Bangla - ভূতের গল্প

জলাশয়ের অপদেবতা

Spread the love

সৌমিত্র দাশগুপ্ত


এক

গ্রামের মাঝখান থেকে সামান্য দূরেই এক পুরোনো পুকুর, যার জলে সবসময় যেন এক অদ্ভুত গা ছমছমে নীরবতা ভেসে থাকে। চারপাশে শ্যাওলা জমে যাওয়া ঘাস, মাটিতে শুকনো পাতার স্তূপ, আর ভোরের কুয়াশা পুকুরের ধারে এক ভয়ানক আচ্ছাদন তৈরি করে। গ্রামের মানুষজন দিনের বেলায় সেখানে জল তুলতে যায়, গবাদি পশুকে গোসল করায়, কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই সেই জলাশয়কে এড়িয়ে চলে যায় সকলে। কারণ সেই পুকুরকে ঘিরে রয়েছে বহু বছরের ভয়ঙ্কর কাহিনি। অকারণে সেখানে ডুবে মরেছে গ্রামের মানুষ, কখনও শিশু, কখনও জেলে, কখনও গৃহবধূ। লোকেরা বলে, জলে সাঁতার জানলেও হঠাৎ পা কেঁচে যায়, শ্বাস আটকে আসে, আর চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠে। আর যখন মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন সবার ঠোঁট নীলচে হয়ে থাকে, যেন কোনো অদৃশ্য হাত তাদের শ্বাসরোধ করে দিয়েছে। বুড়ো-বুড়িরা শপথ করে বলে, এই পুকুরে এক কিশোরী কন্যার আত্মা বসে আছে, যার মৃত্যু হয়েছিল অকালেই, আর যার আত্মা আজও শান্তি পায়নি। তারা বিশ্বাস করে, যে-ই জলের ধারে যায়, সেই আত্মা তাকে টেনে নেয় নিজের সাথে—কখনও প্রতিশোধের জন্য, কখনও নিঃসঙ্গতার সঙ্গী খুঁজতে। কিন্তু আধুনিক শিক্ষিত যুবকেরা এসব মানতে চায় না। তারা ভাবে, এটা কুসংস্কার, অজ্ঞতার ছায়া, আর অযথা ভয় দেখানোর গল্প। কিন্তু যখন একে একে মৃত্যু ঘটে চলেছে, তখনও তাদের মনে ছোট্ট করে প্রশ্ন জাগে—তাহলে কি সত্যিই কিছু আছে এখানে?

এই অভিশপ্ত জলাশয়কে ঘিরে গ্রামের প্রতিটি মানুষ আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতার কথা বলে। কেউ দাবি করে, গভীর রাতে হঠাৎ জলের ভেতর থেকে মেয়ের কান্নার শব্দ শোনা যায়, কেউ আবার বলে, তারা দেখেছে জলে ভেসে আছে সাদা কাপড়ের মতো কিছু, যা আবার মিলিয়েও যায়। গ্রামের বাচ্চাদের কঠোরভাবে নিষেধ করা হয় সন্ধ্যার পর পুকুরের ধারে না যেতে। অনেকে আবার বলে, জলাশয়ের পাশ দিয়ে হাঁটলে শীতল বাতাস গায়ে এসে লাগে, বুক কেঁপে ওঠে, আর মনে হয় কেউ পেছন থেকে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। এসব গুজব ও কাহিনি গ্রামে এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে মানুষজনের দৈনন্দিন জীবনও প্রভাবিত হয়। একসময়ে এই পুকুরই ছিল গ্রামের প্রাণকেন্দ্র—এখান থেকেই পাওয়া যেত পানীয় জল, ধোয়ার জল, আর মাছ ধরা হত প্রতিদিন। কিন্তু আজ সেই পুকুর হয়ে উঠেছে এক আতঙ্কের প্রতীক। তবু দারিদ্র্য আর প্রয়োজনের কারণে মানুষকে দিনের বেলায় জলাশয়ের ধারে যেতে হয়ই। আর গ্রামের বৃদ্ধেরা প্রায়শই তরুণদের বলে—“ভাই, দিনের আলোতে যা খুশি করিস, কিন্তু অন্ধকার নামার আগে ফিরিস, কারণ জলের নিচে যে চোখ জেগে আছে, তা কখনও ঘুমোয় না।”

তবু গ্রামের একাংশের তরুণ প্রজন্ম এসব কথাকে কল্পকাহিনি বলে হেসে উড়িয়ে দেয়। তারা বলে, “এ সব বুড়োদের ভয়ের গল্প, বাস্তবে ভূত বলে কিছু নেই।” তাদের মতে, যারা ডুবে মারা গেছে তারা হয়তো অসাবধানতাবশত পা পিছলে পড়েছে, বা হয়তো সাঁতার জানত না। তারা যুক্তি দেয় যে কোনো আত্মা বা অপদেবতা থাকলে, এতদিনে তা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে পারত। কিন্তু আবারও যখন নতুন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন এই যুবকেরাও অস্থির হয়ে ওঠে, মনে প্রশ্ন জাগে—সত্যিই কি শুধু কুসংস্কার, নাকি এই পুকুরের গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য এক অদৃশ্য শক্তি? গ্রামের সাধারণ মানুষজনের জীবন এমন এক দ্বন্দ্বের ভেতর আটকে আছে, যেখানে ভয় আর অবিশ্বাস পাশাপাশি চলতে থাকে। অভিশপ্ত জলাশয় তাদের কাছে একইসাথে প্রয়োজন আর আতঙ্ক, বেঁচে থাকার উৎস আবার মৃত্যুর ছায়া। আর এই দ্বন্দ্বই ধীরে ধীরে তৈরি করে এক অশান্ত ভূমিকা, যার ভেতর থেকে জন্ম নিতে চলেছে এক ভয়ংকর কাহিনি—অপদেবতার গল্প, যার রূপ এখনও কেউ স্পষ্ট করে দেখতে পায়নি, কিন্তু যার উপস্থিতি গ্রামের প্রতিটি শ্বাসে মিশে আছে।

দুই

অর্জুন ছিল গ্রামের এক সাহসী জেলে, যাকে সবাই চিনত তার পরিশ্রম আর দৃঢ়তার জন্য। ছোটবেলা থেকেই জল আর মাছের সঙ্গে তার জীবন জড়িয়ে গেছে। নদী হোক বা পুকুর, জলে নামতে তার কখনও ভয় লাগত না। কিন্তু সেই সাহসী অর্জুনের জীবনে একদিন হঠাৎ নেমে আসে দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনা। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নিতাই, যে প্রায় প্রতিদিনই তার সঙ্গে মাছ ধরতে যেত, একদিন সকালে গ্রামবাসীর চোখের সামনে সেই অভিশপ্ত পুকুরে ডুবে মারা গেল। কেউ তাকে বাঁচাতে পারল না, এমনকি অর্জুন নিজেও। চোখের সামনে বন্ধুর প্রাণ চলে যেতে দেখে অর্জুন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে। লোকেরা বলল, “এই তো আবার সেই মেয়ের আত্মা, জলে টেনে নিল।” কিন্তু অর্জুন এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। সে বিশ্বাস করতে চাইল না যে ভূতের হাতে তার বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে। সে বারবার নিজের মনে বলল—“এটা দুর্ঘটনা, কুসংস্কারের গল্পে আমি ভেসে যাব না।” কিন্তু যতবার বন্ধুর নিথর শরীরের কথা মনে পড়ে, ততবার তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। সে ঠিক করল, যেভাবেই হোক সে সত্যিটা খুঁজে বের করবে, প্রমাণ করবে যে এসব অলৌকিক ঘটনা নয়, বাস্তবের আড়ালে কোনো যুক্তি লুকিয়ে আছে।

কিন্তু রাত যতই গভীর হতে থাকে, অর্জুনের ভেতরে কৌতূহলের সঙ্গে ভয়ও ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়। সে লোকজনের নিষেধ অগ্রাহ্য করে এক রাতে একা চুপিসারে পুকুরপাড়ে যায়। চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে কোনো কুকুরের হুক্কাহুয়া শব্দ শোনা যায়। কুয়াশার আচ্ছাদনে পুকুরটা যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। অর্জুন কাঁধে জাল ফেলে ভিজে মাটির উপর বসে থাকে, চোখ স্থির পুকুরের জলে। প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও কিছু সময় পরই সে লক্ষ্য করে, পুকুরের মাঝখানে হালকা ঢেউ উঠছে, অথচ সেখানে কোনো মাছ নড়ে না, বাতাসও নেই। অচিরেই তার কানে আসে এক অদ্ভুত শব্দ—যেন কেউ ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে, আবার ছাড়ছে। সেই শব্দ আসছে জলের নিচ থেকে। অর্জুনের বুক ধকধক করতে থাকে, কিন্তু তার কৌতূহল তাকে চেপে ধরে। সে নিজেকে বোঝায়—“এটা হয়তো আমার মনের ভুল, হয়তো পুকুরের ফোঁটায় বাতাস আটকে আছে।” তবু অস্বস্তি তাকে ছাড়ে না। হঠাৎ সে অনুভব করে, অদৃশ্য কারও চোখ যেন তাকে জলের ভেতর থেকে নিরীক্ষণ করছে, তার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করছে। মুহূর্তেই তার মনে পড়ে যায় লোকেদের কথা—“মেয়েটার আত্মা নিশ্বাস ফেলে, সেই শব্দ শোনাই মৃত্যু-সংকেত।” কিন্তু সে নিজের মনকে শক্ত করে, জেদ করে দাঁত কামড়ে বলে ওঠে, “আমি ভয় পাব না। সত্যিটা আমাকে জানতেই হবে।”

এই জেদের কারণেই অর্জুন ধীরে ধীরে এক বিপজ্জনক পথে এগিয়ে যায়। গ্রামের অন্যরা যখন অভিশপ্ত পুকুর থেকে দূরে থাকে, তখন সে প্রায় প্রতিদিন রাতে সেখানে বসতে শুরু করে। তার চোখে ঘুম আসে না, কানে বাজতে থাকে সেই অদ্ভুত নিঃশ্বাসের শব্দ। এক রাতে সে লক্ষ্য করে, জলের তলদেশে যেন এক মুহূর্তের জন্য সাদা কিছু নড়ল—কেউ যেন ধীর ভঙ্গিতে হাঁটছে নিচে। হৃদপিণ্ড দ্রুত ধড়ফড় করতে থাকে, শরীর ঘামে ভিজে যায়, তবুও সে সরে আসে না। বরং পা বাড়ায় আরও কাছে, যেন সত্যি মুখোমুখি হতে চায় সেই রহস্যের। তার মনে হয়, এই আত্মা কিংবা যাই হোক না কেন, তাকে না দেখলে, না বোঝলে তার বন্ধুর মৃত্যু বৃথা হয়ে যাবে। গ্রামবাসী যখন ভয়ে শিউরে ওঠে, তখন অর্জুন নিজের জেদের দমে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, এই জলাশয় কেবল ভয় আর কুসংস্কারের গল্প নয়, বরং এখানে লুকিয়ে আছে এমন এক সত্য, যা উন্মোচিত হলে গ্রামের বহু বছরের আতঙ্ক হয়তো মুছে যাবে—অথবা আরও ভয়ঙ্কর কোনো সত্য সামনে এসে দাঁড়াবে। সেই রাতেই সে শপথ নেয়, যে মূল্যে হোক, এই রহস্যের জট খুলবেই।

তিন

অর্জুনের চোখে প্রশ্ন, বুকের ভেতর অনিশ্চয়তার ঝড়। এই রহস্যময় শব্দ, এই অদৃশ্য টান তাকে প্রায় পাগল করে তুলছে। এমন সময় গ্রামের প্রবীণ মানুষ হরিদাস তাকে ডেকে নিয়ে যায় নিজের উঠোনে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও হরিদাসের কণ্ঠে আছে এক বিশেষ দৃঢ়তা, এক ধরনের গাম্ভীর্য যা সবাইকে শোনাতে বাধ্য করে। তিনি অর্জুনকে বলেন, “তুই যে জলে বসে থাকে রে ছেলে, সেই জলে এক কন্যার কাহিনি চাপা আছে।” তারপর ধীরে ধীরে এক অন্ধকার স্মৃতির পর্দা উঠতে থাকে তার কণ্ঠে। বহু বছর আগে, যখন হরিদাসের বয়সও অল্প, তখন এই গ্রামে জন্মেছিল এক কন্যা—মেঘলা। নামের মতোই সে ছিল সুন্দর, উজ্জ্বল, ঝলমলে। কারও চোখে কখনও এত মায়াবী রূপ দেখা যায়নি। কিন্তু রূপের সঙ্গে নিয়তি তার প্রতি দয়া করেনি। ছোটোবেলা থেকেই তাকে ঘিরে থাকত নানা দুর্ভাগ্য। মা মারা গিয়েছিল অকালেই, বাবা দুঃখে ভেঙে পড়েছিলেন, সংসার চলত অনাহারে আর দারিদ্র্যে। তবুও মেঘলা বড় হয়েছিল সকলের চোখের মণি হয়ে, তার হাসি গ্রামটিকে আলোকিত করত। একদিন তার বিয়ে ঠিক হয় পাশের গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে। কিন্তু সেই শুভ সংবাদই তার জীবনের শেষ সূর্যোদয় হয়ে দাঁড়ায়।

বিয়ের কয়েকদিন আগে এক দুপুরে মেঘলাকে শেষবার দেখা যায় সেই অভিশপ্ত জলাশয়ের ধারে। সে সেদিন সাদা কাপড় পরে জল তুলতে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ আর তাকে জীবিত ফিরে পায়নি। গ্রামের মানুষ প্রথমে ভেবেছিল দুর্ঘটনা, হয়তো পা পিছলে পড়েছিল। কিন্তু তার মৃতদেহ উঠলেই দেখা যায় অদ্ভুত দৃশ্য—চোখ উল্টে আছে, ঠোঁট নীলচে হয়ে গেছে, আর মুখে আছে এক অজানা আতঙ্কের ছাপ। যেন মৃত্যুর আগে সে কারও সঙ্গে লড়াই করেছে, কারও অদৃশ্য হাত তাকে আঁকড়ে ধরেছিল। হরিদাস বললেন, “ও মরেনি, ওকে মারা হয়েছে।” কারও কারও মতে, জমিদারের লোকেরা মেঘলাকে জোর করে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, কারণ সে তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। আবার কেউ বলল, মেঘলার ভাগ্যে এমনই লেখা ছিল, বিয়ের আগে তার জীবন শেষ হবে। কিন্তু সত্যিটা কেউ জানল না। তবে যা জানা গেল, মেঘলার আত্মা শান্তি পায়নি। সেই থেকে এই জলাশয় হয়ে উঠল মৃত্যুর ফাঁদ। হরিদাসের চোখে জল জমে ওঠে যখন তিনি বলেন—“ও মরা মেয়ে নয় রে, ও অভিশাপ। ওর কান্না থামেনি এখনও।”

এভাবেই মেঘলার কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। গ্রামবাসীর বিশ্বাস, মেঘলা কখনও কাউকে ক্ষতি করার জন্য আত্মা হয়ে ওঠেনি, বরং তার অপূর্ণ জীবন, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর অপমানের যন্ত্রণা তাকে আটকে রেখেছে এই জলে। যখনই কেউ সেই পুকুরের কাছে যায়, মেঘলার আত্মা তাকে টেনে নেয়, যেন সে নিজের শূন্যতা পূরণ করতে চায়, নিজের হারিয়ে যাওয়া বিয়ে, সংসার আর ভালোবাসাকে কারও জীবন দিয়ে পূর্ণ করতে চায়। গ্রামের মেয়েরা আজও বলে, গভীর রাতে তারা মেঘলার হাসির শব্দ শোনে, কখনও আবার ভেজা সাদা কাপড়ে তাকে জলধারে বসে থাকতে দেখে। আর যারা ডুবে মরেছে, তাদের সবার শরীরেই ছিল সেই একই চিহ্ন—ঠোঁট নীলচে, চোখ বিস্ফারিত, যেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তারা মেঘলার আলিঙ্গন থেকে মুক্তি পায়নি। হরিদাস অর্জুনকে সতর্ক করে বলেন, “তুই যদি সত্যিই ওই জলে নামতে থাকিস, তবে মনে রাখিস, তোর বুকেও ওর ঠাণ্ডা হাত জড়িয়ে ধরতে পারে। আর একবার সে ডাক দিলে ফেরার পথ থাকে না।” অর্জুন চুপ করে শোনে, বুকের ভেতরে ভয় আর কৌতূহল একসঙ্গে কাজ করতে থাকে। হরিদাসের কাহিনি যেন তার মনের দ্বন্দ্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে—সত্যিই কি শুধু কুসংস্কার, নাকি মেঘলার আত্মা আজও জলে ভাসছে, অপেক্ষা করছে নতুন কাউকে বুকে টেনে নেওয়ার জন্য? এই প্রশ্ন নিয়েই অর্জুনের জেদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

চার

দিন কয়েক শান্ত থাকার পর হঠাৎই গ্রামে আবার তুমুল আলোড়ন ওঠে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে কান্নার শব্দে কেঁপে ওঠে এক গৃহস্থ বাড়ি। পাশের বাড়ির কিশোরী মালতীকে পাওয়া যায় সেই অভিশপ্ত জলাশয়ের জলে ভেসে। সে ছিল সবে ষোলো বছরের, প্রাণবন্ত, হাসিখুশি একটি মেয়ে। সেদিন দুপুরে সে বান্ধবীদের সঙ্গে খেলতে বেরিয়েছিল, তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর গ্রামের কয়েকজন দেখে পুকুরের ধারে তার স্যান্ডেল পড়ে আছে। সবাই বুঝে ফেলে ভেতরে কিছু একটা ঘটেছে। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে গ্রামবাসী টর্চ নিয়ে জলে নামল, আর কিছুক্ষণ পরেই ভেসে উঠল মালতীর নিথর দেহ। তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে উল্টে আছে, ঠোঁট নীলচে হয়ে গেছে, আর সাদা ফেনায় ভরা মুখ যেন কোনো ভয়ঙ্কর ছায়ার বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধ করেছিল। দৃশ্যটা দেখে গ্রামের মেয়েরা অচেতন হয়ে পড়ে, পুরুষদের বুকেও ভয়ের শীতল স্রোত বইতে শুরু করে। এ মৃত্যু কেবল একটি কিশোরীর জীবন কেড়ে নিল না, বরং বহু বছরের পুরোনো আতঙ্ককে নতুন করে জাগিয়ে তুলল। সবাই একসঙ্গে বলতে শুরু করল, “মেঘলা আবার কাউকে টেনে নিল।”

এই ঘটনার পর থেকে গ্রাম যেন সম্পূর্ণ বদলে গেল। সন্ধ্যা নামলেই পুকুরপাড় অন্ধকারের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে ওঠে। একসময় যেখানে মানুষ সন্ধ্যার পর বসে গল্প করত, শিশুেরা খেলত, এখন সেখানে নেমে আসে গা ছমছমে নীরবতা। কেউ আর সাহস করে জলাশয়ের কাছে যায় না, এমনকি দিনের আলোতেও অনেকেই পুকুর এড়িয়ে চলে। মা-বাবারা মেয়েদের কঠোরভাবে শাসন করে, যেন তারা কখনও একা বেরোতে না পারে। কিন্তু ভয়ের আসল ছাপ পড়ে তাদের স্বপ্নে। গ্রামের অনেক মেয়ে, বিশেষ করে কিশোরীরা, রাতের ঘুমে একই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে শুরু করে। তারা স্বপ্নে দেখে, ভিজে সাদা কাপড় পরা এক কিশোরী পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি, চোখে শূন্যতা। কেউ কেউ বলে, সেই হাসি আসলে কাঁদতে কাঁদতে তৈরি এক ভয়ের মুখোশ, আবার কারও মতে সেটা এমন এক আহ্বান, যা তাদের জলাশয়ের দিকে ডাকছে। স্বপ্ন থেকে ঘুম ভাঙলেও বুক ধড়ফড় করে, শরীর ঘামে ভিজে যায়, আর মনে হয় যেন কেউ তাদের শ্বাস কেঁড়ে নিতে চাইছে।

গ্রামবাসীর এই আতঙ্কের মধ্যেই রহস্য আরও গভীর হতে থাকে। কেউ কেউ দাবি করে, তারা রাতের বেলা পুকুরপাড়ে গেলে অদ্ভুত সাদা ছায়া ভেসে বেড়াতে দেখেছে, আবার কেউ বলে জলের ভেতর থেকে আসে ফিসফিস শব্দ, যেন কেউ নাম ধরে ডাকছে। ভয় এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে মানুষজন নিজেদের ঘরেই আলো জ্বালিয়ে রাখে পুরো রাত। কেউ কেউ পুরোহিত ডেকে মন্ত্রপাঠ করায়, কেউ আবার ঢোল বাজিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু যতই চেষ্টা হোক, মেঘলার ছায়া যেন গ্রামটিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। পুরুষেরা অজুহাত দিয়ে রাতে বাইরে বেরোনো এড়িয়ে চলে, মেয়েরা জানলার ধারে দাঁড়াতেও ভয় পায়। আর অর্জুনের মনে এইসব ঘটনার অভিঘাত একেবারেই আলাদা। গ্রাম যখন ভয়ে স্তব্ধ, তখন তার জেদ আরও প্রবল হয়। সে ভাবে, যদি সত্যিই মেঘলার আত্মা এত জীবন্ত হয়ে থেকে থাকে, তবে এর পেছনে নিশ্চয়ই আছে এমন এক রহস্য, যা এখনো কেউ উন্মোচন করতে পারেনি। সে আরও দৃঢ় হয় যে তাকে এই রহস্যের শেষ পর্যন্ত পৌঁছতেই হবে, না হলে এই গ্রাম আর কখনও মুক্তি পাবে না আতঙ্কের ছায়া থেকে।

পাঁচ

গ্রামের সেই ভোরবেলা, যখন হালকা কুয়াশায় চারদিক ঢাকা, তখনই ঘটে গেল সেই ঘটনাটি। অর্জুনের ছোট বোন কমলা, বয়স মাত্র ষোলো, প্রতিদিনের মতো কলসি নিয়ে পুকুর থেকে জল আনতে গিয়েছিল। কমলা হাসিখুশি মেয়ে, তবে ভীষণ সরল। সেই দিন ভোরে যখন সে একা পুকুরপাড়ে পৌঁছাল, পাখিদের ডাক আর কুয়াশার আড়ালে জলের ঢেউ তাকে অদ্ভুত নীরবতায় ভরিয়ে তুলল। কমলার মনে হলো যেন আজকের সকালটা অন্যরকম—জলটা যেন নিথর হয়ে আছে, অথচ ভেতরে কোথাও দমবন্ধ শব্দ শোনা যাচ্ছে। কলসি ভরতে গিয়ে হঠাৎই তার গা কেঁপে উঠল। কেউ যেন অদৃশ্য হাতে টান দিল তার পায়ের দিকে, আর তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। গ্রামের এক নারী, দূর থেকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা, দেখতে পেল কমলার শরীর হঠাৎ জলে ঝুঁকে পড়ল। মুহূর্তেই সে দৌড়ে গিয়ে অন্যদের ডাকল। সবাই ছুটে এল, আর ততক্ষণে কমলার নিস্তেজ শরীরটা টেনে তোলা হলো। চারপাশের লোকেরা আতঙ্কে ফিসফিস করতে লাগল—“মেঘলা আবারও টান দিল!”

অচেতন কমলাকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, ঠোঁট নীলচে আর শ্বাস ছোট ছোট কাঁপছিল। হরিদাস, গ্রামের বৃদ্ধ, সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “আমি তো বলেছিলাম, মেয়েটি কারও জীবন নেয় না, তবে যার ভাগ্যে মৃত্যু নেই তাকে ভয় দেখিয়ে দিয়ে যায়।” কিন্তু সেই ভয় এতটাই প্রবল ছিল যে কমলার নিস্তেজ মুখ দেখে সবার বুক কেঁপে উঠল। গ্রামের মায়েরা আর মেয়েরা একসাথে কমলার শিয়রে বসে রইল, কেউ কেউ মন্ত্র পড়তে লাগল, কেউ আবার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখল। আধ ঘণ্টা পর কমলার ঠোঁট কাঁপল, চোখ আধখোলা হলো, আর ফিসফিস করে একটি শব্দ বের হলো—“মেঘলা…”। ঘরে উপস্থিত সবাই মুহূর্তে থমকে গেল, চারদিকে এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে এল। কারও মুখে কথা নেই, শুধু আতঙ্কে গুঞ্জন উঠল—“সে নাম নিল কেন?” অর্জুনের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল, বোনকে এভাবে কাঁপতে দেখে তার চোখে জল চলে এলো। কিন্তু ভয় নয়, তার চোখে তখন দৃঢ়তা, সে ভাবল—“এবার আমাকে সত্যিটা খুঁজে বের করতেই হবে।”

রাত নামার পর, যখন গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে এল, তখনও কমলার চোখে আতঙ্কের ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে বারবার কেঁপে উঠছিল, যেন কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি তাকে ঘিরে আছে। অর্জুন তার হাত ধরে বসে রইল, ভেতরে ভেতরে শপথ করল—সে মেঘলার রহস্য উদ্ঘাটন করবে, যেভাবেই হোক। গ্রামের অন্য পুরুষেরা বাইরে বসে পুকুরের দিকে তাকিয়ে ভয়ে কাঁপছিল। কেউ কেউ বলছিল, “পুকুরটা ভরাট করে দেওয়া উচিত।” কিন্তু কেউ সাহস পাচ্ছিল না। আর অর্জুন তখন বুঝে গেল, এ আর কুসংস্কার নয়—মেঘলার আত্মা বেঁচে আছে, জলাশয়ের গভীরে অদ্ভুত এক শক্তি হয়ে। তার বোন আজ প্রাণে বেঁচে গেছে, কিন্তু যদি সত্যিই মেঘলা কমলাকে নিজের জগতে টেনে নিত, তবে সেই অভিশাপ থামানো যেত না। সেই রাতে গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে উঠল, পুকুরের দিক থেকে ভেসে এল ভেজা মাটির গন্ধ আর দমবন্ধ এক সুর—যেন কারও ক্ষীণ নিশ্বাস। আর অর্জুনের চোখে প্রতিজ্ঞার আগুন—সে এই জলাশয়ের অভিশাপ ভাঙবেই, মেঘলার রহস্য উন্মোচন করবেই।

ছয়

রঘু সরকার—গ্রামের বর্তমান জমিদার বংশধর, যিনি প্রাচীন একটি ভগ্নপ্রায় প্রাসাদে বাস করেন। তাঁর মুখশ্রীতে সবসময় এক ধরনের আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেন কোনো অদৃশ্য ছায়া তাঁর চারপাশে ঘুরপাক খায়। গ্রামবাসীরা বলে, রঘুর পরিবারই আসল অভিশাপের উৎস। যদিও বাইরে থেকে তিনি দান-খয়রাত করেন, উৎসবে পশুবলি দেন, পুকুরে পুজোর আয়োজন করেন, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তিনি ভয়ংকর গোপন সত্যের ভারে কাতর। গ্রামের বৃদ্ধরা ফিসফিস করে বলেন, মেঘলার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা ছিল না। মেঘলা ছিল গরিব কৃষকের কন্যা, যার সৌন্দর্য আর মাধুর্যে গোটা গ্রাম মুগ্ধ ছিল। তার বিয়ের আগে, এক অন্ধকার রাতে জমিদার পরিবারের কিছু মানুষ তাকে অপমানিত করে, তার আর্তনাদ ঢাকা পড়ে যায় পুকুরপাড়ের নিস্তব্ধতায়। আত্মসম্মান রক্ষার শেষ চেষ্টায়, বা হয়তো জোর করেই, তাকে ঠেলে দেওয়া হয় সেই গভীর জলাশয়ে, যেখানে সে মৃত্যুর নিঃশ্বাস নেয়। সেই থেকে পুকুরটি রক্তপায়ী হয়ে ওঠে, যেন প্রতিটি তরঙ্গ মেঘলার আর্তচিৎকার বহন করে।

রঘু সরকারের ভেতরের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি জানেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের অন্যায় এই গ্রামের প্রতিটি ঘরে ভয়ের ছায়া নামিয়েছে। ছোটবেলায় যখন তিনি শোনেন কিভাবে মেঘলার আত্মা ভেসে ওঠে রাতের অন্ধকারে, তাঁর বুক কেঁপে উঠেছিল। একবার নাকি তাঁর দাদারও মৃত্যুর আগে হঠাৎ পুকুরের ধারে অচেতন হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, তখনও ভেজা চুলে সাদা কাপড়ের এক মেয়ের ছায়া চোখে পড়েছিল। জমিদার পরিবারের প্রতিটি পুরুষ মৃত্যুর আগে কোনো না কোনোভাবে মেঘলার আতঙ্কে ভুগেছে, যেন আত্মা তাদের শাস্তি দিয়ে যাচ্ছে। এই ভয়েই রঘু অস্থির হয়ে ওঠে—সে চায় বিষয়টি চাপা রাখতে, কারণ সত্য প্রকাশ পেলে গ্রামের মানুষ জমিদার বংশকে ধিক্কার দেবে। কিন্তু অন্তরের গভীরে, সে অনুভব করে এই পাপের দায় একদিন না একদিন ফাঁস হবেই, আর সেই দিন তার নিজের রক্তও রক্ষা পাবে না।

অর্জুন যখন গ্রামের মানুষদের কাছে খোঁজখবর নিতে শুরু করে, তখনই হরিদাস কাকার কাছ থেকে জমিদার পরিবারের অন্যায়ের আভাস পায়। ধীরে ধীরে অর্জুন বুঝতে পারে, মেঘলার আত্মা নিছক অস্থির নয়, সে প্রতিশোধপরায়ণ। তার অপূর্ণ জীবন, তার অগণিত অপমান আর তার করুণ মৃত্যু আজও প্রতিটি তরঙ্গকে অভিশাপ বানিয়েছে। গ্রামের মানুষরা যতই ভয় পেয়ে জলাশয় এড়িয়ে চলুক, জমিদার পরিবার জানে—এটা নিছক ভূতের গল্প নয়, বরং তাদের রক্তের দোষ। আর রঘু সরকার নিজের অন্তরে প্রতিদিন আতঙ্কে কাঁপতে থাকে, কারণ সে জানে, মেঘলার ছায়া এখনো তার প্রাসাদের আশেপাশে ঘোরে, রাতের বাতাসে ভেসে আসে ভেজা চুলের গন্ধ, আর অন্ধকার জানালায় কখনও কখনও ভেসে ওঠে সেই অভাগিনী কন্যার নিঃশব্দ দৃষ্টি। এই দৃষ্টি যেন প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি, যা কোনো দিনও মুছে যাবে না।

সাত

রাতের আকাশে চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকিয়েছে, পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ। দূরে কেবল শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে, আর মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে শব্দ। অর্জুনের বুক কাঁপছে, তবু সে থেমে নেই। হাতে কেরোসিনের লণ্ঠন আর কোমরে বাঁধা মোটা দড়ি, যেন যদি কিছু ঘটে তবে অন্তত কেউ টেনে তুলতে পারে। কিন্তু তার সাহসী পদক্ষেপে কেউ সঙ্গী হয়নি—বন্ধুরা ভয়ে পিছিয়ে গেছে, গ্রামের মানুষ বলেছে সে পাগল। কিন্তু অর্জুনের মনে ভয় থেকে বেশি তীব্র ছিল কৌতূহল আর প্রতিজ্ঞা—সে জানবেই সত্যি কী। পুকুরের ধারে এসে দাঁড়াতেই কেমন ঠাণ্ডা শিরশিরে হাওয়া তাকে আচ্ছন্ন করল, যেন অদৃশ্য কারও নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে লাগছে। অন্ধকার জলের ভেতরে কিছুই বোঝা যায় না, শুধু অস্থির ঢেউ একের পর এক ভাঙছে, যদিও বাতাস একদম থেমে আছে। অর্জুন ধীরে ধীরে পা ডুবিয়ে নেমে গেল, লণ্ঠনের আলো কেবল নিজের চারপাশে ছোট্ট বৃত্ত তৈরি করছে, আর তার বাইরে সব অন্ধকার গ্রাস করছে।

হঠাৎ করে জলের ওপর ভেসে উঠল ঘন কুয়াশা। যেন হাওয়ায় নয়, জল থেকেই উঠে আসছে ধোঁয়ার মতো ধূসর পর্দা। অর্জুন চোখ মেলেই টের পেল, কুয়াশার ভেতরে কিছু নড়ছে। সে বুঝতে চেষ্টা করল হয়তো কল্পনা, হয়তো ভয়ের ছায়া। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিষ্কার হতে শুরু করল এক অবয়ব। সাদা ভেজা কাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, লম্বা চুল কাদামাখা জলের মতো ঝরে পড়েছে কাঁধ থেকে। মুখটা অর্ধেক ঢাকা, তবু চোখ দুটো এমন শূন্য—যেন সেই চোখে কোনো প্রাণ নেই, কেবল অন্তহীন অন্ধকার। অর্জুন হঠাৎ গলা শুকিয়ে গেল, বুক কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারল, এ-ই মেঘলা। হরিদাসের বর্ণনা আর গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গল্প যেন জীবন্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। অবয়বটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, আর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জল ঘূর্ণির মতো নড়ে উঠছে। অর্জুন নড়তে চাইছে, কিন্তু শরীর যেন ভারী হয়ে গেছে। তার চোখ আটকে আছে সেই ফাঁকা দৃষ্টিতে। চারপাশের শব্দ থেমে গেছে, শুধু শোনা যাচ্ছে এক অদ্ভুত নিঃশ্বাসের শব্দ—যেন কেউ জলের নিচ থেকে উপরে উঠতে চাইছে কিন্তু বারবার ডুবে যাচ্ছে।

মুহূর্তের মধ্যে মেঘলার হাত উঠল, দীর্ঘ ও ভিজে আঙুলগুলো বাড়িয়ে দিল অর্জুনের দিকে। সেই হাতের শীতলতা যেন দূর থেকেও ছুঁয়ে ফেলল অর্জুনের বুক। সে পিছিয়ে যেতে চাইলো, কিন্তু জল হঠাৎ ভারী হয়ে টেনে নিচে নামাতে শুরু করল তাকে। পায়ের নিচের কাদা যেন শক্ত হয়ে আঁকড়ে ধরছে, আর উপরে ভেসে থাকা কুয়াশা তাকে আচ্ছন্ন করছে। মেঘলার চোখে তখন এক অদ্ভুত হাসি, অর্ধেক যন্ত্রণায় ভরা, অর্ধেক আকর্ষণে ভরা। অর্জুনের মাথা পানির নিচে নামতে শুরু করল, সে দম বন্ধ হয়ে আসছে। কানে শুধু জলের শব্দ আর ভেতরে হাহাকার—মনে হচ্ছে কেউ তাকে ফিসফিস করে বলছে, “এসো… আমার অপূর্ণ জীবন পূর্ণ করো…” হঠাৎ তার হাত দড়িতে লেগে গেল—যে দড়ি সে নিজের কোমরে বেঁধেছিল। শেষ শক্তি দিয়ে সে সেটা টানতে লাগল। কোথা থেকে যেন গ্রামের কুকুরের ডাক ভেসে এল, আর সঙ্গে সঙ্গেই অবয়বটা মিলিয়ে যেতে শুরু করল কুয়াশার ভেতরে। অর্জুন হঠাৎ জলে মাথা তুলল, হাপাতে হাপাতে লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় দেখল—পুকুর আবার আগের মতো শান্ত, যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু তার বুক ধড়ফড় করছে, শরীর ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে, আর মনে ভেসে আসছে সেই মুখ—শূন্য চোখ, ভেজা চুল, আর মৃত্যুর হাতছানি। সে জানল, মেঘলা সত্যিই আছে, আর এই রহস্য তাকে শেষ না করা পর্যন্ত পিছু ছাড়বে না।

আট

রাতের অন্ধকারে ভেজা শরীর নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে অর্জুন যখন ঘরে ফিরল, তখনও তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই মুখ—মেঘলা। ভয় নয়, বরং এক অদ্ভুত যন্ত্রণার ছাপ ছিল সেই অবয়বে। সাদা শাড়ির আঁচল ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে ছিল, ঠোঁট কাঁপছিল, অথচ কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। অর্জুন মনে মনে বুঝতে পারল—সে প্রতিহিংসাপরায়ণ কোনো দানব নয়। বরং এক আত্মা, যাকে জোর করে ধরে রাখা হয়েছে অদৃশ্য বাঁধনে। রাতভর অর্জুন ঘুমোতে পারল না। কানে যেন বারবার বাজছিল ফিসফিসে শব্দ—“আমায় ফিরিয়ে দাও…”। বুকের ভেতর ভয় আর সহানুভূতির দ্বন্দ্ব চলছিল, কিন্তু ক্রমে ভয়টা মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিচ্ছিল এক ধরনের দায়বোধ। সে অনুভব করল, মেঘলার এই অবরুদ্ধ অবস্থার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ভয়ংকর সত্য আছে, যা গ্রামবাসীরা চেপে রেখেছে।

পরদিন ভোরেই সে ছুটল বৃদ্ধ হরিদাসের কাছে। অর্জুনের প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে তিনি বললেন, “মেঘলা প্রতিশোধ নিতে আসেনি রে, ওর আত্মা শান্তি খুঁজছে। কিন্তু ওর মৃত্যুটা যেমন হঠাৎ হয়েছিল, তেমনি অন্যায়েও ভরা ছিল। জমিদার পরিবারের লোকেরা তাকে ব্যবহার করতে চাইত, কিন্তু মেঘলা রাজি হয়নি। সেই অপমান, সেই প্রতারণার ফলেই হয়তো এক রাতে হঠাৎ তাকে পুকুরের জলে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর পর থেকে তার আত্মা আটকে আছে—না যেতে পারছে, না ফিরতে পারছে। তাই তো সে প্রতিটি তরুণ প্রাণকে টেনে নিচ্ছে, যেন তার অপূর্ণতা ভরাট করতে।” বৃদ্ধের কথা শুনে অর্জুনের শরীর কেঁপে উঠল। কিন্তু এবার ভয় নয়, বরং সত্যিটা প্রকাশ করার অদম্য জেদ তাকে গ্রাস করল। সে বুঝল, যতদিন না মেঘলার ব্যথা সবাই জানবে, ততদিন এই অভিশাপ গ্রামের বুক থেকে সরবে না।

অর্জুনের সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট—সে ভয়ে থেমে যাবে না। সে জানল, সত্য প্রকাশ করলেই হয়তো মেঘলার আত্মা মুক্তি পাবে। কিন্তু কাজটা সহজ হবে না। গ্রামবাসীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমিদার পরিবারের ভয়ে মুখ বন্ধ রেখেছে। তবুও অর্জুন স্থির করল, মেঘলার আর্তি কেবল সে একা শুনে চুপ থাকতে পারবে না। তাকে সবার সামনে এই অন্যায়ের ইতিহাস তুলে ধরতেই হবে। রাতের আঁধারে পুকুরপাড়ে শোনা সেই নিঃশ্বাসের শব্দ যেন তার কানে এখনো বাজছিল। যেন মেঘলা নিজেই তাকে দায়িত্ব দিয়ে গেছে—“আমায় মুক্তি দাও।” অর্জুনের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শক্তি জেগে উঠল। ভয়, অভিশাপ আর কুসংস্কার—সবকিছুকে অমান্য করে সে প্রতিজ্ঞা করল, গ্রামে ফিরে আসবে সত্য, আর মেঘলা পাবে তার প্রাপ্য শান্তি।

নয়

অর্জুনের দৃঢ়তা আর হরিদাসের অভিজ্ঞতার মিলনে এক অদম্য অনুসন্ধান শুরু হয়। গ্রামজুড়ে আতঙ্ক আর গুজব ছড়িয়ে থাকলেও, দু’জন মানুষ দৃঢ় বিশ্বাসে খুঁজতে থাকে মেঘলার মৃত্যুর লুকোনো ইতিহাস। হরিদাস পুরোনো দলিলপত্র, জমিদার বাড়ির ধুলো জমা সিন্দুক, আর গ্রামের বয়স্কদের স্মৃতির টুকরো টুকরো গল্প একত্র করতে শুরু করে। সেই সবকিছুর ভেতরে মিলতে থাকে চিহ্ন—অন্যায়ের, লোভের, আর অবিচারের। জানা যায়, মেঘলার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল এক সাধারণ কৃষক পরিবারের ছেলের সঙ্গে, কিন্তু জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি তাকে নিজের করে নিতে চাইত। যখন মেঘলার পরিবার অস্বীকৃতি জানায়, তাদের উপর নানা অত্যাচার শুরু হয়। এক রাতে মেঘলাকে ঘরে থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং পরদিন ভোরে পাওয়া যায় তার দেহ পুকুরের জলে ভাসমান। দুর্ঘটনা বলে চাপা দেওয়া হয় ঘটনাটিকে, কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধরা জানত সত্যি, তবু ভয়ে মুখ খোলেনি কেউ। অর্জুনের চোখে এই ইতিহাস যেন আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে—তার বোন কমলার আতঙ্কিত মুখ আর মেঘলার আত্মার আর্তি তখন তাকে আরো দৃঢ় করে তোলে।

ধীরে ধীরে প্রমাণ জমতে থাকে। গ্রামের এক বৃদ্ধা মহিলার কাছে মেলে মেঘলার ব্যবহৃত একটি অলংকার, যেটি পুলিশি রিপোর্টে হারিয়ে গেছে বলে উল্লেখ ছিল। সেই অলংকারের ভেতরে খোদাই করা ছিল জমিদার পরিবারের নামের প্রথম অক্ষর, যা প্রমাণ করে দেয় মেঘলার মৃত্যু নিছক কাকতালীয় নয়। হরিদাস আর অর্জুন গোপনে রঘু সরকারের বাড়ির পুরোনো ঘরে ঢুকে পায় একটি চিঠি—যেখানে জমিদারের পূর্বপুরুষ স্বীকার করেছে, “আমাদের পাপ এই গ্রামকে ছাড়বে না।” এই প্রমাণ হাতে নিয়েই তারা গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়ায়। আতঙ্কে কাঁপতে থাকা মানুষ, যারা এতদিন ভয়ে চুপ করে ছিল, এবার সাহস সঞ্চয় করে একত্র হয়। পুকুরপাড়ে আয়োজন করা হয় এক সমাবেশ। সেখানে অর্জুন, কণ্ঠে ক্ষোভ আর চোখে আগুন নিয়ে, পুরো ঘটনার কাহিনি শোনায়। একে একে লোকজনও বলতে শুরু করে তারা কী দেখেছিল, কী শুনেছিল সেই সময়, যেগুলো তারা এতদিন চেপে রেখেছিল ভয়ে। ভিড়ের মাঝে রঘু সরকার তখন অস্বীকারের চেষ্টা করে, কিন্তু প্রমাণ আর গ্রামের ঐক্য তার মিথ্যেকে টিকতে দেয় না।

অবশেষে জমিদার পরিবারের লজ্জাজনক অতীত সবার সামনে প্রকাশিত হয়। রঘু সরকারের মুখোশ খুলে যায়—একসময় যে পরিবারকে সবাই ভক্তিভরে দেখত, আজ তারা অভিশাপের উৎস হিসেবে প্রমাণিত হয়। গ্রামের লোকেরা কাঁদতে কাঁদতে মেঘলার নাম উচ্চারণ করে, যেন তার আত্মাকে জানাচ্ছে, “আমরা দেরিতে হলেও তোমার সত্যিটা ফিরিয়ে আনলাম।” পুকুরপাড়ে তখন ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত শান্তির আবেশ, যেন দীর্ঘদিনের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাচ্ছে কারও আর্তি। অর্জুনের মনে হয়, সেদিন রাতে মেঘলার আত্মার চোখের শূন্যতার জায়গায় হয়তো দেখা দেবে প্রশান্তি। গ্রামের লোকজন আর ভয়ে নয়, সম্মিলিত শক্তিতে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করে—এখন থেকে কোনো সত্যকে তারা অন্ধকারে চাপা পড়তে দেবে না। আর অর্জুন বুঝতে পারে, তার জেদ আর সাহস কেবল মেঘলার আত্মাকেই নয়, পুরো গ্রামকেই মুক্ত করেছে দীর্ঘ অভিশাপ থেকে।

দশ

গ্রামের চারদিক জুড়ে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। সেদিন সকাল থেকেই মানুষজন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল মেঘলার আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ পূজার আয়োজন করতে। শ্মশানের ধারে, পুরোনো অশ্বত্থ গাছের তলায়, আর গ্রামের প্রাচীন মন্দিরের উঠোন মিলিয়ে তৈরি হলো এক পবিত্র আসন। চারদিকে প্রদীপের আলো, ধূপের গন্ধে ভারি হয়ে উঠল বাতাস, আর দূরে শোনা যাচ্ছিল শঙ্খধ্বনি। গ্রামের বৃদ্ধ থেকে কিশোর, নারী থেকে শিশু—সবার চোখে ছিল ভয় মিশ্রিত এক আশার ছাপ, যেন এ পূজার পর সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। অর্জুন নিজেকে প্রস্তুত করছিল এক অদ্ভুত দায়িত্বের জন্য। সে জানত, শুধু পূজা করলেই হবে না, তাকে আবারও সেই ভয়ঙ্কর জলাশয়ে নামতে হবে। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মনে পড়ছিল মেঘলার সেই ব্যথাভরা চোখের কথা, ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শের কথা, আর তার আর্তি—যেন কোনো এক অদৃশ্য দেয়ালে আটকে থাকা আত্মা মুক্তির জন্য আর্তনাদ করছে। গ্রামের লোকেরা মন্ত্রপাঠ আর অর্ঘ্য নিবেদন করতে করতে অর্জুনের পিঠে হাত রেখে আশীর্বাদ করল—“তুইই পারবি, অর্জুন। ওর শান্তি তোর হাতেই।”

মাঝরাত ঘনিয়ে এলে পূজার চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয়। শীতল বাতাস বইতে থাকে, পুকুরের চারপাশে যেন অদ্ভুত কুয়াশা নেমে আসে। অর্জুন সাহস করে জলে নামে। প্রথমে হাঁটু-জল, তারপর কোমর, আর শেষে বুক পর্যন্ত ডুবে যায় সে। হঠাৎই চারপাশের আলো যেন নিভে যায়, শুধু পূজার প্রদীপের ক্ষীণ আলো দূরে টিমটিম করে জ্বলতে থাকে। সেই অন্ধকার জলের মাঝে হঠাৎ এক অদ্ভুত আলো জেগে ওঠে। আলোটা ধীরে ধীরে আকার নেয়—চুল ভিজে কাদার মতো লেপ্টে থাকা, ভেজা সাদা কাপড়ে আবৃত, মুখে নিঃশব্দ যন্ত্রণার ছাপ—সে মেঘলা। অর্জুনের বুক কেঁপে ওঠে, কিন্তু এবার সে ভয় পায় না। মেঘলার চোখে আর রক্তের মতো লাল শূন্যতা নেই, বরং সেখানে ভেসে উঠেছে এক অদ্ভুত ক্লান্তি, এক দীর্ঘশ্বাসের ছায়া। ঠাণ্ডা হাত বাড়িয়ে সে এগিয়ে আসে অর্জুনের দিকে। অর্জুন শান্ত গলায় বলে ওঠে, “তোমার সত্য সবাই জানে, মেঘলা। তুমি আর বন্দি নও।” সেই মুহূর্তে জলের উপর ভেসে ওঠা আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর গ্রামের সবাই দূর থেকে দেখে—মেঘলার অবয়ব ধীরে ধীরে কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে যেন এক মুক্তির নিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে, প্রদীপের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর ভোরের আগমনী বার্তা শোনায়। গ্রামের মানুষ কান্না ভেজা চোখে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, “শেষ হলো… অভিশাপ ভাঙল।”

কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয় না। রাতের শেষ প্রহরে, যখন সবাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরছে, দূরে কোথাও জল থেকে ভেসে আসে এক অদ্ভুত শব্দ—মৃদু ফিসফিসের মতো, “জল ডাকছে…”। কারো কানে পরিষ্কার ভেসে ওঠে সেই আওয়াজ, আবার কারো মনে হয় এ শুধু বাতাসের খেলা। অর্জুন থেমে যায়, এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে ভয়, আবার ভেসে ওঠে প্রশ্ন—সত্যিই কি মেঘলা মুক্তি পেল? নাকি তার অভিশাপের শিকড় আরও গভীরে ছড়িয়ে গেছে? পুকুরপাড়ের অন্ধকারে যেন আবারও জমে ওঠে অজানা রহস্য, কুয়াশার ভেতরে মৃদু আলো-ছায়ার খেলা। গ্রামের লোকেরা আপাতত শান্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, অদৃশ্য এক শীতল স্রোত আবারও বুক কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। পূজার ধূপ-ধোঁয়া মিশে যায় কুয়াশার সঙ্গে, আর সেই রাতের অন্ধকার গ্রামকে শিখিয়ে দেয় এক কঠিন সত্য—অভিশাপ ভাঙলেও তার ছায়া হয়তো চিরকাল থেকে যাবে। ভোরের আলোয় গ্রাম যেন নতুন দিনে জেগে ওঠে, কিন্তু কোথাও এক অদৃশ্য প্রশ্ন ঝুলে থাকে—মুক্তি এল তো বটেই, কিন্তু তার মূল্য কী? আর জল কি সত্যিই চুপ করে রইল, নাকি তার ডাক আবারও একদিন প্রতিধ্বনিত হবে?

শেষ

1000056195.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *