Bangla - তন্ত্র

চন্দ্রমণ্ডপ

Spread the love

তপন কুমার মুখার্জী


শীতের শেষ দিকের একটি সকাল। কলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে বর্ধমানগামী লোকাল ট্রেনটি ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে এগোচ্ছে। জানালার ধারে বসে আছেন ড. অরিন্দম মুখার্জি—চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, কোলের উপর মোটা নোটবুক আর কলম। বাইরে শস্যক্ষেত, তালগাছ, আর মাঝেমাঝে কুয়াশা ভেদ করে দেখা যাচ্ছে গ্রামীণ কুঁড়েঘর। অরিন্দম ইতিহাসের ছাত্র নন, বরং ইতিহাস তাঁর জীবনের অনিবার্য এক নেশা। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক, পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে এখন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। তাঁর থিসিসের বিষয়—বঙ্গের জমিদারি যুগের শেষভাগে তান্ত্রিক আচার ও স্থাপত্য। মাসখানেক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে পুরনো নথি ঘাঁটতে গিয়ে তিনি প্রথম ‘চন্দ্রমণ্ডপ’-এর উল্লেখ পান—একটি পাথরের বেদি, যা নাকি শতবর্ষ আগে বর্ধমানের এক জমিদার নির্মাণ করেছিলেন। নথিতে ইঙ্গিত ছিল, মণ্ডপটি তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হত, বিশেষত পূর্ণিমার রাতে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পরবর্তীতে এর বিষয়ে কোনও সরকারি রেকর্ড নেই, আর স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোও এই স্থানের কথা বলার সময় এড়িয়ে গেছে। এই রহস্যই তাঁকে আজ এখানে টেনে এনেছে।

ট্রেন বর্ধমান স্টেশনে ঢোকার আগেই চারপাশে অচেনা শহরের গন্ধ ভেসে এল। স্টেশন চত্বর গমগম করছে—চা বিক্রেতার হাঁক, গরম সিঙাড়ার গন্ধ, রিকশাওয়ালাদের ডাকাডাকি। অরিন্দম একটি ব্যাটারি চালিত রিকশায় উঠলেন, গন্তব্য সেই পুরনো জমিদারবাড়ি, যা এখন প্রায় পরিত্যক্ত। রিকশার চালক, এক চিরকালীন কথাবাজ মধ্যবয়স্ক মানুষ, গন্তব্য শুনেই অদ্ভুতভাবে চুপ করে গেলেন। কিছুক্ষণ পর নিজের থেকেই বললেন, “বাবু, ওই বাড়িতে আর যেও না, ওখানে রাত কাটালে মানুষ ফেরে না।” অরিন্দম হেসে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমি গবেষণার জন্য যাচ্ছি, ভূত-টুত এসব আমি মানি না।” তবুও চালকের মুখের অস্বস্তি তাঁর চোখ এড়াল না। পথে যেতে যেতে গ্রামের দু’একজনের সাথে কথা বলতে গিয়েও একই প্রতিক্রিয়া পেলেন—তারা মাথা নেড়ে বলল, “চন্দ্রমণ্ডপে যাবেন না, বাবু।” তাদের চোখে ছিল একরাশ ভয়, যেন এ জায়গার নাম উচ্চারণ করলেই অমঙ্গল ডেকে আনবে।

জমিদারবাড়ির অবস্থান ছিল শহরের উপকণ্ঠে, চারদিক জঙ্গলে ঘেরা। লোহার তৈরি বড় ফটকটি মরচে ধরা, কড়িকাঠে শ্যাওলা জমে গেছে। ভিতরে ঢুকতেই অরিন্দমের চোখে পড়ল—অর্ধেক ভেঙে পড়া বারান্দা, দেওয়ালের চুন খসে পড়ে গাঢ় সবুজ দাগ, আর চারদিক জুড়ে নিস্তব্ধতা। বাড়িটি যেন সময়ের ঘূর্ণিপাকে আটকে আছে, মানুষের পদচারণা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাড়ির ছাদের দিকের দিকে তাকাতেই দেখা গেল—একটি অদ্ভুত কাঠামো, গোলাকার পাথরের মণ্ডপ, যার চারপাশে ভাঙা পাথরের রেলিং। সূর্যের আলোয় সেটি সাধারণ মনে হলেও, এর নির্মাণশৈলী ছিল অস্বাভাবিক—মাঝখানে কালো পাথরের বেদি, যা আশেপাশের স্থাপত্যের সঙ্গে মিলছে না। অরিন্দম ঠিক করলেন, যত দ্রুত সম্ভব মণ্ডপটি কাছ থেকে দেখতে হবে।

রিকশাওয়ালা তাড়াহুড়ো করে তাঁকে নামিয়ে চলে গেল। অরিন্দম ব্যাগ নামিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন, কিন্তু পেছন থেকে একটি ভাঙা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “ওখানে যাবেন না, বাবু।” ঘুরে দেখলেন, সাদা চুলে ভরা এক বৃদ্ধা—হাতে লাঠি, পরনে মলিন সাদা শাড়ি। চোখে ভয় আর কৌতূহলের মিশ্র ছাপ। তিনি জানালেন, তাঁর নাম করুণা বাউড়ি, বহু বছর আগে জমিদারবাড়িতে কাজ করতেন। করুণা নিচু স্বরে বললেন, “চাঁদের আলো পড়লে ওই মণ্ডপে যা হয়, তা চোখে দেখা যায় না—মনে হয় অন্য জগৎ খুলে যায়।” অরিন্দম একটু অবাক হলেন, কিন্তু সরাসরি কিছু না বলে কেবল নোটবুকে তাঁর কথা লিখে রাখলেন। দূরে কাকের ডাক, হাওয়ার শব্দ, আর জমিদারবাড়ির ছায়া যেন এই অচেনা যাত্রার শুরুতেই অদৃশ্য এক পর্দা নামিয়ে দিল—যার আড়ালে অপেক্ষা করছে অজানা, হয়তো বিপজ্জনক, সত্য।

জমিদারবাড়ির ভেতরে ঢুকে অরিন্দম প্রথমে বুঝতেই পারছিলেন না কোন দিকে গেলে বসবাসযোগ্য অংশে পৌঁছানো যাবে। ভাঙাচোরা সিঁড়ি, মলিন দেওয়াল, ছাদ থেকে ঝুলে পড়া মাকড়সার জাল—সব মিলিয়ে যেন বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে আছে। ভিতরের এক করিডরের শেষে একটি আধখোলা কাঠের দরজা দেখতে পেলেন। ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে কর্কশ অথচ নারীকণ্ঠ ভেসে এল—“কে?” দরজা খুলে দেখা দিলেন এক বৃদ্ধা, বয়স অন্তত ষাটের কোঠায়, পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ, চোখে গম্ভীর দৃষ্টি। এটাই প্রমীলা দেবী—বর্ধমানের জমিদার পরিবারের শেষ উত্তরাধিকারিণী। প্রথমেই তিনি অরিন্দমের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন অচেনা মানুষকে পছন্দ করতে পারছেন না। “আপনি কে? কেন এসেছেন?”—প্রশ্ন করলেন তিনি। অরিন্দম শান্তভাবে পরিচয় দিয়ে বললেন, তিনি একজন গবেষক, জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও বিশেষ করে চন্দ্রমণ্ডপ নিয়ে কাজ করছেন। কথা শেষ হতেই প্রমীলা দেবীর মুখের রেখা আরও কঠোর হয়ে উঠল। “ওখানে যাওয়ার কথা ভেবেছ? তুমি জানো না, ও জায়গাটা অশুভ।”

অরিন্দম চেয়েছিলেন যুক্তি দিয়ে তাঁকে বোঝাতে, কিন্তু প্রমীলা দেবীর চোখে স্পষ্ট ছিল একরাশ অনিচ্ছা আর অদ্ভুত ভয়। তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে জানালেন, বহু বছর ধরে চন্দ্রমণ্ডপে কেউ যায় না, বিশেষত রাতের বেলায়। “ওখানে যারা গিয়েছিল, তারা কেউ ফেরেনি… কিংবা ফিরলেও আর আগের মতো ছিল না,”—তিনি নিচু স্বরে বললেন। তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত কাঁপুনি ছিল, যা কেবল কুসংস্কার নয়, গভীর অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দেয়। অরিন্দম চুপচাপ শুনতে লাগলেন, কিন্তু তাঁর ভেতরের কৌতূহল এই সতর্কবার্তায় আরও তীব্র হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “আমি শুধু ইতিহাস খুঁজতে এসেছি, কোনও আচার করব না।” প্রমীলা একটু থেমে তাঁর দিকে তাকালেন, যেন চোখ দিয়ে যাচাই করছেন অরিন্দম সত্যিই নিজের কথা মানবেন কিনা।

হঠাৎ প্রমীলা দেবী উঠে একটি পুরনো আলমারির দিকে গেলেন। আলমারির ভেতর থেকে একটি ছোট পিতলের চাবি বের করলেন। চাবিটা দেখতে সাধারণ হলেও ধাতব গায়ে খোদাই করা কিছু প্রাচীন নকশা ছিল, যা স্পষ্টতই হাতে বানানো। তিনি চাবিটা অরিন্দমের হাতে দিয়ে বললেন, “এটাই মণ্ডপের প্রবেশদ্বারের চাবি। অনেকে চেষ্টা করেছে খুলতে, কিন্তু এই চাবি ছাড়া কোনও দরজা খোলে না। তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো, তবে আমার কথা মনে রেখো—পূর্ণিমার রাতে ভোর না হওয়া পর্যন্ত বেদি ছেড়ো না। কিছু দেখলেও, কিছু শুনলেও… কিছুতেই নামবে না।” তাঁর গলায় হুঁশিয়ারির পাশাপাশি এক অদ্ভুত আবেদনও মিশে ছিল, যেন তিনি নিজের দীর্ঘদিনের এক গোপন দায়িত্ব এখন অরিন্দমের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

অরিন্দম চাবি হাতে নিয়ে অনুভব করলেন, এ কেবল একটি ধাতব বস্তু নয়, বরং বহু পুরনো রহস্যের দ্বার উন্মোচনের চাবিকাঠি। প্রমীলা দেবীর কথা তাঁর যুক্তিবাদী মনকে নাড়িয়ে দিলেও, গবেষণার তাগিদ তাঁকে পিছিয়ে যেতে দিল না। তিনি নোটবুকে চাবির আকার ও খোদাইয়ের বর্ণনা লিখে রাখলেন। প্রমীলা দেবী জানালেন, তাঁর পরিবারের ইতিহাসে চন্দ্রমণ্ডপ সবসময়ই বিতর্কিত ছিল—একদিকে এটি জমিদারদের ক্ষমতার প্রতীক, অন্যদিকে লোককথায় এক অভিশপ্ত স্থান। তিনি আর কিছু বলতে চাইলেন না, শুধু বিদায়ের সময় চোখে এক দীর্ঘশ্বাসের ছায়া নিয়ে বললেন, “সাবধানে থেকো, অরিন্দম বাবু। কখনও কখনও ইতিহাস কেবল পড়ার জন্য হয়, স্পর্শ করার জন্য নয়।” এই বাক্য যেন তাঁর কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, যখন তিনি ধীরে ধীরে করিডর পেরিয়ে বাইরে বেরোলেন—গোধূলির আলোয় চন্দ্রমণ্ডপের ছায়া তখন দূর থেকে আরও গাঢ় হয়ে উঠছে।

বর্ধমান শহরের মাঝামাঝি একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে বিকেলের ভিড় জমে উঠেছে। কাপের টুংটাং শব্দ, চায়ের ভাঁপ, আর পাশের টেবিলে রাজনৈতিক আলোচনা—সব মিলিয়ে দোকানটি যেন খবরের আড্ডাখানা। এখানেই বসে ছিলেন আকাশ দত্ত, স্থানীয় দৈনিক বর্ধমান বার্তা পত্রিকার তরুণ রিপোর্টার। বয়সে সবে উনত্রিশ, কিন্তু চোখে চিরকালীন এক কৌতূহল, যেন প্রতিটি ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গল্প খুঁজে বের করাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য। চায়ের চুমুক দিতে দিতে তিনি মোবাইলে একটি বার্তা পেলেন—“একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আজকাল বর্ধমানের জমিদারবাড়ি ঘুরে দেখছেন, শুনেছি চন্দ্রমণ্ডপে রাত কাটাবেন।” আকাশের ভেতরে সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক সত্তা জেগে উঠল। চন্দ্রমণ্ডপের নাম শুনলেই তাঁর মনে পড়ে যায় শৈশবের ভয়ঙ্কর গল্পগুলো—পূর্ণিমার রাতে মন্ত্রপাঠ, ধোঁয়ার ভিতর নড়াচড়া করা ছায়া, আর যারা গিয়েছিল, তারা আর ফিরে আসেনি। এই সুযোগ যেন আকাশের জন্য এক রোমাঞ্চকর ব্রেকিং নিউজ।

আকাশ সিদ্ধান্ত নিলেন, ঘটনাটি তিনি সরাসরি কভার করবেন। অফিস থেকে একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা, রেকর্ডার আর টর্চলাইট নিয়ে বেরোলেন। তাঁর পরিকল্পনা—প্রথমে জমিদারবাড়ির আশেপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তারপর সুযোগ মিললে ভেতরে গিয়ে সেই গবেষকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার নেওয়া। কিন্তু গোপনে তাঁর আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল—চন্দ্রমণ্ডপের রহস্যময় পরিবেশ নিজের চোখে দেখা এবং সেটি সংবাদপত্রের জন্য এক্সক্লুসিভ করে তোলা। সাইকেলে চেপে শহরের কোলাহল পেরিয়ে যখন তিনি জমিদারবাড়ির ফটকের কাছে পৌঁছলেন, তখন গোধূলির আলো ক্রমে ম্লান হয়ে আসছে। বিশাল লোহার ফটকটি বন্ধ, কিন্তু ভেতরের বারান্দার দিকে ক্ষীণ আলো জ্বলছে। আকাশ নীরবে ভেতরে ঢুকে পড়লেন, ক্যামেরার স্ট্র্যাপ শক্ত করে ধরে।

ভেতরে ঢুকতেই করিডরের একপ্রান্তে তিনি প্রমীলা দেবীকে দেখতে পেলেন—সাদা শাড়ি, কপালে বড় টিপ, চোখে সেই গম্ভীর দৃষ্টি। আকাশ জানেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলা সহজ নয়, কিন্তু সাংবাদিকতার কৌশলে নিজেকে গ্রামের ছেলে হিসেবে পরিচয় দিলেন, যে চন্দ্রমণ্ডপের ইতিহাস নিয়ে জানতে চায়। প্রথমে প্রমীলা দেবী বিরক্ত হলেন, “তুমি কি ওই গবেষকের লোক?” আকাশ মাথা নাড়লেন, “না, ঠাকুরমা, আমি তো শুধু খবর লিখি।” কথাবার্তার ফাঁকে তিনি সাবধানে মোবাইলের রেকর্ডার চালু করে রাখলেন। ধীরে ধীরে প্রমীলা দেবী নরম হলেন, কিন্তু কণ্ঠে সেই সতর্কতা বজায় রাখলেন। তিনি জানালেন, গবেষকের নাম অরিন্দম, আর তিনি শীঘ্রই পূর্ণিমার রাতে মণ্ডপে রাত কাটাবেন। হঠাৎ প্রমীলা চোখ সরু করে আকাশের দিকে তাকালেন, “তুমি কি জানো, ওখানে রাত কাটানো মানে মৃত্যুর দোরগোড়ায় পা রাখা?”

আকাশ তাঁর কথায় ভয় না পেয়ে বরং আরও কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। তিনি প্রমীলা দেবীর মুখ থেকে যতটুকু সম্ভব তথ্য বের করার চেষ্টা করলেন—কবে শেষবার কেউ মণ্ডপে রাত কাটিয়েছিল, কেন জায়গাটিকে এত ভয় পায় সবাই, আর জমিদার পরিবারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী। প্রমীলা যদিও সরাসরি সব বলেননি, তবুও তাঁর কথা থেকে আকাশ বুঝলেন, এ কেবল কুসংস্কার নয়—এর পেছনে আছে এমন কিছু ঘটনা, যা প্রকাশ পেলে শহরের মানুষ হতবাক হয়ে যাবে। বিদায় নেওয়ার আগে আকাশ মনে মনে ঠিক করে নিলেন, অরিন্দমের সঙ্গে দেখা করাটা জরুরি। হয়তো এই গল্প তাঁর সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে বড় কভারেজ হবে—যেখানে ইতিহাস, লোককথা আর অজানা ভয়ের মিশেলে তৈরি হবে এমন এক সত্য, যা লিখতে গিয়ে তাঁর নিজেরও গায়ে কাঁটা দেবে।

করুণা বাউড়ি, বয়সে তখন আশির কোঠায়, শরীরটা কুঁকড়ে গেলেও চোখে এখনো স্মৃতির তীক্ষ্ণ আলো। আকাশ দত্ত মাইক্রোফোনটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যেন নিজের ভেতরকার পুরনো ভয়কে জাগিয়ে তুলতে সময় নিচ্ছে। তারপর সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—“ওই সময় আমি ছিলাম জমিদারবাড়ির ছোট পরিচারিকা। আমার বয়স তখন চৌদ্দ কি পনেরো। সেই পূর্ণিমার রাতের কথা এখনো ভুলতে পারি না। সেদিন সারা দুপুর মণ্ডপে কাঠ, প্রদীপ আর নানা তান্ত্রিক সরঞ্জাম নিয়ে কিছু অচেনা লোক যাতায়াত করছিল। জমিদারবাবু তখন বাইরে, বাড়িতে শুধু আমরা কয়েকজন দাসী আর বৃদ্ধ দারোয়ান। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক কেমন যেন অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে গেল। আমি খাওয়া সারতে সারতে দেখলাম, চন্দ্রমণ্ডপ থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে, যেন ধূপ বা কোনও আচার চলছে। কৌতূহলবশত আমি চুপিচুপি উঠোন পেরিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, আর তখনই চোখে পড়ল—তিনজন তান্ত্রিক মেঝেতে অদ্ভুত নকশা আঁকছে, মাঝখানে আগুন জ্বলছে, আর তারা একসাথে অজানা ভাষায় মন্ত্র জপ করছে। সেই মন্ত্রের ধ্বনি এত গভীর ছিল যে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।”

সে একটু থেমে মুখে হাত বুলিয়ে আবার বলল—“রাত প্রায় বারোটা নাগাদ হঠাৎ হাওয়া বইতে শুরু করল। গাছের পাতা তীব্র শব্দে কাঁপতে লাগল, আর মণ্ডপের ভেতর আগুনের শিখা যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলতে চাইছে। আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম, কিন্তু চোখ সরাতে পারলাম না। হঠাৎ, সেই তান্ত্রিকদের একজন চিৎকার করে উঠল, আর বাকিরা আরও জোরে মন্ত্র পড়তে লাগল। একসময় আগুনের মাঝখান থেকে যেন কোনও ছায়ামূর্তি উঠে এল—তার চোখে জ্বলন্ত লাল আলো। আমার বুক ধকধক করতে লাগল, আমি দৌড়ে রান্নাঘরে ফিরে এলাম, কিন্তু কানে তখনো সেই মন্ত্রের শব্দ বাজছে। রাতটা আমি কাঁথা মুড়ি দিয়ে কেটে দিলাম। ভোরে খবর পেলাম—মণ্ডপে থাকা তিনজন তান্ত্রিকের কেউ নেই! তাদের কোনও দেহ, রক্তের দাগ, বা সরঞ্জাম—কিছুই নেই। যেন তারা বাতাসে মিলিয়ে গেছে।”

আকাশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, মাঝে মাঝে নোট নিচ্ছিল। করুণা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল—“ওই ঘটনার পর থেকেই চন্দ্রমণ্ডপে কেউ যায় না। রাতে তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও ওখানকার বাতাস অদ্ভুত ঠান্ডা, আর একটা চাপা গন্ধ ভেসে আসে। আমি বহুবার দেখেছি—সন্ধ্যার পর মণ্ডপের ভেতর দিয়ে এক ঝলক ছায়া সরে যায়, যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভালো করে দেখলে কিছুই নেই। গ্রামের লোকজন বলে, সেই তান্ত্রিকদের আত্মা এখনও ওখানে আটকে আছে। মাঝে মাঝে পূর্ণিমার রাতে তাদের মন্ত্রপাঠের আওয়াজ শোনা যায়। আমার নিজের কানে শুনেছি—একবার রাতে কুয়ো থেকে জল তুলতে গিয়ে ঠিক সেই মন্ত্রের অংশ শুনে ফেলেছিলাম। ভয়ে কলসিটা হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল।” করুণা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আমার জীবনে অনেক ভয়ঙ্কর জিনিস দেখেছি, কিন্তু ওই রাতের মতো কিছু আর কখনো নয়। তখন থেকেই মনে হয়, চন্দ্রমণ্ডপ জীবিতদের জন্য নয়।”

শেষ কথাগুলো বলার পর করুণা একদম চুপ করে গেল, যেন কথা বলতে গিয়েই আবার সেই ভয়াবহ রাতের মধ্যে ফিরে গেছে। আকাশ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল, এটা কেবল কুসংস্কার বা গুজব নয়—করুণার চোখে একধরনের স্থির আতঙ্ক জমে আছে, যা অভিনয় নয়। আকাশের সাংবাদিকসুলভ কৌতূহল আরও বেড়ে গেল; সে বুঝতে পারল, এই মণ্ডপের ইতিহাস কেবল জমিদারবাড়ির অলৌকিক কাহিনি নয়, এর মধ্যে হয়তো এমন কিছু ঘটেছে যা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু সে এটাও বুঝল, এই রহস্যের গভীরে যেতে হলে তাকে রাতের মণ্ডপে পা রাখতে হবে—যেখানে হয়তো এখনও সেই তান্ত্রিকদের ছায়া অপেক্ষা করছে। করুণা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, আর আকাশ মনে মনে ঠিক করল, সত্যি যাই হোক, পরের পূর্ণিমার রাত সে চন্দ্রমণ্ডপে কাটাবেই।

অরিন্দম সেদিন বিকেল থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর ব্যাগে রাখা হয়েছে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সরঞ্জাম—ইনফ্রারেড ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, একটি পুরনো কিন্তু নির্ভরযোগ্য ডায়েরি, যেখানে তিনি পর্যবেক্ষণের প্রতিটি ক্ষণ নোট করবেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই প্রবীণ গবেষক জানেন, পূর্ণিমার রাতটি এই তদন্তের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মণ্ডপে পৌঁছানোর সময়, অরিন্দম অনুভব করলেন পায়ের তলায় অদ্ভুত ঠান্ডা কাঁপুনি—যেন মাটি নিজেই শ্বাস নিচ্ছে। চারপাশের বটগাছ, শিমুল আর কদমগাছের ছায়া মিলে মণ্ডপটিকে অন্ধকার গর্ভের মতো করে তুলেছে। দূরে পুকুরপাড়ের জলে চাঁদের প্রতিফলন কাঁপছে, কিন্তু তবু চারপাশে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। শুধু মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে, যেন সে-ও কিছু আঁচ করছে। মণ্ডপের ধুলো জমা মেঝেতে পা রাখতেই অরিন্দম শুনলেন, যেন পায়ের ধুলোতেই পুরনো কালের প্রতিধ্বনি ঘুরে বেড়াচ্ছে—এখানেই হয়তো সেই তিন তান্ত্রিক পূর্ণিমার রাতে বসেছিলেন, যার রহস্য এখনো কেউ ভেদ করতে পারেনি।

প্রমীলা বসে আছেন তাঁর প্রাচীন কাঠের জানালার পাশে, হাতে একটি পুরনো শাল জড়ানো। চোখের কোণে ধরা পড়েছে ক্লান্তি, কিন্তু তার থেকেও বড় কিছু—উদ্বেগ। জানালার কাঠের ফাঁক দিয়ে তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন মণ্ডপের সিঁড়ি, যেখানে অরিন্দম ধীর পায়ে উঠছেন। তিনি জানেন না, অরিন্দম সত্যিই কিছু খুঁজে পাবেন কিনা, কিন্তু তাঁর মনে আছে গ্রামের প্রবীণদের সতর্কবাণী—”পূর্ণিমার রাতের আলোয় মণ্ডপ জেগে ওঠে।” তিনি ছোটবেলায় শুনেছিলেন, সেদিন রাতের পরে গ্রাম থেকে একে একে মানুষ হারিয়ে গেছে, আর কেউ ফিরে আসেনি। তবু তাঁর চোখ জানালা থেকে সরে না, কারণ ভিতরে ভিতরে তিনি যেন আশা করছেন এই গবেষক সত্যিই সেই অন্ধকার পর্দা সরিয়ে দেবেন। নিচে উঠোনে বাতাসের টান বাড়ছে, শাল পাতার ডগা কাঁপছে, যেন প্রমীলার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিলছে এই প্রাকৃতিক অস্থিরতা।

আকাশ দূরে, তালগাছের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটি উচ্চক্ষমতার দূরবীন। সে জানে অরিন্দম যা করছেন, তা বিপজ্জনক, কিন্তু কোনোভাবে সে নিজেকে আটকে রাখতে পারছে না। তার কৌতূহল ও ভয়—দুটোই একসঙ্গে কাজ করছে। দূরবীনে চোখ রাখতেই মণ্ডপের প্রতিটি খুঁটিনাটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—ভাঙা স্তম্ভের ফাটল, সিঁড়ির ধারে ছড়ানো শুকনো পাতা, আর মেঝেতে ছড়ানো ধুলোয় আঁকা অদ্ভুত দাগ, যা অরিন্দম এখন টর্চের আলোয় পরীক্ষা করছেন। আকাশের মনে হলো, সেই দাগগুলো কোনো প্রাচীন চিহ্ন, যা হয়তো তান্ত্রিক আচারেই ব্যবহৃত হত। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল—আলো না ফেললেও মণ্ডপের কোণে যেন একটা ছায়া নড়ল। সে চোখ মুছে আবার দেখল, কিন্তু এবার সেখানে কিছুই নেই, শুধু অন্ধকার। আকাশের বুকের ভেতর ধুকপুক বেড়ে গেল, কিন্তু সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, কারণ জানে, এখনই অরিন্দমকে ডাকলে হয়তো তাঁর গবেষণা নষ্ট হয়ে যাবে।

মধ্যরাত ঘনিয়ে এলো। আকাশে সাদা মেঘের স্তর ভেঙে বেরিয়ে এল গোল, উজ্জ্বল পূর্ণচাঁদ—তার আলো যেন তরল রূপোর মতো মণ্ডপের উপর গড়িয়ে পড়ছে। সেই আলো পড়তেই বাতাসের গতি পাল্টে গেল, ভারি হয়ে উঠল পরিবেশ, আর দূরের ঝোপঝাড়ে অদ্ভুত খসখস শব্দ উঠল। অরিন্দম তাড়াতাড়ি ক্যামেরা চালু করে চারপাশে সেট করলেন, রেকর্ডারের বোতাম টিপলেন, আর ডায়েরিতে লিখলেন—”চাঁদ উঠেছে, বাতাসের গতি বৃদ্ধি। শব্দ অজ্ঞাত।” প্রমীলা জানালা থেকে এই দৃশ্য দেখে শ্বাস আটকে ফেললেন, যেন জানেন—এখনই কিছু ঘটতে চলেছে। আকাশ তার দূরবীনে আবার তাকাল, আর এবার সে স্পষ্ট দেখল—মণ্ডপের সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে এক ধূসরাকৃতির ছায়া, যা ধীরে ধীরে অরিন্দমের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, অরিন্দম যেন কিছুই টের পাচ্ছেন না, বরং মেঝেতে ঝুঁকে আরও কিছু চিহ্ন আঁকছেন ডায়েরিতে। পূর্ণিমার রাত তার প্রথম অদ্ভুত দৃশ্য প্রকাশ করল, আর গ্রামের নিঃশব্দ আকাশের নিচে, তিনজন মানুষের হৃদয়ে ভয়, কৌতূহল, আর এক অদৃশ্য আহ্বান মিলেমিশে এক হয়ে গেল।

অরিন্দম মণ্ডপের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিলেন, চোখ স্থির পাথরের বেদির দিকে। চারপাশে নিস্তব্ধতা এমনভাবে ছেয়ে আছে যেন সময় থমকে গেছে। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন বেদির উপরে কেমন যেন কুয়াশার মতো কিছু গড়ে উঠছে—কিন্তু সেটা সাধারণ কুয়াশা নয়। সাদা ধোঁয়ার মতো, অথচ তার ভেতর যেন এক অদ্ভুত জ্যোতির আভা। ধীরে ধীরে ধোঁয়া গাঢ় হতে থাকে, আর তাপমাত্রা হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি কমে যায়। বাতাসে একটা ধাতব গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে—যেন পুরনো রক্তের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে ভেজা মাটির শ্বাস। অরিন্দম অনুভব করলেন তাঁর হাত কাঁপছে, কিন্তু চোখ সরাতে পারছেন না। সেই ধোঁয়ার ভেতরে ধীরে ধীরে কিছু আকার ফুটে উঠতে শুরু করল—অস্পষ্ট, চলমান, তবু মানুষের অবয়বের মতো। প্রথমে মনে হলো, হয়তো মনের ভুল; কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই দেখা গেল ছায়াগুলো যেন জীবন্ত, তারা একে অপরকে ঘিরে নীরব নৃত্যে মগ্ন। অরিন্দম ক্যামেরা তুলতেই বুঝলেন, যন্ত্রের ভেতর লেন্স অকারণে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বারবার চেষ্টা করেও কিছুই ধরা যাচ্ছে না। তখন তিনি ডায়েরি খুলে তাড়াহুড়ো করে হাত কাঁপতে কাঁপতে লিখতে শুরু করলেন—”রাত ১২টা ০২ মিনিট—পাথরের বেদির উপরে সাদা ধোঁয়া… তার ভেতরে নাচছে অচেনা ছায়ারা… ক্যামেরা অকার্যকর।”

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ এই সময়ে এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। প্রথমে মনে হলো, বাতাসে পাতা দুলছে; কিন্তু শীঘ্রই বুঝল সেটা কোনো প্রাকৃতিক শব্দ নয়। খুব নিচু, কর্কশ অথচ তালময় মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে আসছে মণ্ডপের দিক থেকে। শব্দটা এতটাই ক্ষীণ যে ভাষা চেনা যায় না, কিন্তু তাতে এক ধরণের হিপনোটিক প্রভাব আছে। আকাশ অনুভব করল তার বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি বেড়ে গেছে, আর পা দুটো কেমন যেন নিজে থেকেই মণ্ডপের দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে। সে স্থির থাকতে চেষ্টা করল, কিন্তু মন্ত্রের তাল মাথার ভেতরে এমনভাবে ঢুকে পড়ল যেন সে নিজেই সেই ছায়াদের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে দুলছে। চাঁদের আলো এই সময় মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে মণ্ডপের বেদিতে পড়ল—আর তখনই ছায়াগুলোর গতিবিধি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারা যেন কোনো অদ্ভুত আচার পালন করছে, হাত-পা প্রসারিত করে বৃত্তে ঘুরছে, আর ধোঁয়া ঘন থেকে ঘনতর হচ্ছে। বেদির চারপাশের প্রাচীন শিলালিপিগুলো চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আর তাতে খোদাই করা প্রতীকগুলো একে একে জ্বলজ্বল করতে শুরু করল।

অরিন্দমের ডায়েরির পাতায় শব্দ জমে উঠছে, কিন্তু তাঁর মন এখন দ্বিধাবিভক্ত—একদিকে এই দৃশ্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা, আর অন্যদিকে অদ্ভুত এক ভয় ও মোহের মিশ্রণ তাঁকে চেপে ধরছে। ধোঁয়ার ভেতরকার ছায়াগুলো এখন যেন তার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছে। তাদের মুখ নেই, চোখ নেই, তবু সেই দৃষ্টি অরিন্দম অনুভব করতে পারছেন—শীতল, নিরপেক্ষ, অথচ গভীরভাবে সচেতন। তাঁর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কপালের ঘাম গলায় বেয়ে নামছে। তিনি নিজের মনে বললেন—”শান্ত থাকো, এটা কোনো প্রাকৃতিক অপটিক্যাল ফেনোমেনা হতে পারে।” কিন্তু মন্ত্রের শব্দ ক্রমশ জোরালো হতে থাকল, আর তাতে এক ভয়াবহ সুর ভেসে উঠল—যেন কেউ বহু যুগ ধরে পাথরের নিচে বন্দী ছিল, আর আজ মুক্তি পেতে চলেছে। তখনই ক্যামেরা, যা এতক্ষণ অচল ছিল, হঠাৎ নিজে থেকেই ক্লিক করতে শুরু করল। লেন্সে কোনো মানুষের হাত নেই, কিন্তু শাটারের শব্দ রাতের নীরবতায় ধারাবাহিকভাবে বেজে উঠল। অরিন্দম এক পা পিছিয়ে গেলেন, ডায়েরি বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন।

আকাশ এই দৃশ্য দেখেই আর স্থির থাকতে পারল না। সে মণ্ডপের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল, কিন্তু যতই উপরে উঠছে, ততই চারপাশের আলো অস্বাভাবিকভাবে ম্লান হয়ে আসছে—যেন চাঁদের আলো এখানে ঢুকতে পারছে না। ধোঁয়া এখন সিঁড়ির ধাপ ছুঁয়ে ছুঁয়ে উপরে উঠছে, আর তাতে ভেসে আসছে ছায়াদের নৃত্যের প্রতিবিম্ব। আকাশ হঠাৎ দেখল, ছায়াদের মধ্যে একজনের অবয়ব অনেকটা মানুষের মতো—তার উচ্চতা, গড়ন, এমনকি চলাফেরার ভঙ্গি প্রায় অরিন্দমের মতো। কিন্তু সেটি ছিল কেবল এক মুহূর্তের জন্য; পরের মুহূর্তেই সেই অবয়ব বৃত্তে মিশে যায়। আকাশের কানে মন্ত্রোচ্চারণ এখন স্পষ্টতর, যেন কোনো প্রাচীন ভাষায় বলা হচ্ছে—একটা ভাষা, যা সে আগে কখনো শোনেনি, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মনের গভীরে কোথাও চেনা লাগে। সে অনুভব করল, আরেকটু পরেই হয়তো এই নৃত্য এবং মন্ত্র তার নিজের শরীরকেও গ্রাস করে নেবে। আর সেই মুহূর্তে, হঠাৎ বেদির উপর থেকে এক ঝলক তীব্র সাদা আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল, সবকিছুকে গ্রাস করে নিল, আর সময় যেন থমকে গেল।

ঘন অন্ধকারে চারপাশ যেন এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে আচ্ছন্ন। রাতের হাওয়া কেমন যেন ভারি হয়ে এসেছে, প্রতিটি পাতার মর্মর শব্দও যেন শোনায় চাপা আর ভীতিকর। হঠাৎই অরিন্দম অনুভব করল, পেছনে কারও উপস্থিতি—এক অদৃশ্য দৃষ্টি যেন তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে ঘুরতেই দেখতে পেল, কালচে গেরুয়া পোশাক পরে, গলায় নানা ধরনের রুদ্রাক্ষ ও হাড়ের মালা, মাথায় তেলের আস্তরণে জটধারী একজন ব্যক্তি অন্ধকার ফুঁড়ে এগিয়ে আসছে। তাঁর লম্বা চেহারা, ক্ষীণ অথচ দৃঢ় পদক্ষেপ, আর চোখদুটো যেন দীপশিখার মতো অন্ধকারে জ্বলছে। মুখমণ্ডলে সময়ের ছাপ থাকলেও, সেই মুখে এমন এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি—যেন পৃথিবীর বহু গোপন কথা তাঁর ঠোঁটে জমে আছে। অরিন্দম বুঝতে পারল, এ-ই সেই মানুষ যাকে নিয়ে আকাশ তাকে সতর্ক করেছিল—মহাদেব তান্ত্রিক।

মহাদেব থামলেন অরিন্দমের সামনে এসে। চারপাশের বাতাস যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল, যদিও বেদির আশপাশে মাটির উপর ধূপের গন্ধ এখনো ভাসছে। তিনি গভীর, কর্কশ কণ্ঠে বললেন, “তুমি যা খুঁজছ, তা ইতিহাস নয়—এটা প্রতিশোধ।” অরিন্দম প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না, শুধু তাঁর হাতের দিকে তাকাল—সেখানে একটি লাল রঙের কুঁচি ধরা, যেটার গায়ে শুকনো রক্তের দাগের মতো কিছু লেগে আছে। তান্ত্রিকের চোখে সেই মুহূর্তে এক বিচিত্র দীপ্তি—যেন দৃষ্টি দিয়ে সে অরিন্দমের ভেতরের সমস্ত গোপন ভাবনা পড়ে ফেলছে। হঠাৎই তিনি বেদির দিকে এগিয়ে গেলেন, ধীরে ধীরে লাল কুঁচিটা বেদির উপরে রাখলেন, আর হাত দিয়ে চারপাশে কিছু চিহ্ন আঁকতে শুরু করলেন। প্রতিটি রেখা যেন আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে, যদিও তাতে কোনো আগুন নেই। অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, সে যেন আরেক জগতে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে সময় ও বাস্তবতার কোনো নিয়ম নেই।

তারপর মহাদেব তান্ত্রিক বেদির চারপাশে বসে পড়লেন এবং এক প্রাচীন মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর গভীর, তীক্ষ্ণ, আর এক অদ্ভুত ছন্দে ওঠা-নামা করছে। প্রতিটি শব্দ যেন বাতাসকে কেটে যাচ্ছে, প্রতিটি উচ্চারণে মাটি কেঁপে উঠছে সামান্য। চারপাশের গাছপালা থেকে অদ্ভুত শব্দ আসছে—কোথাও যেন কুকুরের হুঙ্কার, কোথাও শকুনের ডানার শব্দ, আবার কোথাও হাওয়ায় ভেসে আসছে নারী কণ্ঠের চাপা হাসি। আকাশ, যে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, অনুভব করল যেন মন্ত্রের তালে তালে পাথরের বেদি হালকা আলো ছড়াচ্ছে। ধোঁয়া আবার ঘন হয়ে উঠছে, কিন্তু এবার তার ভেতর দিয়ে কিছু অদ্ভুত ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে—যাদের আকার বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু উপস্থিতি নিঃসন্দেহে জীবন্ত। অরিন্দম দেখল, মহাদেবের ঠোঁটে কোনো থামার চিহ্ন নেই, আর তাঁর কণ্ঠে এমন এক শক্তি আছে যা মনকে হিপনোটাইজ করে ফেলে।

শেষে মন্ত্রপাঠ হঠাৎ করেই থেমে গেল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত সমস্ত শব্দ কেটে দিল। মহাদেব ধীরে ধীরে চোখ খুললেন, আর সেই দৃষ্টিতে এমন এক সতর্কতা—যেন তিনি আগাম বিপদের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। তিনি অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি যেটার পেছনে ছুটছ, সেটা এক জীবন্ত শক্তি। এর সঙ্গে ইতিহাসের পাতা নয়, আত্মার ঋণ জড়িত। প্রতিশোধ শেষ না হলে, কারও শান্তি নেই।” তারপর তিনি বেদি থেকে উঠে দাঁড়ালেন, লাল কুঁচিটা আবার হাতে তুলে নিলেন, আর এক মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ফিসফিস করলেন যা কেউ শুনতে পেল না। অরিন্দমের বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি জমে উঠল—সে অনুভব করল, এই রাতের পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না। চারপাশের অন্ধকার যেন আরও ঘনীভূত হয়ে পড়ল, আর বেদির ম্লান আলো ধীরে ধীরে নিভে গেল, রেখে গেল শুধু এক তীব্র গন্ধ আর অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

অন্ধকারে ভরা রাত, শুধু দূরের পেঁচার ডাক আর কাঁপা পাতার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আকাশের চোখ তখনও আধো আলোতে অভ্যস্ত হয়নি, কিন্তু হঠাৎই ভেদ করে আসা সেই চিৎকার তার শরীরের রক্ত জমিয়ে দিল। যেন কারও গলা থেকে উঠে আসা এক মরিয়া, শেষ মুহূর্তের হাহাকার—যা কোনো স্বাভাবিক মানুষের কণ্ঠস্বর নয়, বরং ভিতরের সমস্ত ভয়কে একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে। সে বিন্দুমাত্র দেরি না করে মণ্ডপের দিকে ছুটে গেল, পায়ের তলার ভিজে মাটি, কাঁকর আর শেকড়ে হোঁচট খেয়েও থামল না। ছুটতে ছুটতে তার মনে হচ্ছিল, এই চিৎকার কেবল অরিন্দমের হতে পারে, আর যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে কিছু ভয়ঙ্কর ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। কাছে আসতেই মণ্ডপের ছায়ামূর্তিরা মিলিয়ে গেল—যেন কুয়াশার মধ্যে আঁকা এক দৃশ্য হঠাৎ মুছে দেওয়া হয়েছে।

মণ্ডপের ভিতরে ঢুকতেই আকাশের নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে গেল। অরিন্দম নেই—কোথাও নেই। তার বদলে মাটিতে পড়ে আছে অরিন্দমের চেনা বাদামি চামড়ার ডায়েরি, যার পাতাগুলো হাওয়ায় উল্টে যাচ্ছে, যেন কেউ ইচ্ছে করে তাড়াহুড়োয় রেখে গেছে। ডায়েরির পাশে গলিত মোমের হলুদ দাগ ছড়িয়ে রয়েছে, যেন কয়েক মুহূর্ত আগেই সেগুলো পুড়ছিল। বাতাসে তীব্র চন্দনের গন্ধ, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে পুড়ে যাওয়া ফুলের এক অস্বস্তিকর, তিক্ত ঘ্রাণ। এই গন্ধ আকাশের নাকে পৌঁছাতেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল—এটা স্বাভাবিক কোনো পূজার গন্ধ নয়, বরং কিছু পবিত্র জিনিস বিকৃত হয়ে যাওয়ার দুর্গন্ধ। চারপাশে নিরবতা এত ঘন যে নিজের হৃদস্পন্দনও সে শুনতে পাচ্ছিল।

আকাশ তড়িঘড়ি মণ্ডপের প্রতিটি কোণ খুঁজে দেখল। কিন্তু কোথাও মহাদেব তান্ত্রিকের অস্তিত্ব নেই। সেই লাল কুঁচি, দীপ্তিময় চোখ, কিংবা প্রাচীন মন্ত্রপাঠের ধ্বনি—সব যেন কয়েক মিনিটেই উধাও হয়ে গেছে। আকাশের মনে হল, এই জায়গায় বাস্তবতা আর মায়ার সীমানা মিশে গেছে, আর সে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক বিন্দুতে, যেখানে সময়ও যেন থেমে গেছে। মোমের দাগগুলোর মধ্যে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখতেই হঠাৎ এক শিরশিরে অনুভূতি তাকে গ্রাস করল—যেন মোমের তাপে না, বরং কোনো অদৃশ্য শক্তি তার শরীর ছুঁয়ে গেল। চারদিক অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে উঠল, অথচ কপালে তার ঘাম জমে গেছে। ডায়েরিটা হাতে তুলে নিতেই দেখল, পাতার মধ্যে কিছু কিছু অংশ কালো ছাইয়ের মতো হয়ে গেছে, যেন ভেতরের কিছু লেখা জেনে শুনে মুছে দেওয়া হয়েছে।

হঠাৎ মণ্ডপের বাইরে এক ঝাপটা বাতাস ঢুকে এসে মাটির প্রদীপগুলো নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে আকাশ শুধু অনুভব করতে পারল, বাতাসের সঙ্গে গন্ধটা আরও তীব্র হয়ে উঠছে, আর সেই গন্ধের ভিতর কোথাও লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য উপস্থিতি—যা তার চোখে ধরা দিচ্ছে না, কিন্তু তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। ডায়েরি বুকে চেপে ধরে সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল, কিন্তু মন জানছিল, এ শুধু অরিন্দম বা মহাদেব তান্ত্রিকের অদৃশ্য হওয়া নয়—এটা এক পরিকল্পিত অন্তর্ধান, যার উদ্দেশ্য তাকে জড়িয়ে ফেলা। তার কানে যেন ভেসে এল অস্পষ্ট মন্ত্রের টুকরো, যা মণ্ডপে মহাদেব কিছুক্ষণ আগেই পাঠ করছিলেন, আর তাতে মিলেমিশে ছিল এক অদ্ভুত হাসির প্রতিধ্বনি। আকাশ বুঝল, আজ রাতটা শেষ হলে কিছুই আর আগের মতো থাকবে না।

অরিন্দমের হারিয়ে যাওয়ার পর আকাশ যখন সেই পুরনো ডায়েরিটি নিয়ে প্রমীলা দেবীর বাড়িতে পৌঁছল, তখন সন্ধ্যার শেষ আলো নিঃশব্দে ম্লান হয়ে আসছিল। বাড়ির উঠোনে তখন নিঃশব্দের চাদর, শুধু দূরে কোথাও ভাঙা ঘন্টাধ্বনি যেন বাতাসে দুলে দুলে আসছে। প্রমীলা দেবী জানালার ধারে বসে ছিলেন, হাতে ধরা একটা পুরনো শাল, যেন ঠান্ডা থেকে নয়—কোনো অদৃশ্য শূন্যতার থেকে নিজেকে ঢাকতে চাইছেন। আকাশ ডায়েরিটি টেবিলের ওপর রাখল, আর ধীরে ধীরে শেষ পৃষ্ঠাগুলি খুলল। মলাটের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা ধুলো, কালি-ফিকে হয়ে যাওয়া লেখা, আর পাতাগুলির কিনারে পুরনো আর্দ্রতার দাগ—সবকিছু যেন অতীতের এক ভারি উপস্থিতি বহন করছিল। আকাশের আঙুল যখন শেষ পাতায় পৌঁছল, তখন ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক শীতলতা নেমে এল, যেন বাইরের বাতাস কোনো অদৃশ্য পথে ঢুকে পড়েছে।

শেষ পৃষ্ঠার শীর্ষে অরিন্দমের হাতের লেখা—“চাঁদের আলো পড়তেই অতীত জীবিত হয়ে উঠছে… আমি তাদের দেখছি… তারা আমাকে ডাকছে… আমি যাচ্ছি…”—কথাগুলি যেন পাতার ওপরে নয়, বরং শূন্যে ভেসে উঠেছিল। প্রতিটি শব্দে এমন এক গভীর আকর্ষণ, যা একদিকে ভয়ঙ্কর, অন্যদিকে অবশ্যম্ভাবী মনে হয়। প্রমীলা দেবী ধীরে ধীরে পড়তে পড়তে হাত কাঁপিয়ে শালটা আরও জড়িয়ে নিলেন, চোখের কোণে জল জমে উঠল। তাঁর শ্বাস প্রশ্বাসের ভেতরে যেন অজস্র দীর্ঘশ্বাস গোপনে লুকিয়ে আছে। বাইরে তখন আকাশের ফাঁকে পূর্ণিমার আলো ভেসে উঠছে, জানালার ফাঁক দিয়ে এসে ডায়েরির পাতায় পড়ছে, আর সেই আলোয় অরিন্দমের শেষ বাক্যগুলি যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠছে। আকাশ বুঝতে পারছিল, এটা শুধু কোনো নোটবুকের শেষ লেখা নয়—এ এক প্রস্থানপথের স্বীকারোক্তি।

প্রমীলা দেবী হঠাৎ চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকিয়ে গভীর স্বরে বলতে শুরু করলেন—“তুমি জানো না, এই মণ্ডপের ইতিহাস কত পুরনো… আমার পূর্বপুরুষরা ওখানে যেতেন। শুধু পূজা বা তন্ত্রের জন্য নয়, তারা চাইতেন কিছু যা মানুষের হাতের নাগালের বাইরে—ক্ষমতা। এই ক্ষমতার জন্যই তারা আত্মাদের আহ্বান করতেন। বিশ্বাস করো, তাদের কাছে জীবনের বিনিময়ে শক্তি ছিল সামান্য মূল্য।” তাঁর কণ্ঠে কোনো গর্ব ছিল না, বরং এক ধরনের ক্লান্তি ও অনুশোচনা। আকাশ মন দিয়ে শুনছিল, বুঝতে পারছিল এই স্বীকারোক্তি শুধু এক পরিবারের গোপন কথা নয়—এ এমন এক উত্তরাধিকার যা প্রজন্ম ধরে নীরবে বয়ে চলেছে, আর যার শৃঙ্খল থেকে অরিন্দমও মুক্তি পায়নি। জানালার বাইরে বাতাস হঠাৎ জোরে বয়ে উঠল, যেন অদৃশ্য কেউ এই কথাগুলি শুনে সাড়া দিচ্ছে।

প্রমীলা দেবী শেষবার ডায়েরির দিকে তাকালেন, আঙুল বুলিয়ে দিলেন অরিন্দমের হাতের লেখায়, যেন তাকে শেষবার ছুঁয়ে দেখছেন। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে পাতার ওপর মিশে গেল, আর আকাশ দেখল কালি সামান্য ছড়িয়ে গিয়ে যেন আরো অস্পষ্ট এক আকার ধারণ করছে—মণ্ডপের সেই ত্রিকোণ প্রতীকের মতো। ঘরের ভেতর তখন শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ, বাইরে পূর্ণিমার আলো ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে। আকাশ জানত, এই ডায়েরি এখন শুধু মৃতের শেষ কথা নয়—এ এক দরজা, যা একবার খুলে গেলে আর বন্ধ করা যায় না। প্রমীলা দেবী নিঃশব্দে বললেন, “যারা একবার চলে যায়, তারা আসলে কখনো পুরোপুরি হারায় না… তারা থেকে যায়, অন্য এক রূপে।” আকাশ বুঝল, অরিন্দমের পথচলা শেষ নয়—এ শুধু এক নতুন শুরু, যা এই বাড়ির, এই মণ্ডপের, আর সেই অদৃশ্য আহ্বানের ভেতর দিয়ে বহমান।

১০

পূর্ণিমার রাতের আকাশে এক ধরনের অদ্ভুত শীতলতা ভাসছিল, যেন চাঁদের আলো শুধু চারপাশকে আলোকিত করছে না, বরং সমস্ত শব্দ, সমস্ত জীবনকে গিলে নিচ্ছে। আকাশ ধীরে ধীরে সেই পুরনো মণ্ডপের দিকে এগিয়ে চলেছে, যার পাথরের সিঁড়িগুলো শ্যাওলার চাদরে ঢাকা, আর গায়ে গায়ে জড়িয়ে থাকা বটের শেকড় যেন যুগ যুগ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে আছে। বাতাসে একটা ভারী গন্ধ—ধূপ, ধোঁয়া আর শ্যাওলার মিশ্রণ—নাকে এসে লাগছে, আর প্রতিটি পদক্ষেপে আকাশের মনে পড়ছে অরিন্দমের শেষ দেখা মুখ, যেখানে আতঙ্ক আর অনুতাপ মিশে এক অদ্ভুত দৃষ্টি তৈরি করেছিল। সে জানে, আজ রাতটাই শেষ সুযোগ—যা কিছু সত্যি, যা কিছু অদেখা, সব উন্মোচন হবে এই মণ্ডপে। কাঁপা কাঁপা হাতে যখন সে মণ্ডপের খোদাই করা দরজায় হাত রাখে, ঠান্ডা পাথরের ভেতর দিয়ে এক অদ্ভুত স্রোত যেন তার শরীর জুড়ে ছুটে যায়, আর সেই স্রোতের ভেতর শোনা যায় অতীতের অস্পষ্ট ফিসফিসানি।

ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, মহাদেব তান্ত্রিক এক অন্ধকার কোণে বসে আছেন, চারপাশে জ্বালানো প্রদীপের আলোয় তার মুখ অর্ধেক আলোকিত, অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। তার চোখে সেই গভীর, প্রায় অতিলৌকিক দৃষ্টি—যা মানুষকে শুধু দেখে না, ভেদ করে তার অন্তরে পৌঁছে যায়। আকাশ এগিয়ে গেলে তিনি শান্ত গলায় বলেন, “অরিন্দম চলে গেছে… যেখানে থেকে ফেরে না কেউ।” এই বাক্যটা যেন আকাশের বুকের ভেতর হিম শিরার মতো ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তার কানে হঠাৎই ধরা পড়ে এক মৃদু, কর্কশ ফিসফিসানি—যা নিঃসন্দেহে অরিন্দমের কণ্ঠ, “আমায় বাঁচাও…”। সেই আওয়াজ এত কাছে, এত স্পষ্ট যে আকাশ অবচেতনে চারপাশে তাকায়, কিন্তু কেউ নেই। শুধু চাঁদের আলোয় ঝলমল করা মণ্ডপের সাদা পাথরের মেঝে, যেখানে লম্বা ছায়াগুলো দুলছে প্রদীপের আলোয়। তান্ত্রিক শান্ত ভঙ্গিতে আবার মন্ত্রপাঠ শুরু করেন, কিন্তু আকাশ অনুভব করে, তার চারপাশের বাতাস ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো উপস্থিতি ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে আসছে।

চাঁদের আলো ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে, আর সেই আলোর ভেতর মণ্ডপের দেয়ালে অদ্ভুত ছায়ার খেলা শুরু হয়। প্রথমে সেগুলো এলোমেলো মনে হলেও ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে—মুখ, হাত, আর মানুষের মতো চলমান ছায়া। আকাশের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে যখন সে দেখে, ছায়াগুলোর মধ্যে একটির মুখ হুবহু অরিন্দমের মতো। কিন্তু সেই মুখের চোখ দুটি ফাঁকা, যেন ভিতরে শুধু অন্তহীন শূন্যতা। মহাদেব তান্ত্রিকের কণ্ঠ গর্জে ওঠে—তিনি মন্ত্রপাঠ থামিয়ে বলেন, “তুমি যা শুনছ, তা জীবিতের নয়, মৃতের ডাক। ওর আত্মা বেঁধে রাখা হয়েছে চাঁদের শপথে, আর সেই শপথ ভাঙতে গেলে তুমিও ফিরবে না।” আকাশ দ্বিধায় পড়ে, কিন্তু অরিন্দমের কণ্ঠ আবার ভেসে আসে—এবার আরও যন্ত্রণায়, আরও মরিয়া হয়ে—“আকাশ… আমায় এখান থেকে বের কর…”। মনে হয়, মণ্ডপের চারদিক থেকে সেই ডাক প্রতিধ্বনির মতো ছুটে এসে তার কানে আঘাত করছে। এক ধরনের ঘূর্ণি তাকে কেন্দ্রের দিকে টেনে নিচ্ছে, যেখানে চাঁদের আলো সরাসরি পড়ছে মেঝের একটি ফাটলের উপর।

হঠাৎ, প্রদীপের শিখাগুলো একসাথে কেঁপে উঠে প্রায় নিভে আসে, আর চাঁদের আলো যেন আরও ঠান্ডা, আরও তীক্ষ্ণ হয়ে পড়ে মণ্ডপের মেঝেতে। আকাশ দেখতে পায়, সেই আলোয় এক অদৃশ্য ছায়া ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে—প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর স্পষ্টতর—যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে এগিয়ে আসছে। ছায়াটির চলাফেরায় এক ধরনের অমানবিক ধীরতা, কিন্তু তাতে এমন এক শক্তি আছে যা আকাশের পা মাটি থেকে সরাতে দিচ্ছে না। মহাদেব তান্ত্রিক কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়েই বোঝা যায়, তিনিও এই ছায়াকে থামাতে পারবেন না। আকাশের বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি বেড়ে যায়, কপালে ঠান্ডা ঘাম জমে, আর সেই মুহূর্তে সে স্পষ্ট শুনতে পায়—ছায়াটি ফিসফিস করছে তার নাম। চাঁদের আলোয় ছায়াটির হাত ধীরে ধীরে উঠছে, যেন আকাশকে ছুঁতে চাইছে—আর আকাশ বুঝতে পারে, এই স্পর্শ হয়তো তাকে অরিন্দমের কাছে নিয়ে যাবে, অথবা এমন এক অন্ধকারে ঠেলে দেবে যেখান থেকে ফেরা নেই। ঠিক সেই মুহূর্তেই গল্প শেষ হয়, মণ্ডপের উপর চাঁদের আলো কাঁপতে কাঁপতে পুরো দৃশ্যকে গিলে নেয়, আর অদৃশ্য ছায়াটি আকাশের দিকে আরও এক পা এগিয়ে আসে।

শেষ

 

1000051759.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *