Bangla

জলরঙের শহর

Spread the love

ঈশিতা সেনগুপ্ত


তিয়াষা বসু’র স্টুডিওটা ছিল টালিগঞ্জের এক পুরনো বাড়ির ছাদে। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, ছায়াঘেরা ছাদ আর ভাঙাচোরা জানালার ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো এসে পড়ত তার ক্যানভাসে। একা থাকতে ভালোবাসত তিয়াষা। ওর তুলির আঁচড়ে জন্ম নিত একের পর এক নিঃসঙ্গ শহর, কখনো তীব্র বেদনায় ভরা মুখ, কখনো রোদেলা দুপুরে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি। তিয়াষার সর্বশেষ কাজটা ছিল একটু অন্যরকম। সে একটা গোটা শহর আঁকছিল। রাস্তা, লোকালয়, দোকান, পার্ক, রিকশা, খুদে চায়ের দোকান—সব কিছু মিলিয়ে একটা সম্পূর্ণ শহর। এমনকি, শহরের একটা নামও রেখেছিল—নীলপুর।

নীলপুরের অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের ভেতরের একাগ্রতা মুছে ফেলতে চাইত। এই শহরটা তার কল্পনার পৃথিবী, যেখানে সে রাজা, যেখানে তার শূন্যতা নেই।

গল্পের মোড় ঘোরাতে সময় লাগল না। এক ভোরে, কুয়াশা ঘেরা ছাদের কোণ থেকে তিয়াষা দেখতে পেল, পাশের ছাদের উপর হঠাৎ এক দোকান উঠেছে—একটা ছোট্ট পান-বিড়ির দোকান, যেমনটা সে ক্যানভাসে এঁকেছিল। প্রথমে সে ভাবল হয়তো ভুল দেখছে। কিন্তু না। দোকানটা দাঁড়িয়ে, আর এক বুড়ো লোক বসে বিড়ি ফুঁকছে। ক্যানভাস খুলে পাশে ধরে মিলিয়ে দেখে—একদম এক! দোকানের ঠিক ওপরে একটা টিনের ছাউনির গায়ে লেখা “সঞ্জয়ের দোকান”—ঠিক যেমনটা আঁকেছিল সে। তিয়াষার গলা শুকিয়ে এল। সে নিচে দৌড়ে গেল, দোকানে পৌঁছোতেই বৃদ্ধ লোকটা তাকিয়ে বলল—

“আপনি তো এখানে নতুন, না?” তিয়াষা চমকে উঠল।

“আপনি কে?”

“আমি সঞ্জয়। এই দোকান আমার। বহু বছর ধরে আছি এখানে।”

তিয়াষা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সে নিজের আঁকা শহরের একটা চরিত্রের সাথে কথা বলছে!

দিন যত গড়াচ্ছে, নীলপুর তার বাস্তব জগতে প্রবেশ করছে আরও গভীরভাবে। তার ক্যানভাসে আঁকা একটা হলুদ রঙের বাস চলে যায় সকালবেলা, যার গায়ে লেখা—“নীলপুর-মধ্যমগ্রাম রুট”। সে বাসটা সত্যিই রাস্তায় দেখা গেল।তিয়াষার আঁকা একটা পাগল ছেলেকে সে রেলস্টেশনের পাশে গুনগুন করতে দেখল—তুলির আঁচড়ে যেমন ছিল, তেমনই।

সে আর বুঝে উঠতে পারছিল না—বাস্তবটা কি এখন ক্যানভাসের অন্তর্ভুক্ত, নাকি ক্যানভাসটাই বাস্তব?

তিয়াষা এবার নিজেই পরীক্ষায় নামল। সে একদিন বসে আঁকল এক নতুন রাস্তাঘাট—এক মোড়, যেখানে একটা চায়ের দোকান থাকবে, পাশেই থাকবে একটা সাদা বেঞ্চ, আর এক বৃদ্ধ দম্পতি রোজ বিকেলে সেখানে বসবেন। পরের দিন বিকেলে, সে সেই রাস্তায় গেল। বুক ধুকপুক করছিল। আর সত্যিই—চায়ের দোকানটা সেখানে, বেঞ্চটা সেখানে, আর এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বসে চা খাচ্ছেন! তিয়াষার চোখে জল চলে এল। তার কল্পনার শহর এখন তার নিজের কাছে বাস্তব। কিন্তু এই বিস্ময়ের সাথে একটা অজানা আতঙ্কও জমতে থাকল। এই অদ্ভুত অলৌকিকতা তার জীবনে এক নতুন দ্বিধা এনে দিল। সে ভাবল—যদি সে কারও মৃত্যু আঁকে? যদি সে কোনও দুর্ঘটনা এঁকে ফেলে?

সে এবার ক্যানভাসে হাত দিতেই ভয় পায়। একদিন রাতে, আবেগে সে আঁকে এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যে—নতুন একটা মুখ, এক তরুণ—নামের পাশে লিখে রাখে: “অরণ্য”। তার চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা, কিন্তু মুখে একরাশ সহানুভূতির ছোঁয়া। তিয়াষা তাকে দেখে মন হারিয়ে ফেলে। অরণ্য যেন তার নিঃসঙ্গতার উত্তর। আর সেই পরদিনই, তার স্টুডিওর দরজায় কড়া নাড়ে এক যুবক।

“তিয়াষা বসু? আমি অরণ্য সেন। নতুন সাংবাদিক। আপনাকে নিয়ে একটা প্রোফাইল করতে চাই।”

তিয়াষা স্তম্ভিত। সে আঁকা চরিত্র নিজের পায়ে হেঁটে তার সামনে এসেছে!

তারা কথা বলতে শুরু করে। অরণ্য বললো—

“নীলপুর নিয়ে আপনার আঁকা ছবি আমি দেখেছি। শহরটা যেন ধরা যায়, ছুঁয়ে দেখা যায়। জানেন, এরকম একটা শহরে আমি থাকতে চাই।”

তিয়াষা চুপচাপ শুনছিল। তার মুখের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। অরণ্যও যেন বুঝে ফেলল, তার জন্ম শুধু কল্পনায় নয়, কোথাও এক অলৌকিক সত্যের স্পর্শে। তিয়াষা আর অরণ্য ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হতে লাগল। তারা দু’জনে মিলে নীলপুরের আরও কিছু অংশ গড়ে তুলল—নতুন লাইব্রেরি, ফুলের দোকান, একটা রঙিন ঘোড়ার পিঠে করে চক্কর দেওয়া শিশুদের মেলা। তিয়াষার মনে হতে লাগল, এই শহর, এই জীবনই তার আসল। কিন্তু একদিন, হঠাৎ করে সব বদলে গেল।

স্টুডিওতে ফিরে একদিন তিয়াষা দেখতে পেল তার ক্যানভাসে একটা কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে। রঙগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, মানুষগুলো অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

সে আঁচ করতে পারল, কেউ বা কিছু তার তৈরি শহরটা ধ্বংস করতে চাইছে। সে পাগলের মতো আঁকতে লাগল—আবার নতুন করে রঙ ছড়িয়ে দিতে, ছায়া মুছে ফেলতে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। অরণ্য এসে বলল—

“তিয়াষা, সময় এসেছে সত্যিটা মানার। আমরা কল্পনার জগতে বাস করছিলাম, কিন্তু তোর আঁকা শহরের ভার এখন বাস্তবকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। তুই যদি থামিস না, এই বাস্তবটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।”

তিয়াষা থমকে গেল। সে বুঝল, অতিরিক্ত সৃষ্টি কখনো কখনো আত্মধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে, শেষবারের মতো তার ক্যানভাসে একটা ঝরনা আঁকল। নাম দিল—“শেষ ধারা”। একধরনের নিঃশেষ সমাপ্তি। সে জানত, এই ঝরনার মধ্য দিয়েই ধুয়ে যাবে তার সৃষ্টি, আবার ফাঁকা হয়ে যাবে স্টুডিওর দেওয়াল।

আর সত্যিই, পরদিন সকালে সব যেন ছিল এক স্বপ্ন। স্টুডিওয় কোনো ক্যানভাস নেই, নেই অরণ্য, নেই নীলপুর। তিয়াষা আবার একা। কিন্তু এবার সে কাঁদে না। সে জানে, তার সৃষ্টি বাস্তবে এসেছিল। কেউ না জানলেও, সে জানে। এবং হয়তো… কোনো এক নতুন ক্যানভাসে, সে আবার তুলির আঁচড়ে খুলে দেবে এক নতুন জলরঙের শহর।

1000022466.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *