অরিত্র মুখার্জী
পর্ব ১: আগুনের চোখ
অমাবস্যার রাতে গ্রামের নিস্তব্ধতা যেন অদৃশ্য কোনো হাত এসে একেবারে চেপে ধরত। গঙ্গার তীরের ছোট্ট জনপদ খয়েরপুরে তখন বাতাসও গায়ে লাগতে চাইত না। মাটির ঘরগুলো মৃদু শ্বাসের মতো নিস্তেজ হয়ে থাকত, পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিফলন তো নেই-ই, তারকারাও যেন আকাশের কালো পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। শুধু মন্দিরের গায়ে, কুঁচকে যাওয়া লালচে ইট আর কালো ধোঁয়া-মাখা দেয়ালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই প্রাচীন কালীমূর্তি—যার চোখে অদ্ভুত এক জ্যোতি নাকি দেখা যায়।
বৃদ্ধরা বলত, “আগুনের চোখ”। তাদের দাবি, প্রতি অমাবস্যার রাতে মূর্তির দু’চোখ হঠাৎই জ্বলে ওঠে যেন কারো গায়ের ভিতর থেকে দাউ দাউ করে আগুন বেরিয়ে আসছে। শালপাতার থালায় ভোগ দেওয়া হয়, ঢাক বাজে না, শাঁখ বাজে না, কেবল ভয়ার্ত নীরবতায় সবাই দূর থেকে তাকিয়ে থাকে সেই দুই অগ্নিগোলকের দিকে। কেউ খুব কাছাকাছি যায় না, কারণ ভয় থাকে—আগুনের টান যে কাকে ছাই করে দেবে কে জানে!
সেই রাতেও গ্রামের মানুষ চুপচাপ দরজা-জানালা বন্ধ করে বসেছিল। গৃহস্থালি প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেন আলোর প্রতিযোগিতায় কেউ দেবীর ক্রোধ ডেকে না আনে। দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল নিশ্বাসের শব্দ, আর ঝিঁঝিঁ পোকার ক্রন্দন।
কেবল ছোট্ট ছেলেটি, নাম তার জয়দেব, অন্ধকার ভেদ করে বাইরে বেরোল। বয়স তার দশ কি এগারো, কিন্তু কৌতূহল বয়সের অনেক সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মায়ের হুঁশিয়ারি, বাবার মারধর কিছুতেই থামাতে পারে না তাকে। সে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল মন্দিরের সিঁড়িতে, মূর্তির দিকে তাকিয়ে। আর সেই মুহূর্তেই সে দেখল, দেবীর চোখের ভিতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠছে।
ছেলেটার গলা শুকিয়ে গেল। সে পেছন দিকে দৌড়তে গিয়েও পারল না। পা যেন পাথর হয়ে আটকে গেছে। দু’চোখের ভেতর থেকে ঝরে পড়া আগুনের তেজ তার বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল। জয়দেব শ্বাস নিতে পারছিল না। তখনই হঠাৎ এক অদ্ভুত হাহাকার ভেসে এলো বাতাসে। মনে হলো, মন্দিরের দেয়ালের আড়াল থেকে কেউ যেন কেঁদে উঠল—কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর, নাকি পশুর হাহাকার, বোঝা গেল না।
পরদিন ভোরে গ্রাম কেঁপে উঠল। জয়দেবকে পাওয়া গেল না। মন্দিরের সিঁড়ির নিচে কেবল এক স্তূপ কালো ছাই পড়ে ছিল। গ্রামের লোকেরা কেঁপে উঠল আতঙ্কে। কারো গলার স্বর বেরোল না। তারা জানত, আবারও একজনকে আগুনের চোখ গ্রাস করেছে।
সেইদিন দুপুরে গ্রামের প্রবীণরা একত্র হলেন বটতলায়। ধূসর দাড়িওয়ালা বুড়ো পঞ্চায়েতপ্রধান বললেন, “এ অভিশাপ বহু পুরনো। কালীমূর্তির ভেতরে আছে সেই সাধকের শক্তি। অমাবস্যার রাতে তার আত্মা চোখ দিয়ে বেরোয়, আর তখনই গ্রামের একজনকে টেনে নেয় ছাইয়ে।” অন্যজন চাপা গলায় বলল, “আমরা এ নিয়ে বাইরে কিছু বলব না। শহর থেকে লোক এলে আবার বিপদ ডেকে আনবে।”
কিন্তু সব কথা ঢেকে রাখা যায় না। রাতে ছেলেটির মা কান্না করতে করতে গলা ফাটাল, সেই শব্দ পৌঁছে গেল পাশের গ্রামেও। আর সেখান থেকে পৌঁছে গেল শহরের কানে।
খয়েরপুর তখনও জানত না, শহর থেকে আসছে এক তরুণ—যিনি খুঁজবেন এই আগুনের চোখের রহস্য।
পর্ব ২: আগন্তুক গবেষক
শহরের মানুষজন যখন এই কাহিনি শুনল, বেশিরভাগই হেসে উড়িয়ে দিল। আজকের দিনে মূর্তির চোখে আগুন জ্বলে ওঠে—এমন কথা নাকি শুধু গাঁয়ের অশিক্ষিত লোকই বিশ্বাস করতে পারে। তবু কয়েকজন আগ্রহী সাংবাদিক আর লোকসংস্কৃতির ছাত্রদের কানে যখন খবর পৌঁছোল, তখন ভেতরে ভেতরে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি হল। এমন গল্পগুলোতে শুধু অলৌকিকতার ছাপ নয়, অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, লুকিয়ে থাকে সামাজিক ব্যাখ্যা।
অয়ন মুখার্জী তখন কলকাতার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগের গবেষক। বয়স পঁচিশ, চোখে এক ধরনের অস্থির কৌতূহল। পুরনো কাগজপত্র, ধুলো ধরা পুঁথি, কিংবা লোককথার ভেতরে ঢুকে থাকা রক্তাক্ত সত্যকে খুঁজে বের করার প্রতি তার অদম্য আগ্রহ। খবরটা শোনামাত্রই সে ঠিক করল, খয়েরপুরে যেতেই হবে। সহকর্মীরা হাসল—“ওসব গাঁয়ের ভূত-প্রেতের গল্প! তুই আবার সিরিয়াসলি নিচ্ছিস নাকি?” কিন্তু অয়ন জানত, প্রতিটি লোককথার ভেতরেই থাকে সমাজের গোপন ইতিহাস।
শহর থেকে দূরত্ব খুব বেশি নয়। সকালে হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে উঠে, তারপর বাস, শেষে ভাঙা কাঁচা রাস্তায় পায়ে হেঁটে দুপুর নাগাদ সে পৌঁছোল খয়েরপুরে। চারিদিকে ফসলের মাঠ, শিমুল আর খেজুরগাছের সারি, আর নির্জনতার ভেতর দিয়ে হাওয়ার টান। তবু প্রথমেই চোখে পড়ল—গ্রামের মানুষের ভীত মুখ।
অয়ন গ্রামের চায়ের দোকানে বসে জিজ্ঞেস করল, “এখানে নাকি কালীমূর্তির চোখে আগুন জ্বলে ওঠে?” দোকানদার চুপ করে রইল। চারপাশে থাকা কয়েকজন ক্রেতা একসাথে তাকাল তার দিকে, যেন অয়ন এমন একটা শব্দ উচ্চারণ করেছে যা নিষিদ্ধ। শেষে দোকানদার ধীরে ধীরে বলল, “ওসব কথা বেশি জিজ্ঞেস করবেন না বাবু। আমরা তো চুপচাপ থাকলেই ভালো আছি।”
কিন্তু চুপ থাকা মানেই কি মুক্তি? অয়ন তা মানতে রাজি নয়। সে ঠিক করল, সরাসরি মন্দিরে যাবে।
সন্ধ্যার আগেই সে মন্দিরের সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়াল। লালচে ইটের দেওয়ালে কালো ধোঁয়ার দাগ, দরজার সামনে শুকনো বেলপাতা, আর ভেতরে এক বিশাল কালীমূর্তি। মূর্তির চোখদুটো অস্বাভাবিক বড়, যেন কারো দিকে অবিরাম তাকিয়ে আছে। অয়ন হঠাৎ অনুভব করল, এই দৃষ্টি কেবল পাথরের নয়—এর ভেতরে যেন কোনো অদৃশ্য জীবন লুকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কণ্ঠস্বর এল, “আপনি কি শহরের লোক?”
অয়ন ঘুরে দেখল, এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। দাড়ি সাদা, গায়ের গামছা জীর্ণ, কিন্তু চোখে এক ধরনের তীক্ষ্ণ আলো। বৃদ্ধ নিজেকে পরিচয় দিলেন—তিনি গ্রামের পুরোহিত, নাম রামপদ চক্রবর্তী।
অয়ন বলল, “হ্যাঁ, আমি গবেষণা করছি লোককথা নিয়ে। শুনলাম আপনার গ্রামে এই মূর্তির সঙ্গে অনেক ঘটনা জড়িয়ে আছে। জানতে চাই।”
রামপদ কিঞ্চিতক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “সব জানবার জিনিস নয় বাবু। অনেক কথা গোপন থাকাই ভালো। কিন্তু আপনি যদি সত্যিই খুঁজে দেখতে চান, তবে সাবধান করে দিচ্ছি—এ পথে গেলে ফেরার রাস্তা থাকে না।”
অয়ন মৃদু হাসল, “আমি ভয় পাই না, কাকু। ভয়কে না খুঁজলে সত্যি পাওয়া যায় না।”
পুরোহিতের চোখের গভীরে এক ঝলক দুঃখ ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “গত রাতে যে ছেলেটি গায়েব হয়ে গেল, সে-ও ভয় পেত না। এখন শুধু ছাই বাকি।”
অয়ন কেঁপে উঠল। হঠাৎই গল্প তার চোখের সামনে বাস্তব হয়ে উঠল। মন্দিরের সিঁড়ির নিচে যে ছাইয়ের স্তূপ পড়ে আছে, সেটাই কি জয়দেব? ছাইয়ের গন্ধ যেন হাওয়ার সাথে তার নাকে এসে লাগল।
তবু সে ঠিক করল, সবকিছু জানবে। এই অভিশাপের ভিতর যদি সত্যিই তন্ত্র থাকে, তবে সেটার ইতিহাস তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। সে গ্রামের ভিতর হেঁটে বেড়াতে লাগল, মানুষদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু সবাই এক প্রশ্নে চুপ হয়ে গেল। কেউ বলল, “শহরের বাবুরা এলে অশুভ ডাকে।” কেউ আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল।
রাতে মাটির ঘরে আশ্রয় নিল অয়ন। বাইরে দূরে কোথাও কুকুর হাহাকার করছে। শুতে গিয়েও তার কানে ভেসে এলো ফিসফিস শব্দ—মন্দিরের দিক থেকে যেন কোনো মন্ত্রোচ্চারণ চলছে। তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হল, কিন্তু একইসাথে এক অদম্য কৌতূহলও।
সে জানত না, খয়েরপুর তাকে আর এত সহজে ফিরতে দেবে না।
পর্ব ৩: নিখোঁজের রাত
অমাবস্যা আবার চলে এল। গ্রাম জুড়ে যেন অদৃশ্য শ্বাসরোধ করা ভয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। বাতাস থমথমে, হাওয়ায় তালের গন্ধ নেই, জোনাকির আলো নেই, শুধু একটা ঘন অন্ধকারে ডুবে থাকা সময়। খয়েরপুরের প্রত্যেকটা ঘরে দরজা বন্ধ, প্রদীপ নিভিয়ে রাখা। কেবল মাটির দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় কাঁপতে থাকা চোখজোড়া।
অয়ন দিনভর গ্রামের মানুষের নীরবতা অনুভব করেছিল, কিন্তু রাতে সেটা ভয়ঙ্কর আকার নিল। গ্রামের পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে সে শুনল, হঠাৎ করেই ঢেকুর তোলা জলের শব্দ থেমে গেল। একটাও ব্যাঙ ডাকছে না। আকাশে তারা নেই, বাতাসে শব্দ নেই—মনে হচ্ছে পৃথিবী থেকে সময় মুছে গেছে।
সে নিজের নোটবই বের করে লিখল—
“খয়েরপুর, অমাবস্যা। প্রকৃতির ভেতর অস্বাভাবিক স্তব্ধতা। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক। এই নীরবতা যেন আসন্ন ঘটনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
ঠিক তখনই ভাঙা কাঁচা রাস্তায় কোলাহল শোনা গেল। কিছু লোক দৌড়ে দৌড়ে আসছে। দূরে ঝলসে ওঠা মশালের আলো। অয়ন এগিয়ে গিয়ে দেখল, গ্রামের মাঝবয়সী যুবক হরিদাসকে একদল লোক মন্দিরের দিক থেকে টেনে নিয়ে আসছে। সে নাকি হঠাৎই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, আর তার চোখদুটো একেবারে ফাঁকা।
লোকেরা তাকে আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করছে—“ওকে বাঁচানো যাবে না। আগুনের টান লেগেছে।”
অয়ন ভড়কে গেল। সে কাছে গিয়ে হরিদাসকে ডাকল, “শুনুন! শুনতে পাচ্ছেন?”
কিন্তু লোকটির ঠোঁট নড়ল না, চোখে শূন্য দৃষ্টি। সে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির টানে মন্দিরের দিকে হাঁটতে চাইছে। চারপাশের লোকেরা তাকে ধরে রাখলেও তার শরীর এক অদ্ভুত জোরে সামনে টানছে।
ঠিক তখনই অয়ন লক্ষ্য করল—মন্দিরের কালো দেয়াল থেকে হালকা লালচে আলো বেরোচ্ছে। ধীরে ধীরে সেটা বাড়তে লাগল, যেন মূর্তির চোখদুটো জ্বলে উঠছে। গ্রামের ভয়ে কাঁপতে থাকা মানুষজন হুড়মুড়িয়ে পালিয়ে গেল। অয়ন একা দাঁড়িয়ে রইল মন্দিরের দিকে তাকিয়ে।
তার মনে হলো, কেউ যেন ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই মূর্তির চোখ থেকে আগুনের দাউ দাউ শিখা বেরিয়ে এল, আর সেই আগুন যেন অদৃশ্য সুতোয় হরিদাসকে টেনে নিল ভেতরে। লোকটি আর্তচিৎকার করল না, কেবল শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল, আর মুহূর্তের মধ্যে সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
অয়ন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পায়ের নিচে কেবল এক স্তূপ কালো ছাই ছড়িয়ে রইল, যার মধ্যে থেকে পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে।
ভোরবেলা গ্রামের মানুষজন আবার একত্র হল। সবাই মুখ নিচু করে ছাইয়ের দিকে তাকাল। কারো মুখে শব্দ নেই। কেবল এক বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমার ছেলে! আমার হরিদাস!”
অয়ন গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। সে বুঝল, গল্প নয়—এ গ্রামে সত্যিই কিছু ঘটছে। কিন্তু এটা কি কেবল লোককথার তান্ত্রিক শক্তি, নাকি মানুষের তৈরি কোনো চক্রান্ত?
সেই প্রশ্ন নিয়েই রাতভর সে জেগে রইল। মন্দিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো—দেবীর চোখে যে আগুন জ্বলছে, সেটা কেবল আলো নয়, সেটা এক ভীষণ ক্ষুধার রূপ।
পর্ব ৪: নিষিদ্ধ আখ্যান
অয়ন সেদিন ভোরে ঘুমোয়নি। কেরোসিনের আলো নিভিয়ে দিয়ে সে শুধু খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে মন্দিরের দিকে তাকিয়ে ছিল। রাতের আঁধার একটু একটু করে হালকা হচ্ছিল, কিন্তু মূর্তির চোখের লালচে আভা তখনও যেন দপদপ করে জ্বলছিল। সে জানত, এর ভেতরে কোনো গোপন কাহিনি আছে—যেটা শুধু গুজব নয়, রক্ত-মাংসের মতো বাস্তব।
সকালে যখন গ্রামের লোকেরা হরিদাসের মৃত্যু নিয়ে ক্রন্দন আর চাপা আতঙ্কে ব্যস্ত, তখন অয়ন চুপচাপ এগোল মন্দিরের পুরোহিত রামপদ চক্রবর্তীর বাড়ির দিকে। বাড়িটা প্রায় ভাঙাচোরা, উঠোনে শুকনো তুলসীগাছ, দরজায় অর্ধেক খসে যাওয়া লাল রঙ। রামপদ তখন প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে জপ করছেন। অয়ন ঢুকে গেল ভেতরে।
—“কাকু, আর লুকোবেন না। আমি জানি, মূর্তির এই আগুন কেবল পাথরের নয়। এখানে কোনো প্রাচীন শক্তি কাজ করছে। আমাকে সব বলুন।”
রামপদ প্রথমে চমকে উঠলেন, তারপর ধীরে ধীরে চোখ মুছলেন। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
—“আপনি যখন এসেই পড়েছেন, তখন শোনানোটাই কর্তব্য। কিন্তু মনে রাখবেন, এই কাহিনি শোনার পর আপনার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।”
তিনি কাঁপা গলায় বলতে শুরু করলেন—
“চারশো বছর আগে এই গ্রামে এসেছিলেন এক ভীষণ তান্ত্রিক সাধক—বিরোচনানন্দ। তিনি ছিলেন অগ্নি-সাধক। কথিত আছে, আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ছিল তার হাতে। মানুষ ভয়ে তাকে দেবতার মতো মানত, আবার ঘৃণায় তাকে অভিশাপ দিত। একসময় গ্রামের লোকেরা একত্র হয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আগুনে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর আগমুহূর্তে বিরোচনানন্দ নিজের আত্মাকে স্থানান্তর করলেন কালীমূর্তির চোখে। তখন থেকেই ওই চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।
তিনি শপথ নিয়েছিলেন—‘আমার সাধনা ব্যর্থ করলে, প্রতি অমাবস্যায় তোমাদের একজন করে আমার অগ্নিতে ভস্মীভূত হবে।’ তখন থেকেই এই গ্রামে এই অভিশাপ চলছে। প্রতিটি প্রজন্মে আমরা একেকজনকে হারাই।”
অয়ন স্তম্ভিত হয়ে শুনছিল। সে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু কেউ কি এই অভিশাপ ভাঙার চেষ্টা করেনি?”
রামপদ ম্লান মুখে হাসলেন।
—“অনেকেই করেছে। যারা করেছে, তারাও ছাই হয়ে গেছে। কারণ, ওই তান্ত্রিক শক্তিকে ভাঙার উপায় কেবল একটি—একজনকে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় আগুনের ভেতরে। সেই আত্মাহুতি ছাড়া অভিশাপ ভাঙা যায় না।”
অয়নের বুক কেঁপে উঠল। তার মনে হলো, এ গ্রাম যেন অদৃশ্য শিকলে বাঁধা। কিন্তু তবু একটা প্রশ্ন তার ভেতরে জেগে উঠল—“কাকু, তাহলে আপনারা এ কথা বাইরে বলেন না কেন? শহরে খবর দিলে তো কেউ না কেউ এসে তদন্ত করবে।”
পুরোহিতের চোখ হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠল।
—“আমরা যদি এই কথা বাইরে বলি, তবে গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ আগুনের ক্ষুধা আরও বেড়ে উঠবে। দেবী শুধু আমাদের রক্ত চান না, তিনি আমাদের ভয়কেও চান। ভয়ই তাঁকে শক্তি জোগায়।”
অয়ন শিহরিত হয়ে উঠল। একটা সম্পূর্ণ গ্রাম আতঙ্কের কাছে বন্দি, আর এই বন্দিদশাকে ধরে রেখেছে একটা প্রাচীন অভিশাপ।
সেদিন রাতে সে আবার গেল মন্দিরের সামনে। ছাইয়ের স্তূপ তখনও পড়ে আছে। অয়ন হাতে নিল সামান্য ছাই। গরম নয়, কিন্তু তার আঙুলে যেন শীতল আগুনের খোঁচা লাগল। মনে হলো, ছাইয়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের কান্না, হাড়ের গন্ধ, আর অদৃশ্য চিৎকার।
সে খাতা খুলে লিখল—
“এ কেবল লোককথা নয়, এ এক জীবন্ত ইতিহাস। এখানে অভিশাপ, তন্ত্র আর মানুষের ভয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক জটিল সম্পর্ক।”
তার মনে হচ্ছিল, সে যতই লিখছে, ততই যেন কোনো অদৃশ্য চোখ তাকে লক্ষ্য করছে। যেন মূর্তির ভেতর থেকে কেউ ফিসফিস করে বলছে—“তুমি অনেক দূর চলে যাচ্ছো।”
অয়ন জানত, সে আর পিছোতে পারবে না। সত্যটা না জানা পর্যন্ত তার থামা নেই।
পর্ব ৫: আগুনের সাধনা
গ্রামে তখন আবার রাত নেমেছে। আকাশ ঢেকে আছে কালো মেঘে, বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ—পোড়া ধূপ আর শুকনো মাটির গন্ধ যেন মিশে গিয়ে এক অস্বস্তিকর আবেশ তৈরি করছে। অয়ন সেদিন আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। পুরোহিত রামপদের কথাগুলো মাথায় ঘুরছিল বারবার—“প্রতি অমাবস্যায় একজনকে গ্রাস করবে আগুনের চোখ।”
সে জানত, কিছু একটা ঘটবেই। মন্দিরের অন্ধকার চত্বরে পা রেখেই সে বুঝল, আজকের রাত অন্য রাতের চেয়ে আলাদা। ভেতর থেকে আসছে মৃদু মন্ত্রোচ্চারণ। গভীর, কর্কশ, বারবার উচ্চারিত হচ্ছে অগ্নি, অগ্নি, অগ্নি… শব্দটা যেন বাতাস কেটে ছড়িয়ে পড়ছে।
অয়ন দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মন্দিরের ভিতরে জ্বলছে কয়েকটা প্রদীপ, আর তার চারপাশে বসে আছে একদল মানুষ। মাথায় লাল কাপড়, কপালে সিঁদুরের দাগ, চোখ বন্ধ করে তারা সবাই একই সঙ্গে মন্ত্র পড়ছে। সামনে রাখা হয়েছে পাঁঠার রক্ত, ধূপের ধোঁয়া, আর অদ্ভুত সব চিহ্ন আঁকা।
অয়ন প্রথমে ভেবেছিল—গ্রামের অশিক্ষিত কিছু লোক অন্ধবিশ্বাসে এইসব করছে। কিন্তু যখন সে দেখল, তাদের মাঝখানে বসে আছেন গ্রামের প্রভাবশালী নেতা মহেন্দ্র মণ্ডল, তখন তার বুক ধক করে উঠল। মহেন্দ্র এই গ্রামের জমিদারি পরিবারের উত্তরসূরি। তার কথায় গ্রাম চলে, তার সামনে কেউ কথা বলে না। অথচ সেও বসে আছে এই তান্ত্রিক সাধনার মাঝে, চোখ বুজে অগ্নি-আহ্বান করছে।
এক মুহূর্তে অয়ন বুঝে গেল—এ শুধু লোককথার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতা আর শাসনের রাজনীতি। মানুষের ভয়ের ওপর ভর করেই তারা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখছে।
মূর্তির সামনে রাখা রক্তের থালা থেকে ধোঁয়া উঠছে, সেই ধোঁয়ার ভেতর যেন ভেসে উঠছে অদৃশ্য ছায়া। মন্ত্রোচ্চারণ যত জোরে হচ্ছে, মূর্তির চোখও তত লাল হয়ে উঠছে। হঠাৎ করে চারদিক যেন দাউ দাউ করে লাল আলোয় ভরে গেল। মূর্তির চোখ থেকে যে আগুন বেরোল, তাতে অয়নের শরীর কেঁপে উঠল।
সে নিজের চোখ বিশ্বাস করতে পারছিল না—মূর্তির চোখের ভেতর থেকে যেন সত্যিই শিখা ঝলসে উঠছে। সেই শিখা গিয়ে লেগে পড়ল মন্দিরের দেয়ালে, তবু কিছু পোড়াল না, শুধু আলো ছড়িয়ে দিল। আর সেই আলোর ভিতরেই সবাই একযোগে কণ্ঠ মেলাল—
—“অগ্নি, অগ্নি, আমাদের শক্তি দাও। আমাদের ভয় দাও। আমাদের রক্ত দাও।”
অয়নের মনে হল, এই আচার কেবল দেবীকে খুশি করার জন্য নয়। এটি একধরনের চুক্তি—গ্রামকে ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে রেখে শাসন করার পথ। মহেন্দ্র মণ্ডল আর পুরোহিত রামপদ মিলে এই তন্ত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু এর পেছনে যে সত্যিকারের আগুন আছে, সেটা হয়তো কারো হাতের বাইরে।
হঠাৎই একজন মানুষকে টেনে আনা হল মন্দিরের ভেতরে। অয়ন আতঙ্কে দেখল, ওটা গ্রামেরই এক গরিব চাষা। তার চোখ ভয়ে ফেটে যাচ্ছে, সে কাকুতিমিনতি করছে—“আমায় ছেড়ে দিন, আমি কিছু করিনি!” কিন্তু বাকিদের মুখে কোনো দয়া নেই। তারা তাকে মূর্তির সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।
মহেন্দ্র মণ্ডলের কণ্ঠস্বর গম্ভীর হয়ে উঠল—
—“আগুনকে রক্ত চাই, আগুনকে আত্মা চাই। গ্রামের মঙ্গল এর মধ্যেই।”
অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল। চাষার শরীর কাঁপছে, সে পালাতে চাইছে। কিন্তু মন্ত্রোচ্চারণ এত প্রবল হল যে, মূর্তির চোখ থেকে বেরোনো আগুন যেন তাকে ঘিরে ধরল। এক ঝলকে সব শেষ—চাষার শরীর হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, কেবল ছাই পড়ে রইল মাটিতে।
অয়নের বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হল। সে নিজের খাতায় লিখল—
“এ কোনো সাধারণ আচার নয়। এ এক পৈশাচিক রাজনীতি, যেখানে দেবীর নামে মানুষের আতঙ্ককে পুঁজি করে শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখছে।”
কিন্তু একইসাথে তার মনে হল, যে আগুন সে দেখল, সেটা কেবল প্রতীক নয়—এ সত্যিই এক অতিপ্রাকৃত শক্তি। যার কাছে মানুষ যেমন খেলনা, তেমনি রক্তের ক্ষুধা মেটানোর উপাদান।
অয়ন বুঝল, এখন আর সে শুধু গবেষক নয়। সে এই অভিশপ্ত আগুনের সাক্ষী হয়ে গেছে। আর সাক্ষী হওয়া মানেই হয়তো শীঘ্রই ভস্মীভূত হওয়া।
পর্ব ৬: ভেতরের চক্রান্ত
পরদিন সকালবেলা খয়েরপুরের আকাশ অস্বাভাবিক পরিষ্কার ছিল। যেন রাতের ভয়ঙ্কর আচার, আগুনের শিখা, মানুষের বিলীন হয়ে যাওয়া—সবই মুছে গিয়ে কেবল শান্ত গ্রামীণ সকাল এসে পড়েছে। মাঠে মাঠে খেজুরপাতার ফিসফাস, নদীর জলে আলো ঝিকমিক করছে। অথচ অয়নের চোখে সবকিছু অন্যরকম। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়, আর ভয়কে আঁকড়ে ধরেই দাঁড়িয়ে আছে এই গ্রাম।
সে বারবার ভাবছিল, গত রাতের দৃশ্য কি সত্যিই সে দেখেছিল? নাকি এক বিভ্রম? কিন্তু মন্দিরের সামনে পড়ে থাকা ছাইয়ের স্তূপ আবার তাকে স্মরণ করিয়ে দিল—ওটা বিভ্রম নয়, এ এক বাস্তব দুঃস্বপ্ন।
অয়ন এবার সিদ্ধান্ত নিল, গ্রামের ভিতর ঢুকতে হবে আরও গভীরে। সে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলো। কিন্তু মানুষজন তাকে দেখেই চুপ করে যাচ্ছিল। কেউ কেউ চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, যেন শহরের লোকের সাথে কথা বললেই অমঙ্গল হবে। তবু এক বিকেলে ধানের খেতের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে দেখা পেল এক তরুণী বিধবার। নাম তার সুমিত্রা।
সুমিত্রা প্রথমে অয়নকে দেখে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে কথায় কথায় মুখ খুলল। তার স্বামী নাকি তিন বছর আগে অমাবস্যার রাতে নিখোঁজ হয়েছিল। সেদিন থেকে সে একা। সে চাপা স্বরে বলল,
—“ওরা বলে দেবী নিলেন। কিন্তু আমি জানি, সবটা মিথ্যে নয়। মূর্তির চোখে হয়তো আগুন জ্বলে, কিন্তু মানুষকে তুলে নেওয়ার পেছনে যারা আছে, তারা এখানকার বড়লোকেরা। পুরোহিত, মহেন্দ্র মণ্ডল—ওরাই এই অভিশাপকে ব্যবহার করছে। গ্রামের লোকজন ভয় পায়, তাই কিছু বলে না। কিন্তু আমি জানি, ওরা ইচ্ছে করেই মানুষের প্রাণ দিচ্ছে, যাতে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে।”
অয়ন স্তম্ভিত হয়ে শুনছিল। গত রাতের দৃশ্য তার চোখে ভেসে উঠল। সত্যিই তো—যাকে আগুনের সামনে আনা হয়েছিল, সে সাধারণ গরিব চাষা। মহেন্দ্র মণ্ডলই তো বলেছিলেন, “গ্রামের মঙ্গলের জন্য দরকার।” তাহলে কি মঙ্গল মানে তাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখা?
অয়ন সুমিত্রাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এই কথা অন্য কাউকে বলোনি?”
সুমিত্রার চোখে অশ্রু জমল।
—“কার কাছে বলব বাবু? বললেই হয়তো পরের অমাবস্যায় আমাকেই ছাই করে দেবে।”
অয়ন বুঝল, এ শুধু অলৌকিক তন্ত্র নয়—এ এক রক্তাক্ত রাজনীতি। ভয় আর ধর্মকে মিলিয়ে গ্রামের প্রতিটি মানুষকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। যারা উপরে আছে, তারা মানুষের আতঙ্ককে শাসনের হাতিয়ার করেছে। আর যারা নিচে আছে, তারা অসহায়ভাবে নিজেদের ভাগ্য মেনে নিয়েছে।
সেই রাতে অয়ন নিজের খাতায় লিখল—
“অভিশাপের ভেতরে চক্রান্ত লুকিয়ে আছে। মূর্তির চোখ হয়তো সত্যিই আগুনে জ্বলে ওঠে, কিন্তু সেই আগুনকে শাসনের মঞ্চে ব্যবহার করছে মানুষই। তন্ত্র আর রাজনীতির মেলবন্ধন এই গ্রামকে বন্দি করে রেখেছে।”
কিন্তু তার ভেতরেই একটা দ্বন্দ্ব জেগে উঠল। সত্যিই কি সবটা মানুষের ষড়যন্ত্র? সে তো নিজে চোখে দেখেছে আগুনের ঝলক, মানুষের ছাই হয়ে যাওয়া। এতটা কি কেবল সাজানো নাটক? নাকি সত্যিই বিরোচনানন্দের অভিশাপ আজও বেঁচে আছে?
সেই দ্বন্দ্ব নিয়েই সে গেল রামপদ পুরোহিতের কাছে। পুরোহিত তখন মন্দিরের চৌকাঠে বসে ধূপ জ্বালাচ্ছিলেন। অয়ন সোজাসুজি বলল,
—“আমি সব জানি। মহেন্দ্র মণ্ডল আর আপনি মিলেই এই আচার চালাচ্ছেন। ভয় দেখিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।”
রামপদ ধীরস্বরে উত্তর দিলেন,
—“তুমি অর্ধেকটা দেখেছো, অর্ধেকটা এখনো বাকি। হ্যাঁ, মহেন্দ্ররাও লাভ নিচ্ছে। কিন্তু ভাবছো, ওদের ছাড়া এই আগুন টিকতে পারত? ওদের রক্ত ছাড়া দেবীর শিখা টিকে থাকত? আমরা শুধু শিখাকে খাইয়ে দিই, কিন্তু শিখার ক্ষুধা সত্যিই আছে। তুমি যদি বিশ্বাস না করো, পরের অমাবস্যায় থেকো, সবটা নিজে দেখে নিয়ো।”
অয়ন নির্বাক হয়ে গেল। সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা যেন মুছে যাচ্ছে।
সেই রাতে খয়েরপুরের আকাশে হঠাৎ ঝড় উঠল। বাতাসে উড়তে লাগল শুকনো পাতা, খেজুরগাছ কাঁপতে লাগল। আর দূরে মন্দিরের দিক থেকে আবার ভেসে এল মন্ত্রোচ্চারণ—
“অগ্নি, অগ্নি, আমাদের ভয় দাও, আমাদের রক্ত দাও।”
অয়ন বুঝতে পারল, সে এমন এক চক্রান্তের ভেতর ঢুকে পড়েছে, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়।
পর্ব ৭: মূর্তির অভিশাপ
খয়েরপুরের রাত যেন দিন দিন আরও ভারী হয়ে উঠছিল। প্রতিটি অমাবস্যা যেন গ্রামবাসীর বুকের ভেতর থেকে নিঃশ্বাস কেড়ে নেয়। অয়ন এবার ঠিক করল, সে খুঁজে বার করবে মূর্তির আসল ইতিহাস। গুজব আর কাহিনি নয়, পুঁথি আর দলিলের ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্য।
সে প্রথমে গেল গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ মানুষটির কাছে—হেমন্ত মল্লিক। বয়স নব্বই ছাড়িয়েছে, তবু মাথা এখনো ঠান্ডা। তাকে সবাই ‘জ্যাঠামশাই’ বলেই ডাকে। অয়ন তার কুঁচকানো হাত ধরতেই তিনি ফিসফিস করে বললেন,
—“তুই শহরের ছেলে, ভয় তোর নেই বুঝি?”
অয়ন হেসে উত্তর দিল,
—“ভয় আছে জ্যাঠামশাই, কিন্তু ভয়কে না খুঁজলে সত্যি পাওয়া যায় না।”
হেমন্ত ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
—“আমি ছোট থাকতে দাদুর মুখে শুনেছিলাম বিরোচনানন্দের কাহিনি। চারশো বছর আগের কথা। তখন এই গ্রাম ছিল গঙ্গার ধারে এক ধনী জনপদ। বিরোচনানন্দ এসেছিল সাধনার খোঁজে। সে ছিল অগ্নি-সাধক। বলে, আগুন তার সামনে ঝুঁকত, বজ্র তার কথায় থেমে যেত। মানুষ প্রথমে তাকে ভক্তি করল, কিন্তু ধীরে ধীরে ভয়ের কারণে তাকে দূরে ঠেলতে লাগল। কারণ বিরোচনানন্দ বলত, ‘অগ্নি ক্ষুধার্ত, অগ্নি রক্ত চায়।’”
“এক রাতে গ্রামবাসীরা বিদ্রোহ করল। তারা তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চাইলো। কিন্তু সেই সময় বিরোচনানন্দ হাসল। মৃত্যুর আগুনে দাঁড়িয়ে সে মন্ত্র পড়ল—‘যতদিন না আমার সাধনা পূর্ণ হয়, ততদিন প্রতি অমাবস্যায় তোমাদের একজন আমার অগ্নিতে বিলীন হবে। আমার আত্মা থাকবে এই মূর্তির চোখে, আগুন হবে আমার নিশ্বাস।’ তারপর তার শরীর দাউ দাউ করে জ্বলে গেল। আর সকালের আলোয় মানুষ দেখল, কালীমূর্তির চোখ থেকে ধোঁয়া উঠছে।”
অয়ন নিঃশ্বাস চেপে শুনছিল। হেমন্ত বললেন,
—“তারপর থেকে প্রতি অমাবস্যায় একেকজন গায়েব হয়। প্রথমদিকে গ্রামবাসীরা লড়াই করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু একের পর এক মৃত্যুতে ভয় জমে গেল। তখন থেকেই সবাই চুপ। ভয়কে বুকে নিয়েই বেঁচে আছে।”
অয়ন জিজ্ঞেস করল, “কেউ কি জানে এই অভিশাপ ভাঙার উপায়?”
হেমন্ত চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে বললেন,
—“শুনেছি, একমাত্র উপায় হলো আত্মাহুতি। স্বেচ্ছায় কেউ যদি শিখায় প্রবেশ করে, তবে অভিশাপ ভাঙবে। কিন্তু কে এমন করতে যাবে? কারো সাহস হয়নি।”
অয়ন কেঁপে উঠল। সে জানত, সত্যকে খুঁজতে গিয়ে সে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে ফেরার রাস্তা নেই।
রাতে আবার সে মন্দিরে গেল। চারিদিক নিস্তব্ধ, কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার কান্না। সে মূর্তির দিকে তাকাতেই হঠাৎ মনে হলো, চোখের ভেতর থেকে আগুন নয়, বরং দুটো অদৃশ্য দৃষ্টি তাকে গিলে খাচ্ছে। সেই দৃষ্টি যেন বিরোচনানন্দের—চারশো বছর আগে যে সাধক অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিল।
অয়ন তখন কেঁপে উঠে লিখল খাতায়—
“এ আর কেবল লোকসংস্কৃতির কাহিনি নয়। এ এক জীবন্ত ইতিহাস, যেখানে আগুনের ভেতর বন্দি আছে এক সাধকের অপূর্ণ সাধনা, এক গ্রামকে গ্রাস করে রাখা অভিশাপ।”
ঠিক তখনই মন্দিরের ভেতর থেকে ভেসে এল হাহাকার। হাওয়ার সঙ্গে মিশে থাকা কণ্ঠস্বর বলল—
“শিখা নিভবে না, যতদিন না স্বেচ্ছায় কেউ আসবে।”
অয়ন বুঝল, খয়েরপুরের ভবিষ্যৎ আসলে এক ভয়ঙ্কর প্রতিজ্ঞার ভেতরে আটকে আছে।
পর্ব ৮: গোপন দলিল
অয়ন এখন আর শুধু গবেষক নেই। সে যেন এই গ্রামের প্রতিটি অন্ধকারে, প্রতিটি ছাইয়ের গন্ধে, প্রতিটি কণ্ঠরোধ করা চিৎকারে জড়িয়ে গেছে। হেমন্ত মল্লিকের কাছে শোনা অভিশাপের গল্প তাকে গভীর রাতে ঘুমোতে দেয়নি। কালীমূর্তির চোখ যেন সারাক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে আছে, ভেতর থেকে অগ্নিসাধকের দৃষ্টি ছুটে আসছে।
একদিন দুপুরে অয়ন সিদ্ধান্ত নিল, গ্রামের পুরোনো নথি খুঁজতে হবে। পঞ্চায়েত অফিসে যাওয়ার সাহস করল না, জানত ওখানে কিছুই মিলবে না। সে সোজা গেল গ্রামের ধ্বংসপ্রায় জমিদারবাড়িতে। শোনা যায়, সেখানে এখন কেউ থাকে না। ভাঙা সিঁড়ি, জঙ্গলে ঢেকে যাওয়া অন্দরমহল—ভেতরে ঢুকতেই তার মনে হলো, অদৃশ্য এক ইতিহাস এখানে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
পুরোনো আলমারি খুলে খুলে ধুলো মুছে দেখতে লাগল। অনেকগুলো কাগজ, জমিদারি খাজনার হিসেব, কিছু চিঠিপত্র। হঠাৎই এক ক্ষয়িষ্ণু পুঁথি তার চোখে পড়ল। লাল রঙের কাপড়ে মোড়া, অক্ষর প্রায় মুছে যাওয়া। ভেতরে খুলতেই সে দেখল সংস্কৃত আর বাংলার মিশ্রণ ভাষায় কিছু মন্ত্র লেখা আছে। শিরোনামে লেখা—“অগ্নি-তন্ত্র: বিরোচনানন্দের সাধনপত্র”।
অয়নের বুক কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল।
“যখন আগুনের চোখ ক্ষুধার্ত হবে, তখন তাকে রক্ত দাও, ভয় দাও। কিন্তু যদি ভয় আর রক্ত নিভে যায়, তবে আত্মাহুতি দিতে হবে। কেবল স্বেচ্ছা আত্মাহুতি দিয়েই অগ্নির সাধনা ভাঙা সম্ভব।”
অয়ন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল। সত্যিই হেমন্ত যা বলেছিল, তার প্রমাণ এখানে। বিরোচনানন্দের নিজের হাতে লেখা বা অনুসারীদের সংরক্ষিত মন্ত্রপত্র। কিন্তু আরও পড়তে গিয়ে তার হাত কেঁপে উঠল—
“আত্মাহুতির পর শিখা নিভে যাবে না, বরং নতুন ধারককে গ্রহণ করবে। সে-ই হবে আগুনের পরবর্তী রক্ষক।”
অয়ন স্তম্ভিত হয়ে গেল। তাহলে অভিশাপ ভাঙা মানে মুক্তি নয়, বরং শিখাকে নতুন শরীরে স্থানান্তর করা। তাহলে কি কেউ সেই দায়িত্ব নেবে?
ঠিক তখনই জমিদারবাড়ির ভাঙা ছাদ থেকে একটা শব্দ এল। যেন কারো পায়ের আওয়াজ। অয়ন ঘুরে তাকাল। ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে পুরোহিত রামপদ। তার চোখে অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
—“বেশি খুঁজে দেখো না বাবু। যে সব জানে, তার পরিণতি আর কারও থেকে আলাদা হয় না।”
অয়ন খাতার ভেতর কাগজ ঢুকিয়ে বলল,
—“আমি সব জেনে গেছি, কাকু। এটা কেবল লোককথা নয়, এটা এক ভয়ঙ্কর খেলা। মহেন্দ্র মণ্ডলরা মানুষের রক্তকে ব্যবহার করছে, কিন্তু আগুন আসলেই বেঁচে আছে। অভিশাপ ভাঙার উপায় আমি পেয়েছি।”
রামপদ ধীরে ধীরে হাসলেন।
—“পেয়েছো? নাকি আগুন তোমাকেই পেয়েছে? তুমি যদি সত্যিই কাগজটা পড়েছো, তবে জানবে—যে স্বেচ্ছায় আগুনে প্রবেশ করে, সেও শেষ হয় না। সে-ই হয়ে ওঠে শিখার ধারক। তুমি প্রস্তুত আছো?”
অয়ন নির্বাক হয়ে গেল। তার মনে হলো, মন্দির থেকে ভেসে আসছে ফিসফিস শব্দ—“এসো, এসো…”
বাইরে তখন হাওয়া বইছে অদ্ভুত শব্দে। গাছের ডালপালা কেঁপে উঠছে, আর মন্দিরের দিকে তাকাতেই মনে হলো, দুটো চোখ অগ্নিশিখায় দপদপ করছে।
সে জানত, এই দলিল হাতে পাওয়া মানেই সে আর সাধারণ মানুষ নেই। এখন সে দাঁড়িয়ে আছে আগুনের সঙ্গে চুক্তির দোরগোড়ায়।
পর্ব ৯: শেষ অমাবস্যা
খয়েরপুরে আবার নামল অমাবস্যার রাত। কিন্তু এবার অয়ন জানত, এ রাত আর আগের মতো নয়। তার হাতে আছে সেই পুরোনো দলিল, যেখানে লেখা আছে অভিশাপ ভাঙার শর্ত। দিনকয়েক ধরে সে বারবার সেই শব্দগুলো পড়েছে—“স্বেচ্ছা আত্মাহুতিই শিখার শেষ পথ।”
গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে বসেছিল। প্রতিটি দরজা বন্ধ, প্রতিটি প্রদীপ নিভে যাওয়া। সবাই জানত, আজ আবার কারো না কারো পালা আসবে। অথচ কার মুখে কোনো শব্দ নেই। তারা জানে, ভয়ই তাদের জীবনের নিয়ম।
অয়ন সারা দিন ভেতরে ভেতরে যুদ্ধ করেছে। একদিকে তার গবেষকের কৌতূহল, সত্যকে খুঁজে পাওয়ার তৃষ্ণা; অন্যদিকে তার ভেতরে জন্ম নেওয়া ভয়, হয়তো এই অভিশাপ তার শরীরকেও গ্রাস করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—আরেকজন নিরীহ মানুষের মৃত্যু সে হতে দেবে না।
রাত বাড়তেই সে একাই মন্দিরের দিকে এগোল। তার হাতে দলিলের কাগজ, বুকের ভেতরে দমচাপা ধুকপুকানি। চারপাশে বাতাস ভারী হয়ে আসছে। পুকুরের জল স্থির, কুকুররা চুপ, জোনাকিরাও অদৃশ্য। দূর থেকে ভেসে আসছে মন্ত্রোচ্চারণ—মহেন্দ্র মণ্ডল ও রামপদ আবার বসেছে অগ্নি-সাধনায়।
অয়ন সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই মূর্তির চোখে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। পুরো মন্দির লাল আলোয় ভেসে গেল। মন্ত্রোচ্চারণ গর্জনের মতো উঠল—
“অগ্নি, অগ্নি, আমাদের রক্ত দাও, আমাদের ভয় দাও।”
ঠিক তখনই মহেন্দ্র মণ্ডল তাকে দেখে চমকে উঠল।
—“তুমি এখানে? শহরের ছেলে, এটা তোমার জায়গা নয়!”
অয়ন দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—“আজ আর কোনো নিরীহ মানুষ মরবে না। যদি অভিশাপ ভাঙতেই হয়, তবে আমি যাব।”
রামপদ এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকে দেখলেন। তারপর মৃদু হাসলেন।
—“তুমি জানো, শিখায় গেলে মৃত্যু আসবে না, রূপান্তর আসবে। তুমি কি প্রস্তুত সেই বোঝা বহন করতে?”
অয়ন উত্তর দিল না। সে শুধু ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল মূর্তির দিকে। আগুনের দৃষ্টি তার শরীরকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তবু সে থামল না। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া, তবু তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি জন্ম নিচ্ছে।
গ্রামের লোকেরা তখন বাইরে জড়ো হয়েছে। তারা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দেখছে—শহরের সেই আগন্তুক গবেষক নিজের ইচ্ছায় প্রবেশ করছে শিখার ভেতরে। কারো মুখে শব্দ নেই, শুধু কেঁপে ওঠা নিঃশ্বাস।
অয়ন দলিলের শেষ বাক্যটা মনে মনে উচ্চারণ করল—
“অগ্নি কেবল ধ্বংস নয়, সে রূপান্তরের পথ।”
তারপর সে মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করল। মুহূর্তের মধ্যে আগুন তাকে ঘিরে ধরল। দাউ দাউ শিখায় মিলিয়ে গেল তার দেহ। কোনো আর্তচিৎকার নেই, কোনো প্রতিরোধ নেই—শুধু এক অদ্ভুত শান্তি।
পরদিন ভোরে মন্দিরের সামনে আর কোনো ছাই পাওয়া গেল না। শুধু এক ফোঁটা লালচে আলো ঝিকমিক করে জ্বলছিল মূর্তির চোখের ভেতরে।
গ্রামের মানুষ প্রথমবার বুঝল—অভিশাপ ভাঙা গেছে কি? নাকি আগুন কেবল নতুন ধারককে গ্রহণ করেছে?
পর্ব ১০: ছাই ও শিখা
ভোরের আলো গঙ্গার তীরে ধূসর কুয়াশার মতো নেমে এসেছে। খয়েরপুর গ্রাম সেই আলোয় থরথর করে কাঁপছে। গতরাতের ঘটনার পর গ্রাম যেন একসাথে শ্বাস ধরে রেখেছে—কেউ কথা বলছে না, কারো ঘরে আগুন জ্বলে উঠছে না। সবাই চোখ তুলে তাকাচ্ছে মন্দিরের দিকে।
কালীমূর্তির চোখে অগ্নিশিখা আর নেই। শুধু এক অদ্ভুত লাল আভা ঝিলমিল করছে। আগের মতো ভস্মে মাখানো সিঁড়ির নিচে কোনো ছাই পড়ে নেই। অয়ন কোথায় গেল—সেই প্রশ্ন যেন বাতাসেও ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সুমিত্রা, যে বিধবা গত ক’দিন ধরে অয়নকে গোপনে তথ্য দিয়েছিল, ভোরেই ছুটে এল মন্দিরে। সে স্তব্ধ হয়ে তাকাল মূর্তির দিকে। যেন অগ্নিদৃষ্টি তাকে বিদ্ধ করছে না, বরং মায়ায় টেনে নিচ্ছে। তার ঠোঁট কেঁপে উঠল—“সে কি… বেঁচে আছে?”
রামপদ পুরোহিত নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। গ্রামের লোকেরা জড়ো হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করল, কিন্তু তিনি শুধু বললেন—
—“অগ্নি নিজের ধারককে বেছে নিয়েছে।”
মহেন্দ্র মণ্ডলের মুখে কিন্তু অস্বস্তি। এতদিন ভয় দেখিয়ে, তন্ত্রের আচারকে শাসনের হাতিয়ার বানিয়ে সে গ্রাম শাসন করেছে। কিন্তু আজ যখন কেউ স্বেচ্ছায় শিখায় প্রবেশ করেছে, অভিশাপ ভেঙে গেছে কি না—সেই প্রশ্ন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যদি ভয় না থাকে, তবে ক্ষমতার দণ্ডই বা থাকবে কিসে?
দিন কেটে গেল। আশ্চর্যভাবে, এরপর আর কোনো অমাবস্যায় কাউকে নিখোঁজ হতে দেখা গেল না। মূর্তির চোখে আগুন আর দাউ দাউ করে ওঠেনি। গ্রাম ধীরে ধীরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মানুষ বিশ্বাস করল—অভিশাপ ভেঙে গেছে।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
এক রাতে সুমিত্রা হঠাৎ শুনল, তার জানালার ধারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে পোড়া গন্ধ, মাটিতে হালকা ছাই উড়ে আসছে। সে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল—একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু দু’চোখে লালচে আভা জ্বলছে। অয়ন? নাকি শিখার নতুন ধারক?
মুহূর্তের মধ্যে ছায়াটা মিলিয়ে গেল। সুমিত্রার বুক ধুকপুক করতে লাগল, তবু তার মনে হলো—সে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছে। যেন আগুন এখন আর ভয় নয়, বরং পাহারা।
গ্রামের মানুষ এরপর থেকে বলাবলি করতে লাগল—
“আগুনের চোখ আর ভয় দেখায় না। এখন সে আমাদের রক্ষা করে।”
তবু মাঝরাতে কেউ যদি নিস্তব্ধতায় কান পাতত, শুনতে পেত ফিসফিস শব্দ—
“শিখা নিভে যায় না, কেবল রূপ বদলায়।”
মূর্তির চোখে তখন ক্ষীণ লাল আভা টিমটিম করে জ্বলে থাকত। কেউ কেউ বলত, ওটা অয়নের আত্মা। সে শিখার মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে আজও গ্রামকে রক্ষা করছে। আবার কেউ বলত, আগুন শুধু নতুন ধারক পেয়েছে—কখন যে আবার ক্ষুধার্ত হবে, কে জানে।
কিন্তু ইতিহাস বলে, সেদিন থেকে খয়েরপুরে আর কাউকে নিখোঁজ হতে দেখা যায়নি। অভিশাপের ছাই থেকে জন্ম নিয়েছিল নতুন ভোর।
অয়ন আর ফিরল না, কিন্তু তার নাম ছড়িয়ে পড়ল কিংবদন্তির মতো—
সে-ই সেই মানুষ, যে আগুনের চোখের ভেতর ঝাঁপ দিয়েছিল।
সে-ই সেই আত্মা, যে ছাই হয়ে গেলেও শিখার মতো জ্বলতে জানত।
***




