এক
দক্ষিণ কলকাতার একটি তুলনামূলক পুরনো কিন্তু চৌকস আবাসন, নাম ‘উজ্জ্বল উদয়ন’। নাম শুনলেই মনে হয় যেন আলোয় ভরপুর কোনো স্বপ্নের মতো বাসস্থান। বাস্তবে অবশ্য চারতলার ওপরে ওঠা মাত্রই আলো যেন হঠাৎ একটু ফিকে হয়ে আসে, ছাদের নিচে জমে থাকে একরকম নরম, নিস্তব্ধ অন্ধকার। সেখানেই চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট 4C-তে উঠল সদ্যবিবাহিত দম্পতি সায়ন ও মেঘলা দত্ত। বিয়ের পর মাত্র তিন মাস কেটেছে, সংসার এখনও নতুন, তাজা, রঙিন বাক্সে মোড়ানো স্বপ্নে ভরা। সায়নের চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায়, অফিস মূলত হাইব্রিড—তাই বেশিরভাগ সময় সে বাড়ি থেকেই কাজ করে। মেঘলা একটি বেসরকারি স্কুলে ইতিহাসের শিক্ষিকা, শান্ত, সংবেদনশীল স্বভাবের। আবাসনে উঠে আসার দিনটিতে সব কিছুই ছিল স্বাভাবিক—লিফটে উঠতে উঠতে কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা, কেউ বা সৌজন্যতাবশত হাসলেন, কেউ অন্যমনস্কভাবে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। সন্ধ্যায় ছাদ থেকে দেখা যাচ্ছিল শহরের আলো ঝলমলে প্রান্তর, আর দূরের মেট্রোর রেললাইনের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা মানুষের শৃঙ্খল। কিন্তু প্রথম রাতেই, যখন সায়ন অফিসের ল্যাপটপে ক্লায়েন্ট রিপোর্ট টাইপ করছে, মেঘলা বারান্দার দিক থেকে এক ধরনের ধাতব ঠকঠক শব্দ শুনতে পেল। ভেবে উঠতে পারল না—এই গভীর রাতে কে বারান্দায় হাঁটছে? গলা উঁচু করে বাইরে তাকাতেই তার বুকের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল—বিপরীত দিকের বিল্ডিং-এর তিনতলার ফ্ল্যাটে, একটা অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি ঝুঁকে তাকিয়ে আছে তাদের ফ্ল্যাটের দিকেই। সে মুহূর্তে ভাবতে পারল না ওটা মানুষ না অন্য কিছু, কারণ মুখটাই যেন স্পষ্ট নয়—শুধু একটা অবয়ব, যেন কুয়াশায় গড়া, আর তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি যেন ঠিক মানুষের মতো নয়। কয়েক সেকেন্ড পরে আবার চারপাশ ফাঁকা, যেন কিছুই ছিল না। সায়নকে ডাকলেও সে পাত্তা দিল না—ব্যস্ত কাজে। মেঘলা নিজেকে বোঝাল—নিশ্চয়ই ভুল দেখেছে।
পরের দিনগুলোতে ফ্ল্যাটে নানা জিনিস এল, নতুন পর্দা, রান্নাঘরের বাসন, ডাইনিং টেবিলের চারপাশে চকচকে কাঠের চেয়ার। সবই যেন সাজানো স্বপ্নের অংশ। কিন্তু কোথাও যেন ছন্দপতন ঘটছিল। ঘুমের মধ্যে মেঘলা হঠাৎ করে চমকে জেগে উঠত—বুঝতেই পারত না ঠিক কী দেখেছে, তবে মনে হতো কেউ যেন ফিসফিস করে তার কানে কিছু বলছে। সায়ন প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, বরং বলেছিল, “তুমি বরাবর এসব একটু বেশি কল্পনা করো।” কিন্তু একদিন দুপুরে, যখন মেঘলা একা ছিল, রান্নাঘরের জানালায় ধাক্কা দিয়ে খুলে গেল খোলা কাঁচ। তীব্র বাতাসে পর্দা ফুলে উঠল আর আয়নার ঠিক সামনে দিয়ে যেন কোনো কিছু একটা হেঁটে চলে গেল। সে ছুটে গিয়ে দেখল, ঘরে কেউ নেই। ভেবে আর নিজের মনকে শান্ত রাখতে পারছিল না সে। ওই সময়েই পরিচয় হল মিসেস করিমের সঙ্গে, চতুর্থ তলার সবচেয়ে প্রাচীন বাসিন্দা। তিনি একসময়ের কলেজ অধ্যাপিকা, এখন একা থাকেন বইয়ের স্তূপ আর এক গৃহপরিচারিকার সঙ্গে। একদিন বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মেঘলা তার সঙ্গে আলাপ করল। মিসেস করিম কেমন যেন ভয়ার্ত চোখে ফ্ল্যাটের চারদিক ঘুরে দেখলেন, তারপর বললেন, “তুমি 4C-তে উঠেছ তো? ওই ফ্ল্যাটে তো অনেকদিন খালি ছিল… আগের পরিবার রাতারাতি চলে গিয়েছিল। কেউ কিছু বলেনি, শুধু জানতাম মেয়েটা মাঝরাতে বারান্দা থেকে লাফিয়ে পড়েছিল। তারপর থেকেই… ছায়া আসে। কাউকে সে ঠিকভাবে দেখায় না, কিন্তু থেকে যায়। বারান্দার ধারে।” মেঘলা প্রথমে ভয় পেলেও, নিজের যুক্তিবাদী মনকে দিয়ে বোঝাল, “এই সব ফ্ল্যাটে তো গল্প থাকেই। সবাই একটু একটু ভয়ে মজা পায়।”
তবে মেঘলার ভয়টা ধীরে ধীরে কল্পনার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তবের কাছে এসে দাঁড়াতে শুরু করল যেদিন রাতে সায়ন হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় চলে যায়। মেঘলা দেখতে পায়, সায়নের চোখ খোলা—তবুও যেন সে ঘুমের ঘোরে আছে। ঠোঁটে ফিসফিসানি, যা পরিষ্কার বোঝা যায় না। সে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ জানে না কী দেখছে। পরদিন সকালে জিজ্ঞাসা করলে সায়ন সব অস্বীকার করে। বলে, “তুমি ঘুমে কিছু ভুল দেখেছ। আমি তো রাতে একটাও উঠিনি।” কিন্তু মেঘলা নিশ্চিত—সে দেখেছে। তারপর প্রতিদিন রাতে, এক নির্দিষ্ট সময়ে, সায়নের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে—মুখ ভার হয়ে যায়, চোখের নিচে কালি পড়ে, আর কথা কমে যায়। সে মাঝেমধ্যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে বেশিক্ষণ, যেন কিছু খুঁজছে। এক রাতে মেঘলা নিজেও স্বপ্ন দেখে—সে বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে, হঠাৎ করে কেউ পেছন থেকে কানে ফিসফিস করে বলছে, “তুইও নামবি এবার, না?” ঘুম ভেঙে সে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে পড়ে। তখনই বুঝতে পারে—এই ফ্ল্যাটে কিছু একটা আছে, অথবা তারা যা নিয়ে এসেছে নিজেরাই, সেটাই এ জায়গায় রূপ নিচ্ছে। ছায়া কি বাইরের কেউ? নাকি সে একটা প্রতিচ্ছবি—তাদের অজানা মানসিক অন্ধকারের? এখনই বলা যাচ্ছে না। শুধু এটুকু নিশ্চিত—উজ্জ্বল উদয়ন এখন আর শুধু এক স্বপ্নের ঠিকানা নয়, বরং এক মনস্তাত্ত্বিক ধোঁয়াশার সূচনা।
দুই
মেঘলার সেই স্বপ্নটা ঘুম থেকে জেগে উঠলেও কেমন যেন তাকে আঁকড়ে ধরে ছিল সারাটা দিন। স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন—সে নিশ্চিত হতে পারল না। সেই ফিসফিসে কণ্ঠটা যেন মাথার ভেতরেই গেঁথে বসে আছে, একটা ঝাপসা প্রশ্নের মতো—“তুইও নামবি এবার?” বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল মেয়েটির আত্মহত্যার কথা, যেটা মিসেস করিম বলেছিলেন। তার নাম ছিল কি? কেউ জানে কি? খবরের কাগজে কখনো এসেছে কি সেই খবর? সায়নকে সে এসব বলতে চেয়েও বলে না, কারণ এখন সে প্রচণ্ড কাজের চাপে রয়েছে। রাত দিন ক্লায়েন্ট মিটিং, প্রেজেন্টেশন আর ঘুম বঞ্চনার মাঝে সায়নের মন যেন আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। একরাতে, প্রায় দুটো নাগাদ, মেঘলা হঠাৎ জেগে উঠে দেখে, বিছানা খালি। দরজা আধখোলা, বারান্দা থেকে আলো এসে পড়ছে। নিঃশব্দে উঠে গিয়ে দেখে—সায়ন দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে। মাথা নুয়ে, সিগারেট হাতে, কিন্তু চোখ দুটো স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের ফ্ল্যাটের দিকের একটা জানালার দিকে। আশ্চর্যজনকভাবে, সামনের ফ্ল্যাটটা তখন অন্ধকার, কেউ নেই মনে হয়। কিন্তু সায়নের চোখে যেন একটা কুয়াশার ছায়া জমে আছে—সে নড়ছে না, সাড়া দিচ্ছে না, এমনকি মেঘলা ডাক দিতেও কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। তাকে না ডেকে চুপচাপ ঘরে টেনে এনে শুইয়ে দেয় মেঘলা। সকালে জিজ্ঞেস করলে, সে শুধু বলে, “তুমি কি জানো আমি একটা মেয়েকে বারান্দায় দেখে ফেলেছি?” কিন্তু তারপর হেসে ফেলে—“আসলে ঘুমের মধ্যে হ্যালুসিনেশন হবে হয়ত। আমিও জানি, আমি ক্লান্ত।”
এরপরের কয়েকদিন আবাসনের আবহ যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। দিনের আলোয় সব স্বাভাবিক, বাচ্চাদের খেলা, বাইরের বিক্রেতার ডাকে পাড়ার চেনা ছন্দ, অথচ সন্ধ্যা গড়ানোর পরেই যেন বিল্ডিং-এর করিডোরগুলো অচেনা হয়ে ওঠে। একদিন সন্ধ্যাবেলা, নিচের লনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়, মেঘলা চোখ তুলে দেখে সায়ন একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে—ঠিক যেমন সে আগে দাঁড়াতো, কিন্তু এবার সে তাকিয়ে নেই, বরং হঠাৎ ঘুরে তাকায় নিচের দিকে—সরাসরি মেঘলার দিকে। তার চোখে তখন এমন এক দৃষ্টি যা সে কোনোদিন দেখেনি—শূন্য, কিন্তু তীব্র; যেন তার মধ্য দিয়ে কিছু দেখছে, অথচ কিছুই উপলব্ধি করছে না। মেঘলা ভয় পেয়ে উঠে আসে, সায়ন তখন ঘরের মধ্যে ঢুকে গেছে। রাতে সে চুপচাপ দেখে, সায়নের ঘুম গভীর, কিন্তু তার মুখখানা যেন কুন্ঠিত—ঘামে ভেজা, ঠোঁট হালকা কাঁপছে, যেন স্বপ্নে কিছু বলছে। “সে আসবে,” বা “বারান্দায় আছে”—এরকম কিছু। পরদিন সকালে আবার সব স্বাভাবিক, সায়ন আবার সেই যুক্তিবাদী মানুষ, বলল, “তুমি হয়তো ওভারথিংক করছ। আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না।” মেঘলা বুঝতে পারছিল, যেটা ঘটছে সেটা শুধু বাহ্যিক নয়, বরং মানসিকও বটে। কোনো কিছু বা কেউ তাদের মনের গভীরে গেঁথে যাচ্ছে। মেঘলা একরকম অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করতে লাগল সেই ছায়ার প্রতি, যেন কিছু তাকে কাছে ডাকছে, কিন্তু সেই ডাকের অর্থ বোঝা যাচ্ছে না।
এক রাতে, বিদ্যুৎ চলে যায় হঠাৎ। সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে আটটা, চারদিক নিস্তব্ধ। জেনারেটর চালু হয়নি তখনও, আবাসনের পুরো ব্লকটা কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে। মেঘলা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছিল, আর সায়ন তখন বাথরুমে। হঠাৎ করে এক মুহূর্তে, বারান্দা দিয়ে বাইরের দিকটা দেখে চমকে উঠে সে—সামনের বিল্ডিং-এর ছাদে এক ছায়া! সেটা নড়ছে না, কেবল দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই হাত নামিয়ে, একেবারে সোজা হয়ে, যেন তাকিয়ে আছে—তাদের দিকেই। আলো নেই, শুধু অন্ধকার, কিন্তু তবু তার রূপরেখা স্পষ্ট। কোনো বাতাস নেই, তবু বারান্দার পর্দা যেন অস্বাভাবিকভাবে উড়ে উঠছে। সায়ন এসে পড়ল সেই মুহূর্তে, বলল, “কাকে দেখলে?” মেঘলা কোনও উত্তর দিতে পারল না—সে জানত, ওই ছায়াটা ওর সঙ্গে কথা বলে, অন্তত চোখে চোখ রেখে, এমন কিছু পাঠায় যা ভাষায় বলা যায় না। পরের দিন মেঘলা মিসেস করিমকে গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি ছায়াকে দেখেছেন?” করিম এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “একবার। তাও বহুবছর আগে। তারপর থেকে আমি শুধু চোখ নামিয়ে চলি। কারণ যেই ওর চোখে চোখ রাখে, সে আর আগের মতো থাকে না। ছায়াটা আসলে মানুষ নয়, সে আসলে নিজের ভয়—তোমার অপরাধ, গ্লানি, কিংবা কোনো অপূর্ণতা যা তোমার মধ্যে ছিল এবং থেকে যাবে। সেটাই ছায়া হয়ে রূপ নেয়। ভয় পাবে না, কিন্তু ভুলেও ওর দিকে বেশিক্ষণ তাকাবে না।” মেঘলা যেন শীতল হয়ে গেল। এবার আর শুধু কৌতূহল নয়, ভয় সত্যি। কারণ, প্রতিদিন রাতে সেই ছায়াটা যেন আরও একটু একটু করে কাছে চলে আসছে—আর কেউ দেখুক না দেখুক, মেঘলা জানে, সে আর একা নেই।
তিন
মেঘলা এখন আর অবিশ্বাস করতে পারছে না। যতই নিজেকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করুক, স্পষ্ট অনুভব করছে—কিছু একটা তাদের ফ্ল্যাটে প্রতিনিয়ত উপস্থিত। একটা চাপা দমবন্ধ ভাব, একটা অদৃশ্য দৃষ্টি, একটা অদ্ভুত শব্দ—যার ব্যাখ্যা নেই, যার উৎস নেই। রাতে সায়নের আচরণও দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে। সে আগের মতো প্রাণবন্ত নেই, কথা কমে গেছে, চোখে সারাক্ষণ এক ধরণের ঘোলাটে ক্লান্তি, ঘুমের ঘোরে সে মাঝে মাঝে বলে ওঠে—”ও আবার এসেছে…” কিংবা “আমি জানতাম ও ফিরবে…” এই সব কথাগুলো শোনার পর মেঘলা প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কাজের চাপ, ঘুমের অভাব থেকে এমনটা হচ্ছে। কিন্তু যতই সে গভীরে ডুবে যাচ্ছিল, ততই বুঝতে পারছিল, ব্যাখ্যা যতই খোঁজো, ছায়ার অস্তিত্ব ততই বাস্তব হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় সে একদিন সোজা চলে গেল মিসেস করিমের ফ্ল্যাটে। দরজাটা আগের মতোই আধা খোলা ছিল, যেন এই বৃদ্ধা মহিলার ঘর নিজেই এক অলক্ষ্মী স্মৃতির মতো—অবিন্যস্ত, বইয়ে ভরা, ধূলিধূসর, অথচ ভেতরে চাপা কিছু লুকিয়ে আছে। করিম তাকে দেখে কিছু না বলেই ভেতরে ডাকলেন, যেন জানতেন সে আসবে। একটা পুরনো ট্রাঙ্ক খুলে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ তুলে দিলেন—সংবাদপত্রের কাটা অংশ। শিরোনাম: “দক্ষিণ কলকাতার আবাসনে আত্মহত্যা: এক তরুণী ঝাঁপ দিল বারান্দা থেকে”। তারিখটা আট বছর আগের। মেয়েটির নাম: অনুরাধা সেন। বয়স মাত্র ২৩। পরিবার দাবি করেছিল, সে মানসিক অবসাদে ভুগছিল, অথচ প্রতিবেশীরা বলেছিলেন, “ও খুব স্বাভাবিক ছিল।” আত্মহত্যার কোনো সুস্পষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি।
মেঘলার কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা ধরে থাকতে থাকতে হঠাৎ করেই করিম বললেন, “এখানে সবাই ভুলে যেতে চায়। কারণ যারা মনে রেখেছে, তাদের জীবন আর স্বাভাবিক ছিল না। অনুরাধার মৃত্যুটা ছিল শুরু মাত্র। তারপর এক বৃদ্ধ মারা গেলেন হার্ট অ্যাটাকে—যদিও তিনিও কিছুদিন আগে ছায়ার কথা বলেছিলেন। তারপর এক বাচ্চা মেয়ে, প্রায় দেড় বছর কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল। এই ফ্ল্যাটটা, যেটায় তোমরা থাকো—সেটাই ছিল অনুরাধার শেষ ঠিকানা।” এই কথাগুলো শোনার পর মেঘলার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। সে জানত না এই ফ্ল্যাটের ইতিহাস। কেউ তাদের বলেনি। আর এখন, তার মনে হচ্ছে, সে আর এখানে থাকতে পারবে না। তবু সে বোঝে, এই রহস্য থেকে পালিয়ে গিয়ে মুক্তি নেই। রাতে সে সায়নের দিকে তাকায়, যে এক দৃষ্টিতে ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু তার চোখে কিছু নেই—শুধু একটা ফাঁকা গভীরতা। মেঘলা ধীরে ধীরে অনুভব করতে লাগল, সায়নের মধ্যেও কিছু বদলাচ্ছে, এবং তা অদৃশ্য ছায়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। হয়তো সায়নও ধীরে ধীরে সেই পুরনো ঘটনার অংশ হয়ে উঠছে—সে জানে না কিভাবে, কিন্তু যেন সময়ের ধুলোমাখা কোনো পুনরাবৃত্তি আবার শুরু হয়েছে।
এই আতঙ্ক আর দমবন্ধ পরিবেশের মধ্যেই, একদিন গভীর রাতে দরজায় টোকা পড়ে। ঘড়িতে রাত প্রায় দেড়টা। মেঘলা ভয়ে চুপ করে যায়। বাইরে কে হতে পারে? নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি আছে, কিন্তু এখন তার মন বলছে—বাইরের কেউ নয়, কেউ যেন জানে তারা জেগে আছে। সাহস করে সায়ন গিয়ে দরজা খুলতে গিয়েও থেমে যায়। কেটে যায় মিনিট পাঁচেক। আবার সেই টোকা, এবার একটু জোরে। তখনই করিডোর থেকে কারও পায়ের শব্দ পাওয়া যায়, আর সঙ্গে সঙ্গে টোকার শব্দ বন্ধ। মেঘলা দরজার ছিদ্র দিয়ে তাকায়—কাউকে দেখা যায় না। পরদিন সকালে, ফ্ল্যাটের লিফটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভাঙাচোরা পোস্টার চোখে পড়ে তার—এক লোক নিখোঁজ। নিচে লেখা: “বিক্রম সেন, স্থানীয় সাংবাদিক, সাত বছর আগে এই বহুতল ঘিরে তদন্ত করছিলেন, হঠাৎ নিখোঁজ হন। তার খোঁজে পরিবার এখনও অপেক্ষায়।” সেই নামটা শুনে মেঘলার গায়ে কাঁটা দেয়—কারণ, কদিন আগে সে একটা অচেনা ইমেল পেয়েছিল, বিষয়বস্তু ছিল: “If you are seeing the shadow, you’re not alone.” — প্রেরকের নাম: b.sen@journalistmail.com। তখন বিষয়টাকে সে স্প্যাম ভেবেছিল। এখন সে জানে—কারও ছায়া নয়, বরং এই বাড়ির ইতিহাস এখন তাদের নিজের জীবনেও ছায়া ফেলতে শুরু করেছে। আর সেটা অতিক্রম করার একমাত্র পথ, হয় জানার শেষ সীমায় পৌঁছানো, নয়তো হারিয়ে যাওয়া… চিরতরে।
চার
রাত এখন আর ঘুমানোর সময় নয়—বরং একটা অজানা বিপদের অপেক্ষার সময়। ঘড়ির কাঁটা যত রাত বারোটার কাছাকাছি আসে, ততই যেন আবাসনের চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। বাতাস থেমে যায়, কুকুরের ডাক থেমে যায়, এমনকি অদূরবর্তী রেললাইনের ট্রেনও যেন কেমন নিঃশব্দ হয়ে আসে। মেঘলার কাছে মনে হয়, এই নিরবতা আসলে একটা ঢেউয়ের মতো—যা কোনো এক অদৃশ্য ছায়ার আগমনের পূর্বাভাস। সায়নের ঘুম এখন নিয়মিত ভেঙে যাচ্ছে রাত দুটো থেকে তিনটের মাঝামাঝি। চোখ মেলে সোজা বসে পড়ে সে, তারপর ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পড়ে। মেঘলা মাঝে মাঝে দেখে, সায়নের ঠোঁট নড়ছে, অথচ কোনও শব্দ নেই। প্রথম প্রথম সে ধরে নিত, ঘুমের ঘোরে হাঁটছে; কিন্তু একদিন সে সাহস করে সায়নের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। সায়ন তখন ঠায় দাঁড়িয়ে, আর নিচে তাকিয়ে রয়েছে, যেন কেউ তাকে ডাকছে। হঠাৎ সে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “ও বলছে, আমি ওর জায়গা নিয়েছি…” মেঘলার গা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। “কে বলছে?” সে জিজ্ঞাসা করে। সায়নের জবাব আসে না। একটু পর সে নিজের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, চোখে সেই একই শূন্যতা, যেন ওর ভেতরে আর ও নেই—শুধু কোনো ছায়া ঢুকে গেছে।
পরদিন সকালে মেঘলা যখন আগের রাতের কথাগুলো তুলে ধরল, সায়ন সব অস্বীকার করে। বলে, “তুমি নিজেই ঘুমের মধ্যে বোধহয় ভুল দেখেছ। আমি তো রাতে কোথাও উঠিনি।” অথচ মেঘলার মনে আছে স্পষ্ট—তাকে সে ছুঁয়েছিল, চোখে চোখ রেখেছিল, এমনকি কথা বলেছিল! তবে সেটা কি স্বপ্ন? বাস্তব? অথবা—মনের ওপর চাপ থেকে জন্ম নেওয়া হ্যালুসিনেশন? না, এটা কিছুই না—এটা সেই ছায়ার কাজ। বিকেলবেলা যখন সায়ন এক কাপ চা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ পিছন থেকে এসে মেঘলা বলল, “তুমি অনুরাধার নাম শুনেছ?” সায়নের হাতের কাপ পড়ে গেল—একটা মুহূর্তের জন্য তার চোখ কেমন কেঁপে উঠল, তারপর হাসল, বলল, “আবার সেই মৃত মেয়ের গল্প? তুমি এগুলো পড়া বন্ধ করো মেঘলা।” কিন্তু তার হাসির আড়ালে যে আতঙ্ক, সেটা মেঘলা স্পষ্ট বুঝতে পারে। ওই মুহূর্তে তার মনে হয়, সায়ন হয়তো অনুরাধার নাম আগেও শুনেছে—অথবা দেখেছে—অথবা… হয়তো… চিনতো! রাতে শোয়ার সময় সায়ন আবার বলে উঠল, “তুমি জানো, কিছু মানুষ ঠিক সময়ে না মরলে, তাদের ছায়া থেকে যায়। ওরা নিজের ছায়ার খোঁজে ফিরে আসে। আর কেউ ওর জায়গা নিলে, ও প্রতিশোধ নেয়।” মেঘলা জিজ্ঞেস করল, “এগুলো তুমি কোথা থেকে শুনলে?” সায়ন উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে থাকল জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে, আর তারপর ধীরে ধীরে বলল, “তুমি কখনো ছায়ার মুখ দেখেছ?” তারপরেই সায়নের চোখ বুজে আসে। সে গভীর ঘুমে। কিন্তু সেই প্রশ্নটা ঝুলে থাকে ঘরের হাওয়ায়।
মেঘলার ঘুমও এখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। গভীর রাতে সে দরজা খোলা পায়, কিংবা বারান্দার গেট কেমন যেন খুলে যাওয়ার শব্দ পায়। মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে দেখতে পায়, দূরের বিল্ডিং-এর ছাদে একটা অবয়ব। সেটাকে দেখে যেন নিজের দম বন্ধ হয়ে আসে। সেই ছায়া—না, এবার আর কুয়াশা নয়, এবার সে নিশ্চিত, সেই অবয়ব আস্তে আস্তে স্পষ্ট হচ্ছে। তাতে একটা নারীর আকৃতি, শরীরে সাদা শাড়ির মতো কাপড়ের আঁচল, কিন্তু মুখটা একটা শূন্য জায়গা, যেন কেউ আঁকতে ভুলে গেছে। এক রাতে সে হঠাৎ অনুভব করল, বারান্দা থেকে কারও নিশ্বাস পড়ছে গালে। সে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে তাকাল—কেউ নেই। অথচ কিছু ছিল, এইমাত্রই ছিল। সে এখন আর জানে না, দিন রাতের ভেদ কি, বাস্তব স্বপ্নের সীমারেখা কোথায়। এরই মধ্যে আবার সেই ইমেইল আসে—“b.sen@journalistmail.com” থেকে। diesmal subject line: “You need to talk to me before it’s too late.” এবার আর সে অবহেলা করে না। উত্তর দেয়: “Who are you? Where can we meet?” ঠিক দশ মিনিট পর উত্তর আসে: “Rooftop. Midnight. Don’t come alone.” মেঘলার মনে হয়—এই নিদ্রাহীন রাত হয়তো এক রহস্যের চূড়ান্ত দরজায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে। কিন্তু সে প্রস্তুত কি? অথবা সে যা দেখছে, যা অনুভব করছে—তা সত্যিই কি বাস্তব? নাকি কোনও অলৌকিক ছায়া তার মানসিক ভারসাম্যকেই প্রতিনিয়ত ভেঙে ফেলছে?
পাঁচ
মেঘলার মাথার ভেতর যেন একটা অব্যক্ত শিস বাজতে থাকে, একরকম টানটান অস্থিরতা, যার উৎস সে খুঁজে পায় না। প্রতিটি ঘুমহীন রাত যেন তার বাস্তবতাকে একটু একটু করে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, আর তার জায়গা নিচ্ছে ছায়া, প্রতিধ্বনি, কল্পনা আর আয়নার প্রতিবিম্ব। সেদিন সকালে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, স্রেফ চুল বেঁধে নিচ্ছিল। আচমকা তার চোখ আটকে গেল—প্রতিবিম্বে সে যা দেখছে, তা বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি। তার নিজের মুখ, কিন্তু চোখ দুটি যেন কেমন যেন গভীর, কালি পড়া নয়—বরং একধরনের অন্ধকারে গড়া। যেন অন্য কেউ তাকিয়ে আছে ভেতর থেকে। সে চমকে উঠল, পেছনে তাকিয়ে দেখল—ঘরে কেউ নেই। কিন্তু আয়নার ভেতরে সেই মেঘলার মুখে এক চিলতে হাসি! না, এটা সম্ভব নয়! মেঘলা হুড়মুড় করে পিছিয়ে এসে দরজা খুলে বারান্দায় চলে যায়। বুকের ভিতরটা ধুকপুক করছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিচের দিকে—একশো ফুট নিচে সেই ইট-কংক্রিটের রাস্তা, যে জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ একদিন ঝাঁপ দিয়েছিল। হঠাৎ তার মনে হল, তার শরীর একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে—অজান্তেই পা বারান্দার রেলিংয়ের দিকে। কে যেন তার মাথায় ফিসফিস করে বলছে, “ওর জায়গা তো এখন তোর, তাই না?” সে চিৎকার করে ফিরে আসে ঘরের মধ্যে।
তাকে দেখে সায়ন অবাক হয়। সে কিছুই জানে না, বোঝে না। এখন সে নিজের মধ্যেই যেন আটকে যাচ্ছে, ঘর থেকে বেরোচ্ছে না, কথা বলছে না, চোখের তলার কালি আর শরীরের ক্লান্তি তাকে অচেনা করে দিয়েছে। মেঘলা অনুভব করছে, সায়নও যেন আয়নার ভিতরে আটকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এক রাতে, সায়নের ঘুমন্ত অবস্থায় তার চোখের পাতা খুলে থাকে, এবং সেই ফাঁক দিয়ে সে ফিসফিস করে বলে—“ওকে দেখে ফেলেছি… এবার ও আমায় ছাড়বে না…” এরপর সে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, এবং নিজের গালে হাত বুলিয়ে বলে, “এটা তো আমার মুখ নয়। এটা তো ওর।” মেঘলা সেদিন রাতেই সিদ্ধান্ত নেয়, সে আরও জানবে। সে স্কুলে এক সহকর্মীকে দিয়ে পুরনো তথ্য জোগাড় করে—অনুরাধা সেন নামে যে তরুণী এখানে আত্মহত্যা করেছিল, সে একজন শিল্পী ছিল। আঁকতে ভালোবাসত—বিশেষত প্রতিচ্ছবি, আয়নার শিল্প। আত্মহত্যার আগে সে একটি চিত্রপ্রদর্শনী করেছিল যার থিম ছিল: “The Other Within”—নিজের মধ্যে লুকানো অপর ‘আমি’। এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেল মেঘলা—আয়নার প্রতিফলন, ছায়ামানব, আর এক ‘আমি’—সব একে অপরের সঙ্গে জড়ানো। সে রাতে সে ফ্ল্যাটের সব আয়না কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়। একটাই রেখে দেয়—বাথরুমের আয়না। ঠিক রাতে ৩:১৩ মিনিটে সে বাথরুমে গিয়ে দাঁড়ায়। হালকা আলোয় আয়নার সামনে তার নিজের ছায়া ছাপ ফেলে দেয় পেছনের দেওয়ালে। সে স্পষ্ট ভাবে দেখল—তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পিছন ফিরে তাকানোর সাহস হয়নি। শুধু চোখের সামনে সেই প্রতিচ্ছবিতে দেখা যাচ্ছে—সাদা শাড়ি, খালি পা, আর এক মুখহীন অবয়ব ধীরে ধীরে তার কাঁধের দিকে এগিয়ে আসছে…
সে রাতে মেঘলা ঘুমায়নি। সে জানত, সত্যি কিছু একটা আছে যা শুধু দৃষ্টির সীমায় নয়, মনেরও অতল থেকে বেরিয়ে আসে। সকালে সে সায়নকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে চায়, কিন্তু সায়ন জানায় সে যেতে চায় না। বরং সে বলে, “আজ রাতেই আমি ছাদে যাচ্ছি। আমাকে একজন ডেকেছে।” মেঘলা আঁতকে ওঠে—“বিক্রম সেন?” সায়নের মুখ হঠাৎ সাদা হয়ে যায়, ঠোঁট কেঁপে উঠে। সে জানায় না সে নাম কিভাবে জানে, শুধু বলে, “সে বলেছে আমি ওর মতো হতে পারি না। আমায় কিছু বুঝতে হবে।” মেঘলার মনে পড়ে—ইমেইলে সেই রাতের কথা বলা হয়েছিল। ছাদে। অজানা মানুষের দেখা। ছায়া কি এবার নতুন দেহ চাইছে? পুরনো ঘটনাগুলোর সূত্র কি এখানে পূর্ণ হতে চলেছে? রাত নামার আগে মেঘলা আর একবার বাথরুমের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এবার সে দেখে, তার নিজের মুখ আস্তে আস্তে ফেটে যাচ্ছে, আর সেই ফাটলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে আরেকটা চেনা, অথচ বিকৃত মুখ—অনুরাধার। এবার সে চোখ নামায় না। সে তাকিয়ে থাকে। কারণ সে বুঝে গেছে—ছায়াকে জয় করতে হলে, প্রথমে তাকাতে শিখতে হবে। ভয়কে চেনা লাগবে। আয়নার ওপারে এখন আর শুধু প্রতিবিম্ব নেই, আছে একটা অসমাপ্ত গল্প। আর সেই গল্পেই মেঘলার নামও লেখা হয়ে গেছে।
ছয়
রাতের ছাদ যেন অন্য এক জগত। নিচের আলো-আবৃত কলকাতা শহরের ব্যস্ততা থেকে আলাদা, এক নীরব, থমথমে, ধূসর জায়গা—যেখানে বাতাসের চলাচলও কেমন রহস্যময় হয়ে পড়ে। রাত তখন সাড়ে বারোটা। মেঘলা আর সায়ন একসঙ্গে উঠে এসেছে ছাদে, যদিও মেঘলা জানে—এই সিদ্ধান্তটা সায়নের একার। তার চোখে আজ অদ্ভুত তীব্রতা, যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা কোনো উত্তর এক রাতেই পেতে চায়। ছাদে পৌঁছনোর পর চারদিক দেখে মনে হল, কেউ আছে—কিন্তু কোথাও নেই। হঠাৎই ছাদের এক কোণে একটি অন্ধকার ছায়ার মতো বসে থাকা মানুষ চোখে পড়ল—মেঘলা নিশ্চিত জানে, এ-ই সেই ব্যক্তি, যিনি ইমেইল পাঠিয়েছেন, যিনি হয়তো বিক্রম সেন। ধীরে ধীরে সেই মানুষটা উঠে দাঁড়াল, ধুলো-মাখানো কোট পরা, চোখে গা-ঢাকা চশমা, মুখ অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। কিছু না বলে সোজা সায়নের দিকে তাকাল। তার গলা গভীর, কিন্তু কাঁপা কাঁপা—“তুমিই দ্বিতীয় ব্যক্তি, যে ছায়ার চোখে চোখ রেখেছে, তাও বেশি সময় ধরে। তাই তুমি এখন পাল্টে যাচ্ছ।” মেঘলা হতবাক। সায়ন কি জানে এসব? সে কিছু বলে না। বিক্রম আবার বললেন, “আমি সাত বছর ধরে বেঁচে আছি, অথচ কেউ আমার অস্তিত্ব টের পায় না। কারণ আমি এখানে আছি, কিন্তু বাইরে নেই। ওই ছায়া আমাকে আটকে রেখেছিল। আজ রাতে ওর শক্তি দুর্বল, কারণ সে নতুন আয়না খুঁজছে।”
মেঘলা বিস্মিত। বিক্রম সেন কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন, এখন তার উত্তর মিলছে। এই ছাদেই নাকি এক রাতে তিনজনকে ছায়া দেখেছিল, এবং তার পরদিনই তারা নিজেদের বদলে যেতে থাকে। বিক্রম পালাতে পেরেছিলেন, কিন্তু সমাজের কাছে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ ছায়া তার স্মৃতিকে ছেঁটে ফেলেছিল। এখন তিনি ফিরে এসেছেন, কারণ আর একজন এসে পড়েছে সেই ফাঁদে—সায়ন। বিক্রম বললেন, “ছায়া একটা মনস্তাত্ত্বিক ছায়ামানব। ওর উৎস এক মৃত আত্মা নয়—বরং বহু মানুষের চেতনার ভাঙা প্রতিচ্ছবি, যাদের ভিতরে ছিল গ্লানি, লুকনো অপরাধ, ভয়… অনুরাধা ছিল প্রথম, যে ওর চোখে চোখ রেখেছিল। তারপর সে লাফ দিয়েছিল। সে মারা যায়নি সঙ্গে সঙ্গে, তিনদিন কোমায় ছিল। সেই সময়েই ওই ছায়া জন্ম নেয়—তাকে ঘিরে থাকা অসমাপ্ত চিন্তার ছায়া থেকে। আমি জানতাম, যদি এই ফ্ল্যাটে আবার কেউ আসে—আর যদি কেউ আয়নায় চোখ রাখে সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তে, তাহলে ছায়া আবার জেগে উঠবে। তুমি সেই দ্বিতীয় আয়না সায়ন।” মেঘলার শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। সায়নের ঠোঁট তখন শুকিয়ে এসেছে, চোখের পাতা ভারী, কণ্ঠস্বর বদলে গেছে। সে ধীরে ধীরে বলে, “সে তো আমায় বলেছিল, আমি ওর হয়ে যেতে পারি। আয়নার ওপারটা অনেক বেশি শান্ত।” মেঘলা বুঝতে পারে—আর দেরি নেই।
একটা ঠাণ্ডা বাতাস হঠাৎ চারদিক ঢেকে ফেলে। ছাদের ওপরে যেন কুয়াশা জমে ওঠে, আর সেই কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসে এক মেয়ের অবয়ব—সাদা শাড়ি, খালি পা, আর সেই মুখ… সেই মুখ যেখানে চোখ নেই, নাক নেই—শুধু একটা ফাঁকা গর্ত। বিক্রম সরে দাঁড়ান, বলেন, “যদি ওর দিকে তাকাও, ভুলে যাবে তুমি কে। তুমি যা ছিলে, তা আর থাকবে না। তোমার সবকিছু ওর হয়ে যাবে।” মেঘলা তখন সায়নের হাত ধরে চিৎকার করে ওঠে, “তুমি আমি না হলে, তুমি কে? ফিরে এসো, সায়ন! ওর দিকে আর তাকিও না!” কিন্তু সায়নের দৃষ্টি তখন সেই ছায়ার দিকে—যেন হিপনোটিক। মেঘলা ছুটে গিয়ে সায়নের চোখ আড়াল করে দেয় হাত দিয়ে। হঠাৎ চারপাশের ছায়া কাঁপে, বাতাস গর্জে ওঠে, ছায়া একটা আর্তনাদ করে মিলিয়ে যায়। বিক্রম মাটিতে বসে পড়ে—শরীর নিস্তেজ, মুখে ক্লান্তি। সে শুধু বলে, “তুমি ওকে থামিয়েছ। কিন্তু ও পুরোপুরি মরে যায়নি। ছায়া কখনো মরে না। শুধু আয়না বদলায়।”
সেদিন রাতটা মেঘলা আর সায়নের কাছে এক অনুচ্চারিত অধ্যায় হয়ে রয়ে যায়। তারা ফিরে আসে ঘরে, আয়নার ওপর সাদা কাপড় রাখে, ছাদে ওঠা বন্ধ করে। বিক্রম তাদের আর একবার দেখা দেন না। পরদিন সকালে নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞেস করলে জানা যায়—বিক্রম নামে কেউ সেই রাতে ছাদে আসেননি, কেউ কিছু দেখেনি। কিন্তু মেঘলা জানে—সব কিছু সত্যি। ছায়া আজও আছে, তার ঠিক পেছনে, আড়ালে, নিঃশব্দে। হয়তো সেই আয়নার পেছনেই। হয়তো কোনওদিন আবার কারও চোখে চোখ পড়বে… আর গল্প আবার শুরু হবে।
সাত
সেদিন রাতের ঘটনার পর থেকে সায়ন অনেকটাই বদলে গেছে—তার চোখে আগের সেই ফাঁকা দৃষ্টি নেই, ঘুম আগের তুলনায় অনেক গভীর, আর সে আবার স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছে। তবে কিছু একটা রয়ে গেছে, মেঘলা তা টের পায়। সে জানে, যা ঘটেছে তা শেষ নয়—শুধু থেমে গেছে কিছু সময়ের জন্য। বিক্রমের কথা, সেই ছায়ার আর্তনাদ, আর আয়নার ভেতরের সেই ফাঁকা মুখ—সব মিলিয়ে তার মনে হতে লাগল, এর পেছনে যদি একবার মূল ঘটনাটাই জানা যায়, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আর কাউকে এই ছায়ার কবলে পড়তে হবে না। শুরু করল সে খোঁজ—অনুরাধা সেন কে ছিলেন? তার অতীত কোথায়? পুরোনো আর্ট গ্যালারির খোঁজে বেরিয়ে সে ঢুকে পড়ে গড়িয়াহাটের এক অর্ধেক-ভাঙা আর্ট সেন্টারে, যেখানে এক বৃদ্ধ কিউরেটর এখনো পুরোনো আর্কাইভ আগলে বসে। মেঘলা নাম বলতেই বৃদ্ধ থেমে যায়। “অনুরাধা? হ্যাঁ… শান্ত, কিন্তু অদ্ভুত মেয়ে ছিল। তার আঁকা ছবি দেখে অনেকে কাঁদত। কিছু ছবিতে এমন কিছু ছিল, যা বোঝানো যেত না, কিন্তু মনে একটা কাঁপুনি দিয়ে যেত।” মেঘলা জানতে চায়, “শেষ যে প্রদর্শনী হয়েছিল, ‘The Other Within’—তা কেমন ছিল?” বৃদ্ধ জানায়, “বিষয়বস্তু ছিল প্রতিচ্ছবি। সে বলত, আয়নায় প্রতিফলন কখনো সত্য হয় না, বরং সেটা হলো লুকোনো ভয়, গ্লানি, আর অপূর্ণ বাসনার মুখ। তার একটা পেইন্টিং ছিল—‘অস্ফুট’—যেটা কোনোদিন জনসমক্ষে আসেনি। কারণ সেটা দেখে এক দর্শনার্থীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।”
কেউ জানে না, সেই পেইন্টিং এখন কোথায়। কেউ দাবি করে, অনুরাধা মৃত্যুর আগের রাতে সেটা ছিঁড়ে ফেলেছিল। কেউ আবার বলে, সেই পেইন্টিং-ই ছায়ার জন্ম। মেঘলা কৌতূহল নিয়ে খোঁজ চালাতে থাকে, আর অবশেষে এক পুরনো আর্ট ফোরামের ব্লগে খুঁজে পায় একটি অর্ধেক-মুছে যাওয়া স্ক্যান—ছবির নাম “অস্ফুট”, নিচে লেখা: “The self, inverted.” ছবিটিতে দেখা যায়—এক নারীমূর্তি, যার মুখ নেই, বুক চিরে ভেতরে বসে আছে আরেকটি রক্তাক্ত মূর্তি—আর পুরো ফ্রেমজুড়ে ছায়া। যারা ছবিটা দেখেছিল, তাদের অধিকাংশই বলেন, একটা ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ তারা তখনও মনে করতে পারেন। মেঘলা ভাবতে থাকে—এটা কি কেবল শিল্প? নাকি অনুরাধা কোনো আত্মিক শক্তির ঘনীভবন ঘটিয়েছিল নিজের শিল্প দিয়ে? মানুষের অবদমিত অনুভব, সমাজের চাপে গুটিয়ে পড়া অস্তিত্ব, সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক যন্ত্রণা—সব মিশে কি এক রূপ নিয়েছিল? ছায়া কি তাহলে একধরনের সম্মিলিত মানসিক আত্মা? নাকি সে এক প্রতিক্রিয়া, একটা প্রতিবাদ? মেঘলা বুঝতে পারে—এটা কোনো ভূত নয়, বরং আত্মার এক প্রতিরূপ, যেটা মানুষ নিজেই সৃষ্টি করে। আয়না তার মাধ্যম, কারণ সেখানে প্রতিদিন আমরা নিজেদের দেখি—কিন্তু আমরা যেটা দেখতে চাই না, সেই অদৃশ্য মুখটা—সেটাই ওর বাসস্থান।
মেঘলা এবার উপলব্ধি করে, ছায়াকে শেষ করা যাবে না, কিন্তু তাকে চিনে রাখা যাবে। তাকে চেনানো যাবে পৃথিবীকে, যাতে নতুন কেউ তার ফাঁদে না পড়ে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে পুরো ঘটনা লিখে রাখবে, নিজের ব্লগে নয়—প্রিন্টে, চোখের সামনে। কাগজে-কলমে। বিক্রম সেন যেমন একসময় তদন্ত করছিলেন, তেমনি সে আজ একজন নীরব সাক্ষী। রাতে সে আবার সেই আয়নার সামনে দাঁড়ায়, এবার কাপড় সরিয়ে। নিজেকে দেখে—নিশ্চিন্ত, স্থির, কিন্তু জানে, কোনওদিন হয়তো আবার সেই ফাঁকা মুখ ভেসে উঠবে। ছায়া পুরোপুরি মুছে যায় না—কারণ আমরা কেউই নিজের অন্য রূপ থেকে মুক্ত নই। শুধু পারি তাকে চিনে রাখতে, চোখে চোখ রেখে বলতে, “আমি জানি তুমি কে। কিন্তু আমি তোমায় হতে চাই না।” সায়ন সেই রাতে নিঃশব্দে এসে তার পাশে দাঁড়ায়। বলে, “তুমি আমায় ফিরিয়ে এনেছ। কিন্তু আমি জানি, সে ছিল। তার উপস্থিতি আজও ঘরের দেওয়ালে, আয়নার কিনারায়, নিশ্বাসে লুকিয়ে আছে।” মেঘলা শুধু মাথা হেঁট করে বলে, “ছায়া তো একদিনের নয়, সে জন্ম নেয় আমাদের প্রতিটি ভয়ের ভেতর থেকে।”
আট
তাদের ফ্ল্যাটে এখন আর আয়না নেই, এমনকি মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরাও বন্ধ করে রাখে মেঘলা। ছায়ার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার পর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে তারা। কিন্তু ছায়া কি এত সহজে বিদায় নেয়? একরাতে মেঘলা উঠে দেখে—ঘরের দরজা হালকা খোলা, হাওয়ায় দুলছে পর্দা, আর করিডোর থেকে ভেসে আসছে একরকম কান্নার শব্দ—চাপা, করুণ, মেয়েলি। সেই ধরণের কান্না, যা কেবল নির্জনতা জানে, সমাজ যার মুখ চেনে না। সে সায়নকে ডাকে, কিন্তু সায়ন গভীর ঘুমে। শব্দটা যেন নাম ধরে ডাকছে—“মেঘ-লা…” কাঁপতে কাঁপতে সে এগিয়ে যায় দরজার দিকে, ধীরে ধীরে খোলে, আর একদৃষ্টিতে তাকায় করিডোরের মাঝখানে—একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে, কুয়াশার মতো আবছা আলোয় গা ঢাকা দিয়ে। সেই মূর্তি এবার স্পষ্টতর, মুখটা এখন আঁধারে না ঢাকা, বরং যন্ত্রণায় কুঁচকে থাকা এক চেনা মেয়ে—অনুরাধা! সে এবার বলছে, “আমার জায়গা কে নেবে?” মেঘলা পিছিয়ে যায়, দরজা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু কান্না বন্ধ হয় না। সেটা চারপাশের দেয়াল থেকে ভেসে আসে, জানালার ফাঁক গলে ঢোকে, সিঁড়ির দিকে নেমে যায়। পরদিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বৃদ্ধা জানালেন—“কালকে রাতে যেন কেউ গুনগুন করে গাইছিল লিফটের সামনে। আমি দরজা খোলার সাহস পাইনি।” মেঘলা নিশ্চিত জানে—সে আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু এবার শুধু তাদের জন্য নয়, পুরো বিল্ডিং আবার এক অদৃশ্য চোখের নজরে বন্দি।
তারপর থেকে আবাসনের নানা জায়গায় অদ্ভুত জিনিস ঘটতে শুরু করল। কারও ফ্রিজ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, কারও বাথরুমে আয়নার কাচে লেখা “সে আসছে”, কারও টিভির স্ক্রিনে ফুটে উঠল এক মেয়ের মুখ, তারপর নিঃশেষ হয়ে গেল। শিশুদের কেউ কেউ বলছে, “রাতে এক দিদি এসে গল্প বলে, কিন্তু মা-বাবা তাকে দেখতে পায় না।” মেঘলা ভয় পাচ্ছে—ছায়া এবার ছড়িয়ে পড়ছে, তাদের মধ্যেই কেউ একজন হয়তো সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছে তার উপস্থিতিতে। সায়নও আবার বদলাচ্ছে। তার মুখে হাসি কম, চোখে সেই পুরনো ঘোরফেরা ভাব ফিরে এসেছে। এক দুপুরে সে বলে উঠল—“তুমি কি বুঝতে পারছ না? সে আমায় যেতে দিচ্ছে না। আমি তার কাছে কিছু পাওনা রেখে এসেছি।” মেঘলা আঁতকে ওঠে—“কী পাওনা?” সায়ন উত্তর দেয় না। তারপর পরদিন সে কাজ থেকে ফেরে না, ফোন বন্ধ। সন্ধ্যায় দরজা খোলে—সায়ন ফিরেছে, কিন্তু তার মুখ দেখে মনে হয়—সে ঘুমিয়ে হাঁটছে। শরীর তার, কিন্তু উপস্থিতি নয়। সেই রাতে সায়ন বলল, “আজ আমি করিডোরে ঘুরব। দেখি, কে আসলে ডাকছে।” মেঘলা জানে, এ এক খেলা—যেখানে ভুলে গেলে ছায়া জিতে যায়। সেদিন রাত দেড়টায় মেঘলা দরজা খুলে দেখে, করিডোর একেবারে নিস্তব্ধ, কেবল আলোহীন, অথচ বাতাস বইছে। দেয়ালের ওপরে কিছুর ছায়া। সে সায়নের পেছনে ছুটে যায়, দেখে—সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই কোণায়, যেখানে অনুরাধা সেনের ছবি প্রথম সিসিটিভিতে ধরা পড়েছিল আট বছর আগে। এখনো সেই জায়গায় একটা চিহ্ন রয়ে গেছে—একটা হাতের ছাপ, যেটা ধোয়া যায় না, মুছে যায় না।
মেঘলা এবার জানে, তাকে আরও গভীরে যেতে হবে। ছায়া কেবল কোনো আত্মার প্রতিধ্বনি নয়—সে এক মানসিক ছায়া, এক মনের আরেক রূপ। অনুরাধার মস্তিষ্কে জমে থাকা দুঃসহ যন্ত্রণা, সমাজের চাপ, প্রিয়জনের বিশ্বাসভঙ্গ—সব মিলিয়ে সে নিজেই এক ছায়া জন্ম দিয়েছিল। আর যেসব মন দুর্বল, যাদের ভেতরে অস্পষ্ট অপরাধবোধ বা ভয়ের ছায়া আছে—ছায়ামানব তাদের দেহে আশ্রয় নেয়। সায়নের মধ্যেও ছিল কিছু—হয়তো কোনো অতীত, হয়তো সম্পর্কের এক অসম্পূর্ণ গল্প—যেটা ছায়া চিনে ফেলেছে। করিডোরের কান্না আসলে শুধু এক মৃতার প্রেত নয়, বরং এক জীবিতের অসীম নিঃসঙ্গতা। মেঘলা বুঝতে পারে, যদি তাকে বাঁচাতে হয়, তাহলে ছায়ার মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে, আর সেটাই হবে তার পরবর্তী পদক্ষেপ—ছায়ার মুখোমুখি হয়ে তাকে বোঝানো, “তুমি যা চাও, আমি তা হতে পারব না। কারণ আমি নিজের ছায়াকে চিনে ফেলেছি।”
নয়
মেঘলা অনুভব করেছিল—ছায়াকে পরাজিত করতে হলে অস্ত্রের দরকার নেই, দরকার উপলব্ধি। কারণ এই ছায়া কেবল ভয় নয়, এ এক বিকৃত আত্মপরিচয়, এক অস্পষ্ট অথচ তীব্র মানসিক প্রতিক্রিয়া। সায়নের আচরণ এখন সম্পূর্ণ অদ্ভুত—সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় চুপ থাকে, মাঝে মাঝে নিজের নামটা ভুলে যায়, কখনো মেঘলাকে “অনুরাধা” বলে ডাকে। এই বিভ্রান্তি আর ভয়ের সংমিশ্রণ তাকে এক অদ্ভুত জগতে টেনে নিচ্ছে। মেঘলা সিদ্ধান্ত নেয়—যা হোক, তাকে একবার সেই জায়গায় ফিরে যেতে হবে, যেখানে সবকিছু শুরু হয়েছিল। আবাসনের সেই পুরনো গ্যারেজের নিচে একটা বন্ধ স্টোররুম ছিল, যা অনুরাধার মৃত্যুর পর থেকে তালাবদ্ধ। মেঘলা বহু অনুরোধ করে কেয়ারটেকারকে রাজি করায় তালা খুলতে। সেই ঘরের ভেতর অন্ধকার। বাতাসে ধুলো আর পুরনো রঙের গন্ধ। কোণে পড়ে থাকা এক ক্যানভাসে সে দেখতে পায়—একটা মুখ আঁকা, কিন্তু মুখটার সবকিছু ঘোলা, চোখদুটো শুধু গভীর আর শূন্যতায় ভরা। ছবির পাশে একটা খাতা পড়ে ছিল, যার পাতাগুলো জীর্ণ, ছেঁড়া। খাতার মধ্যে ছিল অনুরাধার নিজস্ব নোট—সে লিখেছে, “আমি আর নিজেকে চিনতে পারি না। প্রতিদিন আয়নায় নতুন মুখ দেখি। আমি জানি, আমার ভিতরে কেউ আছে—একটা ছায়া—যে আমার হয়ে কথা বলে, ভাবনা নেয়, কখনো চোখে জল এনে দেয়।” মেঘলার গা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। ছায়া জন্ম নিয়েছিল এক মানসিক সংকটে, যেখানে নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়, সমাজের প্রত্যাখ্যান, একাকিত্ব সব মিলে এক মনস্তাত্ত্বিক ভাঙনের রূপ নিয়েছিল।
এই লেখা পড়ে মেঘলা বুঝতে পারে, ছায়া আসলে একদম নিঃসঙ্গ। সে ভয় দেখায়, কারণ সে ভয় পেয়েছিল একসময়। সে শরীর খোঁজে, কারণ নিজের শরীর হারিয়ে ফেলেছিল। সায়ন, হয়তো এই ছায়ার ভেতরে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছে যা তার নিজের মধ্যেই ছিল—অপ্রকাশিত দুঃখ, না বলা অনুভব। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে মেঘলা এবার সায়নের সঙ্গে কথা বলে—ধীরে, স্থির গলায়। সে বলে, “তুমি যা হারিয়েছ, সেটা ফিরে পাওয়ার জন্য তুমি অন্য কারও হয়ে যেতে পারো না। ছায়া তোমায় নিজের মতো বানাতে চায়, কারণ সে নিজে কিছু ছিল না। কিন্তু তুমি এখনও আছ, এখনও নিজের চিন্তা করতে পারো।” সায়নের চোখে জল চলে আসে। তার ভেতরে যেন একটা চাপা কষ্ট ভাঙে, আর সে বলে, “আমি শুধু চেয়েছিলাম কেউ আমায় বুঝুক। আর সে—যাকে তুমি ছায়া বলো—সে আমায় সব শুনেছিল। আমি ভুলিনি। আমি ক্ষমা চাই।” এই আত্মস্বীকৃতি, এই অনুতাপ—হয়তো ছায়ার বিরুদ্ধেই একমাত্র সুরক্ষা।
ঠিক সেই রাতে আবার আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় মেঘলা। এবার সায়ন তার পাশে। আয়নার গায়ে কুয়াশার মতো জমে ওঠে সেই পুরনো অবয়ব—একটা মুখহীন নারী, চোখদুটো গভীর কিন্তু শান্ত। এবার সে আর ভয় দেখায় না, কথা বলে না—শুধু একবার মাথা হেঁট করে। মেঘলা বলে, “আমি জানি তুমি কষ্ট পেয়েছিলে। কিন্তু এভাবে আর কাউকে কষ্ট দিয়ে নিজেকে বাঁচানো যায় না। আমি তোমাকে ভয় পাই না। আমি তোমায় দুঃখিত বলতে এসেছি।” সেই মুহূর্তে আয়নার ওপাশে এক ঝলক ঝাপসা আলো জ্বলে ওঠে, তারপর নিঃশব্দে সেই ছায়া মিলিয়ে যায়। শুধু আয়নার কোণে লেখা হয়ে থাকে—“আমায় কেউ প্রথমবার বলল—দুঃখিত।” সেদিন রাতে করিডোরে আর কোনও কান্নার শব্দ শোনা যায় না, লিফট আর থামে না নিজে নিজে, শিশুদের কেউ অদৃশ্য “দিদি”-র গল্প বলে না। ছায়া চলে যায় না চিরতরে, কিন্তু সে শান্ত হয়ে যায়। কারণ হয়তো এই প্রথম কেউ তার ব্যথাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, না বলে ভালোবাসা নয়—বলেছে, “আমি বুঝি।”
দশ
সকালটা অদ্ভুতভাবে আলোকিত ছিল। দক্ষিণ কলকাতার আকাশে মেঘ ছিল না, বাতাস ছিল ঝিরঝিরে, আর জানালার কাচে লেগে থাকা ধুলোও যেন সেই আলোয় একেকটা গল্প বলছিল। মেঘলা ঘুম ভেঙেই বুঝে যায়—আজ কিছু আলাদা। ঘরের দেয়ালে সেই অদৃশ্য ঠান্ডা অনুভব নেই, করিডোর থেকে আসা অকারণ হাওয়ার চাপ নেই, আয়নার কাচে কোনও ছোপ নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কথা—আজ অনেকদিন পর সায়ন তার দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আজকে আমি প্রথমবার ঠিক মতো ঘুমিয়েছি।” এই ছোট্ট স্বীকারোক্তির পেছনে ছিল রাতের পর রাতের অস্পষ্ট আতঙ্ক, ছায়ার ফিসফাস, আর চোখের সামনে নিজের চেহারাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। মেঘলা শুধু জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। একটানা রোদ গায়ে এসে পড়ে। বারান্দার পাথরে পা রেখে দেখে—তার নিজের ছায়া পড়েছে, পরিষ্কার, অনর্গল, আর… একেবারে একা। কোন ছায়া নেই, যে হেঁটে যাচ্ছে পেছনে পেছনে। সেই প্রতিধ্বনি হারিয়ে গেছে।
তারা সিদ্ধান্ত নেয়—এই ফ্ল্যাট তারা ছেড়ে দেবে। কোনও অলৌকিক শক্তিকে জয় করার পরেও, সেখানে থেকে যাওয়া মানে যেন সেই যন্ত্রণাকে বারবার বাঁচিয়ে তোলা। বিক্রম সেন আর কোনোদিন যোগাযোগ করেননি। হয়তো তিনিও সেই ছায়াকে নিজের মতো বিদায় জানিয়ে হারিয়ে গেছেন কোথাও, হয়তো তাঁর আত্মা নতুনভাবে জন্ম নিয়েছে সেই অন্য এক রূপে। আবাসনের অন্য বাসিন্দারাও ধীরে ধীরে ভুলে গেল সেই অদ্ভুত দিনগুলো—মানুষ যেমন করে ভুলে যায় ভয়াবহতা, যতদিন না আবার তা ফিরে আসে। তবে মেঘলা আর সায়ন ভুলল না। তারা নতুন জায়গায় উঠল—একটা পুরোনো বাড়ি, কাঠের জানালার প্যানেল আছে, ছাদে সাদা রঙ করা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাড়িটিতে কোনও আয়না নেই। কেবল মেঘলার ডেস্কে একটা ছোট রুপোর গ্লাস রাখা আছে, যাতে মাঝে মাঝে নিজের প্রতিবিম্ব ঝাপসা হয়ে দেখা যায়। তারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে—কিন্তু এই ‘স্বাভাবিক’ শব্দটার ভিতরে ঢুকে থাকে এক গভীর শিক্ষা—ভয়, দুঃখ আর ছায়ার অস্তিত্ব সবসময় মানুষের ভিতরেই তৈরি হয়। বাহিরের ভূত নয়, বরং মনের অন্ধকারই আসল ছায়ামানব।
শেষ এক সকালে, মেঘলা একাকী বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। সায়ন তখন অফিসে, আকাশে ছিল হালকা মেঘের পরত। হঠাৎ পেছন থেকে একটা হাওয়ার শোঁ-শোঁ শব্দ এল। সে চমকে তাকাল। কিন্তু না, কিছু নেই। শুধু দেয়ালে একটা সাদা কাপড় ঝুলছিল, হাওয়ায় নড়ছিল ধীরে ধীরে। সে তখন নিজেকে বলল—ছায়া চলে যায় না, সে থেকে যায় হৃদয়ের এক কোণে। কিন্তু যদি কেউ তাকে দেখে নেয়, মুখোমুখি হয়, তার সঙ্গে কথা বলে, দুঃখ ভাগ করে নেয়—তাহলে সে আর ভয় দেখায় না। তখন সে হয়তো কেবল একটা নামহীন যন্ত্রণা হয়ে যায়, যা আস্তে আস্তে মিশে যায় বাতাসে। সেই বাতাসই হয়তো আজ মেঘলার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। খুব শান্ত, নিঃশব্দে। ছায়াহীন সকালের স্পর্শ যেন সেই বাতাসের মধ্যেই লেখা—”তুমি এখন মুক্ত।”
—



