অনির্বাণ ঘোষ
পর্ব ১
চামেলী মেমসাহেবের বাংলোটা অনেকদিন পর আবার দেখতে এলাম। ঠিক যেমনটা ছোটোবেলায় দাদুর হাত ধরে প্রথম দেখেছিলাম, অনেকটা তেমনই রয়ে গেছে—আধাভাঙা লাল ছাদের দোতলা কাঠের বাড়ি, সামনের দোলা চেয়ারে শিকল পড়ে আছে, বারান্দার রেলিং ধরা ধরেই বুনো লতা উঠে গেছে ছাদের কিনারা ছুঁয়ে। কুয়াশায় মোড়া রাস্তা ধরে গাড়িটা যখন বাঁক ঘুরে বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল, তখন সূর্য পাহাড়ের পেছনে হারিয়ে যেতে বসেছে। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশে একটা ফিকে কমলা রেখা, আর পাখিরা গাছপালা ছেড়ে ফিরে যাচ্ছে কোথাও।
আমি অর্ণব, বয়স তিরিশ ছুঁই ছুঁই। কলকাতায় একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে চাকরি করি, জীবন বলে কিছু তেমন আর অবশিষ্ট নেই, কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় মাস আর EMI-এর হিসেব। গতবছর দাদু মারা যাওয়ার পর তাঁর উইল অনুযায়ী এই বাংলোটার চাবি আমার হাতে আসে। বলেছিলেন, “চামেলী মেমসাহেবের বাংলো একদিন তোকে ডাকবে, তখন বুঝবি কেন এই বাড়িটা শুধু ইট কাঠ নয়, এটা একটা গল্প।” আমি সে কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম তখন। কিন্তু কে জানত, সত্যিই একদিন ফিরে আসতে হবে এখানে, এই নির্জন পাহাড়ি অরণ্যের ভিতর, যেখানকার রাতের নিস্তব্ধতাও শব্দ হয়ে বেজে ওঠে।
বাংলোটা দেখলেই একটা অদ্ভুত গা ছমছমে অনুভূতি হয়। ছোটোবেলায় দাদুর হাত ধরে এখানে এসেছিলাম কয়েকবার, কিন্তু যত বড় হয়েছি, তত বেশি শহর আমাকে গিলে খেয়েছে। এবার যখন হঠাৎ অফিস থেকে ছুটি মিলল, আর মাথার ভিতর একঘেয়েমির হাহাকার বাড়তে লাগল, তখন মনে হল—চলে যাওয়া যাক। চলে যাওয়া যাক সেই বাড়িতে, যেটা অতীতের মতোই আমার বর্তমানের আর্তি শুনতে পায়।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পুরনো চাবিটা তালায় ঢোকাতেই মনে হল যেন কেউ ভিতর থেকে নিঃশব্দে চোখ রেখে আছে। ঘরটার ভিতর ঢুকেই প্রথম যে গন্ধটা পেলাম, সেটা হল পুরনো কাঠের, ছাতার ফাঁক দিয়ে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে বাতাসের, আর খানিকটা যেন শুকনো গোলাপের মত ম্লান ভালোবাসার গন্ধ। সোফাগুলো ধুলোর আস্তরণে ঢেকে গেছে, দেওয়ালে এখনও সেই পীত হয়ে যাওয়া রঙ, আর শোকেসে কিছু পুরনো বই, চায়ের কাপ, আর একটা ফ্রেমে বাঁধানো নারী-মুখ—যার চোখে কি যেন একটা স্থায়ী অপেক্ষা।
রাতটা ঠান্ডা ছিল। পাহাড়ি হাওয়া জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছে। আমি উপরে উঠে ঘরের আলো জ্বালিয়ে ব্যাগটা নামালাম। খাটের চাদর বদলাতে গিয়ে দেখলাম, বালিশের নিচে একটা চিঠি রাখা। দুরু দুরু হাতে চিঠিটা খুললাম—কিন্তু সেটা ফাঁকা। শুধু এক ফোঁটা গোলাপি রঙের দাগ, যেন কারও ঠোঁট ছুঁয়েছে কাগজটাকে।
রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম। ঘুম আর ঘোরের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ এক টানা চুড়ির শব্দ কানে এল—টুনটুনটুন। মনে হল যেন কেউ নিচের বারান্দা ধরে হাঁটছে। উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে তাকালাম, কুয়াশায় মোড়া বারান্দায় কেউ নেই, শুধু দোলনা চেয়ারটা একটু আগে থেকে একটু বেশি দুলছে, যেন কেউ সবে উঠে গেছে।
ভাবলাম—হ্যালুসিনেশন। একা বাংলোয়, তাও এত বছর পর। মস্তিষ্ক হয়তো খেলে যাচ্ছে। শুয়ে পড়লাম আবার। কিন্তু ঘুমের মাঝে এক দৃশ্য ক্রমাগত ফিরে আসছিল। একটা মহিলা, সাদা শাড়ি, লাল পাড়। চুল খোঁপা করা, ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিকের মৃদু ছোঁয়া। চোখে একটা বেদনাময় গভীরতা। তিনি বসে আছেন বাংলোর সামনের চেয়ারে, এক হাতে চায়ের কাপ, অন্য হাতে একটা চিঠি। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে, যেন কিছু বলছেন—“আমি এখনও এখানে আছি, তুমি কি ফিরে দেখবে?”
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়ি দেখলাম, রাত তিনটে। বাতাস থেমে গেছে, কিন্তু জানলার পাশে রাখা টেবিলের উপর একটা সাদা গোলাপ রাখা—যেটা আমার ছিল না। বুক ধড়াস ধড়াস করছে। উঠে বাইরে গেলাম। পুরো বাংলোটা নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কুয়াশার ফাঁকে একটা ছায়ামূর্তি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে। আমি তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। সে মূর্তিটাও তাকিয়ে ছিল যেন আমার দিকেই।
পরদিন সকালে উঠে চারদিক দেখে আরও অদ্ভুত কিছু টের পেলাম। পেছনের বাগানে পা রাখতেই মনে হল মাটি যেন নতুনভাবে উলটেছে, যেন কেউ কিছু খুঁড়েছে রাতে। ভেতরে ফিরে এসে দাদুর পুরনো ট্রাঙ্ক খুলে দেখলাম—একটা ডায়েরি, যাতে লেখা—“চামেলী, ১৯৪৬, মার্চ, বাংলোর রাতের সেই কাহিনি যেটা কেউ জানে না।”
আমি ডায়েরিটা হাতে নিলাম, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম—এই বাংলোতে যতদিন থাকব, আমি জানার চেষ্টা করব কে ছিলেন চামেলী মেমসাহেব। এবং কী সেই রাত, যা এখনও বাতাসে গুঞ্জন তোলে।
পর্ব ২
ডায়েরিটার পাতাগুলো খুব পাতলা, যেন ছুঁলেই ছিঁড়ে যাবে। দাদুর হস্তাক্ষর চিনি, কিন্তু এই লেখাটা তাঁর নয়। অদ্ভুতভাবে আঁকাবাঁকা, একটা থমকে থাকা সময়ের ছাপ যেন পড়ে আছে শব্দের ফাঁকে ফাঁকে। ডায়েরির প্রথম পাতায় শুধু একটাই লাইন লেখা ছিল—”সবকিছুর শুরু সেই চায়ের কাপ থেকে।” আমি পাতা উলটে পড়তে শুরু করলাম।
“১৯৪৬ সালের মার্চ মাস। বাংলোয় তখন অতিথি এসেছিলেন মেজর হেনরি স্যামুয়েল ও তাঁর স্ত্রী, চামেলী। ঠিক বললে, চামেলী দেবী তখন সদ্য বিবাহিতা, বয়স মাত্র একুশ। আর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এই অভিজাত অফিসার বয়সে তাঁর চেয়ে প্রায় বিশ বছর বড়। তাঁদের এই বাংলোয় আসার কারণ ছিল রওশনপুর চা-বাগান ঘুরে দেখা, যা কিনা হেনরির তত্ত্বাবধানে আসার কথা ছিল ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে। কিন্তু চায়ের বাগানের ছায়া নয়, এই বাংলোর ছায়া অনেক ভারী হয়ে উঠেছিল অচিরেই।”
এতদূর পড়ে আমি ডায়েরি বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। চামেলী নামটা যে আমি স্বপ্নে শুনেছিলাম, সেটা কি কাকতালীয়? আর সে সাদা গোলাপ? এবং সেই চুড়ির শব্দ? না কি এইসবই আমার মনগড়া—একটা একাকী পাহাড়ি রাতের রোমাঞ্চ?
কিন্তু মন মানছিল না। আমি আবার পড়া শুরু করলাম।
“চামেলী ছিলেন নিঃসঙ্গ। হেনরি সারাদিন চা-বাগানে ব্যস্ত থাকতেন, আর চামেলী ঘুরতেন এই বাংলোর বারান্দায়। একদিন, পেছনের বাগানে হঠাৎ তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় একজন বাঙালি শিক্ষক, রণজিৎ সরকারের সঙ্গে। রণজিৎ এখানে স্থানীয় স্কুলে পড়াতেন, পাশাপাশি কিছু ব্রিটিশ কর্মচারীদের বাংলা শেখাতেন। চামেলীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয় বইপত্র আর কবিতার মাধ্যমে। সেই বন্ধুত্ব যত বাড়ে, হেনরির সন্দেহও তত বাড়ে।”
এই পর্যন্ত পড়ে আমার মনে পড়ল, বাংলোর পেছনে একটা পুরনো টিনের বেঞ্চ ছিল, যা এখন গাছের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে। সেখানে আমি আজ দুপুরে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। তখন ঠিক খেয়াল করিনি, কিন্তু বেঞ্চের নিচে যেন কিছু খোঁড়ার চিহ্ন ছিল। হঠাৎ একটা ধারণা আমার মনে এল। আমি আবার পেছনে গেলাম। সূর্যের আলো তখন মেঘে ঢাকা, কিন্তু ছায়াগুলো যেন আজ বেশি গাঢ়।
বেঞ্চের নিচে নত হয়ে খুঁজতে শুরু করলাম। মাটি একটু নরম। একটা লাঠি নিয়ে খুঁড়তে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর একটা ধাতব শব্দ পেলাম। মাটি থেকে বেরিয়ে এল একটা পুরনো কৌটো, গোল, জং ধরা। হাত কাঁপছিল আমার। কৌটো খুলতেই দেখলাম তার ভিতরে কিছু চিঠি, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে লেখা। কালি অনেক জায়গায় মুছে গেছে, কিন্তু যা পড়া যায়, তা নিঃসন্দেহে ভালোবাসার চিঠি।
“চামেলী, তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি যে যন্ত্রণা টের পাই, তা আমি আর নিতে পারি না। হেনরি তোমায় বন্দি করেছে এক স্বর্ণখচিত খাঁচায়, কিন্তু তোমার আত্মা উড়ে যেতে চায়। তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আমি শুধু চাই একটিবার তুমি বলো—চলো, পালিয়ে যাই।”
—রণজিৎ
চিঠিগুলো পড়তে পড়তে আমি কাঁপছিলাম। একুশ শতকের শহুরে আমি, এসব চিঠি যেন আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অন্য এক জগতে। কি হয়েছিল চামেলীর? সে কি পালাতে পেরেছিল রণজিৎ-এর সঙ্গে? না কি ধরা পড়ে গিয়েছিল? আমি ফিরে এসে ডায়েরির পরের পাতাগুলো উলটে দেখি—শেষ কয়েক পাতায় কালি মাখানো, জলচাপার দাগ, আর অস্পষ্ট কিছু বাক্য। তবে একটা লাইন স্পষ্ট—
“বাংলোর পিছনের আমগাছটার নিচে আমরা দেখা করতাম। শেষ রাতটায়, আমি এসেছিলাম। কিন্তু চামেলী আসেনি।”
হঠাৎ কে যেন খুব কাছে থেকে ফিসফিস করে বলল—”সে এসেছিল, কিন্তু তোমরা তা দেখোনি।” আমি ঝাঁপিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। চারপাশে কেউ নেই। শুধুই বাতাস আর বনের শব্দ।
সেদিন রাতে বাংলোর দরজা খোলা রেখে বসে ছিলাম। হাতের কাছে একটা মোমবাতি, পাশে রাখা ডায়েরি আর চিঠির কৌটো। জানলার বাইরেটা কুয়াশায় ঢেকে গেছে, কিন্তু হঠাৎ আবার সেই চুড়ির শব্দ। এবার খুব স্পষ্ট। তারপর পায়ের ধাপ—ধীরে ধীরে, কাঠের মেঝেতে খটখট করে এগিয়ে আসছে কারা যেন।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। দরজার সামনে একটা ছায়া। মহিলা। সাদা শাড়ি, লাল পাড়। তার মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার চোখ দুটো যেন চেনা লাগে, যেন সেই ছবির নারীমুখ, যেটা বাংলোর দেওয়ালে বাঁধানো ছিল। আমি কিছু বলার আগেই সে একপা এগিয়ে এসে বলল, “তুমি কি রণজিৎ-এর মতোই আমাকে বুঝতে পারো?”
তারপর সে হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেল।
আমি বসে পড়লাম মেঝেতে। এই বাংলোয় কি শুধু ইতিহাস লেখা হয়নি? না কি কিছু অসমাপ্ত গল্পের পাতা আমারই জন্য অপেক্ষা করছিল?
পর্ব ৩
সকালে ঘুম ভাঙল পাখিদের চিৎকারে, কিন্তু সে আওয়াজ যেন আজ কিছুটা বিবর্ণ, যেন ভোরের আলোও ক্লান্ত। দরজা খুলেই দেখলাম রাতের বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া মাটি, আর পেছনের আমগাছের নিচে ছড়িয়ে থাকা পাঁকা আমের গন্ধ। আমার চোখ প্রথমে ওদিকেই গেল—সেই জায়গা, যেখানে রণজিৎ চিঠিতে লিখেছিল ওরা দেখা করত। কৌতূহল এমনভাবে চেপে বসেছে যে আজ আর কিছুতেই শান্ত থাকা যাচ্ছে না।
আমি বুট পরে সোজা চলে গেলাম পেছনের দিকে। পায়ের নিচে ভেজা মাটি কাদায় পরিণত হয়েছে, তবু হাঁটছি। আমগাছটা বিশাল, ছায়া যেন পুরো বাংলোটাকে ঢেকে রাখে। ডালের ফাঁকে রোদের টুকরো এসে পড়ে কুয়াশা ঘেরা পাতায়। নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে মনে হল, এখানেই কিছু লুকোনো আছে। দাদুর ডায়েরির পাতা আর রণজিতের চিঠিগুলোর কথাগুলো একসাথে মাথার মধ্যে ঘুরছে—কোনটা কল্পনা, আর কোনটা সত্যি তা আলাদা করা যাচ্ছে না।
আমগাছের গোড়ার চারপাশ খুঁড়তে শুরু করলাম একটা বাঁকা লাঠি দিয়ে। খানিক বাদে মাটি একটু নরম হয়ে এল। চাপ দিয়ে টানতেই দেখা গেল, একটা কাঠের বাক্স। কালচে হয়ে যাওয়া কাঠ, কিন্তু এখনও শক্ত। বুক ধড়ফড় করছে। বাক্সটা খুলতেই একটা পুরনো কাঁচের বটল, যার ভিতরে কিছু শুকনো পাপড়ি—সম্ভবত চামেলীর প্রিয় চা-ফুলের। আর একটা ছোট টিনের বাক্স, খুলতেই দেখা গেল কিছু পোড়া কাগজ, আর তার ওপর একটা আধপোড়া ছবি।
ছবিতে এক তরুণী, তার চোখে ভয়ের ছাপ। পাশে একজন পুরুষ, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। তার মুখটা ঝাপসা হয়ে গেছে, আগুনে পোড়া অংশটা ঠিক সেইখানে। আমি কাগজটা তুলতেই দেখা গেল, ছবির পেছনে লেখা—“শেষ দেখা, মার্চ ১৯৪৬।”
হঠাৎ মনে পড়ল, দাদু বলতেন ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে এই বাংলোয় আগুন লেগেছিল। গ্রামের লোকজন বলত, ‘কেউ একরাতে কান্না শুনেছিল, তারপর আগুন।’ কিন্তু সেই আগুনের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি কোথাও। বরং স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়েছিল একটা গল্প—“চামেলী মেমসাহেব নিজের হাতে বাংলোতে আগুন লাগিয়েছিলেন, তার প্রেমিক মারা গেছিল, আর তারপর থেকে কেউ ওখানে একা রাত কাটায় না।”
আমি বাক্সটা নিয়েই ফিরে এলাম বাংলোয়। বসে রইলাম সামনের বারান্দায়, চা বানানোর কথা মনে হচ্ছিল। চা, যা দিয়ে এই গল্পের শুরু, আবার চা-ই কি তার উত্তর দেবে? আমি রান্নাঘরে গিয়ে চুলা ধরাতে চেষ্টা করছিলাম, হঠাৎ গ্যাস সিলিন্ডার বন্ধ পাওয়া গেল।
ঠিক সেই সময় পেছনের জানলায় ছায়া দেখা গেল। সাদা শাড়ি, চুল খোলা, দাঁড়িয়ে আছে। আমি ছুটে গেলাম সামনে, কিন্তু জানলার বাইরে কেউ নেই। শুধু বাতাসে একটা মিষ্টি, কিন্তু কেমন যেন পুরনো দিনের পারফিউমের গন্ধ। চামেলীর ছোঁয়া?
সন্ধেবেলায় দাদুর ট্রাঙ্ক থেকে একটা পুরনো রেকর্ড প্লেয়ার বার করলাম। কয়েকটা রেকর্ড ছিল, যার একটায় লেখা ছিল—“ভূপেন হাজারিকা – গীতিমালা, ১৯৪৫।” রাখলাম রেকর্ডে। ঘুরতে ঘুরতে প্লাস্টিকের সুই সুর তুলল—“জীবন কি আছে বলো, যদি প্রেম না জাগে…”
গান বেজে উঠতেই হঠাৎ মনে হল কেউ আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। আমি আস্তে করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম—এবং স্থির হয়ে গেলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে চামেলী। না, আমি ভুল দেখিনি। এ চোখে স্বপ্ন নয়। তার মুখে সেই একই বেদনাময় হাসি, হাতের আঙুলে কাঁচের চুড়ি, এবং ঠোঁটে একবিন্দু লাল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কে?”
সে বলল, “আমি চামেলী। তুমি যা খুঁজছো, তা শুধু অতীতে নেই, বর্তমানে আছে। তুমি যদি সাহস পাও, তাহলে আমার সত্যিটা শুনে নিতে পারো।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “শুনতে চাই। আমি জানতে চাই তোমার গল্প।”
সে হেসে বলল, “তবে কাল রাত বারোটায় আমগাছের নিচে এসো। একবার শেষ কথা বলা বাকি ছিল রণজিতের সঙ্গে, আজ আমি বলব। আজ তুমি সাক্ষী হবে।”
হাওয়ার দমকে জানলা বন্ধ হয়ে গেল, এবং সে মিলিয়ে গেল। রেকর্ড প্লেয়ারে সুর থেমে গেছে, শুধু সুই ঘুরছে—ঘড়ঘড় করে।
রাতটা বাকি থাকল কেবল অপেক্ষার। আমি জানি, আগামী রাতে কিছু একটা ঘটবে।
পর্ব ৪
রাত দশটা বাজে, পুরো বাংলো নিস্তব্ধ। জানলার বাইরের পাইন গাছগুলো নড়ছে না একটুও, যেন পাহাড়ের বুক থেকেও বাতাস সরে গেছে। আজকের রাতের কথা সকাল থেকেই মাথায় ঘুরছে। চামেলী মেমসাহেব বলেছিলেন—“বারোটায় আমগাছের নিচে আসবে।” এটা যদি একটা বিভ্রম হয়, তবে তার জন্যও আমি প্রস্তুত। কিন্তু যদি না হয়? যদি সত্যিই আজ রাতে কিছু ঘটে?
আমি মোমবাতি জ্বালিয়ে কাঁপা হাতে ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠাটা বার করে দেখলাম। সেখানে দাদু একটা বাক্য লিখেছিলেন—“এই বাংলো শুধু চার দেয়ালের গল্প নয়, এ বাড়ি অনুভব করে, জবাব দেয়। যদি তুমি শোনার সাহস রাখো।” আমি জানি, আজ সেই শোনার রাত।
বারোটা বাজতে তখনো কুড়ি মিনিট বাকি। আমি একটা ফ্ল্যাশলাইট আর রণজিতের চিঠিগুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমগাছটা দিনের আলোয় যতটা শান্ত লাগে, রাতে এসে দাঁড়ালে তার ছায়া যেন আকাশ ছুঁতে চায়। আমার স্যান্ডেলের নিচে শুকনো পাতা চুপচাপ চুরমার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শব্দ তেমন নেই।
গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। সময় যেন থেমে গেছে। দম বন্ধ করা নিস্তব্ধতা। হঠাৎ পেছন দিক থেকে একটা গানের সুর ভেসে এল—কোনও মেয়ের কণ্ঠে পুরনো দিনের ঠুমরি—”পিয়া তোসে নৈনা লাগে রে…”। গলা টানটান, কিন্তু তার ভিতরে বিষাদের ছোঁয়া। আমি ঘুরে তাকাতেই দেখি, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে চামেলী।
তার পরনে সেই সাদা শাড়ি, লাল পাড়, চোখে গভীর জলাভাস। হাতে ধরা একটা পুরনো কাপ, তাতে ধোঁয়া ওঠা চা। সে বলল, “রণজিত প্রতীক্ষা করেছিল, কিন্তু আমি পারিনি। আমি ছিলাম বন্দি, নিজের ইচ্ছের, সমাজের, আর এক অভিশপ্ত দাম্পত্যের। তুমি জানো, আমি কেন আগুন লাগিয়েছিলাম?”
আমি কিছু বলিনি। সে নিজেই বলল, “সেই রাতটা ছিল পূর্ণিমা। আমি পালিয়ে যাব ঠিক করেছিলাম। রণজিত আমাকে অপেক্ষা করছিল গাছের নিচে। কিন্তু হেনরি… হ্যাঁ, আমার স্বামী হেনরি বুঝে গিয়েছিল। সে মারধর করেছিল আমাকে, আমার মুখে, আমার আত্মায়। আমি লুকিয়ে এলাম বাংলোর পিছনের ঘরে। কিন্তু তখন আমার হাতে কিছুই ছিল না, শুধু একটা মোমবাতি, আর সেই চিঠিগুলো। আমি জানতাম, রণজিত হয়ত ফিরবে না আর কখনও। আমি সব পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম—আমার অতীত, আমার ভুল, আমার বন্দিত্ব।”
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তুমি আগুন লাগিয়েছিলে… সেই জন্য বাংলো জ্বলেছিল?”
সে মাথা নাড়ল, বলল, “আগুন আমি দিয়েছিলাম, কিন্তু রণজিত… সে এসেছিল আমাকে নিতে। আমি তখন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। হেনরি গুলি করেছিল ওকে। বাংলো জ্বলে উঠেছিল—আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, কিন্তু রণজিত… থেকে গিয়েছিল আগুনে।”
তার কণ্ঠ থেমে গেল। বাতাসে হালকা ধোঁয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ আমি যেন দেখতে পেলাম সেই দৃশ্য—একজন পুরুষ, হাতে চিঠি, চোখে হতাশা, আর এক যুবতী জানলার পাশে দাঁড়িয়ে চোখে জল, মুখে নীরবতা।
চামেলী আবার বলল, “আমি আজও রোজ এই গাছের নিচে দাঁড়াই। আমি চাই সে আসুক, আমি বলতে পারি—আমি দুঃখিত। কিন্তু সে তো আর ফিরে আসে না। তুমি কি ওর জন্য কিছু করতে পারবে?”
আমি বললাম, “আমি কী করতে পারি?”
সে উত্তর দিল, “চিঠিগুলো নদীতে ভাসিয়ে দাও। তবেই সে মুক্তি পাবে। তবেই আমিও পারব হারিয়ে যেতে। তুমি তো আমাদের গল্পের শেষ সাক্ষী। তুমি তো বাঁচা মানুষ। তুমি যদি আমাদের শেষ কাজটা করে দাও, তাহলে এই বাংলোও মুক্তি পাবে।”
তারপর হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি, গাছটা কেঁপে উঠল, আর চামেলী যেন ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমি স্তব্ধ। আমার হাতে তখনও ধরা সেই চিঠিগুলোর বাক্স। তার পিঠে আগুনে পোড়া ছাপ।
আমি জানি, আমার কাজ এখন শুরু। আমি জানি, এই গল্পটা শুধু অতীত নয়, এটা আমারও গল্প হয়ে উঠেছে। আমি এখানে এসেছিলাম কেবল কিছুদিন কাটাতে। এখন বুঝছি, আমি এসেছিলাম কোনও এক অসমাপ্ত প্রেমের সাক্ষী হতে।
আগামীকাল আমি যাব নদীর দিকে। আমি চিঠিগুলো ভাসাবো, আমি মুক্ত করব তাদের—রণজিত আর চামেলীকে। তারপর আমি নিজেও এই বাংলো ছেড়ে চলে যাব। কারণ আমি জানি, কিছু জায়গা থাকে শুধু স্মৃতির জন্য, সেখানে বেশিদিন বাঁচা মানুষ থাকলে স্মৃতিরা অস্বস্তি পায়।
পর্ব ৫
পরদিন সকালে খুব ভোরে উঠে পড়লাম। পাহাড়ি বাতাসে হালকা হিম, পাখিদের ডাক এখনও ভিজে কুয়াশার পর্দা পেরিয়ে আসছে। চারিদিকে একটা অনুচ্চ শব্দ—শুধু পাতা নাড়া, মাটিতে শিশির পড়া, আর সেই বাংলোর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। আজ আমি যাচ্ছি সেই কাজটা করতে, যার কথা চামেলী মেমসাহেব নিজে বলেছিলেন—চিঠিগুলোর বিসর্জন।
বিছানার পাশে রাখা ছোট টিনের বাক্সটা হাতে নিলাম। রণজিতের হাতে লেখা চিঠিগুলো, অনেকটা ছেঁড়া, অনেকটাই পোড়া, কিন্তু এখনও তাদের ভিতরে আবেগ স্পষ্ট। একটা চিঠিতে লেখা ছিল—“চামেলী, ভালোবাসার কোনও ভাষা হয় না, তার হয় শুধু প্রতীক্ষা।” সেই প্রতীক্ষাই তো চামেলীর জীবনে ধরা দেয়নি আর। আমি সেইসব শব্দকে আজ মুক্তি দিতে চলেছি।
পাহাড়ের ঢালু পথ ধরে একটা পুরনো নদী রয়েছে—ঝরণার মতন এক নদী, স্থানীয় ভাষায় বলে ‘সোনাঝুরি।’ দাদু বলতেন, এই নদীর ধারেই একসময় লোকজন ধর্মীয় বিসর্জন দিত। আমি ঠিক করলাম, ওই নদীর কাছেই যাব। একটা ব্যাগে জলের বোতল, টিনের বাক্স আর একটা ফুলের তোড়া নিয়ে রওনা হলাম।
পথে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, বাংলোটা পেছনে দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে, যেন জিজ্ঞেস করছে—তুমি ফিরবে তো? হয়ত ফিরব না, বাংলোর সাথে আমার সম্পর্কটাও এবার শেষ হয়ে আসছে।
নদীর ধারে পৌঁছে দেখি, চারপাশে নিঃঝুম পরিবেশ। বুনো ফুল ফোটা, পাথরের উপরে শিশিরের জমাট জল, আর মাঝখানে জলের ফিসফিস আওয়াজ। আমি ধীরে ধীরে বসে টিনের বাক্সটা খুললাম। একটা একটা করে চিঠি হাতে নিলাম, পড়ে ফেললাম শেষবারের মতো—”আমার বুকের মধ্যে যদি একটুকরো সাহস থাকত, তাহলে আমি তোমায় বলে ফেলতাম—চলো, চলে যাই… সেই সাহস কোনওদিন পাইনি চামেলী, শুধু চোখে চোখ রেখে ভালোবেসে গিয়েছি নিঃশব্দে।”
এই নিঃশব্দ ভালোবাসার চিঠিগুলো আজ মুক্তি পাবে। আমি প্রথম চিঠিটা জলে ভাসিয়ে দিলাম। তারপর একে একে সবগুলো। কাগজগুলো ধীরে ধীরে ভিজে গেল, অক্ষরগুলো মিলিয়ে গেল জলের বুকে। একটা সময় মনে হল, নদীর ঢেউ যেন সেই অক্ষরগুলো পড়ছে, বুঝে নিচ্ছে, আর তারপর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে অজানার দিকে।
শেষ চিঠিটা যখন ছাড়লাম, সেই সময় হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা উঠল। আকাশে একটা শালিক পাখি উড়ে গেল, আর আমি শুনতে পেলাম কার যেন হাসি—একটা মেয়েলি হাসি, যেন কোনও গভীর দুঃখের পর পাওয়া হালকা শান্তির হাসি। আমি জানি, চামেলী মেমসাহেব এখন মুক্ত। রণজিতও।
আমি নদীর পাড়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ, মুখ তুললাম আকাশের দিকে। সূর্যটা যেন একটু বেশি উজ্জ্বল, আজকের আলোতে আর শীত নেই, যেন কোনো ভার নেমে গেছে পাহাড়ের বুক থেকে।
ফিরে যখন বাংলোয় এলাম, তখন দুপুর। বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, জানলার পর্দাগুলো বাতাসে দুলছে, বারান্দার চেয়ারটা কেমন নির্ভার লাগছে। আমি ভিতরে ঢুকে দাদুর পুরনো ট্রাঙ্কটা বন্ধ করে দিলাম, চাবি রেখে দিলাম আগের জায়গায়।
তারপর উপরে উঠে সেই ঘরে গেলাম যেখানে প্রথম রাতে চুড়ির শব্দ পেয়েছিলাম। দরজার পাশে আজ রাখা আছে একটা সাদা গোলাপ। আমি জানি, ওটা আমার জন্য ওর শেষ উপহার। আমি গোলাপটা হাতে নিলাম, আর মৃদু করে বললাম, “বিদায়, চামেলী মেমসাহেব। তোমার গল্প আমি শুনেছি, বুঝেছি। এবার তুমি বিশ্রাম নাও।”
গোলাপটা বুক পকেটে রেখে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম। গেট খুলে গাড়ির চাবি ঘোরাতেই মনে হল, পিছন থেকে কেউ বলল—“ধন্যবাদ।” আমি ফিরে তাকালাম না। সবসময় কিছু মুখ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হৃদয়ে অনুভব করা যায়।
গাড়ি চলতে শুরু করল কুয়াশার ভেতর দিয়ে। বাংলোটা পিছনে মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, কিন্তু আমি জানি, আজ থেকে সে বাড়ি শুধুই একটা ভৌতিক রহস্যের নয়, বরং এক অসমাপ্ত প্রেমের বেদনার সাক্ষী।
সামনে শহরের রাস্তা, আবার ফোনের শব্দ, অফিসের মিটিং, ট্রাফিক, হর্ন, আর অভ্যস্ত বাস্তবতা। কিন্তু আমি জানি, আমার ভেতরে আজ থেকে এক চামেলী মেমসাহেব বাস করবে—যে ভালোবাসতে পেরেছিল, কিন্তু বলা হয়নি।
পর্ব ৬
দুদিন পর আমি ফিরে এলাম কলকাতায়। শহরটা আগের মতোই ছিল—উচ্চস্বরে ট্রাফিক, লোকের ভিড়, মোড়ের চায়ের দোকান আর মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকা মানুষেরা। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার ভিতরে কিছু বদলে গেছে। চামেলী মেমসাহেবের বাংলো যেমন শুধু একটা কাঠামো নয়, তেমনই আমি এখন শুধু অর্ণব নই, আমি এক অসমাপ্ত গল্পের অন্তিম পাঠক, এক নিঃশব্দ ভালোবাসার নীরব বাহক।
অফিসে ফিরে গিয়েই কাজের চাপে ডুবে যেতে হল। বস যেন আর একটু বেশি কড়া, সহকর্মীরা আগের মতোই নিন্দা আর কনফারেন্স কলের মাঝে দিন কাটাচ্ছে। আমি ডেস্কে বসে থেকে বুঝে গেলাম, এই চেনা জায়গাটা আমাকে আর আগের মতো টানে না। মাঝে মাঝেই ডেস্কের ড্রয়ার খুলে সাদা গোলাপটার শুকনো পাপড়িগুলো দেখি—এখনও ঘ্রাণ থাকে কি না খুঁজি, যদিও জানি, কিছু ঘ্রাণ থাকে শুধু মনের ভিতরে।
রাতে ঘুম আসে না সহজে। চোখ বন্ধ করলেই সেই বারান্দার দৃশ্য, সেই আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা চামেলী, সেই জলের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া চিঠির অক্ষর ভেসে ওঠে। আমি বুঝে গিয়েছি, যা কিছু ঘটেছে, তা কেবল অতীত নয়—তার একটা অংশ আমার মধ্যে ঢুকে গেছে।
একদিন সন্ধেবেলা কাজ শেষে পার্ক স্ট্রিটের এক নিরিবিলি ক্যাফেতে বসেছিলাম। জানালার পাশে চা নিয়ে ভাবছিলাম—আমার এই জীবনের মানে কী? কেবল চাকরি, বেতন আর অফিস পলিটিক্স? যদি এর বাইরেও কিছু থাকে, তাহলে আমি কি সেদিকে পা বাড়াতে পারি না?
ঠিক তখনই, সামনে এসে দাঁড়াল এক তরুণী। বয়সে আমার চেয়ে কিছুটা ছোট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে ধরা একটা পুরনো বই—“The Shadow Lines”। আমি অবাক হয়ে বললাম, “গোটা ক্যাফেতে কেউ এই বই পড়ে, এটা ভাবতেই পারিনি।”
সে হেসে বলল, “আমিও ভাবিনি যে কেউ বইয়ের দিকে তাকাবে, সবাই তো ইনস্টাগ্রামে মুখ গুঁজে থাকে।”
আমরা হেসে ফেললাম। তার নাম ছিল—ঈরা।
ঈরার সঙ্গে আলাপটা অদ্ভুতভাবে সহজ ছিল। সে কথা বলছিল ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে। ওর চোখে ছিল কিছু একটার খোঁজ, যেন ও নিজেও অপেক্ষা করছিল একটা অসমাপ্ত কিছুর। আমি তাকে বললাম না চামেলী মেমসাহেবের গল্প, কিন্তু আমি বললাম, “আমি কিছুদিন আগে পাহাড়ে গিয়েছিলাম। এক পুরনো বাংলোয়। সেখানে একটা ইতিহাস আছে—যেটা কাগজে লেখা নেই, কিন্তু বাতাসে ভেসে থাকে।”
ঈরা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সেই ইতিহাস বুঝতে পেরেছিলে?”
আমি বললাম, “না, বুঝিনি—কিন্তু অনুভব করেছি। কিছু ভালোবাসা শুধু অনুভবের, ব্যাখ্যার নয়।”
ঈরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, “তুমি জানো, আমি ছোটবেলায় একটা বাংলোয় গিয়েছিলাম, উত্তরবঙ্গে। রাতে একটা ঘুমঘুম আওয়াজ পেতাম, যেন কেউ পুরনো পিয়ানো বাজাচ্ছে। পরে জেনেছিলাম, সেই বাড়িতে এক বধূ আত্মহত্যা করেছিল—কারণ তার ভালোবাসা ছিল বারণের। আমার খুব মনে পড়ে সেই ঘরটা। এখনও স্বপ্নে দেখি কখনো কখনো।”
আমি হেসে ফেললাম। ঈরা বলল, “তুমি হেসে ফেললে কেন?”
আমি বললাম, “হয়ত আমরা দুজনেই অতীতের ছায়া নিয়ে বসে আছি, কিন্তু ভবিষ্যতের আলোয় হাঁটতে ভুলে যাচ্ছি।”
সেদিন আমরা ঘন্টাখানেক কথা বলেছিলাম। তারপর সে উঠে চলে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে বলেছিল, “তোমার মনে যদি এখনও কোনও গল্প থেকে যায়, বলো আমাকে। আমি শুনব।”
ফিরে এসে আমি ভাবছিলাম—আমি কি সত্যিই কাউকে বলতে পারব চামেলী মেমসাহেবের গল্প? ও কি আমারই মনকে ছুঁয়ে গিয়েছে, না কি ঈরার মত কাউকে খুঁজেই সে আমাকে এগিয়ে দিয়েছে ভবিষ্যতের দিকে?
রাতে ঘুমাতে গেলাম। জানলার বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি। চোখ বন্ধ করতেই যেন একটা কণ্ঠ ভেসে এল—“তুমি আমার গল্প বললে না এখনো… বলবে তো?”
আমি উঠে বসলাম বিছানায়। কিন্তু কণ্ঠটা নেই, কেবল বৃষ্টির শব্দ।
আমি জানি, চামেলী মেমসাহেবের গল্প বলা এখনও বাকি। ঈরার মতো কেউ যদি শোনে, তাহলে হয়ত সেই গল্প সত্যি হয়ে উঠবে আবার, হয়ত কোনো নতুন চিঠি লেখা হবে এই শহরের বাতাসে।
পর্ব ৭
সন্ধেটা অদ্ভুত ছিল। কলকাতার আকাশে কেমন এক অস্থিরতা, যেন কুয়াশা শহরের ভিতর ঢুকে পড়েছে একটু আগে থেকেই। আমি তখন ক্যাফের বাইরের বেঞ্চে বসে ছিলাম, ঈরা নিজেই আমায় মেসেজ করে ডেকেছিল। “আজ সন্ধেটা কি তোমার চামেলী মেমসাহেবের গল্পের জন্য ফাঁকা?”—এমনই প্রশ্ন ছিল তার। আমি উত্তর দিয়েছিলাম—“হ্যাঁ, আজ আমার কাছে শুধু সময় আর একটা অসমাপ্ত গল্প আছে।”
সে আসতেই আমরা দুজনে চা আর এক প্লেট শিঙাড়া নিয়ে জানলার ধারে বসলাম। কিছুক্ষণের চুপচাপ সময়ের পর আমি শুরু করলাম।
“চামেলী মেমসাহেব নামে এক মহিলা ছিলেন ১৯৪৬ সালে। বয়সে তরুণী, কিন্তু বিয়ে হয়েছিল এক ব্রিটিশ অফিসারের সঙ্গে, যার বয়স তাঁর দ্বিগুণ। সেই অফিসার আসেন রওশনপুরের এক চা-বাগান পরিচালনার কাজে, আর থাকেন পাহাড়ের কোলে একটা বাংলোয়—যেটা আমার দাদুর নামের ওপর ছিল। চামেলী ঐ বাংলোয় থাকতেন, কিন্তু তাঁর চোখে ছিল ঘর না হওয়ার যন্ত্রণা। ঠিক তখনই তাঁর আলাপ হয় স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রণজিতের সঙ্গে। সে মানুষটা ছিল কবিতার, বইয়ের, আর বিনয়ী স্পর্শের।”
আমি দেখতে পেলাম ঈরা গভীর মনোযোগে শুনছে। চোখে তার আলোকিত বিস্ময়, আর মুখে চাপা উত্তেজনা। আমি থামলাম না।
“রণজিত আর চামেলীর মধ্যে তৈরি হয় এক সম্পর্ক—যেটা ছিল শব্দহীন, কিন্তু স্পষ্ট। ব্রিটিশ অফিসার হেনরি সন্দেহ করে, এবং সেই একটি রাতে, চামেলী সিদ্ধান্ত নেয় পালাবে সে, রণজিতের সঙ্গে। কিন্তু সে রাত ছিল অভিশপ্ত। আগুন লেগে যায় বাংলোয়, কেউ বলে সেটা দুর্ঘটনা, কেউ বলে ইচ্ছাকৃত। কিন্তু সেই আগুনেই রণজিত মারা যায়। চামেলী বেঁচে যায়, কিন্তু তার আত্মা আটকে থাকে সেই বাংলোতে।”
আমি থামলাম একটু, তারপর আস্তে বললাম, “আমি গিয়েছিলাম সেখানে। সেই বাংলোয়। আমি দেখেছি চামেলীকে, আমি শুনেছি তার কণ্ঠস্বর। সে চেয়েছিল মুক্তি, আমি তাকে দিয়েছি। চিঠিগুলো, যা রণজিত লিখেছিল, আমি সেইসব ভাসিয়ে দিয়েছি নদীতে। তারপর সে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু আমি বদলে গেছি, ঈরা। আমি বুঝেছি, ভালোবাসা শুধু সঙ্গে থাকার নাম নয়—ভালোবাসা হচ্ছে, না থাকতে পারার ব্যথা নিয়েও অপেক্ষা করা।”
ঈরা কিছুক্ষণ কিছু বলল না। তারপর ধীরে বলে উঠল, “তুমি গল্পটা বললে, আমি অনুভব করলাম। যেন আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তোমার ঠিক পেছনে, সেই আমগাছের নিচে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি চামেলীর চোখ, আর রণজিতের চিঠি।”
আমি তাকিয়ে বললাম, “তুমি বিশ্বাস করছ?”
সে হেসে বলল, “বিশ্বাস না করলে কি আমি শুনতাম এভাবে? আমার কাছে গল্প আর বাস্তবের ফারাক খুব পাতলা। আর তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝে নিয়েছি—এটা গল্প নয়, এটা এক প্রেতাত্মার শেষ দৃষ্টির মতো সত্য।”
আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। ঈরা বলল, “তুমি কী করছো এখন?”
আমি বললাম, “আসলে জানি না। অফিস চলছে ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে থাকে সাদা শাড়ির মধ্যে, এক পুরনো কাঠের জানলার ধারে। আমি বুঝতে পারছি, আমি কোনো জগতেই পুরোপুরি নেই।”
সে বলল, “তুমি আবার সেখানে যাবে?”
আমি বললাম, “ভেবেছিলাম আর যাব না। কিন্তু সেই বাংলোতে কিছু ফেলে এসেছি।”
“কি?”
“নিজেকে। সেই আমি, যে নির্লিপ্ত আর একঘেয়ে ছিল, সে এখন আর নেই। আমি বদলেছি।”
ঈরা মৃদু হেসে বলল, “তবে যাও। কিন্তু এবার আমি যাব তোমার সঙ্গে। তুমি একা শুনেছ গল্পটা, এবার আমিও শুনতে চাই, সেই জায়গা থেকে। হয়তো চামেলীর মত আরও অনেক অজানা গল্প পাহাড়ে অপেক্ষা করছে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুমি সত্যিই আমার সঙ্গে যাবে?”
সে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, কারণ আমি ভয় পাই না অতীতকে। বরং অতীত না থাকলে আমরা আজকের মানুষ হয়ে উঠি কীভাবে?”
সেদিন আমরা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। আকাশে তখন জ্যোৎস্না, হাওয়ায় কেমন এক ছায়ামাখা গন্ধ। ঈরা আমার পাশে হেঁটে চলেছে—নির্ভার, আত্মবিশ্বাসী, আর সাহসী। আমি জানি, সে পাশে থাকলে আমি আর ভয় পাব না সেই পুরনো দেওয়াল, না পাওয়ার কান্না, কিংবা নিঃশব্দ চুড়ির আওয়াজকে।
চামেলী মেমসাহেবের গল্প শেষ হয়নি। সে নতুন পাঠকের জন্য অপেক্ষা করছে, আবার সেই বাংলোয়, সেই আমগাছের নিচে।
পর্ব ৮
ট্রেন পাহাড়ের দিকে ছুটছে, জানলার বাইরে ঘন সবুজ বনের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সূর্যের আলো। ঈরা আমার পাশেই বসে। এক হাতে তার কফির কাপ, অন্য হাতে ধরা মোবাইলে খুলে রাখা একটা পিডিএফ—ভাসান সিংহের ‘Ghost Stories from Bengal’। মাঝে মাঝে সে চোখ তুলে তাকায় বাইরে, কখনও আমার দিকে। তার মুখে আতঙ্ক নেই, বরং কৌতূহলের সেই সপ্রতিভ আলোটা টের পাই, যা একসময় আমার মধ্যেও ছিল—সেই প্রথমদিন যখন আমি চামেলী মেমসাহেবের বাংলোয় পৌঁছেছিলাম।
“তুমি জানো, আমি স্বপ্নে এক জিনিস বারবার দেখি,” হঠাৎ ঈরা বলে উঠল।
“কি?”
“একটা ঘর। জানলায় পর্দা দুলছে, আর একটা চেয়ার… দুলছে না, কিন্তু তার ছায়া দুলছে। কেউ যেন ঠিক এসে বসে না, আবার ঠিক চলে যায় না।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমার বুকের ভিতর একসাথে কাঁপছে সত্যি আর অনুমান। “সেই ঘরটা কি তোমার জানা কোনো ঘর?”
সে মাথা নাড়ল, “না, কিন্তু জানি, আমি সেখানে ছিলাম কোনো এক জন্মে।”
ট্রেন থেমে গেল পাহাড়ঘেরা ছোট্ট এক স্টেশনে। নামতে নামতে মনে হল, সময় যেন আবার পিছনদিকে চলতে শুরু করেছে। চারপাশের দৃশ্য একই, কিন্তু তার মধ্যে আজ একটা সঙ্গী। সেই একাকীত্বটা নেই—যেটা নিয়েই আমি প্রথমবার এসেছিলাম বাংলোয়।
ট্যাক্সি আমাদের নিয়ে চলল কাঁচা রাস্তায়, বনের পাশ ঘেঁষে। মাঝে মাঝে ঈরা চুপ করে থাকে, মাঝে মাঝে বলে ওঠে, “এখানে গাছগুলো যেন কথা বলে। কেমন করে হাওয়ার দোলায় তারা একে অপরকে ইশারা করে।”
আমি জানি, ঈরা উপলব্ধির মানুষ। সে অনুভব করতে জানে, এবং অতীতের ছায়ার ভিতর দিয়ে হাঁটার সাহস রাখে।
শেষ বাঁক ঘুরতেই দেখা গেল বাংলোটা। এখনও একই রকম, তবে জানলার শিকগুলো একটু বেশি কালচে হয়ে গেছে। বারান্দায় রাখা দোলনা চেয়ারটা আজও আছে, আর পেছনের আমগাছটা এখনও দাঁড়িয়ে—অন্ধকারে মুখ গুঁজে থাকা এক সাক্ষীর মত।
ঈরা নেমেই বলল, “আমি অনুভব করতে পারছি এই জায়গা। যেন কেউ আমাদের দেখে যাচ্ছে।”
আমি বললাম, “হয়ত দেখে যাচ্ছে না, বরং ডাকছে।”
চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললাম। বাতাসের ধাক্কায় একটা পর্দা উড়ল, আর একটা পুরনো গোলাপি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। ঈরা ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে ঢুকল। “এই ঘরটার মধ্যেই কি চামেলীর চিঠিগুলো ছিল?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ। ঠিক এই কোণেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম রণজিতের চিঠিগুলোর বাক্স।”
ঈরা হঠাৎ ঘরের কোণে একটা কিছু দেখতে পেল—একটা পুরনো আয়না, ধুলোয় ঢাকা। সে এগিয়ে গেল ওর দিকে। “এই আয়নাটা কি আগে ছিল?”
আমি ভাবলাম—হ্যাঁ, ছিল। কিন্তু আগেরবার এভাবে চোখে পড়েনি।
ঈরা হাত দিয়ে ধুলো মুছে দিলে আয়নায় তার মুখ দেখা গেল—তবে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার প্রতিচ্ছবি ছিল না।
সে হঠাৎ চমকে উঠল। “তোমার প্রতিচ্ছবি নেই, অর্ণব!”
আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, আমিও তাকালাম আয়নায়। সত্যিই, আয়নায় শুধু ঈরার মুখ, কিন্তু আমার কিছু নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে, আয়নার ভিতর দিয়ে একটা মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এল—“তোমরা ফিরে এসেছো?”
আমি চমকে উঠলাম। ঈরা দাঁড়িয়ে রইল নির্ভার, কিন্তু তার চোখে ধীরে ধীরে ভেসে উঠছিল জল। সে ফিসফিস করে বলল, “চামেলী… তুমি কি এখনও এখানে?”
আয়নার ভিতর যেন এক আবছা মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠল। চুল বাঁধা, ঠোঁটে হালকা লাল ছোঁয়া, চোখে অপার বিষাদ।
চামেলীর কণ্ঠে ভেসে এল, “তোমরা এসেছো সত্যি… আমার আর একটা শেষ কথা ছিল, যা আমি বলিনি।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি এখনও আটকে আছো?”
সে বলল, “রণজিত মুক্ত, আমি না। কারণ আমি বলিনি… আমি নিজেই ভালোবেসে ছিলাম, আমি নিজেই চেয়েছিলাম পালাতে। কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম সমাজকে, লোকজনকে, আর নিজের সাহসহীনতাকে। আমি তাকে ঠকিয়েছিলাম, নিজেকেও।”
ঈরা ধীরে ধীরে বলল, “তুমি বলো চামেলী, এই আয়নার ভিতর থেকেও, আমরা শুনছি।”
চামেলীর ছায়া যেন ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল। “তোমরা যদি পারো, আমার হয়ে এই সত্যটা লিখে রাখো কোথাও—যেন কেউ জানে, আমি ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু সাহস পাইনি।”
তারপর হঠাৎ আয়নার কাচে ফাটল ধরল। শব্দ হল না, কেবল আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের কোণে। আর আয়নার ভিতরটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল।
ঈরা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “চলো, এবার লিখে যাই ওর জন্য। ওর সত্যি কেউ জানত না। এখন জানবে।”
আমি বললাম, “লিখব। গল্পটা আর আমার একার নয় এখন, আমাদের দুজনের।”
আমরা জানি, চামেলী এখন মুক্ত নয়, কিন্তু সত্য উচ্চারণের পথে সে এগোচ্ছে।
পর্ব ৯
সন্ধে নেমেছে। পাহাড়ি বাতাসে আজ একটু বেশি শব্দ, যেন গাছেরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে। বাংলোর ভিতর ছোট কাঠের টেবিলের ওপর রাখা আছে একটা পুরনো খাতা, দাদুর ছোঁয়া লেগে থাকা কলম আর মোমবাতির আলো। এই টেবিলেই বসেছি আমি আর ঈরা—একসঙ্গে লিখব সেই গল্প, যেটা এতদিন ছিল নিঃশব্দ।
চামেলীর আত্মা সেই আয়নার ফাঁক দিয়ে বলেছিল—”তোমরা লিখো, আমি ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম।” এই স্বীকারোক্তিটা শুধুই তার মুক্তির জন্য নয়, এ যেন বহু চুপ থাকা হৃদয়ের মূখর প্রতিধ্বনি। আমরা ঠিক করলাম, কোনও অতিপ্রাকৃত রূপে নয়, কোনও ‘ghost story’ হিসাবে নয়, চামেলীর গল্প লিখব একজন মানুষের গল্প হিসাবে—যার সাহস হয়নি, কিন্তু তার ভালোবাসা সত্য ছিল।
ঈরা প্রথম লাইনটা লিখল—
“১৯৪৬ সালের এক পাহাড়ি সন্ধ্যায়, একজন যুবতী বাংলা মেয়ের চোখে ছিল এমন এক ভালোবাসা, যা বলার সাহস সে পায়নি। সে ছিল চামেলী। সমাজ তাকে বলেছিল ‘মেমসাহেব’, কিন্তু তার মন তো বাঁধা ছিল মেঠো কবিতায়, আকাশ ছোঁয়া ইচ্ছেতে, আর রণজিত নামের এক শিক্ষকের গোপন ভালোবাসায়।”
আমি ওর লেখার পাশে বসে ভাবছিলাম, এই ঘর, এই জানলা, এই শব্দগুলো সব সাক্ষী হয়েছিল সেই মুহূর্তের। চামেলী শুধু ভালোবেসে গিয়েছিল, রণজিত শুধু অপেক্ষা করে গিয়েছিল। আর আগুনে পুড়ে যা হারিয়ে গিয়েছিল, তা শুধু শরীর নয়, একটি অসমাপ্ত কবিতা।
আমিও লিখতে শুরু করলাম—
“তুমি যদি পড়ে থাকো এই লেখা, তবে জেনে রেখো, চামেলী মেমসাহেব কোনও ভৌতিক চরিত্র ছিল না। সে ছিল এক সাহসহীন ভালোবাসা। সে তার অনুভূতিকে লুকিয়ে রেখেছিল শাড়ির ভাঁজে, চুলের খোঁপায়, আর ডায়েরির পাতায়। সে হেনরিকে ভয় পেত, সমাজকে ভয় পেত, কিন্তু রণজিতকে নয়। তবু সে রণজিতের হাত ধরতে পারেনি। তাই তার আত্মা আজও বাংলোর জানলায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।”
ঈরা থামল, বলল, “তুমি জানো, আমি ছোটবেলায় একবার আমার বাবার কাছে জোর করে বলে ফেলেছিলাম যে আমি গান শিখতে চাই। বাবা তখন বিরক্ত হয়েছিল, বলেছিল—‘এসব শখ দিয়ে কী হবে?’ তারপর আমি আর কখনো কিছু চাইনি। সেই ভয়, সেই ‘না’-টা আমাকে আজও থামিয়ে রাখে। চামেলীর গল্প বলতে গিয়ে মনে হল, আমিও তো একটা সাহসহীনতা বয়ে বেড়াচ্ছি।”
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। ঈরা শান্তভাবে লিখে যাচ্ছিল চামেলীর গল্প, যেন নিজেকেই রিলিজ করছে তার ভেতরের শিকল থেকে। আমাদের লেখা চলতে থাকল—পাতার পর পাতা। এক জায়গায় আমি লিখলাম—
“যে রাতে আগুন লেগেছিল, চামেলী ভেবেছিল সব পুড়িয়ে ফেললে সে মুক্তি পাবে। কিন্তু সে জানত না, ভালোবাসা একবার শিকড় ছড়িয়ে দিলে তা আগুনেও মরে না। রণজিতের চিঠিগুলো তার কাছে প্রমাণ ছিল না, প্রতীক্ষা ছিল। সেই প্রতীক্ষাই আমি অর্ণব, এক সময়ের শহুরে কর্পোরেট মানুষ, বহন করে নিয়ে এসেছি এই বাংলোয়। আর আজ ঈরা ও আমি একসাথে এই পাণ্ডুলিপি লিখে চলেছি, যাতে চামেলীর আত্মা শুধু একটা কাহিনি না হয়ে ওঠে—সে হয়ে উঠুক একটা ভাষা, সাহসের ভাষা।”
মোমবাতির আলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। খাতার শেষ পাতায় ঈরা লিখল—
“আজ আমরা বাংলো ছাড়ব। কিন্তু ফেলে যাচ্ছি এই লেখা, এই দলিল। কেউ যদি এখানে আসে আর খুঁজে পায় এই কাগজগুলো, তবে জেনে নেবে—ভালোবাসা কখনও ভূত হয়ে থেকে যায় না, ভালোবাসা শুধু তার সত্য না বলার দুঃখে ছায়া হয়ে বেঁচে থাকে।”
রাত তখন দুটো। আমরা খাতা বন্ধ করলাম। ঈরা বলল, “এখন কোথায় রাখব?”
আমি বললাম, “যেখানে দাদুর পুরনো ট্রাঙ্ক ছিল, ঠিক তার নিচে।”
ট্রাঙ্কটা সরিয়ে ভিতরে আমরা রেখে দিলাম সেই লেখা। তারপর দুজনেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম বারান্দায়। দোলনা চেয়ারে হাওয়ার দোল, দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে যেন কারো চোখের ইঙ্গিত। আমি বললাম, “ও এখন শান্ত। এবার সত্যটা বলা হল।”
ঈরা বলল, “হ্যাঁ, এবার আমরা ফিরতে পারি। এবার এই বাংলো আসলে একটা বন্ধ খাতা নয়—এটা এক লেখা হয়ে গেছে, যা কেউ না কেউ একদিন পড়ে নেবে।”
চামেলী মেমসাহেব, তোমার গল্প আমরা বলে দিয়েছি। তুমি নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারো।
পর্ব ১০
কলকাতায় ফিরে এসেছি প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল। শহরের চেনা রাস্তাগুলো এখন আর আগের মতো মনে হয় না—রবিবার দুপুরের ভিড়ে ট্রাম থেমে থাকে যেমন, তেমনই আমার ভেতরের একটা অংশও কোথায় যেন থেমে গেছে। অফিসের কাজ চলছে, ক্লায়েন্ট মিটিং, রিপোর্ট, প্রেজেন্টেশন—সবই আছে। কিন্তু মনটা পড়ে থাকে পাহাড়ের কোলে, সেই পুরনো বাংলোর এক ছোট টেবিল আর কাঠের জানলার ধারে, যেখানে আমি আর ঈরা একসঙ্গে লিখে গিয়েছিলাম এক প্রেতাত্মার মুক্তির ইতিহাস।
ঈরার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে নিয়মিত, তবে দেখা হয়নি ফেরার পর। ও নিজেও নিজের কাজে ডুবে গেছে—কোনো ম্যাগাজিনের জন্য নতুন একটি সিরিজ লিখছে, শুনলাম ‘Unheard Women’ নামে। আমি জানি, সেই সিরিজে কোথাও না কোথাও ঢুকে পড়বে চামেলীর ছায়া—সেই মুখ, যেটা এখন আর ভূত নয়, বরং এক নারীভয়ের প্রতিচ্ছবি।
একদিন হঠাৎ ঈরা আমায় মেসেজ করল—“তোমার অফিসের কাছের ক্যাফেতে আজ সন্ধে ছ’টায়, পারবে?”
আমি লিখলাম, “হ্যাঁ, আসছি। সঙ্গে থাকবে একটা নতুন গল্প।”
সন্ধেবেলা ছুটে গেলাম ক্যাফেতে। ও আগে থেকেই বসে ছিল জানলার ধারে, ঠিক সেই টেবিলে যেখানে আমরা প্রথম গল্পটা শুরু করেছিলাম। দুজনে মুখোমুখি হয়ে বসতেই ঈরা বলল, “তুমি কি জানো, আমি রাতে এখন আর সেই ঘরটার স্বপ্ন দেখি না?”
আমি অবাক হলাম। “সেই চেয়ারটা আর দুলে না?”
সে হেসে বলল, “না, এখন দেখি এক রোদেলা উঠোন, যেখানে একটা মেয়ে খোলা চুলে বই পড়ছে। হয়ত চামেলী নয়, আমি নিজেই।”
চা এল। আমি বললাম, “আমিও এখন কাজের ফাঁকে খাতার পাতায় কিছু লিখি। তোমার লেখা আমাকে সাহস দিয়েছে, আর চামেলীর গল্প আমাকে সত্যিকারের অনুভবের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।”
ঈরা বলল, “তুমি জানো, আমার মনে হয় কিছু গল্প আমাদেরই খুঁজে নেয়। আমরা শুধু মাধ্যম। তুমি যদি না যেতে সেই বাংলোয়, আমি যদি না শুনতাম সেই আয়নার কথা—তবে চামেলী কি কখনও মুক্তি পেত?”
আমি মাথা নাড়ি। “না, পেত না। হয়ত আরেকজনকে আবার বছর দশেক পর যেতে হত, আর আবার শুরু হত প্রতীক্ষা।”
ঈরা পকেট থেকে একটা সাদা খাম বের করল। “এইটা পড়ো,” বলে আমার দিকে এগিয়ে দিল। খুলে দেখি, সেখানে লেখা—
“প্রিয় ঈরা ও অর্ণব,
আপনাদের লেখা পাওয়া গেল আমার দাদুর পুরনো বাংলো ঘরে। আমি স্থানীয় গ্রামেরই বাসিন্দা, কিন্তু চায়ের দোকান চালাই বলে মাঝে মাঝে পর্যটকদের সঙ্গে আলাপ হয়। একদিন এক বাঙালি দম্পতি এসে বললেন, এই বাংলোতে এক চামেলী মেমসাহেব ছিলেন, তাঁর গল্প কেউ জানে না। আমি তখন অবিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু এক সন্ধ্যায়, ঝড়ের রাতে হঠাৎ সেই বাংলোয় গিয়েছিলাম—তখনই খুঁজে পাই সেই দলিলখাতা। পড়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। এরপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাংলোটা নতুন করে সাজাব। তার এক ঘর থাকবে ‘চামেলীর ঘর’ নামে। যেখানে থাকবে সেই লেখা, সেই আয়না, আর এক কোণে থাকবে একটা দুলনা চেয়ার। যেন কেউ যদি ভালোবেসে থাকে, সাহস করতে না পারে, তবে সে এসে বসুক সেখানে—আর ভাবুক, ‘এবার আমি বলব’।”
আমি খামটা বন্ধ করলাম। চোখে জল। ঈরা ধীরে বলল, “তুমি বুঝতে পারছো, চামেলী শুধু এক জন নয়। সে আমাদের মতো অনেকের ভিতরে আছে। যারা ভালোবাসে, কিন্তু বলে না। যারা প্রতীক্ষা করে, কিন্তু এগোয় না। এখন সেই বাংলো শুধু তারই আশ্রয় নয়, আমাদের সবার।”
আমি হাত বাড়িয়ে ঈরার হাতে হাত রাখলাম। সে তাকিয়ে রইল, চোখে শান্তি। আমি বললাম, “তবে চল এবার নতুন গল্প শুরু করি?”
ঈরা বলল, “হ্যাঁ। তবে এইবার গল্পটা আমাদের। যেখানে ভূত নেই, শুধু মানুষ আছে।”
সেদিন ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, হঠাৎ হালকা হাওয়া বইল। জানলার কাচে বাজল এক টুকরো পাতার আঘাত। যেন দূর পাহাড়ের এক মেয়ে বলল—“ভালো থেকো।”
আমরা হাঁটতে থাকি শহরের আলোর মাঝে।
চামেলী মেমসাহেবের গল্প ফুরোলো, কিন্তু আমাদের পথ রইল।
সমাপ্ত


