অদিতি পাল
এক
রাতের গঙ্গা সবসময়ই অন্যরকম। দিনে যে ঘাটে ভিড় জমে, স্নান, পূজা, আরতির ভিড়ে যেখানকার সিঁড়িগুলো পর্যন্ত হারিয়ে যায় মানুষের ভিড়ে, রাত নামলেই সেই জায়গাটা যেন অন্য কোনো জগতে ঢুকে যায়। বাতাসে তখন থাকে কেবল জলের সোঁদা গন্ধ আর অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে কেবল রাতজাগা পাখির ডাক কিংবা দূরে ভেসে আসা কুকুরের হাহাকার ভাঙে সেই নীরবতা। এই গঙ্গার এক পুরোনো ঘাট নিয়ে ছোটো ছোটো কিশোর থেকে শুরু করে বুড়ো পাণ্ডারা পর্যন্ত বলাবলি করে—ওখানে নাকি মাঝরাতে কান্নার শব্দ শোনা যায়। লোকেরা বলে, সেই কান্না কোনো মানুষের নয়, কোনো বউয়ের আত্মা ওখানে কাঁদে। যার করুণ সুরেলা সিসকি শোনা যায়, কিন্তু উৎস দেখা যায় না। যে সাহস করে ওই কান্নার উৎসের খোঁজে যায়, তাকে আর কখনো পাওয়া যায় না। এই ঘাটের ধারে সন্ধ্যা নামলেই দোকানদাররা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়, সিঁড়িগুলো অন্ধকারে ডুবে যায়, আর নদীর জল যেন নিজের বুকের ভেতর কোনো গোপন কথা লুকিয়ে রাখে। মানুষের মনে আতঙ্ক এতটাই গভীর যে ভোরের আলো ফোটার আগে কেউ সেখানে পা দেয় না। এই অদ্ভুত কাহিনি অনেক দিন ধরেই ছড়িয়ে আছে, কিন্তু সম্প্রতি কয়েকজন যুবকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এই গুজবকে আরও ভৌতিক করে তুলেছে।
অর্পণ দত্ত, বয়স ঊনত্রিশ, কলকাতার এক স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিক। তার বিশেষ দক্ষতা হলো অদ্ভুত, রহস্যময়, কিংবা অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে লেখা। পাঠকের কাছে এই ধরণের রিপোর্টের জন্য তার বেশ নামডাকও আছে। গঙ্গার ঘাটের এই কান্নার খবর কানে আসতেই অর্পণ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, এখানে কিছু একটা আছে যা খোলসা করা দরকার। সে জানে, এ ধরণের কাহিনি সাধারণত হয়তো গ্রামীণ কুসংস্কার, অথবা কোনো অন্ধকারে প্রতিধ্বনির খেলা। কিন্তু অর্পণ বিশ্বাস করে না যতক্ষণ না সে নিজে চোখে দেখে, কানে শোনে। তাই এক অন্ধকার রাতে টর্চ, ক্যামেরা আর নোটবুক হাতে সে এসে দাঁড়াল পুরোনো ঘাটের সিঁড়ির ওপর। চারপাশ নিস্তব্ধ, দূরের আকাশে তখন আধো চাঁদের আলো ঝলমল করছে। নদীর জল অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে আছে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি সেটাকে শাসন করছে। অর্পণ গভীর নিশ্বাস নিল। এই নীরবতায় দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল—পৃথিবীর বাকি সব শব্দ যেন হারিয়ে গেছে, কেবল আছে এক অদৃশ্য অপেক্ষা।
এই অপেক্ষারই শেষ হলো অদ্ভুতভাবে। হঠাৎ যেন বুকের ভেতর দিয়ে ঠাণ্ডা শীতল স্রোত বয়ে গেল—অর্পণ স্পষ্ট শুনতে পেল কান্নার শব্দ। প্রথমে মনে হলো হয়তো কোনো মহিলা দূরে বসে কাঁদছে, কিন্তু অচিরেই সে বুঝল, এ কান্না সাধারণ নয়। এত সুরেলা, এত দীর্ঘশ্বাসমাখা, এতটা করুণ আর অদ্ভুত সিসকি সে জীবনে শোনেনি। শব্দটা ভেসে আসছে সরাসরি জলসিঁড়ির গা ঘেঁষে, যেন জলের বুক থেকে উঠছে। শব্দে এক অদ্ভুত টান আছে, যা শুনে মনে হয় যে কেউ হাঁটতে হাঁটতে সেই দিকে চলে যাবে। অর্পণ শিউরে উঠল। তার টর্চের আলো কাঁপতে লাগল হাতের মধ্যে। ঘাটের সিঁড়ি তখন ফাঁকা, শুধু আর্দ্র পাথরের গায়ে শিশির জমে চকচক করছে। কিন্তু চারপাশে কেউ নেই। তবু সেই কান্নার প্রতিধ্বনি আরও জোরালো হতে লাগল, যেন অদৃশ্য এক ডাকে কেউ অর্পণকে টেনে নিচ্ছে। সে বুঝতে পারল—এ রহস্য সাধারণ নয়। ভেতরে ভেতরে তার সাংবাদিক কৌতূহল বেড়ে গেল, কিন্তু শরীরজুড়ে ভয় জমতে লাগল। সেই রাতে প্রথমবার ঘাটে দাঁড়িয়ে অর্পণ উপলব্ধি করল—গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু অদৃশ্য জগতের উপস্থিতি যখন এত স্পষ্টভাবে কান্নার সুরে প্রকাশ পায়, তখন মানবমন নিজে থেকেই এক অজানা আতঙ্কের শিকার হয়ে যায়। অর্পণ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নোটবুকে লিখল—“এখানে কিছু আছে, যা মানুষের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।”
দুই
ঘটনার পরদিন অর্পণ শহরের কাছাকাছি একটি পুরোনো লাইব্রেরিতে গেল, যেখানে অনেক পুরোনো দলিলপত্র আর গ্রামসংস্কৃতি নিয়ে বই মজুত আছে। সাংবাদিক হিসেবে সে জানে, এই ধরণের কাহিনি বোঝার জন্য শুধু অভিজ্ঞতা নয়, ইতিহাসও জরুরি। লাইব্রেরির ভেতরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে ফালি ফালি হয়ে, আর চারপাশে ধুলোমাখা তাকগুলোতে ভরতি মোটা মোটা বই। এখানেই তার সঙ্গে দেখা হলো মৌরি সেনের। বয়স চব্বিশের কাছাকাছি, শান্ত স্বভাবের মেয়েটির চোখে একটা অদ্ভুত গভীরতা আছে, যেন অনেক কিছু দেখেও না-বলার অভ্যেস। অর্পণ প্রথমে তাকে সাধারণ কর্মচারী ভেবেছিল, কিন্তু কয়েক মিনিটের কথাতেই বুঝতে পারল—মৌরির গলা কাঁপলেও কথাগুলো তার মনের গভীর থেকে আসছে। অর্পণ গঙ্গার ঘাটের রহস্য নিয়ে প্রশ্ন করতেই মেয়েটি থমকে দাঁড়াল। চোখের কোণে হালকা আতঙ্ক, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু দৃষ্টি যেন অনেক দূরে কোথাও চলে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে মৌরি বলল—“আমি ছোটবেলা থেকে সেই কান্না শুনে আসছি। তুমি যা শুনেছ, ওটা মিথ্যে নয়।”
অর্পণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল তার দিকে। একজন স্থানীয় মানুষ, বিশেষত এত তরুণী মেয়ে, এতটা ভয়ে ভরা কণ্ঠে স্বীকার করছে বিষয়টা, তা সহজ নয়। মৌরি জানাল—তার বাড়ি ঘাটের কাছেই। অনেক রাতে, হাওয়ার ফাঁক দিয়ে যখন ঘাট থেকে ভেসে আসে হাহাকার, তখন সে শিউরে উঠে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরত। পরিবারের লোকজন সবসময় তাকে বলত—“ওসব কিছু না, শুধু বাতাসের খেলা।” কিন্তু সে স্পষ্ট শুনত কাঁদতে থাকা এক মহিলার টানা সিসকি। গ্রামের অনেকেই শুনেছে, কিন্তু মুখে স্বীকার করে না, কারণ ভয় আর কুসংস্কারকে তারা লুকিয়ে রাখতে অভ্যস্ত। মৌরি একবার স্কুল থেকে ফিরছিল সন্ধ্যার পর, তখন স্পষ্ট দেখেছিল ঘাটের ধারে সাদা শাড়ি পরা এক অবয়ব। মুখ দেখা যায়নি, কিন্তু জলভেজা কেশ থেকে ঝরে পড়া বিন্দুগুলো সে চোখে দেখেছিল। সেই দিন থেকেই সে জানত—এটা কোনো কল্পনা নয়। তাই অর্পণের প্রশ্নে সে আর এড়িয়ে যেতে পারল না। সে বলল—“যারা কান্নার উৎস খুঁজতে গিয়েছিল, তারা আর ফেরেনি। তুমি যদি যেতে চাও, ভেবেচিন্তে যেও।”
অর্পণ প্রথমে হাসল। সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সে এমন কুসংস্কার অনেক দেখেছে। তার যুক্তি—প্রতিধ্বনি, বাতাস, আর মানুষের ভয় মিলে এইসব অলৌকিক গল্প তৈরি করে। কিন্তু মৌরির চোখের দিকে তাকিয়ে সে দ্বিধায় পড়ল। সেখানে কোনো গল্প নেই, আছে নিখাদ আতঙ্ক আর দীর্ঘদিন ধরে লালিত অভিজ্ঞতার সত্যতা। মৌরি বুঝতে পারছিল অর্পণ তার সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাই সে দৃঢ় গলায় বলল—“ভূতের গল্প বলে যদি উড়িয়ে দাও, করো। কিন্তু মনে রেখো, ওই কান্না ডাক নয়, ফাঁদ। তোমাকে টেনে নিয়ে যাবে।” এই কথাগুলো অর্পণের মনে কাঁপন ধরাল। বাইরে বৃষ্টির হালকা শব্দ, ভেতরে অন্ধকার লাইব্রেরির ভারী নীরবতা—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল। সে নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত টান অনুভব করল—একদিকে কৌতূহল তাকে এগিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে মৌরির ভয়াবহ সতর্কবার্তা তাকে টেনে ধরছে। অবশেষে সে নিজের নোটবুকে লিখল—“কুসংস্কার হোক বা সত্যি, খুঁজে বের করতেই হবে।” আর মৌরি নিঃশব্দে জানাল—“তুমি যদি যাও, আমি তোমার সঙ্গে যাব। কারণ ওই কান্নার গল্প আমি শুরু থেকে শুনে আসছি, আর জানি—তুমি একা গেলে হয়তো আর ফিরবে না।”
তিন
অর্পণ আর মৌরি দু’জনে মিলে স্থানীয় কিছু প্রবীণ মানুষের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করল। কারণ এই ধরনের ভৌতিক কাহিনি সাধারণত গ্রামের প্রবীণদের কাছেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে টিকে থাকে। ঘাটের ধারের অল্প কিছু দূরে থাকেন হরিদাস পাল—বয়স পঁয়ষট্টির কাছাকাছি, শুকনো গায়ের রঙ, লম্বা সাদা দাড়ি, সর্বদা গেরুয়া কাপড়ে মোড়া। পেশায় তিনি ঘাটের পাণ্ডা, দিনে পূজা করান, কিন্তু রাত নামলেই যেন উধাও হয়ে যান। অর্পণ যখন মৌরিকে নিয়ে তার কাছে হাজির হলো, তখন তিনি একটা পুরোনো হুক্কা টানছিলেন, চোখ আধবোজা। অর্পণ প্রশ্ন করতেই তিনি প্রথমে কিছু বলতে চাইছিলেন না। কিন্তু অর্পণের অদম্য জেদ আর মৌরির সঙ্গত উপস্থিতিতে ধীরে ধীরে তার মন খুলতে লাগল। হরিদাসের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত গম্ভীরতা—যেন তিনি কোনো ভারী ইতিহাসকে আবার সামনে টেনে আনছেন। তিনি বললেন, “আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে এই ঘাটেই ঘটেছিল একটা অমানবিক ঘটনা। আর সেই ঘটনার রেশ আজও কাটেনি।” অর্পণ নোটবুক খুলে মন দিয়ে লিখতে শুরু করল, কারণ সে বুঝেছিল, এখানেই লুকিয়ে আছে সত্যের প্রথম সূত্র।
হরিদাস গল্প শুরু করলেন ধীরে ধীরে। একসময় এই অঞ্চলের একজন ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে বিয়ে করেছিল এক অতি সুন্দরী মেয়ে, নাম হিরণ্ময়ী। গ্রামের মানুষ বলত, হিরণ্ময়ীর মতো সুন্দরী আর ভদ্র বউ তারা আগে দেখেনি। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্বামী ছিল প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ, মদে আসক্ত, আর স্বভাবেও নিষ্ঠুর। কোনো কারণে তার মনে হয়েছিল, হিরণ্ময়ী নাকি অবিশ্বাসী। আসলেই এমন কিছু হয়েছিল কি না কেউ জানে না, তবে স্বামী একদিন রাত্রির অন্ধকারে স্ত্রীকে নিয়ে এই ঘাটে আসে। বলে, গঙ্গার সামনে প্রতিজ্ঞা করতে হবে। মেয়েটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে জলে ঠেলে ডুবিয়ে দেয়। কেউ জানত না, কারণ রাতের অন্ধকারে চারপাশ নিস্তব্ধ ছিল। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগে কয়েকজন নৌকোওয়ালা জলসিঁড়ির কাছে ভেসে আসা লাশটা দেখতে পায়। লোকজন বুঝেছিল, স্বামীই খুন করেছে, কিন্তু সে সময় প্রমাণ ছিল না, আর ধনী পরিবার বলে চাপা পড়ে যায় সবকিছু। কিন্তু হিরণ্ময়ীর আত্মা শান্তি পায়নি। সেই দিন থেকেই ঘাটে শোনা যেতে থাকে তার করুণ কান্না। অনেকে বলে, সে বসে থাকে পাথরের সিঁড়িতে, ভেজা চুল গড়িয়ে পড়ে জলে, সাদা শাড়ি শরীরে লেপ্টে থাকে, আর সে কাঁদতে থাকে রাতভর। যাদের চোখে সে ধরা দেয়, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসে না। যেন তার বেদনা ভাগ করে নিতে গিয়ে তারা টেনে যায় অন্ধকারের তলদেশে।
অর্পণ শিউরে উঠল গল্প শুনে। হরিদাস থেমে গিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন, চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক আর অসহায়তা। তিনি বললেন, “বাবু, আমি নিজের কানে সেই কান্না শুনেছি বহুবার। দিনের বেলা আমি পূজা করি, কিন্তু রাত নামলেই আমি ঘাটের দিকে যাই না। তুমি যদি সাংবাদিক হিসেবে সাহস দেখাতে চাও, দাও। কিন্তু মনে রেখো—ওর ডাক মানে মৃত্যু।” মৌরি পাশে বসে কাঁপছিল। তার চোখে অর্পণ স্পষ্ট দেখতে পেল আতঙ্কের ছায়া, কারণ সে জানত, হরিদাস যা বলছেন, তাতে কোনো অতিরঞ্জন নেই। অর্পণের মাথার ভেতর তখন দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে। সাংবাদিক হিসেবে সে জানে, এ রকম কাহিনি উড়িয়ে দিলে চলবে না; আবার এটাও বুঝছে, বিষয়টা সাধারণ নয়। হরিদাসের সতর্কবার্তায় একপ্রকার অদৃশ্য চাপ তৈরি হলো তার ভেতরে। কিন্তু সেই চাপের সঙ্গেই বেড়ে চলল এক অদম্য কৌতূহল—সত্যিই কি কোনো আত্মা কান্না করে সিঁড়ির ধারে? নাকি মানুষের ভয়ের ফাঁদে গড়ে ওঠা আরেকটা লোককথা? উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই। আর সেই উত্তর পেতেই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে ভয়াল ঘাটের দিকে, যদিও জানে—এ পথে বিপদ আসবেই।
চার
গঙ্গার ঘাটের কাহিনি অর্পণকে ক্রমশ গ্রাস করছিল, কিন্তু এরই মধ্যে এমন এক ঘটনা ঘটল, যা পুরো গ্রামকে নতুন করে আতঙ্কিত করে তুলল। স্থানীয় কয়েকজন যুবকের মধ্যে প্রায়ই গল্প হয়—“আত্মা বলে কিছু নেই”, “সবই ভাঁওতা”, ইত্যাদি। তাদের মধ্যে জয়দেব নামের এক দুঃসাহসী ছেলে ছিল, বয়স মাত্র বাইশ, ভীষণ চঞ্চল স্বভাব, আর সবসময় প্রমাণ দিতে চাইত যে ভয় পেলে মানুষ নিজেকেই বোকা বানায়। এক রাতে সে বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরল—“আজ আমি সেই কান্নার উৎস খুঁজে বের করব। দেখবে, ভূতটুত বলে কিছু নেই।” বন্ধুরা প্রথমে থামানোর চেষ্টা করলেও জয়দেবের জেদের কাছে কেউ টিকতে পারল না। অন্ধকার রাত, আকাশে মেঘ ভেসে যাচ্ছে, ঘাটজুড়ে নিস্তব্ধতা, শুধু মাঝে মাঝে শালিকের ডানার শব্দ। জয়দেব হাতে একটা টর্চ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল। বন্ধুরা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল, তাদের বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছিল। হঠাৎই সেই বহুল আলোচিত কান্নার শব্দ ভেসে এলো—টানা, সুরেলা, কিন্তু ভীষণ বেদনাময়। জয়দেব থেমে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য, তারপর টর্চ উঁচিয়ে এগোল শব্দের দিকে। কয়েক মুহূর্ত পর ঘাটজুড়ে এক হৃদয়বিদারক চিৎকার ছড়িয়ে পড়ল। বন্ধুরা দৌড়ে গিয়ে দেখল—সিঁড়ির ধারে শুধু পড়ে আছে জয়দেবের টর্চ, কিন্তু ছেলেটার কোনো হদিস নেই।
ঘটনাটা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল গোটা গ্রামে। আতঙ্কে গ্রামবাসী ভোর হওয়ার আগেই বাড়ির দরজা জানালা বন্ধ করে দিল। কেউ কাছে গেল না, শুধু সকালের আলো ফুটতেই কয়েকজন সাহসী মানুষ মিলে পুলিশে খবর দিল। থানার দায়িত্বে তখন ছিলেন অফিসার অনির্বাণ চৌধুরী—চৌত্রিশ বছরের অভিজ্ঞ পুলিশকর্মী, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, দৃঢ় কণ্ঠ, এবং অদ্ভুতভাবে আত্মবিশ্বাসী। তিনি সব শুনে হেসে বললেন, “ভূত-টুত কিছু নেই। ভয় পেলে মানুষ অনেক কিছু কল্পনা করে। ও হয়তো জলে পড়ে গেছে, অথবা পালিয়েছে।” তার যুক্তি ছিল একেবারেই বাস্তবমুখী। তিনি মনে করলেন, হয়তো জয়দেব কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং ভয়ঙ্কর কাহিনিকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাই তদন্তের দায়িত্ব তিনি নিজেই হাতে নিলেন। পরের দিন সকালে ঘাটে গিয়ে তিনি তদন্ত শুরু করলেন। সিঁড়ির ধারে টর্চ পড়ে ছিল, মাটিতে কিছু আঁচড়ের দাগও দেখা গেল, যেন কেউ জোর করে টেনে নিয়ে গেছে। অনির্বাণ সব কাগজপত্রে নোট নিচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁর মুখে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট ছিল। তাঁর কথা—“এ সব মানুষের বানানো ভয়। ভয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে কেউ।”
গ্রামবাসী কিন্তু এত সহজে বিশ্বাস করতে পারল না। তারা সবাই জানত, এর আগেও বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছে একইভাবে। কিন্তু পুলিশের হাতে প্রমাণ নেই, আর অনির্বাণের যুক্তি জোরালো। তবুও একটা অদ্ভুত চাপা ভয় চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। রাত নামলেই মানুষ দরজা বন্ধ করে রাখে, কারও সাহস হয় না নদীর ধারে যেতে। মৌরি সব শুনে শিউরে উঠল। সে অর্পণকে বলল, “দেখেছ? আমি তো বলেছিলাম, যে অনুসরণ করে, সে আর ফেরে না।” অর্পণের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সাংবাদিক হিসেবে সে জানত, এই ঘটনা শুধু লোককথা নয়, সত্যিকার তদন্তেরও দাবি রাখে। অন্যদিকে অফিসার অনির্বাণ দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করলেন, “আমি একে গুজব প্রমাণ করব।” তাঁর চোখে ছিল চ্যালেঞ্জের আগুন, আর গলায় দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধরা মাথা নেড়ে শুধু বলল—“ওর ডাক মানে মৃত্যু। সেটা যারা মানেনি, তারাই হারিয়ে গেছে।” অনির্বাণ শোনার ভান করলেন না। তিনি জানতেন, সামনে দীর্ঘ তদন্তের রাস্তা রয়েছে, আর এই কেসই প্রমাণ করবে—অলৌকিক বলে কিছু নেই, সবই মানুষের ভয় আর কুসংস্কারের ফসল। কিন্তু গ্রামবাসীর কণ্ঠে জমে থাকা আতঙ্ক যেন বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল। রাতের অন্ধকারে সেই ভয় আবার জীবন্ত হয়ে ফিরে আসবে, তা প্রত্যেকেই মনের ভেতর বুঝতে পারছিল।
পাঁচ
ঘাটের অদ্ভুত নিখোঁজ ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল স্থানীয় পত্রিকায়, আর অর্পণ সেই রিপোর্ট লিখতে বসেছিল গভীর মনোযোগ নিয়ে। কলমের ডগায় যেন ভয়, রহস্য আর এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছায়া ঘুরছিল। রিপোর্টে সে উল্লেখ করল গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, হরিদাস পাণ্ডার সতর্কবাণী, আর জয়দেবের হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ভীতিকর বাস্তবতা। লিখতে লিখতে অর্পণের মনে হচ্ছিল, এই কাহিনি নিছক কোনো অলীক কল্পনা নয়—এখানে লুকিয়ে আছে এক গভীর রহস্য, হয়তো অপরাধ, হয়তো অতিপ্রাকৃত। পরদিন সকালে যখন সে থানায় গিয়ে অফিসার অনির্বাণকে কপি দেখাল, তখনই শুরু হলো তাদের প্রথম তর্ক। অনির্বাণ ফাইলটা হাতে নিয়ে পড়লেন, তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, “মিস্টার দত্ত, আপনি সাংবাদিক, যুক্তি দিয়ে ভাবুন। একটা ছেলে রাতে বাজি ধরে ঘাটে নামল, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। হয়তো সে নদীতে পড়ে গেছে, হয়তো জেনে-শুনে পালিয়েছে। এখন এটাকে ভূত-টুতের গল্প বানানো মানে মানুষের ভয়কে আরও বাড়ানো। আমি চাই না আমার এলাকায় অযথা গুজব ছড়াক।” অর্পণ প্রতিবাদ করল, “কিন্তু স্যার, এভাবে হঠাৎ মানুষ হারিয়ে যেতে পারে না। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে তারা শুধু টর্চ পড়ে থাকতে দেখেছে, আর চারপাশে ছিল শূন্য। তাহলে চিৎকারের পর কোথায় গেল জয়দেব?” অনির্বাণ ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিলেন, “চিৎকার মানেই যে ভূত টেনে নিয়ে গেল, তা প্রমাণিত নয়। সাংবাদিক হিসেবে আপনার কাজ তথ্য প্রকাশ করা, আতঙ্ক ছড়ানো নয়।”
তর্ক বাড়তে থাকল ধীরে ধীরে। অনির্বাণের যুক্তি ছিল যুক্তিপূর্ণ, কিন্তু তার মধ্যে একটা কঠোর অবিশ্বাস কাজ করছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, অতিপ্রাকৃত বলে কিছু নেই, আর থাকলেও সেটা পুলিশের কেস নয়। অপরাধ, ষড়যন্ত্র, কিংবা দুর্ঘটনা—এর বাইরে কিছু ভাবতেই রাজি ছিলেন না তিনি। অন্যদিকে অর্পণ ছিল কৌতূহলী আর অস্থির; তার মনে হচ্ছিল, শুধু যুক্তি দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। হরিদাসের কথা, মৌরির ভয়ের অভিজ্ঞতা, আর স্থানীয় মানুষের আতঙ্ক—এসব কেবল কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। থানার চেয়ারে বসে থাকা অনির্বাণ যখন আবারও বললেন, “আমি নিজে রাতে গিয়ে প্রমাণ করব, সেখানে ভূত বলে কিছু নেই,” তখন অর্পণ উত্তপ্ত হয়ে বলল, “তাহলে আমিও থাকব সঙ্গে। আমার পাঠকদের জানার অধিকার আছে। সত্যকে ঢেকে রাখা যাবে না।” অনির্বাণ ঠান্ডা হাসি হেসে উত্তর দিলেন, “আপনি সাংবাদিক, আইনরক্ষক নন। অতিরিক্ত কৌতূহল অনেক সময় সর্বনাশ ডেকে আনে।” এই কথায় অর্পণের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সাংবাদিকতা তার কাছে শুধু পেশা নয়, সত্যকে তুলে ধরার দায়িত্ব। সে জানত, প্রমাণ ছাড়া কোনো রিপোর্ট যথার্থতা পায় না। তাই সে মনে মনে স্থির করল, যেভাবেই হোক প্রমাণ সে সংগ্রহ করবেই, এমনকি তার জন্য নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও ফেলতে হলে।
অর্পণ থানার দপ্তর থেকে বেরিয়ে আসার পর সরাসরি গেল মৌরির কাছে। লাইব্রেরির নিস্তব্ধ কোণায় বসে মৌরি তখন চুপচাপ বই সাজাচ্ছিল। অর্পণ সব খুলে বলতেই মৌরির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে বলল, “তুমি বুঝছ না অর্পণ, এসব খোঁজার মধ্যে ভয়ানক বিপদ আছে। আমি ছোটবেলা থেকে ওই কান্নার শব্দ শুনে আসছি। আমি জানি, যে এর কাছে যায়, সে আর ফেরে না। পুলিশ হয়তো বিশ্বাস করবে না, কিন্তু আমি জানি এই অভিশপ্ত সিঁড়ি রক্ত চায়। তুমি যদি ওতে জড়িয়ে পড়ো, তোমারও ক্ষতি হতে পারে।” মৌরির কণ্ঠে ছিল আতঙ্কের ছাপ, চোখে সত্যিকারের উদ্বেগ। কিন্তু অর্পণের চোখে তখন জ্বলছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে শান্ত গলায় উত্তর দিল, “তুমি হয়তো ঠিক বলছ, মৌরি। কিন্তু আমার দায়িত্ব ভিন্ন। আমি যতক্ষণ না সত্যকে প্রমাণসহ পাঠকের সামনে আনতে পারছি, ততক্ষণ থামব না। হয়তো এর পেছনে অপরাধী আছে, হয়তো সত্যিই কোনো অজানা শক্তি কাজ করছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া শুধু ভয়ে পিছিয়ে গেলে আমার সাংবাদিকতা অর্থহীন হয়ে যাবে।” মৌরি হালকা কাঁপা কণ্ঠে আবার বলল, “তুমি যত গভীরে যাবে, তত অন্ধকার তোমাকে ঘিরে ধরবে। দয়া করে সাবধানে থেকো।” অর্পণ তার কথার গুরুত্ব বুঝলেও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকল। সে জানত, সামনে আছে বিপজ্জনক পথ, কিন্তু সেই পথেই লুকিয়ে আছে এমন এক সত্য, যা প্রকাশ পেলে হয়তো চিরদিনের জন্য বদলে যাবে এই গঙ্গার ঘাট আর তার ভয়ঙ্কর ইতিহাস।
ছয়
রাত তখন গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে, গঙ্গার পাড় জুড়ে অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই ঘাট যেন এক অচেনা দুনিয়া, যেখানে সময়ের গতি থেমে গেছে। আকাশে মেঘ ভেসে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কুকুরের ডাকে শিউরে উঠছে নীরবতা, আর গঙ্গার কালো জলে প্রতিফলিত হচ্ছে ভাঙা চাঁদের আলো। অর্পণ হাতে টর্চ আর কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরা নিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো জলসিঁড়ির মাথায়। চারপাশে কোনো মানুষ নেই, কেবল বাতাসে ভেসে আসছে গঙ্গার কাদামাটির গন্ধ। সাংবাদিক হিসেবে তার জীবনে বহু রহস্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু আজকের রাত যেন অন্যরকম—এখানে ভয়ের সঙ্গে এক অদৃশ্য আকর্ষণও কাজ করছে। সে এক মুহূর্তের জন্য থমকালো, মনে হলো মৌরির সতর্কবাণী যেন কানে বাজছে—“তুমি যত গভীরে যাবে, তত বিপদ।” কিন্তু নিজের কৌতূহল আর দায়িত্ব তাকে থামাতে পারল না। টর্চটা জ্বেলে অর্পণ ধীরে ধীরে নামতে শুরু করল সিঁড়ির দিকে, প্রতিটি পদক্ষেপে অদ্ভুত ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ছিল বাতাসে। হঠাৎই কোথা থেকে যেন ভেসে এলো সেই বহুল আলোচিত কান্নার শব্দ। সেটা কোনো সাধারণ কান্না নয়—মায়াময়, দীর্ঘশ্বাসে ভরা, যেন বুক ভেঙে যাওয়া এক নববধূর চিৎকার চেপে রাখা বেদনাময় সুর। শব্দটা যত এগোচ্ছে, তত যেন সিঁড়ি কাঁপছে, গঙ্গার জলও কাঁপুনি ধরেছে। অর্পণের হাত কেঁপে উঠলেও ক্যামেরার শাটার ক্লিক করে উঠল, সে চাইছিল যেকোনোভাবে সেই মুহূর্তের প্রমাণ ধরে রাখতে।
কান্নার শব্দ এবার যেন আরও কাছে এল। সিঁড়ির নিচ থেকে উঠে আসছে শব্দ, আবার মনে হচ্ছে গঙ্গার বুক থেকেও ভেসে আসছে। অর্পণ নিচে নামতে থাকল, হৃদস্পন্দন বুকে ক্রমশ জোরে বাজছে। তার কানে শব্দটা এখন প্রায় ফিসফিসের মতো—এক নারীর দীর্ঘ কান্না, যেটা কখনও শোক, কখনও আহ্বান। সে চারপাশে আলো ফেলল, কিন্তু কিছুই নেই, শুধু কুয়াশায় ঢাকা ভেজা সিঁড়ি আর গঙ্গার ঘোলা জল। সেই মুহূর্তে টর্চের আলো হঠাৎ ঝিমিয়ে এলো, কয়েক সেকেন্ড পর নিভে গেল সম্পূর্ণ। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এলো, কেবল দূরের জলে চাঁদের আলো কাঁপছিল। অর্পণের বুকের ভেতর শীতল আতঙ্ক চেপে ধরল, হাতড়াতে লাগল টর্চ আবার জ্বালানোর জন্য। কিন্তু তার আগেই সে টের পেল, আশেপাশের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে গেছে, যেন শীতলতার বরফ তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক তখনই তার কাঁধে টের পেল এক বরফ-ঠান্ডা হাতের স্পর্শ। সেই স্পর্শে রক্ত হিম হয়ে এলো তার, বুকের ভেতর চিৎকার আটকে গেল। মনে হলো, এই হাত কোনো জীবিত মানুষের নয়, এর মধ্যে আছে অন্যরকম এক শক্তি—অদৃশ্য অথচ ভীষণ বাস্তব। তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল প্রতিটি মুহূর্ত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অজানার দিকে।
অর্পণের ভেতরে তখন ভয় আর কৌতূহল একসঙ্গে লড়াই করছে। সে জানে, হয়তো এটাই সেই মুহূর্ত যার প্রমাণ তাকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। কাঁধে রাখা ঠান্ডা হাত যেন ধীরে ধীরে তার শরীরের ভেতর প্রবেশ করছে, সেই স্পর্শে ভেসে আসছে হাজারো ফিসফিসানি—অশ্রুত শব্দ, যেগুলো মানুষের ভাষা নয়, তবুও বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ করেই বাতাসে ভেসে উঠল করুণ এক আর্তনাদ, যেন কেউ বুক ফেটে কান্না করছে। অর্পণ টলতে টলতে একপাশে সরে গেল, কিন্তু সেই ঠান্ডা হাত তার কাঁধ থেকে সরল না। হঠাৎ মনে হলো, গঙ্গার জল থেকে এক ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে উঠে আসছে—অস্পষ্ট, আধো আলোতে ভিজে থাকা, কিন্তু নারী আকৃতির। মূর্তির লম্বা চুল ভেসে যাচ্ছে বাতাসে, চোখদুটো যেন অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলজ্বল করছে এক অচেনা দুঃখে। অর্পণ ক্যামেরার শাটার চাপল কাঁপতে কাঁপতে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ফ্ল্যাশ হঠাৎ নিভে গেল, ক্যামেরাও কাজ করা বন্ধ করে দিল। মনে হলো, অদৃশ্য কোনো শক্তি প্রযুক্তিকে অচল করে দিয়েছে। এখন আর কোনো সুরক্ষা তার হাতে নেই, শুধু বুক কাঁপানো ভয়, আর সেই মূর্তির ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা। অর্পণ তখন বুঝল, সে হয়তো সত্যের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে, কিন্তু সেই সত্য তাকে গ্রাসও করে নিতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—সে কি আজ ফিরে যাবে, নাকি জয়দেবের মতো চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাবে এই অভিশপ্ত জলসিঁড়ির ডাকের ভেতরে?
সাত
অন্ধকারে ডুবে থাকা ঘাটের বুকের ওপর হঠাৎ যেন জমে উঠল জমাট নীরবতা। বাতাসের শব্দ থেমে গেল, গঙ্গার জলও অস্বাভাবিকভাবে স্থির হয়ে পড়ল, কেবল অর্পণের কাঁধে চাপা সেই বরফশীতল স্পর্শ আরও ভারী হয়ে উঠল। তার চোখ টান টান হয়ে ছিল, টর্চ ও ক্যামেরা নিভে যাওয়ার পর সে চারপাশে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে কুয়াশার আবরণের ফাঁক দিয়ে ফুটে উঠতে লাগল এক অবয়ব—প্রথমে ছায়ার মতো, তারপর ক্রমশ পরিষ্কার। অর্পণের নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল। ঘাটের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা, সাদা শাড়িতে ঢাকা, পুরো শরীর ভিজে টপটপ করছে, যেন সদ্য গঙ্গার বুক থেকে উঠে এসেছে। তার লম্বা ভিজে চুল ঝরে পড়ছে কাঁধ থেকে, কিন্তু মুখ ঢাকা রয়ে গেছে—কখনো শাড়ির আঁচলে, কখনো ছায়ায়। অর্পণ বুঝতে পারছিল না, এই অবয়ব বাস্তব নাকি কল্পনা, কিন্তু চোখ ফেরাতেও পারছিল না। মহিলাটি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল, মাথা নিচু করে বুক ভেঙে দেওয়া কান্না করতে করতে। সেই কান্নার সুর অর্পণের বুকের গভীরে বাজতে লাগল, যেন কেউ শতাব্দী ধরে তার কাছে বিচার চাইছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল অর্পণের, শরীরের প্রতিটি শিরায় ছড়িয়ে পড়ল অবশ শীতলতা। সে এক মুহূর্তের জন্য টলমল করে দাঁড়িয়ে রইল, মনে হচ্ছিল—এই কান্নার স্রোতে সে নিজেই ভেসে যাবে।
মহিলার পদক্ষেপ থামল অর্পণের সামনে। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলল, কিন্তু শাড়ির আঁচল আর ভিজে চুলের ফাঁক দিয়ে চোখ দুটোই শুধু দেখা গেল—কৃষ্ণশূন্য, অথচ ভেতরে জ্বলছে দগ্ধ দুঃখের আগুন। অর্পণের মনে হলো, সে তাকিয়ে আছে এমন এক আত্মার চোখে, যে জীবিত অবস্থায় ন্যায়বিচার পায়নি। মহিলাটি হাত তুলল, তার ঠান্ডা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে অর্পণের হাতের দিকে এগোতে লাগল, যেন তাকে টেনে নিতে চাইছে অজানা গভীরে। অর্পণ জানত না কী করবে—পালাবে, না এগিয়ে যাবে। বুকের ভেতর হাহাকার যেন গর্জে উঠল, আর কানে বাজল সেই কথাগুলো: “যে ডাক শুনে সাড়া দেয়, সে আর ফিরে আসে না।” অর্পণ হঠাৎ টের পেল তার পা কাদার মতো ভারী হয়ে যাচ্ছে, যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে নিচের দিকে টেনে নামাচ্ছে। গঙ্গার জল তার দৃষ্টিতে ঝিলিক দিচ্ছিল, অদ্ভুত মায়ার মতো। মুহূর্তের মধ্যেই মনে হলো, সে হয়তো সত্যিই ওই কাঁদতে থাকা কনের সঙ্গে তলিয়ে যাবে নদীর বুকের গভীরে। তার মস্তিষ্ক অবশ হয়ে আসছিল, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল, আর কান্নার শব্দ এখন সরাসরি তার ভেতরে বাজছিল, যেন আত্মা ভেদ করে যাচ্ছে।
ঠিক সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তেই পিছন থেকে কেউ শক্তভাবে অর্পণের হাত টেনে ধরল। এক ঝটকায় সে মূর্তির দিক থেকে সরে গেল। কাঁধে বাতাসের ঝাপটা, বুকের মধ্যে হঠাৎ প্রাণ ফেরার মতো দমকা বাতাস—অর্পণ বুঝল, কেউ তাকে বাঁচিয়ে নিল। সে ঘুরে তাকাল, দেখল মৌরি দাঁড়িয়ে আছে, হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে টেনে ওপরে তুলছে। তার চোখে আতঙ্ক, কপালে ঘাম, কিন্তু ভেতরে এক অদম্য শক্তি। মৌরি চিৎকার করে উঠল, “অর্পণ, চোখে তাকিও না! এ ডাক মানে মৃত্যু!” সেই মুহূর্তে অর্পণ আবার তাকাতে চাইল সাদা শাড়ি পরা মহিলার দিকে, কিন্তু ঘাটের নিচে তখন আর কেউ নেই। শুধু বাতাসে ভাসছে ভেজা গন্ধ আর মৃদু কান্নার প্রতিধ্বনি, যা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল গঙ্গার অন্ধকারে। অর্পণের বুক ধড়ফড় করতে লাগল, সে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারছিল না। মৌরি তাকে সিঁড়ি বেয়ে টেনে নিয়ে এল ওপরে, তারপর কাঁপা গলায় বলল, “তুমি এবার দেখেছ। এটা শুধু গুজব নয়, এ সত্যি। ওর ডাক মানে মৃত্যু।” অর্পণ নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল। জীবনে প্রথমবার সে বুঝল, কিছু সত্য আছে যা কেবল লোককথা নয়—যা সময়, যুক্তি, আর বিজ্ঞানের গণ্ডি ভেঙে যায়। তার সাংবাদিক মন ভরে উঠল ভয়ে আর বিস্ময়ে; এখন সে জানে, এই গঙ্গার কনের কাহিনি আসলে রক্ত-মাংসের ইতিহাস, আর সেই ইতিহাসের অদৃশ্য হাত আজও টেনে নিচ্ছে মানুষকে নদীর অতল অন্ধকারে।
আট
সেদিন রাতের অভিজ্ঞতার পর অর্পণ আর মৌরি দুজনেই আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিল। তবুও সাংবাদিকের কৌতূহল আর গবেষকের অনুসন্ধিৎসা তাদের থামাতে পারল না। অর্পণ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, এই জলসিঁড়ির ডাকের পেছনে আসলেই লুকিয়ে আছে কোনো এক নারীর অসমাপ্ত কাহিনি, আর মৌরি জানত—সেই কাহিনি হয়তো তার শৈশব থেকে শোনা কান্নার উৎস। তাই দু’জনে মিলে স্থানীয় পুরোনো রেজিস্ট্রি অফিস, লাইব্রেরি আর মন্দিরের নথি ঘাঁটতে শুরু করল। দিন কেটে গেল, অসংখ্য জীর্ণ নথি, হলুদ হয়ে যাওয়া খাতার পাতা, হাতের লেখা দলিল, পুরোনো পুঁথি উল্টে পাল্টে দেখল তারা। বেশিরভাগ নথি অগোছালো, অনেকটাই পচে নষ্ট হয়ে গেছে, আবার অনেক নথি পড়াই যায় না। তবুও, এক বিকেলে মৌরি লাইব্রেরির এক কোণে ধুলো জমে থাকা কাঠের আলমারি থেকে বের করল এক পুরোনো নথি, যার পাতাগুলো প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। নথির ভেতর গ্রামের বিয়ের রেজিস্ট্রি তালিকা ছিল, যেখানে প্রায় একশো বছর আগের এক এন্ট্রিতে চোখ আটকে গেল—এক তরুণীর নাম লেখা: হিরণ্ময়ী। নামটা পড়তেই মৌরির শরীর কেঁপে উঠল, আর অর্পণের মনে অদ্ভুত এক শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। তারা যেন অবশেষে খুঁজে পেল সেই নারীর পরিচয়, যে আজও অশান্ত আত্মা হয়ে ঘাটে কাঁদে।
কিন্তু শুধু নাম জানলেই তো সত্যি উদ্ঘাটন হয় না। তাই তারা আরও গভীরে খুঁজতে লাগল। নথিতে দেখা গেল, হিরণ্ময়ীর বিয়ে হয়েছিল জমিদারের এক কর্মচারীর সঙ্গে, নাম তার রমাপদ দত্ত। প্রথমে নথিতে লেখা ছিল—হিরণ্ময়ীর মৃত্যু জলসমাধির মাধ্যমে, অর্থাৎ আত্মহত্যা। কিন্তু অন্য এক দলিলে, যা সম্ভবত গ্রামের পুরোহিত লিখেছিলেন, সেখানে ভিন্ন এক বিবরণ পাওয়া গেল। সেখানে আভাস পাওয়া গেল, হিরণ্ময়ীর মৃত্যু আত্মহত্যা নয়—বরং তাকে জোর করে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। আর কেন? কারণ রমাপদ তার স্ত্রীকে সন্দেহ করেছিল। নথির পাশে হালকা, প্রায় মুছে যাওয়া অক্ষরে লেখা ছিল: “স্ত্রী অবিশ্বাসী”। মৌরি সেই শব্দগুলো পড়তেই চোখে জল চলে এলো। সে বলল, “একটা নারী, যার কোনো দোষ প্রমাণ হয়নি, শুধু সন্দেহের কারণে স্বামীর হাতে খুন হলো।” অর্পণের মনে হলো, হিরণ্ময়ীর সেই কান্না আসলে শতাব্দী প্রাচীন অন্যায়ের আর্তনাদ। তার মৃত্যু আত্মহত্যা বলে চালানো হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল নির্মম হত্যা। কিন্তু গ্রামের মানুষ কেউই তখন রমাপদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি, কারণ সে জমিদারের প্রভাবশালী ভৃত্য ছিল। ফলে হিরণ্ময়ীর মৃত্যু থেকে গেল ইতিহাসের অন্ধকার কোণে, বিচারহীন আর বিস্মৃত।
এই তথ্য হাতে পেয়ে অর্পণের শরীর কেঁপে উঠল। তার সাংবাদিকসত্তা চিৎকার করে উঠল—“এটাই সেই সত্যি, যেটা লুকোনো হয়েছিল এতদিন।” মৌরি তার চোখ মুছে বলল, “বিচার হয়নি বলেই আজও হিরণ্ময়ীর আত্মা শান্তি খুঁজে পায়নি। ওর কান্না এই অন্যায়ের প্রমাণ।” দু’জনের মনে তখন একই প্রশ্ন ঘুরছিল—কীভাবে সেই অশান্ত আত্মাকে শান্তি দেওয়া যায়? তারা দু’জনেই অনুভব করল, এটা আর শুধু ভয়ের গল্প নয়, এটা ইতিহাসের এক ভুলে যাওয়া অধ্যায়, যা ন্যায়বিচার চায়। গঙ্গার ঘাটের সেই কান্না কেবল লোককথা নয়, বরং হিরণ্ময়ীর দগ্ধ আত্মার চিৎকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে মানুষের মনে ভয় ছড়ালেও আসলে সত্যকে ঢেকে রেখেছিল। অর্পণ জানল, এখন তার কাজ কেবল রহস্য উদ্ঘাটন নয়, বরং ইতিহাসের গোপন খুনের বিচার প্রতিষ্ঠা করা। মৌরির দৃষ্টি তখন গম্ভীর, সে ফিসফিস করে বলল, “অর্পণ, যদি হিরণ্ময়ীর আত্মাকে মুক্তি না দেওয়া যায়, তবে এই কান্না চিরকাল বাজবে।” আর অর্পণ নীরবে মাথা নোয়াল, কারণ সে বুঝে গেছে—এবারের যাত্রা কেবল সাংবাদিকতার অনুসন্ধান নয়, বরং শতবর্ষের অন্যায়ের অবসান ঘটানোর এক কঠিন দায়।
নয়
ঘাটের ভৌতিক রহস্য যে কেবল কুসংস্কার নয়, তা অর্পণ আর মৌরি নিশ্চিত হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু এবার সত্য আরও নির্মম রূপে প্রকাশ পেল। গ্রামের মানুষের অগণিত গল্প, নিখোঁজ যুবকদের কাহিনি—সবকিছুর পেছনে যে সত্যটা দাঁড়িয়ে আছে, তা হল হিরণ্ময়ীর অশান্ত আত্মা। হ্যাঁ, যেসব মানুষ কান্নার সেই শব্দ অনুসরণ করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে, তারা নিছক হারিয়ে যায়নি। আসলে তারা সবাই হিরণ্ময়ীর অভিশপ্ত প্রতিশোধের শিকার। মৌরি যখন এ সত্যি অর্পণকে বোঝাচ্ছিল, তার কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছিল। সে বলল, “শোনো, আত্মা যখন অসমাপ্ত কষ্টে বাঁধা থাকে, তখন সেটা নিছক আত্মা থাকে না। সেটা পরিণত হয় অভিশাপে। হিরণ্ময়ী যে যন্ত্রণায় মরে গিয়েছিল, সেই যন্ত্রণা সে চায় সবাই টের পাক। তাই যে-ই তার কান্না শুনে কাছে যায়, সে আর বেঁচে ফিরে আসে না। ওরা হারিয়ে যায় তার প্রতিশোধের আঁধারে।” অর্পণের মাথায় শিউরে উঠল চিন্তা। সে বুঝতে পারল, হিরণ্ময়ীর অশান্তি গ্রাস করছে নিরীহ মানুষদের, যেন সে শতাব্দীর যন্ত্রণা ভাগ করতে চাইছে। এদিকে পুলিশ অফিসার অনির্বাণ, যিনি এতদিন সবকিছুকে নিছক গুজব ভেবেছিলেন, তিনিও অবশেষে ভেঙে পড়লেন। নিজের চোখে অনেকটা অদৃশ্য শক্তির প্রমাণ পাওয়ার পর তিনি মেনে নিলেন—এখানে বিজ্ঞান থেমে যায়, এখানে যুক্তি ব্যর্থ।
কথিত আছে, পূর্ণিমার রাতে আত্মার শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। গ্রামের প্রবীণরা বারবার বলছিলেন, “পূর্ণিমার রাতে ওর ডাক আরও জোরে বাজে, কেউ যেন ঘাটের কাছে না যায়।” তাই সময় ফুরিয়ে আসছিল। সামনে পূর্ণিমার রাত, আর তার মানে আরও নতুন প্রাণহানি ঘটতে পারে। অর্পণ, মৌরি আর অনির্বাণ সিদ্ধান্ত নিলেন—এই অভিশাপ ভাঙতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? সমাধান খুঁজতে গিয়ে তারা আবার হিরণ্ময়ীর গল্পের দিকে ফিরে গেল। মৌরি বলল, “শুধু সত্যি জানলেই হবে না, আত্মাকে শান্তি দেওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।” গ্রাম্য পুরোহিতের পুরোনো দলিল ঘেঁটে জানা গেল, অসমাপ্ত আত্মাকে শান্ত করতে হলে তার জন্য শ্রাদ্ধ ও পূজা করতে হয়। তবে সাধারণ শ্রাদ্ধ নয়, বরং এমন এক আচার যেখানে জল, আগুন আর মন্ত্র মিলিয়ে আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গ্রামের বয়স্ক পুরোহিত বললেন, “ওর নাম উচ্চারণ করে, তার প্রতি সম্মান জানিয়ে, তার সত্য প্রকাশ করে তবেই শান্তি মিলতে পারে।” অর্পণের বুক ভারী হয়ে এল। একজন সাংবাদিক হিসেবে তার কাজ ছিল সত্য উদ্ঘাটন, কিন্তু এবার বুঝল, এই সত্য কেবল প্রকাশ নয়—মুক্তিও চায়। তাই তিনজন মিলে ঠিক করলেন, পূর্ণিমার রাতে ঘাটেই আয়োজন হবে সেই পূজার, যাতে হিরণ্ময়ীর আত্মা তার বহুদিনের দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ঘাটে প্রস্তুতি শুরু হল। গ্রামের মানুষজন ভয়ে কেউ এগিয়ে আসতে চাইছিল না, তবুও ক’জন বৃদ্ধ ও কৌতূহলী তরুণ সাহায্য করল। বাঁশ দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হল, গঙ্গার জলে প্রদীপ ভাসানোর আয়োজন করা হল। শ্রাদ্ধের জন্য চাল, তিল, দুধ, আর পূজার জন্য ফুল, ধূপ, গঙ্গাজল সব জোগাড় করা হল। অর্পণ রিপোর্টার হলেও এবার কেবল দর্শক নয়—সে নিজেই এই ঘটনার সক্রিয় অংশ। মৌরি পূজার উপকরণ সাজাচ্ছিল, তার মুখে এক অদ্ভুত গম্ভীরতা, যেন সে জানত—এই রাত তাদের জন্য সহজ হবে না। অনির্বাণও বন্দুক ফেলে মন্ত্রপাঠ শুনছিল গভীর মনোযোগে, তার মুখে আর আগের সংশয়ের ছায়া নেই। পূর্ণিমার চাঁদ উঠতেই আকাশে হালকা কুয়াশা জমল, গঙ্গার জল রুপালি হয়ে উঠল। পূজার মন্ত্র গাইতে শুরু করলেন পুরোহিত, চারপাশে প্রদীপের আলো কাঁপতে লাগল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, হঠাৎ যেন হাওয়া থেমে গেল। ঘাটের ওপরে ভেসে উঠল পরিচিত সেই করুণ কান্না—এবার আরও তীব্র, আরও গা-ছমছমে। গঙ্গার জলে যেন প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছিল সেই আহাজারি। সবাই শিউরে উঠল, অর্পণ আর মৌরি হাত শক্ত করে ধরল একে অপরের, আর অনির্বাণ দাঁত চেপে দৃঢ় থাকল। তারা জানত, এ রাতেই হবে সিদ্ধান্ত—অভিশাপ ভাঙবে, নাকি আরও গভীর অন্ধকারে ডুবে যাবে ঘাট। পূজার প্রদীপগুলো তখন বাতাসে হেলে যাচ্ছিল, আর গঙ্গার ঢেউ যেন কারও অদৃশ্য ক্রোধে জেগে উঠছিল। হিরণ্ময়ীর আত্মা এসে গেছে—এবং এবার তাকে শান্তি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
দশ
পূর্ণিমার রাত তখন ঘন অন্ধকারে ঢাকা, গঙ্গার জলে চাঁদের আলো মিশে তৈরি করেছে এক ভৌতিক রূপ। চারপাশে ঘন নীরবতা, যেন পাখিরাও ডাক বন্ধ করে দিয়েছে। ঘাটে মণ্ডপ সাজানো, প্রদীপের আলো টিমটিম করছে, ধূপকাঠির ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। পুরোহিত মন্ত্রপাঠ শুরু করেছিলেন অনেকক্ষণ আগে, কিন্তু মাঝরাত ছুঁতেই হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। টানা শ্বাস নেওয়া যেন কষ্টকর হয়ে গেল, আর সেই অস্বাভাবিক নীরবতার মধ্যে ভেসে উঠল সেই বহুল পরিচিত কিন্তু অদ্ভুতভাবে ভয়ংকর কান্না। গঙ্গার বুক কাঁপিয়ে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল, যেন কোনো নারী বুক ভেঙে হাহাকার করছে। গ্রামের লোকেরা, যারা দূর থেকে দেখতে এসেছিল, ভয়ে কেঁপে উঠল। কেউ কেউ হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করতে লাগল, আবার কেউ দৌড়ে পালাতে চাইলো। কিন্তু অর্পণ, মৌরি ও অনির্বাণ দাঁড়িয়ে রইল দৃঢ়ভাবে, কারণ তারা জানত—এটাই সেই শেষ রাত, এ রাতেই ঠিক হবে শতবর্ষের অভিশাপের ভাগ্য। মৌরির হাত কাঁপছিল, তবুও সে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখল, আর অর্পণ বুকের ভেতর কাঁপন নিয়েও মন্ত্রোচ্চারণে সায় দিল। অনির্বাণ বন্দুক না তুলে হাত জোড় করে দাঁড়াল, কারণ সে বুঝেছে—মানুষের শক্তি দিয়ে নয়, আত্মার প্রতি সম্মান আর ক্ষমার মাধ্যমেই আজ মুক্তি আসবে।
কান্নার শব্দ ক্রমে কাছে এল, যেন অদৃশ্য কারও পদচিহ্ন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। হঠাৎ ঘাটের প্রান্তে জলের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে প্রকাশ পেল এক নারীর অবয়ব। সাদা ভেজা শাড়ি গায়ে, লম্বা জলমাখা চুল মুখ ঢেকে রেখেছে, তার শরীর থেকে গঙ্গার জল টপটপ করে পড়ছে। মুখ দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু বুকের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল অমানবিক এক হাহাকার। হিরণ্ময়ীর আত্মা। অর্পণ আর মৌরি দু’জনেই থম মেরে তাকিয়ে রইল। ভয়ে তাদের চোখ কাঁপছিল, কিন্তু ভেতরের দৃঢ়তা তাদের পিছিয়ে যেতে দিল না। মৌরি ধীরে ধীরে দু’হাত জোড় করে মন্ত্রের তালে প্রদীপ এগিয়ে দিল, আর কাঁপা গলায় বলল, “হিরণ্ময়ী… আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই। তুমি যে অন্যায় মৃত্যুর শিকার হয়েছিলে, সেই সত্য আমরা প্রকাশ করেছি। আমরা চাই তুমি শান্তি পাও, মুক্তি পাও।” অর্পণ পাশে দাঁড়িয়ে সেই মোমবাতি জ্বালাল, তার চোখে জল ভরে উঠল। সাংবাদিক হয়েও সে জানত, এই মুহূর্তে কলম নয়—কেবল হৃদয়ের প্রার্থনাই কার্যকর হবে। মোমবাতির আলো কাঁপতে কাঁপতে হিরণ্ময়ীর দিকে এগোল, আর কান্নার শব্দ কিছুটা ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগল। যেন আত্মা ধীরে ধীরে শুনছে, অনুভব করছে—এবার কেউ তাকে বিশ্বাস করেছে, কেউ তাকে দোষী নয় বরং নির্দোষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
অবশেষে, দীর্ঘশ্বাসের মতো এক গভীর কান্না ভেসে এলো—কিন্তু সেটি ছিল শেষ কান্না। তারপর হঠাৎ সব নীরব হয়ে গেল। গঙ্গার জল অস্বাভাবিকভাবে থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। আর ঠিক তখনই হিরণ্ময়ীর ভেজা অবয়ব থেকে ধীরে ধীরে আলো ছড়াতে শুরু করল। প্রথমে ক্ষীণ, তারপর ক্রমে উজ্জ্বল। সাদা, নির্মল, শান্ত এক আলো ঘিরে ধরল পুরো ঘাট। গ্রামের লোকেরা হাঁটু গেড়ে কেঁদে উঠল, কেউ আবার মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল। অর্পণ আর মৌরি বিস্মিত চোখে দেখল—জলসিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে আলোর স্রোতে। গঙ্গার বুকে ভেসে উঠল সাদা আলো, যেন চাঁদের আলোয় জন্ম নিল নতুন শান্তি। অনির্বাণ কণ্ঠ চেপে ফিসফিস করে বলল, “ও মুক্তি পেল।” আর সত্যিই তাই—শতবর্ষ ধরে যে অভিশপ্ত কান্না এই ঘাটে প্রতিধ্বনি তুলছিল, তা থেমে গেল। বাতাস আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠল, গঙ্গার ঢেউ মৃদু স্বরে বইতে শুরু করল, ধূপকাঠির ধোঁয়া আবার হালকা বাতাসে ভেসে মিলিয়ে গেল। অর্পণ আর মৌরি একে অপরের দিকে তাকাল, তাদের চোখে ভয়ের বদলে শান্তির অশ্রু। তারা জানত—আজ ইতিহাসের এক ভুল শুধরে দেওয়া গেল। হিরণ্ময়ীর আত্মা আর অভিশাপ হয়ে থাকবে না, বরং মুক্ত আত্মা হয়ে গঙ্গার স্রোতে মিশে গেল। ঘাট আবার শান্ত হয়ে গেল, আর মানুষের মনে জন্ম নিল এক নতুন বিশ্বাস—ন্যায়বিচার দেরিতে হলেও একদিন আসে, আর আত্মার শান্তি আসে প্রার্থনা ও ভালোবাসার শক্তিতেই।
-শেষ-




