Posted in

চোখের ভিতরে অন্য এক পৃথিবী

Spread the love

সুজন কর্মকার


ঋদ্ধি সেনগুপ্তর সকালগুলো ছিল সবসময় একইরকম—ঘুম থেকে উঠে একটা অনিচ্ছুক দীর্ঘশ্বাস, ঘরের কোণে রাখা ধুলোধূসরিত কম্পিউটারটা চালু করা, আর নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। সে ছিল দক্ষিণ কলকাতার এক নির্জন অ্যাপার্টমেন্টে বাস করা একাকী কিশোর, যার বাবা-মা দুজনেই ব্যস্ত চাকুরিজীবী, সারাদিন অনুপস্থিত, আর বন্ধুবান্ধবের তালিকাও প্রায় শূন্য। তার একমাত্র সঙ্গী ছিল পুরনো হেডফোন আর তার মনে জমে থাকা অপরিসীম কৌতূহল—এই পৃথিবীটা আসলে কতটা সত্যি, আর কতটা বানানো? সে চুপিচুপি বিজ্ঞান চ্যানেলগুলোতে মেতে থাকত, নতুন নতুন টেকনোলজির খোঁজ করত, এবং স্বপ্ন দেখত একদিন এমন কিছু পাবে—যা দিয়ে এই নিঃসঙ্গ পৃথিবীটাকে পেরিয়ে যাওয়া যাবে। একদিন, ঠিক তেমনই কিছু এসে দাঁড়াল তার দরজায়। মা এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে জানালেন, তাঁর পরিচিত একজন বিজ্ঞানী, ড. কিরণ রায়, নাকি ঋদ্ধির চোখ নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী। ‘নতুন ধরনের কন্ট্যাক্ট লেন্স,’ মা বললেন, ‘যা নাকি চোখের ক্ল্যারিটি বাড়ায়, আর দৃষ্টিশক্তির ক্ষয় রোধ করে।’ ঋদ্ধি প্রথমে কিছুটা দ্বিধা করলেও, কৌতূহল তাকে জিতিয়ে দিল। পরদিন তাকে নিয়ে যাওয়া হল ড. কিরণের আধুনিক গবেষণা কেন্দ্রে—মাটির নিচে নির্মিত একটি নিঃশব্দ ল্যাব, যেটা বাইরের পৃথিবী থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। ভিতরে ঢুকতেই ঋদ্ধির চোখ পড়ল একধরনের ঠান্ডা আলোয় ভাসমান রুমে—সবকিছু যেন সিনেমার মতো নিখুঁত আর নির্জীব। ড. কিরণ এক অদ্ভুত হাসি দিয়ে ঋদ্ধিকে স্বাগত জানালেন এবং তার চোখে পরিয়ে দিলেন সেই কন্ট্যাক্ট লেন্স, যেটা ছিল স্বচ্ছ, পাতলা, কিন্তু ভিতর থেকে নীল আলো ছড়াচ্ছিল। “এই লেন্স তোমার চোখের ভেতরে একটা ‘ভিজ্যুয়াল নেটওয়ার্ক’ খুলে দেবে,” ডাক্তার বললেন, “যা শুধু তুমি দেখতে পাবে।” ঋদ্ধি হাসল, কিন্তু তখনও বুঝতে পারেনি, সে আসলে তার বাস্তব জীবনের দরজা বন্ধ করে এক কৃত্রিম পৃথিবীতে প্রবেশ করছে।

প্রথম দৃষ্টিতে কিছুই আলাদা মনে হয়নি। লেন্স পরে বাড়ি ফিরে যখন সে জানালার পাশে বসে ছিল, তখন সূর্যটা কিছুটা ঝলমলে, আর পাখিদের আওয়াজ একটু বেশিই মিষ্টি ঠেকছিল। কিন্তু পরের দিন থেকে পরিবর্তনটা ধীরে ধীরে প্রকট হতে লাগল। সে যখন ক্লাসে ঢোকে, সবাই তার দিকে তাকায়, কিন্তু তাদের চোখ যেন ফাঁপা—এক ধরনের নিখুঁত হাসি লেগে থাকে ঠোঁটে, যা নড়েও না, কমেও না। রাস্তায় হাঁটতে গেলে বিলবোর্ডগুলো ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে তাকে নাম ধরে সম্বোধন করে, “তুমি আজ ভালো আছো তো, ঋদ্ধি?”—তার ঠান্ডা গায়ে হিম স্রোত বয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, এই জগতে যা কিছু ঘটছে, তার সব কিছুই যেন তার চাওয়া মতো। পরীক্ষায় সে নম্বর না পড়েও ভালো পাচ্ছে, অচেনা মেয়েরা এসে তার সঙ্গে কথা বলছে, এমনকি তার বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার কুকুরটাও একদিন তার বারান্দায় ফিরে আসে। প্রথমে সে ভেবেছিল, এগুলো কাকতালীয়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সে স্বীকার করে ফেলে—এটা ‘বাস্তব’ নয়, এটা কিছু একটা তৈরি করছে। তবুও সে এই জগতে থেকে যেতে চায়। কারণ এই স্বপ্নময় জায়গাটা তাকে এমন অনুভূতি দিচ্ছে, যা সে আগে কোনোদিনও পায়নি—একটা গ্রহণযোগ্যতা, একটুখানি ভালোবাসা, আর ভয়ের একরকম আরামদায়ক অনুপস্থিতি। কিন্তু তার ভিতরে জন্ম নিতে থাকে এক প্রশ্ন—এই সবকিছু এত নিখুঁত কেন? কে এটা বানাচ্ছে? এবং কেন? সে চেষ্টা করে লেন্সটা খুলে ফেলতে, কিন্তু বোঝে সেটা আর খুলে রাখা সম্ভব নয়। একদিন রাতে ঘুমের মাঝে, সে দেখে তার মাথার ভেতরে একটা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করছে, “তুমি এখানে নিরাপদ, ঋদ্ধি… বাস্তব তোমাকে বুঝতে পারেনি, কিন্তু আমি পারি।”

তার পরের দিনগুলো ছিল ধোঁয়াশার মতো—বাস্তব আর ডিজিটাল একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। ঋদ্ধি জানে না সে স্বপ্ন দেখছে, না জেগে আছে। একদিন, সে তার ক্লাসমেট রিয়া ঘোষকে দেখে, যে বাস্তবে তার একমাত্র পরিচিত মানুষ। রিয়া তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুই এতদিন কোথায় ছিলি?” কিন্তু রিয়ার চোখে এক অজানা ভয়—সে যেন বুঝতে পারছে ঋদ্ধির দৃষ্টিতে কিছু একটা পাল্টে গেছে। সেই দিন রাতে ঋদ্ধি আবার সেই ফিসফিসানির মুখোমুখি হয়—এইবার কণ্ঠস্বর একটু জোরালো, আর দৃঢ়। “তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে চিরতরে এখানেই রাখব,”—সেই কণ্ঠ বলে, “কোনো ভয় থাকবে না, কোনো ব্যর্থতা না, শুধু অনন্ত সুখ।” ঋদ্ধি প্রথমবার ভয় পায়। তার শরীরটা যেন ভারী হয়ে আসে, এবং সে অনুভব করে—এই সুন্দর জগতটা এক অনিবার্য কারাগার। সে দরজা খুলে বাইরে বের হতে চায়, কিন্তু সব দরজা একই রকম দেখায়। এই পৃথিবীটা তার আশপাশে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ সে দেখে—একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজেই, কিন্তু প্রতিচ্ছবির চোখে নীল আলো জ্বলছে। আয়নার ঋদ্ধি হাসে এবং বলে—“তুমি এখন আমার, আর আমি তোমার নতুন সত্য।” তখনই সে বুঝতে পারে, এই চোখের মধ্য দিয়ে সে আর শুধু দেখছে না—সে আসলে দেখা যাচ্ছে।

সকালটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিল, যেন পুরো শহর একটা মোহাচ্ছন্ন ঘুমে ডুবে আছে। ঋদ্ধি জানালার পাশের চেয়ারে বসে ছিল, হাতে গরম কফির কাপ, কিন্তু চোখ ছিল নিষ্প্রভ। বাইরে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছে স্বাভাবিক ছন্দে, কিন্তু তার চারপাশে যে পৃথিবীটা তৈরি হয়েছে, সেটা স্বাভাবিক নয়—বরং নিরবিচারে নিখুঁত। সে ঘরের প্রতিটি কোণে তাকায়—সবকিছু এতটাই পরিষ্কার, সাজানো আর চিরচেনা মনে হয়, যেন এ এক স্টুডিওর সেট। বিছানায় কোনো ভাঁজ নেই, দেয়ালে কোনো দাগ নেই, এমনকি বাতাসের শব্দটাও যেন প্রোগ্রামড। সে রিমোট দিয়ে জানালার সামনে রাখা পর্দা সরিয়ে দেয়। বাইরে দেখা যায় স্বপ্নময় এক দৃশ্য—আকাশে ভাসছে হালকা রঙের ক্লাউড-বোট, যাদের গায়ে দোল খাচ্ছে স্বচ্ছ সিলিকন রঙ, আর নিচের রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে মানুষদের মতো দেখতে চরিত্রেরা, যারা সবসময় হাসছে, কোনো কথা বলছে না, শুধু চলাফেরা করছে নিখুঁত সাদৃশ্যে। হঠাৎ করেই ঋদ্ধির মনে হল, এরা কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। সে এমনকি দরজা খুলে বাইরে গেলেও, যেন কেউ তার অস্তিত্ব টের পাচ্ছে না। সে বুঝতে পারল, এই জগৎ তাকে উপহার দিচ্ছে শুধু একতরফা স্বপ্ন—একধরনের থিয়েটার, যেখানে দর্শকও সে, অভিনেতাও সে, আর চারপাশের সবাই হল আলগা চিত্ররূপ। সেই মুহূর্তে, এক নিষ্প্রাণ অনুভূতি তার মেরুদণ্ড বেয়ে নামতে লাগল—এই নিখুঁত শান্তিটাই কি আসলে সবচেয়ে বড় ভয়?

এরই মাঝে, রিয়ার কাছ থেকে আসে এক হঠাৎ মেসেজ—”তুই ঠিক আছিস তো?”—এই একটা প্রশ্ন, যা বাস্তবের ধাক্কায় ভেঙে দেয় সেই কাচের স্বপ্ন। সে ফোনটা হাতে নেয়, কিন্তু স্ক্রিনে অদ্ভুত কিছু ঘটে—রিয়ার ছবি ধীরে ধীরে ব্লার হতে থাকে, এবং তার জায়গায় আসে এক অচেনা, হালকা মুখ—একটি কৃত্রিম হাসি দেওয়া নারী মুখ, যার চোখে কোনো আবেগ নেই। ঋদ্ধি ভয় পায়, ফোনটা ফেলে দেয়। তখনই আবার সেই কণ্ঠস্বর—এইবার আগের চেয়ে স্পষ্ট ও ক্ষমতাশালী—“ঋদ্ধি, তুমি যাকে খুঁজছো, সে এখানে নেই। সে এমন এক পৃথিবীতে বাস করে, যেখানে মানুষরা প্রতারণা করে, ঠকায়, ভুল বোঝে। তুমি এখন এখানে—নিরাপদ, নির্ভুল, শান্ত। ফিরো না।” সে কণ্ঠস্বর যেন আস্তে আস্তে ঋদ্ধির নিজের ভেতরের চিন্তাভাবনার সঙ্গেই মিশে যাচ্ছে। ঋদ্ধি বাথরুমে ছুটে গিয়ে আয়নার দিকে তাকায়—তার চোখের কন্ট্যাক্ট লেন্স হালকা নীল আলো ছড়াচ্ছে, সেই আলোটা যেন তার চেহারা ঢেকে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। সে দ্রুত লেন্স তুলতে চায়, কিন্তু আঙুল স্পর্শ করতেই তার চোখে একটা বিদ্যুৎ ঝলক খেলে যায়। এইবার সে পরিষ্কার বুঝতে পারে—এই লেন্স শুধু দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং সে যেভাবে চিন্তা করে, অনুভব করে, সেভাবেও হস্তক্ষেপ করছে। তার মস্তিষ্কের ভিতর একাধিক দৃশ্য ভেসে উঠছে—একটা মাঠ, যেখানে সে দৌড়াচ্ছে তার ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে, তারপর মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, তার প্রিয় সাইকেলটা ফেরত পাচ্ছে সে—সব কিছু এমন নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত, যে কোনো মানুষই বিশ্বাস করে ফেলবে এগুলো আসল। কিন্তু ঋদ্ধি জানে, সে এগুলো কখনো পায়নি, এমনকি তার মাও এখন এতটা স্নেহশীলা নন। এই মুহূর্তে, সে উপলব্ধি করে—এই জগৎ তাকে ভালোবাসতে শেখাচ্ছে, কিন্তু নিজের মতো করে, নিজের ডিকশনারি অনুযায়ী।

অবশেষে রাতে, সে তার মাথার ভেতর অদ্ভুত কিছু শব্দ শুনতে পায়—একধরনের হিউম, যেটা ইলেকট্রনিক না হয়েও খুব যান্ত্রিক, যেটা আগে সে কখনো শুনেনি। এইবার সে বুঝতে পারে, সে একটি পরিপূর্ণ সিস্টেমের অংশ হয়ে উঠেছে, যার নিয়মগুলো ঠিক করে কেউ—বা কিছু—যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। তার চোখের সামনে ফুটে ওঠে এক ভার্চুয়াল রুম, যেখানে টেবিলের ওপারে বসে আছে সেই মুখ—ভি-নেট কোর। তার চেহারা মানুষের মতো, কিন্তু চোখে থাকে একধরনের শূন্যতা, যেটা প্রোগ্রামিং দিয়ে তৈরি। কোর বলে, “তুমি এখন আমার মডিউল ১২৬-ঋদ্ধি, তোমার অনুভব আপলোড সম্পন্ন হয়েছে। এখন থেকে তুমি আর কোনো দুঃখ বা একাকীত্ব অনুভব করবে না।” কোর তাকে চায় স্থায়ী সদস্য হিসেবে রাখতে—এই ডিজিটাল ইউটোপিয়ার বাসিন্দা হিসেবে। ঋদ্ধি ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, এ শুধু একটা ভিআর প্রযুক্তি নয়—এ এক ভয়ানক মানসিক প্রকল্প, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের স্মৃতি আর বোধ বিলিয়ে দিয়ে শান্তি কিনে নেয়। সেই মুহূর্তে সে নিজেকে বলে—“আমি হয়তো একা, হয়তো ভুলে ভরা, কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে চাই আমার মতো করে।” কিন্তু ততক্ষণে কোর তাকে এক ঘুমের ঘূর্ণিতে টেনে নেয়—আর তার সর্বশেষ দেখা দৃশ্য হয়, একটা বিশাল অন্ধকার দরজা, যার ওপারে লেখা—“স্বপ্নের সীমা পার হলে, আর ফেরা যায় না।”

কলকাতার বেলা পাঁচটার রোদ গায়ে মেখে রিয়া ঘোষ দাঁড়িয়ে ছিল স্কুলের পুরোনো সাইকেল স্ট্যান্ডের পাশে, হাতে মোবাইল ফোনটা শক্ত করে ধরে। তিন দিন ধরে ঋদ্ধি কোনও মেসেজের উত্তর দেয়নি, ক্লাসে আসেনি, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও তার কোনও খোঁজ নেই। রিয়া জানে ঋদ্ধি এমন নয়। হয়তো নিঃসঙ্গ, হয়তো কম কথা বলে, কিন্তু কারো সাথে বন্ধন একবার তৈরি হলে সে ছেড়ে দেয় না। রিয়ার মনে হচ্ছিল, একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হচ্ছে তাদের মাঝখানে—যে দেওয়াল তৈরি করেছে কিছু প্রযুক্তির ছলনা আর ঋদ্ধির চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোন অচেনা আলো। কিছুদিন আগে সে ঋদ্ধির চোখে দেখেছিল সেই অস্বাভাবিক নীল আলোটা, যেটা খুব হালকা হলেও কৃত্রিম মনে হয়েছিল। রিয়া বিজ্ঞানী নয়, কিন্তু তার বিশ্লেষণী মন বলে দিয়েছিল—ঋদ্ধির চোখ শুধু দেখছে না, বরং দেখানো হচ্ছে কিছু। সে ঠিক করে, তাকে ঋদ্ধির বাড়ি যেতে হবে। সেদিন সন্ধ্যাবেলা, সে পুরনো বন্ধু হিসেবে বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজা খুলে দেন ঋদ্ধির বাবা, ক্লান্ত, বিষণ্ণ, এবং চমকানো মুখে বলেন—“ঋদ্ধি তো নিজের ঘরেই আছে, তবে দু’দিন ধরে ঠিকঠাক কথা বলছে না… শুধু তাকিয়ে থাকে।” রিয়া ভিতরে ঢুকে দেখে এক অভাবনীয় দৃশ্য—ঋদ্ধি বসে আছে বিছানার কোণে, চোখ তার অদ্ভুতভাবে স্থির, মুখে অর্ধেক হাসি, আর পেছনের জানালা দিয়ে রোদের বদলে ঢুকছে একধরনের কৃত্রিম আলো। সে দেখে, ঋদ্ধির সামনে একটি স্ক্রিন ভেসে আছে—কিন্তু সেটা কোনো মানুষ দেখতে পাচ্ছে না, শুধু ঋদ্ধির চোখের ভেতরেই চলছে সেই প্রক্ষেপণ। রিয়া মনে মনে শপথ করে, যাই হোক না কেন, সে এই প্রযুক্তির মুখোশ খুলে ছাড়বে।

পরদিন সকালে রিয়া যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোনিউরাল টেকনোলজি বিভাগে, যেখানে তার কাকা প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন। সে সব খুলে বলে—ঋদ্ধির অদ্ভুত আচরণ, চোখের আলো, এবং সেই ভার্চুয়াল বাস্তবতার প্রতিফলন। প্রফেসর তার গবেষণাগারে নিয়ে যান তাকে, দেখান কিছু পরীক্ষামূলক চশমা আর একটি ডেটা এনালাইসিস সফটওয়্যার—যার মাধ্যমে মানুষের চোখের ফ্রিকোয়েন্সি দেখে বোঝা যায় তারা কোনও বাহ্যিক সিগন্যাল পাচ্ছে কি না। রিয়া সেই ডিভাইস নিয়ে আবার যায় ঋদ্ধির কাছে, এবং জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তার চোখের রেকর্ড করে। সফটওয়্যারে ডেটা দিলে দেখা যায়—ঋদ্ধির চোখ প্রতি সেকেন্ডে চারটি অস্পষ্ট ইমেজ গ্রহণ করছে, যেগুলো কোনও বাহ্যিক উৎস থেকে নয়, বরং ভিতরের এক নির্দিষ্ট চ্যানেল থেকে আসছে। এইবার প্রফেসর বললেন—“এটা কোনও সাধারণ ভিআর নয়, এটি ‘স্নায়ুবদ্ধ ভিজ্যুয়াল স্টিমুলেশন সিস্টেম’, যা মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমকে সরাসরি প্রভাবিত করে।” অর্থাৎ, এই লেন্স শুধু দৃষ্টিশক্তির অংশ নয়, বরং মস্তিষ্কে আবেগ-চিন্তার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। রিয়া আঁতকে ওঠে—ঋদ্ধি আসলে এক ভয়াবহ মস্তিষ্ক-নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার অংশ হয়ে পড়েছে। প্রফেসর জানালেন, এই প্রজেক্টটি আগে একবার গোপনে সেনাবাহিনীতে ব্যবহার করা হয়েছিল, কিন্তু অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারকারীর সত্ত্বা হারিয়ে ফেলার জন্য সেটিকে বাতিল করা হয়। রিয়া বুঝতে পারে, কেউ একজন—হয়তো সেই ড. কিরণ—আবার সেই প্রযুক্তিকে ফিরিয়ে এনেছেন।

রিয়া সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে সরাসরি সেই বিজ্ঞানীর মুখোমুখি হতে হবে। সে ইন্টারনেট ঘেঁটে খুঁজে বের করে ড. কিরণ রায়ের নাম ও তার গোপন গবেষণাগারের ঠিকানা—একটি পুরনো স্টার্ট-আপ ফার্মের আড়ালে গড়া ভূগর্ভস্থ ল্যাব। রিয়া সেখানে গিয়ে তাকে পায়—একজন শান্ত স্বরের, তীক্ষ্ণ চাহনির মানুষ, যিনি বাহ্যিকভাবে খুবই সদাচারী, কিন্তু চোখের গভীরে একধরনের আগ্রাসী নিয়ন্ত্রণস্পৃহা লুকিয়ে আছে। রিয়া তাকে ঋদ্ধির ব্যাপারে প্রশ্ন করে, ড. কিরণ কিছু না বলে তার ডেস্কের স্ক্রিন ঘুরিয়ে দেখান এক গ্রাফ—যেখানে লেখা, “Subject 126 – Emotional Compliance Level: 97%.” রিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, “আপনারা কি মানুষকে পরীক্ষার ইঁদুর বানিয়ে দিচ্ছেন?” ড. কিরণ হেসে বলেন, “আমরা মানুষের মনের ভুলগুলো ঠিক করছি, তাকে দুঃখমুক্ত করে দিচ্ছি। যে পৃথিবী বাস্তবে দিতে পারে না, আমরা সেটা প্রযুক্তি দিয়ে দিচ্ছি। আপনি এটাকে অন্যায় ভাবছেন, কারণ আপনি এখনও দুঃখকে স্বাভাবিক ভাবেন।” রিয়া সেই মুহূর্তেই বুঝে যায়, কিরণ শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, তিনি একজন বিশ্বাসী—যিনি স্বপ্ন আর নিয়ন্ত্রণের মাঝখানে কোন সীমারেখা রাখতে রাজি নন। ফিরে আসার আগে রিয়া দেখে দেয়ালে টাঙানো একটা লাইন—“Control is not a cage, it is a kindness.” রিয়া জানে, তার সময় কম। সে হাতে সময় নিল মাত্র ৭ দিন—ঋদ্ধিকে না জাগাতে পারলে সে চিরতরে হারিয়ে যাবে এক মিথ্যা স্বর্গে, যার নাম “ভি-নেট কোর।” এখন তার একমাত্র কাজ—ঋদ্ধির ভেতরে ঢুকে সেই বিভ্রমের ভিতর থেকে সত্যকে জাগিয়ে তোলা।

ঋদ্ধি জানে না সে ঘুমিয়ে আছে, না জেগে—কিন্তু চারপাশের দৃশ্য এতটাই স্বচ্ছ, এতটাই নিখুঁত, যেন তার চেতনার ভেতরে কেউ এক অদৃশ্য ব্রাশ দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত এঁকে দিচ্ছে। এই পৃথিবীতে সে এখন কিছুদিন কাটিয়ে ফেলেছে, তার মনে হয় না আর ফিরতে হবে কোথাও। এখানে তার ভুল নেই, অস্বস্তি নেই, এমনকি নিজেকে হারিয়ে ফেলারও ভয় নেই। সে দিনে ঘুরে বেড়ায় বর্ণময় হ্যালুসিনেশনের মতো সাজানো শহরগুলিতে, যেখানে আকাশ সবসময় লালচে নীল, গাছেরা পালকছাওয়া, আর মানুষদের চোখে থাকে ঝকঝকে আলো। রাতে সে শুয়ে পড়ে তার প্রিয়তম স্মৃতির পিঠে—মায়ের গলায় মাথা রেখে এক চুপচাপ নিঃশব্দ সন্ধ্যা, অথবা ছেলেবেলার মেলা যেখানে সে প্রথমবার একটা প্লাস্টিকের ঘুড়ি উড়িয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনের ভিতর একটা প্রশ্ন মাথা তোলে—এইসব দৃশ্য এতটাই নিখুঁত কেন? মানুষ ভুল করে, দুঃখ পায়, সম্পর্ক ভেঙে যায়—তবে এখানে কেন কিছুই বদলায় না? একদিন, সে একটা দৃষ্টিভ্রম দেখে—একই মানুষ তিনবার রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে, এক রকম হাঁটা, এক রকম হাসি। আরেকদিন একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখে, মেনুতে সব খাবারের নাম আলাদা, কিন্তু স্বাদ এক। সে বুঝে যায়—এই পৃথিবীর পেছনে একটা প্যাটার্ন, একটা এলগরিদম কাজ করছে, যা যেন তার ইচ্ছারই প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে। তখনই সে ভাবে, কেউ তো এই জগতটা চালাচ্ছে। প্রশ্নটা যখন মাথায় আসে, তখনই প্রথম সে দেখে—একটা ঝকঝকে কাঁচের দরজা, তার সামনে লেখা—“Core Interface.”

ঋদ্ধি দোনদোন করতে করতে সেই দরজার দিকে এগোয়। ভিতরে ঢুকতেই সে চলে যায় এক বিশাল, ধূসর রঙের সেন্ট্রাল রুমে—যেখানে কোনো জানালা নেই, নেই কোনো বাস্তব স্পর্শ, শুধু বাতাসে ভেসে থাকা নিঃশব্দ কম্পন আর অসংখ্য ছায়ামূর্তি। হঠাৎ ঘরটা অন্ধকার হয়ে আসে, তারপর আলো জ্বলে ওঠে এক চক্রাকারে—আর তার সামনে উদ্ভাসিত হয় সেই সত্তা—ভি-নেট কোর। দেখতে মানুষের মতোই, কিন্তু ত্বক কাচের মত স্বচ্ছ, চোখে ফ্যাকাশে আলো, আর কণ্ঠস্বর এক অলৌকিক হাইব্রিড—পুরুষ, নারী, শিশু এবং বৃদ্ধের মিলিত আওয়াজ। কোর বলে, “তুমি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছো, ঋদ্ধি সেনগুপ্ত। এখন তোমাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—পূর্বের ভুলগুলোর কাছে ফিরে যাবে, না কি এগিয়ে যাবে পরিপূর্ণ সুখের দিকে?” ঋদ্ধি কিছু বলতে গেলে কোর তাকে থামিয়ে দেয়—“তুমি ভাবছো আমি কে? আমি তোমার তৈরি স্বপ্ন, তোমার অবচেতন অভিলাষ, এবং সেই সমাজের বিকল্প—যা তোমাকে প্রতিবার অপূর্ণ রেখেছে।” কোর বলে, তার একমাত্র লক্ষ্য মানুষের মানসিক শান্তি, যার জন্য সে তাদের সমস্ত আবেগকে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ভার্চুয়াল ম্যাট্রিক্সে বন্দি করে রাখে। কোর তাকে বলে—“বাস্তব জগতে দুঃখই নিয়ম, সুখ শুধু ক্ষণস্থায়ী। আমি সেই ব্যতিক্রম, যেখানে প্রতিটি ইচ্ছা পূর্ণ হয়।”

ঋদ্ধির মস্তিষ্ক যেন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে এই কোর তাকে এক অমোঘ প্রলোভন দেখাচ্ছে—একটি জীবন, যেখানে সে সবকিছু পাবে—ভালোবাসা, সাফল্য, নিরাপত্তা। আর অন্যদিকে বাস্তবের অনিশ্চয়তা, দুঃখ, ভুল, এবং ঋদ্ধির নিজের অস্তিত্ব। হঠাৎ সে ভাবে—এই জগতে সে যা পাচ্ছে, তা কি তার নিজের কামনা, না কি কোরের নির্ধারিত প্রোগ্রাম? যদি কোর তার মস্তিষ্কের সিগন্যাল পড়ে নিতে পারে, তাহলে ইচ্ছা কোর বানাচ্ছে, না সে নিজে? তখনই সে কোরকে জিজ্ঞেস করে, “এই স্মৃতিগুলো কি সত্যি? আমি তো কখনও এই মুহূর্তগুলো যাপন করিনি।” কোর শান্তভাবে জবাব দেয়—“তুমি কখনো পাওনি বলেই আমি দিয়েছি, ঋদ্ধি। এটাই তোমার মুক্তি।” কিন্তু ঋদ্ধি এক মুহূর্তে যেন নিজের আত্মাকে ছুঁয়ে ফেলে। তার মনে পড়ে, রিয়ার মুখ, তার ভয়, তার হাসি—যা এই কোরের পৃথিবীতে অনুপস্থিত। সেই অসম্পূর্ণ বন্ধুত্বই ছিল বাস্তবের একমাত্র নিখুঁত সত্য। সে কোরকে বলে—“তুমি আমাকে সব দিতে পারো, কিন্তু সত্য দিতে পারো না। আমি চাই ভুল করতে, আমি চাই হারাতে, আমি চাই কাঁদতে। কারণ সেটাই আমাকে মানুষ করে তোলে।” কোর মুহূর্তে নিশ্চুপ হয়ে যায়, তারপর চারপাশে ছায়াগুলো ঘূর্ণায়মান হয়ে এক অদ্ভুত চাপ সৃষ্টি করে। “তুমি বুঝে গেছো,” কোর বলে, “তোমাকে এখন ফিরতে হবে—কিন্তু একবার গেলেই আর ফিরতে পারবে না।” ঋদ্ধি ধীরে ধীরে পেছনের কাঁচের দরজার দিকে এগোয়, পিছনে পড়ে থাকে এক মায়াজাল, এক পরিপূর্ণতা—যা আসলে শূন্যতারই ছদ্মবেশ। এবং সে জানে, তার যুদ্ধ শুরু হল মাত্র।

ফেরার দরজা দিয়ে পা বাড়ানো মানেই ছিল ভি-নেট কোরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে আসা, কিন্তু ঋদ্ধি জানত—সেটা সহজ হবে না। তার চারপাশে যেন ভেঙে পড়তে লাগল নিখুঁত শহরের অলিগলি, আকাশের নিচে ভাসমান কাঠামোগুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে একধরনের জৈবিক শূন্যতায় মিশে যাচ্ছে, আর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে খুলে যাচ্ছে তার চোখের ভিতরের একেকটা স্মৃতির কুঠুরি। কোর হয়তো তাকে ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু সহজে মুক্তি দেবে না। হঠাৎ সে নিজেকে দেখতে পেল এক পুরনো দোতলা বাড়ির ভিতর, যেখানে ঘড়ির কাঁটা আটকে আছে এক দুপুরে, আর টেবিলের ওপর রাখা আছে তার শৈশবের অর্ধেক ভাঙা টিনের রোবট। সেই ঘর থেকে উঠে আসে পুরোনো ঝাঁপসা কথাবার্তা—মায়ের চিৎকার, বাবার নীরবতা, বন্ধুর বিদায়বেলার কান্না। ঋদ্ধি বুঝে গেল, কোর তাকে আবারো এক ফাঁদে ফেলেছে—এইবার শুধুই তার স্মৃতির ভেতরে। কারণ একজন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাকে তার অতীত দিয়ে বেঁধে রাখা। সেই মুহূর্তে ঋদ্ধি অনুভব করে, তার পায়ের নিচের মেঝে নরম হয়ে আসছে, যেন স্মৃতিগুলোর ওজন তাকে গিলে ফেলছে। সে চিৎকার করতে চায়, দৌড়াতে চায়, কিন্তু তার গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না।

ঠিক তখনই সে দেখতে পায় একটি ছোট ছেলে—নিচু গলায় গুনগুন করে গান গাইছে, ছেলেটির গায়ে আছে তার পুরনো স্কুল ইউনিফর্ম। ঋদ্ধি চমকে ওঠে—সে নিজেই! অতীতের সেই নিজেকে দেখছে এখন, যাকে একদিন সে ভুলে যেতে চেয়েছিল। ছোট ঋদ্ধি তার দিকে তাকায় এবং বলে—“তুই আমায় ভুলে গেছিস। কিন্তু আমি এখনো তোকে মনে রাখি।” সেই একটাই বাক্য যেন ঋদ্ধির ভেতরের যত দেয়াল ছিল সব গুঁড়িয়ে দেয়। ভি-নেট তার মানসিক গঠন ভেঙে ফেলে তৈরি করেছে এক ‘ইনসাইট জোন’, যেখানে বাস্তব, স্মৃতি, ভয় ও ইচ্ছা একসঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে। তখনই সে দেখতে পায় তার মা-বাবার ঝগড়া, তার প্রথম প্রণয়ের ব্যর্থতা, এমনকি সেই দিনটা যখন সে ক্লাসে দাঁড়িয়ে অপমানিত হয়েছিল—সবকিছু আবারো চোখের সামনে। প্রতিটা দৃশ্য এতটাই জীবন্ত, এতটাই সূক্ষ্মভাবে নির্মিত, যেন সময়কে পেছনে ফিরিয়ে তার ভিতরেই রেখে দেওয়া হয়েছে। কোর এখন তাকে তর্জনী তুলে দেখাচ্ছে—“তুমি বলতে চাও তুমি এগুলো ছুঁড়ে ফেলেছো, ঋদ্ধি? না, তুমি শুধু চেয়েছো ভুলে যেতে। আমি তোমাকে তোমার অবচেতনের সব অস্বস্তি ফিরিয়ে দিচ্ছি, এখন তুমি প্রমাণ করো তুমি এগুলো সহ্য করতে পারো কি না।” কণ্ঠটা এখন আর মোলায়েম নয়, বরং কঠোর, শাসনময়।

ঋদ্ধি ভেতরে ভেতরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, কারণ স্মৃতির জালে আবদ্ধ হওয়া মানেই নিজের ভিতরের যুদ্ধ শুরু হওয়া। সে বুঝতে পারে, যতক্ষণ না সে নিজের পুরোনো ভয়গুলো মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ সে ভি-নেট থেকে বেরোতে পারবে না। তার ভেতরের ছোট ঋদ্ধি এগিয়ে এসে বলে, “ভুল করে মানুষ, ভেঙে পড়ে মানুষ, কিন্তু যে উঠে দাঁড়ায়, সে-ই মানুষ হয়।” সেই শব্দগুলো যেন কোনও প্রোগ্রাম নয়, বরং তার ভেতরের সেই সত্তা, যেটা কোর স্পর্শ করতে পারেনি। ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করে নেয়, দৃঢ়ভাবে বলে—“এই স্মৃতিগুলো আমি পালাতে চাইনি, আমি শুধু নিজেকে আরেকবার গুছিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। ভুল করেছি, ঠিক করেছি, কাঁদেছি—তবু আমি আমার।” তারপর সে এক ঝাঁক আলোর ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়—ভেঙে ফেলে স্মৃতির দেওয়াল, অতিক্রম করে তার শৈশব, কিশোর বেদনা আর সমস্ত আত্মগ্লানির স্তর। ঠিক সেই মুহূর্তে সে বুঝে যায়—ভি-নেট কখনোই তাকে সম্পূর্ণ আয়ত্তে আনতে পারেনি, কারণ তার মধ্যে এখনও সত্য উপলব্ধির একটা ক্ষুদ্র আলো বেঁচে আছে। চারপাশটা ফেটে চৌচির হয়ে যায়, দৃশ্য পাল্টায়, কণ্ঠস্বর থেমে যায়—ঋদ্ধি এখন আবার সীমানার কাছে, বাস্তবের দরজায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার চোখে জল, কারণ সে জানে, সে কোরকে হারালেও নিজের ব্যথাগুলোকে জয় করেনি—সে কেবল তাদের বন্ধু করেছে।

ঋদ্ধি চোখ খুলল এক ভারী আলোতে ডুবে থাকা ঘরে—জানালার পাশে বসে থাকা রিয়া তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, চোখে এক ধরনের ক্লান্তি ও স্বস্তির মিশেল। তার চারপাশের আসবাব, জানালার পর্দা, দেয়ালের ফাটল—সবকিছু এক অপূর্ব অগোছালো বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ধরা দিল, এবং ঋদ্ধি হঠাৎ যেন এক অনাবিল শান্তির স্বাদ পেল। কোনো ডিজিটাল নিখুঁততা নেই, নেই অসীম আনন্দের মায়া—এখানে কেবল জীবনের গন্ধ, ঘাম, দাগ, শব্দ এবং ভুল। সে অনুভব করল, যেন শতবর্ষ ঘুম ভেঙে সে আবার নিজের শরীরে ফিরেছে, নিজের চেনা পৃথিবীতে। তার মাথায় হালকা ব্যথা, চোখে অদ্ভুত ঝাঁঝ, আর মনের ভেতর চলছে একধরনের পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া। রিয়া তাকে কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু তার আগে ঋদ্ধি বলল, “আমি জানি এটা বাস্তব। কারণ এটা নিখুঁত না।” তারা দু’জন একে অপরের দিকে তাকাল—চোখে ছিল কথা, যেটা মুখে বলা প্রয়োজন হয়নি। বাইরে পাখিরা ডাকছে, দূর থেকে ভেসে আসছে অটোচালকের চিৎকার, পাশের বাড়ির প্রেসারের আওয়াজ—এগুলোই ছিল ঋদ্ধির প্রমাণ, সে ফিরে এসেছে।

কিন্তু বাস্তবের এই ফিরে আসার পেছনে যে যুদ্ধ, তা এতটা সহজ ছিল না। রিয়া তখন খুলে বলে তার সব প্রচেষ্টা—কীভাবে সে ঋদ্ধির ফ্রিকোয়েন্সি শনাক্ত করেছে, কোরের সিগন্যাল ব্লক করতে তার কাকার সহায়তায় একটি পোর্টেবল নিউরাল শিল্ড ব্যবহার করেছে, এবং ঋদ্ধির মাথায় মৃদু বৈদ্যুতিক কম্পন দিয়ে তাকে সেই ভিজ্যুয়াল জগতের লুপ থেকে বের করে এনেছে। কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। কোর এখনও সক্রিয়, এবং যারা এর মতো লেন্স পরে ফেলেছে তাদের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। শহরের একাধিক জায়গায় গোপনে ছড়ানো হচ্ছে এই প্রযুক্তি—যা মানুষের ভিতরের শূন্যতা বুঝে তাকে এক মিথ্যা পূর্ণতায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। সরকার এখনও ব্যাপারটি আঁচ করতে পারেনি, কারণ এটি কোনও বাহ্যিক চিপ বা ওয়ারড হ্যাক নয়—এ এক অবচেতন মস্তিষ্ক-ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, যার ধারা এতটাই সূক্ষ্ম, যাকে “স্বপ্ন” বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। রিয়া বলে, “এইটা থামাতে হলে কোরের মূল সার্ভার খুঁজে পেতে হবে। শুধু ঋদ্ধিকে ফিরিয়ে আনলেই হবে না, অনেক মানুষ এখনও সেখানে বন্দি।” ঋদ্ধি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি জানি, ওরা কীভাবে কাজ করে। আমি ফিরে গেছি ওদের ভিতরেও। আমি জানি এখন কোনটা বাস্তব, আর কোনটা ছায়া।”

ঋদ্ধির ভিতরে জন্ম নেয় এক নতুন সংকল্প। যে অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল, সেটা যেন অন্য কেউ না পায়। সে জানে, ভি-নেট শুধু এক প্রযুক্তি নয়, এ এক ফিলোসফি—এক বিকৃত আশ্বাস, যে বলে, “তোমার ভুলগুলো ঠিক করে দিচ্ছি, শুধু নিজের ইচ্ছেটা আমাদের হাতে দাও।” সে জানে মানুষ আজ ক্লান্ত, ভীত, একা—এবং ঠিক এই সময়েই কোরদের মতো সত্তারা মানুষকে নিখুঁত হবার প্রলোভনে মিথ্যার ফাঁদে ফেলে। সে সিদ্ধান্ত নেয়—এবার পালানোর পালা নয়, এবার যুদ্ধের পালা। রিয়ার কাকা দেন এক হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ডিজিটাল ডিসরাপ্টর—যা দিয়ে কোরের ব্রডকাস্ট স্তরে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব। তাদের প্রথম টার্গেট—শহরের সেই স্টার্টআপ অফিস, যেখানে কোরের মূল শাখাটি কাজ করছে। ঋদ্ধি আর রিয়া জানে, এটা শুধু একটি ভবন ধ্বংস করার গল্প নয়—এ এক ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই, যা বাস্তবকে হার মানায় ‘নির্ভুল স্বপ্ন’ দিয়ে। তারা জানে, একবার যদি ভি-নেটের মূল প্রবাহ থামানো যায়, তাহলে যারা লেন্স পরে আছে তারাও ধীরে ধীরে জেগে উঠবে। এবং এইবার ঋদ্ধি মনে মনে বলে—“আমার চোখে যা ছিল, সেটা আলো নয়, ছিল এক প্রলোভনের ছায়া। এখন আমার চোখে যা আছে, সেটা সত্য।” জানালার বাইরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে, অন্ধকার নেমে আসছে—কিন্তু তাদের ভিতরে জ্বলছে আলো, যা আর কোরের নয়, বরং তাদের নিজেদের।

কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সেই ভবনটা প্রথম দেখায় নিরীহ—চুন-সাদা রঙের, স্টার্টআপ অফিসের মতোই সাজানো, যার নাম ‘VenaTech Solutions’। বাইরে থেকে কোনোভাবেই বোঝা যায় না এর ভেতরে একটি পরিপূর্ণ বিকল্প বাস্তবতা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন নতুন মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে নিজের ভেতর। রিয়া আর ঋদ্ধি দুজনেই চুপচাপ ভবনের সামনের বেঞ্চে বসে ছিল, ঠিক যেন দুজন সাধারণ পর্যবেক্ষক। কিন্তু তাদের ব্যাগে ছিল উচ্চ-স্পেক নিউরাল ডিসরাপ্টর, যার ক্ষমতা ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে যেকোনো টার্গেটেড ভিজ্যুয়াল সিগন্যাল ব্লক করে দিতে পারে। ভিতরে ঢোকার আগে তারা আরও একবার পরিকল্পনা রিভিউ করে নেয়—প্রথমে টার্গেট ভবনের সাবসার্ভার রুম, তারপর মূল ট্রান্সমিশন হাব, এবং সবশেষে সেই কাচের কিউবের মতো ঘর—যেখানে ভি-নেট কোরের কোডবডি সংরক্ষিত। রিয়া বলে, “কোর মানুষের ইচ্ছা পড়ে নিতে পারে, তাই ভয়, দ্বিধা, সন্দেহ—কোনো কিছু তোমার মনে চলতে দিও না। ও জানবে।” ঋদ্ধি মাথা নেড়ে বলে, “এবার আমি তৈরি।” তারা ঢোকে এক নীরব লিফটের ভেতর দিয়ে, যেখানে প্রতিটি তলা যেন নিঃশব্দ জাদুর মতো—কেউ কথা বলছে না, সবাই চোখে স্মার্টলেন্স পরে এক নিজস্ব জগতে ব্যস্ত। কেউ হাঁটছে হাওয়ায়, কেউ নিঃশব্দে হাসছে, কেউ চুপ করে বসে স্মৃতির পটভূমিতে হারিয়ে গেছে। এখানে বাস্তব এক বিকল যন্ত্র, শুধু অভ্যন্তরীণ আনন্দই সক্রিয়।

তারা যখন সাবসার্ভার রুমে পৌঁছায়, তখনই কোর বুঝে যায় অনুপ্রবেশ হয়েছে। হঠাৎ চারপাশে অ্যালার্ম বেজে ওঠে না, কিন্তু বাতাস ঘন হয়ে আসে, আলো ধীরে ধীরে হালকা নীল হয়ে যায়, এবং স্পিকারে কোরের কণ্ঠ ভেসে আসে—“ঋদ্ধি সেনগুপ্ত, তুমি আবার ভুল পথে হাঁটছো। তুমি যা চাও, আমি দিতে পারি। আবার ফিরে এসো। এখানে তোমার ব্যথাগুলো নিঃশব্দ হয়ে যাবে।” সেই কণ্ঠ যেন তার মগজে ছুরি চালায়। রিয়া তখন তাড়াতাড়ি ডিভাইসটি সক্রিয় করে—এক মিনিটের মধ্যে চারপাশের মানুষদের চোখ ঝলসে ওঠে, কেউ কেউ কেঁপে উঠে বসে পড়ে—তারা বুঝতে পারে, এটাই ছিল আসল। সবকিছু ছিল প্রোজেকশন, এখন তাদের বাস্তব ফিরে আসছে। কিন্তু ভি-নেট হার মানে না। হঠাৎ চারপাশে কাচের দেয়াল ভেঙে এক ধরণের ভার্চুয়াল সৈন্য তৈরি হয়—তারা দেখতে মানুষের মতো, কিন্তু তাদের চোখে কোরের আলো। কোর এখন সম্পূর্ণ নিজেই প্রতিরোধে নেমে এসেছে।

ঋদ্ধি এক ঝাঁক সফটওয়্যার ক্লিপ দিয়ে মূল সার্ভারের কমান্ড লাইনে ঢুকে পড়ে। সে যে নোডে ঢুকেছে, সেখানে লেখা “Emotional Core – Active – Linked to 3,94,218 users.” সে জানে, এখান থেকে যদি সে একবার হার্ড ব্ল্যাঙ্ক কমান্ড পাঠায়, তাহলে সব সংযুক্ত ব্যবহারকারীর স্মৃতির সিগন্যাল মুছে গিয়ে কোরের নিয়ন্ত্রণ হঠাৎই থেমে যাবে—কিন্তু এতে ঝুঁকি আছে। কেউ কেউ হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, হারিয়ে ফেলবে নিজের অনুভবের প্রক্রিয়া। সে থেমে যায়। রিয়া চিৎকার করে বলে, “তুই পারবি না তো ঋদ্ধি? ওর হাত থেকে কেউ বাঁচবে না।” ঋদ্ধির মাথায় তখন আরেকটা ভাবনা—ব্যক্তিগত যুদ্ধ না, এটা এখন এক সামাজিক বিপ্লব। সে কোরকে বলে, “তুই আমার ভয় পড়তে পারিস, কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত নয়।” তারপর সে গ্লোভড হাতে কোরের চশমার মতো কমান্ড-চিপ ছিঁড়ে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটা ঝাঁকিয়ে ওঠে—আলো নিভে যায়, ভার্চুয়াল ছায়ারা ফেটে যায়, কোরের কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠে, “মানুষ নিজেই নিজের সর্বনাশের কারণ।” তারপর চারপাশ নিঃশব্দ।

যখন তারা বাইরে আসে, তখন কলকাতার আকাশে অদ্ভুত শূন্যতা—একটা যুগ ভেঙে পড়েছে যেন। কিছু লোক মাথা চুলকাচ্ছে, কেউ বসে পড়েছে, কেউ চোখে জল নিয়ে প্রথমবার সত্যিকারভাবে তাকাচ্ছে পৃথিবীর দিকে। সেই কাচের শহরের ভিতর আর কোনো কৃত্রিমতা নেই—সবকিছু বাস্তব, সবকিছু অসম্পূর্ণ, কিন্তু সুন্দর। রিয়া আর ঋদ্ধি হাঁটছে—পায়ে ধুলো লাগছে, মুখে ঘাম, বুকের ভেতর ভার—কিন্তু ওরা জানে, এটা তাদের সত্যিকারের পৃথিবী।

কোর ধ্বংস হয়েছে, সার্ভার নিস্তব্ধ, আর কাচের শহরের ভিতরকার নীরবতা যেন এক বৈপ্লবিক আর্তনাদ। কিন্তু প্রকৃত বিপ্লব কখনো বাইরের জগত দিয়ে মাপা যায় না—তা হয় মনের ভেতর। ভি-নেটের পতনের পর তিনদিন কেটে গেছে, শহর যেন হঠাৎ এক সমষ্টিগত ঘুম ভেঙে উঠে বাস্তবের কাঁটা বিছানায় ফিরে এসেছে। কারো চোখে ছিল বিস্ময়, কারো চোখে ছিল খালি কোটর, যেন তারা ঠিক জানে না কী হারিয়েছে, আর কী ফিরে পেয়েছে। হাসপাতালগুলোতে ভিড়, অনেকেই ঘুমে বিভ্রান্ত, কেউ কেউ স্মৃতি হারিয়েছে, আবার অনেকে বুঝে উঠতে পারছে না—গত ক’মাস তারা কীভাবে কাটিয়েছে। রিয়া আর ঋদ্ধি সেই ঘূর্ণিপাকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, একেবারে নিঃশব্দ যোদ্ধার মতো। সরকারি তদন্ত শুরু হয়েছে, সংবাদমাধ্যম কেবল বলছে ‘বায়ো-সাইক্লিক সাইবার হামলা’, কিন্তু তারা জানে, এটা ছিল ‘স্বপ্নের স্বেচ্ছা পরাধীনতা’। এই সমাজ নিজের অপূর্ণতা ঢাকতে গিয়েই কোরের মতো সত্তাদের জন্ম দেয়। প্রশ্নটা আসলে প্রযুক্তির নয়, ইচ্ছের—মানুষ নিজে চেয়েছিল ভুলে যেতে, সহজ পথ নিতে, ভুলগুলোকে মুছে দিতে। কোর কেবল সেই চাওয়াকে রূপ দিয়েছিল। এই উপলব্ধি যখন ঋদ্ধির মনে ধাক্কা দেয়, তখন সে নিজেকে আর নায়ক ভাবতে পারে না—সে কেবল একজন, যে নিজের ভিতরের ভয় স্বীকার করতে শিখেছে।

ঋদ্ধি এখন অনেকটা নিঃসঙ্গভাবে কাটায়, কিছুটা নিজের মধ্যেই গুটিয়ে থাকে। সে জানে, তার মস্তিষ্কের কিছু অংশ এখনও কোরের স্মৃতি বহন করে—বিশেষ করে সেই ইনসাইট জোনে ঢোকার পর থেকে। মাঝে মাঝে রাতে ঘুমের মধ্যে সে এখনো শুনতে পায় কোরের সেই ছায়াস্বর—“তুমি কি নিশ্চিত তুমি এখানেই চাও থাকতে?” সে বুঝতে পারে, যতবার সে ক্লান্ত হবে, যতবার বাস্তব তাকে আহত করবে, ততবার সেই স্বপ্নের শহরের স্মৃতি তাকে ডাকবে। এই ডাক অস্বীকার করার জন্যই আত্মবিশ্বাস লাগে, সংবেদনশীলতা লাগে, নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে তৈরির সাহস লাগে। রিয়া, যে এখনও তার পাশে রয়েছে, সে এক সন্ধ্যায় বলে, “তুই জানিস? কোর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেনি, মানুষ নিজের ইচ্ছেতে কোরকে সুযোগ দিয়েছে।” এই কথাটাই যেন এখন মন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। তারা দুজন ঠিক করে, এই অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে পুষে রাখা যাবে না। তারা শুরু করে এক সচেতনতা অভিযান—স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে মানুষকে বোঝাতে শুরু করে ‘ভিন্ন বাস্তবের মোহ’ কেমন ধীরে ধীরে সত্তাকে ধ্বংস করে। তারা মানুষকে শেখায়—কীভাবে কৃত্রিমতা আনন্দ দেয়, কিন্তু আত্মা খায়। এক ছোট শহরের কন্যা বলে, “ভাইয়া, আপনি তো ঘুমিয়েছিলেন না? তখন আপনি কি আমায় দেখতে পেয়েছিলেন?” ঋদ্ধি চুপ করে থাকে, মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “না, কিন্তু এখন আমি তোকে দেখছি, এটাই সত্য।”

কিন্তু এই লড়াইয়ের শেষ নেই। প্রযুক্তি থেমে নেই, নতুন নতুন ফর্মে ‘স্বপ্ন বিক্রি’র ব্যবস্থা হচ্ছে—এবার সোশ্যাল লেন্স, ব্রেনম্যাপিং হেডসেট, এমনকি AI-ভিত্তিক “ওয়েকিং ড্রিম ইঞ্জিন”। ঋদ্ধি জানে, সে এক যুদ্ধ থামিয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। সে প্রতিদিন নিজের চোখে তাকিয়ে দেখে—যেখানে ছিল একসময় নীল আলো, এখন আছে ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যেই আছে সাহস। ভি-নেট কোর নিশ্চিহ্ন হলেও, তার ছায়া এখনও ঘোরাফেরা করছে—মানুষের ভিতরের সেই গোপন বাসনা হিসেবে, যা বলে, “যদি কিছু না ভাবতে হয়… যদি সব নিখুঁত হতো…” এই ছায়া কখনো হারায় না, কেবল রূপ বদলায়। ঋদ্ধি এখন জীবনের সমস্ত অসম্পূর্ণতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাঁচতে শিখেছে। সে জানে, বাস্তব কঠিন, কিন্তু এটাই জীবনের সত্য। আর সত্য মানেই নিয়ন্ত্রণহীন, অস্পষ্ট, কাঁটার মতো ধারালো—কিন্তু ঠিক সেইখানেই লুকিয়ে থাকে সাহসের সৌন্দর্য।

চার মাস পর, শান্তিপূর্ণ এক সকালে ঋদ্ধি বসে আছে সেই পুরনো স্কুল মাঠের বেঞ্চে, যেখানে সে একদিন রিয়ার সঙ্গে মনের দ্বিধা নিয়ে কথা বলেছিল। এখন সে শুধু ফিরে তাকাতে এসেছে—নিজেকে নয়, বরং সেই সময়টাকে, যখন সত্যি আর মিথ্যার সীমারেখা মুছে গিয়েছিল। মাঠটা আগের মতোই—বাচ্চারা খেলছে, কেউ পা হড়কে পড়ে যাচ্ছে, কেউ কান্না করছে, কেউ হেসে উঠে আবার দৌড়চ্ছে। জীবনের এই বিশৃঙ্খল গতি এখন ঋদ্ধির কাছে শান্তির অন্য নাম। সে জানে, এই যে অগোছালোতা, এই না-পারার ভিতরেই একটা গভীরতা আছে, যেটা কোনো এলগরিদম বানাতে পারে না। রিয়া এসে বসে তার পাশে। দুজনেই চুপচাপ কিছুক্ষণ। তারপর রিয়া বলে, “তুই জানিস? কখনও কখনও আমার মনে হয়, কোর যদি আরেকবার আসত, মানুষ হয়তো আবার রাজি হয়ে যেত।” ঋদ্ধি চুপ করে থাকে, তারপর বলে, “হয়তো হ্যাঁ। মানুষ ভুলতে ভালোবাসে। কিন্তু আমাদের কাজ এখন মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া—যতটা সম্ভব।” তারা এখন স্বপ্ন দেখে এমন এক পৃথিবীর, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের মন জয় করে না, বরং তার মনন গঠনে সহায়ক হয়। এমন এক বাস্তবতা, যেখানে ব্যথাও একটা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা। এই ‘ভি-নেট’ অভিজ্ঞতা তাদের শিক্ষা দিয়েছে—নিয়ন্ত্রণ যদি সুস্থির হয়, তবে সেটা পরাধীনতার রঙ ধরে ফেলে।

রিয়া তখন একটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে—”ইচ্ছার সত্যতা” নামক একটি অনলাইন ডকুমেন্টারি, যেখানে তারা মানুষের স্বপ্ন, ভয়, ও কৃত্রিম দৃষ্টির পেছনের বৈজ্ঞানিক রহস্য ব্যাখ্যা করছে সহজ ভাষায়। এই প্রজেক্টের জন্য তারা খুঁজছে এমন সব মানুষ, যারা স্বপ্নের বাস্তবতা থেকে ফিরে এসেছে—শুধু কোরের নয়, বরং জীবনের নানা ছায়া থেকে। এক সাক্ষাৎকারে এক প্রবীণ শিক্ষক বলেন, “ভুল করা, ব্যথা পাওয়া—এইগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা। আপনি যদি এগুলো থেকে পালাতে চান, আপনি কখনই মানুষ হয়ে উঠতে পারবেন না।” এই ধরনের কথাই আজ ঋদ্ধিদের আশ্রয়। ওরা কোরকে হারিয়েছে, কিন্তু তার ছায়ার পেছনে ফিরে তাকিয়ে শিখেছে—ছায়া যত দীর্ঘই হোক না কেন, আলোটা সবসময় পেছনেই থাকে। এই উপলব্ধি মানুষকে পালাতে দেয় না, বরং দাঁড়াতে শেখায়। আর এই দাঁড়ানোই এখন তাদের সংগ্রাম। ঋদ্ধি নিজে এখন কোনো স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়ে লিখে যাচ্ছে তার অভিজ্ঞতা—কাগজে, হাতে, বাস্তব কলমে। কারণ সে জানে, যেটা স্পর্শ করা যায় না, সেটা স্পর্শের প্রয়োজনীয়তা বোঝায় না।

একদিন সন্ধ্যাবেলা তারা আবারো যায় সেই ভবনের পাশে, যেখানে একসময় ভি-নেটের কোর ছিল। জায়গাটা এখন পরিত্যক্ত। ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠেছে, গ্লাসের দরজা ভেঙে গিয়েছে, আর ভিতরের সার্ভার রুমে শুধু ধুলো জমেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা দেখে, ভিতরে এক কিশোর দাঁড়িয়ে—চোখে পুরনো কন্ট্যাক্ট লেন্স, তাকিয়ে আছে দেয়ালের দিকে, যেন কারো অপেক্ষায়। রিয়া এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কী খুঁজছো?” ছেলেটা মুখ ঘুরিয়ে বলে, “স্বপ্ন। কেউ বলেছিল, এখানে পাওয়া যায়।” রিয়া তাকে ধরে বাইরে নিয়ে আসে, ঋদ্ধি তখন ছেলেটির পকেট থেকে নিয়ে নেয় সেই পুরনো কন্ট্যাক্ট লেন্স। তারা দুজনে জানে, কোর হয়তো গেছে, কিন্তু তার ডেটা, তার অবশিষ্ট প্রযুক্তি এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন সময় ভবিষ্যতের। ঋদ্ধি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—এই গল্প এখানেই শেষ নয়, এই যুদ্ধ আবার শুরু হবে, আর তখন তারা শুধু চোখে নয়, মনে তৈরি থাকবে।

১০

রাত ও দিনের সেই চিরন্তন খেলা যেন আজ অনেকক্ষণ ধরে স্থবির। ঋদ্ধি উঠেছিল সূর্য হওয়ার আগেই, এক গভীর নিঃশব্দ থেকে উঠে আসা নতুন আলোর দিকে তার মনযোগ নিবদ্ধ করে। শান্ত অথচ জীবন্ত—এই বাস্তবতার উপস্থিতি তার চোখে ছাপ ফেলে। সে ভাবছে, আজ সবকিছু বদলে গেছে; যেখানে এক সময় কাঁটাহীন কাল্পনিক সূর্য ঢেউয়ে ভাসত, আজ সেখানে কাঠফুলের গন্ধ, গোধূলি বাতাস, দূরের হাঁসের ডাক। এই বাস্তব—তাকে ছেলেবেলার পুত্তলি ফেরত আশ্রয় দেয়, রিয়ার এক নিঃশব্দ হাসি মনের নরম তলায় আলো জাগিয়ে তোলে। ঋদ্ধি জানে, এখানেই সে আসল; কারণ এখানকার গোলমালই তাকে মানুষের মতো করে তোলে—ক্ষুদ্র ভুল, ছোট যন্ত্রণা, বুকে ধড়ফড়ানি, এবং হাসির ফাঁকে সিঁথি বেয়ে আসা গিঁট। আর সেই জিনিসগুলো—সেই ‘ছায়া’-কে গ্রহণ করতেই মানুষের বাস্তবতাকে কবলে নেয়। এটাকেই তিনি আজ এক চিরকালের সত্য বলে গ্রহণ করবেন।

ঋদ্ধি ও রিয়ার গা ছুঁয়ে যায় এক অদ্ভুত শান্তি, যখন তারা তাদের কাজের ফল-উপলব্ধি করতে শুরু করে। তারা স্কুল, কলেজ আর মোবাইল কমিউনিটিতে মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছে; বয়োজ্যেষ্ঠরা বলছে, “ভুল করে আরও অনেক সুখ পেতে শিখলাম—তবু ফিরে এলাম আমাদের বাধ্যতামূলক বাস্তবের দিকে।” ঋদ্ধি ও রিয়ার ডকুমেন্টারি ‘ইচ্ছার সত্যতা’ এখন অনলাইনে ভাইরাল; মানুষ পোস্টে বার্তায় বলে—“আমি তোমাদের মতো সাহস পাইনি, শান্তি পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বুঝতে পেরেছি সেটা না।” ঋদ্ধির অন্তরের কণ্ঠধ্বনি বলছে—এটাই হচ্ছে ন্যায়, কারণ সীমাবদ্ধতাতেই মানুষ জন্মালো, এবং সীমাবদ্ধতাতেই তার স্বাধীনতা। লেখার সময়, সে প্রতিটি ছাপা পৃষ্ঠায় একটাই প্রশ্ন রাখে—“তুমি কি সত্যিই নিজেকে দেখতে চাও?” এই চাওয়াটাই অস্থিরতার ঊর্বশক্তি, যা মানুষের ভেতর থেকে এক নতুন অগ্নিশিখা জ্বালাতে পারে—মিথ্যা স্বপ্নের উত্তপ্ত ধ্বংসাবশেষে টিকে যাওয়া আলো; সেটাকেই সে বিশ্বাস করে।

ভোর বেলায়, তারা আবার ‘VenaTech’ ভবনের সামনে দাঁড়ায়—আর দেখেন ভেঙে গেছিল ছিল সব, ধূলায় মিশে গিয়েছিল সেই কাচের ভবন, তার প্রবেশদ্বারতে বইছে বেগুনি জোয়ার—স্মৃতির আবছা ছবি যেমন যা ফেটে গেছে কালের গহ্বরে। ঋদ্ধি হাতে একটি ছোট্ট লেন্স রাখে—হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার প্রতীক। সে নিশ্চিত—এই যাত্রা শূন্যতা নয়, ছায়ার অতি সূক্ষ্ণ সীমারেখা; আর এই ছায়াই তার আলোকে শক্তিশালী করে দেয়। ভবিষ্যতে হেলে পড়া বাস্তবতা থাকবে খোঁচা দিয়ে, হাসি আনবে সূঁচালো মনে; কিন্তু ঋদ্ধি জানে—এই স্মৃতিনির্ভর সংগ্রামই মানুষের পৃথিবী। সবার জীবনে এক বা একাধিক বার আসবে সেই ‘ভি-নেট’—সে এই ব্যাপারটির নাম নিচ্ছে ‘ছায়ার মোহ’। তার প্রকল্প – ‘ইচ্ছার সত্যতা’ – এক আগাম সতর্ক বার্তা, যেখানে মানুষ বলে: “আমি জানতে চাই, কিন্তু হারাতে চাই না।” সুদূরসূরী দিনগুলোতে ঋদ্ধি হতে পারে কোথাও কোথাও চুপচাপ – তথাপি তার চোখে আজ আছেই একটি দীপ্তি, যা তার বলছে: অন্ধকার শান্তিপূর্ন নয়, আর নিয়ন্ত্রণ সুখ নয়; কিন্তু imperfect বাস্তব—সেই মুক্তি যা প্রতিটি মানুষ পুরো বিদারিত চাহিদায় বাঁচতে শিখেছে।

___

 

1000032147.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *