Bangla - সামাজিক গল্প

জড়ি: মাটির ভাষা

Spread the love

মৃন্ময় ধারা


শালবনির ছায়া

রাঙা মাটির উপরে সকাল নামে ঢুলুঢুলু আলোয়। সাল, শিমুল, আর পালাশের ছায়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ধুলোবালির মাঠে। বাঁকুড়ার এই গ্রামটার নাম শালবনি। কেউ চেনে না, কেউ জানতে চায় না। সরকারি ম্যাপে ছোট্ট এক বিন্দু, কিন্তু হরিধনের চোখে এই গোটা পৃথিবীটাই হলো শালবনি। সে এখানেই জন্মেছে, এখানেই ধুলো মেখে বড়ো হয়েছে।

সকালে কাক ডাকার আগেই হরিধন তার বাবার সঙ্গে জঙ্গলের দিকে হাঁটে। কাঁধে দড়ি, হাতে কুড়াল, আর গলায় ঝুলে থাকে এক লাল রঙের গামছা। এই পথেই তারা যায়, গাছ কেটে আনতে— জ্বালানির জন্য, বিক্রির জন্য, কোনোদিন হয়তো শুধু জঙ্গলের কথা শুনেই যাওয়া হবে।

“বাবা,” হরিধন একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “আমরা তো কাঠ কাটি। কিন্তু শহরের লোকেরা দাম পায় কেন বেশি?”

তার বাবা, কান্তি বাউরী, গম্ভীর গলায় বলেছিল, “ওরা কাটে না, শুধু হিসেব জানে। আমাদের হাতে কুড়াল, ওদের হাতে খাতা।”

হরিধনের বুকে তখন এক অদ্ভুত জ্বালা ওঠে। সে জানে না সেই হিসেব কী, তবে এটুকু বোঝে— এই রাঙা মাটির গায়ে লেগে আছে কিছু অপারগ গ্লানি, যা ভাষা দিয়ে বোঝানো যায় না। হয়তো তার দিদিমা, বুড়ি সোমা বলতে পারবে।

বুড়ি সোমা শালবনির সবচেয়ে প্রাচীন মুখ। তাঁর গালে বয়সের ভাঁজে জমে আছে সময়, তার চোখে আছে আগুন। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা গ্রামের বাচ্চারা তার উঠোনে জড়ো হয়, আর সে বলে গল্প— “এই মাটির নিচে কত রক্ত গিয়েছে রে। ব্রিটিশরা এসেছিল। বলেছিল, তোমাদের ভাষা নিচু, তোমাদের গান বাজে, তোমরা ‘ভদ্র’ হও। আমরা শিখলাম তাদের ভাষা, ভুলে গেলাম নিজেদের কথা।”

হরিধন একদিন থমকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমরা কী তাহলে খারাপ ছিলাম, দিদিমা?”

বুড়ি সোমা একটু হেসে বলেছিল, “খারাপ নয়, বোকা। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম ওদের কথা। নিজের মাটি ছেড়ে কাগজের ওপর সই করেছিলাম। আজও সেই সইয়ের জ্বালা যায় না।”

সেইদিনের পর থেকেই হরিধনের ভিতরে কিছু একটার জন্ম হয়। সে ভাবে, জঙ্গল তো সবাই দেখে, কিন্তু জঙ্গলের নীচে যে কাহিনি আছে, সেটা কে জানে?

গ্রামে এখন একটা নতুন স্কুল হয়েছে। গেটে লেখা: “Model English Medium Primary School, Salboni.” শহর থেকে শিক্ষক আসে, ল্যাপটপ নিয়ে। বলে, “ইংরেজি শেখো, এই ভাষাতেই ভবিষ্যৎ।” তারা বলে না— এই ভাষাই একদিন কেড়ে নিয়েছিল হরিধনের দাদুর জঙ্গল, তার ঠাকুরদার গান।

হরিধনের সহপাঠীরা এখন “Good morning” বলে, “apple” লিখে দেয়াল চিত্র আঁকে। কিন্তু তারা ভুলে যায় ‘তাল’, ‘বরই’, ‘বেত’ — যা একসময় তাদের গাছে ঝুলে থাকত। দেয়ালে এখন ‘apple tree’, মাঠে আর তালগাছ নেই।

মাঝেমাঝে, শহরের কিছু NGO আসে গ্রামে, ছবি তোলে, হাসে, কথা বলে হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে। তারা বলে, “You are so innocent!” তারপর ফিরে যায় AC গাড়িতে। শালবনির বুকে পড়ে থাকে তাদের পায়ের ছাপ, একধরনের নীরব অবজ্ঞা।

হরিধনের বাড়ির ঠিক পেছনে একটা পুরনো আমগাছ আছে। বুড়ি সোমা বলে— “এই গাছটা দেখে ব্রিটিশ একদিন বলেছিল, এর কাঠ ভালো হবে, কেটে ফেলা হোক। তখন তোমার দাদুর বাবা গায়ে পড়ে বলেছিল, ‘না, এই গাছে দেবতা বাস করে।’ তারপর তারা চলে গিয়েছিল, কিন্তু গাছটার ভয় আর যায়নি।”

গাছটা আজও আছে, নুয়ে পড়েছে কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেমন বুড়ি সোমা।

হরিধন রাতের বেলায় যখন ছাদের ধারে বসে, আকাশ দেখে, তখন তার বুকের ভিতর টনটন করে ওঠে। তার ইচ্ছা হয় কলকাতা যাওয়ার, বিনয়ের কাছে। সে শুনেছে, বিনয় এখন ‘প্রজেক্ট ম্যানেজার’। মাঝে মাঝে চিঠি লেখে।

শেষ চিঠিতে সে লিখেছিল—

“পূর্বাঞ্চল বায়ো-এনার্জি কোম্পানি একটা নতুন প্রকল্প আনছে। আমাদের গ্রামের দিকেই হবে প্লান্ট। চাকরি হবে অনেকের। এখন উন্নয়নের সময়।”

কান্তি বাউরী চিঠিটা পড়তে না জানলেও শুনে খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিল, “দেখলি! বিনয় শহরে গিয়েছিল, এখন আমাদের জন্য কিছু করছে। এটাই ভবিষ্যৎ।”

কিন্তু বুড়ি সোমা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তার শুধু একটা কথাই শোনা গিয়েছিল— “যেখানে মাটি গেল, মানুষ রইলো না।”

পরদিন সকালে, হরিধন আবার জঙ্গলে যায়। কিন্তু কুড়াল হাতে তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন বাজে —
“আমাদের গান কেড়ে নিলে কী দিয়ে ফিরিয়ে আনবো?”

পালাশের লাল ফুলে ছাওয়া শালবনির আকাশের নিচে একটা অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ ভাষার, স্মৃতির, আর আত্মপরিচয়ের। হরিধন তখনও জানে না, সে সেই যুদ্ধের সৈনিক হবে।

দিদিমার কাহিনি

হরিধন হাঁপাচ্ছে। তার কাঁধে জঙ্গলের শুকনো কাঠের গাঁইট, পায়ে জোঁক লেগে রক্ত ঝরছে, কিন্তু সে তা টের পাচ্ছে না। মাথার ভেতর দিদিমার সেই কথাগুলো ঘুরছে বারবার— “যেখানে মাটি গেল, মানুষ রইলো না।” এই বাক্যে লেগে আছে গাঢ় বিষ, একটা জেগে ওঠা দীর্ঘ অভিমান। কিন্তু হরিধন পুরোটা বোঝে না। বোঝার জন্যই তো সে সেদিন সন্ধ্যায় দিদিমার উঠোনে গিয়েছিল, যেখানে শালপাতা পাতা পিঁড়িতে বসে থাকেন বুড়ি সোমা, তার সামনে ধোঁয়ায় পাক খাচ্ছে পুড়তে থাকা শুকনো নিমপাতা।

সন্ধ্যা মানেই এখনো গ্রামের ক’টা ঘরে হ্যারিকেন জ্বলে, বাকিরা অন্ধকারেই ডুবে থাকে। ছেলেমেয়েরা আজকাল টিভি দেখে না— মোবাইলে গান বাজে। তবুও বুড়ি সোমার উঠোনে দু-তিনটে বাচ্চা আসে— শ্রেয়া, বনমালী, আর হরিধন। শুধু গল্প শোনার লোভে।

সে সন্ধ্যায় হরিধন কিছু না বলে চুপচাপ বসে পড়ে। বুড়ি সোমা তাকে দেখে একটু হাসেন, বলেন, “তুই বুঝতে চাইছিস, রে?”

হরিধন মাথা নাড়ে।

“তাহলে শোন— এই শালবনি একদিন শুধু জঙ্গল ছিল না। এখানে একটা গান ছিল, একটা ছন্দ ছিল। সেই গান জঙ্গলের গায়ে লেগে থাকত, মানুষ তার ভাষা ভুলত না। আমাদের পূর্বপুরুষরা গাইত— ‘আঁই গো মাটির গান গাই, আঁই গো জড়ির রঙ বাঁধি।’ তুই জানিস না, সেই গান একদিন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।”

“কে কেড়ে নিয়েছিল, দিদিমা?”— হরিধন জিজ্ঞেস করে।

“শোন,” বুড়ি সোমা শুরু করেন তাঁর গল্প। “আমার ঠাকুর্দা ছিলেন এক জন মাটির কারিগর। পাঁকে হাত দিয়ে তিনি প্রতিমা বানাতেন, পাত্র বানাতেন, এমনকি জড়ির মূর্তি বানাতেন। তাঁর নাম ছিল যুধিষ্ঠির বাউরী। একদিন, ব্রিটিশ সাহেবরা এসে বলে— ‘তোমার কাজ ভালো, কলকাতায় নিয়ে যাবো। প্রদর্শনী হবে।’ ঠাকুর্দা রাজি হননি। বলেছিলেন, ‘আমার মাটি এখানেই।’ তখন তারা আরেকভাবে আসে— বলেন, এই কাজে লেখাপড়া লাগবে। একটা পুঁথি পাঠিয়ে দেন, ইংরেজি হরফে লেখা কাগজ। আমার ঠাকুর্দা পড়তে জানতেন না। তখন থেকে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়।”

“তখন থেকেই মাটি হারাতে শুরু করেছিল রে, হরিধন। ভাষা বদলে গিয়েছিল, গল্প বদলে গিয়েছিল। যারা মাটির সঙ্গে মিশে ছিল, তারা পিছিয়ে গেল।”

হরিধনের মনে হয়, দিদিমার গল্পটা যেন তার বুকের ভেতর ঢুকে চুপচাপ বীজ ফেলে দিয়ে যাচ্ছে।

“কিন্তু দিদিমা, মাটির কাজ কি খারাপ?” সে জিজ্ঞেস করে।

বুড়ি সোমা এবার গলায় একটু কঠিন স্বর এনে বলেন, “খারাপ নয়, তবে লোকেরা সেটাকে তুচ্ছ করে তোলে। আমার মা বলতেন, ‘শ্রম যার, মুখ তার নয়।’ তোর শহরের লোকেরা বলে ‘হ্যান্ডিক্র্যাফট’, কিন্তু আমরা বলি ‘হাতের হাড় ব্যথা’। তফাতটা এখানেই।”

হরিধনের চোখে তখন একটা ছবি ভাসে— তার মা বসে বসে হাঁড়ি মাজছেন, বাবা ঘাম ঝরিয়ে কাঠ কাটছেন, আর একদিকে শহরের লোকেরা কফি খেতে খেতে বলে— “so aesthetic!”

বুড়ি সোমা বলেন, “শুন হরিধন, শালবনির গানে ছিল মাটির ঘ্রাণ। কিন্তু তারপর স্কুল এলো, শহরের ভাষা এলো, ‘ভদ্রলোক’ হতে শিখলাম। আর তুই জানিস, যতদিন না নিজের ভাষায় কথা বলবি, ততদিন তুই অন্যের গোলাম।”

“আমি তো বাংলা বলি, দিদিমা।”

“বাংলা বলিস, কিন্তু ক’টা কথার মানে জানিস? ‘জড়ি’ কী, ‘চুনোটি’ কী, ‘ছেঁড়া মেঠো গান’ কী? তোদের বইয়ে নেই। তোরা যে বাংলা জানিস, তা কাগজের। মাটির বাংলা জানিস না।”

হরিধন চুপ করে থাকে। বুড়ি সোমার এই ভাষা যেন জঙ্গলের গন্ধমাখা কোনো অভিশাপ। কিন্তু আশীর্বাদও হতে পারে।

এই সময় একটা ভাঙাচোরা হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে আসে বনমালী। সে বলে, “দিদিমা, গান গাবে?”

বুড়ি সোমা একটু হেসে বলেন, “এই গান শহরের কেউ বোঝে না রে। কিন্তু তোদের শোনাতে পারি।”

তার গলা নড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। গানের ভাষা অচেনা, পুরনো, কিন্তু সুরে যেন একটা অভিমান ভেসে আসে—

“জড়ির আঁচলে বাঁধা ছিল গল্প,
বেদনার ছাপ ছিল পাঁকে।
আজকে তোরা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখিস,
কেড়ে নেয় শহরের মাকে।”

হরিধনের চোখ ভিজে ওঠে। এই গান সে আগে শোনেনি। স্কুলে শেখেনি। বইয়ে পড়েনি। এই গান তার রক্তে ছিল, কিন্তু ঘুমিয়ে ছিল।

সেই রাতে হরিধন ঘুমোয় না। সে মায়ের মুখে তাকায়, বাবার হাতের কড়া দেখে, জানলার বাইরে আমগাছটার দিকেও। যেন সবকিছু নতুন হয়ে উঠেছে। যেন এই পৃথিবীটা এখন বুঝতে চাইছে— কে ছিল তার আসল উত্তরাধিকারী।

সকালে উঠে হরিধন সিদ্ধান্ত নেয়— সে লিখবে। স্কুলের প্রজেক্টে নয়, নিজের জন্য। তার ভাষায়, তার ছন্দে। সে দিদিমার কাছে গিয়ে বলে, “তোমার গল্পগুলো আমাকে শেখাও, আমি লিখে রাখবো। হারাতে দেব না।”

বুড়ি সোমা হেসে বলে, “তুইই পারবি, রে হরি। তুইই তো আমার ‘জড়ি’। তোকে বুনেই তো আমি বেঁচে আছি।”

শালবনির রক্তমাখা মাটি তখন অল্প একটু নড়ে ওঠে।

বায়ো-এনার্জির রাজনীতি

গ্রীষ্মকাল ঢুকতেই শালবনির আকাশে নতুন শব্দ উঠল— হেলিকপ্টার। গাছপালা, পাখির ডাক, মহিষের ঘন্টা— সব চাপা পড়ে যাচ্ছিল সেই শব্দে। পঞ্চায়েত অফিস থেকে ঘোষণা হল: “জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসাবে বায়ো-এনার্জি প্রকল্প গড়ে তোলা হবে। এই অঞ্চলের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।”

গ্রামের লাউডস্পিকারে কেউ বলল, “উন্নয়ন আসছে, কর্মসংস্থান হবে।”
কেউ আবার ফিসফিসিয়ে বলল, “এ উন্নয়ন মানে জমি নেবে, জঙ্গল কাটবে।”
হরিধনের বাবার মুখ ভার। তিনি বলেন, “কাজের নাম করে মাটি খোঁড়ার ছল। এসব শুনেছি বহুবার।”

দিদিমা সোমা একদিন হরিধনকে ডেকে বলেন, “এই উন্নয়ন কীসে হয় রে?”

হরিধন বইয়ে পড়েছে— জিডিপি, স্কিম, ইকোনমিক গ্রোথ। সে বলল, “নতুন কারখানা হবে, বিদ্যুৎ আসবে। আমাদের গ্রামেও শহরের মতো জীবন হবে।”

দিদিমা হেসে উঠলেন না, ঠোঁট শক্ত করে বললেন, “মাটিকে মেরে, জীবন কখনো হয় না।” তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন—
“তোর ঠাকুরদার একটা খামার ছিল, পাশে কুয়ো, মাঠে লাউগাছ। তখনও উন্নয়নের বুলি শোনা যেত— রাস্তা হবে, স্কুল হবে। রাস্তা হল ঠিকই, তবে তার ওপর দিয়ে চলল শুধু গাড়ি। স্কুল হল, কিন্তু বইয়ের ভাষা হল এমন, যাতে আমরা নিজেদের ভুলে যাই। এখন আবার সেই ভাষাতেই বলা হচ্ছে— ‘বায়ো-এনার্জি।’ শুনতে সবুজ, দেখতে কালো।”

পরে হরিধন বাজারে যায়। সেখানে বিশাল এক কাগজের হোর্ডিং টাঙানো—
“EcoWest Energy Ltd. welcomes you to the Future. A Green Bengal Begins Here.”
নীচে মোটা অক্ষরে লেখা—
“We are committed to Sustainability, Community Engagement & Empowerment.”

তবে হোর্ডিংটার পেছনে ছোট হাতের লেখা, কালো মার্কারে:
“আবার একবার মাটি যাবে, কাজটা শুধু আলগা কুয়োর।”

এ যেন দুই ভাষার মধ্যে যুদ্ধ— উপরেরটা কর্পোরেট, নিচেরটা গ্রামের।

পরের সপ্তাহে ‘EcoWest’-এর লোকজন আসে। গাড়ি থেকে নামে ব্লেজার-পরা আধবুড়ো লোক, মুখে ইংরেজি, গলায় বাঁধা পরিচয়পত্র।

হরিধন পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শোনে:

“Look, we are not acquiring land forcefully. It’s a Public-Private-Partnership. The landowners will be compensated generously, and the villagers will be given jobs as contract staff.”
তাদের পাশে দোভাষী দাঁড়িয়ে অনুবাদ করে—
“সরকার আর কোম্পানি মিলে এই জমি উন্নয়নের জন্য নিচ্ছে। আপনারা টাকা পাবেন, চাকরি পাবেন।”

বাবা ফিসফিসিয়ে বলেন, “চাকরি মানে কী রকম?”

“মাটিতে গাছ কাটার কাজ, ওয়েস্ট প্রোসেসিং ইউনিটে হেল্পার, অফিসের সাফাই। ইজ্জত আছে এসব কাজের?”

হরিধনের চোখ তখন দুভাবে ভাগ হয়ে যায়— একদিকে নতুন, চকচকে ভবিষ্যতের প্রলোভন; অন্যদিকে, জড়ি, মাটি আর দিদিমার পুরনো গানের গন্ধ।

দু’দিন পর গ্রামে পঞ্চায়েতের সভা হয়। চেয়ারম্যান উঠে বলেন,
“আমরা পিছিয়ে পড়েছি বহুদিন। এখন সময় এসেছে এগিয়ে যাওয়ার। যারা বাঁধা দেবে, তারা উন্নয়নের শত্রু।”

হরিধনের মা জিজ্ঞেস করেন, “আমরা এই কাজ চাইনি। আমাদের জিজ্ঞেস করল কে?”

চেয়ারম্যান গলা চড়ান, “ডেমোক্র্যাসিতে অনেক সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”

হরিধন এবার দাঁড়িয়ে বলে,
“আপনারা বলছেন আমাদের জন্য করছেন। কিন্তু মাটির কি অনুমতি নিয়েছেন? এই জমিতে আমার দিদিমার গান রয়ে গেছে, আমাদের আত্মা রয়ে গেছে। উন্নয়ন যদি নিজের ভাষা মুছে দেয়, তাহলে সে শাসন— সেবা নয়।”

সবার মুখ থমথমে।

চেয়ারম্যান বললেন, “তুমি ছোটো ছেলে। বেশি বোলো না।”

কিন্তু সেই রাতে হরিধন তার ডায়রিতে লিখে—
“এবার আমি ছোটো থাকব না। আমি লিখব। আমি জড়িকে রক্ষা করব।”

এরপর হরিধন আরও কয়েকজন যুবককে জড়ো করে। তারা ঠিক করে, গ্রামের মানুষের গল্প, হারিয়ে যাওয়া মাটির গান, পুরনো শব্দ, হারিয়ে যাওয়া ভাষা— সব একত্রিত করে “জড়ির খাতা” নামে একটি পুস্তিকা বানাবে। হাতে লেখা হবে, নিজেদের ভাষায়, নিজেদের কাগজে।
এই খাতা স্কুলে নয়, উঠোনে পড়ানো হবে।

শুরু হয় এক নীরব আন্দোলন।

অন্যদিকে কোম্পানির মাটি পরিমাপ শুরু হয়। কিছু গাছ ইতিমধ্যেই কাটা পড়ে। গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে এক অচেনা শব্দ— চেনস হুইং, ট্রাক্টরের গর্জন, লোকজনের ব্যস্ত পা।

এ যেন গ্রামের ওপর নামছে এক ধূসর ভবিষ্যৎ।

একদিন বুড়ি সোমার উঠোনেও কয়েকজন কোম্পানির লোক আসে। তাঁকে বলেন,
“আপনার এখানে শেড হবে, দয়া করে উঠে যান।”

দিদিমা শুধু বলেন, “এই কুয়োর জল খেয়ে আমার তিন পুরুষ বেঁচেছে। তোমরা কী দিয়ে বাঁচাবে?”

তারা কিছু না বলে চলে যায়।

হরিধন তখন জানে— এবার তার গল্প আর শুধু গল্প নয়, তা প্রতিরোধের ভাষা।

সে তার বন্ধুদের বলে, “আমরা গল্প লিখব না শুধু, আমরা কাগজ গড়ব। সেই কাগজ হবে চাষের মতো— মাটি থেকে, শব্দ দিয়ে। যে কাগজে লেখা থাকবে— আমরা কারা, কোথা থেকে এসেছি, এবং মাটি না দিয়ে কিচ্ছু নেব না।”

সেদিন শালবনি রাতে জেগে থাকে।
আকাশে তারা ঝিকমিক করে না,
কিন্তু উঠোনে জ্বলে ওঠে
জড়ির প্রদীপ।

জড়ির খাতা

চৈত্রের দুপুরে শালবনি যেন হাঁফিয়ে উঠেছে। গরমের মাঝে নদী শুকিয়ে এল, পাতায় সবুজ নেই, মাটিতে পায়ে ফাটল। এই খরায়ও কিছু একটা নতুন জন্ম নিচ্ছে— “জড়ির খাতা।”

হরিধনের ঘরের কোণেই সেই কাগজের জন্ম। মাটি, ছাই, পুরনো কাপড়, গবাদি পশুর গোবর আর সোনাঝুরি পাতার নির্যাস দিয়ে তারা তৈরি করল পাতাগুলো। কোনো প্রেসে ছাপা নয়, কোনও কোম্পানির লোগো নয়— নিজেদের ভাষা, নিজের হাতের লেখা, নিজের আঁকা ছবি।

প্রথম পৃষ্ঠায় বড় অক্ষরে লেখা হল—
“জড়ির খাতা: যেখান থেকে আমরা এসেছি, সেখানে ফিরবার রাস্তা।”

পাশেই আঁকা— কুয়োর ধারে এক বৃদ্ধা, মাথায় আঁচল, হাতে একটা তালপাতার বই।

গ্রামের মানুষ প্রথমে ভয় পেয়েছিল।
“ছেলে পাগল হয়ে গেল নাকি?”
“কোম্পানির বিরুদ্ধাচরণ করছো? সাবধান!”
“পুলিশ আসবে!”

কিন্তু কাগজটা হাতে নিয়ে তাদের চোখ কেমন যেন স্থির হয়ে যেত।
দ্বিতীয় পাতায় লেখা—
“আমার দাদু বলতেন— মাটির গন্ধ বোঝার জন্য নাক নয়, হৃদয় লাগে।”
চতুর্থ পাতায় ছবি— মাঠে কাজ করছে এক মহিলা, পাশে একটা বাচ্চা, তার হাতে ধান।

একদিন গ্রামের স্কুলের পুরনো মাস্টারমশাই, মৃণালবাবু, হাতে নিয়ে পড়তে পড়তে বলেন,
“এই ভাষা আমার মা-র ভাষা। যেটা আমি শহরের ইংরেজি স্কুলে গিয়ে ভুলে গেছিলাম।”

তিনি হরিধনকে বলেন, “আমিও একটা গল্প লিখতে পারি?”
হরিধন মাথা নেড়ে বলে, “এই খাতায় সবাই লিখতে পারে। এটা আমাদের।”

এক রাতে তারা নদীর পাড়ে এক উঠোনসভা করে। বাঁশের খুঁটির সাথে ঝুলে থাকে তালপাতা। পাশে ধূপজ্বালা, একটা মাদল বাজে হালকা। সকলে মাটিতে বসে। আলো কম, কিন্তু মুখ উজ্জ্বল।

হরিধন বলে,
“আজ থেকে আমরা আমাদের ভাষায় আমাদের কথা লিখব। প্রতিরোধ মানে শুধু রাস্তায় নেমে স্লোগান নয়— প্রতিরোধ মানে নিজের মাটি চেনা, নিজের গন্ধে ফেরার পথ খোঁজা।”

মেয়েরা কবিতা পড়ে, কেউ গায় বাউলগান, কেউ নিজের কষ্টের কথা বলে—
“জমি গেছে, গরু নেই, কিন্তু মনটা এখন নিজের মতো কথা বলছে।”

এর নাম তারা দেয়— “আত্মভাষা সভা।”

তবে এই সাড়া যে একা গ্রামেই রয়ে গেল, তা নয়।

শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রছাত্রী খবর পায় এই ‘জড়ির খাতা’র। তারা আসে ক্যামেরা আর নোটবুক নিয়ে। প্রথমে প্রশ্ন করে, ছবি তোলে, তারপর নিজেরাই চুপ হয়ে যায়।

একজন বলে,
“আমরা ‘ইনক্লুসিভিটি’, ‘আর্থিক সমতা’, ‘জেন্ডার ডায়নামিকস’ পড়ি। কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে— তোমরা সেটা লিখছ, যেটা আমরা শুধু কাগজে পড়ি।”

একজন বলে,
“আমরা তোমাদের খাতা শহরে নিয়ে যাবো।”

হরিধন উত্তর দেয়,
“খাতা নিয়ে যেতে পারো, কিন্তু ভাষাটা বুঝতে হলে আগে জুতো খুলে এই মাটিতে বসো।”

তারা বসে।

এই খবরে EcoWest ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের জনসংযোগ আধিকারিক এক চিঠি পাঠায়—
“এই কার্যকলাপ কোম্পানির ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে। সরকারি অনুমতি না নিয়ে কোনো বিকল্প প্রচার চালানো বেআইনি।”

চিঠি আসে পঞ্চায়েত অফিসে। চেয়ারম্যান মুখ গম্ভীর করে বলে,
“তোমরা বিপদ ডেকে আনছো।”

হরিধনের মা এবার বলে ওঠেন,
“আমার ছেলে কাগজ লিখছে, চুরি নয়, আগুন নয়। তোমরা ভয় পাও কেন?”

চেয়ারম্যান চুপ।

এরপর একদিন মাটির খাতার এক বিশেষ সংখ্যা বের হয়—
“জমি ও গান।”

তাতে ১৪টি পরিবার তাদের জমি হারানোর গল্প বলে। একজন লেখে—
“আমার পাটক্ষেত ছিল, এখন সেখানে স্টিলের টাওয়ার উঠছে।”
আরেকজন লেখে—
“গানের গলাটা শুকিয়ে গেছে, জলের পুকুরটা নেই বলে।”

শেষ পাতায় আবার লেখা—
“মাটি কথা বলে। শুনতে পারো?”

এই খাতা পোস্ট করা হয় শহরের কিছু ছোট ম্যাগাজিন, কবি ও সমাজকর্মীদের কাছে। ধীরে ধীরে ‘জড়ির খাতা’ হয়ে ওঠে এক প্রতিরোধের প্রতীক।

এক রাতে হরিধন তার দিদিমার কাছে বসে বলে,
“তুমি কি জানো, আমাদের গল্পগুলো এখন শহরের মানুষও পড়ছে?”

দিদিমা মৃদু হাসেন। বলেন,
“গল্প তো অরণ্যের আগুনের মতো। প্রথমে ধোঁয়া, তারপর জ্বলন। তুমি শুধু আগুনটা বাঁচিয়ে রাখো।”

কৌশলের গন্ধে লুকোনো আগুন

EcoWest চুপচাপ থাকেনি। ওরা জানত— প্রতিরোধ যদি কবিতা দিয়ে শুরু হয়, তা সময়ের সাথে আগুনে রূপ নেয়। আর আগুন তো ছড়ায়।

তারা আর হুমকি দেয় না। এবার চুক্তিপত্র নিয়ে আসে।

চুপচাপ একদিন সকালে তিনটে গাড়ি আসে শালবনির পাড়ে। গাড়ির গায়ে লেখা— “Community Development Wing, EcoWest Initiative.”
লোক নামছে স্যুট পরে, হাতে ল্যাপটপ, ক্যামেরা। সঙ্গে গরম খাবার, চকচকে কাগজের ব্যাগ। ছোট ছোট বাক্সে ছেলেমেয়েদের জন্য পেনসিল, চকোলেট।

সঙ্গে আসে একজন— সুমনা সেনগুপ্ত, যারা নিজেদের পরিচয় দেয় “লোকসংযোগ আধিকারিক” হিসেবে।

তিনি মিষ্টি গলায় বলেন,
“আমরা এই অঞ্চলে উন্নয়নের অংশীদার হতে চাই। কিছু দুষ্কৃতিরা ভুল বার্তা ছড়াচ্ছে। EcoWest এখন আপনাদের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল ও কৃষি-সহায়ক প্রকল্প আনতে চায়।”

গ্রামের অনেকে অবাক। পঞ্চায়েত অফিসের সামনে বসে তারা শুনছে, কেউ চুপচাপ কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে, কেউ চোখ নামিয়ে আছে।

তবে সুমনার কথা যতই মোলায়েম হোক, দৃষ্টিতে একটা হিসেবি চকচকানি।

হরিধন সেই সভায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার পাশে ছিল জড়ির খাতার কয়েকজন লেখক— চুমকি, রবীন, পঁচিশ বছরের ময়না যিনি সদ্য বিধবা হয়েছেন এবং এখন কবিতা লেখেন।

সুমনা মঞ্চ থেকে বলেন,
“আমরা চাই এই অঞ্চলের সংস্কৃতি সামনে আসুক। EcoWest আগামী মাসে একটি বই প্রকাশ করতে চলেছে— ‘মাটি ও শিল্প: এক গ্রামীণ কল্পনাভূমি।’
তাতে থাকবে এই অঞ্চলের ছবি, কবিতা, গল্প। আমাদের ডিজাইন টিম প্রস্তুত। যারা অংশ নিতে চান, তালিকা তৈরি হবে।”

কেউ কেউ হাত তোলে। চুমকি দেখে, পাড়ারই যুবক তপন হাত তুলেছে— যে গত সভায় বলেছিল, “EcoWest-কে তাড়িয়ে দিতে হবে।”

পিছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা হরিধন এবার বলে ওঠে—
“এই কবিতার খাতা কি EcoWest-এর লোগো থাকবে?”

সুমনা হাসেন,
“অবশ্যই। যারা অর্থ দিচ্ছে, তাদের স্বীকৃতি তো থাকা দরকার, নয়?”

হরিধনের চোখে ছায়া পড়ে। সে বলে—
“আমরা যারা নিজেদের কষ্ট, আমাদের ভাষা, আমাদের স্মৃতি লিখছি, তারা কি নিজেদের লেখার মালিক থাকবে?”

সুমনা এবার গম্ভীর হয়ে ওঠেন,
“আপনি কি আমাদের সদিচ্ছাকে সন্দেহ করছেন?”

হরিধন শান্ত গলায় বলেন,
“সন্দেহ নয়, শিক্ষা। আমরা শিখে গেছি, সদিচ্ছার মধ্যে কর্পোরেট কৌশল কিভাবে ঢুকে পড়ে।”

পরের দিন সকালে পাড়ার বাজারে খই বিক্রি করতে আসা রমেশ বলে,
“হরিধনের বেশি কথা এখন ভালো লাগছে না। কোম্পানি তো কাজ করতে চাইছে, তো কী দোষ?”

চুমকি বলে,
“তুই তো তিন মাস আগেও বলেছিলি জমি গিলে খাচ্ছে কোম্পানি।”
রমেশ মাথা ঘুরিয়ে নেয়, বলে,
“সময় বদলায়।”

গ্রামে ‘জড়ির খাতা বনাম EcoWest বই’ নিয়ে বিভাজন স্পষ্ট হতে থাকে। কেউ বলে, “EcoWest টাকা দিচ্ছে, আর ওরা শুধু কবিতা লেখে।”
কেউ বলে, “নিজের ভাষা বিক্রি করে কেউ উন্নয়ন পায় না।”

এক রাতে, হরিধন দেখল— ঘরের পাশের গাছতলায় রাখা জড়ির খাতার একটা বান্ডিল ভিজে গেছে, কেউ জল ঢেলে দিয়েছে।

সে বোঝে— ভয় নয়, এবার লোভ কাজ করছে।

তবে সে পিছিয়ে আসে না।
সে একটা সভা ডাকে। তবে এইবার মঞ্চ নেই, হ্যান্ডমাইক নেই, চেয়ার নেই। সবাই বসে খড়ের উপর, আগুনের চারপাশে। গলায় কাঁপন, চোখে আগুন।

সে বলে—
“আমরা ভাষা লিখেছি কষ্ট দিয়ে। EcoWest এখন চায় আমাদের ভাষাও তাদের সম্পত্তি হোক।”

একজন বলে—
“কিন্তু তারা স্কুল করবে, হাসপাতালও দেবে।”

হরিধন উত্তর দেয়,
“জানো কারা ওই স্কুলে পড়াবে? বাইরের লোক। কারা ওই হাসপাতাল চালাবে? কোম্পানির কর্মচারী। আমাদের ছেলে-মেয়েরা কি শুধু দর্শক থাকবে?”

চুপ।

এরপর, তারা সিদ্ধান্ত নেয়— জড়ির খাতা আর শুধু কাগজে থাকবে না। তারা একটি খোলা পাঠশালা চালু করবে।

নাম দেয়—
“মাটি পাঠ”

প্রথম পাঠ—
“আমার জমির ইতিহাস”
দ্বিতীয় পাঠ—
“মায়ের মুখের গান আমি কিভাবে লিখি”

কোনো ক্লাসরুম নয়। ছাতার নিচে, বটতলায়, নদীর ধারেই হয় পাঠ। ছেলেমেয়েরা এসে পড়ে, প্রশ্ন করে, গল্প লেখে।

EcoWest এবার অন্য কৌশল নেয়। সুমনা এবার সাংবাদিকদের নিয়ে আসে। তারা ছবি তোলে, ক্যামেরা নিয়ে চুমকির কাছে যায়।
একজন প্রশ্ন করে,
“আপনারা কি উন্নয়নের বিরুদ্ধে?”

চুমকি বলে—
“আমরা নিজেদের স্বর ফিরে চাইছি। উন্নয়ন চাই, তবে শর্ত ছাড়া নয়।”

সাংবাদিক আবার জিজ্ঞেস করে,
“আপনাদের কথা কি কেউ শুনবে?”

চুমকি শান্ত গলায় বলে—
“যদি মাটি শুনতে পারে, তবে মানুষও পারবে।”

হরিধন জানে, আগামি দিনে EcoWest হয়তো আরও বড় প্রস্তাব নিয়ে আসবে— হয়তো পুলিশ, হয়তো কাগজে নোটিশ।
কিন্তু এখন সে জানে—
গ্রামে আবার মাটি নিয়ে কথা হচ্ছে।
লোকজন আবার নিজেদের গল্পে ফিরছে।
তারা বুঝতে শিখছে—
ভাষা শুধু উচ্চারণ নয়, অস্তিত্ব।

রক্তে লেখা একটি চিঠি

আষাঢ়ের শুরু। আকাশে মেঘ জমে থাকলেও বৃষ্টি নামে না।
এইরকম এক থমথমে সকালে, হরিধনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তিনজন লোক— পুলিশের পোশাকে।

সঙ্গে এক প্যাকেট কাগজ।
উপরে সরকারি সিল, তলায় সই:
“জমি অবরোধ ও কোম্পানির কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত প্রক্রিয়া চলবে। অভিযুক্ত: হরিধন গরাই, চুমকি সাঁতরা, ময়না মল্লিক ও অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও কয়েকজন।”

হরিধনের মা সেই মুহূর্তে উঠোনে ভাত মাড় ঝরাচ্ছিলেন। মুখে বললেন না কিছু, কিন্তু ঝাঁঝে ভরা চোখে তাকিয়ে ছিলেন পুলিশের দিকে।

চুমকি খবরটা শুনে খড়ের উঠোনে বসে চুপ হয়ে গেল।
ময়না গলায় বলল—
“ওরা ভয় পেতে শুরু করেছে।”

রবীন হাসল, “আর ভয় পায় যে, তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয় আইন।”

তারা জানত, এই লড়াই এখন শুধু কবিতার নয়। এটা ‘নির্মাণ বনাম নিঃস্বতা’র গল্প। উন্নয়ন বনাম অধিকার নয়, বরং কর্পোরেট হজম বনাম লোকজ হুংকার।

জড়ির খাতা এবার পাল্টে গেল ‘জাগরণের খাতা’তে’।

প্রত্যেকটি পাতায় কবিতার সাথে যুক্ত হতে লাগল ঘটনা, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হতে লাগল মানুষের স্বাক্ষর।

কেউ লিখল:
“এই আমার মাটির ঘ্রাণ। আমার পায়ের নিচে না-থাকলে আমি মানুষ নই।”

কেউ লিখল:
“ওরা ল্যাপটপে গাছ এঁকে দেয়, আমি ছায়া খুঁজি।”

চুমকি একদিন বলল—
“এই লেখা তো আসলে চিঠি। ভবিষ্যতের দিকে লেখা চিঠি। যেখানে লেখা থাকবে, আমরা একদিন নিজের স্বর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।”

হরিধনের উপর একদিন গোপনে হামলা হয়।

সন্ধ্যাবেলায়, সে যখন নদীর ঘাট থেকে ফিরছিল, তখন তিনজন লোক— মুখ ঢাকা— তাকে ঘিরে ধরে।
একজন লাঠি তোলে, আরেকজন বলে,
“বেশি কবিতা লেখা ভালো নয়, হরিধন দা। কোম্পানি চাকরি দিতে চায়, আর আপনি মানুষকে উলটো শেখাচ্ছেন।”

হরিধন চোখে চোখ রেখে বলে—
“আমি কেবল মানুষকে শেখাচ্ছি, কিভাবে নিজেদের কথা নিজে বলতে হয়।”

তারপরেই প্রথম ঘুষি আসে।

ঘুষির পর লাথি।
গায়ে কাঁটা পড়ে থাকে বাঁশঝাড়ের ডগা।
একটা কবিতার খাতা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যায় ওরা, পায়ে মাড়িয়ে।

পরদিন সকালে গ্রামের ছেলেমেয়েরা যখন শুনল হরিধনের হামলার কথা, তারা কেউ স্কুলে গেল না।

তারা লিখে ফেলল—
“আমাদের শিক্ষককে মেরেছে যারা, আমরা তাদের ভাষা শিখব না।”

গ্রামের প্রবীণ নারীরা চুমকিকে জড়িয়ে বলল—
“আমাদের কণ্ঠস্বর হরিধন। ওর উপর হাত দেওয়া মানে, আমাদেরই গলা টিপে ধরা।”

একজন ষাটোর্ধ্বা চাষি, যিনি এতদিন চুপচাপ ছিলেন, বললেন—
“আমার জমির দলিল নিতে এসেছিল EcoWest। আমি সই করিনি। এখন বুঝলাম কেন।”

EcoWest এবার নিজস্ব লোক দিয়ে একটা নতুন সভা করে।

এই সভায় ডাক পড়ে সরকারি আধিকারিকদের।
মঞ্চে উঠে এক আধিকারিক বলেন—
“রাজ্য সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যারা কবিতা লেখা শিখিয়ে এইসব প্রতিবাদ করছে, তারা আসলে বহিরাগতদের প্ররোচনায় চলছে।”

সুমনা সেনগুপ্ত বলেন—
“EcoWest আপনাদের শিল্পকে বিশ্বের সামনে আনতে চায়। কিছু ‘পূর্বনির্ধারিত’ মানুষ এই স্বপ্নে বাধা দিচ্ছে।”

এই সভায় হরিধন ছিল না।
কিন্তু তার লেখা ছিল।

চুমকি পরদিন সকালে বাজারে গিয়ে ছোট ছোট ছাপানো খাতা বিলি করতে থাকে—
“জমির পেছনে দাঁড়ানো আত্মার কবিতা”

খাতার প্রথম পাতায় লেখা ছিল:

“আমাকে যদি দোষী করা হয় নিজের ভাষা ভালোবাসার জন্য,
তবে সেই দোষ স্বীকার করি।
আমার রক্ত, আমার মাটি, আমার ভাষা— এরা ভিন্ন নয়।
আমি কাঁপব না,
আমি লিখব।”

এইবার গ্রাম আর কেবল পাঠশালার জায়গা নয়, হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ব্যারিকেড।

প্রত্যেক বাড়িতে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা স্লোগান:

“লেখা মানে জমির দাবি।”

“EcoWest-এর ভাষা না, নিজের ভাষায় স্বপ্ন দেখি।”

“আমরা কাগজে নয়, মাটিতে স্বাক্ষর করি।”

তারা জানে— রাজনীতি বদলাবে, কোম্পানি আসবে যাবে।
কিন্তু ভাষা যদি থেকে যায়, স্মৃতি থাকবে।
আর স্মৃতি থাকলে, মানুষ একদিন জাগবেই।

হরিধন শয্যাশায়ী।
মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখে রোদ পড়লে ব্যথা করে।
তবু সে বলে—
“তোমরা লিখতে থাকো। আমি দেখব না, শুনব না, শুধু জানব— শব্দরা চলছে।”

তার ঘরের পাশে রাখা আছে একটা খাতা।
তাতে সে লিখে গেছে শেষ চিঠি—

“আমার শরীর হারিয়ে যাবে,
কিন্তু তুমি যদি মাটিতে পা রাখো,
আমি ফিরে আসব শব্দ হয়ে,
সেইসব গাছের ছায়ায় যেখানে আমাদের প্রথম কবিতা লেখা হয়েছিল।”

জমির নিচে শব্দেরা জেগে ওঠে

হরিধনের ঘর এখন আর কেবল একটি বাড়ি নয়,
ওটা এক কেন্দ্র, এক তপ্ত আলো,
যেখান থেকে প্রতিদিন বেরিয়ে আসে নতুন নতুন কাগজের খাতা।
পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় লেখা থাকে—

“আমরা হই নিজের ইতিহাসের লেখক।”

জড়ি এখন ছড়িয়ে গেছে পাঁচটি গ্রামে।
প্রতিটি গ্রামের উঠোনে, কারও পানের দোকানে, কারও স্কুল ঘরের বারান্দায়—
একটা করে খাতা রাখা থাকে।
কে কী ভাবছে, কে কী হারিয়েছে, কে কী চাইছে— সব লেখা হয় ওই খাতায়।

কেউ বাংলা ছড়ায়, কেউ ওঁরাও ভাষায়, কেউ সাঁওতালি হরফে।

চুমকি বলে,
“ভাষা আলাদা হতেই পারে, কিন্তু শিকড় তো এক।”

একদিন ময়না সেই খাতার একটা পৃষ্ঠা তুলে পড়ে—

“আমার মা বলেছিল, জমি মেয়েদের হয় না।
এখন জানি, এই মাটি আমাদেরও।
যতক্ষণ আমরা দাঁড়িয়ে থাকি, ততক্ষণ এই জমি আমাদের।
কেউ কাগজে লিখে নিক, তাতে কিছু যায় আসে না।”

পড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে—

“এই কথাগুলো কেবল কবিতা নয়। এ তো মিছিল।”

EcoWest এবার নতুন কৌশল নেয়।

তারা বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলে:
“তিনশো বিঘা জমিতে তৈরি হবে ইকো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক।
স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুবর্ণ সুযোগ।
আগে এলে সুযোগ বেশি!”

একটি পোস্টারে মুখচেনা এক যুবকের ছবি, যার নিচে লেখা:
“আমি আগে সই করেছিলাম। এখন আমার বাইক আছে, নতুন মোবাইল আছে।”
“আপনিও পারবেন!”

এইসব বিজ্ঞাপন এসে ঢোকে সেই স্কুলে, যেখানে হরিধন একদিন জড়ির খাতা খুলেছিল।

কিন্তু এই পোস্টার কেউ দেয়ালে টাঙাতে পারল না।
কারণ, ছাত্ররাই তা ছিঁড়ে দেয়।

তারা বলে—
“আমরা বাইক চাই না, মাটির ছায়া চাই।”
“আমরা মোবাইল চাই না, জলের অধিকার চাই।”

তারা হরিধনের খাতা থেকে পাঠ করে,
তাদের নতুন পাঠ্যক্রম এখন ‘প্রতিরোধের সাহিত্যে’ লেখা।
তারা আর কেবল ভাষা শেখে না, তারা শেখে কীভাবে ভাষা অস্ত্র হয়।

চুমকি কলকাতায় যায়।
কবিতা পাঠের এক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে বলে—

“আমি সেই অঞ্চল থেকে এসেছি যেখানে জমি দখল মানে স্মৃতি হরণ।
যেখানে শিল্পের নাম করে শিকড় ছেঁড়া হয়।
কিন্তু আমরা শুধু গাছ নয়, আমরা বট।
আমাদের শিকড় ভেতরে ভেতরে ছড়ায়।
আমাদের ভাষা থেমে যায় না।”

সেদিন তার পাঠ করা কবিতা ছাপা হয় এক অনলাইন পত্রিকায়।
কয়েকদিনের মধ্যে তা ভাইরাল হয়।

শহরের কিছু ছাত্র তখন ওই গ্রামের জড়ির খাতা দেখতে চায়।

রবীন তাদের নিয়ে যায়।
তারা আসে ক্যামেরা আর নোটবুক নিয়ে।

কিন্তু যখন তারা খাতার এক একটা পৃষ্ঠা পড়ে, তখন ক্যামেরা বন্ধ করে রাখে।
কারণ তারা বুঝে যায়, এই ভাষা চিত্র নয়— অনুভব।

তারা লেখে—
“এইখানে শব্দগুলো মাটির নিচে জেগে আছে।
এইখানে শব্দ মানে অস্তিত্ব।”

তারা ফিরেও যায় না।
দুজন ছাত্র থেকে যায় ওই গ্রামে।
প্রতিদিন স্থানীয় ভাষা শেখে, কবিতা লেখে।

EcoWest এবার গ্রামে লোক পাঠিয়ে সরাসরি হুমকি দেয়:

“পাঁচদিনের মধ্যে জমি না ছাড়লে, কেস হবে দেশদ্রোহিতার।
আপনারা নাকি সরকার বিরোধী গোষ্ঠীর হয়ে কথা বলছেন।”

হরিধনের মা উঠে দাঁড়ান।
কোমরে আঁচল বেঁধে বলেন—

“সরকার যদি গরিবের ভাষা বুঝতে না পারে, তবে সে আমাদের নয়।
আমরা যারা দাঁড়িয়ে আছি, তারা দেশদ্রোহী নয়— দেশদ্রোহের শিকার।”

চুমকি জড়ির খাতা থেকে পড়ে—

“ভুলে যেও না, জমি শুধু মাটি নয়।
জমি হলো ঘাম, হাসি, কান্না, রক্তের গল্প।
আর সেই গল্প যদি চাপা পড়ে, তবে দেশটা কেবল রাস্তা আর বিল্ডিং হয়ে থাকে।
মানুষ নয়।”

এখন প্রতিরোধ শুধু একটা গল্প নয়।
এটা একটা আন্দোলন।
একটা নীরব বিপ্লব।

হরিধনের শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে।
সে এখন বসে বসে নতুন খাতা সাজায়।
নতুন ছেলেমেয়েরা এসে কবিতা পড়ছে, গান লিখছে, নাটক করছে।

এখন তার উঠোনে একটা কাঠের তক্তায় লেখা—

“এখানে লেখা হয় মানুষের মাটি নিয়ে।”

লাল পতাকার নিচে জড়ি

শীতের সকাল।
নবান্নের গন্ধ মিশে আছে বাতাসে,
কিন্তু কুয়াশার চাদরের ভেতরেও জড়ি এখন আরও স্পষ্ট, আরও দৃঢ়।

হরিধনের উঠোনের ঠিক পেছনে তৈরি হয়েছে একটা নতুন কাঠের ঘর—
কোনও সরকারি বরাদ্দে নয়,
সবাই মিলে হাত লাগিয়ে গড়া, নিজেরাই বানানো ঘর।

ঘরের ওপরে বাঁশের মাচায় একটা লাল কাপড় উড়ছে—
একটা লাল পতাকা।
তাতে হাতে আঁকা সাদা অক্ষরে লেখা—
“জমি-কথা”

“জমি-কথা” এখন শুধু একটা পত্রিকার নাম নয়।
এটা এক ঘোষণা, এক প্রতিবাদ, এক সাহস।

এই লিটল প্রেসে কোনো বড় প্রেসের ছাপ নেই।
কিন্তু প্রতিটা অক্ষর, প্রতিটা লাইন— হাতে লেখা, নিজের ভাষায়।
ওদের ভাষা কেউ আগে কাগজে দেখেনি।
এখন দেখছে।
এখন বুঝছে— গলা শুধু শোনা যায় না, পড়াও যায়।

প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়—

ময়নার লেখা গল্প: “সুপর্ণার স্বপ্ন আর এক বিঘা জমি”

চুমকির কবিতা: “জমির নিচে মাতৃভাষা”

রবীনের প্রতিবেদন: “EcoWest-এর ‘উন্নয়ন’ বনাম আমাদের অস্তিত্ব”

আর হরিধনের চিঠি: “একজন মৃতপ্রায় মানুষ লিখছে তোমাদের কাছে”

চিঠির প্রথম লাইন:

“আমি মরিনি।
বরং এই লেখার মধ্য দিয়ে আবার জন্ম নিচ্ছি।”

প্রতিদিন সন্ধ্যায় ওই ঘরে আলো জ্বলে।
কোনও LED নয়, এক পুরনো হ্যাজাক ল্যাম্প।
তাতেই আলো, তাতেই আলোড়ন।

লোক আসে চারপাশের গ্রাম থেকে।
মেয়েরা দল বেঁধে আসে শিশুকে কোলে নিয়ে,
পুরুষরা আসে দিনশেষের ক্লান্তি নিয়ে।

সবাই লেখে, পড়ে, শুনে।
“জমি-কথা” শুধু ছাপা হয় না— বলা হয়, গাওয়া হয়।

একদিন এক অচেনা লোক আসে বাইসাইকেলে।
শহর থেকে।
নাম— অমিত।
সে একটি ছোট পত্রিকায় লেখে।
সে বলে—
“আমি শুনেছি আপনারা নিজেরা পত্রিকা বানান।
দেখতে চাই, বুঝতে চাই।”

হরিধন তাকে নিয়ে যায় কাঠের ঘরের ভেতর।
অমিত দাঁড়িয়ে থাকে স্তব্ধ।
সে চেয়ে দেখে, একটা শিশু তার মায়ের কোলে বসে খাতায় কিছু আঁকছে—
একটা গাছ, আর তার শিকড়।

তার নিচে লেখা:

“আমার মা বলে, এই গাছের শিকড় আছে মাটির ভেতরে।
কিন্তু এখন আমি জানি, শিকড় আছে কথার ভেতরেও।”

অমিত ফিরে গিয়ে লেখে—
“এ এক বিপ্লব যা চুপিচুপি ঘটে।
বন্দুক নেই, কিন্তু প্রতিরোধ আছে।
এই প্রতিরোধ ভাষায়, এই প্রতিরোধ কল্পনায়।
‘জমি-কথা’ এক নতুন ভারত গড়ার ইশতেহার।”

তার লেখা ভাইরাল হয়।
EcoWest তাতে আরও অস্থির হয়ে ওঠে।

এরপর EcoWest-র লোকেরা আসে একদল উকিল আর কনস্টেবল নিয়ে।
তারা হরিধনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে—
“আপনারা সরকার অনুমোদন ছাড়া প্রেস চালাচ্ছেন।
আপনারা ছড়াচ্ছেন বিদ্রোহ।
এই প্রেস বন্ধ হবে।”

হরিধনের মা সামনে এগিয়ে বলেন—
“এটা প্রেস নয়, এটা আমাদের কণ্ঠ।”

চুমকি উঠে পড়ে তার কবিতা—

“তোমরা বলো, লিখতে নেই।
আমরা বলি, না লিখলে মরবো।
তোমরা বলো, জমি দাও।
আমরা বলি, জমি মানে আত্মা।”

লোকজন জড়ো হয়।
পাঁচশো লোক।
কেউ হাতে বাঁশের লাঠি, কেউ হাতে পত্রিকার পাতা।

তারা শ্লোগান দেয়—
“EcoWest হটাও, জমি বাঁচাও!”
“ভাষা বাঁচাও, মুখ বাঁচাও!”

পুলিশ পিছু হটে।
কারণ তারা দেখে,
এই গ্রামে ভয় নেই— শুধু জড়ি আছে।

EcoWest এবার মিডিয়ার কাছে গিয়ে বলে—
“গ্রামে মাওবাদী কার্যকলাপ চলছে।”
কিন্তু শহরের ছাত্ররা যারা প্রথম ‘জড়ি’ পড়ে এসেছিল, তারা পাল্টা বলেন—

“এটা মাওবাদ নয়, এ সমাজবাদ।
যেখানে মানুষ নিজেরা নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পায়।”

তারা কলকাতার প্রেস ক্লাবে জমি-কথার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।
শহরে বইমেলায় “জমি-কথা”-র স্টল বসে।
তাতে লেখা থাকে—
“এটি গরিব মানুষের সাহিত্য।”

এখন “জমি-কথা” ছাপা হয় প্রতি মাসে।
তাতে শুধু কবিতা বা প্রতিবাদ নয়,
থাকে স্থানীয় গল্প, রান্নার রেসিপি, হারিয়ে যাওয়া লোককথা,
আর থাকে ছোটদের আঁকা ছবি,
যেখানে মাটির রঙ লাল, আর আকাশ— ছাই-নীল।

হরিধন এখন হাঁটতে পারে।
সে নতুন ছেলেমেয়েদের শেখায়— কীভাবে কলম ধরে, কীভাবে শব্দ জাগে।

সে বলে—
“যে কথা উচ্চারিত হয় না, তাকেও লেখা যায়।
যা লেখা যায়, তা-ই বদলায় সব।”

 

জড়ি ও রাষ্ট্রের মুখোমুখি

দুই সপ্তাহের মধ্যে বদলে গেল সবকিছু।
যেখানে আগে ছিল জমির নীরবতা, সেখানে এখন সরকারি কাগজের আওয়াজ।
EcoWest আর সরকারের মিলিত বিজ্ঞপ্তি এল পঞ্চায়েত অফিসে—

“পূর্ব গার্ডেনিয়া ব্লকের এই এলাকা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) হিসেবে ঘোষিত হচ্ছে।
কৃষিকাজ ও বসতভূমি ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপিত হবে উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে।”

উন্নয়ন।

এ এক শব্দ যা বহুজাতিক দালালরা তোলে, আর মাটির নিচে চুপচাপ চাপা পড়ে মানুষের ঘাম।

পঞ্চায়েত প্রধান— হরলাল হেমব্রম— নোটিসের কপি নিয়ে চুপচাপ গিয়ে বসেন ময়নার কাছে।
“মেয়ে, এই উন্নয়নের মানে আমি জানি না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি—
এটা আমাদের জন্য নয়।”

ময়না তখনই ডাকে চুমকি, রবীন, কালীচরণ আর মুন্নি বুড়িকে।
পাঁচজন মিলে ঠিক করে—
এবার গড়ে তোলা হবে ‘লোকমাটি পরিষদ’।

লোকমাটি পরিষদের মূল কথা ছিল সহজ:

যারা এখানে বাস করে, তারাই সিদ্ধান্ত নেবে এই মাটির ভবিষ্যৎ।

“উন্নয়ন” হবে লোকের মত নিয়ে, লাঠি বা লোভ দিয়ে নয়।

নিজস্ব ভূমি-আইন তৈরির প্রস্তাব রাখা হবে স্থানীয় জনতার সভায়।

এ এক ছায়া-সংসদ, রাষ্ট্রের ছায়ায় নয়— লোকশক্তির আলোয়।

পরদিন সকালে জড়িপুরের চৌরাস্তার মাঠে বসে লোকসভার প্রথম অধিবেশন।
একটা কাঁঠালের গাছের নিচে টাঙ্গানো হয় লাল কাপড়—
তার ওপরে সাদা রঙে লেখা—
“লোকমাটি পরিষদ: মাটি ও মানুষের গণতন্ত্র”

আসে আশেপাশের আটটা গ্রামের প্রায় হাজারখানেক মানুষ।
কেও আসে চাটাই নিয়ে, কেউ খালি পায়ে।

সভা শুরু করেন হরিধন।
তার গলায় কাঁপন ছিল, কিন্তু চোখে ছিল দাবির আগুন।

“তোমরা বলো উন্নয়ন।
আমাদের জিজ্ঞেস করেছ একবার?
আমাদের স্কুল দাওনি, হাসপাতাল দাওনি, সেচ দাওনি।
এবার জমি নিচ্ছো আর বলছো— উন্নয়ন?
এ কোন রাষ্ট্র, যে নিজের মানুষকে না জিজ্ঞেস করেই তার জমি চুরি করে?
আমরা তা মানব না।”

তারপর উঠে দাঁড়ায় চুমকি।
সে পড়ে তার কবিতা—

“রাষ্ট্রের মুখ গম্ভীর,
মুখে উন্নয়নের কালি।
কিন্তু চোখে জ্বলজ্বল করে জমির দাম।
আমরা বলি—
আমাদের রক্ত দিয়ে আঁকা এই মাঠ,
বিক্রি হবে না।”

তখন এক বৃদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে বলে—

“আমার ছেলেটা শহরে গিয়েছিল কাজ করতে। ও মরেছে এক নির্মাণ সাইটে।
এখন তোমরা বলো আমাদের মাটিও ছাড়তে হবে?
না, এবার থাকবো। শেষ রক্ত ফোঁটা দিয়ে থাকবো।”

“লোকমাটি পরিষদ” ঠিক করে, প্রতি গ্রামে তৈরি হবে ভাষা-পার্চা কমিটি।
এই কমিটি কাগজের ভাষাকে মানুষের ভাষায় অনুবাদ করে বুঝিয়ে দেবে মানুষকে—
“এই কাগজ মানে কী”, “এই উন্নয়ন মানে কী”, “এই অধিকার মানে কী”।

ভাষা বোঝা মানেই লড়াই বোঝা।
আর লড়াই বোঝা মানেই জেতার শুরু।

EcoWest এর লোকেরা ভয় পায়।
তারা এবার সরকারকে চাপ দেয়—
“জমি হস্তান্তরের জন্য পুলিশি সহযোগিতা প্রয়োজন।”

পুলিশ আসে তিন ট্রাকে।
লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলে—

“আপনারা সরকারি জমি দখল করে রেখেছেন।
নোটিস দেওয়া হয়েছে।
আপনারা সরে না গেলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।”

মাঠে তখন প্রায় দু’হাজার লোক।
তারা পিছু হটে না।

চুমকি এগিয়ে এসে বলে—

“আপনারা কাকে ধরবেন?
আমার দাদু এই মাটিতে মরেছেন।
ধরবেন তাঁকে?
আমাদের সন্তান এখানে জন্মেছে।
তুলে নেবেন তাদেরও?”

তখনই সামনে আসে এক বালক, সাত বছর বয়স।
তার হাতে ‘জমি-কথা’র শিশু সংখ্যার কপি।
সে পুলিশকে বলে—
“আঙ্কেল, আমার স্কুল তো দূরে।
এই জায়গায় স্কুল হবে না?”

পুলিশ স্তব্ধ।
নোটিস গুটিয়ে গাড়িতে ওঠে।

হরিধন চুপ করে বলে—
“তারা যাবে।
আবার আসবে।
কিন্তু আমরা যাবো না।
আমরা জড়ি, মাটি থেকে উঠে আসি, আবার মাটিতেই ফিরে যাই।”

সন্ধ্যায় “লোকমাটি পরিষদ”-এর সভায় সিদ্ধান্ত হয়—
সুপ্রিম কোর্টে লোকমাটি পরিষদের পক্ষে মামলা করা হবে।
এক আইনজীবী, শহরের এক তরুণ, নাম অর্ক সেনগুপ্ত— নিঃশর্তে মামলা লড়বেন।

তিনি বলেন—

“এই লড়াই শুধু জমির নয়, এই লড়াই ভাষার।
রাষ্ট্র যখন জনতার ভাষা বোঝে না, তখন আইন হতে পারে লোকের মুখ।
আমি সেই মুখকে কোর্টে নিয়ে যাবো।”

শেষ রক্তবিন্দু ও নতুন বপন

আদালতের দিন।

দিল্লির সুপ্রিম কোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে লোকমাটি পরিষদের প্রতিনিধিরা—
চুমকি, ময়না, হরিধন, মুন্নি বুড়ি আর শহরের তরুণ আইনজীবী অর্ক সেনগুপ্ত।
সবার হাতে মাটি ভর্তি ছোট্ট কাপড়ের থলে—
জমির নীরব সাক্ষী তারা নিয়ে এসেছে আদালতে।

অর্ক বললেন,

“আজ আমরা কেবল জমির কথা বলব না—
আমরা বলব যে রাষ্ট্র তার জনতার ভাষা ভুলে গেছে।
আমরা তাকে মনে করাবো।”

আদালত গম্ভীর।
EcoWest-এর পক্ষে তুখোড় ব্যারিস্টার।
তাঁর কথায় শুধু সংখ্যার নাচ—

“৪৬৬ একর জমি।
১২৫ কোটি টাকার টার্নওভার।
হাজার কর্মসংস্থান।
জাতীয় লাভ।”

অর্ক উঠে দাঁড়ান, গলার স্বর শান্ত কিন্তু কঠিন।

“এই মাঠে কর্মসংস্থান এখনই আছে।
এই জমি শুধু জমি নয়— এটি স্কুল, এটি শ্মশান, এটি নদীর গর্ভধারিণী।
আপনারা যাকে খালি জমি বলছেন, সে কারও মা, কারও পূর্বপুরুষ, কারও দেবতা।”

জজ বললেন,

“আপনি কি বলতে চান লোকেদের অনুমতি না নিয়ে এই জমি অধিগ্রহণ আইনবিরুদ্ধ?”

অর্ক জবাব দিলেন—

“আইনের কণ্ঠে যদি মানুষের কণ্ঠ না মেলে, সে আইন মানুষ নয়, নিছক আয়রন।”

“আমরা চাই— লোকমাটি পরিষদ স্বীকৃত হোক একটি গণতান্ত্রিক ভূমি-প্রতিনিধি সংগঠন হিসেবে।
এবং এই অধিগ্রহণ অবৈধ বলে গণ্য হোক, কারণ এতে জনগণের সম্মতি নেই।”

আদালত স্থগিত রাখল রায় তিন সপ্তাহের জন্য।

এই তিন সপ্তাহ ছিল ‘নীরব যুদ্ধ’।
EcoWest লবিং শুরু করল।
মিডিয়া দু’ভাগ— কেউ বলল “উন্নয়ন বিরোধী কৃষক আন্দোলন”,
আর কেউ বলল “পুনঃউপনিবেশ বিরোধী গণআন্দোলন”।

তিন সপ্তাহ পর রায় ঘোষণা।

“লোকমাটি পরিষদের পক্ষের যুক্তি গ্রহণযোগ্য।
EcoWest-এর জমি অধিগ্রহণ বাতিল।
জনগণের মত ছাড়া কোনও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত নয়।
লোকমাটি পরিষদকে স্থানীয় স্বশাসন কমিটির মর্যাদা দেওয়া হল।”

জজের রায় ঘোষণার পর অর্ক কাঁদলেন।
চুমকি কেবল বলল—

“এখন আবার ধান বোনা যাবে।”

জড়িপুর ফিরে, ময়না লাঙল হাতে মাঠে নামল।
মাঠজুড়ে ছড়িয়ে গেল গরুর ঘন্টাধ্বনি।
বাচ্চারা খেলছে কাদায়,
মুন্নি বুড়ি শুকোতে দিলেন ধুতি,
আর হরিধন গাইলেন পুরনো রাঢ় বাউল:

> “মাটি মোর মা, মোর রাষ্ট্রভাষা,
মোর গায় ঘাম, মোর চোখে আকাশ।”

EcoWest চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল এক প্রাচীর—
একটা বড় বিলবোর্ড, তাতে লেখা ছিল—
“ভবিষ্যতের শহর এখানে আসছে।”

লোকমাটি পরিষদের তরফ থেকে সেটার ওপর লেখা হল—

“ভবিষ্যতের মাটি এখানেই জন্ম নেয়।
শহর নয়, মানুষ আসবে।
তারা গড়বে জড়ি।”

তিন বছর কেটে যায়।

জড়িপুর এখন নিজের তৈরি “লোক-বিদ্যালয়” চালায়।
পড়ানো হয়—

ভূমি আইন

নিজের ভাষায় ইতিহাস

নারীদের জন্য কৃষিশিক্ষা

শিশুরা শিখে নিজেদের ভাষায় গল্প লেখা।

চুমকি এখন “মাটি-চিঠি” নামের এক মাসিক পত্রিকা চালায়।
বয়সের তুলনায় সাহস অনেক বেশি।
সে লিখে—

“আমরা শুধু জমি রাখিনি— আমরা রেখেছি ভাষার অধিকার,
রেখেছি ভবিষ্যতের রূপরেখা।
রাষ্ট্র তো আসবে যাবে, কিন্তু আমরা থেকে যাবো
জড়ি হয়ে, লাল মাটি হয়ে।”

হরিধন একদিন দুপুরে খেত থেকে উঠে এসে বলে—

“তুই জানিস চুমকি, আমি স্বপ্নে দেখলাম—
গাছেরা কথা বলছে,
বলছে— “ধন্যবাদ।””

চুমকি হাসে।

“তারা তো চিরকাল কথা বলেছে, শুধু আমরা শুনিনি।”

শেষ 

 

1000023663.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *