত, নিঃশব্দ, কিন্তু অটুট।
গ্রীষ্মের ছুটির ঠিক আগের সপ্তাহে স্কুলে বিশেষ এক কর্মসূচির আয়োজন হয়—‘আমার মাটি আমার গল্প’—যেখানে প্রতিটি ছাত্রছাত্রী তাদের পরিবার, পাড়া, গ্রাম বা নিজেদের ইতিহাস নিয়ে লিখবে অথবা বলবে মঞ্চে দাঁড়িয়ে। এই উপলক্ষে স্কুলের চত্বর সাজানো হয় কাগজের পতাকা আর মাটির প্রদর্শনী দিয়ে, আর পরী ও অনির্বাণ একসঙ্গে মিলে পুরো পরিকল্পনার তত্ত্বাবধানে ছিল। পরী নিজ হাতে প্রতিটি মেয়ের নাম লেখে, তাদের সাহস জোগায়, তাদের গল্প গুছিয়ে দিতে সাহায্য করে। হঠাৎ একদিন শ্রেণিকক্ষে বসে অনির্বাণ বলল, “পরী, তুমি কি জানো, তুমিই আমার মাটি, আমার শিকড়, আমার গল্প। আমি কোথা থেকে এসেছি সেটা অনেক আগেই ভুলে গিয়েছিলাম, তুমি আমায় আবার আমার নিজের কাছেই ফিরিয়ে দিয়েছ।” পরী মৃদু হেসে বলল, “তুমি যদি আমার আলো হও, তবে আমিই হয়তো তোমার ছায়া, যেখানে তুমি ক্লান্ত হলে একটু বসতে পারো।” সেই মুহূর্তটায় শ্রেণিকক্ষে যেন সময় থেমে যায়, জানালার ফাঁক দিয়ে রোদের রেখা এসে পরীর গালে পড়ে, অনির্বাণ তাকিয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে, আর ভাবে—এই অনুভূতির নাম যদি প্রেম হয়, তবে এ প্রেম কোনো নির্দিষ্ট ভাষা চায় না, এ প্রেম বোবা হয়ে থেকেও অনুরণন তোলে হাওয়ার ভেতর। সেই দিন থেকে তাদের সম্পর্কটা একটা অদ্ভুত ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে যায়—যেখানে তারা কিছুই বলেনা, কিন্তু সব কিছু বোঝে, কেউ কাউকে দাবি করে না, অথচ দু’জনই জানে—দাবি না করেও পাশে থাকা যায়। অনুষ্ঠান যেদিন শুরু হল, সেদিন সকাল থেকেই পরীর মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা, কারণ আজ তার লেখা ছোট গল্প ‘ছায়ার খোঁজে’ প্রথমবার মঞ্চে আবৃত্তি করবে ক্লাস নাইনের মেয়েরা। অনির্বাণ সেদিন তাকে বলল, “তোমার গল্পটাই আমাদের অনুষ্ঠানের প্রাণ, তুমি জানো তো?” পরী মাথা নিচু করে বলল, “ভয় হয়, যদি কেউ মেনে না নেয়?” অনির্বাণ বলল, “ভয় পেয়েছিলে বলেই তো তুমি আজ এত দূর এসেছো, ভয় মানে পেছনে যাওয়া নয়, ভয় মানে সামনে চলার সাহস।” অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েরা একে একে উঠে নিজের গল্প বলছিল, কেউ বলল দাদুর কথা, কেউ বলল জ্যাঠার ট্রাক্টর চালানোর অভিজ্ঞতা, কেউ বলল তার মায়ের লড়াইয়ের কথা। আর ঠিক সেই সময় মঞ্চে উঠল শ্রেয়া আর সিমা, তারা পড়ল পরীর লেখা—“ছায়া নিজে কিছু দেখে না, কিন্তু আলো ছাড়া তার অস্তিত্বও থাকে না। আমরা যারা মেয়েরা, অনেক সময় আমাদের বলা হয় ছায়ার মতো থাকো—দেখো না, বলো না, নিজের আলোর দাবিও কোরো না। কিন্তু আমি বলি, ছায়াও কখনো কখনো আলো হতে পারে, যদি সে নিজের অস্তিত্বের কথা বিশ্বাস করতে শেখে।” পুরো মাঠে নিস্তব্ধতা, তারপর হঠাৎ করে তুমুল হাততালি, শিক্ষকরা উঠে দাঁড়িয়ে প্রশংসা করলেন, এমনকি প্রধান শিক্ষক মঞ্চে উঠে বললেন, “পরী এখন আর শুধু এক মেয়ে নয়, সে এই স্কুলের ইতিহাস, সে প্রমাণ করেছে—অন্ধকার থেকে আলো আসতেই পারে, যদি কেউ পথ দেখায়।” রণজয় মাঠের পেছনে দাঁড়িয়ে সেই সব দেখছিল, শুনছিল, তার চোখের মধ্যে ছিল পরিত্রাণের আর্তি, একটা অনুতপ্ত নীরবতা, সে বুঝতে পারছিল—এই মেয়েটা তার অতীত, আর সেই অতীতই তাকে আজ বদলে দিয়েছে এক চিরন্তন প্রশ্নে—ক্ষমতা কাকে বলে? প্রতিশোধ কাকে বলে? আর প্রেম? রণজয় কিছু বলল না, মাঠ থেকে বেরিয়ে চলে গেল চুপচাপ, আর কখনও বাহাদুরপুরে ফিরে এল না। পরী জানত রণজয় ছিল একটা অধ্যায়, যেটা তাকে ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু আজ সেই ভাঙা টুকরোগুলোকেই সে জুড়ে তুলেছে এমনভাবে যে তারা মিছিল করছে—আলো, ছায়া আর শব্দের মিছিল। অনুষ্ঠান শেষ হলে পরী মঞ্চে উঠে দাঁড়াল, প্রথমবার নিজে, মাইকের সামনে। সে বলল, “আজ আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই—একদিন এই স্কুল থেকেই আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, আজ সেই স্কুলেই আমার গল্প পড়ানো হচ্ছে। আমি কোনও যুদ্ধে জিতিনি, আমি শুধু হেরে গিয়েও নিজের কণ্ঠ ফিরে পেয়েছি। আপনারা কেউ যদি কখনও কোনও মেয়েকে থামান, ভয় দেখান, প্রশ্ন তোলেন তার সাহসে—তবে আজ থেকে একটিবার হলেও ভেবে নেবেন, সে মেয়েটি পরী হতে পারে।” মাঠ স্তব্ধ, কেউ চোখে জল আটকাতে পারছে না, কেউ কাঁপা গলায় বলছে—“আমরা ভুল করেছি, আমরা আর করব না।” অনির্বাণ পেছন থেকে তাকিয়ে থাকল, তার চোখে গর্ব, ভালোবাসা, আর এক অদ্ভুত আশ্রয়বোধ। তারপর সে ধীরে মঞ্চের সিঁড়ি দিয়ে উঠল, পরীর পাশে দাঁড়িয়ে শুধু বলল, “এই গল্পটা এখন সবে শুরু।”
বাহাদুরপুরের সেই অশ্বত্থ গাছটা এখন আর শুধু একটা গাছ নয়, সেটা যেন এক সাক্ষী, এক স্মারক, যেখানে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে নিজের সমস্ত হারানো স্বপ্নকে খুঁজে পেয়েছিল আবার, যেখানে একটা নাম ভুলে গিয়ে আরেকটা নামের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল শক্তি, যেখানে সমাজের উপেক্ষার নিচে থেকেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছিল এক আকাশভরা আলো। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর রাতে স্কুলে ছোট একটা আলোচনার আয়োজন হয়, মোমবাতির আলোয় অনির্বাণ, পরী, কয়েকজন শিক্ষক আর কিছু মেয়ে মিলে বসেছিল, খোলা চাতালে। সেখানে পরী বলল, “আমি জানি, সমাজে আমার অবস্থান আজও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়, আমি জানি, অনেকেই এখনো মুখ ফিরিয়ে নেবে, কেউ কেউ বলবে, ওই পাগলি আবার কী করে এমন সম্মান পেল, কিন্তু আমি আজ নিশ্চিন্ত, কারণ আমার ভিতরে এখন এমন একটা মিছিল শুরু হয়েছে, যেটা কেউ আর থামাতে পারবে না।” অনির্বাণ তখন খাতায় কিছু লিখছিল, পরী তার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী লিখছো?” অনির্বাণ হেসে বলল, “তোমার শেষ অধ্যায়, যেখানে তুমি শুধু এক মেয়ে নও, তুমি এক আন্দোলন, তুমি এক গল্পের শিরোনাম।” সেই রাতে তারা দু’জনে অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটাল, কোনও গোপনতা ছিল না, কোনও উচ্চারণও নয়, কেবল চোখে চোখ রেখে বোঝা—তারা এখন একে অপরের সমস্ত হেরে যাওয়া, সমস্ত ফিরে পাওয়া। পরী বলল, “তুমি কি কোনওদিন ফিরে যাবে শহরে?” অনির্বাণ বলল, “এই গ্রামেই তো আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি, তুমি চাইলে আমি এখানেই থেকে যাবো, আর যদি কখনো যাইও, তবে শুধু তোমার গল্প নিয়ে যাবো না, তোমাকে নিয়েই যাবো।” সেই কথায় পরীর চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলল না, মাথা নিচু করে মাটি থেকে একটা শুকনো পাতা তুলল, বলল, “এই পাতাটা সেই গাছের যা একদিন আমায় আশ্রয় দিয়েছিল, তুমি যদি চাও, এটা তোমার খাতায় রেখে দিও, যখন পড়বে তখন মনে হবে—আমি পাশে আছি।” কয়েক সপ্তাহ পরে স্কুলে ‘পরীর পালক’ লাইব্রেরি-র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়, দেওয়ালে টাঙানো থাকে পরীর আঁকা একটি ছবি—একটা জোনাকি উড়ছে, পেছনে অসংখ্য ছায়া হাঁটছে তার আলোয়। নিচে লেখা—“আমরা সবাই কাউকে না কাউকে আলোর দিকে নিয়ে যাই, যেদিন নিজের ছায়াকেও আলোর মতো ভালোবাসতে শিখি, সেদিনই সমাজ বদলায়।” সেই লাইব্রেরি আজ স্কুলের গর্ব, মেয়েরা সেখানে এসে শুধু পড়ে না, নিজের লেখা জমা দেয়, কেউ চিঠি লিখে দেয় অজানা বাবাকে, কেউ ডায়েরিতে নিজের মনের কথা, কেউ কবিতা, কেউ গল্প—সব মিলিয়ে একটা শব্দের নদী বয়ে যায় প্রতিদিন, আর সেই নদীর উৎস হলো পরী, যে আজও সেই অশ্বত্থ গাছের নিচে বসে, ছেলেমেয়েদের ঘিরে গল্প করে, লেখে, কখনো নিজের লেখা পড়ে শুনায়, আবার কখনো কারও কান্না চুপ করায়। অনির্বাণ তার পাশে থাকে, কখনো শিক্ষক, কখনো বন্ধু, কখনো প্রেমিক—নির্বাচিত নয়, বরং অর্জিত সম্পর্ক, যা সমাজ বোঝে না, কিন্তু সময় চেনে। বহুদিন পরে শহর থেকে এক সাহিত্য সংস্থার প্রতিনিধি এসে পরীর সাক্ষাৎকার নিতে চায়, তার গল্প পড়ে তারা মুগ্ধ, চায় বই প্রকাশ করতে। পরী প্রথমে অস্বস্তিতে পড়ে, বলে, “আমার নাম তো কোনোদিন ছিলই না, আমার গল্পও কি সত্যিই বই হওয়ার যোগ্য?” অনির্বাণ তখন বলে, “তোমার জীবনের প্রতিটা দিন, প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা হেরে যাওয়া আর জিতে ফেরা—সবই বই হবার মতো, তুমি না লিখলে কেউ জানবে না, একজন ‘পরী’ কীভাবে শত অপমানের মধ্যেও উড়ে যেতে শিখেছিল।” সেই বইয়ের নামই হয় জোনাকিদের মিছিল, লেখক হিসেবে শুধু একটাই নাম লেখা থাকে—পরী। বই ছাপা হলে গ্রামের হাটে, স্কুলে, এমনকি পাশের শহরের মেলাতেও সেটা বিক্রি হয়, মেয়েরা হাতে বই নিয়ে বলে, “এই যে, দেখো, এটা আমাদের দিদির লেখা।” আর পরী, সে তখনও প্রতিদিন গাছের নিচে বসে, হাতের কাছে একটা খাতা, কলম, আর পাশে অনির্বাণের ছায়া। কেউ এসে জিজ্ঞেস করে, “আপনি এখন বিখ্যাত, আপনাকে তো কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয় ডেকেছে বক্তৃতা দিতে, আপনি যাবেন না?” পরী হেসে বলে, “আমি তো সেই মাটি যেখান থেকে উঠেছিলাম, এখানেই থাকি, তবে আমার শব্দগুলো যদি কারও শহরে পৌঁছায়, তবে আমি যাই না থেকেও পৌঁছে যাই।” আর একদিন সকালে, স্কুলের দেয়ালে বড় করে লিখে দেওয়া হয়—“এই বিদ্যালয় একজন প্রাক্তন ছাত্রীর নামে একটি সৃষ্টিশীলতা পুরস্কার চালু করল, যার নাম—‘পরীর পালক সম্মাননা’, প্রতি বছর যে মেয়ে নিজেকে খুঁজে পেতে সাহস দেখাবে, সে এই পুরস্কার পাবে।” সেই দিন বাহাদুরপুরে জোনাকির ঝাঁক দেখা যায়—নদীর ধারে, মাঠের পাশে, আর অশ্বত্থ গাছের ডালে, তারা উড়ছে, নীরবে আলো ছড়াচ্ছে, আর দূরে বসে এক মেয়ে শুধু তাকিয়ে দেখছে, তার চোখে আজ আর অভিমান নেই, নেই একটুও রাগ, নেই তীব্র কোনো প্রশ্ন—আছে কেবল জয়, নরম আলোয় গাঁথা একটা মিছিলের মতো জয়, যেটা আজও চলেছে, চলবেই।
শেষ




