Bangla - তন্ত্র - রহস্য গল্প

চামুণ্ডার রাত

Spread the love

বিভাস চট্টোপাধ্যায়


অধ্যায় ১

চন্দ্রকেতুগড়—এক নামই যেন রহস্যে মোড়া। সেই নাম শুনলেই মাথায় ভেসে ওঠে ধুলোমলিন প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাঠ, ঢিপির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার ছায়া, আর তারই মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা শ্মশানঘেরা এক পরিত্যক্ত মন্দির, যার নাম কেউ মুখে আনে না। ঠিক সেই জায়গাতেই এক বিকেলের শেষপ্রহরে এসে পৌঁছালেন ড. তীর্থজিত্‍ ঘোষ। ধুলোমাখা জিপগাড়ি থেকে নেমে তিনি চারপাশটা নিরীক্ষণ করলেন—উত্তরে মেঘে ঢাকা বনাঞ্চল, দক্ষিণে বিস্তীর্ণ পতিতভূমি, মাঝখানে পাথরে গড়া রাস্তা যেখানে দু’পাশে গা ছমছমে নীরবতা। তাঁর সঙ্গে আছে সহকারী বিজন বিশ্বাস, পঞ্চাশোর্ধ্ব ক্যামেরাম্যান, যার চোখে মিশ্রণ রয়েছে ভয় আর উত্তেজনার। এ অঞ্চল নিয়ে বহু কিংবদন্তি রয়েছে, কিন্তু তীর্থজিত্‍ তাদের একজন নন যিনি কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন। বরং রহস্যের গভীরে ডুব দিয়েই তিনি সত্যকে প্রকাশ্যে আনতে ভালোবাসেন। গ্রামের মোড়ল পঞ্চাননবাবু তাঁদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, “দাদা, শ্মশানঘাটের দিকে রাতে যাবেন না… ওখানে আজও পূর্ণিমা রাতে শোনা যায় কান্না আর কাঁসর বাজনার শব্দ।” তীর্থজিত্‍ হেসেছিলেন, “গ্রামবাংলায় অলৌকিক আর ইতিহাসের ফারাক অনেক… আমি সত্য খুঁজতে এসেছি।”

তীর্থজিত্‍ আশ্রয় নেন কুমুদিনীর বাড়িতে—এক পুরনো ইঁটের দোতলা, যার বারান্দায় কুঁচকে যাওয়া বেলপাতা আর গন্ধরাজের গাছ বাতাসে দুলছে। কুমুদিনী, রুক্ষচুল, কপালে কালি তিলক, চোখে এক অদ্ভুত উদাসীনতা নিয়ে তীর্থজিত্‍কে দেখে বলল, “আপনি খুঁজছেন চামুণ্ডাকে, তাই তো?” প্রশ্নটা শুনে তীর্থজিত্‍ থমকে যান। “আমি এসেছি মূর্তির নিচে খনন করতে। শুনেছি এক পুরনো তাম্রলিপি সেখানে লুকানো,” জবাব দেন তিনি। কিন্তু কুমুদিনীর হাসি ছিল অস্বস্তিকর। “চামুণ্ডা নিজে যা গোপন রেখেছে, তা মানুষের খোঁজে প্রকাশ পায় না। রক্ত ছাড়া সে জাগে না,” বলে চলে যায় ঘরের ভেতর। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় তীর্থজিত্‍ শ্মশানের পথে হাঁটতে বের হন। গায়ে হালকা শীত, বাতাসে পোড়া কাঠের গন্ধ। শ্মশানঘাটের ধারে দাঁড়িয়ে দেখা যায় দূরে ধ্বংসাবশেষের মাঝে একটি কালো পাথরের মূর্তি—ছোট, কিন্তু তার ভঙ্গিমায় ভয়াল কিছু আছে। বিজন ক্যামেরা তুলতেই মূর্তির পেছনে হঠাৎ এক ছায়ামূর্তি দেখতে পান, কিন্তু মুহূর্তেই তা মিলিয়ে যায়। “স্যার… কেউ যেন দেখল মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে,” বিজনের গলা কেঁপে ওঠে। কিন্তু তীর্থজিত্‍ বলেন, “অন্ধকারে ভুল দেখা, বিজন… কাল সকাল থেকে খনন শুরু হবে।” সেই রাতেই প্রথম, বাড়ি ফিরে তীর্থজিত্‍ ঘুমোতে গিয়ে স্বপ্নে দেখেন—এক নারী, মুখ ঢাকা, পেছনে রক্তে রাঙানো বেদি, আর তার কণ্ঠে গর্জন, “ফিরে যা… রক্ত না দিলে আমায় ডেকো না।” ঘাম ভেজা শরীরে হঠাৎ জেগে উঠে দেখেন দরজা আধখোলা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে কুমুদিনী।

পরদিন ভোরে খনন শুরু হয়। তীর্থজিত্‍, বিজন, ও কয়েকজন গ্রামবাসীর সহায়তায় চামুণ্ডা মূর্তির চারপাশের মাটি খোঁড়া হয়। তিন ফুট নিচে পাওয়া যায় এক গোলাকার পাথরের কাঠামো—মনে হয় যেন বলির বেদি। বিজন ভিডিও করতে করতে বলে, “স্যার, এটা কি মানুষের বলির পাথর?” তীর্থজিত্‍ কিছু বলেন না, কিন্তু বেদির মাঝখানে পাওয়া এক কালো রঙা তাম্রপত্র তার চোখে বিস্ময় জাগায়। তাতে উৎকীর্ণ কয়েকটি সংস্কৃত শ্লোক: “পূর্ণিমার রক্তে চক্র জাগে, চামুণ্ডার কণ্ঠে বাঁচে রক্তনাথ।” “রক্তনাথ কে?” বিজন জিজ্ঞেস করে। তীর্থজিত্‍ চুপচাপ বেদির দিকে তাকিয়ে থাকেন, যেন শূন্যতা তাঁকে গিলে নিচ্ছে। সন্ধ্যায় রতনচন্দ্র পুরোহিত এসে বলেন, “আপনি যা খুঁড়ছেন, তা এক অভিশপ্ত ইতিহাস। রক্তনাথ ছিলেন এই মূর্তির উপাসক, একজন তান্ত্রিক, যিনি শতাধিক বছর আগে এখানেই বলি দিতেন—মানব বলি। গ্রামবাসীরা তাকে পাথরের নিচে জীবন্ত পুঁতে দেয়। তারপর থেকেই প্রতি পূর্ণিমায় তার আত্মা ফিরে আসে।” তীর্থজিত্‍ মাথা নেড়ে বলেন, “তবে সময় এসেছে ইতিহাসকে আরেকবার মুখোমুখি হবার।” রতনচন্দ্র গভীর গলায় বলেন, “কিন্তু ইতিহাসে সব সময় যুক্তির জয় হয় না, ডক্টরবাবু… চামুণ্ডার রাত আসছে।”

অধ্যায় ২

চন্দ্রকেতুগড়ের বাতাস যেন দিনে দিনে ভারী হয়ে উঠছিল। মন্দিরের চারপাশে খোঁড়াখুঁড়ি চলছিল, কিন্তু জায়গাটা যেন নিজেকে খুলতে চাইছিল না। দ্বিতীয় দিনের সকালে বিজনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে অদ্ভুত শব্দ—রাত্রির নিস্তব্ধতায় রেকর্ডারে উঠে আসে সিঁড়ি বেয়ে নামার শব্দ, কারো গলায় অজানা ভাষার মন্ত্রোচ্চারণ। অথচ রাতভর শ্মশানে কেউ ছিল না। ড. তীর্থজিত্‍ দুপুরে সেই শব্দ বিশ্লেষণ করে এক সংস্কৃত পণ্ডিতকে পাঠান, যিনি জানান, “এটা অতি পুরাতন বৈদিক ধ্বনি, যার সঙ্গে কোনো চামুণ্ডা স্তোত্রের সাদৃশ্য রয়েছে।” সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে, আকাশে দেখা দেয় অর্ধেক চাঁদ—পঞ্চমী তিথি। কুমুদিনী সেই রাতে এক গাঁদা ফুল ও গন্ধরাজ নিয়ে হাজির হয় তীর্থজিত্‍দের ক্যাম্পে। “মূর্তির সামনে এগুলো রাখুন,” বলে দেয় সে। তীর্থজিত্‍ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি বলেছিলে চামুণ্ডা রক্ত চায়। ফুলে কী হবে?” কুমুদিনীর চোখ স্থির, “রক্ত সে পূর্ণিমায় চায়, তার আগে তাকে স্নিগ্ধতা দিতে হয়। না হলে সে তাড়াহুড়ো করে জেগে উঠে।” কথাটা ঠাট্টা মনে হলেও কুমুদিনীর কণ্ঠে এমন একটা মিশ্র আবেগ ছিল—ভয় আর শ্রদ্ধার মাঝে—যা তীর্থজিত্‍কে থমকে দেয়। বিজন বলে, “স্যার, কাল যদি মন্দ কিছু হয়…?” তীর্থজিত্‍ হেসে ওঠেন, “আমরা গবেষক, ভীতু নই।” কিন্তু তার নিজের মধ্যেই যেন কোনো অজানা গুঞ্জন বেজে উঠছিল।

তৃতীয় দিন সকালে, এক বালক এসে তীর্থজিত্‍কে জানায়—গ্রামের এক বৃদ্ধা ভোররাতে চামুণ্ডা মূর্তির সামনে কিছু একটার পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছেন। ঘটনাটা জানার পর তীর্থজিত্‍ ও বিজন ছুটে যান সেই জায়গায়। মূর্তির সামনে গরম ছাইয়ের মতো কিছু পড়ে ছিল, আর চারপাশে অদ্ভুত গোলচিহ্ন। সেই চিহ্ন যেন খোদাই করা, অথচ সকালে এসে দেখা যায়, কেউ তা মুছে ফেলেছে। বিজন ফিসফিস করে বলে, “এটা চক্র নয় তো?” তীর্থজিত্‍ মাথা নেড়ে বলেন, “হ্যাঁ… এটা সেই চক্র যা চামুণ্ডা সাধনায় ব্যবহৃত হত।” সন্ধ্যেবেলা, ক্যাম্পে ফিরে তাঁরা দেখে, খননস্থলের চারপাশে কেউ যেন মাটিতে ছোট ছোট লাল কাপড় পুঁতে রেখে গেছে—সবগুলোয় তিলক আঁকা। রতনচন্দ্র এসে দেখে বলেন, “এটা প্রতিরোধ। গ্রামের কেউ চাইছে তোমরা কাজ বন্ধ করো। ওরা ভয় পাচ্ছে চক্র জাগ্রত হবে।” সেই রাতে বিজন আরও অস্থির হয়ে ওঠে। সে বলে, “স্যার, মূর্তিটার চারপাশে ক্যামেরা বসানো দরকার। আমি আজ রাতে সজাগ থাকব।” তীর্থজিত্‍ সম্মত হন। রাত গভীর হতেই ক্যাম্পে নামল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বিজন মাটিতে বসে আছে, আর দূরে কোথাও শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁর একটানা ডাক। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, হঠাৎ ক্যামেরা নিজে থেকে রেকর্ড শুরু করে। মূর্তির পেছনে হালকা ধোঁয়ার মতো কিছুর আনাগোনা, আর তার মধ্যেই এক গলা—নারী না পুরুষ বোঝা যায় না—বলছে, “অবাধ্য হলে মৃত্যু… চক্র জাগছে… পূর্ণিমা আসছে।”

সকালবেলা ক্যামেরা ফুটেজ দেখে তীর্থজিত্‍ প্রথমবার ভয় পান। ফুটেজে দেখা যায়, মূর্তির ঠিক পেছনে অন্ধকারের মধ্যে এক মুখ—চোখহীন, চুল উড়ছে বাতাসে, যেন মাটির নীচ থেকে উথলে উঠছে কেউ। কুমুদিনী যখন সেটি দেখে, সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ও ফিরে আসছে, ডক্টরবাবু। রক্তনাথ জেগে উঠছে।” তীর্থজিত্‍ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কী জানো?” কুমুদিনী ধীরে বলে, “আমার ঠাকুর্দা ছিলেন রক্তনাথের শেষ শিষ্য। আমি বড় হয়েছি এই ভয় নিয়ে—একদিন কোনো বহিরাগত এসে ওকে আবার জাগাবে। আর তখনই শুরু হবে রক্তপিপাসার পূর্ণিমা।” তীর্থজিত্‍ এবার আর কিছু বলেন না। তিনি শুধু পূর্ণিমার তারিখটা নিজের ডায়েরিতে লিখে রাখেন—আর মাত্র তিনদিন। তার নিজের বিশ্বাস, যুক্তিবাদ দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা সম্ভব, কিন্তু চন্দ্রকেতুগড় যেন দিনে দিনে তাকে যুক্তির বাইরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পূর্ণিমা আসছে, বাতাসের শব্দও যেন বদলে যাচ্ছে, আর সেই শ্মশানের ভিতরে—কেউ কি অপেক্ষা করছে?

অধ্যায় ৩

পূর্ণিমার ঠিক দু’দিন আগে চন্দ্রকেতুগড় যেন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। দিনের বেলা সব স্বাভাবিক মনে হলেও সন্ধ্যার পরে গ্রামের রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে যেত। কেউ আর বাইরে বেরোত না। পঞ্চাননবাবু নিজেই এসে বলেছিলেন, “ডক্টরবাবু, আমাদের গ্রামে নিয়ম আছে—পূর্ণিমার আগের তিন রাত শ্মশানে কেউ যায় না। ওই সময় চক্র গরম হতে শুরু করে।” তীর্থজিত্‍ হেসেছিলেন, “গবেষণা থেমে থাকে না।” কিন্তু বিজনের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, সে ততটা আশ্বস্ত নয়। সেই রাতেই তাঁরা শ্মশানের আশপাশে ছয়টি ক্যামেরা বসান—তিনটি মূর্তির চারপাশে, দুটি দক্ষিণ দিকের গাছগাছালিতে, একটি সোজা বেদির দিকে। রাত আটটা থেকে তাঁরা ক্যাম্পে বসে মনিটরের সামনে অপেক্ষা করেন, চারপাশে কেবল ঝিঁঝিঁর ডাক, মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক, আর একটা চাপা শ্বাসরোধ করা নিস্তব্ধতা। রাত একটা বেজে গেল। হঠাৎ ক্যামেরা নম্বর ২—যেটা বেদির পাশে বসানো ছিল—হঠাৎ কেঁপে উঠল। ঝাপসা ফ্রেমের মধ্যে দেখা গেল, একটা ছায়ামূর্তি চক্রের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। বিজন চেঁচিয়ে উঠল, “স্যার দেখছেন! কেউ হাঁটছে—মাটির ওপরে না, যেন একটু উপরে ভেসে!” তীর্থজিত্‍ মনিটরের সামনে এগিয়ে গিয়ে পরিষ্কার দেখতে পেলেন—ছায়ামূর্তি এক পা-দুই পা করে চক্রের চারপাশে ঘুরছে। তারপর থেমে গিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে কী যেন বলছে। কোন শব্দ নেই। শুধু ঠোঁট নড়ছে।

ভোর চারটের দিকে ক্যাম্পে কিছু একটা শব্দ হয়—ক্লিক… ক্লাক… যেন কেউ কাঠের পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তীর্থজিত্‍ ও বিজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মশাল হাতে বেরিয়ে পড়েন। মূর্তির সামনে গিয়ে দেখেন, বেদির ওপর কেউ যেন জল ছিটিয়েছে। তীর্থজিত্‍ নিচু হয়ে দেখে বলেন, “এটা জল নয়… এটা ঘাম… শরীর থেকে নির্গত জল… কিন্তু কেউ ছিল না তো এখানে?” বিজন থমকে গিয়ে বলে, “স্যার, আপনি গন্ধ পাচ্ছেন? এই গন্ধটা যেন পচা গাছের… বা পোড়া শরীরের!” হঠাৎ তাঁদের পিছনে হাওয়ার এক ঘূর্ণি শুরু হয়, যেন বাতাস চিৎকার করছে। তারা দ্রুত ক্যাম্পে ফিরে এসে দেখে, ক্যামেরাগুলো নিজে থেকেই অফ হয়ে গেছে। শুধু ক্যামেরা ৩—যেটা মূর্তির মুখের দিকে তাক করে ছিল—সেটি এখনো চলছিল। সেই ফুটেজে দেখা গেল, মূর্তির চোখ থেকে হালকা ধোঁয়ার রেখা বেরোচ্ছে, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছায়ামূর্তি—যার শরীর অর্ধেক ছিন্ন, আর পেছনে ফড়িংয়ের মতো দুটো হাড়গোড় বেরিয়ে আছে। বিজন শিউরে ওঠে, “ও তো… মানুষ না!” পরদিন সকালে ক্যামেরার ফ্রেমে পাওয়া গেল আরও ভয়ানক কিছু—মূর্তির নিচে মাটি একটু আলগা হয়ে গেছে, আর সেখানে বেরিয়ে আছে একটি মানুষের হাড়। তীর্থজিত্‍ বললেন, “এটা চামুণ্ডা বলির স্থান… এবং এটাই হয়তো সেই রক্তনাথের কবরে রূপান্তরিত হয়েছিল।” তাঁর মনে হল, মৃতরা নাচছে—তাদের নীরব নৃত্য ছায়ার আড়ালে প্রতিদিন আরও এক ধাপ এগোচ্ছে।

বিকেলে কুমুদিনী আসে, মুখ সাদা, চোখ লাল, যেন অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছে। সে বলে, “রক্তনাথ জেগে উঠছে, আমি সেটা জানি। গতরাতে আমি এক স্বপ্নে দেখেছি—চক্রের মাঝে দাঁড়িয়ে সে বলছে, ‘আমার কাজ শেষ হয়নি। পূর্ণিমা এলেই শুরু হবে!’” তীর্থজিত্‍ জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কী করেছিলে?” কুমুদিনী উত্তর দেয় না, শুধু বলে, “আমার রক্তই ছিল শেষ বলি… কিন্তু তখন আমি পালিয়ে যাই… এখন সে আমাকে খুঁজছে।” তার কথা শুনে বিজন বলে, “স্যার, আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। এটা কোনো সাধারণ ইতিহাস নয়।” তীর্থজিত্‍ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, “না, আমি পালাব না। আমরা সত্যের দোরগোড়ায় এসেছি। আর পেছনে ফেরার পথ নেই।” তারপর তিনি চুপচাপ মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকেন, যার চোখদুটি যেন গভীর অন্ধকারে ডুবে থেকে হঠাৎ কাঁপছে। চাঁদ আর একদিনের অপেক্ষায়… আর রক্তনাথের নৃত্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অধ্যায় ৪

সকালে ঘুম ভাঙতেই তীর্থজিত্‍ দেখলেন, বারান্দায় বসে কুমুদিনী একমনে দূরে চেয়ে আছে। তার হাতে একটি পুরনো কাপড়ের পুঁটলি, আর ঠোঁটে যেন একটা বিস্বাদ চুপ। “তুমি ঘুমাওনি?” জিজ্ঞেস করতেই সে মাথা নাড়ে। “ঘুম আসে না, ডক্টরবাবু। অনেক কিছু মনে পড়ে যায়… আমি অনেক কিছু গোপন রেখেছি আপনার থেকে।” তীর্থজিত্‍ ধীরে কাছে গিয়ে বসেন, “আমি জানি তুমি কিছু লুকাচ্ছো, কিন্তু এখন যদি না বলো, তাহলে হয়তো আর বলার সুযোগ থাকবে না।” কুমুদিনী চুপ করে পুঁটলিটা খুলে দেখায়—একটি রক্তমাখা পুরনো রুদ্রাক্ষ মালা, যার কিছু দানা ভাঙা, কিছুতে আঁকা অদ্ভুত চিহ্ন। “এটা আমার ঠাকুর্দার ছিল—শ্রীধর নাথ তান্ত্রিক। তিনি ছিলেন রক্তনাথের প্রধান শিষ্য। সবাই ভাবে গ্রামবাসীরা রক্তনাথকে হত্যা করেছিল। কিন্তু সত্যি হলো—তাঁরা ওঁকে হত্যা করতে পারেনি। ওঁকে বেঁধে রাখা হয়েছিল চক্রের মাঝখানে। আমার ঠাকুর্দা নিজ হাতে ওঁকে রক্ত চক্রে বসিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন।” তীর্থজিত্‍ থমকে যান। “তাহলে সে মারা যায়নি?” কুমুদিনী মাথা নাড়ে, “শরীর মারা যায়… আত্মা নয়। তাঁর আত্মা আটকে ছিল মূর্তির নিচে—চামুণ্ডার চক্রে।”

সে বলতে থাকে, “আমি ছোট ছিলাম। এক পূর্ণিমার রাতে, বাড়ির পেছনের ঘরে হঠাৎ ঠাকুর্দাকে দেখতে পাই, তিনি একটা মাটির পাত্রে নিজে রক্ত দিচ্ছেন… নিজের হাতে। আর বলছেন, ‘ওর রক্ত চাই… ও না ফিরলে চক্র সম্পূর্ণ হবে না।’ আমি ভয়ে ঘর থেকে পালিয়ে যাই। এরপর যতদিন গেছে, ততদিন সেই গলা, সেই মন্ত্র, সেই কান্না আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ঠাকুর্দা মারা যান, কিন্তু সেই রক্তমালা রেখে যান আমার জন্য, আর বলেন, ‘যেদিন ফিরে আসবে কেউ—তখন বুঝবি সময় এসেছে।’ আমি জানতাম কেউ আসবে। আপনি এসেছেন, আপনার ক্যামেরায় ধরা পড়ছে ওর অস্তিত্ব… রক্তনাথ জেগে উঠছে। আমার ভয়, এবার সে চায় আমাকে—কারণ আমি সেই রক্তধারা, যেটা তাকে শেষ করে দিয়েছিল।” তীর্থজিত্‍ তখন বলেন, “তাহলে আমাদের থেমে যাওয়া উচিত?” কিন্তু কুমুদিনীর চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, “না। আমি আর পালাব না। আমি চাই আপনি জানুন সবকিছু। চক্র ভেঙে দিলে ও মুক্ত হবে, কিন্তু যদি ঠিক সময়ে ওকে আবার শৃঙ্খলে না বাঁধা যায়, তাহলে পুরো অঞ্চল অভিশপ্ত হবে।”

তীর্থজিত্‍ এবার গভীরভাবে ভাবেন। “তুমি আমাকে সেই চক্র দেখাতে পারবে?” কুমুদিনী মাথা নাড়ে। “মূর্তির নিচে একটা গুহা আছে। খুব অল্প মানুষ জানে তার অস্তিত্ব। পূর্ণিমার রাতে সেই চক্র একবার উজ্জ্বল হয়। তখন যদি শুদ্ধ রক্তপাত না হয়, তবে রক্তনাথ সম্পূর্ণ শক্তি পাবে।” দুপুরে তীর্থজিত্‍ ও কুমুদিনী গিয়ে খোঁজ করেন সেই গুহা, এবং সত্যিই মূর্তির ডানদিকে একটা অদৃশ্য স্লাব সরিয়ে নিচে নামার পথ খুঁজে পান—একটা সিঁড়ি, যা নিচে অন্ধকারে নেমে যায়। সেই প্রথম তারা দেখে চক্রটিকে—এক বিশাল বৃত্ত, যার কেন্দ্রস্থলে ছাইয়ে ঢাকা পাথর। তার ওপরে ছোট ছোট কাঠির মতো কিছু বসানো, আর চারদিকে রক্তরঙা রেখা। “এই চক্রের মাঝখানে বসিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল রক্তনাথকে। এবং এই জায়গায়ই তাকে বলি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে মরেনি। এই চক্রই তার শয়ান… আবার এই চক্রই তার মুক্তির রাস্তা।” সেই মুহূর্তে যেন গুহার বাতাস কেঁপে ওঠে। কুমুদিনী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, তার গলার স্বর নিচু হয়, “ডক্টরবাবু… আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন। কিন্তু আমি এখানেই থাকব। এইবার আমি পালাব না।” তীর্থজিত্‍ তার দিকে তাকিয়ে বলেন, “তুমি একা নও। আমরা একসঙ্গে এই রাত পার করব।” আর দূরে, গুহার অন্ধকারে, চক্রের কিনার ঘেঁষে কোথাও এক বিন্দু রক্ত পড়ে—একটি পুরনো শৃঙ্খলের কাঁপন যেন অশরীরীভাবে জানান দেয়—পূর্ণিমা আসছে।

অধ্যায় ৫

পূর্ণিমার আগের দিন সকাল থেকেই আকাশ ছিল অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার, অথচ বাতাসে যেন লুকিয়ে ছিল এক চাপা অস্বস্তি। গ্রামের মানুষজন কেউ বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছিল না। ঘরের জানালা বন্ধ, উঠোনে মন্দিরের দিকে মুখ করা কেউ নেই, যেন গোটা গ্রাম নিঃশব্দভাবে অপেক্ষা করছে অদৃশ্য কোনো আতঙ্কের জন্য। কুমুদিনী সকালবেলাতেই শ্মশানঘাটে গিয়ে মূর্তির সামনে বসে পড়ে। তার সামনে ছিল পিতলের থালা, যাতে রাখা ছিল এক মুঠো চাল, নিমপাতা আর লাল সিঁদুর। সে ধীরে ধীরে মন্ত্রপাঠ শুরু করে, আর আশপাশের বাতাস কাঁপতে থাকে কেমন এক অজানা শব্দে—যা শব্দ নয়, কিন্তু স্তব্ধতাকে চিৎকারের মতো ছিন্ন করে। তীর্থজিত্‍ ও বিজন তখন গুহার নিচে নেমে সেই চক্রের মুখোমুখি, যেখানে আগের রাতের রক্তের দাগ শুকিয়ে এক ভয়াল রেখা তৈরি করেছে। তীর্থজিত্‍ নিচু হয়ে চক্রের উপরের এক রত্নচিহ্নে আঙুল ছোঁয়াতেই হঠাৎ শোনা যায় অদ্ভুত গর্জন—মনে হয় যেন মাটির নিচে কেউ কিছু ছিঁড়ে ফেলছে। কুমুদিনী উপরে থেকে চিৎকার করে ওঠে, “চক্র জেগে উঠেছে! সময় শুরু হয়ে গেছে!”

বিকেল নাগাদ আকাশ রক্তিম হয়ে ওঠে। চাঁদ তখনও ওঠেনি, কিন্তু পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবার আগেই মূর্তির চারপাশে একটা কালো কুয়াশার বলয় জমতে শুরু করে। ক্যাম্পের সব যন্ত্র অদ্ভুতভাবে বন্ধ হয়ে যায়—ক্যামেরা, রেকর্ডার, টর্চ—সব এক এক করে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। বিজন বার বার বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। “স্যার, কেউ যেন ইলেকট্রিক ফিল্ড তৈরি করছে আশপাশে… এটা প্রাকৃতিক নয়,” সে ফিসফিস করে বলে। কুমুদিনী তখন ধীরে ধীরে নিজের কপালে রক্তের ফোঁটা এঁকে নেয়—নিজের আঙুল কেটে, ঠোঁট কামড়ে মন্ত্রপাঠ করে। “আমি ওর রক্ত চাই,” কাঁপা গলায় সে বলে। “তুমি পাগল হয়ে গেছো!” তীর্থজিত্‍ এগিয়ে এসে হাত ধরে বাধা দেয়। কুমুদিনীর চোখে তখন এক অন্যমাত্রার গভীরতা, “না, আমি পালাতে পারি না, এই দায় আমার—আমার পূর্বপুরুষদের, আমার শরীরের রক্তে রয়েছে ওর ছায়া। আজ ওকে থামাতে হলে আমাকে বলি দিতেই হবে।” ঠিক তখনই, গুহার ভিতর থেকে শোনা যায় ভারী শ্বাসের আওয়াজ, যেন কেউ জেগে উঠছে দীর্ঘ ঘুম থেকে। চক্রের মাঝখানে ছাই জমে ঘূর্ণি তৈরি হয়, আর তার মধ্য থেকে উঁকি দেয় এক হাত—কঙ্কালের মতো, কিন্তু তার আঙুলে রক্ত লেগে আছে।

তারপর যা ঘটে, তা ছিল বাস্তবের বাইরের কিছু। সেই হাত ধীরে ধীরে পুরো শরীরসহ উঠে আসে চক্রের মাঝখানে—এক দীর্ঘকায় ছায়ামূর্তি, যার মুখে চোখ নেই, কেবল গর্ত, আর সেখান থেকে যেন বাতাস টেনে নেওয়া শব্দ বের হচ্ছে। সে বলে, “তোমরা আবার ডাকলে আমায়… এবার সম্পূর্ণ হবো আমি।” বিজন ভয়ে পেছনে হটে, ক্যামেরা চালাতে গিয়েও কাঁপতে থাকে। তীর্থজিত্‍ স্তব্ধ। কুমুদিনী তখন মাটিতে বসে চক্রের বাইরে এক প্রাচীন তাম্রপত্রে আঁকা মন্ত্রপাঠ শুরু করে। ছায়ামূর্তিটি—রক্তনাথ—চক্রের ধারে এসে থেমে যায়। “আমার রক্ত দরকার… আমার বলি চাই… নয়তো আমি নিজেই নেব।” হঠাৎ করে মূর্তির পাশ থেকে উঠে আসে কালো ধোঁয়ার মেঘ, আর চক্রের বাইরের সব পাথর কাঁপতে শুরু করে। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে কুমুদিনী নিজেকে ছুড়ে দেয় চক্রের ভেতর—তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় শেষ মন্ত্র: “চামুণ্ডে দেবি, রক্ষা কর!” সেই মুহূর্তে গোটা এলাকা কেঁপে ওঠে, চক্র আলোকিত হয়ে ওঠে রক্তরঙে, আর রক্তনাথের আত্মা ছটফট করতে করতে মাটির ভেতর আবার ডুবে যেতে শুরু করে।

তীর্থজিত্‍ ছুটে গিয়ে দেখে, চক্রের মাঝখানে কুমুদিনী পড়ে আছে নিস্তেজ, ঠোঁটে রক্ত, চোখ খোলা কিন্তু অনড়। হাওয়ার গতি থেমে যায়, আকাশ শান্ত হয়ে আসে। পূর্ণিমার চাঁদ তখন ঠিক উপরে, আলো পড়ছে সেই বলির বেদির ওপর, যেখানে এক নারী নিজের পূর্বপুরুষের পাপের শেষ বলি হয়ে শুয়ে আছে। তীর্থজিত্‍ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন, বিজনের চোখে জল। সেই রাতে আর কেউ কিছু বলেনি, শুধু চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে চেয়ে ছিল সেই চক্রের দিকে, যেন শতাব্দী পুরনো কোনো অভিশাপ নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেল—আর তার বিনিময়ে চিরতরে হারিয়ে গেল কুমুদিনীর রক্ত।

অধ্যায় ৬

চাঁদের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। কুমুদিনীর বলিদানের পরে যেন রাতটা অন্যরকম নীরবতায় আবৃত হয়ে পড়ে। বিজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ, তীর্থজিত্‍ মাটির নিচের সেই গুহা থেকে উঠে এসে ঝিম ধরে বসে ছিলেন মূর্তির পাথরের পাশে। কুমুদিনীর নিথর দেহ তখনও রক্তমাখা পাথরে পড়ে ছিল, যেন এক প্রাচীন উৎসর্গের সাক্ষ্য হয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ভোরের আলো ফোটার আগেই তার দেহ মিলিয়ে যায় ধোঁয়ার মতো। তীর্থজিত্‍ এক পলক তাকিয়ে ছিলেন সেই স্থানে, যেখান থেকে একবার কুমুদিনী উঠে এসেছিলেন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য—এখন সেখানে কেবল কিছু লাল গন্ধরাজের পাতা আর রক্তে ভেজা রুদ্রাক্ষের মালা পড়ে আছে। বিজন ধীরে ধীরে বলে ওঠে, “স্যার… ও কোথায় গেল?” তীর্থজিত্‍ কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলেন, “সে চক্রে ফিরে গেছে… ঠিক যেমন রক্তনাথ গিয়েছিল, কিন্তু চক্র কাউকে চিরতরে আটকে রাখে না… এটাই সমস্যা।” ঠিক তখনই, ক্যাম্পের রেকর্ডিং ডিভাইস হঠাৎ করে চালু হয়ে যায় নিজে থেকে, আর তার পর্দায় ভেসে ওঠে এক লাল রেখাচিত্র—চক্রের নিখুঁত নকশা, যার মাঝখানে এবার উজ্জ্বল এক বিন্দু জ্বলছে।

তীর্থজিত্‍ বুঝতে পারেন, কুমুদিনীর আত্মোৎসর্গ রক্তনাথকে থামিয়েছে ঠিকই, কিন্তু চক্র এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে—পুরোপুরি। এটি আর কেবল বন্দিত্ব নয়, এটি এখন এক প্রবেশপথ। তিনি ক্যাম্পের ভেতরে বসে রতনচন্দ্র পুরোহিতের লেখা একটি পুরনো শাস্ত্রপত্র বের করেন, যেখানে লেখা আছে, “যে চক্র একবার জাগে, সে তখন বেছে নেয় নিজের আহুতি। বলি যদি না হয় নিয়মমাফিক, তবে সে নিজেই আহ্বান করে তার পুরনো আত্মাদের।” তাঁর কাঁধে যেন কুমুদিনীর ছায়া বসে আছে, নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে, “আপনার কাজ এখনো শেষ হয়নি।” বিজন তখন মাটির তলায় নামা বন্ধ করে দিতে অনুরোধ জানায়, “স্যার, এটা আর প্রত্নতত্ত্ব নয়… এটা তন্ত্র, এটা জীবন্ত শক্তি, যাকে আপনি যুক্তি দিয়ে থামাতে পারবেন না।” কিন্তু তীর্থজিত্‍ থেমে যাবেন না, কারণ কুমুদিনী বলেছিলেন—“চক্র ভাঙা গেলে, আর কোনো বলির দরকার হবে না।” সেই ভাঙার চাবিকাঠি ছিল সেই তাম্রশাসন, যেটা তীর্থজিত্‍ খুঁজে পেয়েছিলেন দ্বিতীয় দিনে।

পরদিন রাতে, ভোরের ঠিক আগে, তিনি আর বিজন আবার গুহায় নামেন। চক্র এখন আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট, তার রেখাগুলো যেন রক্ত দিয়ে আঁকা হয়েছে, আর মাঝখানের পাথরটা কাঁপছে হালকা শব্দে। হঠাৎই, এক কুয়াশাময় ছায়া গুহার শেষ প্রান্ত থেকে এগিয়ে আসে—এক নারী মূর্তি, চুল খোলা, সাদা শাড়ি, কিন্তু মুখে কোনো স্পষ্ট অবয়ব নেই। বিজন ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসে, “স্যার, ও… ও কুমুদিনী নয় তো?” তীর্থজিত্‍ তখন বলে ওঠেন, “হ্যাঁ, ও ফিরে এসেছে। কারণ চক্র এখন মুক্তি চায়। ওর আত্মা চক্রের ভেতরে গিয়ে আটকে গেছে, কিন্তু সে চায় এই বৃত্ত শেষ হোক।” সেই মুহূর্তে গুহার ছাদ থেকে ধুলো ঝরতে থাকে, চক্রের চারপাশে আগুনের মতো আলো জ্বলে ওঠে। তীর্থজিত্‍ সেই তাম্রশাসনটি তুলে নিয়ে শেষ শ্লোক পাঠ করেন—“যে রক্তে জাগে, সে আলোয় নিবৃত্ত হয়।” আর তখনই সেই নারী মূর্তি হাত বাড়িয়ে চক্রের মাঝখানে চলে যায়, এবং সাথে সাথে সব আলো নিভে যায়। চারদিকে গভীর অন্ধকার।

যখন আলো ফিরে আসে, তখন চক্র আর নেই—শুধু পাথরের খণ্ড, এবং এক শান্ত বাতাস। তীর্থজিত্‍ কাঁপা গলায় বলেন, “চক্র শেষ হয়েছে… আর কেউ বলি দেবে না, আর কোনো রক্তপাত নয়। হয়তো সত্যিই শেষবার কেউ তার নিজের রক্ত দিয়ে অভিশাপ ভাঙল।” তারা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসেন। গুহার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় স্থায়ীভাবে। পরদিন গ্রামের লোকেরা দেখতে পায়, চামুণ্ডা মূর্তির চোখ দুটি বন্ধ হয়ে গেছে—যা এতদিন ছিল ভয়াল খোলা, এখন শান্ত ও সংযত। রতনচন্দ্র বলে ওঠেন, “চামুণ্ডা এবার শান্ত… অভিশাপ শেষ।” কিন্তু তীর্থজিত্‍ জানেন, অভিশাপ শেষ হলেও ইতিহাস শেষ হয়নি। কারণ এই ভূখণ্ড নিজেই এক দীর্ঘ আত্মার নথিপত্র। আর চক্র—চক্র কখনো পুরোপুরি বিলীন হয় না, সে শুধু ঘুমিয়ে পড়ে… অপেক্ষায় থাকে।

অধ্যায় ৭

তিন দিন কেটে গেছে। গুহা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ক্যাম্পও গুটিয়ে আনা হয়েছে অনেকটাই। গ্রাম যেন নতুন আলোয় জেগে উঠছে—বাচ্চারা আবার খেলতে শুরু করেছে, সন্ধ্যাবেলায় মহিলারা উঠোনে বসে পেঁয়াজ কাটছে, আর পঞ্চাননবাবু নিজে এসে তীর্থজিত্‍-বিজনের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আপনারা ইতিহাস বাঁচালেন, বাবু।” কিন্তু তীর্থজিত্‍ জানেন, সবটা এখনও শেষ হয়নি। তাঁর ডায়েরিতে লেখা আছে তিনটি অদ্ভুত লক্ষণ—(১) চক্রের চিহ্ন পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি, (২) কুমুদিনীর আত্মা শান্ত না হয়ে গিয়েছিল চক্রে, আর (৩) তাম্রশাসনে একটি লাইন অসম্পূর্ণ ছিল: “অগ্নি বিনা মুক্তি অসম্ভব।” এই তিনটি দিক মিলিয়ে তাঁর মনে একটাই ভয় ফিরে আসছিল—রক্তনাথ পুরোপুরি ডুবে যায়নি, সে শুধু অপেক্ষা করছে।

চতুর্থ দিনে, বিজন যখন গাড়ি গুছিয়ে কলকাতায় ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ক্যাম্পে ঢুকলেন এক অচেনা লোক—দেখতে আধা বাউল, চোখে ঘুমঘুম, হাতে এক পুরনো কাঠের বাক্স। বললেন, “তীর্থজিত্‍ বাবু, আমার দাদু আপনাদের এক খোঁজ দিতে বলেছিলেন।” বাক্সটা খোলার পর দেখা গেল—একটি ছেঁড়া ছবির টুকরো, তাতে আঁকা সেই চক্র, কিন্তু কেন্দ্রে বসে রয়েছে এক কঙ্কালসদৃশ সন্ন্যাসী। নিচে লেখা একটি লাইন—“অগ্নি নয়, আত্মা জ্বলে রক্তে।” তীর্থজিত্‍ ছবিটা দেখে শিউরে উঠলেন, কারণ এই ছবিটি তিনি দেখেছিলেন তাঁর স্বপ্নে—যেদিন প্রথম শ্মশানে যান। লোকটা আরও বলে, “আমার দাদু বলতেন, চক্র কখনো কাউকে দেয় না, কেবল নেয়। কুমুদিনী যদি নিজেকে দিয়েছে, তাহলে চক্র তাকে ফিরিয়ে দেবে না—তাকে রক্ত দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে… চক্র আবার আহ্বান পাঠাবে।”

সেই রাতেই শ্মশানের পাশে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। একজন স্থানীয় কৃষক হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। সকালবেলায় তার মৃতদেহ পাওয়া যায় চক্রের ওপরেই—যেখানে আগেই পাথর ছিল। মৃতদেহ অর্ধেক পোড়া, মুখ উল্টে যাওয়া, আর বুকে আঁকা ত্রিকোণ চিহ্ন—রক্ত দিয়ে। বিজন ক্যামেরা অন করেই বলে ওঠে, “স্যার, রক্তনাথ ফিরেছে।” তীর্থজিত্‍ তখন বলেন, “চক্রকে আমরা থামিয়েছিলাম, কিন্তু রক্তনাথ বেঁচে গেছে আমাদের মধ্যেই—হয়তো আমাদের কারো মধ্যে ও ঢুকে গেছে।” তারা তখন আবার সেই মন্দিরঘেঁষা স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। মূর্তির চোখ এখনও বন্ধ, কিন্তু তার নিচে মাটি ফাটছে। তীর্থজিত্‍ একপলক দেখে বুঝে যান—গুহার ভেতরের পাথর আবার সরছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এবার কেউ চক্র আঁকেনি, কেউ মন্ত্র পাঠ করেনি।

সেই রাতে বিজনের আচরণ পাল্টে যায়। সে একা একা হেঁটে বেড়ায়, মন্ত্র আওড়ায় অচেনা ভাষায়, চোখে লাল রেখা, ঠোঁটে অর্ধেক হাসি। তীর্থজিত্‍ সন্দেহে পড়ে তাকে অনুসরণ করেন, আর গোপনে দেখে, বিজন শ্মশানের দিকে গিয়ে মাটির মাঝে লাল রঙে একটি গোল দাগ দিচ্ছে—ঠিক চক্রের মতো, কিন্তু ভেতরে সে নিজের আঙুল কেটে রক্ত ফেলছে। তীর্থজিত্‍ চিৎকার করে ওঠেন, “বিজন! থামো!” বিজন ঘুরে তাকায়, কিন্তু তার চোখ বিজনের নয়—সেগুলো ফাঁপা, ধূসর, আর মুখে শোনা যায় অন্য কারো কণ্ঠস্বর, “আমি ফিরেছি… এবার সম্পূর্ণ হব।” ঠিক তখনই বাতাস হাহাকার করে ওঠে, যেন এক অদৃশ্য শক্তি সমস্ত মাঠ চুষে নিচ্ছে। মাটির নিচ থেকে শোনা যায় রক্তনাথের গর্জন—“বলির সময় এলো, এবার আমি নিজে নেব। আমি কারো জন্য অপেক্ষা করব না।”

তীর্থজিত্‍ সেই রাতে সিদ্ধান্ত নেন—রক্তনাথের আত্মা কোথাও ঢুকে পড়েছে, আর তাকে বাঁচাতে হলে এবার তন্ত্র নয়, আত্মার প্রতিরোধ দরকার। সেই প্রতিরোধ তিনি খুঁজবেন তাঁর জ্ঞান, কুমুদিনীর স্মৃতি, আর সেই অসমাপ্ত তাম্রশাসনের মধ্যেই। কিন্তু সময় অল্প। চক্র আবার খুলেছে, এবং এবার তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিজন… নয়তো রক্তনাথ নিজে।

অধ্যায় ৮

রাত তখন গভীর, আকাশে চাঁদের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু বাতাস ভারী—যেন কিছু চেপে বসে আছে। ক্যাম্পের ভেতর বসে তীর্থজিত্‍ তার পুরনো নোটবুক খুলে বসেছেন, কুমুদিনীর বলা প্রতিটি বাক্য, সেই তাম্রশাসনের অসমাপ্ত লাইন, বিজনের আচরণের পরিবর্তন—সব একসাথে মেলানোর চেষ্টা করছেন। তাম্রপত্রে লেখা শেষ বাক্যটা বারবার তাঁর মাথায় বাজতে থাকে: “যে আত্মা রক্তে স্নাত, তাকে তন্ত্র নয়—দর্শন দেবে মুক্তি।” কিন্তু এই ‘দর্শন’ কী? বই ঘেঁটে, চক্রচিহ্ন বিশ্লেষণ করে, পুরোনো বৈদিক টেক্সট পড়েও তীর্থজিত্‍ বুঝতে পারেন না—এখানে দর্শন মানে দার্শনিক ব্যাখ্যা নয়, বরং যেন কোনো অন্তর্দৃষ্টি, আত্মার ভেতরের কোনও উন্মোচন। তাঁর মনে পড়ে, চক্রের ঠিক কেন্দ্রে একবার কুমুদিনী পড়ে গিয়েছিল বলি হিসেবে—হয়তো সেই স্থানেই এই ‘দর্শন’-এর দরজা লুকিয়ে আছে।

সকালে উঠে তিনি দেখতে পান বিজন নেই। তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে তিনি মন্দিরের নিচের গুহার সেই প্রবেশমুখের সামনে যান—যেটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল পাথর চাপিয়ে। অবাক হয়ে দেখেন, পাথর সরে গেছে। চিহ্নিত ফাটলগুলো একে একে মুছে গেছে, আর ভেতর থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে। তীর্থজিত্‍ ধীরে ধীরে নিচে নামেন। গুহা আগের চেয়ে অনেক গাঢ় অন্ধকারে মোড়ানো, কুয়াশা ঘনীভূত, বাতাসে জ্বলন্ত সর্ষের গন্ধ। চক্র এখন আর মাটি বা পাথরের নয়—তার রেখাগুলো যেন আগুনে আঁকা, মাঝখানে লাল শিখা জ্বলছে। সেই আগুনের ধারে দাঁড়িয়ে আছে বিজন—কিন্তু সে বিজন নয়। তার মুখ অর্ধেক গলে গেছে, চোখ দুটি রক্তবর্ণ, ঠোঁটে হাসি নয়, তাচ্ছিল্য। “তুমি আবার এলে?” সেই গলা বিজনের নয়, রক্তনাথের। “তুমি তো ভেবেছিলে, আত্মার প্রতিরোধ আমাকে রুখবে। কিন্তু আত্মা-ই তো আমার শক্তি। আমি রক্তে তৈরি, ভয় দিয়ে বড় হয়েছি। এবার আমিই চক্র। বিজন তো আমার বাহন।”

তীর্থজিত্‍ চুপ করে চক্রের ঠিক পাশে দাঁড়ান। তিনি জানেন, এখানে অস্ত্র বা যুক্তি চলে না। তিনি নিজের বুক পকেট থেকে বের করেন কুমুদিনীর রক্তমালা, যেটা এতদিন ধরে সঙ্গে রেখেছিলেন। তাঁর চোখ বন্ধ করে বলেন, “যদি আত্মাই সত্য, তবে দর্শন হোক আজ।” হঠাৎ চক্রের মাঝখানে আগুন থেমে গিয়ে এক ঝলক আলো ছড়িয়ে পড়ে—আর সেই আলোয় দেখা যায় কুমুদিনী, শান্ত মুখে, হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছেন আগুনের মধ্য দিয়ে। বিজন থেমে যায়। তার চোখের লাল আভা কমে আসে। কুমুদিনীর কণ্ঠে একটিই বাক্য, “তুই আমার নয়, তোকে ত্যাগ করেছি আমি।” সেই মুহূর্তে চক্র কেঁপে উঠে বিদীর্ণ হয়। আগুন চারপাশে ছিটকে পড়ে, আর বিজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, ধীরে ধীরে তার শরীর থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়ে যায়।

গুহা তখন আবার অন্ধকারে ডুবে যায়। তীর্থজিত্‍ ছুটে গিয়ে বিজনের ধড়ফড়ানো শরীরকে তুলে ধরে—সে চোখ খুলে বলে, “স্যার… আমি… আমি ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম… ভিতর থেকে… ও আমার দেহ চালাচ্ছিল…” আর কেঁপে কেঁপে নিঃশ্বাস নেয়। তীর্থজিত্‍ বলে, “সব ঠিক আছে। তুমি ফিরেছো।” তখন হঠাৎ শেষবারের মতো সেই চক্রের কেন্দ্রে কুমুদিনীর ছায়া একবার হাসে—একটি মৃদু, শান্ত হাসি—আর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

তীর্থজিত্‍ জানেন, আজ চক্র হয়তো চুপ হয়েছে। রক্তনাথ আজ থেমেছে, কিন্তু চক্রের দরজা এখন একবার খোলা হয়ে গেছে। সেটি আবার ডাকা পড়লে… আবার কোনো আত্মা সেখানে ছায়া হয়ে ফিরবে। চক্রের দহন হয়তো শেষ হয়নি, শুধু ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু এই ‘অন্তর্দৃষ্টি’—এই আত্মজাগরণ—তাঁর গবেষণার পথ বদলে দিল চিরতরে। প্রত্নতত্ত্ব আর ইতিহাসের পাঁজি থেকে এই চক্র উঠে এল মানুষের মন ও আত্মার ভেতরের গভীর অন্ধকার আলোচনায়।

অধ্যায় ৯

ঘটনার দু’সপ্তাহ পরে, বিজন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। চন্দ্রকেতুগড় থেকে তাঁরা ফিরে এসেছেন কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র ‘আর্কিওসেন্টারে’। সব রিপোর্ট, নোট, অডিও-ভিডিও প্রমাণ একে একে সংরক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু তীর্থজিত্‍ জানেন, এটা কোনো সাধারণ গবেষণা নয়। প্রত্নতত্ত্বের বাইরের কিছু, এমন এক স্তরে পৌঁছে গেছেন তিনি, যেখানে ইতিহাস, আত্মা, তন্ত্র আর মানুষের মনোজগত পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। তিনি নিয়মিত ঘুমোতে পারেন না। প্রতিটি রাতেই মনে হয়, যেন মাটির নিচে কোনো কিছু লেখে চলেছে নিজের মতো করে। ঘুম ভাঙলেই ডায়েরিতে সেই শব্দগুলো উঠে আসে—“রক্ত”, “চক্র”, “নাম”… আর মাঝে মাঝে একটি নাম—”কুমুদিনী”।

একদিন গভীর রাতে, লাইব্রেরির পুরনো আর্কাইভ ঘেঁটে বের করে আনেন ১৮৫৭ সালের এক ব্রিটিশ তন্ত্র-গবেষকের জার্নাল। সেখানে এক অধ্যায়ে পাওয়া যায় কুন্ডলিনী চক্র ও ‘রক্ত বলি’ ঘিরে একটি ঘটনা—চন্দ্রকেতুগড়েরই আশেপাশের অঞ্চলে একটি দেবীমূর্তির পায়ের নিচে প্রতিটি শতকে একবার করে কোনো না কোনো নারীর বলি হয়। এবং তাতে চক্রের নতুন এক স্তর খোলে—‘মাটির নিচে লেখা নাম’। লেখক উল্লেখ করেন, “যে নাম এই চক্র আত্মস্থ করে, তা আর মুছে যায় না। সেই আত্মা চক্রের সঙ্গে মিশে থাকে। যদি কোনো এক আত্মা আত্মত্যাগ করে চক্র বন্ধ করে দেয়, তবে তার নাম হয় চক্রের পাহারাদার।” তীর্থজিত্‍ স্তব্ধ হয়ে পড়েন। মানে, কুমুদিনী চক্রের নতুন রক্ষক হয়ে গেছে? বিজন তখন বলে, “স্যার, আমার মনে হচ্ছে আমি এখনও মাঝে মাঝে ওকে দেখতে পাই। আয়নায়… বা ঘুমে… অথবা বইয়ের ফাঁকে, হঠাৎ এক লাল শাড়ি ভেসে ওঠে।”

সেদিন সন্ধ্যাবেলা, একটি ছোট্ট ডাক আসে চন্দ্রকেতুগড়ের স্কুল থেকে। বিদ্যালয়ের পেছনের মাঠে খননের সময় এক পুরনো পাথরের ফলক পাওয়া গেছে, যাতে লেখা—“কুমুদিনী দেবী”, আর তার নিচে খোদাই চক্রচিহ্ন, যেটা অবিকল সেই তান্ত্রিক বলি-চক্রের মতো। তীর্থজিত্‍ ও বিজন গিয়ে দাঁড়ান সেই ফলকের সামনে। এক প্রাচীন শিক্ষক বলেন, “এটা ওই অদ্ভুত মূর্তির পেছনের জায়গা থেকেই উঠে এসেছে—যেখানে বহুদিন কেউ পা দেয়নি।” বিজনের চোখ স্থির হয়ে থাকে চিহ্নের দিকে। সে ফিসফিস করে বলে, “স্যার, মাটির নিচে নাম লেখা মানে… ওর আত্মা এখনও এখানে আছে।” তীর্থজিত্‍ এবার বুঝে যান, চক্র একরকম জীবনবৃত্ত—যা কেবল রক্ত, ভয় বা মন্ত্রে নয়, আত্মত্যাগেও গড়ে ওঠে। এবং যারা সেই আত্মত্যাগ করে, তারা হয় পাহারাদার, নয়তো উপাস্য।

সেই রাতে, তীর্থজিত্‍ একা বসে নিজের গবেষণালেখা শুরু করেন:

“কোনো কোনো চক্র শুধু কালের ঘূর্ণি নয়—সে মানুষকে পায়, চায়, গিলে নেয়, আর ফেরায় না। যারা ফেরে, তারা পালটে যায়। তারা হয়ে ওঠে ইতিহাসের নতুন স্তর। আজ কুমুদিনীর নাম মাটির নিচে, কিন্তু সে হারিয়ে যায়নি—সে পাহারায় আছে।”

ঠিক তখনই, জানালার বাইরে হালকা কুয়াশা জমে, আর বাতাসে এক স্নিগ্ধ কণ্ঠ ভেসে আসে—“আপনি থামবেন না, ডক্টরবাবু… কারণ ইতিহাস লিখে ফেলে, শুধু হাত দিয়ে নয়… আত্মা দিয়েও।”

অধ্যায় ১০

কলকাতায় বসে তীর্থজিত্‍ ভেবেছিলেন সব কিছু শেষ। কিন্তু ইতিহাসের চক্র একবার শুরু হলে, তা আর সাধারণভাবে বন্ধ হয় না। একদিন, হঠাৎ একটি ডাক আসে পাণ্ডুয়া থেকে—এক প্রাচীন শিবমন্দিরের খোঁড়াখুঁড়ির সময় পাওয়া গেছে একটি মূর্তি, যার মুখাবয়ব অবিকল চামুণ্ডার মতো, কিন্তু নিচে খোদাই করা—“রক্তনাথ জন্মভূমি”। তীর্থজিত্‍ আর বিলম্ব না করে সেখানে পৌঁছন। বিজন তখন বাইরে আছে, তবে রোজ খবর রাখছে। পাণ্ডুয়ার সেই জায়গায় গিয়ে তিনি দাঁড়ান এক ধ্বংসস্তূপের সামনে—যেখানে খোদাই, রক্ত, আগুন আর আত্মার গন্ধ যেন এখনও বাতাসে রয়েছে। সেখানে পাওয়া যায় কিছু ভাঙা তাম্রশাসন, যেখানে প্রথমবার রক্তনাথের নামের পাশে লেখা একটি শব্দ—“চক্রগ্রাহী”—মানে, সে কেবল একজন তান্ত্রিক নয়, চক্রের মধ্যে জন্মানো এক আত্মা, যে নিজের বলি না পেলে অন্যকে গ্রাস করে।

তীর্থজিত্‍ এবার বুঝে যান, রক্তনাথ শুধু তন্ত্রবিদ বা অশুভ আত্মা নয়—সে চক্রেরই সন্তান। চামুণ্ডার নিচে তার আবির্ভাব হয়েছিল, কিন্তু শুরু হয়েছিল এখানে। আর এই সূত্রেই খুলে যায় ইতিহাসের প্রাচীনতর এক দ্বার—যেখানে পাওয়া যায় সেই প্রথম বলির রেকর্ড, ১৭১১ সালে, এক বালিকাকে উৎসর্গ করা হয়েছিল এই চক্রচিহ্নের কেন্দ্রে। সেই বলির মাধ্যমেই চক্র সক্রিয় হয়েছিল, এবং শত বছর অন্তর অন্তর একজন করে নারীর আত্মা সেই চক্রে গিয়ে আটকে পড়েছে। কিন্তু প্রথমবার কেউ নিজে বলি হয়ে চক্র বন্ধ করে দিয়েছিল—সে ছিল একজন পুরুষ তান্ত্রিক, নাম অজানা, তবে তার শরীর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এই পাণ্ডুয়া মন্দিরেই। মন্দিরের নিচে পাওয়া যায় তাঁর হাড়, এবং একটি ধাতুর থালা, যাতে আঁকা ছিল সেই চক্রের কেন্দ্রচিহ্ন। অথচ এটি চন্দ্রকেতুগড়ের চক্র থেকে ভিন্ন—এটি ছিল “উৎস চক্র”, যেখান থেকে অন্য চক্রের জন্ম।

তীর্থজিত্‍ অনুভব করেন, কুমুদিনী চক্রকে রক্ষা করছেন ঠিক, কিন্তু যদি উৎস চক্র আবার জাগে—তাহলে রক্তনাথ ফের জাগবে আর অধিক শক্তিতে। আর সেই চক্র এখন তার সামনে। তিনি স্থির করেন, এবারের গবেষণা নয়, এটি হবে নিবেদনের কাজ। তিনি সেই প্রাচীন ধাতুতে নিজের রক্ত দিয়ে লিখে দেন—“যেখানে চক্র জন্মায়, সেখানে আলো জাগে। আমি চক্রভেদী। আমি ইতিহাসের সাক্ষী।” সেই মুহূর্তে পুরো মন্দিরজুড়ে ছায়া নড়ে ওঠে, বাতাস থেমে যায়, আর মনে হয়, এক পুরুষকণ্ঠ বলছে—“তুমি আমার পথ দেখলে। এবার আমি নিজেই সরে যাবো।”

তীর্থজিত্‍ নিচু হয়ে কপাল ছুঁইয়ে বলে ওঠেন, “আমি তোমাকে ইতিহাসে রেখে গেলাম, চক্রে নয়।” আর তাঁর পেছনে যেন এক নারীছায়া দাঁড়িয়ে, যার পরনে লাল শাড়ি, মাথায় বেলপাতা, চোখে নিঃশব্দ আশীর্বাদ। কুমুদিনী হয়তো এবার মুক্ত।

[সমাপ্ত]

1000037460.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *