Bangla

চিরন্তন কলকাতা

Spread the love

Arindam Mukherjee


সকালে সাতটা নাগাদ কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় হাজির হন বিমলবাবু। মহাবোধি সোসাইটির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি চা খাচ্ছেন। দোকানদার চিনে ফেলল—”আরে, বিমলদা! আবার বই খুঁজতে নাকি এলেন?”

বিমলবাবু মুচকি হেসে বললেন, “এই বইপাড়াটার মধ্যে একটা ঘোর আছে হে। আমি যখন প্রেসিডেন্সিতে পড়তাম, তখন রোজ এখানে আসতাম। সেই ঘোরটা এখনও যায়নি।”

তিনি আজ খুঁজছেন একটা পুরনো বই—”বেঙ্গল ইন ট্রানজিশন”—১৮৭২ সালে প্রকাশিত। কারণ বইটির ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে এক রহস্য—একটা পুরনো মানচিত্র, যেটাতে কলকাতার এক লুপ্তপ্রায় পাড়ার উল্লেখ আছে—”ঘুসুড়িপাড়া”, যেটা নাকি ১৯০৫ সালের পর কলকাতার মানচিত্র থেকেই মুছে গেছে।

“আপনার খোঁজার পেছনে কারণটা কী বলুন তো?” চা দোকানদার অচিন্ত্য জানতে চায়।

বিমলবাবু চুপ করে থাকেন। শুধু বলেন, “আমার এক পুরনো ছাত্রের মৃত্যুর আগের চিঠিতে এই পাড়াটার উল্লেখ ছিল। ও বলেছিল, ঘুসুড়িপাড়ার একটা বাড়িতে নাকি ব্রিটিশ আমলে লুকোনো কিছু গোপন কাগজপত্র আছে। আমি সেটা খুঁজতেই নেমেছি।”

বইটা না পেলেও বিমলবাবুর যাত্রা থামে না। তিনি রওনা দেন শোভাবাজারের দিকে। সেখানেই ছিলেন তাঁর এক পরিচিত বৃদ্ধ, হেমাঙ্গ চট্টোপাধ্যায়, যিনি পুরনো কলকাতা নিয়ে লেখালিখি করতেন। শোভাবাজার রাজবাড়ির পাশে একটা পুরনো দোতলা বাড়িতে দেখা হয় তাঁদের।

“তুমি এখনও ঘুসুড়িপাড়ার খোঁজে?”—হেমাঙ্গ হেসে বলেন।

“হ্যাঁ। তুই তো জানিস, হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজতে আমার কেমন ভালো লাগে।”

হেমাঙ্গবাবু ধীরে ধীরে একটা পুরনো খাতা এনে দিলেন।

“এটা আমার দাদুর লেখা। উনি ১৯১০ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক জমিদারের অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার ছিলেন। তাতে ঘুসুড়িপাড়া নিয়ে কিছু তথ্য আছে।”

বিমলবাবু সেই খাতার পাতায় চোখ বোলান। এক জায়গায় লেখা— “ঘুসুড়িপাড়ার গলির ভিতরে ‘নীলবাড়ি’ নামে এক বাড়ি আছে, যেখানে ব্রিটিশদের গোপন রাজনৈতিক দলিল লুকোনো থাকত। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় সেই দলিলগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন থেকেই পাড়াটা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে।”

বিমলবাবু কাঁপা কাঁপা হাতে খাতাটা হাতে নিয়ে বলেন, “তাহলে সত্যি! ঘুসুড়িপাড়া শুধু কিংবদন্তি নয়, বাস্তব!”

পরদিন তিনি যান পোস্তা ঘাটের দিকে। সেখানে তিনি এক পুরনো দারোয়ানকে খুঁজে পান, নাম ভোলা মণ্ডল। ভোলা বলে, “বাবু, আমি ছোটোবেলায় একবার বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম সেই ‘নীলবাড়ি’তে। তবে বাড়িটার দরজা সবসময় বন্ধ থাকত। গলিটাও এত সরু, গাড়ি ঢোকেই না।”

“তুমি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে সেই গলিটায়?”

ভোলা একটু ভেবে রাজি হয়। তাঁরা পৌঁছান এক ভাঙাচোরা গলিতে—বাঁ পাশে ধ্বংসপ্রায় এক দোতলা বাড়ি, দেওয়ালে নীল রংয়ের ছাপ এখনও আছে। বিমলবাবুর বুকের ধড়ফড়ানি বাড়তে থাকে। তিনি জানেন, ইতিহাস এখন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে।

নীলবাড়ির ভিতরে ঢুকে তাঁরা একটা ধুলো ভর্তি ঘরে পৌঁছান। এক কোণে একটা লোহার ট্রাঙ্ক। খুলতেই তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে কয়েকটা পাতলা চামড়ার ফোল্ডার, যার উপর ইংরেজিতে লেখা:

“Confidential: Partition Intelligence (1905)”

ঠিক তখনই আচমকা দরজার বাইরে শব্দ—কয়েকজন ছেলেপিলে, যারা মোবাইল টর্চ জ্বেলে ঢুকছে। একজন বলে, “এই বাড়িতে কেউ ঢুকেছে, ভিতরে বুঝি গুপ্তধন আছে!”

ভোলা ভয়ে কাঁপে। বিমলবাবু শান্তভাবে বলেন, “গুপ্তধন নয়, এটা ইতিহাস।”

তিনি ছেলেগুলোকে বোঝান, কী পাওয়া গেছে। প্রথমে তারা হাসাহাসি করলেও পরে এক ছেলেটি বলে, “আপনি এগুলো মিউজিয়ামে দেবেন না?”

বিমলবাবু মাথা নাড়েন, “এর থেকে বড় মিউজিয়াম আর কী হতে পারে—আমাদের কলকাতা নিজেই তো এক চলমান ইতিহাস।”

বিমলবাবু ফোল্ডারগুলো নিয়ে যান ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর্কাইভসে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সংবাদপত্রে খবর হয়—

“Professor Discovers Lost Documents from Bengal Partition Era in North Kolkata House”

কলকাতার মানুষ যেন হঠাৎ ফিরে পায় নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ। পুরনো পাড়াগুলোর উপর আবার গবেষণা শুরু হয়, ঘুসুড়িপাড়াকে সংরক্ষণের দাবি ওঠে। বিমলবাবু একদিন ট্রামে করে যাচ্ছেন ধর্মতলা থেকে গড়িয়াহাট। এক স্কুলছাত্র পাশে বসে বলে,

“আপনি কি সেই অধ্যাপক? আমি আপনার কথা খবরের কাগজে পড়েছি। আমি ইতিহাস ভালোবাসি এখন।”

বিমলবাবু হেসে বলেন, “তাহলে জানো তো, কলকাতা শুধু একটা শহর নয়, এটা একটা সময়—যেটা থেমে নেই, আবার হারিয়েও যায় না। যতদিন আমরা তাকে মনে রাখি, কলকাতা বেঁচে থাকবে।”

1000022427.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *