Bangla - কল্পবিজ্ঞান

চন্দ্রপুরীর বাসিন্দা

Spread the love

তানভীর আহসান


চাঁদের বুকে ভোর হয় না, সূর্যের আলো যখন ঘুরে আসে তখনই কেবল অন্ধকার দূর হয়, আর সেই মুহূর্তগুলোই মানুষের হৃদয়ে জন্ম দেয় নতুন আশার আলো। পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দূরে, মহাকাশের বিশাল শূন্যতাকে অতিক্রম করে, বাংলাদেশ বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে মানুষের প্রথম চন্দ্রনগরী—“চন্দ্রপুরী”। গম্বুজের মতো কাচের বিশাল কাঠামোর নিচে গড়ে উঠেছে এক টুকরো প্রাণ, যেখানে পৃথিবীর সবুজ শস্য আর কৃত্রিম জলাধারের ঝিলিক ভেসে ওঠে। এই স্বপ্নের নগরীতে মানুষের প্রতিটি নিশ্বাসই যেন একেকটি বিজয়ের গল্প বলে। চারপাশে ধূসর পাথরের মরুভূমি, আকাশে নক্ষত্রের ঠাণ্ডা ঝিকিমিকি আর দূরে পৃথিবীর নীলাভ বলয়, কিন্তু চন্দ্রপুরীর গম্বুজের ভেতরে মানুষের চোখে ভাসে সবুজ ফসলের কণা, গবেষণাগারের আলো, আর হালকা হাসির ঝলক। রিয়াজ হোসেন, বাংলাদেশের প্রবীণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দাঁড়িয়ে ছিলেন গম্বুজের স্বচ্ছ দেয়ালের পাশে, পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে। তাঁর হৃদয় ভরে উঠছিল গর্বে—যে স্বপ্ন তিনি কৈশোরে দেখেছিলেন, আজ তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। মানুষের এই চন্দ্রনগরী কেবল প্রযুক্তির বিস্ময় নয়, এটি মানবজাতির অদম্য সাহসের প্রতীক, এমন এক নতুন ভোরের প্রতিচ্ছবি, যেখানে পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে মহাকাশের অচেনা প্রান্তরে।

চন্দ্রপুরীর ভেতরে জীবন ছিল ব্যস্ত, কিন্তু এক ধরনের মায়াবী ছন্দে ভরা। গবেষকরা সকালেই নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত—কেউ মাটি পরীক্ষা করত, কেউ হাইড্রোপনিক বাগানে সবজি চাষের দিকে মনোযোগ দিত, কেউ বা সোলার এনার্জি রিঅ্যাক্টরে নতুন পরীক্ষা চালাত। শিশুদের হাসি শোনা যেত স্কুলে, যেখানে তারা পৃথিবীর ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে শিখত চন্দ্রনগরীর জীবনের পাঠ। বাতাসে ভেসে আসত ভিন্নধর্মী ঘ্রাণ—অক্সিজেন মেশানো কৃত্রিম বাতাসে মিশে থাকা চাঁদের ধুলোর হালকা গন্ধ। একপাশে ছোট্ট পার্কে বাচ্চারা ফুটবল খেলত, যদিও মাধ্যাকর্ষণ কম থাকায় বলটি অদ্ভুতভাবে লাফিয়ে উঠত, আর তাতেই তারা আনন্দে চিৎকার করে উঠত। এ যেন নতুন এক পৃথিবী, মানুষের তৈরি কৃত্রিম আকাশের নিচে বিকশিত এক অদ্ভুত সুন্দর জগৎ। রিয়াজ হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করছিলেন, মানুষের অভিযাত্রা কতটা অবিশ্বাস্য হতে পারে—যেখানে একসময় পৃথিবীর গ্রামে ধান কাটার গান গাওয়া হত, আজ সেই জাতির সন্তানরা চাঁদের বুকে নতুন শহরের ইট বসাচ্ছে। তাঁর মনে হচ্ছিল, চন্দ্রপুরী শুধু একটি বৈজ্ঞানিক প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের, এমনকি সমগ্র মানবজাতির এক মহাকাব্যিক যাত্রার সূচনা।

তবে প্রতিটি ভোরের মতোই এই ভোরেরও ছিল এক অদৃশ্য রহস্যময়তা। গম্বুজের ভেতরে আলো ঝলমল করলেও, বাইরে ছিল নিঃশব্দ, শূন্যতা আর অজানা ভয়ের রাজত্ব। গবেষকরা জানত, চাঁদের মাটি নিস্তব্ধ হলেও তাতে লুকিয়ে আছে অজানা উপাদান, এমনকি হয়তো অচেনা প্রাণের সম্ভাবনাও। কিন্তু এই ভোরে সেই সব আশঙ্কা কেউ মনে আনতে চায়নি। সবাই চেয়েছিল আশা নিয়ে দিন শুরু করতে, যেন পৃথিবীর জন্য সুখবর পাঠানো যায়—মানুষ সত্যিই চাঁদকে বাসযোগ্য করে তুলতে পারছে। রিয়াজ তাঁর সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে উঠলেন, “এটাই মানব সভ্যতার নতুন ঠিকানা।” তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল আগুনের ঝিলিক। হয়তো তিনি জানতেন না, সামনে অপেক্ষা করছে এক ভয়ঙ্কর আবিষ্কার—যা বদলে দেবে মানুষের মহাকাশ অভিযাত্রার সংজ্ঞা। তবু এই মুহূর্তে তিনি বিশ্বাস করতে চাইছিলেন কেবল একটাই কথা—চন্দ্রপুরীর ভোর মানেই ভবিষ্যতের আলো।

চন্দ্রপুরীর প্রতিদিনের কাজকর্ম সাধারণত যান্ত্রিক নিয়ম মেনে চলত। সূর্যের আলো গম্বুজের উপর পড়লে আলোকশক্তি সংগ্রহের যন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠত, গবেষকরা নিজেদের ল্যাবরেটরিতে ঢুকে পরীক্ষা শুরু করত, আর কৃত্রিম অক্সিজেন পাম্প নিরবচ্ছিন্নভাবে বাতাসে জীবন জোগাত। কিন্তু সেই দিনের সকালটা কিছুটা ভিন্ন ছিল। তরুণ এক্সোবায়োলজিস্ট নুসরাত রহমান নিজের ল্যাবে বসে হাইড্রোপনিক সবজি চাষের জন্য ব্যবহৃত সেন্সর ডেটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন—তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে, যেন যন্ত্রগুলো কোনো অদৃশ্য প্রভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলেন হয়তো সিগন্যাল ট্রান্সমিশনের সমস্যা, কিন্তু মেশিনের সার্কিট পরীক্ষা করেও তিনি কোনো ত্রুটি খুঁজে পাননি। আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল—যখনই তিনি ডেটা লগ পুনরায় চালু করছিলেন, মেশিনগুলো নিজেরাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। নুসরাত জানতেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এখানে বিরল, কারণ প্রতিটি যন্ত্র তিন স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল, মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি জন্ম নিতে লাগল। যেন কেউ বা কিছু ইচ্ছে করেই তাঁর কাজ ব্যাহত করছে।

সন্ধ্যার পর চন্দ্রপুরীর ভেতর আলো নিভে গেলে এবং গম্বুজের বাইরে তারারাজি জ্বলে উঠলে নুসরাত আরও অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন। ল্যাবের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, চাঁদের ধুলোয় হালকা ঢেউ খেলে যাচ্ছে, অথচ বাতাস নেই, কোনো নড়াচড়া নেই। তাঁর চোখে ভেসে উঠল ধূসর জমিনে অদ্ভুত এক ছায়া, যা মানুষের ছায়ার মতো নয়, বরং প্রবাহমান ধোঁয়ার মতো। তিনি দ্রুত সিস্টেমে রেকর্ড করতে চাইলেন, কিন্তু ক্যামেরা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, স্ক্রিনে দেখা গেল কেবল বিকৃত সাদা রেখা। তিনি বুঝলেন না এটা যন্ত্রের সমস্যা নাকি অন্য কিছু। সেই মুহূর্তে তাঁর শরীর শিউরে উঠল—মনে হল কেউ যেন তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন, অদৃশ্য দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন, কিন্তু ল্যাবের নিঃশব্দ অন্ধকার ছাড়া কিছুই ছিল না। শ্বাস ভারী হয়ে উঠল, হাত ঘামে ভিজে গেল, আর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল। তিনি বারবার নিজেকে বোঝাতে চাইলেন—এটা নিছক কল্পনা, চাপের কারণে হ্যালুসিনেশন। কিন্তু ভেতরের কোনো অজানা কণ্ঠ যেন বলছিল—না, তুমি একা নও, কেউ তোমাকে লক্ষ্য করছে।

রাত গভীর হলে নুসরাত গম্বুজের করিডর দিয়ে হেঁটে নিজের থাকার কক্ষে ফিরছিলেন। গম্বুজের স্বচ্ছ দেয়ালের ওপারে দেখা যাচ্ছিল দূরের পৃথিবীর নীল গোলক—এক টুকরো উজ্জ্বল আশ্বাস, কিন্তু তাঁর মনে তা পৌঁছাচ্ছিল না। পায়ের শব্দ ধাতব মেঝেতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, আর প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল কেউ তাঁর সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটছে। তিনি একবার ঘুরে তাকালেন—কেউ নেই। গম্বুজের অন্ধকার কোণে হঠাৎই চোখে পড়ল এক ঝলক ছায়া, যেটা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। নুসরাতের গলা শুকিয়ে গেল, বুকের ভেতর ভয় আর কৌতূহল একসাথে তোলপাড় করতে লাগল। তিনি বুঝলেন, এটা কেবল যন্ত্রের সমস্যা নয়, এর পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি আছে। কিন্তু সেই শক্তি কী? শত্রু নাকি অচেনা সহবাসী? বিছানায় শুয়েও তিনি অনুভব করছিলেন, তাঁর ঘরের ভেতরে কোনো এক অচেনা সত্তা নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই রাতে নুসরাত চোখ বন্ধ করলেও ঘুম এল না, কেবল বারবার মনে হচ্ছিল—চন্দ্রপুরী যতটা নিরাপদ মনে হয়, আসলে তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর অদৃশ্য ছায়া।

চন্দ্রপুরীর কৃত্রিম হাসপাতাল ইউনিটে সেই সকালে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ড. মায়া সেন, তরুণ ও সাহসী চিকিৎসক, দেখলেন কয়েকজন কর্মী একসাথে অস্বাভাবিক মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের চোখ লাল, কপালে ঘাম জমে আছে, আর তারা এক অদ্ভুত আতঙ্কে কাঁপছে। একজন গবেষক চিৎকার করে বলল—“আমাদের চারপাশে কিছু আছে, যারা আমাদের দেখছে। ওরা দেয়ালের ভেতর দিয়ে চলে বেড়ায়, আমাদের শ্বাসের শব্দও শুনতে পায়।” আরেকজন কর্মী কাঁপা কণ্ঠে জানাল, রাতের অন্ধকারে তিনি অনুভব করেছেন কেউ যেন তাঁর কাঁধে হাত রেখেছে, অথচ ঘরে কেউ ছিল না। মায়া প্রথমে এটাকে মানসিক চাপ, কাজের ক্লান্তি আর নিঃসঙ্গতার ফল ভেবেছিলেন। চাঁদের মাটিতে গড়ে ওঠা এই নগরীতে দীর্ঘসময় বিচ্ছিন্ন জীবন যাপনে কারও কারও মধ্যে মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তিনি ধৈর্য ধরে রোগীদের মনোচিকিৎসা শুরু করলেন, মেডিকেল স্ক্যান করলেন, আর সেডেটিভ দিলেন যাতে তারা শান্তিতে ঘুমোতে পারে। কিন্তু তাঁর ভেতরে এক প্রশ্ন ক্রমশ জেগে উঠছিল—একই সময়ে এতজনের মধ্যে হঠাৎ এই বিভ্রম দেখা দিল কেন? নিছক কল্পনা কি একইরকম ভয় একসাথে এতজন মানুষের মনে আনতে পারে?

দিনের কাজকর্ম এগোতে থাকলেও হাসপাতালের আবহ ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল। রোগীরা বারবার একই কথা বলতে শুরু করল—“ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে… আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে…” মায়া যখন তাদের চোখের গভীরে তাকালেন, দেখলেন সেখানে আতঙ্কের এমন ছাপ, যা কেবল মানসিক বিভ্রান্তিতে হয় না। তাদের শরীরেও অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন—কারও কারও শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে, আবার কারও হার্টবিট অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যেন তারা কোনো অদৃশ্য শক্তির সংস্পর্শে এসেছে। মায়া নোট নিলেন, তুলনা করলেন, কিন্তু সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন না। এক বিকেলে তিনি নিজের সহকর্মী নুসরাত রহমানকে ডেকে বললেন, “আমি জানি তুমি যন্ত্রে কিছু অদ্ভুত গণ্ডগোল লক্ষ্য করেছ। এখন আমার রোগীরাও একইভাবে বলছে—কেউ তাদের দেখছে। এটা নিছক কাকতালীয় মনে হচ্ছে না।” নুসরাত ভ্রু কুঁচকে বললেন, “আমি-ও মনে করি, চন্দ্রপুরীর বাইরে কোনো অদৃশ্য সত্তা আছে। হয়তো এরা মানুষের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলছে।” মায়া ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে লাগলেন—যা তিনি হ্যালুসিনেশন ভেবেছিলেন, তা হয়তো আসলে চন্দ্রপুরীর অদৃশ্য বাসিন্দাদের প্রথম ছোঁয়া।

রাত গভীর হলে মায়া নিজের থাকার কক্ষে ফিরলেন। ছোট্ট কেবিনে কৃত্রিম আলো জ্বলছিল, দেয়ালে ঝোলানো ছিল পৃথিবীর একটি ছবি—যা তাঁকে প্রতিদিন আশ্বাস দিত যে তিনি একদিন ফিরে যাবেন নিজের পরিচিত জগতে। কিন্তু সেই রাতে তিনি নিজেকে শান্ত করতে পারলেন না। রোগীদের আতঙ্কিত চোখের ছবি বারবার তাঁর মনে ভেসে উঠছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই মনে হল ঘরের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। চন্দ্রপুরীর প্রতিটি কক্ষ বায়ুরোধী সুরক্ষায় তৈরি, সেখানে হঠাৎ করে কোনো বাতাস প্রবাহিত হওয়ার কথা নয়। তাঁর শরীর হিম হয়ে গেল, বুক ধকধক করতে লাগল। কানে ভেসে এল হালকা গুঞ্জন, যেন কেউ তাঁর কানের খুব কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। তিনি তড়াক করে উঠে বসলেন, কিন্তু ঘরে কেউ নেই—শুধু দেয়ালের ছায়া। মুহূর্তের জন্য মনে হল, কোনো অদৃশ্য চোখ তাঁকে লক্ষ্য করছে, যেন তিনি আর একা নন। মায়া নিজেকে বোঝালেন—এটা নিছক মানসিক ক্লান্তি, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে তিনি জানলেন, তাঁর রোগীরা মিথ্যে বলেনি। সেই রাত থেকে ড. মায়া সেনের নিজের জীবনও রোগীদের মতো আতঙ্কে গ্রাস হতে শুরু করল—চন্দ্রপুরীতে সত্যিই কিছু আছে, যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, অথচ প্রতিটি ভোর আর রাত তাদের ঘিরে ধরে আছে নিঃশব্দ উপস্থিতি নিয়ে।

ইশতিয়াক কবির ছিলেন চন্দ্রপুরীর সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী প্রকৌশলী। পৃথিবীতে থাকাকালীন তিনি অসংখ্য স্পেস স্টেশন ও লুনার রোভার মেরামত করেছেন, তাঁর যন্ত্রবিজ্ঞানের ওপর দখল ছিল অটল। তাই যখন গবেষকরা তাঁকে এসে বলল—মেশিন হঠাৎ থেমে যাচ্ছে, স্ক্যানারে অজানা বিকৃতি ধরা পড়ছে, বা ডেটা বিশৃঙ্খল হয়ে যাচ্ছে—তখন তিনি কেবল এক চিলতে হাসি দিয়ে উত্তর দিলেন, “সবই যন্ত্রগত গোলমাল।” তাঁর কাছে ভূত-প্রেত, অদৃশ্য ছায়া বা রহস্যময় শক্তির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তিনি কন্ট্রোল রুমে দাঁড়িয়ে ডজনখানেক যন্ত্রপাতির মনিটর পরীক্ষা করছিলেন, আর ঠান্ডা মাথায় বলছিলেন—“কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান বৈজ্ঞানিকভাবেই হয়।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনিও বুঝতে পারছিলেন, চন্দ্রপুরীর ভেতরে কিছু যেন অস্বাভাবিক ঘটছে। কয়েকদিন আগে এক স্যাটেলাইট স্ক্যান করতে গিয়ে তাঁর যন্ত্র হঠাৎ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি সব শক্তি শুষে নিয়েছে। আবার চালু করার পরও ডেটায় দেখা গেল—গম্বুজের বাইরে কোনো অদ্ভুত নড়াচড়া, যা মানুষের নয়, যন্ত্রেরও নয়। তবুও ইশতিয়াক নিজেকে বোঝালেন, এটা শুধু প্রোগ্রামিং-এর ত্রুটি, হয়তো সিগন্যালের গোলযোগ। কিন্তু সেই রাতেই তিনি হঠাৎ অনুভব করলেন—কন্ট্রোল রুমে এক অদ্ভুত কম্পন, যা কোনো যন্ত্রের ত্রুটিতে হয় না, বরং যেন কোনো উপস্থিতি নীরবে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর পেছনে।

পরের দিন ইশতিয়াক আরও কঠোরভাবে যন্ত্রগুলো পরীক্ষা শুরু করলেন। তাঁর সহকর্মীরা ভয় পেয়ে যন্ত্র চালাতেই নারাজ, কিন্তু তিনি একাই সব সিস্টেম রিবুট করলেন, স্যাটেলাইট স্ক্যান আবার চালালেন। প্রথমে সব ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু হঠাৎ করে মনিটরে ঝলক দিয়ে উঠল এক অদ্ভুত আকৃতি—অর্ধেক ছায়া, অর্ধেক আলোর বিন্যাস, যা মানুষের মতো আবার যন্ত্রের মতোও নয়। সেই চিত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল, তারপর মিলিয়ে যায়, আর সিস্টেম সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। ইশতিয়াক বিস্মিত হয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন, কীভাবে সম্ভব এই বিকৃতি? তিনি সার্কিট খুলে আবার পরীক্ষা করলেন, পাওয়ার সাপ্লাই, কোডিং, অ্যালগরিদম—সবই ঠিকঠাক। যুক্তি দিয়ে কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। সেই রাতে তিনি নিজের লগবুকে লিখলেন—“আজ প্রথমবার স্বীকার করছি, যন্ত্রের ভেতরে এমন কিছু ঘটছে, যা কেবল বৈজ্ঞানিক ত্রুটি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি যন্ত্রগুলোর সঙ্গে খেলছে।” কিন্তু পরক্ষণেই নিজের লেখার পাশে একটি লাল দাগ টেনে লিখলেন—“অতিপ্রাকৃত কিছু নেই, এরও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে।” তাঁর অহংকার এখনো ভাঙেনি, যদিও ভেতরে ভেতরে ভয় তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

তৃতীয় দিনে ইশতিয়াক ঠিক করলেন, তিনি গম্বুজের বাইরে গিয়ে সরাসরি স্যাটেলাইট মডিউলের কাছে যাবেন। সাদা স্যুট পরে যখন তিনি চাঁদের মাটিতে পা রাখলেন, তখন চারপাশে ছিল অদ্ভুত নীরবতা, শুধু তাঁর নিজের শ্বাসের শব্দ হেলমেটের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তিনি যন্ত্রের প্যানেল খুলে দেখতে শুরু করলেন, কিন্তু হঠাৎ তাঁর স্ক্রিনে দেখা গেল—একটা ছায়া, যা তাঁর পাশেই নড়ছে। তিনি তাড়াতাড়ি মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন—কেউ নেই। আবার স্ক্রিনে তাকাতেই দেখলেন, ছায়াটা ক্রমশ কাছে আসছে। তাঁর হাত কাঁপছিল, তবু তিনি রেকর্ড বোতামে চাপ দিলেন, কিন্তু যন্ত্র আবার বন্ধ হয়ে গেল। সেই মুহূর্তে তাঁর ভেতরের যুক্তি আর অহংকার একসঙ্গে ভেঙে পড়ল। তিনি বুঝলেন, এ কেবল প্রযুক্তির ত্রুটি নয়—চন্দ্রপুরীর বাইরে এমন কিছু আছে, যা মানুষের দৃষ্টি বা যন্ত্রের লজিকে বাঁধা পড়ে না। গম্বুজে ফিরে আসার পর তিনি আর অন্যদের সামনে কিছু বলেননি, কিন্তু চোখেমুখের আতঙ্ক দেখে সবাই বুঝেছিল—প্রযুক্তির ভরসায় দাঁড়িয়ে থাকা ইশতিয়াক কবিরও এখন সেই অদৃশ্য ছায়ার অস্তিত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।

কর্নেল তানভীর আহমেদ ছিলেন একজন অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা, পৃথিবীতে বহু শান্তিরক্ষা মিশনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। চন্দ্রপুরীতে নিযুক্ত হওয়ার সময় তাঁর ভেতরে গর্বের সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের দায়িত্ববোধও ছিল—এটাই মানবজাতির ভবিষ্যতের প্রথম পদক্ষেপ, আর সেটি নিরাপদ রাখা তাঁর দায়িত্ব। যখন বিজ্ঞানীরা তাঁকে জানালেন, অদ্ভুত ছায়ার উপস্থিতি আর যন্ত্রের বিকৃতি তাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে, তিনি প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, কোনো রহস্যকথা বা অদৃশ্য শক্তি নেই, সবই মানসিক আতঙ্ক। তাই তিনি সৈন্য মোতায়েন করলেন চন্দ্রপুরীর ভেতরে এবং বাইরে—অটোমেটিক রাইফেল, লেজার টারেট, সেন্সর ড্রোন সব কিছু ব্যবহার করে গম্বুজ ঘিরে ফেলা হলো। কিন্তু প্রথম রাতেই তিনি বুঝলেন, এ শত্রু কোনো সাধারণ শত্রু নয়। সৈন্যরা টহল দিতে দিতে হঠাৎ থেমে গেল, যেন তারা কারো দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ সেখানে কিছুই নেই। তাদের চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক ফুটে উঠল। কেউ কেউ হেলমেট খুলে ফেলতে চাইছিল, কেউ বা আকাশের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য কারো সঙ্গে কথা বলছিল। কর্নেল গর্জে উঠলেন, “সতর্ক হও! অস্ত্র তাক করো!” কিন্তু তাঁর নিজের কণ্ঠেও কাঁপন চলে এসেছিল। যেন অদৃশ্য শক্তি বাতাস ভেদ করে তাদের মনে ঢুকে পড়ছে, চিন্তাগুলোকে বদলে দিচ্ছে, ভয়কে বাস্তবে রূপান্তরিত করছে।

পরের দিন সকালের বৈঠকে তিনি সৈন্যদের অবস্থার কথা জানালেন। অনেকেই হঠাৎ দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে, কেউ অকারণে আতঙ্কে চিৎকার করছে, আবার কেউ নিজের সহযোদ্ধার ওপর অস্ত্র তাক করছে। এই পরিস্থিতিকে সামলাতে কর্নেল তানভীর কড়া শৃঙ্খলার ব্যবস্থা নিলেন—অতিরিক্ত নজরদারি, অস্ত্র সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখা, আর যেকোনো অস্বাভাবিক আচরণ করলেই তাৎক্ষণিক মেডিক্যাল আইসোলেশন। কিন্তু এতকিছুর পরও রাত নামলেই সমস্যা বাড়তে লাগল। সেন্সর ড্রোনগুলো নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, বা হঠাৎ এমন কিছু ছবি পাঠাচ্ছিল যেখানে মানুষের ছায়ার মতো কিছু চলাফেরা করছে, অথচ এলাকায় কোনো মানুষ নেই। কর্নেল নিজে বাইরে টহল দিতে বের হলেন, তাঁর হাতে লেজার রাইফেল। চারপাশের চাঁদের ধূসর মাটি, দূরের অন্ধকার শূন্যতা আর নক্ষত্রভরা আকাশ তাঁকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢেকে ফেলল। হঠাৎই তাঁর হেলমেটের ভেতরে ফিসফিসানি শোনা গেল—“তুমি আমাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো…”। তিনি তড়িঘড়ি কমিউনিকেশন চ্যানেল পরীক্ষা করলেন, কিন্তু সব নিস্তব্ধ। ফিসফিসানি যেন তাঁর মনের ভেতর থেকেই আসছে। তাঁর হাত কাঁপতে লাগল, অথচ একজন সেনাপতি হিসেবে তিনি ভয় প্রকাশ করতে পারলেন না।

চন্দ্রপুরীর ভেতরে সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়তে শুরু করল। তারা আর যন্ত্র বা অস্ত্রের ওপর ভরসা রাখতে পারছিল না, কারণ শত্রু কোনো দেহধারী সত্তা নয়, বরং তাদের মনকেই আক্রমণ করছে। ড. মায়া সেন পরে বলেছিলেন, এই শক্তি মানুষের ভয়কে বাড়িয়ে তুলছে, তাদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। কর্নেল তানভীর বুঝতে পারলেন, প্রযুক্তি বা সামরিক শক্তি দিয়ে এই অদৃশ্য প্রতিপক্ষকে হারানো সম্ভব নয়। তিনি সৈন্যদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিলেন, “আমরা অস্ত্র হাতে নিয়েছি, কিন্তু যুদ্ধটা আমাদের মনে লড়াই করছে। ভয়কে জয় করতে না পারলে এই গম্বুজ কেউ রক্ষা করতে পারবে না।” তাঁর কণ্ঠে দৃঢ়তা থাকলেও চোখেমুখের ক্লান্তি আর উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেই রাতেই আবার টহলের সময় একদল সৈন্য একে অপরের ওপর অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে রইল, কারণ তারা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করছিল, অন্যজন আর মানুষ নেই। গুলির শব্দ গম্বুজের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হলো, রক্ত ঝরল, আর কর্নেল তানভীর নিস্তব্ধ চোখে বুঝলেন—নিরাপত্তার সমস্ত আয়োজন ব্যর্থ হয়ে গেছে। চন্দ্রপুরীর প্রথম প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়েছে, আর অদৃশ্য শত্রু ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

চন্দ্রপুরীর গবেষণাগারে রাত তখন গভীর, কিন্তু নুসরাত রহমানের চোখে ঘুম নেই। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্ত্রপাতির অকারণ বিকৃতি, ডেটার অসঙ্গতি আর অদৃশ্য উপস্থিতির অনুভূতি তাঁকে তাড়া করে ফিরছে। অন্য গবেষকেরা যখন এটাকে স্রেফ টেকনিক্যাল ত্রুটি বা মানুষের মানসিক চাপ বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তখন নুসরাতের কৌতূহল আর বৈজ্ঞানিক জেদ তাঁকে শান্ত থাকতে দিচ্ছিল না। তিনি নিজের উদ্যোগে এক নতুন পরীক্ষা শুরু করলেন। চাঁদের ধুলো, যেটা প্রতিদিন মানুষের জুতায় লেগে আসে কিংবা যন্ত্রের ভেতরে ঢুকে পড়ে, সেটাকেই তিনি গবেষণার কেন্দ্রে রাখলেন। মাইক্রোস্কোপিক লেন্স আর কোয়ান্টাম কম্পন শনাক্তকারী যন্ত্র বসিয়ে তিনি চাঁদের ধুলোতে অদৃশ্য কোনো তরঙ্গ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। প্রথমদিকে সব ডেটাই নিস্তব্ধ ছিল, কিছুই ধরা পড়ছিল না। কিন্তু এক মধ্যরাতে, যখন চারপাশের ল্যাব নিস্তব্ধ, তখন হঠাৎ তাঁর যন্ত্রে এক অস্বাভাবিক কম্পন ধরা পড়ল—এক ধরনের অদৃশ্য তরঙ্গ, যা মানুষের চোখে অদৃশ্য, কিন্তু ধুলো কণাগুলোর গতি পাল্টে দিচ্ছিল। যেন কোনো অজানা শক্তি চারপাশে লুকিয়ে থেকে তার উপস্থিতি জানাচ্ছে। নুসরাত শিহরিত হলেন; এতদিনের সন্দেহ প্রথমবারের মতো প্রমাণের আকারে ধরা দিল।

তিনি দ্রুত পরীক্ষা পুনরায় চালালেন এবং দেখলেন, প্রতিবার যখন তিনি ল্যাবের আলো কিছুটা ম্লান করেন বা শব্দের তরঙ্গ পরিবর্তন করেন, তখনই সেই অদৃশ্য শক্তির কম্পন বেড়ে যায়। যেন তারা মানুষের চোখ এড়িয়ে আলো-অন্ধকারের সীমানায় বাস করে। তাঁর মনে হলো, চাঁদের বুকে মানুষের আগমনের বহু আগে থেকেই হয়তো এই সত্তাগুলো এখানে ছিল। তারা দৃশ্যমান জগতের বাইরে বেঁচে আছে—না আলোতে, না অন্ধকারে, বরং মানুষের ধারণার সীমার বাইরে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। নুসরাত উচ্ছ্বসিত হয়ে তাঁর আবিষ্কার লিপিবদ্ধ করলেন—“এরা অদৃশ্য প্রাণী, যাদের অস্তিত্ব মানুষের সাধারণ ইন্দ্রিয় বা চোখ দিয়ে ধরা সম্ভব নয়। চাঁদের ধুলোয় তাদের কম্পনের চিহ্ন রয়ে গেছে। হয়তো তারা আমাদের দেখছে, আমাদের সঙ্গে সহাবস্থান করছে, অথচ আমরা তাদের ছুঁতেও পারছি না।” সকালে বৈঠকে তিনি সবাইকে ফলাফল দেখালেন। ড. মায়া প্রথমে বিস্মিত হয়ে তাকালেন, কর্নেল তানভীর ভ্রু কুঁচকে বললেন—“প্রমাণ থাকলেও, এটা কি আমাদের জন্য হুমকি?” কিন্তু প্রকৌশলী ইশতিয়াক ঠান্ডা গলায় মন্তব্য করলেন—“একটা যন্ত্রের অস্বাভাবিক কম্পন মানেই প্রাণীর অস্তিত্ব নয়।” বৈঠকজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল—নুসরাতের বক্তব্য কারও কাছে যুগান্তকারী আবিষ্কার, আবার কারও কাছে নিছক কল্পনা।

তবুও নুসরাত নিরুৎসাহ হলেন না। তাঁর চোখে দৃঢ়তা স্পষ্ট ছিল। তিনি জানতেন, মানুষ যখন প্রথম আগুন আবিষ্কার করেছিল, তখনও অনেকে বিশ্বাস করেনি। আজকের এই আবিষ্কারও হয়তো সেইরকম এক নতুন অধ্যায়। তবে তাঁর ভেতরে ভয়ও বাড়ছিল। যদি সত্যিই এরা বেঁচে থাকে, তবে তারা মানুষকে দেখছে—কিন্তু কেন? নুসরাত মনে মনে প্রশ্ন তুললেন, এই অদৃশ্য প্রাণীরা কি শুধু পর্যবেক্ষক, নাকি মানুষের উপস্থিতি তাদের অস্থির করে তুলেছে? সেই রাতে তিনি ল্যাবে একা কাজ করতে করতে আবারও সেই কম্পনের রেখা অনুভব করলেন, কিন্তু এবার যন্ত্রের বাইরে তাঁর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল, যেন বাতাসে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। তিনি বুঝলেন, যন্ত্র শুধু তাদের অস্তিত্ব ধরতে পারে না, তাঁর নিজের শরীরও সেই উপস্থিতি টের পাচ্ছে। চন্দ্রপুরীতে এই প্রথমবার বিজ্ঞানের যুক্তি আর অদৃশ্য আতঙ্ক এক হয়ে গেল। নুসরাতের আবিষ্কার সবাইকে নাড়া দিলেও, কেউ এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে রাজি হলো না। কিন্তু তিনি জানতেন, সত্য অস্বীকার করে রাখা যাবে না, কারণ এই আবিষ্কারই হয়তো ঠিক করবে—মানুষ চাঁদে টিকে থাকবে, নাকি অদৃশ্য শক্তির ছায়ায় হারিয়ে যাবে।

রিয়াজ হোসেন, চন্দ্রপুরীর প্রথম প্রশাসনিক প্রধান এবং স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি একদিন কল্পনা করেছিলেন যে এই চন্দ্রনগরী হবে মানব সভ্যতার নতুন ঠিকানা, সেদিন এক অভিযানে বের হলেন। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার, প্রকৌশলীদের ব্যর্থতা আর সৈন্যদের আতঙ্ক দেখে তিনি আর নির্লিপ্ত থাকতে পারলেন না। ভেতরে ভেতরে তাঁর মনে হচ্ছিল—যদি সত্যিই এখানে কোনো অদৃশ্য শক্তি থাকে, তবে তা সরাসরি নিজের চোখে দেখা কিংবা নিজের শরীরে অনুভব করাই হবে প্রকৃত প্রমাণ। তাই তিনি ছোট একটি টহলদল নিয়ে চন্দ্রপুরীর বাইরের ধূসর প্রান্তরে গেলেন। সামনে শুধু শূন্যতা—পৃথিবীর আলো ম্লান হয়ে এসে পড়ে চাঁদের মাটিতে, আর দূরে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। নীরবতা এত গভীর যে নিজের শ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। হঠাৎ তাঁর মনে হলো চারপাশের বায়ু অস্বাভাবিকভাবে ঘন হয়ে এসেছে। চাঁদে বায়ু নেই বললেই চলে, কৃত্রিম স্যুট ছাড়া এক মুহূর্তও টিকে থাকা যায় না, কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর স্যুটের ভেতরে যেন চাপ তৈরি হলো। শরীর ভারী হয়ে গেল, বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি জমে উঠল। তাঁর মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য কারো উপস্থিতি চারপাশ থেকে তাঁকে ঘিরে ফেলছে, যেন তিনি একা নন, বরং এক বিশাল ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন।

হেলমেটের ভেতরে হঠাৎ কানে এলো এক অচেনা গুঞ্জন। সেটা কোনো রেডিও সিগন্যাল নয়, কোনো পরিচিত যান্ত্রিক শব্দও নয়। বরং মনে হচ্ছিল, শব্দটা তাঁর কানের ভেতর থেকে আসছে, আবার একইসঙ্গে চাঁদের ধুলোমাখা শূন্যতাতেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শব্দের ভেতরে ছিল অজানা ছন্দ, অচেনা ভাষা, যা মানুষের কোনো ভাষার সঙ্গে মেলে না, কিন্তু অনুভূতির স্তরে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। যেন কেউ তাঁকে বলছে—“আমরা এখানে আছি… আমরা সবসময় দেখছি।” রিয়াজ শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিলেন, তবু মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করলেন। তাঁর পাশে থাকা টহলদলের কয়েকজনও অস্থির হয়ে উঠল; কেউ কেউ হেলমেট খুলে ফেলতে চাইছিল, যেন তারা অসহ্য কোনো চাপ অনুভব করছে। কিন্তু রিয়াজ সবাইকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিলেন, যদিও তাঁর নিজের গলাতেও আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠেছিল। তাঁর ভেতরে তখন দুটি অনুভূতি লড়াই করছিল—একদিকে ভয়, অন্যদিকে বিস্ময়। তিনি বুঝতে পারলেন, এতদিন যাদের নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিতর্ক করছিলেন, সেই অদৃশ্য প্রাণীরা সত্যিই বিদ্যমান। তারা শুধু চন্দ্রপুরীর যন্ত্রপাতি বিকৃত করছে না, শুধু সৈন্যদের মনে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিচ্ছে না—তারা সচেতনভাবে মানুষকে পর্যবেক্ষণ করছে, হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে মানুষ আসলে কী।

অভিযান শেষে রিয়াজ যখন চন্দ্রপুরীতে ফিরে এলেন, তাঁর চোখের দৃষ্টি বদলে গিয়েছিল। বৈঠককক্ষে সবাই তাঁকে ঘিরে ধরল—নুসরাত, মায়া, ইশতিয়াক, এমনকি কর্নেল তানভীরও। সবাই জানতে চাইছিল, তিনি আসলে কী দেখেছেন। রিয়াজ ধীরে ধীরে বললেন, “আমি কিছু দেখিনি, কিন্তু সবকিছু অনুভব করেছি। বাতাস ঘন হয়ে গিয়েছিল, শব্দ আমার কানে নয়, মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ওরা আমাদের দেখছে, প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে। আমরা ওদের কাছে কেবল আগন্তুক।” কক্ষে নীরবতা নেমে এলো। নুসরাতের চোখ ঝলমল করে উঠল, কারণ তাঁর আবিষ্কার এবার জীবন্ত প্রমাণ পেল। কিন্তু অন্যদের চোখে স্পষ্ট ভয়—যদি এরা কেবল পর্যবেক্ষণ না করে, বরং প্রতিক্রিয়া জানায়? রিয়াজ টেবিলে হাত রেখে বললেন, “আমরা নতুন পৃথিবী গড়তে এসেছি, কিন্তু হয়তো আগে থেকেই এই পৃথিবীর অদৃশ্য বাসিন্দারা এখানে আছে। প্রশ্ন হলো—ওরা কি আমাদের স্বাগত জানাবে, নাকি তাড়িয়ে দেবে?” তাঁর কণ্ঠে ছিল মানবজাতির ভবিষ্যতের শঙ্কা, আর সেই মুহূর্ত থেকে চন্দ্রপুরীর প্রতিটি বাসিন্দা বুঝে গেল—অদৃশ্য প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের প্রথম সংস্পর্শ শুরু হয়ে গেছে, আর এর ফলাফল কেউই অনুমান করতে পারছে না।

চন্দ্রপুরীর হাসপাতালের কক্ষে ড. মায়া সেন দাঁড়িয়ে ছিলেন নিস্তব্ধ হয়ে, চোখের সামনে দৃশ্যগুলো দেখে তিনি যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কয়েকজন কর্মী সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। তারা চিৎকার করছে, নিজের শরীর আঁচড়াচ্ছে, আবার কেউ অদৃশ্য কারো সঙ্গে কথা বলছে। এক তরুণ গবেষক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ফিসফিস করে বলছিল—“ওরা আমাদের মনের ভেতর ঢুকে গেছে… আমার চিন্তাগুলো আমার আর নেই।” মায়া মরিয়া হয়ে তাঁদের শান্ত করতে চাইলেন, কিন্তু যেকোনো ওষুধ, সেডেটিভ বা থেরাপি যেন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল। প্রতিবার তাঁরা চোখ বন্ধ করলেই চমকে উঠে বসে বলত, কেউ তাদের ভেতরে ঢুকে হাঁটছে, স্মৃতি উল্টেপাল্টে দেখছে, ভয়কে বাড়িয়ে তুলছে। মায়ার নিজের হাত কেঁপে উঠল, মনে পড়ল সেই রাতের কথা, যখন তিনি নিজেই ঠান্ডা বাতাস আর ফিসফিসানির শিকার হয়েছিলেন। আজ বুঝতে পারলেন, এই আতঙ্ক শুধুই মানসিক অসুস্থতা নয়, বরং অদৃশ্য প্রাণীদের উপস্থিতি মানুষের চেতনায় সরাসরি আঘাত করছে। হাসপাতালের করিডরে যেন ভয় জমাট বেঁধে আছে, প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি ছায়ায়।

অন্যদিকে, গবেষণা কেন্দ্রে নুসরাত ও ইশতিয়াক একসাথে বসে এই আতঙ্কের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। নুসরাত আবার পরীক্ষাগুলো চালিয়ে দেখলেন, চাঁদের ধুলোয় কম্পন শুধু যন্ত্রে নয়, মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনেও প্রতিফলিত হচ্ছে। তিনি অনুমান করলেন, হয়তো এই অদৃশ্য প্রাণীরা এক ধরনের অজানা তরঙ্গ ব্যবহার করে মানুষের চিন্তায় প্রবেশ করছে, যেন তারা মনের ভেতর দিয়ে পথ খুঁজে নেয়। ইশতিয়াক প্রথমে সবকিছুকে যন্ত্রের বিভ্রান্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন তিনি নিজেই অস্বীকার করতে পারছিলেন না। তিনি যন্ত্রের রেকর্ড দেখিয়ে বললেন, “এটা কোনো যান্ত্রিক বিকৃতি নয়। এরা প্রযুক্তিকে অকার্যকর করে দিতে পারে, আবার মানুষের মনকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” নুসরাত গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন, “আমরা হয়তো এখানে অতিথি, কিন্তু ওরা আমাদের মস্তিষ্ককে খেলনার মতো ব্যবহার করছে।” এই ব্যাখ্যা শুনে গবেষণা দলের বাকিরা স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ল, কেউ আবার এক নিঃশব্দ আতঙ্কে নিজেদের গুটিয়ে নিতে লাগল। বিজ্ঞান আর যুক্তি যেন এই প্রথমবার ভেঙে পড়ছিল অদৃশ্য ভয়ের চাপে।

এদিকে কর্নেল তানভীর আহমেদ আর ধৈর্য রাখতে পারছিলেন না। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, “যদি ওরা আমাদের মনের ভেতরে ঢুকতে পারে, তবে আমাদের লড়াইয়ের কৌশলও বদলাতে হবে। মানসিক প্রতিরক্ষা যতটা সম্ভব বাড়াতে হবে, আর সামরিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভয়কে যদি অস্ত্র বানানো যায়, তবে আমরাও তাদের বিরুদ্ধে ভয়কে ব্যবহার করব।” তিনি সৈন্যদের নিয়ে মহড়া শুরু করলেন, কঠোর শৃঙ্খলা আর মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে লাগলেন। কিন্তু ফলাফল আশানুরূপ হলো না। সৈন্যরা অস্ত্র হাতে দাঁড়ালেই যেন আরও বেশি অস্থির হয়ে যাচ্ছিল। তাঁদের মনে হচ্ছিল, গম্বুজের ভেতরে কারা যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে, অদৃশ্য চোখে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ একে অপরের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে লাগল, যেন সঙ্গীর শরীরেই অদৃশ্য প্রাণী ঢুকে পড়েছে। রিয়াজ হোসেন বৈঠকে বসে নিরুপায় কণ্ঠে বললেন, “চন্দ্রপুরী ভেঙে পড়ার পথে। বিজ্ঞানীরা উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না, সৈন্যরা লড়াই করতে পারছে না, আর মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের মস্তিষ্ক হারাচ্ছে।” তাঁর কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ল, তবু চোখের গভীরে এক ধরনের অটলতা ছিল। সবাই তখন বুঝল—চন্দ্রপুরীর সংকট আর শুধু বৈজ্ঞানিক বা সামরিক নয়, এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে রূপ নিয়েছে। ভয়ই এখানে চূড়ান্ত পরীক্ষা, আর এই পরীক্ষায় জয়ী হতে না পারলে মানুষের চন্দ্রস্বপ্ন ভেঙে যাবে ভোর হওয়ার আগেই।

চন্দ্রপুরীর ভেতরে চারদিক যেন ভয়ের ভারে থমথমে হয়ে আছে। সৈন্যদের চোখে ক্লান্তির ছাপ, বিজ্ঞানীদের মনে অস্থিরতা, আর প্রতিটি করিডরেই চাপা আতঙ্কের গন্ধ লেগে রয়েছে। এই অবস্থায় নুসরাত সিদ্ধান্ত নিলেন আর দেরি করা যাবে না। তিনি তার তৈরি বিশেষ যন্ত্রটি বারবার পরীক্ষা করলেন—চাঁদের ধুলো থেকে সংগৃহীত অদৃশ্য শক্তির কম্পন তরঙ্গ নির্দিষ্ট এক ছকে সাজিয়ে একপ্রকার বার্তা তৈরি করা যায় কি না। নুসরাতের ধারণা ছিল, যদি এই সত্ত্বারা সত্যিই কোনো বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণী হয়ে থাকে, তবে তারা হয়তো সংকেতের উত্তর দিতে পারে। রাতে যখন চন্দ্রপুরীর সবাই ক্লান্তিতে বা আতঙ্কে জেগে-ঘুমিয়ে আছে, তিনি ল্যাবরেটরির ভেতর সেই যন্ত্র চালু করলেন। মেশিনের ভেতর থেকে নিঃশব্দে এক অদৃশ্য তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল, বাতাসে যেন অদেখা কোনো দোলা খেলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র ঘাঁটির ভেতর এক অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এলো। দূরের যন্ত্রগুলো, যেগুলো এতদিন অকারণে বিঘ্নিত হচ্ছিল, আচমকা নিস্তব্ধ হয়ে থেমে গেল। মনে হলো, যেন চাঁদের অচেনা বাসিন্দারা থেমে থেমে শোনার চেষ্টা করছে—মানুষ প্রথমবার তাদের উদ্দেশ্যে কোনো ভাষা পাঠিয়েছে।

নুসরাতের ভেতর এক ধরনের শীতল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি দেখলেন—ড. মায়া সেন হঠাৎ করিডর থেকে দৌড়ে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন, মুখে অবিশ্বাস আর ভয়ের ছাপ। মায়া অনুভব করছিলেন, যেন চারপাশের চাপা আতঙ্ক এক অন্যরকম ভারে রূপ নিয়েছে, নিছক শত্রুতা নয়, বরং এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি যেন সবাইকে বিদ্ধ করছে। একই সময়ে প্রকৌশলী ইশতিয়াক যন্ত্রপাতির পরিমাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর অভ্যস্ত যুক্তিবাদী মন এই অদ্ভুত ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারছিল না। তিনি বারবার যন্ত্রের স্ক্রিনে তাকাচ্ছিলেন—চাঁদের ধুলো থেকে আসা কম্পনের তরঙ্গগুলো হঠাৎ করেই সুশৃঙ্খল হয়ে উঠেছে, যেন কোনো ছন্দে বাঁধা। কর্নেল তানভীর আহমেদ সৈন্যদের সতর্ক থাকতে বললেন, কিন্তু তিনিও বুঝতে পারছিলেন যে, এখানে যুদ্ধ নয়, বরং ভিন্ন এক ধরণের বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া চলছে। বাতাসে ভেসে আসা অদৃশ্য চাপা গুঞ্জন, যা এতদিন শুধু বিভ্রান্ত করেছিল, এবার তা যেন ছন্দে বাঁধা শব্দ হয়ে উঠতে চাইছে।

ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো—এই অদৃশ্য প্রাণীরা মানুষকে হত্যা করতে আসেনি, বরং নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করতে চাইছে। তারা মানুষকে সরাতে চাইছে, কারণ এই অচেনা ধুলো আর তাদের কম্পনময় পরিবেশের ভেতরেই তারা টিকে আছে। নুসরাত গভীরভাবে অনুভব করলেন, হয়তো এই বোঝাপড়ার ভেতরেই বেঁচে থাকার পথ লুকিয়ে আছে। কিন্তু সবাই একমত ছিল না। মায়া সেন বারবার বলছিলেন, এদের প্রভাবে মানুষের মন দুর্বল হয়ে পড়ছে, যদি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তবে সেটা ভয়ঙ্কর হবে। ইশতিয়াক তর্ক তুললেন—যতক্ষণ না পরিষ্কারভাবে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ এটাকে কেবল অনুমান বলা যায় না। আর কর্নেল তানভীর সিদ্ধান্ত নিলেন, সামরিক ব্যবস্থা বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু হঠাৎ আক্রমণও করা যাবে না। চন্দ্রপুরীর ভেতরে যেন প্রথমবার আলোচনার দ্বার খুলল—মানুষ আর অদৃশ্য প্রাণীদের মধ্যে এক অনিশ্চিত কিন্তু সম্ভাবনাময় সেতু তৈরি হলো। নীরব রাতের ভেতর, সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করতে লাগল—ওরা সত্যিই উত্তর দেবে কি না।

১০

চন্দ্রপুরীর আকাশে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল, যেন চাঁদ নিজেই শ্বাস আটকে রেখেছে। সমস্ত সংঘাত, বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের পর অবশেষে রিয়াজ হোসেন এগিয়ে এলেন। তিনি সৈন্যদের, বিজ্ঞানীদের এবং প্রকৌশলীদের নিয়ে একত্রে দাঁড়ালেন ঘাঁটির বিশাল সম্মেলন কক্ষে। ক্লান্ত চোখে সবার দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ। রিয়াজ বললেন, “আমরা এতদিন ধরে ওদের শত্রু ভেবেছি, অথচ ওরা আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল নিজের জায়গা রক্ষার জন্য। চাঁদ আমাদের বাড়ি নয়—আমরা কেবল অতিথি। যদি মানুষ এখানে থাকতে চায়, তবে আমাদের অস্ত্র নয়, বোঝাপড়ার শক্তি ব্যবহার করতে হবে।” তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, কিন্তু সেই দৃঢ়তার ভেতরে ছিল এক অচেনা মমতা। তিনি জানতেন, ভয় আর সন্দেহের দেয়াল ভেঙে ফেলা সহজ নয়, তবুও এই মুহূর্তে চন্দ্রপুরীর প্রতিটি প্রাণীকে এক নতুন সত্য স্বীকার করতে হবে।

নুসরাত তখন ধীরে ধীরে সামনে এলেন। তার আবিষ্কৃত তরঙ্গ-সংকেত যন্ত্রটি নিভু আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, কিভাবে চাঁদের ধুলোয় থাকা অদৃশ্য কম্পনই এই প্রাণীদের অস্তিত্বের কেন্দ্র, কিভাবে সেই কম্পনই মানুষের মনের গভীরে ঢুকে ভয়ের প্রতিচ্ছবি আঁকছিল। তিনি বললেন, “আমরা এতদিন ভেবেছি ওরা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। কিন্তু সত্যি হলো, ওরা আমাদেরকে থামাতে চাইছিল যেন আমরা তাদের জগৎ ভেঙে না ফেলি। সহাবস্থান মানে হবে আমরা তাদের সীমারেখা মান্য করব, আর তারা আমাদের উপস্থিতিকে মেনে নেবে।” ড. মায়া সেন তখন যোগ করলেন, “এটা কেবল বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়ার প্রশ্ন নয়, এটা মানবতারও পরীক্ষা। যদি আমরা এই অদৃশ্য সত্ত্বাদের ভয়কে সম্মান করি, তবে হয়তো তারাও আমাদের ভয়কে বুঝবে।” মায়ার চোখে সহমর্মিতা ছিল, যেন তিনি মানুষ আর অদৃশ্য প্রাণীদের মধ্যে সেতু হয়ে উঠেছেন। ইশতিয়াক, যিনি এতদিন প্রযুক্তির ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন, এবার মাথা নেড়ে স্বীকার করলেন, “যন্ত্র সব কিছু মাপে না, কখনো কখনো হৃদয়ের যুক্তিই পথ দেখায়।” কর্নেল তানভীরও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর হাতের অস্ত্র তখন নিচু হয়ে এসেছে—মনে হচ্ছিল, তিনিও বুঝেছেন যে আসল বিজয় হচ্ছে না হত্যা, বরং টিকে থাকা একসাথে।

চন্দ্রপুরীর মানুষরা সেদিন এক অঘোষিত শপথ নিল—অস্ত্র দিয়ে নয়, কূটনীতি দিয়ে নয়, বরং সহাবস্থানের মাধ্যমে চাঁদে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। রিয়াজ সেই শপথকে উচ্চারণ করলেন সবার সামনে, “আজ থেকে আমরা এদের শত্রু নয়, বরং প্রতিবেশী হিসেবে মেনে নেব। আমরা জানব, চাঁদের মাটি আসলে তাদের ঘর, আর আমরা শুধুই অতিথি।” তার এই ঘোষণার পর চারপাশের নিস্তব্ধতা আবারও অদ্ভুত হয়ে উঠল। বাতাসে অদৃশ্য এক সাড়া ভেসে এলো, যেন প্রাণীরা সত্যিই শোনছে এবং মেনে নিচ্ছে। কেউ তা শব্দে শুনল, কেউ মনে অনুভব করল—কিন্তু সবাই জানল, এটা সম্মতির ইঙ্গিত। সেই রাতে চন্দ্রপুরীতে আতঙ্কের বদলে শান্তি নেমে এলো। বাংলাদেশ যখন পৃথিবীতে খবর পাঠাল, তারা বলল—“আমরা চাঁদে নতুন এক সম্পর্কের শুরু করেছি, যেখানে অস্ত্র নয়, বোঝাপড়াই আমাদের ঢাল।” ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এভাবেই মহাকাশের ইতিহাসে প্রথম দেশ হয়ে দাঁড়াল, যারা যুদ্ধ নয়, সহাবস্থান দিয়ে অজানা প্রাণের সাথে নতুন বন্ধন গড়ল। এই শপথ ছিল না কেবল চাঁদের জন্য, বরং গোটা মানবজাতির জন্য—ভয় নয়, বোঝাপড়াই অজানার পথে যাত্রার একমাত্র চাবিকাঠি।

শেষ

1000061812.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *